জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

আহকামুল কুরআন (Ahkamul Quran) – 201802, আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ – ফাজিল অনার্স ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা ২০২২

Abswer.com Abswer.com
20 September, 2026
৮৫ মিনিট পড়ার সময়
১৬ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

ফাজিল স্নাতক (সম্মান) ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা ২০২২
বিভাগ: আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: أحكام القرآن (আহকামুল কুরআন)
বিষয় কোড: ২০১৮০২ | পরীক্ষা কোড: ২০৮ | প্রশ্নপত্র কোড: ১১২
পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা


مجموعة (الف) : مجموعة النصوص القرآنية والأحكام الفقهية (গ্রুপ ‘ক’ – কুরআনিক পাঠ্য ও ফিকহুল কুরআন)

[الملاحظة: أجب عن خمسة أسئلة من هذه المجموعة. الدرجات: ৫ × ১৪ = ৭০]
(পরীক্ষার্থীদের সুবিধার জন্য এবং পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতির লক্ষ্যে গ্রুপ ‘ক’-এর ১০টি মূল প্রশ্ন ও উপ-প্রশ্নের সবগুলোই প্রামাণ্যভাবে সমাধান করা হলো।)


١- قوله تعالى: مَا آمَنَتْ قَبْلَهُم مِّن قَرْيَةٍ أَهْلَكْنَاهَا أَفَهُمْ يُؤْمِنُونَ – وَمَا أَرْسَلْنَا قَبْلَكَ إِلَّا رِجَالًا نُّوحِي إِلَيْهِمْ فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِن كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ – وَمَا جَعَلْنَاهُمْ جَسَدًا لَّا يَأْكُلُونَ الطَّعَامَ وَمَا كَانُوا خَالِدِينَ

(ক) আয়াতত্রয়ের প্রাঞ্জল বাংলা অনুবাদ

“তাদের পূর্বে যেসব জনপদ আমি ধ্বংস করে দিয়েছি, তাদের অধিবাসীরা ঈমান আনেনি; তবে কি এরা এখন ঈমান আনবে? আর আপনার পূর্বেও আমি পুরুষদেরই রাসুলরূপে প্রেরণ করেছিলাম, যাদের প্রতি আমি ওহি অবতীর্ণ করতাম; অতএব তোমরা যদি না জানো তবে জ্ঞানীদের (আহলুজ জিকর) জিজ্ঞেস করো। আর আমি তাদেরকে এমন কোনো দেহবিশিষ্ট করিনি যে তারা আহার করত না, আর না তারা চিরঞ্জীব ছিল।” [সূরা আল-আম্বিয়া: ৬-৮]

(الف) بين سبب نزول قوله تعالى: “ما امنت قبلهم من قرية – الخ” (আয়াতসমূহের শানে নুযুল)

উক্ত মোবারক আয়াতসমূহ অবতীর্ণ হওয়ার সুস্পষ্ট ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তাফসিরের কিতাবসমূহে বর্ণিত হয়েছে:

  • অলৌকিক নিদর্শন দাবির প্রেক্ষাপট: মক্কার মুশরিকরা রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট অযৌক্তিক দাবি তুলল যে, মূসা (আ.)-এর লাঠি কিংবা সালিহ (আ.)-এর উষ্ট্রীর ন্যায় প্রকাশ্য চাক্ষুষ মুজিজা প্রদর্শন করা হোক এবং সাফা পাহাড়কে স্বর্ণে রূপান্তর করে দেওয়া হোক। তারা অঙ্গীকার করেছিল যে, এমনটি করা হলে তারা ঈমান আনবে।
  • ঐতিহাসিক শিক্ষণীয় বাস্তবতা: আল্লাহ তাআলা তাদের এই অবাস্তব দাবির জবাবে স্পষ্ট করে দিলেন যে, বিগত জাতিসমূহের ইতিহাস সাক্ষী—যখনই কোনো জাতি নির্দিষ্ট অলৌকিক বস্তু দাবি করেছে এবং তা পূর্ণ হওয়ার পরও কুফরিতে অটল থেকেছে, তখন তাদের ওপর আল্লাহর অবধারিত আযাব নেমে এসেছে এবং তাদের সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে (যেমন সামূদ ও আদ জাতি)। সুতরাং মক্কার এই কাফেররাও অলৌকিক নিদর্শন দেখার পর কখনো ঈমান আনবে না, বরং চূড়ান্ত ধ্বংসের মুখোমুখি হবে। আল্লাহর রহমত যে তিনি উম্মতে মুহাম্মাদীকে তাত্ক্ষণিক গণ-ধ্বংস থেকে রক্ষা করতে চান।
  • ফেরেশতা রাসুল না পাঠানোর যৌক্তিকতা: কাফেররা আরও আপত্তি তুলেছিল যে, একজন মানব কীভাবে রাসুল হতে পারেন! রাসুল হিসেবে তো কোনো ফেরেশতা প্রেরণ করা উচিত ছিল। এর প্রত্যুত্তরে পরবর্তী আয়াতে বলা হলো যে, পূর্ববর্তী সকল যুগেও আল্লাহ তাআলা রক্ত-মাংসের মানুষকেই ওহির বাহক ও রাসুল বানিয়ে পাঠিয়েছেন।

(ب) ما معنى التقليد؟ وما المراد بأهل الذكر؟ (তাকলীদের সংজ্ঞা ও আহলুজ জিকরের তাৎপর্য)

১. তাকলীদের পারিভাষিক সংজ্ঞা (معنى التقليد):

উসূলে ফিকহের পরিভাষায় তাকলীদ হলো—

«قَبُولُ قَوْلِ الْغَيْرِ مِنْ غَيْرِ مَعْرِفَةِ دَلِيلِهِ»
অর্থাৎ: কোনো নির্ভরযোগ্য মুজতাহিদ বা আলেমের সিদ্ধান্তের দলিল বিস্তারিতভাবে যাচাই-বাছাই না করে তার প্রজ্ঞা ও শরয়ি যোগ্যতার ওপর আস্থা রেখে তার ফতোয়া বা মত গ্রহণ ও অনুসরণ করা। সাধারণ মানুষের জন্য দ্বীনের জটিল ও গভীর ইজতিহাদি মাসআলায় বিজ্ঞ মুজতাহিদের অনুসরণ করা ওয়াজিব।

২. আহলুজ জিকর (أهل الذكر)-এর তাৎপর্য:

পবিত্র কুরআনের নির্দেশ: “فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِن كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ” (যদি তোমরা না জানো, তবে জ্ঞানীদের নিকট জিজ্ঞাসা করো)। মুফাসসিরীনে কিরাম ‘আহলুজ জিকর’-এর ব্যাখ্যায় কয়েকটি প্রধান মত উল্লেখ করেছেন:

  1. আসমানি কিতাবের পণ্ডিতবর্গ (আহলুল কিতাব): প্রাথমিক শানে নুযুলের ক্ষেত্রে এর দ্বারা তাওরাত ও ইঞ্জিলের সেই সত্যনিষ্ঠ পণ্ডিতদের বোঝানো হয়েছে, যারা জানতেন যে পূর্ববর্তী সকল নবীই মানুষ ছিলেন, কোনো ফেরেশতা ছিলেন না। কাফেরদের বলা হলো তোমরা তাদের নিকট খোঁজ নিয়ে নিশ্চিত হও।
  2. কুরআন ও সুন্নাহর গভীর প্রজ্ঞাবান উলামা ও ফুকাহায়ে কিরাম: সার্বজনীন হুকুম হিসেবে সমস্ত উম্মতের ক্ষেত্রে ‘আহলুজ জিকর’ হলেন কুরআন, সুন্নাহ ও শরয়ি আহকামের গভীর বিশেষজ্ঞ আলেম ও মুজতাহিদগণ। অজ্ঞ বা সাধারণ মুসলমানদের জন্য যেকোনো ধর্মীয় জটিলতায় তাদের ফতোয়া গ্রহণ করা অপরিহার্য। এই আয়াতটিই হলো শরিয়তে ‘তাকলীদ’ ও বিশেষজ্ঞ অনুসরণের মৌলিক দলীল।

٢- قوله تعالى: وَمَا خَلَقْنَا السَّمَاءَ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا لَاعِبِينَ – لَوْ أَرَدْنَا أَن نَّتَّخِذَ لَهْوًا لَّاتَّخَذْنَاهُ مِن لَّدُنَّا إِن كُنَّا فَاعِلِينَ – بَلْ نَقْذِفُ بِالْحَقِّ عَلَى الْبَاطِلِ فَيَدْمَغُهُ فَإِذَا هُوَ زَاهِقٌ وَلَكُمُ الْوَيْلُ مِمَّا تَصِفُونَ

