জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাস (History of British India: 1858-1947) – 205805, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি – ফাজিল অনার্স ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা ২০২২

Abswer.com Abswer.com
20 September, 2026
১২৬ মিনিট পড়ার সময়
১৩ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

পরীক্ষা কোড: ২০৮ | প্রশ্নপত্র কোড: ১৫১
ফাজিল (স্নাতক) সম্মান চতুর্থ বর্ষ পরীক্ষা, ২০২২
বিভাগ: ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
বিষয়: ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাস (১৮৫৮-১৯৪৭ খ্রি.) (পঞ্চম পত্র)
[History of British India: 1858-1947 (Paper V)]
বিষয় কোড: ২০৫৮০৫
সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০


ক বিভাগ (রচনামূলক প্রশ্ন)

[যে কোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও। প্রতিটি প্রশ্নের মান ১৫: ১৫ × ৪ = ৬০]

১. ১৮৫৮ সালে ভারতের ইতিহাসে কী পরিবর্তন ঘটেছিল? পূর্ব অবস্থার সাথে এর পার্থক্য নির্দেশ কর।

[English: What changes happened in the history of India in 1858? Point out its difference from the pre-condition.]

ভূমিকা

১৮৫৮ সাল ভারতীয় উপমহাদেশের সাংবিধানিক, রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী সন্ধিক্ষণ। ১৮৫৭ সালের ঐতিহাসিক মহাবিদ্রোহ বা সিপাহী বিপ্লবের প্রত্যক্ষ পরিণতি হিসেবে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ২ আগস্ট ১৮৫৮ সালে পাস হয় “অ্যাক্ট ফর দ্য বেটার গভর্নমেন্ট অব ইন্ডিয়া” (Act for the Better Government of India 1858) বা ভারত শাসন আইন ১৮৫৮। একই বছরের ১ নভেম্বর ভারতের এলাহাবাদে এক আড়ম্বরপূর্ণ দরবারে লর্ড ক্যানিং পাঠ করেন মহারানী ভিক্টোরিয়ার ঐতিহাসিক রাজকীয় ঘোষণা। এই আইনের মাধ্যমে দীর্ঘ আড়াই শতাব্দীর ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔপনিবেশিক বাণিজ্যিক শাসনের অবসান ঘটে এবং ভারতের শাসনভার সরাসরি ব্রিটিশ রাজমুকুটের (British Crown) অধীনে ন্যস্ত হয়।

১৮৫৮ সালে সংঘটিত প্রধান ঐতিহাসিক পরিবর্তনসমূহ

  • কোম্পানির শাসনের অবসান ও ব্রিটিশ রাজের প্রত্যক্ষ কর্তৃত্ব: ১৬০০ সালে প্রতিষ্ঠিত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির যাবতীয় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা বিলুপ্ত করা হয়। ভারতের শাসনভার ব্রিটিশ সম্রাজ্ঞী রানী ভিক্টোরিয়ার হাতে হস্তান্তরিত হয় এবং ভারত সরাসরি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অংশ হিসেবে ঘোষিত হয়।
  • দ্বৈত শাসন ব্যবস্থার বিলোপ ও ভারত সচিবের পদ সৃষ্টি: পিটের ভারত শাসন আইন (১৭৮৪) দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ‘বোর্ড অব কন্ট্রোল’ (Board of Control) এবং কোম্পানির ‘কোর্ট অব ডিরেক্টরস’ (Court of Directors) বিলুপ্ত করা হয়। তাদের সমুদয় ক্ষমতা ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার একজন দায়িত্বশীল সদস্য ‘ভারত সচিব’ (Secretary of State for India)-এর হাতে অর্পিত হয়। তাঁর সহায়তা ও পরামর্শের জন্য ১৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি উপদেষ্টা পরিষদ বা ‘কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া’ (Council of India) গঠন করা হয়।
  • ভাইসরয় পদের প্রবর্তন: ভারতের গভর্নর জেনারেলকে ব্রিটিশ রাজমুকুটের ব্যক্তিগত প্রতিনিধি হিসেবে ‘ভাইসরয়’ (Viceroy) উপাধিতে ভূষিত করা হয়। লর্ড ক্যানিং ছিলেন ভারতের শেষ গভর্নর জেনারেল এবং প্রথম ভাইসরয়।
  • দেশীয় রাজ্যসমূহের প্রতি নীতির পরিবর্তন: লর্ড ডালহৌসির কুখ্যাত ‘স্বত্ববিলোপ নীতি’ (Doctrine of Lapse) চিরতরে বাতিল ঘোষণা করা হয়। দেশীয় রাজন্যবর্গকে আশ্বস্ত করা হয় যে ব্রিটিশ সরকার আর কোনো রাজ্য দখল বা অধিগ্রহণ করবে না এবং ভারতীয় রাজারা তাঁদের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হিসেবে দত্তকপুত্র গ্রহণের পূর্ণ অধিকার পাবেন।
  • ধর্মীয় ও সামাজিক নিরপেক্ষতার অঙ্গীকার: ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ধর্মনাশের আশঙ্কা। তাই ১৮৫৮ সালের ঘোষণায় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় যে, ব্রিটিশ সরকার ভারতীয়দের প্রাচীন ধর্মবিশ্বাস, রীতিনীতি ও সামাজিক ঐতিহ্যে কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ করবে না এবং সকল ধর্মের প্রজাদের সমান দৃষ্টিতে দেখবে।
  • সরকারি চাকরিতে ভারতীয়দের মেধাভিত্তিক নিয়োগের আশ্বাস: জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে সকল ভারতীয়কে উপযুক্ত সরকারি চাকরিতে নিয়োগের উদার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়।
  • সামরিক বাহিনীর ব্যাপক পুনর্গঠন: পিল কমিশনের (Peel Commission) সুপারিশ অনুযায়ী ব্রিটিশরা সেনাবাহিনীতে চরম সতর্কতামূলক নীতি গ্রহণ করে। গোলন্দাজ বাহিনী ও ভারী যুদ্ধাস্ত্র সম্পূর্ণভাবে ইউরোপীয় সেনাদের নিয়ন্ত্রণে রাখা হয় এবং ইউরোপীয় ও ভারতীয় সেনাদের অনুপাত কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিতে এ অনুপাত নির্ধারিত হয় ১:২ এবং বোম্বে ও মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিতে ১:৩। এছাড়া জাতিগত ও আঞ্চলিক বিভাজনের ভিত্তিতে সৈন্যদল গঠন শুরু হয়।

পূর্ব অবস্থা (কোম্পানি আমল) বনাম ১৮৫৮ পরবর্তী অবস্থা (ব্রিটিশ রাজ আমল)-এর তুলনামূলক পার্থক্য

  • সার্বভৌম ক্ষমতার উৎস: ১৮৫৮ সালের পূর্বে ভারত শাসনের প্রকৃত কর্তৃত্ব ছিল একটি মুনাফালোভী যৌথ মূলধনি বাণিজ্যিক কোম্পানির (ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি) হাতে, যার মূল লক্ষ্য ছিল লাভজনক বাণিজ্য ও রাজস্ব আদায়। ১৮৫৮ সালের পর শাসনক্ষমতা চলে যায় ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এবং গণতান্ত্রিক সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের প্রত্যক্ষ তদারকিতে।
  • প্রশাসনিক কাঠামোর প্রকৃতি: কোম্পানি আমলে লন্ডনে কোর্ট অব ডিরেক্টরস ও বোর্ড অব কন্ট্রোলের জটিল দ্বৈত শাসন বিদ্যমান ছিল, যার ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা ও সমন্বয়হীনতা দেখা দিত। ১৮৫৮ সালের পর এককভাবে ‘সেক্রেটারি অব স্টেট ফর ইন্ডিয়া’ এবং ভারতীয় কাউন্সিলে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়, যা ব্রিটিশ পার্লামেন্টের কাছে সরাসরি জবাবদিহি করত।
  • আগ্রাসী ভূখণ্ড বিস্তার বনাম স্থিতাবস্থা রক্ষা: ১৮৫৮ সালের পূর্বে ব্রিটিশ কোম্পানির নীতি ছিল আগ্রাসী সাম্রাজ্য বিস্তার ও ভারতীয় রাজন্যবর্গের রাজ্য গ্রাস (যেমন ডালহৌসির অযোধ্যা, ঝাঁসি, নাগপুর দখল)। কিন্তু ১৮৫৮ সালের পর প্রত্যক্ষ ভূখণ্ড বিস্তার বন্ধ করে দেশীয় রাজ্যগুলোকে ব্রিটিশ শাসনের স্থায়ী মিত্র ও ‘ব্রেকওয়াটার’ (সামাজিক রক্ষাকবচ) হিসেবে টিকিয়ে রাখার নীতি গ্রহণ করা হয়।
  • সামরিক প্রতিরক্ষা কৌশল: কোম্পানি আমলে বিপুলসংখ্যক ভারতীয় সৈন্যের ওপর ভিত্তি করে সাম্রাজ্য রক্ষা করা হতো, যেখানে ইউরোপীয়দের সংখ্যা ছিল নগণ্য (প্রায় ১:৫)। ১৮৫৮ সালের পর সেনাবাহিনীর ভারসাম্য আমূল বদলে ফেলা হয় এবং কাউন্টারপয়জ বা বিভাজন নীতির মাধ্যমে ভারতীয় রেজিমেন্টগুলোকে সম্প্রদায়ভিত্তিক আলাদা রাখা হয় যাতে তারা ঐক্যবদ্ধ হতে না পারে।
  • অর্থনৈতিক শোষণের রূপান্তর: কোম্পানি আমলে লুণ্ঠন ও প্রত্যক্ষ বাণিজ্যিক একচেটিয়া আধিপত্যের মাধ্যমে অর্থ ইংল্যান্ডে পাচার করা হতো। কিন্তু ১৮৫৮ সালের পর শোষণটি আরও সূক্ষ্ম ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়; যেমন রেলওয়ে অবকাঠামোতে ব্রিটিশ পুঁজির নিশ্চিত মুনাফাভিত্তিক বিনিয়োগ (Guaranteed Interest System), বিপুল প্রশাসনিক ব্যয় (হোম চার্জেস) এবং ‘ড্রেন অব ওয়েলথ’ বা সম্পদ নির্গমন।

উপসংহার

১৮৫৮ সালের পরিবর্তন ভারতীয় উপমহাদেশকে মধ্যযুগীয় বাণিজ্য কোম্পানির অদূরদর্শী করগ্রাসী শাসন থেকে মুক্ত করে একটি আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রকাঠামো উপহার দিয়েছিল। যদিও মহারানীর রাজকীয় ঘোষণার অধিকাংশ প্রতিশ্রুতি (বিশেষত সরকারি চাকরিতে সমঅধিকার ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা) ফাঁকা বুলিতে পর্যবসিত হয়েছিল, তবুও এটি ভারতীয়দের মধ্যে সাংবিধানিক সচেতনতা ও পরবর্তীতে সংগঠিত জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক আন্দোলনের পটভূমি তৈরি করেছিল।


২. নিখিল ভারত কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পটভূমি পর্যালোচনা কর। এর প্রতি মুসলমানদের মনোভাব কী ছিল?

[English: Review the background of the establishing of the Indian National Congress. What was the attitude of the Muslims towards it?]

