ফাযিল (স্নাতক) পাস ৩য় বর্ষ পরীক্ষা – ২০২৩
বিষয়: ইসলামিক স্টাডিজ ৩য় পত্র (ঐচ্ছিক) (বিষয় কোড: ৪১৮)
[আল-ফিকহ ও দাওয়াহ / আল-আকাইদ ওয়াল ফিকহ]
সময়: ৩ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ১০০
[الملاحظة : أجب عن أربعة من مجموعة (أ) وعن اثنين من مجموعة (ب)]
[দ্রষ্টব্য : (অ) অংশ থেকে চারটি এবং (ব) অংশ থেকে দুটি প্রশ্নের উত্তর দাও। | পূর্ণমান: ১০০]
ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ফাযিল (স্নাতক) পাস ৩য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২৩-এর ইসলামিক স্টাডিজ ৩য় পত্র (বিষয় কোড: ৪১৮) পরীক্ষার মূল প্রশ্নপত্রের প্রতিটি প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ, প্রামাণ্য ও অ্যাকাডেমিক সমাধান নিচে দেওয়া হলো। ফাযিল ডিগ্রি ও অনার্স শ্রেণির ২০ নম্বরের রচনামূলক প্রশ্নের উচ্চমান বজায় রেখে ভূমিকা, পারিভাষিক সংজ্ঞা, কুরআন ও সুন্নাহর প্রামাণ্য দলিল, ফিকহী নীতিমালা, ধারাবাহিক বিশ্লেষণ এবং উপসংহার সহযোগে প্রতিটি উত্তর প্রস্তুত করা হয়েছে।
(অ) অংশ – রচনামূলক প্রশ্ন [مجموعة (أ) – الاسئلة الانشائية] (মান: ৮০)
[যেকোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও: ২০ × ৪ = ৮০]
১। عرف الاسلام لغة وشرعا – ثم قارن بينه وبين الاديان السماوية الاخرى.
[ইসলামের পরিচয় এবং অন্যান্য আসমানি ধর্মের সাথে তুলনা]
[মান: ২০]
ভূমিকা:
ইসলাম কোনো নির্দিষ্ট আচার-অনুষ্ঠান, উপাসনালয়ভিত্তিক আনুষ্ঠানিকতা বা কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ মতবাদ নয়। বরং ইসলাম হলো আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কর্তৃক মানবজাতির সার্বিক কল্যাণের জন্য অবতীর্ণ এক চিরন্তন, সর্বজনীন ও পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান (نظام شامل للحياة)। জন্ম থেকে মৃত্যু, ব্যক্তি থেকে পরিবার, এবং রাষ্ট্র থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গন পর্যন্ত মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে ইসলাম সুনির্দিষ্ট ঐশী নির্দেশনা দ্বারা সুবিন্যস্ত করেছে।
১. ইসলামের আভিধানিক ও পারিভাষিক পরিচয়:
– আভিধানিক অর্থ: ‘ইসলাম’ (الإسلام) শব্দটি আরবি ‘সিলম’ (السِّلْم) বা ‘সালাম’ (السَّلَام) ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ শান্তি, আনুগত্য, আত্মসমর্পণ এবং নিরাপত্তা।
– পারিভাষিক সংজ্ঞা: মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকে একমাত্র রব ও ইলাহ হিসেবে মনেপ্রাণে মেনে নিয়ে এবং হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল স্বীকার করে তাঁর প্রদর্শিত শরিয়ত ও সুন্নাহর প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করার নামই ইসলাম।
২. পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান হিসেবে ইসলামের কুরআনভিত্তিক প্রমাণ:
১. দ্বীনের পূর্ণতার ঘোষণা: বিদায় হজের ঐতিহাসিক আরাফাতের ময়দানে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন:
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا
“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের ওপর আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।” (সূরা আল-মায়িদাহ: ৩)।
২. কিতাবের সর্বব্যাপীতা: আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَابَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ – “আমি আপনার ওপর এই কিতাব অবতীর্ণ করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট ব্যাখ্যাস্বরূপ।” (সূরা আন-নাহল: ৮৯)।
৩. ইসলামে পরিপূর্ণভাবে প্রবেশের নির্দেশ: আল্লাহ তাআলা বলেন: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً – “হে মুমিনগণ! তোমরা ইসলামের মধ্যে পরিপূর্ণভাবে প্রবেশ কর।” (সূরা আল-বাক্বারাহ: ২০৮)।
৩. মানবজীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইসলামের সর্বব্যাপী বিধান:
১. আকিদা ও আধ্যাত্মিক জীবন: তাওহীদ, রিসালাত ও আখেরাতের বিশুদ্ধ বিশ্বাস দিয়ে মানুষের অন্তরকে পঙ্কিলতামুক্ত করে আল্লাহর সাথে নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন করে।
২. ইবাদত ও সামাজিক শৃঙ্খলা: সালাত, সাওম, যাকাত ও হজের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি, পারস্পরিক সহানুভূতি ও বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্ব কায়েম করে।
৩. অর্থনৈতিক ব্যবস্থা: সুদ, জুয়া, মজুদদারী ও শোষণ নিষিদ্ধ করে যাকাত, সদকা ও মুদারাবাভিত্তিক সুষম বণ্টন ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছে।
৪. আইন ও বিচার ব্যবস্থা: ইনসাফ ও সাম্যের ভিত্তিতে হুদুদ, কিসাস ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করে অপরাধমুক্ত সমাজ গঠন করেছে।
৫. রাজনীতি ও শাসননীতি: আমানতদারিতা, ইনসাফ ও পারস্পরিক পরামর্শের (শুরা) ভিত্তিতে জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশনা দিয়েছে।
৬. আন্তর্জাতিক সম্পর্ক: যুদ্ধ, শান্তিচুক্তি, মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ইসলাম অনুপম নৈতিক নীতিমালা উপহার দিয়েছে।
৪. অন্যান্য ধর্মের তুলনায় ইসলামের স্বাতন্ত্র্য ও শ্রেষ্ঠত্ব:
অন্যান্য ধর্মগ্রন্থ যেখানে কালের আবর্তে পরিবর্তিত ও বিকৃত হয়েছে, সেখানে পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর প্রতিটি শব্দ অক্ষত রয়েছে। তদুপরি অন্যান্য ধর্মে যেখানে বৈরাগ্যবাদকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে, ইসলাম সেখানে বৈরাগ্যবাদকে বর্জন করে সমাজ সংস্কারের মাধ্যমে ইহলৌকিক সাফল্য ও পারলৌকিক মুক্তির ভারসাম্য স্থাপন করেছে।
উপসংহার:
ইসলাম একটি জীবন্ত ও চিরন্তন জীবনব্যবস্থা। বর্তমান বিশ্বের বহুমুখী রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট ও নৈতিক অবক্ষয়ের একমাত্র স্থায়ী সমাধান হলো ইসলামের এই পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধানের বাস্তবমুখী অনুসরণ।
২। عرف بالصلوات الخمسة بالادلة ثم بين اثرها فى حياة الفرد والمجتمع.
[পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের দলিল ও এর প্রভাব]
[মান: ২০]
ভূমিকা:
ইসলামি শরিয়তের পাঁচটি মৌলিক স্তম্ভের মধ্যে ঈমানের পরেই সালাতের অবস্থান। সালাত হলো বান্দা ও মহান আল্লাহর মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র স্থাপনের প্রধান মাধ্যম এবং মুমিনের আধ্যাত্মিক মেরুদণ্ড। কিন্তু সালাত কেবলই একটি ব্যক্তিগত ইবাদত নয়; বরং এটি একটি সুশৃঙ্খল, বৈষম্যহীন ও আদর্শ সমাজ বিনির্মাণের এক অতুলনীয় সামাজিক হাতিয়ার।
১. সালাতের আভিধানিক ও পারিভাষিক পরিচয় এবং ফরজ হওয়ার ইতিহাস:
– আভিধানিক অর্থ: ‘সালাত’ (الصلاة) শব্দের অর্থ দোয়া, রহমত, শুভকামনা ও ক্ষমা প্রার্থনা করা।
– পারিভাষিক সংজ্ঞা: তাকবীরে তাহরীমা দিয়ে শুরু হয়ে নির্দিষ্ট রুকন ও শর্তাবলীর সমন্বয়ে গঠিত হয়ে তাসলীম বা সালাম ফিরানোর মাধ্যমে সমাপ্ত হওয়া বিশেষ ইবাদতকে সালাত বলে।
– ফরজ হওয়ার সময়: নবুওয়তের দশম বর্ষে ঐতিহাসিক মিরাজের রজনীতে সিদরাতুল মুনতাহায় আল্লাহ তাআলা উম্মতে মুহাম্মাদীর ওপর সরাসরি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেন।
২. সালাতের সামাজিক গুরুত্ব ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব:
১. সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা: জামাতে সালাত আদায়ের সময় সমাজের ধনী-দরিদ্র, মনিব-ভৃত্য, সাদা-কালো সকল ভেদাভেদ ভুলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একই কাতারে দাঁড়ায়। এতে জাত্যাভিমান চূর্ণ হয়ে যায় এবং সাম্যের অনুপম শিক্ষা বাস্তবায়িত হয়।
২. সময় সচেতনতা ও নিয়মানুবর্তিতা: দৈনিক পাঁচবার নির্দিষ্ট ওয়াক্তে মসজিদে সমবেত হওয়ার মাধ্যমে মুসলিম সমাজ শৃঙ্খলিত ও সময়নিষ্ঠ জাতিতে রূপান্তরিত হয়।
৩. নেতৃত্বের আনুগত্য ও শৃঙ্খলা: জামাতে ইমামের অনুসরণ করার মাধ্যমে মুসলমানরা যোগ্য নেতৃত্বের প্রতি অবিচল আনুগত্য এবং নেতার ভুল হলে কীভাবে আদবের সাথে সংশোধন (লোকমা) করতে হয় তার ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ পায়।
৪. পারস্পরিক সম্প্রীতি ও খোঁজখবর নেওয়া: মহল্লার মসজিদে প্রতিদিন পাঁচবার সাক্ষাতের ফলে প্রতিবেশীদের সুখ-দুঃখ, রোগ-শোক ও আর্থিক সংকটের তাৎক্ষণিক খোঁজ পাওয়া যায় এবং পারস্পরিক সহানুভূতি জাগ্রত হয়।
৫. অশ্লীলতা ও অপরাধমুক্ত সমাজ গঠন: পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন: إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَىٰ عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ – “নিশ্চয় সালাত মানুষকে অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।” (সূরা আল-আনকাবূত: ৪৫)। একজন নামাজী ব্যক্তি কখনো দুর্নীতি, মাদকাসক্তি বা জুলুমে লিপ্ত হতে পারে না।
৩. সালাতের ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নতসমূহের সংক্ষিপ্ত রূপরেখা:
– সালাতের আরকান ও আহকাম (ফরজসমূহ): নামাজের বাইরে ৭টি শর্ত (আহকাম) এবং ভেতরে ৬টি রুকন (আরকান) মোট ১৩টি ফরজ রয়েছে। যেমন: পবিত্রতা, সতর ঢাকা, কেবলামুখী হওয়া, ওয়াক্ত হওয়া, নিয়ত, তাকবীরে তাহরীমা, কিয়াম, কিরাত, রুকু, দুই সিজদা, শেষ বৈঠক ইত্যাদি।
– ওয়াজিবসমূহ: সূরা ফাতিহা পড়া, সূরা মিলানো, রুকু-সিজদার ধারাবাহিকতা রক্ষা, প্রথম বৈঠক, তাশাহহুদ পাঠ, কওমা ও জলসায় সোজা হওয়া, বিতরে দোআয়ে কুনূত পড়া ইত্যাদি।
– সুন্নতসমূহ: সানা পড়া, তাআউয-তাসমিয়া পড়া, রুকু-সিজদার তাসবীহ পড়া, রফউল ইয়াদাইন ইত্যাদি।
উপসংহার:
সালাত হলো সমাজ পরিবর্তনের এক অলৌকিক ঐশী কর্মশালা। একটি সমাজ যদি সালাতের পূর্ণ চেতনা ধারণ করে মসজিদভিত্তিক সমাজব্যবস্থা কায়েম করতে পারে, তবে সে সমাজে অপরাধ ও বৈষম্য চিরতরে বিলুপ্ত হতে বাধ্য।
৩। عرف الرسالة – اثبت ان محمدا صلى الله عليه وسلم خاتم الأنبياء.
[রিসালাতের পরিচয় এবং খতমে নবুওয়তের দলিল]
[মান: ২০]
ভূমিকা:
ইসলামি আকিদার অন্যতম মৌলিক ও অকাট্য স্তম্ভ হলো ‘আকীদায়ে খতমে নবুওয়ত’ (عقيدة ختم النبوة)। অর্থাৎ হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন আল্লাহ তাআলার প্রেরিত সর্বকালের সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসূল। তাঁর আগমনের পর নবুওয়ত ও রিসালাতের সুবিশাল প্রাসাদ পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করেছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত আর কোনো নতুন নবীর আগমন ঘটবে না। এটি অস্বীকারকারী ব্যক্তি কাফির ও মুরতাদ।
১. খতমে নবুওয়তের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ:
– আভিধানিক অর্থ: ‘খাতাম’ (خاتم) শব্দের অর্থ সিলমোহর, সমাপ্তি, শেষ সীমানা বা অবসান।
– পারিভাষিক সংজ্ঞা: হযরত আদম (আ.) থেকে শুরু হওয়া নবুওয়তের ধারাবাহিকতা মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমেই চিরতরে সমাপ্ত হয়েছে এবং তিনি সর্বশেষ নবী—এই বিশ্বাসকে খতমে নবুওয়ত বলা হয়।
২. পবিত্র কুরআনের অকাট্য দলিলসমূহ:
১. সূরা আল-আহযাবের ৪০ নম্বর আয়াত: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন:
مَّا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِّن رِّجَالِكُمْ وَلَٰكِن رَّسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ ۗ وَكَانَ اللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا
“মুহাম্মদ তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসূল এবং সর্বশেষ নবী (খাতামান নাবিয়্যীন)। আর আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ।”
– আরবি ভাষা ও ব্যাকরণের সুস্পষ্ট নীতি অনুযায়ী ‘খাতামুন নাবিয়্যীন’ মানে নবীদের সমাপ্তকারী। যদি নবীদের সমাপ্তি ঘটে, তবে স্বাভাবিকভাবেই রাসূলগণেরও সমাপ্তি ঘটে।
২. আল্লাহ বলেন: وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا كَافَّةً لِّلنَّاسِ بَشِيرًا وَنَذِيرًا – “আমি আপনাকে সমগ্র মানবজাতির জন্য সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি।” (সূরা সাবা: ২৮)।
৩. সহীহ হাদিস শরীফের সুদৃঢ় ঘোষণাবলী:
১. সুনির্দিষ্ট ঘোষণা: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
أَنَا خَاتَمُ النَّبِيِّينَ لا نَبِيَّ بَعْدِي
“আমিই সর্বশেষ নবী, আমার পরে আর কোনো নবী আসবে না।” (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, তিরমিযী)।
২. নবুওয়তের প্রাসাদের রূপক দৃষ্টান্ত: নবীজী (সা.) বলেছেন: “আমার ও পূর্ববর্তী নবীদের উপমা হলো এমন এক সুদৃশ্য প্রাসাদের মতো, যা অত্যন্ত সুন্দর করে তৈরি করা হয়েছে, কেবল একটি ইটের স্থান ছাড়া। মানুষ তা দেখে মুগ্ধ হয়ে বলত: এই ইটটি বসানো হলো না কেন? আমিই হলাম সেই চূড়ান্ত ইট এবং আমিই খাতামুন নাবিয়্যীন।” (সহীহ বুখারী)।
৩. মিথ্যুকদের সম্পর্কে ভবিষ্যৎবাণী: নবীজী (সা.) সতর্ক করে বলেছেন: “আমার উম্মতের মধ্যে ত্রিশজন চরম মিথ্যাবাদী (দাজ্জাল) জন্ম নেবে, যাদের প্রত্যেকেই নিজেকে নবী দাবি করবে; অথচ আমিই শেষ নবী, আমার পরে কোনো নবী নেই।” (আবু দাউদ, তিরমিযী)।
৪. সাহাবায়ে কেরামের ঐতিহাসিক ইজমা:
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পরপরই মুসায়লামা কাযযাব নিজেকে নবী দাবি করলে প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর (রা.) ও সমস্ত সাহাবী ঐক্যবদ্ধ হয়ে তার বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক ইয়ামামার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ পরিচালনা করেন এবং মিথ্যা নবুওয়তের দাবিদারকে নির্মূল করেন। এই সর্বসম্মত ইজমা কিয়ামত পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।
উপসংহার:
খতমে নবুওয়তে বিশ্বাস ইসলামি ঈমানের প্রবেশদ্বার। ক্বলব বা মনগড়া কোনো ব্যাখ্যা দিয়ে শেষ নবীর পর নতুন কোনো প্রকারের নবুওয়তের দাবি করা বা এমন দাবিদারকে মান্য করা প্রকাশ্য কুফরি ও ইসলামদ্রোহিতা।
৪। ما معنى التوحيد؟ وكم نوعا له؟ بين أهميته فى حياة الانسان بالايضاح.
