পরীক্ষা কোড: 203 | প্রশ্নপত্র কোড: 087
اختبار السنة الثالثة للفاضل (البكالوريوس) الشرف، لعام ٢٠٢٢
[ফাজিল (স্নাতক) সম্মান তৃতীয় বর্ষ পরীক্ষা, ২০২২]
الدعوة والدراسات الإسلامية
[দা’ওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
أصول الدعوة الإسلامية وأخلاق الداعية
[উসুলুদ দা’ওয়াতিল ইসলামিয়্যাহ ওয়া আখলাকুদ দা’ইয়াহ]
বিষয় কোড: 203301
الوقت — ٤ ساعات [সময় — ৪ ঘণ্টা] | الدرجات الكاملة — ٨٠ [পূর্ণমান — ৮০]
الملاحظة : أجب عن أربعة من مجموعة (الف) وعن أربعة من مجموعة (ب)
[দ্রষ্টব্য: (الف) অংশ থেকে চারটি এবং (ب) অংশ থেকে চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও।]
مجموعة (الف) [বিভাগ ‘ক’ – রচনামূলক প্রশ্নাবলী]
মান: ১৫ × ৪ = ৬০
١- عرف الدعوة الإسلامية واذكر أهدافها وخصائصها-
[১. ইসলামি দাওয়াহর সংজ্ঞা দাও এবং এর লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ বিস্তারিত আলোচনা কর।]
ভূমিকা
ইসলামি দাওয়াত হলো বিশ্বমানবতাকে অন্ধকার ও পথভ্রষ্টতা থেকে আলোর পথে ফিরিয়ে আনার ঐশী আন্দোলন। মানবজাতির ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তির চিরন্তন দিশারি হিসেবে মহান আল্লাহ নবী-রাসূলগণকে প্রেরণ করেছিলেন এবং সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওফাতের পর এই অবিচল দায়িত্ব উম্মতে মুহাম্মদীর স্কন্ধে অর্পিত হয়েছে। দাওয়াত ছাড়া ইসলামের বিস্তার ও স্থায়িত্ব অসম্ভব।
ইসলামি দাওয়াহর সংজ্ঞা (تعريف الدعوة الإسلامية)
শাব্দিক অর্থ: ‘দাওয়া’ (الدعوة) আরবি শব্দ, যা ‘দা’আ-ইয়াদ’ঊ’ ধাতু থেকে নিষ্পন্ন। এর আভিধানিক অর্থ ডাকা, আহ্বান জানানো, উদ্বুদ্ধ করা, দাওয়াত দেওয়া বা প্রার্থনা করা।
পারিভাষিক অর্থ: ড. আলী আব্দুল হালিম মাহমুদের মতে: মানুষকে সর্বান্তকরণে মহান আল্লাহর তাওহিদের প্রতি আহ্বান করা, তাঁর প্রেরিত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহর পূর্ণ আনুগত্য করতে উদ্বুদ্ধ করা এবং জীবনের সকল ক্ষেত্রে আল্লাহ ছাড়া অন্য সব তাগুতকে বর্জন করার নির্দেশ দেওয়ার নামই ইসলামি দাওয়াত।
ইসলামি দাওয়াতের প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যসমূহ (أهداف الدعوة)
- আল্লাহর তাওহিদ প্রতিষ্ঠা: মানুষকে গায়রুল্লাহর দাসত্ব ও শিরক থেকে মুক্ত করে একচ্ছত্রভাবে একক আল্লাহর আনুগত্যে আবদ্ধ করা।
- শরীয়তের বাস্তবায়ন: সমাজে আল্লাহর নাযিলকৃত আইন ও সুবিচার কায়েম করা এবং জুলুম ও শোষণ নির্মূল করা।
- আত্মশুদ্ধি ও নৈতিক বিপ্লব: মানব আত্মাকে পাপ, অহংকার ও লোভ থেকে পবিত্র করে উৎকৃষ্ট আখলাকে ভূষিত করা।
- জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও জান্নাত লাভ: মানুষকে পরকালের ভয়াবহ আজাব সম্পর্কে সতর্ক করা এবং জান্নাতের সুসংবাদ দেওয়া।
- হুজ্জত কায়েম করা: কিয়ামতের দিন মানুষ যেন আল্লাহর সামনে বলতে না পারে যে তাদের নিকট কোনো পথপ্রদর্শক পৌঁছেনি।
ইসলামি দাওয়াতের অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ (خصائص الدعوة)
- রব্বানিয়্যাহ বা ঐশী উৎস: এটি মানুষের মস্তিষ্কপ্রসূত মতবাদ নয়; এর প্রতিটি মূলনীতি কুরআন ও ওহী নির্দেশিত।
- শুমূলিয়্যাহ বা সর্বজনীন পূর্ণাঙ্গতা: এটি জীবনের কোনো একটি খণ্ডে সীমাবদ্ধ নয়; আকাইদ, ইবাদত, অর্থনীতি, বিচার ও রাজনীতির সামগ্রিক রূপরেখা।
- আল-হিকমাহ ওয়াল মাওয়িজাহ: বলপ্রয়োগ নয়; বরং যুক্তি, প্রজ্ঞা ও মধুর উপদেশের মাধ্যমে মানুষের অন্তর জয় করা।
- আখলাকিয়্যাহ বা নৈতিকতা: উদ্দেশ্য সৎ হওয়ার পাশাপাশি দাওয়াত প্রচারের মাধ্যম ও উপায়কেও শতভাগ সৎ ও পবিত্র হতে হবে।
উপসংহার
ইসলামি দাওয়াত হলো উম্মাহর প্রাণভোমরা। এই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের মাধ্যমেই বিশ্বমানবতার কাঙ্ক্ষিত মুক্তি অর্জিত হতে পারে।
٢- بين فضائل الدعوة إلى الله في ضوء القرآن والسنة-
[২. কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে আল্লাহর পথে দাওয়াত প্রদানের ফজিলত ও মর্যাদা বিস্তারিত আলোচনা কর।]
ভূমিকা
পবিত্র কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর দৃষ্টিতে আল্লাহর পথে মানুষকে আহ্বান করা হলো মানবজীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ পুণ্যময় কাজ। এটি সাধারণ কোনো পেশা নয়; বরং স্বয়ং আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের উত্তরাধিকার। যারা মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকে, তারা মহান আল্লাহর নিকট সর্বাধিক সম্মানিত।’
