জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

উলূমুল হাদীস (Ulumul Hadith) – 201303, আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ – ফাজিল অনার্স ৩য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২৩

Abswer.com Abswer.com
20 September, 2026
৫২ মিনিট পড়ার সময়
১১ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

اختبار السنة الثالثة للفاضل البكالوريوس (الشرف) ، لعام ۲۰۲৩ م
[ফাজিল স্নাতক (সম্মান) তৃতীয় বর্ষ পরীক্ষা, ২০২৩]
القرآن والدراسات الإسلامية
[আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
علوم الحديث
[উলূমুল হাদীস]
বিষয় কোড: ২০১৩০৩ | পরীক্ষা কোড: ২০৩
সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০

الملاحظة: اجب عن اربعة من مجموعة (أ) وعن اربعة من مجموعة (ب)-
[দ্রষ্টব্য: (ক) অংশ থেকে চারটি এবং (খ) অংশ থেকে চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও।]


مجموعة (أ) – ক-বিভাগ (রচনামূলক প্রশ্নাবলি)

الدرجات: ١٥ × ٤ = ٦٠

١- مَا مَعْنَى الْحَدِيثِ لُغَةً وَشَرْعًا؟ وَمَا الْفَرْقُ بَيْنَ الْحَدِيثِ وَالْخَبَرِ وَالْآثَارِ وَالسُّنَّةِ؟ بَيِّنْ –

[১. হাদীসের শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ কী? হাদীস, খবর, আছার ও সুন্নাহর মাঝে পার্থক্য কী? বর্ণনা কর।]

ভূমিকা

ইসলামি শরিয়তের দ্বিতীয় প্রধান এবং অপরিবর্তনীয় উৎস হলো পবিত্র হাদীস। উলূমুল হাদীস শাস্ত্রে ‘হাদীস’, ‘খবর’, ‘আছার’ এবং ‘সুন্নাহ’—এই পরিভাষাগুলো অত্যন্ত গভীর তাৎপর্য বহন করে। নিম্নে এগুলোর সংজ্ঞা ও পারস্পরিক পার্থক্য সবিস্তারে আলোচনা করা হলো।

হাদীসের শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ

শাব্দিক অর্থ: ‘হাদীস’ (الحديث) আরবি শব্দ। এর দুটি প্রধান আভিধানিক অর্থ রয়েছে:

  • নতুন বা অভিনব (الجديد): যা প্রাচীন বা পুরাতন (القديم)-এর বিপরীত। যেহেতু কুরআন আল্লাহর প্রাচীন কালাম (কাদীম) এবং রাসূলুল্লাহ (স.)-এর বাণী পরবর্তীকালে উচ্চারিত, তাই একে হাদীস (নতুন) বলা হয়।
  • বাণী বা কথা (الخبر / الكلام): মানুষ যা বলে বা প্রকাশ করে তাকে হাদীস বলে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: فَلْيَأْتُوا بِحَدِيثٍ مِّثْلِهِ — “তারা পারলে এর অনুরূপ কোনো বাণী নিয়ে আসুক।” (সূরা আত-তূর: ৩৪)।

পারিভাষিক সংজ্ঞা: মুহাদ্দিসীনদের পরিভাষায়, “রাসূলুল্লাহ (স.)-এর দিকে সম্বন্ধযুক্ত প্রতিটি কথা (কওল), কর্ম (ফেল), মৌন সম্মতি (তাক্ববীর) এবং তাঁর সৃষ্টিগত বা চারিত্রিক গুণাবলিকে হাদীস বলা হয়।”

হাদীস, খবর, আছার ও সুন্নাহর মধ্যকার তুলনামূলক পার্থক্য

পরিভাষা সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্য প্রয়োগক্ষেত্র
হাদীস (الحديث) যা বিশেষভাবে কেবল রাসূলুল্লাহ (স.)-এর বাণী, কর্ম, মৌন সম্মতি বা গুণাবলির সাথে সংশ্লিষ্ট। সর্বাধিক খাস ও বিশুদ্ধতমভাবে মারফূ রেওয়ায়েতকে নির্দেশ করে।
খবর (الخبر) অধিকতর সাধারণ। রাসূলুল্লাহ (স.) ছাড়াও যে কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তি, রাজা-বাদশাহ বা অতীতের যে কোনো সংবাদকে খবর বলা হয়। মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিক উভয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
আছার (الأثر) যা মূলত সাহাবায়ে কিরাম (রা.) ও তাবেঈনদের বাণী ও কর্মের দিকে সম্বন্ধযুক্ত (মাওকূফ ও মাক্বতূ)। মুহাদ্দিসীনদের পরিভাষায় সাহাবীদের ফতোয়া ও আমলকে আছার বলা হয়।
সুন্নাহ (السنة) রাসূলুল্লাহ (স.)-এর সামগ্রিক জীবনপদ্ধতি, আদর্শ, শরয়ী তরিকা ও সার্বক্ষণিক আমল। সুন্নাহ হলো বাস্তব অনুসৃত আদর্শ; যা বেদআতের বিপরীত।

উপসংহার

যদিও সাধারণ ক্ষেত্রে এ শব্দগুলো কখনো কখনো সমার্থক হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তবে উলূমুল হাদীসের সুনির্দিষ্ট মূলনীতি অনুযায়ী প্রতিটি শব্দের সূক্ষ্ম শাস্ত্রীয় স্বাতন্ত্র্য রয়েছে।


٢- عَرِّفِ الصَّحِيحَ وَالْحَسَنَ وَالضَّعِيفَ مَعَ ذِكْرِ شَرَائِطِ الصَّحِيحِ –

[২. সহীহ, হাসান ও যয়ীফের পরিচয় প্রদানপূর্বক সহীহ হাদীসের শর্তাবলি উল্লেখ কর।]