ভূমিকা

১৮৮৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর বোম্বাইয়ের (বর্তমান মুম্বাই) গোকুলদাস তেজপাল সংস্কৃত কলেজে অবসরপ্রাপ্ত ব্রিটিশ আইসিএস কর্মকর্তা অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউম (A. O. Hume)-এর সক্রিয় উদ্যোগে এবং বিশিষ্ট বাঙালি ব্যারিস্টার উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভাপতিত্বে নিখিল ভারত কংগ্রেস (Indian National Congress) প্রতিষ্ঠিত হয়। ৭২ জন প্রতিনিধির উপস্থিতিতে শুরু হওয়া এই সংগঠনটি পরবর্তীকালে ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রধান রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়।

কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক পটভূমি

  • পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার ও শিক্ষিত মধ্যবিত্তের বিকাশ: উনিশ শতকে ইংরেজি শিক্ষার বিস্তার ও কলকাতা, বোম্বে ও মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার ফলে ভারতে এক আধুনিকমনস্ক আইনজীবী, সাংবাদিক, শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণির উদ্ভব ঘটে। তাঁরা ব্রিটিশ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, বাকস্বাধীনতা ও সংসদীয় পদ্ধতির সাথে পরিচিত হয়ে একটি সর্বভারতীয় প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজনীয়তা গভীরভাবে অনুভব করেন।
  • আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠনসমূহের সীমাবদ্ধতা: কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পূর্বে ভারতে বেশ কয়েকটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক সমিতি গড়ে উঠেছিল; যেমন ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন (১৮৫১), পুনা সার্বজনিক সভা (১৮৭০), ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন বা ভারত সভা (১৮৭৬), মাদ্রাজ মহাজন সভা (১৮৮৪) এবং বোম্বে প্রেসিডেন্সি অ্যাসোসিয়েশন (১৮৮৫)। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ১৮৮৩ ও ১৮৮৫ সালে কলকাতায় দুটি সফল ‘ন্যাশনাল কনফারেন্স’ বা জাতীয় সম্মেলন আহ্বান করেছিলেন। এসব আঞ্চলিক উদ্যোগ সর্বভারতীয় ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক ঐক্যের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে।
  • লর্ড লিটনের প্রতিক্রিয়াশীল ও দমনমূলক শাসন (১৮৭৬-১৮৮০): ভাইসরয় লর্ড লিটনের জনবিরোধী নীতি ভারতীয় শিক্ষিত সমাজকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। ১৮৭৬-৭৮ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময় বিপুল অর্থ ব্যয়ে দিল্লির রাজকীয় দরবার আয়োজন, ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইন (ভারতীয়দের অস্ত্র রাখা নিষিদ্ধ), ভারতীয় সংবাদপত্র দমন আইন (Vernacular Press Act 1878) এবং আইসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ২১ থেকে কমিয়ে ১৯ বছরে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত ভারতীয়দের মধ্যে তীব্র সরকারবিরোধী ক্ষোভ জন্মায়।
  • ইলবার্ট বিল বিতর্ক (১৮৮৩): লর্ড রিপনের শাসনকালে আইন সচিব সি. পি. ইলবার্ট ভারতীয় বিচারকদের শ্বেতাঙ্গ অপরাধীদের বিচার করার ক্ষমতা প্রদানের জন্য একটি ঐতিহাসিক বিল উত্থাপন করেন। এর বিরুদ্ধে ভারতের ইংরেজ ও ইউরোপীয় সমাজ উগ্র বর্ণবাদী আন্দোলন গড়ে তোলে এবং বিলটি সংশোধনে সরকারকে বাধ্য করে। এই ঘটনা ভারতীয় শিক্ষিতদের চোখ খুলে দেয় এবং বুঝিয়ে দেয় যে অধিকার আদায়ে সর্বভারতীয় সুসংগঠিত জাতীয় আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই।
  • ‘নিরাপত্তা কপাট’ বা সেফটি ভাল্ব তত্ত্ব (Safety Valve Theory): হিউমের জীবনীকার উইলিয়াম ওয়েডারবার্নের মতে, হিউম সরকারি গোয়েন্দা তথ্যে জানতে পেরেছিলেন যে ব্রিটিশদের নির্মম শোষণের বিরুদ্ধে ভারতীয় জনগণের মধ্যে ১৮৫৭ সালের মতো আরেকটি মারাত্মক গণবিস্ফোরণের আশঙ্কা ঘনীভূত হচ্ছিল। তাই শিক্ষিত মধ্যবিত্তের ক্ষোভকে অহিংস ও নিয়মতান্ত্রিক সাংবিধানিক পথে পরিচালিত করে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে রক্ষা করার একটি ‘সেফটি ভাল্ব’ বা সুরক্ষামূলক নির্গমন কপাট হিসেবে তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড ডাফরিনের মৌন সমর্থনে কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।

কংগ্রেসের প্রতি মুসলমানদের মনোভাব

নিখিল ভারত কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পর ভারতীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের মনোভাব কোনো একক ধারায় প্রবাহিত হয়নি; তবে সামগ্রিকভাবে বৃহত্তর মুসলিম জনগোষ্ঠীর অবস্থান ছিল কংগ্রেসের প্রতি অনীহা ও সতর্কতামূলক দূরত্বের।

  • স্যার সৈয়দ আহমদ খানের আলিগড় ধারার দৃষ্টিভঙ্গি: উত্তর ভারতের অবিসংবাদিত মুসলিম নেতা স্যার সৈয়দ আহমদ খান প্রথম থেকেই মুসলমানদের কংগ্রেসের রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকার দ্ব্যর্থহীন আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্য ছিল:
    1. মুসলমানরা শিক্ষা, বাণিজ্য ও সরকারি চাকরিতে হিন্দুদের চেয়ে প্রায় অর্ধশতাব্দী পিছিয়ে রয়েছে; এই সন্ধিক্ষণে সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী রাজনীতিতে জড়ালে ব্রিটিশদের সুনজর ও আধুনিক শিক্ষায় অগ্রগতি নষ্ট হবে।
    2. কংগ্রেসের দাবি অনুযায়ী যদি ব্রিটিশ ধাঁচের প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র ও উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা (Open Competitive Exam) চালু করা হয়, তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুরা সমস্ত ক্ষমতা ও চাকরি দখল করে নেবে এবং সংখ্যালঘু মুসলিমরা স্থায়ীভাবে তাদের রাজনৈতিক অধীনস্থে পরিণত হবে।
    3. ১৮৮৮ সালে তিনি কংগ্রেসের বিরোধিতায় এবং ব্রিটিশদের প্রতি মুসলমানদের আনুগত্য প্রকাশের লক্ষ্যে ‘ইউনাইটেড ইন্ডিয়ান প্যাট্রিয়টিক অ্যাসোসিয়েশন’ (United Indian Patriotic Association) গঠন করেন।
  • বাংলার মুসলিম সমাজের অবস্থান: বাংলার প্রখ্যাত মুসলিম নেতা নওয়াব আব্দুল লতিফ (মোহামেডান লিটারেরি সোসাইটি) এবং সৈয়দ আমীর আলী (সেন্ট্রাল ন্যাশনাল মোহামেডান অ্যাসোসিয়েশন) উভয়ই কংগ্রেসের রাজনীতিকে মুসলিম স্বার্থের জন্য অনুপযুক্ত মনে করেছিলেন। ১৮৮৬ সালের কলকাতা কংগ্রেস অধিবেশনে যোগদানের আমন্ত্রণ তাঁরা প্রত্যাখ্যান করেন, কারণ তাঁরা মনে করেছিলেন কংগ্রেস মূলত সংখ্যাগরিষ্ঠ বর্ণহিন্দু স্বার্থের প্রতিনিধিত্বকারী।
  • জাতীয়তাবাদী মুসলমানদের ইতিবাচক অংশগ্রহণ: তবে কিছু প্রগতিশীল মুসলিম নেতা গোড়া থেকেই কংগ্রেসে সক্রিয় ছিলেন। বোম্বাইয়ের বিশিষ্ট আইনজীবী বদরুদ্দীন তৈয়বজী ১৮৮৭ সালে মাদ্রাজ কংগ্রেসের ৩য় অধিবেশনে ঐতিহাসিক প্রথম মুসলিম সভাপতি নির্বাচিত হন। এছাড়া রহমতউল্লাহ এম. সায়ানী (১৮৯৬ সালের কলকাতা কংগ্রেস সভাপতি), এ. রসুল প্রমুখ নেতা কংগ্রেসের মাধ্যমে সকল ভারতীয়ের যৌথ মুক্তির স্বপ্ন দেখতেন। বদরুদ্দীন তৈয়বজী যুক্তি দিয়েছিলেন যে জাতীয় স্বার্থে কংগ্রেসের সাধারণ প্ল্যাটফর্মে মুসলমানদের অংশগ্রহণ করা অপরিহার্য।

উপসংহার

নিখিল ভারত কংগ্রেস একটি ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও বাস্তব ক্ষেত্রে এর নেতৃত্ব ও কর্মসূচি হিন্দু নেতৃত্বের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল। ফলে কংগ্রেসের সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা এবং মুসলমানদের স্বাতন্ত্র্যবাদী অস্তিত্বের দ্বন্দ্বে ভারতে এক স্থায়ী রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি হয়, যা শেষ পর্যন্ত ১৯০৬ সালে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার অপরিহার্য প্রেক্ষাপট রচনা করে।


৩. ফরায়েজী আন্দোলনের প্রকৃতি ও ধারা বিশ্লেষণ কর।

[English: Analyze the nature and trend of the Faraizi Movement.]

ভূমিকা

উনিশ শতকের প্রথমার্ধে অবিভক্ত বাংলায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন, স্থানীয় অত্যাচারী জমিদার ও ইউরোপীয় নীলকরদের অমানুষিক শোষণের বিরুদ্ধে গ্রামীণ মুসলিম কৃষক সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করে যে আলোড়ন সৃষ্টিকারী পুনর্জাগরণবাদী সামাজিক-ধর্মীয় আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তার নাম ‘ফরায়েজী আন্দোলন’। বৃহত্তর ফরিদপুরের বাহাদুরপুরের কৃতি সন্তান হাজী শরীয়তুল্লাহ (১৭৮১-১৮৪০ খ্রি.) এই আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা। পরবর্তীতে তাঁর সুযোগ্য পুত্র মুহসিনুদ্দীন আহমদ ওরফে দুদু মিয়ার (১৮১৯-১৮৬২ খ্রি.) বলিষ্ঠ নেতৃত্বে এই আন্দোলন এক অপ্রতিরোধ্য গণজাগরণ ও কৃষক প্রতিরোধে রূপান্তরিত হয়।

ফরায়েজী আন্দোলনের আদর্শিক ভিত্তি ও মূল দর্শন

আরবি ‘ফরজ’ (যার অর্থ আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত বাধ্যতামূলক ধর্মীয় অনুশাসন) শব্দ থেকে ‘ফরায়েজী’ নামের উৎপত্তি। মক্কায় দীর্ঘ প্রায় দুই দশক অবস্থানকালে হাজী শরীয়তুল্লাহ ওয়াহাবি সংস্কার আন্দোলন এবং কুরআন-সুন্নাহর বিশুদ্ধ শিক্ষায় গভীরভাবে প্রভাবিত হন। তিনি বাংলায় ফিরে এসে লক্ষ্য করেন যে, দীর্ঘদিনের সহাবস্থানের ফলে বাঙালি মুসলিম সমাজে বেদাত, শিরক ও নানা কুসংস্কার শিকড় গেড়ে বসেছে। তাই তিনি ইসলামের পাঁচটি মৌলিক ফরজ হুকুম পালন, তওবা এবং অনৈসলামিক প্রথা বর্জনের ডাক দেন। এছাড়া তিনি ব্রিটিশ শাসনাধীন বাংলাকে ‘দারুল হরব’ (যুদ্ধাবস্থা বা শত্রুভাবাপন্ন অঞ্চল) ঘোষণা করে জুমা ও দুই ঈদের নামাজ জামাতে আদায় স্থগিত করেন, যা ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে এক নীরব অথচ গভীর রাজনৈতিক অনাস্থা।

ফরায়েজী আন্দোলনের বহুমুখী প্রকৃতি (Nature of the Movement)

  • ধর্মীয় সংস্কারবাদী রূপ: আন্দোলনের প্রাথমিক প্রকৃতি ছিল বিশুদ্ধ ধর্মীয় সংস্কার। পীরপূজা, কবরপূজা, ফাতেহা পাঠের অনৈসলামিক অনুষঙ্গ, মহররমের তাজিয়া মিছিল এবং লোকজ কুসংস্কারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়। মানুষের মধ্যে নিখাদ তৌহিদবাদ ও আধ্যাত্মিক পুনরুজ্জীবন সৃষ্টি করাই ছিল এর প্রধান লক্ষ্য।
  • আর্থ-সামাজিক ও কৃষক আন্দোলন (Agrarian Protest): ফরায়েজী আন্দোলন কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ থাকেনি; অতি দ্রুত এটি ঔপনিবেশিক বাংলার নিপীড়িত রায়ত, কৃষক ও তাঁতিদের অর্থনৈতিক মুক্তির আন্দোলনে পরিণত হয়। হিন্দু জমিদারদের অন্যায় ‘অবওয়াব’ বা অবৈধ কর (যেমন দাড়ি রাখার ওপর কর, দুর্গোৎসব ও কালীপূজার চাঁদা, বিবাহ কর ইত্যাদি) প্রদানে ফরায়েজীরা সরাসরি অস্বীকৃতি জানায়। ফলে জমিদার ও নীলকরদের সাথে তাদের প্রত্যক্ষ সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে ওঠে।
  • ঔপনিবেশিকতা-বিরোধী রাজনৈতিক প্রকৃতি: ইংরেজ শাসকরা স্থানীয় উৎপাদক কৃষকদের রক্ত চুষে নীলচাষে বাধ্য করত এবং কর সংগ্রাহক হিসেবে জমিদারদের অবাধ ক্ষমতা দিয়েছিল। ফরায়েজী নেতৃত্ব ইংরেজদের আইন-আদালতের পরিবর্তে নিজস্ব ‘পঞ্চায়েত’ ব্যবস্থার মাধ্যমে বিচার কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করে, যা ছিল ব্রিটিশ সমান্তরাল বিচার ব্যবস্থা ও চরম উপনিবেশবিরোধী পদক্ষেপ।
  • সাম্যবাদী ও গণমুখী চরিত্র: ফরায়েজী মতবাদে জাতপাত ও সামাজিক মর্যাদার কৃত্রিম ব্যবধান ভেঙে ফেলা হয়। হাজী শরীয়তুল্লাহ ও দুদু মিয়া ঘোষণা করেন যে ইসলামে সকল মানুষ সমান, কোনো মানুষ অন্য মানুষের প্রভু হতে পারে না। এই সাম্যবাদী চেতনা শোষিত প্রান্তিক মুসলিম কৃষকদের মধ্যে অভূতপূর্ব আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদাবোধ তৈরি করে।