কুরআনুল কারীমের আলোকে দাওয়াতের ফজিলত
- সর্বোৎকৃষ্ট বাণী ও কথার মর্যাদা: মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন:
وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلًا مِمَّنْ دَعَا إِلَى اللَّهِ وَعَمِلَ صَالِحًا وَقَالَ إِنَّنِي مِنَ الْمُسْلِمِينَ
“তার চেয়ে উত্তম কথার অধিকারী আর কে হতে পারে, যে মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করে, নেক আমল করে এবং দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করে: নিশ্চয় আমি আত্মসমর্পণকারীদের (মুসলিমদের) অন্তর্ভুক্ত।” (সূরা ফুসসিলাত: ৩৩)
- শ্রেষ্ঠ উম্মতের খেতাব লাভের মূল শর্ত: মুসলিম উম্মাহকে ‘উম্মাতে ওয়াসাত’ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে ঘোষণা করার মূল কারণই হলো দাওয়াত:
كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ
“তোমরাই হলে মানবজাতির জন্য উদ্ভূত সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি; তোমরা সৎকাজের আদেশ দাও, অসৎকাজ থেকে নিষেধ কর এবং আল্লাহর ওপর ঈমান রাখ।” (সূরা আলে ইমরান: ১১০)
- আল্লাহর বিশেষ রহমত ও মাগফিরাত প্রাপ্তি: যারা সমাজে দাওয়াত ও সৎকাজের আদেশ জারি রাখে, আল্লাহ তাদের ওপর বিশেষ দয়া ও বরকত নাযিল করেন।
সহিহ সুন্নাহর আলোকে দাওয়াতের ফজিলত
- লাল উটের চেয়েও মূল্যবান সম্পদ: খায়বারের যুদ্ধে হযরত আলী (রা.)-কে পতাকা দেওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছিলেন:
فَوَاللَّهِ لَأَنْ يَهْدِيَ اللَّهُ بِكَ رَجُلًا وَاحِدًا خَيْرٌ لَكَ مِنْ أَنْ يَكُونَ لَكَ حُمْرُ النَّعَمِ
“আল্লাহর কসম! তোমার মাধ্যমে যদি আল্লাহ একজন মানুষকেও হেদায়েত দান করেন, তবে তা তোমার জন্য মূল্যবান লাল উট (তৎকালীন আরবের শ্রেষ্ঠ সম্পদ) লাভ করার চেয়েও উত্তম।” (সহিহ বুখারি)
- অনন্ত সাদাকায়ে জারিয়া ও সমপরিমাণ সওয়াব: রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: “যে ব্যক্তি কোনো সৎকাজের দিকে আহ্বান জানাবে, সে ওই কাজে আমলকারীদের সমপরিমাণ সওয়াব পাবে; এতে তাদের সওয়াবের কোনো ঘাটতি হবে না।” (সহিহ মুসলিম)
- সমগ্র সৃষ্টিজগতের দোয়া লাভ: রাসূল (সা.) বলেন: কল্যাণকামী দায়ী ও শিক্ষকের জন্য আসমান-জমিনের সকল সৃষ্টি, এমনকি পানির নিচের মাছ ও গর্তের পিঁপড়া পর্যন্ত আল্লাহর কাছে রহমত ও ক্ষমার দোয়া করে (তিরমিজি)।
উপসংহার
দাওয়াতের এই মহিমান্বিত পুরস্কার স্মরণ রেখে প্রতিটি মুসলিমের উচিত নিজ নিজ অবস্থান থেকে দ্বীনের প্রচারক ও খাদেম হিসেবে আত্মনিয়োগ করা।
٣- ما هي أصناف المدعوين؟ وكيف تتم دعوة الكفار إلى الإسلام؟
[৩. যাদের দাওয়াত দেওয়া হয় (মাদ’ঊ) তাদের শ্রেণিবিভাগ কী কী? এবং কাফিরদের নিকট কীভাবে ইসলামের দাওয়াত পেশ করতে হবে?]
ভূমিকা
ইসলামি দাওয়াত সফল হওয়ার অন্যতম মূল চাবিকাঠি হলো শ্রোতা বা মাদ’ঊদের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা, জ্ঞান ও সামাজিক স্তর নিখুঁতভাবে অনুধাবন করা। সর্বশ্রেণির মানুষকে একই ধাঁচে দাওয়াত দিলে তা ফলপ্রসূ হয় না। কুরআনুল কারীম মাদ’ঊদের প্রকারভেদের ওপর ভিত্তি করে দাওয়াতের তিনটি মৌলিক রূপরেখা দিয়েছে।
মাদ’ঊদের শ্রেণিবিভাগ (أصناف المدعوين)
পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নাহলের ১২৫ নম্বর আয়াতে মাদ’ঊদের তিনটি মূল শ্রেণিতে চিহ্নিত করা হয়েছে:
- বুদ্ধিজীবী ও চিন্তাশীল শ্রেণি (খাওয়াস): যারা গভীর যুক্তি, দর্শন ও গবেষণাপূর্ণ চিন্তা পছন্দ করেন। তাঁদের সামনে উপস্থাপন করতে হয় ‘হিকমত’ (الحكمة) অর্থাৎ গভীর প্রজ্ঞাপূর্ণ ও অকাট্য বুদ্ধিবৃত্তিক দলিল।
- সাধারণ ও আবেগপ্রবণ জনসমাজ (আওয়াম): যারা জটিল দর্শন বোঝেন না কিন্তু হৃদয়গ্রাহী কথায় প্রভাবিত হন। তাঁদের জন্য প্রয়োজন ‘আল-মাওয়িজাতুল হাসানাহ’ (الموعظة الحسنة) অর্থাৎ জান্নাতের সুসংবাদ, জাহান্নামের ভয় ও অশ্রুসিক্ত নসিহত।
- বিতর্ককারী ও সংশয়বাদী শ্রেণি (আহলুল জিদাল): যারা বিরুদ্ধ মনোভাব নিয়ে তর্ক করতে আসে। তাদের সাথে বিতর্ক করতে হয় ‘মুজাদালাহ বিল্লাতী হিয়া আহসান’ (وجادلهم بالتي هي أحسن) অর্থাৎ শালীন, চমৎকার ও অপ্রতিরোধ্য যুক্তির মাধ্যমে।
কাফির ও অমুসলিমদের দাওয়াত দেওয়ার কর্মপদ্ধতি
অমুসলিম বা কাফিরদের নিকট ইসলামের দাওয়াত উপস্থাপনের ক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশিত নীতিমালা:
- ১. জবরদস্তি সম্পূর্ণ বর্জন করা: ইসলামে জোরপূর্বক ধর্ম চাপিয়ে দেওয়া হারাম: “দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই।” (সূরা আল-বাকারা: ২৫৬)
- ২. তাওহিদ ও অভিন্ন বিষয়ের মাধ্যমে সূচনা: তাদের সাথে বিতর্কে না জড়িয়ে প্রথমে তাদের নিজস্ব গ্রন্থের অভিন্ন তাওহিদ ও স্রষ্টার একত্ববাদের আলোচনা দিয়ে কথা শুরু করা। যেমন কুরআন আহলে কিতাবদের বলে: “আস এমন এক কথার দিকে যা আমাদের ও তোমাদের মাঝে অভিন্ন।”
- ৩. তাদের দেবতাদের গালি না দেওয়া: আল্লাহ তায়ালা কঠোরভাবে নির্দেশ দিয়েছেন: “আল্লাহকে ছাড়া তারা যাদের পূজা করে তোমরা তাদের গালি দিয়ো না; অন্যথায় তারা অজ্ঞতাবশত বিদ্বেষের বশে আল্লাহকে গালি দেবে।” (সূরা আল-আনআম: ১০৮)
- ৪. সর্বোত্তম চরিত্র ও আমানতদারি প্রদর্শন: কাফিরদের সাথে লেনদেনে চরম সততা ও ওয়াদা রক্ষা করা। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আমানতদারি দেখেই মক্কার বহু মুশরিক ইসলাম গ্রহণ করেছিল।
- ৫. মানবিক সেবা ও সহানুভূতি: অসুস্থ হলে দেখতে যাওয়া এবং বিপদে আর্থিক সাহায্য করা।
উপসংহার
মাদ’ঊদের স্তর বুঝে কোমলতা ও যুক্তির সাথে সত্য উপস্থাপন করলেই কেবল অমুসলিমদের হৃদয়ে ইসলামের আলো প্রজ্জ্বলিত হতে পারে।
٤- بيّن أن السنة النبوية مصدر ثان للدعوة ورد على شبهات منكري السنة-
[৪. সুন্নাতে নাবাবিয়্যাহ দাওয়াতের দ্বিতীয় মূল উৎস—তা প্রমাণ কর এবং হাদিস অস্বীকারকারীদের (মুনকিরে হাদিস) সংশয় খণ্ডন কর।]
ভূমিকা
ইসলামি দাওয়াহর ভিত্তি কুরআনুল কারীমের পরেই সুন্নাতে রাসূল (সা.)-এর ওপর প্রতিষ্ঠিত। সুন্নাহ ছাড়া কুরআন বোঝা এবং ইসলামি জীবনব্যবস্থা কার্যকর করা অসম্ভব। অথচ সমকালীন যুগে ‘আহলে কুরআন’ নামধারী একদল ভ্রান্ত লোক সুন্নাহকে অস্বীকার করে ইসলামের ভিত্তি ধ্বংস করতে চায়। শরীয়তের অকাট্য দলিলের সামনে তাদের এই চক্রান্ত সম্পূর্ণ অসার।
সুন্নাহ দাওয়াতের দ্বিতীয় উৎস হওয়ার অকাট্য প্রমাণ
- কুরআনের দ্ব্যর্থহীন নির্দেশ: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা নিজের আনুগত্যের পাশাপাশি নিঃশর্তভাবে রাসূলের আনুগত্য ফরজ করেছেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর।” (সূরা আন-নিসা: ৫৯)
- সুন্নাহ কুরআনের অবিকল ব্যবহারিক রূপ: হযরত আয়েশা (রা.)-কে রাসূলের চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেছিলেন: “কুরআনই ছিল তাঁর জীবন্ত চরিত্র।”
- কুরআনের বিধান বিস্তারিতকরণে সুন্নাহ অপরিহার্য: সালাতের ৫ ওয়াক্তের সময়সীমা, রাকাতের সংখ্যা, রুকু-সিজদার তাসবিহ, যাকাতের নেসাব ও হজের তাওয়াফের নিয়ম কুরআনে উল্লেখ নেই; এগুলো একমাত্র সুন্নাহর মাধ্যমেই উম্মাহ লাভ করেছে।
হাদিস অস্বীকারকারীদের প্রধান সংশয় ও তার দাঁতভাঙ্গা জবাব
সংশয়: “কুরআনই আমাদের জন্য যথেষ্ট (حَسْبُنَا كِتَابُ اللَّهِ); হাদিস রাসূলের মৃত্যুর দেড়-দুইশত বছর পর লেখা হয়েছে, তাই এতে বিশ্বাস রাখা যায় না।”
অকাট্য জবাব:
- কুরআন নিজেই সুন্নাহ অনুসরণের নির্দেশ দেয়: যে ব্যক্তি কুরআন মানে, সে কুরআনের আয়াত “রাসূল তোমাদের যা দেন তা গ্রহণ কর এবং যা নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাক” (সূরা হাশর: ৭) অনুযায়ী সুন্নাহ মানতে বাধ্য। সুন্নাহ অস্বীকার করলে প্রকারান্তরে কুরআনকেই অস্বীকার করা হয়।
- হাদিস লিপিবদ্ধকরণের বাস্তবতা: হাদিস ২০০ বছর পর লেখা শুরু হয়নি; বরং সাহাবিদের যুগেই ‘সাহিফায়ে সাদিকাহ’ (আমর ইবনুল আস রা.), সাহিফায়ে আলী (রা.) এবং শত শত সাহাবির হস্তলিখিত সংগ্রহ ছিল। পরবর্তীতে ইমাম বুখারি ও মুসলিমগণ সনদের কঠোরতম বৈজ্ঞানিক নিরীক্ষা ও জারহ-তাদীল প্রয়োগ করে কেবল শতভাগ খাঁটি বর্ণনাগুলো গ্রন্থায়িত করেছেন।
- উম্মতের নিরবচ্ছিন্ন ইজমা: দেড় হাজার বছর ধরে সাহাবি থেকে শুরু করে বর্তমান কাল পর্যন্ত সমগ্র উম্মতের অবিচ্ছিন্ন আমল দ্বারা সুন্নাহ সংরক্ষিত।
উপসংহার
সুন্নাহকে অস্বীকার করা প্রকারান্তরে ইসলামকেই অন্তঃসারশূন্য করার এক জঘন্য সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্র। সুন্নাহ ছাড়া ইসলামের কোনো অস্তিত্ব টিকে থাকতে পারে না।
٥- عرف الأخلاق واذكر أقسامها وآثارها في حياة الفرد والمجتمع-
[৫. আখলাকের সংজ্ঞা দাও এবং এর প্রকারভেদ ও ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তারিত আলোচনা কর।]
ভূমিকা
ইসলামের সমগ্র শিক্ষা ও ইবাদতের চূড়ান্ত ফল হলো সৎ চরিত্র ও উত্তম আখলাক। যে ব্যক্তির আখলাক সুন্দর নয়, তার বাহ্যিক ইবাদতের কোনো মূল্য আল্লাহর দরবারে নেই। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নবুওয়াতের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্যই ছিল বিশ্ববাসীকে অনুপম চরিত্রের পূর্ণতা দান করা।
আখলাকের সংজ্ঞা (تعريف الأخلاق)
শাব্দিক অর্থ: ‘আখলাক’ (الأخلاق) শব্দটি ‘খুলুক’ (خُلُق)-এর বহুবচন। এর আভিধানিক অর্থ স্বভাব, চরিত্র, স্বভাবগত আচরণ ও স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য।
পারিভাষিক অর্থ: ইমাম আল-গাজ্জালী (রহ.) বলেন:
عِبَارَةٌ عَنْ هَيْئَةٍ فِي النَّفْسِ رَاسِخَةٍ، عَنْهَا تَصْدُرُ الْأَفْعَالُ بِسُهُولَةٍ وَيُسْرٍ مِنْ غَيْرِ حَاجَةٍ إِلَى فِكْرٍ وَرَوِيَّةٍ
“আখলাক হলো মানুষের অন্তরের গভীরে প্রোথিত এমন এক স্থায়ী অবস্থা বা গুণ, যার কারণে কোনো চিন্তা-ভাবনা বা কৃত্রিম চেষ্টা ছাড়াই মানুষের কাছ থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভালো বা মন্দ আচরণ প্রকাশ পায়।”
আখলাকের মৌলিক প্রকারভেদ
- আখলাকে হামীদাহ বা সৎ চরিত্র (الأخلاق الحميدة): শরীয়ত ও মানববিবেকের দৃষ্টিতে প্রশংসিত গুণাবলী। যেমন: সত্যবাদিতা, আমানতদারি, ধৈর্য, লজ্জা, ক্ষমা, ন্যায়পরায়ণতা ও পরোপকার।
- আখলাকে যামীমাহ বা অসৎ চরিত্র (الأخلاق الذميمة): নিন্দিত ও ক্ষতিকর স্বভাবসমূহ। যেমন: মিথ্যা, অহংকার, গীবত, হিংসা, রিয়া, প্রতারণা ও রাগ।
ব্যক্তিজীবনে আখলাকের প্রভাব
- আল্লাহর প্রিয়পাত্র হওয়া ও ঈমানের পূর্ণতা: রাসূল (সা.) বলেছেন: “মুমিনদের মধ্যে ঈমানের দিক থেকে সর্বাধিক পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তি সে, যার চরিত্র সবচেয়ে সুন্দর।” (আবু দাউদ)
- পরকালে পাল্লা ভারী হওয়া: কিয়ামতের দিন মিজানের পাল্লায় সুন্দর চরিত্রের চেয়ে ভারী কোনো বস্তু থাকবে না।
- অন্তরের স্থায়ী প্রশান্তি: পাপী অন্তর সর্বদা অশান্তিতে থাকে, কিন্তু সচ্চরিত্রবান ব্যক্তি আত্মিক প্রশান্তিতে জীবন কাটায়।
সমাজজীবনে আখলাকের প্রভাব
- শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা: সমাজে পারস্পরিক বিশ্বাস ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধি পায় এবং হানাহানি ও অপরাধ দূর হয়।
- অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি: ব্যবসায় ও চাকরিতে সততা ও আমানত থাকলে শোষণমুক্ত ও দুর্নীতিহীন বাজার তৈরি হয়।
- দাওয়াতি সাফল্য: দায়ী ও মুসলিমদের সুন্দর ব্যবহার দেখে অমুসলিমরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়।
উপসংহার
আখলাক হলো ইসলামি জীবনবৃক্ষের সুমিষ্ট ফল। ব্যক্তি ও সমাজের পরিশুদ্ধির জন্য উত্তম চরিত্র অর্জন করা প্রতিটি মুমিনের অপরিহার্য কর্তব্য।
٦- ما معنى التوبة؟ وما هي شروطها وحكمها؟
[৬. তওবা শব্দের অর্থ কী? তওবার শর্তাবলী এবং শরয়ি বিধান বিস্তারিত আলোচনা কর।]
ভূমিকা
মানুষ স্বভাবতই ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে নয়। মানবীয় দুর্বলতার কারণে মানুষ পাপে লিপ্ত হতে পারে। কিন্তু পরম দয়ালু আল্লাহ মানুষের জন্য ফিরে আসার যে রহমতের দরজা উন্মুক্ত রেখেছেন, তা-ই হলো ‘তওবা’। তওবার মাধ্যমে পাপী ব্যক্তি নিষ্কলুষ ও আল্লাহর প্রিয় বান্দায় রূপান্তরিত হতে পারে।
তওবার অর্থ ও হাকীকত (معنى التوبة)
শাব্দিক অর্থ: ‘তওবা’ (التوبة) আরবি শব্দ, এর আভিধানিক অর্থ ফিরে আসা, প্রত্যাবর্তন করা (الرجوع)।
পারিভাষিক অর্থ: শরীয়তের পরিভাষায়: কৃত পাপের জন্য চরমভাবে লজ্জিত হয়ে তা তৎক্ষণাৎ বর্জন করা এবং ভবিষ্যতে তা আর কখনো না করার সুদৃঢ় সংকল্প নিয়ে পুনরায় আল্লাহর আনুগত্যে ফিরে আসাকে তওবা বলে।
তওবার শরয়ি হুকুম (حكمها)
সর্বপ্রকার ছোট ও বড় গুনাহ থেকে সাথে সাথে তওবা করা ফরজে আইন (উম্মতের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত)। মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে মুমিনদের নির্দেশ দিয়েছেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَصُوحًا
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর নিকট খাঁটি তওবা (তওবাতুন নাসূহ) কর।” (সূরা আত-তাহরীম: ৮)
তওবা কবুল হওয়ার আবশ্যকীয় শর্তাবলী (شروط التوبة)
ইমাম নববী (রহ.) বলেন, যদি পাপটি আল্লাহর হকের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়, তবে তওবা কবুল হওয়ার জন্য তিনটি শর্ত পূরণ করতে হবে:
- পাপ তৎক্ষণাৎ ত্যাগ করা (الإقلاع عن المعصية): যে গুনাহে লিপ্ত ছিল তা সাথে সাথে সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা।
- অতীতের কৃতকর্মের জন্য চরম লজ্জিত হওয়া (الندم على ما فات): অন্তরে গভীর অনুশোচনা জাগ্রত হওয়া। হাদিসে এসেছে: “অনুতাপই হলো তওবা” (الندم توبة)।
- ভবিষ্যতে পুনরায় না করার সুদৃঢ় সংকল্প (العزم على عدم العود): অন্তরে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করা যে জীবনে কখনো আর এই পাপে ফিরে যাব না।
চতুর্থ শর্ত (বান্দার হকের ক্ষেত্রে):
পাপটি যদি কোনো মানুষের হকের (হক্বুল ইবাদ) সাথে সম্পর্কিত হয় (যেমন: চুরি, আত্মসাৎ, গীবত বা মারধর), তবে উপরোক্ত তিনটি শর্তের সাথে চতুর্থ শর্ত হলো: ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির সম্পদ তাকে ফেরত দিতে হবে অথবা তার কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে মাফ করিয়ে নিতে হবে। বান্দা মাফ না করা পর্যন্ত আল্লাহ তা মাফ করবেন না।
তওবার সময়সীমা: মৃত্যুর গরগরা (কণ্ঠনালীতে প্রাণ আসা) শুরু হওয়ার পূর্বে এবং পশ্চিম দিক থেকে সূর্যোদয়ের পূর্বে তওবা করতে হবে।
উপসংহার
হাদিসে এসেছে: “পাপ থেকে তওবাকারী ব্যক্তি এমন নিষ্পাপ হয়ে যায় যেন সে কখনো পাপই করেনি।” (ইবনে মাজাহ)। অতএব জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে খাঁটি তওবা করা মুমিনের চিরন্তন ভূষণ।
٧- ما هو الصبر والحلم؟ واذكر أقسام الصبر وفضائله-
[৭. ধৈর্য (সবর) ও সহনশীলতা (হিলম) কী? সবরের প্রকারভেদ এবং এর ফজিলতসমূহ বিস্তারিত বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
ইসলামি দাওয়াত ও মুমিনের জীবনের অপরিহার্য দুটি মহৎ গুণ হলো ‘সবর’ এবং ‘হিলম’। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিজের আত্মনিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা এবং ক্রোধের মুখেও মার্জিত ও প্রজ্ঞাপূর্ণ আচরণ করাই হলো একজন সফল দায়ীর ভূষণ। পবিত্র কুরআনে নব্বইটিরও বেশি স্থানে সবরের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
সবর ও হিলমের সংজ্ঞা
১. আস-সবর (الصبر): শাব্দিক অর্থ বিরত রাখা বা বেঁধে রাখা। পরিভাষায়: বিপদ-আপদে হা-হুতাশ না করে এবং গুনাহের হাতছানি দেখে নিজের কুপ্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে অবিচলভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টির ওপর নিজেকে ধরে রাখাকে সবর বলে।
২. আল-হিলম (الحلم): প্রতিশোধ নেওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ক্রোধ সংবরণ করা এবং অজ্ঞ ব্যক্তির রূঢ় আচরণের জবাবে ক্ষমা ও কোমলতা প্রদর্শন করাকে হিলম বলা হয়।
সবরের তিনটি প্রধান প্রকারভেদ (أقسام الصبر)
- আল্লাহর আনুগত্যে অবিচল থাকার ধৈর্য (الصبر على طاعة الله): অলসতা বা নফসের বিরোধিতা সত্ত্বেও নিয়মিত সালাত, সাওম, দান ও দাওয়াতের মতো নেক আমল নিরবচ্ছিন্নভাবে চালিয়ে যাওয়া।
- গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার ধৈর্য (الصبر عن معصية الله): তীব্র প্রলোভন ও কুপ্রবৃত্তির আকর্ষণ থাকা সত্ত্বেও কেবল আল্লাহর ভয়ে হারাম কাজ থেকে নিজেকে সংবরণ করা (যেমন ইউসুফ আ.-এর ধৈর্য)।
- বিপদ-মুসিবতে ধৈর্য ধারণ (الصبر على أقدار الله المؤلمة): রোগ-ব্যাধি, অর্থনৈতিক সংকট, প্রিয়জনের মৃত্যু ইত্যাদিতে আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থেকে শোকর আদায় করা।
পবিত্র কুরআনে সবরের ফজিলতসমূহ
- আল্লাহর প্রত্যক্ষ সান্নিধ্য ও সাহায্য লাভ: আল্লাহ ঘোষণা করেছেন:
إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ
“নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।” (সূরা আল-বাকারা: ১৫৩)
- অগণিত ও সীমাহীন প্রতিদান: কিয়ামতের দিন সকল আমলের একটি নির্দিষ্ট হিসাব থাকলেও ধৈর্যশীলদের বেহিসাব নেকি দেওয়া হবে:
إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُمْ بِغَيْرِ حِسَابٍ
“ধৈর্যশীলদের তো তাদের প্রতিদান অপরিমিতভাবে প্রদান করা হবে।” (সূরা আয-যুমার: ১০)
- জান্নাতের সুসংবাদ: “আর আপনি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন।” (সূরা আল-বাকারা: ১৫৫)
উপসংহার
সবর কোনো দুর্বলতা নয়; বরং সবর হলো ঈমানদারের সবচেয়ে শক্তিশালী নৈতিক হাতিয়ার, যা তাকে দুনিয়ায় বিজয়ী এবং আখিরাতে জান্নাতী করে।
٨- ما معنى الحسد وما هي أسبابه وأضراره على الداعية؟
[৮. হিংসা (হাসাদ) কাকে বলে? এর কারণসমূহ এবং একজন দায়ীর জীবনে এর ভয়াবহ ক্ষতিসমূহ বিস্তারিত আলোচনা কর।]
ভূমিকা
