পরীক্ষা কোড: ২০৪ | প্রশ্নপত্র কোড: ১৮৭
ফাজিল (স্নাতক) সম্মান চতুর্থ বর্ষ পরীক্ষা, ২০২১
বিভাগ: ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
বিষয়: ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাস (১৭৫৭-১৯৪৭ খ্রি.) (পঞ্চম পত্র)
[History of British India: 1757-1947 (Paper V)]
বিষয় কোড: ২০৫৪০৫
সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০
রচনামূলক প্রশ্ন
[দ্রষ্টব্য: যেকোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও। প্রতিটি প্রশ্নের মান ১৫: ১৫ × ৪ = ৬০]
১. ষোল শতকে ভারতে পর্তুগিজ বাণিজ্যিক ব্যবস্থার ইতিহাসের একটি বিবরণ দাও।
[English: Give an account of the history of commercial system by the Portuguese in India in the 16th century.]
ভূমিকা
১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দে পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো দা গামা উত্তমাশা অন্তরীপ হয়ে ভারতের কালিকট বন্দরে পৌঁছানোর মাধ্যমে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক বাণিজ্যের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। ষোড়শ শতকে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম ইউরোপীয় শক্তি হিসেবে পর্তুগিজরা তাদের বাণিজ্যিক আধিপত্য বিস্তার করে এবং প্রায় এক শতাব্দী ধরে ভারত মহাসাগরীয় বাণিজ্যে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে।
বাণিজ্যিক ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা ও বিস্তার
- কারখানা ও দুর্গ নির্মাণ: ভাস্কো দা গামার পর ১৫০৫ সালে ফ্রান্সিসকো ডি আলমিডা প্রথম পর্তুগিজ ভাইসরয় নিযুক্ত হন। তিনি স্থলভাগে সাম্রাজ্য বিস্তারের বদলে সমুদ্রে আধিপত্য রক্ষার ‘নীল জল নীতি’ (Blue Water Policy) গ্রহণ করেন।
- আলবুকার্ক ও সাম্রাজ্যিক ভিত্তি: আলফনসো ডি আলবুকার্ক (১৫০৯-১৫১৫ খ্রি.) ভারতে পর্তুগিজ আধিপত্যের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ১৫১০ সালে বিজাপুরের সুলতান ইউসুফ আদিল শাহের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ বন্দর গোয়া (Goa) দখল করেন। গোয়া পরবর্তীতে ভারতে পর্তুগিজদের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক রাজধানীতে পরিণত হয়। এছাড়া তিনি মালাক্কা (১৫১১) ও হরমুজ (১৫১৫) দখল করে প্রাচ্যের সমস্ত বাণিজ্যপথ সুরক্ষিত করেন।
- বাণিজ্য কুঠিসমূহ: ষোড়শ শতকে পর্তুগিজরা কোচিন, কান্নানুর, দমন, দিউ, সালসেট, বেসিন, বোম্বে এবং বাংলায় হুগলি ও চট্টগ্রামে শক্তিশালী বাণিজ্যকুঠি ও দুর্গ গড়ে তোলে।
পর্তুগিজ বাণিজ্যিক ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য ও কৌশল
- কার্তাজ ব্যবস্থা (Cartaz System): পর্তুগিজ বাণিজ্যিক ব্যবস্থার সবচেয়ে বিতর্কিত ও কার্যকর হাতিয়ার ছিল ‘কার্তাজ’ বা রাজকীয় বাণিজ্য ছাড়পত্র। ভারত মহাসাগরে চলাচলকারী সকল আরব, ভারতীয় ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জাহাজের জন্য পর্তুগিজদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট শুল্ক দিয়ে কার্তাজ ক্রয় বাধ্যতামূলক ছিল। ছাড়পত্রহীন যেকোনো জাহাজ পর্তুগিজরা জলদস্যুর মতো বাজেয়াপ্ত করত ও নাবিকদের বন্দি বা হত্যা করত।
- মসলা বাণিজ্যে একচেটিয়া কর্তৃত্ব: গোলমরিচ, দারুচিনি, লবঙ্গ, এলাচ ও আদা ইত্যাদি মূল্যবান মসলার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য তারা একচ্ছত্র কুক্ষিগত করে। স্থানীয় উৎপাদকদের পানির দামে পর্তুগিজ ক্রাউন ফ্যাক্টরির কাছে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য করা হতো।
- ঘোড়া বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ: আরব ও পারস্য থেকে বিজয়নগর ও বাহমনী সালতানাতে সামরিক কাজের জন্য উচ্চবংশীয় ঘোড়া আমদানির বাণিজ্য পর্তুগিজরা নিয়ন্ত্রণ করত। যে রাজ্য পর্তুগিজদের সাথে সুসম্পর্ক রাখত, কেবল তারাই ঘোড়া পেত।
- জলদস্যুতা ও দাস ব্যবসা (মগ-ফিরিঙ্গি দৌরাত্ম্য): বিশেষ করে বাংলায় পর্তুগিজরা ‘হার্মাদ’ (Armada) নামে কুখ্যাত ছিল। তারা সুন্দরবন ও নদীয়া-মেঘনা অঞ্চলে আরাকানের মগদের সাথে যৌথভাবে সাধারণ নিরীহ মানুষদের অপহরণ করে ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করত।
- ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও ধর্মান্তরকরণ: পর্তুগিজ বণিক ও জেসুইট মিশনারিরা স্থানীয় হিন্দু ও মুসলমানদের বলপূর্বক খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত করতে থাকে এবং গোয়ায় কুখ্যাত ‘ইনকুইজিশন’ (Inquisition) আদালত চালু করে অবর্ণনীয় নির্যাতন চালায়।
পর্তুগিজ বাণিজ্যিক ব্যবস্থার পতন
অসহনীয় নিষ্ঠুরতা, ধর্মীয় গোঁড়ামি, মোগলদের সাথে সংঘাত (১৬৩২ সালে শাহজাহানের নির্দেশে কাসেম খান কর্তৃক হুগলি থেকে পর্তুগিজদের বিতাড়ন) এবং সর্বোপরি সপ্তদশ শতকের শুরুতে ইংরেজ ও ওলন্দাজদের নৌ-শক্তির উত্থানের মুখে ষোড়শ শতকের পর্তুগিজ বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে।
উপসংহার
পর্তুগিজরা বাণিজ্য করতে এসে আধিপত্য ও জলদস্যুতার পথ বেছে নিয়েছিল। তবে তাদের মাধ্যমেই ভারতে তামাক, কাজুবাদাম, আলু, পেঁপে এবং মুদ্রণযন্ত্রের (Printing Press) প্রথম আগমন ঘটেছিল।
২. ১৮২৪ সালের ইঙ্গ-ওলন্দাজ চুক্তির পটভূমি এবং এর প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ বিশ্লেষণ কর।
[English: Analyze the background and main features of the Anglo-Dutch Treaty of 1824.]