ভূমিকা

গ্রহণযোগ্যতা ও প্রামাণিকতার ভিত্তিতে মুহাদ্দিসীনে কিরাম হাদীসকে প্রধান তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেন: সহীহ (বিশুদ্ধ), হাসান (উত্তম) এবং যয়ীফ (দুর্বল)।

সংজ্ঞাসমূহ

  1. সহীহ হাদীস (الحديث الصحيح): যে হাদীসের সনদের ধারাবাহিকতা শেষ পর্যন্ত অবিচ্ছিন্ন থাকে, যার প্রতিটি বর্ণনাকারী ন্যায়পরায়ণ ও পূর্ণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী এবং যা কোনো বিরুদ্ধাচরণ (শুযূয) ও সূক্ষ্ম ত্রুটি (ইল্লাত) থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত, তাকে সহীহ হাদীস বলে।
  2. হাসান হাদীস (الحديث الحسن): যে হাদীসের সকল বর্ণনাকারী ন্যায়পরায়ণ এবং সনদ অবিচ্ছিন্ন, তবে বর্ণনাকারীর স্মৃতিশক্তি (যবত) সহীহ হাদীসের বর্ণনাকারীর তুলনায় কিছুটা কম এবং যা শুযূয ও সূক্ষ্ম দোষমুক্ত, তাকে হাসান হাদীস বলে।
  3. যয়ীফ হাদীস (الحديث الضعيف): যে হাদীসের মধ্যে সহীহ ও হাসান হাদীসের শর্তাবলির কোনো একটি বা একাধিক শর্ত অনুপস্থিত থাকে, তাকে যয়ীফ হাদীস বলে।

সহীহ হাদীসের আবশ্যকীয় ৫টি শর্ত (شروط الحديث الصحيح)

ইমাম ইবনুস সালাহ ও হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.)-এর মতে সহীহ হাদীসের শর্ত পাঁচটি:

  • ১. ইত্তিসালুস সানাদ (اتصال السند): সনদের প্রতিটি স্তরে রাবী সরাসরি তাঁর ঊর্ধ্বতন উস্তাদ থেকে হাদীস শ্রবণ করা অর্থাৎ সনদের অবিচ্ছিন্নতা বজায় থাকা।
  • ২. আদালাতুর রুওয়াত (عدالة الرواة): সনদের প্রতিটি রাবীকে মুসলিম, প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ বিবেকবান, তাকওয়াবান এবং ফাসেকী ও চারিত্রিক হীনমন্যতা থেকে মুক্ত হতে হবে।
  • ৩. তামামুদ দ্বাবত (تمام الضبط): রাবীর স্মৃতিশক্তি অথবা কিতাবের সংরক্ষণ ক্ষমতা পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভুল হতে হবে।
  • ৪. আদামুশ শুযূয (عدم الشذوذ): কোনো নির্ভরযোগ্য রাবীর বর্ণনা তার চেয়ে অধিক নির্ভরযোগ্য বিশ্বস্ত রাবীর বর্ণনার বিপরীত হতে পারবে না।
  • ৫. আদামুল ইল্লাহ (عدم العلة): হাদীসের সনদ ও মতন এমন কোনো সূক্ষ্ম গোপন ত্রুটি থেকে মুক্ত হতে হবে যা হাদীসের বিশুদ্ধতাকে নষ্ট করে দেয়।

উপসংহার

এই পাঁচটি শর্তের সবকটি অক্ষুণ্ণ থাকলেই একটি হাদীস সহীহ হিসেবে গণ্য হয় এবং তার ওপর আমল করা উম্মতের জন্য শরিয়তসিদ্ধ ওয়াজিব দায়িত্ব।


٣- هَلْ تَجُوزُ رِوَايَةُ الْحَدِيثِ بِالْمَعْنَى أَوْ بِالِاخْتِصَارِ؟ بَيِّنْ مُفَصَّلًا –

[৩. হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে মর্মার্থ বা সংক্ষিপ্ত করে বর্ণনা করা বৈধ কি না? বিস্তারিত বর্ণনা কর।]

ভূমিকা

হাদীস সংরক্ষণে শব্দে শব্দে অবিকল বর্ণনা করাই হলো সর্বোত্তম আদর্শ। তবে প্রয়োজনের তাগিদে মূল শব্দের পরিবর্তে সমার্থক শব্দে ভাব বর্ণনা করা (রিওয়ায়েত বিল মা’না) এবং দীর্ঘ হাদীসের প্রাসঙ্গিক অংশ সংক্ষিপ্ত করে বর্ণনা করা (রিওয়ায়েত বিল ইখতিসার) বৈধ কি না, এ নিয়ে উলামায়ে উসূল ও মুহাদ্দিসগণের সুস্পষ্ট মূলনীতি রয়েছে।

মর্মার্থ দ্বারা হাদীস বর্ণনা (رواية الحديث بالمعنى)-এর হুকুম

জমহুর সাহাবা, তাবেঈন এবং চার মাজহাবের ফকীহগণের মতে, শর্তসাপেক্ষে মর্মার্থ দ্বারা হাদীস বর্ণনা করা জায়েজ।

বৈধতার শর্তাবলি:

  1. বর্ণনাকারীকে আরবি ভাষা, ব্যাকরণ এবং শব্দের আসল ও রূপক অর্থ সম্পর্কে পূর্ণ পাণ্ডিত্য থাকতে হবে।
  2. শব্দ পরিবর্তনের ফলে যাতে অর্থের কোনো বিকৃতি, সংকোচন বা পরিবর্তন না ঘটে।
  3. যে সমস্ত বাক্য তাওকীফী বা নির্দিষ্ট ইবাদত সংক্রান্ত (যেমন: আজান, নামাজের তাশাহহুদ, খুতবা ও দোয়া), সেগুলোতে কোনোভাবেই ভাবার্থ দ্বারা পরিবর্তন করা জায়েজ নয়; বরং হুবহু শব্দই পাঠ করতে হবে।

