জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

আত-তারীখুল ইসলামী (At-Tarikhul Islami) – 201803, আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ – ফাজিল অনার্স ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা ২০২২

Abswer.com Abswer.com
20 September, 2026
৭৫ মিনিট পড়ার সময়
১৪ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

ফাজিল স্নাতক (সম্মান) ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা ২০২২
বিভাগ: আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: التاريخ الإسلامي (আত-তারীখুল ইসলামী / ইসলামের ইতিহাস)
বিষয় কোড: ২০১৮০৩ | পরীক্ষা কোড: ২০৮ | প্রশ্নপত্র কোড: ১১৩
পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা


مجموعة (الف) : الأسئلة التحريرية الشاملة (গ্রুপ ‘ক’ – বিশদ রচনামূলক প্রশ্নাবলি)

[الملاحظة: أجب عن أربعة أسئلة من هذه المجموعة. الدرجات: ৪ × ১৫ = ৬০]
(পরীক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি ও সামগ্রিক জ্ঞানার্জনের সুবিধার্থে গ্রুপ ‘ক’-এর ৮টি মূল প্রশ্নের সবগুলোই বিস্তারিত বিশ্লেষণসহ সমাধান করা হলো।)


١- ما الخلافة؟ تحدث عن منهج الانتخاب للخلفاء الراشدين؟

[খেলাফত কাকে বলে? খোলাফায়ে রাশেদীনের নির্বাচন পদ্ধতি আলোচনা কর।]

১. খেলাফতের সংজ্ঞা (مفهوم الخلافة):

আভিধানিক অর্থ: ‘খিলাফত’ (الْخِلَافَةُ) শব্দটির আভিধানিক অর্থ প্রতিনিধিত্ব, উত্তরাধিকার বা কারো অনুপস্থিতি বা ওফাতের পর তার স্থলাভিষিক্ত হওয়া।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: আল্লামা ইবনে খালদুন তাঁর বিখ্যাত মুকাদ্দিমায় সংজ্ঞায়িত করেছেন—

«حَمْلُ الْكَافَّةِ عَلَى مُقْتَضَى النَّظَرِ الشَّرْعِيِّ فِي مَصَالِحِهِمُ الْأُخْرَوِيَّةِ وَالدُّنْيَوِيَّةِ الرَّاجِعَةِ إِلَيْهَا، إِذْ أَحْوَالُ الدُّنْيَا تَرْجِعُ كُلُّهَا عِنْدَ الشَّارِعِ إِلَى اعْتِبَارِ مَصَالِحِ الْآخِرَةِ، فَهِيَ فِي الْحَقِيقَةِ خِلَافَةٌ عَنْ صَاحِبِ الشَّرْعِ فِي حِرَاسَةِ الدِّينِ وَسِيَاسَةِ الدُّنْيَا بِهِ»
অর্থাৎ: “দ্বীন ইসলামের সামগ্রিক হেফাজত ও সংরক্ষণের মাধ্যমে ইহকালীন ও পরকালীন কল্যাণে সার্বিক মানবসমাজকে শরিয়তের বিধিমালার অধীনে পরিচালনা করার উদ্দেশ্যে শরিয়তের প্রবর্তক মুহাম্মদ ﷺ-এর যে প্রতিনিধিত্ব, তাকেই খিলাফত বলা হয়।”

২. খোলাফায়ে রাশেদীনের নির্বাচন পদ্ধতি (منهج الانتخاب للخلفاء الراشدين):

খোলাফায়ে রাশেদীনের খিলাফত লাভ কোনো একক বা বংশানুক্রমিক রাজতান্ত্রিক ধারা ছিল না; বরং তা পরিচালিত হয়েছিল কুরআন নির্দেশিত শুরা (পরামর্শ) এবং জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত বায়আতের অনন্য গণতান্ত্রিক নীতির ওপর। চার খলিফার নির্বাচন পদ্ধতি ছিল নিম্নরূপ:

  1. হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর নির্বাচন (সাকীফায়ে বনু সায়িদা ও শুরা):
    • রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ওফাতের পর আনসার ও মুহাজির নেতৃবৃন্দ ‘সাকীফায়ে বনু সায়িদা’-তে সমবেত হয়ে খলিফা নির্বাচনের বিষয়ে পরামর্শে বসেন।
    • আনসারদের পক্ষ থেকে সাদ ইবনে উবাদা (রা.)-এর নাম প্রস্তাব করা হলে হযরত আবু বকর (রা.) কুরাইশদের নেতৃত্ব ও ঐতিহাসিক ঐক্য রক্ষার যৌক্তিকতা তুলে ধরেন।
    • হযরত উমর (রা.) ও আবু উবায়দা (রা.) আবু বকর (রা.)-এর গুণাবলী ও রাসুলের ইমামতির মনোনয়ন স্মরণ করে তাঁর হাতে সর্বপ্রথম বায়আত গ্রহণ করেন। অতঃপর সমস্ত উপস্থিত সাহাবী স্বতঃস্ফূর্তভাবে বায়আত হন এবং পরদিন মসজিদে নববীতে সাধারণ বায়আত (البيعة العامة) অনুষ্ঠিত হয়।
  2. হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর নির্বাচন (ইস্তিংলাফ বা প্রত্যক্ষ মনোনয়ন ও সর্বসম্মত অনুমোদন):
    • হযরত আবু বকর (রা.) তাঁর অন্তিম শয্যায় মুসলিম উম্মাহর সম্ভাব্য গৃহযুদ্ধ ও অনৈক্য রোধে শীর্ষস্থানীয় সাহাবীদের (যেমন আব্দুর রহমান ইবনে আউফ, উসমান, তালহা প্রমুখ) সাথে ব্যক্তিগতভাবে দীর্ঘ পরামর্শ করেন।
    • তিনি উমর (রা.)-এর নাম প্রস্তাব করে একটি ওসিয়তনামা প্রস্তুত করেন এবং সাহাবীদের উদ্দেশ্যে বলেন, “আমি কি আমার কোনো আত্মীয়কে মনোনয়ন দিয়েছি? আমি তোমাদের মাঝে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিকেই নির্বাচিত করেছি।”
    • সমস্ত সাহাবী একবাক্যে এই সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেন এবং আবু বকর (রা.)-এর ওফাতের পর উমর (রা.)-এর হাতে সাধারণ বায়আত গ্রহণ করেন।
  3. হযরত উসমান ইবনে আফফান (রা.)-এর নির্বাচন (নির্বাচনী বোর্ড বা শুরা কমিটি গঠন):
    • হযরত উমর (রা.) শাহাদাতের পূর্বে ছয়জন শীর্ষ আশারায়ে মুবাশশারাহ সাহাবীকে নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের শুরা কমিটি গঠন করেন: উসমান, আলী, আব্দুর রহমান ইবনে আউফ, সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস, যুবাইর এবং তালহা (রা.)।
    • কমিটির অন্যতম সদস্য আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) নিজে খলিফা হওয়ার দাবি ত্যাগ করে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা গ্রহণ করেন। তিনি একটানা তিন দিন মদিনার সাধারণ মানুষ, নারী, প্রবীণ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মতামত জরিপ করেন।
    • সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে তিনি হযরত উসমান (রা.)-এর হাতে বায়আত গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে সর্বস্তরের জনগণ তাঁর আনুগত্য স্বীকার করে।
  4. হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রা.)-এর নির্বাচন (গণদাবি ও প্রকাশ্য সর্বজনীন বায়আত):
    • হযরত উসমান (রা.)-এর মর্মান্তিক শাহাদাতের পর মদিনায় চরম বিশৃঙ্খলা ও সংকট সৃষ্টি হয়। তখন সাহাবায়ে কিরাম ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ হযরত আলী (রা.)-কে খিলাফতের গুরুদায়িত্ব গ্রহণের জন্য প্রবল অনুরোধ জানান।
    • হযরত আলী (রা.) কোনো গোপন বৈঠক প্রত্যাখ্যান করে বলেন, “আমার বায়আত কেবল প্রকাশ্যভাবে এবং মসজিদে নববীতে সাধারণ মুসলমানদের উপস্থিতিতেই হতে হবে।”
    • মসজিদে নববীতে বিশিষ্ট সাহাবী ও সর্বস্তরের মুসলমানদের স্বতঃস্ফূর্ত বায়আতের মাধ্যমে তিনি খলিফা নির্বাচিত হন।

٢- لماذا سمى عمر رضى الله عنه فاروقا؟ تحدث عن سياسته وإصلاحه مفصلاً-

[ওমর (রা)কে কেন ফারুক বলা হয়? তাঁর শাসন ও সংস্কার সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা কর।]

১. হযরত উমর (রা.)-কে ‘ফারুক’ উপাধি দানের কারণ:

‘ফারুক’ (الْفَارُوقُ) শব্দের অর্থ সত্য ও মিথ্যার মাঝে সুস্পষ্ট পার্থক্যকারী (المفرِّق بين الحق والباطل)। রাসুলুল্লাহ ﷺ হযরত উমর (রা.)-কে এই মর্যাদাপূর্ণ খেতাবে ভূষিত করেছিলেন। এর প্রধান ঐতিহাসিক কারণসমূহ:

  • ইসলামের প্রকাশ্য বিজয়: উমর (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণের পূর্বে মুসলমানরা গোপনে কাবা চত্বরে বা দারুল আরকামে সালাত আদায় করতেন। উমর (রা.) ঈমান আনার পর বললেন, “আমরা কি সত্যের ওপর নই? তবে কেন এই গোপনীয়তা?” তিনি মুসলমানদের দুটি কাতারে বিভক্ত করে বীরদর্পে কাবা প্রাঙ্গণে প্রকাশ্য সালাত কায়েম করেন। কাফেররা স্তব্ধ হয়ে যায়। সেদিন থেকেই সত্য ও মিথ্যার প্রকাশ্য বিচ্ছেদ ঘটে।
  • মুওয়াফাকাত বা কুরআনিক অনুকূলতা: উমর (রা.) যে বিষয়ে রায় দিতেন, আল্লাহ তাআলা তাঁর রায়ের সমর্থনে কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ করতেন (যেমন: মাকামে ইবরাহীমকে সালাতের স্থান নির্ধারণ, পর্দার বিধান ও বদরের বন্দীদের হুকুম)।

২. উমর (রা.)-এর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কারসমূহ (سياسته وإصلاحه):

হযরত উমর (রা.)-এর ১০ বছরের খিলাফতকাল ছিল ইসলামি প্রশাসনিক কাঠামোর স্বর্ণযুগ। তিনি যে যুগান্তকারী সংস্কারসমূহ সাধন করেন:

  1. মজলিশে শুরার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ: তিনি শীর্ষ সাহাবী ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে ‘মজলিশে শুরা’ গঠন করেন। গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত শুরার পরামর্শক্রমেই গৃহীত হতো।
  2. প্রদেশ বিভাজন ও যোগ্য গভর্নর নিয়োগ: বিশাল মুসলিম সাম্রাজ্যকে কয়েকটি প্রদেশে (যেমন মক্কা, মদিনা, বসরা, কুফা, দামেস্ক, ফিলিস্তিন ও মিসর) বিভক্ত করেন এবং আমীর ও ওয়ালী নিয়োগ করেন।
  3. কঠোর জবাবদিহিতা ও সম্পদ তদারকি: যেকোনো গভর্নর বা কর্মকর্তার নিয়োগের সময় তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের হিসাব লিপিবদ্ধ করা হতো। হজের মৌসুমে সাধারণ মানুষের সরাসরি অভিযোগ শুনতেন এবং প্রয়োজনে শীর্ষ গভর্নরদেরও জবাবদিহি করতেন।
  4. বিচার বিভাগকে শাসন বিভাগ থেকে পৃথকীকরণ: তিনিই ইতিহাসে সর্বপ্রথম বিচার বিভাগকে (القضاء) স্বাধীন করেন এবং কাজী বা বিচারপতিদের আলাদা বেতন ও ক্ষমতা নির্ধারণ করেন (যেমন কাজী শুরাইহ)।
  5. বায়তুল মাল ও দেওয়ান প্রতিষ্ঠা: রাষ্ট্রীয় কোষাগার বা বায়তুল মালকে একটি বিধিবদ্ধ রূপ দেন। তিনিই সর্বপ্রথম সরকারি রেজিস্টার (দিওয়ান) চালু করে সেনাবাহিনী ও সাধারণ নাগরিকদের জন্য নিয়মিত ভাতার ব্যবস্থা করেন।
  6. ভূমি সংস্কার ও ‘খারাজ’ ব্যবস্থা: বিজিত ভূমিসমূহ সৈন্যদের মাঝে ভাগ না করে মূল মালিক কৃষকদের হাতে রেখে রাষ্ট্রীয় রাজস্ব (খারাজ) ধার্য করেন, যা কৃষির বিকাশ ঘটায়।
  7. হিজরি সন প্রবর্তন: খিলাফতের ঐতিহাসিক নথিপত্রের সুবিধার্থে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর হিজরতের ঐতিহাসিক ঘটনাকে ভিত্তি করে ১৬ হিজরীতে হিজরি ক্যালেন্ডার প্রবর্তন করেন।
  8. ডাক বিভাগ ও পুলিশ/নিরাপত্তা বাহিনী: বেসামরিক নাগরিকদের জানমালের পাহারায় ‘আহদাস’ বা রাত্রিকালীন টহল ব্যবস্থা এবং সরকারি বার্তার দ্রুত আদান-প্রদানে ডাক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলেন।

٣- من عبد الملك بن مروان؟ تحدث عن اصلاحاته مفصلاً-

[আব্দুল মালেক বিন মারওয়ান কে? তাঁর সংস্কার সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা কর।]

১. আব্দুল মালেক বিন মারওয়ানের পরিচয়:

আব্দুল মালেক ইবনে মারওয়ান ইবনিল হাকাম (৬৫–৮৬ হি. / ৬৮৫–৭০৫ খ্রি.) ছিলেন উমাইয়া খিলাফতের ৫ম খলিফা। উমাইয়া রাজবংশের সংকটকালে তিনি ক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রা.)-এর সাথে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে গোটা মুসলিম জাহানকে একক উমাইয়া পতাকাতলে একত্রিত করেন। এজন্য ইতিহাসবিদগণ মুয়াবিয়া (রা.)-এর পর আব্দুল মালেককে উমাইয়া সাম্রাজ্যের “দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাতা” (المؤسس الثاني للدولة الأموية) হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

২. আব্দুল মালেকের যুগান্তকারী সংস্কারসমূহ (إصلاحاته):

  • আরবিকরণ নীতি (تعريب الدواوين): তিনিই প্রথম সরকারি ভাষা হিসেবে আরবিকে বাধ্যতামূলক করেন। এর পূর্বে সিরিয়ায় গ্রিক, ইরাকে ফারসি এবং মিশরে কিবতি ভাষায় সরকারি দফতর পরিচালিত হতো। এর ফলে আরবি ভাষা আন্তর্জাতিক প্রশাসনিক ও বৈজ্ঞানিক ভাষার মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়।
  • স্বতন্ত্র ইসলামি মুদ্রা প্রবর্তন (إصلاح العملة والنقود): এর পূর্বে মুসলমানরা রোমান স্বর্ণমুদ্রা (দিনার) এবং পারস্যের রৌপ্যমুদ্রা (দিরহাম) ব্যবহার করত। আব্দুল মালেক রোমান প্রতীক ও ক্রুশ অপসারণ করে নিজস্ব ইসলামি দিনার ও দিরহাম চালু করেন, যার একদিকে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এবং অন্যদিকে রাসুলের রিসালাতের ঘোষণা ও সাল অঙ্কিত ছিল।
  • ডাক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার পুনর্গঠন (تطوير البريد): সাম্রাজ্যের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে দ্রুত সংবাদ ও গোয়েন্দা তথ্য প্রেরণের জন্য নিয়মিত ঘোড়সওয়ার ডাক ব্যবস্থা (বারীদ) ঢেলে সাজান।
  • স্থাপত্যশিল্প ও বায়তুল মুকাদ্দাস নির্মাণ: তিনি ৬৮৮-৬৯১ খ্রিস্টাব্দে জেরুজালেমে সুবিখ্যাত কুব্বাতুস সাখরা (Dome of the Rock) নির্মাণ করেন, যা ইসলামি স্থাপত্যশিল্পের এক বিস্ময়কর মাইলফলক।
  • কুরআনে হরকত ও নুক্তা সংযোজনের পৃষ্ঠপোষকতা: অনারবদের কুরআন তিলাওয়াত বিশুদ্ধ করার লক্ষ্যে তাঁরই অনুমোদনে এবং হাজ্জাজ বিন ইউসুফের তত্ত্বাবধানে প্রখ্যাত ভাষাবিদ আবুল আসওয়াদ দুয়ালী ও নাসর বিন আসিম কুরআনের হরফে নুক্তা ও হরকত সংযোজন করেন।

٤- اكتب مساهمة العباسيين فى تطور العلم والفنون والثقافة-

[জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির বিকাশে আব্বাসীদের অবদান লিপিবদ্ধ কর।]

১. আব্বাসী যুগের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:

আব্বাসী খিলাফতকাল (১৩২–৬৫৬ হি. / ৭৫০–১২৫৮ খ্রি.), বিশেষ করে খলিফা আল-মনসুর, হারুনুর রশীদ এবং আল-মামুনের আমল ছিল ইসলামি ইতিহাসের “স্বর্ণযুগ” (العصر الذهبي للإسلام)। এই যুগে জ্ঞানচর্চা বিশ্বমঞ্চে নেতৃত্ব প্রদান করে।

২. জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিতে আব্বাসীদের অবদান:

  1. ‘বাইতুল হিকমাহ’ (House of Wisdom) প্রতিষ্ঠা: বাগদাদে খলিফা হারুনুর রশীদ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এবং আল-মামুন কর্তৃক সমৃদ্ধ ‘বাইতুল হিকমাহ’ ছিল একাধারে আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সুবিশাল লাইব্রেরি এবং অনুবাদের কেন্দ্র। এখানে গ্রিক, ভারতীয়, পারসিক ও সিরিয়াক ভাষার সমস্ত বিজ্ঞান ও দর্শনের ক্লাসিক গ্রন্থসমূহ আরবিতে অনূদিত হয়।
  2. চিকিৎসাবিজ্ঞান (الطب):
    • ইবনে সিনা রচনা করেন আল-কানুন ফিত তিব্ব, যা শত শত বছর ধরে ইউরোপের মেডিকেল কলেজসমূহে প্রধান পাঠ্য ছিল।
    • আবু বকর আল-রাযী সংকলন করেন আল-হাবী এবং হাম ও বসন্ত রোগের প্রথম নির্ভুল জীবাণুবিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা দেন।
  3. গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞান (الرياضيات والفلك):
    • মুহাম্মদ ইবনে মূসা আল-খাওয়ারিজমি বীজগণিত (Algebra)-র জনক। তাঁর কিতাব আল-জাবর ওয়াল মুকাবালা এবং অ্যালগরিদম (Algorithm) আধুনিক কম্পিউটার বিজ্ঞানের মূলভিত্তি।
    • আল-বাত্তানী এবং আল-বিরুনী নিখুঁত মানমন্দির তৈরি করে পৃথিবীর পরিধি ও গ্রহ-নক্ষত্রের দূরত্ব পরিমাপ করেন।
  4. রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞান (الكيمياء والفيزياء): জাবির ইবনে হাইয়ানকে বলা হয় রসায়নের জনক; তিনি নাইট্রিক এসিড, সালফিউরিক এসিড এবং পাতন (distillation) প্রক্রিয়া আবিষ্কার করেন। আল-হাসান ইবনুল হাইসাম আলোকবিজ্ঞানের (Optics) ওপর কালজয়ী কিতাবুল মানাযির রচনা করেন।
  5. ইসলামি আইন ও তাফসির শাস্ত্র: চার প্রধান মাযহাবের বিকাশ, সিহাহ সিত্তাহর হাদিস সংকলন এবং তাবারীর মতো মহান মুফাসসিরদের আবির্ভাব ঘটে এই আব্বাসী যুগেই।

٥- من السلطان محمد الفاتح؟ تحدث عن فتوحاته فى أوروبا-

[সুলতান মুহাম্মদ আল-ফাতেহ কে? ইউরোপে তাঁর বিজয়াভিযান সম্পর্কে আলোচনা কর।]

১. সুলতান মুহাম্মদ আল-ফাতেহের পরিচয়:

সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ (মুহাম্মদ আল-ফাতেহ: ১৪৩২–১৪৮১ খ্রি.) ছিলেন উসমানী (অটোমান) সাম্রাজ্যের সপ্তম সুলতান। তিনি ১৪৫৩ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সে পরাক্রমশালী বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপল (বর্তমান ইস্তাম্বুল) জয় করে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ভবিষ্যদ্বাণীকে বাস্তবে রূপ দান করেন। রাসুল ﷺ ইরশাদ করেছিলেন: «لَتُفْتَحَنَّ الْقُسْطَنْطِينِيَّةُ، فَلَنِعْمَ الْأَمِيرُ أَمِيرُهَا، وَلَنِعْمَ الْجَيْشُ ذَلِكَ الْجَيْشُ» (অবশ্যই কনস্টান্টিনোপল বিজিত হবে; কতই না চমৎকার সেই আমীর এবং কতই না চমৎকার সেই সেনাদল!)।

২. ইউরোপে তাঁর গৌরবোজ্জ্বল বিজয়াভিযানসমূহ:

  • কনস্টান্টিনোপল বিজয় (১৪৫৩ খ্রি.): তিনি স্থলপথ দিয়ে গভীর রাতে ৭০টিরও বেশি যুদ্ধজাহাজ কাঠে চর্বি মাখিয়ে পাহাড় অতিক্রম করিয়ে গোল্ডেন হর্নে নামিয়ে বিশ্বকে স্তম্ভিত করে দেন। সুবিশাল কামান (Urban Cannon) দিয়ে কনস্টান্টিনোপলের অজেয় প্রাচীর গুঁড়িয়ে দেন এবং ২৯ মে ১৪৫৩ তারিখে শহরটি বিজয় করেন। শহরটির নাম পরিবর্তন করে ‘ইসলামবুল’ বা ইস্তাম্বুল রাখা হয়।
  • সার্বিয়া বিজয় (১৪৫৯ খ্রি.): কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের পর তিনি বলকান অঞ্চলের সার্বিয়াকে উসমানী সাম্রাজ্যের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনেন।
  • মোরিয়া ও এথেন্স বিজয় (১৪৬০ খ্রি.): প্রাচীন গ্রিসের শিল্প-সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র এথেন্স ও পেলোপনিসাসের মোরিয়া অঞ্চলকে তিনি ইসলামি শাসনের অধীনে নিয়ে আসেন।
  • বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা বিজয় (১৪৬৩ খ্রি.): বসনিয়ার রাজা স্টিফেন তোমাশেভিচকে পরাজিত করে পুরো বসনিয়াকে তিনি অটোমান প্রদেশ করেন। সুলতানের ন্যায়পরায়ণতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতায় মুগ্ধ হয়ে বসনিয়ার বিপুলসংখ্যক খ্রিস্টান স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইসলাম গ্রহণ করে।
  • আলবেনিয়া ও কাফফা বিজয় (১৪৭৫-১৪৭৯ খ্রি.): তিনি ভেনিস ও জেনোয়ার আধিপত্য ভেঙে কৃষ্ণসাগরকে একটি ‘অটোমান হ্রদ’-এ পরিণত করেন এবং স্কান্দারবেগের দীর্ঘ বিদ্রোহ দমন করে আলবেনিয়াকে পদানত করেন।
  • ইতালির ওটরান্টো বিজয় (১৪৮০ খ্রি.): তিনি ইউরোপের হৃদপিণ্ড রোম বিজয়ের উদ্দেশ্যে ইতালির ওটরান্টো উপকূলে উসমানী বাহিনী অবতরণ করান। তবে ১৪৮১ সালে তাঁর আকস্মিক ওফাতের ফলে সেই অভিযান স্থগিত হয়।

٦- اذكر مآثر السلطان معز الدين محمد الغورى مؤسِّسًا لإمبراطورية-

[একটি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে সুলতান মু’য়িজ উদ্দিন মুহাম্মদ ঘুরীর কৃতিত্ব পর্যালোচনা কর।]

১. সুলতান মুহাম্মদ ঘুরীর পরিচয়:

সুলতান শিহাবুদ্দিন মুহাম্মদ ঘুরী (যিনি মু’য়িজ উদ্দিন মুহাম্মদ ঘুরী নামে খ্যাত; ১১৪৯–১২০৬ খ্রি.) ছিলেন মধ্য আফগানিস্তানের ঘুর রাজবংশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক। গজনভীর সুলতান মাহমুদ ভারত আক্রমণ করলেও তিনি কোনো স্থায়ী মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা করে যাননি; কিন্তু মুহাম্মদ ঘুরী ভারতবর্ষে স্থায়ী মুসলিম সাম্রাজ্যের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা (The Real Founder of Muslim Empire in India)।

২. সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে ঘুরীর ঐতিহাসিক কৃতিত্ব:

  1. দূরদর্শী রাজনৈতিক লক্ষ্য: সুলতান মাহমুদ যেখানে ধনসম্পদ অর্জন ও সীমান্ত সুরক্ষার অভিযান চালিয়েছিলেন, সেখানে মুহাম্মদ ঘুরী এসেছিলেন ভারতে একটি চিরস্থায়ী ইসলামি রাজনৈতিক ভিত্তি স্থাপন করতে।
  2. তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধ (১১৯২ খ্রি.):
    • ১১৯১ সালে তরাইনের প্রথম যুদ্ধে পৃথ্বীরাজ চৌহানের কাছে পরাজিত হলেও ঘুরী হতোদ্যম হননি। তিনি এক বছর ধরে নিখুঁত রণকৌশল ও শৃঙ্খলা গড়ে তোলেন।
    • ১১৯২ সালে তরাইনের দ্বিতীয় প্রান্তরে পৃথ্বীরাজের সুবিশাল বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাস্ত করেন। এই যুদ্ধই উত্তর ভারতে হিন্দু আধিপত্যের অবসান ঘটিয়ে মুসলিম বিজয়ের দ্বার উন্মুক্ত করে।
  3. প্রশাসনিক ভিত্তি ও দাস সেনাপতিদের লালন: মুহাম্মদ ঘুরীর সবচেয়ে বড় দূরদর্শিতা ছিল তাঁর যোগ্য দাসদের দক্ষ সেনাপতি ও প্রশাসক হিসেবে গড়ে তোলা। তিনি কুতুবুদ্দিন আইবেককে দিল্লির গভর্নর এবং বখতিয়ার খলজিকে পূর্ব ভারতে পাঠান।
  4. বাংলা ও বিহারের সংযোজন: তাঁরই জেনারেল ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজি ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ১৮ জন অশ্বারোহী নিয়ে লক্ষণ সেনকে পরাজিত করে বাংলা জয় করেন।
  5. দিল্লি সালতানাতের পথ সুগমকরণ: ১২০৬ সালে মুহাম্মদ ঘুরীর শাহাদাতের পর তাঁর প্রধান সেনাপতি কুতুবুদ্দিন আইবেক স্বাধীন ‘দিল্লি সালতানাত’ ও দাস বংশের ভিত্তি স্থাপন করেন, যা পরবর্তী প্রায় সাড়ে ছয়শত বছর ধরে ভারতে মুসলিম শাসনের ঐতিহ্য রচনা করে।

٧- اذكر أسباب سقوط الدولة المغولية مفصلاً-

[মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের কারণগুলো বিস্তারিত উল্লেখ কর।]

১. মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের ঐতিহাসিক পটভূমি:

বাবর কর্তৃক ১৫২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং আকবর ও আওরঙ্গজেবের শাসনামলে সমগ্র উপমহাদেশে বিস্তৃত পরাক্রমশালী মুঘল সাম্রাজ্য ১৭০৭ সালে আওরঙ্গজেবের ওফাতের পর দ্রুত পতনের মুখে পতিত হয় এবং ১৮৫৭ সালে বাহাদুর শাহ জাফরের নির্বাসনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত হয়।

২. পতনের প্রধান অভ্যন্তরীণ ও বহিঃকারণসমূহ:

  • দুর্বল ও অযোগ্য উত্তরাধিকারী: আওরঙ্গজেবের পরবর্তী মুঘল সম্রাটরা (মুহাম্মদ শাহ রঙ্গিলা, আহমদ শাহ প্রমুখ) ছিলেন বিলাসপ্রিয়, দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং প্রশাসনিক যোগ্যতাহীন। তারা রঙমহলের আমোদ-প্রমোদে মত্ত থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা অবহেলা করেন।
  • নির্দিষ্ট উত্তরাধিকার আইনের অভাব: মুঘলদের কোনো সুস্পষ্ট উত্তরাধিকার আইন ছিল না। প্রতিজন সম্রাটের মৃত্যুর পর ভাইদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ শুরু হতো, যা সাম্রাজ্যের রাজকোষ, দক্ষ সৈন্যবাহিনী ও প্রশাসনিক কাঠামোকে ধ্বংস করে দিত।
  • আমির ও দরবারীদের দলীয় কোন্দল: মুঘল দরবার তূরানী, ইরানী, হিন্দুস্তানি ও আফগান দলে বিভক্ত হয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। সৈয়দ ভ্রাতৃদ্বয় (কিং মেকার) নিজেদের ইচ্ছামতো সম্রাট বদল করতে শুরু করে।
  • অর্থনৈতিক সংকট ও জায়গিরদারি বিপর্যয়: দীর্ঘস্থায়ী দাক্ষিণাত্য যুদ্ধ এবং সম্রাটদের অতিরিক্ত অপচয়ের কারণে রাজকোষ শূন্য হয়ে পড়ে। জায়গিরের সংকট দেখা দেয় এবং কৃষকদের ওপর করের বোঝা বেড়ে গিয়ে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়।
  • সামরিক দুর্বলতা ও প্রযুক্তির পশ্চাৎপদতা: মুঘল সেনাবাহিনী আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র, উন্নত নৌবাহিনী এবং ইউরোপীয় সামরিক শৃঙ্খলার সাথে তাল মেলাতে ব্যর্থ হয়। সৈন্যদের আনুগত্য সম্রাটের পরিবর্তে স্থানীয় মনসবদারদের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
  • বহিরাগত আক্রমণ (নাদির শাহ ও আহমদ শাহ আবদালী): ১৭৩৯ সালে পারস্যের নাদির শাহের দিল্লি আক্রমণ ও লুণ্ঠন মুঘলদের কোহিনূর হীরা ও ময়ূর সিংহাসন ছিনিয়ে নেয় এবং তাদের শক্তিকে পঙ্গু করে দেয়। পরবর্তীতে আবদালীর উপর্যুপরি আক্রমণ সাম্রাজ্যের কোমর ভেঙে দেয়।
  • মারাঠা, শিখ ও রাজপুতদের উত্থান: আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে মারাঠারা শিবাজীর নেতৃত্বে এবং পরবর্তীতে পেশোয়াদের অধীনে দিল্লি পর্যন্ত মুঘল কর্তৃত্বকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে।
  • ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কুটিল চক্রান্ত: সর্বশেষে ব্রিটিশরা মুঘলদের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ১৭৫৭ সালে পলাশী এবং ১৭৬৪ সালে বক্সারের যুদ্ধের মাধ্যমে প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী হয় এবং মুঘল সম্রাটকে পুতুলে পরিণত করে।

٨- تحدث عن خدمات الصوفية فى نشر الاسلام فى بنغلاديش-

[বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারে সুফীদের অবদান আলোচনা কর।]

১. বাংলায় সুফিবাদ ও ইসলাম প্রচারের পটভূমি:

বাংলাদেশে তরবারির জোরে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়নি; বরং সুফী-সাধক ও আউলিয়া-ই-কেরামের নিঃস্বার্থ মানবসেবা, আত্মিক পবিত্রতা, অসাধারণ চারিত্রিক মাধুর্য এবং সামাজিক সাম্যের আকর্ষণে এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ নিপীড়িত মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে।

২. সুফীদের সুনির্দিষ্ট খেদমত ও ভূমিকা:

  1. বর্ণপ্রথার শিকার নিম্নবর্ণের হিন্দুদের মুক্তি: প্রাচীন বাংলায় ব্রাহ্মণবাদী কঠোর বর্ণপ্রথা ও জাতিভেদ দ্বারা সাধারণ শূদ্র ও দলিতরা অমানবিক নির্যাতনের শিকার ছিল। সুফীরা তাঁদের খানকাহে ধনী-দরিদ্র, উচ্চ-নীচ নির্বিশেষে সকলকে এক কাতারে বসিয়ে আহার করিয়ে মানবিক সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
  2. লঙ্গরখানা ও মানবসেবা: প্রতিটি সুফী খানকাহ ছিল ক্ষুধার্তদের অন্নশালা, গৃহহীনদের আশ্রয়স্থল এবং চিকিৎসাবঞ্চিতদের সেবা কেন্দ্র। মানুষের বিপদে সুফীদের নিঃশর্ত পাশে দাঁড়ানো বাংলার সাধারণ মানুষকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করে।
  3. জঙ্গল পরিষ্কার ও জনবসতি স্থাপন: রিচার্ড ইটন তাঁর The Rise of Islam and the Bengal Frontier গ্রন্থে প্রমাণ করেছেন যে, মুসলিম সুফীরা সুন্দরবন ও বরেন্দ্র অঞ্চলের গহীন বন জঙ্গল পরিষ্কার করে কৃষি বিপ্লব ঘটান এবং লাখ লাখ দরিদ্র ভূমিহীন মানুষকে পুনর্বাসিত করেন।
  4. শীর্ষস্থানীয় সুফী সাধকদের অবদান:
    • শাহ জালাল (রহ.): সিলেটের পাহাড়ি এলাকায় হিন্দু রাজা গৌরগোবিন্দের নির্মম অত্যাচার দমন করে তাঁর ৩৬০ জন আউলিয়ার মাধ্যমে সমগ্র বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে ইসলামের আলো প্রজ্জ্বলিত করেন।
    • খান জাহান আলী (রহ.): দক্ষিণাঞ্চলের বাগেরহাটে নোনা পানির দেশে শত শত সুপেয় পানির দিঘি খনন, রাস্তাঘাট ও অনন্য ষাটগম্বুজ মসজিদ নির্মাণ করে ইসলাম প্রচার করেন।
    • শাহ মাখদুম রূপোশ (রহ.): বরেন্দ্র অঞ্চলের রাজশাহীতে ইসলাম প্রচার করেন।
    • বাবা আদম শহীদ (রহ.): বিক্রমপুরে প্রাচীন বাংলায় ইসলামের দাওয়াত পৌঁছান।
    • শাহ পরান, বায়েজিদ বোস্তামী (চট্টগ্রাম), বদর শাহ প্রমুখ: তাঁদের ঐকান্তিক পরিশ্রমে চট্টগ্রাম ‘বারো আউলিয়ার দেশ’ হিসেবে ইসলামি রূপ ধারণ করে।
  5. বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশ: সুফী ও তাঁদের অনুসারী মুসলিম সুলতানরা সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা বাংলাকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে পুঁথি ও অনুবাদ সাহিত্যের মাধ্যমে ইসলামি মূল্যবোধ ঘরে ঘরে পৌঁছে দেন।

مجموعة (ب) : الأسئلة الموجزة والتحليلية (গ্রুপ ‘খ’ – সংক্ষিপ্ত ও বিশ্লেষণমূলক প্রশ্নাবলি)

[الملاحظة: أجب عن أربعة أسئلة من هذه المجموعة. الدرجات: ৪ × ৫ = ২০]
(পরীক্ষার্থীদের সেরা প্রস্তুতি ও পূর্ণাঙ্গ সহায়ক তথ্যের জন্য গ্রুপ ‘খ’-এর ৮টি প্রশ্নের সবগুলোরই গভীর একাডেমিক উত্তর প্রস্তুত করা হলো।)


٩- ما الفرق بين الخلافة والملوكية؟ اكتب-

[খেলাফত এবং রাজতন্ত্রের মাঝে পার্থক্য কী? লেখ।]

ইসলামী রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইতিহাসে খিলাফত (الخلافة) এবং রাজতন্ত্র (الملوكية)-এর মধ্যে মৌলিক পার্থক্যসমূহ বিদ্যমান:

পার্থক্যের ক্ষেত্র ইসলামী খিলাফত (الخلافة الراشدة) বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্র (الملوكية)
সার্বভৌমত্ব ও সংবিধান একচ্ছত্র সার্বভৌমত্ব আল্লাহর; খলিফা কেবল আল্লাহর শরিয়ত বাস্তবায়নকারী প্রতিনিধি। রাজার আদেশই আইন; রাজা নিজেই সার্বভৌম ক্ষমতার উৎস বলে দাবি করে।
শাসক নির্বাচন পদ্ধতি যোগ্যতার ভিত্তিতে শুরা (পরামর্শ) ও জনগণের মুক্ত বায়আতের মাধ্যমে খলিফা নির্বাচিত হন। শক্তি প্রয়োগ, বংশগত উত্তরাধিকার বা জোরপূর্বক সিংহাসন দখলের মাধ্যমে রাজা ক্ষমতা গ্রহণ করে।
জবাবদিহিতা ও সমালোচনা খলিফা আইনের ঊর্ধ্বে নন; সাধারণ নাগরিকও আদালতে খলিফার বিরুদ্ধে মামলা ও প্রশ্ন করতে পারে। রাজা সমস্ত আইনের ঊর্ধ্বে (King can do no wrong); রাজার সিদ্ধান্তের সমালোচনা রাজদ্রোহিতা বলে গণ্য।
বায়তুল মালের প্রকৃতি রাষ্ট্রীয় কোষাগার জনগণের আমানত; খলিফা সাধারণ দিনমজুরের সমপরিমাণ বেতন নিতে পারেন। রাষ্ট্রীয় তহবিল রাজার ব্যক্তিগত সম্পত্তি; অপচয় ও বিলাসিতায় রাজপরিবারের একচ্ছত্র অধিকার।
মূল লক্ষ্য আখেরাতের সাফল্য ও ইহকালীন সুবিচার প্রতিষ্ঠা। নিজের সাম্রাজ্য বিস্তার, ক্ষমতা রক্ষা এবং রাজবংশের স্বার্থ হাসিল।

١٠- بين الآيات والاحاديث المشيرة إلى خلافة أبى بكر الصديق (رض)-

[হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা) এর খিলাফতের ইঙ্গিতবাহী আয়াত ও হাদিসসমূহ বর্ণনা কর।]

১. কুরআনিক ইঙ্গিতসমূহ (الآيات المشيرة):

  • সূরা আত-তওবা (আয়াত ৪০): «إِلَّا تَنصُرُوهُ فَقَدْ نَصَرَهُ اللَّهُ إِذْ أَخْرَجَهُ الَّذِينَ كَفَرُوا ثَانِيَ اثْنَيْنِ إِذْ هُمَا فِي الْغَارِ إِذْ يَقُولُ لِصَاحِبِهِ لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا»—হিজরতের সংকটময় মুহূর্তে গুহায় রাসুলের একমাত্র সঙ্গী ও সহযাত্রী হিসেবে আবু বকর (রা.)-এর এই অবিসংবাদিত মর্যাদা খিলাফতের শ্রেষ্ঠত্বের অকাট্য ইঙ্গিত।
  • সূরা আন-নূর (আয়াত ৫৫): মুমিনদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও নেক আমল করে তাদের পৃথিবীতে খলিফা বানানোর যে ঐশী ওয়াদা করা হয়েছে, আবু বকর (রা.)-এর খেলাফত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই তা পূর্ণ রূপ লাভ করে।

২. হাদিসের অকাট্য ইঙ্গিতসমূহ (الأحاديث النبوية):

  • রাসুলের ওফাতকালীন সালাতে ইমামতি: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর অন্তিম অসুস্থতার সময় স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেন—«مُرُوا أَبَا بَكْرٍ فَلْيُصَلِّ بِالنَّاسِ» (তোমরা আবু বকরকে বলো, সে যেন লোকদের নিয়ে সালাত আদায় করে)। সাহাবায়ে কিরাম সর্বসম্মতভাবে উপলব্ধি করেছিলেন: রাসুল ﷺ যাঁকে আমাদের দ্বীনের (সালাতের) নেতা বানিয়েছেন, আমরা কীভাবে তাঁর দুনিয়াবী নেতৃত্বকে অস্বীকার করতে পারি!
  • মহিলার প্রশ্নের জবাবে রাসুলের দিকনির্দেশনা: এক মহিলা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নিকট কোনো একটি প্রয়োজনে এলে রাসুল তাকে পরে আসতে বললেন। মহিলা বলল, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি এসে যদি আপনাকে না পাই (অর্থাৎ ওফাত হয়ে যায়)?” রাসুল ﷺ স্পষ্ট বললেন—«إِنْ لَمْ تَجِدِينِي فَأْتِي أَبَا بَكْرٍ» (যদি আমাকে না পাও, তবে আবু বকরের নিকট যেয়ো)। [সহিহ বুখারী]।
  • আবু বকরের দরজা ব্যতীত সমস্ত দরজা বন্ধের নির্দেশ: ওফাতের পূর্বে রাসুল ﷺ মসজিদে নববীর দিকে উন্মুক্ত সমস্ত ঘরের দরজা বন্ধ করার নির্দেশ দেন, কেবল আবু বকর (রা.)-এর ঘরের দরজাটি খোলা রাখার নির্দেশ বহাল রাখেন।

١١- بين الفضائل والخصائص الخُلُقية لسيدنا على بن أبى طالب (رض)-

[আলী ইবনু আবি তালিব (রা) এর কৃতিত্ব ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বর্ণনা কর।]

১. হযরত আলী (রা.)-এর অনন্য মর্যাদা ও ফজিলত:

  • প্রথম কিশোর মুসলিম: কিশোরদের মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণের গৌরব অর্জন করেন। রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর প্রত্যক্ষ গৃহেই তিনি লালিত-পালিত ও প্রশিক্ষিত হন।
  • হিজরতের রাতে বিছানায় শয়ন: চরম বিপদের রাতে কাফেরদের উন্মুক্ত তরবারির মুখে নিজের জীবন বাজি রেখে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর বিছানায় শুয়ে থেকে আমানত প্রত্যর্পণের নজিরবিহীন বীরত্ব দেখান।
  • রাসুলের সাথে আত্মীয়তার সৌভাগ্য: তিনি ছিলেন রাসুল ﷺ-এর চাচাতো ভাই এবং জান্নাতের নারীদের সর্দার মা ফাতেমাতুয যাহরা (রা.)-এর স্বামী এবং হাসান ও হুসাইন (রা.)-এর সম্মানিত পিতা। রাসুল ﷺ তাঁকে বলেছিলেন—«أَنْتَ مِنِّي بِمَنْزِلَةِ هَارُونَ مِنْ مُوسَى، إِلَّا أَنَّهُ لَا نَبِيَّ بَعْدِي» (মূসার কাছে হারুন যেরূপ ছিল, আমার কাছে তুমি সেরূপ; কেবল আমার পর কোনো নবী নেই)।
  • খায়বার বিজয়ের বীর: খায়বারের দুর্ভেদ্য দুর্গ বিজয়ে রাসুল ﷺ ঘোষণা করেন—«لَأُعْطِيَنَّ الرَّايَةَ غَدًا رَجُلًا يُحِبُّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ، وَيُحِبُّهُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ» (আগামীকাল আমি এমন ব্যক্তির হাতে ঝান্ডা দেব, যাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ভালোবাসেন এবং সেও আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে ভালোবাসে)। আলী (রা.) খায়বারের কেল্লার ফটক উপড়ে ফেলে বিজয় ছিনিয়ে আনেন।

২. চারিত্রিক ও জ্ঞানগত বৈশিষ্ট্য (الخصائص الخُلُقية):

  • মহাজ্ঞানী ও সুপ্রিম জাজ: রাসুল ﷺ ইরশাদ করেন—«أَنَا مَدِينَةُ الْعِلْمِ وَعَلِيٌّ بَابُهَا» (আমি জ্ঞানের নগরী আর আলী তার প্রবেশদ্বার)। জটিলতম বিচারিক মাসআলায় সাহাবায়ে কিরাম আলী (রা.)-এর ফয়সালার শরণাপন্ন হতেন। উমর (রা.) বলতেন: “আলী না থাকলে উমর ধ্বংস হয়ে যেত।”
  • অসাধারণ দানশীলতা ও যুহদ (দুনিয়াবিমুখতা): রাষ্ট্রপ্রধান হয়েও তিনি অতি সাধারণ মোটা কাপড় পরতেন, নিজ হাতে খেজুর বাগানে শ্রম দিতেন এবং নিজের ক্ষুধার্ত পেটের খাবার মিসকিন ও এতিমদের বিলাতেন।

١٢- تحدث عن نظام الحكم لعمر بن عبد العزيز رحمه الله-

[উমর ইবনে আব্দুল আযীয (রহ) এর শাসননীতি সম্পর্কে আলোচনা কর।]

১. পরিচিতি:

উমর ইবনে আব্দুল আযীয (রহ.) (৯৯–১০১ হি. / ৭১৭–৭২০ খ্রি.) ছিলেন উমাইয়া খিলাফতের ৮ম খলিফা। তাঁর চরিত্র, তাকওয়া ও শাসন ব্যবস্থা খোলাফায়ে রাশেদীনের হুবহু অনুরূপ হওয়ায় তাঁকে মুসলিম বিশ্বে “পঞ্চম খলিফায়ে রাশেদ” (خامس الخلفاء الراشدين) হিসেবে গণ্য করা হয়।

২. তাঁর আদর্শ শাসননীতির মূল স্তম্ভসমূহ (نظام الحكم):

  1. অন্যায়ভাবে দখলকৃত রাজকীয় সম্পদ বায়তুল মালে ফেরত: ক্ষমতা গ্রহণের সাথে সাথেই তিনি উমাইয়া রাজপুত্রদের অবৈধভাবে দখলকৃত সমস্ত জমিদারি ও ধনসম্পদ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বাজেয়াপ্ত করেন। এমনকি নিজের স্ত্রীর রাজকীয় গহনাও বায়তুল মালে জমা দেন।
  2. নবদীক্ষিত মুসলমানদের জিজিয়া কর মওকুফ: এর পূর্বে উমাইয়া প্রশাসকরা রাজস্ব হ্রাসের ভয়ে নতুন মুসলমানদের কাছ থেকেও জিজিয়া আদায় করত। উমর ইবনে আব্দুল আযীয তা কঠোরভাবে বন্ধ করে ঘোষণা করেন—«إِنَّ اللَّهَ بَعَثَ مُحَمَّدًا هَادِيًا وَلَمْ يَبْعَثْهُ جَابِيًا» (নিশ্চয়ই আল্লাহ মুহাম্মদ ﷺ-কে হিদায়াতকারী হিসেবে পাঠিয়েছেন, ট্যাক্স কালেক্টর হিসেবে নয়)। এর ফলে দলে দলে মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে।
  3. সামাজিক নিরাপত্তা ও যাকাত বণ্টন: তাঁর মাত্র আড়াই বছরের শাসনামলে প্রজাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এমন এক স্তরে পৌঁছায় যে, গোটা মুসলিম সাম্রাজ্যে যাকাত নেওয়ার মতো একজন দরিদ্র লোকও খুঁজে পাওয়া যেত না।
  4. অমুসলিমদের অধিকার ও গির্জা সুরক্ষা: দামেস্কের সেন্ট জন গির্জার যে অংশ ওয়ালিদ অন্যায়ভাবে মসজিদে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন, উমর তা খ্রিস্টানদের ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে আইনের শাসনের পরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেন।

١٣- اذكر نشأة دولة الإسلام فى الأندلس وسقوطها-

[স্পেনে ইসলামি সাম্রাজ্যের উৎপত্তি এবং তার পতন সম্পর্কে আলোচনা কর।]

১. স্পেনে (আন্দালুস) মুসলিম শাসনের উৎপত্তি (نشأة الدولة):

  • তারিক বিন জিয়াদের ঐতিহাসিক বিজয় (৭১১ খ্রি.): উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ বিন আব্দুল মালেকের শাসনামলে উত্তর আফ্রিকার গভর্নর মুসা বিন নুসাইরের নির্দেশে তরুণ বীর সেনাপতি তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ৭ হাজার সৈন্য নিয়ে জিব্রাল্টার (জাবালুত তারিক) প্রণালী পাড়ি দেন।
  • তিনি গুয়াদালেতের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে রডারিককে পরাজিত করে স্পেনের বিশাল অঞ্চল জয় করেন। এর ফলে স্পেনে মুসলিম সভ্যতার ভিত্তি স্থাপিত হয়।
  • স্বাধীন উমাইয়া আমিরাত প্রতিষ্ঠা (৭৫৬ খ্রি.): আব্বাসীদের হাতে উমাইয়াদের পতনের পর তরুণ রাজপুত্র আব্দুর রহমান আদ-দাখিল (ফ্যালকন অব কুরাইশ) অলৌকিকভাবে পালিয়ে স্পেনে পৌঁছে স্বাধীন কর্ডোভা আমিরাত প্রতিষ্ঠা করেন, যা ইউরোপে জ্ঞান, বিজ্ঞান ও শিল্পের রাজধানী হয়ে ওঠে।

২. স্পেনে মুসলিম শাসনের পতনের কারণসমূহ (أسباب السقوط):

  • গৃহযুদ্ধ ও দলীয় বিভাজন (মুলুকুত তাওয়াইফ): একাদশ শতাব্দীতে কেন্দ্রীয় খিলাফতের পতনের পর আন্দালুস ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজত্বে (Party Kings) বিভক্ত হয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে খ্রিস্টানদের সাহায্য নিয়ে ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে লিপ্ত হয়।
  • বিলাসিতা ও নৈতিক স্খলন: জ্ঞান ও বীরত্বের গৌরব ভুলে মুসলিম রাজন্যবর্গ অপচয়, নাচ-গান ও আমোদ-প্রমোদে গা ভাসিয়ে দেয়।
  • খ্রিস্টানদের ঐক্যবদ্ধ রিকনকোয়েস্টা (Reconquista): ফার্ডিন্যান্ড ও ইসাবেলার বিবাহ স্পেনের খ্রিস্টান শক্তিকে একক পতাকাতলে এনে মুসলিমদের নিশ্চিহ্ন করার ক্রুসেডীয় অভিযান তীব্র করে।
  • গ্রানাডার চূড়ান্ত পতন (১৪৯২ খ্রি.): সর্বশেষ মুসলিম দুর্গ গ্রানাডার সুলতান আবু আব্দুল্লাহ (বোয়াবদিল) আত্মসমর্পণ করলে স্পেনে প্রায় ৮০০ বছরের গৌরবময় মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে এবং মুসলমানদের ওপর নির্মম ইনকুইজিশন (গণহত্যা ও বিতাড়ন) চালানো হয়।

١٤- اذكر أسباب سقوط الدولة العثمانية بالإيجاز-

[উসমানী সাম্রাজ্যের পতনের কারণগুলো সংক্ষেপে উল্লেখ কর।]

প্রায় ছয়শত বছরের সুমহান উসমানী (অটোমান) খিলাফতের পতনের প্রধান ঐতিহাসিক কারণসমূহ:

  1. অযোগ্য সুলতান ও হেরেমের আধিপত্য: সুলাইমান আল-কানুনীর পর অনেক সুলতান প্রশাসনিক ও সামরিক দায়িত্ব অবহেলা করেন এবং রাজপ্রাসাদের অভ্যন্তরে ষড়যন্ত্রে নিমজ্জিত হন।
  2. ইয়েনিসারি বাহিনীর বিশৃঙ্খলা: অটোমানদের প্রধান অভিজাত সামরিক বাহিনী ‘ইয়েনিসারি’ (Janissaries) চরম দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং রাষ্ট্রীয় আধুনিকায়নের বিরোধিতা করে সুলতানদের হত্যা করতে শুরু করে।
  3. শিল্প ও প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতা: ইউরোপীয় জাতিসমূহ যখন বৈজ্ঞানিক নবজাগরণ ও শিল্প বিপ্লবের মাধ্যমে আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ও অর্থনৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে, উসমানী সাম্রাজ্য তখন রক্ষণশীলতায় আবদ্ধ থেকে পিছিয়ে পড়ে।
  4. জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ও সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্র: উসমানী সাম্রাজ্যের অধীনে থাকা গ্রিক, সার্ব, বুলগেরীয় ও আরব জাতীয়তাবাদীদের মাঝে ব্রিটিশ ও ফরাসিরা বিদ্রোহের আগুন উসকে দেয় (যেমন লরেন্স অব অ্যারাবিয়ার ষড়যন্ত্র)।
  5. প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয় ও কামাল পাশার ধর্মনিরপেক্ষতা: জার্মানির সাথে মিত্রতা করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে শোচনীয় পরাজয় বরণের পর ১৯২৪ সালে মোস্তফা কামাল পাশা আনুষ্ঠানিকভাবে খিলাফত বিলুপ্ত ঘোষণা করে আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ তুরস্ক প্রতিষ্ঠা করেন।

١٥- تحدث عن أسباب غزوات الهند ونتائجها للسلطان محمود الغزنوى-

[সুলতান মাহমুদ গজনভীর ভারত অভিযানের কারণ ও ফলাফল আলোচনা কর।]

১. ভারত অভিযানের মূল কারণসমূহ (أسباب الغزوات):

সুলতান মাহমুদ গজনভী ১০০০ থেকে ১০২৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ভারতে সর্বমোট ১৭ বার সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন। ঐতিহাসিকদের মতে এর প্রধান কারণগুলো ছিল:

  • সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ: পাঞ্জাব ও সিন্ধু সীমান্তের হিন্দু শাহী রাজারা (জয়পাল ও আনন্দপাল) গজনী সীমান্তে ক্রমাগত আক্রমণ ও অশান্তি সৃষ্টি করত। নিজের সাম্রাজ্যের সীমান্ত নিরাপদ রাখাই ছিল তাঁর প্রধান কৌশলগত লক্ষ্য।
  • ভারতকে পদানত করা ও ইসলামি প্রভাব বিস্তার: ভারতের পৌত্তলিক রাজাদের আগ্রাসী শক্তির দম্ভ চূর্ণ করে ইসলামি ভূখণ্ডের রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা।
  • বিশাল সামরিক শক্তি পরিচালনায় অর্থ সংগ্রহ: মধ্য এশিয়ার সেলজুক ও অন্যান্য শক্তিশালী শত্রুদের বিরুদ্ধে বিশাল স্থায়ী সেনাবাহিনী রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ভারতের মন্দিরে সঞ্চিত বিপুল স্বর্ণ ও সম্পদ প্রয়োজন ছিল।

২. অভিযানের ফলাফল ও প্রভাব (النتائج والآثار):

  • হিন্দু শক্তির কোমর ভেঙে দেওয়া: গজনভীর ধারাবাহিক বিজয়ের ফলে উত্তর ভারতের সমন্বিত হিন্দু প্রতিরোধ ক্ষমতা চিরতরে দুর্বল হয়ে পড়ে।
  • পাঞ্জাব সংযুক্তি ও ভিত্তিপ্রস্তর: তিনি পাঞ্জাবকে সরাসরি গজনী সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন, যা পরবর্তীতে মুহাম্মদ ঘুরী ও দিল্লি সালতানাত প্রতিষ্ঠার প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করে।
  • জ্ঞান-বিজ্ঞান ও পণ্ডিতদের আগমন: তাঁর অভিযানের সাথে সাথেই সুবিখ্যাত পণ্ডিত আল-বিরুনী ভারতে আসেন এবং রচনা করেন কালজয়ী গ্রন্থ কিতাবুল হিন্দ (ভারততত্ত্ব)।
  • সুফীদের আগমনের পথ সুগম হওয়া: তাঁর পর থেকেই হযরত আলী হাজভেরি (দাতা গঞ্জেবখশ) সহ বিশিষ্ট সুফীরা লাহোর ও ভারতে এসে ইসলাম প্রচারের সুযোগ পান।

١٦- قدر مساهمة شاه جلال اليمنى (رح) فى نشر الإسلام فى بنغلاديش-

[বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারে শাহ-জালাল ইয়ামানী (রহ) এর অবদান মূল্যায়ন কর।]

১. হযরত শাহ জালাল (রহ.)-এর আগমন ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:

হযরত শাহ জালাল আল-মুজাররাদ আল-ইয়ামানী (১২৭১–১৩৪৬ খ্রি.) ছিলেন বাংলা ভূখণ্ডে ইসলাম প্রচারের অবিসংবাদিত সিংহপুরুষ। তিনি তাঁর পীর সৈয়দ আহমদ ইয়াসাবীর নির্দেশে একমুঠো মাটি নিয়ে বের হন এবং সিলেটের মাটির সাথে হুবহু মিল খুঁজে পেয়ে সিলেটে স্থায়ীভাবে বসতি গড়েন।

২. ইসলাম প্রচারে তাঁর ঐতিহাসিক অবদান ও মূল্যায়ন:

  1. বুরহান উদ্দিন (রহ.)-এর ওপর জুলুমের অবসান: সিলেটে গরু কোরবানি করার অপরাধে রাজা গৌরগোবিন্দ এক মুসলিম পিতা বুরহান উদ্দিনের নবজাতক শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা করে। এই চরম মানবতাবিরোধী অত্যাচারের খবর পেয়ে শাহ জালাল (রহ.) ৩৬০ জন আউলিয়া ও সেনাপতি সিকান্দার গাজীকে সাথে নিয়ে সিলেট অভিমুখে যাত্রা করেন।
  2. গৌরগোবিন্দের পতন ও সিলেটের বিজয় (১৩০৩ খ্রি.): সুরমা নদী জায়নামাজে পাড়ি দিয়ে আল্লাহর অলৌকিক কুদরতে এবং তীব্র প্রতিরোধের মুখে গৌরগোবিন্দের দুর্গ ধ্বংস হয় এবং সিলেটে ইসলামের বিজয় কেতন উড্ডীন হয়।
  3. ৩৬০ জন আউলিয়াকে বিভিন্ন অঞ্চলে প্রেরণ: সিলেট বিজয়ের পর তিনি তাঁর সঙ্গী ৩৬০ জন দরবেশ ও সুফীকে সমগ্র ময়মনসিংহ, ঢাকা, কুমিল্লা, নোয়াখালী এবং আসামের বিভিন্ন প্রান্তে ইসলাম প্রচারের জন্য ছড়িয়ে দেন। তাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রমে এই বিশাল অঞ্চলে লাখ লাখ মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে।
  4. অসাধারণ আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব ও মানবিক সহমর্মিতা: বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতূতা ১৩৪৬ সালে হযরত শাহ জালালের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং তাঁর দীর্ঘ রোজা, রাতভর ইবাদত এবং জনগণের প্রতি গভীর ভালোবাসার বিশদ বিবরণ লিপিবদ্ধ করেন।
  5. চিরস্থায়ী উত্তরাধিকার: আজ সিলেট অঞ্চলকে যে ‘পুণ্যভূমি’ বলা হয়, তা হযরত শাহ জালাল (রহ.)-এর মহান দাওয়াতি বিপ্লবেরই ফলশ্রুতি। তাঁর দরগাহ ও খানকাহ শতাব্দী ধরে বাংলার মানুষের আত্মিক ও আধ্যাত্মিক প্রেরণার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা রাখছে।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. ফাজিল ৪র্থ বর্ষের التاريخ الإسلامي (ইসলামের ইতিহাস) বিষয়ের কোড ও মান বণ্টন কেমন?

ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ফাজিল ৪র্থ বর্ষের ইসলামিক হিস্ট্রির বিষয় কোড হলো ২০১৮০৩ (পরীক্ষা কোড ২০৮, প্রশ্নপত্র কোড ১১৩)। পূর্ণমান ৮০; যার মধ্যে গ্রুপ ‘ক’-তে ১৫ নম্বরের ৪টি বিশদ প্রশ্ন (৬০ নম্বর) এবং গ্রুপ ‘খ’-তে ৫ নম্বরের ৪টি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন (২০ নম্বর) উত্তর দিতে হয়।

২. খোলাফায়ে রাশেদীনের নির্বাচন পদ্ধতির মূল বৈশিষ্ট্য কী ছিল?

খোলাফায়ে রাশেদীনের খিলাফত কোনো একক বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্র ছিল না; বরং তা পরিচালিত হয়েছিল কুরআন নির্দেশিত শুরা (পরামর্শ), উম্মাহর স্বাধীনতা এবং সর্বস্তরের জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত মুক্ত বায়আতের ভিত্তিতে।

৩. উমাইয়া খলিফা আব্দুল মালেক বিন মারওয়ানকে কেন “দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাতা” বলা হয়?

আব্দুল মালেক ইবনে যুবাইর (রা.)-এর সাথে গৃহযুদ্ধের পর বিচ্ছিন্ন সাম্রাজ্যকে পুনরেকত্রিত করেন, সরকারি ভাষা হিসেবে আরবিকরণ প্রবর্তন করেন, প্রথম স্বাধীন ইসলামি মুদ্রা চালু করেন এবং কুদ্দুসে কুব্বাতুস সাখরা নির্মাণ করে উমাইয়া শাসনকে সুদৃঢ় করেন।

৪. ভারতে স্থায়ী মুসলিম সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠায় মুহাম্মদ ঘুরীর ঐতিহাসিক কৃতিত্ব কী?

সুলতান মাহমুদ গজনভী ভারত আক্রমণ করে সম্পদ অর্জন করলেও সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেননি। অন্যদিকে মুহাম্মদ ঘুরী ১১৯২ সালে তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে পৃথ্বীরাজকে পরাজিত করে ভারতে স্থায়ী মুসলিম রাজনৈতিক শাসন ও ভবিষ্যৎ দিল্লি সালতানাতের ভিত্তি স্থাপন করেন।

৫. উমর ইবনে আব্দুল আযীয (রহ.)-কে কেন ‘পঞ্চম খলিফায়ে রাশেদ’ বলা হয়?

উমর ইবনে আব্দুল আযীয উমাইয়া রাজপুত্রদের সমস্ত অন্যায়ভাবে দখলকৃত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে বায়তুল মালে ফেরত দেন, নবমুসলিমদের জিজিয়া মওকুফ করেন এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের ইনসাফভিত্তিক শাসন পুনরুজ্জীবিত করেন।

৬. বাংলায় ইসলাম প্রচারে সুফী-সাধকদের মূল কৌশল ও অবদান কী ছিল?

সুফীগণ বর্ণপ্রথায় নির্যাতিত নিম্নবর্ণের সাধারণ মানুষকে মানবিক মর্যাদা দান করেন, বিনামূল্যে লঙ্গরখানা ও চিকিৎসা প্রদান করেন, গহীন বনজঙ্গল পরিষ্কার করে কৃষিজমি গড়ে তোলেন এবং নিজেদের চারিত্রিক মাধুর্য দিয়ে লাখ লাখ মানুষকে ইসলামের ছায়াতলে আনেন।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন ➜