ভারতে মুসলমানদের ইতিহাস (৭১২—১৫২৬ খ্রি.) (History of the Muslims in India 712-1526) – 205103, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি – ফাজিল অনার্স ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২১

StudyBoi StudyBoi
September 26, 2026
৪৩ মিনিট পড়ার সময়
২ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন

পরীক্ষা কোড: ২০১ | প্রশ্নপত্র কোড: ০৩১
ফাজিল (স্নাতক) সম্মান প্রথম বর্ষ পরীক্ষা, ২০২১
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
ভারতে মুসলমানদের ইতিহাস (৭১২—১৫২৬ খ্রি.)
[History of the Muslims in India (712—1526 A.D.)]
বিষয় কোড: ২০৫১০৩
সময়—৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান—৮০
[দ্রষ্টব্য: ক বিভাগ থেকে ৪টি এবং খ বিভাগ থেকে ২টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।]


ক বিভাগ (রচনামূলক প্রশ্ন)

১। আরবদের সিন্ধু বিজয়ের প্রাক্কালে ভারতের রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক অবস্থার বিবরণ দাও।

[Narrate the political and socio-economic conditions of the India on the eve of the conquest of Sind by the Arabs.]

ভূমিকা

৭১২ খ্রিষ্টাব্দে কিশোর সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাসিমের নেতৃত্বে আরবদের সিন্ধু বিজয়ের মাধ্যমে ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের ঐতিহাসিক সূচনা ঘটে। এই বিজয়ের প্রাক্কালে অর্থাৎ অষ্টম শতাব্দীর প্রথমার্ধে ভারতের রাজনৈতিক সংহতি বিনষ্ট ছিল এবং সমাজব্যবস্থা চরম ভেদাভেদ ও অনাচারে নিমজ্জিত ছিল, যা মুসলিম বিজয়ের পথকে সুগম করেছিল।

রাজনৈতিক অবস্থা

  • রাজনৈতিক অনৈক্য ও খণ্ডরাজ্য: হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর পর উত্তর ভারতে কোনো শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শাসন ছিল না। সমগ্র ভারত বহু ছোট ছোট স্বাধীন ও কলহপ্রিয় রাজ্যে বিভক্ত ছিল। কনৌজ, কাশ্মীর, সিন্ধু, মালব ও বাংলার রাজারা নিজেদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত থাকত।
  • সিন্ধুর অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা: সিন্ধুর শাসক রাজা দাহির ছিলেন একজন অত্যাচারী ব্রাহ্মণ শাসক। তিনি বৌদ্ধ ও নিম্নবর্ণের প্রজাদের ওপর কঠোর নির্যাতন চালাতেন। ফলে সিংহভাগ প্রজা তাঁর প্রতি বিক্ষুব্ধ ছিল।
  • সামরিক ব্যবস্থার ত্রুটি: ভারতীয় রাজারা প্রাচীন সামরিক কৌশল এবং ধীরগতির হস্তিবাহিনীর ওপর নির্ভরশীল ছিলেন, যা আরবদের দ্রুতগামী অশ্বারোহী বাহিনী এবং আধুনিক মেকানাইজড ‘মানজানিক’ (Catapult)-এর সামনে চরমভাবে ব্যর্থ হয়।

আর্থ-সামাজিক ও ধর্মীয় অবস্থা

  • চরম বর্ণপ্রথা ও জাতিভেদ (Caste System): হিন্দু সমাজ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র—এই চার বর্ণে বিভক্ত ছিল। নিম্নবর্ণের শূদ্র ও অস্পৃশ্যদের কোনো সামাজিক অধিকার ছিল না। সিন্ধুর জাট ও মেদ উপজাতিকে জুতা পরা, ঘোড়ায় চড়া এবং ভালো পোশাক পরা নিষিদ্ধ ছিল।
  • নারীর অমর্যাদাকর অবস্থান: সমাজে নারীর মর্যাদা ছিল শোচনীয়। বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ এবং সতীদাহ প্রথা ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। নারীদের কোনো উত্তরাধিকার বা সম্পত্তির অধিকার ছিল না।
  • অর্থনৈতিক শোষণ ও বৈষম্য: সাধারণ কৃষক ও মেহনতি মানুষের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা চাপানো হতো, অথচ মন্দিরের পুরোহিত ও সামন্ত প্রভুরা অঢেল সম্পদের অধিকারী ছিল। ফলে সাধারণ মানুষ মুক্তির উপায় খুঁজছিল।
  • ধর্মীয় বিরোধ: সিন্ধুতে হিন্দু ও বৌদ্ধদের মধ্যে তীব্র ধর্মীয় অসন্তোষ বিদ্যমান ছিল। রাজা দাহিরের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে বৌদ্ধরা মুহাম্মদ বিন কাসিমকে গোপনে সাহায্য করেছিল।

উপসংহার

আরবদের সিন্ধু বিজয়ের প্রাক্কালে ভারতের রাজনৈতিক অনৈক্য, বর্ণবাদী বৈষম্য এবং নৈতিক অবক্ষয় এক মারাত্মক শূন্যতার সৃষ্টি করেছিল। মুহাম্মদ বিন কাসিম সমতা, ধর্মীয় সহনশীলতা ও ন্যায়পরায়ণতার যে আদর্শ প্রদর্শন করেছিলেন, তা ভারতীয় সমাজকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করে।


২। ভারতে মুসলিম শাসনের ইতিহাসের উৎসসমূহ আলোচনা কর।

[Discuss the sources of the history of Muslim rule in India.]

ভূমিকা

ভারতে ৭১২ খ্রিষ্টাব্দে সিন্ধু বিজয় থেকে শুরু করে ১৫২৬ খ্রিষ্টাব্দে দিল্লি সালতানাতের সমাপ্তি পর্যন্ত দীর্ঘ সময়কালের ইতিহাস পুনর্নির্মাণের জন্য ঐতিহাসিকগণ বহু সমৃদ্ধ ও প্রামাণ্য উৎসের ওপর নির্ভর করেন। প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসের তুলনায় মুসলিম শাসনামলের ইতিহাস অনেক বেশি প্রামাণ্য ও ধারাবাহিক, কারণ মুসলিম পণ্ডিতরা ইতিহাস রচনার বৈজ্ঞানিক রীতি অনুসরণ করতেন।

মুসলিম ইতিহাসের প্রধান উৎসসমূহ

  • ১. সমসাময়িক ফারসি ও আরবি ইতিহাসগ্রন্থ (Literary Sources):
    • চাচনামা (Chachnama): সিন্ধু বিজয়ের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আদি ফারসি উৎস, যাতে আরবদের আগমন ও রাজা দাহিরের পতনের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।
    • তারিখ-ই-ইয়ামিনী (উতবি): সুলতান মাহমুদ গজনভীর ভারত অভিযানের নির্ভরযোগ্য ইতিহাস।
    • কিতাবুল হিন্দ (আল-বিরুনি): একাদশ শতাব্দীর ভারতের বিজ্ঞান, ধর্ম, ভূগোল ও সমাজব্যবস্থার এক বিশ্বকোষীয় আকরগ্রন্থ।
    • তাবাকাত-ই-নাসিরী (মিনহাজ-ই-সিরাজ): মুহাম্মদ ঘুরী, কুতুবউদ্দীন আইবেক ও শামসুদ্দিন ইলতুতমিশের আমল থেকে নাসিরউদ্দিন মাহমুদের সময় পর্যন্ত সালতানাতের রাজনৈতিক ইতিহাস।
    • তারিখ-ই-ফিরোজশাহী (জিয়াউদ্দীন বারানী ও শামস-ই-সিরাজ আফিফ): বলবন, খলজি ও তুঘলক বংশের শাসনব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক সংস্কারের অমূল্য বিবরণ।
  • ২. বিদেশি পর্যটকদের ভ্রমণবৃত্তান্ত (Travelogues):
    • ইবনে বতুতার ‘রেহলা’ (Rihla): সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের দরবারে দীর্ঘ আট বছর অবস্থানকারী মরক্কোর বিশ্বখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা তাঁর গ্রন্থে সেকালের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার সজীব চিত্র তুলে ধরেছেন।
    • আব্দুর রাজ্জাক ও মার্কো পোলো: দক্ষিণ ভারতের বিজয়নগর ও বাণিজ্য ব্যবস্থার নিখুঁত বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন।
  • ৩. স্মৃতিকথা ও আত্মজীবনী: সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলকের স্বরচিত ‘ফুতুহাত-ই-ফিরোজশাহী’ এবং সম্রাট বাবুরের কালজয়ী আত্মজীবনী ‘তুজুক-ই-বাবুরী’ (বাবুরনামা) অত্যন্ত প্রত্যক্ষ ও মূল্যবান উৎস।
  • ৪. প্রত্নতাত্ত্বিক ও স্থাপত্যিক উপাদান (Archaeological Sources): দিল্লির কুতুব মিনার, কুওয়াতুল ইসলাম মসজিদ, আলাই দরওয়াজা, তুঘলকাবাদ দুর্গ এবং ফিরোজ শাহ কোটলা সালতানাত যুগের স্থাপত্যরীতি ও কারিগরি উৎকর্ষের সাক্ষী।
  • ৫. মুদ্রা ও শিলালিপি (Numismatics & Epigraphy): ইলতুতমিশের রৌপ্যমুদ্রা ‘টঙ্কা’ ও তাম্রমুদ্রা ‘জিতল’, আলাউদ্দিন খলজির মুদ্রার উপাধি এবং বিভিন্ন মসজিদের শিলালিপি নির্ভুল কালানুক্রম নির্ণয়ে সহায়তা করে।

উপসংহার

লিখিত সাহিত্য, স্থাপত্য এবং মুদ্রার এই বিপুল সমন্বয়ের কারণে ভারতে দিল্লি সালতানাতের ইতিহাস পৃথিবীর অন্যতম সুসংরক্ষিত ও সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক অধ্যায় হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে।


৩। সুলতান রাজিয়া কে ছিলেন? তাঁর কৃতিত্ব ও চরিত্র পর্যালোচনা কর।

[Who was Sultan Razia? Review her achievements and character.]

ভূমিকা

দিল্লি সালতানাতের ইতিহাসে ১২৩৬ থেকে ১২৪০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত সুলতানা রাজিয়া ছিলেন মধ্যযুগীয় মুসলিম বিশ্বের প্রথম সার্বভৌম নারী শাসক। তিনি দাস বংশের মহান সুলতান শামসুদ্দিন ইলতুতমিশের সুযোগ্য কন্যা। তাঁর পুত্রদের অযোগ্যতা বিবেচনা করে ইলতুতমিশ মৃত্যুর পূর্বেই রাজিয়াকে সিংহাসনের যোগ্য উত্তরাধিকারী মনোনীত করে গিয়েছিলেন।

সুলতান রাজিয়ার সিংহাসন আরোহণ ও চ্যালেঞ্জ

ইলতুতমিশের মৃত্যুর পর তুর্কি আমির ও অভিজাতরা (চল্লিশচক্র বা বন্দেগান-ই-চিহালগানী) নারী শাসনকে মেনে নিতে না পেরে রাজিয়ার ভাই রুকনউদ্দীন ফিরোজকে সিংহাসনে বসায়। ফিরোজের অযোগ্যতা ও তাঁর মাতা শাহ তুরকানের অত্যাচারে বিদ্রোহ দেখা দিলে রাজিয়া লাল পোশাক পরে সাধারণ জুমার নামাজের পর দিল্লিবাসীর আদালতে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেন। জনগণের বিপুল সমর্থনে তিনি ১২৩৬ খ্রিষ্টাব্দে দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং ‘সুলতান’ উপাধি গ্রহণ করেন (তিনি নিজেকে কখনোই ‘সুলতানা’ বলেননি, কারণ ‘সুলতানা’ অর্থ সুলতানের স্ত্রী, আর ‘সুলতান’ হলো সার্বভৌম শাসক)।

তাঁর কৃতিত্বসমূহ

  • ১. রাজকীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও বিদ্রোহী দমন: লাহোর, বাদাউন ও মুলতানের বিদ্রোহী গভর্নরদের তিনি অসাধারণ কূটনৈতিক চালে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন করে পরাস্ত করেন। রণথম্বোর দুর্গ উদ্ধার করেন।
  • ২. নারী সুলভ পর্দা বর্জন ও প্রশাসনিক নেতৃত্ব: তিনি পুরুষের পোশাক (কুবা ও কুলাহ) পরিধান করে প্রকাশ্যে দরবার পরিচালনা করতেন, বিচারকার্য করতেন এবং উন্মুক্ত হস্তিপৃষ্ঠে চড়ে যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাদলের নেতৃত্ব দিতেন।
  • ৩. অ-তুর্কিদের অন্তর্ভুক্তি ও উদার নীতি: তুর্কি আমিরদের একচেটিয়া আধিপত্য খর্ব করতে তিনি আবিসিনীয় দাস জামালউদ্দীন ইয়াকুতকে অশ্ববাহিনীর প্রধান (আমির-ই-আখুর) নিয়োগ করেন এবং ভারতীয় মুসলিমদের প্রশাসনে জায়গা দেন।
  • ৪. শিক্ষা ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা: রাজিয়া নিজে ছিলেন বিদূষী ও কুরআনে হাফেজা। তিনি বহু স্কুল, মাদ্রাসা ও পাঠাগার নির্মাণ করেন এবং আলেম ও কবিদের ভাতা প্রদান করতেন।

চরিত্র পর্যালোচনা ও পতনের কারণ

সমসাময়িক ইতিহাসবিদ মিনহাজ-ই-সিরাজ তাঁর ‘তাবাকাত-ই-নাসিরী’ গ্রন্থে লিখেছেন: “সুলতান রাজিয়া ছিলেন একজন মহান শাসক, বিজ্ঞ, সুবিচারক, প্রজাবৎসল, আলেমদের পৃষ্ঠপোষক এবং সকল রাজকীয় গুণে ভূষিত। কিন্তু তাঁর একমাত্র ত্রুটি ছিল যে তিনি ছিলেন একজন নারী।”

তুর্কি চল্লিশচক্রের অভিজাতরা একজন নারীর অধীনতা এবং দাস ইয়াকুতের পদোন্নতি মেনে নিতে পারেনি। ভাটিণ্ডার গভর্নর আলতুনিয়া বিদ্রোহ করলে রাজিয়া যুদ্ধে গিয়ে বন্দি হন। পরবর্তীতে তিনি রাজনৈতিক চালে আলতুনিয়াকে বিবাহ করে দিল্লির দিকে অগ্রসর হন, কিন্তু ভাই বাহরাম শাহের বাহিনীর কাছে পরাজিত হন এবং ১২৪০ খ্রিষ্টাব্দে একদল দস্যুর হাতে কায়থালে শহীদ হন।

উপসংহার

সুলতান রাজিয়া ছিলেন তাঁর যুগের চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকা এক অকুতোভয় নারী রাষ্ট্রনায়ক। তাঁর যোগ্যতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ছিল না; মধ্যযুগীয় সামন্ততান্ত্রিক পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও তুর্কি আমিরদের ষড়যন্ত্রই তাঁর অকাল পতনের কারণ হয়েছিল।


৪। দিল্লির সালতানাতের সুসংহতকরণে সুলতান গিয়াসউদ্দীন বলবনের কৃতিত্ব মূল্যায়ন কর।

[Evaluate the achievements of Sultan Giasuddin Balban to the consideration of the Delhi sultanate.]

ভূমিকা

ইলতুতমিশের মৃত্যুর পর প্রায় ত্রিশ বছর ধরে দিল্লির সালতানাত তুর্কি আমিরদের প্রাসাদ ষড়যন্ত্র, মেওয়াতি দস্যুদের নৈরাজ্য এবং রক্তক্ষয়ী বিশৃঙ্খলায় ধ্বংসের মুখে পতিত হয়েছিল। এই সংকটময় মুহূর্তে ১২৬৬ খ্রিষ্টাব্দে সিংহাসনে বসেন গিয়াসউদ্দীন বলবন (শাসনকাল: ১২৬৬—১২৮৭ খ্রি.)। তিনি তাঁর সুবিখ্যাত ‘রক্ত ও লৌহ নীতি’ (Blood and Iron Policy) প্রয়োগ করে সালতানাতকে নিশ্চিত পতনের হাত থেকে রক্ষা ও সুসংহত করেন।

বলবনের কৃতিত্ব ও সুসংহতকরণ পদক্ষেপসমূহ

  • ১. রাজকীয় কর্তৃত্ব ও খোদায়ী তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা (The Theory of Kingship): সুলতানের হারানো মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে বলবন প্রচার করেন যে সুলতান হলেন পৃথিবীতে ‘নিয়াবত-ই-খোদা’ (আল্লাহর প্রতিনিধি) এবং ‘জিল্লুল্লাহ’ (আল্লাহর ছায়া)। তিনি পারস্যের দরবারি শিষ্টাচার প্রবর্তন করেন এবং দরবারে ‘সিজদা’ (সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত) ও ‘পাইবস’ (সুলতানের পদচুম্বন) বাধ্যতামূলক করেন। তিনি দরবারে হাসি-তামাশা ও মদ্যপান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেন।
  • ২. চল্লিশচক্র বা চিহালগানীর ক্ষমতার বিলোপ: ইলতুতমিশের দাসদের তৈরি শক্তিশালী ‘চল্লিশচক্র’ খলিফা ও সুলতানদের পুতুলে পরিণত করেছিল। বলবন অত্যন্ত নির্মমভাবে এই আমিরদের ক্ষমতা চূর্ণ করেন। বাদাউনের মালিক বাকবক এবং অযোধ্যার হায়বাত খানকে সামান্য অপরাধে প্রকাশ্যে চাবুক মেরে মৃত্যুদণ্ড দেন। এর ফলে অভিজাতরা সুলতানের আনুগত্যে বাধ্য হয়।
  • ৩. আইন-শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও মেওয়াতি দমন: দিল্লির উপকণ্ঠে মেওয়াতি দস্যুরা দিনের বেলায়ও নগরবাসীকে আক্রমণ করত। বলবন দিল্লির চারপাশের জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করেন, সেনা ফাঁড়ি বসান এবং কয়েক হাজার মেওয়াতিকে হত্যা করে নগরীতে শতভাগ শান্তি ফিরিয়ে আনেন। দোয়াব ও অযোধ্যার রাজপুত বিদ্রোহীদের নির্মমভাবে দমন করা হয়।
  • ৪. দক্ষ গুপ্তচর ব্যবস্থা (বারিদ): সাম্রাজ্যের প্রতিটি প্রান্তে গোপন তথ্য সংগ্রহের জন্য বিশ্বস্ত গুপ্তচর (বারিদ) নিয়োগ করা হয়। কোনো গভর্নর অন্যায় আচরণ করলে বারিদদের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক খবর সুলতানের কাছে পৌঁছে যেত। এমনকি তথ্য গোপনকারী গুপ্তচরকেও ফাঁসি দেওয়া হতো।
  • ৫. মোঙ্গল আক্রমণ প্রতিরোধ: চেঙ্গিস খানের বংশধর মোঙ্গলদের অব্যাহত আক্রমণ থেকে সালতানাতকে রক্ষা করতে তিনি সীমান্ত দুর্গগুলো মেরামত করেন এবং তাঁর যোগ্য পুত্র শাহজাদা মুহাম্মদ ও বুগরা খানকে প্রতিরক্ষার দায়িত্ব দেন। ১২৮৫ খ্রিষ্টাব্দে এক ভয়াবহ যুদ্ধে শাহজাদা মুহাম্মদ শাহাদাতবরণ করেন, যার শোকে বলবন মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।
  • ৬. তুঘরিল খানের বিদ্রোহ দমন: বাংলার বিদ্রোহী গভর্নর তুঘরিল খানকে দমন করতে বলবন স্বয়ং বাংলায় অভিযান পরিচালনা করেন এবং লখনৌতির প্রকাশ্য বাজারে বিদ্রোহীদের ফাঁসি দেন।

উপসংহার

গিয়াসউদ্দীন বলবন নতুন কোনো রাজ্য জয় করেননি, কিন্তু তিনি সালতানাতের অভ্যন্তরীণ কাঠামোকে এমন এক মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছিলেন, যার ওপর ভর করেই পরবর্তীকালে আলাউদ্দিন খলজি বিশাল সাম্রাজ্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিলেন।


৫। সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলকের জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের একটি বিবরণ দাও।

[Give an account of the public welfare activities of Sultan Firuz Shah Tughluq.]

ভূমিকা

তুঘলক বংশের সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক (শাসনকাল: ১৩৫১—১৩৮৮ খ্রি.) সামরিক অভিযানের চেয়ে প্রজাকল্যাণ ও সংস্কারমূলক কাজের জন্য ইতিহাসে সর্বাধিক স্মরণীয় হয়ে আছেন। ঐতিহাসিক ভি. এ. স্মিথ তাঁকে মধ্যযুগের আকবরের পূর্বসূরি এবং এলফিনস্টোন তাঁকে সালতানাত আমলের এক মানবতাবাদী কল্যাণকামী সুলতান হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

ফিরোজ শাহ তুঘলকের জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডসমূহ

  • ১. কর সংস্কার ও ঋণ মওকুফ: তিনি ক্ষমতা গ্রহণ করেই মুহাম্মদ বিন তুঘলকের আরোপিত ২৩ প্রকারের কষ্টদায়ক ও অনৈসলামিক উপকর (আবওয়াব) সম্পূর্ণ বাতিল করেন। কেবল শরিয়তসম্মত ৪টি কর বহাল রাখা হয়: খারাজ, খামস, জাকাত ও জিজিয়া। কৃষকদের কৃষিঋণ (সোন্ধার) সম্পূর্ণ মওকুফ করা হয়।
  • ২. সেচ ব্যবস্থা ও খাল খনন: কৃষি উৎপাদনের বিপ্লব ঘটাতে তিনি যমুনা, শতদ্রু ও ঘগ্গর নদী থেকে পাঁচটি বিশাল সেচ খাল খনন করেন। খালগুলোর পানি ব্যবহারের জন্য নামমাত্র সেচ কর (হক-ই-শিরব) নেওয়া হতো। এর ফলে হাজার হাজার একর পতিত জমি আবাদি জমিতে রূপ নেয় এবং দুর্ভিক্ষ দূর হয়। তিনি দিল্লির আশেপাশে ১,২০০ ফলের বাগান গড়ে তোলেন।
  • ৩. নতুন নগরী ও জনপদ প্রতিষ্ঠা: তিনি বহু পরিকল্পিত নতুন শহর স্থাপন করেন, যার মধ্যে ফিরোজাবাদ (দিল্লির নতুন অংশ), জৌনপুর (ভাই জুনা খানের স্মরণে), ফতেহাবাদ, হিসার ও ফিরোজপুর আজও বিদ্যমান।
  • ৪. চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা (দারুশ শিফা): দরিদ্র প্রজাদের বিনামূল্যে চিকিৎসার জন্য তিনি দিল্লিতে ‘দারুশ শিফা’ বা দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপন করেন, যেখানে অভিজ্ঞ হাকিম ও ওষুধপত্র বিনামূল্যে সরবরাহ করা হতো।
  • ৫. কর্মসংস্থান দপ্তর (Employment Bureau): তিনিই প্রথম বেকার সমস্যা সমাধানের জন্য একটি আধুনিক কর্মসংস্থান দপ্তর বা এমপ্লয়মেন্ট ব্যুরো খোলেন, যেখানে বেকার যুবকদের যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি দেওয়া হতো।
  • ৬. দেওয়ান-ই-খয়রাত (দান বিভাগ): এতিম, বিধবা ও দরিদ্র মুসলিম কন্যাদের বিবাহে আর্থিক সাহায্য প্রদানের জন্য তিনি ‘দেওয়ান-ই-খয়রাত’ তহবিল চালু করেন।
  • ৭. প্রাচীন স্থাপত্যের সংরক্ষণ ও মেরামত: কুতুব মিনার বজ্রপাতে ক্ষতিগ্রস্ত হলে তিনি তা মেরামত করে অতিরিক্ত দুটি তলা নির্মাণ করেন। এছাড়া আলাউদ্দিনের হৌজ-ই-খালাই ও শামসী হ্রদ সংস্কার করেন।
  • ৮. দাসদের পুনর্বাসন (দেওয়ান-ই-বান্দেগান): তিনি দাসদের শিক্ষার ব্যবস্থা করেন এবং বিভিন্ন কারিগরি ও প্রশাসনিক কাজে নিযুক্ত করেন।

উপসংহার

ফিরোজ শাহ তুঘলক সামরিক দিক থেকে কিছুটা দুর্বল হলেও জনকল্যাণ, কৃষি উন্নয়ন, স্থাপত্য সংরক্ষণ ও মানবিক প্রশাসনে তিনি মধ্যযুগীয় ভারতীয় ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।


৬। ভারতে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বাবুরের কৃতিত্ব মূল্যায়ন কর।

[Evaluate the achievements of Babur as the founder of the Mughal Empire in India.]

ভূমিকা

১৫২৬ খ্রিষ্টাব্দে পানিপথের প্রথম যুদ্ধে ইব্রাহিম লোদীকে পরাজিত করে ভারতে প্রায় তিনশত বছরের মুঘল সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন করেন জহিরুদ্দীন মুহাম্মদ বাবর। মধ্য এশিয়ার ফারগানার এক ভাগ্যহীন উদ্বাস্তু যুবরাজের হিন্দুস্তানের সম্রাট হয়ে ওঠার কাহিনী বিশ্ব ইতিহাসের এক রোমাঞ্চকর মহাকাব্য।

মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বাবুরের ঐতিহাসিক কৃতিত্ব

  • ১. পানিপথের প্রথম যুদ্ধ (২১ এপ্রিল, ১৫২৬ খ্রি.): বাবর মাত্র ১২,০০০ দুর্ধর্ষ সৈন্য নিয়ে ইব্রাহিম লোদীর ১ লাখ বিশাল বাহিনীকে পর্যুদস্ত করেন। তাঁর এই অভাবনীয় বিজয়ের চাবিকাঠি ছিল:
    • রুমী রণকৌশল বা তুলঘুমা পদ্ধতি: গাড়িবহর দিয়ে সুরক্ষিত ব্যূহ তৈরি করে শত্রুকে তিন দিক থেকে ঘিরে আক্রমণ করা।
    • ভারতে প্রথম কামানের ব্যবহার: ওস্তাদ আলী ও মোস্তফার পরিচালনায় ভারতীয় ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলন্দাজ বাহিনী ব্যবহার করা হয়।
  • ২. খানুয়ার যুদ্ধ ও রাজপুত শক্তি চূর্ণ (১৫২৭ খ্রি.): পানিপথে লোদী বাহিনীকে হারানো সহজ হলেও মেওয়ারের অপরাজেয় বীর রানা সাঙ্গার নেতৃত্বে রাজপুতদের মোকাবিলা ছিল বাবুরের জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বাবর মদ্যপান বর্জনের শপথ নেন এবং এই যুদ্ধকে ‘জিহাদ’ ঘোষণা করেন। খানুয়ার প্রান্তরে রাজপুতদের সম্মিলিত শক্তিকে গুঁড়িয়ে দিয়ে বাবর ‘গাজী’ উপাধি গ্রহণ করেন এবং উত্তর ভারতে তাঁর সাম্রাজ্য নিরাপদ করেন।
  • ৩. চান্দেরি ও ঘাগরার যুদ্ধ (১৫২৮ ও ১৫২৯ খ্রি.): মেদিনী রাওকে চান্দেরির যুদ্ধে এবং বিহারের আফগানদের ঘাগরার যুদ্ধে পরাজিত করে বাবর সিন্ধু থেকে বিহার এবং হিমালয় থেকে গোয়ালিয়র পর্যন্ত এক সুবিশাল সাম্রাজ্যের পত্তন করেন।
  • ৪. সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অবদান: বাবর কেবল যোদ্ধা ছিলেন না, তিনি ছিলেন তুর্কি ভাষার শ্রেষ্ঠ কবিদের একজন। তাঁর আত্মজীবনী ‘তুজুক-ই-বাবুরী’ (বাবুরনামা) বিশ্বসাহিত্যের এক ক্লাসিক গ্রন্থ। ভারতে তিনি চারবাগ (চারকোণা পরিকল্পিত বাগান) পদ্ধতির প্রবর্তন করেন।

উপসংহার

ঐতিহাসিক লেনপুলের মতে, বাবর ছিলেন এমন এক চরিত্র যিনি তরবারির কঠোরতার সাথে কবি হৃদয়ের সৌন্দর্যের সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন। মাত্র চার বছরের শাসনামলে তিনি রাজ্য সুসংহত করার বেশি সময় পাননি, কিন্তু তিনি যে সাম্রাজ্যের বীজ বপন করেছিলেন, তাঁর পৌত্র আকবর তাকে বিশাল মহীরুহে পরিণত করেছিলেন।


খ বিভাগ (সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন)

৭। টীকা লেখ (যে কোনো দুটি):

(ক) তরাইনের যুদ্ধ [The Battle of Tarain]

১১৯১ ও ১১৯২ খ্রিষ্টাব্দে দিল্লির নিকটবর্তী থানেশ্বরের কাছে তরাইন প্রান্তরে মুইজুদ্দীন মুহাম্মদ ঘুরী এবং দিল্লির চৌহান বংশের রাজা পৃথ্বীরাজ চৌহানের মধ্যে দুটি ঐতিহাসিক যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ১১৯১ সালে তরাইনের ১ম যুদ্ধে ঘুরী মারাত্মক আহত হয়ে পরাজিত হন। কিন্তু ঠিক এক বছর পর ১১৯২ সালে দ্বিতীয় তরাইনের যুদ্ধে মুহাম্মদ ঘুরী ১ লাখ ২০ হাজার সৈন্য নিয়ে সুকৌশলে রাজপুত বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাস্ত করেন। পৃথ্বীরাজ বন্দি ও নিহত হন। তরাইনের ২য় যুদ্ধ ভারতীয় ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং এর মাধ্যমেই ভারতে স্থায়ী মুসলিম শাসনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়।

(খ) দাস বংশ [Slave Dynasty]

১২০৬ থেকে ১২৯০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত দিল্লি সালতানাত শাসনকারী প্রথম রাজবংশকে ‘দাস বংশ’ বা ‘মামলুক বংশ’ বলা হয়। এই বংশের উল্লেখযোগ্য শাসকগণ—কুতুবউদ্দীন আইবেক, শামসুদ্দিন ইলتুতমিশ এবং গিয়াসউদ্দীন বলবন—তাঁদের জীবনের প্রারম্ভে দাস বা ক্রীতদাস ছিলেন। নিজ প্রতিভা, বিশ্বস্ততা ও সামরিক যোগ্যতার বলে তাঁরা সর্বোচ্চ সিংহাসনে আরোহণ করেন। এই বংশের শাসনামলেই দিল্লির কুতুব মিনার নির্মিত হয় এবং মোঙ্গলদের হাত থেকে ভারতীয় ভূখণ্ড সুরক্ষিত থাকে।

(গ) ইবনে বতুতা [Ibn-e-Battuta]

আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে বতুতা (১৩০৪—১৩৬৯ খ্রি.) ছিলেন মরক্কোর তাঞ্জিয়ারে জন্মগ্রহণকারী বিশ্বখ্যাত পর্যটক। তিনি দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে প্রায় ৭৫,০০০ মাইল ভ্রমণ করেন। ১৩৩৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ভারতে আসেন এবং সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের দরবারে প্রায় আট বছর প্রধান বিচারপতির (কাজী) দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে সুলতানের দূত হয়ে চীন সফরে যান। তাঁর অমর ভ্রমণকাহিনী ‘তুহফাতুন নুজ্জার ফি গারায়িবিল আমসার ওয়া আজায়িবিল আসফার’ (সংক্ষেপে কিতাবুর রেহলা) মধ্যযুগীয় ভারতের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল।

(ঘ) বাহমানি রাষ্ট্র [Bahmani State]

সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের শাসনামলে দক্ষিণ ভারতে যে কয়টি স্বাধীন রাজ্যের জন্ম হয়, তার মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল ১৩৪৭ খ্রিষ্টাব্দে হাসান গাঙ্গু (আলাউদ্দিন হাসান বাহমান শাহ) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ‘বাহমানি সালতানাত’। তিনি গুলবার্গায় তাঁর রাজধানী স্থাপন করেন। পরবর্তীকালে এই সালতানাত বিদ্যা ও সংস্কৃতির কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হয়, বিশেষ করে উজির মাহমুদ গাওয়ানের আমলে। প্রায় দেড় শতাব্দী পর বাহমানি রাজ্য ভেঙে পাঁচটি স্বাধীন সালতানাতে রূপ নেয়: বিজাপুর, গোলকুন্ডা, আহমেদনগর, বেরার ও বিদার।


সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. ‘ভারতে মুসলমানদের ইতিহাস (৭১২—১৫২৬)’ পেপারে কোন কোন সালতানাত বংশ অন্তর্ভুক্ত?

এ কোর্সে আরবদের সিন্ধু বিজয়, সুলতান মাহমুদ গজনভী ও মুহাম্মদ ঘুরীর ভারত অভিযান, দিল্লি সালতানাতের পাঁচটি প্রধান বংশ (দাস বংশ, খলজি বংশ, তুঘলক বংশ, সৈয়দ বংশ ও লোদী বংশ) এবং ১৫২৬ সালে পানিপথের ১ম যুদ্ধের মাধ্যমে বাবুরের মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পূর্ব পর্যন্ত বিস্তারিত পড়ানো হয়।

২. সুলতান আলাউদ্দিন খলজির মূল্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কেন বিখ্যাত?

সুলতান আলাউদ্দিন খলজি বিশাল স্থায়ী সেনাবাহিনী কম খরচে পরিচালনা করার জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করেন, রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেন এবং শাহনা-ই-মন্ডি ও দিওয়ান-ই-রিয়াসতের মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট ও কালোবাজারি কঠোরভাবে দমন করেন।

৩. মুহাম্মদ বিন তুঘলককে ‘স্ববিরোধী চরিত্রের সংমিশ্রণ’ বলা হয় কেন?

তিনি প্রখর মেধা, বিজ্ঞান ও দর্শনের অনুরাগী হয়েও রাজধানী স্থানান্তর (দিল্লি থেকে দেবগিরি), তাম্রমুদ্রা প্রবর্তন এবং খোরাসান অভিযানের মতো উচ্চাভিলাষী কিন্তু অবাস্তব পরিকল্পনা গ্রহণ করে চরম বিপর্যয় ডেকে এনেছিলেন।

৪. সুলতান গিয়াসউদ্দীন বলবনের ‘রক্ত ও লৌহ নীতি’ কী?

সুলতানের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে তিনি বিদ্রোহী তুর্কি চল্লিশচক্রের আমিরদের হত্যা করেন, মেওয়াতি দস্যুদের সমূলে উৎপাটন করেন এবং পারস্যের কঠোর রাজকীয় শিষ্টাচার (সিজদা ও পাইবস) প্রবর্তন করেন।

৫. দিল্লি সালতানাতের পতনের প্রধান কারণগুলো কী ছিল?

তুঘলক ও লোদী বংশের দুর্বল নেতৃত্ব, তৈমুর লঙের দিল্লি আক্রমণ (১৩৯৮ খ্রি.), আমিরদের প্রাসাদ ষড়যন্ত্র, কোনো নির্দিষ্ট উত্তরাধিকার নীতি না থাকা এবং সর্বশেষে পানিপথের যুদ্ধে বাবর কর্তৃক কামানের আধুনিক প্রয়োগই পতনের মূল কারণ ছিল।

৬. ২০৫১০৩ বিষয়ের ঐতিহাসিক উত্তরগুলোতে ভালো নম্বর তোলার কৌশল কী?

মধ্যযুগীয় ফারসি ইতিহাসগ্রন্থের নাম (যেমন: তারিখ-ই-ফিরোজশাহী, তাবাকাত-ই-নাসিরী, রেহলা) উদ্ধৃত করা, সমসাময়িক সুলতানদের প্রশাসনিক পরিভাষা সঠিকভাবে উপস্থাপন করা এবং পয়েন্টভিত্তিক আলোচনা করা অপরিহার্য।