হাদীস সংক্ষিপ্ত করে বর্ণনা (رواية الحديث بالاختصار)-এর হুকুম

একটি দীর্ঘ হাদীসের কেবল নির্দিষ্ট মাসআলা সংশ্লিষ্ট অংশ বর্ণনা করে বাকি অংশ বাদ দেওয়াকে ‘ইখতিসার’ বলা হয়।

  • বৈধতার ক্ষেত্র: যদি কর্তিত অংশটি বাকি অংশের সাথে এমনভাবে জড়িত না থাকে যে একটি বাদ দিলে অপরটির অর্থ বিভ্রান্তিকর হয়ে পড়ে, তবে বিজ্ঞ আলিমদের জন্য তা সংক্ষিপ্ত করা সর্বসম্মতভাবে জায়েজ। ইমাম বুখারী (রহ.) তাঁর সহীহ গ্রন্থে বিভিন্ন অধ্যায়ে একই হাদীসকে সংক্ষেপ করে পেশ করেছেন।
  • অবৈধতার ক্ষেত্র: যদি একটি অংশের সাথে শর্ত বা ব্যতিক্রম (ইসতিসনা) হিসেবে অপর অংশটি জড়িত থাকে, তবে তা বাদ দিয়ে সংক্ষিপ্ত করা সম্পূর্ণ হারাম।

উপসংহার

সতর্কতা ও তাহকীক অনুযায়ী হুবহু শব্দে বর্ণনা করাই কাম্য; তবে বিজ্ঞ গবেষকদের জন্য শর্ত পূরণ সাপেক্ষে ভাবার্থ ও সংক্ষিপ্ত বর্ণনা শরিয়তে স্বীকৃত।


٤- اذْكُرْ حُجِّيَّةَ الْحَدِيثِ عَلَى ضَوْءِ الْقُرْآنِ وَالسُّنَّةِ بِالتَّفْصِيلِ –

[৪. হাদীসের প্রামাণিকতা কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে বিশদভাবে উল্লেখ কর।]

ভূমিকা

ইসলামের মৌলিক বিধান প্রণয়ন ও ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে পবিত্র কুরআনের পরই হাদীসের অবস্থান। কোনো ব্যক্তি হাদীসকে অস্বীকার করে মুমিন থাকতে পারে না। হাদীসের প্রামাণিকতা ও শরিয়তের হুজ্জত হওয়ার বিষয়টি কুরআন ও সুন্নাহর দ্ব্যর্থহীন ঘোষণায় প্রমাণিত।

পবিত্র কুরআনের আলোকে হাদীসের প্রামাণিকতা

  1. রাসূলের আনুগত্যের নিঃশর্ত নির্দেশ: আল্লাহ তাআলা কুরআনে নিজের আনুগত্যের সাথে রাসূলের আনুগত্যকে অবিচ্ছেদ্য করে দিয়েছেন: مَّن يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ — “যে ব্যক্তি রাসূলের আনুগত্য করল, সে মূলত আল্লাহরই আনুগত্য করল।” (সূরা আন-নিসা: ৮০)।
  2. রাসূলের নির্দেশ গ্রহণ ও নিষেধ বর্জন: আল্লাহ ইরশাদ করেন: وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا — “রাসূল তোমাদের যা দেন তা গ্রহণ করো এবং যা থেকে নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাকো।” (সূরা আল-হাশর: ৭)।
  3. ঈমানের পূর্বশর্ত রাসূলের ফায়সালা মানা: আল্লাহ নিজের পবিত্র সত্তার শপথ করে ঘোষণা করেন: فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ — “অতএব তোমার রবের শপথ! তারা কিছুতেই মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যকার বিবাদসমূহে আপনাকে বিচারক মেনে নেয়।” (সূরা আন-নিসা: ৬৫)।
  4. কুরআনের ব্যাখ্যাকারক হিসেবে রাসূল (স.): আল্লাহ ইরশাদ করেন: وَأَنزَلْنَا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيْهِمْ — “আর আমি আপনার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করেছি যাতে আপনি মানুষের সামনে তা ব্যাখ্যা করে দেন।” (সূরা আন-নাহল: ৪৪)।

পবিত্র সুন্নাহর আলোকে প্রামাণিকতা

  • রাসূলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন: أَلَا إِنِّي أُوتِيتُ الْكِتَابَ وَمِثْلَهُ مَعَهُ — “জেনে রেখো! আমাকে কিতাব (কুরআন) দেওয়া হয়েছে এবং তার সাথে তার অনুরূপ (হাদীসও) প্রদান করা হয়েছে।” (আবু দাউদ: ৪৬০৪)।
  • বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি ঘোষণা করেন: “আমি তোমাদের মাঝে দুটি বস্তু রেখে যাচ্ছি, যতক্ষণ তোমরা তা দৃঢ়ভাবে ধারণ করবে ততক্ষণ তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না—আল্লাহর কিতাব এবং তাঁর রাসূলের সুন্নাহ।” (মুয়াত্তা মালেক)।

উপসংহার

হাদীস ছাড়া কুরআনের সংক্ষিপ্ত বিধানাবলি (যেমন: নামাজের রাকাত, রুকু-সিজদার নিয়ম, জাকাতের নেসাব ইত্যাদি) আমল করা অসম্ভব। সুতরাং হাদীস হলো দ্বীনের অবিচ্ছেদ্য ভিত্তি ও হুজ্জত।


٥- مَا الْإِسْنَادُ؟ اذْكُرْ أَهَمِّيَّتَهُ وَحَاجَتَهُ فِي عُلُومِ الْحَدِيثِ مُفَصَّلًا –

[৫. ইসনাদ কী? হাদীসশাস্ত্রে এর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা বিশদভাবে আলোচনা কর।]

