ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা ২০২০
বিভাগ: আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব (مقارنة الأديان – Comparative Religion)
বিষয় কোড: ৪০২ | প্রশ্নপত্র কোড: ১৫৮ | পরীক্ষা কোড: ২০৪
পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
[দ্রষ্টব্য: নিম্নের যে কোনো পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দাও। সকল প্রশ্নের মান সমান: ১৬ × ৫ = ৮০]
ভূমিকা ও পাঠ্যক্রম পরিচিতি
ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ৪র্থ বর্ষের আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য ‘তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব’ (مقارنة الأديان – Comparative Religion) একটি অত্যন্ত অপরিহার্য ও সমসাময়িক শাস্ত্র (বিষয় কোড: ৪০২)। এই শাস্ত্রের উদ্দেশ্য হলো বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে প্রধান প্রধান আসমানী ও মানব রচিত ধর্মসমূহের উৎপত্তি, ইতিহাস, বিশ্বাসমালা, ধর্মগ্রন্থ এবং সমাজদর্শনের নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ তুলনামূলক অধ্যয়ন করা। ২০২০ সালের এই প্রশ্নপত্রে দ্বীনের সংজ্ঞা ও প্রয়োজনীয়তা, ইসলামের অনন্য সামাজিক সৌন্দর্য ও আকিদাগত বৈশিষ্ট্য, ইহুদি ধর্মের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ, তাওরাতের বিকৃতি (তাহরীফ), ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ইহুদি ষড়যন্ত্র, হিন্দুধর্মের বর্ণপ্রথা (Caste System) এবং বৌদ্ধধর্ম, তালমুদ ও খ্রিস্টধর্ম বিষয়ক তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়সমূহ সন্নিবেশিত হয়েছে। নিচে এই প্রশ্নপত্রের সকল প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ, তথ্যবহুল ও প্রামাণিক উত্তর প্রস্তুত করে দেওয়া হলো।
١- ما معنى الدين لغةً واصطلاحًا؟ وما حاجة الناس إلى الدين السماوي؟ بين مفصلًا-
[الدين এর শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ কী? মানবজাতির জন্য আসমানি ধর্ম কেন প্রয়োজন? বিস্তারিত বর্ণনা কর।]
১. ‘আদ-দ্বীন’ (الدين)-এর আভিধানিক অর্থ
আরবী ভাষায় ‘আদ-দ্বীন’ (الدين) শব্দটি ‘دَانَ – يَدِينُ’ (দানা-ইয়াদীনু) ধাতু থেকে উদ্ভূত এক অনন্য শব্দমূল। আরবী অভিধানবিদদের মতে এর একাধিক বহুল প্রচলিত অর্থ রয়েছে:
- আনুগত্য ও বশ্যতা (الطاعة والخضوع): যেমন আরবী প্রবাদ রয়েছে: دِنْتُ لَهُ أَيْ أَطَعْتُهُ (আমি তার আনুগত্য করলাম)। দ্বীন মানে এমন এক ব্যবস্থা যার প্রতি মানুষ বিনম্র চিত্তে আত্মসমর্পণ করে।
- প্রতিদান ও বিচার (الجزاء والحساب): যেমন পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ﴿مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ﴾ অর্থাৎ প্রতিদান দিবসের মালিক। ইমাম রাগিব ইসফাহানী বলেন, কৃতকর্মের উপযুক্ত প্রতিফল দেওয়ার নাম দ্বীন।
- আইন, সংবিধান ও নিয়মপদ্ধতি (القانون والشريعة والسلطان): পবিত্র কুরআনে সূরা ইউসুফে এসেছে: ﴿مَا كَانَ لِيَأْخُذَ أَخَاهُ فِي دِينِ الْمَلِكِ﴾ অর্থাৎ বাদশাহর আইনে আপন ভাইকে আটক করার সুযোগ ছিল না।
- স্বভাব, অভ্যাস ও রীতি (العادة والشأن): কোনো জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের অনুসৃত আচরণ ও রীতিনীতিকে দ্বীন বলা হয়।
২. ‘আদ-দ্বীন’-এর পারিভাষিক সংজ্ঞা
ইসলামী ধর্মতাত্ত্বিক ও উসূলবিদগণের মতে দ্বীনের প্রামাণ্য সংজ্ঞা নিম্নরূপ:
- আল্লামা তফতযানী ও জুরজানী (রহ.)-এর মতে:
«الدِّينُ: وَضْعٌ إِلَهِيٌّ يَسُوقُ ذَوِي الْعُقُولِ بِاخْتِيَارِهِمُ الْمَحْمُودِ إِلَى الْخَيْرِ بِالذَّاتِ، بُلُوغًا إِلَى السَّعَادَةِ فِي الدَّارَيْنِ»
“দ্বীন হলো এমন এক ঐশী বিধান, যা বিবেকবান মানুষকে তাদের নিজস্ব সুপছন্দের মাধ্যমে সরাসরি পরম কল্যাণের দিকে পরিচালিত করে, যাতে তারা উভয় জাহানে (দুনিয়া ও আখিরাতে) পরম সৌভাগ্য লাভ করতে পারে।” - তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ববিদদের সাধারণ পরিভাষায়: দ্বীন হলো পরম সত্তা বা স্রষ্টার প্রতি মানুষের অকৃত্রিম বিশ্বাস, তাঁর সাথে আত্মিক সম্পর্ক স্থাপন এবং সেই বিশ্বাসের ভিত্তিতে প্রণীত কতিপয় ধর্মীয় অনুশাসন, উপাসনা ও নৈতিক আচরণবিধির সমষ্টি।
৩. মানবজাতির জন্য আসমানি ধর্মের অপরিহার্য প্রয়োজনীয়তা (حاجة الناس إلى الدين السماوي)
মানবজাতির ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে আসমানি ধর্মের প্রয়োজনীয়তা সার্বজনীন ও অবিসংবাদিত। কেবল মানুষের বুদ্ধি ও বিজ্ঞান কখনো স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবনবিধান হতে পারে না। নিম্নে এর যৌক্তিক ও ব্যবহারিক প্রয়োজনীয়তাসমূহ বিশ্লেষণ করা হলো:
- সৃষ্টিকর্তা ও সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানলাভ:
মানুষের মানবীয় বুদ্ধি সীমিত। মানুষ কোথা থেকে এল? কেন সে পৃথিবীতে প্রেরিত হয়েছে? মৃত্যুর পর তার কী পরিণতি হবে?—এই মৌলিক দার্শনিক প্রশ্নের সঠিক ও সন্দেহাতীত উত্তর একমাত্র আসমানি ওহীই দিতে পারে। আসমানি ধর্ম ছাড়া মানুষ বস্তুবাদের চোরাবালিতে হারিয়ে যায়। - মানুষের সহজাত স্বভাবের (ফিতরাত) তৃপ্তি:
আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে এমন ফিতরাতের ওপর সৃষ্টি করেছেন যে, সে স্বভাবতই একজন পরম সত্তার উপাসনা করতে চায় (فِطْرَتَ اللَّهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا)। মানুষ যদি সত্য আসমানি ধর্ম না পায়, তবে সে পাথর, গাছপালা, সূর্য, আগুন কিংবা মানুষের পূজা করতে শুরু করে। আসমানি ধর্ম মানুষকে প্রকৃত স্রষ্টার সন্ধান দিয়ে আত্মিক প্রশান্তি দান করে। - অভ্রান্ত নৈতিক মানদণ্ড নির্ধারণ:
মানব রচিত আইন ও নীতি সবসময় পরিবর্তনশীল, স্বার্থান্বেষী এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক। কোনটি পরম সত্য আর কোনটি মিথ্যা, কোনটি শাশ্বত কল্যাণ আর কোনটি অকল্যাণ—তার সর্বজনীন ও ত্রুটিমুক্ত মাপকাঠি মানববুদ্ধি দিতে পারে না। আসমানি ধর্ম এমন এক শাশ্বত নৈতিক ভিত্তি প্রদান করে যা স্থান ও কালের পরিবর্তনে কখনো বিকৃত হয় না। - বিবেক ও প্রবৃত্তির ভারসাম্য রক্ষা:
মানুষের ভেতরে যেমন ফেরেশতাসুলভ গুণাবলি রয়েছে, তেমনি রয়েছে পাশবিক রিপু ও লালসা। পার্থিব আইন কেবল মানুষের বাহ্যিক অপরাধ দমন করতে পারে, অন্তরের পাপ দমন করতে পারে না। আসমানি ধর্ম অন্তরে তাকওয়া (আল্লাহভীতি) ও আখিরাতের জবাবদিহিতা জাগ্রত করে বিবেককে প্রবৃত্তির ওপর বিজয়ী করে। - ন্যায়ভিত্তিক ও সুশৃঙ্খল সমাজব্যবস্থা বিনির্মাণ:
সমাজে সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, মানবাধিকার এবং দুর্বল ও মজলুমের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য আসমানি বিধানের কোনো বিকল্প নেই। আসমানি ধর্ম ধনী-গরিব, রাজা-প্রজা সকল মানুষকে এক স্রষ্টার বান্দা হিসেবে বিবেচনা করে অহংকার চূর্ণ করে এবং ন্যায়ভিত্তিক সামাজিক শৃঙ্খলার নিশ্চয়তা দেয়। - মৃত্যু-পরবর্তী চিরন্তন মুক্তির দিশা:
পার্থিব জীবন মানুষের জন্য চূড়ান্ত গন্তব্য নয়; বরং এটি অনন্ত আখেরাতের কর্মক্ষেত্র। আসমানি ধর্ম মানুষকে কিয়ামত, পুলসিরাত, মিজান, জান্নাত ও জাহান্নামের বিবরণ দিয়ে চিরন্তন জীবনের মুক্তির সুনির্দিষ্ট পথপ্রদর্শন করে।
٢- تحدث عن محاسن الإسلام الاجتماعية موضحًا-
[ইসলামের সামাজিক সৌন্দর্যসমূহ বিশদভাবে আলোচনা কর।]
ইসলামের সামাজিক সৌন্দর্য ও শ্রেষ্ঠত্বের রূপরেখা
ইসলাম কেবল কতিপয় আনুষ্ঠানিক ইবাদতের নাম নয়; বরং এটি মানবজাতির সামগ্রিক জীবনের এক পূর্ণাঙ্গ ও কালজয়ী সামাজিক ইশতেহার (نظام اجتماعي متكامل)। জাহেলী যুগের চরম বর্বরতা, শ্রেণিভেদ ও জুলুমের অন্ধকার দূর করে ইসলাম এমন এক ইনসাফপূর্ণ সমাজ উপহার দিয়েছিল যা পৃথিবীর ইতিহাসে অতুলনীয়। নিম্নে ইসলামের প্রধান সামাজিক সৌন্দর্যসমূহ বিশদভাবে পর্যালোচনা করা হলো:
- মানবীয় সাম্য ও বর্ণবাদের চূড়ান্ত উচ্ছেদ (المساواة الإنسانية):
ইসলাম ঘোষণা করেছে যে রক্ত, বর্ণ, ভাষা ও ভৌগোলিক সীমারেখার ভিত্তিতে মানুষে মানুষে কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। সকল মানুষ একই পিতা-মাতা আদম ও হাওয়া (আ.)-এর সন্তান। বিদায় হজ্জের ভাষণে বিশ্বনবী (ﷺ) দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন:
«أَلَا لَا فَضْلَ لِعَرَبِيٍّ عَلَى أَعْجَمِيٍّ، وَلَا لِعَجَمِيٍّ عَلَى عَرَبِيٍّ، وَلَا لِأَحْمَرَ عَلَى أَسْوَدَ، وَلَا أَسْوَدَ عَلَى أَحْمَرَ إِلَّا بِالتَّقْوَى»
“সাবধান! কোনো অনারবের ওপর কোনো আরবের এবং আরবের ওপর অনারবের, কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের এবং শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই; শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি হলো তাকওয়া বা খোদাভীতি।” হাবশী কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাস হযরত বিলাল (রা.)-কে ইসলাম কুরাইশ নেতৃবৃন্দের মাথার তাজ বানিয়ে সাম্যের সর্বোচ্চ পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছে। - বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্ববোধ ও পারস্পরিক সহমর্মিতা (الأخوة والتعاطف):
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন: ﴿إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ﴾ অর্থাৎ মুমিনগণ পরস্পর ভাই ভাই। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মুমিন সমাজকে একটি একক মানবদেহের সাথে তুলনা করেছেন:
«مَثَلُ الْمُؤْمِنِينَ فِي تَوَادِّهِمْ وَتَرَاحُمِهِمْ وَتَعَاطُفِهِمْ مَثَلُ الْجَسَدِ، إِذَا اشْتَكَى مِنْهُ عُضْوٌ تَدَاعَى لَهُ سَائِرُ الْجَسَدِ بِالسَّهَرِ وَالْحُمَّى»
“পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়া ও সহমর্মিতায় মুমিনদের দৃষ্টান্ত একটি দেহের ন্যায়; দেহের একটি অঙ্গ আক্রান্ত হলে সমগ্র দেহ অনিদ্রা ও জ্বরে কাতর হয়ে পড়ে।” (সহীহ মুসলিম)। হিজরতের পর মদীনার আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যকার ‘মুওয়াখাত’ (ভ্রাতৃত্ব বন্ধন) মানব ইতিহাসের অনন্য সামাজিক বিস্ময়। - পারিবারিক ব্যবস্থার সুরক্ষা ও পিতামাতার মর্যাদা (بر الوالدين ورعاية الأسرة):
সমাজ কাঠামোর মূল একক হলো পরিবার। ইসলাম বিবাহকে পবিত্রতম সামাজিক বন্ধন ঘোষণা করে ব্যভিচার ও অশ্লীলতার পথ বন্ধ করেছে। পাশাপাশি পিতামাতার মর্যাদাকে আল্লাহর তাওহীদের পরেই স্থান দিয়ে ইরশাদ করেছে: ﴿وَقَضَى رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا﴾। মায়ের পদতলে সন্তানের জান্নাত ঘোষণা করে মাতৃত্বের সর্বোচ্চ সম্মান নিশ্চিত করেছে। - নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা (حقوق المرأة):
জাহেলিয়াতের যুগে কন্যাসন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়া হতো এবং নারীদের পণ্য হিসেবে ব্যবহার করা হতো। ইসলাম এসে নারীদের স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব, স্বাধীন সম্পদের মালিকানা, মিরাসে হিস্যা, শিক্ষার অধিকার এবং সম্মানের সর্বোচ্চ স্থান দান করেছে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: «اسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ خَيْرًا» (তোমরা নারীদের সাথে সর্বোত্তম সদাচরণের উপদেশ গ্রহণ কর)। - সামাজিক সুবিচার ও ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনীতি (العدالة الاجتماعية والتكافل):
ইসলাম পুঁজিবাদী শোষণ ও সুদের অভিশাপ দূর করে বাধ্যতামূলক যাকাত, উশর, সদাকাতুল ফিতর এবং ঐচ্ছিক দান-খয়রাতের মাধ্যমে সম্পদে গরিব ও বঞ্চিতদের অধিকার নিশ্চিত করেছে (﴿وَفِي أَمْوَالِهِمْ حَقٌّ لِّلسَّائِلِ وَالْمَحْرُومِ﴾)। বায়তুলমালের মাধ্যমে সমাজকল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠন করে প্রতিটি নাগরিকের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। - প্রতিবেশীর অধিকার ও সামাজিক সম্প্রীতি (حقوق الجار):
প্রতিবেশীর অধিকার সংরক্ষণে ইসলাম এত কঠোর তাকিদ দিয়েছে যে, রাসূল (ﷺ) বলেছেন: “জিবরীল (আ.) আমাকে প্রতিবেশীর হকের ব্যাপারে এত বেশি উপদেশ দিচ্ছিলেন যে, আমার মনে হয়েছিল তিনি হয়তো প্রতিবেশীকে উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেবেন!” মুসলিম, অমুসলিম সকল প্রতিবেশীর ইজ্জত, নিরাপত্তা ও বিপদে পাশে দাঁড়ানো ঈমানের অংশ। - অমুসলিম সংখ্যালঘুদের অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতা (حقوق غير المسلمين):
ইসলামের সামাজিক সৌন্দর্য হলো অমুসলিম নাগরিকদের জান-মাল ও উপাসনালয়ের পূর্ণ নিরাপত্তা দেওয়া (عقد الذمة)। রাসূল (ﷺ) ইরশাদ করেছেন: “যে ব্যক্তি কোনো চুক্তিবদ্ধ অমুসলিম নাগরিকের ওপর জুলুম করল অথবা তার অধিকার খর্ব করল, কিয়ামতের দিন আমি স্বয়ং তার বিরুদ্ধে বাদী হব!” (সুনানে আবু দাউদ)।
٣- ما معنى الإسلام لغةً واصطلاحًا؟ ثم اذكر خصائص الإسلام العقدية-
[ইসলামের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ কী? ইসলামের আকিদাগত বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা কর।]
১. ‘আল-ইসলাম’ (الإسلام)-এর আভিধানিক অর্থ
‘আল-ইসলাম’ শব্দটি আরবী ’أَسْلَمَ – يُسْلِمُ – إِسْلَامًا‘ বাব থেকে গৃহীত। এর মূল ধাতু হলো ‘س – ل – م’ (সীন-লাম-মীম)। এর প্রধান আভিধানিক অর্থগুলো হলো:
- আত্মসমর্পণ ও আনুগত্য (الاستسلام والانقياد): শর্তহীনভাবে কারো নির্দেশের সামনে মস্তক অবনত করা এবং স্বীয় ইচ্ছাকে অন্যের ইচ্ছার অধীনে সঁপে দেওয়া।
- শান্তি ও নিরাপত্তা (السلام والسلامة): সমস্ত অনিষ্ট, যুদ্ধ ও বিবাদ থেকে নিরাপদ থাকা এবং সমাজে সার্বিক শান্তি বজায় রাখা।
- বিশুদ্ধতা ও নিষ্কৃতি (الإخلاص والخلوص): ভেজাল বা ত্রুটিমুক্ত হওয়া। যেমন আরবী প্রবাদ: سَلِمَ الشَّيْءُ (জিনিসটি ত্রুটিমুক্ত হলো)।
২. ‘আল-ইসলাম’-এর পারিভাষিক অর্থ
ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় ইসলামের সর্বাধিক প্রামাণ্য ও সর্বজনীন সংজ্ঞা হলো:
- «الاسْتِسْلَامُ لِلَّهِ بِالتَّوْحِيدِ، وَالانْقِيَادُ لَهُ بِالطَّاعَةِ، وَالْبَرَاءَةُ مِنَ الشِّرْكِ وَأَهْلِهِ»
“তাওহীদ বা একত্ববাদের মাধ্যমে একমাত্র আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করা, তাঁর বিধিবিধান পালনের মাধ্যমে আনুগত্য স্বীকার করা এবং সকল প্রকার শিরক ও মুশরিকী আচরণ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও সম্পর্কহীন থাকা।” - হাদীসে জিবরীলের আলোকে: হযরত উমর (রা.) বর্ণিত বিশ্ববিখ্যাত হাদীসে জিবরীলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইসলামের ব্যবহারিক স্তম্ভসমূহ বর্ণনা করেছেন: তাওহীদের সাক্ষ্যদান, নামায কায়েম করা, যাকাত আদায় করা, রমযানের রোযা রাখা এবং সামর্থ্যবান ব্যক্তির জন্য বায়তুল্লাহর হজ্জ সম্পাদন করা (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)।
৩. ইসলামের আকিদাগত অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ (خصائص الإسلام العقدية)
ইসলামের আকিদা (বিশ্বাসমালা) এমন কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী যা পৃথিবীর অন্য কোনো ধর্ম বা মতবাদে খুঁজে পাওয়া যায় না:
- খাঁটি ও আপসহীন তাওহীদ (التوحيد الخالص):
ইসলামের আকিদার মূল ভিত্তি হলো তাওহীদ। ইসলাম আল্লাহর সত্তা, গুণাবলি ও উপাসনায় কোনো প্রকার অংশীদারিত্ব (শিরক) স্বীকার করে না। খ্রিস্টধর্মের ত্রিত্ববাদ (Trinity), হিন্দুধর্মের বহু ঈশ্বরবাদ বা পৌত্তলিকতা এবং জড়বাদের বিপরীতে ইসলাম পরম একত্ববাদের অটল ঘোষণা দেয়: ﴿قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ اللَّهُ الصَّمَدُ﴾। - সুস্পষ্টতা ও সরলতা (الوضوح والبساطة):
ইসলামের আকিদা অত্যন্ত সহজ, সরল ও স্বাভাবিক। এতে কোনো ধরনের অবোধ্য রহস্যবাদ (Mysteries), পুরোহিততন্ত্রের মধ্যস্থতা বা দর্শনতাত্ত্বিক জটাজাল নেই। একজন সাধারণ রাখাল থেকে শুরু করে শীর্ষ বিজ্ঞানী পর্যন্ত সকলেই অতি সহজে বুঝতে পারে যে—আমাদের একজনই স্রষ্টা, তিনিই আমাদের রিযিকদাতা এবং তাঁর কাছেই আমাদের ফিরে যেতে হবে। - ফিতরাত বা মানব প্রকৃতির সাথে পূর্ণ সংগতি (الموافقة للفطرة السليمة):
ইসলামের বিশ্বাসমালা মানুষের জন্মগত নির্মল স্বভাবের সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি মানুষকে কোনো কাল্পনিক জন্মগত পাপের (Original Sin) বোঝা চাপায় না। ইসলাম শেখায় প্রতিটি মানবশিশু নিষ্পাপ হয়ে জন্মগ্রহণ করে (كُلُّ مَوْلُودٍ يُولَدُ عَلَى الْفِطْرَةِ)। - যুক্তি ও সুস্থ বিবেকের সাথে সামঞ্জস্য (التوافق مع العقل السليم):
ইসলাম কোনো অন্ধবিশ্বাস চাপিয়ে দেয় না; বরং কুরআন মানুষকে চিন্তা-গবেষণা, মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণ এবং বুদ্ধি প্রয়োগের আহ্বান জানায় (﴿أَفَلَا تَعْقِلُونَ﴾, ﴿أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ﴾)। সুস্থ বিবেকের সাথে ইসলামের কোনো আকিদাগত বিরোধ নেই। - স্থায়িত্ব ও শাশ্বত রূপ (الثبات والخلود):
ইসলামের মূল আকিদা হযরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে শেষনবী মুহাম্মদ (ﷺ) পর্যন্ত অভিন্ন ছিল এবং কিয়ামত পর্যন্ত অপরিবর্তনীয় থাকবে। এতে কোনো যুগের মানুষের ইচ্ছা অনুযায়ী কোনো সংযোজন বা বিয়োজনের সুযোগ নেই। - ইহকাল ও পরকালের সুষম সমন্বয় (الشمول والتوازن):
ইসলাম কেবল বৈরাগ্য বা কেবল বস্তুবাদ শেখায় না; বরং এটি পার্থিব জীবনকে আখেরাতের ক্ষেত হিসেবে গণ্য করে মানুষের আধ্যাত্মিক ও জাগতিক চাহিদার মাঝে অপূর্ব ভারসাম্য বিধান করে।
٤- عرف اليهودية- ثم تحدث عن نشأتها وتطورها مفصلًا-
[ইহুদি ধর্মের পরিচয় দাও। অতঃপর ইহুদি ধর্মের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা কর।]
১. ইহুদি ধর্মের (اليهودية – Judaism) পরিচয়
- নামকরণ ও আভিধানিক অর্থ: ‘আল-ইয়াহূদিয়্যাহ’ (اليهودية) শব্দটি মূলত হযরত ইয়াকুব (আ.)-এর চতুর্থ পুত্র ‘ইয়াহূদা’ (Judah)-এর নামানুসারে প্রচলিত হয়েছে। ব্যাবিলনীয় নির্বাসনের পর ইয়াহূদা বংশের লোকজনের প্রাধান্য থাকায় তাদের ধর্ম ও মতবাদ ‘ইহুদি ধর্ম’ নামে প্রসিদ্ধি পায়। কেউ কেউ বলেন, এটি আরবী ‘هَادَ – يَهُودُ’ (হাদা-ইয়াহূদু) থেকে এসেছে, যার অর্থ সত্যের দিকে প্রত্যাবর্তন বা তাওবাহ করা। যেমন কুরআনে এসেছে: ﴿إِنَّا هُدْنَا إِلَيْكَ﴾ অর্থাৎ আমরা আপনার দিকেই প্রত্যাবর্তন করলাম।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: ইহুদি ধর্ম হলো বনী ইসরাঈল বা হিব্রু জাতির ধর্মবিশ্বাস, যা ঐতিহাসিকভাবে হযরত মূসা (আ.)-এর মাধ্যমে আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ তাওরাতের অনুসারী হিসেবে দাবি করে; কিন্তু কালক্রমে মানব রচিত ‘তালমুদ’ এবং রব্বাইদের বিকৃত বিধিবিধান ও বর্ণবাদী জাতীয়তাবাদ দ্বারা রূপান্তরিত হয়েছে।
২. ইহুদি ধর্মের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ঐতিহাসিক পর্যায়সমূহ (نشأتها وتطورها)
ইহুদি ধর্মের ইতিহাস এক সুদীর্ঘ ও সংঘাতপূর্ণ বিবর্তনের ইতিহাস। এর প্রধান ঐতিহাসিক স্তরগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
- হযরত ইব্রাহীম (আ.) ও পিতৃপুরুষদের যুগ (عصر الآباء):
ঐতিহাসিকভাবে হিব্রু জাতির সূচনা হয় হযরত ইব্রাহীম (আ.)-এর ইরাক থেকে কেনানে (ফিলিস্তিন) হিজরতের মাধ্যমে। অতঃপর হযরত ইসহাক (আ.) এবং তাঁর পুত্র হযরত ইয়াকুব (আ.)-এর মাধ্যমে এই বংশধারা বিস্তৃত হয়। ইয়াকুব (আ.)-এর অপর নাম ছিল ‘ইসরাঈল’ (আল্লাহর দাস)। তাঁর বারো পুত্রের মাধ্যমে বনী ইসরাঈলের বারোটি গোত্রের উৎপত্তি ঘটে। - মিশরে অবস্থান ও মূসা (আ.)-এর আবির্ভাব (عصر موسى عليه السلام والخروج):
হযরত ইউসুফ (আ.)-এর যুগে বনী ইসরাঈল মিশরে আগমন করে স্থায়ী হয়। পরবর্তীতে ফেরাউনদের দ্বারা তারা চরম দাসত্ব ও নির্যাতনের শিকার হয়। ত্রয়োদশ শতাব্দী খ্রিস্টপূর্বাব্দে মহান আল্লাহ হযরত মূসা (আ.)-কে বনী ইসরাঈলের ত্রাণকর্তা হিসেবে প্রেরণ করেন। মূসা (আ.) অলৌকিকভাবে লোহিত সাগর পার হয়ে তাদেরকে মিশর থেকে মুক্ত করেন। ঐতিহাসিক সীনাই পর্বতে আল্লাহ তা‘আলা মূসা (আ.)-এর ওপর দশটি মূল আদেশ (Ten Commandments) এবং ‘তাওরাত’ কিতাব অবতীর্ণ করেন। - মরুভূমিতে বিচরণ ও বিচারকদের যুগ (عصر القضاة):
মূসা (আ.)-এর অবাধ্যতা ও ফিলিস্তিনে জিহাদে অস্বীকৃতির কারণে বনী ইসরাঈল তিহ প্রান্তরে ৪০ বছর পথভ্রষ্ট থাকে। মূসা ও হারূন (আ.)-এর ওফাতের পর হযরত ইউশা ইবনে নূন (আ.)-এর নেতৃত্বে তারা পবিত্র ভূমি জেরুজালেমে প্রবেশ করে। এরপর দীর্ঘকাল বিভিন্ন বিচারক বা গোত্রপতিদের দ্বারা তারা শাসিত হয়। - রাজতন্ত্রের স্বর্ণযুগ (عصر الملوك: داود وسليمان عليهما السلام):
তালূতের পর হযরত দাউদ (আ.) বনী ইসরাঈলকে ঐক্যবদ্ধ করে জেরুজালেম বিজয় করেন এবং শক্তিশালী সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। অতঃপর তাঁর পুত্র হযরত সুলাইমান (আ.) সুবর্ণ যুগে উপনীত হন। তিনি জেরুজালেমে প্রথম পবিত্র ‘হায়কালে সুলাইমানী’ (Solomon’s Temple) নির্মাণ করেন। - বিভক্তি ও প্রথম ধ্বংসযজ্ঞ – ব্যাবিলনীয় বন্দিদশা (الانقسام والسبي البابلي – 586 BC):
সুলাইমান (আ.)-এর ওফাতের পর রাষ্ট্রটি দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে: উত্তরে ইসরাঈল রাজ্য এবং দক্ষিণে ইয়াহূদা রাজ্য। অনাচার ও পাপে লিপ্ত হওয়ায় খ্রিস্টপূর্ব ৫৮৬ অব্দে ব্যাবিলনের রাজা বখতেনাস্বার (Nebuchadnezzar) জেরুজালেম আক্রমণ করে হায়কালে সুলাইমানী সম্পূর্ণ ধ্বংস করে এবং অধিকাংশ ইহুদিকে বন্দী করে ব্যাবিলনে নিয়ে যায়। - পারস্য যুগ ও তালমুদী যুগের সূচনা (عصر التلمود والعودة):
পারস্যের সম্রাট সাইরাস ব্যাবিলন দখল করার পর ইহুদিদের ফিলিস্তিনে প্রত্যাবর্তনের অনুমতি দেন। এ যুগে উযাইর (Ezra)-এর নেতৃত্বে তাওরাত পুনরায় লিপিবদ্ধের দাবি করা হয়। পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে মৌখিক ঐতিহ্যগুলোকে সংকলিত করে সুবিশাল ‘তালমুদ’ (Talmud) রচিত হয়, যা তাওরাতের চেয়েও বেশি কর্তৃত্বশীল হয়ে ওঠে। - রোমান যুগ ও দ্বিতীয় ধ্বংসযজ্ঞ (تدمير الهيكل الثاني – 70 AD):
৭০ খ্রিস্টাব্দে রোমান সেনাপতি টাইটাস জেরুজালেম পুনরায় মাটিতে মিশিয়ে দেন এবং দ্বিতীয় মন্দির ধ্বংস করেন। এরপর থেকে ইহুদিরা সমগ্র বিশ্বে ছিন্নভিন্ন (Diaspora) হয়ে যাযাবর জীবনযাপন করতে থাকে। বিংশ শতাব্দীতে জায়নবাদী আন্দোলনের ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনের ভূখণ্ড জবরদখল করে অবৈধ ইসরায়েল রাষ্ট্র কায়েম করে।
٥- اكتب ما تعرف عن مؤامرات اليهود ضد الإسلام والمسلمين-
[ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ইহুদিদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে যা জান লেখ।]
ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে ইহুদিদের ঐতিহাসিক ও সমকালীন ষড়যন্ত্র
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, ইহুদিরা নিজেদের ‘ঈশ্বরের মনোনীত জাতি’ দাবি করে অহংকার ও হিংসায় মত্ত হয়ে সত্যের দূত নবী-রাসূলদের হত্যা করেছে এবং ইসলামের আবির্ভাবের প্রথম দিন থেকেই এর অস্তিত্ব মুছে দিতে অবিরাম ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা মোমেনদের সতর্ক করে ইরশাদ করেছেন:
﴿لَتَجِدَنَّ أَشَدَّ النَّاسِ عَدَاوَةً لِّلَّذِينَ آمَنُوا الْيَهُودَ وَالَّذِينَ أَشْرَكُوا﴾ [المائدة: ৮২]
“নিশ্চয় আপনি ঈমানদারদের প্রতি শত্রুতার দিক দিয়ে সর্বাপেক্ষা কঠোর পাবেন ইহুদি ও মুশরিকদের।”
নিম্নে যুগে যুগে ইসলামের বিরুদ্ধে ইহুদিদের প্রধান প্রধান ষড়যন্ত্রসমূহ আলোচনা করা হলো:
- মদীনায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাথে চুক্তিভঙ্গ ও বিশ্বাসঘাতকতা:
রাসূল (ﷺ) মদীনায় হিজরতের পর শান্তি ও সম্প্রীতির উদ্দেশ্যে ইহুদি গোত্রগুলোর সাথে বিখ্যাত ‘মদীনা সনদ’ সম্পাদন করেছিলেন। কিন্তু তারা চরম বিশ্বাসঘাতকতা প্রদর্শন করে:- বনু কাইনুকা’র ষড়যন্ত্র: বদর যুদ্ধের বিজয়ে ঈর্ষান্বিত হয়ে এক মুসলিম নারীর হিজাব টেনে অসম্মান করে এবং চুক্তি লঙ্ঘন করে যুদ্ধ ঘোষণা করে।
- বনু নাযীরের হত্যা প্রচেষ্টা: তারা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে প্রাচীরের পাশে বসিয়ে ওপর থেকে বিশাল পাথর ফেলে হত্যা করার চক্রান্ত করেছিল, যা জিবরীল (আ.) ওহীর মাধ্যমে ফাঁস করে দেন।
- বনু কুরায়যার চরম গাদ্দারী (খন্দক যুদ্ধ): আহযাব বা খন্দকের যুদ্ধে যখন দশ হাজার পৌত্তলিক মদীনা ঘেরাও করেছিল, তখন শহরের অভ্যন্তরে থাকা বনু কুরায়যা পিছন থেকে মুসলমানদের ওপর হামলার জন্য কাফেরদের সাথে হাত মিলিয়ে গোটা মুসলিম জাতিকে সমূলে ধ্বংস করার অপচেষ্টা চালায়।
- রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বিষপ্রয়োগ ও যাদু করার ষড়যন্ত্র:
খায়বার বিজয়ের পর যায়নাব বিনতে হারেছ নাম্নী এক ইহুদি নারী ভেড়ার ভুনা গোশতের সাথে মারাত্মক বিষ মিশিয়ে নবীজী (ﷺ)-কে হত্যার অপচেষ্টা চালায়। এছাড়া লাবীদ ইবনুল আ’সাম নামক এক ইহুদি রাসূল (ﷺ)-এর চুল ও চিরুনি চুরি করে তাতে মারাত্মক যাদু করেছিল, যার ফলে সূরা ফালাক ও সূরা নাস নাযিল হয়। - মুসলিম উম্মাহর অভ্যন্তরে প্রথম ফিতনা ও গৃহযুদ্ধ সৃষ্টি (আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা):
ইহুদিরা অস্ত্র দিয়ে ইসলামকে পরাস্ত করতে ব্যর্থ হয়ে ভেতরে ঢুকে মুনাফেকী শুরু করে। ইয়ামেনের চরম ধূর্ত ইহুদি আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা কৃত্রিমভাবে ইসলাম গ্রহণ করে। সে হযরত উসমান (রা.)-এর খেলাফতের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ ছড়িয়ে বিদ্রোহের আগুন জ্বালায়, যার ফলে খলীফা উসমান (রা.) শহীদ হন এবং পরবর্তীতে জঙ্গে জামাল ও সিফফীনের মতো রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ সংঘটিত হয়। - উসমানীয় খেলাফত ধ্বংসের ষড়যন্ত্র:
জায়নবাদের প্রতিষ্ঠাতা থিওডোর হার্জেল ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জন্য ভূমি কিনতে উসমানীয় সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদের কাছে বিপুল অর্থ ও ঋণের প্রস্তাব নিয়ে যায়। সুলতান কঠোরভাবে তা প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন, “ফিলিস্তিনের এক ইঞ্চি মাটিও ইহুদিদের দেব না; কারণ এটি আমার ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, বরং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর আমানত।” এর প্রতিশোধ হিসেবে ইহুদিরা ‘দুনমা ইহুদি’ এবং ‘ইয়াং টার্ক’দের ব্যবহার করে ১৯২৪ সালে উসমানীয় খেলাফতকে সমূলে ধ্বংস করে দেয়। - ফিলিস্তিন দখল, আল-আকসা ধ্বংসের চক্রান্ত ও হত্যাযজ্ঞ:
প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মদদে ১৯৪৮ সালে বলপূর্বক ফিলিস্তিনে ইসরায়েল রাষ্ট্র কায়েম করে লক্ষ লক্ষ ফিলিস্তিনীকে বাস্তুচ্যুত করা হয়। মুসলমানদের প্রথম কিবলা ‘মসজিদুল আকসা’ ধ্বংস করে তথাকথিত ‘হায়কালে সুলাইমানী’ নির্মাণের জন্য প্রতিদিন খননকার্য ও অপতৎপরতা চালাচ্ছে এবং গাজাসহ পুরো ভূখণ্ডে ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যা পরিচালনা করছে। - আন্তর্জাতিক মিডিয়া, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির নিয়ন্ত্রণ:
আধুনিক বিশ্বে বৈশ্বিক মিডিয়া, ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি (হলিউড) এবং সুদী ব্যাংকিং ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে ইহুদিরা বিশ্বব্যাপী ইসলামোফোবিয়া (ইসলামভীতি) ছড়াচ্ছে এবং মুসলিম তরুণ প্রজন্মের মাঝে বেহায়াপনা ও অনৈতিকতা ছড়িয়ে তাদের ঈমান ধ্বংস করার গোপন এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে।
٦- على من أنزلت التوراة؟ وكيف حرفها اليهود؟ بين مفصلًا-
[তাওরাত কার উপর নাযিল হয়েছিল? ইহুদিরা কীভাবে তাওরাতকে বিকৃত করেছিল? বিস্তারিত বর্ণনা কর।]
১. তাওরাত কার ওপর নাযিল হয়েছিল?
তাওরাত (التوراة – Torah) হলো মহান রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ অন্যতম প্রধান চারখানা আসমানী কিতাবের একটি। এটি বনী ইসরাঈলের শ্রেষ্ঠ নবী ও রাসূল হযরত মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর ওপর নাযিল হয়েছিল।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন:
﴿إِنَّا أَنزَلْنَا التَّوْرَاةَ فِيهَا هُدًى وَنُورٌ يَحْكُمُ بِهَا النَّبِيُّونَ الَّذِينَ أَسْلَمُوا لِلَّذِينَ هَادُوا﴾ [المائدة: ৪৪]
“নিশ্চয় আমি তাওরাত অবতীর্ণ করেছি, যাতে রয়েছে হিদায়াত ও আলো। আল্লাহর অনুগত নবীগণ এর দ্বারাই ইহুদিদের ফয়সালা করতেন।”
ঐতিহাসিক সীনাই পর্বতে চল্লিশ দিন ইবাদতের পর মহান আল্লাহ স্বহস্তে খোদাই করা ফলকসমূহের (الألواح) মাধ্যমে মূসা (আ.)-কে এই পবিত্র বিধান দান করেছিলেন।
২. ইহুদিরা কীভাবে তাওরাতকে বিকৃত (তাহরীফ) করেছিল? (كيف حرفها اليهود)
পবিত্র কুরআন অকাট্যভাবে সাক্ষ্য দেয় যে, ইহুদিরা তাদের আসমানি গ্রন্থ তাওরাতকে বিকৃত করে নিজেদের মনগড়া কিতাবে রূপান্তরিত করেছে (﴿يُحَرِّفُونَ الْكَلِمَ عَن مَّوَاضِعِهِ﴾)। ইহুদিদের এই বিকৃতি মূলত দুই প্রকারে সম্পন্ন হয়েছিল: শব্দগত বিকৃতি (التحريف اللفظي) এবং অর্থগত বিকৃতি (التحريف المعنوي)। নিম্নে তা বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হলো:
- মূল পাণ্ডুলিপি হারিয়ে যাওয়া ও শত শত বছর পর স্মৃতি থেকে পুনর্লিখন:
হযরত মূসা (আ.)-এর ওফাতের পর ব্যাবিলনীয় রাজা বখতেনাস্বার (খ্রিস্টপূর্ব ৫৮৬) যখন জেরুজালেম ধ্বংস করে, তখন তাওরাতের মূল ফলক ও সিন্দুক (তাবুত) চিরতরে ভস্মীভূত ও ধ্বংস হয়ে যায়। এর দীর্ঘকাল পর পারস্যের যুগে ‘উযাইর’ (Ezra) নিজের স্মৃতি থেকে তাওরাত পুনর্লিখনের দাবি করেন। ঐতিহাসিক গবেষক ও আধুনিক বাইবেল বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান তাওরাতের পাঁচটি পুস্তক (Genesis, Exodus, Leviticus, Numbers, Deuteronomy) মূসা (আ.)-এর লেখা নয়; বরং বহু শতাব্দী ধরে বহু অজ্ঞাত লেখক নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী এতে সংযোজন ও বিয়োজন ঘটিয়েছে। - শব্দ ও বিধান পরিবর্তন (التحريف بالتبديل والزيادة والنقصان):
ইহুদি রব্বাইরা তাদের স্বার্থের অনুকূলে ঈশ্বরের বাণী পরিবর্তন করে দিত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাদের এই ধৃষ্টতা উন্মোচন করেছেন:
﴿فَوَيْلٌ لِّلَّذِينَ يَكْتُبُونَ الْكِتَابَ بِأَيْدِيهِمْ ثُمَّ يَقُولُونَ هَذَا مِنْ عِندِ اللَّهِ لِيَشْتَرُوا بِهِ ثَمَنًا قَلِيلًا﴾ [البقرة: ৭৯]
“অতএব দুর্ভোগ তাদের জন্য, যারা নিজ হাতে কিতাব লিখে অতঃপর বলে এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে, যাতে এর বিনিময়ে সামান্য মূল্য গ্রহণ করতে পারে!” - শেষনবী মুহাম্মদ (ﷺ)-এর নবুওয়াত ও গুণাবলীর বিবরণ গোপন করা:
আসল তাওরাতে শেষযামানার নবী হযরত মুহাম্মদ (ﷺ)-এর আগমন, তাঁর গুণাবলি, মক্কা ও মদীনার বিবরণ স্পষ্টভাবে উল্লেখিত ছিল। কিন্তু ইহুদি পণ্ডিতরা নিজেদের গোত্রীয় শ্রেষ্ঠত্ব হারানোর ভয়ে সেই আয়াতগুলোকে তাওরাত থেকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলে এবং সাধারণ মানুষের কাছে তা গোপন করে (﴿يَكْتُمُونَ مَا أَنزَلَ اللَّهُ مِنَ الْكِتَابِ﴾)। - শারয়ী বিধান ও হদ রহিতকরণ:
সহীহ হাদীসে এসেছে, এক সম্ভ্রান্ত ইহুদি পুরুষ ও নারী ব্যভিচারে লিপ্ত হলে তাওরাতের ‘রজম’ (প্রস্তরাঘাতে মৃত্যুদণ্ড)-এর স্পষ্ট বিধান থাকা সত্ত্বেও তারা তা লুকিয়ে রেখে মুখে কালি মেখে গাধার পিঠে উল্টো করে চড়ানোর বিধান তৈরি করেছিল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাওরাত আনালে তারা রজমের আয়াতের ওপর হাত দিয়ে ঢেকে রেখেছিল, যা আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রা.) ধরে ফেলেন। - আল্লাহর পবিত্র সত্তা সম্পর্কে কুরুচিপূর্ণ মিথ্যা সংযোজন:
বর্তমান তাওরাতে আল্লাহ তা‘আলার মর্যাদার চরম অবমাননা করে লেখা হয়েছে যে—সৃষ্টির পর ঈশ্বর ক্লান্ত হয়ে বিশ্রাম নিয়েছিলেন (Genesis 2:2), ঈশ্বর অনুতপ্ত হয়ে কেঁদেছিলেন, এমনকি ইয়াকুব (আ.)-এর সাথে ঈশ্বর সারারাত কুস্তি লড়ে হেরে গিয়েছিলেন (Genesis 32:28)! (নাউযুবিল্লাহ)। - আল্লাহর নিষ্পাপ নবীগণের ওপর ব্যভিচার ও মদ্যপানের জঘন্য অপবাদ:
বিকৃত তাওরাতে হযরত লূত (আ.) সম্পর্কে দাবি করা হয়েছে তিনি মদ পান করে নিজের দুই কন্যার সাথে ব্যভিচার করেছেন (Genesis 19:30-36)! হযরত দাউদ (আ.) সম্পর্কে বলা হয়েছে তিনি সেনাপতির স্ত্রীকে দেখে কামাসক্ত হয়ে সেনাপতিকে হত্যা করিয়ে স্ত্রীকে নিজের ঘরে তুলেছেন! হযরত হারূন (আ.) নাকি নিজেই স্বর্ণের বাছুর বানিয়ে পূজার ব্যবস্থা করেছিলেন!
এই ঐতিহাসিক ও লিখিত বাস্তব প্রমাণাদি দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করে যে, বর্তমান প্রচলিত তাওরাত কোনোভাবেই আল্লাহর খাঁটি ওহী নয়; বরং তা ইহুদিদের বিকৃত ও রূপান্তরিত এক পৌরাণিক সংকলন মাত্র।
٧- عرف الهندوسية ثم تحدث عن الطبقات الموجودة فى المجتمع الهندوسي مع ذكر خصوصيات كل عنها موضحًا-
[হিন্দু ধর্মের পরিচয় দাও। হিন্দু সমাজে বিদ্যমান শ্রেণিবিভেদ এবং এদের বৈশিষ্ট্যাবলি বিস্তারিত বর্ণনা কর।]
১. হিন্দু ধর্মের (الهندوسية – Hinduism) পরিচয়
- নামকরণ ও সংজ্ঞা: ‘হিন্দু’ কোনো একক ধর্মের নাম নয়; বরং এটি মূলত একটি ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক অভিধা। প্রাচীন পারসিক ও আরবরা সিন্ধু নদের (Indus River) তীরবর্তী অববাহিকায় বসবাসকারী মানুষদের ‘হিন্দ’ এবং তাদের অধিবাসীদের ‘হিন্দু’ বলে ডাকত। পরবর্তীতে ইংরেজ ঔপনিবেশিক আমলে এই অঞ্চলের প্রাচীন পৌত্তলিক বিশ্বাসমালাকে সম্মিলিতভাবে ‘হিন্দুধর্ম’ (Hinduism) নামে অভিহিত করা হয়। হিন্দুরা স্বয়ং নিজেদের ধর্মকে ‘সনাতন ধর্ম’ (Eternal Religion) বা ‘বর্ণাশ্রম ধর্ম’ বলে আখ্যায়িত করে।
- ধর্মতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য: হিন্দুধর্মের কোনো নির্দিষ্ট একক প্রতিষ্ঠাতা (Founder), সুনির্দিষ্ট একক ধর্মগ্রন্থ বা একক আকীদা নেই। এটি বহু দেব-দেবী পূজা, মূর্তিপূজা, প্রকৃতিপূজা এবং জন্মান্তরবাদ ও কর্মফলের বিশ্বাসের ওপর গড়ে ওঠা একটি জটিল ধর্মীয় বিশ্বাস। তাদের মূল ধর্মীয় সাহিত্যের মধ্যে রয়েছে বেদ (ঋগ্বেদ, সামবেদ, যজুঃবেদ ও অথর্ববেদ), উপনিষদ, রামায়ণ, মহাভারত এবং মনুসংহিতা।
২. হিন্দু সমাজে বিদ্যমান বর্ণভেদ ও শ্রেণিপ্রথা (نظام الطبقات – Caste System)
হিন্দু সমাজব্যবস্থার সবচেয়ে প্রভাবশালী ও বিতর্কিত স্তম্ভ হলো তাদের বর্ণপ্রথা (Caste System বা চতুর্বর্ণ প্রথা)। হিন্দুধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী সমাজ জন্মগতভাবেই চারটি প্রধান স্তরে বিভক্ত। ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের বিখ্যাত ‘পুরুষসূক্ত’ (Purusha Sukta) এবং মনুসংহিতায় দাবি করা হয়েছে যে, পরমাত্মা বা ব্রহ্মার কাল্পনিক শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ থেকে এই চারটি বর্ণের উৎপত্তি হয়েছে:
| শ্রেণি/বর্ণ | পৌরাণিক উৎপত্তি | সমাজ নির্ধারিত দায়িত্ব ও পেশা | ধর্মীয় বিশেষত্ব ও সামাজিক অধিকার |
|---|---|---|---|
| ১. ব্রাহ্মণ (البرهميون – Brahmins) | ব্রহ্মার মুখ থেকে সৃষ্ট। | বেদ পাঠ ও অধ্যাপনা, যজ্ঞ সম্পাদন, ধর্মীয় পৌরহিত্য এবং সমাজকে আধ্যাত্মিক দিকনির্দেশনা প্রদান। | সর্বোচ্চ সামাজিক মর্যাদা, পূজনীয় ও অভ্রান্ত শ্রেণি। কোনো অবস্থাতেই তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যাবে না এবং সমস্ত কর থেকে তারা মুক্ত থাকবে। |
| ২. ক্ষত্রিয় (الكشتري – Kshatriyas) | ব্রহ্মার বাহু বা বক্ষ থেকে সৃষ্ট। | দেশরক্ষা, যুদ্ধ পরিচালনা, রাজ্য শাসন, বিচারকাজ এবং প্রজাপালন। | সামরিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী। ব্রাহ্মণদের পরেই দ্বিতীয় স্থান; তবে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে ব্রাহ্মণের অধীনস্থ। |
| ৩. বৈশ্য (الفيش – Vaishyas) | ব্রহ্মার উরু থেকে সৃষ্ট। | কৃষিকাজ, পশুপালন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতি সচল রাখা। | সমাজের মধ্যম শ্রেণি। তারা বেদ পাঠের অধিকার পেত (দ্বিজ), কিন্তু শাসনক্ষমতা বা পৌরহিত্যের কোনো অধিকার ছিল না। |
| ৪. শূদ্র (الشودر – Shudras) | ব্রহ্মার পদযুগল থেকে সৃষ্ট। | উপরোক্ত উচ্চ তিন বর্ণের (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য) আজীবন নিঃশর্ত সেবা ও দাসত্ব করা। | সবচেয়ে নিম্ন ও মর্যাদাহীন স্তর। বেদ পাঠ বা শোনার কোনো অধিকার নেই; বেদ শুনলে কানে উত্তপ্ত সীসা ঢেলে দেওয়ার শাস্তির বিধান মনুসংহিতায় রয়েছে। |
৩. দলিত বা অস্পৃশ্য সম্প্রদায় (الأنجاس أو الداليت – Untouchables)
উক্ত চার বর্ণের বাইরেও বিশাল এক মানবগোষ্ঠী রয়েছে যাদের চাতুর্বর্ণের বাইরে রাখা হয়েছে। তাদের ‘অস্পৃশ্য’, ‘ম্লেচ্ছ’, ‘চণ্ডাল’ বা আধুনিককালে ‘দলিত’ বলা হয়। তাদের ছোঁয়া লাগলে উচ্চবর্ণের মানুষের শরীর অপবিত্র হয়ে যায় বলে বিশ্বাস করা হতো। তাদের জন্য গ্রামের সাধারণ কূপে পানি তোলা, মন্দিরে প্রবেশ করা এবং প্রকাশ্য রাস্তায় জুতো পরে হাঁটা পর্যন্ত শতাব্দীর পর শতাব্দী নিষিদ্ধ ছিল।
৪. বর্ণপ্রথার বৈশিষ্ট্য ও কুফল
- জন্মগত অনড়তা: কর্ম বা মেধার ভিত্তিতে নয়; বরং একজন মানুষ যে বর্ণে জন্মগ্রহণ করবে, মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত সে সেই বর্ণের সদস্য থাকবে। কোনো শূদ্র শত গুণবান হলেও ব্রাহ্মণ হতে পারবে না।
- বিবাহ ও সামাজিক মেলামেশায় কঠোর নিষেধাজ্ঞা: এক বর্ণের সাথে অন্য বর্ণের বিবাহ (অনুলোম ও প্রতিলোম বিবাহ) কঠোরভাবে নিষিদ্ধ এবং এটি সামাজিক পাপ হিসেবে গণ্য হতো।
- মানবাধিকার ও সাম্যের চরম পরিপন্থী: এই বর্ণপ্রথা মানবজাতিকে চিরতরে দাসত্ব ও অসমতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ করেছে, যার সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান গ্রহণ করেছে ইসলাম—যেখানে তাকওয়াই হলো মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র ভিত্তি।
٨- علق على اثنين مما يلى: (أ) البوذية؛ (ب) كتاب التلمود؛ (ج) النصرانية؛ (د) مقارنة الأديان-
[নিচের যে কোনো দুটি বিষয়ে টীকা লেখ: (ক) বৌদ্ধ ধর্ম; (খ) তালমুদ গ্রন্থ; (গ) খ্রিস্টান ধর্ম; (ঘ) তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব।]
(পরীক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতির স্বার্থে চারটি বিষয়েরই বিশদ টীকা নিচে প্রস্তুত করা হলো:)
(أ) البوذية (বৌদ্ধ ধর্ম – Buddhism)
- সূচনা ও প্রতিষ্ঠাতা: খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে প্রাচীন ভারতে হিন্দুধর্মের চরম বর্ণপ্রথা, যাগযজ্ঞ ও ব্রাহ্মণদের শোষণের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদী আন্দোলন হিসেবে বৌদ্ধধর্মের উৎপত্তি হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শাক্যবংশীয় রাজপুত্র সিদ্ধার্থ গৌতম (খ্রিস্টপূর্ব ৫৬৩–৪৮৩ অব্দ)। কঠোর তপস্যার পর তিনি ‘বোধি’ (দিব্যজ্ঞান) লাভ করে ‘বুদ্ধ’ (জ্ঞানী) নামে খ্যাতি লাভ করেন।
- মৌলিক দর্শন: বৌদ্ধধর্ম মূলত কোনো ঈশ্বরবাদী ধর্ম নয়; বরং এটি একটি নীতিবাদী ও মনস্তাত্ত্বিক আত্মশুদ্ধির দর্শন। এর মূল নির্যাস হলো ‘চারটি মহান আর্য সত্য’ (Four Noble Truths):
- জগৎ দুঃখময় (জীবন দুঃখপূর্ণ)।
- দুঃখের মূল কারণ হলো কামনা, বাসনা ও তৃষ্ণা।
- কামনা-বাসনা ত্যাগ করলেই দুঃখের অবসান সম্ভব।
- দুঃখ মুক্তির একমাত্র পথ হলো ‘অষ্টাঙ্গিক মার্গ’ (Eightfold Path – সৎ চিন্তা, সৎ সংকল্প, সৎ বাক্য, সৎ কর্ম, সৎ জীবিকা, সৎ প্রচেষ্টা, সৎ স্মৃতি ও সৎ সমাধি)।
- চূড়ান্ত লক্ষ্য: বৌদ্ধধর্মের পরম লক্ষ্য হলো ‘নির্বাণ’ (Nirvana) লাভ—যা সকল জাগতিক লোভ, লালসা ও পুনর্জন্মের চক্র থেকে চিরতরে আত্মিক মুক্তি বোঝায়।
- ধর্মগ্রন্থ ও সম্প্রদায়: বৌদ্ধদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ হলো পাল ভাষায় রচিত ‘ত্রিপিটক’ (বিনয় পিটক, সূত্র পিটক ও অভিধর্ম পিটক)। এটি প্রধান দুটি শাখায় বিভক্ত: হীনযান (থেরবাদ) ও মহাযান।
(ب) كتاب التلمود (তালমুদ গ্রন্থ – The Talmud)
- পরিচয় ও তাৎপর্য: ‘তালমুদ’ (التلمود) হিব্রু শব্দ, যার অর্থ শিক্ষা বা পাঠ। এটি ইহুদি ধর্মের মৌখিক ঐতিহ্য, রব্বাই পণ্ডিতদের ব্যাখ্যা, বিতর্ক এবং আইনগত ফতোয়ার এক সুবিশাল বিশ্বকোষ। ইহুদিদের নিকট তালমুদের মর্যাদা ও কর্তৃত্ব বর্তমান লিখিত তাওরাতের চেয়েও বহুগুণ বেশি। এক ইহুদি প্রবাদে বলা হয়: “তাওরাত হলো পানি, কিন্তু তালমুদ হলো সর্বোৎকৃষ্ট সুরা।”
- তালমুদের গঠন: তালমুদ মূলত দুটি প্রধান অংশের সমন্বয়ে গঠিত:
- মিশনাহ (Mishnah): এটি হিব্রু ভাষায় রচিত মূল আইন ও মৌখিক বিধিবিধানের সারসংক্ষেপ, যা আনুমানিক ২০০ খ্রিস্টাব্দে জুদাহ হা-নাসী কর্তৃক সংকলিত হয়।
- গেমারা (Gemara): এটি আরামাইক ভাষায় রচিত মিশনাহর ওপর ইহুদি রব্বাইদের বিস্তারিত ব্যাখ্যা, টিকা ও আইনি বিতর্ক।
সংকলনস্থলের ভিত্তিতে তালমুদ দুই প্রকার: ‘তালমুদে বাবলী’ (ব্যাবিলনীয় সংস্করণ, যা সর্বাধিক প্রামাণিক) এবং ‘তালমুদে ইয়েরুশালমী’ (জেরুজালেম সংস্করণ)।
- তালমুদের চরম বর্ণবাদী ও বিপজ্জনক শিক্ষামালা: তালমুদে চরম ইহুদি শ্রেষ্ঠত্ববাদ এবং অ-ইহুদিদের (গোইম/Goyim) প্রতি চরম ঘৃণা প্রচার করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে—কেবল ইহুদিরাই প্রকৃত মানুষ; অ-ইহুদিরা পশুর সমতুল্য। অ-ইহুদিদের সম্পদ ধোঁকা দিয়ে দখল করা জায়েয এবং খ্রিস্টান ও মুসলমানদের প্রতি চরম অবমাননাকর উক্তি এতে লিপিবদ্ধ রয়েছে।
(ج) النصرانية (খ্রিস্টান ধর্ম – Christianity)
- নামকরণ ও ভিত্তি: আরবী ভাষায় একে ‘নাসরানিয়্যাত’ বলা হয়, যা হযরত ঈসা (আ.)-এর জন্ম ও শৈশবের শহর ফিলিস্তিনের ‘নাসেরা’ (Nazareth) শহরের নামানুসারে করা হয়েছে। পাশ্চাত্য ভাষায় এটি ‘খ্রিস্টধর্ম’ (Christianity) নামে পরিচিত, যা যীশুর গ্রিক উপাধি ‘খ্রিস্ট’ (মসীহ) থেকে উদ্ভূত।
- উৎপত্তি ও বিবর্তন: বনী ইসরাঈলের নবী হযরত ঈসা (আ.) আল্লাহর তাওহীদ এবং ইনজীল কিতাবের প্রচার নিয়ে আগমন করেছিলেন। কিন্তু তাঁর অন্তর্ধানের পর ‘পল’ (Saul of Tarsus) গ্রিক পৌত্তলিক দর্শনের সংমিশ্রণে মূল তাওহীদী শিক্ষাকে বিকৃত করে বর্তমান খ্রিস্টধর্মের রূপ দেয়।
- মৌলিক বিকৃত বিশ্বাসমালা:
- ত্রিত্ববাদ (Trinity – التثليث): একই সাথে তিন ব্যক্তিসত্তায় এক ঈশ্বর—পিতা (ঈশ্বর), পুত্র (যীশু) এবং পবিত্র আত্মা (Holy Spirit)।
- মূল পাপ বা জন্মগত পাপ (Original Sin): আদম (আ.) গন্ধম ফল খেয়ে যে পাপ করেছিলেন, সেই পাপের বোঝা নিয়ে প্রতিটি মানবশিশু পাপী হয়ে জন্ম নেয়।
- ক্রুশবিদ্ধকরণ ও প্রায়শ্চিত্তবাদ (Crucifixion & Atonement – الفداء): ঈশ্বর তাঁর কথিত একমাত্র পুত্রকে ক্রুশে বলিদান দিয়ে মানবজাতির জন্মগত পাপের প্রায়শ্চিত্ত করেছেন। ইসলাম পবিত্র কুরআনে এই ক্রুশবিদ্ধের দাবি সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছে (﴿وَمَا قَتَلُوهُ وَمَا صَلَبُوهُ وَلَكِن شُبِّهَ لَهُمْ﴾)।
- প্রধান সম্প্রদায়সমূহ: রোমান ক্যাথলিক (ভ্যাটিকান ও পোপের অনুসারী), ইস্টার্ন অর্থোডক্স এবং প্রোটেস্ট্যান্ট। তাদের সংকলিত ধর্মগ্রন্থ হলো ‘বাইবেল’ (ওল্ড টেস্টামেন্ট ও নিউ টেস্টামেন্ট)।
(د) مقارنة الأديان (তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব – Comparative Religion)
- সংজ্ঞা: ‘তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব’ হলো জ্ঞানের একটি বৈজ্ঞানিক ও তাত্ত্বিক শাখা, যা বিশ্বের বিভিন্ন ধর্মের ইতিহাস, বিশ্বাস, ধর্মগ্রন্থ, ইবাদত-পদ্ধতি, নীতিশাস্ত্র এবং সামাজিক প্রভাবকে পাশাপাশি রেখে বস্তুনিষ্ঠ ও গভীর পর্যালোচনা করে তাদের মধ্যকার মিল ও অমিল উদঘাটন করে।
- মুসলিম পণ্ডিতগণের ঐতিহাসিক পথিকৃৎ ভূমিকা: আধুনিক ইউরোপ এই শাস্ত্রের দাবিদার হলেও প্রকৃতপক্ষে মুসলিম মনীষীগণই তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের জনক। মুসলিম পণ্ডিতগণ নিরপেক্ষ গবেষণা, মূল ভাষার জ্ঞান এবং অকাট্য প্রমাণের সাহায্যে এই শাস্ত্রকে প্রথম প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।
এই শাস্ত্রের শ্রেষ্ঠ মুসলিম বিশেষজ্ঞ ও গ্রন্থাবলী:- ইমাম আবু রায়হান আল-বীরুনী (রহ.): তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘তাহকীকু মা লিল-হিন্দ’ (تحقيق ما للهند)—যা হিন্দুধর্ম ও ভারতীয় সংস্কৃতির ওপর বিশ্বের প্রথম বস্তুনিষ্ঠ বৈজ্ঞানিক গবেষণাকর্ম।
- ইমাম ইবনে হাযম আল-আন্দালুসী (রহ.): তাঁর রচিত বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-ফিসাল ফিল মিলাল ওয়াল আহওয়া ওয়ান নিহাল’ (الفصل في الملل والأهواء والنحل)—যা ধর্মের তুলনামূলক সমালোচনার ইতিহাসে সর্বকালের সেরা ক্ল্যাসিক।
- ইমাম আশ-শাহরাসতানী (রহ.): তাঁর সুবিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-মিলাল ওয়ান নিহাল’ (الملل والنحل)।
- ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.): তাঁর রচিত ‘আল-জাওয়াবুস সহীহ লিমান বাদ্দালার দীনাল মাসীহ’ (الجواب الصحيح لمن بدل دين المسيح)।
- বর্তমান যুগে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের গুরুত্ব: ইসলামের সার্বজনীন সত্যতা প্রমাণ, ভ্রান্ত মতবাদের যৌক্তিক খণ্ডন, ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সাথে ফলপ্রসূ দাওয়াতি সংলাপ এবং আন্তঃধর্মীয় সহমর্মিতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় এই শাস্ত্রের অবদান অপরিসীম।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের (مقارنة الأديان) জনক কাকে বলা হয় এবং মুসলিমদের ভূমিকা কী?
পাশ্চাত্যে ম্যাক্স মুলারকে আধুনিক ধর্মতত্ত্বের প্রতিষ্ঠাতা বলা হলেও ঐতিহাসিকভাবে মুসলিম মনীষীগণই এই শাস্ত্রের আদি জনক। বিশেষ করে ইমাম ইবনে হাযম আন্দালুসী (‘আল-ফিসাল’) এবং আবু রায়হান আল-বীরুনী (‘তাহকীকু মা লিল-হিন্দ’) বিশ্বখ্যাত বৈজ্ঞানিক ও বস্তুনিষ্ঠ তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।
২. তাওরাত ও তালমুদের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য কী?
তাওরাত হলো আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক হযরত মূসা (আ.)-এর ওপর অবতীর্ণ মূল আসমানী কিতাব; যদিও পরবর্তীতে তা বিকৃত হয়েছে। পক্ষান্তরে তালমুদ হলো আসমানি কিতাব নয়; বরং এটি ইহুদি রব্বাইদের নিজস্ব ব্যাখ্যা, মৌখিক রীতিনীতি ও আইনি ফতোয়ার সংকলন, যাকে ইহুদিরা তাওরাতের চেয়েও বেশি কর্তৃত্বশীল মনে করে।
৩. হিন্দুধর্মের বর্ণপ্রথা ও ইসলামের সামাজিক সাম্যের মূল বৈসাদৃশ্য কী?
হিন্দু বর্ণপ্রথা জন্মগতভাবে মানুষকে চারটি অপরিবর্তনীয় শ্রেণিতে বিভক্ত করে শূদ্র ও দলিতদের চিরতরে মৌলিক মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত করে। বিপরীতে ইসলাম ঘোষণা করেছে সকল মানুষ সমান এবং মানুষের সম্মান ও শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি হলো আল্লাহভীতি বা তাকওয়া।
৪. আসমানি ধর্ম মানুষের জন্য কেন অপরিহার্য?
মানুষের সীমিত বুদ্ধি কখনো জীবনের উদ্দেশ্য ও পরকালের সঠিক জ্ঞান দিতে পারে না। পরম স্রষ্টার পরিচয়, নির্ভুল নৈতিক মানদণ্ড, আত্মিক প্রশান্তি এবং ব্যক্তি ও সমাজের পূর্ণাঙ্গ ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য আসমানি ওহী বা ধর্মের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য।
৫. খ্রিস্টধর্মের মূল ত্রিত্ববাদ (Trinity) কীভাবে ইসলামের তাওহীদের বিপরীত?
খ্রিস্টধর্ম পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মা—এই তিন ব্যক্তিত্বে এক ঈশ্বরের বিভ্রান্তিকর সূত্রে বিশ্বাসী। বিপরীতে ইসলাম আপসহীন নির্ভেজাল একত্ববাদে বিশ্বাসী, যেখানে আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়, যাঁর কোনো সন্তান নেই, পিতা-মাতা নেই এবং সমকক্ষ কেউ নেই।
৬. বৌদ্ধধর্মের ‘নির্বাণ’ বলতে কী বোঝায়?
বৌদ্ধ দর্শনে ‘নির্বাণ’ হলো মানবজীবনের পরম মুক্তি বা আত্মিক প্রাপ্তি। অষ্টাঙ্গিক মার্গ অনুশীলনের মাধ্যমে অন্তরের যাবতীয় কামনা, বাসনা, লোভ ও অহংকার সম্পূর্ণ নিঃশেষ করে জন্ম-মৃত্যুর দুঃখময় পুনর্জন্মের চক্র থেকে চিরতরে অবলুপ্তি লাভ করাই হলো নির্বাণ।
উপসংহার ও পরীক্ষার্থীদের জন্য দিকনির্দেশনা
ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাজিল সম্মান ৪র্থ বর্ষের ‘তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব’ (৪০২) প্রশ্নপত্রটি অত্যন্ত তথ্যসমৃদ্ধ ও আন্তর্জাতিক মানের। পরীক্ষায় ভালো ফলাফল অর্জনের জন্য শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ধর্মের মৌলিক পারিভাষিক শব্দ (হিব্রু, সংস্কৃত, পালি ও আরবী পরিভাষা), ঐতিহাসিক সাল-তারিখ, পবিত্র কুরআনের প্রামাণ্য আয়াত এবং তুলনামূলক বিশ্লেষণ ছক আকারে তুলে ধরতে হবে। ২০২০ সালের এই প্রশ্নপত্রের প্রতিটি উত্তরের গভীরতা ও প্রামাণিকতা আত্মস্থ করলে শিক্ষার্থীরা যে কোনো পর্যায়ের পরীক্ষায় পূর্ণ সাফল্য অর্জন করতে পারবে ইনশাআল্লাহ।
| প্রশ্ন নং | আলোচ্য বিষয় | মূল ধর্মীয় / ঐতিহাসিক রেফারেন্স | সারসংক্ষেপ |
|---|---|---|---|
| ১ | দ্বীনের সংজ্ঞা ও আসমানি ধর্মের প্রয়োজনীয়তা | আরবী অভিধান, তফতযানী, সূরা ফাতিহা ও বাকারাহ | দ্বীনের আভিধানিক অর্থ, পারিভাষিক সংজ্ঞা ও মানবজীবনে ওহীর অনিবার্যতা। |
| ২ | ইসলামের সামাজিক সৌন্দর্যসমূহ | বিদায় হজ্জের ভাষণ, সহীহ বুখারী ও মুসলিমের হাদীস | সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, মানবাধিকার, নারীর সম্মান ও সামাজিক সুবিচার। |
| ৩ | ইসলামের পরিচয় ও আকিদাগত বৈশিষ্ট্য | হাদীসে জিবরীল, সূরা আল-ইখলাস | ইসলামের সংজ্ঞা, আপসহীন তাওহীদ, ফিতরাতের সংগতি ও যুক্তিনির্ভরতা। |
| ৪ | ইহুদি ধর্মের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ | হযরত মূসা (আ.), সীনাই পর্বত, ব্যাবিলনীয় বন্দিদশা ও তালমুদ | বনী ইসরাঈলের বিবর্তন, ধ্বংসযজ্ঞ ও তালমুদী যুগের বিকাশ। |
| ৫ | ইসলামের বিরুদ্ধে ইহুদি ষড়যন্ত্র | মদীনা সনদ লঙ্ঘন, বিষপ্রয়োগ, ইবনে সাবা ও ফিলিস্তিন দখল | বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস ও আধুনিক জায়নবাদের আগ্রাসন। |
| ৬ | তাওরাত নাযিল ও ইহুদিদের বিকৃতি (তাহরীফ) | সূরা মায়েদা, সূরা বাক্বারা, বর্তমান বাইবেলের স্ববিরোধিতা | তাওরাতের শব্দগত ও অর্থগত বিকৃতি এবং নবীদের চরিত্রে মিথ্যা অপবাদ। |
| ৭ | হিন্দুধর্ম ও চতুর্বর্ণ প্রথা | ঋগ্বেদ, পুরুষসূক্ত, মনুসংহিতা | ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র ও দলিতদের জন্মগত বৈষম্য। |
| ৮ | সংক্ষিপ্ত টীকা (চারটি বিষয়) | বৌদ্ধধর্ম, তালমুদ গ্রন্থ, খ্রিস্টান ধর্ম, তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব | চার আর্যসত্য, ইহুদি তালমুদ, ত্রিত্ববাদ ও আল-বীরুনী/ইবনে হাযমের শাস্ত্র। |