ইসলামী দর্শন ও তাসাউফ ১ম পত্র (Islamic Philosophy and Tasawwuf 1st Paper) – 422, ইসলামী দর্শন ও তাসাউফ – ফাযিল পাস ৩য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২১

StudyBoi StudyBoi
September 26, 2026
৬২ মিনিট পড়ার সময়
১ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন

ফাযিল (স্নাতক) পাস ৩য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২১
বিষয়: ইসলামী দর্শন ও তাসাউফ (ঐচ্ছিক) প্রথম পত্র (বিষয় কোড: ৪২২)
(দর্শনের সমস্যাবলী)
সময়: ৩ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ১০০
[দ্রষ্টব্য : সকল প্রশ্নের মান সমান। যে-কোনো পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দাও।]

ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ফাযিল (স্নাতক) পাস ৩য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২১-এর ইসলামী দর্শন ও তাসাউফ ১ম পত্র (বিষয় কোড: ৪২২) পরীক্ষার মূল প্রশ্নপত্রের প্রতিটি প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ, প্রামাণ্য ও অ্যাকাডেমিক সমাধান নিচে দেওয়া হলো। ফাযিল ডিগ্রি ও অনার্স শ্রেণির ২০ নম্বরের রচনামূলক প্রশ্নের উচ্চমান বজায় রেখে ভূমিকা, দার্শনিক সংজ্ঞা ও পরিভাষা, কুরআন-সুন্নাহ ও প্রাজ্ঞ চিন্তাবিদদের দলিল, বিশ্লেষণী ছক এবং সমকালীন মূল্যায়ন সহযোগে প্রতিটি উত্তর প্রস্তুত করা হয়েছে।

১। ইসলামী দর্শনের সংজ্ঞা দাও। দর্শনের সাথে ধর্মের সম্পর্ক কী? বিশদভাবে আলোচনা কর।

[Define Islamic Philosophy. What is the relation of religion with philosophy? Discuss elaborately.]

[মান: ২০]

ভূমিকা:
মানব চিন্তার ইতিহাসে জ্ঞান অন্বেষণ ও সত্যোপলব্ধির দুটি সুপ্রাচীন ও প্রভাবশালী ধারা হলো দর্শন (Philosophy) ও ধর্ম (Religion)। উভয়েরই মূল লক্ষ্য পরম সত্য, বিশ্বজগতের সৃষ্টিরহস্য এবং মানব জীবনের উদ্দেশ্য অনুসন্ধান করা। তবে এই সত্যে পৌঁছানোর পদ্ধতি, উৎস এবং দৃষ্টিভঙ্গিতে উভয়ের মধ্যে যেমন গভীর ঐক্য রয়েছে, তেমনি বিদ্যমান কিছু মৌলিক পার্থক্য। ধর্ম ও দর্শনের পারস্পরিক সম্পর্ক উপলব্ধি করা ইসলামী দর্শনের শিক্ষার্থীদের জন্য ভিত্তিপ্রস্তরস্বরূপ।

১. দর্শন ও ধর্মের স্বরূপ ও পদ্ধতিগত রূপরেখা:
– দর্শনের ভিত্তি: দর্শন মানবীয় বুদ্ধি, বিচার-বিশ্লেষণ, সংশয় ও যুক্তির ওপর নির্ভরশীল। দর্শনে কোনো কিছু অন্ধভাবে মানা হয় না; প্রতিটি বিষয়কে বুদ্ধি দিয়ে পরীক্ষা করা হয়।
– ধর্মের ভিত্তি: ধর্ম প্রত্যাদেশ বা ওহী (Divine Revelation), বিশ্বাস (Iman) এবং ঐশী নির্দেশ পালনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ধর্মের সূচনা ভক্তি ও আনুগত্য দিয়ে।

২. দর্শন ও ধর্মের মধ্যকার তুলনামূলক সম্পর্ক (সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য):

তুলনার ক্ষেত্র দর্শন (Philosophy) ধর্ম (Religion)
১. জ্ঞানের উৎস সীমিত মানবীয় বুদ্ধি ও ইন্দ্রিয়ানুভূতি। আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত ওহী ও নবীগণের শিক্ষা।
২. মূল চালিকাশক্তি যুক্তিতর্ক, প্রশ্ন উত্থাপন ও বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধান। ঈমান, আত্মসমর্পণ ও আত্মিক বিশ্বাস।
৩. কার্যপ্রণালী ও গ্রহণযোগ্যতা চিন্তাবিদদের পরিবর্তনশীল তত্ত্ব; সর্বজনীন নিশ্চয়তা নেই। অনন্ত ও অভ্রান্ত সত্য বিধান; সার্বজনীন পথপ্রদর্শক।
৪. প্রভাবের পরিধি কেবল সমাজের উচ্চশিক্ষিত বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। শিশু-বৃদ্ধ, ধনী-দরিদ্র সর্বস্তরের গণমানুষের সার্বিক জীবনবিধান।
৫. সাধারণ লক্ষ্য পরম সত্যের স্বরূপ জানা এবং অজ্ঞতা দূর করা। পরম সত্যকে জেনে তদনুযায়ী জীবন গড়ে চিরমুক্তি লাভ।

৩. ইসলামী দর্শনে ধর্ম ও দর্শনের অপূর্ব সমন্বয় (ইবনে রুশদের দৃষ্টিভঙ্গি):
মুসলিম দার্শনিকদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ দার্শনিক ইবনে রুশদ (Averroes) তাঁর যুগান্তকারী গ্রন্থ ফাসলুল মাকাল (فصل المقال فيما بين الحكمة والشريعة من الاتصال)-এ প্রমাণ করেছেন যে, প্রকৃত ধর্ম এবং প্রকৃত দর্শনের মাঝে কোনো বিরোধ নেই। কারণ সত্য কখনোই অন্য সত্যের সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে না। কুরআন নিজেই মানুষকে দর্শন চর্চা ও যুক্তি ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছে:
فَاعْتَبِرُوا يَا أُولِي الْأَبْصَارِ
“অতএব হে চক্ষুষ্মান ব্যক্তিবর্গ! তোমরা শিক্ষা গ্রহণ ও চিন্তা কর।” (সূরা আল-হাশর: ২)।

উপসংহার:
দর্শন যদি চোখ হয়, তবে ধর্ম হলো সূর্যালোক। আলো ছাড়া চোখ যেমন অন্ধ, তেমনি ওহীর সত্য ছাড়া একক যুক্তিও বিভ্রান্তির অন্ধকারে পথ হারায়। অতএব ওহীর নির্দেশনায় যুক্তি প্রয়োগই হলো ধর্ম ও দর্শনের পরম মেলবন্ধন।

২। ভারতীয় দর্শনের উৎপত্তি এবং ক্রমবিকাশের ইতিহাস বর্ণনা কর।

[Describe the history of the origin and development of Indian philosophy.]

[মান: ২০]

ভূমিকা:
ভারতীয় দর্শন (Indian Philosophy) বিশ্বের প্রাচীনতম ও সমৃদ্ধ দার্শনিক ঐতিহ্যের অন্যতম। সিন্ধু সভ্যতা ও বৈদিক যুগ থেকে শুরু করে ভারতীয় উপমহাদেশে জীবন, জগৎ, আত্মা, মোক্ষ বা মুক্তি এবং কর্মফল সম্পর্কে যে গভীর দার্শনিক चिंतन গড়ে উঠেছে, তা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। ভারতীয় দর্শনের মূল সুর নিছক তাত্ত্বিক বিচার নয়; বরং দুঃখ থেকে চিরতরে নিষ্কৃতি লাভ এবং আত্মার চরম পরমার্থ বা মোক্ষ অর্জনই এর পরম লক্ষ্য।

১. ভারতীয় দর্শনের উৎপত্তি ও শ্রেণিবিন্যাস:
ভারতীয় দর্শনকে বেদের প্রামাণ্যতার ওপর ভিত্তি করে প্রধানত দুটি ধারায় বিভক্ত করা হয়:
১. আস্তিক সম্প্রদায় (বেদ অনুসারী): এরা বেদকে অপৌরুষেয় ও অভ্রান্ত সত্য বলে স্বীকার করে। এই ধারায় ষড়দর্শন (ছয়টি প্রধান দর্শন) অন্তর্ভুক্ত।
২. নাস্তিক সম্প্রদায় (বেদ বিরোধী): এরা বেদের প্রামাণ্যতা অস্বীকার করে এবং স্বাধীন চিন্তার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। যথা: চার্বাক, জৈন ও বৌদ্ধ দর্শন।

২. ভারতীয় দর্শনের প্রধান সম্প্রদায়সমূহের বিশদ রূপরেখা:

দর্শনের নাম ও ধারা প্রবর্তক / মূল আচার্য মূল দার্শনিক প্রত্যয় ও ভাববস্তু
১. চার্বাক দর্শন (নাস্তিক/জড়বাদী) মহর্ষি বৃহস্পতি / চার্বাক প্রত্যক্ষই একমাত্র প্রমাণ। আত্মা ও পরকাল মিথ্যা; ইহজাগতিক সুখভোগই জীবনের পরম লক্ষ্য (“ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ”)।
২. বৌদ্ধ দর্শন (নাস্তিক/অনাত্মবাদী) গৌতম বুদ্ধ চারটি আর্য সত্য (দুঃখ, দুঃখের কারণ, দুঃখ নিরোধ ও অষ্টাঙ্গিক মার্গ) এবং প্রতীত্যসমুৎপাদ ও অনিত্যতাবাদ।
৩. জৈন দর্শন (নাস্তিক/আত্মবাদী) মহাবীর ও পার্শ্বনাথ অহিংসা পরম ধর্ম, অনেকান্তবাদ (স্যাদবাদ), জীব ও অজীবের দ্বৈত সত্তা এবং ত্রিরত্ন।
৪. সাংখ্য দর্শন (আস্তিক) মহর্ষি কপিল পুরুষ (চেতনা) ও প্রকৃতি (জড়)—এই দ্বৈত সত্তা দ্বারা বিশ্বজগতের সৃষ্টি ব্যাখ্যা। বেদভিত্তিক নিরীশ্বরবাদী রূপ।
৫. যোগ দর্শন (আস্তিক) মহর্ষি পতঞ্জলি অষ্টাঙ্গ যোগ (যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান, সমাধি) দ্বারা চিত্তবৃত্তি নিরোধ ও ঈশ্বর সাধনা।
৬. ন্যায় দর্শন (আস্তিক) মহর্ষি গৌতম যুক্তিবিদ্যা ও জ্ঞানতত্ত্ব। চারটি প্রমাণ স্বীকার করে: প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপমান ও শব্দ।
৭. বৈশেষিক দর্শন (আস্তিক) মহর্ষি কণাদ পরমাণুবাদ (Atomism)। সমগ্র জগৎ সাতটি পদার্থে বিভক্ত এবং পরমাণুর সংযোগ-বিয়োগে সৃষ্টি নিয়ন্ত্রিত।
৮. মীমাংসা ও বেদান্ত দর্শন (আস্তিক) জৈমিনি ও বাদরায়ণ (শঙ্করাচার্য) অদ্বৈত বেদান্ত (ব্রহ্ম সত্য জগৎ মিথ্যা) এবং বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ (রামানুজ)। উপনিষদের চরম পরাকাষ্ঠা।

৩. ভারতীয় দর্শনের সাধারণ বৈশিষ্ট্যসমূহ:
– দুঃখবোধ ও মোক্ষচেতনা: সকল ভারতীয় দর্শনের সূচনা জাগতিক দুঃখের উপলব্ধি থেকে এবং পরিণতি মোক্ষ বা দুঃখমুক্তি কামনায়।
– কর্মবাদ ও জন্মান্তরবাদ: চার্বাক ব্যতীত সকল সম্প্রদায় মানুষের কর্মের প্রতিফল এবং আত্মার পুনর্জন্মে বিশ্বাসী।
– আধ্যাত্মিক অন্তর্দৃষ্টি: ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য রূপের অন্তরালে অন্তর্নিহিত চিরন্তন সত্যের সন্ধান।

উপসংহার:
ভারতীয় দর্শন মানব ইতিহাসের এক সুবিশাল বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ। যদিও এর বহু ধ্যানধারণা পৌত্তলিকতা ও জন্মান্তরবাদের কারণে ইসলামী তাওহীদি দর্শনের সাথে সাংঘর্ষিক, তবুও যুক্তিবিদ্যা, জ্ঞানতত্ত্ব ও সংযমসাধনার ক্ষেত্রে ভারতীয় দর্শন বিশ্ব দর্শনের ইতিহাসে চিরভাস্বর হয়ে আছে।

৩। তাসাউফ-এর সংজ্ঞা দাও। এর বিষয়বস্তু ও লক্ষ্য আলোচনা কর।

[Define ‘Tasauf’. Discuss its subject and aim.]

[মান: ২০]

ভূমিকা:
ইসলামী শরিয়তের অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য ও আধ্যাত্মিক পূর্ণতার নাম ইলমুত তাসাউফ (علم التصوف)। ইসলাম কেবল বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানের ধর্ম নয়; বরং প্রতিটি আমলের সাথে অন্তরের নিষ্ঠা ও খুশু-খুজুর অবিচ্ছেদ্য সংযোগ রয়েছে। ফিকহ শাস্ত্র যেখানে মানুষের বাহ্যিক কর্মের বৈধতা ও অবৈধতা নির্ধারণ করে, তাসাউফ সেখানে অন্তরের পরিশুদ্ধি ও খোদাভীতির মানদণ্ড নিশ্চিত করে।

১. তাসাউফের সংজ্ঞা ও নামকরণের পটভূমি:
– শাব্দিক সংজ্ঞা: তাসাউফ শব্দটি ‘সূফ’ (পশমি কাপড় পরিধান করা) অথবা ‘সাফা’ (অন্তরকে নির্মল ও কলুষমুক্ত রাখা) কিংবা মসজিদে নববীর ‘আসহাবে সুফফা’ থেকে গঠিত।
– পারিভাষিক সংজ্ঞা: হযরত জুনাইদ বাগদাদী (র)-এর মতে: “আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপনে সৃষ্টিজগতের সকল কিছু ভুলে যাওয়া এবং পার্থিব মোহহীন হয়ে আত্মনিমগ্ন থাকাই তাসাউফ।” শায়খুল ইসলাম জাকারিয়া আল-আনসারীর মতে: “যে শাস্ত্রের দ্বারা আত্মার পবিত্রতা অর্জন, চারিত্রিক দোষত্রুটি বর্জন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে চরিত্র অলঙ্কৃত করা যায়, তাকে ইলমুত তাসাউফ বলে।”
– কুরআনের নির্দেশনা:
قَدْ أَفْلَحَ مَن زَكَّاهَا ۝ وَقَدْ خَابَ مَن دَسَّاهَا
“সে-ই সফলকাম হলো, যে নিজের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করল; আর সে-ই ব্যর্থ হলো, যে নিজেকে কলুষিত করল।” (সূরা আশ-শামস: ৯-১০)।

২. তাসাউফের বিষয়বস্তু ও আলোচ্য এলাকা (موضوع التصوف):

আলোচ্য ক্ষেত্র সুনির্দিষ্ট বিষয়বস্তু ও চর্চা
১. নফসের পরিশুদ্ধি (তাযকিয়াতুন নফস) নফসে আম্মারা (মন্দপ্রবণ আত্মা)-কে নফসে লাউয়ামা এবং নফসে মুতমায়িন্নায় উন্নীত করা।
২. অন্তরের কুপ্রবৃত্তি বর্জন (তাখলিয়া) হিংসা (হাসাদ), অহংকার (কিবর), লোকদেখানো আমল (রিয়া), ক্রোধ ও সম্পদের মোহ দূর করা।
৩. প্রশংসনীয় গুণে চরিত্র অলঙ্করণ (তাহলিয়া) ধৈর্য (সবর), কৃতজ্ঞতা (শোকর), নির্ভরতা (তাওয়াক্কুল), অল্পেতুষ্টি (কানাআত) ও ভালোবাসা (মুহব্বত)।
৪. মাআরিফাতুল্লাহ ও মুরাকাবা আল্লাহ তাআলার সার্বক্ষণিক উপস্থিতি স্মরণ করা (যিকির ও ফিকির) এবং প্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া।

৩. তাসাউফের পরম লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য (غاية التصوف):
– মাকামে ইহসান অর্জন: আল্লাহকে প্রত্যক্ষভাবে অবলোকন করার মতো একাগ্রচিত্তে ইবাদতের স্তরে পৌঁছানো।
– আল্লাহর সন্তুষ্টি (রিদ্বা) লাভ: কোনো জাগতিক পদমর্যাদা বা বাহ্যিক লাভের জন্য নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টিই একমাত্র কাম্য।
– আত্মার চিরমুক্তি: কিয়ামতের দিন যে ‘কলবে সালীম’ বা বিশুদ্ধ অন্তর একমাত্র নাজাতের উসিলা হবে, তা অর্জন করা।

উপসংহার:
তাসাউফ কোনো বিলাসিতা নয়, বরং প্রতিটি মুমিনের ঈমানি সুরক্ষার আত্মিক ঢাল। শরিয়তের মূল কাঠামোর সাথে তাসাউফের যোগসূত্রেই খাঁটি মুমিনের চরিত্র নির্মিত হয়।

৪। সূফীবাদ বলতে কী বোঝ? মুসলিম সমাজে সূফীবাদের ভূমিকা বিস্তারিত আলোচনা কর।

[What do you mean by Sufism? Discuss the roles of it in the Muslim society.]

[মান: ২০]

ভূমিকা:
সূফীবাদ বা ইলমুত তাসাউফ (علم التصوف) হলো ইসলামের আধ্যাত্মিক হৃৎপিণ্ড। এটি কোনো ইসলাম-বহির্ভূত মতবাদ নয়, বরং কুরআন ও সুন্নাহর পূর্ণাঙ্গ অনুসরণের মাধ্যমে অন্তরের কলুষতা দূর করে আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি (ইহসান) অর্জনের সুনির্দিষ্ট শাস্ত্রীয় পদ্ধতি। মুসলিম সমাজের নৈতিক চরিত্র গঠন, গণমানুষের মাঝে দ্বীনি আবেগ জাগ্রত রাখা, সমাজ সংস্কার এবং দিগ্বিজয়ী প্রচারকদের মাধ্যমে বিশ্বময় ইসলাম বিস্তারে সূফীবাদের ভূমিকা অবিস্মরণীয়।

১. সূফীবাদের প্রামাণ্য সংজ্ঞা ও মূলভিত্তি:
– শাব্দিক উৎস: ‘সূফ’ (পশমি বস্ত্র), ‘সাফা’ (পবিত্রতা) কিংবা আসহাবে সুফফার সাথে সাদৃশ্য থেকে তাসাউফ শব্দের উৎপত্তি।
– বিখ্যাত হাদিস (হাদিসে জিবরীল): রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেছেন:
أَنْ تَعْبُدَ اللَّهَ كَأَنَّكَ تَرَاهُ، فَإِنْ لَمْ تَكُنْ تَرَاهُ فَإِنَّهُ يَرَاكَ
“ইহসান হলো এই যে, তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে যেন তুমি তাঁকে দেখছ; আর যদি তুমি তাঁকে দেখতে না পাও, তবে নিশ্চিত জানবে যে তিনি তোমাকে দেখছেন।” (সহীহ বুখারী: ৫০)।
– ইমাম জুনাইদ বাগদাদী (র)-এর মতে: “আমাদের তাসাউফের ভিত্তি কুরআন ও সুন্নাহর সাথে সম্পূর্ণ আবদ্ধ। যে ব্যক্তি কুরআন হিফজ করেনি ও হাদিস আয়ত্ত করেনি, তার এই পথে চলা বৈধ নয়।”

২. মুসলিম সমাজে সূফীবাদের বহুমুখী ভূমিকা ও অবদান:

ভূমিকার ক্ষেত্র সুনির্দিষ্ট অবদান ও কার্যাবলি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত
১. ইসলাম প্রচার ও বিস্তার তরবারির শক্তি দিয়ে নয়, বরং সূফীদের অনুপম চরিত্র, মানবসেবা ও আধ্যাত্মিক আকর্ষণে কোটি কোটি মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে। উপমহাদেশে হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী (র), বাংলায় হযরত শাহজালাল (র) ও খানজাহান আলী (র)।
২. নৈতিক ও আত্মিক পরিশুদ্ধি সমাজের সর্বস্তরের মানুষের অন্তর থেকে অহংকার, হিংসা, রিয়া ও লোভ দূর করে তাকওয়া, শোকর ও সবর প্রতিষ্ঠা। ইমাম গাযযালী (র)-এর ইহয়াউ উলুমিদ্দীন এবং হাসান বসরি (র)-এর যুহদ সাধনা।
৩. খানকাহভিত্তিক সমাজসেবা ও লঙ্গরখানা বর্ণ-ধর্ম নির্বিশেষে অসহায়, ক্ষুধার্ত ও বিপদাপন্ন মানুষকে আশ্রয় প্রদান, খাদ্য বিতরণ এবং সামাজিক ভ্রাতৃত্ব রক্ষা। চিশতিয়া ও কাদেরিয়া তরীকার লঙ্গরখানা ও আশ্রয়কেন্দ্র।
৪. সামাজিক সুবিচার ও সাম্য প্রতিষ্ঠা তৎকালীন সামন্তবাদী রাজা-বাদশাহদের অন্যায়ের প্রতিবাদ করা এবং জাত-পাত দূর করে সর্বজনীন সাম্য কায়েম। মুজাদ্দিদে আলফে সানি (র)-এর আকবরের তথাকথিত ‘দ্বীন-ই-ইলাহী’র বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো।
৫. জ্ঞান ও সাহিত্য চর্চা উর্দু, ফারসি, বাংলা ও তুর্কি ভাষায় সূফী কবিতার মাধ্যমে তাওহীদ ও খোদা-প্রেমের অপূর্ব বিকাশ সাধন। মাওলানা জালালুদ্দীন রুমি (র)-এর মসনবি এবং শেখ সাদী (র)-এর গুলিস্তাঁ ও বোস্তাঁ।

৩. বর্তমান সমাজে সূফীবাদের অপরিহার্যতা:
আজকের ভোগবাদী ও বস্তুবাদী দুনিয়ায় মানুষ যখন মানসিক হতাশা ও নৈতিক অবক্ষয়ে জর্জরিত, তখন শরিয়তসম্মত প্রকৃত সূফীবাদ মানুষকে অন্তরের প্রশান্তি দান করতে পারে। তবে পীরপূজা, মাজারপূজা ও শরিয়তবিরোধী কুসংস্কার থেকে সূফীবাদকে মুক্ত রাখা মুসলিম উম্মাহর ঈমানি দায়িত্ব।

উপসংহার:
সূফীবাদ মুসলিম সমাজের প্রাণশক্তি। শরিয়ত যদি হয় বৃক্ষ, তবে তরিকত ও তাসাউফ হলো তার সুমিষ্ট ফল। ইসলামের বিজয় নিশান উড্ডীন রাখতে এবং আত্মিক বিপ্লব ঘটাতে সূফীবাদের অবদান চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

৫। “সূফীবাদ ও বৈরাগ্যবাদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই” – এ বিষয়ে তোমার নিজের মতামত প্রমাণসহ লেখ।

[There is no relation between ‘Sufism and Monasticism’ – Write your own opinion about it with proofs.]

[মান: ২০]

ভূমিকা:
ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও প্রকৃতির অনুসারী (দ্বীনুল ফিতরাত) জীবনব্যবস্থা। সংসার ত্যাগ করে বন-জঙ্গলে চলে যাওয়া, পরিবার-পরিজন বর্জন করা এবং দেহকে অমানুষিক কষ্ট দিয়ে আধ্যাত্মিকতা অর্জনের খ্রিস্টীয় ও হিন্দুত্ববাদী নীতিকে ‘বৈরাগ্যবাদ’ (Rahbaniyyah / Monasticism) বলা হয়। কিন্তু ইসলামের সূফীবাদ বৈরাগ্যবাদ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। “সূফীবাদ ও বৈরাগ্যবাদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই”—এই বক্তব্যটি শতভাগ সত্য এবং কুরআন ও সুন্নাহর প্রামাণ্য দলিলে প্রতিষ্ঠিত।

১. বৈরাগ্যবাদ সম্পর্কে ইসলামের অলঙ্ঘনীয় ঘোষণা:
– হাদিসের বাণী: রাসূলুল্লাহ (সা) দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছেন:
لَا رَهْبَانِيَّةَ فِي الْإِسْلَامِ
“ইসলামে কোনো বৈরাগ্যবাদের স্থান নেই।” (বায়হাকী ও মুসনাদে আহমাদ)।
– কুরআনের ঘোষণা: পবিত্র কুরআনে বৈরাগ্যবাদকে মানবসৃষ্ট ও অকার্যকর প্রথা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে:
وَرَهْبَانِيَّةً ابْتَدَعُوهَا مَا كَتَبْنَاهَا عَلَيْهِمْ إِلَّا ابْتِغَاءَ رِضْوَانِ اللَّهِ فَمَا رَعَوْهَا حَقَّ رِعَايَتِهَا
“আর বৈরাগ্যবাদ—তা তো তারা নিজেরা প্রবর্তন করেছিল; আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্য ছাড়া আমি তাদের ওপর তা ফরজ করিনি। কিন্তু তারাও তা যথার্থভাবে রক্ষা করতে পারেনি।” (সূরা আল-হাদীদ: ২৭)।

২. সূফীবাদ ও বৈরাগ্যবাদের মধ্যকার আকাশ-পাতাল পার্থক্য:

পার্থক্যসূচক মানদণ্ড ইসলামী সূফীবাদ (Tasawwuf) খ্রিস্টীয়/অন্যান্য বৈরাগ্যবাদ (Monasticism)
১. পারিবারিক জীবন ও বিবাহ বিবাহ করা রাসূলের সুন্নাত; সূফীগণ বিবাহিত হয়ে সুসন্তান লালন-পালন করেছেন। আজীবন কৌমার্য পালন করা এবং নারীকে পাপের কারণ মনে করা।
২. হালাল উপার্জনের বাধ্যবাধকতা নিজের পরিশ্রমে হালাল রুজি উপার্জন ফরজ বিধান। সূফীগণ ব্যবসা-বাণিজ্য ও কাজ করেছেন। উৎপাদনশীল কাজ ত্যাগ করে মানুষের দয়ার ওপর বেঁচে থাকা।
৩. সমাজ ও জিহাদে অংশগ্রহণ সমাজের মাঝে থেকে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা, আর্তমানবতার সেবা এবং প্রয়োজনে জিহাদ করা। সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে পালিয়ে নির্জন মঠ বা জঙ্গলে আত্মগোপন করা।
৪. ত্যাগের প্রকৃত রূপ দুনিয়ার মোহ অন্তর থেকে বের করা, হাত থেকে বৈধ সম্পদ ত্যাগ করা নয়। জগতের সকল আনন্দ ও বৈধ সম্পর্ক জোরপূর্বক বর্জন করা।

৩. মহান সূফীগণের বাস্তব জীবনের উদাহরণ:
– হযরত জুনাইদ বাগদাদী (র) কাঁচের ব্যবসা করতেন।
– হযরত আবদুল কাদের জিলানী (র) বিপুল পরিবারের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং জ্ঞান প্রচার করেছেন।
– হযরত শাহজালাল (র) অত্যাচারী রাজার বিরুদ্ধে স্বশরীরে জিহাদ পরিচালনা করে বাংলায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছেন।

উপসংহার:
অতএব স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, সূফীবাদ কখনো বৈরাগ্যবাদ নয়। প্রকৃত সূফী হলেন তিনি, যার হাত থাকবে কর্মে কিন্তু অন্তর থাকবে সার্বক্ষণিক আল্লাহর স্মরণে—”দিল বা ইয়ার, দস্ত বা কার” (অন্তর আল্লাহর সাথে, হাত কর্মে)।

৬। সূফীবাদের কলব (মন) এবং জিসম (শরীর) বলতে কী বোঝ? বিশদভাবে আলোচনা কর।

[What do you mean by ‘Mind’ and ‘Body’ in Sufism? Discuss elaborately.]

[মান: ২০]

ভূমিকা:
ইলমুত তাসাউফে মানুষের সামগ্রিক অস্তিত্বকে জড় ও চেতনার এক গভীর সমন্বয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর মধ্যে দৃশ্যমান বাহ্যিক কাঠামো হলো ‘জিসম’ (جسم – দেহ/শরীর) এবং অদৃশ্য অভ্যন্তরীণ অনুভূতির রাজপ্রাসাদ হলো ‘কলব’ (قلب – অন্তর/মন)। সূফী সাধনায় এই জিসম ও কলবের সম্পর্ক ঠিক তেমনি, যেমনটি হয় প্রজা ও শাসকের। মানুষের আত্মার উন্নতি বা অধঃপতন সম্পূর্ণভাবে এই জিসম ও কলবের ভারসাম্যপূর্ণ পরিচালনার ওপর নির্ভরশীল।

১. কলব (অন্তর/মন) ও জিসম (দেহ)-এর স্বরূপ ও পরিচয়:
– জিসমের পরিচয়: মাটি, পানি, বায়ু ও অগ্নির সমন্বয়ে গঠিত পঞ্চইন্দ্রিয়বিশিষ্ট নশ্বর দেহ। এটি হলো আত্মার অস্থায়ী বাহন।
– কলবের পরিচয়: শারীরবৃত্তীয় রক্তপিণ্ড মাংসখণ্ডটি ছাড়াও এর অন্তরালে এক অলৌকিক রূহানি লতিফা বিদ্যমান, যা আল্লাহর মাআরিফত, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার মূল কেন্দ্রস্থল। একেই সূফী পরিভাষায় ‘হৃদয়’ বা মন বলা হয়।
– নবী করীম (সা)-এর যুগান্তকারী হাদিস:
أَلَا وَإِنَّ فِي الْجَسَدِ مُضْغَةً، إِذَا صَلَحَتْ صَلَحَ الْجَسَدُ كُلُّهُ، وَإِذَا فَسَدَتْ فَسَدَ الْجَسَدُ كُلُّهُ، أَلَا وَهِيَ الْقَلْبُ
“জেনে রাখ! মানবদেহে একটি মাংসপিণ্ড রয়েছে, যা সুস্থ থাকলে সমগ্র শরীর সুস্থ থাকে; আর তা বিনষ্ট হলে সমগ্র শরীর বিনষ্ট হয়ে যায়। শুনে রাখ, সেটাই হলো কলব।” (সহীহ বুখারী: ৫২)।

২. সূফীতত্ত্বে কলব ও জিসমের আন্তঃসম্পর্কের তুলনামূলক রূপরেখা:

বৈশিষ্ট্য ও ভূমিকা কলব (মন/অন্তর) জিসম (শরীর/দেহ)
১. প্রাকৃতিক সত্তা অতীন্দ্রিয়, রূহানি ও অমর লতিফা। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য, জড়বস্তু ও নশ্বর কাঠামো।
২. শাসনের ক্ষমতা সামগ্রিক মানবদেহের রাজা ও হুকুমকর্তা। কলবের নির্দেশ পালনকারী সৈন্য ও প্রজা।
৩. খোরাক ও পুষ্টি যিকির, ফিকির, তিলাওয়াত ও প্রেমাস্পদের ধ্যান। অন্ন, বস্ত্র, জল ও শারীরিক বিশ্রাম।
৪. ব্যাধি ও চিকিৎসা হিংসা, অহংকার, লোভ ও অজ্ঞতা (আধ্যাত্মিক চিকিৎসা প্রয়োজন)। জ্বর, ক্ষত, ক্লান্তি (চিকিৎসা বিজ্ঞানের মাধ্যমে নিরাময়)।
৫. পরকালীন পরিণতি কলবে সালীম নিয়ে আল্লাহর দরবারে চিরশান্তি লাভ। মাটিতে মিশে যাবে, কিয়ামতে পুনরায় গঠিত হবে।

৩. সাধনায় জিসম ও কলবের পরিশুদ্ধি:
সূফীগণ দেহকে ধ্বংস করার শিক্ষা দেন না; বরং দেহকে শরিয়তের অনুগত রেখে কলবকে যিকিরুল্লাহর মাধ্যমে জাগ্রত করতে বলেন। যখন কলব আলোকিত হয়, তখন জিসমের চোখ হারাম দেখে না, জিসমের পা পাপের দিকে হাঁটে না এবং জিসমের জিহ্বা পরনিন্দা করে না।

উপসংহার:
মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব তার জিসমের সৌন্দর্যে নয়, বরং তার কলবের পবিত্রতায়। কলবকে পবিত্র রেখে জিসমকে সৎকাজে নিয়োজিত রাখাই তাসাউফ সাধনার পরম সার্থকতা।

৭। অস্তিত্ববাদ কী? অস্তিত্ববাদের (উজূদিয়াত) একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দাও।

[What is Existentialism? Give a brief description of Existentialism.]

[মান: ২০]

ভূমিকা:
অস্তিত্ববাদ (Existentialism / আরবি পরিভাষায়: الوجودية – আল-উজূদিয়্যাহ) বিংশ শতাব্দীর একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী পাশ্চাত্য দার্শনিক মতবাদ। বিশেষত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর ইউরোপে চরম মানবীয় বিপর্যয়, হতাশা ও রাজনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে এই দর্শন ব্যাপক বিস্তার লাভ করে। এই মতবাদের মূল দাবি হলো—মানুষের ক্ষেত্রে তার পূর্বনির্ধারিত সারসত্তা (Essence)-র চেয়ে তার বর্তমান অস্তিত্ব (Existence) আগে। মানুষ নিজেই নিজের ভাগ্য ও ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জন্য সম্পূর্ণ স্বাধীন ও দায়ী।

১. অস্তিত্ববাদের সংজ্ঞা ও প্রবক্তাগণ:
– মূল সূত্র: জঁ-পল সার্ত্র (Jean-Paul Sartre)-এর বিখ্যাত ঘোষণা: “Existence precedes Essence” (অস্তিত্ব সারসত্তার পূর্ববর্তী)। অর্থাৎ কোনো মানুষ আগে থেকে চোর, সাধু বা বীর হয়ে জন্মায় না; সে প্রথমে অস্তিত্বশীল হয় এবং পরবর্তীতে নিজের সিদ্ধান্ত ও কাজের মাধ্যমে নিজেকে তৈরি করে।
– প্রধান দুই ধারা:
১. ঈশ্বরবিশ্বাসী অস্তিত্ববাদ (Theistic Existentialism): প্রবক্তা—সোরেন কির্কেগার্দ (Søren Kierkegaard), গ্যাব্রিয়েল মার্সেল। তাঁরা মনে করেন ঈশ্বরের ওপর গভীর আস্থা ও বিশ্বাসের মাধ্যমেই মানব জীবনের পূর্ণতা সম্ভব।
২. নাস্তিক্যবাদী অস্তিত্ববাদ (Atheistic Existentialism): প্রবক্তা—জঁ-পল সার্ত্র, আলবেয়ার কামু, ফ্রিডরিখ নিৎশে। তাঁরা ঈশ্বরকে অস্বীকার করে মানুষকে চরম নিঃসঙ্গ ও নিরঙ্কুশ স্বাধীন মনে করেন।

২. অস্তিত্ববাদের প্রধান প্রধান প্রত্যয়সমূহ:

মৌলিক প্রত্যয় দার্শনিক ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ
১. অবাধ স্বাধীনতা (Radical Freedom) মানুষ তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত গ্রহণে সম্পূর্ণ স্বাধীন। কোনো পরিবেশ বা ভাগ্যকে দোষারোপ করার সুযোগ নেই।
২. দায়িত্ববোধ ও যন্ত্রণা (Anguish/Anxiety) স্বাধীনতা মানুষের ওপর বিপুল দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়। ভুল সিদ্ধান্তের ভয়ে মানুষ অস্তিত্বমূলক যন্ত্রণা ও উদ্বেগে ভোগে।
৩. অসততা বা আত্মপ্রবঞ্চনা (Bad Faith) যখন কেউ নিজের ভুলের দায় সমাজ, ভাগ্য বা প্রকৃতির ওপর চাপিয়ে দেয়, সার্ত্রের মতে সে ‘Bad Faith’-এ লিপ্ত হয়।
৪. অর্থহীনতা বা অযৌক্তিকতা (Absurdity) নাস্তিক্যবাদী ধারায় মনে করা হয় মহাবিশ্ব জন্মগতভাবে কোনো অর্থ বহন করে না; মানুষ নিজেই তার জীবনের অর্থ সৃষ্টি করে।

৩. ইসলামী দর্শন ও অস্তিত্ববাদের তুলনামূলক মূল্যায়ন:
– সম্মতিসূচক দিক: মানুষের কর্মের স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধকে ইসলামও পূর্ণ স্বীকৃতি দেয়। কুরআন বলে: كُلُّ نَفْسٍ بِمَا كَسَبَتْ رَهِينَةٌ (“প্রত্যেক ব্যক্তি তার কৃতকর্মের জন্য দায়ী।” – সূরা আল-মুদ্দাসসির: ৩৮)।
– মৌলিক অমিল ও বিপত্তি: নাস্তিক্যবাদী অস্তিত্ববাদ মানুষকে এক দিশাহীন শূন্যতায় ছেড়ে দেয়, যা মানুষকে চরম হতাশা ও আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেয়। পক্ষান্তরে ইসলামী উজূদিয়াত মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আল্লাহ তাআলা মানুষকে অর্থহীনভাবে সৃষ্টি করেননি; জীবনের সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য রয়েছে—আল্লাহর দাসত্ব ও খিলাফতের দায়িত্ব পালন।

উপসংহার:
অস্তিত্ববাদ মানুষকে গতানুগতিক অন্ধ অনুকরণ থেকে মুক্ত করে সচেতন ব্যক্তি হিসেবে গড়ে ওঠার আহ্বান জানায়। কিন্তু ওহীর পথপ্রদর্শন ছাড়া এই দর্শন মানুষকে আত্মিক প্রশান্তি দিতে সম্পূর্ণ অক্ষম।

৮। মানবতাবাদ কী? “মানব সেবাই সূফীবাদের মূল কথা” – ব্যাখ্যা কর।

[What is humanism? “The main point of Sufism is human service”- Explain.]

[মান: ২০]

ভূমিকা:
মানবতাবাদ বা মানবপ্রেম হলো মানবজাতির প্রতি অকৃত্রিম সমবেদনা, ভালোবাসা ও তাদের অধিকার রক্ষার এক সার্বজনীন চেতনা। তবে পাশ্চাত্য ধর্মনিরপেক্ষ মানবতাবাদ যেখানে মানুষকে নিছক বৈষয়িক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে, ইসলামী সূফীবাদ সেখানে মানবসেবাকে সরাসরি আল্লাহর সন্তুষ্টি ও এবাদতের সর্বোত্তম অঙ্গ হিসেবে ঘোষণা করে। “মানব সেবাই সূফীবাদের মূল কথা”—এই অমর বাণী সূফী সাধকদের শত শত বছরের জীবন ও কর্মের মাধ্যমে ইতিহাসের পাতায় চিরভাস্বর হয়ে আছে।

১. সূফীবাদে মানবসেবার ঐশী দর্শন ও প্রেরণা:
সূফীগণের দৃষ্টিতে সৃষ্টির সেবা হলো স্রষ্টার প্রতি প্রেমের প্রত্যক্ষ বহিঃপ্রকাশ। সৃষ্টিকে কষ্ট দিয়ে কিংবা মানুষের দুঃখ মোচনে উদাসীন থেকে কোনো মানুষ আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারে না।
– কুরআনের নির্দেশ:
وَيُطْعِمُونَ الطَّعَامَ عَلَىٰ حُبِّهِ مِسْكِينًا وَيَتِيمًا وَأَسِيرًا ۝ إِنَّمَا نُطْعِمُكُمْ لِوَجْهِ اللَّهِ لَا نُرِيدُ مِنكُمْ جَزَاءً وَلَا شُكُورًا
“তারা আল্লাহর ভালোবাসায় খাদ্য দান করে অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দীদের; এবং বলে: আমরা তো কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই তোমাদের আহার করাই, আমরা তোমাদের থেকে কোনো প্রতিদান বা কৃতজ্ঞতা কামনা করি না।” (সূরা আল-ইনসান: ৮-৯)।
– হাদিসে কুদসির অমোঘ ঘোষণা: কিয়ামতের দিন আল্লাহ বান্দাকে বলবেন: “হে বনি আদম! আমি ক্ষুধার্ত ছিলাম, তুমি আমাকে আহার দাওনি; আমি অসুস্থ ছিলাম, তুমি আমাকে দেখতে যাওনি…” বান্দা বলবে: “হে রব! আপনি নিখিল বিশ্বের প্রতিপালক, আমি কীভাবে আপনাকে আহার করাব?” আল্লাহ বলবেন: “তোমার অমুক ভাই অসুস্থ হয়েছিল, তুমি তার সেবা করলে সেখানে আমাকে পেতে!” (সহীহ মুসলিম: ২৫৬৯)।

২. সূফীবাদের মানবসেবার প্রধান প্রধান ক্ষেত্রসমূহ:

সেবামূলক ক্ষেত্র বাস্তব রূপায়ণ ও ঐতিহাসিক অবদান
১. সার্বজনীন লঙ্গরখানা (খাদ্য বিতরণ) খানকাহসমূহে ধনী-দরিদ্র, মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে প্রতিদিন শত শত ক্ষুধাতুর মানুষকে বিনামূল্যে খাবার পরিবেশন।
২. চিকিৎসা ও আশ্রয় প্রদান মুসাফির, রোগী ও নিপীড়িত মানুষদের খানকাহে নিরাপদ আশ্রয় ও ভেষজ চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।
৩. সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও অহিংসা খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী (র)-এর “সূর্যের মতো ভালোবাসা, নদীর মতো উদারতা এবং মাটির মতো আতিথেয়তা” নীতির বাস্তব প্রয়োগ।
৪. সামাজিক অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো অত্যাচারী শাসক ও সামন্তপ্রভুদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে মজলুম মানুষের পাশে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো।

৩. শেখ সাদীর অমর বাণী:
ইরানের কালজয়ী সূফী কবি শেখ সাদী (র) মানবজাতির একাত্মতা ঘোষণা করে লিখেছেন:
বনি আদম আযায়ে ইয়াক দিগ রান্দ / কে দার আফরিনেশ যে ইয়াক গোওহরান্দ
“আদম সন্তানগণ পরস্পর একটি দেহের বিভিন্ন অঙ্গের মতো; কারণ সৃষ্টির মূল উপাদানে তারা সবাই অভিন্ন।”

উপসংহার:
সুতরাং সূফীবাদ কোনো ঘরকুনো বা আত্মকেন্দ্রিক জপসাধনা নয়। আর্তমানবতার অশ্রু মোচন করা, ক্ষুধাতুরের মুখে অন্ন তুলে দেওয়া এবং মানুষের অন্তরে শান্তির পরশ বুলিয়ে দেওয়াই হলো সূফীবাদের পরম পরিচয় ও মূল কথা।

৯। দার্শনিক ড. মুহাম্মদ ইকবাল (র)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী লেখ।

[Write the short biography of the Philosopher Dr. Muhammad Iqbal (R.).]

[মান: ২০]

ভূমিকা:
ড. আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল (১৮৭৭-১৯৩৮ খ্রি.) ছিলেন মুসলিম জাহানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দার্শনিক, চিন্তাবিদ, কবি এবং নবজাগরণের অগ্রদূত। তিনি শুধু সুমধুর কাব্যের রচয়িতাই ছিলেন না, বরং পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদ ও বস্তুবাদী মোহগ্রস্ত মুসলিম উম্মাহকে আত্মমর্যাদা ও আধ্যাত্মিক পুনর্জাগরণের দীক্ষা দেওয়া এক যুগান্তকারী পথপ্রদর্শক ছিলেন। তাঁর বৈপ্লবিক ‘খুদি তত্ত্ব’ (Philosophy of the Self) মুসলিম চিন্তাধারায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।

১. জন্ম, শিক্ষা ও কর্মজীবন:
– জন্ম: ১৮৭৭ সালের ৯ নভেম্বর অবিভক্ত ভারতের পাঞ্জাবের শিয়ালকোটে এক ধর্মপ্রাণ কাশ্মীরি বংশোদ্ভূত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
– শিক্ষা: লাহোরের সরকারি কলেজ থেকে দর্শনে এম.এ পাস করেন। এরপর উচ্চশিক্ষার্থে ইংল্যান্ডের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে ডিগ্রি এবং বার-অ্যাট-ল অর্জন করেন। জার্মানির মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে “The Development of Metaphysics in Persia” থিসিসের ওপর পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।
– অধ্যাপনা ও আইন পেশা: দেশে ফিরে লাহোরে গভর্নমেন্ট কলেজে দর্শনের অধ্যাপনা ও আইন ব্যবসায় যুক্ত হন। পরবর্তীতে ভারতীয় মুসলিমদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির লড়াইয়ে আত্মনিয়োগ করেন।

২. ইকবালের কালজয়ী গ্রন্থাবলি ও দর্শনতত্ত্ব:

গ্রন্থের নাম ও ধরন মূল বিষয়বস্তু ও অবদান
১. আসরার-ই-খুদি (ফারসি কাব্য) ‘খুদি’ বা আত্মসত্তার রহস্য উন্মোচন। নিষ্ক্রিয়তা ও বৈরাগ্যবাদ বর্জন করে কর্মচাঞ্চল্য অর্জনের আহ্বান।
২. রুমুয-ই-বেখুদি (ফারসি কাব্য) ব্যক্তির সাথে সমষ্টি বা মুসলিম সমাজের অপরিহার্য সম্পর্কের রূপরেখা।
৩. দ্য রিকনস্ট্রাকশন অব রিলিজিয়াস থট ইন ইসলাম ইকবালের প্রধান দার্শনিক ইংরেজি গ্রন্থ, যেখানে আধুনিক বিজ্ঞান, দর্শন ও ইসলামের সমন্বয়ে নবব্যাখ্যার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
৪. বালে জিবরিল ও বাঙ্গে দারা (উর্দু কাব্য) মুসলিম তরুণ প্রজন্মকে ঈমানি জাগরণ ও শাহীন পাখির মতো উচ্চাশা ধারণের কাব্যময় নির্দেশনা।

৩. ইকবালের দর্শনের প্রধান স্তম্ভসমূহ:
– খুদি বা আত্মসত্তার বিকাশ: ইকবাল চাইলেন মানুষ যেন আত্মবিলোপ না করে বরং আত্মমর্যাদায় বলীয়ান হয়। তাঁর বিখ্যাত পঙ্‌ক্তি:
“খুদি কো কর বুলন্দ ইতনা কে হর তকদির সে পহলে / খোদা বান্দে সে খুদ পুছে বাতা তেরি রাজা কেয়া হ্যায়।”
– ইজতিহাদের পুনরুজ্জীবন: ইসলামী আইনের গতিশীলতা রক্ষার জন্য সমকালীন প্রেক্ষাপটে ইজতিহাদ চর্চাকে অপরিহার্য মনে করতেন।
– পাশ্চাত্য বস্তুবাদের তীব্র সমালোচনা: তিনি ইউরোপীয় সভ্যতার ভোগবাদ, আধ্যাত্মিকতাহীন বিজ্ঞান এবং ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদের কঠোর সমালোচনা করেন।

উপসংহার:
১৯৩৮ সালের ২১ এপ্রিল এই মহান মনীষী ইন্তেকাল করেন। আল্লামা ইকবাল তাঁর লেখনী ও দর্শনের মাধ্যমে পরাধীন মুসলিম জাতিকে যে আত্মবিশ্বাসের পরশপাথর উপহার দিয়েছিলেন, তা আজও সমগ্র মুসলিম জাহানের প্রেরণার অনন্ত উৎস।

১০। বাঙালি দর্শনের উৎপত্তি ও উহার ক্রমবিকাশ বিশ্লেষণ কর।

[Analyze the origin of Bengali Philosophy and its gradual development.]

[মান: ২০]

ভূমিকা:
বাঙালি দর্শন হলো এই ভূখণ্ডের হাজার বছরের সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার এক অনুপম বুদ্ধিবৃত্তিক ফসল। ভৌগোলিক ও পরিবেশগত কারণে বাংলা অঞ্চল চিরকালই উদারতা, মানবপ্রেম ও অন্তর্দৃষ্টির চারণভূমি। ভারতীয় বৈদিক সনাতন ঐতিহ্য, বৌদ্ধ সহজিয়া সাধনা, ইসলামের সাম্যবাদী সূফী ধারা এবং আধুনিক রেনেসাঁসের সমন্বয়ে বাঙালি চিন্তাধারা এক অনন্য স্বকীয়তা লাভ করেছে। ফাযিল ও অনার্স স্তরে বাঙালি দর্শনের বিকাশধারা অনুধাবন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

১. বাঙালি দর্শনের উৎপত্তি ও প্রাচীন ভিত্তি:
– চর্যাপদের যুগ (৮ম-১২শ শতক): বাঙালি দর্শনের প্রাচীনতম লিখিত নিদর্শন হলো চর্যাপদ। এতে বৌদ্ধ সহজযান ও নাথ দর্শনের তাত্ত্বিক রূপ প্রকাশ পেয়েছে, যেখানে দেহসাধনা এবং জীব ও জগতের অদ্বৈত সত্তা আলোচিত হয়েছে।
– লোকায়ত দর্শন: আর্য সংস্কৃতির বাইরে বাংলার আদি অধিবাসীদের মাঝে প্রাকৃত জড়বাদ ও কৃষিনির্ভর প্রকৃতি পূজার ধারা বিদ্যমান ছিল।

২. বাঙালি দর্শনের ঐতিহাসিক বিকাশধারার পর্যায়সমূহ:

ঐতিহাসিক পর্যায় প্রধান ধারা ও আন্দোলন প্রধান ব্যক্তিত্ব ও দার্শনিক চিন্তাবিদ
১. মধ্যযুগ ও বৈষ্ণব ভাবান্দোলন শ্রীচৈতন্যদেবের গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম ও প্রেমভক্তি দর্শন। বর্ণাশ্রমের বিরুদ্ধে সর্বজনীন মানবপ্রেমের ঘোষণা (“সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই”)। শ্রীচৈতন্যদেব, চণ্ডীদাস, বিদ্যাপতি।
২. ইসলামী সূফী ধারা ও সমন্বয়বাদ বাংলায় ইসলাম আগমনের পর সূফী সাধকদের প্রচারিত সাম্য, ইনসাফ ও তরিকত সাধনা। এটি বাংলার লোকমানসে তাওহীদের গভীর শিকড় প্রোথিত করে। শাহজালাল (র), খানজাহান আলী (র), আলাওল, সৈয়দ সুলতান।
৩. বাউল ও মরমি দর্শন “মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি”—দেহকেন্দ্রিক মানবপ্রেম ও জাতিভেদহীন পরমাত্মার সন্ধান। লালন সাঁইজির অমর সংগীতধারা। লালন শাহ, হাছন রাজা, লালনগীতির সাধকগণ।
৪. আধুনিক পর্যায় ও নবজাগরণ ১৯শ শতকের উনিশ শতকীয় রেনেসাঁস, যুক্তিবাদের উন্মেষ, সমাজ সংস্কার ও আধুনিক বিজ্ঞানমুখী চিন্তা। রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমার দত্ত।
৫. বিশ শতকের মুসলিম জাগরণ ও স্বাধীনতা চিন্তা বাঙালি মুসলিমদের আত্মপরিচয় সন্ধান, বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন এবং শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের দর্শন। কাজী নজরুল ইসলাম, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, আবুল হুসেন, মোতাহের হোসেন চৌধুরী।

৩. বাঙালি দর্শনের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:
– মানবকেন্দ্রিকতা ও প্রেমসাধনা: কঠিন জটিল শাস্ত্রীয় যুক্তির চেয়ে অন্তরের প্রেম ও মানবিক মিলনকে বাঙালি দর্শন চিরকাল অগ্রাধিকার দিয়েছে।
– সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও উদারতাবাদ: সকল ধর্মের ভালো দিকগুলোকে সাদরে গ্রহণ করে পরমতসহিষ্ণু সমাজ গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা।
– দেহাত্মবাদ ও মরমি অনুধ্যান: ক্ষীর-ননীর দেহের মাঝেই অনন্ত পরমেশ্বরের উপস্থিতি উপলব্ধি করার চেষ্টা।

উপসংহার:
বাঙালি দর্শন নিছক পুঁথিগত তত্ত্ব নয়; এটি পদ্মনাড়ীর মতো বাংলার পলিমাটিতে প্রোথিত এক মানবিক জীবনদর্শন। প্রেম, সম্প্রীতি ও মানবতার যে জয়গান বাঙালি দর্শন গেয়ে গেছে, তা আজও যেকোনো সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে আমাদের প্রধান নৈতিক আলোকবর্তিকা।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

ফাযিল ৩য় বর্ষ ইসলামী দর্শন ও তাসাউফ ১ম পত্রের বিষয় কোড কত?

বিষয় কোড হলো ৪২২।

ধর্ম ও দর্শনের মাঝে প্রধান পার্থক্য কী?

ধর্ম ওহী ও বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত, পক্ষান্তরে দর্শন মানবীয় বুদ্ধি ও বিচার বিশ্লেষণের ওপর নির্ভরশীল।

ইসলামে বৈরাগ্যবাদের বিধান কী?

ইসলামে সংসার ত্যাগী বৈরাগ্যবাদ সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ (‘লা রাহবানিয়্যাতা ফিল ইসলাম’)।

কলব ও জিসমের মধ্যে শাসক কে?

হাদিস অনুযায়ী কলব হলো মানবদেহের মূল নিয়ন্ত্রক ও শাসক এবং জিসম তার অনুগত প্রজা।

অস্তিত্ববাদের মূল স্লোগান কী?

‘অস্তিত্ব সারসত্তার পূর্ববর্তী’ (Existence precedes Essence) — মানুষ নিজেই কর্মের মাধ্যমে নিজেকে নির্মাণ করে।

আল্লামা ইকবালের দর্শনের মূল ভিত্তি কী?

আত্মসত্তার বিকাশ বা ‘খুদি দর্শন’ এবং মুসলিম উম্মাহর বুদ্ধিবৃত্তিক পুনর্জাগরণ।