ভূমিকা
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ভারতীয় উপমহাদেশে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইতিহাসে ১৮২৪ সালের ১৭ মার্চ লন্ডনে স্বাক্ষরিত ‘ইঙ্গ-ওলন্দাজ চুক্তি’ (Anglo-Dutch Treaty of 1824) একটি বৈপ্লবিক সন্ধিক্ষণ। এর মাধ্যমে ব্রিটিশ ও ডাচদের মধ্যকার শতাব্দীর দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটে এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া তাদের মাঝে স্থায়ীভাবে ভাগাভাগি হয়ে যায়।
চুক্তির ঐতিহাসিক পটভূমি
- মসলা দ্বীপপুঞ্জে দীর্ঘ সংঘাত: সপ্তদশ শতক থেকেই ইন্দোনেশিয়ান দ্বীপপুঞ্জ (মলাক্কাস) এবং জাভায় ওলন্দাজ (ডাচ) ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একচেটিয়া আধিপত্য ছিল। ১৬২৩ সালের কুখ্যাত ‘আমবয়না হত্যাকাণ্ড’ (Amboyna Massacre)-এ ওলন্দাজরা ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের নৃশংসভাবে হত্যা করলে দুই শক্তির চিরশত্রুতা শুরু হয়।
- নেপোলিয়নীয় যুদ্ধ ও ব্রিটিশ দখলদারিত্ব: ১৭৯৫ থেকে ১৮১৪ সাল পর্যন্ত ফ্রান্সে নেপোলিয়নের সময় হল্যান্ড ফ্রান্সের অধীনে চলে গেলে ব্রিটিশরা নিরাপত্তার অজুহাতে ইন্দোনেশিয়ায় ওলন্দাজ উপনিবেশগুলো সাময়িকভাবে দখল করে নেয়। নেপোলিয়নের পতনের পর ১৮১৪ সালের লন্ডন কনভেনশনে ব্রিটেন ওলন্দাজদের কাছে জাভা ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয়।
- র্যাফেলস ও সিঙ্গাপুর প্রতিষ্ঠা (১৮১৯): ১৮১৯ সালে স্যার স্ট্যামফোর্ড র্যাফেলস জহুর সুলতানের সাথে চুক্তি করে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিঙ্গাপুরে ব্রিটিশ বাণিজ্য ঘাঁটি স্থাপন করেন। এতে ওলন্দাজরা ক্ষিপ্ত হয়, কারণ তারা এটিকে তাদের প্রভাববলয় মনে করত। ফলে মালয় প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন যুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দেয়।
- বাণিজ্যিক রেষারেষি দূর করার সমঝোতা: উভয় দেশের সরকার উপলব্ধি করে যে পরস্পরের সাথে যুদ্ধ ইউরোপে শক্তিভারসাম্য নষ্ট করবে। তাই একটি আনুষ্ঠানিক সীমারেখা টেনে নিজ নিজ প্রভাব এলাকা নির্দিষ্ট করার জন্য এই চুক্তি সম্পাদিত হয়।
চুক্তির প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য ও ধারাসমূহ
- ভৌগোলিক সীমারেখা নির্ধারণ (Sphere of Influence):
মালাক্কা প্রণালীকে (Strait of Malacca) প্রাকৃতিক বিভাজন রেখা হিসেবে গ্রহণ করা হয়। প্রণালীর উত্তর ও পূর্বাংশ (মালয় উপদ্বীপ ও সিঙ্গাপুর) ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং দক্ষিণাংশ (বর্তমান ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা, জাভা ইত্যাদি) ওলন্দাজদের প্রভাবাধীন থাকবে।
- উপনিবেশ বিনিময়:
- ওলন্দাজরা ভারতে তাদের অবশিষ্ট সমস্ত বাণিজ্যকুঠি (যেমন: বাংলায় চুঁচুড়া, সুরাট ইত্যাদি) এবং মালয় উপদ্বীপে তাদের প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র ‘মালাক্কা’ (Malacca) ব্রিটিশদের হাতে সম্পূর্ণ সমর্পণ করে।
- এর বিনিময়ে ব্রিটিশরা সুমাত্রায় তাদের দীর্ঘদিনের সমৃদ্ধ দুর্গ ‘ফোর্ট মার্লবোরো’ (বেনকুলেন বা বেনকুলু) এবং সুমাত্রার সমস্ত দাবি ওলন্দাজদের ছেড়ে দেয়।
- সিঙ্গাপুরে ব্রিটিশ কর্তৃত্বের স্বীকৃতি: ওলন্দাজরা সিঙ্গাপুরের ওপর থেকে তাদের সকল দাবি প্রত্যাহার করে নেয় এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিটিশ অধিকার মেনে নেয়।
- বাণিজ্যিক সুবিধা ও শুল্ক সমতা: উভয় শক্তি সম্মত হয় যে তারা নিজ নিজ নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে একে অপরের ব্যবসায়ীদের বৈষম্যমূলক অতিরিক্ত শুল্ক চাপাবে না এবং ভারত মহাসাগর ও দক্ষিণ চীন সাগরে মুক্ত বাণিজ্য চর্চা করবে।
- জলদস্যুতা দমন: মালাক্কা প্রণালী ও আশপাশের সাগরে স্থানীয় জলদস্যুদের দমনে উভয় দেশের নৌবাহিনী যৌথ অভিযান পরিচালনা করবে।
ঐতিহাসিক তাৎপর্য ও ফলাফল
এই চুক্তির সুদূরপ্রসারী ফল হলো আধুনিক মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সীমারেখা তৈরি। ব্রিটিশরা মালয় ও সিঙ্গাপুরে নির্বিঘ্নে আধিপত্য কায়েম করে এবং ওলন্দাজরা ডাচ ইস্ট ইন্ডিজ (বর্তমান ইন্দোনেশিয়া) সুসংহত করার সুযোগ পায়। ভারতে ওলন্দাজদের সম্পূর্ণ বিলুপ্তি ঘটে এবং ব্রিটিশদের একমাত্র প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।
৩. ১৮৫৮ সালের ভারত শাসন আইনের ধারাগুলো বিশ্লেষণ কর এবং ব্রিটিশ ভারতের সাংবিধানিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব নির্ণয় কর।
[English: Analyze the clauses of the Government of India Act of 1858 and determine its importance in the constitutional development in the British India.]
ভূমিকা
১৮৫৭ সালের মহাবিপ্লব বা সিপাহী বিদ্রোহ ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তি নাড়িয়ে দিয়েছিল। এই বিদ্রোহের প্রত্যক্ষ ফলশ্রুতিতে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ১৮৫৮ সালের ২ আগস্ট ‘অ্যাক্ট ফর দ্য বেটার গভর্নমেন্ট অব ইন্ডিয়া’ (Act for the Better Government of India) বা ১৮৫৮ সালের ভারত শাসন আইন পাস করে। এর মাধ্যমে ভারতে এক শতাব্দীর দীর্ঘ ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যিক শাসনের অবসান ঘটে এবং ব্রিটিশ রাজের প্রত্যক্ষ শাসন কায়েম হয়।
১৮৫৮ সালের ভারত শাসন আইনের মূল ধারাসমূহ
- কোম্পানির শাসনের অবসান ও মহারানীর প্রত্যক্ষ শাসন: ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে ভারতের শাসনভার সরাসরি ব্রিটেনের মহারানী ভিক্টোরিয়া ও ব্রিটিশ রাজমুকুটের (Crown) অধীনে ন্যস্ত করা হয়। গভর্নর জেনারেলের পরিষদ এবং কোর্ট অব ডিরেক্টরসের সমস্ত কর্তৃত্ব বিলুপ্ত হয়।
- ভারত সচিব (Secretary of State for India) পদ সৃষ্টি: ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার একজন ক্যাবিনেট মন্ত্রীর হাতে ভারতের প্রশাসনের সর্বোচ্চ দায়িত্ব অর্পণ করা হয়, যিনি ‘সেক্রেটারি অব স্টেট ফর ইন্ডিয়া’ বা ভারত সচিব নামে অভিহিত হন। তিনি ব্রিটিশ পার্লামেন্টের কাছে সরাসরি জবাবদিহি করতে বাধ্য ছিলেন।
- ভারত কাউন্সিল (Council of India) গঠন: ভারত সচিবকে পরামর্শ ও সহায়তা দেওয়ার জন্য ১৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠিত হয়, যার নাম দেওয়া হয় ‘ইন্ডিয়া কাউন্সিল’। এর আটজন সদস্য ক্রাউন কর্তৃক এবং সাতজন কোম্পানির সাবেক পরিচালকদের দ্বারা মনোনীত হতেন।
- গভর্নর জেনারেল ও ভাইসরয় (Viceroy) পদমর্যাদা: ভারতের প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা ‘গভর্নর জেনারেল’-এর পদটি বহাল রাখা হয়, তবে মহারানীর প্রত্যক্ষ প্রতিনিধি হিসেবে তাঁকে অতিরিক্ত ‘ভাইসরয়’ (রাজপ্রতিনিধি) উপাধিতে ভূষিত করা হয়। লর্ড ক্যানিং ভারতের প্রথম ভাইসরয় নিযুক্ত হন।
- দ্বৈত শাসনের (Board of Control & Court of Directors) অবসান: ১৭৮৪ সালের পিটের ভারত শাসন আইন দ্বারা প্রবর্তিত ‘কোর্ট অব ডিরেক্টরস’ এবং ‘বোর্ড অব কন্ট্রোল’ সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করে একক প্রশাসনিক কর্তৃত্ব ভারত সচিবের অধীনে আনা হয়।
- সামরিক পুনর্গঠন: কোম্পানির ইউরোপীয় বাহিনীকে সরাসরি ব্রিটিশ রাজকীয় সেনাবাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং ভারতীয়দের অনুপাতে ইউরোপীয় সৈন্যের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়।
সাংবিধানিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব ও মূল্যায়ন
- সংসদীয় গণতন্ত্র ও জবাবদিহিতা: কোম্পানি একটি অনির্বাচিত মুনাফালোভী কর্পোরেশন ছিল। এই আইনের মাধ্যমে ভারতের শাসন ব্রিটিশ পার্লামেন্টের নিয়মিত নজরদারির আওতায় আসে।
- মহারানীর ঐতিহাসিক ঘোষণাপত্র (১ নভেম্বর ১৮৫৮): এলাহাবাদ দরবারে লর্ড ক্যানিং মহারানীর ঐতিহাসিক ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। এতে ভারতীয় রাজন্যবর্গের সাথে পূর্বের সকল চুক্তি রক্ষার অঙ্গীকার করা হয়, ডালহৌসির কুখ্যাত ‘স্বত্ববিলোপ নীতি’ বাতিল করা হয় এবং ধর্মীয় বিশ্বাসে হস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। বর্ণ ও ধর্ম নির্বিশেষে ভারতীয়দের মেধার ভিত্তিতে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
- পরবর্তী সংবিধানের ভিত্তি: এই আইনই ছিল ব্রিটিশ ভারতের প্রথম সরাসরি সাংবিধানিক কাঠামো, যার ওপর ভিত্তি করে পরবর্তীতে ১৮৬১ ও ১৮৯২ সালের ভারতীয় কাউন্সিল আইন এবং ১৯১৯ ও ১৯৩৫ সালের সংবিধান গড়ে ওঠে।
উপসংহার
যদিও শাসনব্যবস্থায় নীতিগত কোনো স্বায়ত্তশাসন বা ভারতীয়দের হাতে প্রকৃত ক্ষমতা আসেনি (কেবল প্রভুর পরিবর্তন হয়েছিল—কোম্পানির বদলে ক্রাউন), তবুও এটি ভারতের প্রাতিষ্ঠানিক ও আধুনিক সাংবিধানিক বিকাশের সূচনা করেছিল।
৪. ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শিক্ষানীতি আলোচনা কর।
[English: Discuss the education policy of the English East India Company.]
ভূমিকা
১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের পর প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রধান লক্ষ্য ছিল কেবল অর্থনৈতিক শোষণ। শিক্ষা বিস্তার তাদের কোনো দায়িত্ব ছিল না। তবে ভারতীয় ঐতিহ্য ধ্বংস না করে তাদের বিশ্বস্ত কেরানি ও আমলা শ্রেণি তৈরি করতে গিয়ে কোম্পানি পরবর্তীতে ধীরে ধীরে আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষানীতি গড়ে তুলতে বাধ্য হয়।
কোম্পানির শিক্ষানীতির ঐতিহাসিক পর্যায়ক্রম
- প্রাচ্যবাদী পর্ব (Orientalist Phase – ১৭৮১ থেকে ১৮১৩):
প্রাথমিক পর্যায়ে ওয়ারেন হেস্টিংস ও উইলিয়াম জোন্সের মতো প্রশাসকরা বিশ্বাস করতেন যে ভারতীয় সমাজকে তাদের নিজস্ব সনাতন আইন ও ভাষায় শাসন করা উচিত।
- ১৭৮১ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস মুসলিম আইন ও ফারসি শেখার জন্য ‘কলকাতা মাদ্রাসা’ প্রতিষ্ঠা করেন।
- ১৭৮৪ সালে স্যার উইলিয়াম জোন্স প্রাচ্যের সংস্কৃতি গবেষণায় ‘এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল’ প্রতিষ্ঠা করেন।
- ১৭৯১ সালে জোনাথন ডানকান বেনারসে ‘সংস্কৃত কলেজ’ স্থাপন করেন।
- ১৮০০ সালে লর্ড ওয়েলেসলি নবনিযুক্ত তরুণ ব্রিটিশ সিভিলিয়ানদের ভারতীয় ভাষা ও সংস্কৃতি শেখাতে ‘ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ’ প্রতিষ্ঠা করেন।
- ১৮১৩ সালের চার্টার অ্যাক্ট ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের সূচনা:
১৮১৩ সালের সনদে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট প্রথমবারের মতো ভারতে সাহিত্যের পুনরুজ্জীবন এবং বিজ্ঞানের প্রসারের জন্য বার্ষিক **এক লাখ টাকা** শিক্ষাখাতে বরাদ্দের নির্দেশ দেয়। এর মাধ্যমে শিক্ষা বিস্তার রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হিসেবে প্রথম স্বীকৃতি পায়।
- প্রাচ্য-পাশ্চাত্য বিতর্ক (Anglicist-Classicist Controversy):
এই বরাদ্দকৃত অর্থ কোন ভাষায় ব্যয় হবে তা নিয়ে বিরোধ বাঁধে। এইচ. টি. প্রিন্সেপের নেতৃত্বে একদল প্রাচ্যবিদ দাবি করেন আরবি, ফারসি ও সংস্কৃত ভাষায় ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা দেওয়া হোক। অপরদিকে রাজা রামমোহন রায় ও ট্রেভেলিয়ানের নেতৃত্বে পাশ্চাত্যপন্থীরা আধুনিক বিজ্ঞান ও ইংরেজি শিক্ষার দাবি জানান।
- ১৮৩৫ সালের মেকলের কার্যবিবরণী (Macaulay’s Minute):
লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের আইন সচিব লর্ড মেকলে ১৮৩৫ সালে তাঁর চরম বর্ণবাদী ও প্রভাবশালী রিপোর্ট পেশ করেন। তিনি দাবি করেন, “প্রাচ্য সাহিত্যের একটি ভালো আলমারি সমগ্র প্রাচ্যের সাহিত্যের সমকক্ষ।” বেন্টিঙ্ক ইংরেজিকে সরকারি শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ঘোষণা করেন।
ক্রমনিম্ন পরিস্রাবণ তত্ত্ব (Downward Filtration Theory): মেকলে উচ্চশ্রেণিকে পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত করার নীতি নেন, যাতে সেই শিক্ষা চুইয়ে চুইয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে পৌঁছায়। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল: “রক্তে ও বর্ণে ভারতীয় কিন্তু রুচি, মতামত ও বুদ্ধিতে ইংরেজ এমন একটি মধ্যবিত্ত দল তৈরি করা।”
- ১৮৫৪ সালের উডের শিক্ষানীতি (Wood’s Education Despatch):
বোর্ড অব কন্ট্রোলের সভাপতি স্যার চার্লস উডের এই দলিলকে ভারতের **’শিক্ষার ম্যাগনা কার্টা’** (Magna Carta of Indian Education) বলা হয়।
- প্রাথমিক স্তরে মাতৃভাষা এবং উচ্চশিক্ষায় ইংরেজির সমন্বয় ঘোষণা।
- বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সরকারি অনুদান (Grants-in-aid) প্রদান।
- ১৮৫৭ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে কলকাতা, বোম্বে ও মাদ্রাজে তিনটি উচ্চশিক্ষার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা।
- প্রতিটি প্রদেশে স্বতন্ত্র ‘জনশিক্ষা বিভাগ’ (DPI) এবং নারীশিক্ষা ও শিক্ষক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা।
উপসংহার
কোম্পানির শিক্ষানীতির মূল উদ্দেশ্য সাম্রাজ্যিক স্বার্থ হাসিল হলেও, এই ইংরেজি শিক্ষার সংস্পর্শে এসেই পরবর্তীতে শিক্ষিত ভারতীয় মধ্যবিত্ত সমাজ গড়ে ওঠে, যারা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধেই স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিল।
৫. ভারতে সিপাহী বিদ্রোহের কারণ ও প্রভাব বর্ণনা কর।
[English: Describe the causes and impact of Sepoy Mutiny in India.]
ভূমিকা
১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের ঐতিহাসিক মহাবিপ্লব বা সিপাহী বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে ভারতীয় জনগণের শতাব্দীব্যাপী পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও প্রতিরোধের এক মহা-বিস্ফোরণ। ব্যারাকপুরে মঙ্গল পাণ্ডের বিদ্রোহ এবং ১০ মে মীরাট থেকে শুরু হওয়া এই সংগ্রাম দ্রুত দিল্লি, কানপুর, লক্ষ্ণৌ, ঝাঁসি ও বিহারে ছড়িয়ে পড়ে এক সর্বাত্মক মুক্তি সংগ্রামে রূপ নিয়েছিল।
সিপাহী বিদ্রোহের প্রধান কারণসমূহ
- রাজনৈতিক কারণ: লর্ড ডালহৌসির সাম্রাজ্যবাদী নীতি চরম ক্ষোভের জন্ম দেয়। তিনি ‘স্বত্ববিলোপ নীতি’ (Doctrine of Lapse) প্রয়োগ করে সাতারা, নাগপুর, ঝাঁসি ও সম্বলপুর গ্রাস করেন। রানি লক্ষ্মীবাঈ ও নানা সাহেবকে তাঁদের দত্তক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। এছাড়া অপশাসনের মিথ্যা অজুহাত তুলে ১৮৫৬ সালে অযোধ্যার নওয়াব ওয়াজেদ আলী শাহকে ক্ষমতাচ্যুত করায় বেঙ্গল আর্মির বিপুলসংখ্যক অযোধ্যাবাসী সৈনিক বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহের সাথে অপমানজনক আচরণ করা হয়।
- অর্থনৈতিক কারণ: ব্রিটিশদের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও ত্রুটিপূর্ণ ভূমিরাজস্ব নীতির ফলে জমিদার, তালুকদার ও রায়তরা সর্বস্বান্ত হয়। ইংল্যান্ডের যন্ত্রের কাপড়ের সাথে প্রতিযোগিতায় ধ্বংস হয় বাংলার ঐতিহ্যবাহী মসলিন ও তাঁতশিল্প। ফলে লাখ লাখ কারিগর বেকার ও নিঃস্ব হয়ে পড়ে।
- সামাজিক ও ধর্মীয় কারণ: খ্রিস্টান মিশনারিদের আগ্রাসী ধর্মান্তরকরণ এবং লর্ড মেকলের শিক্ষানীতি সাধারণ মানুষের মনে বিশ্বাস জন্মায় যে কোম্পানি তাদের ধর্ম ধ্বংস করতে চায়। সতীদাহ প্রথা উচ্ছেদ, বিধবা বিবাহ আইন এবং কারাবন্দিদের ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা সনাতনবাদী সমাজে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করে।
- সামরিক কারণ: বেঙ্গল আর্মিতে ভারতীয় সিপাহীদের ব্রিটিশ অফিসাররা অমানুষিক অবজ্ঞা করত। সমযোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও ভারতীয়দের পদোন্নতি সূবেদারের ওপরে হতো না। বেতন-ভাতার চরম বৈষম্য এবং ১৮৫৬ সালের ‘সাধারণ সার্ভিস আইন’ (General Service Enlistment Act)-এর মাধ্যমে ধর্মীয় অনুভূতি অগ্রাহ্য করে সমুদ্র পাড়ি দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়।
- প্রত্যক্ষ কারণ (এনফিল্ড রাইফেলের কার্তুজ): ১৮৫৩ সালে প্রবর্তিত নতুন এনফিল্ড রাইফেলের কার্তুজ দাঁত দিয়ে কেটে বন্দুকে ভরতে হতো। সিপাহীদের মধ্যে দৃঢ় খবর ছড়িয়ে পড়ে যে এই কার্তুজে গরু ও শূকরের চর্বি মেশানো হয়েছে। এতে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের সৈন্যদের ধর্মীয় আবেগে সরাসরি আঘাত লাগে এবং বিদ্রোহের দাবানল জ্বলে ওঠে।
সিপাহী বিদ্রোহের সুদূরপ্রসারী প্রভাব
- কোম্পানি শাসনের অবসান: শতবর্ষী ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অত্যাচারী শাসনের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটে এবং ভারতের শাসন সরাসরি ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ও মহারানীর হাতে ন্যস্ত হয় (১৮৫৮ সালের আইন)।
- মোগল সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত বিলুপ্তি: সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফরকে রেঙ্গুনে নির্বাসিত করা হয় এবং তাঁর পুত্রদের নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে মোগল সাম্রাজ্যের চির সমাপ্তি টানা হয়।
- সেনাবাহিনী পুনর্গঠন: ‘ভাগ কর ও শাসন কর’ (Divide and Rule) নীতির ভিত্তিতে সেনাবাহিনীকে সাজানো হয়। মুসলিমদের প্রতি অবিশ্বাস থেকে উচ্চপদ থেকে তাদের দূরে রাখা হয় এবং শিখ, গোর্খা ও পাঠানদের ‘মার্শাল রেস’ (যুদ্ধংদেহী জাতি) হিসেবে সেনাবাহিনীতে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
- সাম্রাজ্য বিস্তার নীতির অবসান: মহারানীর ঘোষণার মাধ্যমে নতুন দেশীয় রাজ্য দখল না করার অঙ্গীকার করা হয় এবং দেশীয় রাজাদের ব্রিটিশ আধিপত্যের খুঁটি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
- মুসলমানদের ওপর নির্মম নিপীড়ন: ব্রিটিশরা বিদ্রোহের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে মুসলমানদের দায়ী করে হাজার হাজার আলেম ও অভিজাত মুসলিমকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলায় এবং মুসলিম ওয়াকফ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে তাদের অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেয়।
উপসংহার
সামরিক দিক থেকে বিদ্রোহ ব্যর্থ হলেও এটি ভারতবাসীকে পরাধীনতার গভীর অন্ধকার অনুধাবন করায় এবং ভবিষ্যতে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অবিনাশী অনুপ্রেরণা জোগায়।
৬. ১৯৪৭ সালের ভারত স্বাধীনতা আইনের মূলধারাগুলো ব্যাখ্যা কর।
[English: Explain the main provisions of the India Independence Act of 1947.]
ভূমিকা
উপমহাদেশে প্রায় দুইশত বছরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি ঘটাতে এবং কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ১৯৪৭ সালের ১৮ জুলাই ঐতিহাসিক ‘ভারত স্বাধীনতা আইন ১৯৪৭’ (Indian Independence Act, 1947) পাস করে। শেষ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেনের ৩ জুনের পরিকল্পনার ওপর ভিত্তি করে প্রণীত এই আইনের মাধ্যমেই ১৯৪৭ সালের ১৪ ও ১৫ আগস্ট পাকিস্তান ও ভারত নামে দুটি স্বাধীন সার্বভৌম ডোমিনিয়নের জন্ম হয়।
১৯৪৭ সালের ভারত স্বাধীনতা আইনের প্রধান প্রধান ধারাসমূহ
- দুটি স্বাধীন ডোমিনিয়ন প্রতিষ্ঠা: ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ব্রিটিশ ভারতে ‘ভারত’ ও ‘পাকিস্তান’ নামে দুটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও সার্বভৌম ডোমিনিয়ন সৃষ্টি হবে এবং মহামান্য ব্রিটিশ সরকারের সমস্ত সার্বভৌম ক্ষমতা এই দুটি নবগঠিত রাষ্ট্রের ওপর ন্যস্ত হবে।
- ভূখণ্ড বিভাজন:
- পাকিস্তান: মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা যথা পূর্ব বাংলা, পশ্চিম পাঞ্জাব, সিন্ধু, বেলুচিস্তান ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ নিয়ে পাকিস্তান গঠিত হবে। সিলেটের অন্তর্ভুক্তির জন্য গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।
- ভারত: অবশিষ্টাংশ অর্থাৎ হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল (পশ্চিমবঙ্গ, পূর্ব পাঞ্জাব, আসাম, বিহার, বোম্বে, মাদ্রাজ ইত্যাদি) নিয়ে ভারত ইউনিয়ন গঠিত হবে।
- সীমানা কমিশন গঠন: পাঞ্জাব ও বাংলাকে বিভক্ত করে সুনির্দিষ্ট সীমানা চিহ্নিত করার জন্য স্যার সিরিল র্যাডক্লিফের নেতৃত্বে দুটি ‘বাউন্ডারি কমিশন’ (সীমানা কমিশন) গঠিত হবে।
- গভর্নর জেনারেলের পদ: প্রতিটি ডোমিনিয়নের জন্য রাজা কর্তৃক নিযুক্ত একজন স্বতন্ত্র গভর্নর জেনারেল থাকবেন। তবে উভয় রাষ্ট্র একমত হলে একজন একক গভর্নর জেনারেল থাকতে পারবেন। (ভারত লর্ড মাউন্টব্যাটেনকে গভর্নর জেনারেল রাখে এবং পাকিস্তান কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে গভর্নর জেনারেল মনোনীত করে)।
- গণপরিষদের সার্বভৌম ক্ষমতা: প্রতিটি ডোমিনিয়নের নিজস্ব সংবিধান প্রণয়ন না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যমান গণপরিষদ (Constituent Assembly) একাধারে সার্বভৌম আইনসভা ও সংবিধান সভার পূর্ণ ক্ষমতা ভোগ করবে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের কোনো আইন এই দুটি ডোমিনিয়নের ওপর প্রযোজ্য হবে না।
- ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের অন্তর্বর্তীকালীন প্রয়োগ: নতুন সংবিধান রচিত না হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি রাষ্ট্র ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনকে প্রয়োজনীয় সংশোধনসহ অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধান হিসেবে অনুসরণ করবে।
- দেশীয় রাজ্যসমূহের সার্বভৌমত্ব ও বিকল্প: ভারতের প্রায় ৫৬৫টি দেশীয় রাজ্যের ওপর থেকে ব্রিটিশ রাজার আধিপত্য (Paramountcy) সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হবে। এই রাজ্যগুলো তাদের ভৌগোলিক বাস্তবতা ও ইচ্ছানুযায়ী ভারত বা পাকিস্তানে যোগ দিতে পারবে অথবা স্বাধীন থাকতে পারবে।
- ভারত সচিব পদের বিলুপ্তি: লন্ডনে ‘সেক্রেটারি অব স্টেট ফর ইন্ডিয়া’ (ভারত সচিব) পদটি বাতিল করা হয় এবং তাঁর দায়িত্ব কমনওয়েলথ সচিবের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এছাড়া ব্রিটিশ রাজার পদবি থেকে ‘ভারত সম্রাট’ (Emperor of India) শব্দটি বর্জন করা হয়।
উপসংহার
১৯৪৭ সালের ভারত স্বাধীনতা আইন ছিল দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ভূগোলের সবচেয়ে নির্ণায়ক মোড়। এর মাধ্যমে স্বাধীনতার সূর্য উদিত হলেও দেশভাগজনিত রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা, লাখ লাখ শরণার্থীর বাস্তুচ্যুতি এবং কাশ্মীর সমস্যার মতো চিরস্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিল।
সংক্ষিপ্ত উত্তর প্রশ্ন
[দ্রষ্টব্য: যেকোনো দুইটি প্রশ্নের উত্তর দাও। প্রতিটি প্রশ্নের মান ১০: ১০ × ২ = ২০]
৭. আলীগড় আন্দোলন।
[English: Aligarh Movement.]
উত্তর:
পটভূমি ও উদ্দেশ্য: ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর ভারতীয় মুসলমানরা যখন ব্রিটিশ সরকারের চরম প্রতিহিংসা, অর্থনৈতিক ধ্বংস এবং আধুনিক ইংরেজি শিক্ষার অভাবে গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল, তখন তাঁদের উদ্ধার করতে স্যার সাইয়্যিদ আহমদ খান (১৮১৭-১৮৯৮) যে বহুমুখী আধুনিক সংস্কার আন্দোলন গড়ে তোলেন, তা ইতিহাসে ‘আলীগড় আন্দোলন’ নামে খ্যাত। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানদের আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত করা, ব্রিটিশদের সাথে রাজনৈতিক দূরত্ব কমিয়ে সরকারি চাকরিতে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা এবং অন্ধ কুসংস্কারমুক্ত যুক্তিবাদী চিন্তার বিকাশ ঘটানো।
আন্দোলনের প্রধান অর্জনসমূহ:
- এমএও কলেজ প্রতিষ্ঠা: ১৮৭৫ সালে তিনি উত্তর প্রদেশের আলীগড়ে ‘মোহামেডান অ্যাংলো-ওরিয়েন্টাল (এমএও) কলেজ’ প্রতিষ্ঠা করেন (যা পরবর্তীতে ১৯২০ সালে বিখ্যাত ‘আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে’ রূপান্তরিত হয়)। এখানে পাশ্চাত্য বিজ্ঞান ও দর্শনের সাথে ইসলামী শিক্ষার অপূর্ব সমন্বয় ঘটানো হয়।
- সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কার: ১৮৭০ সালে তিনি ‘তাহযীবুল আখলাক’ (নৈতিক চরিত্রের সংস্কার) নামে পত্রিকা প্রকাশ করে মুসলমানদের বিজ্ঞানমনস্ক ও আধুনিক হতে উদ্বুদ্ধ করেন। এছাড়া ১৮৬৪ সালে তিনি বিজ্ঞানের আধুনিক গ্রন্থাবলি উর্দুতে অনুবাদের জন্য ‘সায়েন্টিফিক সোসাইটি’ গঠন করেন।
- রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি: স্যার সাইয়্যিদ মুসলমানদের সর্বনাশা আন্দোলন ও রাজনীতি পরিহার করে অন্তত কয়েক দশক কেবল শিক্ষায় মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের হিন্দু আধিপত্যের বিরোধিতা করে সর্বপ্রথম মুসলমানদের স্বতন্ত্র জাতিসত্তার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
তাৎপর্য: আলীগড় আন্দোলন আধুনিক মুসলিম বুদ্ধিজীবী ও নেতা তৈরির সূতিকাগার ছিল, যা পরবর্তীতে ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ গঠন এবং উপমহাদেশের মুসলমানদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক জাগরণে অগ্রদূতের ভূমিকা পালন করেছিল।
৮. সৈয়দ আমীর আলীর পরিচয় দাও।
[English: Introduce Syed Ameer Ali.]
উত্তর:
সংক্ষিপ্ত পরিচয়: সৈয়দ আমীর আলী (১৮৪৯-১৯২৮) ছিলেন ঊনবিংশ ও বিংশ শতকের প্রারম্ভে বাঙালি মুসলমানদের নবজাগরণের এক উজ্জ্বলতম নক্ষত্র, বিশিষ্ট আইনজ্ঞ, ইতিহাসবিদ, রাজনীতিবিদ এবং সমাজসংস্কারক। তিনি ১৮৪৯ সালে কটকে এক সম্ভ্রান্ত শিয়া পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ ও বিএল ডিগ্রি অর্জনের পর লন্ডনের লিংকনস ইন থেকে ব্যারিস্টারি ডিগ্রি লাভ করেন।
ঐতিহাসিক অবদানসমূহ:
- প্রথম ভারতীয় হিসেবে ঐতিহাসিক অর্জন: তিনি ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের দ্বিতীয় ভারতীয় মুসলিম বিচারপতি এবং ১৯০৯ সালে তিনিই প্রথম ভারতীয় হিসেবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ আপিল আদালত লন্ডনের ‘প্রিভি কাউন্সিল’-এর জুডিশিয়াল কমিটির সদস্য নিযুক্ত হন।
- সেন্ট্রাল ন্যাশনাল মোহামেডান অ্যাসোসিয়েশন (১৮৭৭): মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে তিনি ১৮৭৭ সালে কলকাতায় ভারতের সর্বপ্রথম মুসলিম রাজনৈতিক সংগঠন ‘সেন্ট্রাল ন্যাশনাল মোহামেডান অ্যাসোসিয়েশন’ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৮২ সালে লর্ড রিপনের কাছে মুসলমানদের শিক্ষা ও চাকরির অধিকার দাবি করে তিনি বিখ্যাত স্মারকলিপি প্রদান করেন।
- বিশ্ববিখ্যাত সাহিত্য ও ইতিহাসচর্চা: ইসলাম সম্পর্কে পশ্চিমা প্রাচ্যবিদদের অপপ্রচারের জবাবে তিনি ইংরেজি ভাষায় দুটি অমর মাস্টারপিস রচনা করেন:
- The Spirit of Islam (১৮৯১): রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র জীবন এবং ইসলামের গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল মূলনীতি তুলে ধরা আধুনিক বিশ্বের অন্যতম সেরা গ্রন্থ।
- A Short History of the Saracens (১৮৮৯): মুসলিম সভ্যতার গৌরবোজ্জ্বল রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের প্রামাণ্য গ্রন্থ।
- লন্ডন মুসলিম লীগ ও পৃথক নির্বাচন: তিনি লন্ডনে মুসলিম লীগের শাখা প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৯০৯ সালের মর্লে-মিন্টো সংস্কারে মুসলমানদের জন্য ‘পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা’ (Separate Electorate) আদায়ে ব্রিটিশ সরকারকে রাজি করাতে তিনি মূখ্য ভূমিকা পালন করেন।
৯. ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের কারণগুলো সংক্ষেপে উল্লেখ কর।
[English: Mention in brief the causes of the Partition of Bengal of 1905.]
উত্তর:
পটভূমি: ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড কার্জনের নির্দেশে বাংলা প্রেসিডেন্সিকে বিভক্ত করে ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম’ নামে নতুন প্রদেশ গঠনের সিদ্ধান্তটি ভারতীয় রাজনীতিতে এক প্রচণ্ড আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
বঙ্গভঙ্গের প্রধান কারণসমূহ:
- প্রশাসনিক বিশালতা ও জটিলতা: তৎকালীন অবিভক্ত বাংলা প্রদেশ ছিল আয়তন ও জনসংখ্যার দিক থেকে মাত্রাতিরিক্ত বড় (প্রায় ১,৮৯,০০০ বর্গমাইল এবং প্রায় ৮ কোটি জনসংখ্যা)। এতে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা অন্তর্ভুক্ত ছিল। একজন মাত্র লেফটেন্যান্ট গভর্নরের পক্ষে যোগাযোগব্যবস্থার অনুন্নত অবস্থায় কলকাতার বাইরে প্রত্যন্ত পূর্ববঙ্গ সুষ্ঠুভাবে শাসন করা প্রায় অসম্ভব ছিল।
- পূর্ববঙ্গের দীর্ঘ অর্থনৈতিক ও সামাজিক বঞ্চনা: সমস্ত উন্নয়ন বরাদ্দ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি অফিস কলকাতায় কেন্দ্রীভূত থাকায় পূর্ববঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম ও কৃষক সমাজ চরম অবহেলা ও দারিদ্র্যের শিকার ছিল। চট্টগ্রাম বন্দরের কোনো উন্নতি করা হয়নি। ঢাকাকে কেন্দ্র করে নতুন প্রদেশ গঠন করলে এ অঞ্চলের দ্রুত উন্নয়ন সম্ভব হতো।
- রাজনৈতিক উদ্দেশ্য (‘ভাগ কর ও শাসন কর’ নীতি): ব্রিটিশ সরকারের গোপন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল শক্তিশালী হয়ে ওঠা বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ঐক্যকে দুর্বল করা। স্বরাষ্ট্র সচিব রিজলে স্পষ্ট লিখেছিলেন: “সংযুক্ত বাংলা একটি শক্তি; বিভক্ত বাংলা বিভিন্ন পথে চালিত হবে।” মধ্যবিত্ত হিন্দু ও পিছিয়ে পড়া মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করে ব্রিটিশ শাসন দীর্ঘায়িত করা ছিল এর নেপথ্য চাল।
ফলাফল: বঙ্গভঙ্গের ফলে পূর্ববঙ্গের মুসলিম সমাজ নবজাগরণের সুযোগ পেলেও হিন্দু উচ্চবিত্তদের প্রবল বিরোধিতায় স্বদেশী ও চরমপন্থী সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের মুখে ১৯১১ সালে ব্রিটিশ সরকার তা রদ করতে বাধ্য হয়।
১০. ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের প্রধান বৈশিষ্ট্যাবলি পরীক্ষা কর।
[English: Examine the main features of the govt. of India Act of 1935.]
উত্তর:
পটভূমি: সাইমন কমিশন রিপোর্ট এবং তিনটি গোলটেবিল বৈঠকের দীর্ঘ পর্যালোচনার পর ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ১৯৩৫ সালে ‘ভারত শাসন আইন ১৯৩৫’ পাস করে। এটি ছিল ব্রিটিশদের দ্বারা ভারতীয়দের জন্য তৈরি দীর্ঘতম ও সবচেয়ে বিস্তারিত আইনবিধি (এতে ৩২১টি ধারা ও ১০টি তফসিল ছিল), যা পরবর্তীতে ভারত ও পাকিস্তানের সংবিধানের মূল ভিত্তিকাঠামো হিসেবে কাজ করেছে।
আইনটির প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:
- সর্বভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র (All India Federation): ব্রিটিশ ভারতের ১১টি প্রদেশ এবং স্বেচ্ছায় যোগদানকারী দেশীয় রাজ্যগুলোকে একত্র করে একটি ফেডারেশন বা যুক্তরাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব করা হয় (যদিও দেশীয় রাজ্যগুলোর আপত্তির কারণে এ যুক্তরাষ্ট্রীয় অংশটি কখনোই কার্যকর হতে পারেনি)।
- প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন (Provincial Autonomy): ১৯১৯ সালের আইন দ্বারা প্রদেশে প্রচলিত অকার্যকর ‘দ্বৈত শাসন’ (Dyarchy) সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করা হয় এবং প্রদেশগুলোকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রদান করা হয়। প্রাদেশিক মন্ত্রীসভা এখন থেকে নির্বাচিত প্রাদেশিক আইনসভার কাছে দায়বদ্ধ ছিল।
- কেন্দ্রে দ্বৈত শাসন প্রবর্তন: কেন্দ্রীয় সরকারের বিষয়াবলিকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়: ‘সংরক্ষিত’ (প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও ধর্মীয় বিষয়—যা ভাইসরয় নিজের হাতে রাখেন) এবং ‘হস্তান্তরিত’ (অন্যান্য মন্ত্রণালয়—যা ভারতীয় মন্ত্রীদের হাতে ন্যস্ত করা হয়)।
- বিষয়সমূহের ত্রি-স্তর বিন্যাস: আইন প্রণয়নের ক্ষমতাকে ৩টি তালিকায় ভাগ করা হয়: যুক্তরাষ্ট্রীয় তালিকা (৫৯টি), প্রাদেশিক তালিকা (৫৪টি) এবং যৌথ তালিকা (৩৬টি)। অবশিষ্ট ক্ষমতা (Residuary Powers) ভাইসরয়ের ওপর অর্পণ করা হয়।
- ফেডারেল কোর্ট ও ব্যাংক প্রতিষ্ঠা: সাংবিধানিক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য দিল্লিতে একটি ‘ফেডারেল কোর্ট’ (যা পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টে রূপ নেয়) এবং মুদ্রানীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য ‘রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া’ (RBI) প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেওয়া হয়। এছাড়া বার্মাকে (মিয়ানমার) ভারত থেকে পৃথক করা হয় এবং সিন্ধু ও উড়িষ্যা নামে দুটি নতুন প্রদেশ তৈরি করা হয়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের ইতিহাস (২০৫৪০৫) পত্রের মূল গুরুত্ব কী?
উত্তর: এই পত্রটির মাধ্যমে পলাশী পরবর্তী কোম্পানি শাসন থেকে শুরু করে ১৮৫৮ সালের মহারানীর প্রত্যক্ষ শাসন এবং ১৯৪৭ সালের ভারত ও পাকিস্তান সৃষ্টির পেছনে ঘটে যাওয়া সাংবিধানিক, রাজনৈতিক ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস জানা যায়।
২. ১৮৫৮ সালের ভারত শাসন আইন কোম্পানির শাসন থেকে কীভাবে ভিন্ন ছিল?
উত্তর: এই আইনের মাধ্যমে একটি বাণিজ্যিক কোম্পানির মুনাফালোভী শাসনের সমাপ্তি ঘটে এবং ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ও মহারানীর সরাসরি জবাবদিহিতামূলক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়, যেখানে ভারত সচিব প্রশাসন তদারকি করতেন।
৩. ১৮৫৪ সালের উডের শিক্ষানীতিকে কেন ভারতীয় শিক্ষার ‘ম্যাগনা কার্টা’ বলা হয়?
উত্তর: কারণ এই দলিলের মাধ্যমেই প্রথম প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত একটি সুসংহত কাঠামো তৈরি হয়, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অনুদান চালু হয় এবং কলকাতা, বোম্বে ও মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শীর্ষ প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়।
৪. সৈয়দ আমীর আলীর ‘The Spirit of Islam’ কেন বিশ্বখ্যাত?
উত্তর: কারণ এটি পশ্চিমা গবেষকদের পক্ষ থেকে ইসলামের বিরুদ্ধে আরোপিত অন্ধত্ব ও সন্ত্রাসের মিথ্যা অভিযোগের জবাবে ইসলামের যুক্তিভিত্তিক, মানবতাবাদী ও প্রগতিশীল মূলনীতিকে ইংরেজিতে অত্যন্ত শক্তিশালী ভাষায় প্রমাণ করেছিল।
৫. ১৯৩৫ সালের আইনের কোন অংশটি স্বাধীনতার পর ভারত ও পাকিস্তানের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়?
উত্তর: ১৯৩৫ সালের আইনের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো, কেন্দ্র ও প্রদেশের মধ্যে ক্ষমতার বণ্টন তালিকা (ফেডারেল, প্রভিন্সিয়াল, কনকারেন্ট) এবং বিচার বিভাগীয় গঠন প্রণালী উভয় দেশের স্বাধীন সংবিধানে প্রায় অপরিবর্তিতভাবে গৃহীত হয়েছিল।
৬. পরীক্ষায় ব্রিটিশ ভারতের সাংবিধানিক আইনের উত্তর লেখার সঠিক কৌশল কী?
উত্তর: আইনের নাম ও পাসের সাল উল্লেখ করে পটভূমি, প্রধান ধারাগুলোর নম্বরভিত্তিক সারসংক্ষেপ এবং সমকালীন ভারতীয় সমাজে ও স্বাধীনতার অগ্রযাত্রায় সেই আইনের ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্টভাবে তুলে ধরা আবশ্যক।