(ক) আয়াতত্রয়ের প্রাঞ্জল বাংলা অনুবাদ

“আর আসমান, জমিন এবং উভয়ের মধ্যবর্তী কোনো কিছুই আমি অনর্থক খেলাচ্ছলে সৃষ্টি করিনি। যদি আমি ক্রীড়া-কৌতুকের উপকরণ গ্রহণ করতে চাইতাম, তবে আমার উপযুক্ত পদ্ধতিতে আমি নিজেই তা করতাম, যদি আমাকে তা করতেই হতো। বরং আমি সত্য দ্বারা আঘাত হানি মিথ্যার ওপর, অতঃপর তা মিথ্যাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয় এবং তৎক্ষণাৎ তা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। আর তোমরা যা আরোপ করছ, তার জন্য তোমাদের দুর্ভোগ!” [সূরা আল-আম্বিয়া: ১৬-১৮]

(الف) ما الحكمة من خلق السماء والارض وما بينهما؟ (মহাবিশ্ব সৃষ্টির হিকমত ও উদ্দেশ্য)

মহাবিশ্বের বিশাল সৃষ্টিজগতের পেছনে মহান আল্লাহর অনন্ত প্রজ্ঞা ও সুস্পষ্ট লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নিহিত রয়েছে:

  • নিরর্থক সৃষ্টির অস্বীকৃতি: আল্লাহ তাআলা কোনো কিছু খেল-তামাশা বা বৃথা বিনোদন হিসেবে সৃষ্টি করেননি (وَمَا خَلَقْنَا السَّمَاءَ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا بَاطِلًا)। বরং এর প্রতিটি অনু-পরমাণু সুনির্দিষ্ট নিয়ম, শৃঙ্খলা ও উপযোগিতা বহন করে।
  • তাওহিদ ও কুদরতের অকাট্য প্রমাণ: আকাশমণ্ডল, গ্রহ-নক্ষত্র এবং পৃথিবীর সুশৃঙ্খল আবর্তন প্রমাণ করে যে, এই সৃষ্টির একজন সর্বজ্ঞানী, একচ্ছত্র স্রষ্টা ও পরিচালক আছেন। সৃষ্টিজগতকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে মানুষের বিবেক স্বতঃস্ফূর্তভাবে আল্লাহর একত্ববাদকে স্বীকার করতে বাধ্য হয়।
  • মানুষের জন্য পরীক্ষা ও কর্মক্ষেত্র তৈরি: এই মহাবিশ্ব মানবজাতির জন্য একটি পরীক্ষাগার। এখানে মানুষকে বিবেক, ইচ্ছা ও বিবেকশক্তি দিয়ে পাঠানো হয়েছে যাতে তারা আনুগত্যের মাধ্যমে জান্নাতের উত্তরাধিকারী হতে পারে অথবা কৃতকর্মের প্রতিফল হিসেবে জাহান্নামের আযাব ভোগ করে।
  • কিয়ামত ও ন্যায়বিচারের অনিবার্য প্রয়োজনীয়তা: সৃষ্টির উদ্দেশ্য যদি খেলাধুলা হতো, তবে সৎ ও অসৎ লোকের কর্মের কোনো ফলাফল থাকত না। কিন্তু সুবিচার নিশ্চিত করতে এবং নেককারদের পুরস্কৃত ও বদকারদের শাস্তি দিতেই এই জগত সৃষ্টি এবং এর পরিসমাপ্তিতে কিয়ামত অপরিহার্য।

(ب) ما المراد باللهو؟ (লাহউ বা ক্রীড়া-কৌতুকের মর্মার্থ)

মুফাসসিরীনে কিরাম ও ভাষাতত্ত্ববিদদের মতে ‘লাহউ’ (اللَّهْو)-এর তাৎপর্য নিম্নরূপ:

  1. স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি: ইয়ামেনীয় আরবি উপভাষায় ‘লাহউ’ শব্দের অর্থ হলো স্ত্রী ও সন্তান। কাফের ও মুশরিকরা দাবি করত যে ফেরেশতারা আল্লাহর কন্যা, অথবা ইহুদি-খ্রিস্টানরা বলত উজাইর ও ঈসা আল্লাহর পুত্র। আল্লাহ তাআলা দৃঢ়ভাবে তা খণ্ডন করে বললেন—যদি আমি সন্তান বা স্ত্রী গ্রহণ করতে চাইতাম, তবে তা নিজের শান অনুযায়ী গ্রহণ করতাম, সৃষ্টিজগত থেকে নয়; কিন্তু আল্লাহ এসব মানবিক দুর্বলতা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র।
  2. খেলাধুলা ও নিরর্থক কাজ: সাধারণ অর্থে লাহউ হলো এমন কর্ম যাতে কোনো দূরদর্শী হিতকর উদ্দেশ্য থাকে না। আল্লাহ রব্বুল আলামিন ঘোষণা করেছেন যে, নিরর্থক ক্রীড়াকৌতুক সৃষ্টি করা তাঁর উলুহিয়্যাত ও রবুবিয়্যাতের মর্যাদার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

٣- قوله تعالى: يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِن كُنتُمْ فِي رَيْبٍ مِّنَ الْبَعْثِ فَإِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن تُرَابٍ ثُمَّ مِن نُّطْفَةٍ ثُمَّ مِنْ عَلَقَةٍ ثُمَّ مِن مُّضْغَةٍ مُّخَلَّقَةٍ وَغَيْرِ مُخَلَّقَةٍ لِّنُبَيِّنَ لَكُمْ وَنُقِرُّ فِي الْأَرْحَامِ مَا نَشَاءُ إِلَىٰ أَجَلٍ مُّسَمًّى ثُمَّ نُخْرِجُكُمْ طِفْلًا ثُمَّ لِتَبْلُغُوا أَشُدَّكُمْ وَمِنكُم مَّن يُتَوَفَّىٰ وَمِنكُم مَّن يُرَدُّ إِلَىٰ أَرْذَلِ الْعُمُرِ لِكَيْلَا يَعْلَمَ مِن بَعْدِ عِلْمٍ شَيْئًا وَتَرَى الْأَرْضَ هَامِدَةً فَإِذَا أَنزَلْنَا عَلَيْهَا الْمَاءَ اهْتَزَّتْ وَرَبَتْ وَأَنبَتَتْ مِن كُلِّ زَوْجٍ بَهِيجٍ

(ক) আয়াতের প্রাঞ্জল বাংলা অনুবাদ

“হে মানবজাতি! যদি তোমরা পুনরুত্থানের ব্যাপারে সন্দেহে থাকো, তবে অনুধাবন করো—আমি তোমাদের মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি, অতঃপর বীর্য থেকে, অতঃপর জমাট রক্তপিণ্ড থেকে, অতঃপর গঠিত ও অগঠিত মাংসপিণ্ড থেকে, যাতে তোমাদের কাছে বাস্তব সত্য স্পষ্ট করে দিই। আর আমি মাতৃগর্ভে যা ইচ্ছা তা একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত রাখি, অতঃপর তোমাদের শিশুরূপে বের করে আনি, যাতে পরে তোমরা যৌবনে পদার্পণ করতে পারো। তোমাদের মধ্যে কারো কারো অকালে মৃত্যু ঘটে এবং কাউকে কাউকে পৌঁছে দেওয়া হয় নিকৃষ্টতম বার্ধক্যে, যাতে সে জানার পরও আর কিছুই না জানে। আর আপনি শুষ্ক মৃত ভূমি দেখতে পান, অতঃপর আমি যখন তাতে বৃষ্টিবর্ষণ করি, তখন তা সতেজ হয়ে ওঠে, ফুলে-ফেঁপে ওঠে এবং প্রতিটি দৃষ্টিনন্দন উদ্ভিদ উৎপাদন করে।” [সূরা আল-হাজ্জ: ৫]

(الف) بين مراحل خلق الانسان في ضوء القرآن وعلم الطب (কুরআন ও আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলোকে মানব সৃষ্টির পর্যায়সমূহ)

পবিত্র কুরআন মানবভ্রূণের ক্রমবিকাশকে এমন বৈজ্ঞানিক সূক্ষ্মতার সাথে বিন্যস্ত করেছে, যা আধুনিক ভ্রূণতত্ত্ব (Embryology)-এর সাথে শতভাগ সামঞ্জস্যপূর্ণ:

পর্যায় কুরআনিক পরিভাষা চিকিৎসাবিজ্ঞানের সমার্থকতা (Medical Embryology) শারীরবৃত্তীয় বিবরণ ও বৈশিষ্ট্য
১ تراب (মাটি) Inorganic chemical elements মানবদেহের ভিত্তি প্রথম মানব আদম (আ.)-এর মাটি থেকে সৃষ্টি এবং দেহের সমস্ত মৌলিক রাসায়নিক উপাদানের উৎস মাটি।
২ نطفة (নুতফাহ) Zygote / Fertilized Ovum শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মিলনজাত নিষিক্ত কোষ যা জরায়ুর দেয়ালে রোপিত হওয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করে।
৩ علقة (আলাকাহ) Blastocyst / Clot-like leech structure জরায়ুর দেয়ালে ঝুলন্ত অবস্থায় আঁকড়ে থাকা রক্তপিণ্ডসদৃশ পর্যায়; এটি দেখতে জোঁকের ন্যায় রক্ত চোষণকারী আকৃতি ধারণ করে।
৪ مضغة (মুদগাহ) Somites / Chewed-like lump of flesh চিবানো গোশতের টুকরার ন্যায় আকৃতি বিশিষ্ট মাংসপিণ্ড। مخلقة (গঠিত/অঙ্গ চিহ্নিত) এবং غير مخلقة (অগঠিত)।
৫ عظام ولحم (হাড় ও পেশি) Skeleton & Muscular development প্রথমে তরুণাস্থির কাঠামো তৈরি হয় এবং পরবর্তীতে তার ওপর মাংসপেশি আবৃত করে পূর্ণাঙ্গ মানব অবয়ব রূপায়িত করা হয়।
৬ نفخ الروح (রুহ সঞ্চার) Viability & Quickening ১২০তম দিনে বা প্রায় চতুর্থ মাসে আল্লাহ তাআলা বিশেষ ফেরেশতার মাধ্যমে ভ্রূণে জীবন বা রুহ ফুঁকে দেন।

(ب) تحدث عن المكتوبات إذا استقرت النطفة فى الرحم فى ضوء أحكام القرآن لابن العربى (ইবনুল আরাবীর আহকামুল কুরআনের আলোকে চার ভাগ্যলিপি)

আল্লামা কাযী আবু বকর ইবনুল আরাবী তাঁর আহকামুল কুরআন গ্রন্থে সহিহ হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে উল্লেখ করেছেন যে, যখন জরায়ুতে নুতফাহ সুপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১২০ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর ফেরেশতা আগমন করেন, তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে চারটি অমোঘ নির্দেশ লিপিবদ্ধ করা হয়:

  1. رزقه (তার রিজিক বা জীবিকা): সে পার্থিব জীবনে কতটুকু খাদ্য, সম্পদ ও নেয়ামত লাভ করবে তা সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারিত হয়।
  2. أجله (তার আয়ুষ্কাল বা মৃত্যুর সময়): সে ঠিক কত বছর, মাস বা দিন জীবিত থাকবে এবং কোথায় কীভাবে মৃত্যুবরণ করবে তা নির্ধারিত হয়।
  3. عمله (তার কর্ম ও ভূমিকা): সে দুনিয়াতে কী কী ভালো বা মন্দ কাজ সম্পাদন করবে তা আল্লাহর চিরন্তন ইলমের ভিত্তিতে লিপিবদ্ধ হয়।
  4. شقي أم سعيد (সে দুর্ভাগ্যবান না সৌভাগ্যবান): আখেরাতে তার চূড়ান্ত পরিণতি কি জাহান্নাম (شقاوة) হবে নাকি জান্নাত (سعادة)—তা ধার্য হয়ে যায়।

ইবনুল আরাবী উল্লেখ করেন, এই ভাগ্যলিপি মানুষের ইচ্ছাশক্তিকে অস্বীকার করে না, বরং আল্লাহর পূর্বজ্ঞান (العلم الأزلي)-এর পরিপূর্ণ রূপায়ন নির্দেশ করে।


٤- قوله تعالى: وَالَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ ثُمَّ لَمْ يَأْتُوا بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ فَاجْلِدُوهُمْ ثَمَانِينَ جَلْدَةً وَلَا تَقْبَلُوا لَهُمْ شَهَادَةً أَبَدًا وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ – إِلَّا الَّذِينَ تَابُوا مِن بَعْدِ ذَٰلِكَ وَأَصْلَحُوا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ

(ক) আয়াতদ্বয়ের প্রাঞ্জল বাংলা অনুবাদ

“আর যারা সতী-সাধ্বী নারীর ওপর অপবাদ আরোপ করে, অতঃপর চারজন সাক্ষী উপস্থিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে তাদের আশিটি বেত্রাঘাত করো এবং কখনো তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করো না; আর এরাই হলো পাপাচারী (ফাসিক)। তবে যারা এর পর তওবা করে এবং নিজেদের সংশোধন করে নেয়—নিশ্চয়ই আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [সূরা আন-নূর: ৪-৫]

(الف) ما معنى القذف؟ وما هو حد القذف على المحصنات؟ (কযফের সংজ্ঞা ও শরয়ি হদ্দ)

১. কযফের সংজ্ঞা (تعريف القذف):

আভিধানিক অর্থে ‘কযফ’ (الْقَذْفُ) হলো কোনো বস্তু সজোরে নিক্ষেপ করা (الرَّمْيُ بقُوَّةٍ)।
শরিয়তের পরিভাষায়: কোনো পবিত্র চরিত্রের সতী-সাধ্বী স্বাধীন মুসলমান পুরুষ বা নারীর ওপর ব্যভিচার (যিনা)-এর মিথ্যা অপবাদ আরোপ করা অথবা তার বৈধ বংশধারাকে অস্বীকার করাকে ‘কযফ’ বলা হয়।

২. কযফের শরয়ি হদ্দ ও শাস্তি (عقوبة حد القذف):

যদি অপবাদকারী শরিয়ত নির্ধারিত চারজন প্রত্যক্ষদর্শী ন্যায়পরায়ণ পুরুষ সাক্ষী উপস্থিত করতে না পারে, তবে তার ওপর তিনটি সুনির্দিষ্ট শাস্তি অবধারিত হয়:

  1. দৈহিক শাস্তি (عقوبة بدنية): তাকে জনসমক্ষে আশিটি (৮০) বেত্রাঘাত করা হবে।
  2. নাগরিক/আইনি অধিকার খর্ব (عقوبة مدنية): ভবিষ্যতে কোনো বিচারিক বা সামাজিক বিষয়ে তার সাক্ষ্য কখনো গ্রহণযোগ্য হবে না (وَلَا تَقْبَلُوا لَهُمْ شَهَادَةً أَبَدًا)।
  3. ধর্মীয় ও নৈতিক মর্যাদা হানি (عقوبة دينية): ইসলামী আইনে তাকে চিহ্নিত ‘ফাসিক’ বা পাপাচারী হিসেবে গণ্য করা হবে (وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ)।

(ب) اشرح قوله تعالى: “إلا الذين تابوا من بعد ذلك وأصلحوا” (তওবাকারীদের সাক্ষ্যের বিধান নিয়ে ফুকাহায়ে কিরামের ইখতিলাফ)

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—“إِلَّا الَّذِينَ تَابُوا مِن بَعْدِ ذَٰلِكَ وَأَصْلَحُوا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ” (তবে যারা এরপর তওবা করে এবং নিজেদের সংশোধন করে…)। অপবাদ আরোপকারী তওবা করলে তার ওপর উল্লেখিত তিনটি শাস্তির কোন কোনটির অবসান ঘটবে, এ নিয়ে ফুকাহায়ে কিরামের মধ্যে দুটি প্রধান মাযহাবি অভিমত রয়েছে:

  • ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও হানাফী মাযহাবের অভিমত: এই শর্তহীন ব্যতিক্রম কেবল সর্বশেষ বাক্য “وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ”-এর সাথে সম্পর্কিত। অর্থাৎ খাঁটি তওবা ও আত্মসংশোধনের ফলে তার ‘ফিসক’ দূর হবে, সে আল্লাহর নিকট ক্ষমাপ্রাপ্ত হবে এবং মুসলমান হিসেবে তার সাথে সাধারণ ভ্রাতৃত্ব বহাল থাকবে। কিন্তু দুনিয়ার আদালতে তার সাক্ষ্য চিরতরে বর্জিত থাকবে (حرمانا مؤبدا) এবং বেত্রাঘাতও মাফ হবে না; কারণ “أَبَدًا” (কখনো নয়) শব্দটি দিয়ে সাক্ষ্য বর্জনের নির্দেশ চিরস্থায়ী করা হয়েছে।
  • ইমাম মালিক, শাফেয়ী ও আহমাদ বিন হাম্বল (রহ.)-এর অভিমত: এই ব্যতিক্রমী বাক্যটি পূর্ববর্তী উভয় বিধানের সাথে সম্পৃক্ত। তওবা ও চরিত্র সংশোধনের ফলে সে ফিসক থেকেও মুক্ত হবে এবং ভবিষ্যতে অন্যান্য সৎ মুসলমানের ন্যায় তার সাক্ষ্যও আদালতে গ্রহণযোগ্য হবে। তবে শারীরিক হদ্দ (৮০ বেত্রাঘাত) তওবার দ্বারা বাতিল হয় না, কারণ তা বান্দার হকের সাথে সংশ্লিষ্ট।

٥- قوله تعالى: إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَن تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ آمَنُوا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ – وَلَوْلَا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ وَأَنَّ اللَّهَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ

(ক) আয়াতদ্বয়ের প্রাঞ্জল বাংলা অনুবাদ

“নিশ্চয়ই যারা মুমিনদের মাঝে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। আর আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না। আর যদি তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া না থাকত এবং আল্লাহ অতিশয় স্নেহশীল, পরম দয়ালু না হতেন (তবে তোমাদের ওপর কঠিন শাস্তি নেমে আসত)।” [সূরা আন-নূর: ১৯-২০]

(الف) تحدث عن وعيد من أحب إظهار الفاحشة في ضوء القرآن والسنة (অশ্লীলতা প্রচারকারীদের ভয়াবহ পরিণতি)