ফরায়েজী আন্দোলনের ঐতিহাসিক ধারা ও বিবর্তন (Trend and Evolution)

  • ১. হাজী শরীয়তুল্লাহর সংস্কারমূলক ধারা (১৮১৮-১৮৪০): এ পর্বে আন্দোলনটি ছিল প্রধানত শান্তিপূর্ণ, প্রচারধর্মী ও আত্মগঠনমূলক। শরীয়তুল্লাহ ফরিদপুর, ঢাকা, ময়মনসিংহ, বরিশাল ও বাখরগঞ্জ অঞ্চলের সাধারণ মানুষকে তওবা করিয়ে সংগঠিত করেন। তিনি সরাসরি সংঘর্ষ এড়িয়ে কৃষকদের অধিকার সচেতন করার ওপর গুরুত্ব দেন। তবে তাঁর জনপ্রিয়তায় শঙ্কিত হয়ে স্থানীয় জমিদাররা ব্রিটিশ ম্যাজিস্ট্রেটের সহায়তায় তাঁকে একাধিকবার পুলিশি নজরদারিতে রাখে।
  • ২. দুদু মিয়ার বিপ্লবী ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরোধ ধারা (১৮৪০-১৮৬২): হাজী শরীয়তুল্লাহর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র দুদু মিয়া আন্দোলনের হাল ধরে এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ বিপ্লবী রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ধারায় রূপান্তর করেন:
    1. সুসংগঠিত প্রশাসনিক ও খেলাফত কাঠামো: সমগ্র অঞ্চলকে বিভিন্ন ‘হালকা’য় (Halqa) বিভক্ত করা হয়। প্রতিটি হালকা বা গ্রামে একজন প্রতিনিধি (ছোট খলিফা/উস্তাদ) এবং মহকুমা পর্যায়ে প্রধান খলিফা নিয়োগ করা হয়, যাঁদের তত্ত্বাবধানে সমান্তরাল কর সংগ্রহ ও বিচার সম্পন্ন হতো। বাহাদুরপুরে প্রতিষ্ঠিত হয় ফরায়েজীদের সদর দফতর।
    2. বিপ্লবী ভূমিনীতি ঘোষণা: দুদু মিয়া এক কালজয়ী বৈপ্লবিক ঘোষণা দেন—“জমির মালিক আল্লাহ, সুতরাং জমিতে খাজনা ধার্য করার বা কর আদায়ের কোনো অধিকার জমিদারের নেই”। এই তত্ত্ব কৃষকদের মধ্যে অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়ে।
    3. সশস্ত্র প্রতিরোধ ও লাঠিয়াল বাহিনী গঠন: অত্যাচারী জমিদার ও ইংরেজ নীলকুঠির আক্রমণ প্রতিহত করতে দুদু মিয়া জালালুদ্দীন মোল্লার মতো বীরদের নেতৃত্বে সুপ্রশিক্ষিত লাঠিয়াল বাহিনী গড়ে তোলেন। ১৮৪১ ও ১৮৪২ সালে মদনপুরের জমিদার এবং ১৮৪৭ সালে নীলকর ডানলপের পাচুচর নীলকুঠি আক্রমণ ও ধ্বংস করে ফরায়েজীরা তাঁদের অসীম সাহসের প্রমাণ দেন। ব্রিটিশ সরকার দুদু মিয়াকে বারবার কারারুদ্ধ করলেও জনসমর্থনের মুখে প্রতিবারই তিনি মুক্ত হন।
  • ৩. পরবর্তী আপসকামী ও স্তিমিত ধারা (১৮৬২-এর পরবর্তী সময়): ১৮৬২ সালে দুদু মিয়ার মৃত্যুর পর তাঁর অপ্রাপ্তবয়স্ক পুত্র গিয়াসউদ্দীন হায়দার ও পরবর্তীতে আব্দুল গফুর ওরফে নয়া মিয়া আন্দোলনের হাল ধরেন। নয়া মিয়ার সময় ফরায়েজীরা ব্রিটিশ সরকারের সাথে বিরোধ নিরসনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ১৮৮৪ সালে কলকাতায় আলেমদের সাথে বিতর্কের পর নয়া মিয়া পুনরায় জুমার নামাজ আদায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ফলে আন্দোলন তার বিপ্লবী রাজনৈতিক ও কৃষক প্রতিরোধী চরিত্র হারিয়ে ধীরে ধীরে একটি নিছক আত্মশুদ্ধিমূলক ধর্মীয় গোষ্ঠীতে রূপ নেয়।

উপসংহার

ফরায়েজী আন্দোলন বাংলার শোষিত মেহনতি মানুষের আত্মজাগরণের এক অবিস্মরণীয় ইতিহাস। এটি কেবল বাঙালি মুসলমানের ধর্মীয় পরিচয়কে বিশুদ্ধ করেনি, বরং ঔপনিবেশিক শোষক ও দেশীয় সামন্ত প্রভুদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর যে বৈপ্লবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল, তা পরবর্তীকালে তিতুমীরের আন্দোলন ও বাংলার কৃষক বিদ্রোহসমূহকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।


৪. বাংলার মুসলিম সমাজের পুনর্জাগরণে নওয়াব আব্দুল লতিফের অবদান মূল্যায়ন কর।

[English: Evaluate the contribution of Nawab Abdul Latif to regenerating of the Muslim society in Bengal.]

ভূমিকা

উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ব্রিটিশ ভারতে রাজনৈতিক পরাজয়, অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং চরম সামাজিক হতাশায় নিমজ্জিত বাংলার মুসলিম সমাজের নবজাগরণ ও আধুনিকায়নের মহান অগ্রদূত ছিলেন নওয়াব আব্দুল লতিফ (১৮২৮-১৮৯৩ খ্রি.)। সমকালীন বাংলার মুসলিম জাগরণে তাঁর অসামান্য ও দূরদর্শী অবদানের কারণে তাঁকে উত্তর ভারতের স্যার সৈয়দ আহমদ খানের সমকক্ষ হিসেবে ‘বাংলার স্যার সৈয়দ’ (The Sir Syed of Bengal) বলে আখ্যায়িত করা হয়।

মুসলিম সমাজের অবক্ষয়ের পটভূমি ও আব্দুল লতিফের আবির্ভাব

১৭৫৭ সালের পলাশীর বিপর্যয় এবং ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর ব্রিটিশদের প্রতিহিংসামূলক দমনপীড়নের প্রধান শিকার হয়েছিল মুসলমানরা। ফারসি ভাষার পরিবর্তে ১৮৩৭ সালে ইংরেজিকে সরকারি ভাষা করা হলে মুসলিম সম্প্রদায় নিজেদের গুটিয়ে নেয়। ইংরেজি শিক্ষাকে ‘বিধর্মী ভাষা’ মনে করে বর্জনের কারণে প্রশাসন, আইন, চিকিৎসা ও উচ্চশিক্ষা থেকে মুসলমানরা সম্পূর্ণ উচ্ছেদ হয়ে পড়ে। এই চরম সংকটকালে নওয়াব আব্দুল লতিফ উপলব্ধি করেন যে, আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষা ও বিজ্ঞান শিক্ষা অর্জন ব্যতিরেকে মুসলিম জাতির অস্তিত্ব রক্ষা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

মুসলিম সমাজ পুনর্জাগরণে নওয়াব আব্দুল লতিফের ঐতিহাসিক অবদান

  • ১. মোহামেডান লিটারেরি সোসাইটি প্রতিষ্ঠা (১৮৬৩):
    ১৮৬৩ সালে কলকাতায় নওয়াব আব্দুল লতিফ প্রতিষ্ঠা করেন ঐতিহাসিক ‘মোহামেডান লিটারেরি সোসাইটি’ (Mohammedan Literary Society)। এটি ছিল আধুনিক বাংলার মুসলিম সমাজের প্রথম কার্যকর বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক প্ল্যাটফর্ম। এর প্রধান অবদানসমূহ:

    1. মুসলিম শিক্ষিত সমাজ ও ইংরেজ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে সেতুবন্ধন ও ভুল বোঝাবুঝি দূরীকরণ।
    2. কলকাতার টাউন হলে নিয়মিত সেমিনার, সম্মেলন ও বিজ্ঞান প্রদর্শনীর আয়োজন করে মুসলিমদের মধ্যে পদার্থবিদ্যা, রসায়ন ও আধুনিক দর্শনের প্রতি আগ্রহ তৈরি করা।
    3. স্যার সৈয়দ আহমদ খান এবং আমির আলী প্রমুখ বিশিষ্ট মনীষী এ সভায় বক্তব্য রেখে মুসলিম সমাজকে আধুনিক জ্ঞানচর্চায় উদ্বুদ্ধ করেন।
  • ২. আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষার বিস্তার ও প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা (১৮৬৮):
    মুসলমানদের মানসিক জড়তা ভাঙতে ১৮৬৮ সালে তিনি মোহামেডান লিটারেরি সোসাইটির পক্ষ থেকে এক ঐতিহাসিক প্রবন্ধ প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন। প্রতিযোগিতার বিষয় ছিল: “ব্রিটিশ ভারতে মুসলিম তরুণদের জন্য শিক্ষার সর্বোত্তম মাধ্যম কী?” (What are the best means of providing education for the Musalman Youth of Bengal?)। এর মাধ্যমে তিনি প্রতিষ্ঠিত করেন যে, মুসলিম শিশুদের আরবি-ফারসির পাশাপাশি ইংরেজি ভাষা ও আধুনিক বিজ্ঞান শিক্ষা গ্রহণ করা সময়ের অপরিহার্য দাবি।
  • ৩. কলকাতা মাদ্রাসার আধুনিকায়ন ও সংস্কার:
    তিনি ঐতিহ্যবাহী কলকাতা মাদ্রাসাকে একটি পূর্ণাঙ্গ আধুনিক বিদ্যাপীঠে রূপান্তরের জন্য আজীবন সংগ্রাম করেন। তাঁর সুপারিশে কলকাতা মাদ্রাসায় উচ্চতর ইংরেজি ও উর্দু বিভাগ চালু করা হয় এবং মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের প্রেসিডেন্সি কলেজে গিয়ে স্বল্প খরচে আধুনিক বিজ্ঞান ও মানবিক বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের দ্বার উন্মোচিত হয়।
  • ৪. মহসিন ফান্ডের অর্থ মুসলিম শিক্ষায় বরাদ্দকরণ (১৮৭৩):
    নওয়াব আব্দুল লতিফের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক কীর্তি ছিল হাজী মুহাম্মদ মহসিন কর্তৃক ১৮০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘মহসিন ট্রাস্ট ফান্ডের’ অপব্যবহার রোধ করা। এ ফান্ডের অর্থ তৎকালীন হিন্দু কলেজ ও অন্যান্য অমুসলিম খাতে খরচ হচ্ছিল। আব্দুল লতিফের অবিরাম আবেদন ও যুক্তিতর্কের মুখে ১৮৭৩ সালে তৎকালীন বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার জর্জ ক্যাম্পবেল এই ট্রাস্টের সমস্ত অর্থ এককভাবে মুসলিম শিক্ষার্থীদের কল্যাণে ব্যয়ের সরকারি নির্দেশ দেন। এর ফলে:

    1. কলকাতা ও মফস্বলের হাজার হাজার দরিদ্র মুসলিম ছাত্রের জন্য বৃত্তি ও স্বল্প ফি-তে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়।
    2. ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে তিনটি নতুন সরকারি মাদ্রাসা এবং মহসিন হোস্টেল প্রতিষ্ঠিত হয়।
  • ৫. ফতোয়া আদায় ও জিহাদের ভুল ব্যাখ্যার অবসান (১৮৭০):
    তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার ওয়াহাবি ও ফরায়েজী আন্দোলনের কারণে মুসলমানদের সার্বক্ষণিকভাবে ‘বিদ্রোহী’ ভাবত। এই সংকট নিরসনে ১৮৭০ সালে আব্দুল লতিফ মোহামেডান লিটারেরি সোসাইটির এক বিশেষ অধিবেশনে ভারতের খ্যাতনামা আলেম মাওলানা কেরামত আলী জৌনপুরীর কাছ থেকে ঐতিহাসিক ধর্মীয় ফতোয়া আদায় করেন। ফতোয়ায় স্পষ্ট বলা হয় যে, ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতে মুসলমানরা স্বাধীনভাবে ধর্মকর্ম পালন করতে পারছে, বিধায় এটি ‘দারুল হরব’ নয় বরং ‘দারুল ইসলাম/দারুল আমান’ (শান্তির দেশ); সুতরাং এখানে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে তথাকথিত সশস্ত্র বিদ্রোহ বা জিহাদ সম্পূর্ণ অনৈসলামিক। এই ফতোয়া ব্রিটিশদের সন্দেহ দূর করে মুসলমানদের সরকারি সুযোগ-সুবিধা লাভের পথ সুগম করে।
  • ৬. প্রথম মুসলিম আইনপ্রণেতা হিসেবে অধিকার আদায়:
    নওয়াব আব্দুল লতিফ ১৮৬২ সালে বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের প্রথম মুসলিম সদস্য হিসেবে মনোনীত হন। পরবর্তীতে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো এবং প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে অত্যন্ত সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করে বাঙালি মুসলমানদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তি তৈরি করেন।

উপসংহার

নওয়াব আব্দুল লতিফ ছিলেন একাধারে দূরদর্শী শিক্ষাবিদ, কুসংস্কারমুক্ত সমাজ সংস্কারক এবং বাস্তববাদী কূটনীতিক। তিনি ধর্মীয় মূল্যবোধের সাথে আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষার সুষম সমন্বয় ঘটিয়ে বাংলার পশ্চাৎপদ মুসলিম সমাজকে মধ্যযুগীয় ধ্যানধারণা থেকে আধুনিক যুগে পদার্পণ করিয়েছিলেন। তাঁর এই আত্মত্যাগ ও প্রজ্ঞার ওপর দাঁড়িয়ে পরবর্তীকালে বিশ শতকে বাংলার আধুনিক মুসলিম মধ্যবিত্ত ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণির নবসূচনা ঘটেছিল।


৫. খিলাফত আন্দোলনের পটভূমি আলোচনা কর। এ আন্দোলনে মহাত্মা গান্ধীর ভূমিকা নিরূপণ কর।

[English: Discuss the background of the Khilafat Movement. Determine the role of Mahatma Gandhi in this movement.]

ভূমিকা

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে (১৯১৯-১৯২৪ খ্রি.) ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের কুটিল কূটনীতির হাত থেকে তুরস্কের উসমানীয় খিলাফতের অস্তিত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার দাবিতে ভারতীয় উপমহাদেশে যে অভূতপূর্ব গণআন্দোলন গড়ে ওঠে, তা ইতিহাসে ‘খিলাফত আন্দোলন’ নামে সুপরিচিত। মাওলানা মোহাম্মদ আলী, মাওলানা শওকত আলী (আলী ভ্রাতৃদ্বয়), মাওলানা আবুল কালাম আজাদ প্রমুখের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন পরবর্তীকালে মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে পরিচালিত কংগ্রেসের ‘অহিংস অসহযোগ আন্দোলন’-এর সাথে যুক্ত হয়ে সমগ্র ভারতে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের এক নজিরবিহীন উত্তাল ঢেউ তৈরি করেছিল।

খিলাফত আন্দোলনের ঐতিহাসিক পটভূমি

  • তুর্কি খিলাফতের প্রতি ধর্মীয় আনুগত্য: বিশ্ব মুসলিমদের কাছে তুরস্কের সুলতান ছিলেন সমগ্র উম্মাহর ‘খলিফা’ এবং ইসলামের রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক ঐক্যের প্রতীক। ভারতীয় মুসলমানরা মোগল সাম্রাজ্যের পতনের পর খলিফার প্রতি গভীর আনুগত্য পোষণ করত। অটোমান সাম্রাজ্যের পতন হলে মুসলিম জাহানের গৌরব ধ্বংস হবে—এমন আশঙ্কায় ভারতীয় মুসলিমরা ব্যথিত ও উৎকণ্ঠিত হয়ে ওঠে।
  • প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের মিথ্যা আশ্বাস ও প্রতিশ্রুতি: প্রথম বিশ্বযুদ্ধে (১৯১৪-১৯১৮) তুরস্ক জার্মানির পক্ষে ব্রিটেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এ অবস্থায় লাখ লাখ ভারতীয় মুসলিম সৈন্যকে ব্রিটিশ বাহিনীতে ধরে রাখতে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড লয়েড জর্জ ভারতীয় মুসলমানদের দ্ব্যর্থহীন আশ্বাস দিয়েছিলেন যে, যুদ্ধ শেষে অটোমান সাম্রাজ্যের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখা হবে এবং মক্কা, মদিনা, বায়তুল মুকাদ্দাসসহ পবিত্র স্থানসমূহ খলিফার নিয়ন্ত্রণেই থাকবে। কিন্তু যুদ্ধের অবসান ঘটতেই ব্রিটিশরা তাদের প্রতিশ্রুতি সম্পূর্ণ ভঙ্গ করে।
  • সেভার্স চুক্তির কুৎসিত শর্তাবলি (Treaty of Sèvres, 1920): ১৯২০ সালের ১০ আগস্ট মিত্রশক্তি তুরস্কের ওপর অত্যন্ত অপমানজনক সেভার্স চুক্তি চাপিয়ে দেয়। এর মাধ্যমে তুরস্ক সাম্রাজ্যকে বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করে থ্রেস গ্রিসকে, সিরিয়া ফ্রান্সকে এবং মেসোপটেমিয়া ও প্যালেস্টাইন ব্রিটেন নিজেদের অধীনে নিয়ে নেয়। খলিফাকে কেবল কনস্টান্টিনোপলে নামমাত্র ক্ষমতাহীন বন্দির মতো রেখে কার্যত খিলাফতকে নিশ্চিহ্ন করার নীলনকশা করা হয়। এই চরম বিশ্বাসঘাতকতায় ভারতীয় মুসলিমরা তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়ে।
  • ভারতের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ ও দমনপীড়ন: এ সময় ভারতে ব্রিটিশদের যুদ্ধোত্তর অর্থনৈতিক মন্দা, মূল্যস্ফীতি, ভারতীয়দের স্বাধীনতা আন্দোলন দমনে প্রণীত কালাকানুন ‘রাওলাট আইন’ (Rowlatt Act 1919) এবং ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল অমৃতসরের ‘জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড’ সমগ্র ভারতবাসীকে বিক্ষুব্ধ করে তুলেছিল। ফলে খিলাফতের আন্তর্জাতিক সংকট ভারতীয় জাতীয়তাবাদী ক্ষোভের সাথে নিখুঁতভাবে একীভূত হয়।
  • খিলাফত কমিটির আত্মপ্রকাশ: ১৯১৯ সালের মার্চ মাসে বোম্বাইতে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী শেঠ ছোটানির সভাপতিত্বে গঠিত হয় ‘সেন্ট্রাল খিলাফত কমিটি’। এরপর দিল্লির নিখিল ভারত খিলাফত সম্মেলনে আলী ভ্রাতৃদ্বয় ব্রিটিশ পণ্য ও সরকারি প্রতিষ্ঠান বর্জনের মাধ্যমে আন্দোলনের ডাক দেন।

খিলাফত আন্দোলনে মহাত্মা গান্ধীর ভূমিকা

খিলাফত আন্দোলনে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অবিসংবাদিত নেতা মহাত্মা গান্ধীর অবদান ছিল অত্যন্ত গভীর, কৌশলগত ও ঐতিহাসিক তাৎপর্যপূর্ণ।

  • ১. খিলাফতকে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের মোক্ষম সুযোগ হিসেবে গ্রহণ: গান্ধীজি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন যে, ব্রিটিশদের সুচতুর ‘ভাগ কর ও শাসন কর’ (Divide and Rule) নীতি ভাঙতে হলে মুসলিমদের ব্যথিত হৃদয়ে পাশে দাঁড়ানো কংগ্রেসের প্রধান দায়িত্ব। তিনি বলেছিলেন—“শত বছরেও হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের এমন সুযোগ আর আসবে না” (An opportunity such as would not come in a hundred years)। তিনি খিলাফত প্রশ্নকে কেবল মুসলমানদের ধর্মীয় বিষয় হিসেবে না দেখে ভারতের সামগ্রিক স্বাধীনতা সংগ্রামের হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেন।
  • ২. অহিংস অসহযোগের ধারণা উপস্থাপন ও খিলাফতে সংযোগ: ১৯২০ সালের জানুয়ারিতে গান্ধীজি খিলাফত কমিটিকে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে তাঁর অনন্য রাজনৈতিক কৌশল ‘অহিংস অসহযোগ’ (Non-Violent Non-Cooperation) গ্রহণের প্রস্তাব দেন। খেলাফত কমিটি সানন্দে এই প্রস্তাব মেনে নেয়। গান্ধীজির মধ্যস্থতায় কংগ্রেসের কলকাতা বিশেষ অধিবেশন (সেপ্টেম্বর ১৯২০) এবং ঐতিহাসিক নাগপুর অধিবেশনে (ডিসেম্বর ১৯২০) খিলাফত আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনকে যৌথভাবে পরিচালনার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
  • ৩. গণসংযোগ ও জনজাগরণ সৃষ্টি: গান্ধীজি আলী ভ্রাতৃদ্বয়কে (মাওলানা শওকত আলী ও মোহাম্মদ আলী) সাথে নিয়ে সমগ্র ভারত অবিরাম চষে বেড়ান। তাঁর অনুপ্রেরণায় সাধারণ মানুষ সরকারি খেতাব, পদক, আদালত, স্কুল-কলেজ এবং বিলাতি বস্ত্র বর্জন করতে শুরু করে। হিন্দুরা খিলাফতের পক্ষে স্লোগান তোলে এবং মুসলমানরা গান্ধীর অহিংস আদর্শকে সমর্থন জানায়। দিল্লির জামে মসজিদের মিম্বরে দাঁড়িয়ে হিন্দু সন্ন্যাসী স্বামী শ্রদ্ধানন্দ বক্তব্য দেন এবং অমৃতসরের স্বর্ণমন্দিরের চাবি তুলে দেওয়া হয় মুসলিম নেতা ডা. কিচলুর হাতে।
  • ৪. আন্দোলনে ভাটা ও গান্ধীর বিতর্কিত একক সিদ্ধান্ত: আন্দোলনের যখন তুঙ্গে এবং ব্রিটিশ প্রশাসন যখন প্রায় পঙ্গু হয়ে পড়েছিল, তখন ১৯২২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি উত্তরপ্রদেশের গোরক্ষপুর জেলার চৌরিচৌরা গ্রামে উত্তেজিত জনতা কর্তৃক একটি থানায় আগুন লাগিয়ে ২২ জন পুলিশ সদস্যকে পুড়িয়ে মারা হয়। এই সহিংস ঘটনার অজুহাতে মহাত্মা গান্ধী খিলাফত নেতাদের সাথে কোনো প্রকার আলোচনা ছাড়াই ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯২২ সালে বরদৌলিতে একক সিদ্ধান্তে অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন।
  • ৫. খিলাফত নেতৃত্বের মোহভঙ্গ ও ফলাফল: গান্ধীর এই অপ্রত্যাশিত ঘোষণায় আলী ভ্রাতৃদ্বয়, মাওলানা আজাদ এবং জওহরলাল নেহরু চরম স্তম্ভিত ও ব্যথিত হন। আন্দোলনের গতি আকস্মিকভাবে স্তব্ধ হয়ে পড়ে এবং ব্রিটিশরা সুযোগ বুঝে আলী ভ্রাতৃদ্বয়সহ হাজার হাজার নেতাকর্মীকে কারারুদ্ধ করে। শেষ পর্যন্ত ১৯২৪ সালে তুরস্কে আধুনিক জাতীয়তাবাদী নেতা মুস্তফা কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে খিলাফত আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত হলে খিলাফত আন্দোলন তার অস্তিত্ব হারায়।

উপসংহার

খিলাফত আন্দোলনে মহাত্মা গান্ধীর ভূমিকা ছিল উপমহাদেশের ইতিহাসে হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। যদিও চৌরিচৌরা কাণ্ডের পর তাঁর আকস্মিক পশ্চাদপসরণ আন্দোলনকে সফল সমাপ্তির মুখ দেখতে দেয়নি, তবুও তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বে এই আন্দোলনই প্রথমবারের মতো সাধারণ মেহনতি কৃষক, শ্রমিক ও নারী সমাজকে রাজপথে এনে ব্রিটিশ রাজের ভিত্তি নাড়িয়ে দিয়েছিল।


৬. ১৯১৬ সালের লক্ষ্ণৌ চুক্তির প্রধান ধারাসমূহ উল্লেখ কর। তুমি কি এই চুক্তিকে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের সূচনা মনে কর?

[English: Mention the main clauses of the Lucknow Pact of 1916. Do you consider this pact as the beginning of the Hindu-Muslim unity?]

ভূমিকা

১৯১৬ সালের ডিসেম্বর মাসে ভারতের উত্তরপ্রদেশের ঐতিহাসিক শহর লক্ষ্ণৌতে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এবং নিখিল ভারত মুসলিম লীগের বার্ষিক যৌথ অধিবেশনে দুই সম্প্রদায়ের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক সাংবিধানিক সমঝোতা স্বাক্ষরিত হয়, যা ভারতীয় রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘লক্ষ্ণৌ চুক্তি’ (Lucknow Pact) নামে খ্যাত। কংগ্রেসের পক্ষে লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক এবং মুসলিম লীগের পক্ষে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এই চুক্তির রূপরেখা তৈরি ও চূড়ান্তকরণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এই অসামান্য সমঝোতা প্রতিষ্ঠার স্বীকৃতিস্বরূপ বিশিষ্ট কংগ্রেস নেত্রী সরোজিনী নাইডু মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে ‘হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের দূত’ (Ambassador of Hindu-Muslim Unity) উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।

লক্ষ্ণৌ চুক্তির প্রধান প্রধান ধারাসমূহ (Main Clauses)

  1. পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার স্বীকৃতি (Separate Electorate): ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রথমবারের মতো মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা ও মুসলিম ভোটারদের অধিকার আনুষ্ঠানিকভাবে মেনে নেয়, যা ব্রিটিশরা ১৯০৯ সালের মর্লে-মিন্টো সংস্কার আইনে দিয়েছিল।
  2. আইনসভায় মুসলিম আসন সংরক্ষণ ও অনুপাত বণ্টন:
    • কেন্দ্রীয় আইনসভা: কেন্দ্রীয় আইনসভার নির্বাচিত ভারতীয় সদস্যদের এক-তৃতীয়াংশ (৩৩.৩৩%) মুসলিম সদস্যদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে এবং তারা পৃথক মুসলিম নির্বাচকমণ্ডলীর ভোটে নির্বাচিত হবেন।
    • প্রাদেশিক আইনসভা: যেসব প্রদেশে মুসলমানরা সংখ্যালঘু, সেখানে তাদের সুরক্ষার জন্য অতিরিক্ত আসন (Weightage) প্রদান করা হয়; যেমন—যুক্তপ্রদেশে (ইউপি) মোট আসনের ৫০%, বিহারে ২৫%, বোম্বেতে ৩৩.৩%, মাদ্রাজে ১৫% এবং মধ্যপ্রদেশে ১৫%।
    • মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশে আসন ত্যাগ: এর বিনিময়ে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশসমূহে মুসলমানরা তাদের জনসংখ্যার চেয়ে কম আসন গ্রহণে সম্মত হয়; যথা—বাংলায় শতকরা ৫৪ ভাগ জনসংখ্যার বিপরীতে মাত্র ৪০% আসন এবং পাঞ্জাবে ৫৫ ভাগ জনসংখ্যার বিপরীতে ৫০% আসন নির্ধারিত হয়।
  3. ধর্মীয় ও সামাজিক আইনে ভেটো ক্ষমতা (Three-Fourths Rule): কোনো সম্প্রদায়ের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো বিল বা প্রস্তাব আইন পরিষদে পাস করা যাবে না, যদি সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের নির্বাচিত সদস্যদের তিন-চতুর্থাংশ (৭৫%) সদস্য প্রস্তাবটির বিরুদ্ধে ভোট প্রদান করেন।
  4. প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন ও ক্ষমতা হস্তান্তর: প্রাদেশিক পরিষদগুলোতে পর্যাপ্ত আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রদান করতে হবে এবং কেন্দ্রের অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। প্রাদেশিক আইনসভার মেয়াদ হবে ৫ বছর এবং গভর্নর কোনো প্রস্তাবে ভেটো দিলে তা পুনরায় পাস হলে আইন হিসেবে গণ্য হবে।
  5. ভাইসরয় ও গভর্নরের নির্বাহী পরিষদে ভারতীয় প্রতিনিধিত্ব: ভাইসরয়ের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ এবং প্রাদেশিক গভর্নরের নির্বাহী পরিষদের মোট সদস্যদের অন্তত অর্ধেক সদস্য নির্বাচিত ভারতীয়দের মধ্য থেকে নিয়োগ দিতে হবে।
  6. বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথকীকরণ: বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করতে হবে এবং তাকে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে।

তুমি কি এই চুক্তিকে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের সূচনা মনে কর? (সমালোচনামূলক মূল্যায়ন)

লক্ষ্ণৌ চুক্তি নিঃসন্দেহে ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে একটি গৌরবময় মাইলফলক ছিল। তবে এটি সত্যিকারে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের স্থায়ী সূচনা ছিল কিনা, তা বিচার করতে এর ইতিবাচক দিক ও সীমাবদ্ধতা উভয় দিকই খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

ঐক্যের সূচনা হিসেবে ইতিবাচক যুক্তি:
  • ঐতিহাসিক যৌথ রাজনৈতিক যাত্রা: ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার পর থেকে কংগ্রেস ও লীগ ছিল পরস্পরের প্রতিপক্ষ। লক্ষ্ণৌ চুক্তির মাধ্যমে প্রথমবারের মতো উভয় দল অভিন্ন রাজনৈতিক দাবি নিয়ে ব্রিটিশদের মুখোমুখি হয়। এর ফলেই ১৯১৯ সালের মন্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কারে ভারতীয়দের নানা দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয় ব্রিটিশ সরকার।
  • সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সুবর্ণ অধ্যায়: এই চুক্তির উষ্ণ সৌহার্দ্যের ধারাবাহিকতায় পরবর্তীকালে ১৯১৯-১৯২১ সালের খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনে হিন্দু ও মুসলমানরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজপথে রক্ত দিয়েছিল।
  • জাতীয়তাবাদী ঐক্যের প্রকাশ: ব্রিটিশদের কুখ্যাত নীতি ছিল—”ভারতীয়রা ঐক্যবদ্ধ কোনো শাসনতান্ত্রিক প্রস্তাব দিতে পারে না।” লক্ষ্ণৌ চুক্তির মাধ্যমে ভারতীয়রা ব্রিটিশদের সেই অহংকার চূর্ণ করে নিজেদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞার প্রমাণ দিয়েছিল।
ঐক্যের সীমাবদ্ধতা ও বৈপরীত্যমূলক দিক (কেন এটি স্থায়ী সূচনা ছিল না):
  • দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রচ্ছন্ন স্বীকৃতি: কংগ্রেস পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা মেনে নেওয়ার মাধ্যমে অনিচ্ছাকৃতভাবে এই তত্ত্বই স্বীকৃতি দিয়েছিল যে, ভারতীয় হিন্দু ও মুসলিমরা একক কোনো রাজনৈতিক জাতি নয়, বরং তারা ভিন্ন স্বার্থবাহী দুটি পৃথক সম্প্রদায়। এটি পরবর্তীকালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ধারণাকে তাত্ত্বিক ভিত্তি দান করেছিল।
  • সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের স্বার্থহানি ও ক্ষোভ: বাংলা ও পাঞ্জাবের মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশে মুসলিমদের আসন কমিয়ে দেওয়ার ফলে এ অঞ্চলের মুসলিম নেতৃত্ব মনে করেন যে, উত্তর ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিম এলিটদের সুবিধার জন্য বাংলার ৫৫% মুসলিমের অধিকার জলাঞ্জলি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে বাংলায় নওয়াব আলী চৌধুরী ও ফজলুল হকের মতো নেতাদের মধ্যে কংগ্রেসের প্রতি গভীর অনীহা ও ক্ষোভ জন্মায়।
  • এলিটদের দরকষাকষি বনাম গণমানুষের মিলন: লক্ষ্ণৌ চুক্তিটি ছিল মূলত শীর্ষস্থানীয় আইনজীবী ও সুবিধাভোগী এলিট নেতাদের মধ্যে আইনসভার আসন ভাগাভাগির একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তি (Pact between Elites)। এর সাথে তৃণমূল পর্যায়ের কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ হিন্দু-মুসলমানের সামাজিক ও ধর্মীয় মেলবন্ধনের কোনো সরাসরি সম্পর্ক ছিল না।

ব্যক্তিগত মতামত ও উপসংহার

সার্বিক বিশ্লেষণে বলা যায়, ১৯১৬ সালের লক্ষ্ণৌ চুক্তি হিন্দু-মুসলিমদের কৌশলগত ও রাজনৈতিক ঐক্যের এক চমৎকার সূচনা করেছিল, যা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে নতুন শক্তির সঞ্চার করেছিল। কিন্তু যেহেতু এটি দুই সম্প্রদায়ের সামাজিক, ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক স্বার্থের মৌলিক দ্বন্দ্বসমূহ নিরসন করতে পারেনি, তাই এই ঐক্য দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেনি। ১৯২৮ সালের নেহরু রিপোর্টে কংগ্রেস কর্তৃক পৃথক নির্বাচন বাতিলের ঘোষণার সাথে সাথেই লক্ষ্ণৌ চুক্তির অপমৃত্যু ঘটে এবং ভারত চূড়ান্তভাবে ভারত বিভাগের দিকে ধাবিত হয়।


৭. মুসলিম লীগ কেন গঠিত হয়েছিল? এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বর্ণনা কর।

[English: Why was Muslim League formed? Describe its aims and objects.]

ভূমিকা

১৯০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকার ঐতিহাসিক শাহবাগের ইশরাত মঞ্জিলে নওয়াব সলিমুল্লাহর বাগানবাড়িতে আয়োজিত নিখিল ভারত মুসলিম শিক্ষা সম্মেলনের (All India Muhammadan Educational Conference) সমাপ্তি অধিবেশনে সর্বসম্মতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ’ (All India Muslim League) বা নিখিল ভারত মুসলিম লীগ। নওয়াব ভিকারুল মুলক এই ঐতিহাসিক অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন এবং ঢাকার নওয়াব খাজা সলিমুল্লাহ মূল রাজনৈতিক দল গঠনের ঐতিহাসিক প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এটি ছিল ব্রিটিশ ভারতে মুসলমানদের সর্বভারতীয় প্রথম স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সংগঠন।

মুসলিম লীগ গঠনের কারণ ও পটভূমি

  • কংগ্রেসের হিন্দুত্ববাদী আধিপত্য ও দৃষ্টিভঙ্গি: ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত কংগ্রেস নিজেকে অসাম্প্রদায়িক দাবি করলেও অচিরেই এটি বাল গঙ্গাধর তিলক ও লালা লাজপত রায়ের মতো উগ্রবাদী হিন্দু নেতাদের প্রভাবাধীন হয়ে পড়ে। তিলকের ‘শিবাজী উৎসব’, ‘গণপতি উৎসব’ এবং বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ উপন্যাসের ইসলামবিদ্বেষী ‘বন্দে মাতরম’ সঙ্গীত কংগ্রেসি সভা-সমাবেশে জাতীয় স্লোগান হিসেবে চালু করা হলে সাধারণ মুসলমানরা ভীত হয়ে পড়ে যে কংগ্রেস ভারতে একটি হিন্দু রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
  • বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫) ও হিন্দুদের উগ্র প্রতিক্রিয়া: ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন কর্তৃক অবহেলিত পূর্ববঙ্গ ও আসামকে একত্রিত করে একটি নতুন প্রদেশ গঠন (বঙ্গভঙ্গ) করা হলে পূর্ব বাংলার পশ্চাৎপদ মুসলিম সমাজ শিক্ষা, অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে নবজীবনের আলো দেখতে পায়। কিন্তু কলকাতার বর্ণহিন্দু বাবু শ্রেণি ও কংগ্রেস একে ‘ভারত মাতা অঙ্গচ্ছেদ’ আখ্যা দিয়ে উগ্র ‘স্বদেশী আন্দোলন’ ও চরমপন্থী সন্ত্রাসের সূচনা করে। হিন্দুদের এই অন্ধ মুসলিম-স্বার্থবিরোধী আচরণ মুসলমানদের উপলব্ধি করতে বাধ্য করে যে নিজেদের অধিকার রক্ষার জন্য একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সংগঠন অপরিহার্য।
  • আলিগড় আন্দোলন ও রাজনৈতিক জাগরণ: স্যার সৈয়দ আহমদ খান মুসলমানদের আত্মমর্যাদা ও স্বতন্ত্র অস্তিত্বের যে চেতনা জাগ্রত করেছিলেন, নওয়াব মহসিনুল মুলক ও ভিকারুল মুলক তা অব্যাহত রাখেন। মুসলিম মধ্যবিত্ত ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণির বিকাশের ফলে একটি সর্বভারতীয় রাজনৈতিক দল গঠনের তাগিদ অনুভূত হয়।
  • আসন্ন সাংবিধানিক সংস্কারের বার্তা: তৎকালীন ব্রিটিশ লিবারেল সরকার ভারতে নতুন শাসনতান্ত্রিক সংস্কারের (১৯০৯ সালের মর্লে-মিন্টো সংস্কার) ইঙ্গিত দিলে মুসলিম নেতৃবৃন্দ তাঁদের দাবিদাওয়া সরকারের কাছে পেশ করার জন্য একটি স্থায়ী সাংবিধানিক সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারেন।
  • শিমলা ডেপুটেশনের ঐতিহাসিক সাফল্য (১৯০৬): ১৯০৬ সালের ১ অক্টোবর স্যার আগা খানের নেতৃত্বে ৩৫ জন বিশিষ্ট মুসলিম অভিজাতদের এক প্রতিনিধিদল শিমলায় ভাইসরয় লর্ড মিন্টোর সাথে সাক্ষাৎ করেন। তাঁরা আইনসভায় মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা (Separate Electorate) এবং জনসংখ্যাভিত্তিক আসন সংরক্ষণের দাবি জানান। ভাইসরয় এ দাবিতে নীতিগত ইতিবাচক আশ্বাস দিলে মুসলিম নেতারা আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন এবং ঢাকায় সম্মেলন চলাকালে স্বতন্ত্র রাজনৈতিক দল গঠনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেন।

মুসলিম লীগের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

১৯০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী সম্মেলনে মুসলিম লীগের তিনটি মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত ও ঘোষিত হয়:

  1. ব্রিটিশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ ও ভুল বোঝাবুঝি দূরীকরণ: ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে ব্রিটিশ রাজমুকুটের প্রতি অকৃত্রিম আনুগত্যের মনোভাব জাগ্রত করা এবং সরকারের কোনো পদক্ষেপ বা প্রশাসনিক নীতি সম্পর্কে মুসলমানদের মনে কোনো বিভ্রান্তি বা ভুল ধারণা তৈরি হলে তা দূর করা।
  2. মুসলিমদের রাজনৈতিক ও সামাজিক স্বার্থ সংরক্ষণ: ভারতীয় মুসলমানদের রাজনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও নাগরিক অধিকার ও স্বার্থসমূহের সুরক্ষা প্রদান করা এবং অত্যন্ত শালীন ও সাংবিধানিক পন্থায় সরকারের নিকট মুসলিম সমাজের দাবিদাওয়া ও অভাব-অভিযোগ উপস্থাপন করা।
  3. অন্যান্য সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ পরিহার ও সম্প্রীতি রক্ষা: মুসলিম লীগের পূর্বোল্লিখিত দুটি মূল লক্ষ্যের কোনো প্রকার ক্ষতিসাধন না করে ভারতের অন্যান্য জাতি ও সম্প্রদায়ের (বিশেষত হিন্দু সম্প্রদায়ের) সাথে যথাসম্ভব পারস্পরিক বন্ধুত্ব, সহমর্মিতা ও আন্তঃসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের বিস্তার প্রতিহত করা।

উপসংহার

মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে উপমহাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন ধারার সূচনা হয়। ব্রিটিশ সরকারের সাথে মধ্যপন্থী আপসরফা দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও সময়ের সাথে সাথে এটি ভারতীয় মুসলমানদের প্রধান রাজনৈতিক দুর্গে পরিণত হয়। কায়েদে আযম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বে এই মুসলিম লীগই পরবর্তীকালে ১৯৪০ সালের ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের মাধ্যমে উপমহাদেশের মানচিত্র পরিবর্তন করে ১৯৪৭ সালে স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিল।


৮. ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির সুদূর-প্রসারী ফলাফল ব্যাখ্যা কর।

[English: Explain the far-reaching effects of the partition of India in 1947.]

ভূমিকা

১৯৪৭ সালের ১৪ ও ১৫ আগস্ট ব্রিটিশদের প্রায় দুই শতাব্দীর ঔপনিবেশিক শোষণের অবসান ঘটিয়ে মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনা এবং ‘ভারতীয় স্বাধীনতা আইন ১৯৪৭’ (Indian Independence Act 1947)-এর মাধ্যমে জন্ম নেয় দুটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র—পাকিস্তান ও ভারত। এটি কেবল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মানচিত্র বদল ছিল না, বরং বিংশ শতাব্দীর মানব ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম, রক্তক্ষয়ী ও সুদূরপ্রসারী ভূরাজনৈতিক ট্র্যাজেডি ছিল এই দেশভাগ। এর বহুমাত্রিক রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অভিঘাত আজও দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের সার্বিক রাজনীতি ও ভূরাজনীতিকে প্রভাবিত করছে।

ভারত বিভক্তির সুদূর-প্রসারী ফলাফলসমূহ

  • ১. শতাব্দীর ভয়াবহতম সাম্প্রদায়িক গণহত্যা:
    র‍্যাডক্লিফ সীমানা কমিশনের মনগড়া ও তড়িঘড়ি প্রস্তুতকৃত মানচিত্র প্রকাশের সাথে সাথে সমগ্র পাঞ্জাব, বাংলা, দিল্লি ও বিহারে এক অবর্ণনীয় ও উন্মত্ত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। লুটপাট, নারী নির্যাতন এবং উন্মাদ হত্যাযজ্ঞে প্রায় ১০ থেকে ১৫ লক্ষ নিরীহ মানুষ প্রাণ হারায়। হাজার বছরের প্রতিবেশীর সম্পর্ক রাতারাতি চরম ঘৃণায় রূপান্তরিত হয়।
  • ২. ইতিহাসের বৃহত্তম মানব স্থানান্তর ও দীর্ঘস্থায়ী উদ্বাস্তু সমস্যা:
    দেশভাগের ফলে প্রায় দেড় কোটি (১৫ মিলিয়ন) মানুষ ভিটেমাটি হারিয়ে রাতারাতি ঠিকানাহীন শরণার্থীতে পরিণত হয়। লাখ লাখ হিন্দু ও শিখ ভারত অভিমুখে এবং লাখ লাখ মুসলিম পাকিস্তান অভিমুখে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পায়ে হেঁটে ও ট্রেনের ছাদে চড়ে দেশান্তর হয়। এই বিপুলসংখ্যক ছিন্নমূল মানুষের পুনর্বাসন ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশের অর্থনীতি ও সমাজকে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে চরম বিপর্যয়ের মধ্যে রেখেছিল।
  • ৩. কাশ্মীর সংকট ও চিরস্থায়ী পারমাণবিক সীমান্ত বৈরিতা:
    দেশভাগের ফলে দেশীয় রাজ্যগুলোর সংযুক্তি নিয়ে মারাত্মক সংকট তৈরি হয়, যার মধ্যে সবচেয়ে জটিল আকার ধারণ করে জম্মু ও কাশ্মীর। কাশ্মীরের রাজা হরি সিং ভারতীয় সেনার সমর্থনে ভারতে অন্তর্ভুক্তির দলিলে স্বাক্ষর করলে পাকিস্তান এর বিরোধিতা করে এবং ১৯৪৭-৪৮ সালেই উভয় দেশ প্রথম কাশ্মীর যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এই কাশ্মীর সংকট পরবর্তীতে ১৯৬৫, ১৯৭১ এবং ১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধের মূল কারণে পরিণত হয়। বর্তমানে দুই বৈরী পারমাণবিক শক্তিধর দেশের উপস্থিতিতে কাশ্মীর বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক ফ্ল্যাশপয়েন্টে পরিণত হয়েছে।
  • ৪. পাকিস্তান রাষ্ট্রের অস্বাভাবিক ভৌগোলিক কাঠামো ও বাংলাদেশের অভ্যুদয়:
    দেশভাগের সবচেয়ে মারাত্মক ত্রুটি ছিল কেবল ধর্মের ভিত্তিতে এক হাজার মাইলের দূরত্বে অবস্থিত পূর্ব বাংলা (পূর্ব পাকিস্তান) ও পশ্চিম পাকিস্তানকে নিয়ে একটি অদ্ভুত ও কৃত্রিম রাষ্ট্র কাঠামো গঠন। শুরু থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ব পাকিস্তানের ওপর রাজনৈতিক নিপীড়ন, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসন (১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন) চাপিয়ে দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় এক রক্তাক্ত রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালে নয় মাসের সশস্ত্র মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ-এর সৃষ্টি হয়, যা কার্যত ১৯৪৭-এর ধর্মভিত্তিক দ্বিজাতিতত্ত্বকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ করে।
  • ৫. শিল্প, কৃষি ও প্রাকৃতিক সম্পদের বিপর্যয়কর বিভাজন:
    দেশভাগ অবিভক্ত ভারতের সুষম অর্থনীতিকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। যেমন—কাঁচা পাটের সিংহভাগ উৎপাদিত হতো পূর্ব বাংলায়, কিন্তু সমস্ত পাটকল ছিল ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায়। ফলে কৃষক কাঁচামালের দাম হারায় এবং ভারতের কারখানাগুলো সংকটে পড়ে। একইভাবে অবিভক্ত পাঞ্জাবের নদী ও সেচ ব্যবস্থা বিভক্ত হওয়ায় দুই দেশের মধ্যে সৃষ্টি হয় পানি বিরোধ (যা পরবর্তীতে ১৯৬০ সালের সিন্ধু পানি চুক্তির মাধ্যমে সমাধান করতে হয়)।
  • ৬. দক্ষিণ এশিয়ার লাগামহীন সামরিকায়ন ও অর্থনৈতিক ক্ষতি:
    ভারত ও পাকিস্তানের পরস্পরবিরোধী সন্দেহের কারণে উভয় দেশ জাতীয় বাজেটের সিংহভাগ অর্থ সামরিক খাত, প্রতিরক্ষা ও অস্ত্র ক্রয়ে ব্যয় করতে শুরু করে। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দারিদ্র্য দূরীকরণের মতো মৌলিক খাতগুলো মারাত্মকভাবে উপেক্ষিত হয়। আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বাণিজ্য কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।
  • ৭. ভারতীয় মুসলমানদের সংখ্যালঘু মানসিক সংকট:
    দেশভাগের ফলে ভারতে থেকে যাওয়া কোটি কোটি মুসলমান চরম মানসিক নিরাপত্তাহীনতা ও পরিচয় সংকটে পড়ে। উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির উত্থানের মুখে তাঁদের প্রায়শই রাজনৈতিক সন্দেহের চোখে দেখা এবং প্রান্তিকীকরণের শিকার হতে হয়।

উপসংহার

১৯৪৭ সালের ভারত বিভক্তি একদিকে যেমন ঔপনিবেশিক পরাধীনতা থেকে ভারতীয়দের স্বাধীনতা এনে দিয়েছিল, অন্যদিকে তা দক্ষিণ এশিয়ার ভূখণ্ডে এমন এক গভীর ও স্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি করেছে যা পৌনে এক শতাব্দী পরেও শুকায়নি। ভৌগোলিক সীমানার এই রক্তাক্ত বিভাজন দুই প্রতিবেশী দেশের সাধারণ মানুষের হৃদয়ে যে অবিশ্বাস ও দূরত্বের প্রাচীর গড়ে তুলেছে, তা আজও আঞ্চলিক শান্তি, প্রবৃদ্ধি ও সৌহার্দ্যের সবচেয়ে বড় অন্তরায়।


খ বিভাগ (সংক্ষিপ্ত উত্তর প্রশ্ন)

[যে কোনো দুইটি প্রশ্নের উত্তর দাও। প্রতিটি প্রশ্নের মান ১০: ১০ × ২ = ২০]

৯. ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানী।

[English: East-India Company.]

প্রতিষ্ঠা ও রাজকীয় সনদ

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি (British East India Company) ছিল বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী যৌথ মূলধনি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। ১৬০০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ইংল্যান্ডের রানী প্রথম এলিজাবেথ লন্ডনের ২১৭ জন বণিককে উত্তমাশা অন্তরীপ হয়ে প্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে বাণিজ্যের একচ্ছত্র অধিকার প্রদান করে একটি ঐতিহাসিক রাজকীয় সনদ (Royal Charter) দেন। প্রতিষ্ঠানটির প্রাতিষ্ঠানিক নাম ছিল “দ্য গভর্নর অ্যান্ড কোম্পানি অব মার্চেন্টস অব লন্ডন ট্রেডিং ইনটু দ্য ইস্ট ইন্ডিজ” (The Governor and Company of Merchants of London Trading into the East Indies)।

ভারতে আগমন ও বাণিজ্যকুঠি বিস্তার

১৬০৮ সালে ক্যাপ্টেন উইলিয়াম হকিন্স মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের দরবারে উপস্থিত হয়ে বাণিজ্য কুঠি স্থাপনের অনুমতি প্রার্থনা করেন। ১৬১২ সালে সুরাটে কোম্পানির প্রথম স্থায়ী বাণিজ্য কুঠি স্থাপিত হয়। এরপর সুচতুর কূটনীতি ও সামরিক শক্তির মাধ্যমে কোম্পানি মাদ্রাজ (ফোর্ট সেন্ট জর্জ, ১৬৪৪), বোম্বে (১৬৬৮) এবং বাংলায় কলকাতা নগরী প্রতিষ্ঠা করে সেখানে ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ (১৭০০) গড়ে তোলে। ১৭১৭ সালে মোগল সম্রাট ফারুকশিয়ার কোম্পানিকে নামমাত্র বার্ষিক করের বিনিময়ে শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের যে রাজকীয় ফরমান (দস্তক) প্রদান করেন, তা কোম্পানির বাণিজ্যিক আধিপত্যকে অপ্রতিরোধ্য করে তোলে।

বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর

বাংলায় নবাব সিরাজউদ্দৌলার সাথে কোম্পানির সংঘাতের মধ্য দিয়ে তাদের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা উন্মোচিত হয়। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন লর্ড ক্লাইভের কূটকৌশলে ঐতিহাসিক পলাশীর যুদ্ধে নবাবের পরাজয়ের মাধ্যমে বাংলায় ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তি স্থাপিত হয়। এরপর ১৭৬৪ সালের বক্সারের যুদ্ধে মোগল সম্রাট শাহ আলম, অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলা এবং মীর কাসেমের সম্মিলিত বাহিনীকে পরাজিত করে কোম্পানি অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিতে পরিণত হয়। ১৭৬৫ সালে সম্রাট শাহ আলমের কাছ থেকে ক্লাইভ বাংলা, বিহার ও ওড়িশার দেওয়ানি (রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা) লাভ করেন। দেওয়ানি লাভের মাধ্যমে কোম্পানি একাধারে ব্যবসায়ী এবং দেশের রাজনৈতিক শাসকে রূপান্তরিত হয়।

কোম্পানির শাসন ও কুখ্যাত শোষণ

দেওয়ানি লাভের পর ক্লাইভ কুখ্যাত ‘দ্বৈত শাসন’ (১৭৬৫-১৭৭২) ব্যবস্থা কায়েম করেন, যার ফলে কোম্পানি পায় ক্ষমতাহীন দায়হীন অবাধ রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা আর নবাবের ওপর থাকে দায়িত্বহীন বিচারকাজ। এর প্রত্যক্ষ পরিণতিতে ১৭৭০ সালে (বাংলা ১১৭৬) নেমে আসে মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহতম দুর্ভিক্ষ ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’, যাতে বাংলার এক-তৃতীয়াংশ মানুষ অনাহারে মারা যায়। এরপর ওয়ারেন হেস্টিংস, লর্ড কর্নওয়ালিস (১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত), লর্ড ওয়েলেসলি (অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি) এবং লর্ড ডালহৌসি (স্বত্ববিলোপ নীতি)-র মতো সাম্রাজ্যবাদী গভর্নর জেনারেলদের মাধ্যমে প্রায় সমগ্র ভারত কোম্পানির অধীনে চলে আসে।

কোম্পানি শাসনের পতন ও বিলোপ

কোম্পানির নির্বিচার লুণ্ঠন, চরম অর্থনৈতিক শোষণ, ধর্মীয় অবমাননা ও সামরিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে ভারতীয়দের দীর্ঘ পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে ১৮৫৭ সালের ঐতিহাসিক মহাবিদ্রোহে (সিপাহী বিপ্লব)। এই বিদ্রোহের তীব্রতায় কেঁপে ওঠে লন্ডন। ফলে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ১৮৫৮ সালে “ভারত শাসন আইন ১৮৫৮” পাসের মাধ্যমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির যাবতীয় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা বিলুপ্ত করে এবং সরাসরি রানী ভিক্টোরিয়া ও ব্রিটিশ সরকারের নিয়ন্ত্রণে ভারতের শাসনভার গ্রহণ করে।


১০. স্যার সৈয়দ আহমদ খাঁন।

[English: Sir Syed Ahmed Khan.]

পরিচিতি ও প্রারম্ভিক জীবন

স্যার সৈয়দ আহমদ খান (১৮১৭-১৮৯৮ খ্রি.) ছিলেন উনিশ শতকের ব্রিটিশ ভারতের মুসলিম নবজাগরণের মহান দিশারী, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, দার্শনিক ও সমাজ সংস্কারক। তিনি দিল্লির এক সম্ভ্রান্ত ও উচ্চপদস্থ মোগল পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। প্রথম জীবনে তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিচার বিভাগে সাব-জজ হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহকে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে প্রত্যক্ষ করেছিলেন এবং এর পরবর্তী ধ্বংসাত্মক পরিণতি থেকে ভারতীয় মুসলমানদের রক্ষা করতে নিজের জীবন উৎসর্গ করেন।

আলিগড় আন্দোলন ও সংস্কার দর্শন

১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ সরকার ভারতীয় মুসলমানদেরকে বিদ্রোহের মূল ষড়যন্ত্রকারী মনে করে চরম প্রতিহিংসামূলক আচরণ শুরু করে। মুসলিম সমাজকে অর্থনৈতিক, শিক্ষাগত ও সামাজিক ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে তিনি যে সর্বাত্মক আধুনিক সংস্কার আন্দোলন শুরু করেন, তা ইতিহাসে ‘আলিগড় আন্দোলন’ (Aligarh Movement) নামে খ্যাত। স্যার সৈয়দ আহমদ যুক্তি দিয়ে দেখান যে, কুরআন ও বিশুদ্ধ ইসলামি শিক্ষা আধুনিক বিজ্ঞান ও যুক্তির সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ (“The Word of God cannot be in contradiction to the Work of God”)। তিনি মুসলমানদের ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কুসংস্কার ত্যাগ করে পাশ্চাত্য আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ইংরেজি শিক্ষা অর্জনের উদাত্ত আহ্বান জানান।

ঐতিহাসিক গ্রন্থাবলি ও প্রচারপত্র

  • আসবাব-ই-বাঘাওয়াত-ই-হিন্দ (১৮৫৮): ‘ভারতের বিদ্রোহের কারণসমূহ’ শীর্ষক এই সাহসী গ্রন্থে তিনি ব্রিটিশ সরকারের ভুল নীতি, প্রজাদের অভাব-অভিযোগ অগ্রাহ্য করা এবং ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের ঔদ্ধত্যকে সিপাহী বিদ্রোহের প্রকৃত কারণ হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি প্রমাণ করেন যে বিদ্রোহের জন্য মুসলমানরা এককভাবে দায়ী নয়।
  • তাহজিবুল আখলাক (১৮৭০): মুসলিম সমাজের নৈতিক চরিত্র গঠন, কুসংস্কার বর্জন ও সামাজিক সংস্কারের উদ্দেশ্যে তিনি এই বিখ্যাত উর্দু সাময়িকীটি প্রকাশ করেন।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান

স্যার সৈয়দ আহমদ খান বিশ্বাস করতেন শিক্ষাই মুসলিম জাতির মুক্তির একমাত্র চাবিকাঠি। তাঁর প্রধান শিক্ষামূলক পদক্ষেপসমূহ:

  1. ১৮৬৪ সালে গাজিপুরে প্রতিষ্ঠা করেন ‘সায়েন্টিফিক সোসাইটি’ (Scientific Society), যার মূল কাজ ছিল পাশ্চাত্য জ্ঞানবিজ্ঞান ও ইতিহাসের মূল্যবান ইংরেজি গ্রন্থসমূহ উর্দু ভাষায় অনুবাদ করে সাধারণ মুসলিমদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া।
  2. ১৮৭৫ সালে তিনি ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে আলিগড়ে প্রতিষ্ঠা করেন ঐতিহাসিক ‘মোহামেডান অ্যাংলো-ওরিয়েন্টাল কলেজ’ (M.A.O College)। এই কলেজটিই পরবর্তীতে ১৯২০ সালে অবিভক্ত ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাपीठ ‘আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়’-এ রূপান্তরিত হয়।
  3. ১৮৮৬ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘অল ইন্ডিয়া মোহামেডান এডুকেশনাল কনফারেন্স’, যা সমগ্র ভারতের মুসলমানদের মধ্যে আধুনিক শিক্ষার চেতনা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

রাজনৈতিক চিন্তা ও ঐতিহাসিক মূল্যায়ন

স্যার সৈয়দ আহমদ খান মুসলমানদের তৎকালীন কংগ্রেসের রাজনীতি থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক ভিত্তিকে শক্তিশালী না করে রাজনীতিতে জড়ালে মুসলিম সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি ব্রিটিশ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিপরীতে ভারতীয় মুসলমানদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অধিকার ও বৈশিষ্ট্যের কথা প্রথম স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করেছিলেন। তাঁর এই রাজনৈতিক দর্শনই পরবর্তীকালে আল্লামা ইকবাল ও কায়েদে আযম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব’ এবং পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক তাত্ত্বিক ভিত্তি রচনা করেছিল। ১৮৯৮ সালের ২৭ মার্চ এই মহান মনীষী আলিগড়ে মৃত্যুবরণ করেন।


১১. খেলাফত আন্দোলন।

[English: Khilafat Movement.]