ভূমিকা

ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বের ইতিহাসে মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল ও মৌলিক আবিষ্কার হলো ‘ইসনাদ’ বা বর্ণনাসূত্র ব্যবস্থা। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের পণ্ডিতগণ একবাক্যে স্বীকার করেছেন যে, ইতিহাস ও ধর্মীয় বর্ণনা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে মুসলিমদের ইসনাদ পদ্ধতি বিশ্বে অতুলনীয়।

ইসনাদের পরিচয়

শাব্দিক অর্থ: ‘ইসনাদ’ (الإسناد) শব্দটি বাবে ইফআল-এর মাসদার। এর অর্থ কোনো বিষয়ের ওপর ভর করা বা কোনো কথাকে তার মূল বক্তার দিকে সম্বন্ধযুক্ত করা।

পারিভাষিক অর্থ: উলূমুল হাদীসে, “হাদীসের মূল বক্তব্য বা মতন পর্যন্ত পৌঁছার জন্য ধারাবাহিক বর্ণনাকারীদের যে নাম ও পরম্পরা উল্লেখ করা হয়, তাকে ইসনাদ বা সনদ বলা হয়।”

হাদীসশাস্ত্রে ইসনাদের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা

  1. দ্বীন সংরক্ষণের সুদৃঢ় প্রাচীর: বিখ্যাত তাবেঈ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহ.) বলেছেন: الإِسْنَادُ مِنَ الدِّينِ، وَلَوْلَا الإِسْنَادُ لَقَالَ مَنْ شَاءَ مَا شَاءَ — “ইসনাদ হলো দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত; যদি ইসনাদ না থাকত তবে যে কেউ যা ইচ্ছা তা-ই বলে বেড়াত।”
  2. জাল ও সত্য হাদীসের পার্থক্য নিরূপণ: মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন (রহ.) বলেন, “যখন উম্মতের মাঝে ফিতনা সৃষ্টি হলো, তখন আলেমরা বললেন: আমাদের বর্ণনাকারীদের নাম বলো। অতঃপর আহলে সুন্নতের বর্ণনা গ্রহণ করা হতো এবং বিদআতীদের বর্ণনা প্রত্যাখ্যান করা হতো।”
  3. রাসূলুল্লাহ (স.)-এর সুন্নাহর নিরাপত্তা: অন্যান্য ধর্মের কিতাবসমূহ বিকৃত হয়ে গেছে কারণ তাদের কোনো ধারাবাহিক নির্ভরযোগ্য সনদ ছিল না। কিন্তু মুসলিম উম্মাহ প্রতিটি বর্ণনাকারীর জীবনী, চরিত্র ও স্মৃতিশক্তি যাচাই করে হাদীসকে সম্পূর্ণ সংরক্ষিত রেখেছে।
  4. মুসনাদ ও মুনকাতে হাদীসের পার্থক্য: সনদের মাধ্যমেই জানা যায় হাদীসের সূত্র অবিচ্ছিন্ন নাকি মাঝে কোনো রাবী বাদ পড়েছে।

উপসংহার

ইসনাদ হলো ইসলামি শরিয়তের প্রাণভোমরা এবং রাসূলুল্লাহ (স.)-এর পবিত্র বাণীর বিশুদ্ধতা রক্ষার এক অমর দুর্গ।


٦- عَرِّفِ الْمَوْضُوعَ ثُمَّ بَيِّنْ حُكْمَ رِوَايَتِهِ مَعَ ذِكْرِ دَوَاعِي الْوَضْعِ مُفَصَّلًا –

[৬. মওদূ (জাল হাদীস)-এর সংজ্ঞা দাও। এটি বর্ণনার হুকুম এবং হাদীস জালকরণের কারণসমূহ বিস্তারিত বর্ণনা কর।]

ভূমিকা

হাদীস সংরক্ষণের পাশাপাশি জাল ও মিথ্যা বর্ণনা চিহ্নিত করা উলূমুল হাদীসের এক বিশাল দায়িত্ব। মওদূ বা মিথ্যা হাদীস দ্বীনের মধ্যে অনুপ্রবেশ করিয়ে ইসলামকে কলুষিত করার বহু অপচেষ্টা হয়েছিল, যা মুহাদ্দিসীনদের কঠোর সাধনায় ধূলিসাৎ হয়েছে।

আল-মওদূ (الحديث الموضوع)-এর সংজ্ঞা

মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায়: “যে কথা রাসূলুল্লাহ (স.)-এর নামে সম্পূর্ণ বানোয়াট, মিথ্যা ও রচিতভাবে প্রচার করা হয়, তাকে হাদীসে মওদূ বা জাল হাদীস বলা হয়।” এটি মূলত কোনো হাদীস নয়, বরং রাসূল (স.)-এর ওপর অপবাদ।

মওদূ হাদীস বর্ণনার হুকুম

উম্মতের আলিমদের সর্বসম্মত ফতোয়া হলো: হাদীসটি যে জাল ও বানোয়াট তা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা ছাড়া কোনো জাল হাদীস বর্ণনা করা সম্পূর্ণ হারাম ও কবিরা গোনাহ।
রাসূলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেন: مَنْ حَدَّثَ عَنِّي بِحَدِيثٍ يُرَى أَنَّهُ كَذِبٌ فَهُوَ أَحَدُ الْكَاذِبِينَ — “যে ব্যক্তি আমার পক্ষ থেকে এমন কোনো হাদীস বর্ণনা করে যা মিথ্যা বলে ধারণা হয়, তবে সেও মিথ্যুকদের একজন।” (সহীহ মুসলিম)।

হাদীস জালকরণের প্রধান কারণসমূহ (دواعي الوضع)

  1. দ্বীন বিকৃত করার ষড়যন্ত্র (যিন্দিকদের চক্রান্ত): ইসলামের শত্রুরা প্রকাশ্য যুদ্ধে পরাজিত হয়ে ইসলাম ধ্বংসের জন্য হাজার হাজার জাল হাদীস তৈরি করেছিল। যেমন ইবনে আবিল আওজা ফাঁসির পূর্বে স্বীকার করেছিল যে সে চার হাজার জাল হাদীস বানিয়েছে।
  2. রাজনৈতিক ও মাযহাবী পক্ষপাতিত্ব: বিভিন্ন রাজনৈতিক দল (যেমন: খারেজী, শিয়া) তাদের নেতার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য জাল হাদীস রচনা করেছিল।
  3. সওয়াব বা মানুষকে দ্বীনের প্রতি আকৃষ্ট করার ভ্রান্ত নিয়ত: একদল জাহেল আবেদ মনে করত মানুষকে নফল ইবাদতের দিকে উদ্বুদ্ধ করতে বিভিন্ন সূরার মনগড়া ফজিলত বানালে সওয়াব হবে (যেমন নূহ ইবনে আবী মারইয়াম)।
  4. শাসকদের তোষামোদ করা ও স্বার্থসিদ্ধি: জালেম বাদশাহদের খুশি করে অর্থ বা উপঢৌকন পাওয়ার লোভে দরবারী আলেমরা হাদীস বিকৃত করত (যেমন গিয়াস ইবনে ইবরাহীম)।
  5. পার্থিব বাণিজ্য ও লোকদেখানো খ্যাতি: ওয়াজ মাহফিলে মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ ও অর্থ উপার্জনের জন্য কিসসাকাররা চমৎকার মিথ্যা কিচ্ছা হাদীস নামে ছড়াত।

উপসংহার

মুহাদ্দিসীনে কিরাম ‘আসমাউর রিজাল’ শাস্ত্রের মাধ্যমে সমস্ত জাল হাদীস চিহ্নিত করে পৃথক কিতাব সংকলন করে উম্মতকে রক্ষা করেছেন।


٧- اذْكُرْ طَبَقَاتِ الرُّوَاةِ بِاعْتِبَارِ الضَّبْطِ وَالْمُلَازَمَةِ، ثُمَّ اكْتُبْ عِدَّةَ أَسْمَاءِ أَشْهَرِ الْمُصَنَّفَاتِ فِي الصَّحِيحِ –

[৭. হাদীস সংরক্ষণ ও উস্তাদের সাথে সাহচর্যের দিক দিয়ে রাবীদের স্তরসমূহ উল্লেখ কর। অতঃপর সহীহ হাদীসের কয়েকটি প্রসিদ্ধ কিতাবের নাম লেখ।]

ভূমিকা

হাদীসশাস্ত্রের সূক্ষ্মতম শাখা হলো রাবীদের স্মরণশক্তি (দ্বাবত) এবং তাঁদের উস্তাদের সাথে সান্নিধ্যের দীর্ঘতার ভিত্তিতে বিভিন্ন স্তরে বিন্যস্ত করা। ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম (রহ.) এই স্তরভেদের ওপর ভিত্তি করেই তাঁদের সহীহ সংকলন সাজিয়েছেন।

যবত ও সাহচর্যের ভিত্তিতে রাবীদের স্তরসমূহ (طبقات الرواة)

মুহাদ্দিসীন যেমন ইমাম হাকেম ও হাফেয হাযেমী (রহ.) রাবীদের প্রধান পাঁচটি স্তরে বিভক্ত করেছেন:

  1. প্রথম স্তর (الطبقة الأولى): যারা উস্তাদের সাথে দীর্ঘকাল সার্বক্ষণিক সান্নিধ্যে ছিলেন এবং স্মৃতিশক্তি ও ন্যায়পরায়ণতায় ছিলেন সর্বোচ্চ পর্যায়ের (مثل الزهري مع سعيد بن المسيب)। ইমাম বুখারী এদের হাদীস সর্বাধিক প্রাধান্য দিয়েছেন।
  2. দ্বিতীয় স্তর (الطبقة الثانية): যারা পূর্ণ স্মৃতিশক্তিসম্পন্ন ও বিশ্বস্ত ছিলেন, কিন্তু উস্তাদের সাথে সাহচর্যের মেয়াদ কিছুটা কম ছিল। ইমাম মুসলিম এদের বর্ণনা ব্যাপকভাবে গ্রহণ করেছেন।
  3. তৃতীয় স্তর (الطبقة الثالثة): যারা উস্তাদের সাথে দীর্ঘকাল ছিলেন, কিন্তু তাঁদের স্মৃতিশক্তি প্রথম দুই স্তরের মতো নিখুঁত ছিল না বরং কিছুটা দুর্বলতা ছিল। নাসায়ী ও আবু দাউদে এদের রেওয়ায়েত পাওয়া যায়।
  4. চতুর্থ স্তর (الطبقة الرابعة): যাদের সাহচর্যও কম ছিল এবং স্মৃতিশক্তিতেও ত্রুটি বিদ্যমান ছিল। এরা মূলত যয়ীফ বা বিবেচ্য রাবী।
  5. পঞ্চম স্তর (الطبقة الخامسة): যারা চরম দুর্বল, মাতরূক বা প্রত্যাখ্যাত। এদের হাদীস গ্রহণযোগ্য নয়।

সহীহ হাদীসের প্রসিদ্ধ কিতাবসমূহ

  • ১. সহীহুল বুখারী (صحيح البخاري): ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল আল-বুখারী (রহ.)। কুরআনের পর পৃথিবীর বিশুদ্ধতম কিতাব।
  • ২. সহীহ মুসলিম (صحيح مسلم): ইমাম মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ আল-কুশায়রী (রহ.)। সুবিন্যস্ত বিন্যাসের জন্য অনন্য।
  • ৩. সহীহ ইবনে খুযাইমাহ (صحيح ابن خزيمة): ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক ইবনে খুযাইমাহ (রহ.)।
  • ৪. সহীহ ইবনে হিব্বান (صحيح ابن حبان): ইমাম আবু হাতিম মুহাম্মদ ইবনে হিব্বান আল-বুসতী (রহ.)।
  • ৫. আল-মুস্তাদরাক আলাস সাহীহাইন (المستدرك على الصحيحين): ইমাম আবু আব্দুল্লাহ আল-হাকেম আন-নায়সাবুরী (রহ.)।

٨- مَا هِيَ شُرُوطُ قَبُولِ الرَّاوِي؟ كَيْفَ تَثْبُتُ هَذِهِ الشُّرُوطُ؟ بَيِّنْ مُفَصَّلًا –

[৮. রাবী গ্রহণযোগ্য হওয়ার শর্তাবলি কী কী এবং সেগুলো কীভাবে প্রমাণিত হয়? বিস্তারিত বর্ণনা কর।]

ভূমিকা

হাদীস সহীহ হওয়ার মূল ভিত্তি হলো বর্ণনাকারী বা রাবীর গ্রহণযোগ্যতা। একজন রাবীর রেওয়ায়েত শরিয়তে গ্রহণ করার জন্য মুহাদ্দিসগণ অত্যন্ত কঠোর ও নিখুঁত শর্তাবলি নির্ধারণ করেছেন।

রাবী গ্রহণযোগ্য হওয়ার মৌলিক শর্তাবলি

প্রধানত দুটি মৌলিক গুণের সমন্বয়ে রাবীর গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত হয়:

  1. আল-আদালাত (العدالة – চারিত্রিক ন্যায়পরায়ণতা):
    • ইসলাম (মুসলিম হওয়া)।
    • বুলূগিয়াত (প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া)।
    • আকল (সুস্থ বিবেকসম্পন্ন হওয়া)।
    • তাকওয়া (কবিরা গোনাহ বর্জন এবং সগীরা গোনাহে লিপ্ত না থাকা)।
    • মুরূওয়াত (সামাজিক শালীনতা ও ব্যক্তিত্ব রক্ষা করে চলা)।
  2. আদ-দ্বাবত (الضبط – সংরক্ষণ ক্ষমতা):
    • মুখস্থের প্রখরতা (দ্বাবতুস সদর) অথবা কিতাবে বিশুদ্ধভাবে সংরক্ষণের সক্ষমতা (দ্বাবতুল কিতাব)।
    • অমনোযোগিতা বা উদাসীনতা থেকে মুক্ত থাকা।

এই শর্তসমূহ যেভাবে প্রমাণিত হয়

  • ইস্তিফাযাহ ও খ্যাতি (الشهرة والاستفاضة): রাবী যদি মুসলিম উম্মাহ ও আলেম সমাজে তাঁর সততা, তাকওয়া ও আমানতদারির জন্য ব্যাপকভাবে প্রসিদ্ধ হন (যেমন ইমাম মালেক, সুফিয়ান সাওরী, ইমাম শাফেঈ রহ.)।
  • জারহ ও তা’দীলের ইমামদের সাক্ষ্য (تنصيص أئمة الجرح والتعديل): তৎকালীন হাদীস সমালোচক ইমামদের (যেমন ইমাম আহমাদ, ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন, বুখারী রহ.) প্রত্যক্ষ সত্যায়ন ও নির্ভরযোগ্যতার সাক্ষ্য প্রদান।
  • পরীক্ষা ও তুলনামূলক পর্যালোচনা (المقارنة والامتحان): কোনো রাবীর বর্ণিত হাদীসকে অন্যান্য বিশ্বস্ত হাফেযদের হাদীসের সাথে তুলনা করে দেখা হতো তাঁর বর্ণনায় কোনো অসঙ্গতি আছে কি না।

উপসংহার

এই কঠোর যাচাই ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে কেবল খাঁটি ও নিখাদ বিশ্বস্ত রাবীদের হাদীসই সহীহ কিতাবসমূহে স্থান পেয়েছে।


مجموعة (ب) – খ-বিভাগ (সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি)

الدرجات: ٥ × ٤ = ٢٠

٩- عَرِّفِ الْمُرْسَلَ مَعَ ذِكْرِ حُكْمِهِ –

[৯. মুরসাল হাদীসের সংজ্ঞা ও হুকুম বর্ণনা কর।]

সংজ্ঞা

যে হাদীসের সনদের শেষ প্রান্তে সাহাবীর নাম উল্লেখ না করে কোনো তাবেঈ সরাসরি রাসূলুল্লাহ (স.)-এর দিকে সম্বন্ধযুক্ত করে বলেন—”রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন বা করেছেন”, তাকে ‘হাদীসে মুরসাল’ (الحديث المرسل) বলে।

শরয়ী হুকুম

  • ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মালেক (রহ.): নির্ভরযোগ্য শ্রেষ্ঠ তাবেঈনদের (যেমন সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব, হাসান বসরী) মুরসাল হাদীস অকাট্য দলিল হিসেবে গ্রহণযোগ্য।
  • ইমাম শাফেঈ (রহ.): সাধারণ অবস্থায় যয়ীফ, তবে অন্য কোনো সনদে মারফূ বা মুরসাল হিসেবে সমর্থিত হলে তা দলিল হিসেবে গণ্য হবে।
  • জমহুর মুহাদ্দিসীন: সনদে সাহাবী বাদ পড়েছেন নাকি কোনো যয়ীফ তাবেঈ বাদ পড়েছেন তা নিশ্চিত না হওয়ায় এটি মূলত যয়ীফের অন্তর্ভুক্ত।

١٠- مَا هُوَ الْمُتَوَاتِرُ؟ بَيِّنْ حُكْمَهُ –

[১০. মুতাওয়াতির কী? এর হুকুম বর্ণনা কর।]

সংজ্ঞা

যে হাদীস সনদের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে এমন বিপুল সংখ্যক রাবী বর্ণনা করেছেন যাদের সকলের পক্ষে একসাথে মিথ্যা রটনা করার জন্য একমত হওয়া সাধারণ বুদ্ধিতে সম্পূর্ণ অসম্ভব, তাকে ‘হাদীসে মুতাওয়াতির’ বলে।

হুকুম

মুতাওয়াতির হাদীস অকাট্য ও নিশ্চিত জ্ঞান (العلم اليقيني القطعي) প্রদান করে। এর প্রামাণিকতা কুরআনের মতো শতভাগ সুনিশ্চিত এবং এর কোনো বিধান অস্বীকারকারী ব্যক্তি সরাসরি কাফের বলে গণ্য হবে।


١١- تَحَدَّثْ عَنْ آدَابِ الْمُحَدِّثِ وَطَالِبِ الْحَدِيثِ –

[১১. মুহাদ্দিস ও তালিবুল হাদীস (শিক্ষার্থী)-এর শিষ্টাচারসমূহ আলোচনা কর।]

মুহাদ্দিসের শিষ্টাচার

  • নিয়তের বিশুদ্ধতা ও কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হাদীস শিক্ষা দেওয়া।
  • পবিত্রতা অর্জন করে, সুগন্ধি মেখে পরম সম্মানের সাথে হাদীসের দারসে বসা।
  • কোনো অযোগ্য ব্যক্তির কাছে হাদীসের অপব্যবহার না করা এবং ছাত্রদের প্রতি স্নেহশীল হওয়া।

তালিবুল হাদীসের শিষ্টাচার

  • উস্তাদের প্রতি সর্বোচ্চ ভক্তি ও সম্মান প্রদর্শন করা।
  • লজ্জা বা অহংকার পরিহার করে গভীর নিষ্ঠার সাথে নোট লিপিবদ্ধ ও মুখস্থ করা।
  • অর্জিত হাদীস অনুযায়ী ব্যক্তিগত জীবনে আমল করা ও সুন্নাহর অনুসারী হওয়া।

١٢- مَا الْخَبَرُ الْغَرِيبُ؟ اذْكُرْ مِثَالًا مِنَ الْغَرِيبِ –

[১২. গরীব হাদীস কাকে বলে? গরীব হাদীসের একটি উদাহরণ দাও।]

সংজ্ঞা

যে হাদীসের সনদের কোনো একটি স্তরে মাত্র একজন একক রাবী বর্ণনা করেছেন, তাকে উলূমুল হাদীসে ‘গরীব’ (الحديث الغريب) বলা হয়।

উদাহরণ

সহীহ বুখারীর সর্বপ্রথম হাদীসটি গরীবের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ: إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ (নিশ্চয় সকল আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল)। এই হাদীসটি রাসূল (স.) থেকে কেবল ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.), তাঁর থেকে কেবল আলক্বামাহ, তাঁর থেকে কেবল মুহাম্মদ ইবনে ইবরাহীম এবং তাঁর থেকে কেবল ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আল-আনসারী বর্ণনা করেছেন।


١٣- مَا الْفَرْقُ بَيْنَ الْحَدِيثِ الْمُدَلَّسِ وَالْمُرْسَلِ الْخَفِيِّ؟

[১৩. হাদীসে মুদাদ্দাস ও মুরসালে খফীর মধ্যকার পার্থক্য কী?]

পার্থক্যসমূহ

বিষয় হাদীসে মুদাদ্দাস (المدلس) মুরসালে খফী (المرسل الخفي)
সাক্ষাৎকার রাবীর সাথে উস্তাদের সাক্ষাৎ ও সরাসরি হাদীস শ্রবণ প্রমাণিত, তবে তিনি উস্তাদ থেকে শোনেননি এমন একটি হাদীস অস্পষ্ট শব্দে (عن) বর্ণনা করেন। উভয় রাবী সমসাময়িক (মুআসারাত) ছিলেন কিন্তু তাঁদের মাঝে কখনো সাক্ষাৎ প্রমাণিত হয়নি অথবা সাক্ষাৎ হলেও হাদীস শোনেননি।
দোষের মাত্রা তাদলীস করা নিন্দনীয় ও এক প্রকার ধোঁকা। এটি মূলত সনদের একটি গোপন বিচ্ছিন্নতা, এতে ধোঁকার উদ্দেশ্য কম থাকে।

١٤- مَا هِيَ طُرُقُ تَحَمُّلِ الْحَدِيثِ؟

[১৪. হাদীস ধারণ (তাহাম্মুল)-এর পদ্ধতিগুলো কী কী?]

হাদীস গ্রহণের আটটি স্বীকৃত পদ্ধতি (طرق التحمل)

  1. আস-সামা’ (السماع): উস্তাদের মুখ থেকে সরাসরি হাদীস পাঠ শ্রবণ করা। এটি সর্বোচ্চ স্তর।
  2. আল-আরয বা আল-ক্বিরাআত (العرض / القراءة): উস্তাদের সামনে ছাত্র নিজে বা অন্য কেউ হাদীস পাঠ করা এবং উস্তাদ তা নীরবে শুনে অনুমোদন দেওয়া।
  3. আল-ইজাযাত (الإجازة): উস্তাদ কাউকে তাঁর বর্ণিত হাদীস রেওয়ায়েত করার অনুমতি প্রদান করা।
  4. আল-মুনাওয়ালাহ (المناولة): উস্তাদ স্বীয় হাদীসের মূল কিতাব ছাত্রের হাতে তুলে দিয়ে বর্ণনা করার হুকুম দেওয়া।
  5. আল-মুকাতেবাহ (المكاتبة): উস্তাদ স্বহস্তে হাদীস লিখে অনুপস্থিত ছাত্রের নিকট পাঠিয়ে দেওয়া।
  6. আল-ই’লাম (الإعلام): উস্তাদ ছাত্রকে জানিয়ে দেওয়া যে এই কিতাবটি তাঁর বর্ণিত হাদীস।
  7. আল-ওয়াসিয়্যাহ (الوصية): মৃত্যুর পূর্বে উস্তাদ স্বীয় কিতাব কোনো ব্যক্তির জন্য অসিয়ত করে যাওয়া।
  8. আল-বিজাদাহ (الوجادة): কোনো প্রাচীন নির্ভরযোগ্য মুহাদ্দিসের স্বহস্তে লিখিত কিতাব প্রাপ্ত হওয়া।

١٥- مَا هِيَ شُرُوطُ قَبُولِ الْمُعَنْعَنِ؟

[১৫. মু’আন’আন হাদীস গ্রহণযোগ্য হওয়ার শর্তগুলো কী কী?]

সংজ্ঞা ও গ্রহণযোগ্যতার শর্ত

যে হাদীসের সনদে সরাসরি শ্রবণের শব্দ (যেমন حدثنا বা سمعت) না বলে ‘আন’ (عن فلان – অমুক থেকে) শব্দ দ্বারা বর্ণনা করা হয়, তাকে ‘মু’আন’আন’ বলে।

গ্রহণযোগ্য হওয়ার দুটি প্রধান শর্ত:

  1. বর্ণনাকারী রাবীকে ‘তাদলীস’ (গোপন করার দোষ)-এর অপবাদ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হতে হবে।
  2. সাক্ষাৎ প্রমাণিত হওয়া:
    • ইমাম বুখারী ও আলী ইবনুল মাদীনী (রহ.)-এর মতে: উভয়ের মাঝে জীবনে অন্তত একবার হলেও সরাসরি সাক্ষাৎ (তাক্বাবুল বা লিক্বা) অকাট্যভাবে প্রমাণিত হতে হবে।
    • ইমাম মুসলিম (রহ.)-এর মতে: উভয়ের সমসাময়িক (মুআসারাত) হওয়া এবং সাক্ষাৎ সম্ভবপর হওয়াই যথেষ্ট।

١٦- مَا هِيَ أَلْفَاظُ التَّعْدِيلِ؟

[১৬. তা’দীল (রাবীর নির্ভরযোগ্যতা প্রকাশক)-এর শব্দগুলো কী কী?]

আলফাযুত তা’দীল-এর স্তর ও শব্দসমূহ

হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী ও ইমাম সাখাবী (রহ.)-এর মতে তা’দীলের ছয়টি স্তর রয়েছে:

  1. সর্বোচ্চ স্তর (মুবালাগাহ): أَوْثَقُ النَّاسِ (সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি), إِلَيْهِ المُنْتَهَى فِي التَّثَبُّتِ (বিশ্বস্ততায় চূড়ান্ত ব্যক্তিত্ব)।
  2. শব্দ পুনরুল্লেখ দ্বারা সুদৃঢ়করণ: ثِقَةٌ ثِقَةٌ (পরম বিশ্বস্ত, পরম বিশ্বস্ত), ثِقَةٌ ثَبْتٌ (সুদৃঢ় ও নির্ভরযোগ্য)।
  3. একক নির্ভরযোগ্যতার শব্দ: ثِقَةٌ (বিশ্বস্ত), حُجَّةٌ (দলিলযোগ্য), عَدْلٌ (ন্যায়পরায়ণ)।
  4. সামান্য কম নির্ভরযোগ্যতা: صَدُوقٌ (সত্যবাদী), لَا بَأْسَ بِهِ (কোনো সমস্যা নেই)।
  5. দলিলযোগ্য নয় তবে বিবেচ্য: مَحَلُّهُ الصِّدْقُ (সত্যবাদী হওয়ার উপযুক্ত), شَيْخٌ (সম্মানিত শায়খ)।
  6. সর্বনিম্ন স্তর: صَالِحُ الحَدِيثِ (হাদীস ভালো), يُكْتَبُ حَدِيثُهُ (তার হাদীস বিবেচনার জন্য লেখা যায়)।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. উলূমুল হাদীস বিষয়ের বিষয় কোড কত?

আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের উলূমুল হাদীস বিষয়ের বিষয় কোড হলো ২০১৩০৩ এবং পরীক্ষা কোড হলো ২০৩।

২. সহীহ হাদীসের মৌলিক শর্ত কয়টি?

সহীহ হাদীসের মৌলিক শর্ত হলো পাঁচটি: সনদের অবিচ্ছিন্নতা, রাবীদের ন্যায়পরায়ণতা, পূর্ণ সংরক্ষণ ক্ষমতা, বিরুদ্ধাচরণমুক্ত হওয়া এবং সূক্ষ্ম ত্রুটিমুক্ত হওয়া।

৩. হাদীসশাস্ত্রে ইসনাদের ভূমিকা কী?

ইসনাদ হলো হাদীসের বিশুদ্ধতা যাচাইয়ের একমাত্র নির্ভরযোগ্য মাধ্যম, যা মিথ্যা ও জাল বর্ণনা থেকে রাসূলুল্লাহ (স.)-এর পবিত্র সুন্নাহকে রক্ষা করে।

৪. মওদূ বা জাল হাদীস প্রচারের বিধান কী?

এটি যে জাল বা বানোয়াট তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ না করে কোনো জাল হাদীস বর্ণনা বা প্রচার করা সম্পূর্ণ হারাম ও কবিরা গোনাহ।

৫. মুতাওয়াতির হাদীসের বিধান কী?

মুতাওয়াতির হাদীস নিশ্চিত ও অকাট্য জ্ঞান প্রদান করে; এর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা আবশ্যক এবং তা অস্বীকারকারী কাফের বলে গণ্য হয়।

৬. তাহাম্মুলে হাদীস বা হাদীস ধারণের প্রধান পদ্ধতি কয়টি?

হাদীস ধারণের জন্য মুহাদ্দিসীনদের নিকট আটটি পদ্ধতি স্বীকৃত, যার মধ্যে উস্তাদের মুখ থেকে সরাসরি শ্রবণ করা (আস-সামা’) হলো সর্বোত্তম।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *