পরীক্ষা কোড: ২০৮ | প্রশ্নপত্র কোড: ১২৮
اختبار السنة الرابعة للفاضل البكالوريوس (الشرف) ، لعام ۲۰۲۲
[ফাজিল স্নাতক (সম্মান) চতুর্থ বর্ষ পরীক্ষা, ২০২২]
الحديث والدراسات الإسلامية
[আল-হাদীস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
دراسة الحديث-٣
[দিরাসাতুল হাদীস-৩]
বিষয় কোড: ২০২৮০৯
الوقت — ٤ ساعات | الدرجات الكاملة — ٨٠
[সময় — ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান — ৮০]
الملاحظة : أجب عن اثنين من مجموعة (الف) وعن إثنين من مجموعة (ب) وعن إثنين من مجموعة (ج) وعن إثنين من مجموعة (د) – الأعداد بالهامش تدل على الدرجات كاملة-
[বিশেষ দ্রষ্টব্য: প্রশ্নপত্রের প্রতিটি বিভাগ থেকে পরীক্ষার্থীদের পছন্দের সুযোগ থাকলেও, পূর্ণাঙ্গ একাডেমিক প্রস্তুতি ও রেফারেন্সভিত্তিক অনুশীলনের সুবিধার্থে এখানে প্রতিটি গ্রুপের সকল প্রশ্নের গভীর ও প্রামাণ্য সমাধান উপস্থাপন করা হলো।]
مجموعة (الف) — مصنف عبد الرزاق
(ترجم الأحاديث الآتية ثم أجب عن الأسئلة الملحقة بها)
١- حدثنا عبد الرزاق اخبرنا معمر عن الزهرى قال بعث رسول الله صلى الله عليه وسلم مصعب بن عمير بن هشام إلى اهل المدينة ليقرأهم القرآن فاستأذن رسول الله صلى الله عليه وسلم أن يجمع بهم فأذن له رسول الله صلى الله عليه وسلم وليس يومئذ بأمير ولكنه انطلق يعلم اهل المدينة قال معمر فكان الزهرى حيثما كان أمير فإنه يعظ اصحابه يوم الجمعة ويصلى بهم ركعتين- [الدرجات: ٦]
[১. মূল হাদিসের বাংলা অনুবাদ: ইমাম আব্দুর রাজ্জাক (রহ.) আমাদের হাদিস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আমাদের সংবাদ দিয়েছেন মা’মার (রহ.), তিনি ইমাম যুহরী (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত মুসআব ইবনে উমাইর ইবনে হিশাম (রা.)-কে মদিনাবাসীদের নিকট প্রেরণ করেছিলেন যেন তিনি তাদের পবিত্র কুরআন শিক্ষা দেন। অতঃপর মুসআব (রা.) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট তাদের নিয়ে জুমার সালাত কায়েম করার অনুমতি চাইলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে অনুমতি প্রদান করলেন; অথচ তিনি সেই সময় কোনো রাষ্ট্রীয় শাসক বা গভর্নর ছিলেন না, বরং তিনি মদিনার লোকদের দ্বীন শেখানোর জন্য গমন করেছিলেন। মা’মার বলেন: যুহরী (রহ.) যেখানেই কোনো দায়িত্বশীল বা শাসক থাকতেন, সেখানে জুমার দিন তিনি তাঁর সঙ্গীদের উপদেশ দিতেন (খুতবা পেশ করতেন) এবং তাদের নিয়ে দুই রাকাত সালাত আদায় করতেন।]
ক. হাদিসের শাব্দিক অর্থ ও শব্দকোষ (Vocabulary Table)
হাদিসটির সঠিক ব্যাকরণিক ও শাব্দিক অনুধাবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শব্দসমূহের রূপান্তর নিম্নের সারণিতে উপস্থাপন করা হলো:
| আরবি শব্দ (مفردات) | মূলধাতু ও ব্যাকরণিক রূপ | অর্থ ও তাহকিক |
|---|---|---|
| بَعَثَ | فعل ماض معروف، باب فتح (ب-ع-ث) | প্রেরণ করলেন, পাঠালেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ হিজরতের পূর্বে মদিনায় ইসলামের প্রথম দূত হিসেবে মুসআব ইবনে উমাইর (রা.)-কে পাঠান। |
| لِيُقْرِئَهُمْ | فعل مضارع منصوب بأن مضمرة بعد لام الكي، باب إفعال (ق-ر-أ) | যেন তিনি তাদের কুরআন তিলাওয়াত ও তিলাওয়াতের পদ্ধতি শিক্ষা দেন। |
| فَاسْتَأْذَنَ | فعل ماض، باب استفعال (أ-ذ-ن) | অতঃপর তিনি অনুমতি প্রার্থনা করলেন। দ্বীনের নতুন ইবাদত প্রবর্তনে নববী অনুমোদনের আবশ্যকতা প্রমাণ করে। |
| أَنْ يُجَمِّعَ بِهِمْ | فعل مضارع، باب تفعيل (ج-م-ع) | তাদের নিয়ে জুমার জামাত কায়েম করা বা জুমা আদায় করা। |
| فَأَذِنَ لَهُ | فعل ماض، باب سمع (أ-ذ-ن) | অতঃপর রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে সানন্দে অনুমতি দান করলেন। |
| لَيْسَ يَوْمَئِذٍ بِأَمِيرٍ | فعل ماض ناقص مع ظرف زمان وجار ومجرور | তিনি সে সময় কোনো রাষ্ট্রীয় প্রশাসক বা আমীর ছিলেন না, বরং ছিলেন শিক্ষক ও দ্বীনি প্রতিনিধি। |
| يَعِظُ أَصْحَابَهُ | فعل مضارع، باب وعد (و-ع-ظ) | তিনি তাঁর সঙ্গীদের সদুপদেশ দিতেন ও নসীহত করতেন (খুতবা প্রদান করতেন)। |
| يُصَلِّي بِهِمْ رَكْعَتَيْنِ | فعل مضارع مع جار ومجرور ومفعول به | তাদের নিয়ে ইমামতি করে জুমার দুই রাকাত ফরজ নামাজ আদায় করতেন। |
খ. হাদিসের সনদ ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট (সববে উরূদ ও শরাহ)
এই হাদিসটি সংকলিত হয়েছে ইমাম আব্দুর রাজ্জাক আস-সান’আনী (রহ.)-এর জগদ্বিখ্যাত হাদিস কোষ আল-মুসান্নাফ-এর কিতাবুল জুমুআহ অধ্যায়ে (হাদিস নং: ৫১৫৮)। হাদিসের সনদটি মুহাদ্দিসীনদের নিকট ‘উচ্চমানের স্বর্ণশৃঙ্খল’ হিসেবে বিবেচিত:
«عَبْدُ الرَّزَّاقِ عَنْ مَعْمَرِ بْنِ رَاشِدٍ عَنِ ابْنِ شِهَابٍ الزُّهْرِيِّ»
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: প্রথম আকাবার বায়আতের পর মদিনার ১২ জন বিশিষ্ট আনসার সাহাবি ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেন। তারা মদিনায় ফিরে গিয়ে দ্বীন শেখার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে একজন প্রাজ্ঞ শিক্ষকের আবেদন করেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ তরুণ ও তেজস্বী সাহাবি হযরত মুসআব ইবনে উমাইর (রা.)-কে মদিনায় পাঠান। মদিনায় আসআদ ইবনে যুরারাহ (রা.)-এর আতিথেয়তায় থেকে মুসআব (রা.) দাওয়াত বিস্তার করেন। যখন মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, তখন তিনি অনুভব করেন যে ইহুদিরা শনিবারে এবং খ্রিস্টানরা রবিবারে উপাসনা করে; অতএব মুসলমানদের জন্য সপ্তাহের সবচেয়ে মহিমান্বিত দিন জুমাবারে সম্মিলিত উপাসনা করা উচিত। তিনি পত্র মারফত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নিকট অনুমতি প্রার্থনা করলে নবীজি ﷺ তাঁকে জুমার জামাত কায়েম করার নির্দেশ দেন।
(الف) ما معنى الجمعة ومتى فرضت؟ اين اقام النبى صلى الله عليه وسلم اول جمعة فى الإسلام؟ بين- [الدرجات: ٤]
১. জুমার শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ (معنى الجمعة)
শাব্দিক অর্থ: আরবি ‘জুমু’আহ’ (الْجُمُعَةُ) শব্দটি ج-م-ع (জিম-মিম-আইন) মূলধাতু থেকে উদ্ভূত। এর আভিধানিক অর্থ হলো একত্রিত হওয়া, সমবেত করা, জমায়েত হওয়া বা সংহত হওয়া। সপ্তাহের ষষ্ঠ দিনটিকে ‘ইয়াওমুল জুমুআহ’ বলা হয়, কারণ এ দিনে মুসলিম উম্মাহ মহান আল্লাহর স্মরণে একই জামাতে বৃহৎ পরিসরে সমবেত হয়। জাহেলি যুগে এই দিনটিকে ‘ইয়াওমু আরূবাহ’ (يَوْمُ عَرُوبَةَ) বলা হতো। হযরত কা’ব ইবনে লুআই সর্বপ্রথম কুরাইশদের এই দিনে একত্র করে ভাষণ দিতেন বিধায় একে জুমা নামে অভিহিত করার ধারা সূচিত হয়।
পারিভাষিক অর্থ: শরীয়তের পরিভাষায়, প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ ও মুকীম মুসলিম পুরুষদের জন্য জুমার দিন জোহরের ওয়াক্তে চার রাকাতের পরিবর্তে জামাতের সাথে নির্দিষ্ট শর্ত ও খুতবাসহ দুই রাকাত ফরজ নামাজ আদায় করাকে ‘সালাতুল জুমু’আহ’ (صلاة الجمعة) বলা হয়।
২. জুমা কখন ফরজ হয়? (متى فرضت الجمعة؟)
মুহাদ্দিসীন ও ফুকাহায়ে কেরামের নির্ভরযোগ্য তাহকিক অনুযায়ী, জুমার নামাজের বিধান হিজরতের পূর্বেই মক্কা মুকাররমায় ফরজ হয়েছিল। তবে মক্কায় মুশরিকদের চরম নির্যাতন, প্রকাশ্য জমায়েতে নিষেধাজ্ঞা এবং সার্বভৌম কর্তৃত্বের অভাবের কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে জুমার জামাত কায়েম করতে পারেননি। সূরা আল-জুমুআহর নির্দেশাবলি মক্কায় অবতীর্ণ হলেও এর প্রথম বাস্তবায়ন ঘটে মদিনায় হযরত মুসআব ইবনে উমাইর (রা.)-এর মাধ্যমে এবং স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ﷺ কর্তৃক হিজরতের ঐতিহাসিক সফরে।
৩. ইসলামে রাসূলুল্লাহ ﷺ কর্তৃক সর্বপ্রথম জুমা কায়েমের স্থান (أين أقام النبي ﷺ أول جمعة؟)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনার উপকণ্ঠে কুবা নামক স্থানে উপনীত হন। সেখানে তিনি সোমবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত অবস্থান করে ইসলামের প্রথম মসজিদ ‘মসজিদে কুবা’র ভিত্তি স্থাপন করেন। অতঃপর শুক্রবার সকালে তিনি মদিনা মুনাওয়ারার মূল শহরের অভিমুখে রওয়ানা হন।
পথিমধ্যে মদিনার বনু সালিম ইবনে আউফ গোত্রের উপত্যকায়—যা ‘ওয়াদি রানুনা’ (وادي رانوناء) নামে প্রসিদ্ধ—পৌঁছলে জুমার ওয়াক্ত উপস্থিত হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানেই তাঁর উষ্ট্রী থামান এবং সাহাবায়ে কেরামকে সাথে নিয়ে ঐতিহাসিক প্রথম জুমার খুতবা প্রদান করেন ও দুই রাকাত জুমার নামাজ কায়েম করেন। এই ঐতিহাসিক স্থানেই পরবর্তীতে নির্মিত হয় বিখ্যাত ‘মসজিদুল জুমুআহ’ (مسجد الجمعة), যা আজ পর্যন্ত ইসলামের প্রথম নববী জুমার স্মৃতি বহন করছে। এই জামাতে প্রায় একশত জন সাহাবি অংশগ্রহণ করেছিলেন।
٢- عن عبد الله بن عمر عن خبيب بن عبد الرحمن عن حفص بن عاصم عن أبى هريرة (رض) ان النبى صلى الله عليه وسلم قال: ما بين بيتى وبين منبرى روضة من رياض الجنة ومنبرى على حوضى- [الدرجات: ٦]
[২. মূল হাদিসের বাংলা অনুবাদ: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি খুবাইব ইবনে আব্দুর রহমান থেকে, তিনি হাফস ইবনে আসিম থেকে এবং তিনি হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “আমার ঘর (রওজা মোবারক) এবং আমার মিম্বরের মধ্যবর্তী স্থানটি হলো জান্নাতের বাগানসমূহের মধ্য থেকে একটি অনন্য বাগান; আর আমার মিম্বরটি অবস্থান করছে আমার হাউযের (হাউযে কাওসারের) ওপর।”]
ক. হাদিসের শাব্দিক অর্থ ও শব্দকোষ (Vocabulary Table)
| আরবি শব্দ (مفردات) | মূলধাতু ও ব্যাকরণিক রূপ | অর্থ ও তাহকিক |
|---|---|---|
| بَيْتِي | اسم مضاف إلى ياء المتكلم | আমার ঘর; রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ওফাতের পর যেখানে তাঁকে দাফন করা হয়েছে (হযরত আয়েশা রা.-এর হুজরা)। |
| مِنْبَرِي | اسم آلة، باب نصر (ن-ب-ر) | আমার মিম্বর; যে কাষ্ঠনির্মিত তিন ধাপবিশিষ্ট স্থানে দাঁড়িয়ে রাসুলুল্লাহ ﷺ খুতবা দিতেন। |
| رَوْضَةٌ | اسم مفرد مؤنث، جمع: رِيَاض | বাগান, সুশোভিত কানন, শ্যামল প্রান্তর। রহমত ও মাগফিরাতের অফুরন্ত স্থান। |
| رِيَاضِ الْجَنَّةِ | مركب إضافي | জান্নাতের বাগানসমূহ। আখেরাতের চিরশান্তির উদ্যান। |
| حَوْضِي | اسم مضاف إلى ياء المتكلم | আমার হাউয; কেয়ামতের ময়দানে উম্মতে মুহাম্মাদীকে তৃষ্ণা নিবারণ করার জন্য প্রদত্ত বিশেষ জলাধার (হাউযে কাওসার)। |
খ. হাদিসের তাত্পর্য ও উলামায়ে কেরামের ব্যাখ্যা
ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) ফাতহুল বারী গ্রন্থে এবং ইমাম নববী (রহ.) শারহু সহীহ মুসলিম-এ এই হাদিসের তিনটি গভীর অর্থ ব্যাখ্যা করেছেন:
- রূপক অর্থ (المجاز): এই স্থানে ইবাদত, তিলাওয়াত, দরূদ ও রোনাজারি জান্নাতে প্রবেশের প্রধান কারণ হয়। অর্থাৎ এখানে ইবাদতের প্রতিদান জান্নাত।
- বাস্তব অর্থ (الحقيقة): এই পবিত্র ভূখণ্ডটি আক্ষরিক অর্থেই জান্নাতের মাটি থেকে আনা হয়েছে অথবা কেয়ামতের দিন এই স্থানটিকে হুবহু জান্নাতে স্থানান্তর করা হবে।
- মিম্বরের অবস্থান: নবীজি ﷺ-এর মিম্বরটি আখেরাতে হাউযে কাওসারের তীরে পুনঃস্থাপিত হবে, যেখান থেকে নবীজি তাঁর প্রিয় উম্মতকে নিজ হাতে পানি পান করাবেন।
(الف) ما معنى الكوثر؟ بين أوصاف الحوض فى ضوء الحديث- [الدرجات: ٤]
১. কাওসারের অর্থ (معنى الكوثر)
শাব্দিক অর্থ: ‘আল-কাওসার’ (الْكَوْثَرُ) শব্দটি আরবি ك-ث-ر (কাফ-ছা-রা) ধাতু থেকে ‘ফাওআল’ (فَوْعَل) ওজনে গঠিত একটি সিফাতে মুবালাগা বা অতিশয়ার্থক বিশেষ্য। এর আভিধানিক অর্থ হলো অগাধ, অসীম ও প্রাচুর্যময় কল্যাণ (الْخَيْرُ الْكَثِيرُ)।
পারিভাষিক অর্থ: শরীয়তের পরিভাষায় কাওসার হলো সেই জান্নাতী নহর বা নদী, যা মহান রাব্বুল আলামীন তাঁর প্রিয় হাবীব মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিশেষ উপহার হিসেবে দান করেছেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: «إِنَّا أَعْطَيْنَاكَ الْكَوْثَرَ» (নিশ্চয়ই আমি আপনাকে কাওসার দান করেছি)। হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, জান্নাতের কাওসার নদী থেকেই হাশরের ময়দানে অবস্থিত ‘হাউযে কাওসারে’ অবিরত দুটি নালার মাধ্যমে সুমিষ্ট পানি প্রবাহিত হবে।
২. হাদিসের আলোকে হাউযে কাওসারের প্রামাণ্য বিবরণ ও বৈশিষ্ট্য (أوصاف الحوض)
সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম এবং মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাকে বর্ণিত বিশুদ্ধ হাদিসসমূহের আলোকে হাউযে কাওসারের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ নিম্নরূপ:
- বিশালতা ও আয়তন: রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন, আমার হাউযের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তের দূরত্ব এক মাসের পথ। এর দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ সমান চতুর্ভুজাকৃতির—যেমন ইয়েমেনের সান’আ থেকে সিরিয়ার আম্মান বা জর্ডানের আইলাহ পর্যন্ত বিস্তৃত।
- পানির গুণাগুণ ও শুভ্রতা: এর পানি দুধ বা বরফের চেয়েও অধিক শুভ্র এবং খাঁটি মধুর চেয়েও অধিক মিষ্টি ও সুস্বাদু।
- সুগন্ধি: এর সুবাস হবে মেশক আম্বরের সুগন্ধির চেয়েও অধিক মনমাতানো ও পবিত্র।
- পানপাত্রের সংখ্যা: হাউযের চতুর্পাশে রক্ষিত পানপাত্রের সংখ্যা হবে রাতের মেঘমুক্ত আকাশের উজ্জ্বল তারকারাজির চেয়েও অধিক অসংখ্য ও নক্ষত্রখচিত।
- তৃষ্ণা নিবারণের চিরস্থায়ী বরকত: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
«مَنْ شَرِبَ مِنْهُ شَرْبَةً لَمْ يَظْمَأْ بَعْدَهَا أَبَدًا»
“যে ব্যক্তি এই হাউয থেকে একবার পানি পান করবে, সে জীবনে আর কখনোই তৃষ্ণার্ত হবে না।”
- অনাকাঙ্ক্ষিত বঞ্চিত দল: কিছু লোক এই হাউযের নিকট উপস্থিত হতে চাইলে ফেরেশতাগণ তাদের তাড়িয়ে দেবেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলবেন, “তারা তো আমার উম্মত!” তখন বলা হবে, “আপনি জানেন না, আপনার ওফাতের পর এরা দ্বীনের মধ্যে কী কী বিদআত ও বিকৃতি আবিষ্কার করেছিল!” তখন নবীজি ﷺ বলবেন: «سُحْقًا سُحْقًا لِمَنْ غَيَّرَ بَعْدِي» (দূর হও, দূর হও তারা, যারা আমার পর দ্বীনকে বিকৃত করেছে!)।
٣- أخبرنا عبد الرزاق قال اخبرنا معمر عن أبى إسحاق عن أبى عمرو الشيبانى أنه رأى ابن مسعود يخرج النساء من المسجد ويقول اخرجن إلى بيوتكن خير لكن- [الدرجات: ٦]
[৩. মূল হাদিসের বাংলা অনুবাদ: ইমাম আব্দুর রাজ্জাক (রহ.) বলেন: আমাদের সংবাদ দিয়েছেন মা’মার (রহ.), তিনি আবু ইসহাক থেকে, তিনি আবু আমর আশ-শায়বানী (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি প্রখ্যাত সাহাবি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-কে মসজিদ থেকে নারীদের বের করে দিতে দেখেছেন এবং তিনি বলছিলেন: “তোমরা বের হয়ে তোমাদের ঘরে ফিরে যাও, কেননা তোমাদের ঘরই তোমাদের জন্য অধিক কল্যাণকর ও সর্বোত্তম।”]
ক. হাদিসের শাব্দিক অর্থ ও শব্দকোষ (Vocabulary Table)
| আরবি শব্দ (مفردات) | মূলধাতু ও ব্যাকরণিক রূপ | অর্থ ও তাহকিক |
|---|---|---|
| يُخْرِجُ النِّسَاءَ | فعل مضارع مع مفعول به، باب إفعال (خ-ر-ج) | তিনি নারীদের মসজিদ থেকে বের করে দিচ্ছিলেন। সাহাবিদের ফিকহি সতর্কতামূলক পদক্ষেপ। |
| اخْرُجْنَ | فعل أمر للمخاطبات المؤنث، باب نصر | তোমরা নারীরা বের হয়ে যাও। |
| إِلَىٰ بُيُوتِكُنَّ | جار ومجرور مع ضمير الجمع المؤنث | তোমাদের নিজ নিজ গৃহের অভ্যন্তরে। |
| خَيْرٌ لَّكُنَّ | اسم تفضيل مع جار ومجرور | তোমাদের জন্য সর্বোত্তম ও অধিক পুণ্যময়। নারী সমাজের মর্যাদা ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। |
খ. আছারের প্রেক্ষাপট ও সাহাবায়ে কেরামের দৃষ্টিভঙ্গি
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) ছিলেন ফিকহ ও তাফসিরের শীর্ষস্থানীয় ইমাম। তিনি কুফায় অবস্থানকালে লক্ষ্য করেন যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর যুগের মতো পবিত্র ও নিষ্পাপ পরিবেশ ধীরে ধীরে হ্রাস পাচ্ছে এবং জনসমাগমে নারীদের উপস্থিতির কারণে সামাজিক বিশৃঙ্খলা ও ফেতনার আশঙ্কা সৃষ্টি হচ্ছে। তিনি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সেই বাণীর মূল মর্ম উপলব্ধি করেছিলেন যেখানে ইরশাদ হয়েছে: «صَلاَةُ الْمَرْأَةِ فِي بَيْتِهَا أَفْضَلُ مِنْ صَلاَتِهَا فِي حُجْرَتِهَا، وَصَلاَتُهَا فِي مَخْدَعِهَا أَفْضَلُ مِنْ صَلاَتِهَا فِي بَيْتِهَا» (নারীর জন্য ঘরের নামাজ বাইরের নামাজের চেয়ে এবং অন্দরমহলের নামাজ ঘরের নামাজের চেয়ে বহুগুণে উত্তম)। তাই তিনি ফেতনা প্রতিরোধে ও নারীদের মর্যাদা রক্ষার্থে এই কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন।
(الف) ما حكم خروج النساء إلى المساجد لصلاة الجمعة أو الصلوات الخمس؟ أوضح هذه المسئلة بالدلائل مع اختلاف العلماء- [الدرجات: ٤]
১. মূল মাসআলা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
ইসলামের প্রাথমিক যুগে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় নারীদের মসজিদে এসে জামাতে ও জুমায় শরিক হওয়ার সাধারণ অনুমতি ছিল। তবে সেই অনুমতির সাথে কঠোর শর্তাবলি যুক্ত ছিল—যেমন সুগন্ধি ব্যবহার না করা, পর্দার পূর্ণ অনুশাসন মেনে চলা, শেষ কাতারে দাঁড়ানো এবং পুরুষদের পূর্বে মসজিদ ত্যাগ করা। নবীজি ﷺ একই সাথে এ কথাও স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে: «وَبُيُوتُهُنَّ خَيْرٌ لَهُنَّ» (মসজিদে আসার অনুমতি থাকলেও তাদের নিজ গৃহই তাদের জন্য অধিক কল্যাণকর)।
২. উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.)-এর ঐতিহাসিক অভিমত
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের অল্প কিছুদিন পরেই সমাজবাস্তবতায় পরিবর্তন লক্ষ্য করে উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন:
«لَوْ أَدْرَكَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ مَا أَحْدَثَ النِّسَاءُ لَمَنَعَهُنَّ الْمَسَاجِدَ كَمَا مُنِعَتْ نِسَاءُ بَنِي إِسْرَائِيلَ»
“আজ নারীরা যে অবস্থার সৃষ্টি করেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ যদি তা প্রত্যক্ষ করতেন, তবে তিনি নিশ্চিতভাবেই তাদের মসজিদে প্রবেশ নিষিদ্ধ করতেন, যেভাবে বনী ইসরাঈলের নারীদের জন্য তা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।” [সহীহ বুখারী: ৮৬৯, সহীহ মুসলিম: ৪৪৫]
৩. ফুকাহায়ে কেরামের মাযহাবভিত্তিক মতপার্থক্য ও বিশ্লেষণ (اختلاف العلماء)
| মাযহাব | শারঈ হুকুম ও সিদ্ধান্ত | প্রধান দলীল ও কারণ |
|---|---|---|
| হানাফি মাযহাব | বর্তমান যুগে যুবতী ও বয়োবৃদ্ধা সকল নারীর জন্যই পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, জুমা ও ঈদের জামাতে মসজিদে যাওয়া মাকরূহে তাহরীমী (নিষিদ্ধতুল্য)। | হযরত উমর (রা.) ও ইবনে মাসউদ (রা.)-এর নিষেধাজ্ঞা, হযরত আয়েশা (রা.)-এর আছার এবং ‘ফাসাদে যামান’ (যুগের নৈতিক অবক্ষয়)। ফেতনা দূরীকরণ শরীয়তে কল্যাণের চেয়েও অগ্রগণ্য। |
| শাফেঈ মাযহাব | সুন্দরী ও যুবতী নারীদের জন্য মসজিদে যাওয়া মাকরূহ; তবে বয়োবৃদ্ধা নারীদের জন্য সাজসজ্জাহীন অবস্থায় ও ফেতনামুক্ত পরিবেশে যাওয়া জায়েয। | নবীজি ﷺ-এর বাণী: «لا تمنعوا إماء الله مساجد الله»، তবে ফেতনার সম্ভাবনা দেখা দিলে সবার জন্যই মাকরূহ হবে। |
| মালেকি মাযহাব | যুবতীদের জন্য মসজিদে আসা সর্বাবস্থায় নিষিদ্ধ; বয়োবৃদ্ধা যাদের প্রতি কোনো আকর্ষণ নেই, তাদের জন্য কেবল দিনের বেলায় মসজিদে জামাতে অংশ নেওয়া মুবাহ। | সদ্দে যারীআহ (অন্যায় ও ফেতনার পথ বন্ধ করার মূলনীতি)। |
| হাম্বলি মাযহাব | পূর্ণ পর্দা রক্ষা করে, সুগন্ধি পরিহার করে এবং স্বামীর অনুমতি সাপেক্ষে উপস্থিত হওয়া বৈধ, তবে ঘরে নামাজ পড়াই সর্বসম্মতভাবে শ্রেষ্ঠ। | নবীজি ﷺ নিষেধ করতে বারণ করেছেন, তবে নিজ ঘরের নামাজকে শ্রেষ্ঠ বলে আখ্যায়িত করেছেন। |
সারসংক্ষেপ: হানাফি ফিকহের সিদ্ধান্ত মতে, বর্তমান যুগের ব্যাপক নৈতিক অবক্ষয়, অবাধ মেলামেশা ও ফেতনার পরিপ্রেক্ষিতে নারীদের জন্য মসজিদে গিয়ে জুমা বা পাঞ্জেগানা সালাত আদায় করা মাকরূহে তাহরীমী। তাদের জন্য নিজ গৃহকোণে নামাজ আদায় করা হাজার গুণ শ্রেষ্ঠ ও অধিক পুণ্যময়।
٤- حدثنا عبد الرزاق عن الثورى عن رجل سماه عن ابراهيم قال رفع اليدين والقنوت فى الجمعة بدعة- [الدرجات: ٦]
[৪. মূল হাদিসের বাংলা অনুবাদ: ইমাম আব্দুর রাজ্জাক (রহ.) সুফিয়ান আস-সাওরী (রহ.) থেকে, তিনি এক নির্দিষ্ট ব্যক্তি থেকে এবং তিনি প্রখ্যাত তাবেয়ী ইমাম ইবরাহিম আন-নাখায়ী (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন: জুমার সালাতে (তাকবীরে তাহরীমা ব্যতীত রুকুতে যাওয়া ও ওঠার সময়) উভয় হাত ওঠানো (রাফউল ইয়াদাইন করা) এবং জুমার নামাজে কুনূত পাঠ করা বিদআত।]
ক. হাদিসের শাব্দিক অর্থ ও শব্দকোষ (Vocabulary Table)
| আরবি শব্দ (مفردات) | মূলধাতু ও ব্যাকরণিক রূপ | অর্থ ও তাহকিক |
|---|---|---|
| رَفْعُ الْيَدَيْنِ | مصدر مضاف إلى المثنى، باب فتح (ر-ف-ع) | উভয় হাত উত্তোলন করা; নামাজে তাকবীরের সময় কান বা কাঁধ পর্যন্ত হাত তোলা। |
| الْقُنُوتُ | مصدر، باب نصر (ق-ن-ت) | বিনম্র প্রার্থনা, দোয়া; এখানে নামাজে রুকুর পূর্বে বা পরে পঠিত বিশেষ মোনাজাত উদ্দেশ্য। |
| فِي الْجُمُعَةِ | جار ومجرور | জুমার নামাজের ভেতরে। |
| بِدْعَةٌ | اسم مصدر، باب ضرب (ب-د-ع) | সুন্নাহ পরিপন্থী নবউদ্ভাবিত রীতি বা অপছন্দনীয় কাজ। |
খ. আছারের ফিকহি প্রেক্ষাপট
ইমাম ইবরাহিম আন-নাখায়ী (রহ.) ছিলেন কুফার ফিকহি ঐতিহ্যের প্রধান স্তম্ভ এবং হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) ও হযরত আলী (রা.)-এর ইলমি ধারার প্রধান মুখপাত্র। কুফার ফকীহগণের নিকট নামাজে তাকবীরে তাহরীমার পর অন্য কোথাও হাত না তোলাই ছিল রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর জীবনের সর্বশেষ ও অপরিবর্তিত আমল। এছাড়া জুমার ফরজ নামাজে অহেতুক কুনূতের প্রচলনকেও বিদআত গণ্য করা হয়েছে, কারণ নবীজি ﷺ বিশেষ বিপদ (নাযেলাহ) ছাড়া জুমায় নিয়মিত কুনূত পড়েননি।
(ألف) كم مرة يرفع اليدين فى الصَّلوة؟ اثبت بالدلائل مع اختلاف الائمة- [الدرجات: ٤]
১. মাসআলার স্বরূপ ও মূল মতপার্থক্য
নামাজে কতবার হাত তুলতে হবে—এ বিষয়ে সাহাবায়ে কেরামের যুগ থেকেই সুপরিচিত ফিকহি ইজতিহাদ ও বৈচিত্র্য বিদ্যমান। সকল ইমাম একমত যে, নামাজের প্রারম্ভে তাকবীরে তাহরীমার সময় হাত তোলা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। কিন্তু রুকুতে যাওয়ার সময়, রুকু থেকে ওঠার সময় এবং তৃতীয় রাকাতের শুরুতে হাত তোলা হবে কি না—এ নিয়ে মুজতাহিদ ইমামগণের মাঝে দুটি মূল মতামত রয়েছে।
২. ইমামগণের মতামত ও দলীলভিত্তিক পর্যালোচনা (اختلاف الأئمة)
প্রথম মত (হানাফি মাযহাব ও ইমাম মালিকের প্রসিদ্ধ রেওয়ায়েত):
হানাফি ফুকাহায়ে কেরাম এবং ইমাম মালিক (রহ.)-এর কিতাবুল মুদাওওয়ানার বর্ণনা অনুযায়ী: নামাজে কেবল একবারই হাত তুলতে হবে—আর তা হলো তাকবীরে তাহরীমার সময় (এছাড়া বিতরের কুনূতে এবং ঈদের অতিরিক্ত তাকবীরসমূহে হাত তোলা হবে, কিন্তু সাধারণ নামাজে রুকু ও সেজদায় আর হাত তোলা যাবে না)।
হানাফি মাযহাবের অকাট্য দলীলসমূহ:
- হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর সহীহ হাদিস:
«أَلاَ أُصَلِّي بِكُمْ صَلاَةَ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ؟ فَصَلَّى فَلَمْ يَرْفَعْ يَدَيْهِ إِلاَّ فِي أَوَّلِ مَرَّةٍ»
“ইবনে মাসউদ (রা.) বললেন: আমি কি তোমাদের রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নামাজ পড়ে দেখাব না? অতঃপর তিনি নামাজ আদায় করলেন এবং প্রথমবার (তাকবীরে তাহরীমা) ব্যতীত আর কোনো স্থানেই হাত তুললেন না।” [সুনানে তিরমিযী: ২৫৭—ইমাম তিরমিযী বলেন: হাদিসটি হাসান; সুনানে নাসাঈ: ১০২৬, সুনানে আবু দাউদ: ৭৪৮]।
- হযরত বারা ইবনে আযিব (রা.)-এর হাদিস: তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন নামাজের শুরুতে তাকবীর দিতেন তখন কান পর্যন্ত উভয় হাত তুলতেন, অতঃপর নামাজ সমাপ্ত করা পর্যন্ত আর হাত তুলতেন না [সুনানে আবু দাউদ: ৭৪৯]।
- খুলাফায়ে রাশেদীনের আমল: হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) এবং হযরত আলী (রা.) তাকবীরে তাহরীমা ব্যতীত রুকুতে হাত তুলতেন না [মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বাহ ও মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক]।
- নামাজে প্রশান্তি রক্ষা (السكون في الصلاة): রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: «مَا لِي أَرَاكُمْ رَافِعِي أَيْدِيكُمْ كَأَنَّهَا أَذْنَابُ خَيْلٍ شُمْسٍ؟ اسْكُنُوا فِي الصَّلَاةِ» (তোমাদের কী হলো যে অবাধ্য চঞ্চল ঘোড়ার লেজের মতো হাত তুলছ? তোমরা নামাজে স্থিরতা বজায় রাখো!) [সহীহ মুসলিম: ৪৩০]।
দ্বিতীয় মত (শাফেঈ, হাম্বলি মাযহাব ও আহলুল হাদিস):
ইমাম শাফেঈ ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর মতে নামাজে চার স্থানে হাত তোলা মুস্তাহাব: ১. তাকবীরে তাহরীমার সময়, ২. রুকুতে যাওয়ার সময়, ৩. রুকু থেকে মাথা তোলার সময় («سمع الله لمن حمده» বলার সময়), এবং ৪. প্রথম তাশাহহুদের পর তৃতীয় রাকাতের জন্য দাঁড়ানোর সময়।
তাদের প্রধান দলীল: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.)-এর হাদিস, যাতে বর্ণিত হয়েছে যে নবীজি ﷺ তাকবীরে তাহরীমায়, রুকুতে যাওয়ার সময় এবং রুকু থেকে ওঠার সময় কাঁধ পর্যন্ত হাত তুলতেন [সহীহ বুখারী: ৭৩৫, সহীহ মুসলিম: ৩৯০]。
সমন্বয় ও হানাফি দৃষ্টিভঙ্গি: হানাফি ফুকাহায়ে কেরামের তাহকিক হলো—ইসলামের সূচনালগ্নে রুকুতে যাওয়ার ও ওঠার সময় হাত তোলার বিধান ছিল, যা হযরত ইবনে উমর (রা.) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু পরবর্তীতে নামাজে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অধিকতর স্থিরতা ও বিনম্রতা নিশ্চিত করতে প্রথম তাকবীর ব্যতীত অন্যান্য তাকবীরে হাত তোলার বিধান মানসূখ (রহিত) হয়ে যায় এবং একমাত্র তাকবীরে তাহরীমার বিধানটিই কিয়ামত পর্যন্ত বহাল থাকে। উভয় পক্ষের দলীল বিশুদ্ধ, তবে হানাফি আমলটি অধিকতর প্রশান্তিদায়ক ও অপরিবর্তিত নববী আদর্শের ধারক।
مجموعة (ب) — مصنف ابن أبى شيبة
(ترجم الأحاديث التالية ثم أجب عن الأسئلة الملحقة بها)
٥- حدثنا وكيع قال حدثنا مسعر عن زيد العمّى عن ابى الصديق الناجى أن سليمان بن داؤد خرج بالناس يستسقى فمر على نملة مستلقية على قفاها رافعة قوائمها إلى السماء هي تقول اللهم إنى خلق من خلقك ليس بنا غنى عن رزقك فإما أن تسقينا وأما أن تهلكنا فقال سليمان للناس ارجعوا فقد سقيتم بدعوة غيركم- [الدرجات: ٦]
[৫. মূল হাদিসের বাংলা অনুবাদ: ইমাম আবু বকর ইবনে আবি শায়বাহ (রহ.) বলেন: আমাদের হাদিস বর্ণনা করেছেন ওয়াকী ইবনুল জাররাহ (রহ.), তিনি বলেন: আমাদের হাদিস বর্ণনা করেছেন মিস’আর (রহ.), তিনি যায়দ আল-আম্মী থেকে, তিনি আবুস সিদ্দীক আন-নাজী (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন যে, হযরত সুলায়মান ইবনে দাউদ (আ.) বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা (ইস্তিসকা) করতে লোকদের নিয়ে প্রান্তরে বের হলেন। পথিমধ্যে তিনি একটি পিপীলিকার পাশ দিয়ে অতিক্রম করলেন, যা তার পিঠের ওপর চিৎ হয়ে শুয়ে আকাশের দিকে তার পাগুলো প্রসারিত করে বলছিল: “হে আল্লাহ! নিশ্চয় আমি আপনার সৃষ্টিসমূহের মধ্য থেকে একটি সৃষ্টি; আপনার প্রদত্ত রিজিক ছাড়া আমাদের বেঁচে থাকার বিন্দুমাত্র কোনো উপায় নেই। অতএব, হয় আপনি আমাদের বৃষ্টি দিয়ে সিক্ত করুন, নতুবা আমাদের ধ্বংস করে দিন!” এ দৃশ্য দেখে হযরত সুলায়মান (আ.) লোকদের লক্ষ্য করে বললেন: “তোমরা ফিরে চলো; কেননা তোমাদের বাদ দিয়ে অপর এক সৃষ্টির দোয়ার কারণেই তোমাদের বৃষ্টি দিয়ে সিক্ত করা হয়েছে!”]
ক. হাদিসের শাব্দিক অর্থ ও শব্দকোষ (Vocabulary Table)
| আরবি শব্দ (مفردات) | মূলধাতু ও ব্যাকরণিক রূপ | অর্থ ও তাহকিক |
|---|---|---|
| يَسْتَسْقِي | فعل مضارع، باب استفعال (س-ق-ي) | বৃষ্টির জন্য সকাতরে প্রার্থনা করা (সালাতুল ইস্তিসকা আদায় করা)। |
| مُسْتَلْقِيَةً | اسم فاعل، باب استفعال (ل-ق-ي) | চিৎ হয়ে শায়িত অবস্থায়, পিঠ মাটিতে লাগিয়ে। চূড়ান্ত অক্ষমতা ও দৈন্য প্রকাশের প্রতীক। |
| عَلَى قَفَاهَا | جار ومجرور مع ضمير الغائبة | তার পিঠ বা ঘাড়ের ওপর ভর করে। |
| رَافِعَةً قَوَائِمَهَا | اسم فاعل منصوب على الحال مع مفعول به | তার পাগুলো আকাশের দিকে উত্তোলন করে। মহান আল্লাহর প্রতি কায়মনোবাক্যে দোয়ার রূপ। |
| لَيْسَ بِنَا غِنًى | جملة اسمية منفية | আমাদের কোনো অমুখাপেক্ষিতা বা উপায় নেই। আমরা আপনার রহমতের প্রতি সম্পূর্ণ অভাবগ্রস্ত। |
| سُقِيتُمْ | فعل ماض مجهول، باب ضرب (س-ق-ي) | তোমাদের বৃষ্টি দিয়ে সিক্ত করা হয়েছে বা পিপাসা নিবারণ করা হয়েছে। |
| بِدَعْوَةِ غَيْرِكُمْ | مركب إضافي مع جار ومجرور | তোমাদের ব্যতিরেকে অপর এক দুর্বল সৃষ্টির (পিপীলিকার) আকুল প্রার্থনার বরকতে। |
খ. হাদিসের সনদ ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা (روح الحديث)
এই হাদিসটি ইমাম আবু বকর ইবনে আবি শায়বাহ (রহ.) তাঁর বিশ্বখ্যাত আল-মুসান্নাফ-এর কিতাবুদ দোয়ায় (কিতাবুস সালাত/ইস্তিসকা অধ্যায়) সংকলন করেছেন। এই হাদিসটি আল্লাহর রহমতের এক অভূতপূর্ব দিগন্ত উন্মোচন করে:
- সৃষ্টিজগতের তসবিহ ও প্রার্থনা: পিপীলিকার মতো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রাণীও তাদের স্রষ্টাকে চেনে এবং নিজেদের ভাষায় বিপদাপদে একমাত্র তাঁরই নিকট সাহায্য প্রার্থনা করে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: «وَإِنْ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا يُسَبِّحُ بِحَمْدِهِ وَلَكِنْ لَا تَفْقَهُونَ تَسْبِيحَهُمْ» (বিশ্বজগতের প্রতিটি বস্তুই আল্লাহর প্রশংসাসহ পবিত্রতা ঘোষণা করে, কিন্তু তোমরা তাদের তাসবিহ অনুধাবন করতে পারো না)।
- আল্লাহর রহমতের ব্যাপকতা: অনেক সময় মানুষের পাপের কারণে বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যায়, কিন্তু পশুপাখি, নিরীহ জীবজন্তু ও শিশুদের প্রার্থনায় মহান আল্লাহ সমগ্র মানবজাতির ওপর রহমতের বারিধারা বর্ষণ করেন।
- আম্বিয়ায়ে কেরামের বিনয়: হযরত সুলায়মান (আ.) এত বড় বাদশাহ ও নবী হওয়া সত্ত্বেও একটি পিপীলিকার দোয়ার মাহাত্ম্য বুঝতে পেরে নিজের কোনো কৃতিত্ব দাবি না করে বিনম্রচিত্তে আল্লাহর ওপর ভরসা করে ফিরে এসেছিলেন।
(الف) ما معنى الدعاء وما آدابه؟ ما حكم الدعاء الاجتماعى عقب الصلوة المفروضة؟ بين- [الدرجات: ٤]
১. দোয়ার শাব্দিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা (معنى الدعاء)
শাব্দিক অর্থ: আরবি ‘আদ-দু’আ’ (الدُّعَاءُ) শব্দটি د-ع-و (দাল-আইন-ওয়াও) মূলধাতু থেকে নির্গত। এর আভিধানিক অর্থ হলো আহ্বান করা, ডাকা, মিনতি করা, প্রার্থনা করা বা সাহায্য চাওয়া।
পারিভাষিক অর্থ: শরীয়তের পরিভাষায়, বান্দা কর্তৃক চরম বিনয়, নম্রতা, মুখাপেক্ষিতা ও অসহায়ত্ব প্রকাশ করে নিখিল বিশ্বের স্রষ্টা মহান রাব্বুল আলামীনের নিকট ইহলৌকিক কল্যাণ ও পারলৌকিক মুক্তি কামনায় সাহায্য প্রার্থনা করাকে ‘দোয়া’ বলা হয়। হাদীসে কুদসীতে দোয়ার গুরুত্ব প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
«الدُّعَاءُ هُوَ الْعِبَادَةُ»
“দোয়াই হলো মূল ইবাদত।” [সুনানে তিরমিযী: ২৯৬৯, সুনানে আবু দাউদ: ১৪৭৯]。
২. দোয়া কবুলের অপরিহার্য আদবসমূহ (آداب الدعاء)
মুহাদ্দিসীন ও আউলিয়ায়ে কেরাম পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে দোয়ার প্রধান আদবসমূহ নিম্নরূপ নির্ধারণ করেছেন:
- হালাল উপার্জন ও আহার: খাদ্য, পানীয় ও পোশাক শতভাগ হালাল হওয়া; হারাম ভক্ষণকারীর দোয়া আসমানে গৃহীত হয় না।
- ইখলাস ও হৃদয়ের একাগ্রতা: অন্যমনস্ক অন্তরে দোয়া না করে সম্পূর্ণ মনোযোগ ও খুলুসিয়াতের সাথে কায়মনোবাক্যে চাওয়া।
- আল্লাহর প্রশংসা ও দরূদ পাঠ: দোয়ার শুরুতে মহান আল্লাহর হামদ ও সানা এবং প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর দরূদ শরীফ পাঠ করা এবং দোয়ার শেষেও দরূদ পাঠ করা।
- উভয় হাত উত্তোলন ও কেবলামুখী হওয়া: দোয়ার সময় কেবলামুখী হয়ে বক্ষ বরাবর হাত তুলে আজীজি করা।
- দৃঢ় বিশ্বাস ও পুনরাবৃত্তি: দোয়া কবুল হওয়ার পূর্ণ একীন রাখা এবং অনুনয়-বিনয় সহকারে অন্তত তিনবার একই আকুতি পেশ করা।
- ধৈর্য ধারণ করা: জলদিবাজি না করা এবং “আমি তো অনেক দোয়া করলাম কিন্তু কবুল হলো না”—এমন হতাশা প্রকাশ না করা।
৩. ফরজ সালাত পরবর্তী সম্মিলিত দোয়ার শারঈ বিধান (حكم الدعاء الجماعي عقب الصلاة المفروضة)
ফরজ সালাত সমাপনান্তে ইমাম ও মুক্তাদি কর্তৃক হাত তুলে সম্মিলিতভাবে দোয়া করার ব্যাপারে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের ফুকাহায়ে কেরামের দলীলভিত্তিক সুদৃঢ় সিদ্ধান্ত নিম্নরূপ:
- জুমহুর ফুকাহায়ে কেরাম (বিশেষত হানাফি ও শাফেঈ মাযহাব): ফরজ নামাজের পর দোয়া করা সর্বসম্মতভাবে একটি সুপ্রমাণিত ও মোস্তাহাব আমল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: «أَيُّ الدُّعَاءِ أَسْمَعُ؟» (কোন্ দোয়া সর্বাধিক কবুল হয়?) নবীজি ﷺ ইরশাদ করলেন:
«جَوْفَ اللَّيْلِ الآخِرِ، وَدُبُرَ الصَّلَوَاتِ الْمَكْتُوبَاتِ»
“শেষ রাতের গভীর প্রহরে এবং ফরজ সালাতের ঠিক সমাপ্তিলগ্নে।” [সুনানে তিরমিযী: ৩৪৯৯—ইমাম তিরমিযী একে হাসান বলেছেন]।
- সম্মিলিত রূপের যৌক্তিকতা: রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: «لا يَجْتَمِعُ مَلأٌ فَيَدْعُو بَعْضُهُمْ وَيُؤَمِّنُ سَائِرُهُمْ، إِلا أَجَابَهُمُ اللَّهُ» (যখন কোনো দল একত্র হয়ে তাদের কেউ দোয়া করে এবং অন্যরা ‘আমিন’ বলে, তখন আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তাদের দোয়া কবুল করেন) [মুসতাদরাকে হাকেম: ৩৪৭৮]।
- ভারসাম্যপূর্ণ শারঈ সিদ্ধান্ত: ফরজ নামাজের পর ইমাম ও মুক্তাদি কখনো সংক্ষেপে হাত তুলে সম্মিলিতভাবে দোয়া করা, আবার কখনো একাকী দোয়া করা—উভয়টিই জায়েয ও বরকতময়। তবে একে নামাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ বা ওয়াজিব মনে করা যাবে না এবং কেউ হাত না তুললে তাকে তিরস্কার করা যাবে না। এটি মোস্তাহাব ও সুন্নাতে গায়রে মুয়াক্কাদাহ পর্যায়ের একটি সুপ্রতিষ্ঠিত মুস্তাহসান আমল।
٦- حدثنا ابو أسامة عن يزيد وابى الاشهب عن الحسن قال كان يقال قلب المؤمن وراء لسانه فاذا هم بامر تدبره فان كان خيرا تكلم به وان كان غير ذالك سكت وقلب المنافق على طرف لسانه فاذا هم بشيئ تكلم به وابداه- [الدرجات: ٦]
[৬. মূল হাদিসের বাংলা অনুবাদ: ইমাম আবু বকর ইবনে আবি শায়বাহ (রহ.) বলেন: আমাদের হাদিস বর্ণনা করেছেন আবু উসামা (রহ.), তিনি ইয়াযীদ ও আবুল আশহ্যাব থেকে, এবং তাঁরা প্রখ্যাত তাবেয়ী ইমাম হাসান আল-বসরী (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: পূর্ববর্তী প্রাজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ বলতেন—মুমিনের অন্তর থাকে তার জিহ্বার পেছনে; সুতরাং সে যখন কোনো কথা বলার ইচ্ছা করে, তখন প্রথমে তা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করে; অতঃপর তা যদি কল্যাণকর হয় তবেই তা উচ্চারণ করে, আর যদি তা অকল্যাণকর হয় তবে নীরব থাকে। পক্ষান্তরে, মুনাফিকের অন্তর থাকে তার জিহ্বার ডগায়; সুতরাং সে যখনই কোনো কিছু চিন্তা করে, সাথে সাথেই তা মুখে প্রকাশ করে ফেলে এবং সবাইকে জানিয়ে দেয়।]
ক. হাদিসের শাব্দিক অর্থ ও শব্দকোষ (Vocabulary Table)
| আরবি শব্দ (مفردات) | মূলধাতু ও ব্যাকরণিক রূপ | অর্থ ও তাহকিক |
|---|---|---|
| قَلْبُ الْمُؤْمِنِ | مركب إضافي | মুমিনের হৃদয় বা অন্তঃকরণ; যা প্রজ্ঞা, খোদাভীতি ও হিকমতের আধার। |
| وَرَاءَ لِسَانِهِ | ظرف مكان مع مضاف إليه | তার জিহ্বার পশ্চাতে; অর্থাৎ জবান অন্তরের নির্দেশ ও বিবেকের অধীন। |
| إِذَا هَمَّ بِأَمْرٍ | فعل ماض، باب نصر (ه-م-م) | যখন সে কোনো কথা বা কাজের ইচ্ছা বা সংকল্প করে। |
| تَدَبَّرَهُ | فعل ماض، باب تفعّل (د-ب-ر) | তার পরিণতি ও শুভাশুভ নিয়ে গভীর চিন্তা ও গবেষণা করল। |
| عَلَىٰ طَرَفِ لِسَانِهِ | مركب إضافي مع جار ومجرور | তার জিহ্বার অগ্রভাগে বা ডগায়; অর্থাৎ বিবেকহীন অবিমৃশ্যকারিতা। |
| أَبْدَاهُ | فعل ماض، باب إفعال (ب-د-و) | তা নির্দ্বিধায় প্রকাশ করে দিল ও ফাঁস করে দিল। |
খ. হাসান বসরী (রহ.)-এর বাণীর মর্ম ও আত্মশুদ্ধি
তাবেয়ীন শিরোমণি ইমাম হাসান বসরী (রহ.) ছিলেন জাহেদ ও আত্মশুদ্ধির শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। তিনি মুমিন ও মুনাফিকের মনস্তাত্ত্বিক ও আচরণিক পার্থক্য তুলে ধরেছেন। মুমিনের প্রতিটি বাক্য চিন্তা-ভাবনা, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও আল্লাহর ভয়ে পরিশোধিত হয়ে বের হয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: «مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ» (যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা নীরব থাকে) [সহীহ বুখারী: ৬০১৮]। পক্ষান্তরে মুনাফিকের মধ্যে আত্মনিয়ন্ত্রণ থাকে না; সে আবেগপ্রবণ, মুখরোচক ও লাগামহীন কথা বলে সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে।
(الف) عرف المنافق ثم بين آيات المنافق- [الدرجات: ٤]
১. মুনাফিকের আভিধানিক ও পারিভাষিক পরিচিতি (تعريف المنافق)
আভিধানিক অর্থ: আরবি ‘মুনাফিক’ (الْمُنَافِقُ) শব্দটি ن-ف-ق (নূন-ফা-ক্বাফ) ধাতু থেকে ‘মুফাআলাহ’ (مُفَاعَلَة) বাবে ‘ইসমে ফায়েল’ (কর্তৃবাচক বিশেষ্য)। এটি ‘নাফাক্ব’ (نَفَق) বা সুরঙ্গ থেকে উদ্ভূত; যেমন বনরুই বা ইঁদুরের সুরঙ্গের দুটি মুখ থাকে—একটি দিয়ে প্রবেশ করে এবং বিপদের সময় অন্যটি দিয়ে পালিয়ে যায়। অর্থাৎ যে ব্যক্তি দ্বিমুখী নীতি অবলম্বন করে, তাকে মুনাফিক বলা হয়।
পারিভাষিক অর্থ: শরীয়তের পরিভাষায় মুনাফিক হলো সেই ব্যক্তি, যে বাহ্যিকভাবে নিজেকে মুসলিম হিসেবে জাহির করে কিন্তু অন্তরে কুফর, শিরক ও ইসলামবিদ্বেষ গোপন রাখে।
মুনাফিকের শ্রেণিবিভাগ:
- ১. বিশ্বাসগত নিফাক (النفاق الاعتقادي): অন্তরে ইসলামকে মিথ্যা জেনেও পার্থিব স্বার্থে মুখে ঈমান প্রকাশ করা। এই শ্রেণির মুনাফিকরা চিরস্থায়ী জাহান্নামী এবং আখেরাতে তারা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে (الدَّرْكِ الأَسْفَلِ مِنَ النَّارِ) নিক্ষিপ্ত হবে।
- ২. কর্মগত নিফাক (النفاق العملي): বিশ্বাসে কোনো সংশয় নেই, কিন্তু আচরণ ও চরিত্রে মুনাফিকসুলভ মন্দ স্বভাব (যেমন মিথ্যা বলা, প্রতারণা করা ইত্যাদি) প্রকাশ পাওয়া। এটি কবিরা গুনাহ।
২. হাদিসের আলোকে মুনাফিকের সুস্পষ্ট আলামতসমূহ (آيات المنافق)
সহীহ বুখারী ও মুসলিমের প্রখ্যাত হাদিসসমূহে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুনাফিকের লক্ষণসমূহ বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন:
- হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত হাদিস:
«آيَةُ الْمُنَافِقِ ثَلاَثٌ: إِذَا حَدَّثَ كَذَبَ، وَإِذَا وَعَدَ أَخْلَفَ، وَإِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ»
“মুনাফিকের নিদর্শন তিনটি: ১. যখন কথা বলে তখন মিথ্যা বলে; ২. যখন অঙ্গীকার করে তখন তা ভঙ্গ করে; এবং ৩. যখন তার নিকট কোনো আমানত রাখা হয় তখন সে তাতে খেয়ানত করে।” [সহীহ বুখারী: ৩৩, সহীহ মুসলিম: ৫৯]
- হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) বর্ণিত হাদিসে অতিরিক্ত বৈশিষ্ট্য:
«أَرْبَعٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ كَانَ مُنَافِقًا خَالِصًا… وَإِذَا عَاهَدَ غَدَرَ، وَإِذَا خَاصَمَ فَجَرَ»
“চারটি স্বভাব যার মধ্যে পাওয়া যাবে সে খাঁটি মুনাফিক… ৪. যখন চুক্তি করে তখন বিশ্বাসঘাতকতা করে; এবং ৫. যখন কারো সাথে বিবাদে লিপ্ত হয় তখন অশালীন ও কটু ভাষা প্রয়োগ করে।” [সহীহ বুখারী: ৩৪]
- কুরআনুল কারীমে বর্ণিত মানসিক লক্ষণ:
- নামাজে অলসতা ও লোকদেখানো ভাব প্রদর্শন করা: «وَإِذَا قَامُوا إِلَى الصَّلَاةِ قَامُوا كُسَالَى يُرَاءُونَ النَّاسَ» [সূরা আন-নিসা: ১৪২]।
- আল্লাহকে খুব সামান্যই স্মরণ করা।
- সত্য ও মিথ্যার মাঝে দোদুল্যমান থাকা (مُذَبْذَبِينَ بَيْنَ ذَلِكَ)।
٧- يحيى بن يعلى عن منصور عن طلق بن حبيب عن انس بن مالك قال: ثلاث من كن فيه وجد طعم الايمان وحلاوته أن يكون الله ورسوله أحب إليه مما سواهما وأن يحب فى الله وأن يبغض فى الله وأن لو أوقدت له نار يقع فيها أحب إليه من أن يشرك بالله- [الدرجات: ٦]
[৭. মূল হাদিসের বাংলা অনুবাদ: ইমাম আবু বকর ইবনে আবি শায়বাহ (রহ.) বর্ণনা করেন ইয়াহইয়া ইবনে ইয়া’লা থেকে, তিনি মানসুর থেকে, তিনি তালক ইবনে হাবিব থেকে এবং তিনি প্রখ্যাত সাহাবি হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: তিনটি গুণ যার মধ্যে পূর্ণাঙ্গভাবে বিদ্যমান থাকবে, সে ঈমানের প্রকৃত স্বাদ ও তার অপূর্ব মিষ্টতা উপভোগ করবে: ১. আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তার নিকট অপর সবকিছু অপেক্ষা অধিক প্রিয় হওয়া; ২. কাউকে ভালোবাসা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এবং কাউকে অপছন্দ বা ঘৃণা করা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য; ৩. এবং তার জন্য লেলিহান অগ্নিকুণ্ড প্রজ্বলিত করে তাতে তাকে নিক্ষেপ করা অধিক পছন্দনীয় হওয়া এ বিষয়ের চেয়ে যে সে পুনরায় আল্লাহর সাথে শিরকে লিপ্ত হবে।]
ক. হাদিসের শাব্দিক অর্থ ও শব্দকোষ (Vocabulary Table)
| আরবি শব্দ (مفردات) | মূলধাতু ও ব্যাকরণিক রূপ | অর্থ ও তাহকিক |
|---|---|---|
| طَعْمَ الإِيمَانِ | مصدر مضاف إلى المعرفة (ط-ع-م) | ঈমানের আধ্যাত্মিক স্বাদ ও আস্বাদন। |
| حَلاَوَتَهُ | اسم مفرد مع ضمير الغائب (ح-ل-و) | ঈমানের অনুপম মিষ্টতা ও আত্মিক আনন্দ। |
| أَحَبَّ إِلَيْهِ | اسم تفضيل مع جار ومجرور | তার নিকট সর্বাপেক্ষা অধিক ভালোবাসার পাত্র। |
| مِمَّا سِوَاهُمَا | مركب مجرور | আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ব্যতীত দুনিয়ার সকল ব্যক্তি ও বস্তু হতে। |
| يُبْغِضَ فِي اللهِ | فعل مضارع، باب إفعال (ب-غ-ض) | আল্লাহর দ্বীনের স্বার্থে ঘৃণা বা অনীহা পোষণ করা। |
| أُوقِدَتْ لَهُ نَارٌ | فعل ماض مجهول مع فاعل مؤنث | তার জন্য প্রকাণ্ড অগ্নিকুণ্ড প্রজ্জ্বলিত করা হলো। |
| يُشْرِكَ بِاللهِ | فعل مضارع منصوب بأن، باب إفعال | আল্লাহর একত্ববাদে কাউকে শরিক করা। |
খ. হাদিসের শারঈ অবস্থান ও গভীর তাত্পর্য
এই কালজয়ী হাদিসটি সহীহ বুখারী (১৬) ও সহীহ মুসলিম (৪৩)-এ প্রায় একই শব্দে বর্ণিত হয়েছে। এই হাদিসে ঈমানকে একটি সুস্বাদু ফলের সাথে তুলনা করা হয়েছে। মানুষ যেমন সুস্বাদু খাদ্যে দৈহিক তৃপ্তি লাভ করে, তেমনি একজন মুমিন তার আত্মিক জীবনে আল্লাহর আনুগত্য, রাসূলের ভালোবাসা এবং সুদৃঢ় তাওহীদের মাধ্যমে এক অপার্থিব স্বর্গীয় তৃপ্তি ও প্রশান্তি লাভ করে।
(ألف) ما المراد بحلاوة الإيمان؟ كيف يجدها المؤمن؟ بين- [الدرجات: ٤]
১. ‘ঈমানের মিষ্টতা’ (حلاوة الإيمان)-এর তাৎপর্য ও ব্যাখ্যা
ইমাম নববী (রহ.) শারহু সহীহ মুসলিম-এ লিখেছেন: «حَلاَوَةُ الإِيمَانِ هِيَ اسْتِلْذَاذُ الطَّاعَاتِ، وَتَحَمُّلُ الْمَشَاقِّ فِي رِضَا اللَّهِ وَرَسُولِهِ، وَإِيثَارُ ذَلِكَ عَلَى أَعْرَاضِ الدُّنْيَا» অর্থাৎ ঈমানের মিষ্টতা হলো—ইবাদত-বন্দেগিতে পরম তৃপ্তি ও আনন্দ অনুভব করা, আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে যে কোনো ত্যাগ ও কষ্ট স্বীকারে গর্ববোধ করা এবং পার্থিব সমস্ত ভোগ-বিলাসের ওপর দ্বীনের বিধানকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) বলেন, এটি এমন এক আধ্যাত্মিক সুবাস ও নূর, যা অন্তরে প্রবেশ করলে পাপের প্রতি চরম ঘৃণা জন্মে এবং নেক আমলের প্রতি গভীর আকর্ষণ সৃষ্টি হয়।
২. মুমিন কীভাবে এই মিষ্টতা অর্জন করতে পারে? (كيف يجدها المؤمن؟)
আলোচ্য হাদিসে উল্লিখিত তিনটি মৌলিক শর্ত পূরণ করার মাধ্যমেই কেবল একজন মুমিন এই পরম নেয়ামত লাভ করতে পারে:
- আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ভালোবাসাকে সর্বোচ্চ স্থানে আসীন করা: মুমিনের অন্তরে পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি, স্ত্রী, সম্পদ ও নিজের প্রাণের চেয়েও আল্লাহ এবং তাঁর প্রিয় রাসূলের আদেশ-নিষেধ ও মহব্বত অগ্রগণ্য হতে হবে। যখন কোনো পার্থিব স্বার্থের সাথে রাসূলের সুন্নাতের সংঘাত তৈরি হবে, তখন হাসিমুখে সুন্নাতকে গ্রহণ করতে হবে।
- আল্লাহর ওয়াস্তে ভালোবাসা ও শত্রুতা (আল-ওয়ালা ওয়াল-বারা): মানুষের সাথে পারস্পরিক সম্পর্ক দুনিয়াবী স্বার্থ, দল বা রক্তের সম্পর্কের ভিত্তিতে হবে না; বরং কাউকে ভালোবাসলে তা হবে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এবং কারো সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলে তাও হবে আল্লাহর বিধান লঙ্ঘনের কারণে।
- তাওহীদের ওপর পাহাড়সম অবিচলতা: আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া বা টুকরো টুকরো হয়ে মৃত্যুবরণ করা মেনে নেবে, তবুও কুফর, শিরক বা বাতিল মতবাদের কাছে মাথা নত করবে না—যেমনটি করেছিলেন হযরত বিলাল (রা.), খাব্বাব (রা.) ও সুমাইয়া (রা.)।
এই তিনটি স্তর যখন একজন মুমিনের অন্তরে বাস্তবায়িত হয়, তখন তার সমস্ত উদ্বেগ দূর হয়ে যায় এবং সে ঈমানের অতুলনীয় মিষ্টতায় আত্মহারা হয়।
٨- عن أبى هريرة رضى الله تعالى عنه أن رجلا من الانصار اذنه ضيف فلم يكن عنده الاقوته وقوت صبيانه فقال لامرأته نومى الصبية واطفئ السراج قال فنزلت هذه الآية “ويؤثرون على أنفسهم ولو كان بهم خصاصة ومن يوق شح نفسه فأولئك هم المفلحون”- [الدرجات: ٦]
[৮. মূল হাদিসের বাংলা অনুবাদ: হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, আনসার সাহাবিদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তির (হযরত আবু তালহা আনসারী রা.) নিকট এক মেহমান আগমন করলেন; অথচ তাঁর কাছে নিজের খাবার ও সন্তানদের সামান্য খাবার ছাড়া অন্য কিছুই ছিল না। তখন তিনি তাঁর স্ত্রীকে বললেন: “বাচ্চাদের ঘুম পাড়িয়ে দাও, আর বাতিটি নিভিয়ে দাও (যাতে মেহমান অন্ধকার ঘরে তৃপ্তি সহকারে খাবার খেতে পারে এবং বুঝতে না পারে যে আমরা না খেয়ে কেবল মুখের শব্দ করছি)।” বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর মহান আল্লাহ এই প্রশংসামূলক আয়াত অবতীর্ণ করলেন: “এবং তারা নিজেদের ওপর অন্যদের অগ্রাধিকার দান করে, যদিও তারা নিজেরা চরম অভাবগ্রস্ত হয়; আর যাদের মনের কৃপণতা থেকে মুক্ত রাখা হয়েছে, প্রকৃতপক্ষে তারাই হলো সফলকাম।” (সূরা আল-হাশর: ৯)]
ক. হাদিসের শাব্দিক অর্থ ও শব্দকোষ (Vocabulary Table)
| আরবি শব্দ (مفردات) | মূলধাতু ও ব্যাকরণিক রূপ | অর্থ ও তাহকিক |
|---|---|---|
| أَذِنَهُ ضَيْفٌ | فعل ماض مع مفعول به وفاعل | তার গৃহে মেহমান বা অতিথি আগমন করল। |
| قُوتُ صِبْيَانِهِ | مركب إضافي (ق-و-ت) | তার কচি শিশুদের যৎসামান্য একবেলার আহার বা খাদ্য। |
| نَوِّمِي الصِّبْيَةَ | فعل أمر للمخاطبة المؤنث، باب تفعيل | বাচ্চাদের ঘুম পাড়িয়ে দাও বা নিদ্রায় মগ্ন করো। |
| أَطْفِئِي السِّرَاجَ | فعل أمر للمخاطبة المؤنث مع مفعول به | প্রদীপ বা চেরাগটি নিভিয়ে দাও। অতিথিকে লজ্জার হাত থেকে বাঁচাতে দূরদর্শী হিকমত। |
| يُؤْثِرُونَ | فعل مضارع، باب إفعال (أ-ث-ر) | তারা নিজেদের ওপর অপরকে অগ্রাধিকার দেয় (ঈসার বা আত্মত্যাগ করে)। |
| خَصَاصَةٌ | اسم مفرد (خ-ص-ص) | চরম দরিদ্রতা, অনটন, খাদ্যাভাব বা কৃচ্ছ্রসাধন। |
| شُحَّ نَفْسِهِ | مركب إضافي (ش-ح-ح) | অন্তরের চরম কার্পণ্য, লোভ ও আত্মকেন্দ্রিকতা। |
| الْمُفْلِحُونَ | اسم فاعل جمع مذكر سالم، باب إفعال | প্রকৃত সফলকাম, চিরস্থায়ী মুক্তি ও জান্নাত লাভকারী। |
খ. শানে নুযূল ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের বর্ণনা অনুযায়ী, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে একজন ক্ষুধার্ত মুহাজির মেহমান উপস্থিত হন। নবীজি ﷺ তাঁর পবিত্র স্ত্রীদের ঘরে খাবার খোঁজ পাঠালে তাঁরা জানান যে, ঘরে পানি ছাড়া কিছুই নেই। তখন নবীজি ﷺ সাহাবিদের লক্ষ্য করে বললেন: «مَنْ يُضَيِّفُ هَذَا اللَّيْلَةَ رَحِمَهُ اللَّهُ؟» (আজ রাতে কে এই মেহমানকে আতিথেয়তা দেবে? আল্লাহ তার ওপর রহম করবেন)। তখন হযরত আবু তালহা আনসারী (রা.) দাঁড়িয়ে মেহমানকে নিজ ঘরে নিয়ে যান। ঘরে এসে তিনি স্ত্রী উম্মে সুলাইম (রা.)-এর সাথে পরামর্শ করে এই অপূর্ব আত্মত্যাগের পরিকল্পনা করেন। সকালে যখন আবু তালহা (রা.) নবীজি ﷺ-এর দরবারে গেলেন, তখন নবীজি মুচকি হেসে বললেন: «لَقَدْ عَجِبَ اللَّهُ مِنْ صَنِيعِكُمَا بضَيْفِكُمَا اللَّيْلَةَ» (আজ রাতে মেহমানের সাথে তোমরা স্বামী-স্ত্রী যে আচরণ করেছ, তা দেখে মহান আল্লাহ অত্যন্ত আনন্দিত ও সন্তুষ্ট হয়েছেন!)।
(الف) اذكر حكم إكرام الضيف- ثم بين حقوق الضيف فى ضوء الحديث- [الدرجات: ٤]
১. মেহমানদারির শারঈ বিধান (حكم إكرام الضيف)
ইসলাম একটি উদার ও মানবিক ভ্রাতৃত্বের দ্বীন। মেহমানদারির বিধান সম্পর্কে ফুকাহায়ে কেরামের দুটি প্রসিদ্ধ অভিমত রয়েছে:
- জুমহুর ফুকাহায়ে কেরাম (হানাফি, মালেকি ও শাফেঈ মাযহাব): মেহমানদারি করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ এবং ইসলামের সুউচ্চ নৈতিক শিষ্টাচারের অন্তর্ভুক্ত। রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
«مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلْيُكْرِمْ ضَيْفَهُ»
“যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের ওপর পূর্ণ বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার মেহমানকে যথাযোগ্য সম্মান ও আপ্যায়ন করে।” [সহীহ বুখারী: ৬০১৮]।
- ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল ও জাহেরী ফুকাহাগণ: মেহমানের জন্য প্রথম দিন ও রাত আপ্যায়ন করা মেযবানের ওপর ওয়াজিব। এর দলীল হলো রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর বাণী: «ضِيَافَةُ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ حَقٌّ وَاجِبٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ» (একদিন ও একরাতের মেহমানদারি প্রত্যেক মুসলমানের ওপর অবশ্য পালনীয় হক) [সহীহ বুখারী]।
২. হাদিসের আলোকে মেহমানের অধিকার ও আদবসমূহ (حقوق الضيف)
পবিত্র হাদিসসমূহের সামগ্রিক পর্যালোচনায় মেহমানের প্রধান প্রধান অধিকার নিম্নরূপ:
- উষ্ণ অভ্যর্থনা ও প্রসন্ন বদন: মেহমানকে আন্তরিক মুচকি হাসি, মার্জিত সম্ভাষণ ও প্রফুল্ল চেহারায় বরণ করে নেওয়া মেযবানের প্রথম দায়িত্ব। এতে মেহমান নিজেকে সম্মানিত বোধ করে।
- বিশেষ আপ্যায়ন (জায়িযাহ): প্রথম দিন ও রাত মেহমানকে সামর্থ্য অনুযায়ী সর্বোত্তম খাবার ও সেবা দ্বারা আপ্যায়ন করা। হাদিসের পরিভাষায় একে ‘জায়িযাহ’ (جَائِزَةُ الضَّيْفِ) বলা হয়।
- তিন দিন পর্যন্ত সাধারণ আতিথেয়তা: দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিন ঘরে স্বাভাবিক যা রান্না হয় তাই দিয়ে মেহমানদারি করা। এটিও মেহমানের মেহমানদারির অধিকারের অন্তর্ভুক্ত।
- সদকা ও অতিরিক্ত মেহমানদারি: তিন দিনের অধিক মেহমান অবস্থান করলে তা মেযবানের পক্ষ থেকে ‘সদকা’ বা ঐচ্ছিক দান হিসেবে গণ্য হবে।
- মেহমানের দায়িত্ববোধ ও সংযম: মেহমানের জন্যও সমীচীন হলো তিন দিনের বেশি অযথা অবস্থান করে মেযবানকে আর্থিক বা পারিবারিক সংকটে না ফেলা। নবীজি ﷺ ইরশাদ করেছেন: «وَلاَ يَحِلُّ لَهُ أَنْ يَثْوِيَ عِنْدَهُ حَتَّى يُحْرِجَهُ» (মেহমানের জন্য মেযবানের নিকট এত দীর্ঘ অবস্থান করা বৈধ নয় যাতে সে অস্বস্তি ও সংকটে নিপতিত হয়)।
- সম্মানের সাথে বিদায় সংবর্ধনা: বিদায়ের সময় মেহমানকে দরজা বা বাহন পর্যন্ত এগিয়ে দেওয়া এবং তার নিরাপদ সফরের জন্য দোয়া করা সুন্নাত।
مجموعة (ج) — سنن الإمام الدارمي
(ترجم الأحاديث التالية ثم أجب عن الأسئلة الملحقة بها)
٩- حدثنا اسحاق بن عيسى اخبرنا حماد بن سلمة عن ثابت عن انس عن النبى صلى الله عليه وسلم قال اذا اكل أحدكم فليلعق أصابعه الثلاث- [الدرجات: ٦]
[৯. মূল হাদিসের বাংলা অনুবাদ: ইমাম আবু মুহাম্মদ আদ-দারিমী (রহ.) বলেন: আমাদের হাদিস বর্ণনা করেছেন ইসহাক ইবনে ঈসা (রহ.), তিনি বলেন: আমাদের সংবাদ দিয়েছেন হাম্মাদ ইবনে সালামাহ (রহ.), তিনি সাবিত আল-বুনানী থেকে এবং তিনি হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “তোমাদের কেউ যখন খাবার আহার করে, সে যেন (খাবার শেষে হাত ধোয়ার বা মোছার পূর্বে) তার তিনটি আঙুল চেটে খায়।”]
ক. হাদিসের শাব্দিক অর্থ ও শব্দকোষ (Vocabulary Table)
| আরবি শব্দ (مفردات) | মূলধাতু ও ব্যাকরণিক রূপ | অর্থ ও তাহকিক |
|---|---|---|
| إِذَا أَكَلَ | فعل ماض شرطي، باب نصر (أ-ك-ل) | যখন খাবার গ্রহণ করে বা আহার সমাপ্ত করে। |
| فَلْيَلْعَقْ | فعل مضارع مجزوم بلام الأمر، باب فتح (ل-ع-ق) | সে যেন অবশ্যই জিহ্বা দিয়ে চেটে নেয়। |
| أَصَابِعَهُ | جمع قلة لـ إِصْبَع، مفعول به | তার হাতের আঙুলসমূহ। আহারের ক্ষেত্রে ডান হাতের আঙুল উদ্দেশ্য। |
| الثَّلاَثَ | نعت لـ أصابعه | তিনটি আঙুল; অর্থাৎ বৃদ্ধাঙ্গুলি, তর্জনী ও মধ্যমা—যা দিয়ে নবীজি ﷺ আহার করতেন। |
খ. হাদিসের সনদ ও নববী ভোজনরীতির বিশ্লেষণ
এই বিশুদ্ধ হাদিসটি ইমাম দারিমী তাঁর সুনান-এর কিতাবুল আত’ইমাহ (খাদ্যাভ্যাস অধ্যায়)-এ সংকলন করেছেন। হাদিসের সনদটি অত্যন্ত চমৎকার: ইসহাক ইবনে ঈসা প্রখ্যাত মুহাদ্দিস, হাম্মাদ ইবনে সালামাহ তাবেয়ীদের অন্যতম সেরা ইমাম, আর সাবিত আল-বুনানী হলেন হযরত আনাস (রা.)-এর বিশিষ্টতম শাগরেদ।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাবার গ্রহণের সময় অহংকার ও অপব্যয়মুক্ত বিনম্র পন্থা অবলম্বন করতেন। তিনি সাধারণত ডান হাতের তিনটি আঙুল (বৃদ্ধা, তর্জনী ও মধ্যমা) দ্বারা খাবার খেতেন। ঝোল বা পাতলা তরলযুক্ত খাবারের ক্ষেত্রে চার বা পাঁচ আঙুল ব্যবহারের অবকাশ থাকলেও তিন আঙুলে আহার করা ছিল নববী সুন্নাহর সৌন্দর্য। খাবার শেষে সেই আঙুলে লেগে থাকা খাবারের অংশটি চেটে খাওয়া ছিল আল্লাহর দেওয়া রিজিকের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শনের অনন্য নিদর্শন।
(الف) ما معنى اللعق؟ وما حكم لعق الأصابع والقصعة؟ بين- [الدرجات: ٤]
১. ‘আল-লা’ক্ব’ (اللعق)-এর শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ
শাব্দিক অর্থ: আরবি ‘আল-লা’ক্ব’ (اللَّعْقُ) শব্দটি ل-ع-ق (লাম-আইন-ক্বাফ) ধাতু থেকে নির্গত। এর আভিধানিক অর্থ হলো জিহ্বা দ্বারা চেটে পরিষ্কার করা, আস্বাদন করা বা চেটে খাওয়া (لحس الشيء باللسان)।
পারিভাষিক অর্থ: শরীয়তের পরিভাষায় খাবার আহার করার পর হাত ধৌত করার পূর্বে ডান হাতের আঙুলসমূহ এবং আহারের পাত্রে লেগে থাকা খাদ্যকণা অপচয় না করে জিহ্বা দিয়ে ভক্ষণ করে পরিষ্কার করে নেওয়াকে ‘লা’ক্ব’ বলা হয়।
২. আঙুল ও খাবারের পাত্র (ক্বাছ’আহ) চেটে খাওয়ার শারঈ হুকুম
চার মাযহাবের (হানাফি, মালেকি, শাফেঈ ও হাম্বলি) সকল ফুকাহায়ে কেরামের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী: খাবার শেষে আঙুল চেটে খাওয়া এবং আহারের পাত্র সুন্দরভাবে পরিষ্কার করে খাওয়া সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ ও মোস্তাহাব।
প্রধান প্রধান দলীলসমূহ:
- সহীহ মুসলিমের বর্ণনা: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
«إِذَا أَكَلَ أَحَدُكُمْ طَعَامًا فَلاَ يَمْسَحْ يَدَهُ حَتَّى يَلْعَقَهَا أَوْ يُلْعِقَهَا»
“তোমাদের কেউ যখন খাবার খায়, সে যেন তার হাত না মোছে যে পর্যন্ত না সে তা নিজে চেটে খায় অথবা অন্য কাউকে (যেমন স্ত্রী বা সন্তানকে) দিয়ে চাটায়।” [সহীহ মুসলিম: ২০৩১]।
- বরকতের অন্বেষণ: নবীজি ﷺ ইরশাদ করেছেন:
«فَإِنَّكُمْ لاَ تَدْرُونَ فِي أَيِّ طَعَامِكُمُ الْبَرَكَةُ»
“কেননা তোমরা জানো না যে তোমাদের খাবারের কোন্ অংশে বরকত নিহিত রয়েছে!” [সহীহ মুসলিম]। হতে পারে সেই অবশিষ্ট ক্ষুদ্র খাদ্যকণাতেই নিহিত রয়েছে আরোগ্য ও বরকত।
- পাত্র কর্তৃক ক্ষমা প্রার্থনার সুসংবাদ: হযরত নুবাইশাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
«مَنْ أَكَلَ فِي قَصْعَةٍ ثُمَّ لَحِسَهَا اسْتَغْفَرَتْ لَهُ الْقَصْعَةُ»
“যে ব্যক্তি কোনো পাত্রে খাবার খায়, অতঃপর তা চেটে পরিষ্কার করে, সেই পাত্রটি আল্লাহর দরবারে তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং বলে: হে আল্লাহ! আপনি একে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করুন যেভাবে সে আমাকে শয়তানের অংশ থেকে মুক্ত করেছে!” [সুনানে তিরমিযী: ১৮০৪, সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩২৫৭]।
৩. আধুনিক বিজ্ঞান ও স্বাস্থ্যগত রহস্য
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, মানুষের হাতের আঙুলের ডগায় বিশেষ এক প্রকার পাচক রস ও উপকারী এনজাইম থাকে, যা খাবার গ্রহণের সময় নিঃসরণের মাধ্যমে হজমপ্রক্রিয়াকে সহজ করে। তাছাড়া খাবার শেষে আঙুল চেটে খাওয়ার ফলে লালা গ্রন্থি সক্রিয় হয় এবং হজমশক্তি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। সর্বোপরি এটি অহংকার চূর্ণ করে, খাদ্য অপচয় রোধ করে এবং সামাজিক বিনয় শিক্ষা দেয়।
١٠- أخبرنا ابو محمد الحنفى حدثنا مالك عن ابن شهاب عن ابى بكر بن عبيد الله ابن عمر عن عبد الله بن عمر ان رسول الله صلى الله عليه وسلم قال اذا اكل احدكم فليأكل بيمينه وليشرب بيمينه فان الشيطان يأكل بشماله ويشرب بشماله- [الدرجات: ٦]
[১০. মূল হাদিসের বাংলা অনুবাদ: ইমাম আবু মুহাম্মদ আদ-দারিমী (রহ.) বলেন: আমাদের সংবাদ দিয়েছেন আবু মুহাম্মদ আল-হানাফী (রহ.), তিনি বলেন: আমাদের হাদিস বর্ণনা করেছেন ইমাম মালিক (রহ.), তিনি ইবনে শিহাব আয-যুহরী থেকে, তিনি আবু বকর ইবনে উবাইদুল্লাহ ইবনে উমর থেকে এবং তিনি প্রখ্যাত সাহাবি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “তোমাদের কেউ যখন খাবার খায়, সে যেন তার ডান হাত দিয়ে খায় এবং যখন পান করে, সে যেন ডান হাত দিয়ে পান করে; কেননা শয়তান বাম হাত দিয়ে খায় এবং বাম হাত দিয়েই পান করে।”]
ক. হাদিসের শাব্দিক অর্থ ও শব্দকোষ (Vocabulary Table)
| আরবি শব্দ (مفردات) | মূলধাতু ও ব্যাকরণিক রূপ | অর্থ ও তাহকিক |
|---|---|---|
| فَلْيَأْكُلْ بِيَمِينِهِ | فعل مضارع مجزوم بلام الأمر مع جار ومجرور | সে যেন অবশ্যই তার ডান হাত দিয়ে খায়। |
| وَلْيَشْرَبْ بِيَمِينِهِ | فعل مضارع معطوف بلام الأمر | এবং সে যেন ডান হাত দিয়ে পান করে। সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ ও শিষ্টাচার। |
| فَإِنَّ الشَّيْطَانَ | حرف مشبه بالفعل مع اسمه المنصوب | কেননা চিরশত্রু অভিশপ্ত শয়তান। |
| بِشِمَالِهِ | جار ومجرور (ش-م-ل) | তার বাম হাত দ্বারা। অপবিত্র ও বর্জনীয় অভ্যাস। |
খ. হাদিসের ফিকহি বিধান ও তাৎপর্য
এই হাদিসটি সহীহ মুসলিমের কিতাবুল আশরিবাহ অধ্যায়েও বর্ণিত হয়েছে। ইসলামে ডান হাতকে পবিত্র, শুভ ও মর্যাদাপূর্ণ কাজের প্রতীক বানানো হয়েছে (যেমন আহার, পানীয়, পোশাক পরিধান, সালাম বিনিময় ও দান-সদকা)। অন্যদিকে বাম হাতকে শৌচকার্য, নাক পরিষ্কার ইত্যাদি অপবিত্র জিনিস অপসারণের জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে। তাই ইচ্ছাকৃতভাবে বিনা ওজরে বাম হাতে পানাহার করা মাকরূহে তাহরীমী বা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ; কারণ এটি শয়তানের সাদৃশ্য গ্রহণ করার শামিল। যদি ডান হাতে কোনো আঘাত, পক্ষাঘাত বা খাঁটি ওজর থাকে, কেবল তখনই বাম হাতে খাওয়ার অবকাশ রয়েছে।
(الف) ما الفرق بين ‘حدثنا’ و ‘أخبرنا’؟ بين- [الدرجات: ٤]
১. উসূলে হাদিসে ‘তাহাদ্দুস’ ও ‘ইখবার’-এর ঐতিহাসিক পটভূমি
হাদিস শাস্ত্রে হাদিস শ্রবণ, গ্রহণ ও অপরকে বর্ণনা করার পরিভাষাসমূহকে ‘ছিগাতুত তাহাম্মুল ওয়াল আদা’ (صيغ التحمل والأداء) বলা হয়। হাদিসের রাবী কীভাবে তাঁর উস্তাদ বা শায়খের নিকট থেকে হাদিসটি গ্রহণ করেছেন, তা নির্ভুলভাবে প্রকাশের জন্য মুহাদ্দিসীনগণ অত্যন্ত সূক্ষ্ম পরিভাষা প্রণয়ন করেছেন।
২. মুতাকাদ্দিমীন ও মুতাআখখিরীন মুহাদ্দিসদের দৃষ্টিভঙ্গি
ক. মুতাকাদ্দিমীন (প্রাথমিক যুগের ইমামগণ):
ইমাম যুহরী, ইমাম মালিক, ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আল-ক্বাত্তান এবং ইমাম বুখারী (রহ.)-এর মতো মুতাকাদ্দিমীন ইমামদের নিকট ‘হাদ্দাসানা’ (حَدَّثَنَا) এবং ‘আখবারানা’ (أَخْبَرَنَا) সমার্থক (مترادفان)। অর্থাৎ উস্তাদ নিজে পড়ে শোনান কিংবা ছাত্র উস্তাদের সামনে পাঠ করে শোনান—উভয় অবস্থাতেই ‘হাদ্দাসানা’ বা ‘আখবারানা’ বলা জায়েয ছিল। ইমাম বুখারী তাঁর সহীহ-এর ইলম অধ্যায়ে স্পষ্ট অধ্যায় রচনা করেছেন: «بَابُ قَوْلِ الْمُحَدِّثِ حَدَّثَنَا وَأَخْبَرَنَا وَأَنْبَأَنَا» এবং প্রমাণ করেছেন যে মূল অর্থে এগুলোর মধ্যে কোনো ব্যবধান নেই।
খ. জুমহুর মুহাদ্দিসীন ও মুতাআখখিরীন (বিশেষত ইমাম শাফেঈ, মুসলিম ও নাসাঈ):
পরবর্তী যুগে সনদের নিখুঁত সংরক্ষণ ও স্পষ্টতার স্বার্থে জুমহুর মুহাদ্দিসীন এই দুটি পরিভাষার মধ্যে সুস্পষ্ট প্রায়োগিক পার্থক্য নির্ধারণ করেছেন, যা আজ পর্যন্ত হাদিস বিজ্ঞানের স্বীকৃত মানদণ্ড:
| পরিভাষা | শারঈ প্রয়োগের ক্ষেত্র | প্রযোজ্য রূপ ও শর্ত |
|---|---|---|
| حَدَّثَنَا (হাদ্দাসানা) | السَّمَاعُ مِنْ لَفْظِ الشَّيْخِ (শায়খের মুখ থেকে সরাসরি শ্রবণ) |
যখন উস্তাদ বা শায়খ নিজ স্মৃতি থেকে অথবা কিতাব দেখে নিজে মুখে হাদিস পাঠ করেন এবং শিক্ষার্থী তা কান দিয়ে সরাসরি শ্রবণ করে ও লিখে নেয়। একক শিক্ষার্থী হলে বলা হয় ‘হাদ্দাসানী’ (حَدَّثَنِي)। |
| أَخْبَرَنَا (আখবারানা) | الْقِرَاءَةُ عَلَى الشَّيْخِ (الْعَرْضُ) (শায়খের সামনে শিক্ষার্থীর পাঠ) |
যখন শিক্ষার্থী নিজে উস্তাদের সামনে হাদিস পাঠ করে অথবা অপর কোনো শিক্ষার্থী পাঠ করে আর উস্তাদ তা মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং কোনো ভুল হলে সংশোধন করে দেন। একক শিক্ষার্থী হলে বলা হয় ‘আখবারানী’ (أَخْبَرَنِي)। |
৩. পার্থক্যের গুরুত্ব ও ফলাফল
ইমাম মুসলিম (রহ.) তাঁর সহীহ গ্রন্থের মুকাদ্দিমায় এই পার্থক্য রক্ষা করার ওপর সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করেছেন। এই নিয়মতান্ত্রিক পার্থক্যের ফলে সনদের ভেতর কোনো অস্পষ্টতা বা তাদলীস (ধোঁকা) থাকার সুযোগ চিরতরে বন্ধ হয়ে যায় এবং হাদিস বর্ণনাকারীর আমানতদারী ও সততা সর্বোচ্চ স্তরে প্রমাণিত হয়।
١١- أخبرنا يزيد بن هارون حدثنا شعبة عن ابى الجودى عن سعيد بن المهاجر عن المقدام بن معد يكرب ابى كريمة قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: ايما مسلم ضاف قوماً فاصبح الضيف محروما فان على كل مسلم نصره حتى يأخذ له بقرى ليلته من زرعه وماله- [الدرجات: ٦]
[১১. মূল হাদিসের বাংলা অনুবাদ: ইমাম আবু মুহাম্মদ আদ-দারিমী (রহ.) বলেন: আমাদের সংবাদ দিয়েছেন ইয়াযীদ ইবনে হারুন (রহ.), তিনি বলেন: আমাদের হাদিস বর্ণনা করেছেন শু’বাহ (রহ.), তিনি আবুল জুদী থেকে, তিনি সাঈদ ইবনুল মুহাজির থেকে এবং তিনি প্রখ্যাত সাহাবি হযরত আল-মিকদাম ইবনে মা’দিকারিব আবু কারীমা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “যে কোনো মুসলিম ব্যক্তি কোনো সম্প্রদায়ের মেহমান হলো, অতঃপর ভোরবেলা মেহমান বঞ্চিত (মেহমানদারিহীন ও অনাহারী) অবস্থায় রইলো, তবে প্রত্যেক মুসলমানের ওপর অবশ্য কর্তব্য হলো সেই মেহমানকে সাহায্য করা, এমনকি সে যেন তার মেজবানের ফসল ও সম্পদ থেকে তার এক রাতের মেহমানদারির সমপরিমাণ অধিকার আদায় করে নিতে পারে।”]
ক. হাদিসের শাব্দিক অর্থ ও শব্দকোষ (Vocabulary Table)
| আরবি শব্দ (مفردات) | মূলধাতু ও ব্যাকরণিক রূপ | অর্থ ও তাহকিক |
|---|---|---|
| ضَافَ قَوْمًا | فعل ماض، باب نصر (ض-ي-ف) | কোনো কওম বা দলের মেহমান বা অতিথি হিসেবে আশ্রয় নিল। |
| مَحْرُومًا | اسم مفعول منصوب على الحال (ح-ر-م) | বঞ্চিত অবস্থায়, খাদ্য ও মেহমানদারিহীন অবস্থায়। |
| نَصْرُهُ | مصدر مضاف إلى الهاء، اسم إن مؤخر | তাকে সর্বতোভাবে সাহায্য করা ও তার পাশে দাঁড়ানো। |
| بِقِرَى لَيْلَتِهِ | اسم مقصور مجرور مضاف (ق-ر-ي) | তার এক রাতের আতিথেয়তা ও মেহমানদারির সমপরিমাণ খাদ্য। |
| مِنْ زَرْعِهِ وَمَالِهِ | مركب عطفي مع جار ومجرور | মেযবানের শস্যক্ষেত, বাগান ও নগদ সম্পদ থেকে। |
খ. হাদিসের ফিকহি মর্যাদা ও সামাজিক গুরুত্ব
মরুভূমির রুক্ষ পরিবেশে পথিক ও মুসাফিরদের আশ্রয় ও আহারের কোনো বিকল্প ব্যবস্থা (যেমন হোটেল বা সরাইখানা) ছিল না। এমতাবস্থায় কোনো ব্যক্তি মেহমানকে না খাইয়ে অনাহারে ফেলে রাখলে তা চরম অমানবিকতা ও নিষ্ঠুরতা হিসেবে গণ্য হতো। তাই রাসূলুল্লাহ ﷺ মেহমানের প্রথম রাতের আতিথেয়তাকে এমন এক সুদৃঢ় আইনি হক হিসেবে ঘোষণা করেছেন যে, মেযবান স্বেচ্ছায় তা আদায় না করলে মুসলিম সমাজ তার কাছ থেকে ন্যায্য অধিকার আদায় করে মেহমানকে পৌঁছে দেবে।
(الف) اكتب أية من القرآن وحديثا مع الترجمة فى فضل إطعام الطعام- [الدرجات: ٤]
১. খাদ্য দানের ফযিলতে কুরআনুল কারীমের আয়াত ও অনুবাদ
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ মুত্তাকী ও জান্নাতী বান্দাদের গুণাবলি বর্ণনা করতে গিয়ে সূরা আল-ইনসানে ইরশাদ করেছেন:
«وَيُطْعِمُونَ الطَّعَامَ عَلَىٰ حُبِّهِ مِسْكِينًا وَيَتِيمًا وَأَسِيرًا • إِنَّمَا نُطْعِمُكُمْ لِوَجْهِ اللَّهِ لَا نُرِيدُ مِنكُمْ جَزَاءً وَلَا شُكُورًا»
অর্থ ও অনুবাদ: “এবং তারা খাদ্যের প্রতি নিজের আকর্ষণ ও প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অভাবগ্রস্ত, পিতৃহীন এতিম এবং বন্দিদের খাবার আহার করায়। (এবং তারা মনে মনে বলে:) আমরা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যেই তোমাদের আহার করাচ্ছি; আমরা তোমাদের নিকট থেকে কোনো প্রকার প্রতিদান চাই না এবং কোনো কৃতজ্ঞতা প্রকাশও কামনা করি না।” [সূরা আল-ইনসান: ৮-৯]。
২. খাদ্য দানের ফযিলতে প্রখ্যাত হাদিস ও অনুবাদ
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদিনায় তাশরিফ আনেন, তখন তাঁর পবিত্র মুখ থেকে সর্বপ্রথম যে ঐতিহাসিক নির্দেশনা উচ্চারিত হয়েছিল, তা হলো:
«يَا أَيُّهَا النَّاسُ، أَفْشُوا السَّلاَمَ، وَأَطْعِمُوا الطَّعَامَ، وَصِلُوا الأَرْحَامَ، وَصَلُّوا بِاللَّيْلِ وَالنَّاسُ نِيَامٌ، تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ بِسَلاَمٍ»
অর্থ ও অনুবাদ: “হে মানবমণ্ডলী! তোমরা সমাজে পরস্পরের মাঝে সালামের ব্যাপক বিস্তার ঘটাও, ক্ষুধার্তকে খাদ্য দান করো, আত্মীয়তার সম্পর্ক দৃঢ়ভাবে বজায় রাখো এবং রাতের গভীরে যখন সাধারণ মানুষ ঘুমিয়ে থাকে তখন তোমরা নামাজে দণ্ডায়মান হও; তবেই তোমরা পরম শান্তিতে ও নিরাপদে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে।” [সুনানে তিরমিযী: ২৪৮৫, সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩২৫১, মুসনাদে আহমদ: ৫/৪৫১—সনদটি সহীহ]।
অন্য একটি বিশুদ্ধ হাদিসে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞাসা করল: ইসলামের কোন্ আমলটি সর্বোত্তম? নবীজি ﷺ ইরশাদ করলেন: «تُطْعِمُ الطَّعَامَ، وَتَقْرَأُ السَّلاَمَ عَلَى مَنْ عَرَفْتَ وَمَنْ لَمْ تَعْرِفْ» (ক্ষুধার্তকে অন্ন দান করবে এবং পরিচিত-অপরিচিত সকলকে সালাম প্রদান করবে) [সহীহ বুখারী: ১২]।
١٢- أخبرنا اسحاق بن عيسى حدثنا حماد بن سلمة عن ثابت عن انس رضى الله تعالى عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : إذا سقطت لقمة أحدكم فليمسح عنها التراب وليسم الله وليأكلها- [الدرجات: ٦]
[১২. মূল হাদিসের বাংলা অনুবাদ: ইমাম আবু মুহাম্মদ আদ-দারিমী (রহ.) বলেন: আমাদের সংবাদ দিয়েছেন ইসহাক ইবনে ঈসা (রহ.), তিনি বলেন: আমাদের হাদিস বর্ণনা করেছেন হাম্মাদ ইবনে সালামাহ (রহ.), তিনি সাবিত থেকে এবং তিনি হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “তোমাদের কারো খাবারের লোকমা যদি হাত থেকে নিচে পড়ে যায়, তবে সে যেন তা থেকে ধূলিবালি মুছে ফেলে, আল্লাহর নাম স্মরণ করে (বিসমিল্লাহ বলে) এবং তা খেয়ে নেয় (শয়তানের জন্য ফেলে না রাখে)।”]
ক. হাদিসের শাব্দিক অর্থ ও শব্দকোষ (Vocabulary Table)
| আরবি শব্দ (مفردات) | মূলধাতু ও ব্যাকরণিক রূপ | অর্থ ও তাহকিক |
|---|---|---|
| سَقَطَتْ | فعل ماض، باب نصر (س-ق-ط) | হাত থেকে নিচে পতিত হলো বা পড়ে গেল। |
| لُقْمَةُ أَحَدِكُمْ | مركب إضافي (ل-ق-م) | তোমাদের কারো এক লোকমা বা এক গ্রাস খাবার। |
| فَلْيَمْسَحْ | فعل مضارع مجزوم بلام الأمر (م-س-ح) | সে যেন মুছে ফেলে বা পরিষ্কার করে নেয়। |
| التُّرَابَ | اسم جنس، مفعول به (ت-ر-ب) | ধূলিকণা, মাটি বা বাহ্যিক ময়লা। |
| وَلْيُسَمِّ اللَّهَ | فعل مضارع مجزوم بلام الأمر، باب تفعيل | সে যেন আল্লাহর নাম নেয় (বিসমিল্লাহ পাঠ করে)। |
| وَلْيَأْكُلْهَا | فعل مضارع معطوف مع ضمير المؤنث | এবং সে যেন তা খেয়ে ফেলে; অহংকারবশত অপচয় না করে। |
খ. হাদিসের নৈতিক ও আত্মিক দর্শন
সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় এই হাদিসের শেষে অতিরিক্ত অংশ রয়েছে: «وَلَا يَدَعْهَا لِلشَّيْطَانِ» (এবং সে যেন তা শয়তানের ভোজের জন্য ফেলে না রাখে)। ইসলাম মানুষকে শিখিয়েছে যে প্রতিটি খাদ্যকণা মহান রাব্বুল আলামীনের পবিত্র নেয়ামত। মাটিতে পড়া মাত্রই কোনো খাবারকে অপবিত্র মনে করে ফেলে দেওয়া উদ্ধত ও অহংকারী মনের লক্ষণ। পরিচ্ছন্নতার শারঈ নিয়ম হলো—যদি খাবারটিতে কোনো অপবিত্র নাপাকি না লাগে, তবে ধূলিবালি ধুয়ে বা মুছে তা খেয়ে ফেলা সুন্নাত। এটি যেমন সম্পদের অপচয় রোধ করে, তেমনি অন্তরে বিনয় ও কৃতজ্ঞতাবোধ জাগ্রত করে।
(ألف) اكتب نبذة من حياة سيدنا أنس بن مالك (رض)- [الدرجات: ٤]
১. পরিচয়, বংশ ও শুভ জন্ম
হযরত আনাস ইবনে মালিক ইবনে নাদর আল-আনসারী আল-খাযরাজী (রা.) ছিলেন ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহাবি ও হাদিস বর্ণনাকারী। তাঁর উপনাম (কুনিয়ত) ছিল আবু হামযাহ, যা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ﷺ তাকে ভালোবেসে প্রদান করেছিলেন। তিনি হিজরতের দশ বছর পূর্বে ঐতিহাসিক মদিনা মুনাওয়ারায় আনসারদের বনু নাজ্জার গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মাতা ছিলেন ইসলামের মহীয়সী নারী হযরত উম্মে সুলাইম বিনতে মিলহান (রা.)।
২. রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সান্নিধ্যে খাদেম হিসেবে আগমন
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদিনায় হিজরত করে পদার্পণ করেন, তখন হযরত আনাস (রা.)-এর বয়স ছিল মাত্র দশ বছর। তাঁর দূরদর্শী মাতা উম্মে সুলাইম (রা.) শিশু আনাসকে নবীজি ﷺ-এর দরবারে নিয়ে এসে আরজ করলেন: “হে আল্লাহর রাসূল! আনসারদের সমস্ত নারী-পুরুষ আপনাকে কোনো না কোনো উপহার দিয়েছে; আমার কাছে এই প্রিয় সন্তান ছাড়া উপহার দেওয়ার মতো কিছুই নেই। আপনি একে গ্রহণ করুন, সে আপনার সার্বক্ষণিক খেদমত করবে।” রাসূলুল্লাহ ﷺ পরম স্নেহে আনাসকে গ্রহণ করলেন এবং তিনি একাধারে দীর্ঘ ১০ বছর নবীজির খাস খাদেম হিসেবে অতিবাহিত করেন।
৩. রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর অনুপম দোয়ার বরকত
হযরত আনাস (রা.)-এর জন্য রাসূলুল্লাহ ﷺ বিশেষভাবে হাত তুলে দোয়া করেছিলেন:
«اللَّهُمَّ أَكْثِرْ مَالَهُ وَوَلَدَهُ وَبَارِكْ لَهُ فِيمَا أَعْطَيْتَهُ، وَأَطِلْ حَيَاتَهُ، وَاغْفِرْ لَهُ»
“হে আল্লাহ! আপনি তার ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে অফুরন্ত প্রাচুর্য দান করুন, তাকে যা দিয়েছেন তাতে বরকত দিন, তার জীবনকে দীর্ঘায়িত করুন এবং তাকে ক্ষমা করুন!” [সহীহ বুখারী ও মুসলিম]। এই দোয়ার বরকতে তিনি ছিলেন মদিনার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধনী সাহাবি, তাঁর বাগানে বছরে দুইবার ফল হতো, তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর শতাধিক সন্তান-সন্ততি তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন এবং তিনি একশত বছরেরও বেশি দীর্ঘ হায়াত লাভ করেছিলেন।
৪. হাদিস শাস্ত্রে সুউচ্চ মর্যাদা
হযরত আনাস (রা.) ছিলেন সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে হাদিস বর্ণনাকারীদের শীর্ষ স্তরের (মুকছিরীন ফিল হাদিস) অন্যতম। তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে সরাসরি ২,২৮৬টি হাদিস বর্ণনা করেছেন। দীর্ঘ সান্নিধ্যের কারণে নববী আখলাক ও দৈনন্দিন সুন্নাহ বর্ণনায় তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ইমাম যুহরী, হাসান বসরী, সাবিত আল-বুনানী ও কাতাদাহর মতো শ্রেষ্ঠ তাবেয়ীগণ ছিলেন তাঁর প্রত্যক্ষ ছাত্র।
৫. ওফাত
নবীজির ওফাতের পর তিনি ইরাকের বসরা নগরীতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং সেখানে হাদিসের দারস প্রদান করেন। তিনি ৯৩ হিজরিতে ১০৩ বছর বয়সে বসরায় ইন্তেকাল করেন। তিনি ছিলেন বসরা নগরীতে মৃত্যুবরণকারী সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে সর্বশেষ জীবিত সাহাবি। ওফাতের সময় তাঁর অসিয়ত অনুযায়ী নবীজি ﷺ-এর একটি পবিত্র চুল তাঁর জিহ্বার নিচে রেখে দাফন করা হয়।
مجموعة (د)
(مناهج المحدثين وتراجمهم)
١٣- أكتب نبذة عن كتاب مصنف عبد الرزاق ومنهج الامام فيه ومكانته بين الكتب الحديثية- [الدرجات: ۱۰]
১. ভূমিকা ও গ্রন্থ পরিচিতি
হাদিস সংকলনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় হিজরি শতাব্দীতে সংকলিত বিশ্ববিশ্রুত হাদিসকোষসমূহের মধ্যে ‘আল-মুসান্নাফ’ (المصنّف) হলো অন্যতম প্রাচীন, প্রামাণ্য ও সুবিশাল গ্রন্থ। এ মহান গ্রন্থের সংকলক হলেন ইয়েমেনের বিখ্যাত মুহাদ্দিস হাফেযে হাদিস ইমাম আবু বকর আব্দুর রাজ্জাক ইবনে হাম্মাম আস-সান’আনী (রহ.) (১২৬–২১১ হি.)। মুসলিম বিশ্বের প্রায় বিলুপ্তপ্রায় এই মহাগ্রন্থটি আধুনিক যুগে প্রখ্যাত ভারতীয় হাদিস বিশারদ আল্লামা হাবীবুর রহমান আল-আ’যমী (রহ.)-এর অক্লান্ত গবেষণায় ও সম্পাদনায় ১১ খণ্ডে বৈরুত থেকে প্রকাশিত হয়। গ্রন্থটিতে সর্বমোট ২১,০৩৩টি হাদিস, আছার ও ফতোয়া সংকলিত হয়েছে।
২. ইমাম আব্দুর রাজ্জাক (রহ.)-এর সংকলন পদ্ধতি (منهج الإمام فيه)
ইমাম আব্দুর রাজ্জাক (রহ.) তাঁর মুসান্নাফ গ্রন্থটি একটি সুনির্দিষ্ট, বিজ্ঞানসম্মত ও সূক্ষ্ম ফিকহি নীতিমালার আলোকে প্রণয়ন করেছেন:
- ফিকহি তারতীব বা অধ্যায়ভিত্তিক বিন্যাস: গ্রন্থটি ইসলামের ব্যবহারিক বিধান (ফিকহ)-এর অনুচ্ছেদ অনুসারে সাজানো হয়েছে। ঈমান, তাহারাত, সালাত, জুমা, জানায়েয, যাকাত, সওম, হজ, নিকাহ, তালাক, বাই’ (ক্রয়-বিক্রয়) থেকে শুরু করে আদব, যুহদ ও মাগাযী পর্যন্ত বিস্তৃত অধ্যায়ে একে ভাগ করা হয়েছে।
- মারফূ, মওকূফ ও মাক্বতূ বর্ণনার সংমিশ্রণ: ‘মুসান্নাফ’ পরিভাষার মৌলিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী ইমাম আব্দুর রাজ্জাক এতে কেবল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মারফূ হাদিসই সংকলন করেননি; বরং বিপুল সংখ্যায় সাহাবায়ে কেরামের আমল ও ফতোয়া (আছার/মওকূফ) এবং তাবেয়ীন ও তাবে-তাবেয়ীনদের ইজতিহাদ ও সিদ্ধান্ত (মাক্বতূ) প্রামাণ্য সনদে সন্নিবেশিত করেছেন।
- ফিকহুস সালাফের প্রামাণ্য উৎস: ইমাম আব্দুর রাজ্জাক তাঁর যুগে হিজাজ, ইয়েমেন, ইরাক ও সিরিয়ার শ্রেষ্ঠ ইমামদের ফতোয়াসমূহ নিখুঁতভাবে সংরক্ষণ করেছেন। বিশেষ করে ইবনে জুরাইজ, মা’মার ইবনে রাশিদ, সুফিয়ান সাওরী এবং ইবনে জুহাইনা প্রমুখের মতামত অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে উল্লেখ করেছেন।
- উচ্চ সনদের মর্যাদা (علو الأسانيد): দ্বিতীয় শতাব্দীর প্রারম্ভে সংকলিত হওয়ায় এই গ্রন্থের সনদসমূহ অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও উচ্চমানের। এতে রাসূলুল্লাহ ﷺ ও সংকলকের মাঝে রাবীর সংখ্যা সাধারণত মাত্র দুই বা তিনজন।
- বর্ণনার পাঠভেদ ও বিশ্বস্ততা: কোনো হাদিসের শব্দাবলিতে উস্তাদদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলে তিনি অত্যন্ত সততার সাথে তা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন।
৩. হাদিস শাস্ত্রে মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাকের সুউচ্চ মর্যাদা (مكانته بين الكتب الحديثية)
| মূল্যায়নের ক্ষেত্র | মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাকের অবস্থান ও গুরুত্ব |
|---|---|
| সিহাহ সিত্তার ভিত্তিপ্রস্তর | ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিমসহ সিহাহ সিত্তার সংকলকগণ তাঁদের গ্রন্থে ইমাম আব্দুর রাজ্জাকের মাধ্যমে বহু সংখ্যক বিশুদ্ধ হাদিস গ্রহণ করেছেন। |
| মুসনাদে আহমদের প্রধান উৎস | ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) ইয়েমেনে দীর্ঘ সফর করে এই মুসান্নাফের অধিকাংশ হাদিস সরাসরি শ্রবণ করেছিলেন এবং নিজ মুসনাদে তা ব্যাপকভাবে সংকলন করেছেন। |
| ফিকহি মাযহাবসমূহের প্রমাণপঞ্জি | হানাফি, মালেকি, শাফেঈ ও হাম্বলি—চারটি প্রধান সুন্নি ফিকহি মাযহাবের ইমাম ও ফকীহগণ সাহাবা ও তাবেয়ীনদের আমল প্রমাণের জন্য এই গ্রন্থের ওপর সর্বাধিক নির্ভর করেছেন। |
| বিলুপ্ত প্রাচীন সহীফাসমূহের সংরক্ষণ | ইমাম যুহরী, মা’মার ইবনে রাশিদের ‘আল-জামি’ এবং ইবনে জুরাইজের সংকলনসমূহ সরাসরি এই মুসান্নাফে সংরক্ষিত হয়েছে। |
উপসংহার: মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক কেবল একটি সাধারণ হাদিস গ্রন্থ নয়; বরং এটি ইসলামের প্রথম দুই শতাব্দীর ইসলামী ফিকহ ও আইনতত্ত্বের নিরবচ্ছিন্ন ইতিহাসের এক কালজয়ী জীবন্ত দলিল।
١٤- اكتب ترجمة الامام بن أبى شيبة ثم بين مكانته فى علم الحديث- [الدرجات: ۱۰]
১. নাম, বংশ ও গৌরবোজ্জ্বল পরিবার
হাদিস জগতের প্রাতঃস্মরণীয় ইমাম, ‘আমীরুল মুমিনীন ফিল হাদিস’ ইমাম আবু বকর ইবনে আবি শায়বাহ (রহ.)। তাঁর পূর্ণ নাম হলো আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আবি শায়বাহ ইব্রাহিম ইবনে উসমান আল-আবসী আল-কূফী। তিনি ১৫৯ হিজরিতে ইরাকের ইলমি রাজধানী কুফা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পরিবার ছিল ইলমে হাদিসের এক অবিস্মরণীয় খনি। তাঁর পিতা মুহাম্মদ, পিতামহ ইব্রাহিম (আবু শায়বাহ), ভ্রাতা উসমান ইবনে আবি শায়বাহ এবং কাসিম ইবনে আবি শায়বাহ—সকলেই ছিলেন হাদিসের প্রখ্যাত হাফেয ও মুহাদ্দিস।
২. প্রখর স্মৃতিশক্তি ও ইলম অন্বেষণ
ইমাম আবু বকর ইবনে আবি শায়বাহ (রহ.) শৈশব থেকেই অসাধারণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন। সমকালীন মুহাদ্দিসীনদের অভিমত অনুযায়ী, তিনি লক্ষাধিক হাদিস সনদ ও মতনসহ মুখস্থ রেখেছিলেন। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) বলেন: “আবু বকর ইবনে আবি শায়বাহর স্মৃতিশক্তি ছিল বিস্ময়কর এবং হাদিসের বিশুদ্ধতা নির্ণয়ে তিনি ছিলেন পর্বতসম বিশ্বস্ত।”
৩. বিখ্যাত উস্তাদ ও বিশিষ্ট ছাত্রমণ্ডলী
- প্রসিদ্ধ শায়খ ও উস্তাদবৃন্দ: ওয়াকী ইবনুল জাররাহ, সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ, ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আল-ক্বাত্তান, আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক, হুশাইম ইবনে বাশীর এবং আলী ইবনে মুসহির (রহ.)।
- বিখ্যাত ছাত্রবৃন্দ: ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল আল-বুখারী, ইমাম মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ, ইমাম আবু দাউদ আস-সিজিস্তানী, ইমাম ইবনে মাজাহ আল-কাযভীনী এবং ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)। সিহাহ সিত্তার প্রায় সকল ইমামই তাঁর দরবারে বসে হাদিস লিপিবদ্ধ করেছেন।
৪. ইলমে হাদিসে ইমাম ইবনে আবি শায়বাহর সুউচ্চ মর্যাদা (مكانته في علم الحديث)
ইলমে হাদিসের জগতে তাঁর অবস্থান ছিল সর্বজনস্বীকৃত শীর্ষচূড়ায়:
- আমীরুল মুমিনীন ফিল হাদিস: ইমাম আবু যুরআ আর-রাযী বলেন: «مَا رَأَيْتُ أَحْفَظَ لِلْحَدِيثِ مِنْ أَبِي بَكْرِ بْنِ أَبِي شَيْبَةَ» (হাদিসের মুখস্থবিদ্যা ও সংরক্ষণে আমি আবু বকর ইবনে আবি শায়বাহর চেয়ে শ্রেষ্ঠ কাউকে দেখিনি)।
- মুহাদ্দিসীনদের প্রশস্তিসমূহ: ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন বলেন: “তিনি সত্যবাদী ও নির্ভরযোগ্যতার সর্বোচ্চ শিখরে আসীন।” আল্লামা ইবনে হিব্বান বলেন: “তিনি ছিলেন ফকীহ, হাফেয, দ্বীনদার এবং হাদিসের একনিষ্ঠ সেবক।”
- কালজয়ী সংকলনসমূহ:
- আল-মুসান্নাফ (المصنّف): এটি তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি, যাতে ৩৭,৯৪৩টিরও বেশি হাদিস ও আছার সন্নিবেশিত হয়েছে। এটি তৎকালীন পৃথিবীর বৃহত্তম হাদিস সংকলন।
- আল-মুসনাদ (المسند): সাহাবিদের নামানুসারে সংকলিত প্রামাণ্য গ্রন্থ।
- কিতাবুল ঈমান (كتاب الإيمان), কিতাবুল আদাব (كتاب الأدب), কিতাবু তারীখে উমর (كتاب تاريخ عمر)।
৫. ওফাত
ইলমে হাদিসের এই মহান দিকপাল ২৩৫ হিজরির মহররম মাসে নিজ জন্মভূমি কুফা নগরীতে ইন্তেকাল করেন। তাঁর ইন্তেকালে ইলমি দুনিয়ায় যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল, তা চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।
١٥- بين ترجمة الامام الدارمى ثم اكتب خصائصه عند المحدثين- [الدرجات: ۱۰]
১. নাম, বংশ ও জন্ম
সুনানে দারিমীর অমর সংকলক, ইমামুল উফুক ইমাম আবু মুহাম্মদ আদ-দারিমী (রহ.)। তাঁর পূর্ণ নাম হলো আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুর রহমান ইবনুল ফাদল ইবনে বাহরাম ইবনে আব্দুস সামাদ আল-দারিমী আত-তামীমী আস-সামারকান্দী। তিনি ১৮১ হিজরিতে মধ্য এশিয়ার ঐতিহাসিক সমরকন্দ নগরীতে এক সম্ভ্রান্ত ও জ্ঞানপিপাসু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তামিম গোত্রের ‘দারিম ইবনে মালিক’ শাখার সাথে সম্পৃক্ত বিধায় ‘দারিমী’ নামে বিশ্ববিখ্যাত হন।
২. ইলমি সফর ও অসাধারণ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য
ইমাম দারিমী হাদিস অন্বেষণের জন্য তৎকালীন মুসলিম জাহানের সকল জ্ঞানকেন্দ্রে সফর করেন। তিনি খুরাসান, খোরাসানের মার্ভ, নিশাপুর, বোখারা, ইরাকের বাগদাদ, বসরা, কুফা, হিজাজের মক্কা, মদিনা, এবং সিরিয়া ও মিসর ভ্রমণ করেন।
তিনি ছিলেন অনন্য খোদাভীতি, তাকওয়া, প্রজ্ঞা ও অনাড়ম্বর জীবনের অধিকারী। সমরকন্দের শাসক তাঁকে প্রধান বিচারপতির (কাজী) পদ গ্রহণের জন্য প্রচণ্ড চাপ প্রয়োগ করলে তিনি অনিচ্ছা সত্ত্বেও দায়িত্ব নেন; কিন্তু একটি মাত্র মামলার ন্যায়বিচার সম্পন্ন করার পরেই পদত্যাগপত্র জমা দেন এবং সারা জীবন ইলমে হাদিসের নিরলস খেদমতে আত্মনিয়োগ করেন।
৩. বিখ্যাত উস্তাদ ও ছাত্রমণ্ডলী
- উস্তাদবৃন্দ: ইয়াযীদ ইবনে হারুন, ইসহাক ইবনে ঈসা, আবু আসিম আন-নাবীল, সাঈদ ইবনে আমির এবং জাফর ইবনে আওন (রহ.)।
- ছাত্রবৃন্দ: ইমাম মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ, ইমাম আবু দাউদ, ইমাম তিরমিযী, ইমাম নাসাঈ, ইমাম আবু যুরআ আর-রাযী এবং ইমাম আবু হাতেম আর-রাযী (রহ.)।
৪. মুহাদ্দিসীনদের নিকট তাঁর অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ (خصائصه عند المحدثين)
মুহাদ্দিসীন ও রিজালশাস্ত্রবিদগণের সর্বসম্মত মূল্যায়নে ইমাম দারিমীর প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ নিম্নরূপ:
- অতুলনীয় স্মৃতিশক্তি ও বিশ্বস্ততা: ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) তাঁর সম্পর্কে গভীর শ্রদ্ধার সাথে বলতেন: «قَدِمَ عَلَيْنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ الدَّارِمِيُّ، وَهُوَ إِمَامٌ» (আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুর রহমান আদ-দারিমী আমাদের নিকট আগমন করেছিলেন, তিনি তো সত্যই এক মহান ইমাম!)।
- স্বল্পতম দুর্বল হাদিস ও বিশুদ্ধতার মানদণ্ড: ইমাম দারিমীর সংকলিত সুনানে দারিমী গ্রন্থে দুর্বল, মাতরূক বা মুনকার হাদিসের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য। হাফেয সালাহুদ্দীন আল-আলাঈ বলেন, সুনানের গ্রন্থগুলোর মধ্যে দারিমীর গ্রন্থে সনদের ত্রুটি সবচেয়ে কম।
- উচ্চ সনদের সুলাসিয়াত (الثلاثيات): সুনানে দারিমীর অন্যতম অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এতে ১৫টিরও বেশি সুলাসিয়াত হাদিস রয়েছে, যেখানে ইমাম দারিমী ও রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর মাঝে মাত্র তিনজন রাবী বিদ্যমান। এটি সনদের শীর্ষতম মর্যাদা (উলুউস্ সানাদ) প্রমাণ করে।
- অনবদ্য মুকাদ্দিমাহ (ভূমিকা): ইমাম দারিমী তাঁর গ্রন্থের শুরুতে যে সুদীর্ঘ ভূমিকা রচনা করেছেন, তা মুহাদ্দিসীনদের নিকট শাস্ত্রীয় অমূল্য সম্পদ হিসেবে স্বীকৃত। এতে সুন্নাহর প্রতি আনুগত্য, বিদআতের বর্জন, জাহেলিয়াতের কুসংস্কার এবং ফতোয়া প্রদানে সাহাবিদের চরম সতর্কতা সংক্রান্ত দলিলভিত্তিক পর্যালোচনা উপস্থাপন করা হয়েছে।
- সিহাহ সিত্তার ষষ্ঠ গ্রন্থ হওয়ার দাবি: ইমাম ইবনুস সালাহ, হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী ও শাহ আব্দুল আজিজ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.) প্রমুখ গবেষক দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেছেন যে, সুনানে ইবনে মাজাহ-এর চেয়ে বিশুদ্ধতা ও সনদের মানদণ্ডে সুনানে দারিমী-ই সিহাহ সিত্তার ষষ্ঠ গ্রন্থ হওয়ার অধিক হকদার।
৫. ওফাত
ইলমে হাদিসের এই মহান নক্ষত্র ২৫৫ হিজরির ৮ই জিলহজ (ইয়াওমুত তারবিয়াহ) বৃহস্পতিবার সমরকন্দে ইন্তেকাল করেন এবং জুমার দিন তাকে দাফন করা হয়। তাঁর মৃত্যুতে ইমাম বুখারী গভীর শোক প্রকাশ করে বলেছিলেন: “আপনার চলে যাওয়ার সাথে সাথে ইলমের এক সুবিশাল সমুদ্র শুকিয়ে গেল!”
١٦- اذكر نبذة من حياة عبد الرزاق مع بيان أشهر شيوخه وتلاميذه ومصنفاته- [الدرجات: ۱۰]
১. জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন
ইয়েমেনের মুহাদ্দিস, হাদিসের অন্যতম বিশ্বস্ত স্তম্ভ ইমাম আব্দুর রাজ্জাক আস-সান’আনী (রহ.)। তাঁর পূর্ণ নাম হলো আবু বকর আব্দুর রাজ্জাক ইবনে হাম্মাম ইবনে নাফি’ আল-হিময়ারী আস-সান’আনী। তিনি ১২৬ হিজরিতে ইয়েমেনের ঐতিহাসিক রাজধানী সান’আ নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই তিনি ইলম অন্বেষণে আত্মনিয়োগ করেন এবং মাত্র বিশ বছর বয়সেই তিনি সমকালীন হাদীস বিশারদদের নজরে আসেন।
২. ইলমি মর্যাদা ও জ্ঞানের তীর্থক্ষেত্র
তৎকালীন মুসলিম জাহানের ইলমে হাদিসের একচ্ছত্র কেন্দ্র ছিল ইয়েমেন, আর তার মধ্যমণি ছিলেন ইমাম আব্দুর রাজ্জাক। তৎকালীন যুগে আলেমদের মাঝে প্রবাদ প্রচলিত ছিল: «لاَ بُدَّ مِنْ صَنْعَاءَ، وَإِنْ طَالَ السَّفَرُ» (ইয়েমেনের সান’আয় তোমাকে পৌঁছতেই হবে, চাই পথ যতই দীর্ঘ হোক না কেন!)। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল এবং ইয়াহইয়া ইবনে মাঈনের মতো দিকপাল মুহাদ্দিসগণ বাগদাদ থেকে মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে অর্থকষ্ট সহ্য করে সান’আয় উপস্থিত হয়েছিলেন কেবল ইমাম আব্দুর রাজ্জাকের মুখ থেকে সরাসরি হাদিস শ্রবণের উদ্দেশ্যে।
৩. ইমাম আব্দুর রাজ্জাকের বিখ্যাত শায়খ ও উস্তাদবৃন্দ (أشهر شيوخه)
তিনি সমকালের শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিসীনদের সান্নিধ্যে দীর্ঘ সময় ইলম অর্জন করেন:
- ইমাম মা’মার ইবনে রাশিদ আল-আযদি (রহ.): তিনি ছিলেন ইমাম আব্দুর রাজ্জাকের প্রধান উস্তাদ। সান’আয় মা’মারের সাথে তিনি একাধারে সাত থেকে আট বছর সার্বক্ষণিক অবস্থান করে তাঁর সমস্ত হাদিস ও সংকলন আয়ত্ত করেন।
- ইমাম ইবনে জুরাইজ আল-মাক্কী (রহ.): মক্কার বিখ্যাত ফকীহ ও মুহাদ্দিস।
- ইমাম সুফিয়ান আস-সাওরী (রহ.): আমীরুল মুমিনীন ফিল হাদিস।
- ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রহ.): মদিনার দারুল হিজরাতের ইমাম।
- ইমাম সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ (রহ.): মক্কার মুহাদ্দিস।
- ইমাম আল-আওযাঈ (রহ.): সিরিয়ার প্রখ্যাত ফকীহ।
৪. বিশ্ববিখ্যাত ছাত্রমণ্ডলী (أشهر تلاميذه)
সমগ্র মুসলিম বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় মুহাদ্দিসগণ ছিলেন তাঁর প্রত্যক্ষ ছাত্র:
- ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) — হাম্বলি মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ও মুসনাদের সংকলক।
- ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন (রহ.) — জারহ ও তাদীল শাস্ত্রের প্রবাদপুরুষ।
- ইমাম আলী ইবনুল মাদীনী (রহ.) — ইলমে ইলাল শাস্ত্রের সর্বশ্রেষ্ঠ পণ্ডিত।
- ইমাম ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ (রহ.) — ইমাম বুখারীর প্রধান উস্তাদ।
- ইমাম মাহমূদ ইবনে গাইলান (রহ.) এবং আব্দ ইবনে হুমাইদ (রহ.)।
৫. তাঁর অমর সংকলনসমূহ (مصنفاته)
- আল-মুসান্নাফ (المصنف): ১১ খণ্ডে মুদ্রিত ২১,০৩৩টি হাদিস ও আছারের সুবিশাল কোষগ্রন্থ।
- তাফসীরে আব্দুর রাজ্জাক (تفسير عبد الرزاق): পবিত্র কুরআনের সবচেয়ে প্রাচীন সংরক্ষিত ও মুদ্রিত তাফসির গ্রন্থগুলোর অন্যতম।
- আল-আমালী (الأمالي) ও কিতাবুল মাগাযী (المغازي): রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর যুদ্ধ ও সিরাত সংক্রান্ত মৌলিক ঐতিহাসিক সংকলন।
৬. শিয়া মতবাদের অভিযোগ ও নিরপেক্ষ তাহকিক
কিছু রিজালগ্রন্থে তাঁর বিরুদ্ধে শিয়া মতাদর্শের (তাশায়্যু) অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। তবে মুহাদ্দিসীনদের নিরপেক্ষ তাহকিক হলো—তাঁর মধ্যে কোনো প্রকার বিদআতী বা চরমপন্থী রাফেজী শিয়াত্ব ছিল না। বরং তাঁর মধ্যে ছিল আহলে বাইত ও হযরত আলী (রা.)-এর প্রতি অতিরিক্ত শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা, যাকে পরিভাষায় ‘তাশায়্যুয়ে লুগাবী’ বা লঘু অনুরাগ বলা হয়। তিনি হযরত আবু বকর ও উমর (রা.)-কে সর্বসম্মতভাবে শ্রেষ্ঠ মনে করতেন এবং সাহাবায়ে কেরামের মর্যাদা অটুট রাখতেন। একারণেই ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিম এবং ইমাম আহমদ সর্বসম্মতভাবে তাঁকে ‘সিক্বাহ, ছাবত ও হুজ্জাত’ (ثقة ثبت حجة) হিসেবে গ্রহণ করেছেন এবং তাঁর সূত্রে শত শত হাদিস বর্ণনা করেছেন।
৭. ওফাত
ইমাম আব্দুর রাজ্জাক আস-সান’আনী (রহ.) ২১১ হিজরির শাওয়াল মাসে ৮৫ বছর বয়সে সান’আয় ইন্তেকাল করেন এবং সেখানেই তাঁকে শ্রদ্ধার সাথে দাফন করা হয়।
উপসংহার ও সামগ্রিক পর্যালোচনা
ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাজিল স্নাতক (সম্মান) চতুর্থ বর্ষের দিরাসাতুল হাদীস-৩ (বিষয় কোড: ২০২৮০৯) ২০২২ সালের এই প্রশ্নপত্রটি হাদিস শাস্ত্রের প্রাচীনতম ও বিশুদ্ধতম আকর সংকলনসমূহের এক অতুলনীয় সমন্বয়। প্রাথমিক যুগে সিহাহ সিত্তার আবির্ভাবের পূর্বেই মুসলিম উম্মাহর ফিকহ, সুন্নাহ এবং ঐতিহাসিক আমলকে যেভাবে প্রামাণ্যভাবে নথিভুক্ত করা হয়েছিল—তা এই পাঠ্যসূচির মাধ্যমে প্রতিভাত হয়।
প্রশ্নপত্রটিতে মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বাহ এবং সুনানে দারিমী—এই তিনটি ভিত্তিমূল গ্রন্থের আলোকে জুমার ঐতিহাসিক সূচনা ও তাৎপর্য, জান্নাতের রওজা ও হাউযে কাওসারের বর্ণনা, সমাজে নারীদের চলাচলের শারঈ নীতিমালা, নামাজে রাফউল ইয়াদাইনের মাসআলা, অসহায় সৃষ্টির দোয়ার বরকত, আত্মশুদ্ধি ও খাঁটি মুমিনের গুণাবলি, মেহমানদারির মানবিক ও আইনগত অধিকার, ভোজনের নববী শিষ্টাচার এবং উসূলে হাদিসের সূক্ষ্ম পরিভাষাসমূহ অত্যন্ত চমৎকারভাবে বিধৃত হয়েছে। একই সাথে হাদিস বিজ্ঞানের মহান স্থপতি—ইমাম আব্দুর রাজ্জাক, ইমাম ইবনে আবি শায়বাহ এবং ইমাম দারিমী (রহ.)-এর জীবন ও সংকলন পদ্ধতির বিশ্লেষণ শিক্ষার্থীদের উচ্চতর গবেষণায় এক অপরিহার্য দিকনির্দেশনা প্রদান করে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. ফাজিল ৪র্থ বর্ষের দিরাসাতুল হাদীস-৩ (২০২৮০৯) কোর্সে কোন কোন কিতাব অন্তর্ভুক্ত?
দিরাসাতুল হাদীস-৩ পাঠ্যক্রমে প্রধানত হাদিস শাস্ত্রের তিনটি সুপ্রাচীন ও মৌলিক সংকলন অন্তর্ভুক্ত: ১. ইমাম আব্দুর রাজ্জাক আস-সান’আনী (রহ.)-এর আল-মুসান্নাফ, ২. ইমাম আবু বকর ইবনে আবি শায়বাহ (রহ.)-এর আল-মুসান্নাফ এবং ৩. ইমাম আবু মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ আদ-দারিমী (রহ.)-এর সুনানে দারিমী।
২. মুসান্নাফ ও সাধারণ সুনান গ্রন্থের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য কী?
যে হাদিস গ্রন্থে কেবল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মারফূ হাদিসসমূহ ফিকহি অধ্যায় অনুসারে সংকলিত হয় তাকে ‘সুনান’ বলা হয় (যেমন সুনানে দারিমী, সুনানে আবু দাউদ)। পক্ষান্তরে, যে গ্রন্থে মারফূ হাদিসের সাথে সাথে বিপুল সংখ্যায় সাহাবায়ে কেরামের আমল ও ফতোয়া (আছার/মওকূফ) এবং তাবেয়ীনদের সিদ্ধান্ত (মাক্বতূ) ফিকহি অনুচ্ছেদে সাজানো হয় তাকে ‘মুসান্নাফ’ বলা হয় (যেমন মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক ও মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বাহ)।
৩. ইসলামে সর্বপ্রথম আনুষ্ঠানিক জুমা কোথায় ও কার দ্বারা কায়েম হয়েছিল?
মদিনায় হিজরতের পূর্বে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশে ইসলামের প্রথম দূত হযরত মুসআব ইবনে উমাইর (রা.) মদিনাবাসীদের নিয়ে সর্বপ্রথম জুমার নামাজ কায়েম করেন। আর স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরতের সফরে মদিনায় প্রবেশের পথে ‘ওয়াদি রানুনা’ নামক স্থানে বনু সালিম ইবনে আউফ গোত্রের উপত্যকায় ইসলামের সর্বপ্রথম নববী জুমার জামাত কায়েম করেন, যেখানে বর্তমানে ‘মসজিদুল জুমুআহ’ অবস্থিত।
৪. নামাজে কতবার হাত ওঠানো (রাফউল ইয়াদাইন) সুন্নাত?
হানাফি মাযহাব এবং ইমাম মালিকের প্রসিদ্ধ মতানুযায়ী, নামাজে কেবল একবারই তাকবীরে তাহরীমার সময় উভয় হাত উত্তোলন করা সুন্নাত; রুকুতে যাওয়া বা ওঠার সময় হাত তোলার বিধান পরবর্তীতে অধিকতর স্থিরতা রক্ষার স্বার্থে রহিত হয়ে যায়। পক্ষান্তরে, শাফেঈ ও হাম্বলি মাযহাব মতে তাকবীরে তাহরীমা ছাড়াও রুকুতে যাওয়া, রুকু থেকে ওঠা এবং তৃতীয় রাকাতের শুরুতে হাত তোলা সুন্নাত। উভয় মতই বিশুদ্ধ হাদিস ও সাহাবিদের আমল দ্বারা সমর্থিত।
৫. ‘হাদ্দাসানা’ (حدثنا) এবং ‘আখবারানা’ (أخبرنا)-এর মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য কী?
জুমহুর মুহাদ্দিসীনদের পরিভাষায়, যখন উস্তাদ বা শায়খ নিজে মুখ দিয়ে হাদিস পাঠ করেন এবং শিক্ষার্থী তা কান দিয়ে সরাসরি শ্রবণ করে, তখন বর্ণনার সময় ‘হাদ্দাসানা’ (حَدَّثَنَا) শব্দ ব্যবহার করা হয়। আর যখন শিক্ষার্থী নিজে উস্তাদের সামনে পাঠ করে শোনায় এবং উস্তাদ তা অনুমোদন করেন, তখন ‘আখবারানা’ (أَخْبَرَنَا) শব্দ ব্যবহার করা হয়।
৬. খাবার গ্রহণের পর আঙুল ও পাত্র চেটে খাওয়ার সুন্নাতসম্মত তাৎপর্য কী?
খাবার শেষে ডান হাতের তিনটি আঙুল চেটে খাওয়া এবং পাত্রের অবশিষ্ট খাবার সুন্দরভাবে পরিষ্কার করে খাওয়া সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন, খাদ্যের কোন্ অংশে বরকত নিহিত রয়েছে তা মানুষ জানে না। তাছাড়া এটি অহংকার দূর করে, খাদ্যের অপচয় রোধ করে এবং পাত্রও ব্যক্তির মাগফিরাতের জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করে। আধুনিক বিজ্ঞানও হাতের আঙুলের এনজাইম নিঃসরণের মাধ্যমে হজমশক্তি বৃদ্ধির প্রমাণ পেয়েছে।
৭. সুনানে দারিমী গ্রন্থটিকে কেন অনেকে সিহাহ সিত্তার অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করেছেন?
ইমাম ইবনুস সালাহ, হাফেয আলাঈ এবং হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.)-এর মতো নিরপেক্ষ গবেষকগণ মত দিয়েছেন যে, সুনানে ইবনে মাজাহর তুলনায় সুনানে দারিমী গ্রন্থটিতে চরম দুর্বল ও মুনকার হাদিস নেই বললেই চলে এবং এতে বহু উচ্চ সনদের ‘সুলাসিয়াত’ হাদিস বিদ্যমান। তাই প্রামাণিকতা ও সনদের বিশুদ্ধতার বিচারে সুনানে দারিমী সিহাহ সিত্তার ষষ্ঠ গ্রন্থ হওয়ার অধিক যোগ্য।