পবিত্র কুরআন ও হাদিসে অশ্লীলতা ও বেহায়াপনা ছড়ানোর বিরুদ্ধে কঠোরতম হুঁশিয়ারি উচ্চারিত হয়েছে:

  • কুরআনিক ঘোষণা: যারা মুমিন সমাজে অপবাদ, নগ্নতা, ব্যভিচার ও অনৈতিকতার প্রসার কামনা করে—তাদের জন্য ইহকালে রয়েছে অপমানজনক হদ্দ বা আইনি শাস্তি এবং পরকালে চিরস্থায়ী জাহান্নামের যন্ত্রণাদায়ক আযাব (عَذَابٌ أَلِيمٌ)। মুনাফিক সর্দার আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই উম্মুল মুমিনীন আয়িশা (রা.)-এর ওপর মিথ্যা অপবাদ (ইফক) রটিয়ে সমাজে অশ্লীলতা ছড়াতে চেয়েছিল, যার পরিণামে এই সতর্কবার্তা অবতীর্ণ হয়।
  • রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর হাদিসের সতর্কবাণী: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
    «لَمْ تَظْهَرِ الْفَاحِشَةُ فِي قَوْمٍ قَطُّ حَتَّى يُعْلِنُوا بِهَا، إِلَّا فَشَا فِيهِمُ الطَّاعُونُ وَالأَوْجَاعُ الَّتِي لَمْ تَكُنْ مَضَتْ فِي أَسْلاَفِهِمُ»
    “যখন কোনো জাতির মাঝে অশ্লীলতা এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে তারা তা প্রকাশ্যে করতে শুরু করে, তখন তাদের মাঝে মহামারী ও এমন সব দূরারোগ্য ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ে যা তাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে কখনো দেখা যায়নি।” [ইবনে মাজাহ: ৪০১৯]
  • সামাজিক প্রভাব: গুনাহ নিজে করা যেমন পাপ, পাপকে সমাজের সামনে দর্শনীয়, মুখরোচক ও সহজলভ্য করা তার চেয়েও মারাত্মক সামাজিক অপরাধ। এটি তরুণ সমাজের চরিত্র ধ্বংস করে পারিবারিক ও সামাজিক শান্তি বিনষ্ট করে।

(ب) ما المراد بالرحمة فى قوله تعالى: “ولولا فضل الله عليكم ورحمته”؟ (রহমতের তাৎপর্য)

আয়াতটিতে আল্লাহর অফুরন্ত ‘ফযল’ (অনুগ্রহ) এবং ‘রহমত’ (দয়া)-এর গভীর তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেছেন মুফাসসিরীনগণ:

  1. তাৎক্ষণিক আযাব বিলম্বিত করা: মক্কার কাফের ও মুনাফিকদের এই জঘন্য ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও আল্লাহ আকাশ ভেঙে ফেলেননি কিংবা মাটি ধসিয়ে দেননি; বরং সত্য উন্মোচন করে তওবার সুযোগ দিয়েছেন।
  2. হিদায়াত ও তওবার তাওফিক: অজ্ঞতাবশত যেসব সরলমনা মুমিন এই অপবাদে কান দিয়েছিল (যেমন মিসতাহ, হামনাহ ও হাসসান ইবনে সাবিত), আল্লাহ তাআলা তওবার বিধান দান করে তাদের পবিত্র করেছেন এবং আখেরাতের মহাবিপদ থেকে রক্ষা করেছেন।
  3. শরয়ি বিধানের সহজীকরণ ও নিরাপত্তা: আল্লাহ ইসলামি সমাজ ব্যবস্থার জন্য সুস্পষ্ট আইনি কাঠামো ও হদ্দ নির্ধারণ করে ব্যক্তিগত চরিত্র ও পরিবারের ইজ্জত রক্ষার চিরন্তন ঢাল প্রদান করেছেন।

٦- قوله تعالى: الم – تِلْكَ آيَاتُ الْكِتَابِ الْحَكِيمِ – هُدًى وَرَحْمَةً لِّلْمُحْسِنِينَ – الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَهُم بِالْآخِرَةِ هُمْ يُوقِنُونَ – أُولَٰئِكَ عَلَىٰ هُدًى مِّن رَّبِّهِمْ وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ

(ক) আয়াতসমূহের প্রাঞ্জল বাংলা অনুবাদ

“আলিফ-লাম-মীম। এগুলো প্রজ্ঞাপূর্ণ কিতাবের আয়াত—সৎকর্মপরায়ণদের জন্য পথপ্রদর্শক ও অনুগ্রহস্বরূপ। যারা সালাত কায়েম করে, জাকাত প্রদান করে এবং আখেরাতের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখে। তারাই তাদের রবের পক্ষ থেকে সত্য পথের ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং তারাই সফলকাম।” [সূরা লুকমান: ১-৫]

(الف) عرف الصلاة؟ ثم تحدث عن أهميتها في حياة الإنسان (সালাতের সংজ্ঞা ও মানবজীবনে এর গুরুত্ব)

১. সালাতের সংজ্ঞা (تعريف الصلاة):

ভাষাগত অর্থ: ‘সালাত’ (الصَّلَاةُ) শব্দের মূল অর্থ হলো দুআ, ক্ষমা প্রার্থনা ও প্রশংসা করা (الدُّعَاءُ وَالِاسْتِغْفَارُ)।
শরিয়তের পরিভাষা: সুনির্দিষ্ট শর্ত ও রুকন সমন্বিত এমন বিশেষ ইবাদত, যা তাকবীরে তাহরীমা দিয়ে শুরু হয় এবং তাসলীম (সালাম ফেরানো)-এর মাধ্যমে শেষ হয়।

২. মানবজীবনে সালাতের গুরুত্ব ও প্রভাব:
  • ইসলামের দ্বিতীয় স্তম্ভ ও ঈমানের পরিচয়: রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—«رَأْسُ الأَمْرِ الإِسْلاَمُ وَعَمُودُهُ الصَّلاَةُ» (দ্বীনের মূল হলো ইসলাম আর তার প্রধান খুঁটি হলো সালাত)। এটি কুফর ও ঈমানের মধ্যকার সুস্পষ্ট পার্থক্যকারী।
  • অশ্লীলতা ও অন্যায় থেকে আত্মরক্ষা: আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন—«إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَىٰ عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ» (নিশ্চয়ই সালাত মানুষকে অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে)। নিয়মিত সালাত মানুষের অন্তরে তাকওয়ার প্রাচীর গড়ে তোলে।
  • আত্মিক প্রশান্তি ও মানসিক দৃঢ়তা: পার্থিব জীবনের দুশ্চিন্তা, হতাশা ও অস্থিরতা দূর করে আত্মিক শান্তি লাভে সালাতের কোনো বিকল্প নেই। রাসুলুল্লাহ ﷺ সংকটকালে বলতেন—«أَرِحْنَا بِهَا يَا بِلَالُ» (হে বেলাল, সালাতের ইকামত দাও, আমাদের হৃদয়কে প্রশান্ত করো)।
  • শৃঙ্খলা ও সামাজিক সাম্যের অনুশীলন: দৈনিক পাঁচবার জামাতে সালাত আদায় ধনী-গরিবের ব্যবধান মিটিয়ে মুসলিম উম্মাহর মাঝে অভূতপূর্ব ঐক্য, শৃঙ্খলা ও সময়ানুবর্তিতা প্রতিষ্ঠা করে।

(ب) على من تجب الزكاة؟ أوضح إيضاحا تاما (যাদের ওপর জাকাত ফরজ)

শরিয়তের অকাট্য বিধান অনুযায়ী কোনো ব্যক্তির ওপর জাকাত ফরজ হওয়ার জন্য নিম্নোক্ত শর্তাবলি বিদ্যমান থাকা আবশ্যক:

  1. মুসলমান হওয়া (الإسلام): জাকাত একটি স্বতন্ত্র আর্থিক ইবাদত; অমুসলিমের ওপর জাকাত ফরজ নয়।
  2. স্বাধীন ও প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া (الحرية والبلوغ): ক্রীতদাসের নিজস্ব কোনো মালিকানা না থাকায় তার ওপর জাকাত নেই। প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী হওয়া হানাফী মাযহাব মতে ওয়াজিবের অন্যতম শর্ত।
  3. নেসাব পরিমাণ সম্পদের পূর্ণ মালিকানা (ملك النصاب ملكا تاما): নিত্যপ্রয়োজনীয় মৌলিক খরচ (হাওয়ায়েজে আসলিয়া) এবং ঋণ পরিশোধের অতিরিক্ত সম্পদ থাকতে হবে। রৌপ্যের হিসাবে ৫২.৫ তোলা রূপা অথবা স্বর্ণের হিসাবে ৭.৫ তোলা স্বর্ণ বা তার সমমূল্যের নগদ অর্থ/ব্যবসায়িক পণ্য থাকতে হবে।
  4. সম্পদ বর্ধনশীল হওয়া (النماء): সম্পদটি বাস্তবে বা অনুমানে বর্ধনশীল হতে হবে, যেমন গবাদি পশু, নগদ অর্থ ও বাণিজ্যিক পণ্যদ্রব্য।
  5. এক বছর পূর্ণ হওয়া (حولان الحول): নেসাব পরিমাণ উদ্বৃত্ত সম্পদের ওপর পূর্ণ এক চান্দ্র বছর অতিবাহিত হওয়া আবশ্যক (لا زكاة في مال حتى يحول عليه الحول)।

٧- قوله تعالى: وَلَقَدْ آتَيْنَا لُقْمَانَ الْحِكْمَةَ أَنِ اشْكُرْ لِلَّهِ وَمَن يَشْكُرْ فَإِنَّمَا يَشْكُرُ لِنَفْسِهِ وَمَن كَفَرَ فَإِنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ حَمِيدٌ – وَإِذْ قَالَ لُقْمَانُ لِابْنِهِ وَهُوَ يَعِظُهُ يَا بُنَيَّ لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ

(ক) আয়াতদ্বয়ের প্রাঞ্জল বাংলা অনুবাদ

“আর আমি অবশ্যই লুকমানকে হিকমত (প্রজ্ঞা) দান করেছিলাম এই মর্মে যে, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো। আর যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, সে তো তা নিজের কল্যাণের জন্যই করে; আর যে অকৃতজ্ঞ হয়, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ অভাবমুক্ত, প্রশংসিত। আর স্মরণ করো, যখন লুকমান উপদেশচ্ছলে তার পুত্রকে বলেছিল—হে বৎস! আল্লাহর সাথে শরিক কোরো না; নিশ্চয়ই শিরক হলো সবচেয়ে বড় জুলুম।” [সূরা লুকমান: ১২-১৩]

(الف) اكتب نبذة من حياة لقمان عليه السلام بالإيجاز (হযরত লুকমান আ.-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী)

হযরত লুকমান (আ.) ছিলেন ইতিহাসের এক পরম স্মরণীয় প্রজ্ঞাবান ও আদর্শ চরিত্র:

  • পরিচয় ও বংশধারা: অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে তিনি ছিলেন আবিসিনীয় (হাবশি) বংশোদ্ভূত এক কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি। তিনি মিসর ও আরবের মধ্যবর্তী অঞ্চলে বসবাস করতেন এবং বনী ইসরাইলের যুগে দাউদ (আ.)-এর সমসাময়িক ছিলেন।
  • নবুয়ত বনাম হিকমত: জমহুর আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আলেমদের সর্বসম্মত অভিমত হলো—তিনি নবী ছিলেন না, বরং ছিলেন অত্যন্ত উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ওলী, মুত্তাকী এবং প্রজ্ঞাবান দার্শনিক (حكيم من الحكماء)। আল্লাহ তাআলা তাঁকে বিশেষ ‘হিকমত’ বা তত্ত্বজ্ঞান দান করেছিলেন।
  • পেশা ও জীবিকা: ঐতিহাসিক বর্ণনামতে তিনি কাঠমিস্ত্রি বা মেষপালক ছিলেন। তাঁর সত্যবাদিতা, আমানতদারী, অপ্রয়োজনীয় কথা বর্জন এবং আল্লাহর প্রতি পরম নির্ভরতার কারণে আল্লাহ তাঁকে সর্বোচ্চ প্রজ্ঞার ভূষণে ভূষিত করেন। কুরআনে তাঁর নামে একটি পূর্ণাঙ্গ সূরার নামকরণ করা হয়েছে।

(ب) اكتب وصايا لقمان عليه السلام لابنه موجزا (পুত্রের প্রতি হযরত লুকমানের উপদেশমালার সারসংক্ষেপ)

সূরা লুকমানে বর্ণিত তাঁর অমর নসিহতসমূহ ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবন গঠনের কালজয়ী পাথেয়:

  1. তাওহিদ প্রতিষ্ঠা ও শিরক বর্জন: উপদেশমালার শুরুতেই তিনি শিরক থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশ দেন, কারণ শিরক হলো স্রষ্টার হকের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অন্যায় (إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ)।
  2. আল্লাহর সর্বব্যাপী জ্ঞানের প্রতি ভয়: কোনো বস্তু যদি সরিষার দানার মতোও ক্ষুদ্র হয় এবং তা আসমান, জমিন বা শক্ত পাথরের ভেতরেও লুকিয়ে থাকে—আল্লাহ তা হাশরের ময়দানে উপস্থিত করবেন।
  3. সালাত কায়েম করা (أَقِمِ الصَّلَاةَ): নিয়মিত নিষ্ঠার সাথে আল্লাহর বন্দেগী করা।
  4. সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ (وَأْمُرْ بِالْمَعْرُوفِ وَانْهَ عَنِ الْمُنكَرِ): সমাজের অন্যায়ের বিরুদ্ধে ভূমিকা রাখা।
  5. বিপদে ধৈর্যধারণ (وَاصْبِرْ عَلَىٰ مَا أَصَابَكَ): দ্বীনের পথে যেকোনো কষ্ট-মুসিবত এলে সবর করা।
  6. অহংকার বর্জন ও বিনম্র আচরণ: মানুষের দিক থেকে অবজ্ঞায় মুখ ফিরিয়ে না নেওয়া, অহংকারভরে না হাঁটা এবং কণ্ঠস্বর সংযত ও নিচু রাখা (وَاقْصِدْ فِي مَشْيِكَ وَاغْضُضْ مِن صَوْتِكَ)।

٨- قوله تعالى: مَّا جَعَلَ اللَّهُ لِرَجُلٍ مِّن قَلْبَيْنِ فِي جَوْفِهِ وَمَا جَعَلَ أَزْوَاجَكُمُ اللَّائِي تُظَاهِرُونَ مِنْهُنَّ أُمَّهَاتِكُمْ وَمَا جَعَلَ أَدْعِيَاءَكُمْ أَبْنَاءَكُمْ ذَٰلِكُمْ قَوْلُكُم بِأَفْوَاهِكُمْ وَاللَّهُ يَقُولُ الْحَقَّ وَهُوَ يَهْدِي السَّبِيلَ

(ক) আয়াতের প্রাঞ্জল বাংলা অনুবাদ

“আল্লাহ কোনো মানুষের অভ্যন্তরে দুটি হৃদয় সৃষ্টি করেননি; আর তোমাদের যেসব স্ত্রীর সাথে তোমরা ‘যিহার’ (মায়ের পিঠের সাথে তুলনা) করো, তাদের তিনি তোমাদের গর্ভধারিনী মা বানাননি; এবং তোমাদের পোষ্যপুত্রদেরকে তিনি তোমাদের প্রকৃত পুত্র বানাননি। এগুলো তোমাদের মুখের কথা মাত্র; আর আল্লাহ সত্য কথাই বলেন এবং তিনিই সঠিক পথ প্রদর্শন করেন।” [সূরা আল-আহযাব: ৪]

(الف) اكتب سبب نزول الآية (আয়াতটির শানে নুযুল)

জাহেলি যুগের তিনটি ভিত্তিহীন সামাজিক কুসংস্কার ও কুপ্রথা মূলোৎপাটনের লক্ষ্যে এই আয়াত অবদ্বতীর্ণ হয়:

  • জামীল ইবনে মা’মারের ঘটনা (দুই হৃদয়ের দাবি): কুরাইশ বংশের এক চতুর ব্যক্তি জামীল ইবনে মা’মার ফিহরী দাবি করত যে, তার বক্ষের ভেতরে দুটি হৃদয় বা ব্রেন রয়েছে, যার একটি দিয়ে সে গোটা বিশ্ব এবং অন্যটি দিয়ে মুহাম্মদ ﷺ-এর চেয়েও বেশি চিন্তা করতে পারে। মক্কার অজ্ঞ মুশরিকরাও তাকে ‘যুল কালবাইন’ (দুই হৃদয়ের অধিকারী) বলত। আল্লাহ তাআলা এই অমূলক অহংকার চূর্ণ করে জানালেন—মানুষের দেহে একটিমাত্র অন্তঃকরণ থাকে।
  • যিহার প্রথাকে চিরতরে বাতিল করা: জাহেলি যুগে স্বামীরা স্ত্রীর সাথে রাগ করে বলত “তুমি আমার কাছে আমার মায়ের পিঠের মতো”—আর এতেই স্ত্রীকে চিরতরে হারাম ও তালাকপ্রাপ্তা মনে করা হতো। আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করলেন, কেবল মুখের কথায় কোনো স্ত্রী গর্ভধারিণী মা হয়ে যায় না।
  • পালক পুত্রের মর্যাদা স্পষ্টকরণ: আরবরা দত্তক বা পালকপুত্রকে নিজের ঔরসজাত সন্তানের মতো উত্তরাধিকারী ও সমস্ত সম্পর্কের হকদার মনে করত। রাসুলুল্লাহ ﷺ হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা (রা.)-কে অত্যন্ত স্নেহ করায় লোকেরা তাঁকে ‘যায়েদ ইবনে মুহাম্মদ’ ডাকত। আল্লাহ এই প্রথা রদ করে নির্দেশ দিলেন যে, পালক সন্তান কখনো রক্ত সম্পর্কের ঔরসজাত পুত্র হতে পারে না।

(ب) عرف الظهار؟ وما حكم الظهار؟ (যিহারের সংজ্ঞা ও শরয়ি হুকুম)

১. যিহারের সংজ্ঞা (تعريف الظهار):

শব্দমূল: এটি ‘যাহর’ (الظَّهْرُ) শব্দ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ পিঠ।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: কোনো স্বামী কর্তৃক নিজের বৈধ স্ত্রীকে এমন কোনো নারীর সাথে বা নারীর এমন কোনো অঙ্গের সাথে তুলনা করা, যা তার জন্য আজীবনের জন্য বিবাহ হারাম (যেমন: মা, বোন, দুধমা বা খালা)। যেমন বলা: “তুমি আমার জন্য আমার মায়ের পিঠের ন্যায়” (أَنْتِ عَلَيَّ كَظَهْرِ أُمِّي)।

২. যিহারের শরয়ি হুকুম ও কাফফারা (حكم الظهار):

ইসলামী শরিয়তে যিহার করা একটি কবিরা গুনাহ এবং অন্যায় মিথ্যা বাক্য (مُنكَرًا مِّنَ الْقَوْلِ وَزُورًا)। যিহার সংঘটিত হওয়ার পর তার হুকুম নিম্নরূপ:

  • শারীরিক মেলামেশা হারাম: যিহারকারী স্বামীর জন্য কাফফারা আদায় না করা পর্যন্ত স্ত্রীর সাথে সহবাস বা যেকোনো ধরনের শারীরিক ঘনিষ্ঠতা সম্পূর্ণরূপে হারাম।
  • যিহারের নির্ধারিত কাফফারা (সূরা মুজাদালাহ: ৩-৪): স্ত্রীকে পুনরায় স্পর্শ করার পূর্বে ক্রমানুসারে নিম্নোক্ত কাফফারা আদায় করতে হবে:
    1. একজন দাস বা দাসী মুক্ত করা (বর্তমানে অপ্রচলিত)।
    2. তাতে অপারগ হলে বিরতিহীনভাবে একটানা ৬০টি (দুই মাস) রোজা রাখা (فَصِيَامُ شَهْرَيْنِ مُتَتَابِعَيْنِ)।
    3. বার্ধক্য বা অসুস্থতার কারণে রোজা রাখতে অক্ষম হলে ৬০ জন মিসকিনকে দুই বেলা তৃপ্তিসহকারে খাবার খাওয়ানো (فَإِطْعَامُ سِتِّينَ مِسْكِينًا)।
  • কাফফারা পূর্ণাঙ্গরূপে আদায়ের পরই স্ত্রীর সাথে দাম্পত্য সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করা বৈধ হবে।

٩- قوله تعالى: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُقَدِّمُوا بَيْنَ يَدَيِ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ – يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَرْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ وَلَا تَجْهَرُوا لَهُ بِالْقَوْلِ كَجَهْرِ بَعْضِكُمْ لِبَعْضٍ أَن تَحْبَطَ أَعْمَالُكُمْ وَأَنتُمْ لَا تَشْعُرُونَ

(ক) আয়াতদ্বয়ের প্রাঞ্জল বাংলা অনুবাদ

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সামনে অগ্রবর্তী হইয়ো না এবং আল্লাহকে ভয় করো; নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। হে ঈমানদারগণ! তোমরা নবীর কণ্ঠস্বরের ওপর নিজেদের কণ্ঠস্বর উঁচু কোরো না এবং নিজেদের মধ্যে পরস্পরের সাথে যেভাবে উচ্চৈঃস্বরে কথা বলো, তাঁর সাথে সেভাবে উচ্চৈঃস্বরে কথা বোলো না; যাতে তোমাদের অজান্তেই তোমাদের সমস্ত নেক আমল বিনষ্ট হয়ে না যায়।” [সূরা আল-হুজুরাত: ১-২]

(الف) بين سبب نزول الآيتين (উক্ত আয়াতদ্বয়ের শানে নুযুল)

সহিহ বুখারীতে হযরত ইবনে আবি মুলাইকা (রহ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন—নিকটবর্তী ছিল যে দুই শ্রেষ্ঠ সাহাবী আবু বকর ও উমর (রা.) ধ্বংস হয়ে যেতেন:

  • বনু তামীম প্রতিনিধি দলের ঘটনা: নবম হিজরীতে বনু তামীম গোত্রের এক প্রতিনিধি দল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে আগমন করল। তাদের ওপর কাকে গভর্নর বা নেতা নিযুক্ত করা হবে—এ বিষয়ে আলোচনা হচ্ছিল।
  • আবু বকর ও উমর (রা.)-এর মতানৈক্য: হযরত আবু বকর (রা.) পরামর্শ দিলেন কা’কা’ ইবনে মা’বাদকে নেতা বানানোর জন্য। পক্ষান্তরে হযরত উমর (রা.) প্রস্তাব করলেন আকরা ইবনে হাবিসকে দায়িত্ব দেওয়ার জন্য।
  • কণ্ঠস্বর উচ্চ হওয়া: পরামর্শের একপর্যায়ে উভয়ের মধ্যে মতভেদ তীব্র হয়ে উঠল এবং রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর উপস্থিতিতেই তাঁদের কণ্ঠস্বর কিছুটা উঁচু হয়ে গেল। আবু বকর (রা.) উমর (রা.)-কে বললেন, “তুমি কেবল আমার বিরোধিতা করতেই চেয়েছ!” উমর (রা.) বললেন, “আমি আপনার বিরোধিতা করতে চাইনি।” দরবারে নববীতে এই উচ্চকণ্ঠের প্রেক্ষাপটেই আল্লাহ তাআলা মুমিনদের শিষ্টাচার শিক্ষা দিয়ে এই আয়াত অবতীর্ণ করেন। এর পর থেকে উমর (রা.) রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সামনে এত মৃদু স্বরে কথা বলতেন যে রাসুলকে পুনরাবৃত্তি শুনতে হতো।

(ب) تحدث عن الآداب مع النبي عليه السلام (রাসূলে কারীম ﷺ-এর প্রতি প্রদর্শনের শিষ্টাচার)

পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সাথে মুমিনের আচরণীয় অপরিহার্য আদবসমূহ নিম্নরূপ:

  1. চূড়ান্ত আনুগত্য ও অগ্রাধিকার প্রদান: কোনো বিষয়ে নিজের রায় বা মতকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ফায়সালার ওপরে স্থান না দেওয়া (لَا تُقَدِّمُوا بَيْنَ يَدَيِ اللَّهِ وَرَسُولِهِ)। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে নবীর সুন্নাতকে চূড়ান্ত মানদণ্ড মানা।
  2. কণ্ঠস্বর নিচু রাখা ও পরম সমীহ প্রদর্শন: তাঁর উপস্থিতিতে উচ্চৈঃস্বরে কথা না বলা এবং তাঁর পবিত্র নাম ধরে সাধারণ মানুষের মতো না ডাকা (যেমন ‘হে মুহাম্মদ’ না বলে ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ’ বা ‘ইয়া নাবীয়্যাল্লাহ’ বলা)।
  3. অফুরন্ত ভালোবাসা ও দরূদ পাঠ: নিজের জান, মাল, পিতা-মাতা ও সন্তান-সন্ততির চেয়ে রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে অধিক ভালোবাসা এবং তাঁর নাম উচ্চারিত হলে শ্রদ্ধার সাথে দরূদ ও সালাম পেশ করা।
  4. ওফাতোত্তর সম্মান প্রদর্শন: ওফাতের পরেও তাঁর হাদিসের সামনে মাথা নত করা, তাঁর রওজা মুবারক জিয়ারতের সময় নীরবতা ও চরম আদব বজায় রাখা এবং তাঁর পরিবারবর্গ (আহলে বাইত) ও সাহাবায়ে কিরামকে গভীর শ্রদ্ধা করা।

١٠- قوله تعالى: وَإِن طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا فَإِن بَغَتْ إِحْدَاهُمَا عَلَى الْأُخْرَىٰ فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّىٰ تَفِيءَ إِلَىٰ أَمْرِ اللَّهِ فَإِن فَاءَتْ فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا بِالْعَدْلِ وَأَقْسِطُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ – إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ

(ক) আয়াতদ্বয়ের প্রাঞ্জল বাংলা অনুবাদ

“আর মুমিনদের দুটি দল যদি পরস্পরে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়, তবে তোমরা তাদের মাঝে মীমাংসা করে দাও। অতঃপর যদি তাদের একটি দল অপর দলের ওপর বাড়াবাড়ি বা সীমালঙ্ঘন করে, তবে যে দলটি সীমালঙ্ঘন করে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো, যে পর্যন্ত না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। অতঃপর যদি তারা ফিরে আসে, তবে তাদের মধ্যে ন্যায়পরায়ণতার সাথে মীমাংসা করো এবং সুবিচার করো; নিশ্চয়ই আল্লাহ সুবিচারকারীদের ভালোবাসেন। মুমিনরা তো পরস্পর ভাই ভাই; সুতরাং তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মাঝে সমঝোতা স্থাপন করো এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও।” [সূরা আল-হুজুরাত: ৯-১০]

(الف) اكتب سبب نزول الآية (আয়াতটির শানে নুযুল)

ইমাম বুখারী ও মুসলিম হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন:

  • একদা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি গাধায় আরোহণ করে মুনাফিক নেতা আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের নিকট গমন করেন। গাধাটি অতিক্রম করার সময় ইবনে উবাই নাক চেপে ধরে অবজ্ঞার সাথে বলল, “আমার কাছ থেকে দূরে থাকুন, আল্লাহর কসম আপনার গাধার দুর্গন্ধ আমাকে কষ্ট দিচ্ছে।”
  • এ কথা শুনে এক আনসারী সাহাবী বললেন, “আল্লাহর কসম! রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর গাধার ঘ্রাণ তোমার চেয়ে অনেক বেশি পবিত্র ও সুবাসিত।” এতে ইবনে উবাইয়ের গোত্র (খাযরাজ) এবং ওই সাহাবীর গোত্র (আউস)-এর মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
  • উভয় পক্ষ খেজুরের ডাল, জুতো ও হাতাহাতি নিয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে পড়ে। তৎক্ষণাৎ রাসুলুল্লাহ ﷺ তাদের মাঝে উপস্থিত হয়ে বিবাদ নিরসন করেন এবং পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও ন্যায়বিচারের রূপরেখা দিয়ে এই আয়াত নাজিল হয়।

(ب) ما معنى الباغي؟ هل الباغي مؤمن أم لا؟ بين كيفية اصلاح الاختلافات فيما بين المسلمين (বাগীর সংজ্ঞা, তার ঈমানি অবস্থান ও মুসলিম বিরোধ নিষ্পত্তির পদ্ধতি)

১. বাগীর সংজ্ঞা (تعريف الباغي):

ফিকহের পরিভাষায় ‘বাগী’ (الْبَاغِي) বলা হয় এমন কোনো বিদ্রোহী দলকে—যারা কোনো অপব্যাখ্যা বা ভ্রান্ত ধারণার ওপর নির্ভর করে বৈধ মুসলিম রাষ্ট্রনায়ক বা ন্যায়নিষ্ঠ ইমামের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করে আনুগত্য ত্যাগ করে।

২. বাগী কি মুমিন? (هل الباغي مؤمن أم لا؟):

হ্যাঁ, বাগী মুসলমান ও মুমিন। স্বয়ং আল্লাহ তাআলা আয়াতে ইরশাদ করেছেন—«وَإِن طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا» (মুমিনদের দুটি দল যদি দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়)। পারস্পরিক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সত্ত্বেও আল্লাহ তাদের ঈমান থেকে খারিজ করেননি, বরং পরবর্তী আয়াতে তাদের ‘পরস্পর ভাই’ (إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ) আখ্যায়িত করেছেন। হযরত আলী (রা.)-কে সিফফীন ও জামালের বিদ্রোহীদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেছিলেন, “তারা কি কাফের? তিনি বললেন: না, তারা তো কুফর থেকে বাঁচার জন্যই পালিয়ে এসেছে। বলা হলো: তবে কি তারা মুনাফিক? তিনি বললেন: মুনাফিকরা তো খুব কমই আল্লাহর স্মরণ করে, আর এরা তো দিন-রাত স্মরণ করে। বলা হলো: তবে তারা কারা? আলী (রা.) বললেন: তারা আমাদেরই ভাই, যারা আমাদের বিরুদ্ধে সীমালঙ্ঘন (বাগাওয়াত) করেছে।”

৩. মুসলিমদের পারস্পরিক বিরোধ নিষ্পত্তির কুরআনিক কর্মপদ্ধতি:
  1. প্রাথমিক সালিস ও সমঝোতা: নিরপেক্ষ মুসলিম নেতৃবৃন্দ বিবাদমান উভয় পক্ষকে ডেকে কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে শান্তিপূর্ণ আপস-মীমাংসা করে দেবেন।
  2. সীমাবদ্ধ শক্তির প্রয়োগ: যদি একটি দল আপস প্রত্যাখ্যান করে অন্যায় আক্রমণ জারি রাখে, তবে সমস্ত মুসলিম সমাজ সম্মিলিতভাবে সেই বিদ্রোহী দলের আগ্রাসন প্রতিহত করতে শক্তি প্রয়োগ করবে, যতক্ষণ না তারা আল্লাহর হুকুম ও ন্যায়ের পথে ফিরে আসে।
  3. শাস্তির সীমারক্ষা: বিদ্রোহীদের বন্দীদের হত্যা করা যাবে না, পলায়নকারীদের পিছু ধাওয়া করে হত্যা করা যাবে না এবং তাদের সম্পদ গনিমত হিসেবে দখল করা যাবে না।
  4. ন্যায়ের ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন: যখন তারা আনুগত্য স্বীকার করবে, তখন কোনো প্রকার পক্ষপাতিত্ব ছাড়া ইনসাফের সাথে বিবাদের চূড়ান্ত সমাধান করে দিতে হবে।

مجموعة (ب) : مناهج المفسرين ودراسة كتب أحكام القرآن (গ্রুপ ‘খ’ – মুফাসসিরদের পদ্ধতি ও আহকামুল কুরআন শাস্ত্রের গ্রন্থ পরিচিতি)

[الملاحظة: أجب عن سؤال واحد من هذه المجموعة. الدرجات: ১ × ১০ = ১০]
(উচ্চতর নম্বর প্রাপ্তি ও পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনার সুবিধার্থে গ্রুপ ‘খ’-এর উভয় প্রশ্নেরই বিস্তারিত একাডেমিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হলো।)


١١- اكتب خصائص “الجامع لأحكام القرآن للقرطبي” ومناهج تأليفه موضحا (ইমাম কুরতুবীর ‘আল-জামি লি আহকামিল কুরআন’-এর বৈশিষ্ট্য ও সংকলন পদ্ধতি)

১. গ্রন্থ ও গ্রন্থকারের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি:

গ্রন্থকার হলেন আন্দালুসের বিখ্যাত মুফাসসির ও ফকীহ ইমাম আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে আহমাদ আল-কুরতুবী (মৃত্যু: ৬৭১ হি.)। তাঁর রচিত “الْجَامِعُ لِأَحْكَامِ الْقُرْآنِ وَالْمُبَيِّنُ لِمَا تَضَمَّنَهُ مِنَ السُّنَّةِ وَآيِ الْفُرْقَانِ” তাফসির ও আহকামুল কুরআন সাহিত্যের এক অবিসংবাদিত শ্রেষ্ঠ বিশ্বকোষীয় গ্রন্থ।

২. তাফসিরে কুরতুবীর সংকলন পদ্ধতি (مناهج تأليفه):

ইমাম কুরতুবী তাঁর তাফসিরের ভূমিকায় একটি অত্যন্ত চমৎকার ও সুশৃঙ্খল বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির রূপরেখা তুলে ধরেছেন:

  • আয়াতভিত্তিক মাসআলা নির্ধারণ: তিনি প্রতিটি সুরার আয়াতসমূহ উল্লেখ করে সেগুলোর অধীনে সংশ্লিষ্ট ফিকহি আহকামকে সুনির্দিষ্ট সংখ্যায় (المسألة الأولى، المسألة الثانية) ভাগ করে আলোচনা করেন।
  • শব্দার্থ ও ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: আররি ব্যাকরণ (নাহু ও সরফ), অলঙ্কারশাস্ত্র (বালাগাত) এবং জাহেলি যুগের প্রামাণ্য আরবী কবিতা (শাওয়াহিদ) উদ্ধৃত করে আয়াতের শব্দের নিখুঁত বুৎপত্তিগত বিশ্লেষণ করেন।
  • কেরাত শাস্ত্রের সমাহার: মুতাওয়াতির ও মশহুর কেরাতসমূহ উল্লেখ করে কোন কেরাতের কারণে ফিকহি অর্থে কী বৈচিত্র্য সৃষ্টি হয় তা চমৎকারভাবে তুলে ধরেন।
  • হাদিসের প্রামাণিকতা ও তাকরীজ: কেবল সহিহ ও হাসান হাদিসের ওপর নির্ভর করেন এবং সনদের বিশুদ্ধতার ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক থাকেন।

৩. গ্রন্থের অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ (خصائص التفسير):

  1. মাযহাবি গোঁড়ামিমুক্ত উদারতা (الإنصاف الفقهي): যদিও ইমাম কুরতুবী ব্যক্তিগতভাবে মালিকী মাযহাবের অনুসারী ছিলেন, কিন্তু তাফসিরের ক্ষেত্রে তিনি কোনো অন্ধ পক্ষপাতিত্ব করেননি। যদি কোনো মাসআলায় হানাফী বা শাফেয়ী মাযহাবের দলিল অধিক শক্তিশালী মনে হতো, তবে তিনি অকপটে মালিকী মত ছেড়ে সেই দলিলভিত্তিক মতকে প্রাধান্য দিতেন।
  2. ইসরাঈলিয়্যাত ও অবাস্তব কাহিনীর তীব্র খণ্ডন: অধিকাংশ প্রাচীন তাফসির গ্রন্থে ইসরাঈলি রূপকথার ছড়াছড়ি থাকলেও ইমাম কুরতুবী এগুলো কঠোরভাবে পরিহার করেছেন এবং ভিত্তিহীন কিসসা-কাহিনীর কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
  3. বাতিল ফিরকা ও বিদআতের জবাব: মুতাযিলা, কাদারিয়া, জাহমিয়া ও বাতেনিয়াদের কুরআন বিকৃতির যুক্তি খণ্ডন করে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদা প্রতিষ্ঠা করেছেন।
  4. সমকালীন সামাজিক সংস্কার: তিনি কেবল পুথিগত ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং সমাজের অনৈতিকতা ও রাজন্যবর্গের জুলুমের বিরুদ্ধে কুরআনি আহকামের বিপ্লবী প্রয়োগ তুলে ধরেছেন।

١٢- اكتب نبذة من حياة ابن العربى ومزايا احكام القران له (আল্লামা ইবনুল আরাবীর সংক্ষিপ্ত জীবনী ও ‘আহকামুল কুরআন’ গ্রন্থের অনন্য বৈশিষ্ট্য)

১. আল্লামা কাযী আবু বকর ইবনুল আরাবীর সংক্ষিপ্ত জীবনী:

  • নাম ও বংশপরিচয়: তাঁর নাম মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আরাবী আল-মা’আফিরী আল-আন্দালুসী আল-ইশবীলী। তিনি মালেকী মাযহাবের শীর্ষস্থানীয় ইমাম ও কাজী ছিলেন (উল্লেখ্য, তিনি সুফি মুহিউদ্দীন ইবনুল আরাবী নন, যিনি ভিন্ন ব্যক্তি)।
  • জন্ম ও শিক্ষা সফর: তিনি ৪৬৮ হিজরীতে আন্দালুসের সেভিলে (ইশবিলিয়াহ) জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জ্ঞানের অন্বেষণে পিতা সহ শাম, মিশর, বাগদাদ ও হিজায সফর করেন। তিনি ইমাম গাজ্জালী, আবু বকর আশ-শাশী ও তূরতূশীর মতো যুগশ্রেষ্ঠ মনীষীদের সান্নিধ্য লাভ করেন।
  • কর্মজীবন ও বিচারকার্য: স্বদেশে ফিরে তিনি সেভিলের প্রধান বিচারক (কাজী) নিযুক্ত হন। তিনি ন্যায়ের প্রশ্নে ছিলেন আপসহীন। ৫৪৩ হিজরীতে মরক্কোর ফেজ শহরে তিনি ইন্তেকাল করেন।

২. ‘আহকামুল কুরআন’ গ্রন্থের অনন্য বৈশিষ্ট্য ও শৈলী (مزايا كتاب أحكام القرآن):

কাযী ইবনুল আরাবীর ‘আহকামুল কুরআন’ ফিকহুল কুরআন সাহিত্যের অন্যতম প্রধান প্রাচীন মৌলিক উৎস:

  1. সুনির্দিষ্ট সুরা ও আয়াত বিন্যাস: তিনি পুরো কুরআনের সমস্ত আয়াতের সাধারণ তাফসির করেননি, বরং যেসব সুরায় কোনো আদেশ, নিষেধ বা আইনগত বিধিবিধান (আহকাম) রয়েছে—ধারাবাহিকভাবে কেবল সেসব সূরার বিধানসংবলিত আয়াতসমূহ একত্রিত করেছেন।
  2. অধ্যায়ভিত্তিক সুবিন্যস্ত মাসআলা: প্রতিটি আয়াত থেকে উৎসারিত ব্যবহারিক ও তাত্ত্বিক মাসআলাগুলোকে ক্রমানুসারে (مسألة ১, ২, ৩…) অত্যন্ত সুচারুভাবে বিশ্লেষণ করেছেন।
  3. তুলনামূলক ফিকহি বিশ্লেষণ (الفقه المقارن): বিভিন্ন মাযহাবের (বিশেষ করে হানাফী, শাফেয়ী ও হাম্বলী) ফিকহি দলিলসমূহ বিস্তারিত পর্যালোচনা করে মালিকী মাযহাবের প্রাধান্য ও যৌক্তিকতা নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন।
  4. ভাষাতাত্ত্বিক ও উসূলি গভীরতা: আররি ভাষার বিশুদ্ধ ব্যাকরণ ও উসূলে ফিকহের মূলনীতি প্রয়োগ করে কীভাবে আয়াত থেকে হুকুম ইস্তিম্বাত (নিষ্কাশন) করতে হয়, তার চমৎকার প্রদর্শনী করেছেন।
  5. কঠোর নিরপেক্ষ সমালোচনা: কোনো ফকিহ বা মুফাসসিরের ব্যাখ্যা দুর্বল হলে অত্যন্ত যুক্তিগ্রাহ্য ও বলিষ্ঠ ভাষায় তার ত্রুটি চিহ্নিত করেছেন।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. ফাজিল ৪র্থ বর্ষের أحكام القرآن (আহকামুল কুরআন) বিষয়ের কোড ও সিলেবাস কাঠামো কী?

ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কারিকুলামে ফাজিল ৪র্থ বর্ষের أحكام القرآن পরীক্ষার বিষয় কোড হলো ২০১৮০২ (পরীক্ষা কোড ২০৮, প্রশ্নপত্র কোড ১১২)। এই কোর্সে নির্দিষ্ট সূরার আহকামভিত্তিক আয়াতের ফিকহি ও শাব্দিক ব্যাখ্যা এবং তাফসির ও আহকামুল কুরআন সাহিত্যের বিখ্যাত কিতাবসমূহ অন্তর্ভুক্ত থাকে।

২. অপবাদ আরোপকারী (কযফ) তওবা করলে আদালতে তার সাক্ষ্য গ্রহণের বিধান কী?

ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে কযফের শাস্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তি খাঁটি তওবা করলেও আজীবনের জন্য আদালতে তার সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে না। তবে ইমাম মালিক, শাফেয়ী ও আহমাদ বিন হাম্বল (রহ.)-এর মতে তওবা ও আত্মসংশোধনের পর তার সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে।

৩. ইসলামি আইনে ‘যিহার’ (الظِّهَار)-এর নির্ধারিত কাফফারা কী?

যিহারের কাফফারা ক্রমানুসারে তিনটি: প্রথমে দাস মুক্ত করা; তা সম্ভব না হলে একটানা বিরতিহীনভাবে ৬০টি রোজা রাখা; আর বার্ধক্য বা অসুস্থতার কারণে রোজা রাখতে অক্ষম হলে ৬০ জন মিসকিনকে পূর্ণ পেট তৃপ্তিসহ দুই বেলা আহার করানো। কাফফারা সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত স্ত্রীর সাথে শারীরিক মিলন সম্পূর্ণ হারাম।

৪. কুরআনের দৃষ্টিতে ‘বাগী’ (বিদ্রোহী) দলের সাথে যুদ্ধের বিধান কী এবং তারা কি মুমিন?

কুরআনের সূরা হুজুরাতের ৯ নম্বর আয়াত অনুযায়ী বাগী দল সশস্ত্র বিদ্রোহ ও সীমালঙ্ঘন করলে তাদের প্রতিরোধে শক্তি প্রয়োগ করা ওয়াজিব। তবে তারা কাফের নয়, বরং মুসলমান ও ভাই হিসেবে গণ্য; তাদের বন্দীদের বা পলায়মানদের হত্যা করা ও সম্পদ দখল করা বৈধ নয়।

৫. ইমাম কুরতুবীর ‘আল-জামি লি আহকামিল কুরআন’-এর প্রধান অনন্য বৈশিষ্ট্য কী?

তাফসিরে কুরতুবীর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি মাযহাবি গোঁড়ামিমুক্ত একটি বিশ্বকোষীয় তাফসির। মালিকী মাযহাবের আলেম হওয়া সত্ত্বেও ইমাম কুরতুবী দলিলের ভিত্তিতে অন্যান্য মাযহাবের মতকে অকপটে প্রাধান্য দিতেন এবং ইসরাঈলি রূপকথা কঠোরভাবে বর্জন করেছেন।

৬. কাযী আবু বকর ইবনুল আরাবীর ‘আহকামুল কুরআন’ গ্রন্থের মূল সংকলন কৌশল কী?

কাযী ইবনুল আরাবী পুরো কুরআনের সাধারণ তাফসির না করে শুধুমাত্র যেসব আয়াতে আইনি বিধিবিধান ও আহকাম রয়েছে, সেগুলোকে সুরাওয়ারি নির্বাচন করে প্রতিটি আয়াত থেকে যুক্তি ও উসূলে ফিকহের সাহায্যে সুনির্দিষ্ট সংখ্যায় মাসআলা বিন্যস্ত করে ব্যাখ্যা করেছেন।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন ➜