আন্দোলনের সংজ্ঞা ও প্রেক্ষাপট

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে (১৯১৯-১৯২৪) তুরস্কের উসমানীয় খিলাফতের পবিত্রতা, সার্বভৌমত্ব ও ইসলামী পবিত্র স্থানসমূহের নিরাপত্তা রক্ষার দাবিতে ভারতীয় মুসলিমদের নেতৃত্বে পরিচালিত ব্রিটিশবিরোধী ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আন্দোলনই ‘খেলাফত আন্দোলন’ নামে পরিচিত। বিশ্ব মুসলিমের আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে তুরস্কের সুলতান ‘খলিফা’ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমান সাম্রাজ্যের পরাজয়ের পর বিজয়ী মিত্রশক্তি বিশেষ করে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড লয়েড জর্জ তাঁর প্রদত্ত যুদ্ধকালীন প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে তুরস্কের খিলাফতকে ভেঙে ফেলার উদ্যোগ নেন। ১৯২০ সালের অবমাননাকর ‘সেভার্স চুক্তি’ দ্বারা তুর্কি সাম্রাজ্য খণ্ডবিখণ্ড করা হলে ভারতীয় মুসলিমদের ধর্মীয় অনুভূতিতে চরম আঘাত লাগে।

নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক বিস্তার

খেলাফত আন্দোলনের মূল কাণ্ডারী ছিলেন উপমহাদেশের দুই অবিসংবাদিত বিপ্লবী ভাই—মাওলানা মোহাম্মদ আলী এবং মাওলানা শওকত আলী, যাঁরা ইতিহাসে ‘আলী ভ্রাতৃদ্বয়’ (Ali Brothers) নামে সুপরিচিত। তাঁদের সাথে এই আন্দোলনের পুরোধা হিসেবে যুক্ত হন স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, ডা. মুখতার আহমদ আনসারী, হাকিম আজমল খান, মাওলানা হাসরাত মোহানী এবং সৈয়দ সুলায়মান নদভী। ১৯১৯ সালের মার্চে গঠিত হয় ‘সেন্ট্রাল খেলাফত কমিটি’ এবং নভেম্বর মাসে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত খেলাফত সম্মেলনের মাধ্যমে সমগ্র ভারতে প্রতিরোধ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।

গান্ধীজির ভূমিকা ও অসহযোগের সাথে সংযোগ

মহাত্মা গান্ধী ও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস খেলাফত আন্দোলনকে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে হিন্দু-মুসলিম ঐক্য গড়ে তোলার এক মোক্ষম ও ঐতিহাসিক সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেন। গান্ধীজির আহ্বানে ১৯২০ সালে খেলাফত কমিটি এবং কংগ্রেস যৌথভাবে ‘অহিংস অসহযোগ আন্দোলন’ শুরু করে। এই যৌথ আন্দোলনের কর্মসূচির মধ্যে ছিল:

  • ব্রিটিশ সরকার প্রদত্ত খেতাব, মেডেল ও উপাধি বর্জন।
  • সরকারি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং আদালত বর্জন।
  • ব্রিটিশ পণ্য ও বিলাতি বস্ত্র বর্জন এবং স্বদেশী খদ্দর বস্ত্রের ব্যবহার।
  • সরকারি চাকরি ও সেনাবাহিনীতে যোগদানে অস্বীকৃতি এবং কর প্রদান বন্ধের আহ্বান।

এর ফলে সমগ্র ভারতে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির এক অভূতপূর্ব নজির স্থাপিত হয়। হাজার হাজার মানুষ কারাবরণ করেন এবং ব্রিটিশ শাসন ব্যবস্থা প্রায় অচল হয়ে পড়ে।

আন্দোলনের সমাপ্তি ও তাৎপর্য

১৯২২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি উত্তরপ্রদেশের চৌরিচৌরায় সংঘটিত একটি বিচ্ছিন্ন হিংসাত্মক ঘটনার কারণে মহাত্মা গান্ধী একতরফাভাবে অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিলে খেলাফত আন্দোলনে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় এবং ব্রিটিশরা দমনপীড়ন চালিয়ে এর মূল নেতাদের কারারুদ্ধ করে। সবশেষে ১৯২৪ সালে তুরস্কের মহান বিপ্লবী নেতা মুস্তফা কামাল আতাতুর্ক তুরস্ককে আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করে উসমানীয় খিলাফত চিরতরে বিলুপ্ত করেন। ফলে খিলাফত আন্দোলনের প্রাসঙ্গিকতা স্বাভাবিকভাবেই শেষ হয়ে যায়। তবে এই আন্দোলন উপমহাদেশের সাধারণ মুসলিম জনসমাজকে প্রথমবারের মতো রাজপথের রাজনীতিতে নামিয়ে রাজনৈতিক সচেতনতা ও আত্মবিশ্বাসের অভূতপূর্ব ভিত্তি স্থাপন করেছিল।


১২. লাহোর প্রস্তাব।

[English: Lahore Resolution.]

উত্থাপন ও ঐতিহাসিক পটভূমি

১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের পাঞ্জাবের ঐতিহাসিক শহর লাহোরের বিখ্যাত ইকবাল পার্কে (বর্তমানে গ্রেটার ইকবাল পার্ক/মিন্টো পার্ক) অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত মুসলিম লীগের ২৭তম বার্ষিক সাধারণ অধিবেশনে যে ঐতিহাসিক প্রস্তাবটি গৃহীত হয়, তা ইতিহাসে ‘লাহোর প্রস্তাব’ (Lahore Resolution) নামে খ্যাত। মুসলিম লীগের এই ঐতিহাসিক অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন কায়েদে আযম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং প্রস্তাবটি আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করেন বাংলার তৎকালীন জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী ও বিশিষ্ট জননেতা শের-ই-বাংলা এ. কে. ফজলুল হক। চৌধুরী খালিকুজ্জামান এই প্রস্তাবের সমর্থন করেন।

লাহোর প্রস্তাবের মূল ধারাসমূহ

লাহোর প্রস্তাবের মূল পাঠে উপমহাদেশের ভবিষ্যৎ শাসনতান্ত্রিক রূপরেখা সম্পর্কে সুস্পষ্ট বিধান প্রদান করা হয়েছিল। এর প্রধান অংশগুলো হলো:

  1. ভৌগোলিক সান্নিধ্য ও সীমানা নির্ধারণ: কোনো সাংবিধানিক পরিকল্পনা ভারতে কার্যকর বা মুসলমানদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না, যদি না তা ভৌগোলিকভাবে পরস্পর সংলগ্ন এলাকাগুলোকে পৃথক অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করার মৌলিক নীতির ওপর রচিত হয়।
  2. স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ (Independent States) গঠন: ভারতের উত্তর-পশ্চিম এবং পূর্বাঞ্চলের মতো যে সকল এলাকায় মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেগুলোকে এমনভাবে বিন্যস্ত করতে হবে যাতে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোকে নিয়ে ‘স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ’ (Independent States) গঠিত হতে পারে, যার অঙ্গরাজ্যগুলো বা উপাদান এককগুলো হবে সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৌম (Autonomous and Sovereign)।
  3. সংখ্যালঘুদের সাংবিধানিক রক্ষাকবচ: এসব স্বাধীন রাষ্ট্রীয় অঞ্চলের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও অন্যান্য অধিকার এবং স্বার্থ যথাযথভাবে সুরক্ষার জন্য তাঁদের সাথে পরামর্শ সাপেক্ষে সংবিধানে কার্যকর, বাধ্যতামূলক ও সুনির্দিষ্ট রক্ষাকবচ রাখতে হবে। একইভাবে ভারতের অন্যান্য অংশে যেখানে মুসলমানরা সংখ্যালঘু, সেখানেও অনুরূপ রক্ষাকবচ থাকতে হবে।

‘States’ বনাম ‘State’ বিতর্ক ও বাংলাদেশ

শের-ই-বাংলা এ. কে. ফজলুল হক কর্তৃক উত্থাপিত মূল লাহোর প্রস্তাবে সুস্পষ্টভাবে বহুবচনে ‘States’ (স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছিল। এর ঐতিহাসিক তাৎপর্য ছিল—ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের মুসলিম অঞ্চলের জন্য একটি রাষ্ট্র এবং পূর্বাঞ্চলের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলা ও আসামকে নিয়ে সম্পূর্ণ পৃথক আরেকটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠিত হবে। কিন্তু ১৯৪৬ সালের এপ্রিল মাসে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগ আইনপ্রণেতাদের কনভেনশনে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এক বিতর্কিত ও অনানুষ্ঠানিক সংশোধনী এনে দাবি করেন যে ‘States’ শব্দটি ছিল মূলত একটি মুদ্রণ প্রমাদ (Typographical error) এবং তিনি বহুবচনকে একবচন ‘State’-এ রূপান্তর করে একক পাকিস্তান রাষ্ট্রের দাবি করেন। এই পরিবর্তনের প্রতিবাদ বাঙালি নেতারা করেছিলেন। মূল লাহোর প্রস্তাবের এই দ্ব্যর্থহীন সার্বভৌমত্বের অধিকারই ১৯৭১ সালে বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রাম ও স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মূল নৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রেরণা জুগিয়েছিল।

ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও ফলাফল

লাহোর প্রস্তাবের পর হিন্দু প্রেস ও সংবাদপত্রগুলো একে উপহাস করে ‘পাকিস্তান প্রস্তাব’ (Pakistan Resolution) বলে আখ্যায়িত করে, যা পরবর্তীতে মুসলিম লীগ গর্বভরে গ্রহণ করে। এই প্রস্তাব ভারতীয় মুসলিমদের রাজনীতিকে নিছক সংখ্যালঘু অধিকার রক্ষার আবেদন-নিবেদনের রাজনীতি থেকে মুক্ত করে একটি স্বাধীন জাতি গঠনের সংগ্রামে উন্নীত করে। লাহোর প্রস্তাবের ওপর ভিত্তি করেই সাত বছরের সংক্ষিপ্ত সময়ের ব্যবধানে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট রক্তক্ষয়ী দেশভাগের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর মানচিত্রে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল।


সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. ১৮৫৮ সালের ভারত শাসন আইনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন কী ছিল?

১৮৫৮ সালের ভারত শাসন আইনের মাধ্যমে ভারতে দীর্ঘ আড়াই শতাব্দীর ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔপনিবেশিক বাণিজ্যিক শাসনের অবসান ঘটে এবং ভারতের শাসনভার সরাসরি ব্রিটিশ রাজমুকুটের (British Crown) অধীনে হস্তান্তরিত হয়। গভর্নর জেনারেলকে ‘ভাইসরয়’ বা রাজপ্রতিনিধি উপাধি দেওয়া হয় এবং লর্ড ক্যানিং ভারতের প্রথম ভাইসরয় নিযুক্ত হন।

২. অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউম কেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেছিলেন?

অবসরপ্রাপ্ত ব্রিটিশ আইসিএস কর্মকর্তা এ. ও. হিউম ভারতীয়দের ক্রমবর্ধমান ক্ষোভ ও ১৮৫৭ সালের মতো আরেকটি সশস্ত্র গণবিস্ফোরণ ঠেকাতে সাংবিধানিক ও নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে শিক্ষিত ভারতীয়দের মনোভাব প্রকাশের একটি নির্গমন পথ বা ‘সেফটি ভাল্ব’ (Safety Valve) হিসেবে ১৮৮৫ সালে কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

৩. দুদু মিয়ার বিপ্লবী ভূমিনীতি কী ছিল?

ফরায়েজী নেতা মুহসিনুদ্দীন আহমদ ওরফে দুদু মিয়ার কালজয়ী বিপ্লবী ঘোষণা ছিল—”জমির প্রকৃত মালিক মহান আল্লাহ, সুতরাং জমিতে খাজনা ধার্য করার বা কর আদায়ের কোনো অধিকার কোনো জমিদারের নেই।” এই নীতির মাধ্যমে তিনি হিন্দু জমিদার ও ইংরেজ নীলকরদের অবৈধ করের বিরুদ্ধে কৃষকদের সংগঠিত প্রতিরোধে নামান।

৪. নওয়াব আব্দুল লতিফকে কেন ‘বাংলার স্যার সৈয়দ আহমদ’ বলা হয়?

উত্তর ভারতের স্যার সৈয়দ আহমদ খানের মতো উনিশ শতকের বাংলায় পশ্চাৎপদ ও রক্ষণশীল মুসলিম সমাজকে আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষা ও বিজ্ঞানের আলোয় আলোকিত করতে নওয়াব আব্দুল লতিফ মোহামেডান লিটারেরি সোসাইটি প্রতিষ্ঠা, মহসিন ফান্ডের অর্থ মুসলিম শিক্ষায় বরাদ্দ এবং মাদ্রাসার আধুনিকায়নে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বিধায় তাঁকে ‘বাংলার স্যার সৈয়দ’ বলা হয়।

৫. ১৯১৬ সালের লক্ষ্ণৌ চুক্তিকে কেন ভারতীয় রাজনীতির মাইলফলক বলা হয়?

লক্ষ্ণৌ চুক্তির মাধ্যমে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রথমবারের মতো মুসলিম সম্প্রদায়ের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব ও পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার দাবি মেনে নেয় এবং মুসলিম লীগ ও কংগ্রেস প্রথমবারের মতো একক মঞ্চে ব্রিটিশবিরোধী সাধারণ শাসনতান্ত্রিক দাবি তুলে ধরে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির ঐতিহাসিক নজির স্থাপন করে।

৬. ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবে “States” শব্দের ঐতিহাসিক তাৎপর্য কী ছিল?

মূল লাহোর প্রস্তাবে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে বহুবচনে ‘স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ’ (Independent States) প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছিল, যার অর্থ ছিল উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে একটি এবং পূর্ব ভারতে (বাংলায়) আরেকটি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে। এই নীতিই পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মূল আদর্শিক ও ঐতিহাসিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *