ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ৩য় বর্ষ পরীক্ষা 2023
বিভাগ: ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
বিষয়: আধুনিক তুরস্ক, ইরান ও আফগানিস্তানের ইতিহাস
বিষয় কোড: 205304 | পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
[দ্রষ্টব্য: (ক) বিভাগ থেকে ৪টি এবং (খ) বিভাগ থেকে ৪টি প্রশ্নের উত্তর দাও।]
ক বিভাগ: রচনামূলক প্রশ্নাবলি
১. কামালবাদ কী? কামালবাদের অধীনে তুরস্কে সূচিত প্রধান সংস্কারসমূহ পর্যালোচনা কর।
[What is Kemalism? Review the major reforms introduced under Kemalism in Turkey.]
ক. কামালবাদের সংজ্ঞা ও ছয়টি মূলনীতি (Six Arrows):
আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ তুরস্ক প্রজাতন্ত্রের জনক মুস্তফা কামাল আতাতুর্ক (১৮৮১-১৯৩৮) ঐতিহ্যবাহী উসমানীয় সাম্রাজ্যের ধ্বংসস্তূপের ওপর একটি পশ্চিমা ধাঁচের প্রগতিশীল, আধুনিক ও সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র বিনির্মাণের লক্ষ্যে যে রাষ্ট্রদর্শন ও সংস্কার কর্মসূচি প্রবর্তন করেন তাকে কামালবাদ (Kemalism) বলা হয়। আতাতুর্কের রিপাবলিকান পিপলস পার্টির প্রতীকে এটি ‘ছয়টি তীর’ (Six Arrows) নামে বিধিবদ্ধ হয়: ১. প্রজাতন্ত্রবাদ (Republicanism), ২. জাতীয়তাবাদ (Nationalism), ৩. ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ (Secularism), ৪. গণমুখী নীতি (Populism), ৫. রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি (Statism), এবং ৬. সংস্কারবাদ বা বিপ্লববাদ (Reformism/Revolutionism)।
খ. কামালবাদের অধীনে তুরস্কে সূচিত প্রধান সংস্কারসমূহ:
- রাজনৈতিক ও আইনি সংস্কার: ১৯২২ সালে সালতানাত এবং ১৯২৪ সালের ৩ মার্চ শতাব্দীপ্রাচীন ইসলামি খিলাফত চিরতরে বিলুপ্ত করা হয়। শরীয়াহ আদালত ও উসমানীয় কানুন বাতিল করে সুইস দেওয়ানি আইন, ইতালীয় ফৌজদারি আইন এবং জার্মান বাণিজ্যিক আইনের প্রবর্তন করা হয়। নারীদের বহুবিবাহ নিষিদ্ধ করে বিবাহ ও তালাকের ক্ষেত্রে পুরুষদের সমমর্যাদা দেওয়া হয়।
- শিক্ষা ও ভাষাগত বৈপ্লবিক সংস্কার: ১৯২৮ সালে আরবি বর্ণমালার পরিবর্তে তুর্কি ভাষার জন্য লাতিন বর্ণমালা বাধ্যতামূলক করা হয় এবং এক রাতের মধ্যে নিরক্ষরতা দূরীকরণে গণপাঠশালা (Millet Mektepleri) চালু করা হয়। ধর্মীয় মাদরাসা ও খানকাহসমূহ বন্ধ করে একমুখী আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়।
- সামাজিক ও পোশাক সংস্কার: ১৯২৫ সালের টুপি আইন (Hat Law) দ্বারা ঐতিহ্যবাহী উসমানীয় ‘ফেজ’ (Fez) টুপি নিষিদ্ধ করে পশ্চিমা হ্যাট পরা বাধ্যতামূলক করা হয়। নারীদের হিজাব ও পর্দাপ্রথা নিরুৎসাহিত করা হয় এবং ১৯৩৪ সালে উপাধি আইন (Surname Law) পাস করে বংশগত পাশা, বে উপাধির বদলে পারিবারিক পদবি গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়।
- নারীর ক্ষমতায়ন: ইউরোপের বহু দেশের আগেই ১৯৩০ সালে পৌরসভা এবং ১৯৩৪ সালে জাতীয় নির্বাচনে তুর্কি নারীদের ভোটাধিকার ও সংসদে নির্বাচিত হওয়ার পূর্ণ রাজনৈতিক অধিকার প্রদান করা হয়।
- অর্থনৈতিক সংস্কার: রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে শিল্পায়ন (ইতিরিশ ব্যাংক ও সুমের ব্যাংক), রেলযোগাযোগের সম্প্রসারণ এবং কৃষকদের ওপর থেকে প্রাচীন ‘আশার’ (উশর) কর বাতিল করে দেশীয় কৃষকদের স্বস্তি প্রদান করা হয়।
২. ইরানের তেল সম্পদ জাতীয়করণে ড. মোসাদ্দেকের ভূমিকা মূল্যায়ন কর এবং এর ব্যর্থতার কারণ নিরূপণ কর।
[Evaluate the role of Dr. Mosaddeq in the nationalization of oil resources of Iran and determine the causes of its Failure.]
ক. ড. মোসাদ্দেকের ভূমিকা ও তেল জাতীয়করণ (১৯৫১):
বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি ইরানের তেল খনিগুলোর ওপর ব্রিটিশ কোম্পানি ‘অ্যাংলো-ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানি’ (AIOC)-র একচেটিয়া লুটেরা আধিপত্য ছিল। ইরানের জাতীয়তাবাদী নেতা ড. মোহাম্মদ মোসাদ্দেক ‘ন্যাশনাল ফ্রন্ট’ (National Front) গঠন করে বিদেশি শোষণের বিরুদ্ধে তীব্র গণআন্দোলন গড়ে তোলেন। ১৯৫১ সালের মার্চ মাসে তাঁর নেতৃত্বে ইরানি পার্লামেন্ট (মজলিশ) সর্বসম্মতিক্রমে ঐতিহাসিক তেল সম্পদ জাতীয়করণ বিল পাস করে।
জনগণের বিপুল সমর্থনে ১৯৫১ সালের মে মাসে ড. মোসাদ্দেক ইরানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তিনি ব্রিটিশ কোম্পানিকে বরখাস্ত করে ইরানের তেল খনিগুলো রাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেন এবং হেগের আন্তর্জাতিক আদালত ও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ইরানের সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর এ সাহসী পদক্ষেপ সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনার আগুন জ্বালিয়ে দেয়।
খ. মোসাদ্দেকের ব্যর্থতা ও পতনের কারণসমূহ (১৯৫৩):
- অপারেশন অ্যাজাক্স (Operation Ajax): ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা MI6 এবং মার্কিন সিআইএ (CIA) যৌথভাবে ‘অপারেশন অ্যাজাক্স’ পরিচালনা করে। তারা লক্ষ লক্ষ ডলার ঘুষ দিয়ে রাজপথের গুন্ডা, রাজনীতিবিদ ও সংবাদমাধ্যমকে ভাড়া করে কৃত্রিম দাঙ্গা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।
- আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অবরোধ: ব্রিটেন বিশ্ববাজারে ইরানি তেল বিক্রির ওপর আন্তর্জাতিক অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং পারস্য উপসাগরে রাজকীয় নৌবহর মোতায়েন করে। ফলে তেলের রাজস্ব বন্ধ হয়ে ইরানে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট, মুদ্রাস্ফীতি ও বেকারত্ব দেখা দেয়।
- আভ্যন্তরীণ ঐক্যফ্রন্টে ফাটল: মোসাদ্দেকের ধর্মনিরপেক্ষ নীতি ও জরুরি ক্ষমতার ব্যবহারে আয়াতুল্লাহ কাশানির মতো শীর্ষ ধর্মীয় নেতা এবং রক্ষণশীল মজলিশ সদস্যরা তাঁর ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে জোট ত্যাগ করেন। কট্টর কমিউনিস্ট তুদেহ পার্টির সাথে সম্পৃক্ততার মিথ্যা জুজু দেখিয়ে সেনাবাহিনীকে তাঁর বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলা হয়।
- ১৯৫৩ সালের সামরিক অভ্যুত্থান: ১৯৫৩ সালের ১৯ আগস্ট জেনারেল ফজলুল্লাহ জাহেদীর নেতৃত্বে রাজকীয় সেনাবাহিনী মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত ও বন্দি করে। পলাতক শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি স্বদেশে ফিরে এসে পুনরায় একনায়কতন্ত্র কায়েম করেন এবং তেল পুনরায় পশ্চিমা কনসোর্টিয়ামের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
৩. ইরান-ইরাক যুদ্ধের কারণ ও ফলাফল আলোচনা কর।
[Discuss the causes and the results of the Iran-Iraq war.]
ক. ইরান-ইরাক যুদ্ধের কারণসমূহ (১৯৮০-১৯৮৮):
- শাত-ইল-আরব জলসীমা বিরোধ: টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর মোহনা ‘শাত-ইল-আরব’ জলপথ নিয়ে উভয় দেশের ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব ছিল। ১৯৭৫ সালের আলজিয়ার্স চুক্তিতে নদীর কেন্দ্ররেখা (থালওয়েগ) মেনে নেওয়া হলেও সাদ্দাম হোসেন এ চুক্তি একতরফা বাতিল করে জলপথের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দাবি করেন।
- ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব ও সাদ্দামের ভীতি: আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনীর নেতৃত্বে ইরানে রাজতন্ত্র উৎখাত হয়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলে সাদ্দাম হোসেন ভীত হয়ে পড়েন যে, ইরাকের সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়া জনগোষ্ঠী উদ্বুদ্ধ হয়ে সাদ্দামের ধর্মনিরপেক্ষ বাথ পার্টির সরকারকে উৎখাত করতে পারে।
- আরব বিশ্বের নেতৃত্ব দখলের লালসা: মিসর ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি করায় আরব বিশ্বে নেতৃত্বের শূন্যতা তৈরি হয়। সাদ্দাম হোসেন ইরানের তেলসমৃদ্ধ খুজেস্তান (আরবিস্তান) দখল করে সমগ্র আরব বিশ্বের অবিসংবাদিত নেতা হতে চেয়েছিলেন।
- পশ্চিমা ও উপসাগরীয় পরাশক্তির উসকানি: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো ইসলামি বিপ্লবের বিস্তার ঠেকাতে সাদ্দাম হোসেনকে বিপুল সমরাস্ত্র, গোয়েন্দা তথ্য ও শত শত কোটি ডলার ঋণ দিয়ে যুদ্ধে নামিয়ে দেয়।
খ. যুদ্ধের ফলাফল ও পরিণতি:
- বিপুল প্রাণহানি ও নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ: আট বছর স্থায়ী এ আধুনিক ইতিহাসের দীর্ঘতম যুদ্ধে প্রায় দশ লক্ষ সৈন্য ও বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারায়। সাদ্দাম বাহিনী ইরানি সৈন্য ও কুর্দিদের ওপর বিষাক্ত রাসায়নিক গ্যাস (মাস্টার্ড গ্যাস ও সারিন) ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক অপরাধ সংঘটিত করে।
- অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও ধ্বংসস্তূপ: উভয় দেশের তেল শোধনাগার, বন্দর ও অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে প্রায় এক ট্রিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি সাধিত হয়। ইরাক শত শত কোটি ডলার ঋণে দেউলিয়া হয়ে পড়ে।
- যুদ্ধ নিষ্ফল ও সীমানা অপরিবর্তিত: ১৯৮৮ সালের ২০ আগস্ট জাতিসংঘের প্রস্তাব ৫৯৮ অনুসারে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। কোনো পক্ষই বিজয়ী হতে পারেনি এবং প্রাক-যুদ্ধ সীমানায় উভয় বাহিনী ফিরে যায়।
- কুয়েত আক্রমণের পটভূমি: যুদ্ধজনিত ঋণের কারণে সাদ্দাম হোসেন ১৯৯০ সালে আকস্মিকভাবে কুয়েত আক্রমণ ও দখল করেন, যা পরবর্তীতে প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটায়।
৪. আফগানিস্তানের আধুনিকায়নে বাদশাহ আমানুল্লাহ খানের অবদান মূল্যায়ন কর।
[Evaluate the contributions of Badshah Amanullah Khan for modernizing Afghanistan.]
ক. স্বাধীনতা অর্জন ও তৃতীয় ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধ (১৯১৯):
বাদশাহ আমানুল্লাহ খান ১৯১৯ সালে সিংহাসনে আরোহণ করেই ব্রিটিশদের পরাধীনতার শৃঙ্খল ছিন্ন করতে তৃতীয় ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধ ঘোষণা করেন। রাওয়ালপিন্ডি চুক্তির (১৯১৯) মাধ্যমে তিনি আফগানিস্তানের পূর্ণ সার্বভৌম বৈদেশিক স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনে জাতীয় বীর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
খ. আফগানিস্তানের আধুনিকায়নে আমানুল্লাহর বৈপ্লবিক সংস্কার:
- প্রথম লিখিত সংবিধান ও আইনের শাসন (১৯২৩): তিনি আফগানিস্তানের ইতিহাসে সর্বপ্রথম আধুনিক সংবিধান (নিজামনামা) প্রণয়ন করেন। এতে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের (হিন্দু ও শিখ) স্বাধীনতা এবং দাসপ্রথা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়।
- নারী শিক্ষার বিস্তার ও অধিকার প্রতিষ্ঠা: তিনি রানি সুরাইয়াকে সাথে নিয়ে কাবুলে মেয়েদের জন্য প্রথম আধুনিক বিদ্যালয় ‘মাস্তুরাত’ প্রতিষ্ঠা করেন। মেয়েদের উচ্চশিক্ষার জন্য তুরস্কে পাঠান। বাল্যবিয়ে ও পণপ্রথা নিষিদ্ধ করেন এবং নারীদের বোরকা ও পর্দা ঐচ্ছিক করেন।
- প্রশাসনিক ও সামাজিক সংস্কার: সরকারি কর্মচারীদের জন্য পশ্চিমা কোট-প্যান্ট ও টুপি পরিধান বাধ্যতামূলক করেন। কাবুলের দরবার ও বাজারে শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি এবং সৌর হিজরি ক্যালেন্ডার চালু করেন। নতুন রাজধানী হিসেবে দারুল আমান প্রাসাদ গড়ে তোলেন।
- অর্থনৈতিক ও কর সংস্কার: আধুনিক বাজেট ব্যবস্থা প্রণয়ন করেন, জাতীয় মুদ্রা ‘আফগানি’ চালু করেন এবং প্রাচীন অনিয়মতান্ত্রিক জমিদারি কর ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে নগদ রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করেন।
গ. সংস্কারের ব্যর্থতা ও পতন (১৯২৯):
রক্ষণশীল উপজাতীয় মোল্লা ও সর্দারগণ তাঁর দ্রুতগামী পশ্চিমা সংস্কারকে ইসলামের অবমাননা হিসেবে আখ্যায়িত করে ব্রিটিশদের গোপন সহায়তায় বিদ্রোহ ঘোষণা করে। বাচা-ই সাক্কার (হায়দারী ডাকাত) নেতৃত্বে তীব্র বিদ্রোহের মুখে রক্তপাত এড়াতে ১৯২৯ সালে আমানুল্লাহ সিংহাসন ত্যাগ করে ইউরোপে নির্বাসনে চলে যান।
৫. আফগানিস্তানের রাজতন্ত্র পতনের ইতিহাস ব্যাখ্যা কর।
[Explain the history of the fall of monarchy in Afghanistan.]
ক. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও জাহির শাহের শাসন (১৯৩৩-১৯৭৩):
নাদির শাহের হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৩৩ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সে মোহাম্মদ জাহির শাহ আফগানিস্তানের সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি দীর্ঘ চার দশক আফগানিস্তানে তুলনামূলক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখেন। ১৯৬৪ সালে তিনি একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক সংবিধান উপহার দেন, যা আফগানিস্তানের ইতিহাসে ‘গণতন্ত্রের দশক’ নামে পরিচিত।
খ. রাজতন্ত্র পতনের মূল কারণ ও ঘটনাবলি:
- ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ও অর্থনৈতিক সংকট (১৯৭১-১৯৭২): আফগানিস্তানের মধ্য ও পশ্চিমাঞ্চলে চরম খরার কারণে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। লাখ লাখ মানুষ অনাহারে থাকে এবং রাজদরবারের আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি ও ত্রাণ বিতরণের চরম ব্যর্থতা সরকারের প্রতি জনরোষের বিস্ফোরণ ঘটায়।
- সেনাবাহিনীতে বামপন্থী ও সোভিয়েত প্রভাব: আফগান সামরিক অফিসারদের অধিকাংশই সোভিয়েত ইউনিয়নে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছিল। তাদের মাঝে পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি অব আফগানিস্তান (PDPA)-র কমিউনিস্ট মতাদর্শ গভীরভাবে শিকড় গেড়েছিল। তারা রাজতন্ত্রকে একটি প্রতিক্রিয়াশীল ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থা মনে করত।
- সরদার দাউদ খানের রক্তপাতহীন অভ্যুত্থান (১৭ জুলাই ১৯৭৩): বাদশাহ জাহির শাহ যখন চোখের চিকিৎসার জন্য ইতালির রোমে অবস্থান করছিলেন, তখন তাঁরই ফুফাতো ভাই ও প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী সরদার মোহাম্মদ দাউদ খান বামপন্থী সামরিক অফিসারদের সহায়তায় এক রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থান ঘটান।
- প্রজাতন্ত্র ঘোষণা ও রাজতন্ত্রের চির অবসান: দাউদ খান ১৯৬৪ সালের সংবিধান বাতিল করেন, আড়াইশত বছরের বারাকজাই রাজবংশের রাজতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক বিলুপ্তি ঘোষণা করেন এবং আফগানিস্তানকে একটি প্রজাতন্ত্র (Republic of Afghanistan) হিসেবে ঘোষণা করে নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন। জাহির শাহ রোম থেকেই স্বেচ্ছায় পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে গৃহযুদ্ধ রোধ করেন।
৬. জহির শাহের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতিসমূহ আলোচনা কর।
[Discuss the internal and foreign policies of Zohir Shah.]
ক. অভ্যন্তরীণ নীতি (Internal Policies):
- রাজনৈতিক সংস্কার ও ১৯৬৪ সালের গণতান্ত্রিক সংবিধান: জাহির শাহ ১৯৬৪ সালে একটি সংবিধান প্রণয়ন করে আফগানিস্তানকে সাংবিধানিক রাজতন্ত্রে রূপান্তর করেন। এতে স্বাধীন সংসদ (ওলেসি জিরগা ও মেশরানো জিরগা), স্বাধীন বিচার বিভাগ এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়। রাজপরিবারের সদস্যদের প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রী হওয়া নিষিদ্ধ করা হয়।
- শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশ: তিনি কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিকায়ন করেন, নারীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ও পেশাগত শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করেন এবং স্বেচ্ছায় পর্দা বাতিলের অনুমোদন দেন।
- যোগাযোগ ও অবকাঠামো উন্নয়ন: সোভিয়েত ও মার্কিন যৌথ আর্থিক সহায়তায় তিনি সালাং সুড়ঙ্গপথ (Salang Tunnel) নির্মাণ করেন, যা হিন্দুকুশ পর্বত ভেদ করে উত্তর ও দক্ষিণ আফগানিস্তানকে যুক্ত করে। দেশের প্রধান প্রধান মহাসড়ক আধুনিকায়ন করা হয়।
খ. বৈদেশিক নীতি (Foreign Policies):
- সক্রিয় জোটনিরপেক্ষ নীতি (Non-Alignment): স্নায়ুযুদ্ধের চরম উত্তেজনার যুগে জাহির শাহ কোনো সামরিক জোটে (যেমন সেন্টো বা ওয়ারশ) যোগ না দিয়ে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখেন। তিনি চাতুর্যের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন উভয় পরাশক্তি থেকেই বিপুল অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহায়তা গ্রহণ করেন।
- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিরপেক্ষতা: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অক্ষশক্তি ও মিত্রশক্তি উভয় পক্ষের চাপ অগ্রাহ্য করে আফগানিস্তানকে যুদ্ধের বিধ্বংসী ক্ষতি থেকে নিরাপদ রাখেন।
- পশতুনিস্থান বিরোধ ও প্রতিবেশীদের সাথে সম্পর্ক: পাকিস্তানের সাথে ডুরান্ড লাইন ও পশতুনিস্থান ইস্যু নিয়ে সম্পর্কের টানাপোড়েন সৃষ্টি হলেও তিনি প্রত্যক্ষ সামরিক সংঘাত এড়িয়ে চলেন এবং মুসলিম বিশ্বের সাথে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা করেন।
৭. সোভিয়েত রাশিয়া থেকে মধ্য এশিয়ার মুসলিম রাষ্ট্রসমূহের স্বাধীনতা লাভের প্রেক্ষাপট আলোচনা কর।
[Discuss the background of the Central Asian Muslim states gaining independence from Soviet Russia.]
ক. রুশ ঔপনিবেশিক পটভূমি:
ঊনবিংশ শতাব্দীতে জার সাম্রাজ্য এবং ১৯১৭ সালের বলশেভিক বিপ্লবের পর লেনিন ও স্ট্যালিনের সোভিয়েত ইউনিয়ন বোখারা, খিভা ও কোকান্দ দখল করে মধ্য এশিয়ার সুবিশাল মুসলিম অঞ্চলকে জবরদস্তিমূলকভাবে সোভিয়েত অন্তর্ভুক্ত করে। সাত দশক ধরে ইসলামি ঐতিহ্য, আরবি হরফ, মসজিদ ও মাদরাসা বলপ্রয়োগে দমন করা হয়।
খ. স্বাধীনতা লাভের প্রেক্ষাপট ও অনুঘটকসমূহ:
- গর্বাচেভের পেরেস্ত্রইকা ও গ্লাসনস্ত: ১৯৮৫ সালে মিখাইল গর্বাচেভ অর্থনৈতিক পুনর্গঠন (Perestroika) এবং রাজনৈতিক খোলামেলা নীতি (Glasnost) ঘোষণা করলে মধ্য এশিয়ায় সুপ্ত জাতীয়তাবাদী ও ধর্মীয় চেতনা পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। মানুষ নিজ ভাষা, ঐতিহ্য ও ধর্মের অধিকার দাবিতে সোচ্চার হয়।
- সোভিয়েত ইউনিয়নের অর্থনৈতিক ধস: কেন্দ্রীয় পরিকল্পিত অর্থনীতির অকার্যকারিতা, আফগান যুদ্ধে পরাভব ও চেরনোবিল পরমাণু বিপর্যয়ে সোভিয়েত অর্থনীতি চূড়ান্তভাবে দেউলিয়া হয়ে পড়ে। মস্কো প্রান্তিক প্রজাতন্ত্রগুলোকে আর অর্থনৈতিক সুবিধা দিতে পারছিল না।
- জাতীয়তাবাদী ও আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের বিস্ফোরণ: কাজাখস্তানে ১৯৮৬ সালের জেলতোকসান গণবিক্ষোভ মধ্য এশিয়ার মুক্তির প্রথম সংকেত দেয়। উজবেক, তাজিক, তুর্কমেন ও কিরগিজরা নিজ নিজ ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার দাবিতে রাজপথে নামে।
- ১৯৯১ সালের আগস্ট অভ্যুত্থান ও সোভিয়েত বিলুপ্তি: মস্কোয় হার্ডলাইনার কমিউনিস্টদের ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের পর সোভিয়েত ইউনিয়ন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। ১৯৯১ সালের শেষভাগে মধ্য এশিয়ার পাঁচটি স্বাধীন মুসলিম প্রজাতন্ত্রের জন্ম হয়: উজবেকিস্তান, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান এবং তুর্কমেনিস্তান (এবং ককেশাস অঞ্চলের আজারবাইজান)। ১৯৯১ সালের ২৬ ডিসেম্বর সোভিয়েত ইউনিয়ন আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত হয়।
৮. আফগানিস্তানে তালেবানদের উত্থান ও ক্রমবিকাশের বিবরণ দাও।
[Describe the rise and evolution of Taliban in Afghanistan.]
ক. তালেবানদের উত্থানের পটভূমি (১৯৯৪):
১৯৮৯ সালে সোভিয়েত সৈন্য প্রত্যাহারের পর আফগানিস্তানে মুজাহিদীন দলগুলোর (হেকমতিয়ার, রব্বানী, মাসুদ, দোস্তাম) মধ্যে ক্ষমতার নির্লজ্জ দ্বন্দ্বে এক ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। বিভিন্ন ওয়ারলর্ড (Warlord) ও অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা সাধারণ মানুষের ওপর ধর্ষণ, চাঁদাবাজি ও লুটতরাজের রাজত্ব কায়েম করে। কান্দাহারে দুই তরুণীকে অপহরণ ও ধর্ষণের ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে স্থানীয় দেওবন্দি মাদরাসা শিক্ষক মোল্লা মোহাম্মদ ওমর তাঁর ছাত্র ও প্রাক্তন মুজাহিদীনদের নিয়ে ১৯৯৪ সালে ‘তালেবান’ (পশতু ভাষায় তালেবান অর্থ ছাত্র) আন্দোলন গড়ে তোলেন।
খ. ক্ষমতার বিজয় ও শাসন কায়েম (১৯৯৬-২০০১):
- কান্দাহার থেকে কাবুল বিজয়: অস্ত্র সমর্পণ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার জনপ্রিয় স্লোগানে সাধারণ জনগণের ব্যাপক সমর্থনে তালেবানরা দ্রুত অগ্রসর হয়। ১৯৯৪ সালে কান্দাহার এবং ১৯৯৬ সালের সেপ্টেম্বরে রাজধানী কাবুল দখল করে আফগানিস্তানকে ‘ইসলামি আমিরাত অব আফগানিস্তান’ হিসেবে ঘোষণা করে।
- কঠোর শরীয়াহ আইন বাস্তবায়ন: তালেবান সরকার দেশে অপরাধ ও গৃহযুদ্ধ পুরোপুরি বন্ধ করে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনে, তবে কঠোর শরীয়াহ বিধিনিষেধ চাপিয়ে দেয় (নারী শিক্ষা বন্ধ, টেলিভিশনে বিনোদন নিষিদ্ধ, পুরুষদের দাড়ি রাখা বাধ্যতামূলক)। পাকিস্তান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এদের কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেয়।
গ. মার্কিন আগ্রাসন ও পুনরায় ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন (২০০১-২০২১):
- ২০০১ সালের মার্কিন আগ্রাসন ও পতন: ৯/১১ সন্ত্রাসী হামলার পর ওসামা বিন লাদেনকে হস্তান্তর না করায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো বাহিনী আফগানিস্তানে বিমান হামলা চালিয়ে তালেবান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে। তালেবানরা পাহাড়ে ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলে গেরিলা প্রতিরোধে আত্মগোপন করে।
- দীর্ঘ ২০ বছরের প্রতিরোধ ও ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন: মার্কিন পুতুল সরকারের দুর্বলতা ও দুর্নীতির সুযোগে দীর্ঘ দুই দশক গেরিলা যুদ্ধের পর ২০২০ সালে কাতারের দোহা চুক্তির মাধ্যমে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার নিশ্চিত করে। পরিশেষে ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট তালেবান বাহিনী বিনা রক্তপাতে পুনরায় কাবুল দখল করে ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে।
খ বিভাগ: সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি
৯। সেভর্স চুক্তির (১৯২০) ধারাগুলো লেখ।
[Write down the provisions of the Treaty of Severs (1920).]
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে উসমানীয় সাম্রাজ্যের পরাজয়ের পর ১৯২০ সালের ১০ আগস্ট ফ্রান্সের সেভর্স শহরে মিত্রশক্তি বিজিত তুরস্কের ওপর এক অপমানজনক দাসত্বমূলক ‘সেভর্স চুক্তি’ চাপিয়ে দেয়:
- তুরস্ককে ছিন্নভিন্নকরণ: ইস্তানবুল ও আনাতোলিয়ার একটি ক্ষুদ্র অংশ ছাড়া সমগ্র উসমানীয় ভূখণ্ড মিত্রশক্তির মাঝে ভাগ করা হয়। স্মার্না ও থ্রেস গ্রিসকে, আদানা ও সিরিয়া ফ্রান্সকে, ইরাক ও ফিলিস্তিন ব্রিটেনকে এবং আন্তালিয়া ইতালিকে প্রদান করা হয়।
- স্বাধীন আর্মেনিয়া ও কুর্দিস্তান গঠন: আনাতোলিয়ায় পৃথক স্বাধীন আর্মেনিয়া ও স্বায়ত্তশাসিত কুর্দিস্তান গঠনের সিদ্ধান্ত হয়।
- আন্তর্জাতিক জলপথ ও সামরিক নিয়ন্ত্রণ: বসফরাস ও দার্দানেলিস প্রণালী আন্তর্জাতিক কমিশনের অধীনে চলে যায় এবং তুর্কি সেনাবাহিনী মাত্র ৫০ হাজারে সীমাবদ্ধ করা হয়। মুস্তফা কামাল আতাতুর্ক এ চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালনা করে ১৯২৩ সালে লোজান চুক্তির মাধ্যমে তুরস্কের সার্বভৌমত্ব ফিরিয়ে আনেন।
১০। ইউরোপীয় ইউনিয়নে তুরস্কের অন্তর্ভুক্তি সম্পর্কে লেখ।
[Write down about the entry of Turkey in the European Union.]
তুরস্ক বহু দশক ধরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU)-র পূর্ণ সদস্যপদ লাভের প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে। ১৯৬৩ সালে আঙ্কারা চুক্তির মাধ্যমে তুরস্ক ইউরোপীয় অর্থনৈতিক সম্প্রদায়ের সহযোগী সদস্য হয় এবং ১৯৮৭ সালে পূর্ণ সদস্যপদের আবেদন করে। ১৯৯৯ সালে প্রার্থী দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও এখনো অন্তর্ভুক্তি অর্জিত হয়নি:
- বাধার কারণসমূহ: সাইপ্রাস সংকট (উত্তর সাইপ্রাস নিয়ে গ্রিসের বিরোধিতা), মানবাধিকার ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংক্রান্ত ইউরোপীয় শর্তাবলি এবং সর্বোপরি ৮ কোটি মুসলিম জনসংখ্যার তুরস্ক অন্তর্ভুক্ত হলে ইউরোপের খ্রিস্টান পরিচয় ক্ষুণ্ণ হবে—ইউরোপীয় রক্ষণশীল নেতৃত্বের এমন মানসিকতা প্রধান বাধা।
১১। আফগান গৃহযুদ্ধের বর্ণনা দাও।
[Give an account of civil war in Afghan.]
১৯৮৯ সালে সোভিয়েত বাহিনী প্রত্যাহারের পর ১৯৯২ সালে কমিউনিস্ট নাজিবুল্লাহ সরকারের পতন ঘটলে মুজাহিদীন দলগুলোর ক্ষমতার দ্বন্দ্বে আফগানিস্তানে এক ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ (১৯৯২-১৯৯৬) শুরু হয়:
- ওয়ারলর্ডদের নারকীয় সংঘাত: বুরহানউদ্দিন রব্বানী ও আহমদ শাহ মাসুদের জামায়াত-ই-ইসলামী, গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ারের হেজব-ই-ইসলামী, আব্দুল রশিদ দোস্তামের উজবেক মিলিশিয়া এবং শিয়া হেজব-ই-ওয়াহদাত কাবুল শহরের ওপর লক্ষ লক্ষ রকেট নিক্ষেপ করে শহরটিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে এবং ৫০ হাজার বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়। এই নিদারুণ নৈরাজ্যের পটভূমিতেই কান্দাহার থেকে শান্তি প্রতিষ্ঠার দাবি নিয়ে তালেবানের উত্থান ঘটে।
১২। ‘ডুরান্ড লাইন’ সম্পর্কে ধারণা দাও।
[Give an idea about the ‘Durand Line’.]
ডুরান্ড লাইন (Durand Line): ব্রিটিশ ভারতের পররাষ্ট্র সচিব স্যার মর্টিমার ডুরান্ড এবং আফগানিস্তানের আমির আব্দুর রহমান খানের মধ্যে ১৮৯৩ সালে স্বাক্ষরিত চুক্তির মাধ্যমে নির্ধারিত ২,৬৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত রেখাকে ‘ডুরান্ড লাইন’ বলা হয়।
- ঐতিহাসিক বিরোধ: এ সীমান্ত রেখাটি পশতুন উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলকে কৃত্রিমভাবে দুই খণ্ডে বিভক্ত করে দেয়। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত কোনো আফগান সরকার (এমনকি তালেবান প্রশাসনও) ডুরান্ড লাইনকে স্থায়ী আন্তর্জাতিক সীমান্ত হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি, যা বর্তমান পর্যন্ত পাকিস্তান-আফগান সম্পর্কের প্রধান বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. কামালবাদের (Kemalism) ছয়টি মূল স্তম্ভ কী কী?
কামালবাদের ছয়টি মূলনীতি হলো: প্রজাতন্ত্রবাদ, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, গণমুখী নীতি, রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি এবং সংস্কারবাদ।
২. ইরানের তেল সম্পদ জাতীয়করণে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন কে?
ইরানের জাতীয়তাবাদী প্রধানমন্ত্রী ড. মোহাম্মদ মোসাদ্দেক ১৯৫১ সালে ব্রিটিশ কোম্পানি AIOC থেকে ইরানের তেল সম্পদ জাতীয়করণ করেন।
৩. ইরান-ইরাক যুদ্ধ কত বছর স্থায়ী হয়েছিল?
১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সুদীর্ঘ আট বছর ধরে রক্তক্ষয়ী ইরান-ইরাক যুদ্ধ স্থায়ী হয়েছিল।
৪. আফগানিস্তানের শেষ বাদশাহ কে ছিলেন?
বাদশাহ মোহাম্মদ জাহির শাহ (শাসনকাল ১৯৩৩-১৯৭৩) ছিলেন আফগানিস্তানের শেষ বাদশাহ, যিনি ১৯৭৩ সালে ক্ষমতাচ্যুত হন।
৫. সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর মধ্য এশিয়ায় কয়টি স্বাধীন মুসলিম প্রজাতন্ত্রের জন্ম হয়?
১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর মধ্য এশিয়ায় পাঁচটি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্রের জন্ম হয়: কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, কিরগিজস্তান এবং তাজিকিস্তান।
৬. ‘ডুরান্ড লাইন’ কী এবং এটি কোন দুটি দেশকে বিভক্ত করেছে?
১৮৯৩ সালে নির্ধারিত ডুরান্ড লাইন হলো আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যকার আন্তর্জাতিক সীমান্ত সীমানা রেখা।