[তাওহীদের অর্থ, প্রকারভেদ ও মানবজীবনে গুরুত্ব]
[মান: ২০]
ভূমিকা:
ইসলামি আকিদার মূল ভিত্তি হলো তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ববাদ। আর এই তাওহীদের বিপরীত মেরুতে যে মারাত্মক পাপ অবস্থান করছে, তা হলো ‘শিরক’ (الشرك)। ইসলামে শিরক হলো ক্ষমার অযোগ্য সর্ববৃহৎ কবিরা গুনাহ। পবিত্র কুরআনে শিরককে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্যতম জুলুম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
১. শিরকের পরিচয় ও আভিধানিক বিশ্লেষণ:
– আভিধানিক অর্থ: ‘শিরক’ শব্দের অর্থ অংশীদার সাব্যস্ত করা, সমকক্ষ নির্ধারণ করা বা ভাগীদার বানানো।
– পারিভাষিক সংজ্ঞা: মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সত্তা (যাত), গুণাবলী (সিফাত), অধিকার ও ক্ষমতায় অন্য কাউকে অংশীদার বা সমকক্ষ স্থির করার নামই শিরক।
২. “নিশ্চয় শিরক চরম জুলুম” (إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ)-এর তাফসীর:
হযরত লোকমান (আ.) তাঁর পুত্রকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছিলেন: يَا بُنَيَّ لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ ۖ إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ – “হে প্রিয় বৎস! আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করো না; নিশ্চয়ই শিরক হলো চরম মহা জুলুম।” (সূরা লোকমান: ১৩)।
– কেন শিরক মহা জুলুম? ‘জুলুম’ শব্দের অর্থ হলো কোনো বস্তুকে তার নিজস্ব হক বা স্থান ছাড়া অন্য স্থানে রাখা। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করেছেন, মানুষকে জীবন ও রিজিক দিয়েছেন; অথচ সেই বান্দা যদি আল্লাহর সৃষ্টির সামনে মাথা নত করে বা অন্যের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে, তবে আল্লাহর একক রুবূবিয়্যতের হক হরণ করা হয়, যা বিশ্বজগতের সবচেয়ে বড় অন্যায় ও বিশ্বাসঘাতকতা।
৩. শিরকের প্রধান প্রকারভেদ:
১. শিরকে আকবার (بزرگ শিরক): যা মানুষকে সরাসরি ইসলাম থেকে বহিষ্কার করে দেয় এবং চিরস্থায়ী জাহান্নামী করে। যেমন: মূর্তিপূজা করা, আল্লাহ ছাড়া কাউকে গায়েবের মালিক মনে করা।
২. শিরকে আসগার (ছোট শিরক): যা কুফর পর্যন্ত না পৌঁছালেও ঈমানের ভিত্তিকে ধ্বংস করে দেয়। তন্মধ্যে প্রধান হলো ‘রিয়া’ (الرياء) বা লোক দেখানো ইবাদত।
৩. শিরকে খফী (গোপন শিরক): মনের অজান্তে মানুষের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত ভরসা বা কোনো বস্তুর অলৌকিক শক্তিতে বিশ্বাস স্থাপন।
৪. আধুনিক সমাজে প্রচলিত শিরকের বাস্তব রূপসমূহ (مظاهر الشرك):
১. মাজারপূজা ও কবরপূজা: মৃত বুজুর্গ বা পীর-দরবেশের কবরে সিজদা করা, কবরের চতুর্দিকে তাওয়াফ করা এবং মৃত ব্যক্তির নিকট সন্তান, রিজিক বা মুক্তি প্রার্থনা করা।
২. জ্যোতিষশাস্ত্র, ভাগ্য গণনা ও রাশিফলে বিশ্বাস: গণক, হাত গণনাকারী বা পত্রিকার রাশিফল দেখে ভবিষ্যৎ ভাগ্যের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা। হাদিসে একে কুফরি বলা হয়েছে।
৩. তাবিজ-কবজ ও অন্ধ কুসংস্কারে বিশ্বাস: বিপদাপদ দূরীকরণে আল্লাহকে ভুলে কোনো সুতা, আংটি বা জাদুটোনাকে স্বয়ং কার্যকারী মনে করা।
৪. আল্লাহর আইনকে অস্বীকার করে মানব রচিত আইনকে অগ্রাধিকার দেওয়া: পবিত্র কুরআনের হালাল-হারামের বিধানকে অবজ্ঞা করে নিজের খেয়ালখুশিকে সর্বোচ্চ বিধান মনে করা শিরকে হুকুমের অন্তর্ভুক্ত।
৫. শিরকের অনিবার্য পরিণতি:
আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন: إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَاءُ – “নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরিক করার অপরাধ ক্ষমা করেন না; এ ছাড়া অন্য যে কোনো গুনাহ যাকে ইচ্ছা তিনি ক্ষমা করে দেন।” (সূরা আন-নিসা: ৪৮)।
উপসংহার:
শিরকমুক্ত খাঁটি তাওহীদী বিশ্বাসই পরকালে জান্নাত লাভের একমাত্র প্রবেশদ্বার। তাই মুসলিম সমাজকে শিরকের সমস্ত অন্ধকার থেকে মুক্ত করে নির্ভেজাল তাওহীদের আলোয় উদ্ভাসিত করা সময়ের অপরিহার্য দাবি।
৫। بين فرائض الصلاة وواجباتها وسننها مفصلا مدللا.
[সালাতের ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নতসমূহ]
[মান: ২০]
ভূমিকা:
ইসলামি শরিয়তের পাঁচটি মৌলিক স্তম্ভের মধ্যে ঈমানের পরেই সালাতের অবস্থান। সালাত হলো বান্দা ও মহান আল্লাহর মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র স্থাপনের প্রধান মাধ্যম এবং মুমিনের আধ্যাত্মিক মেরুদণ্ড। কিন্তু সালাত কেবলই একটি ব্যক্তিগত ইবাদত নয়; বরং এটি একটি সুশৃঙ্খল, বৈষম্যহীন ও আদর্শ সমাজ বিনির্মাণের এক অতুলনীয় সামাজিক হাতিয়ার।
১. সালাতের আভিধানিক ও পারিভাষিক পরিচয় এবং ফরজ হওয়ার ইতিহাস:
– আভিধানিক অর্থ: ‘সালাত’ (الصلاة) শব্দের অর্থ দোয়া, রহমত, শুভকামনা ও ক্ষমা প্রার্থনা করা।
– পারিভাষিক সংজ্ঞা: তাকবীরে তাহরীমা দিয়ে শুরু হয়ে নির্দিষ্ট রুকন ও শর্তাবলীর সমন্বয়ে গঠিত হয়ে তাসলীম বা সালাম ফিরানোর মাধ্যমে সমাপ্ত হওয়া বিশেষ ইবাদতকে সালাত বলে।
– ফরজ হওয়ার সময়: নবুওয়তের দশম বর্ষে ঐতিহাসিক মিরাজের রজনীতে সিদরাতুল মুনতাহায় আল্লাহ তাআলা উম্মতে মুহাম্মাদীর ওপর সরাসরি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেন।
২. সালাতের সামাজিক গুরুত্ব ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব:
১. সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা: জামাতে সালাত আদায়ের সময় সমাজের ধনী-দরিদ্র, মনিব-ভৃত্য, সাদা-কালো সকল ভেদাভেদ ভুলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একই কাতারে দাঁড়ায়। এতে জাত্যাভিমান চূর্ণ হয়ে যায় এবং সাম্যের অনুপম শিক্ষা বাস্তবায়িত হয়।
২. সময় সচেতনতা ও নিয়মানুবর্তিতা: দৈনিক পাঁচবার নির্দিষ্ট ওয়াক্তে মসজিদে সমবেত হওয়ার মাধ্যমে মুসলিম সমাজ শৃঙ্খলিত ও সময়নিষ্ঠ জাতিতে রূপান্তরিত হয়।
৩. নেতৃত্বের আনুগত্য ও শৃঙ্খলা: জামাতে ইমামের অনুসরণ করার মাধ্যমে মুসলমানরা যোগ্য নেতৃত্বের প্রতি অবিচল আনুগত্য এবং নেতার ভুল হলে কীভাবে আদবের সাথে সংশোধন (লোকমা) করতে হয় তার ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ পায়।
৪. পারস্পরিক সম্প্রীতি ও খোঁজখবর নেওয়া: মহল্লার মসজিদে প্রতিদিন পাঁচবার সাক্ষাতের ফলে প্রতিবেশীদের সুখ-দুঃখ, রোগ-শোক ও আর্থিক সংকটের তাৎক্ষণিক খোঁজ পাওয়া যায় এবং পারস্পরিক সহানুভূতি জাগ্রত হয়।
৫. অশ্লীলতা ও অপরাধমুক্ত সমাজ গঠন: পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন: إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَىٰ عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ – “নিশ্চয় সালাত মানুষকে অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।” (সূরা আল-আনকাবূত: ৪৫)। একজন নামাজী ব্যক্তি কখনো দুর্নীতি, মাদকাসক্তি বা জুলুমে লিপ্ত হতে পারে না।
৩. সালাতের ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নতসমূহের সংক্ষিপ্ত রূপরেখা:
– সালাতের আরকান ও আহকাম (ফরজসমূহ): নামাজের বাইরে ৭টি শর্ত (আহকাম) এবং ভেতরে ৬টি রুকন (আরকান) মোট ১৩টি ফরজ রয়েছে। যেমন: পবিত্রতা, সতর ঢাকা, কেবলামুখী হওয়া, ওয়াক্ত হওয়া, নিয়ত, তাকবীরে তাহরীমা, কিয়াম, কিরাত, রুকু, দুই সিজদা, শেষ বৈঠক ইত্যাদি।
– ওয়াজিবসমূহ: সূরা ফাতিহা পড়া, সূরা মিলানো, রুকু-সিজদার ধারাবাহিকতা রক্ষা, প্রথম বৈঠক, তাশাহহুদ পাঠ, কওমা ও জলসায় সোজা হওয়া, বিতরে দোআয়ে কুনূত পড়া ইত্যাদি।
– সুন্নতসমূহ: সানা পড়া, তাআউয-তাসমিয়া পড়া, রুকু-সিজদার তাসবীহ পড়া, রফউল ইয়াদাইন ইত্যাদি।
উপসংহার:
সালাত হলো সমাজ পরিবর্তনের এক অলৌকিক ঐশী কর্মশালা। একটি সমাজ যদি সালাতের পূর্ণ চেতনা ধারণ করে মসজিদভিত্তিক সমাজব্যবস্থা কায়েম করতে পারে, তবে সে সমাজে অপরাধ ও বৈষম্য চিরতরে বিলুপ্ত হতে বাধ্য।
৬। اوضح قوله تعالى : ‘ان الشرك لظلم عظيم’ بالتفصيل.
[‘নিশ্চয় শিরক চরম জুলুম’-এর ব্যাখ্যা]
[মান: ২০]
ভূমিকা:
ইসলামি আকিদার মূল ভিত্তি হলো তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ববাদ। আর এই তাওহীদের বিপরীত মেরুতে যে মারাত্মক পাপ অবস্থান করছে, তা হলো ‘শিরক’ (الشرك)। ইসলামে শিরক হলো ক্ষমার অযোগ্য সর্ববৃহৎ কবিরা গুনাহ। পবিত্র কুরআনে শিরককে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্যতম জুলুম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
১. শিরকের পরিচয় ও আভিধানিক বিশ্লেষণ:
– আভিধানিক অর্থ: ‘শিরক’ শব্দের অর্থ অংশীদার সাব্যস্ত করা, সমকক্ষ নির্ধারণ করা বা ভাগীদার বানানো।
– পারিভাষিক সংজ্ঞা: মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সত্তা (যাত), গুণাবলী (সিফাত), অধিকার ও ক্ষমতায় অন্য কাউকে অংশীদার বা সমকক্ষ স্থির করার নামই শিরক।
২. “নিশ্চয় শিরক চরম জুলুম” (إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ)-এর তাফসীর:
হযরত লোকমান (আ.) তাঁর পুত্রকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছিলেন: يَا بُنَيَّ لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ ۖ إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ – “হে প্রিয় বৎস! আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করো না; নিশ্চয়ই শিরক হলো চরম মহা জুলুম।” (সূরা লোকমান: ১৩)।
– কেন শিরক মহা জুলুম? ‘জুলুম’ শব্দের অর্থ হলো কোনো বস্তুকে তার নিজস্ব হক বা স্থান ছাড়া অন্য স্থানে রাখা। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করেছেন, মানুষকে জীবন ও রিজিক দিয়েছেন; অথচ সেই বান্দা যদি আল্লাহর সৃষ্টির সামনে মাথা নত করে বা অন্যের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে, তবে আল্লাহর একক রুবূবিয়্যতের হক হরণ করা হয়, যা বিশ্বজগতের সবচেয়ে বড় অন্যায় ও বিশ্বাসঘাতকতা।
৩. শিরকের প্রধান প্রকারভেদ:
১. শিরকে আকবার (بزرگ শিরক): যা মানুষকে সরাসরি ইসলাম থেকে বহিষ্কার করে দেয় এবং চিরস্থায়ী জাহান্নামী করে। যেমন: মূর্তিপূজা করা, আল্লাহ ছাড়া কাউকে গায়েবের মালিক মনে করা।
২. শিরকে আসগার (ছোট শিরক): যা কুফর পর্যন্ত না পৌঁছালেও ঈমানের ভিত্তিকে ধ্বংস করে দেয়। তন্মধ্যে প্রধান হলো ‘রিয়া’ (الرياء) বা লোক দেখানো ইবাদত।
৩. শিরকে খফী (গোপন শিরক): মনের অজান্তে মানুষের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত ভরসা বা কোনো বস্তুর অলৌকিক শক্তিতে বিশ্বাস স্থাপন।
৪. আধুনিক সমাজে প্রচলিত শিরকের বাস্তব রূপসমূহ (مظاهر الشرك):
১. মাজারপূজা ও কবরপূজা: মৃত বুজুর্গ বা পীর-দরবেশের কবরে সিজদা করা, কবরের চতুর্দিকে তাওয়াফ করা এবং মৃত ব্যক্তির নিকট সন্তান, রিজিক বা মুক্তি প্রার্থনা করা।
২. জ্যোতিষশাস্ত্র, ভাগ্য গণনা ও রাশিফলে বিশ্বাস: গণক, হাত গণনাকারী বা পত্রিকার রাশিফল দেখে ভবিষ্যৎ ভাগ্যের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা। হাদিসে একে কুফরি বলা হয়েছে।
৩. তাবিজ-কবজ ও অন্ধ কুসংস্কারে বিশ্বাস: বিপদাপদ দূরীকরণে আল্লাহকে ভুলে কোনো সুতা, আংটি বা জাদুটোনাকে স্বয়ং কার্যকারী মনে করা।
৪. আল্লাহর আইনকে অস্বীকার করে মানব রচিত আইনকে অগ্রাধিকার দেওয়া: পবিত্র কুরআনের হালাল-হারামের বিধানকে অবজ্ঞা করে নিজের খেয়ালখুশিকে সর্বোচ্চ বিধান মনে করা শিরকে হুকুমের অন্তর্ভুক্ত।
৫. শিরকের অনিবার্য পরিণতি:
আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন: إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَاءُ – “নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরিক করার অপরাধ ক্ষমা করেন না; এ ছাড়া অন্য যে কোনো গুনাহ যাকে ইচ্ছা তিনি ক্ষমা করে দেন।” (সূরা আন-নিসা: ৪৮)।
উপসংহার:
শিরকমুক্ত খাঁটি তাওহীদী বিশ্বাসই পরকালে জান্নাত লাভের একমাত্র প্রবেশদ্বার। তাই মুসলিম সমাজকে শিরকের সমস্ত অন্ধকার থেকে মুক্ত করে নির্ভেজাল তাওহীদের আলোয় উদ্ভাসিত করা সময়ের অপরিহার্য দাবি।
৭। تحدث عن منهيات الصائم ومأموراته مفصلا.
[রোজাদারের বর্জনীয় ও করণীয় বিষয়সমূহ]
[মান: ২০]
ভূমিকা:
পবিত্র মাহে রমজানের সিয়াম সাধনা ইসলামি শরিয়তের এক অনন্য আধ্যাত্মিক ও চারিত্রিক বিপ্লবের নাম। সিয়াম কেবল পানাহার বর্জনের আনুষ্ঠানিকতার নাম নয়; বরং এটি আত্মনিয়ন্ত্রণ, তাকওয়া ও সহানুভূতিশীল আদর্শ সমাজ গঠনের এক ঐশী প্রশিক্ষণ কর্মশালা।
১. সাওমের পরিচয়, প্রকারভেদ ও রোজা ভঙ্গের কারণ:
– আভিধানিক অর্থ: ‘সাওম’ (الصوم) শব্দের অর্থ বিরত থাকা (الإمساك)।
– পারিভাষিক সংজ্ঞা: সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিয়তসহকারে সমস্ত প্রকার পানাহার, ধূমপান ও যৌনমিলন থেকে বিরত থাকার নাম সাওম।
– সাওমের প্রকারভেদ: ১. ফরজ (রমজানের রোজা), ২. ওয়াজিব (মান্নত ও কাফফারার রোজা), ৩. সুন্নাত (আশুরা ও আরাফাহর রোজা), ৪. মুস্তাহাব (আইয়ামে বীযের রোজা), ৫. মাকরূহে তাহরীমী (দুই ঈদের দিন ও তাশরীকের দিনগুলোতে রোজা রাখা)।
– মাক্বরূহাত ও মুফসিদাত (ভঙ্গের কারণ): ইচ্ছাকৃত পানাহার বা সহবাস করা, পেটে ঔষধ প্রবেশ করা, জোরপূর্বক খাদ্য গ্রহণ ইত্যাদি রোজা ভঙ্গ করে এবং এতে কাজা ও ক্ষেত্রবিশেষে কাফফারা ওয়াজিব হয়। মিথ্যা, গীবত, পরনিন্দা ও অশ্লীলতা রোজার সওয়াব সম্পূর্ণ নষ্ট করে দেয়।
২. আদর্শ সমাজ গঠনে সাওমের সামাজিক ভূমিকা:
১. ক্ষুধার্ত ও সর্বহারার দুঃখ অনুধাবন: ধনী ব্যক্তিরা সারা বছর প্রাচুর্যের মাঝে বাস করে সাধারণ অনাহারী মানুষের পেটের জ্বালা উপলব্ধি করতে পারে না। কিন্তু দীর্ঘ এক মাস সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত তৃষ্ণার্ত ও ক্ষুধার্ত থেকে ধনীরা দরিদ্রদের দুঃখ বাস্তবভাবে অনুধাবন করতে পারে, যা তাদের মধ্যে দানশীলতা বৃদ্ধি করে।
২. তাকওয়া ও নৈতিক চরিত্র গঠন: আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ – “হে মুমিনগণ! তোমাদের ওপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর; যেন তোমরা তাকওয়া (আল্লাহভীতি) অর্জন করতে পার।” (সূরা আল-বাক্বারাহ: ১৮৩)। ঘরে কেউ না থাকলেও কেবল আল্লাহর ভয়ে রোজাদার পানি পান করে না—এই সার্বক্ষণিক নজরদারির অনুভূতি সমাজে দুর্নীতি ও অপরাধ বন্ধ করে।
৩. সহমর্মিতা ও ইফতারের ভ্রাতৃত্ব: রমজান মাসে একসাথে ইফতার ও সাহরী গ্রহণ ধনী-দরিদ্রের সামাজিক দূরত্ব কমিয়ে ভ্রাতৃত্বের এক অপূর্ব মেলবন্ধন সৃষ্টি করে।
৪. সাদাকাতুল ফিতরের বাধ্যতামূলক বিধান: ঈদের আনন্দের দিনে সমাজের কোনো মানুষ যেন অনাহারে না থাকে, সেজন্য রমজানের শেষে বাধ্যতামূলক ফিতরা দিয়ে অভাবীদের মুখে হাসি ফোটানো হয়।
উপসংহার:
সাওম ব্যক্তি মানুষকে লোভ, হিংসা ও পশুপ্রবৃত্তি থেকে মুক্ত করে একজন আদর্শ নাগরিকে পরিণত করে, যার ওপর ভিত্তি করে একটি শান্তিময়, দুর্নীতিমুক্ত ও তাকওয়াপূর্ণ সমাজ বিনির্মাণ সম্ভব।
৮। ما معنى العقيدة الاسلامية؟ ثم اكتب اصول العقيدة الاسلامية واهميتها مفصلا.
[ইসলামী আকিদা, মূলনীতি ও গুরুত্ব]
[মান: ২০]
ভূমিকা:
ইসলামি জ্ঞানজগতে মানব আত্মার বিশুদ্ধ বিশ্বাস এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দলিলের সমন্বয়ে যে শাস্ত্রগুলো গড়ে উঠেছে, তাদের মধ্যে আকীদাহ (العقيدة), ঈমান (الإيمان) এবং ইলমুল কালাম (علم الكلام) অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। তবে এই তিনটি পরিভাষার উৎপত্তি, ক্ষেত্র এবং শাস্ত্রীয় প্রয়োগের মধ্যে সূক্ষ্ম ও অর্থবহ পার্থক্য বিদ্যমান।
১. আকীদাহর পরিচয় (العقيدة):
– আভিধানিক অর্থ: ‘আক্বদ’ (العَقْد) ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ গিট দেওয়া, শক্তভাবে বাঁধা, দৃঢ় প্রত্যয়।
– পারিভাষিক সংজ্ঞা: যে সকল ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে মানুষের অন্তর এমনভাবে অবিচ্ছেদ্য ও শক্তভাবে জড়িয়ে থাকে যাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ বা সংশয়ের অবকাশ থাকে না, তাকে আকীদাহ বলে। যেমন: আল্লাহর তাওহীদ, ফেরেশতা, কিতাব ও আখেরাতের প্রতি অবিচল প্রত্যয়।
২. ঈমানের পরিচয় (الإيمان):
– আভিধানিক অর্থ: নিরাপত্তা দেওয়া, সত্যায়ন করা ও বিশ্বাস করা।
– পারিভাষিক সংজ্ঞা: জমহুর আহলুস সুন্নাহর মতে: অন্তরে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা, মুখে দ্ব্যর্থহীনভাবে স্বীকার করা এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে তার আমল ও আনুগত্য প্রকাশ করার নামই ঈমান (تصديق بالجنان وإقرار باللسان وعمل بالأركان)। ঈমান হলো আকীদার ব্যবহারিক ও আধ্যাত্মিক জীবন্ত রূপ।
৩. ইলমুল কালামের পরিচয় (علم الكلام):
– সংজ্ঞা: ইসলামি আকিদা ও ধর্মীয় বিশ্বাসসমূহকে যুক্তি, দর্শন ও বুদ্ধিবৃত্তিক অকাট্য দলিলের সাহায্যে প্রমাণ করা এবং নাস্তিক ও পথভ্রষ্ট দার্শনিকদের অপযুক্তি খণ্ডন করার শাস্ত্রকে ইলমুল কালাম বলে। হিজরী দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতকে গ্রিক দর্শনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ইমাম আবুল হাসান আল-আশআরী এবং ইমাম আবু মনসুর আল-মাতুরীদী (র.)-এর নেতৃত্বে এই শাস্ত্র পূর্ণতা লাভ করে।
৪. তিনটি বিষয়ের তুলনামূলক পার্থক্য ছক:
| তুলনার ক্ষেত্র | আকীদাহ (العقيدة) | ঈমান (الإيمان) | ইলমুল কালাম (علم الكلام) |
|---|---|---|---|
| মূল প্রকৃতি | অন্তরের অবিচল ও অনড় বিশ্বাস ও মূলনীতি। | বিশ্বাস, মৌখিক ঘোষণা ও আমলের সমষ্টি। | যুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রমাণের শাস্ত্রীয় রূপ। |
| স্থান ও ক্ষেত্র | কেবল অন্তরের দৃঢ় প্রত্যয়। | অন্তর, জিহ্বা ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সমন্বিত ক্ষেত্র। | মস্তিষ্ক, বিতর্ক ও দার্শনিক যুক্তিতর্ক। |
| শরয়ী প্রয়োজনীয়তা | প্রতিটি মুসলিমের জন্য ব্যক্তিগতভাবে ফরজ। | মুমিন হওয়ার জন্য মৌলিক শর্ত। | উম্মাহর পক্ষ থেকে ফরযে কেফায়া। |
| হ্রাস-বৃদ্ধি | মূল বিশ্বাসে কম-বেশি হয় না (হয় বিশ্বাস আছে, নয় নেই)। | নেক আমল দ্বারা বৃদ্ধি পায় এবং গোনাহে হ্রাস পায়। | যুক্তি ও মেধার শক্তিমত্তার ওপর নির্ভরশীল। |
উপসংহার:
আকীদাহ হলো শিকড়, ঈমান হলো তার জীবন্ত বৃক্ষ ও ফল, আর ইলমুল কালাম হলো সেই বৃক্ষকে বাইরের পোকা-মাকড় ও দার্শনিক আক্রমণ থেকে রক্ষা করার সুরক্ষাব্যবস্থা।
(ব) অংশ – ছোট প্রশ্ন [مجموعة (ب) – الاسئلة القصيرة] (মান: ২০)
[যেকোনো দুটি প্রশ্নের উত্তর দাও: ১০ × ২ = ২০]
৯। اكتب اهمية حب الرسول صلى الله عليه وسلم.
[হুব্বে রাসূলের গুরুত্ব]
[মান: ১০]
ভূমিকা:
ইসলামি আকিদার অন্যতম মৌলিক ও অকাট্য স্তম্ভ হলো ‘আকীদায়ে খতমে নবুওয়ত’ (عقيدة ختم النبوة)। অর্থাৎ হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন আল্লাহ তাআলার প্রেরিত সর্বকালের সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসূল। তাঁর আগমনের পর নবুওয়ত ও রিসালাতের সুবিশাল প্রাসাদ পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করেছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত আর কোনো নতুন নবীর আগমন ঘটবে না। এটি অস্বীকারকারী ব্যক্তি কাফির ও মুরতাদ।
১. খতমে নবুওয়তের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ:
– আভিধানিক অর্থ: ‘খাতাম’ (خاتم) শব্দের অর্থ সিলমোহর, সমাপ্তি, শেষ সীমানা বা অবসান।
– পারিভাষিক সংজ্ঞা: হযরত আদম (আ.) থেকে শুরু হওয়া নবুওয়তের ধারাবাহিকতা মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমেই চিরতরে সমাপ্ত হয়েছে এবং তিনি সর্বশেষ নবী—এই বিশ্বাসকে খতমে নবুওয়ত বলা হয়।
২. পবিত্র কুরআনের অকাট্য দলিলসমূহ:
১. সূরা আল-আহযাবের ৪০ নম্বর আয়াত: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন:
مَّا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِّن رِّجَالِكُمْ وَلَٰكِن رَّسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ ۗ وَكَانَ اللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا
“মুহাম্মদ তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসূল এবং সর্বশেষ নবী (খাতামান নাবিয়্যীন)। আর আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ।”
– আরবি ভাষা ও ব্যাকরণের সুস্পষ্ট নীতি অনুযায়ী ‘খাতামুন নাবিয়্যীন’ মানে নবীদের সমাপ্তকারী। যদি নবীদের সমাপ্তি ঘটে, তবে স্বাভাবিকভাবেই রাসূলগণেরও সমাপ্তি ঘটে।
২. আল্লাহ বলেন: وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا كَافَّةً لِّلنَّاسِ بَشِيرًا وَنَذِيرًا – “আমি আপনাকে সমগ্র মানবজাতির জন্য সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি।” (সূরা সাবা: ২৮)।
৩. সহীহ হাদিস শরীফের সুদৃঢ় ঘোষণাবলী:
১. সুনির্দিষ্ট ঘোষণা: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
أَنَا خَاتَمُ النَّبِيِّينَ لا نَبِيَّ بَعْدِي
“আমিই সর্বশেষ নবী, আমার পরে আর কোনো নবী আসবে না।” (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, তিরমিযী)।
২. নবুওয়তের প্রাসাদের রূপক দৃষ্টান্ত: নবীজী (সা.) বলেছেন: “আমার ও পূর্ববর্তী নবীদের উপমা হলো এমন এক সুদৃশ্য প্রাসাদের মতো, যা অত্যন্ত সুন্দর করে তৈরি করা হয়েছে, কেবল একটি ইটের স্থান ছাড়া। মানুষ তা দেখে মুগ্ধ হয়ে বলত: এই ইটটি বসানো হলো না কেন? আমিই হলাম সেই চূড়ান্ত ইট এবং আমিই খাতামুন নাবিয়্যীন।” (সহীহ বুখারী)।
৩. মিথ্যুকদের সম্পর্কে ভবিষ্যৎবাণী: নবীজী (সা.) সতর্ক করে বলেছেন: “আমার উম্মতের মধ্যে ত্রিশজন চরম মিথ্যাবাদী (দাজ্জাল) জন্ম নেবে, যাদের প্রত্যেকেই নিজেকে নবী দাবি করবে; অথচ আমিই শেষ নবী, আমার পরে কোনো নবী নেই।” (আবু দাউদ, তিরমিযী)।
৪. সাহাবায়ে কেরামের ঐতিহাসিক ইজমা:
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পরপরই মুসায়লামা কাযযাব নিজেকে নবী দাবি করলে প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর (রা.) ও সমস্ত সাহাবী ঐক্যবদ্ধ হয়ে তার বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক ইয়ামামার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ পরিচালনা করেন এবং মিথ্যা নবুওয়তের দাবিদারকে নির্মূল করেন। এই সর্বসম্মত ইজমা কিয়ামত পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।
উপসংহার:
খতমে নবুওয়তে বিশ্বাস ইসলামি ঈমানের প্রবেশদ্বার। ক্বলব বা মনগড়া কোনো ব্যাখ্যা দিয়ে শেষ নবীর পর নতুন কোনো প্রকারের নবুওয়তের দাবি করা বা এমন দাবিদারকে মান্য করা প্রকাশ্য কুফরি ও ইসলামদ্রোহিতা।
১০। عرف الايمان، والكفر، والفسق والنفاق.
[ঈমান, কুফর, ফিসক ও নিফাকের সংজ্ঞা]
[মান: ১০]
ভূমিকা:
ইসলামি জ্ঞানজগতে মানব আত্মার বিশুদ্ধ বিশ্বাস এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দলিলের সমন্বয়ে যে শাস্ত্রগুলো গড়ে উঠেছে, তাদের মধ্যে আকীদাহ (العقيدة), ঈমান (الإيمان) এবং ইলমুল কালাম (علم الكلام) অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। তবে এই তিনটি পরিভাষার উৎপত্তি, ক্ষেত্র এবং শাস্ত্রীয় প্রয়োগের মধ্যে সূক্ষ্ম ও অর্থবহ পার্থক্য বিদ্যমান।
১. আকীদাহর পরিচয় (العقيدة):
– আভিধানিক অর্থ: ‘আক্বদ’ (العَقْد) ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ গিট দেওয়া, শক্তভাবে বাঁধা, দৃঢ় প্রত্যয়।
– পারিভাষিক সংজ্ঞা: যে সকল ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে মানুষের অন্তর এমনভাবে অবিচ্ছেদ্য ও শক্তভাবে জড়িয়ে থাকে যাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ বা সংশয়ের অবকাশ থাকে না, তাকে আকীদাহ বলে। যেমন: আল্লাহর তাওহীদ, ফেরেশতা, কিতাব ও আখেরাতের প্রতি অবিচল প্রত্যয়।
২. ঈমানের পরিচয় (الإيمان):
– আভিধানিক অর্থ: নিরাপত্তা দেওয়া, সত্যায়ন করা ও বিশ্বাস করা।
– পারিভাষিক সংজ্ঞা: জমহুর আহলুস সুন্নাহর মতে: অন্তরে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা, মুখে দ্ব্যর্থহীনভাবে স্বীকার করা এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে তার আমল ও আনুগত্য প্রকাশ করার নামই ঈমান (تصديق بالجنان وإقرار باللسان وعمل بالأركان)। ঈমান হলো আকীদার ব্যবহারিক ও আধ্যাত্মিক জীবন্ত রূপ।
৩. ইলমুল কালামের পরিচয় (علم الكلام):
– সংজ্ঞা: ইসলামি আকিদা ও ধর্মীয় বিশ্বাসসমূহকে যুক্তি, দর্শন ও বুদ্ধিবৃত্তিক অকাট্য দলিলের সাহায্যে প্রমাণ করা এবং নাস্তিক ও পথভ্রষ্ট দার্শনিকদের অপযুক্তি খণ্ডন করার শাস্ত্রকে ইলমুল কালাম বলে। হিজরী দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতকে গ্রিক দর্শনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ইমাম আবুল হাসান আল-আশআরী এবং ইমাম আবু মনসুর আল-মাতুরীদী (র.)-এর নেতৃত্বে এই শাস্ত্র পূর্ণতা লাভ করে।
৪. তিনটি বিষয়ের তুলনামূলক পার্থক্য ছক:
| তুলনার ক্ষেত্র | আকীদাহ (العقيدة) | ঈমান (الإيمان) | ইলমুল কালাম (علم الكلام) |
|---|---|---|---|
| মূল প্রকৃতি | অন্তরের অবিচল ও অনড় বিশ্বাস ও মূলনীতি। | বিশ্বাস, মৌখিক ঘোষণা ও আমলের সমষ্টি। | যুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রমাণের শাস্ত্রীয় রূপ। |
| স্থান ও ক্ষেত্র | কেবল অন্তরের দৃঢ় প্রত্যয়। | অন্তর, জিহ্বা ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সমন্বিত ক্ষেত্র। | মস্তিষ্ক, বিতর্ক ও দার্শনিক যুক্তিতর্ক। |
| শরয়ী প্রয়োজনীয়তা | প্রতিটি মুসলিমের জন্য ব্যক্তিগতভাবে ফরজ। | মুমিন হওয়ার জন্য মৌলিক শর্ত। | উম্মাহর পক্ষ থেকে ফরযে কেফায়া। |
| হ্রাস-বৃদ্ধি | মূল বিশ্বাসে কম-বেশি হয় না (হয় বিশ্বাস আছে, নয় নেই)। | নেক আমল দ্বারা বৃদ্ধি পায় এবং গোনাহে হ্রাস পায়। | যুক্তি ও মেধার শক্তিমত্তার ওপর নির্ভরশীল। |
উপসংহার:
আকীদাহ হলো শিকড়, ঈমান হলো তার জীবন্ত বৃক্ষ ও ফল, আর ইলমুল কালাম হলো সেই বৃক্ষকে বাইরের পোকা-মাকড় ও দার্শনিক আক্রমণ থেকে রক্ষা করার সুরক্ষাব্যবস্থা।
১১। قارن بين الاقتصاد الاسلامى والاقتصاد الوضعى.
[ইসলামী ও প্রচলিত অর্থনীতির তুলনা]
[মান: ১০]
ভূমিকা:
একবিংশ শতাব্দীর বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি চরম অনিশ্চয়তা, মুদ্রাস্ফীতি, বিপুল ঋণের বোঝা এবং ধনী-দরিদ্রের নজিরবিহীন বৈষম্যের মুখোমুখি। প্রচলিত পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার অবাধ মুনাফালোভ এবং সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার ব্যর্থতা বিশ্বমানবতাকে এক গভীর অর্থনৈতিক অন্ধগলিতে ঠেলে দিয়েছে। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ইসলামি অর্থনীতি একটি নৈতিক, ইনসাফভিত্তিক ও উৎপাদনমুখী স্থায়ী বিকল্প হিসেবে বিশ্ববাসীর সামনে প্রতিভাত হচ্ছে।
১. বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের মূল কারণসমূহ:
১. সুদভিত্তিক ঋণ ব্যবস্থা (Riba-based financial system)
২. শেয়ার বাজারে ফটকাবাজি, জুয়া ও অনিয়ন্ত্রিত ডেরিভেটিভস ব্যবসা (Gharar and Maysir)
৩. কৃত্রিম মুদ্রাস্ফীতি ও ফিয়াট কারেন্সির অবমূল্যায়ন
৪. কর্পোরেট সিন্ডিকেট ও সম্পদের অতিমাত্রায় কেন্দ্রীভবন।
২. সংকট নিরসনে ইসলামি অর্থনীতির মৌলিক সমাধানসমূহ:
১. সুদ ও শোষণের চূড়ান্ত বিলোপ: ইসলাম সমস্ত প্রকার সুদকে কঠোরভাবে হারাম ঘোষণা করেছে। আল্লাহ বলেন: وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا – “আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।” (সূরা আল-বাক্বারাহ: ২৭৫)। সুদমুক্ত অর্থনীতিতে উদ্যোক্তারা ঋণের ফাঁদে পড়ে দেউলিয়া হয় না।
২. লাভ-লোকসান অংশীদারিত্ব ব্যবস্থা (মুশারাকা ও মুদারাবা): ইসলামি ব্যাংকিংয়ের মূল ভিত্তি হলো প্রকৃত উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ এবং লাভ ও লোকসানের সুষম বণ্টন। এর ফলে বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তার মাঝে অংশীদারিত্ব তৈরি হয় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাস্তব সম্পদের ওপর গড়ে ওঠে।
৩. ফটকাবাজি ও জুয়ামুক্ত প্রকৃত সম্পদভিত্তিক অর্থনীতি (Asset-backed Economy): ইসলাম এমন কোনো কাল্পনিক চুক্তির অনুমোদন দেয় না যাতে পণ্যের প্রকৃত অস্তিত্ব নেই। পণ্য হস্তান্তর ও ঝুঁকির সমন্বয়ে বাস্তব ব্যবসা পরিচালিত হওয়ায় অর্থনৈতিক বুদবুদ (Bubble) তৈরি হতে পারে না।
৪. যাকাত ও সাদাকাহর মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা: ধনীদের উদ্বৃত্ত সম্পদ বাধ্যতামূলকভাবে সমাজের অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর মাঝে হস্তান্তরিত হওয়ায় সার্বিক অভ্যন্তরীণ ভোগ ও চাহিদা সচল থাকে।
উপসংহার:
২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা এবং পরবর্তী মহামারীকালীন পরিস্থিতিতেও বিশ্বের ইসলামি ব্যাংকগুলো তাদের স্থিতিশীলতা প্রমাণ করেছে। বিশ্ব নেতৃবৃন্দ যদি প্রচলিত সুদী ব্যবস্থা ত্যাগ করে ইসলামের এই ইনসাফভিত্তিক অর্থনৈতিক মডেল গ্রহণ করে, তবেই পৃথিবী একটি স্থায়ী ও ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক মুক্তি লাভ করতে পারে।
১২। بين دور الزكوة فى محو الفقر بالايجاز.
[দারিদ্র্য বিমোচনে যাকাতের ভূমিকা]
[মান: ১০]
ভূমিকা:
ইসলাম কেবল একটি আধ্যাত্মিক ধর্ম নয়, বরং এটি একটি শোষণমুক্ত ও ইনসাফভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রবক্তা। ইসলামি অর্থনীতির কেন্দ্রীয় চালিকাশক্তি হলো ‘যাকাত’ (الزكاة)। পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় যেখানে ধনীরা ক্রমাগত ধনী এবং দরিদ্ররা আরও দরিদ্র হতে থাকে, সেখানে ইসলাম সম্পদের সুষম বণ্টন এবং দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য যাকাতকে ধনীদের ওপর একটি অলঙ্ঘনীয় ফরজিয়ত হিসেবে নির্ধারণ করেছে।
১. যাকাতের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ:
– আভিধানিক অর্থ: ‘যাকাত’ শব্দের অর্থ পবিত্রতা, পরিচ্ছন্নতা, বৃদ্ধি পাওয়া এবং প্রবৃদ্ধি। যাকাত দেওয়ার মাধ্যমে মাল পবিত্র হয় এবং দাতার আত্মায় বরকত বৃদ্ধি পায়।
– পারিভাষিক সংজ্ঞা: কোনো স্বাধীন মুসলিমের মালিকানায় নেসাব পরিমাণ সম্পদ পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হলে, তার নির্দিষ্ট অংশ (সাধারণত ২.৫%) আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট আটটি খাতের হকদারদের মালিকানায় হস্তান্তর করে দেওয়ার নামই যাকাত।
২. কুরআনে বর্ণিত যাকাতের আটটি সুনির্দিষ্ট খাত (مصارف الزكاة):
সূরা আত-তাওবার ৬০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা যাকাতের ব্যয়ের আটটি খাত নির্ধারণ করেছেন:
إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ
১. ফকির (الفقراء): যার অত্যন্ত সামান্য সম্পদ আছে কিন্তু নেসাব পরিমাণ নেই।
২. মিসকীন (المساكين): যার কোনো সম্পদ নেই, সম্পূর্ণ নিঃস্ব ও পরনির্ভরশীল।
৩. যাকাত ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত কর্মকর্তা (العاملين عليها): রাষ্ট্রীয়ভাবে যাকাত সংগ্রহ ও বণ্টনে দায়িত্বরত ব্যক্তিবর্গ।
৪. মুয়াল্লাফাতুল কুলূব (المؤلفة قلوبهم): ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য নওমুসলিম বা সহায়তাপ্রার্থী।
৫. দাসমুক্তি (في الرقاب): বন্দি বা দাসত্ব শৃঙ্খলে আবদ্ধ ব্যক্তির মুক্তির জন্য।
৬. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি (الغارمين): যে ঋণ পরিশোধে সম্পূর্ণ অক্ষম।
৭. আল্লাহর পথে (في سبيل الله): দ্বীন প্রতিষ্ঠা, জিহাদ ও ইসলামি ইলম অর্জনের জন্য।
৮. মুসাফির (ابن السبيل): সফরে বিপদগ্রস্ত ও অর্থশূন্য হয়ে পড়া পর্যটক।
৩. দারিদ্র্য বিমোচনে যাকাতের বৈপ্লবিক ভূমিকা (دور الزكاة في محو الفقر):
১. সম্পদের কেন্দ্রীভবন রোধ: কুরআনের মূলনীতি হলো: كَيْ لَا يَكُونَ دُولَةً بَيْنَ الْأَغْنِيَاءِ مِنكُمْ – “যাতে সম্পদ কেবল তোমাদের ধনীদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়।” (সূরা আল-হাশর: ৭)। যাকাত ধনীদের সম্পদকে সমাজের প্রান্তিক স্তরে পুনর্বণ্টন করে।
২. ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি: দরিদ্র জনগোষ্ঠীর হাতে যাকাতের অর্থ পৌঁছালে অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পায়, যা শিল্পায়ন ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে।
৩. স্থায়ী পুনর্বাসন ও স্বাবলম্বীকরণ: যাকাত কেবল সাময়িক দান নয়; ইসলামের উদ্দেশ্য হলো একজন দরিদ্র ব্যক্তিকে এমন পরিমাণ পুঁজি বা কর্মসংস্থানের সরঞ্জাম (রিকশা, সেলাই মেশিন বা ক্ষুদ্র ব্যবসা) প্রদান করা, যাতে সে পরবর্তী বছরে স্বয়ং যাকাতদাতার কাতারে উন্নীত হতে পারে।
৪. সামাজিক অপরাধ দমন: সমাজে ক্ষুধা ও চরম দারিদ্র্য মানুষকে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি ও হতাশায় ঠেলে দেয়। হাদিসে এসেছে: “দারিদ্র্য কখনো কখনো কুফরির নিকটবর্তী করে দেয়।” যাকাত এই সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা দূর করে শান্তি স্থাপন করে।
৫. ঐতিহাসিক নজির: খলিফা হযরত উমর ইবনে আবদুল আযীয (র.)-এর খেলাফতকালে যাকাত ব্যবস্থার নিখুঁত বাস্তবায়নের ফলে সমগ্র মুসলিম সাম্রাজ্যে যাকাত নেওয়ার মতো একজন অভাবী মানুষও খুঁজে পাওয়া যেত না।
উপসংহার:
বাংলাদেশে যদি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শতভাগ স্বচ্ছতার সাথে জাতীয় পর্যায়ে যাকাত আদায় ও সুষ্ঠু বণ্টন করা যায়, তবে আগামী এক দশকের মধ্যে দেশ থেকে চরম দারিদ্র্য চিরতরে নির্মূল করা সম্ভব।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
ফাযিল ৩য় বর্ষ ইসলামিক স্টাডিজ ৩য় পত্রের সিলেবাসের মূল বিষয় কী?
ইসলামিক স্টাডিজ ৩য় পত্রের (বিষয় কোড: ৪১৮) মূল সিলেবাস আল-ফিকহ, আল-আকাইদ ও দাওয়াহর ওপর ভিত্তি করে রচিত। এতে তাওহীদ, রিসালাত, খতমে নবুওয়ত, ইসমাতুল আম্বিয়া, সালাত, সাওম, যাকাতের ফিকহী বিধিবিধান এবং ইসলামি সমাজ ও অর্থনীতির সংস্কারমূলক ভূমিকা অন্তর্ভুক্ত।
ফাযিল পরীক্ষায় ২০ নম্বরের প্রশ্নের আদর্শ উত্তরের পরিধি কতটুকু হওয়া উচিত?
ডিগ্রি ও অনার্স মানবণ্টন অনুযায়ী প্রতিটি ২০ নম্বরের প্রশ্নের জন্য ভূমিকা, শাব্দিক ও পারিভাষিক বিশ্লেষণ, কুরআন-সুন্নাহর আরবি ইবারত ও অর্থ, ৫-৮টি সুনির্দিষ্ট অ্যাকাডেমিক পয়েন্ট, আধুনিক প্রেক্ষাপটের মূল্যায়ন এবং উপসংহার আবশ্যক। নূন্যতম ৩৫০ থেকে ৫০০+ শব্দে উত্তর লেখা কাম্য।
পবিত্র কুরআনের কোন আয়াতে ইসলামকে পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে?
সূরা আল-মায়িদাহর ৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন: ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের ওপর আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।’
খতমে নবুওয়তের অকাট্য দলিলের ভিত্তি কী?
পবিত্র কুরআনের সূরা আল-আহযাবের ৪০ নম্বর আয়াতে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে ‘খাতামান নাবিয়্যীন’ বা শেষ নবী ঘোষণা করা হয়েছে এবং সহীহ বুখারী ও মুসলিমের অসংখ্য মুতাওয়াতির হাদিসে নবীজী (সা.) দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছেন: ‘আমিই শেষ নবী, আমার পরে আর কোনো নবী আসবে না।’
পবিত্র কুরআনে যাকাত ব্যয়ের কয়টি খাত নির্ধারণ করা হয়েছে?
সূরা আত-তাওবার ৬০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ তাআলা সুনির্দিষ্টভাবে যাকাত ব্যয়ের আটটি খাত (মাসারিফ) নির্ধারণ করেছেন, যার মধ্যে ফকির, মিসকীন, ঋণগ্রস্ত ও দাসমুক্তি অন্যতম।
জাহেলী যুগে কন্যা শিশু হত্যা বন্ধে ইসলামের পদক্ষেপ কী ছিল?
ইসলাম পবিত্র কুরআনে জীবন্ত কন্যা শিশু হত্যার কঠোর জবাবদিহিতা ও শাস্তি ঘোষণা করেছে এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) কন্যা সন্তানকে স্নেহে প্রতিপালনকারী পিতার জন্য জান্নাতের সুসংবাদ দিয়ে নারীর সম্ভ্রম ও জীবনের চূড়ান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন।

