ফাজিল স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষ পরীক্ষা, ২০২২
আল কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বাংলা
বিষয় কোড: ২০ ১১ ০৪
সময়—৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান—৮০
[দ্রষ্টব্য: ডান পাশের সংখ্যা প্রশ্নের পূর্ণমান জ্ঞাপক।]
ক বিভাগ
মান—১০ × ২ = ২০
১। (ক) বাংলা সাহিত্যের যুগবিভাগ সম্পর্কে পণ্ডিতদের মতামত বিশ্লেষণ কর। (১০)
ভূমিকা:
যেকোনো সাহিত্যের ইতিহাস পর্যালোচনা ও সুষ্ঠু বিশ্লেষণের সুবিধার্থে কালানুক্রমিক পর্ববিভাজন অপরিহার্য। সাহিত্যের গতিপ্রকৃতি, সামাজিক-রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং ভাব ও ভাষার রূপান্তরের ওপর ভিত্তি করে বাংলা সাহিত্যের সুদীর্ঘ যাত্রাপথকে বিভিন্ন যুগে বিভক্ত করা হয়েছে। বাংলা সাহিত্যের এই যুগবিভাগ নিয়ে বহু ভাষাতাত্ত্বিক ও গবেষক পাণ্ডিত্যপূর্ণ মতামত দিয়েছেন।
পণ্ডিতদের যুগবিভাগ সংক্রান্ত মতামত:
১. ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মত:
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তাঁর বিখ্যাত ‘বাঙ্গালা সাহিত্যের কথা’ গ্রন্থে ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও রাজনৈতিক ইতিহাসের আলোকে বাংলা সাহিত্যকে তিনটি প্রধান যুগে বিভক্ত করেছেন:
ক. প্রাচীন যুগ: ৬৫০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১২০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। (চর্যাপদের সূচনাকাল তিনি সপ্তম শতক মনে করেন)।
খ. মধ্যযুগ: ১২০১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত।
গ. আধুনিক যুগ: ১৮০১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত।
২. ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মত:
অধিকাংশ গবেষক ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের যুগবিভাগকে অধিকতর বিজ্ঞানসম্মত ও প্রামাণ্য বলে গণ্য করেন। তিনি ‘ওরিজিন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অব দ্য বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ’ (ODBL) গ্রন্থে যুগবিভাগ করেছেন নিম্নরূপ:
ক. প্রাচীন যুগ: ৯৫০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১২০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত।
খ. মধ্যযুগ: ১২০১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত।
গ. আধুনিক যুগ: ১৮০১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে বর্তমান কাল।
৩. ড. সুকুমার সেনের মত:
ড. সুকুমার সেন ‘বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস’ গ্রন্থে প্রাচীন যুগকে দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী, মধ্যযুগকে চতুর্দশ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী এবং আধুনিক যুগকে ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত চিহ্নিত করেছেন।
অন্ধকার যুগ বা বন্ধ্যা যুগ (১২০১–১৩৫০ খ্রিষ্টাব্দ) বিতর্ক:
১২০১ সালে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজীর বাংলা বিজয়ের পর থেকে ১৩৫০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় দেড়শত বছর বাংলা সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য কোনো সৃষ্টিশীল নিদর্শন পাওয়া যায় না বলে গবেষকগণ একে ‘অন্ধকার যুগ’ বা বন্ধ্যা যুগ বলে চিহ্নিত করেছেন। তবে আধুনিক গবেষকগণ (যেমন আহমদ শরীফ ও ওয়াকিল আহমদ) প্রমাণ করেছেন যে এ সময় একেবারে শূন্য ছিল না; এ যুগে ‘শূন্যপুরাণ’, ‘হালয়ুধ মিশ্রের সেক শুভোদয়া’ এবং রামাই পণ্ডিতের গান মৌখিকভাবে প্রচলিত ছিল।
উপসংহার:
সার্বিক আলোচনায় প্রমাণিত হয় যে, সূচনা পর্ব নিয়ে কিছুটা মতপার্থক্য থাকলেও ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় কর্তৃক প্রস্তাবিত ৯৫০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে আধুনিক কাল পর্যন্ত ত্রিকাল বিভাজনই বাংলা সাহিত্যের সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য ও প্রামাণ্য যুগবিভাগ।
অথবা
১। (খ) টীকা লেখ: (৫ + ৫ = ১০)
(১) ইউসুফ-জোলেখা:
‘ইউসুফ-জোলেখা’ বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের প্রথম প্রণয়োপখ্যান কাব্য। পঞ্চদশ শতকে গৌড়ের সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের রাজত্বকালে (১৩৮৯–১৪১০ খ্রি.) শাহ মুহম্মদ সগীর এ অমর প্রেমকাব্য রচনা করেন। এর মূল উৎস কুরআনুল কারীমের সূরা ইউসুফ (যাকে ‘আহসানুল ক্বাসাস’ বা শ্রেষ্ঠ কাহিনী বলা হয়েছে) এবং পারস্যের মহাকবি জামি ও ফেরদৌসীর ফারসি মহাকাব্য। তবে শাহ মুহম্মদ সগীর ধর্মীয় গণ্ডির বাইরে এসে মানবিক প্রেম, আত্মত্যাগ ও দাম্পত্য আবেগের এক অপূর্ব কাব্যরূপ সৃষ্টি করেছেন। এ কাব্যের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যানের ধারা সূচিত হয় এবং কাব্যের প্রধান চরিত্র ইউসুফ ও জোলেখার রূপ, বিরহ ও মিলন বাঙালির নিজস্ব লোকায়ত আবেগে চিত্রিত হয়েছে। মধ্যযুগে বাঙালি মুসলমান কবিদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাব্যিক কীর্তি হিসেবে ‘ইউসুফ-জোলেখা’ চিরস্মরণীয়।
(২) পদ্মাবতী:
‘পদ্মাবতী’ মধ্যযুগের আরাকান (রোসাং) রাজসভার মহাকবি সৈয়দ আলাওলের শ্রেষ্ঠ কাব্য। ১৬৫১ খ্রিষ্টাব্দে আরাকান প্রধানমন্ত্রী কোরেশী মাগন ঠাকুরের নির্দেশে কবি হিন্দি কবি মালিক মুহম্মদ জায়সীর ‘পদুমাবত’ কাব্য অবলম্বনে এ অনবদ্য আখ্যানকাব্য রচনা করেন। চিতোরের রাজা রত্নসেন, সিংহল রাজকন্যা পদ্মাবতী ও দিল্লির সুলতান আলাউদ্দীন খলজীর ঐতিহাসিক সংঘাত ও প্রেমের দ্বন্দ্ব এর মূল বিষয়বস্তু। কাব্যটির মূল ভিত্তি রূপক হলেও আলাওল বাস্তব চরিত্রাঙ্কন, মানবিক অনুভূতি, নিখুঁত ছন্দপ্রকরণ এবং পাণ্ডিত্যপূর্ণ অলংকার প্রয়োগে এটিকে মৌলিক শিল্পে রূপ দিয়েছেন। সংস্কৃত, ফারসি ও দেশীয় বাংলা ভাষার সংমিশ্রণে রচিত এ কাব্যটি বাংলা প্রণয়োপাখ্যানের ইতিহাসে ক্লাসিক মর্যাদায় অভিষিক্ত।
২। (ক) বাংলা গদ্যের বিকাশে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের ভূমিকা মূল্যায়ন কর। (১০)
ভূমিকা:
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস মূলত পদ্যময় হাজার বছরের ইতিহাস হলেও আধুনিক যুগে এসে গদ্যের চরম বিকাশ সাধিত হয়। বাংলা গদ্যের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপন ও বিকাশে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের ভূমিকা ছিল অনন্য ও যুগান্তকারী।
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের প্রতিষ্ঠা ও উদ্দেশ্য:
১৮০০ সালের ৪ মে তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড ওয়েলেসলি ইংল্যান্ড থেকে আগত নবীন ইংরেজ সিভিলিয়ানদের (কর্মচারীদের) এদেশের দেশীয় ভাষা, রীতিনীতি ও সংস্কৃতির সাথে পরিচিত করার লক্ষ্যে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮০১ সালে এ কলেজে বাংলা বিভাগ চালু করা হয় এবং এর প্রধান (রেভারেন্ড) নিযুক্ত হন উইলিয়াম কেরি।
বাংলা গদ্যের বিকাশে অবদান:
১. পাঠ্যপুস্তক রচনা ও পাঠ্যক্রম প্রণয়ন: ইংরেজ সিভিলিয়ানদের পাঠদানের উপযোগী বাংলা গদ্যের কোনো বই তখন ছিল না। ফলে উইলিয়াম কেরির নেতৃত্বে পণ্ডিত ও মুনশিগণ দ্রুত মৌলিক ও অনুবাদমূলক গ্রন্থ রচনায় আত্মনিয়োগ করেন।
২. পণ্ডিতমণ্ডলীর অবদান:
– উইলিয়াম কেরি: রচনা করেন ‘কথোপকথন’ (১৮০১) ও ‘ইতিহাসমালা’ (১৮১২)। ‘কথোপকথন’ গ্রন্থে তৎকালীন সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের মুখের সজীব কথ্য ভাষার প্রথম মুদ্রিত গদ্যরূপ দেখা যায়।
– রামরাম বসু: ১৮০১ সালে রচনা করেন বাংলা ভাষায় রচিত ও মুদ্রিত প্রথম মৌলিক গদ্যগ্রন্থ ‘রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র’। পরবর্তীতে তিনি রচনা করেন ‘লিপিমালা’ (১৮০২)।
– মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার: ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের সবচেয়ে পণ্ডিত লেখক। তিনি রচনা করেন ‘বত্রিশ সিংহাসন’ (১৮০২), ‘হিতোপদেশ’ (১৮০৮), ‘রাজাবলি’ (১৮০৮) এবং সুসংহত গদ্যের ‘প্রবোধ চন্দ্রিকা’ (১৮১৩)। তাঁর হাত ধরেই বাংলা গদ্যে সাধু ও চলিতরীতির নান্দনিক প্রয়োগ ঘটে।
– অন্যান্য পণ্ডিতগণ: গোলকনাথ শর্মা (হিতোপদেশ), তারিণীচরণ মিত্র (ওরিয়েন্টাল ফেবুলিস্ট), রাজীবলোচন মুখোপাধ্যায় (মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়স্য চরিত্রম) প্রমুখ বহু গ্রন্থ রচনা করেন।
৩. মুদ্রণ ও মুদ্রাক্ষর বিস্তার: শ্রীরামপুর মিশনের প্রেস থেকে এসব গ্রন্থ মুদ্রিত হয়ে জনসাধারণের কাছে গদ্যের আদর্শ লিখিত কাঠামো পৌঁছে দেয়।
সীমাবদ্ধতা ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য:
যদিও ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের গদ্যে তৎসম শব্দের মাত্রাতিরিক্ত ভার এবং কোথাও কোথাও কৃত্রিমতা ছিল, তবুও বাংলা গদ্যের সূচনা পর্বের জড়তা কাটিয়ে তাকে একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ লিখিত রূপ দিতে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ঐতিহাসিক ভিত্তি প্রস্তুত করেছিল। এই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই পরবর্তীতে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় আধুনিক বাংলা গদ্যের সুরম্য প্রাসাদ নির্মাণ করেন।
অথবা
২। (খ) ‘নজরুল শুধু বিদ্রোহের নন, প্রেমেরও কবি’—এ কথার যৌক্তিকতা বিশ্লেষণ কর। (১০)
ভূমিকা:
আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে সাধারণ দৃষ্টিতে ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হলেও তিনি ছিলেন একাধারে বিদ্রোহ ও ভালোবাসার সার্থক সমন্বয়ক। তিনি যেমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে বজ্রকঠিন কণ্ঠে রুখে দাঁড়িয়েছেন, তেমনি হৃদয়ের কোমল অনুভূতির প্রকাশে রচনা করেছেন চিরন্তন প্রেমের অনবদ্য গীতিকাব্য। এজন্যই কবি নিজেই বলেছেন— “মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণতূর্য।”
প্রেমিক নজরুলের বৈশিষ্ট্য ও যৌক্তিকতা:
১. রোমান্টিক প্রেম ও বিরহের কবি:
নজরুলের কাব্যে প্রেম এসেছে আনন্দ ও বেদনার দ্বৈত রূপ নিয়ে। নার্গিসের বিচ্ছেদ এবং পরবর্তীতে প্রমীলা দেবীর সাথে প্রণয় কবির ব্যক্তিগত জীবনে যেমন গভীর বেদনার সৃষ্টি করেছিল, তেমনি তা তাঁর কাব্যকে করেছে অমৃতময়। তাঁর ‘দোলন-চাঁপা’, ‘ছায়ানট’, ‘পূবের হাওয়া’, ‘সিন্ধু-হিন্দোল’ ও ‘চক্রবাক’ কাব্যের পরতে পরতে গভীর প্রেমের সুর অনুরণিত।
২. চিরায়ত বিরহচেতনা:
নজরুল প্রেমের মিলনের চেয়ে বিরহকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। ‘অভিশাপ’ কবিতায় তিনি লিখেছেন:
“যেদিন আমি হারিয়ে যাব, বুঝবে সেদিন বুঝবে!
অস্তপারের সন্ধ্যাতারায় আমারই রূপ খুঁজবে।”
বিরহের এই সুতীব্র আর্তি পাঠকহৃদয়কে দ্রবীভূত করে।
৩. নারী বন্দনা ও মানবিক প্রেম:
কবি নারীকে দেখেছেন মমতাময়ী ও প্রেরণাদাত্রী রূপে। তিনি তাঁর বিখ্যাত ‘নারী’ কবিতায় নারীর অবদানকে পুরুষের সমান্তরালে উচ্চকিত করেছেন:
“বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।”
৪. গীতিসাহিত্যে প্রেমের প্লাবন:
নজরুল ছিলেন বাংলা আধুনিক গান ও গজল গানের অবিসংবাদিত স্রষ্টা। তাঁর প্রায় তিন সহস্রাধিক গানের সিংহভাগই প্রেম, বিরহ ও ভক্তির অপূর্ব মূর্ছনায় সমৃদ্ধ। “মোর প্রিয়া হবে এসো রানী”, “নয়ন ভরা জল গো তোমার”, “যাও পাখি বল তারে” ইত্যাদি গান বাংলা প্রেমের গীতিসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সম্পদ।
উপসংহার:
সুতরাং দেখা যায়, নজরুলের বিদ্রোহ ছিল শোষিত মানবতার প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ। যেখানে মানবপ্রেম না থাকে, সেখানে শোষণমুক্তির বিদ্রোহ জন্ম নিতে পারে না। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায়, নজরুল শুধু বিদ্রোহের নন, তিনি বাংলা সাহিত্যের চিরন্তন ও অতলান্ত প্রেমের কবি।
খ বিভাগ
মান—১০ × ২ = ২০
৩। (ক) “আমাদের ভাষা সমস্যা” প্রবন্ধে ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহর যুক্তিতর্কের মূল্যায়ন কর। (১০)
ভূমিকা:
ভাষাতত্ত্ববিদ ও শিক্ষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর একটি অত্যন্ত দূরদর্শী ও মননশীল প্রবন্ধ হলো “আমাদের ভাষা সমস্যা”। পাকিস্তান সৃষ্টির প্রাক্কালে ও পরবর্তীতে বাঙালি জাতির রাষ্ট্রভাষা, শিক্ষার মাধ্যম এবং সাংস্কৃতিক ভাষার সংকট নিরসনে তিনি যে বিজ্ঞানসম্মত ও প্রাজ্ঞ মতামত দিয়েছিলেন, তা এ প্রবন্ধে সুস্পষ্টভাবে বিধৃত হয়েছে।
প্রবন্ধে উপস্থাপিত যুক্তিতর্কসমূহ:
১. মাতৃভাষাই শিক্ষার স্বাভাবিক মাধ্যম:
ড. শহীদুল্লাহ অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে যুক্তি উপস্থাপন করেন যে, কোনো জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ও সার্বজনীন শিক্ষার জন্য মাতৃভাষার কোনো বিকল্প নেই। তিনি বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশের দৃষ্টান্ত দিয়ে প্রমাণ করেন যে, বিদেশি ভাষার মাধ্যমে শিক্ষা অর্জন করতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের জীবনের অর্ধেকেরও বেশি শক্তি শুধু ভাষার কাঠামো মুখস্থ করতেই ব্যয় হয়ে যায়। অতএব প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত বাংলাকেই প্রধান মাধ্যম করা অপরিহার্য।
২. রাষ্ট্রভাষা বিতর্ক ও বাংলার অধিকার:
তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যখন সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা বাংলাকে উপেক্ষা করে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল, তখন শহীদুল্লাহ তথ্য-উপাত্ত দিয়ে দেখান যে পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৫৬ ভাগ মানুষের ভাষা বাংলা। কাজেই গণতান্ত্রিক ও ন্যায়সঙ্গত দিক থেকে বাংলাই হওয়া উচিত পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা। তিনি উদাত্ত কণ্ঠে উচ্চারণ করেছিলেন— “আমরা হিন্দু বা মুসলিম যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি।”
৩. আরবি ও উর্দু প্রীতির বিভ্রান্তি নিরসন:
ধর্মীয় সেন্টিমেন্ট ব্যবহার করে বাংলাকে আরবি বা উর্দু হরফে লেখার যে অপচেষ্টা চলছিল, ড. শহীদুল্লাহ একজন প্রখ্যাত প্রাচ্যবিদ ও ধর্মপ্রাণ মুসলিম পণ্ডিত হওয়া সত্ত্বেও তার তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি যুক্তি দেন যে, কোনো ভাষার হরফ পরিবর্তন করলেই তা ইসলামিক হয়ে যায় না; ভাষার নিজস্ব ব্যাকরণ ও প্রকৃতির বিরুদ্ধে এমন চাপিয়ে দেওয়া নীতি ভাষা ও সংস্কৃতির ধ্বংস ডেকে আনবে।
৪. আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে ইংরেজির স্থান:
তিনি একপেশে ছিলেন না। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের জন্য ইংরেজি ভাষা শেখার গুরুত্বকেও তিনি বাস্তবসম্মতভাবে স্বীকার করেছেন।
মূল্যায়ন ও সিদ্ধান্ত:
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর যুক্তিতর্ক ছিল সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক, বাস্তবধর্মী ও জাতীয়তাবাদী চেতনায় ভাস্বর। তাঁর এই সুস্পষ্ট অবস্থানের কারণেই তৎকালীন ছাত্র-সমাজ ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত অনুপ্রেরণা লাভ করেছিল।
অথবা
৩। (খ) সৈয়দ মুজতবা আলী বিরচিত ‘পাদটীকা’ গল্পে পণ্ডিতমশাইয়ের চরিত্র অঙ্কন কর। (১০)
ভূমিকা:
বাংলা রম্যসাহিত্যের দিকপাল সৈয়দ মুজতবা আলীর একটি অবিস্মরণীয় ও করুণ-মধুর ছোটগল্প হলো ‘পাদটীকা’। এই গল্পে বর্ণিত স্কুলের সংস্কৃতের পণ্ডিতমশাইয়ের চরিত্রটি একদিকে যেমন হাস্যরসাত্মক, অন্যদিকে তা তৎকালীন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সমাজব্যবস্থায় শিক্ষকদের চরম অবমূল্যায়ন ও দারিদ্র্যের এক মর্মস্পর্শী দলিল।
পণ্ডিতমশাইয়ের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যসমূহ:
১. অকৃত্রিম শিক্ষকতা ও স্নেহশীলতা:
পণ্ডিতমশাই প্রাচীন আদর্শের একজন শিক্ষক। শিক্ষার্থীদের প্রতি তাঁর শাসন যেমন ছিল আন্তরিক, তেমনি তাঁর ভালোবাসা ছিল অফুরন্ত। তিনি ছাত্রদের শুধু ব্যাকরণ ও সংস্কৃত শেখাতেন না, নীতিশিক্ষাও দিতেন।
২. চরম দারিদ্র্য ও সামাজিক অবমূল্যায়ন:
গল্পটিতে পণ্ডিতমশাইয়ের অর্থনৈতিক দুরবস্থার চিত্র অত্যন্ত বেদনাবিধুর। স্কুলের হেডমাস্টার বা অন্যান্য আধুনিক শিক্ষকদের তুলনায় পণ্ডিতমশাইকে সমাজ ও কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত তুচ্ছ চোখে দেখত। তাঁর সামান্য বেতন দিয়ে সংসার চালানো ছিল দুঃসাধ্য।
৩. সরলতা ও আত্মমর্যাদাবোধ:
দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত হলেও পণ্ডিতমশাইয়ের মাঝে কোনো কপটতা ছিল না। স্কুলের ইংরেজ ইন্সপেক্টরের পরিদর্শনের সময় কিংবা সাধারণ শ্রেণিকক্ষে তিনি তাঁর নিজস্ব সারল্য বজায় রাখতেন। পরিদর্শকের তোষামোদ করার কৌশল তাঁর জানা ছিল না, যার ফলে তিনি সর্বদা মূল প্রশাসনিক কাঠামোর বাইরে ‘পাদটীকা’ (অতিরিক্ত বা উপেক্ষিত নোট) হিসেবে পড়ে থাকতেন।
৪. উপহাসের পাত্র থেকে সহানুভূতির প্রতীকে রূপান্তর:
ছাত্ররা পণ্ডিতমশাইকে নিয়ে নানা কৌতুক করত, কিন্তু গল্পের শেষপ্রান্তে এসে তাঁর বুকভাঙ্গা দীর্ঘশ্বাস ও অসহায়ত্ব পাঠককে অশ্রুসজল করে তোলে। তিনি ঔপনিবেশিক শিক্ষা ব্যবস্থার যূপকাষ্ঠে আত্মাহুতি দেওয়া লক্ষ লক্ষ অবহেলিত গ্রামীণ শিক্ষকের প্রতিনিধি।
উপসংহার:
মুজতবা আলী পণ্ডিতমশাই চরিত্রের মধ্য দিয়ে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষক সমাজের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও দরদ প্রকাশ করেছেন। চরিত্রটি পাঠকহৃদয়ে চিরকাল চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।
৪। (ক) হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ‘তৈল’ প্রবন্ধের নামকরণের সার্থকতা নিরূপণ কর। (১০)
ভূমিকা:
মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ‘তৈল’ বাংলা ব্যঙ্গ-সাহিত্য ও রম্যপ্রবন্ধের একটি কালোত্তীর্ণ সৃষ্টি। যে কোনো সাহিত্যকর্মের নামকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; কারণ তা রচনার মূল ভাব ও মর্মবস্তুর দিকে ইঙ্গিত করে। এ প্রবন্ধে ‘তৈল’ বা তোষামোদের ভূমিকা আলোচনায় নামকরণের সার্থকতা বিচার করা যাক।
নামকরণের সার্থকতা ও প্রবন্ধের মূল বক্তব্য:
১. তৈলের প্রত্যক্ষ ও রূপক ব্যবহার:
লেখক প্রারম্ভেই তৈলের বৈষয়িক ও ব্যবহারিক গুণাগুণ বর্ণনা করেছেন— তৈল দ্বারা অঙ্গমর্দন হয়, চাকা ঘোরে, যন্ত্রের ঘর্ষণ দূর হয়। কিন্তু অতি দ্রুতই লেখক বস্তুগত তৈল থেকে এর রূপক বা সামাজিক দিকটিতে পদার্পণ করেন। সমাজে তৈল মানে হলো ‘তোষামোদ’ বা চাটুকারিতা।
২. সাংসারিক ও কর্মজীবনের চাবিকাঠি:
লেখক অত্যন্ত তির্যক ভঙ্গিতে প্রমাণ করেছেন যে, জগতে বিদ্যা, বুদ্ধি, মেধা ও প্রতিভার চেয়ে ‘তৈলপ্রদান’ বা তোষামোদ ক্ষমতা অনেক বেশি প্রভাবশালী। তৈল দিতে পারলে অসম্ভব কাজও অতি সহজে সম্পন্ন হয়ে যায়। অফিসের পদোন্নতি, রাজদরবারের তোষণ কিংবা সমাজের উচ্চাসনে বসার জন্য তৈলের চেয়ে অব্যর্থ ঔষধ আর নেই।
৩. সমাজ বাস্তবতার নগ্ন রূপ উন্মোচন:
হরপ্রসাদ শাস্ত্রী লিখেছেন— “তৈল যে কি পদার্থ তাহা আমরা সকলেই জানি, কিন্তু তৈলপ্রদান করা বড় কঠিন বিদ্যা।” যারা এই বিদ্যা আয়ত্ত করতে পেরেছে তারা জীবনে সফল, আর যারা সততা ও মেধার ওপর ভর করে চলতে চায় তারা পদে পদে লাঞ্ছিত ও বঞ্চিত হয়।
৪. ব্যঙ্গ ও শ্লেষের পরাকাষ্ঠা:
লেখক গভীর সমাজচেতনা থেকে ভণ্ড চাটুকারদের মুখোশ উন্মোচন করতে নির্মোহ হাস্যরস ও শ্লেষাত্মক ভাষা ব্যবহার করেছেন। সমগ্র প্রবন্ধটির আলোচনা আবর্তিত হয়েছে তৈলের এই অলৌকিক শক্তিকে কেন্দ্র করে।
উপসংহার:
প্রবন্ধের বিষয়বস্তু, ব্যঙ্গাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সামগ্রিক বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দু হওয়ায় ‘তৈল’ নামকরণটি বিষয়মুখী ও ব্যঞ্জনাময় হয়েছে। অতএব এ নামকরণ সর্বতোভাবে সার্থক ও যথার্থ।
অথবা
৪। (খ) ‘শিউলিমালা’ গল্পে প্রেমের যে স্বরূপ ফুটে উঠেছে তা বিশ্লেষণ কর। (১০)
ভূমিকা:
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটি কালজয়ী রোমান্টিক প্রেমের গল্প হলো ‘শিউলিমালা’। নজরুল কেবল বিদ্রোহ ও মানবতার নন, ভালোবাসার অমলিন আবেগের রূপকার। ‘শিউলিমালা’ গল্পে তিনি তরুণ হৃদয়ের প্রথম প্রেম, আকর্ষণ, বিরহ এবং আত্মত্যাগের এক অনন্য আলেখ্য অঙ্কন করেছেন।
গল্পে প্রেমের নান্দনিক স্বরূপ:
১. সঙ্গীত ও সুরের মাধ্যমে প্রেমের উন্মেষ:
গল্পের নায়ক শফিকুল সঙ্গীতপ্রেমী এক আদর্শিক যুবক। তার গানের সুরের যাদুতে মুগ্ধ হয়ে নায়িকা পারুল (শিউলি) তার প্রেমে পড়ে। প্রেম এখানে কোনো স্থূল কামজ আকর্ষণ নয়, বরং শিল্প, সঙ্গীত ও আত্মিক অনুভূতির এক স্বর্গীয় মিলন।
২. শৈশব ও কৈশোরের অনুভূতির সঞ্চার:
শিউলি ফুলের সুবাস এবং মালা গাঁথার সরল স্মৃতি যেন পারুলের অন্তরে ভালোবাসার প্রদীপ জ্বালিয়ে দেয়। পারুলের প্রেম ছিল নিঃশব্দ, লাজুক ও পরম ভক্তিময়।
৩. বিরহ ও সামাজিক বাধার ট্র্যাজেডি:
নজরুলের প্রেমের গল্পের প্রধান সুরই হলো বিচ্ছেদ। সামাজিক বিধিবিধান, জাত-পাত বা পরিবারের সিদ্ধান্ত তরুণ-তরুণীর এই পবিত্র প্রেমকে পূর্ণতা পেতে দেয়নি। শফিকুলের জীবনে পারুল আসে এক অপার্থিব সুবাস ছড়িয়ে, কিন্তু সামাজিক বাস্তবতায় তাদের পরিণয় অধরা থেকে যায়।
৪. প্রেমের অমর আত্মত্যাগ:
মিলনহীন প্রেমই নজরুলের কাছে প্রেমের চরম পরাকাষ্ঠা। পারুলের বিবাহ অন্যত্রে স্থির হলেও শফিকুলের হৃদয়ে পারুলের স্মৃতি শিউলি ফুলের পবিত্রতার মতো চিরজাগ্রত থাকে। প্রেমের এই আত্মত্যাগ ও বিরহের আর্তি গল্পটিকে ট্র্যাজিক মহিমায় ভাস্বর করেছে।
উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, ‘শিউলিমালা’ গল্পে নজরুলের প্রেম স্থূলতার ঊর্ধ্বে উঠে পবিত্রতা, সৌন্দর্য ও গভীর বিরহের এক চিরন্তন সৌন্দর্যে রূপায়িত হয়েছে।
গ বিভাগ
মান—১০ × ২ = ২০
৫। (ক) ‘বলাকা’ কবিতা যেন রবীন্দ্রনাথের স্থবিরতার বিরুদ্ধে সচেতন বিদ্রোহ।—উক্তিটির যথার্থতার পরিচয় দাও। (১০)
ভূমিকা:
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বলাকা’ কাব্যগ্রন্থের নাম-কবিতা ‘বলাকা’ আধুনিক বাংলা কবিতার ইতিহাসে গতিবাদের এক পরম বিস্ময়। এ কবিতায় কবি প্রাচীন স্থিতাবস্থা ও স্থবিরতার মায়াজাল ছিন্ন করে মহাজাগতিক নিরন্তর প্রবাহ ও গতির জয়গান গেয়েছেন। তাই উক্তিটি সর্বাংশে যথার্থ যে, ‘বলাকা’ কবিতা স্থবিরতার বিরুদ্ধে কবির সচেতন বিদ্রোহ।
স্থবিরতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও গতিবাদের উন্মেষ:
১. ঝিলাম নদীর পটভূমি ও বকের ডানার শব্দ:
কাশ্মীরের শ্রীনগরে ঝিলাম নদীর তীরে সান্ধ্য প্রকৃতির শান্ত ও নিথর পরিবেশে বসে কবি যখন অনন্ত অন্ধকারের স্তব্ধতায় নিমগ্ন, তখনই তাঁর মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যায় একঝাঁক বুনো হাঁস। তাদের ডানার তীব্র বাতাস ও চঞ্চল গতি স্তব্ধ প্রকৃতির বক্ষে এক যুগান্তকারী নাড়া দেয়। কবি অনুভব করেন, এই বিশ্বচরাচর কোথাও স্থির নয়, সবকিছুই এক অবিরাম গতির অভিযাত্রী।
২. গতির উন্মাদনা ও জড়তার বিনাশ:
বলাকার ডানা ঝাপটানোর মধ্যে কবি শুনতে পেলেন মহাকালের শাশ্বত বাণী। পর্বত, বনানী, নদী কিংবা নক্ষত্র— দৃশ্যত যা কিছু স্থির মনে হয়, গভীরে তা মহাশূন্যে ছুটে চলেছে। কবি লিখেছেন:
“পর্বত চাহিল হতে বৈশাখের নিরুদ্দেশ মেঘ;
তরুশ্রেণী চাহে পাখা মেলি
মাটির বন্ধন ফেলি
ওই শব্দ-রেখা ধরে চকিতে চকিতে
শূন্যে গিয়ে সন্ধান করিতে।”
৩. বার্গসোঁর দর্শনের প্রভাব ও আধ্যাত্মিক জাগরণ:
ফরাসি দার্শনিক অঁরি বার্গসোঁর (Henri Bergson) ‘এলঁ ভাইতাল’ (Élan vital) বা প্রাণাবেগ তত্ত্বের প্রতিফলন ঘটেছে এ কবিতায়। জীবন কোনো জমে থাকা পুকুর নয়, জীবন এক উদ্দাম স্রোতস্বিনী। স্থবিরতাই মৃত্যু, আর নিরন্তর চলাই হলো জীবন।
৪. ‘হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোনোখানে’:
মানুষের আত্মা কোনো নির্দিষ্ট সীমানায় আবদ্ধ থাকতে চায় না। সে অসীমের পানে অনন্ত ধাবমান। কবির অন্তরাত্মাও বলে ওঠে— “হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোনোখানে।”
উপসংহার:
সুতরাং দেখা যায়, বার্ধক্যের জরা ও স্থবিরতার নিশ্চলতাকে ধিক্কার দিয়ে তারুণ্যের চঞ্চল গতির আবাহনই বলাকা কবিতার মূল সুর। এ কবিতা জড়ত্বের শৃঙ্খল ভেঙে মহাজাগতিক প্রাণপ্রবাহের সাথে একাত্ম হওয়ার এক দীপ্ত ঘোষণা।
অথবা
৫। (খ) ‘উমর ফারুক’ কবিতা অবলম্বনে হযরত উমর ফারুক (রা)-এর চারিত্রিক মাহাত্ম্যের পরিচয় দাও। (১০)
ভূমিকা:
কাজী নজরুল ইসলামের ঐতিহাসিক চরিত্রাশ্রয়ী একটি কালজয়ী কবিতা হলো ‘উমর ফারুক’। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা আমীরুল মুমিনীন হযরত উমর ফারুক (রা.)-এর মহীয়সী জীবন, সুবিচার, নির্ভীক মানসিকতা ও প্রজাবাৎসল্যের যে অনন্য রূপ নজরুল এ কবিতায় এঁকেছেন, তা বিশ্বসাহিত্যে বিরল।
হযরত উমর (রা.)-এর চারিত্রিক মাহাত্ম্যসমূহ:
১. কঠোরতা ও কোমলতার অপূর্ব সমন্বয়:
হযরত উমর (রা.) বাতিলের বিরুদ্ধে ছিলেন খড়গহস্ত এবং পর্বতের ন্যায় অটল, কিন্তু সত্য ও ইনসাফের প্রশ্নে এবং দুঃখী মানুষের জন্য তাঁর হৃদয় ছিল কুসুমকোমল। নজরুল তাঁর এ চরিত্রকে ফুটিয়ে তুলেছেন অনন্য উপমায়:
“তিমির-রাত্রি ভেদ করিয়া উঠিল এক জ্যোতির্ময় পুরুষ,
বজ্র যাহার হুঙ্কারে কাপিল রোম ও পারস্যের সিংহাসন।”
২. অনুপম প্রজাবাৎসল্য ও দায়িত্ববোধ:
খলিফা হিসেবে তিনি প্রাসাদে বসে আরাম করেননি। রাতের অন্ধকারে সাধারণ প্রজাদের দুঃখ-কষ্ট দেখতে তিনি মদীনার অলিতে-গলিতে ঘুরে বেড়াতেন। ক্ষুধার্ত শিশুর মুখে আহার তুলে দেওয়ার জন্য বায়তুল মাল থেকে আটার বস্তা নিজ কাঁধে বহন করে অসহায় মায়ের তাঁবুতে পৌঁছে দিয়েছিলেন। খাদেম যখন বস্তা বহন করতে চেয়েছিল, তখন তিনি বলেছিলেন— “কিয়ামতের দিন কি আমার গুনাহের বোঝা তুমি বহন করবে?”
৩. সাম্য ও মানবিকতার চরম পরাকাষ্ঠা:
জেরুজালেম বিজয়ের সফরে খলিফা উমর ও তাঁর ভৃত্যের উটের পিঠে পালাক্রমে চড়ার ঐতিহাসিক ঘটনা তাঁর চরিত্রের সর্বোচ্চ সাম্যকে তুলে ধরে। মরুভূমির তীব্র রোদে উটের রশি ধরে খলিফা হেঁটেছেন আর ভৃত্য উটের পিঠে বসেছিল— ক্ষমতার এমন বিনয়ী ও সাম্যবাদী দৃশ্য মানবজাতির ইতিহাসে দ্বিতীয়টি নেই।
৪. কঠোর ও নিরপেক্ষ সুবিচার:
আইনের দৃষ্টিতে ধনী-দরিদ্র, আপন-পর কোনো ব্যবধান ছিল না। এমনকি স্বীয় পুত্রের অন্যায়ের বিরুদ্ধেও তিনি শরিয়তের হদ জারি করতে দ্বিধা করেননি।
উপসংহার:
নজরুল তাঁর কবিতায় উমর (রা.)-কে শুধু একজন শাসক হিসেবে নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির পথপ্রদর্শক ও ইনসাফের জীবন্ত প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। বর্তমান বিশ্বের রাজনৈতিক অস্থিরতায় উমরের চরিত্রই হোক আদর্শ আলোকবর্তিকা।
৬। (ক) ‘বনলতা সেন’ কবিতায় জীবনানন্দ দাশ প্রকৃতি প্রেমের যে মানসচিত্র অঙ্কন করেছেন, তা তোমার নিজের ভাষায় লেখ। (১০)
ভূমিকা:
আধুনিক বাংলা সাহিত্যের তিমিরবিনাশী ও রূপসী বাংলার রূপকার জীবনানন্দ দাশের কালজয়ী সৃষ্টি ‘বনলতা সেন’। এ কবিতা কেবল একজন কাঙ্ক্ষিত নারীর স্তুতি নয়, বরং যুগ-যুগান্তরের ক্লান্ত পথিকের নিঃসঙ্গতা এবং বাংলার শ্যামল প্রকৃতির নিবিড় কোলে পরম আশ্রয়ের এক অতীন্দ্রিয় মানসচিত্র।
প্রকৃতি ও প্রেমের যুগলবন্দী মানসচিত্র:
১. হাজার বছরের পরিভ্রমণ ও প্রকৃতির ব্যাপ্তি:
কবিতার প্রারম্ভেই কবি ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক এক সুবিশাল ক্যানভাস তৈরি করেন। সিংহল সমুদ্র, মালয় সাগর, বিদিশা নগরী কিংবা শ্রাবস্তীর মতো সুদূর ইতিহাস ও ভৌগোলিক বিস্তৃতির মাঝে ক্লান্ত পথিক খুঁজে ফেরে দুদণ্ড শান্তি। প্রকৃতির এই বিশালতাই কবির অন্তরের আশ্রয়স্থল।
২. বাংলার চিরন্তন প্রকৃতির উপমায় নারীর রূপায়ণ:
জীবনানন্দ দাশ তাঁর প্রেমিকা বনলতা সেনের অবয়ব নির্মাণ করেছেন সম্পূর্ণ বাংলার পল্লী প্রকৃতির নিখাদ উপাদান দিয়ে:
– “চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা”— নারীর কেশরাশিতে ঘনিয়ে এসেছে নিঝুম রাতের তমসা।
– “মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য”— শিল্পের সৌন্দর্য।
– “পাখির নীড়ের মত চোখ তুলে মহীয়সী বনলতা সেন”— পৃথিবীর সকল ঝঞ্ঝা ও ক্লান্তি থেকে পরম নিরাপত্তা যেন পাখির ছোট্ট নীড়ের মতোই পরম আশ্রয়ে ধরা দিয়েছে নারীর দুই নয়নে।
৩. সান্ধ্য প্রকৃতির মায়াবী পরিবেশ:
দিনের সমস্ত কোলাহল শেষে যখন ধরণীতে সন্ধ্যা নেমে আসে, কবি প্রকৃতির সেই মায়াবী রূপকে এঁকেছেন তুলির টানে:
“সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন
সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;
পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন
তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল।”
এই বর্ণনা প্রমাণ করে কবি প্রকৃতির অণু-পরমাণুর স্পন্দনকে কতটা নিবিড়ভাবে অনুভব করতে পেরেছিলেন।
উপসংহার:
‘বনলতা সেন’ কবিতায় প্রকৃতি এবং নারী পরস্পর বিলীন হয়ে একাকার হয়ে গেছে। জীবনানন্দের প্রকৃতিচেতনা এখানে বহিরঙ্গ বর্ণনায় সীমাবদ্ধ না থেকে মানবিক নিঃসঙ্গতা ঘোচানোর এক চিরন্তন শান্তির আলয়ে পরিণত হয়েছে।
অথবা
৬। (খ) ‘আমার পূর্ববাংলা’ একটি অসামান্য আধুনিক কবিতা—উক্তিটি বিশ্লেষণ কর। (১০)
ভূমিকা:
পঞ্চাশের দশকের অন্যতম প্রধান কবি সৈয়দ আলী আহসানের রচিত ‘আমার পূর্ববাংলা’ স্বদেশপ্রেম ও আধুনিক কাব্যভাষার এক অপূর্ব সম্মিলন। ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে পূর্ববাংলার নিসর্গ, নদী, জনপদ এবং মানুষের আত্মিক রূপ যেভাবে এ কবিতায় মূর্ত হয়েছে, তাতে এটি নিঃসন্দেহেই একটি অসামান্য আধুনিক কবিতা।
আধুনিক কবিতার বৈশিষ্ট্য ও ‘আমার পূর্ববাংলা’:
১. স্বদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অনবদ্য চিত্ররূপ:
কবি পূর্ববাংলাকে কোনো জড় ভূখণ্ড হিসেবে দেখেননি, দেখেছেন এক প্রাণবন্ত রূপবতী জননী রূপে। পদ্মার রূপালী ইলিশ, শরতের মেঘ, শীতের কুয়াশা, বাঁশবনের ছায়া এবং ভাটিয়ালি গানের সুর মিলেমিশে পূর্ববাংলা কবির মানসপটে জীবন্ত হয়ে ওঠে।
২. আধুনিক সংবেদনশীলতা ও চিত্রকল্প:
আধুনিক কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো অভিনব চিত্রকল্প ও প্রতীকের ব্যবহার। সৈয়দ আলী আহসান প্রচলিত স্বদেশপ্রেমের সংকীর্ণ প্রচারধর্মী স্লোগান পরিহার করে অত্যন্ত গভীর শিল্পগুণে স্বদেশের রূপ এঁকেছেন। তিনি লিখেছেন— “আমার পূর্ববাংলা একগুচ্ছ স্নিগ্ধ অন্ধকারের মতো / একখণ্ড মেঘের মতো / শ্রাবণের পূর্ণ নদীর মতো।”
৩. ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির শেকড়সন্ধানী চেতনা:
পূর্ববাংলার লোকসংস্কৃতি, জারি-সারি গান, কৃষকের মেহনত এবং নদীমাতৃক বাংলার আবহমান জীবনধারা কবির ভাবনায় গভীর মমতায় স্থান পেয়েছে। ঔপনিবেশিক পাকিস্তানের শোষণ ও আধিপত্যের মুখে দাঁড়িয়ে স্বদেশের ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্বকে এভাবে কবিতার ভাষায় আবিষ্কার করা ছিল এক যুগান্তকারী আধুনিক চেতনা।
৪. ব্যক্তিমানস ও সমষ্টির ঐক্য:
কবির নিজস্ব অনুভূতি ও জাতির সামগ্রিক চেতনা এখানে এক বিন্দুতে মিলিত হয়েছে। কবি যখন বলেন, “আমার পূর্ববাংলা আমার আনন্দ, আমার বেদনা”, তখন তা কোটি বাঙালির অন্তরের সংরাগে পরিণত হয়।
উপসংহার:
বিষয়বস্তুর গাম্ভীর্য, নিখুঁত ছন্দপ্রবাহ, প্রতীকী ব্যঞ্জনা এবং আধুনিক স্বাদেশিক চেতনার আলোকে সৈয়দ আলী আহসানের ‘আমার পূর্ববাংলা’ আধুনিক বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সাধারণ শ্রেষ্ঠ কবিতা।
ঘ বিভাগ
মান—৫ × ৪ = ২০
৭। যে কোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও: (মান: ৫ × ৪ = ২০)
(ক) বাংলা ভাষা কাকে বলে? সাধু ও চলিতরীতির পার্থক্য লেখ।
বাংলা ভাষার সংজ্ঞা:
ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, “মাগধী অপভ্রংশ হইতে উদ্ভূত যে ভাষা আজ বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে প্রধানত ব্যবহৃত হইতেছে, তাহাকেই বাঙ্গালা ভাষা বলে।” সহজ কথায়, বাঙালি জাতি মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য যে অর্থপূর্ণ ধ্বনি ও বাক্য উচ্চারণ করে, তাকে বাংলা ভাষা বলে।
সাধু ও চলিতরীতির পার্থক্য:
| বৈশিষ্ট্য | সাধুরীতির রূপ | চলিতরীতির রূপ |
|---|---|---|
| ১. পদবিন্যাস ও গাম্ভীর্য | সাধুরীতি মার্জিত, গুরুগম্ভীর এবং তৎসম (সংস্কৃত) শব্দবহুল। | চলিতরীতি সহজ-সরল, চটুল এবং তদ্ভব ও দেশি শব্দবহুল। |
| ২. সর্বনাম ও ক্রিয়াপদ | সর্বনাম ও ক্রিয়াপদের পূর্ণাঙ্গ বা দীর্ঘ রূপ ব্যবহৃত হয় (যেমন: তাহাদিগের, করিতেছে, খাইয়াছিল)। | সর্বনাম ও ক্রিয়াপদের সংক্ষিপ্ত রূপ ব্যবহৃত হয় (যেমন: তাদের, করছে, খেয়েছিল)। |
| ৩. অনুসর্গ ও অব্যয় | অনুসর্গের পূর্ণরূপ বসে (যেমন: হইতে, দিয়া)। | অনুসর্গের সংক্ষিপ্ত রূপ বসে (যেমন: হতে, দিয়ে)। |
| ৪. নাটকের সংলাপ ও বক্তৃতা | সাধুরীতি নাটক ও কথোপকথনের অনুপযোগী। | চলিতরীতি নাটক, কথোপকথন ও বক্তৃতার জন্য সর্বতোভাবে উপযোগী। |
| ৫. পরিবর্তনশীলতা | সাধুরীতি ব্যাকরণের কঠোর নিয়মানুসারী ও অপরিবর্তনশীল। | চলিতরীতি মানুষের মুখের ভাষার সাথে সাথে পরিবর্তনশীল ও জীবন্ত। |
(খ) ব্যাসবাক্যসহ সমাস নির্ণয় কর (পাঁচটি):
- বই-পত্র: বই ও পত্র = দ্বন্দ্ব সমাস।
- মনমাঝি: মন রূপ মাঝি = রূপক কর্মধারয় সমাস।
- ঘরজামাই: ঘরে আশ্রিত জামাই = মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস।
- উপজেলা: জেলার সদৃশ / ক্ষুদ্র জেলা = অব্যয়ীভাব সমাস।
- নদীমাতৃক: নদী মাতা যার = বহুব্রীহি সমাস।
- গৃহান্তর: অন্য গৃহ = নিত্য সমাস।
- গণতন্ত্র: গণের তন্ত্র = ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস।
(গ) প্রকৃতি ও প্রত্যয় নির্ণয় কর (পাঁচটি):
- অত্যন্ত: অতি + অন্ত (সন্ধিজাত) অথবা তদ্ধিত প্রত্যয়জাত রূপ। প্রকৃতি-প্রত্যয়: অতি + √অম্ + ত (ক্ত)।
- উক্ত: √বচ্ + ত (ক্ত) = কৃৎ প্রত্যয়।
- একুশে: একুশ + এ = তদ্ধিত প্রত্যয়।
- ক্রেতা: √ক্রী + তৃচ্ (তা) = কৃৎ প্রত্যয়।
- পার্থিব: পৃথিবী + ষ্ণ (অ) = তদ্ধিত প্রত্যয়।
- খেলনা: √খেল্ + অনা = কৃৎ প্রত্যয়।
- কর্তব্য: √কৃ + তব্য = কৃৎ প্রত্যয়।
(ঘ) উপসর্গ কাকে বলে? বাংলা শব্দ গঠনে উপসর্গের ভূমিকা ব্যাখ্যা কর।
উপসর্গের সংজ্ঞা:
যেসব অর্থহীন অব্যয়সূচক শব্দাংশ ধাতু বা শব্দের পূর্বে বসে তার অর্থের পরিবর্তন, সংকোচন, সম্প্রসারণ বা নতুন অর্থবোধক শব্দ তৈরি করে, সেগুলোকে উপসর্গ বলে। যেমন: ‘হার’ শব্দের পূর্বে ‘আ’ উপসর্গ যুক্ত হয়ে হয় ‘আহার’ (খাওয়া), ‘প্র’ যুক্ত হয়ে ‘প্রহার’ (মারধর)।
বাংলা শব্দ গঠনে উপসর্গের ভূমিকা:
উপসর্গকে বলা হয় বাংলা শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধকরণের এক জাদুকরী হাতিয়ার। এর প্রধান ভূমিকাসমূহ নিম্নরূপ:
১. নতুন শব্দ সৃষ্টি: উপসর্গের নিজস্ব কোনো অর্থবাচকতা নেই, কিন্তু অন্য শব্দের পূর্বে বসে নতুন অর্থদ্যোতকতা সৃষ্টি করে। যেমন: জ্ঞান শব্দের পূর্বে ‘বি’ যুক্ত হয়ে ‘বিজ্ঞান’।
২. শব্দের অর্থের পূর্ণতা সাধন: শব্দের অর্থকে পূর্ণ ও বিকশিত করে। যেমন: পুষ্ট এর পূর্বে ‘পরি’ যুক্ত হয়ে ‘পরিপুষ্ট’।
৩. শব্দের অর্থের সংকোচন: মূল শব্দের অর্থকে সীমিত বা সংকুচিত করে। যেমন: ছায়া এর পূর্বে ‘উপ’ যুক্ত হয়ে ‘উপচ্ছায়া’।
৪. শব্দের অর্থের পরিবর্তন: মূল শব্দের বিপরীত বা ভিন্ন অর্থ প্রদান করে। যেমন: মান এর পূর্বে ‘অপ’ যুক্ত হয়ে ‘অপমান’, রাজি এর পূর্বে ‘বে’ যুক্ত হয়ে ‘বেরাজি’।
সুতরাং, বাংলা ভাষার নতুন নতুন শব্দ সৃষ্টি ও শব্দভাণ্ডার সম্প্রসারণে উপসর্গের ভূমিকা অপরিহার্য।
(ঙ) বাংলা একাডেমি কর্তৃক প্রণীত প্রমিত বাংলা বানানের পাঁচটি নিয়ম উদাহরণসহ লেখ।
বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের যে নিয়মাবলি প্রণয়ন করেছে, তার প্রধান পাঁচটি নিয়ম নিচে তুলে ধরা হলো:
১. অতৎসম শব্দে ই/ঈ-এর ব্যবহার: সকল অতৎসম (তদ্ভব, দেশি, বিদেশি ও মিশ্র) শব্দে সর্বদা হ্রস্ব-ইকার (ি) বা ই ব্যবহৃত হবে, দীর্ঘ-ঈকার (ী) ব্যবহৃত হবে না। যেমন: পাখি, বাড়ি, শাড়ি, সরকারি, আরবি, ফারসি ইত্যাদি।
২. রেফের পর ব্যঞ্জনবর্ণের দ্বিত্ব বর্জন: শব্দের মধ্যে রেফ (র্)-এর পরে কোনো ব্যঞ্জনবর্ণের দ্বিত্ব হবে না। যেমন: কর্ম (কর্ম্ম নয়), ধর্ম (ধর্ম্ম নয়), সূর্য (সূর্য্য নয়), অর্জন (অর্জ্জন নয়)।
৩. ‘ক্ষি’ ও ‘অপ্রয়োজনীয় ‘ষ’-এর পরিহার: বিদেশি শব্দে কদাচ ‘ষ’ বা ‘ণ’ ব্যবহৃত হবে না। সর্বদা দন্ত্য-স (স) ব্যবহৃত হবে। যেমন: বাস, স্টেশন, পোস্ট, স্টার ইত্যাদি।
৪. ‘আলি’ প্রত্যয়যুক্ত শব্দ: শব্দে ‘আলি’ প্রত্যয় যুক্ত হলে সর্বদা হ্রস্ব-ইকার (ি) হবে। যেমন: সোনালি, রুপালি, বর্ণালি, মিতালি ইত্যাদি।
৫. সন্ধির ‘হস্’ চিহ্ন ও বিসর্গ বর্জন: শব্দের শেষে বিসর্গ (ঃ) বর্জন করতে হবে। যেমন: মূলত (মূলতঃ নয়), প্রধানত (প্রধানতঃ নয়), ফলত (ফলতঃ নয়)।
(চ) বিভিন্ন বিরামচিহ্নের নাম লেখ এবং সংক্ষেপে এদের ব্যবহার রীতি উদাহরণসহ আলোচনা কর।
বাক্যের অর্থ সুস্পষ্টভাবে বোঝাতে এবং পাঠের সুবিধার্থে বাক্যের মধ্যে বা শেষে যে সকল যতি বা বিরামচিহ্ন ব্যবহৃত হয়, সেগুলোর প্রধান কয়েকটি নিচে আলোচনা করা হলো:
১. দাঁড়ি বা পূর্ণচ্ছেদ (|): বাক্যের সমাপ্তি বা পূর্ণ ভাব প্রকাশের জন্য বসে। থামার সময়: ১ সেকেন্ড। যেমন: বাংলাদেশ একটি সুন্দর দেশ।
২. কমা (,): বাক্যে অল্প বিরতি নির্দেশ করতে বা সমজাতীয় পদ পৃথক করতে বসে। থামার সময়: ১ বলতে যে সময় লাগে। যেমন: সুখ চাও, সুখ পাবে পরিশ্রমে।
৩. সেমিকোলন (;): কমার চেয়ে বেশি কিন্তু দাড়ির চেয়ে কম বিরতির জন্য বসে। থামার সময়: ১ বলার দ্বিগুণ সময়। যেমন: তিনি বিদ্বান; কিন্তু চরিত্রহীন।
৪. প্রশ্নবোধক চিহ্ন (?): কোনো কিছু জানতে বা জিজ্ঞাসা করতে বাক্যের শেষে বসে। থামার সময়: ১ সেকেন্ড। যেমন: আপনার নাম কী?
৫. বিস্ময়সূচক চিহ্ন (!): আনন্দ, ভয়, শোক, বিস্ময় ইত্যাদি আবেগ প্রকাশে বসে। থামার সময়: ১ সেকেন্ড। যেমন: বাহ! পাখিটি তো চমৎকার!
৬. কোলন (:): উদাহরণ বা উদ্ধৃতি দিতে ব্যবহৃত হয়। যেমন: পদ প্রধানত দুই প্রকার: নামপদ ও ক্রিয়াপদ।
৭. উদ্ধৃতি চিহ্ন (“ ”): বক্তার আসল উক্তি হুবহু তুলে ধরতে ব্যবহৃত হয়। যেমন: শিক্ষক বললেন, “সদা সত্য কথা বলবে।”
(ছ) ভাব-সম্প্রসারণ লেখ:
“স্বদেশের উপকারে নাই যার মন
কে বলে মানুষ তারে? পশু সেই জন।”
মূলভাব:
স্বদেশপ্রেম মানুষের শ্রেষ্ঠ মানবিক ও নৈতিক গুণ। যে ব্যক্তি মাতৃভূমির ঋণ স্বীকার করে না এবং দেশের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করে না, সে মানুষ নামের অযোগ্য এবং পশুর সমান।
সম্প্রসারিত ভাব:
জন্মভূমি মানুষের কাছে পরম জননীর মতো শ্রদ্ধেয়। মানুষ যে দেশের আলো-বাতাসে লালিত-পালিত হয়, যে দেশের জল ও খাদ্য খেয়ে জীবনধারণ করে, সে দেশের প্রতি তার অপরিসীম ঋণ ও দায়িত্ব রয়েছে। দেশমাতৃকার এই ঋণ পরিশোধ করা প্রত্যেক নাগরিকের পরম পবিত্র কর্তব্য। নিঃস্বার্থ দেশপ্রেম মানুষকে উচ্চ মহিমায় আসীন করে। স্বদেশপ্রেমের প্রেরণাতেই মানুষ নিজ স্বার্থ, এমনকি অমূল্য জীবনও বিসর্জন দিতে কুণ্ঠাবোধ করে না।
পক্ষান্তরে, যে ব্যক্তি কেবল নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থ, ভোগবিলাস ও অর্থোপার্জনে মত্ত থাকে এবং স্বদেশের কল্যাণ ও দেশের মানুষের বিপদে এগিয়ে আসে না, সে প্রকৃত মানুষ হতে পারে না। পশু যেমন কেবল নিজের উদরপূর্তি ও জৈবিক চাহিদার জন্য বাঁচে, তার কোনো বৃহত্তর দেশ বা সমাজের প্রতি অনুভূতি থাকে না; তেমনি যে মানুষের অন্তরে স্বদেশের প্রতি দরদ ও মমতা নেই, তার সাথে পশুর কোনো গুণগত পার্থক্য নেই। সে সমাজের এক অভিশাপ এবং দেশের এক পরজীবী কীট। ইতিহাস এমন স্বার্থপর দেশদ্রোহীদের ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে, আর দেশপ্রেমিকদের চিরস্মরণীয় করে রেখেছে।
মন্তব্য:
দেশপ্রেমহীন ব্যক্তি আত্মিক দিক থেকে সম্পূর্ণ মৃত। সুতরাং প্রতিটি মানুষের উচিত সংকীর্ণ স্বার্থপরতা পরিহার করে দেশমাতৃকার সেবায় আত্মনিয়োগ করা এবং প্রকৃত মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলা।
(জ) বাংলা প্রভাষক পদে চাকুরীর জন্য একটি আবেদনপত্র লেখ।
তারিখ: ২৫ অক্টোবর ২০২২
বরাবর,
অধ্যক্ষ
দারুননাজাত সিদ্দিকিয়া কামিল মাদ্রাসা
ডেমরা, ঢাকা।
বিষয়: বাংলা প্রভাষক পদে চাকুরীর জন্য আবেদন।
মহোদয়,
বিনীত নিবেদন এই যে, গত ২০ অক্টোবর ২০২২ তারিখে দৈনিক ‘ইত্তেফাক’ পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানতে পারলাম যে, আপনার ঐতিহ্যবাহী মাদ্রাসায় ফাজিল ও কামিল স্তরে পাঠদানের জন্য একজন ‘বাংলা প্রভাষক’ নিয়োগ করা হবে। আমি উক্ত পদের একজন আগ্রহী প্রার্থী হিসেবে আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা ও জীবনবৃত্তান্ত আপনার সদয় বিবেচনার জন্য নিচে পেশ করছি:
ব্যক্তিগত তথ্যাবলি:
১. প্রার্থীর নাম: মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম
২. পিতার নাম: মো: আবদুল লতিফ
৩. মাতার নাম: মোসা: খাদিজা বেগম
৪. বর্তমান ঠিকানা: বাসা নং- ১২, রোড নং- ৪, সেক্টর- ৩, উত্তরা, ঢাকা।
৫. স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: রামপুর, ডাকঘর: সোনাপুর, উপজেলা: রায়পুরা, জেলা: নরসিংদী।
৬. জন্ম তারিখ: ১৫ জানুয়ারি ১৯৯৬ খ্রি.
৭. জাতীয়তা: বাংলাদেশী
৮. ধর্ম: ইসলাম
শিক্ষাগত যোগ্যতা:
| পরীক্ষার নাম | বিভাগ / বিষয় | বোর্ড / বিশ্ববিদ্যালয় | পাসের সাল | প্রাপ্ত জিপিএ / সিজিপিএ |
|---|---|---|---|---|
| দাখিল | সাধারণ | বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড | ২০১১ | ৫.০০ (এ প্লাস) |
| আলিম | সাধারণ | বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড | ২০১৩ | ৫.০০ (এ প্লাস) |
| বি.এ (অনার্স) | বাংলা ভাষা ও সাহিত্য | ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় | ২০১৭ | ৩.৬৫ (প্রথম শ্রেণি) |
| এম.এ | বাংলা ভাষা ও সাহিত্য | ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় | ২০১৮ | ৩.৭০ (প্রথম শ্রেণি) |
| এনটিআরসিএ (NTRCA) | প্রভাষক (বাংলা) | বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ | ২০১৯ | উত্তীর্ণ (মেধা স্থান: ২৫) |
অতএব, মহোদয়ের নিকট বিনীত প্রার্থনা, উপরোক্ত যোগ্যতার ভিত্তিতে আমাকে উক্ত ‘বাংলা প্রভাষক’ পদে নিয়োগের জন্য ইন্টারভিউতে অংশগ্রহণের সুযোগ দানে বাধিত করবেন।
বিনীত নিবেদক,
মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম
মোবাইল: ০১৭১২-XXXXXX
সংযুক্তি: সকল শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদের সত্যায়িত অনুলিপি, এনটিআরসিএ সনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র ও ২ কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: ফাজিল ১ম বর্ষের বাংলা পরীক্ষার বিষয় কোড ও মানবন্টন কী?
ফাজিল স্নাতক (সম্মান) ১ম বর্ষের বাংলা বিষয়ের বিষয় কোড ২০১১০৪। এতে ক বিভাগ (সাহিত্য), খ বিভাগ (গদ্য), গ বিভাগ (কবিতা) এবং ঘ বিভাগ (ব্যাকরণ ও নির্মিতি) থেকে মোট ৮০ নম্বরের প্রশ্ন হয়।
প্রশ্ন ২: বাংলা সাহিত্যের সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য যুগবিভাগ কোনটি?
ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতানুযায়ী ৯৫০ থেকে ১২০০ খ্রিষ্টাব্দ প্রাচীন যুগ, ১২০১ থেকে ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ মধ্যযুগ এবং ১৮০১ থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত আধুনিক যুগ— এই ত্রিকাল বিভাজনই সর্বাধিক প্রামাণ্য।
প্রশ্ন ৩: ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ কত সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এর উদ্দেশ্য কী ছিল?
১৮০০ সালের ৪ মে কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। ইংরেজ সিভিলিয়ান নবীন কর্মচারীদের দেশীয় ভাষা ও সংস্কৃতির পাঠদানের উদ্দেশ্যে এ কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
প্রশ্ন ৪: কাজী নজরুল ইসলামের ‘উমর ফারুক’ কবিতার মূল উপজীব্য কী?
হযরত উমর ফারুক (রা.)-এর ইনসাফ, চারিত্রিক দৃঢ়তা, কোমল প্রজাবাৎসল্য এবং ক্ষমতার বিনয়ী সাম্যবাদী শাসনকে এ কবিতায় চিত্রিত করা হয়েছে।
প্রশ্ন ৫: প্রমিত বাংলা বানানে অতৎসম শব্দে কোন ই-কার ব্যবহৃত হয়?
বাংলা একাডেমি প্রণীত প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম অনুযায়ী সকল অতৎসম (দেশি, বিদেশি ও তদ্ভব) শব্দে সর্বদা হ্রস্ব-ইকার (ি) ব্যবহৃত হয়, দীর্ঘ-ঈকার (ী) বর্জনীয়।
প্রশ্ন ৬: সাধু ও চলিতরীতির প্রধান পার্থক্য কী?
সাধুরীতি সংস্কৃত শব্দবহুল, গুরুগম্ভীর এবং সর্বনাম ও ক্রিয়াপদের পূর্ণরূপ ব্যবহৃত হয়; পক্ষান্তরে চলিতরীতি মানুষের মুখের স্বাভাবিক ভাষা, চটুল এবং সর্বনাম ও ক্রিয়াপদের সংক্ষিপ্ত রূপ ব্যবহৃত হয়।