মানব আত্মার সবচেয়ে মারাত্মক ও ধ্বংসাত্মক ব্যাধিগুলোর একটি হলো ‘হাসাদ’ বা হিংসা। আসমানে আল্লাহর বিরুদ্ধে প্রথম যে পাপ সংঘটিত হয়েছিল তা ছিল ইবলিসের হিংসা (আদমের প্রতি), এবং জমিনে প্রথম যে নরহত্যা সংঘটিত হয়েছিল তাও ছিল কাবিলের হিংসা (হাবিলের প্রতি)। হিংসা মানুষের সমস্ত পুণ্য ধ্বংস করে দেয়।
হিংসার সংজ্ঞা (معنى الحسد)
শাব্দিক অর্থ: হিংসা করা, চোখ টাটানো।
পারিভাষিক অর্থ: কোনো ব্যক্তির ধন-সম্পদ, ইলম বা সামাজিক সম্মান দেখে অন্তরে জ্বালা অনুভব করা এবং তার সেই নেয়ামতটি ধ্বংস বা ছিনিয়ে নেওয়ার কামনা করাকে ‘হাসাদ’ বলে। (তবে অপর ব্যক্তির নেয়ামত ধ্বংস কামনা না করে নিজেও সেরূপ নেয়ামত পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করাকে ‘গিবতাহ’ বা ঈর্ষা বলে, যা জায়েজ)।
হিংসা সৃষ্টির প্রধান কারণসমূহ (أسبابه)
- অহংকার ও আত্মম্ভরিতা (الكبر): নিজেকে অন্যের চেয়ে বড় মনে করা এবং অন্য কেউ এগিয়ে গেলে তা সহ্য করতে না পারা।
- শত্রুতা ও অন্তরের ক্ষোভ (العداوة والبغضاء): কারও প্রতি বিদ্বেষ থাকলে তার উন্নতি দেখলে অন্তরে হিংসার আগুন জ্বলে ওঠে।
- পদমর্যাদা ও নেতৃত্বের লোভ (حب الجاه والرياسة): সমাজে একমাত্র নিজের প্রভাব থাকবে—এমন স্বার্থান্ধ কামনা।
- আল্লাহর বণ্টনের ওপর অসন্তুষ্টি: আল্লাহ কাকে কী দিয়েছেন তার ফয়সালাকে অন্তরে মেনে নিতে না পারা।
দায়ীর জীবনে হিংসার ভয়াবহ ক্ষতিসমূহ (أضراره على الداعية)
- আমলসমূহ পুড়ে ছাই হওয়া: রাসূলুল্লাহ (সা.) কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন:
إِيَّاكُمْ وَالْحَسَدَ، فَإِنَّ الْحَسَدَ يَأْكُلُ الْحَسَنَاتِ كَمَا تَأْكُلُ النَّارُ الْحَطَبَ
“তোমরা হিংসা থেকে বেঁচে থাক; কেননা আগুন যেভাবে কাঠকে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়, হিংসা তেমনি নেক আমলসমূহকে খেয়ে ফেলে।” (আবু দাউদ)
- দাওয়াতি কাজে বরকত নষ্ট হওয়া: হিংসুক দায়ীর অন্তরে ইখলাস থাকে না। ফলে তার কথায় মানুষের ওপর কোনো তাছির বা প্রভাব তৈরি হয় না।
- সহকর্মীদের সাথে ঐক্য বিনষ্ট হওয়া: অন্য দায়ী বা আলেমদের জনপ্রিয়তা দেখে হিংসা করলে দাওয়াতি ময়দানে বিভেদ ও কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি শুরু হয়, যা সামগ্রিক ইসলামি আন্দোলনের ক্ষতিসাধন করে।
- আল্লাহর ফয়সালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ: হিংসুক ব্যক্তি মূলত আল্লাহর বণ্টনকে চ্যালেঞ্জ করে, যা ঈমানের মূল ভিত্তির পরিপন্থী।
উপসংহার
একজন দায়ীকে অবশ্যই নিজের অন্তরকে হিংসার কলুষতা থেকে মুক্ত রেখে অন্য ভাইয়ের সাফল্যে আনন্দিত হওয়ার মতো উদার হৃদয়ের অধিকারী হতে হবে।
مجموعة (ب) [বিভাগ ‘খ’ – সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলী]
মান: ৫ × ৪ = ২০
٩- اذكر صفات الداعية الناجح باختصار-
[৯. একজন সফল ইসলামি দায়ীর আবশ্যকীয় গুণাবলী সংক্ষেপে উল্লেখ কর।]
উত্তর
ইসলামি দাওয়াতকে ফলপ্রসূ করতে একজন দায়ীর মধ্যে নিম্নলিখিত গুণাবলী থাকা আবশ্যক:
- ইখলাস বা খাঁটি নিয়ত: কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করা; কোনো পার্থিব প্রশংসা বা স্বার্থের লোভ না করা।
- গভীর ইলম: কুরআন, সুন্নাহ এবং সমকালীন যুগোপযোগী বিষয়ে সঠিক ও গভীর জ্ঞান থাকা।
- উত্তম চরিত্র ও বাস্তব আমল: নিজে যা প্রচার করেন, ব্যক্তিগত জীবনে তার নিখুঁত প্রতিফলন ঘটানো।
- ধৈর্য ও সহনশীলতা: মানুষের গালিগালাজ ও বিরোধিতায় ধৈর্য ধারণ করা।
- হিকমত ও প্রজ্ঞা: পরিবেশ ও শ্রোতার স্তর বুঝে উপযুক্ত ভাষায় কথা বলা।
١٠- ما هي خدمات عثمان بن عفان رضي الله عنه في نشر الدعوة؟
[১০. দাওয়াত প্রসারে হযরত উসমান ইবনে আফফান (রা.)-এর অবদান উল্লেখ কর।]
উত্তর
তৃতীয় খলিফা হযরত উসমান (রা.) ইসলামের দাওয়াত ও সুরক্ষায় ঐতিহাসিক অবদান রেখেছেন:
- কুরআনের সর্বসম্মত প্রামাণ্য কপি তৈরি (রসমুল উসমানি): বিভিন্ন অঞ্চলে কিরাআতের বৈচিত্র্যের কারণে মুসলিমদের মধ্যে বিভ্রান্তি রোধ করতে তিনি কোরাইশ উচ্চারণে কুরআন সংকলন করে বিভিন্ন প্রদেশে সরকারি কপি প্রেরণ করেন, যার জন্য তাঁকে ‘জামেউল কুরআন’ বলা হয়।
- ইসলামি নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠা ও দূরবর্তী দেশে দাওয়াত: তাঁর নির্দেশে প্রথম মুসলিম নৌবাহিনী গঠিত হয় এবং সাইপ্রাস ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ইসলাম পৌঁছে।
- বিশাল ভূখণ্ডে দাওয়াত বিস্তার: তাঁর খেলাফতকালে তৎকালীন আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, উত্তর আফ্রিকা এবং মধ্য এশিয়ার বিশাল অঞ্চল ইসলামি রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয়।
- আর্থিক কুরবানি: তাবুক যুদ্ধে বিপুল অর্থ ও রসদ দান এবং মদিনায় মুসলিমদের জন্য বীর রুমা কূপ ক্রয় করে ওয়াকফ করে দেন।
١١- بين أن القرآن الكريم دستور كامل لحياة الإنسان-
[১১. পবিত্র কুরআন মানুষের সমগ্র জীবনের এক পূর্ণাঙ্গ সংবিধান—তা ব্যাখ্যা কর।]
উত্তর
পবিত্র কুরআন কেবল কতগুলো ধর্মীয় উপাখ্যানের বই নয়; এটি মানুষের ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ সংবিধান:
- আল্লাহর ঘোষণা: আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন:
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَابَ تِبْيَانًا لِكُلِّ شَيْءٍ وَهُدًى وَرَحْمَةً
“আমি আপনার ওপর কিতাব অবতীর্ণ করেছি প্রতিটি বিষয়ের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যাস্বরূপ এবং এটি হেদায়েত ও রহমত।” (সূরা আন-নাহল: ৮৯)
- জীবনের সকল দিকের সমাধান: এতে আকাইদ ও ইবাদতের পাশাপাশি বিয়ে-তালাকের পারিবারিক আইন, বেচাকেনা ও সুদমুক্ত অর্থনীতির বিধান, চুরি-ব্যভিচার ও খুনের ফৌজদারি দণ্ডবিধি এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির মৌলিক নীতি সন্নিবেশিত রয়েছে।
١٢- تحدث عن الحسن البصري ودوره في الوعظ والإرشاد-
[১২. প্রখ্যাত তাবেঈ হাসান বসরী (রহ.)-এর পরিচয় এবং ওয়াজ ও নসিহতে তাঁর ভূমিকা আলোচনা কর।]
উত্তর
পরিচয়: হযরত হাসান বসরী (রহ.) (২১-১১০ হি.) ছিলেন তাবেঈগণের মধ্যে অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ইমাম, ফকিহ ও মুহাদ্দিস। তিনি উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালমা (রা.)-এর ঘরে লালিত-পালিত হন এবং বহু সাহাবির সাহচর্য লাভ করেন।
ওয়াজ ও নসিহতে তাঁর ভূমিকা:
- অশ্রুসিক্ত বয়ান: বসরার জামে মসজিদে তাঁর ওয়াজের মজলিসে মানুষ মৃত্যুর স্মরণ ও পরকালের ভয়ে অঝোরে কাঁদত। তাঁর কথা ছিল অত্যন্ত অলংকারপূর্ণ ও সরাসরি অন্তরকে স্পর্শকারী।
- দুনিয়ার মোহমুক্তি ও যুহদ: উমাইয়া যুগের ভোগবিলাসের বিরুদ্ধে তিনি সাহাবিদের আমলের ত্যাগী জীবনের আদর্শ তুলে ধরে এক আধ্যাত্মিক জাগরণ তৈরি করেছিলেন।
- সুলতানদের সামনে সত্য কথন: জালিম শাসক হাজ্জাজ বিন ইউসুফের সামনে নির্ভীক চিত্তে সত্যের কথা তুলে ধরেছিলেন।
١٣- ما هي أصول دعوة الملحدين؟
[১৩. নাস্তিকদের (মুলহিদীন) দাওয়াত দেওয়ার মৌলিক নীতিমালা কী কী?]
উত্তর
নাস্তিকরা যেহেতু ওহী বা আসমানি কিতাব বিশ্বাস করে না, তাই তাদের সাথে দাওয়াতের নীতি সাধারণ মুসলিমদের চেয়ে ভিন্ন:
- মহাবিশ্বের নিখুঁত সৃষ্টির যৌক্তিক প্রমাণ: আধুনিক মহাকাশবিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞান দেখিয়ে প্রমাণ করা যে কোনো দুর্ঘটনা বা অন্ধ বিবর্তন থেকে এমন নিখুঁত মহাবিশ্ব সৃষ্টি হতে পারে না; এর পেছনে একজন পরম স্রষ্টা রয়েছেন।
- কার্যকারণ তত্ত্ব (Law of Causality): কোনো সৃষ্টিই স্রষ্টা ছাড়া অস্তিত্বে আসতে পারে না (যেমন: ঘড়ি থাকলে ঘড়ি নির্মাতা থাকতে হবে)।
- আত্মার অস্তিত্ব ও নৈতিক বিবেক: মানুষের ভেতরের ন্যায়-অন্যায়ের চেতনা ও বিবেকের উৎস কোনো জড় পদার্থ নয়, এটি স্রষ্টার পক্ষ থেকে।
- নম্রতা ও বৈজ্ঞানিক তথ্যভিত্তিক বিতর্ক: উত্তেজিত না হয়ে শান্তভাবে আধুনিক বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক তথ্যের সাহায্যে তাদের যুক্তি খণ্ডন করা।
١٤- اذكر فوائد الصدق وأضرار الكذب-
[১৪. সত্যবাদিতার সুফল এবং মিথ্যার অপকারিতাসমূহ উল্লেখ কর।]
উত্তর
সত্যবাদিতার সুফল (فوائد الصدق):
- জান্নাত ও নেক কাজের দিশা: রাসূল (সা.) বলেছেন: “সত্য মানুষকে পুণ্যের দিকে পরিচালিত করে এবং পুণ্য মানুষকে জান্নাতের দিকে নিয়ে যায়।” (সহিহ বুখারি)
- অন্তরের প্রশান্তি: সত্যবাদীর অন্তরে কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব বা ধরা পড়ার ভয় থাকে না।
- দুনিয়ায় সম্মান ও বিশ্বস্ততা: সমাজে সকলেই সত্যবাদীকে শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস করে।
মিথ্যার অপকারিতা (أضرار الكذب):
- জাহান্নামের পথ: “নিশ্চয় মিথ্যা মানুষকে পাপাচারের দিকে নিয়ে যায় এবং পাপাচার মানুষকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করে।”
- মুনাফিকির আলামত: মিথ্যা কথা বলা মুনাফিকের অন্যতম প্রধান লক্ষণ।
- সামাজিক ধ্বংস: মিথ্যার কারণে মানুষের পারস্পরিক আস্থা নষ্ট হয় এবং পরিবার ও সমাজ ভেঙে পড়ে।
١٥- ما هي الغيبة وما هي آثارها السيئة؟
[১৫. গীবত কাকে বলে এবং এর ক্ষতিকর প্রভাবসমূহ কী কী?]
উত্তর
গীবতের সংজ্ঞা: রাসূলুল্লাহ (সা.) গীবতের সংজ্ঞা দিয়ে বলেন: “ذِكْرُكَ أَخَاكَ بِمَا يَكْرَهُ” (তোমার মুসলিম ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে তার এমন কোনো দোষ বা অপ্রিয় কথা বলা যা শুনলে সে কষ্ট পায়—সহিহ মুসলিম)। যদি দোষটি তার মধ্যে সত্যিই থাকে তবে তা গীবত, আর না থাকলে তা তোহমত বা অপবাদ।
গীবতের ক্ষতিকর প্রভাব:
- মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সমতুল্য জঘন্য পাপ: কুরআনে আল্লাহ বলেন: “তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? নিশ্চয় তোমরা তা ঘৃণা কর।” (সূরা আল-হুজুরাত: ১২)
- আমলনামা শূন্য হওয়া: কিয়ামতের দিন গীবতকারীর নেক আমল যার গীবত করা হয়েছে তাকে দিয়ে দেওয়া হবে।
- সামাজিক বিভেদ ও শত্রুতা: গীবতের কারণে সমাজে ঘৃণা, সন্দেহ ও শত্রুতা বৃদ্ধি পায়।
١٦- بيّن أهمية العلم في حياة الداعية-
[১৬. একজন ইসলামি দায়ীর জীবনে ইলম বা জ্ঞানের গুরুত্ব আলোচনা কর।]
উত্তর
জ্ঞান ছাড়া কোনো ব্যক্তি ইসলামি দায়ী হতে পারে না। অন্ধ আবেগ দিয়ে দাওয়াত দিলে উপকারের চেয়ে ক্ষতি বেশি হয়:
- প্রজ্ঞার সাথে দাওয়াত দেওয়ার ভিত্তি: আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন: “বলুন: এটি আমার পথ; আমি পূর্ণ জ্ঞানের (বসিরাত) ওপর ভিত্তি করে আল্লাহর দিকে ডাকি।” (সূরা ইউসুফ: ১০৮)
- হালাল ও হারামের পার্থক্য জানা: কী আদেশ করতে হবে এবং কী বর্জন করতে হবে—তা শরীয়তের সঠিক ইলম ছাড়া জানা অসম্ভব।
- সংশয়বাদীদের জবাব দেওয়া: সমকালীন নাস্তিক্যবাদ ও বিভ্রান্ত ফেরকাগুলোর বিরুদ্ধে যুক্তিপূর্ণ উত্তর দিতে হলে গভীর জ্ঞান অপরিহার্য। জাহেল ব্যক্তির দাওয়াতে বিভ্রান্তি ছড়ায়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. ইসলামি দাওয়াহর মূল ভিত্তি কী?
ইসলামি দাওয়াত কুরআনুল কারীম ও সহিহ সুন্নাতে নাবাবিয়্যাহর অবিসংবাদিত নির্দেশনার ওপর প্রতিষ্ঠিত, যার মূল লক্ষ্য হলো পৃথিবীতে আল্লাহর তাওহিদ ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা।
২. তওবা কবুল হওয়ার শর্ত কয়টি?
আল্লাহর হকের ক্ষেত্রে শর্ত তিনটি: গুনাহ বর্জন করা, অতীতের জন্য অনুতপ্ত হওয়া এবং ভবিষ্যতে না করার সংকল্প করা। বান্দার হকের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত শর্ত হলো ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির পাওনা পরিশোধ বা ক্ষমা নেওয়া।
৩. হাদিস অস্বীকারকারীদের যুক্তি কি গ্রহণযোগ্য?
না, হাদিস অস্বীকার করা প্রকারান্তরে কুরআনকেই অস্বীকার করার নামান্তর; কারণ কুরআন নিজেই রাসূল (সা.)-এর সুন্নাহর পূর্ণ আনুগত্যকে ঈমানের অপরিহার্য শর্ত ঘোষণা করেছে।
৪. হিংসা (হাসাদ) কেন এত ভয়াবহ পাপ?
কারণ হিংসা আগুন যেভাবে কাঠ পুড়িয়ে ছাই করে, তেমনি মানুষের সারা জীবনের নেক আমলসমূহ নিঃশেষ করে দেয় এবং এটি মূলত আল্লাহর বণ্টনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ।
৫. হযরত উসমান (রা.)-কে কেন ‘জামেউল কুরআন’ বলা হয়?
তিনি সমগ্র মুসলিম বিশ্বের জন্য পবিত্র কুরআনের একটি অভিন্ন প্রামাণ্য নুসখা প্রস্তুত করে বিভিন্ন প্রদেশে সরকারিভাবে সরবরাহ করেছিলেন এবং কিরাআতের বিভ্রান্তি দূর করেছিলেন।
৬. একজন সফল দায়ীর সবচেয়ে বড় হাতিয়ার কোনটি?
একজন সফল দায়ীর প্রধান হাতিয়ার হলো খাঁটি ইখলাস, কুরআন-সুন্নাহর গভীর জ্ঞান, অনুপম চারিত্রিক সৌন্দর্য এবং মানুষের প্রতি অপরিসীম মমতা ও প্রজ্ঞা।