ফাযিল (স্নাতক) সম্মান ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা—২০২৩
বিভাগ: আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: আহকামুল কুরআন (أحكام القرآن)
বিষয় কোড: 201802 | প্রশ্নপত্র কোড: 112
পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
ইসলামিক আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ২০২৩ সালের ফাযিল (স্নাতক) সম্মান ৪র্থ বর্ষের আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অন্যতম মৌলিক ও ফিকহভিত্তিক প্রায়োগিক কোর্স হলো “আহকামুল কুরআন” (বিষয় কোড: 201802)। কুরআনুল কারীমের যেসকল আয়াতে হালাল-হারাম, ইবাদত, মুআমালাত, দণ্ডবিধি (হুদুদ ও কিসাস), পারিবারিক আইন ও নৈতিক অনুশাসন বর্ণিত হয়েছে, সেসকল আয়াতের আইনি তাৎপর্য ও ইজতিহাদী বিশ্লেষণই এই শাস্ত্রের প্রতিপাদ্য। ২০২৩ সালের এই প্রশ্নপত্রটিতে সূরা আল-আম্বিয়া, সূরা আল-হাজ্জ, সূরা আন-নূর, সূরা লুকমান, সূরা আল-আহযাব এবং সূরা আল-হুজুরাত-এর গুরুত্বপূর্ণ আহকাম সংবলিত আয়াতসমূহের অনুবাদ ও ব্যাখ্যার পাশাপাশি যাদু, ভ্রূণতত্ত্ব, কিয়ামত, যেনা ও অপবাদের শাস্তি, ইফকের ঘটনা, লোকমান হাকীমের উপদেশ, সালাত, পালক প্রথা, গীবত ও গোয়েন্দাগিরির হুকুম এবং ইমাম কুরতুবীর তাফসীর পদ্ধতির ওপর গভীর প্রশ্ন সন্নিবেশিত হয়েছে। নিচে প্রশ্নপত্রের গ্রুপ ‘ক’ ও গ্রুপ ‘খ’-এর অন্তর্ভুক্ত সকল ১২টি প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ ও অ্যাকাডেমিক সমাধান পরিবেশন করা হলো।
একনজরে প্রশ্নপত্রের রূপরেখা ও মানবণ্টন
| বিভাগ | মোট প্রশ্ন | উত্তর দিতে হবে | প্রতি প্রশ্নের মান | মোট নম্বর |
|---|---|---|---|---|
| مجموعة (أ) – গ্রুপ ‘ক’ (অনুবাদ ও সংশ্লিষ্ট প্রশ্নাবলি) | ১০টি | ৫টি | ১৪ (অনুবাদ ৬ + ক ৪ + খ ৪) | ৭০ |
| مجموعة (ب) – গ্রুপ ‘খ’ (তাত্ত্বিক ও বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন) | ২টি | ১টি | ১০ | ১০ |
| সর্বমোট | ১২টি | ৬টি | — | ৮০ |
مجموعة (أ) : গ্রুপ ‘ক’ (অনুবাদ ও সংশ্লিষ্ট ফিকহী প্রশ্নাবলি)
[যেকোনো পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। প্রতিটি প্রশ্নের পূর্ণমান ১৪ (অনুবাদ ৬ + ক ৪ + খ ৪)।]
١- قوله تعالى: ﴿اقْتَرَبَ لِلنَّاسِ حِسَابُهُمْ وَهُمْ فِي غَفْلَةٍ مُعْرِضُونَ – مَا يَأْتِيهِمْ مِنْ ذِكْرٍ مِنْ رَبِّهِمْ مُحْدَثٍ إِلَّا اسْتَمَعُوهُ وَهُمْ يَلْعَبُونَ – لَاهِيَةً قُلُوبُهُمْ وَأَسَرُّوا النَّجْوَى الَّذِينَ ظَلَمُوا هَلْ هَذَا إِلَّا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ أَفَتَأْتُونَ السِّحْرَ وَأَنْتُمْ تُبْصِرُونَ – قَالَ رَبِّي يَعْلَمُ الْقَوْلَ فِي السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ﴾ [الأنبياء: ١-٤]
(أ) ما معنى السحر لغة واصطلاحًا؟ أثبت بأن تعاطي السحر حرام-
(ب) من أول الأنبياء ومن سيد المرسلين؟ بين أسماء الأنبياء المذكورة في القرآن الكريم-
আয়াতসমূহের সরল ও প্রামাণ্য অনুবাদ
“মানুষের হিসাব-নিকাশের সময় সন্নিকটে এসে গেছে, অথচ তারা উদাসীনতায় মুখ ফিরিয়ে রয়েছে। (১) যখনই তাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে কোনো নতুন উপদেশ তাদের কাছে আসে, তারা তা কেবল খেল-তামাশার ছলে শ্রবণ করে। (২) তাদের অন্তরগুলো থাকে অমনোযোগী ও ক্রীড়ারত। আর এই জালেমরা গোপনে কানাঘুষা করে বলে: ‘এ তো তোমাদের মতোই একজন সাধারণ মানুষ ছাড়া আর কিছু নয়; তবে কি তোমরা দেখে-শুনে জাদুর কবলে পতিত হবে?’ (৩) নবী বললেন: ‘আমার প্রতিপালক আসমান ও জমিনের প্রতিটি কথাই অবগত আছেন; তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ’ (৪)।”
(ক) জাদুর শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ এবং যাদুচর্চা হারামের অকাট্য প্রমাণ
১. জাদুর শাব্দিক অর্থ: আরবি ‘আস-সিহর’ (السِّحْرُ) শব্দের মূল আভিধানিক অর্থ হলো এমন বিষয় যার কারণ বা উৎস অতীব সূক্ষ্ম, গোপন ও অদৃশ্য (ما دقّ ولطُف مأخذه وخفي سببه)। এছাড়া এর অর্থ প্রতারণা, দৃষ্টিবিভ্রম ও কোনো বস্তুর রূপ পরিবর্তন করা।
২. পারিভাষিক সংজ্ঞা: শরীয়তের পরিভাষায় ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী ও আল্লামা ইবনে কুদামাহ (রহ.) বলেন: «السحر: هو عزائم ورقى وكلام يُتكلم به أو يُكتب، يؤثر في بدن المسحور أو قلبه أو عقله من غير مباشرة» অর্থাৎ “যাদু হলো এমন কিছু চুক্তি, মন্ত্র, তন্ত্র, ফুঁক বা লিখিত তাবিজাত, যার দ্বারা শয়তানের সাহায্য নিয়ে প্রত্যক্ষ স্পর্শ ছাড়াই যাদুগ্রস্ত ব্যক্তির শরীর, অন্তর বা মস্তিস্কে অসুস্থতা, প্রেম-ভালোবাসা বা বিচ্ছেদ ঘটানো হয়।”
৩. যাদুচর্চা হারাম ও কুফরী হওয়ার দলীল: ইসলামি শরীয়তে যাদু শিক্ষা করা, যাদু করা এবং যাদুকরের কাছে যাওয়া সম্পূর্ণ হারাম ও কবিরা গুনাহ; অধিকাংশ ফকীহের মতে এটি স্পষ্ট কুফর।
- কুরআন মাজীদের দলীল: আল্লাহ তাআলা সুরা আল-বাকারার ১০২ নম্বর আয়াতে ইরশাদ করেন:
﴿وَمَا كَفَرَ سُلَيْمَانُ وَلَكِنَّ الشَّيَاطِينَ كَفَرُوا يُعَلِّمُونَ النَّاسَ السِّحْرَ﴾
অর্থ: “সুলাইমান কুফরী করেননি; বরং শয়তানরাই কুফরী করেছিল, তারা মানুষকে যাদু শিক্ষা দিত।” উক্ত আয়াতে আল্লাহ আরও বলেন: ﴿وَلَقَدْ عَلِمُوا لَمَنِ اشْتَرَاهُ مَا لَهُ فِي الْآخِرَةِ مِنْ خَلَاقٍ﴾ অর্থাৎ “তারা ভালোভাবেই জানত যে, যে ব্যক্তি যাদু ক্রয় (গ্রহণ) করে, পরকালে তার কোনো অংশ নেই।” - হাদিস শরীফের দলীল: রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:
«اجْتَنِبُوا السَّبْعَ الْمُوبِقَاتِ: الشِّرْكُ بِاللَّهِ، وَالسِّحْرُ…»
অর্থ: “তোমরা সাতটি ধ্বংসাত্মক মহাপাপ থেকে বেঁচে থাকো—আল্লাহর সাথে শিরক করা এবং যাদুচর্চা করা…” (সহীহ বুখারী: ২৭৬৬, সহীহ মুসলিম)। - ফিকহী হুকুম: চার মাযহাবের অধিকাংশ ইমামদের (হানাফী, মালেকী ও হাম্বলী) মতে যাদুকর যদি এমন কুফরী বাক্য দ্বারা যাদু করে তবে সে মুরতাদ ও কাফের হিসেবে গণ্য এবং ইসলামিক আদালতে তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।
(খ) প্রথম নবী ও শ্রেষ্ঠ রাসুলের পরিচয় এবং কুরআনে বর্ণিত পয়গম্বরগণের নাম
১. প্রথম নবী: মানবজাতির আদি পিতা হযরত আদম (আলাইহিস সালাম) হলেন পৃথিবীর সর্বপ্রথম মানব এবং সর্বপ্রথম নবী।
২. সাইয়্যিদুল মুরসালীন বা শ্রেষ্ঠ রাসুল: আখেরি জামানার নবী, বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হলেন সকল নবী ও রাসুলদের সর্বশ্রেষ্ঠ ইমাম ও সাইয়্যিদুল মুরসালীন। রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বয়ং ঘোষণা করেছেন: «أَنَا سَيِّدُ وَلَدِ آدَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلَا فَخْرَ» অর্থাৎ “কিয়ামতের দিন আমি আদম সন্তানের নেতা হব, এতে কোনো অহংকার নেই” (তিরমিযী: ৩১৪৮)।
৩. পবিত্র কুরআনে নাম উল্লিখিত ২৫ জন পয়গম্বর: পবিত্র কুরআনুল কারীমে সর্বমোট ২৫ জন নবী ও রাসুলের নাম স্পষ্টভাবে উল্লিখিত হয়েছে। তাঁরা হলেন:
- হযরত আদম (আ.)
- হযরত ইদরীস (আ.)
- হযরত নূহ (আ.)
- হযরত হূদ (আ.)
- হযরত সালেহ (আ.)
- হযরত ইব্রাহীম (আ.)
- হযরত লূত (আ.)
- হযরত ইসমাঈল (আ.)
- হযরত ইসহাক (আ.)
- হযরত ইয়াকূব (আ.)
- হযরত ইউসুফ (আ.)
- হযরত আইয়ূব (আ.)
- হযরত শুআইব (আ.)
- হযরত মূসা (আ.)
- হযরত হারূন (আ.)
- হযরত ইউনুস (আ.)
- হযরত দাউদ (আ.)
- হযরত সুলাইমান (আ.)
- হযরত ইলিয়াস (আ.)
- হযরত আল-ইয়াসা’ (আ.)
- হযরত যুলকিফল (আ.)
- হযরত যাকারিয়া (আ.)
- হযরত ইয়াহইয়া (আ.)
- হযরত ঈসা (আ.)
- হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)।
٢- قوله تعالى: ﴿يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنْ كُنْتُمْ فِي رَيْبٍ مِنَ الْبَعْثِ فَإِنَّا خَلَقْنَاكُمْ مِنْ تُرَابٍ ثُمَّ مِنْ نُطْفَةٍ ثُمَّ مِنْ عَلَقَةٍ ثُمَّ مِنْ مُضْغَةٍ مُخَلَّقَةٍ وَغَيْرِ مُخَلَّقَةٍ لِنُبَيِّنَ لَكُمْ وَنُقِرُّ فِي الْأَرْحَامِ مَا نَشَاءُ إِلَى أَجَلٍ مُسَمًّى ثُمَّ نُخْرِجُكُمْ طِفْلًا ثُمَّ لِتَبْلُغُوا أَشُدَّكُمْ وَمِنْكُمْ مَنْ يُتَوَفَّى وَمِنْكُمْ مَنْ يُرَدُّ إِلَى أَرْذَلِ الْعُمُرِ لِكَيْلَا يَعْلَمَ مِنْ بَعْدِ عِلْمٍ شَيْئًا وَتَرَى الْأَرْضَ هَامِدَةً فَإِذَا أَنْزَلْنَا عَلَيْهَا الْمَاءَ اهْتَزَّتْ وَرَبَتْ وَأَنْبَتَتْ مِنْ كُلِّ زَوْجٍ بَهِيجٍ﴾ [الحج: ٥]
(أ) بيّن مراحل خلق الإنسان في ضوء القرآن الكريم-
(ب) أوضح أطوار خلق الإنسان في ضوء علم الطب-
আয়াতটির সরল ও প্রামাণ্য অনুবাদ
“হে মানবজাতি! তোমরা যদি পুনরুত্থানের ব্যাপারে সন্দেহে থাক, তবে অনুধাবন কর—আমি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি, অতঃপর বীর্য থেকে, অতঃপর রক্তপিণ্ড থেকে, অতঃপর মাংসপিণ্ড থেকে যা সুগঠিতও হয় আবার অপরিপূর্ণও থাকে, যাতে আমি তোমাদের নিকট সত্য সুস্পষ্ট করি। আর আমি জরায়ুর মধ্যে যা ইচ্ছা এক নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত স্থিত রাখি, অতঃপর তোমাদেরকে শিশুরূপে বের করে আনি, যাতে তোমরা পূর্ণ যৌবনে উপনীত হও। তোমাদের কারো কারো মৃত্যু ঘটানো হয় এবং কাউকে কাউকে ফিরিয়ে নেওয়া হয় হীনতম বয়সে (বার্ধক্যে), যাতে সে যা জানত তার পর আর কিছুই স্মরণ রাখতে না পারে। আর তুমি জমিনকে শুষ্ক ও মৃত দেখতে পাও, অতঃপর যখনই আমি তাতে পানি বর্ষণ করি, অমনি তা আন্দোলিত ও স্ফীত হয় এবং তা থেকে সর্বপ্রকার চোখ জুড়ানো উদ্ভিদ উদ্গত হয়।”
(ক) পবিত্র কুরআনের আলোকে মানব সৃষ্টির বিভিন্ন পর্যায়
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা মানব সৃষ্টির প্রাথমিক সৃষ্টিতত্ত্ব এবং গর্ভকালীন বিকাশের ধারাবাহিক পর্যায়সমূহ অত্যন্ত চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন:
- তুরাব (تُرَاب – মাটি): সমগ্র মানবজাতির আদি পিতা হযরত আদম (আ.)-কে মাটি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। এছাড়া পরোক্ষভাবে মানুষের খাদ্য পুষ্টির মূল উৎস মাটি থেকে উৎপন্ন হয়।
- নুতফাহ (نُطْفَة – মিশ্রিত শুক্রবিন্দু): নর-নারীর মিলনে নিষিক্ত ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর সংমিশ্রণে সৃষ্ট বিন্দুমাত্র তরল।
- আলাক্বাহ (عَلَقَة – রক্তপিণ্ড বা জোঁকের মতো ঝুলন্ত বস্তু): জরায়ুর দেওয়ালে শক্তভাবে আটকে থাকা জোঁকসদৃশ রক্তপিণ্ড।
- মুদগাহ (مُضْغَة – চর্বিত মাংসপিণ্ড): এক লোকমা চিবানো মাংসের টুকরোর ন্যায় গঠন। কুরআনে একে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে—’মুখাল্লাক্বাহ’ (যেটির অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সুবিন্যস্তভাবে বিকাশ লাভ করে) এবং ‘গায়রু মুখাল্লাক্বাহ’ (যা পূর্ণাঙ্গ রূপ পায় না বা অপূর্ণ অবস্থায় ঝরে পড়ে)।
- ইযাম ও লাহম (عظام ولحم – অস্থি ও মাংসের আবরণ): মাংসপিণ্ডের ভেতর অস্থিকাঠামো তৈরি হওয়া এবং অস্থির ওপর মাংসপেশীর চাদর পরিয়ে দেওয়া।
- খালকান আখার (خَلْقًا آخَرَ – রূহ সঞ্চার ও পূর্ণাঙ্গ মানব রূপ): নির্দিষ্ট সময় পর আল্লাহর পক্ষ থেকে ফেরেশতার মাধ্যমে রূহ ফুঁকে দেওয়া এবং স্বতন্ত্র জীবন্ত মানবে রূপান্তর।
- তিফল ও আশুদ্দ (طفل وأشد – শৈশব ও পূর্ণ যৌবন): ভূমিষ্ঠ হওয়া, শৈশব অতিক্রম করে পূর্ণ শক্তি ও যৌবনে পদার্পণ।
- আরযালুল উমূর (أَرْذَلِ الْعُمُرِ – চরম বার্ধক্য): স্মৃতিভ্রম ও শারীরিক দুর্বলতার অন্তিম বয়স।
(খ) আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান ও মানব ভ্রূণতত্ত্বের (Embryology) আলোকে পর্যায়সমূহ
আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের এমব্রায়োলজি (Embryology) শাখার বিশ্ববিখ্যাত বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ড. কিথ মুর (Dr. Keith L. Moore) পবিত্র কুরআনের এই পর্যায়গুলোর বৈজ্ঞানিক সত্যতা স্বীকার করে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন:
| কুরআনী পরিভাষা | চিকিৎসা বিজ্ঞানের স্তর (Medical Stages) | বৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্য ও বিবরণ |
|---|---|---|
| নুতফাহ (نطفة) | Fertilized Zygote | পুরুষের শুক্রাণু (Sperm) ও নারীর ডিম্বাণুর (Ovum) মিলনে জাইগোট তৈরি হয়, যা ফ্যালোপিয়ান টিউব দিয়ে জরায়ুর দিকে যাত্রা করে। |
| আলাক্বাহ (علقة) | Blastocyst & Implantation | গর্ভাবস্থার ৭ম থেকে ২৪তম দিন। ভ্রূণ জরায়ুর এন্ডোমেট্রিয়াম দেওয়ালে নোঙর করে এবং দেখতে হুবহু জোঁকের (Leech-like) মতো রক্তচোষা আকৃতি ধারণ করে। |
| মুদগাহ (مضغة) | Somite Stage (Embryo) | ২৪ থেকে ৪০তম দিন। ভ্রূণে সোমাইটস (Somites) গঠিত হয়, যা দেখতে অবিকল দাঁত দিয়ে চিবানো চুইংগাম বা মাংসের টুকরোর মতো লাগে। |
| ইযাম ও লাহম (عظام ولحم) | Skeleton & Muscular System | ৬ষ্ঠ ও ৭ম সপ্তাহে তরুণাস্থি ও হাড় গঠিত হয় এবং এরপর হাড়ের চারিপাশে মাংসপেশী বিন্যস্ত হয়। |
| রূহ সঞ্চার (نفخ الروح) | Fetal Stage (Movement & Viability) | ১২০ দিনে (চতুর্থ মাস) ভ্রূণে স্বতন্ত্র প্রাণের স্পন্দন, অনুভূতি ও সঞ্চালন ক্ষমতা সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। |
٣- قوله تعالى: ﴿وَأَنَّ السَّاعَةَ آتِيَةٌ لَا رَيْبَ فِيهَا وَأَنَّ اللّٰهَ يَبْعَثُ مَنْ فِي الْقُبُورِ – وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يُجَادِلُ فِي اللّٰهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَلَا هُدًى وَلَا كِتَابٍ مُنِيرٍ – ثَانِيَ عِطْفِهِ لِيُضِلَّ عَنْ سَبِيلِ اللّٰهِ لَهُ فِي الدُّنْيَا خِزْيٌ وَنُذِيقُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَذَابَ الْحَرِيقِ – ذَلِكَ بِمَا قَدَّمَتْ يَدَاكَ وَأَنَّ اللّٰهَ لَيْسَ بِظَلَّامٍ لِلْعَبِيدِ﴾ [الحج: ٧-١٠]
(أ) ما حكم الإيمان بالساعة والبعث بعد الموت؟ أثبتهما بالأدلة النقلية-
(ب) ما المراد بالساعة في الآية المذكورة؟ اكتب علامات الساعة الكبرى-
আয়াতসমূহের সরল ও প্রামাণ্য অনুবাদ
“এবং এই কারণে যে, কিয়ামত অবশ্যম্ভাবী, এতে কোনো সন্দেহ নেই; এবং নিশ্চয়ই আল্লাহ কবরসমূহে যারা রয়েছে তাদেরকে পুনরুত্থিত করবেন। (৭) মানুষের মধ্যে কেউ কেউ কোনো জ্ঞান, হেদায়াত এবং কোনো দীপ্তিমান কিতাব ছাড়াই আল্লাহ সম্বন্ধে বিতর্ক করে; (৮) সে অহংকারে ঘাড় বাঁকিয়ে চলে মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করার জন্য। তার জন্য দুনিয়াতে রয়েছে চরম লাঞ্ছনা এবং কিয়ামতের দিন আমি তাকে দহনযন্ত্রণা আস্বাদন করাব। (৯) (তাকে বলা হবে) এ তো তোমার দু’হাতের পূর্বকৃত কর্মের ফল; এবং নিশ্চয় আল্লাহ বান্দাদের ওপর বিন্দুমাত্র জুলুমকারী নন (১০)।”
(ক) কিয়ামত ও পরকালের ওপর ঈমান আনার হুকুম এবং নাকলী (ঐশী) দলীলসমূহ
১. শরয়ী হুকুম: কিয়ামত এবং মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের (আল-বা’স বা’দাল মাওত) ওপর ঈমান আনা ইসলামের ঈমানের ছয়টি মৌলিক রুকনের অন্যতম অকাট্য রুকন (فرض عين وقطعي)। যে ব্যক্তি কিয়ামত বা পুনরুত্থানকে অস্বীকার করবে বা এতে সামান্যতম সন্দেহ পোষণ করবে, সে সর্বসম্মতভাবে কাফের ও ইসলামের গণ্ডি থেকে সম্পূর্ণ বহিষ্কৃত।
২. পবিত্র কুরআনের অকাট্য দলীল:
- আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ইরশাদ করেন:
﴿زَعَمَ الَّذِينَ كَفَرُوا أَنْ لَنْ يُبْعَثُوا قُلْ بَلَى وَرَبِّي لَتُبْعَثُنَّ ثُمَّ لَتُنَبَّؤُنَّ بِمَا عَمِلْتُمْ وَذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ﴾
অর্থ: “কাফেররা দাবি করে যে তারা কখনো পুনরুত্থিত হবে না। বলুন, অবশ্যই হ্যাঁ! আমার রবের কসম, তোমরা নিশ্চয়ই পুনরুত্থিত হবে, অতঃপর তোমাদেরকে কৃতকর্ম সম্পর্কে অবহিত করা হবে। আর এটা আল্লাহর পক্ষে খুবই সহজ” (সূরা আত-তাগাবুন: ৭)। - অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে: ﴿وَهُوَ الَّذِي يَبْدَأُ الْخَلْقَ ثُمَّ يُعِيدُهُ وَهُوَ أَهْوَنُ عَلَيْهِ﴾ অর্থাৎ “তিনিই সৃষ্টির সূচনা করেন অতঃপর পুনরায় তা সৃষ্টি করবেন; আর এটি তাঁর পক্ষে অধিকতর সহজ” (সূরা আর-রূম: ২৭)।
৩. হাদীস শরীফের দলীল: হাদীসে জিব্রাঈলে রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈমানের পরিচয় দিতে গিয়ে ইরশাদ করেছেন:
«أَنْ تُؤْمِنَ بِاللَّهِ، وَمَلَائِكَتِهِ، وَكُتُبِهِ، وَرُسُلِهِ، وَالْيَوْمِ الْآخِرِ، وَتُؤْمِنَ بِالْقَدَرِ خَيْرِهِ وَشَرِّهِ»
অর্থ: “ঈমান হলো এই যে, তুমি বিশ্বাস স্থাপন করবে আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাগণের প্রতি, তাঁর কিতাবসমূহের প্রতি, তাঁর রাসুলগণের প্রতি, পরকালের প্রতি এবং ভাগ্যের ভালো-মন্দের প্রতি” (সহীহ মুসলিম: ৮)।
(খ) ‘আস-সাআহ’-এর মর্মার্থ এবং কিয়ামতের বড় আলামতসমূহ
১. ‘আস-সাআহ’ (السَّاعَة)-এর তাৎপর্য: আরবি ভাষায় ‘সাআহ’ অর্থ সময় বা মুহূর্ত। কুরআনের পরিভাষায় ‘আস-সাআহ’ দ্বারা কিয়ামত দিবস, মহাপ্রলয় এবং মানুষের পুনরুত্থানের সময়কে বোঝানো হয়েছে। একে সাআহ বলার কারণ হলো—তা চোখের পলকে এক নিমেষেই অকস্মাৎ সংঘটিত হবে এবং এর হিসাব-নিকাশ অত্যন্ত দ্রুত সম্পন্ন হবে।
২. কিয়ামতের বড় বড় আলামতসমূহ (علامات الساعة الكبرى): সহীহ মুসলিমের হযরত হুযাইফা বিন আসীদ (রা.) বর্ণিত সহীহ হাদিস অনুযায়ী কিয়ামতের ১০টি প্রধান বা বড় আলামত নিচে উল্লেখ করা হলো:
- ইমাম মাহদীর আত্মপ্রকাশ: আহলে বাইতের বংশধর হিসেবে সারা পৃথিবীতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার জন্য আবির্ভূত হওয়া।
- দাজ্জালের আবির্ভাব (خروج الدجال): পৃথিবীতে এক চোখ অন্ধ মহামিথ্যুক দাজ্জালের প্রকাশ ঘটে মানুষকে ঈমানহারা করার সর্বগ্রাসী ফিতনা।
- হযরত ঈসা (আ.)-এর অবতরণ (نزول عيسى بن مريم): দামেস্কের পূর্ব মিনারে দুই ফেরেশতার ডানায় ভর করে অবতীর্ণ হয়ে দাজ্জালকে হত্যা ও কুরআনী শরীয়ত প্রতিষ্ঠা করা।
- ইয়াজুজ ও মাজুজের প্রাদুর্ভাব (خروج يأجوج ومأجوج): অবরুদ্ধ প্রাচীর ভেঙে এক বর্বর মানবগোষ্ঠীর সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়া।
- পশ্চিমাকাশে সূর্যোদয় (طلوع الشمس من مغربها): প্রকৃতির নিয়মিত নিয়মের বিপরীতে পশ্চিমে সূর্য ওঠা, যার সাথে সাথেই তাওবার দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে।
- দাব্বাতুল আরদ-এর আত্মপ্রকাশ (خروج دابة الأرض): মাটি ফেটে এক অলৌকিক চতুষ্পদ প্রাণীর বের হয়ে মানুষের কপালে ঈমানদার ও কাফেরের মোহর এঁকে দেওয়া।
- ধোঁয়াশা বা দুখান (الدخان): আকাশ থেকে এমন এক ধোঁয়া নেমে আসবে যা সারা পৃথিবীকে ঢেকে ফেলবে।
- পূর্বাঞ্চলে ভূমিধস (خسف بالمشرق): পৃথিবীর পূর্ব ভাগে এক বিশাল ভূগর্ভস্থ ধস।
- পশ্চিমাঞ্চলে ভূমিধস (خسف بالمغرب): পশ্চিম ভাগে দ্বিতীয় প্রকাণ্ড ভূমিধস।
- আরব উপদ্বীপে ভূমিধস (خسف بجزيرة العرب) এবং ইয়েমেন থেকে অগ্নিকাণ্ড: আদন প্রান্তর থেকে এক প্রচণ্ড আগুন বের হয়ে সমস্ত মানুষকে হাশরের ময়দানের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাবে।
٤- قوله تعالى: ﴿الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلَّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا مِائَةَ جَلْدَةٍ وَلَا تَأْخُذْكُمْ بِهِمَا رَأْفَةٌ فِي دِينِ اللّٰهِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللّٰهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَلْيَشْهَدْ عَذَابَهُمَا طَائِفَةٌ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ – الزَّانِي لَا يَنْكِحُ إِلَّا زَانِيَةً أَوْ مُشْرِكَةً وَالزَّانِيَةُ لَا يَنْكِحُهَا إِلَّا زَانٍ أَوْ مُشْرِكٌ وَحُرِّمَ ذَلِكَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ – وَالَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ ثُمَّ لَمْ يَأْتُوا بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ فَاجْلِدُوهُمْ ثَمَانِينَ جَلْدَةً وَلَا تَقْبَلُوا لَهُمْ شَهَادَةً أَبَدًا وَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ﴾ [النور: ٢-٤]
(أ) ما الاختلاف بين الأئمة في حدّ الزنا وأداء الشهادة فيه؟ بين-
(ب) عرف الجلد والرجم ثم بين صفة الضرب في الزنا-
আয়াতসমূহের সরল ও প্রামাণ্য অনুবাদ
“ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী—তাদের প্রত্যেককে একশত করে বেত্রাঘাত কর। আর যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান এনে থাক, তবে আল্লাহর বিধান কার্যকর করার ক্ষেত্রে তাদের প্রতি কোনো দয়া যেন তোমাদেরকে পেয়ে না বসে। আর মুমিনদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে। (২) ব্যভিচারী পুরুষ ব্যভিচারিণী অথবা মুশরিক নারী ছাড়া কাউকে বিবাহ করে না; এবং ব্যভিচারিণী নারী—তাকে কোনো ব্যভিচারী অথবা মুশরিক ছাড়া কেউ বিবাহ করে না; আর মুমিনদের ওপর এটি হারাম করা হয়েছে। (৩) আর যারা সতী-সাধ্বী নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, অতঃপর চারজন সাক্ষী উপস্থিত করতে পারে না, তবে তাদের আশিটি বেত্রাঘাত কর এবং কখনো তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করো না; আর এরাই হলো চরম ফাসেক (৪)।”
(ক) যেনার শাস্তি ও সাক্ষ্যদানের ক্ষেত্রে ইমামদের মতভেদ
১. যেনার শাস্তির ক্ষেত্রে আইনি মতভেদ:
- অবিবাহিত (গায়রে মুহসান) যেনাকারীর ক্ষেত্রে: সকল ইমাম একমত যে কুরআনের বিধান অনুযায়ী ১০০টি বেত্রাঘাত (جلد مائة) ওয়াজিব। তবে বেত্রাঘাতের সাথে এক বছরের জন্য দেশান্তর (تغريب عام) করা হবে কি না—এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে:
- ইমাম শাফেয়ী, মালেক ও আহমদ (রহ.): বেত্রাঘাতের সাথে সাথে এক বছরের দেশান্তর বাধ্যতামূলক।
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.): ১০০ বেত্রাঘাতই একমাত্র শরয়ী হদ্দ। দেশান্তর করা হদ্দের অংশ নয়; তবে বিচারক জনস্বার্থে বা তাযীর হিসেবে উপযুক্ত মনে করলে দেশান্তর করতে পারেন।
- বিবাহিত (মুহসান) যেনাকারীর ক্ষেত্রে: চার মাযহাবের সকল ইমাম একমত যে বিবাহিত নারী বা পুরুষের জন্য শাস্তি হলো পাথর নিক্ষেপে মৃত্যুদণ্ড বা রজব (الرجم بالحجارة)। তবে ইমাম আলী (রা.) ও ইমাম আহমদের একটি রেওয়ায়াত মতে বিবাহিতের ক্ষেত্রে ১০০ বেত্রাঘাত এবং রজম উভয়টি একত্রিত করা যায়, কিন্তু জমহুর ও হানাফীদের মতে কেবল রজমই কার্যকর হবে।
২. সাক্ষ্য আদায়ের ক্ষেত্রে শর্ত ও মতভেদ:
- চারজন সাক্ষীর আবশ্যকতা: যেনা প্রমাণের জন্য অবশ্যই চারজন প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থমস্তিস্ক ও ন্যায়পরায়ণ (আদেল) পুরুষ সাক্ষীর প্রয়োজন। মহিলাদের সাক্ষ্য যেনার হদ্দে গ্রহণযোগ্য নয়।
- সাক্ষ্যগ্রহণের স্থান ও সময়:
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.): চারজন সাক্ষীকে একই মজলিসে একই সাথে বিচারকের সামনে উপস্থিত হয়ে সাক্ষ্য দিতে হবে। যদি পৃথক পৃথক মজলিসে সাক্ষ্য দেয় তবে তাদের সাক্ষ্য বাতিল হবে এবং তাদের ওপর অপবাদের হদ্দ (ক্বযফ) জারি হবে।
- জমহুর ইমামগণ: পৃথক মজলিসে এলেও যদি চারজন যথানিয়মে সাক্ষ্য দেয় তবে তা গণ্য হতে পারে।
- সাক্ষ্য প্রদানের প্রত্যক্ষ রূপ: সাক্ষীদের নিজ চোখে স্পষ্টভাবে সুরমাদানি ও শলাকার ন্যায় সরাসরি সঙ্গম দেখতে হবে। কেবল একসাথে শোয়া বা আপত্তিকর অবস্থায় দেখা হদ্দ জারির জন্য যথেষ্ট নয়।
(খ) জিলদ ও রজমের সংজ্ঞা এবং যেনার কষাঘাতের ধরণ
১. জিলদ (الْجَلْدُ): চামড়ার ওপর চাবুক বা বেত দিয়ে আঘাত করাকে জিলদ বা বেত্রাঘাত বলা হয়। শরীয়তে অবিবাহিত যেনাকারীর জন্য একশত বেত্রাঘাতের বিধান রয়েছে।
২. রজম (الرَّجْمُ): বিবাহিত যেনাকারীকে পাথর ছুড়ে ছুড়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার শরয়ী শাস্তিকে রজম বলা হয়, যা রাসুলুল্লাহ (সা.) ও খোলাফায়ে রাশেদীনের অবিচ্ছিন্ন সুন্নাহ ও ইজমা দ্বারা প্রমাণিত।
৩. যেনার বেত্রাঘাতের পদ্ধতি ও ধরণ (صفة الضرب):
- মধ্যম মাত্রার আঘাত: বেত্রাঘাত এত শক্ত হবে না যাতে চামড়া ছিঁড়ে যায় বা হাড় ভেঙে যায়, আবার এত নরমও হবে না যাতে অপরাধী কোনো ব্যথাই অনুভব না করে।
- স্পর্শকাতর অঙ্গসমূহ পরিহার: মুখমণ্ডল, মাথা, বুক, পেট ও লজ্জাস্থানে আঘাত করা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। পিঠ ও নিতম্বে আঘাত বণ্টন করে মারতে হবে।
- পোশাক ও অবস্থান: পুরুষকে দাঁড়িয়ে এবং নারীকে বসিয়ে বেত্রাঘাত করা হবে। শীতকালীন ভারী জ্যাকেট বা কাপড় খুলে সাধারণ স্বাভাবিক পোশাকে প্রহার করা হবে, তবে একেবারে উলঙ্গ করা হারাম।
- প্রহারকারীর অঙ্গ সঞ্চালন: হানাফী ফিকহ অনুযায়ী প্রহারকারী তার হাত বা বগল সম্পূর্ণ উঁচুতে তুলবে না যাতে আঘাত অতিরিক্ত হিংস্র না হয়ে যায়।
٥- قوله تعالى: ﴿إِنَّ الَّذِينَ جَاءُوا بِالْإِفْكِ عُصْبَةٌ مِنْكُمْ لَا تَحْسَبُوهُ شَرًّا لَكُمْ بَلْ هُوَ خَيْرٌ لَكُمْ لِكُلِّ امْرِئٍ مِنْهُمْ مَا اكْتَسَبَ مِنَ الْإِثْمِ وَالَّذِي تَوَلَّى كِبْرَهُ مِنْهُمْ لَهُ عَذَابٌ عَظِيمٌ – لَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ ظَنَّ الْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بِأَنْفُسِهِمْ خَيْرًا وَقَالُوا هَذَا إِفْكٌ مُبِينٌ – لَوْلَا جَاءُوا عَلَيْهِ بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ فَإِذْ لَمْ يَأْتُوا بِالشُّهَدَاءِ فَأُولَئِكَ عِنْدَ اللّٰهِ هُمُ الْكَاذِبُونَ﴾ [النور: ١١-١٣]
(أ) كم آية نزلت في واقعة الإفك؟ اكتب قصة الإفك بضوء الآيات والأحاديث موجزًا-
(ب) من المراد بقوله تعالى: “والذي تولى كبره”؟ ولِمَ خصّه الله بالعذاب؟ بين-
আয়াতসমূহের সরল ও প্রামাণ্য অনুবাদ
“নিশ্চয়ই যারা এই চরম মিথ্যা অপবাদ (ইফক) রচনা করেছে, তারা তোমাদেরই একটি দল। তোমরা একে তোমাদের জন্য ক্ষতিকর মনে করো না; বরং এটি তোমাদের জন্য কল্যাণকর। তাদের মধ্যকার প্রত্যেক ব্যক্তি যতটুকু পাপে লিপ্ত হয়েছে তার প্রতিফল পাবে; আর তাদের মধ্যে যে এ অপবাদের প্রধান হোতা ছিল, তার জন্য রয়েছে মহাশাস্তি। (১১) তোমরা যখন এ কথা শুনলে, তখন মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা কেন নিজেদের লোকদের সম্পর্কে উত্তম ধারণা পোষণ করল না এবং বলল না যে, ‘এ তো এক সুস্পষ্ট অপবাদ’? (১২) তারা কেন এর সপক্ষে চারজন সাক্ষী নিয়ে এল না? সুতরাং যেহেতু তারা সাক্ষী উপস্থিত করতে পারল না, সেহেতু আল্লাহর দৃষ্টিতে তারাই চরম মিথ্যাবাদী (১৩)।”
(ক) ইফকের ঘটনায় অবতীর্ণ আয়াতের সংখ্যা ও সংক্ষেপিত হৃদয়স্পর্শী ইতিহাস
১. অবতীর্ণ আয়াতের সংখ্যা: উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা.)-এর পবিত্রতা ও নির্দোষিতা ঘোষণা করে সূরা আন-নূরের ১১ নম্বর আয়াত থেকে শুরু করে ২০ নম্বর আয়াত পর্যন্ত সর্বমোট ১০টি আয়াত একাধারে নাযিল হয়েছিল।
২. ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ (সংক্ষেপিত):
- যুদ্ধ ও কাফেলা থেকে বিচ্ছিন্নতা: ৫ম বা ৬ষ্ঠ হিজরীতে বনু মুস্তালিক (মুরাইসী) যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে রাতের বেলা কাফেলা যাত্রাবিরতি করে। উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.) প্রাকৃতিক প্রয়োজনে কিছুটা দূরে যান এবং অসাবধানতাবশত তাঁর ইয়েমেনি গলার হার হারিয়ে যায়। হারটি খুঁজতে গিয়ে কিছুটা দেরি হয়। এদিকে কাফেলার প্রহরীরা মনে করে তিনি হাওদার ভেতরেই আছেন, তাই তাঁরা উটের ওপর হাওদা তুলে দিয়ে কাফেলা নিয়ে রওয়ানা হয়ে যান।
- হযরত সাফওয়ান (রা.)-এর উদ্ধার: ফিরে এসে আয়েশা (রা.) কাফেলা দেখতে না পেয়ে একাকী বসে পড়েন এবং ঘুমিয়ে যান। সেনাবাহিনীর ফেলে আসা জিনিসপত্র খোঁজার দায়িত্বে নিয়োজিত সাহাবী হযরত সাফওয়ান ইবনুল মুয়াত্তাল (রা.) সকালে সেখানে পৌঁছে উম্মুল মুমিনীনকে চিনে ফেলেন এবং «إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ» পাঠ করেন। তিনি তাঁর উট বসিয়ে দিয়ে দূরে সরে দাঁড়ান। আয়েশা (রা.) উটে সওয়ার হলে সাফওয়ান (রা.) উটের লাগাম ধরে পদব্রজে হেঁটে মদিনার কাফেলায় মিলিত হন।
- মুনাফিকদের রটনা ও অপপ্রচার: এই দৃশ্য দেখে মদিনার মুনাফিক সরদার আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুল এক জঘন্য ও কুরুচিপূর্ণ কুৎসা রটনা শুরু করে। দুর্ভাগ্যবশত কিছু সরলমনা মুসলমানও (হাসসান বিন সাবিত, মিসতাহ বিন উসাসা ও হামনাহ বিনতে জাহাশ) তাদের অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে কান দেয়।
- মদিনায় মানসিক অস্থিরতা: দীর্ঘ এক মাস মদিনায় এই নিয়ে তীব্র কানাঘুষা চলে। আয়েশা (রা.) অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং পরবর্তীতে ঘটনা জানতে পেরে দিনরাত কাঁদতে থাকেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) চরম মানসিক কষ্টে ছিলেন এবং ওহীর অপেক্ষা করছিলেন।
- আসমানী ফায়সালা ও পবিত্রতা ঘোষণা: অবশেষে স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আকাশ থেকে দশটি আয়াত নাযিল করে আয়েশা (রা.)-এর চিরন্তন সতীত্ব ও পবিত্রতার ঘোষণা দেন এবং মিথ্যা অপবাদ রটনাকারীদের কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিলে মিথ্যা অপবাদে জড়িত ব্যক্তিদের ওপর আশিটি করে বেত্রাঘাত (হদ্দে ক্বযফ) কার্যকর করা হয়।
(খ) “আল্লাযী তাওয়াল্লা কিবরাহু”-এর পরিচয় এবং তার মহাশাস্তির কারণ
১. উদ্দিষ্ট ব্যক্তি: ﴿وَالَّذِي تَوَلَّى كِبْرَهُ مِنْهُمْ﴾ (তাদের মধ্যে যে এই অপবাদের বড় দায়িত্বটি কাঁধে নিয়েছিল) দ্বারা সর্বসম্মতভাবে মদিনার মুনাফিকদের সর্দার আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুল-কে বোঝানো হয়েছে।
২. তাকে বিশেষ শাস্তির (عَذَابٌ عَظِيمٌ) আওতায় আনার কারণসমূহ:
- অপবাদের মূল স্থপতি ও পরিকল্পনাকারী: আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই স্বয়ং নিজ মস্তিষ্ক থেকে এই জঘন্য কুৎসা উদ্ভাবন করেছিল এবং নিজের বৈঠকে বারবার তা রসিয়ে রসিয়ে আলোচনা করে মদিনায় বিষবাষ্প ছড়িয়েছিল।
- রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর পবিত্র পরিবারের সম্মানহানি: তার মূল উদ্দেশ্য কোনো সাধারণ নারীর কুৎসা নয়, বরং স্বয়ং সাইয়্যিদুল মুরসালীন (সা.)-এর পবিত্র গৃহের সম্মান ধূলিসাৎ করে ইসলামি আন্দোলনের গতি স্তব্ধ করা।
- মুমিনদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি: সে আওস ও খাযরাজ গোত্রের মাঝে পারস্পরিক সন্দেহ ও ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত পুনরুজ্জীবিত করার অপচেষ্টা চালিয়েছিল।
- মুনাফেক্বী ও তওবাহীন মৃত্যু: মুমিন সাহাবীদের যারা এতে কান দিয়েছিলেন তাঁরা তওবা করেছিলেন এবং হদ্দের বেত্রাঘাতের মাধ্যমে তাঁদের গুনাহ মোচন হয়েছিল; কিন্তু এই খবিস মুনাফিক অন্তরে কুফর লুকিয়ে রেখেছিল এবং তওবা ছাড়াই জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরের (আদ-দারকুল আসফাল) চিরস্থায়ী বাসিন্দা হয়েছিল।
٦- قوله تعالى: ﴿وَإِذْ قَالَ لُقْمَانُ لِابْنِهِ وَهُوَ يَعِظُهُ يَا بُنَيَّ لَا تُشْرِكْ بِاللّٰهِ إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ – وَوَصَّيْنَا الْإِنْسَانَ بِوَالِدَيْهِ حَمَلَتْهُ أُمُّهُ وَهْنًا عَلَى وَهْنٍ وَفِصَالُهُ فِي عَامَيْنِ أَنِ اشْكُرْ لِي وَلِوَالِدَيْكَ إِلَيَّ الْمَصِيرُ – وَإِنْ جَاهَدَاكَ عَلَى أَنْ تُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا وَصَاحِبْهُمَا فِي الدُّنْيَا مَعْرُوفًا وَاتَّبِعْ سَبِيلَ مَنْ أَنَابَ إِلَيَّ ثُمَّ إِلَيَّ مَرْجِعُكُمْ فَأُنَبِّئُكُمْ بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ – يَا بُنَيَّ إِنَّهَا إِنْ تَكُ مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِنْ خَرْدَلٍ فَتَكُنْ فِي صَخْرَةٍ أَوْ فِي السَّمَاوَاتِ أَوْ فِي الْأَرْضِ يَأْتِ بِهَا اللّٰهُ إِنَّ اللّٰهَ لَطِيفٌ خَبِيرٌ﴾ [لقمان: ١٣-١٦]
(أ) من لقمان عليه السلام؟ اكتب وصاياه لابنه موجزًا-
(ب) بين حقوق الوالدين على الأولاد على ضوء القرآن والسنة-
আয়াতসমূহের সরল ও প্রামাণ্য অনুবাদ
“এবং স্মরণ কর, যখন লোকমান উপদেশচ্ছলে তাঁর পুত্রকে বললেন: ‘হে বৎস! আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করো না; নিশ্চয়ই শিরক হলো এক চরম জুলুম।’ (১৩) আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদয় ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা কষ্টের ওপর কষ্ট সহ্য করে তাকে গর্ভে ধারণ করেছে এবং তার স্তন্যপান ছাড়ানো হয় দুই বছরে। অতএব আমার প্রতি এবং তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও; আমারই নিকট তোমাদের প্রত্যাবর্তন। (১৪) আর যদি তারা উভয়ে তোমার ওপর এমন বিষয়ে পীড়াপীড়ি করে যাতে আমার সাথে এমন কিছু শরিক কর যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তবে তাদের কথা মানবে না; তবে দুনিয়াতে তাদের সাথে সদ্ভাবে বসবাস করবে এবং যে আমার অভিমুখী হয়েছে তার পথ অনুসরণ করবে। অতঃপর আমারই কাছে তোমাদের ফিরে আসতে হবে এবং আমি তোমাদেরকে কৃতকর্ম সম্পর্কে জানিয়ে দেব। (১৫) (লোকমান আরও বললেন) ‘হে বৎস! পাপ বা পুণ্য যদি সরিষার দানা পরিমাণও হয় এবং তা যদি থাকে কোনো শক্ত পাথরের গর্ভে অথবা আসমানসমূহে বা জমিনের অতল গহ্বরে, আল্লাহ তাও উপস্থিত করবেন; নিশ্চয়ই আল্লাহ অতি সূক্ষ্মদর্শী, সর্বজ্ঞ’ (১৬)।”
(ক) হযরত লোকমান (আ.)-এর পরিচয় ও তাঁর অমর উপদেশাবলি
১. হযরত লোকমান (আ.)-এর পরিচয়: অধিকাংশ মুফাসসির ও ঐতিহাসিকের মতে লোকমান ছিলেন আফ্রিকার হাবশার (ইথিওপিয়া) এক অত্যন্ত প্রজ্ঞাবান, সংযমী ও পুণ্যবান আল্লাহর ওলী (হাকীম)। তিনি নবী ছিলেন না, বরং এক পরম জ্ঞানী বান্দা ছিলেন, যাঁকে আল্লাহ তাআলা বিশেষ ‘হিকমত’ দান করেছিলেন (সূরা লোকমান: ১২)।
২. পুত্রের প্রতি তাঁর প্রধান উপদেশসমূহ:
- শিরক বর্জন ও তাওহীদের প্রতিষ্ঠা: শিরক সবচেয়ে বড় অন্যায়, তাই কোনো অবস্থাতেই আল্লাহর সাথে শরিক করা যাবে না।
- আল্লাহর সর্বব্যাপী জ্ঞানের অনুভূতি: সরিষার দানা পরিমাণ ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র আমলও আল্লাহর চোখ এড়াতে পারে না; সুতরাং গোপনেও পাপ করা যাবে না।
- নামাজ কায়েম করা: নিয়মিত একাগ্রতার সাথে সময়মতো সালাত আদায় করতে হবে।
- সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ: সমাজে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের প্রতিরোধে সক্রিয় ভূমিকা রাখা।
- বিপদে ধৈর্য ধারণ: সত্য প্রতিষ্ঠার পথে যে দুঃখ-কষ্ট আসবে তাতে অবিচল সবর অবলম্বন করা।
- অহংকার বর্জন ও বিনম্র আচরণ: মানুষের দিক থেকে অবজ্ঞায় মুখ ফিরিয়ে না নেওয়া এবং জমিনে গর্বভরে পদচারণা না করা।
- কথাবার্তায় শালীনতা: চলার গতিতে ভারসাম্য বজায় রাখা এবং কণ্ঠস্বর নিচু রাখা; কারণ কর্কশ চিৎকার গাধার স্বরের মতো অপ্রীতিকর।
(খ) কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে সন্তানের ওপর পিতা-মাতার অধিকার
ইসলামে আল্লাহর তাওহীদের পর সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে পিতা-মাতার সেবাকে। সন্তানের ওপর পিতা-মাতার প্রধান হকসমূহ নিম্নরূপ:
- সর্বাবস্থায় সদাচরণ ও সম্মান প্রদর্শন: আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন:
﴿وَقَضَى رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِنْدَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُلْ لَهُمَا أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُلْ لَهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا﴾
অর্থ: “তোমার রব নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া আর কারো ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে উত্তম আচরণ করবে। তাদের একজন বা উভয়েই তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদের ‘উফ’ (বিরক্তি) পর্যন্ত বলো না, তাদের ধমক দিও না এবং তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বল” (সূরা বনী ইসরাঈল: ২৩)। - মায়ের বিশেষ অধিকার: এক সাহাবী রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, “আমার সর্বোত্তম সেবার সবচেয়ে বেশি হকদার কে?” রাসুলুল্লাহ (সা.) তিনবার বললেন: “তোমার মা”, চতুর্থবারে বললেন: “তোমার পিতা” (সহীহ বুখারী: ৫৯৭১)।
- পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করা: বয়োবৃদ্ধ পিতা-মাতার যাবতীয় আর্থিক ব্যয়ভার, বাসস্থান, খাদ্য ও চিকিৎসা বহন করা সন্তানের ওপর শরিয়ত নির্ধারিত ওয়াজিব দায়িত্ব।
- পিতা-মাতার সন্তুষ্টি অর্জন: রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: «رِضَا الرَّبِّ فِي رِضَا الْوَالِدِ، وَسَخَطُ الرَّبِّ فِي سَخَطِ الْوَالِدِ» অর্থাৎ “পিতার সন্তুষ্টিতে রবের সন্তুষ্টি এবং পিতার অসন্তুষ্টিতে রবের অসন্তুষ্টি” (তিরমিযী: ১৮৯৯)।
- মৃত্যুর পর তাদের জন্য দোয়া ও হক আদায়: তাঁদের মাগফিরাতের জন্য «رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا» পাঠ করা, তাঁদের অসিয়ত ও ঋণ পরিশোধ করা এবং তাঁদের আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা।
٧- قوله تعالى: ﴿الم – تِلْكَ آيَاتُ الْكِتَابِ الْحَكِيمِ – هُدًى وَرَحْمَةً لِلْمُحْسِنِينَ – الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَهُمْ بِالْآخِرَةِ هُمْ يُوقِنُونَ – أُولَئِكَ عَلَى هُدًى مِنْ رَبِّهِمْ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ – وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَشْتَرِي لَهْوَ الْحَدِيثِ لِيُضِلَّ عَنْ سَبِيلِ اللّٰهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَيَتَّخِذَهَا هُزُوًا أُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ مُهِينٌ – وَإِذَا تُتْلَى عَلَيْهِ آيَاتُنَا وَلَّى مُسْتَكْبِرًا كَأَنْ لَمْ يَسْمَعْهَا كَأَنَّ فِي أُذُنَيْهِ وَقْرًا فَبَشِّرْهُ بِعَذَابٍ أَلِيمٍ﴾ [لقمان: ١-٧]
(أ) ما الحروف المقطعات؟ ولِمَ بدئ بعض السور بالحروف المقطعات؟ بين بيانًا شافيًا-
(ب) عرّف الصلاة ثم تحدث عن أهميتها في حياة الإنسان-
আয়াতসমূহের সরল ও প্রামাণ্য অনুবাদ
“আলিফ-লাম-মীম। (১) এগুলো প্রজ্ঞাময় কিতাবের আয়াত। (২) যা সৎকর্মশীলদের জন্য পথপ্রদর্শক ও রহমত। (৩) যারা সালাত কায়েম করে, যাকাত প্রদান করে এবং পরকালের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখে। (৪) তারাই তাদের রবের পক্ষ থেকে সঠিক পথের ওপর রয়েছে এবং তারাই সফলকাম। (৫) আর মানুষের মধ্য থেকে কেউ কেউ অজ্ঞতাবশত আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বিচ্যুত করার জন্য অনর্থক ও অবান্তর কথা (লাহওয়াল হাদীস) ক্রয় করে এবং একে উপহাসের বিষয় বানায়; এদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি। (৬) আর যখন তার সামনে আমার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করা হয়, তখন সে অহংকারে মুখ ফিরিয়ে নেয়—যেন সে তা শুনতেই পায়নি, যেন তার উভয় কানে বধিরতা রয়েছে; সুতরাং তাকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দাও (৭)।”
(ক) হুরূফে মুকাত্তা’আতের পরিচয় এবং তা দ্বারা সূরা সূচনার অন্তর্নিহিত হেকমত
১. হুরূফে মুকাত্তা’আত (الحروف المقطعات)-এর পরিচয়: ‘আল-মুক্বাত্তা’আত’ শব্দের অর্থ বিচ্ছিন্ন বা পৃথক পৃথক অক্ষর। পবিত্র কুরআনের ২৯টি সূরার প্রারম্ভে যেসকল একক বা যৌগিক বিচ্ছিন্ন বর্ণমালা এসেছে (যেমন: الم، الر، المر، كهيعص، طه، طسم، يس، ص، حم، ق، ن), সেগুলোকে ‘হুরূফে মুকাত্তা’আত’ বলা হয়। এগুলোকে আলাদা আলাদা হরফ হিসেবে সাকিন দিয়ে পড়তে হয়।
২. হুরূফে মুকাত্তা’আত দিয়ে সূরা সূচনার রহস্য ও হেকমত:
- কুরআনের অলৌকিকত্ব ও চ্যালেঞ্জ (الإعجاز والتحدي): তৎকালীন আরব জাহেলিয়াত ছিল তাদের অসাধারণ কাব্যপ্রতিভা ও ভাষার বিশুদ্ধতায় অহংকারী। আল্লাহ এই পরিচিত বর্ণগুলো (আলিফ, লাম, মীম) দিয়েই কুরআন রচনা করেছেন। আল্লাহ যেন তাদের চ্যালেঞ্জ করছেন—”তোমরা যে বর্ণমালা দিয়ে কথা বলো, সেই বর্ণমালা দিয়েই এই কুরআন অবতীর্ণ; পারলে এর মতো একটি ছোট্ট সূরাও বানিয়ে দেখাও।” তারা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে কুরআনের ঐশী রূপ মেনে নিতে বাধ্য হয়। একারণেই প্রায় প্রতিটি মুকাত্তা’আত সূরার পরেই কুরআনের শ্রেষ্ঠত্বের উল্লেখ রয়েছে (যেমন: ﴿الم * تِلْكَ آيَاتُ الْكِتَابِ الْحَكِيمِ﴾)।
- মনোযোগ আকর্ষণ ও চমক সৃষ্টি (جلب انتباه السامعين): মক্কার কাফেররা কুরআন পাঠের সময় হট্টগোল করত যাতে কেউ কুরআন শুনতে না পারে। যখন রাসুলুল্লাহ (সা.) হঠাৎ এই রহস্যময় বিচ্ছিন্ন বর্ণগুলো গম্ভীর কণ্ঠে পাঠ করতেন, তখন কাফেররা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে সম্পূর্ণ নীরব হয়ে শুনত।
- আল্লাহ ও রাসুলের মধ্যকার গোপন ভেদ (سرّ بين الله ورسوله): খলিফা আবু বকর সিদ্দীক (রা.), আলী (রা.) ও সালাফে সালেহীনের মতে—প্রতিটি আসমানী কিতাবের একটি গোপনীয় তত্ত্ব থাকে, আর কুরআনের গভীর গোপনীয় রহস্য হলো এই হুরূফে মুকাত্তা’আত, যার চূড়ান্ত মর্ম কেবল আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলই সম্যক অবগত।
(খ) সালাতের সংজ্ঞা এবং মানবজীবনে এর অপরিহার্য গুরুত্ব
১. সালাতের সংজ্ঞা: ‘আস-সালাত’ (الصَّلَاةُ)-এর শাব্দিক অর্থ দোয়া, তাসবীহ, ক্ষমা প্রার্থনা ও রহমত। শরীয়তের পরিভাষায়: «أقوال وأفعال مخصوصة، مفتتحة بالتكبير، ومختتمة بالتسليم، بشرائط مخصوصة» অর্থাৎ “নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে তাকবীরে তাহরীমা দ্বারা শুরু হয়ে সালাম ফিরানোর মাধ্যমে সমাপ্ত হওয়া বিশেষ কতগুলো বাণী ও দৈহিক অঙ্গভঙ্গির সমন্বিত ইবাদতকে সালাত বলা হয়।”
২. মানবজীবনে সালাতের গুরুত্ব ও প্রভাব:
- দ্বীনের মূল স্তম্ভ: রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: «الصَّلَاةُ عِمَادُ الدِّينِ، فَمَنْ أَقَامَهَا فَقَدْ أَقَامَ الدِّينَ» অর্থাৎ “সালাত হলো দ্বীনের খুঁটি; যে ব্যক্তি সালাত কায়েম করল সে দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করল, আর যে তা বিনষ্ট করল সে দ্বীনকে ধ্বংস করল।”
- পাপ ও অশ্লীলতা থেকে আত্মরক্ষা: মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন: ﴿إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ﴾ অর্থাৎ “নিশ্চয় সালাত মানুষকে অশ্লীল ও অপকর্ম থেকে বিরত রাখে” (সূরা আল-আনকাবূত: ৪৫)।
- আত্মিক প্রশান্তি ও মানসিক মুক্তি: সালাত বান্দার সকল দুশ্চিন্তা ও মানসিক অস্থিরতা দূর করে পরম শান্তি এনে দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) যখনই কোনো জটিল সমস্যার মুখোমুখি হতেন তখনই নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন এবং বলতেন: «أَرِحْنَا بِهَا يَا بِلَالُ» (হে বেলাল! আজান দিয়ে নামাজের মাধ্যমে আমাদের অন্তরকে স্বস্তি দাও)।
- দৈহিক পবিত্রতা ও নিয়মানুবর্তিতা: দৈনিক পাঁচবার অজু ও নামাজের নির্দিষ্ট সময় মানুষকে শারীরিক পরিচ্ছন্নতা, নিয়মানুবর্তিতা ও সময়ের সদ্ব্যবহার শিক্ষা দেয়।
- সামাজিক সাম্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ: জামাআতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে ধনী-দরিদ্র, রাজা-প্রজা সকল ভেদাভেদ ভুলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ায়, যা এক অভূতপূর্ব সামাজিক সংহতি তৈরি করে।
٨- قوله تعالى: ﴿مَا جَعَلَ اللّٰهُ لِرَجُلٍ مِنْ قَلْبَيْنِ فِي جَوْفِهِ وَمَا جَعَلَ أَزْوَاجَكُمُ اللَّائِي تُظَاهِرُونَ مِنْهُنَّ أُمَّهَاتِكُمْ وَمَا جَعَلَ أَدْعِيَاءَكُمْ أَبْنَاءَكُمْ ذَلِكُمْ قَوْلُكُمْ بِأَفْوَاهِكُمْ وَاللّٰهُ يَقُولُ الْحَقَّ وَهُوَ يَهْدِي السَّبِيلَ – ادْعُوهُمْ لِآبَائِهِمْ هُوَ أَقْسَطُ عِنْدَ اللّٰهِ فَإِنْ لَمْ تَعْلَمُوا آبَاءَهُمْ فَإِخْوَانُكُمْ فِي الدِّينِ وَمَوَالِيكُمْ وَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ فِيمَا أَخْطَأْتُمْ بِهِ وَلَكِنْ مَا تَعَمَّدَتْ قُلُوبُكُمْ وَكَانَ اللّٰهُ غَفُورًا رَحِيمًا﴾ [الأحزاب: ٤-٥]
(أ) اكتب سبب نزول الآية الأولى-
(ب) من الذي ادّعى أن في جوفه قلبين؟ بيّن حكم التبني على ضوء القرآن الكريم-
আয়াতসমূহের সরল ও প্রামাণ্য অনুবাদ
“আল্লাহ কোনো মানুষের ভেতরে দুটি হৃদয় স্থাপন করেননি; এবং তোমাদের যে স্ত্রীগণের সাথে তোমরা ‘যিহার’ (মায়ের পিঠের সাথে তুলনা) কর, আল্লাহ তাদেরকে তোমাদের গর্ভধারিণী মা বানিয়ে দেননি; এবং তোমাদের পোষ্যপুত্রদেরকে তিনি তোমাদের ঔরসজাত সন্তান বানাননি। এগুলো কেবল তোমাদের মুখের মনগড়া কথা; অথচ আল্লাহ সত্য কথা বলেন এবং তিনিই সঠিক পথ প্রদর্শন করেন। (৪) তোমরা তাদেরকে তাদের আসল পিতৃপরিচয়ে ডাক, এটিই আল্লাহর নিকট সর্বাধিক ন্যায়সঙ্গত; আর যদি তোমরা তাদের পিতাদের না জান, তবে তারা তোমাদের দ্বীনি ভাই ও অভিভাবক। আর যে বিষয়ে তোমরা ভুল করেছ সে জন্য তোমাদের কোনো অপরাধ নেই, তবে অপরাধ হলো তোমাদের অন্তর যা ইচ্ছাকৃতভাবে সংকল্প করে করেছে; এবং নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু (৫)।”
(ক) প্রথম আয়াতের শানে নুযূল বা অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট
ইমাম কুরতুবী, ইবনে কাসীর ও আল্লামা সুয়ূতী (রহ.) প্রমুখ মুফাসসিরীনে কেরাম এই আয়াতের নাযিলের তিনটি ঐতিহাসিক কারণ উল্লেখ করেছেন:
- জাহেলী কুসংস্কার ও দ্বিমনা মুনাফিকদের মুখোশ উন্মোচন: জাহেলিয়াতের যুগে কোনো কোনো ব্যক্তি নিজেকে অসম্ভব ধীমান ও অদ্বিতীয় দাবি করে বলত যে তার বুকের ভেতর দুটি অন্তর রয়েছে, যার একটি দিয়ে সে সাধারণ মানুষের চেয়ে দ্বিগুণ বোঝে। আবার মুনাফিকরা একদিকে মুখে ঈমানের দাবি করত এবং অন্তরে কাফেরদের সাথে আঁতাত করত। আল্লাহ জানিয়ে দিলেন, একজন মানুষের বুকে কখনো দুটি হৃদয় থাকতে পারে না; মানুষের অন্তর একটিই—তাতে হয় খাঁটি ঈমান থাকবে, নয়তো কুফর থাকবে।
- যিহারের জাহেলী প্রথা বাতিল: আরবরা রাগের মাথায় স্ত্রীকে বলত «أنت علي كظهر أمي» (তুমি আমার জন্য আমার মায়ের পিঠের মতো)। তারা মনে করত এতে স্ত্রী চিরতরে আপন গর্ভধারিণী মায়ের মতো হয়ে যায়। আল্লাহ এই কুসংস্কার প্রত্যাখ্যান করে বললেন, কেবল মুখের কথায় স্ত্রী কখনো গর্ভধারিণী মা হয়ে যায় না।
- পালকপুত্র প্রথার বিলোপ সাধন: ইসলামে দত্তক সন্তানকে নিজের বংশপরিচয় দেওয়া নিষিদ্ধ করার বাস্তব প্রেক্ষাপট হিসেবে এটি নাযিল হয়।
(খ) দুই হৃদয়ের দাবিদার ব্যক্তি এবং কুরআনের আলোকে দত্তক/পালক নেওয়ার শরয়ী বিধান
১. যে ব্যক্তি দুটি হৃদয়ের দাবি করেছিল: কুরাইশ বংশের ফাহর গোত্রের জামীল ইবনে মা’মার আল-ফিহরী (جميل بن معمر الفهري) নামক এক ধূর্ত ও বাগ্মী ব্যক্তি দাবি করেছিল যে তার বুকের ভেতর দুটি হৃদয় রয়েছে, যার একটি দিয়ে সে মুহাম্মদ (সা.)-এর চেয়েও বেশি বোঝে। কাফেররা তাকে ‘যুল কালবাইন’ (দুই হৃদয়ের অধিকারী) ডাকত। বদরের যুদ্ধে কাফেররা পরাজিত হয়ে পালালে আবু সুফিয়ান দেখতে পান জামীল তার একটি জুতো হাতে এবং অপর জুতো পায়ে ঝুলিয়ে পাগলের মতো ছুটছে। আবু সুফিয়ান তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “মানুষের খবর কী?” সে ঘাবড়ে গিয়ে বলল, “সবাই খতম!” তখন সবাই বুঝতে পারল তার দুটি মন তো দূরের কথা, একটি সাধারণ বিবেকও ঠিকমতো কাজ করছে না। এছাড়া মুনাফিকদের সর্দারদের ব্যাপারেও এই কথা বর্ণিত আছে।
২. কুরআনের আলোকে সন্তান দত্তক নেওয়ার (আত-তাবান্নী – التبني) সুনির্দিষ্ট ফিকহী বিধান:
- পিতৃপরিচয় পরিবর্তনের সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা: জাহেলিয়াতের যুগে দত্তক সন্তানকে নিজের বংশনাম দেওয়া হতো এবং তাকে ঔরসজাত সন্তানের মতো উত্তরাধিকার দেওয়া হতো। রাসুলুল্লাহ (সা.) হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা (রা.)-কে মুক্ত করে দত্তক নিয়েছিলেন এবং সাহাবীরা তাঁকে ‘যায়েদ ইবনে মুহাম্মদ’ ডাকতেন। আল্লাহ তাআলা এই প্রথা সম্পূর্ণরূপে হারাম ঘোষণা করে নির্দেশ দেন: ﴿ادْعُوهُمْ لِآبَائِهِمْ هُوَ أَقْسَطُ عِنْدَ اللَّهِ﴾ অর্থাৎ “তাদেরকে তাদের আসল পিতার নামে ডাকো, এটাই আল্লাহর কাছে ন্যায়সঙ্গত।” এরপর থেকে তাঁকে ‘যায়েদ ইবনে হারেসা’ ডাকা শুরু হয়।
- উত্তরাধিকার ও সম্পদের বিধান: পালক সন্তান পালক পিতার সম্পত্তির স্বয়ংক্রিয় ওয়ারিশ হয় না। তবে পিতা চাইলে জীবদ্দশায় তাকে হেবা (দান) করতে পারেন অথবা সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ (১/৩) পর্যন্ত অসিয়ত করতে পারেন।
- মাহরাম ও পর্দার বিধান: পালক নেওয়া সন্তান সাবালক হলে সে পালক পিতা-মাতার সাথে মাহরাম হবে না। অর্থাৎ তাদের মধ্যে পর্দা ফরজ থাকবে। তবে যদি দুই বছরের মধ্যে পালক মা তাকে দুধ পান করায়, তবে দুধের সম্পর্কের কারণে সে ‘রেযাঈ সন্তান’ হিসেবে মাহরাম হবে।
- অনাথ লালন-পালনের মহৎ সাওয়াব: ইসলামে পিতৃপরিচয় গোপন করা নিষিদ্ধ করা হলেও এতিম ও অসহায় শিশুকে লালন-পালন করা, স্নেহ দেওয়া এবং অভিভাবকত্ব গ্রহণ করাকে জান্নাত লাভের সর্বোত্তম মাধ্যম হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
٩- قوله تعالى: ﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوا أَنْ تُصِيبُوا قَوْمًا بِجَهَالَةٍ فَتُصْبِحُوا عَلَى مَا فَعَلْتُمْ نَادِمِينَ – وَاعْلَمُوا أَنَّ فِيكُمْ رَسُولَ اللّٰهِ لَوْ يُطِيعُكُمْ فِي كَثِيرٍ مِنَ الْأَمْرِ لَعَنِتُّمْ وَلَكِنَّ اللّٰهَ حَبَّبَ إِلَيْكُمُ الْإِيمَانَ وَزَيَّنَهُ فِي قُلُوبِكُمْ وَكَرَّهَ إِلَيْكُمُ الْكُفْرَ وَالْفُسُوقَ وَالْعِصْيَانَ أُولَئِكَ هُمُ الرَّاشِدُونَ – فَضْلًا مِنَ اللّٰهِ وَنِعْمَةً وَاللّٰهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ﴾ [الحجرات: ٦-٨]
(أ) تحدث عن القيم الخلقية والاجتماعية الواردة في سورة الحجرات موجزًا-
(ب) ما معنى الفاسق؟ هل يعتبر خبر الفاسق في المعاملات كالوكالات والمضاربات؟ بيّن موضحًا-
আয়াতসমূহের সরল ও প্রামাণ্য অনুবাদ
“হে মুমিনগণ! কোনো পাপাচারী (ফাসেক) যদি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তা যাচাই-বাছাই করে সত্যতা নিশ্চিত কর; যাতে অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতিসাধন না করে বসো, অতঃপর নিজেদের কৃতকর্মের জন্য তোমাদের অনুতপ্ত হতে হয়। (৬) আর জেনে রাখ, তোমাদের মাঝে আল্লাহর রাসুল রয়েছেন; তিনি যদি বহু বিষয়ে তোমাদের কথা মেনে নিতেন তবে তোমরাই বিপদে পড়তে। কিন্তু আল্লাহ তোমাদের কাছে ঈমানকে প্রিয় করে দিয়েছেন এবং তা তোমাদের অন্তরে সুশোভিত করেছেন; আর কুফর, পাপাচার ও অবাধ্যতাকে তোমাদের কাছে ঘৃণ্য করে দিয়েছেন। এরাই হলো সত্যপথপ্রাপ্ত। (৭) এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ অনুগ্রহ ও নিয়ামত; আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময় (৮)।”
(ক) সূরা আল-হুজুরাতে বর্ণিত নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধসমূহ
সূরা আল-হুজুরাতকে সামগ্রিকভাবে ‘সূরাতুল আখলাক’ (নৈতিকতার সূরা) বলা হয়। এই সূরায় একটি আদর্শ মানবিক সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে যে কালজয়ী মূল্যবোধগুলো প্রদান করা হয়েছে তা নিচে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
- তথ্য যাচাই ও গুজবের মূলোৎপাটন (التثبت في الأخبار): যেকোনো সংবাদ শুনেই সিদ্ধান্ত না নিয়ে তার উৎস ও সত্যতা যাচাই করার নীতি। এটি সামাজিক স্থিতিশীলতার মেরুদণ্ড।
- বিরোধ নিষ্পত্তি ও মুসলিম ভ্রাতৃত্ব (الإصلاح بين المؤمنين): মুমিনরা একে অপরের ভাই। দুই দলের মধ্যে বিরোধ বাধলে ন্যায়বিচারের সাথে তা মীমাংসা করে দেওয়া প্রতিটি মুসলিমের কর্তব্য।
- কাউকে নিয়ে উপহাস ও বিদ্রূপ নিষিদ্ধকরণ (تحريم السخرية): কোনো ব্যক্তি বা সম্প্রদায়কে খাটো মনে করে উপহাস না করা; কারণ হতে পারে সে আল্লাহর নিকট অধিক উত্তম।
- খারাপ নামে ডাকা বর্জন (النهي عن التنابز بالألقاب): কাউকে এমন ব্যঙ্গাত্মক নাম বা উপাধি না দেওয়া যা তার ব্যক্তিত্বকে আঘাত করে।
- মন্দ ধারণা ও পরনিন্দা পরিহার (اجتناب الظن والغيبة): অহেতুক মানুষকে সন্দেহ না করা এবং কারো পেছনে গীবত না করা। গীবতকে মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সমান ঘৃণ্য অপরাধ বলা হয়েছে।
- ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা (النهي عن التجسس): কারো গোপন ত্রুটি খুঁজতে গোয়েন্দাগিরি না করা।
- বর্ণবাদ ও বৈষম্যের অবসান: সকল মানুষ আদম ও হাওয়া থেকে সৃষ্ট। বংশ, বর্ণ বা ভাষার কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই; আল্লাহর নিকট সর্বাধিক সম্মানিত সেই ব্যক্তি যে সবচেয়ে বেশি মুত্তাকী।
(খ) ফাসেকের পরিচয় এবং ব্যবসায়িক লেনদেনে (মুআমালাত) তার সংবাদের গ্রহণযোগ্যতা
১. ফাসেক (الْفَاسِقُ)-এর সংজ্ঞা: আরবি ভাষায় ‘ফাসাক্বা’ (فَسَقَ) অর্থ বের হয়ে যাওয়া। শরীয়তের পরিভাষায়: «الخارج عن طاعة الله بارتكاب كبيرة من كبائر الذنوب أو الإصرار على صغيرة» অর্থাৎ “যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্যের সীমা লঙ্ঘন করে কোনো কবিরা গুনাহে লিপ্ত হয় অথবা অনবরত সগিরা গুনাহ করতে থাকে, তাকে ফাসেক বলা হয়।”
২. লেনদেন ও ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে ফাসেকের সংবাদের ফিকহী মানদণ্ড:
- দীনি রেওয়ায়াত ও সাক্ষ্যদানের ক্ষেত্রে (الديانات والشهادات): বিচারিক আদালতে সাক্ষ্যদান এবং হাদিস রেওয়ায়াতের ক্ষেত্রে ফাসেকের সংবাদ সর্বসম্মতভাবে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।
- মুআমালাত বা ব্যবসায়িক লেনদেনের ক্ষেত্রে (المعاملات كالوكالة والمضاربة): হানাফী ফিকহের মূলনীতি অনুযায়ী লেনদেনের ক্ষেত্রে ফাসেকের সংবাদ সাধারণভাবে শর্তসাপেক্ষে গৃহীত হয়। কারণ পার্থিব লেনদেনে ন্যায়পরায়ণতার কঠিন শর্ত আরোপ করলে মানুষের জীবনযাত্রা ও বাণিজ্যে চরম অচলাবস্থা ও সংকীর্ণতা (হজর ও হরজ) সৃষ্টি হবে।
- ওকালত ও ব্যবসার বার্তা: ফাসেক ব্যক্তি যদি সংবাদ দেয়: “অমুক ব্যবসায়ী আপনাকে তার পণ্য বিক্রির উকিল বানিয়েছেন” অথবা “মুদারাবার মূলধন বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন”, তবে যদি তার সত্যতার কোনো প্রবল লক্ষণ থাকে এবং প্রতারণার কোনো স্পষ্ট প্রমাণ না থাকে, তবে তা গ্রহণ করা জায়েজ।
- সন্দেহযুক্ত ক্ষেত্রে যাচাই অপরিহার্য: কিন্তু যদি তার বক্তব্যে কোনো অস্পষ্টতা, আত্মস্বার্থ বা বিরোধের আশঙ্কা প্রকাশ পায়, তবে সূরা হুজুরাতের বিধান অনুযায়ী (ফাতাবাইয়্যানূ) লেনদেনের পূর্বে মূল মালিকের সাথে যাচাই করা আবশ্যক।
١٠- قوله تعالى: ﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مِنْ قَوْمٍ عَسَى أَنْ يَكُونُوا خَيْرًا مِنْهُمْ وَلَا نِسَاءٌ مِنْ نِسَاءٍ عَسَى أَنْ يَكُنَّ خَيْرًا مِنْهُنَّ وَلَا تَلْمِزُوا أَنْفُسَكُمْ وَلَا تَنَابَزُوا بِالْأَلْقَابِ بِئْسَ الِاسْمُ الْفُسُوقُ بَعْدَ الْإِيمَانِ وَمَنْ لَمْ يَتُبْ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ – يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ وَاتَّقُوا اللّٰهَ إِنَّ اللّٰهَ تَوَّابٌ رَحِيمٌ﴾ [الحجرات: ١١-١٢]
(أ) ما المراد بالظن والتجسس؟ ثم بيّن حكم الجاسوسية الدَّوْلِيَّة الإسلامية-
(ب) عرّف الغيبة مع بيان حكمها ثم اذكر حديثًا في ذمّ الغيبة-
আয়াতসমূহের সরল ও প্রামাণ্য অনুবাদ
“হে মুমিনগণ! কোনো পুরুষ যেন অপর পুরুষকে উপহাস না করে; হতে পারে তারা তাদের চেয়ে উত্তম। আর কোনো নারী যেন অপর নারীকে উপহাস না করে; হতে পারে তারা তাদের চেয়ে উত্তম। আর তোমরা একে অপরকে দোষারোপ করো না এবং একে অপরকে মন্দ উপাধিতে ডেকো না; ঈমান আনার পর ফাসেকী নাম কতই না মন্দ! আর যারা তওবা করে না তারাই তো জালেম। (১১) হে মুমিনগণ! তোমরা অধিকাংশ অনুমান থেকে বেঁচে থাক; কারণ কোনো কোনো অনুমান তো সুস্পষ্ট পাপ। আর তোমরা কারো গোপনীয় দোষ অনুসন্ধান করো না এবং একে অপরের গীবত করো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? নিশ্চয় তোমরা তা অপছন্দ কর; অতএব আল্লাহকে ভয় কর, নিশ্চয় আল্লাহ পরম তওবা কবুলকারী, অসীম দয়ালু (১২)।”
(ক) মন্দ ধারণা ও গোয়েন্দাগিরির অর্থ এবং ইসলামি আন্তর্জাতিক গুপ্তচরবৃত্তির বিধান
১. যন (الظَّنُّ – অনুমান বা ধারণা): এখানে যন দ্বারা এমন ভিত্তিহীন কুধারণা বা খারাপ ধারণাকে বোঝানো হয়েছে, যার সপক্ষে কোনো শরয়ী বা প্রত্যক্ষ আলামত নেই। কোনো সৎ ও পরহেযগার মুসলিম ভাইয়ের ব্যাপারে কোনো প্রমাণ ছাড়াই মনে মনে খারাপ ভাবা কবিরা গুনাহ।
২. তাজাসসুস (التَّجَسُّسُ – গোপনীয়তা খোঁজা): মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, ঘরের অন্দরমহল বা গোপন দোষত্রুটি উন্মোচন করার জন্য গোয়েন্দাগিরি করাকে তাজাসসুস বলা হয়। এটি ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
৩. আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ইসলামি রাষ্ট্রের গুপ্তচরবৃত্তির ফিকহী বিধান (الجاسوسية الدولية):
- বৈধ ও ওয়াজিব জাতীয় গোয়েন্দাগিরি: ইসলামি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষা, বহিরাগত শত্রু ও আগ্রাসনকারীদের ষড়যন্ত্র প্রতিহত করা এবং যুদ্ধকালীন সময়ে শত্রু শিবিরের গোপন তথ্য সংগ্রহের জন্য গোয়েন্দা নিযুক্ত করা সর্বসম্মতভাবে জায়েজ এবং ক্ষেত্রবিশেষে ওয়াজিব। স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা.) বদর, খন্দক ও মক্কা বিজয়ের সময় শত্রু বাহিনীর অবস্থান ও শক্তি জানার জন্য হযরত হুযাইফা বিন ইয়ামান (রা.) প্রমুখ সাহাবীদের তথ্য সংগ্রহের জন্য পাঠিয়েছিলেন। একে ইসলামি পরিভাষায় ‘উয়ূন’ (العيون) বলা হয়।
- অবৈধ গোয়েন্দাগিরি: নিজ মুসলিম নাগরিকদের ব্যক্তিগত অন্দরমহলে অনুপ্রবেশ করা, তাদের ঘরের দুর্বলতা অনুসন্ধান করা এবং সাধারণ মানুষের ইজ্জতহানি করার জন্য গোয়েন্দাগিরি করা সম্পূর্ণ হারাম।
(খ) গীবতের সংজ্ঞা, শরয়ী হুকুম এবং গীবত নিন্দায় সহীহ হাদীস
১. গীবত (الْغِيبَةُ)-এর সংজ্ঞা: সহীহ মুসলিমের হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বয়ং গীবতের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা দিয়েছেন:
«ذِكْرُكَ أَخَاكَ بِمَا يَكْرَهُ»
অর্থ: “তোমার মুসলিম ভাই সম্পর্কে এমন কোনো কথা তার অনুপস্থিতিতে বলা, যা শুনলে সে কষ্ট পাবে বা অপছন্দ করবে।” এক সাহাবী বললেন, “আমি যা বলছি তা যদি বাস্তবিকই তার মধ্যে বিদ্যমান থাকে?” রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করলেন: «إِنْ كَانَ فِيهِ مَا تَقُولُ فَقَدِ اغْتَبْتَهُ، وَإِنْ لَمْ يَكُنْ فِيهِ فَقَدْ بَهَتَّهُ» অর্থাৎ “তুমি যা বলছ তা যদি তার মধ্যে থাকে তবেই তুমি তার গীবত করলে; আর যদি তা তার মধ্যে না থাকে তবে তুমি তার ওপর মিথ্যা অপবাদ (বুহতান) আরোপ করলে” (সহীহ মুসলিম: ২৫৮৯)।
২. গীবতের শরয়ী হুকুম: গীবত করা কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমা অনুযায়ী চরম হারাম এবং অন্যতম জঘন্য কবিরা গুনাহ। কুরআনে একে নিজের মৃত ভাইয়ের পচা গোশত ভক্ষণের সাথে তুলনা করে এর ঘৃণ্যতা তুলে ধরা হয়েছে।
৩. গীবতের নিন্দায় হাদিস শরীফ:
- রাসুলুল্লাহ (সা.) মেরাজের রাতের এক লোমহর্ষক দৃশ্য বর্ণনা করে ইরশাদ করেন:
«لَمَّا عُرِجَ بِي مَرَرْتُ بِقَوْمٍ لَهُمْ أَظْفَارٌ مِنْ نُحَاسٍ يَخْمُشُونَ وُجُوهَهُمْ وَصُدُورَهُمْ، فَقُلْتُ: مَنْ هَؤُلَاءِ يَا جِبْرِيلُ؟ قَالَ: هَؤُلَاءِ الَّذِينَ يَأْكُلُونَ لُحُومَ النَّاسِ، وَيَقَعُونَ فِي أَعْرَاضِهِمْ»
অর্থ: “যখন আমাকে মিরাজে নিয়ে যাওয়া হলো, তখন আমি এমন এক সম্প্রদায়ের পাশ দিয়ে অতিক্রম করলাম যাদের তামার নখ ছিল এবং তারা তা দিয়ে নিজেদের মুখমণ্ডল ও বুক খুবলে খুবলে ছিঁড়ছিল। আমি বললাম: হে জিব্রাঈল! এরা কারা? জিব্রাঈল (আ.) বললেন: এরা তারাই যারা মানুষের গোশত খেত (গীবত করত) এবং তাদের ইজ্জত-সম্মান নিয়ে ছিনিমিনি খেলত” (সুনানে আবু দাউদ: ৪৮৭৮, সহীহ)।
مجموعة (ب) : গ্রুপ ‘খ’ (তাত্ত্বিক ও বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্নাবলি)
[যেকোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। প্রশ্নের মান ১০ নম্বর।]
١١- ما المفهوم بأحكام القرآن؟ ثم بيّن نشأته وتطوره وأنواعه مفصّلًا-
[আহকামুল কুরআন বলতে কী বোঝায়? অতঃপর এর উৎপত্তি, ক্রমবিকাশ এবং প্রকারভেদ বিস্তারিত আলোচনা কর।]
১. আহকামুল কুরআনের ধারণা ও সংজ্ঞা (المفهوم بأحكام القرآن)
শাব্দিক বিশ্লেষণ: ‘আহকাম’ (أَحْكَام) শব্দটি ‘হুকম’ (حُكْم)-এর বহুবচন, যার অর্থ বিধান, আদেশ-নিষেধ বা মীমাংসা। আর ‘কুরআন’ হলো আল্লাহর অবতীর্ণ কালাম।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: উলূমুল কুরআন ও উসূলে ফিকহের পরিভাষায়: «هو العلم الذي يبحث عن الآيات القرآنية التي تتضمن الأحكام الشرعية العملية، واستنباط القواعد الفقهية والتكليفية منها بأدلتها التفصيلية» অর্থাৎ “পবিত্র কুরআনের যেসকল আয়াতে মানবজীবনের ব্যবহারিক শরয়ী বিধিবিধান (যেমন: হালাল-হারাম, ইবাদত, মুআমালাত, বিবাহ-তালাক, দণ্ডবিধি ইত্যাদি) বর্ণিত হয়েছে, সেসকল আয়াত থেকে ফিকহী নীতিমালা ও হুকুম ইস্তিম্বাত করার বিদ্যাকে আহকামুল কুরআন বলা হয়।” আল্লামা সুয়ূতী ও জাস্সাস (রহ.)-এর মতে কুরআনে আহকাম সম্পর্কিত আয়াতের সংখ্যা প্রায় ৫০০ (মতান্তরে তার চেয়েও অধিক)।
২. আহকামুল কুরআনের উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশ (نشأته وتطوره)
- নবুওয়াত ও সাহাবা যুগ (বীজবপন কাল): রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বয়ং সাহাবায়ে কেরামকে কুরআনের আয়াতের বাস্তব ফিকহী প্রয়োগ শিক্ষা দেন। পরবর্তীতে হযরত উমর, আলী, ইবনে মাসউদ ও আয়েশা (রা.) আহকামের আয়াত থেকে ইজতিহাদ করে সমস্যার ফয়সালা করতেন।
- আইনি সংকলন ও ইমাম শাফেয়ীর সূচনা: হিজরী দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতকে যখন ফিকহী মাযহাবগুলো সুপ্রতিষ্ঠিত হতে থাকে, তখন স্বতন্ত্র শাস্ত্র হিসেবে এর সূচনা হয়। সর্বপ্রথম ইমাম মুহাম্মদ বিন ইদরীস আশ-শাফেয়ী (রহ.) (মৃ. ২০৪ হি.) আহকামুল কুরআন নামে স্বতন্ত্র গ্রন্থ প্রণয়ন করেন।
- মাযহাবী সংকলন ও স্বর্ণযুগ:
- হানাফী মাযহাব: ইমাম আবু বকর আল-জাস্সাস (রহ.) (মৃ. ৩৭০ হি.) তাঁর সুবিশাল আহকামুল কুরআন রচনা করে হানাফী উসূলে কুরআনের ব্যাখ্যা প্রদান করেন। পরবর্তীতে ইমাম কিয়া আল-হাররাসী (মৃ. ৫০৪ হি.) শাফেয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রন্থ লেখেন।
- মালেকী মাযহাব: কাযী আবু বকর ইবনুল আরাবী (রহ.) (মৃ. ৫৪৩ হি.) রচনা করেন কালজয়ী আহকামুল কুরআন এবং পরবর্তীতে ইমাম কুরতুবী (রহ.) (মৃ. ৬৭১ হি.) আল-জামি’ লি-আহকামিল কুরআন রচনা করে এই শাস্ত্রকে পূর্ণতার শিখরে পৌঁছে দেন।
- আধুনিক যুগ: সমকালীন সময়ে শায়খ মুহাম্মদ আলী আস-সাবূনী প্রণীত রাওয়ায়েউল বায়ান ফী তাফসীরি আয়াতিল আহকাম গ্রন্থটি আধুনিক শিক্ষার্থীদের নিকট এই বিষয়ের অন্যতম জনপ্রিয় পাঠ্যপুস্তক হিসেবে গৃহীত হয়েছে।
৩. আহকামুল কুরআনের প্রকারভেদ (أنواع أحكام القرآن)
কুরআনুল কারীমে বর্ণিত মানবজীবনের বিধানাবলিকে ফকীহগণ প্রধানত তিনটি মূল ভাগে বিভক্ত করেছেন:
| আহকামের শ্রেণি | আরবি পরিভাষা | ব্যাপ্তি ও মূল প্রতিপাদ্য বিষয় |
|---|---|---|
| ১. আকিদাগত বিধান | الأحكام الاعتقادية | আল্লাহর সত্তা ও সিফাত, ফেরেশতাগণ, আসমানী কিতাব, নবী-রাসুল, পরকাল ও তাকদীরের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন সংক্রান্ত অপরিহার্য বিধান। একে ‘ফিকহুল আকবার’ বলা হয়। |
| ২. নৈতিক ও চরিত্রগত বিধান | الأحكام الخلقية | আত্মশুদ্ধি, বিনয়, ধৈর্য, শুকরিয়া, সততা ও সচ্চরিত্রতা অর্জন এবং অহংকার, হিংসা, মিথ্যা ও কৃপণতা বর্জন সংক্রান্ত বিধান (ইলমুত তাসাউফ ও আখলাক)। |
| ৩. ব্যবহারিক ও ফিকহী বিধান | الأحكام العملية | মানুষের বাহ্যিক কর্ম ও আচরণের সাথে সংশ্লিষ্ট আইনি বিধান। এটি পুনরায় দুটি প্রধান শাখায় বিভক্ত: (ক) ইবাদাত (العبادات): নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত ইত্যাদি আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্কের বিধান। (খ) মুআমালাত ও সামাজিক আইন (المعاملات): চুক্তি, পারিবারিক আইন (বিবাহ, তালাক, উত্তরাধিকার), বিচারব্যবস্থা, দেওয়ানি ও ফৌজদারি দণ্ডবিধি (কিসাস ও হুদুদ) এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক। |
١٢- اكتب نبذة من حياة الإمام القرطبي مع خصائص تفسيره ومناهجه-
[ইমাম কুরতুবীর সংক্ষিপ্ত জীবনী এবং তাঁর তাফসীরের বৈশিষ্ট্য ও কর্মপদ্ধতি আলোচনা কর।]
১. ইমাম কুরতুবী (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী
- নাম ও উপাধি: নাম মুহাম্মদ বিন আহমদ বিন আবি বকর বিন ফারাহ। উপনাম আবুল আব্বাস। উপাধি ‘শামসুদ্দীন’ (দ্বীনের সূর্য)। জন্মস্থানের সাথে সম্বন্ধ করে তাঁকে ‘আল-কুরতুবী’ বলা হয়।
- জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন: তিনি স্পেনের (আন্দালুসিয়া) ঐতিহাসিক জ্ঞাননগরী কর্ডোভায় (কুরতুবা) জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন একজন সাধারণ কৃষক, যিনি খ্রিস্টানদের এক হামলায় শাহাদাত বরণ করেছিলেন। এরপর ইমাম কুরতুবী চরম দারিদ্র্যের মাঝে কঠোর পরিশ্রম করে জ্ঞানার্জন অব্যাহত রাখেন।
- জ্ঞানচর্চা ও হিজরত: তিনি কুরতুবার শ্রেষ্ঠ ওলামাদের নিকট আরবি ভাষা, বালাগাত, হাদিস ও মালেকী ফিকহে পাণ্ডিত্য লাভ করেন। পরবর্তীতে আন্দালুসিয়ায় খ্রিস্টানদের আগ্রাসন শুরু হলে তিনি জন্মভূমি ত্যাগ করে আলেকজান্দ্রিয়া ও কায়রো হয়ে মিসরের ঊর্ধ্বাঞ্চলের ‘মুনয়াতু বনী খাছীব’ (বর্তমান আল-মিনিয়া) শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।
- চরিত্র ও যুহদ: তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী, পরহেযগার ও দুনিয়াত্যাগী তাপস। সারাদিন ইলম চর্চা ও ইবাদতে মশগুল থাকতেন এবং একটি সাধারণ পশমী জুব্বা পরিধান করতেন।
- ইন্তেকাল: হিজরী ৬৭১ সনের ৯ই শাওয়াল মিসরের আল-মিনিয়ায় এই মহান মুফাসসির ইন্তেকাল করেন।
২. তাফসীরে কুরতুবীর মূল বৈশিষ্ট্য ও কর্মপদ্ধতি (خصائص تفسيره ومناهجه)
ইমাম কুরতুবী প্রণীত সুবিশাল বিশ খণ্ডের তাফসীরগ্রন্থ “আল-জামি’ লি-আহকামিল কুরআন ওয়াল মুবায়্যিনু লিমা তাদামানাহু মিনাস সুন্নাতি ওয়া আয়াতিল ফুরকান” (الجامع لأحكام القرآن) আহকামুল কুরআন ও সাধারণ তাফসীর সাহিত্যের এক অনন্য বিশ্বকোষ। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ নিম্নরূপ:
- আয়াত থেকে ফিকহী মাসআলাসমূহের সুশৃঙ্খল বিন্যাস: তিনি প্রতিটি আহকামের আয়াত উল্লেখ করে তার অধীনে «المسألة الأولى… المسألة الثانية…» (প্রথম মাসআলা, দ্বিতীয় মাসআলা…) এভাবে সংখ্যা দিয়ে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে শরয়ী বিধান আলোচনা করেছেন। কোনো কোনো আয়াতে তিনি ৩০টিরও বেশি ফিকহী মাসআলা উদ্ঘাটন করেছেন।
- ফিকহী মাযহাবসমূহের নিরপেক্ষ পর্যালোচনা ও ইনসাফ: যদিও তিনি মালেকী মাযহাবের অনুসারী ছিলেন, কিন্তু তাফসীরে তিনি কখনোই অন্ধ মাযহাবী পক্ষপাতিত্ব করেননি। দলিলের বিচারে যদি হানাফী বা শাফেয়ী মাযহাবের মত অধিক শক্তিশালী মনে হয়েছে, তিনি দ্বিধাহীনচিত্তে তাকে সমর্থন করেছেন।
- হাদিস ও আসার দ্বারা নিখুঁত প্রমাণ উপস্থাপন: তিনি কেবল অভিমত পেশ করেননি, বরং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মারফু হাদিস এবং সাহাবা ও তাবেয়ীদের বক্তব্য দিয়ে প্রতিটি মতের পক্ষে সনদ ও মতন বিশ্লেষণ করেছেন।
- ইসরাঈলী বর্ণনা ও দুর্বল রেওয়ায়াত বর্জন: অন্যান্য প্রাচীন তাফসীরকারকদের মতো তিনি ভিত্তিহীন কল্পকাহিনী বা অলীক ইসরাঈলিয়্যাত গ্রহণ করেননি, বরং এমন বর্ণনা পাওয়া গেলে তার কঠোর সমালোচনা করে তা খণ্ডন করেছেন।
- ভাষাতত্ত্ব, বালাগাত ও কিরাআতের প্রামাণ্য বিশ্লেষণ: আয়াতের জটিল শব্দের অর্থ বোঝাতে তিনি জাহেলী যুগের প্রাচীন বিশুদ্ধ আরবি কবিতা উদ্ধৃত করেছেন এবং বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য মুতাওয়াতির কিরাআতের কারণে অর্থে কী পরিবর্তন সূচিত হয় তা দক্ষতার সাথে তুলে ধরেছেন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: আহকামুল কুরআন শাস্ত্রের মূল আলোচ্য বিষয় কী?
উত্তর: পবিত্র কুরআনের যেসকল আয়াতে মানবজীবনের ব্যবহারিক শরয়ী বিধান (ইবাদত, মুআমালাত, দণ্ডবিধি ইত্যাদি) বর্ণিত হয়েছে, সেসকল আয়াত থেকে নির্ভরযোগ্য ফিকহী হুকুম ও নীতিমালা উদ্ঘাটন করা।
প্রশ্ন ২: ইসলামে যাদুচর্চা করার বিধান কী?
উত্তর: ইসলামি শরীয়তে যাদু করা, যাদু শিক্ষা করা এবং যাদুকরের শরণাপন্ন হওয়া সর্বসম্মতভাবে সম্পূর্ণ হারাম এবং জমহুর ফকীহদের মতে এটি স্পষ্ট কুফরী কাজ।
প্রশ্ন ৩: ইসলামে দত্তক বা পালক পুত্র গ্রহণের শরয়ী অবস্থান কী?
উত্তর: এতিম ও অসহায় শিশুকে লালন-পালন করা অত্যন্ত সাওয়াবের কাজ; কিন্তু তাকে নিজের ঔরসজাত সন্তান বানিয়ে তার পিতৃপরিচয় পরিবর্তন করা এবং মিরাসের অংশীদার বানানো ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
প্রশ্ন ৪: সূরা আল-হুজুরাতকে কেন ‘সূরাতুল আখলাক’ বলা হয়?
উত্তর: কারণ এই সূরায় তথ্য যাচাই, মুসলিম ভ্রাতৃত্ব রক্ষা, পরনিন্দা বর্জন, উপহাস না করা এবং বর্ণবাদ দূরীকরণের মতো সর্বজনীন সামাজিক ও নৈতিক আচরণবিধি বিধিবদ্ধ হয়েছে।
প্রশ্ন ৫: অবিবাহিত ও বিবাহিত যেনাকারীর শাস্তির মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর: অবিবাহিত যেনাকারীর শাস্তি হলো ১০০টি প্রকাশ্য বেত্রাঘাত; আর বিবাহিত যেনাকারীর শাস্তি হলো পাথর নিক্ষেপে মৃত্যুদণ্ড বা রজম।
প্রশ্ন ৬: ইমাম কুরতুবীর তাফসীরগ্রন্থটির প্রধান স্বাতন্ত্র্য কী?
উত্তর: এটি আহকামুল কুরআনের ওপর রচিত সর্ববৃহৎ বিশ্বকোষ, যেখানে অন্ধ মাযহাবী পক্ষপাতিত্ব পরিহার করে দলিলের ভিত্তিতে ইনসাফপূর্ণ ফিকহী ফয়সালা পেশ করা হয়েছে।