اختبار السنة الثالثة للفاضل البكالوريوس (الشرف) ، لعام ۲۰۲۰ م
[ফাজিল স্নাতক (সম্মান) তৃতীয় বর্ষ পরীক্ষা, ২০২০]
القرآن والدراسات الإسلامية
[আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
الفرق الإسلامية وعقائدها
[আল-ফিরাকুল ইসলামিয়্যাহ ওয়া আকাইদুহা]
বিষয় কোড: ২০১৩০৫ | পরীক্ষা কোড: ২০৩
সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০
الملاحظة: أجب عن أربعة من مجموعة (أ) وعن أربعة من مجموعة (ب)-
[দ্রষ্টব্য: (ক) অংশ থেকে চারটি এবং (খ) অংশ থেকে চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও।]
مجموعة (أ) : [ক-বিভাগ]
أجب عن أربعة من الأسئلة التالية (لكل سؤال ١٥ درجة) :
[নিচের যে কোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও (প্রতিটি প্রশ্নের মান ১৫) :]
১. আক্বীদার সংজ্ঞা, গুরুত্ব ও মানবজীবনে প্রয়োজনীয়তা
السؤال:
١- عرف العقيدة ثم تحدث عن أهميتها وحاجة الناس إليها-
[আক্বীদার সংজ্ঞা দাও। অতঃপর এর গুরুত্ব ও মানব জীবনে এর প্রয়োজনীয়তা আলোচনা কর।]
ভূমিকা:
মানব জীবনের চিন্তা, চেতনা, কর্ম ও দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিপ্রস্তর হলো আক্বীদা বা বিশ্বাস। পরিশুদ্ধ আক্বীদা ছাড়া কোনো আমল আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য হয় না। ইসলামে আমল হলো শাখা-প্রশাখা স্বরূপ আর আক্বীদা হলো তার মূল শিকড়।
আক্বীদার সংজ্ঞা:
আভিধানিক অর্থ:
আরবি ‘আল-আক্বীদা’ (العقيدة) শব্দটি ‘আল-আক্বদ’ (العقد) মূলধাতু থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ দৃঢ়ভাবে বাঁধা (الربط والشد والإحكام), কোনো বিষয়ে অবিচল চুক্তি বা অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়া এবং দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করা। যা মানুষের অন্তরে এমনভাবে গেঁথে যায় যে তাতে কোনো সন্দেহের অবকাশ থাকে না, তাকে আক্বীদা বলে।
পারিভাষিক অর্থ:
ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায়, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা স্বীয় রাসূলগণের মাধ্যমে যে সমস্ত মৌলিক বিশ্বাসের বিষয় মানুষের নিকট অবতীর্ণ করেছেন, কোনো প্রকার দ্বিধা বা সংশয় ব্যতীত সেগুলোর প্রতি অন্তরে দৃঢ় ও অবিচল বিশ্বাস স্থাপন করাকে ‘ইসলামি আক্বীদা’ বলে।
ইমাম আল-জুরজানী (রহ.) তাঁর ‘আত-তারীফাত’ গ্রন্থে বলেন: “আক্বীদা হলো অন্তরের এমন এক প্রত্যয় যার ওপর মানুষ তার চিন্তা ও কর্মকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে।” এর মূল স্তম্ভগুলো হলো: আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, তাঁর ফেরেশতাগণের প্রতি বিশ্বাস, কিতাবসমূহের প্রতি বিশ্বাস, নবী-রাসূলগণের প্রতি বিশ্বাস, শেষ দিবস বা আখেরাতের প্রতি বিশ্বাস এবং তাকদীরের ভালো-মন্দের প্রতি বিশ্বাস।
আক্বীদার অপরিসীম গুরুত্ব:
১. আমল কবুল হওয়ার পূর্বশর্ত: সঠিক আক্বীদা ব্যতীত কোটি কোটি নেক আমলও আল্লাহর দরবারে সম্পূর্ণ নিষ্ফল ও ধূলিসদৃশ হয়ে যায়। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: “যদি তুমি শিরক করো, তবে তোমার আমল বিনষ্ট হয়ে যাবে এবং তুমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।” (সূরা আয-যুমার: ৬৫)।
২. নাজাত ও জান্নাত লাভের ভিত্তি: আখেরাতে চিরস্থায়ী জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি এবং জান্নাত লাভের একমাত্র মূল চাবিকাঠি হলো তাওহীদী আক্বীদা। যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণ খাঁটি ঈমান থাকবে, সেও একদিন জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে।
৩. মানুষের মর্যাদা রক্ষা: শিরক ও কুফরি আক্বীদা মানুষকে গাছপালা, পাথর ও সৃষ্টির সামনে মাথা নত করিয়ে চরম অপদস্থ করে; পক্ষান্তরে বিশুদ্ধ তাওহীদী আক্বীদা মানুষকে সৃষ্টির দাসত্ব থেকে মুক্ত করে কেবল মহান স্রষ্টার সামনে মাথা নত করতে শেখায়।
মানব জীবনে আক্বীদার প্রয়োজনীয়তা:
১. জীবনের সঠিক উদ্দেশ্য নির্ধারণ: বিশুদ্ধ আক্বীদা মানুষকে শিক্ষা দেয় যে, সে অর্থহীনভাবে পৃথিবীতে প্রেরিত হয়নি; বরং সে আল্লাহর প্রতিনিধি এবং আখেরাতে তাকে প্রতিটি কাজের হিসাব দিতে হবে।
২. নৈতিক চরিত্র ও মানসিক স্থৈর্য গঠন: আক্বীদা বিশ্বাসীর হৃদয়ে সর্বদা আল্লাহর সার্বক্ষণিক উপস্থিতির (মুরাকাবা) অনুভূতি জাগ্রত রাখে। ফলে লোকচক্ষুর অন্তরালেও সে পাপকাজ থেকে বিরত থাকে এবং সমাজে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করে।
৩. বিপদ-আপদে পরম ধৈর্য ও সান্ত্বনা: তাকদীরের প্রতি অবিচল বিশ্বাস মানুষকে দুঃখ-কষ্ট ও চরম সংকটের মুহূর্তেও ভেঙে পড়তে দেয় না; বরং সে আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থেকে মানসিক শান্তি ও আত্মবিশ্বাস লাভ করে।
৪. সমাজ সংস্কার ও ঐক্যের বন্ধন: অভিন্ন আক্বীদা বিভিন্ন বর্ণ, ভাষা ও ভৌগোলিক দূরত্বের মানুষকে একই আন্তর্জাতিক ভ্রাতৃত্বের ডোরে আবদ্ধ করে, যা একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ বিনির্মাণের পূর্বশর্ত।
২. ইসলামে ভ্রান্ত দলের আত্মপ্রকাশের কারণ ও হাদিসের আলোকে এদের আলামত
السؤال:
٢- اذكر أسباب ظهور الفرق الضالة في الإسلام وعلاماتها في ضوء أحاديث الرسول صلى الله عليه وسلم-
[ইসলামে বিভিন্ন ভ্রান্ত দল আত্মপ্রকাশের কারণ ও রসুল (স) এর হাদিসের আলোকে এদের আলামতসমূহ আলোচনা কর।]
ভূমিকা:
খোলাফায়ে রাশেদীনের শেষার্ধে বিশেষত হযরত উসমান ও আলী (রা.)-এর খেলাফতকালে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে মতাদর্শিক বিভক্তি ও বিভিন্ন বিদআতী ও ভ্রান্ত দলের আত্মপ্রকাশ ঘটে, যার ভবিষ্যদ্বাণী স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.) বহু পূর্বেই করে গিয়েছিলেন।
ভ্রান্ত দলসমূহ আত্মপ্রকাশের মূল কারণসমূহ:
১. রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও খেলাফত বিতর্ক: সিফফীন ও জঙ্গে জামালের যুদ্ধ এবং পরবর্তীতে সালিশি (তাহকীম) ব্যবস্থা কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিভেদের গর্ভ থেকে খারেজী ও শিয়াদের মতো মতাদর্শিক দলের জন্ম হয়।
২. নব্য মুসলিমদের প্রাচীন দর্শনের অনুপ্রবেশ: পারস্য, রোম, সিরিয়া ও মিশরের প্রাচীন জরথুস্ত্রীয়, ইয়াহুদী, খ্রিস্টান ও গ্রিক দর্শনের অনুসারীরা ইসলাম গ্রহণ করলেও তাদের পূর্বতন ভ্রান্ত বিশ্বাস ও যুক্তিবাদের অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে দ্বীনের সরল শিক্ষাকে বিকৃত করার অপচেষ্টা চালায় (যেমন আব্দুল্লাহ ইবনে সাবার ষড়যন্ত্র)।
৩. কুরআন-সুন্নাহর মনগড়া অপব্যাখ্যা ও অজ্ঞতা: আরবির গভীর ব্যাকরণ ও উসূলে ফিকহ না জেনে রূপক বা মুতাশাবিহ আয়াতসমূহের আক্ষরিক অপব্যাখ্যা দেওয়া (যেমন খারেজীদের ‘লা হুকমা ইল্লা লিল্লাহ’-এর অপপ্রয়োগ)।
৪. প্রবৃত্তির অন্ধ অনুসরণ ও নেতৃত্বের লোভ: রাজনৈতিক ক্ষমতা ও নেতৃত্ব কুক্ষিগত করার হীন উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ব্যক্তি মনগড়া মতবাদ প্রচার করে পৃথক দল গঠন করে।
৫. গ্রিক দর্শনের অনিয়ন্ত্রিত তর্জমা ও চর্চা: আব্বাসীয় যুগে গ্রিক যুক্তিবিদ্যা ও দর্শনের অবাধ অনুবাদের ফলে বিশুদ্ধ ওহিভিত্তিক বিশ্বাসের ওপর মানবীয় বুদ্ধি ও যুক্তিকে প্রাধান্য দেওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়, যার ফলশ্রুতিতে মু’তাজিলা ও জাহমিয়া সম্প্রদায়ের জন্ম হয়।
হাদিসের আলোকে ভ্রান্ত দলসমূহের আলামত ও ভবিষ্যদ্বাণী:
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর একাধিক সহীহ হাদিসে ভ্রান্ত ফিরক্বাসমূহের সুস্পষ্ট লক্ষণ বর্ণনা করেছেন:
১. ৭৩ দলের হাদিস (حديث الافتراق): রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: “ইহুদিরা ৭১ দলে বিভক্ত হয়েছিল, খ্রিস্টানরা ৭২ দলে বিভক্ত হয়েছিল, আর আমার উম্মত ৭৩ দলে বিভক্ত হবে। একটি ব্যতীত তাদের সব কটিই জাহান্নামী হবে। সাহাবায়ে কিরাম জিজ্ঞাসা করলেন: হে আল্লাহর রাসূল, সেই দলটি কারা? তিনি বললেন: ‘মা আনা আলাইহি ওয়া আসহাবী’—অর্থাৎ যে দল আমার এবং আমার সাহাবীগণের নীতি ও আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে (আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত)।” (তিরমিযী, আবু দাউদ)।
২. বাহ্যিক আমলের প্রাচুর্য কিন্তু অন্তরে ঈমানের শূন্যতা: খারেজীদের সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছিলেন: “তোমরা তোমাদের নামায-রোযাকে তাদের নামায-রোযার তুলনায় তুচ্ছ মনে করবে। তারা কুরআন তিলাওয়াত করবে কিন্তু তা তাদের কণ্ঠনালী অতিক্রম করবে না (হৃদয়ে প্রবেশ করবে না)। ধনুক থেকে তীর যেভাবে বের হয়ে যায়, তারা দ্বীন থেকে সেভাবে বের হয়ে যাবে।” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)।
৩. সাহাবায়ে কিরামের সমালোচনা ও তাকফীর: ভ্রান্ত দলগুলোর অন্যতম প্রধান আলামত হলো তারা সাহাবায়ে কিরামের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করবে, তাঁদের গালিগালাজ করবে এবং কবিরা গুনাহগার মুমিনদের কাফের আখ্যা দিয়ে হত্যা বৈধ মনে করবে।
৪. উম্মাহর মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্নতা: তারা ইজমা বা মুসলিমদের বৃহত্তর জামাআত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজেদের ক্ষুদ্র গণ্ডি তৈরি করবে। রাসূল (সা.) সতর্ক করে বলেছেন: “তোমরা বৃহৎ জামাআতকে (আস-সাওয়াদুল আযম) আঁকড়ে ধরো, কারণ বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি নেকড়ে বাঘের শিকারে পরিণত হয়।”
৩. খারেজী সম্প্রদায়ের পরিচয়, হযরত আলী (রা.) সম্পর্কে তাদের অবস্থান ও কবিরা গুনাহগার সংক্রান্ত আক্বীদা
السؤال:
٣- من هم الخوارج؟ بين موقفهم من على بن أبى طالب رضى الله عنه وعقيدتهم في صاحب الكبيرة-
[খারেজী কারা? হযরত আলী (রা) সম্পর্কে তাদের অবস্থান ও কবিরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তির ব্যাপারে তাদের বিশ্বাস আলোচনা কর।]
ভূমিকা:
ইসলামের ইতিহাসে প্রথম ধর্মীয় চরমপন্থী ও উগ্রবাদী রাজনৈতিক দল হলো খারেজী সম্প্রদায়। তারা বাহ্যিক ইবাদতে অতি উৎসাহী হলেও সঠিক দ্বীনি প্রজ্ঞার অভাবে চরম ভ্রষ্টতায় নিপতিত হয়েছিল।
খারেজীদের পরিচয়:
আভিধানিক অর্থ:
‘আল-খাওয়ারিজ’ (الخوارج) শব্দটি ‘খারাজা’ (خرج) ক্রিয়ামূল থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ বের হয়ে যাওয়া, দলত্যাগ করা বা বিদ্রোহ করা। পরিভাষায় খারেজী বলা হয় ওই উগ্র দলকে যারা ৩৭ হিজরিতে সিফফীনের যুদ্ধের পর হযরত আলী (রা.)-এর দল থেকে বের হয়ে তাঁর খেলাফতের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ করেছিল। কূফার নিকটবর্তী ‘হারূরা’ নামক স্থানে তারা সর্বপ্রথম সমবেত হওয়ায় তাদের ‘হারূরীয়া’ (الحرورية) এবং ‘লা হুকমা ইল্লা লিল্লাহ’ স্লোগান দেওয়ায় ‘মুহাক্কিমা’ও বলা হয়।
হযরত আলী (রা.) সম্পর্কে তাদের অবস্থান:
১. তাহকীম (সালিশি) মানার কারণে কাফের ঘোষণা: সিফফীনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে হযরত আলী (রা.) ও হযরত মুআবিয়া (রা.) যখন দুজন বিজ্ঞ সাহাবি (হযরত আবু মূসা আশআরী ও হযরত আমর ইবনুল আস)-কে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে মেনে নেন, তখন খারেজীরা গর্জে ওঠে এবং “إن الحكم إلا لله” (আল্লাহ ব্যতীত কারো বিধান দেওয়ার অধিকার নেই) আয়াত আওড়ে দাবি করে যে, মানুষ দিয়ে বিচার করানো শিরক ও কুফরি।
২. তাকফীর ও বৈরিতা: তারা হযরত আলী (রা.)-কে তওবা করার আহ্বান জানায়। আলী (রা.) যুক্তির মাধ্যমে তাদের ভ্রান্তি খণ্ডন করলে তারা তাঁকে কাফের ঘোষণা করে এবং তাঁর আনুগত্য পরিত্যাগ করে।
৩. নাহরাওয়ানের যুদ্ধ: হযরত আলী (রা.) তাদের বুঝানোর অনেক চেষ্টা করেন এবং আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর সাথে বাহাসে বহু খারেজী ফিরে আসে। কিন্তু গোঁড়া অবশিষ্ট অংশ যখন নিরাপরাধ মুসলমানদের হত্যা করতে শুরু করে, তখন ৩৮ হিজরিতে নাহরাওয়ানের যুদ্ধে হযরত আলী (রা.) তাদের শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন।
৪. হযরত আলী (রা.)-কে নৃশংসভাবে শহীদ করা: নাহরাওয়ানের প্রতিশোধ নিতে এবং মুসলিম বিশ্বকে ‘শিরকমুক্ত’ করার উন্মাদনায় খারেজী আততায়ী আব্দুর রহমান ইবনে মুলজাম ৪০ হিজরির ১৭ রমযান ফজরের নামাযে কূফার মসজিদে হযরত আলী (রা.)-কে বিষাক্ত তরবারি দিয়ে আঘাত করে নির্মমভাবে শহীদ করে।
কবিরা গুনাহগার সম্পর্কে খারেজীদের আক্বীদা:
কবিরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তির বিধান সম্পর্কে খারেজীরা চরমপন্থী ও বিভ্রান্তিকর বিশ্বাস পোষণ করে:
১. আমলকে ঈমানের অপরিহার্য রুকন মনে করা: তাদের মতে, ঈমান ও আমল অবিভাজ্য। যে ব্যক্তি কোনো একটি ফরজ ত্যাগ করবে বা কোনো কবিরা গুনাহ (যেমন ব্যভিচার, মদ্যপান, চুরি, মিথ্যাচার) করবে, সে সাথে সাথে ঈমান থেকে খারিজ হয়ে কাফের ও মুরতাদ হয়ে যাবে।
২. রক্ত ও সম্পদ হালাল মনে করা: তাদের আক্বীদা অনুযায়ী, কবিরা গুনাহগার ব্যক্তি কাফের হওয়ায় তার জান ও মাল হালাল এবং তাকে হত্যা করা বৈধ। এই বিভ্রান্তিকর যুক্তিতেই তারা বহু সাহাবি ও সাধারণ নিরপরাধ মুসলিমকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল।
৩. আখেরাতে চিরস্থায়ী জাহান্নামী: তারা বিশ্বাস করে, কবিরা গুনাহকারী তওবা ছাড়া মারা গেলে কোনো শাফায়াত বা ক্ষমার সুযোগ থাকবে না; সে কাফেরদের মতোই অনন্তকাল জাহান্নামের আগুনে দগ্ধ হবে।
(আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদা হলো: কবিরা গুনাহগার ব্যক্তি কাফের হয় না, বরং ফাসিক মুমিন। আল্লাহ চাইলে তাকে নিজ দয়ায় ক্ষমা করতে পারেন অথবা তার গুনাহের শাস্তি দিয়ে পরবর্তীতে ঈমানের কারণে জান্নাত দান করবেন।)
৪. শিয়া সম্প্রদায়ের পরিচয়, আল্লাহ, কুরআন ও বারো ইমাম সম্পর্কে তাদের বিশ্বাস
السؤال:
٤- عرف الشيعه ثم تحدث عن عقيدتهم فى الله وفى القرآن وفى الأئمة الاثنى عشر-
[শিয়া সম্প্রদায়ের পরিচয় দাও। অতঃপর আল্লাহ, কুরআন ও বার ইমাম সম্পর্কে তাদের বিশ্বাস আলোচনা কর।]
ভূমিকা:
শিয়া হলো ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক ও ধর্মতাত্ত্বিক উপদল। হযরত আলী (রা.) ও আহলে বায়তের ভালোবাসার দাবিদার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও পরবর্তীতে তাদের চিন্তাধারায় চরমপন্থী ও মৌলিক আকিদাবিরোধী বহু উপাদান যুক্ত হয়।
শিয়া সম্প্রদায়ের পরিচয়:
‘শিয়া’ (الشيعة) শব্দের আভিধানিক অর্থ দল, অনুসারী বা সমর্থক। ইসলামি পরিভাষায়, যে দলটি দাবি করে যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওফাতের পর খেলাফত ও ইমামতের একমাত্র হকদার ছিলেন হযরত আলী (রা.) এবং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত ও নস দ্বারা সাব্যস্ত ছিল, তাদেরকে শিয়া বলা হয়। শিয়াদের মধ্যে প্রধান ও সবচেয়ে প্রভাবশালী শাখা হলো ‘ইসনা আশারিয়া’ বা দ্বাদশ ইমামপন্থী শিয়া (ইমামিয়া)।
শিয়াদের মৌলিক আক্বীদাসমূহ:
১. আল্লাহ সম্পর্কে শিয়াদের বিশ্বাস:
শিয়াদের আকিদা অনুযায়ী তারা তাওহীদের দাবি করলেও তাদের কিতাবসমূহে বিশেষ কিছু বিচ্যুতি রয়েছে:
– বাদা (البداء): শিয়াদের একটি বিতর্কিত আকিদা হলো ‘বাদা’—অর্থাৎ কোনো বিষয়ে আল্লাহর পূর্বে অজ্ঞতা থাকা এবং পরবর্তীতে নতুন পরিস্থিতি দেখে তাঁর সিদ্ধান্তের পরিবর্তন ঘটা। আহলে সুন্নাতের মতে এটি আল্লাহর শানে চরম অবমাননাকর ও কুফরি, কারণ আল্লাহর ইলম অনাদি ও অনন্ত।
– আল্লাহর গুণাবলি অস্বীকার: মু’তাজিলাদের ন্যায় শিয়ারাও আল্লাহর সিফাত বা সত্তাগত গুণাবলিকে মূল সত্তা থেকে পৃথক মনে করে না এবং পরকালে চাক্ষুষ দর্শনকে (রুইয়াতুল্লাহ) সম্পূর্ণ অসম্ভব মনে করে।
২. কুরআনুল কারীম সম্পর্কে তাদের বিশ্বাস:
শিয়াদের প্রাচীন ও প্রামাণ্য ধর্মতাত্ত্বিক কিতাবসমূহে (যেমন আল-কুলাইনী রচিত ‘উসূলুল কাফী’) বর্ণিত হয়েছে যে:
– তাহরীফে কুরআনের দাবি: তাদের কট্টর পণ্ডিতদের মতে বর্তমান প্রচলিত কুরআন সাহাবায়ে কিরাম (নাউযুবিল্লাহ) বিকৃত করেছেন এবং হযরত আলী (রা.)-এর খেলাফত সংক্রান্ত বহু আয়াত ফেলে দিয়েছেন। তাদের বিশ্বাস, মূল পূর্ণাঙ্গ কুরআন (মুসহাফে ফাতিমা) তাঁদের দ্বাদশ ইমামের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
– তবে আধুনিক শিয়া গবেষকদের একাংশ উম্মাহর চাপের মুখে তাহরীফের বিষয়টি প্রকাশ্যে অস্বীকার করার নীতি (তাক্বিয়া) অবলম্বন করে থাকে।
৩. বারো ইমাম (الأئمة الاثنى عشر) সম্পর্কে তাদের বিশ্বাস:
ইসনা আশারিয়া শিয়াদের ধর্মবিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দু হলো ‘ইমামত’। তাদের মতে:
– ইমামত নবুওয়াতের সমতুল্য বা শ্রেষ্ঠ: ইমামত হলো ঈমানের মৌলিক স্তম্ভ (উসূলে দ্বীন)। ইমামগণ সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে মনোনীত এবং তাঁদের আনুগত্য নবীর মতোই ফরজ।
– ইমামদের নিষ্পাপতা (عصمة الأئمة): তাঁরা বিশ্বাস করে বারোজন ইমামই নবীদের মতো নিষ্পাপ (মা’সূম), তাঁরা কোনো ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে।
– ইলমে গায়েব ও সৃষ্টি পরিচালনার ক্ষমতা: শিয়াদের মতে ইমামগণ অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সমস্ত গায়েব জানেন এবং তাঁদের মৃত্যুও তাঁদের নিজস্ব ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল।
– বারো ইমামের তালিকা: ১. আলী ইবনে আবি তালিব, ২. হাসান ইবনে আলী, ৩. হুসাইন ইবনে আলী, ৪. আলী যয়নুল আবেদিন, ৫. মুহাম্মদ আল-বাক্বির, ৬. জাফর আস-সাদিক, ৭. মূসা আল-কাযিম, ৮. আলী আর-রিদা, ৯. মুহাম্মদ আত-তাক্বী, ১০. আলী আল-হাদী, ১১. হাসান আল-আসকারী, এবং ১২. মুহাম্মদ ইবনুল হাসান আল-মাহদী (যিনি শিয়াদের মতে ৮৭৪ খ্রিষ্টাব্দে সামাররার এক গোপন সুড়ঙ্গে আত্মগোপন করেছেন এবং কিয়ামতের পূর্বে মাহদী রূপে প্রকাশ পাবেন)।
৫. শিয়াদের ব্যাপারে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অবস্থান
السؤال:
٥- ما موقف أهل السنة والجماعة من الشيعة؟ بين مدللًا ومفصلًا-
[শিয়াদের ব্যাপারে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অবস্থান কী? দলিল-প্রমাণসহ বিস্তারিত আলোচনা কর।]
ভূমিকা:
শিয়াদের বিভিন্ন উপদল ও তাদের চরমপন্থী বিশ্বাসের কারণে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের ফকীহ ও মুতাকাল্লিমগণ শিয়াদেরকে একক কোনো হুকুমে সীমাবদ্ধ করেননি, বরং তাদের বিশ্বাস ও আকিদার স্তরভেদ অনুযায়ী অত্যন্ত সুবিচারপূর্ণ ও দলিলভিত্তিক অবস্থান গ্রহণ করেছেন।
শিয়াদের শ্রেণিবিভাগ ও আহলে সুন্নাতের অবস্থান:
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত শিয়াদের মূলত তিনটি প্রধান ধারায় বিভক্ত করে তাদের হুকুম নির্ধারণ করেছেন:
১. চরমপন্থী শিয়া (الغلاة বা গুলাত):
যারা হযরত আলী (রা.) বা ইমামদের খোদায়ী সত্তা দাবি করে, জিব্রাঈল (আ.) ওহি নিয়ে ভুল করেছেন বলে বিশ্বাস করে, বর্তমান কুরআনকে বিকৃত দাবি করে অথবা উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়িশা (রা.)-এর পবিত্র চরিত্রের ওপর অপবাদ আরোপ করে (অথচ পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নূরে আল্লাহ তাঁকে নিষ্পাপ ঘোষণা করেছেন)।
শরয়ী হুকুম: এই চরমপন্থী বিশ্বাস পোষণকারী ব্যক্তিরা কুরআন ও সুন্নাহর অকাট্য নাস অস্বীকার করার কারণে সর্বসম্মতভাবে কাফের ও ইসলামের গণ্ডি বহির্ভূত। ইমাম মালিক, ইমাম আহমাদ এবং ফিকহে হানাফীর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত এটিই।
২. সাব্বিয়্যাহ বা সাহাবাগণকে গালি প্রদানকারী দল (الرافضة):
যারা হযরত আবু বকর ও উমর (রা.)-কে কাফের বা মুনাফিক বলে গালি দেয় এবং সাহাবায়ে কিরামের প্রায় সবাইকে মুরতাদ আখ্যায়িত করে (নাউযুবিল্লাহ)।
শরয়ী হুকুম: সাহাবায়ে কিরামের ন্যায়পরায়ণতা ও ঈমানের সাক্ষ্য পবিত্র কুরআন দিয়েছে (সূরা আত-তাওবা: ১০০, সূরা আল-ফাতহ: ২৯)। অতএব, সাহাবাগণকে ঢালাওভাবে কাফের বলা কুফরি। যারা কেবল রাজনৈতিক কারণে হযরত আলী (রা.)-কে অন্যদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দেয় কিন্তু সাহাবাদের কাফের বলে না, তারা বিভ্রান্ত, বিদআতী ও ফাসিক; তবে সরাসরি কাফের নয়।
৩. মধ্যপন্থী শিয়া বা যায়দিয়া সম্প্রদায় (الزيدية):
ইমাম যায়েদ ইবনে আলীর অনুসারী এই দলটি চরমপন্থা বর্জন করেছে। তারা আবু বকর ও উমর (রা.)-এর খেলাফতকে বৈধ ও সহীহ মনে করে এবং সাহাবায়ে কিরামকে সম্মান করে। তারা কেবল ফযিলতের দিক থেকে হযরত আলী (রা.)-কে শ্রেষ্ঠ মনে করে।
শরয়ী হুকুম: আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের দৃষ্টিতে যায়দিয়া সম্প্রদায় আহলে কিবলা ও মুসলমান। তারা মূলধারার বিভ্রান্ত উপদল হলেও তাদের কাফের বলা যাবে না।
দলিল-প্রমাণভিত্তিক সারসংক্ষেপ:
– রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবাদের মর্যাদা সম্পর্কে বলেছেন: “তোমরা আমার সাহাবীদের গালি দিও না। যার হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ! তোমাদের কেউ যদি ওহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণও আল্লাহর পথে ব্যয় করে, তবে সে সাহাবীদের এক মুদ (এক আঁজলা) বা অর্ধ মুদের সমকক্ষ হতে পারবে না।” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)।
– অতএব, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত শিয়াদের চরমপন্থী আকিদাকে বাতিল ও ইসলাম পরিপন্থী হিসেবে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে এবং মুসলিম উম্মাহকে সাহাবায়ে কিরাম ও আহলে বায়ত—উভয়ের প্রতি সমভাবে ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শনের আহ্বান জানায়।
৬. মু’তাজিলা সম্প্রদায়ের আত্মপ্রকাশ, কুরআন সৃষ্টি সংক্রান্ত বিতর্ক (খালক্বে কুরআন) ও এর রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
السؤال:
٦- متى ولم ظهرت فرقة المعتزلة؟ اكتب ما تعرف عن مسألة خلق القرآن وتداعياتها السياسية-
[কখন, কেন মু’তাজিলা সম্প্রদায়ের আত্মপ্রকাশ ঘটে? مسألة خلق القرآن এবং এর রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে যা জান লেখ।]
ভূমিকা:
মুসলিম ইতিহাসের বুদ্ধিবৃত্তিক ও ধর্মতাত্ত্বিক জগতে চরম আলোড়ন সৃষ্টিকারী যুক্তিভিত্তিক দল হলো মু’তাজিলা সম্প্রদায়। তারা ধর্মীয় বিশ্বাসের ক্ষেত্রে ওহির ওপর মানুষের মানবীয় বুদ্ধি ও যুক্তিকে প্রাধান্য দিয়েছিল।
মু’তাজিলাদের আত্মপ্রকাশের প্রেক্ষাপট ও কারণ:
কখন ও কীভাবে আত্মপ্রকাশ ঘটে:
দ্বিতীয় হিজরি শতকের প্রথমভাগে (আনুমানিক ১১০ হিজরি সনে) উমাইয়া খলিফা হিশাম ইবনে আব্দুল মালিকের শাসনামলে বসরার প্রখ্যাত তাবেয়ী ইমাম হাসান আল-বসরী (রহ.)-এর জ্ঞানগর্ভ মজলিসে মু’তাজিলাদের উৎপত্তি ঘটে।
একদিন এক ব্যক্তি এসে হাসান বসরী (রহ.)-কে কবিরা গুনাহগার ব্যক্তির হুকুম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। হাসান বসরী চিন্তা করছিলেন, এমন সময় তাঁর অন্যতম ছাত্র ওয়াসিল ইবনে আতা উস্তাদের অনুমতির তোয়াক্কা না করে নিজ থেকে মন্তব্য করে বসল: “কবিরা গুনাহগার মুমিনও নয়, কাফেরও নয়; বরং সে দুটি স্তরের মধ্যবর্তী স্তরে অবস্থানকারী (المنزلة بين المنزلتين)।”
অতঃপর ওয়াসিল উস্তাদের মজলিস থেকে উঠে গিয়ে মসজিদের এক কোণে পৃথক হালাকা কায়েম করল। তখন ইমাম হাসান বসরী (রহ.) আক্ষেপ করে বললেন: “اعتزل عنا واصل” (ওয়াসিল আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে)। এই ‘ই’তিযাল’ বা বিচ্ছিন্ন হওয়া থেকেই তাদের নাম হয় ‘মু’তাজিলা’। ওয়াসিলের সাথে আমর ইবনে উবায়দ যুক্ত হয়ে এ মতবাদ প্রচার শুরু করে।
মাসআলায়ে খালক্বে কুরআন (কুরআন সৃষ্টি সংক্রান্ত বিতর্ক):
মু’তাজিলাদের প্রধান বিভ্রান্তিকর মতবাদগুলোর অন্যতম ছিল ‘কুরআন মাখলুক’ বা সৃষ্ট হওয়ার দাবি:
১. তাদের বিভ্রান্ত যুক্তি: মু’তাজিলারা দাবি করে যে, আল্লাহ তাআলা এক ও অদ্বিতীয়। যদি কুরআন আল্লাহর কালাম হিসেবে অনাদি ও চিরন্তন (কাদীম) হয়, তবে আল্লাহর পাশাপাশি আরেকটি কাদীম সত্তা বিদ্যমান থাকে, যা বহুত্ববাদ (তাআদ্দুদে কুদামা)। সুতরাং তাওহীদ রক্ষা করতে গিয়ে তারা দাবি করল যে কুরআন আল্লাহর সৃষ্টি (মাখলুক), তা আল্লাহর শাশ্বত কালাম নয়।
২. আহলে সুন্নাতের অবস্থান: আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে প্রমাণ করে যে, কালাম আল্লাহর সত্তাগত ও অপরিহার্য অনাদি গুণ (সিফাতে কাদীমাহ)। গুণ কখনো সত্তা থেকে আলাদা কোনো উপাস্য হতে পারে না। সুতরাং পবিত্র কুরআন আল্লাহর অনাদি কালাম, তা মাখলুক বা সৃষ্টি নয়।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও মিহনা (محنة خلق القرآن):
১. রাষ্ট্রীয় মতবাদ হিসেবে গ্রহণ: আব্বাসীয় খলিফা আল-মামুন মু’তাজিলা দার্শনিকদের প্রভাবে বিভ্রান্ত হয়ে ‘খালক্বে কুরআন’ মতবাদকে খেলাফতের রাষ্ট্রীয় আকিদা হিসেবে ঘোষণা করেন এবং পরবর্তীতে খলিফা আল-মুতাসিম ও আল-ওয়াসিক্ব এই নীতি অব্যাহত রাখেন।
২. আলেমগণের ওপর নির্যাতন (মিহনা পর্ব): খলিফা নির্দেশ জারি করেন যে, রাষ্ট্রের সমস্ত বিচারক, কাজী ও শীর্ষ আলেমদের আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বাস করতে হবে যে ‘কুরআন মাখলুক’। যারা এ মতবাদ মানতে অস্বীকার করবে, তাদের চাকরিচ্যুত, বন্দি ও চাবুক মারা হবে।
৩. ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ: ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.) একাকী বীরদর্পে রাষ্ট্রীয় এই খোদাদ্রোহী আকিদার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। তাঁকে দীর্ঘকাল অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দি রেখে বেত্রাঘাত করে রক্তাক্ত করা হয়, কিন্তু তিনি অবিচল কণ্ঠে ঘোষণা করেন: “কুরআন আল্লাহর অবতীর্ণ কালাম, তা সৃষ্টি নয়।” তাঁর এই আপসহীন সংগ্রামের মাধ্যমে সুন্নাহর বিজয় ঘটে।
৪. সুন্নাহর বিজয় ও মু’তাজিলাদের পতন: পরবর্তীতে ২৩২ হিজরিতে খলিফা আল-মুতাওয়াক্কিল ক্ষমতায় এসে মু’তাজিলা মতবাদ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন, মিহনা বন্ধ করেন এবং সুন্নাহ পুনরুজ্জীবিত করেন। ফলে রাজনৈতিক সমর্থন হারিয়ে মু’তাজিলা মতবাদ চিরতরে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়।
مجموعة (ب) : [খ-বিভাগ]
أجب عن أربعة من الأسئلة التالية (لكل سؤال ٥ درجات) :
[নিচের যে কোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও (প্রতিটি প্রশ্নের মান ৫) :]
৭. শিয়া ইসমাইলিয়া সম্প্রদায়
السؤال:
٧- ماذا تعرف عن الشيعة الإسماعيلية؟ بين بإيجاز-
[الشيعة الإسماعيلية সম্পর্কে তুমি কী জান? সংক্ষেপে আলোচনা কর:]
সংক্ষিপ্ত পরিচয়:
শিয়া ইসমাইলিয়া হলো শিয়াদের মধ্যকার একটি চরম বিভ্রান্ত ও বাতেনী শাখা। শিয়াদের ষষ্ঠ ইমাম জাফর আস-সাদিক (রহ.)-এর ওফাতের পর (১৪৮ হি.) তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র ইসমাইল ইবনে জাফরের প্রতি ইমামতের দাবিদার গোষ্ঠীকে ‘ইসমাইলিয়া’ বলা হয়। তারা সপ্তম ইমাম হিসেবে মুসা আল-কাযিমকে না মেনে ইসমাইল ও তাঁর পুত্র মুহাম্মদকে সপ্তম ইমাম হিসেবে স্বীকার করে, এজন্য এদের ‘সাবয়িয়্যাহ’ (সাত ইমামপন্থী) বলা হয়।
তাদের প্রধান বিশ্বাস ও কার্যক্রম:
১. বাতেনী ব্যাখ্যার দাবি: তারা বিশ্বাস করে কুরআনের প্রতিটি আয়াত ও শরিয়তের বিধানের একটি বাহ্যিক (জাহির) অর্থ আছে এবং একটি অভ্যন্তরীণ রহস্যময় (বাতেন) অর্থ আছে, যা কেবল তাদের ইমামই জানেন। এই বাতেনী ব্যাখ্যার নামে তারা নামায, রোযা ও শরিয়তের বহু বিধানকে বিকৃত ও রহিত করে দেয়।
২. রাজনৈতিক উত্থান: উত্তর আফ্রিকা ও মিশরে প্রতিষ্ঠিত বিখ্যাত ‘ফাতেমীয় খেলাফত’ (عبيديون) ছিল এই ইসমাইলিয়াদের রাজনৈতিক সাম্রাজ্য।
৩. শাখা-প্রশাখা: ইসমাইলিয়ারা পরবর্তীতে নিজারী ও মুসতালী শাখায় বিভক্ত হয়। কুখ্যাত ঘাতক দল ‘হাশাশীন’ ছিল এদের চরমপন্থী শাখা। বর্তমান বিশ্বে এদের নেতা হলেন ‘আগা খান’, যিনি নিজেকে ইসমাইলিয়াদের ৪৯তম ইমাম দাবি করেন।
৮. শিয়াদের পবিত্র স্থানসমূহ
السؤال:
٨- ما هى الأماكن المقدسة لدى الشيعة؟ بين-
[শিয়াদের পবিত্র স্থানসমূহ কী? বর্ণনা কর:]
মক্কা মুকাররমা ও মদিনা মুনাওয়ারার পাশাপাশি শিয়া সম্প্রদায়ের নিকট তাদের ইমামগণের মাযার ও কবরসমূহকে কেন্দ্র করে বেশ কয়েকটি স্থান অত্যন্ত পবিত্র ও জিয়ারতের তীর্থক্ষেত্র হিসেবে পরিগণিত:
১. নাজাফ আশ-আশরাফ (ইরাক): এখানে হযরত আলী (রা.)-এর মাযার অবস্থিত বলে তারা বিশ্বাস করে। এটি শিয়াদের সবচেয়ে পবিত্রতম কেন্দ্র ও তাদের ধর্মীয় মারজায়ে তাক্বলীদের প্রধান পিঠস্থান।
২. কারবালা মুয়াল্লা (ইরাক): এখানে সাইয়্যিদুনা ইমাম হুসাইন (রা.) এবং তাঁর পরিবারের শহীদগণের রওজা অবস্থিত। আশুরার দিন ও চেহলামের সময় এখানে লক্ষ লক্ষ শিয়া শোক মাতমে সমবেত হয়।
৩. জান্নাতুল বাক্বী (মদিনা): যেখানে চারজন শিয়া ইমামের (হাসান, যয়নুল আবেদিন, বাক্বির ও সাদিক) কবর অবস্থিত। সৌদি সরকারের পূর্বে এখানে গম্বুজ ছিল, যা সংস্কারের দাবি তারা সর্বদা তোলে।
৪. কাযিমিয়া (বাগদাদ, ইরাক): সপ্তম ইমাম মূসা আল-কাযিম ও নবম ইমাম মুহাম্মদ আত-তাক্বীর মাযার শরীফ।
৫. সামাররা (ইরাক): দশম ইমাম আলী আল-হাদী ও একাদশ ইমাম হাসান আল-আসকারীর রওজা এবং দ্বাদশ ইমাম মাহদীর কথিত অন্তর্ধানের স্থান (সারদাব)।
৬. মাশহাদ (ইরান): অষ্টম ইমাম আলী আর-রিদার বিশাল মাযার কমপ্লেক্স, যা ইরানের সবচেয়ে পবিত্র শিয়া জিয়ারতগাহ।
৭. কোম (ইরান): ইমাম রিদার বোন ফাতিমা মা’সূমার মাযার এবং শিয়া ধর্মীয় পাণ্ডিত্যের অন্যতম শীর্ষ মারকায।
৯. পরকালে আল্লাহকে দেখা (রুইয়াতুল্লাহ) প্রসঙ্গে মু’তাজিলা ও আশআরীদের বিরোধ
السؤال:
٩- ما الخلاف بين المعتزلة والأشاعرة فى مسألة رؤية الله فى الآخرة؟ بين-
[‘পরকালে আল্লাহকে দেখা সম্ভব’—এ বিষয়ে মু’তাজিলা ও আশআরীদের মধ্যকার বিরোধ কী? আলোচনা কর:]
বিরোধের মূল বিষয়বস্তু:
আখেরাতে বা জান্নাতে মুমিনগণ মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলাকে চাক্ষুষ দেখতে পাবে কি না—এ বিষয়ে মু’তাজিলা এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের (আশআরী ও মাতুরিদী) মধ্যে মৌলিক বিরোধ রয়েছে।
মু’তাজিলাদের অবস্থান:
মু’তাজিলারা বিশ্বাস করে যে, দুনিয়া বা আখেরাত কোথাও আল্লাহকে কোনো চোখ দিয়ে চাক্ষুষ দেখা কখনোই সম্ভব নয় (رؤية الله مستحيلة عقلا ونقلا)।
– তাদের যুক্তি: কোনো কিছু দেখতে হলে তা কোনো নির্দিষ্ট দিকে (جهة) থাকতে হয়, তার রূপ-আকৃতি থাকতে হয় এবং চোখ ও বস্তুর মধ্যে নির্দিষ্ট দূরত্ব থাকতে হয়। আল্লাহ স্থান, দিক, আকার ও সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে। সুতরাং তাঁকে দেখা অসম্ভব। কুরআনের আয়াত “দৃষ্টিসমূহ তাঁকে পরিবেষ্টন করতে পারে না” (সূরা আল-আনআম: ১০৩) দিয়ে তারা দলিল দেয়।
ইমাম আবুল হাসান আল-আশআরী ও আহলে সুন্নাতের অবস্থান:
ইমাম আশআরী এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অকাট্য আকিদা হলো: জান্নাতে মুমিন বান্দাগণ মহান আল্লাহকে কোনো দিক, রূপ, স্পর্শ বা শারীরিক উপমা ব্যতীতই চাক্ষুষ দর্শন লাভ করবে (رؤية الله للمؤمنين حق بلا كيف ولا تشبيه)।
– কুরআনের দলিল: “সেদিন বহু মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হবে, তারা তাদের প্রতিপালকের দিকে তাকিয়ে থাকবে।” (সূরা আল-কিয়ামাহ: ২২-২৩)।
– হাদিসের দলিল: রাসূলুল্লাহ (সা.) পূর্ণিমার চাঁদের দিকে ইঙ্গিত করে বলেছিলেন: “নিশ্চয়ই তোমরা তোমাদের রবকে তেমনি সুস্পষ্ট দেখতে পাবে যেমন তোমরা এই পূর্ণিমার চাঁদকে কোনো ভিড় ছাড়াই দেখতে পাচ্ছ।” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)।
ইমাম আশআরী বলেন, আল্লাহ অস্তিত্বশীল (মওজুদ), আর যা অস্তিত্বশীল তা দৃশ্যমান হওয়া বুদ্ধিবৃত্তিক ও যৌক্তিকভাবে সম্পূর্ণ সম্ভব।
১০. ‘হাকিমিয়্যাত’ (সার্বভৌমত্ব) বিষয়ে খারেজিদের অবস্থান
السؤال:
١٠- اشرح موقف الخوارج من مسألة ‘الحاكمية’-
[‘الحاكمية’ বিষয়ে খারেজিদের অবস্থান ব্যাখ্যা কর:]
হাকিমিয়্যাত প্রশ্নে খারেজিদের দৃষ্টিভঙ্গি:
খারেজিদের সমগ্র বিদ্রোহ ও মতাদর্শিক চরমপন্থার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ‘হাকিমিয়্যাত’ বা শাসন ও সার্বভৌমত্বের ভুল উপলব্ধি।
১. ‘লা হুকমা ইল্লা লিল্লাহ’ স্লোগান: সিফফীনের সালিশির সময় তারা পবিত্র কুরআনের আয়াত “إن الحكم إلا لله” (বিধান দেওয়ার অধিকার কেবল আল্লাহরই)—এ বাক্যটিকে পুঁজি করে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। তারা দাবি করে যে, মানুষ কোনো বিষয়ে মধ্যস্থতা বা বিচার করতে পারে না, বিচার কেবল আল্লাহই করবেন।
২. হযরত আলী (রা.)-এর ঐতিহাসিক উত্তর: খারেজিদের এই স্লোগান শুনে বিজ্ঞ সাহাবি আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী (রা.) বলেছিলেন: “كلمة حق أريد بها باطل”—অর্থাৎ ‘বাক্যটি তো সত্য, কিন্তু তা দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য চরম অসৎ ও বাতিল!’
৩. আলী (রা.)-এর ব্যাখ্যা: হযরত আলী (রা.) পরিষ্কার বুঝিয়ে দিলেন যে, কুরআনের আইন বা হুকুম কিতাবের পাতায় অক্ষরের মধ্যে থাকে, তা নিজে নিজে কথা বলে না; মানুষকেই সেই আইন বাস্তবায়ন ও প্রয়োগ করতে হয়। এমনকি স্বামী-স্ত্রীর পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তিতেও কুরআন দুই পক্ষ থেকে দুজন মানুষ সালিশ নিযুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছে (সূরা আন-নিসা: ৩৫)। সুতরাং মানুষের সালিশি মানা শিরক নয়।
৪. চরমপন্থী পরিণতি: খারেজিরা এই আয়াতের বিকৃত রাজনৈতিক প্রয়োগ ঘটিয়ে যে কোনো শাসক ও বিচারককে কাফের আখ্যা দিয়ে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও রক্তপাতকে বৈধতা দান করেছিল।
১১. কাদিয়ানি সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বিবরণ
السؤال:
١١- اكتب ما تعرف عن مؤسس القاديانية بإيجاز-
[কাদিয়ানি সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা সম্পর্কে যা জান সংক্ষেপে লেখ:]
নাম ও জন্ম:
কাদিয়ানি বা তথাকথিত ‘আহমদীয়া’ জামাআতের প্রতিষ্ঠাতা ছিল মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানি। সে ১৮৩৫ বা ১৮৩৯ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ শাসিত ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের গুরুদাসপুর জেলার ‘কাদিয়ান’ নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করে।
দাবি ও বিভ্রান্তির ক্রমবিকাশ:
১. মুজাদ্দিদ থেকে নবুওয়াতের মিথ্যা দাবি: গোলাম আহমদ প্রথম জীবনে সাধারণ লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও পরবর্তীতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের পৃষ্ঠপোষকতায় ক্রমান্বয়ে বিভ্রান্তিকর দাবি তুলতে থাকে। প্রথমে সে নিজেকে মুজাদ্দিদ (সংস্কারক), এরপর প্রতিশ্রুত ঈসা মসীহ ও মাহদী এবং পরিশেষে ১৯০১ সনে সরাসরি নিজেকে যিললী ও বুরুযী ‘নবী’ ও ‘রাসূল’ হিসেবে ঘোষণা করে।
২. খতমে নবুওয়াত অস্বীকার: সে পবিত্র কুরআনের সূরা আল-আহযাবের ৪০ নম্বর আয়াতে ঘোষিত “খাতামুন নাবিয়্যীন”-এর সুপ্রতিষ্ঠিত অর্থ বিকৃত করে দাবি করে যে, মুহাম্মাদ (সা.)-এর পরেও নতুন নবুওয়াতের দ্বার উন্মুক্ত।
৩. জিহাদ রহিতের ঘোষণা: ভারতে ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন ও মুসলমানদের সশস্ত্র প্রতিরোধ দমন করতে সে ঘোষণা দেয় যে ব্রিটিশ সরকারের আনুগত্য করা ফরজ এবং তরবারির জিহাদ চিরতরে হারাম ও বাতিল করা হয়েছে।
৪. উম্মতে মুসলিমার ঐক্য বিনষ্ট: যে ব্যক্তি তাকে নবী হিসেবে মানবে না, তাকে সে কাফের ঘোষণা করে।
মৃত্যু ও আন্তর্জাতিক ফতোয়া:
প্রখ্যাত মুহাদ্দিস মাওলানা সানাউল্লাহ অমৃতসরীর সাথে মোবাহালার পর মির্জা কাদিয়ানি ১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ মে লাহোরে কলেরায় (ওলাউঠা) চরম যন্ত্রণাদায়কভাবে পায়খানায় পড়ে অপদস্থ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে।
১৯৭৪ সনে মক্কায় অনুষ্ঠিত রাবেতায়ে আলমে ইসলামীর আন্তর্জাতিক মহাসম্মেলনে এবং পাকিস্তান ও অন্যান্য মুসলিম দেশের পার্লামেন্টে সর্বসম্মতিক্রমে কাদিয়ানিদের অমুসলিম সংখ্যালঘু হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
১২. সংক্ষেপ টীকা: যে কোনো একটি
السؤال:
١٢- علق على واحد مما يلى :
(أ) الفرقة الناجية؛
(ب) البهائية؛
(ج) فرقة الجبرية-
[যে কোনো একটি বিষয়ে টীকা লেখ: (ক) আল-ফিরকাতুন নাজিয়াহ; (খ) আল-বাহায়িয়্যাহ; (গ) ফিরকাতুল জাবারিয়্যাহ।]
(أ) আল-ফিরকাতুন নাজিয়াহ (الفرقة الناجية – মুক্তিপ্রাপ্ত দল):
হাদিস শরীফে বর্ণিত ৭৩ দলের মধ্যে যে একমাত্র দল জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে, তাকে ‘আল-ফিরকাতুন নাজিয়াহ’ (মুক্তিপ্রাপ্ত দল) বা ‘আত-তাইফাতুল মানসূরাহ’ (বিজয়ী কাফেলা) বলা হয়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এদের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন: “তারা হলো ওই সমস্ত লোক, যারা আমি এবং আমার সাহাবীগণ যার ওপর প্রতিষ্ঠিত আছি তার ওপর অটল থাকবে।” (তিরমিযী)। সাহাবায়ে কিরাম, তাবেয়ীন, মুহাদ্দিসীন এবং চার ইমামের অনুসৃত মূলধারার এই দলটিই ইতিহাসে ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত’ নামে পরিচিত। তারা কোনো নবউদ্ভাবিত বিদআত ও গোঁড়ামিতে বিশ্বাস করে না; বরং ওহিভিত্তিক কুরআন ও সহীহ সুন্নাহকে সাহাবাদের বুঝ অনুযায়ী গ্রহণ করে উভয় জাহানে চিরন্তন সাফল্য অর্জন করবে।
(ب) আল-বাহায়িয়্যাহ (البهائية – বাহাই সম্প্রদায়):
উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ইরানে শিয়া বাতেনী মতবাদের গর্ভ থেকে শিয়া শেখী আন্দোলনের নেতা আলী মুহাম্মদ রেজা শিরাযী (যিনি নিজেকে ‘বাব’ বা দ্বারে সত্য দাবি করেন)-এর হাত ধরে সূচিত এবং পরবর্তীতে তার প্রধান শিষ্য হুসাইন আলী নূরী (যিনি নিজেকে ‘বাহাউল্লাহ’ অর্থাৎ আল্লাহর জ্যোতি দাবি করেন)-এর মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভকারী একটি ইসলামত্যাগী বিভ্রান্ত দল হলো ‘বাহাই সম্প্রদায়’।
তারা দাবি করে যে সমস্ত ধর্ম এক এবং বাহাউল্লাহ সমস্ত ধর্মের মূল প্রতিশ্রুত অবতার। তারা কুরআনের বিধান রহিত দাবি করে নতুন কিতাব ‘কিতাবুল আকদাস’ রচনা করে, কেবলা হিসেবে ইরানের আক্কা নগরীকে নির্ধারণ করে এবং ১৯ দিনের রোযা পালন করে। সমগ্র মুসলিম উম্মাহর সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে বাহাইরা সম্পূর্ণ অমুসলিম ও ইসলামের বহির্ভূত একটি স্বতন্ত্র ধর্মীয় গোষ্ঠী।
(গ) ফিরকাতুল জাবারিয়্যাহ (فرقة الجبرية – অদৃষ্টবাদী দল):
ইসলামি ধর্মতত্ত্বে মানুষের ইচ্ছা ও কর্মক্ষমতা নিয়ে সৃষ্ট অন্যতম বিভ্রান্ত প্রাচীন দার্শনিক দল হলো ‘জাবারিয়্যাহ’। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিল জাহম ইবনে সাফওয়ান ও জাদ ইবনে দিরহাম।
তারা মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা ও কর্মক্ষমতা (الإرادة والاختيار) সম্পূর্ণ অস্বীকার করে দাবি করে যে, মানুষ সম্পূর্ণ নিরুপায় ও বাধ্য (مجبور)। বাতাসে উড়ন্ত শুকনো পাতার মতো কিংবা পুতুলের মতো মানুষ কর্ম করতে বাধ্য; মানুষের নিজস্ব কোনো ক্ষমতা নেই।
তাদের ভ্রান্তি: এই আকিদার ফলে মানুষের পাপকাজের দায়ভার আল্লাহর ওপর চাপিয়ে দেওয়ার ধৃষ্টতা তৈরি হয় এবং শরিয়তের আদেশ-নিষেধ ও পুরস্কার-শাস্তির সমস্ত যৌক্তিকতা বিনষ্ট হয়। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদা হলো: আল্লাহ মানুষকে সীমিত স্বাধীনতা ও কর্মের ইচ্ছা (কাসব) দান করেছেন, যার ওপর ভিত্তি করেই পরকালে প্রতিদান বা শাস্তি নির্ধারিত হবে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. ফাজিল অনার্স ৩য় বর্ষের আল-আক্বাইদুল ইসলামিয়্যাহ (২০১৩০৫) পরীক্ষার প্রশ্ন কাঠামো কেমন?
আল-আক্বাইদুল ইসলামিয়্যাহ পরীক্ষায় মোট পূর্ণমান ৮০ এবং সময় ৪ ঘণ্টা। প্রশ্নপত্র দুটি বিভাগে বিভক্ত: ‘ক’ বিভাগে ৬টি বর্ণনামূলক প্রশ্ন থেকে ৪টির উত্তর দিতে হয় (প্রতিটি ১৫ নম্বর = ৬০ নম্বর); এবং ‘খ’ বিভাগে ৬টি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন থেকে ৪টির উত্তর দিতে হয় (প্রতিটি ৫ নম্বর = ২০ নম্বর)।
২. খারেজী সম্প্রদায়ের প্রধান ভ্রষ্টতা ও আকিদাগত বিচ্যুতি কী ছিল?
খারেজীদের প্রধান ভ্রষ্টতা ছিল তারা ‘লা হুকমা ইল্লা লিল্লাহ’ আয়াতের অপব্যাখ্যা করে খেলাফতের মধ্যস্থতা মানার কারণে হযরত আলী (রা.) সহ সাহাবাদের কাফের ঘোষণা করে এবং যে কোনো কবিরা গুনাহে লিপ্ত মুসলিমকে কাফের ও চিরস্থায়ী জাহান্নামী ফতোয়া দিয়ে তাদের রক্ত হালাল মনে করত।
৩. শিয়াদের দ্বাদশ ইমামপন্থী (ইসনা আশারিয়া) সম্প্রদায়ের মূল আকিদা কী?
ইসনা আশারিয়া শিয়ারা বিশ্বাস করে যে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর খেলাফত ও ইমামত কেবল হযরত আলী (রা.) ও তাঁর বংশধর বারো জন ইমামের জন্য নির্ধারিত। এই ইমামগণ নিষ্পাপ, ওহিপ্রাপ্ত নবীদের মতোই তাঁদের আনুগত্য ফরজ এবং তাঁরা সমগ্র মহাবিশ্ব পরিচালনার অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী।
৪. মাসআলায়ে খালক্বে কুরআন কী এবং এর পরিণতি কী হয়েছিল?
মু’তাজিলারা ভ্রান্ত যুক্তি প্রয়োগ করে দাবি করেছিল যে পবিত্র কুরআন আল্লাহর সৃষ্টি (মাখলুক), তা অনাদি কালাম নয়। আব্বাসীয় শাসনামলে রাষ্ট্রীয়ভাবে এই মতবাদ চাপিয়ে দিয়ে বহু আলেমকে নির্যাতন করা হয়। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.) অটলভাবে এই ভ্রান্ত আকিদার বিরুদ্ধে লড়াই করে প্রমাণ করেন কুরআন আল্লাহর অনাদি কালাম, সৃষ্টি নয়।
৫. হাদিসে উল্লেখিত ‘আল-ফিরকাতুন নাজিয়াহ’ বলতে কোন দলকে বোঝানো হয়েছে?
হাদিসে ঘোষিত ৭৩ দলের মধ্যে একমাত্র মুক্তিপ্রাপ্ত দল (ফিরকাতুন নাজিয়াহ) হলো আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন, তারা সেই আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে যার ওপর তিনি এবং তাঁর সম্মানিত সাহাবায়ে কিরাম অধিষ্ঠিত ছিলেন।
৬. কাদিয়ানি সম্প্রদায় কেন মুসলিম উম্মাহর সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে কাফের ও অমুসলিম?
কাদিয়ানিদের প্রতিষ্ঠাতা মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানি পবিত্র কুরআনে ঘোষিত হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ‘খাতামুন নাবিয়্যীন’ (সর্বশেষ নবী) হওয়ার মৌলিক আকিদা অস্বীকার করে নিজেকে নবী দাবি করেছিল এবং জিহাদ রহিত ঘোষণা করেছিল। ইসলামের মৌলিক অকাট্য আকিদা অস্বীকার করায় তারা ইসলাম বহির্ভূত অমুসলিম।