জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

দিরাসাতুল হাদিস (Dirasatul Hadith) – 201304, আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ – ফাজিল অনার্স ৩য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২০

Abswer.com Abswer.com
20 September, 2026
৯২ মিনিট পড়ার সময়
৬ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

اختبار السنة الثالثة للفاضل البكالوريوس (الشرف) ، لعام ۲۰۲۰ م
[ফাজিল স্নাতক (সম্মান) তৃতীয় বর্ষ পরীক্ষা, ২০২০]
القرآن والدراسات الإسلامية
[আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
دراسة الحديث
[দিরাসাতুল হাদিস]
বিষয় কোড: ২০১৩০৪ | পরীক্ষা কোড: ২০৩
সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০

الملاحظة: أجب عن خمسة من مجموعة (أ) وعن واحد من مجموعة (ب)-
[দ্রষ্টব্য: (ক) অংশ থেকে পাঁচটি এবং (খ) অংশ থেকে একটি প্রশ্নের উত্তর দাও।]


مجموعة (أ) : [ক-বিভাগ]

أجب عن خمسة من الأسئلة التالية (لكل سؤال ١٤ درجة: الحديث ٦ + أ ٤ + ب ٤) :
[নিচের যে কোনো পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দাও (প্রতিটি প্রশ্নের মান ১৪: হাদিস ৬ + ক ৪ + খ ৪) :]


১. হাদিস ও সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর

الحديث:
عن عائشة أم المؤمنين أن الحارث بن هشام سأل رسول الله صلى الله عليه وسلم فقال يا رسول الله كيف يأتيك الوحي؟ فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم أحيانا يأتيني مثل صلصلة الجرس وهو أشده علي فيفصم عني وقد وعيت عنه ما قال وأحيانا يتمثل لي الملك رجلا فيكلمني فأعي ما يقول قالت عائشة رضي الله عنها ولقد رأيته ينزل عليه الوحي في اليوم الشديد البرد فيفصم عنه وإن جبينه ليتفصد عرقا-

[উম্মুল মুমিনীন আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত: হারিস ইবনে হিশাম (রা.) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার নিকট ওহি কীভাবে আসে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: কখনো কখনো তা আমার নিকট ঘণ্টার টুংটাং শব্দের ন্যায় আসে, আর এটি আমার ওপর সবচেয়ে কষ্টদায়ক হয়; অতঃপর তা যখন শেষ হয়, তখন ফেরেশতা যা বলেছেন তা আমি পুরোপুরি আয়ত্ত করে ফেলি। আবার কখনো ফেরেশতা পুরুষের রূপ ধারণ করে আমার নিকট আগমন করেন এবং আমার সাথে কথা বলেন, তখন তিনি যা বলেন আমি তা মুখস্থ করে নিই। আয়িশা (রা.) বলেন: আমি তীব্র শীতের দিনে তাঁর ওপর ওহি নাজিল হতে দেখেছি; যখন ওহির সমাপ্তি ঘটত, তখন তাঁর কপাল থেকে ঘাম ঝরে পড়ত।]

(أ) ما معنى الوحي لغة وشرعا؟ بين أقسامه مفصلا –

[(ক) ওহির আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ কী? বিস্তারিতভাবে এর প্রকারভেদসমূহ বর্ণনা কর:]

ওহির শাব্দিক অর্থ:
আরবি ‘ওহি’ (الوحي) শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো অত্যন্ত গোপন ও দ্রুততম সংকেত বা বার্তা পাঠানো (الإشارة السريعة الخفية), অলক্ষ্যে মনে কোনো কথা প্রক্ষেপ করা, ইলহাম করা এবং পত্র প্রেরণ করা।

ওহির পারিভাষিক অর্থ:
ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায়, মহান আল্লাহ তাআলা মানবজাতির হিদায়াত ও পথপ্রদর্শনের নিমিত্তে তাঁর মনোনীত নবী ও রাসূলগণের নিকট তাঁর নিজস্ব বিধানাবলি ও বাণী যে অলৌকিক ও গোপন মাধ্যমে অবতীর্ণ করেন, তাকে ‘ওহি’ বলে। ইমাম রাগিব আল-ইসফাহানি (রহ.) বলেন, ওহি হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো বিশেষ নির্দেশ বা প্রজ্ঞা নবুওয়াতের মাধ্যমে দ্রুত ও অলৌকিকভাবে কোনো পয়গম্বরের নিকট অবতীর্ণ হওয়া।

ওহির প্রধান প্রকারভেদ:
পবিত্র কুরআনের সূরা আশ-শূরার ৫১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা ওহির তিনটি মূল পদ্ধতির কথা উল্লেখ করেছেন:
১. ইলহাম বা অন্তরে প্রক্ষেপণ (إلهاما أو في المنام): জাগ্রত অবস্থায় কোনো মাধ্যম ছাড়া সরাসরি নবীর অন্তরে কোনো বিষয় ঢেলে দেওয়া অথবা সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে নির্দেশনা প্রদান করা। আম্বিয়ায়ে কিরামের স্বপ্ন ওহির অন্তর্ভুক্ত।
২. পর্দার অন্তরাল থেকে কথোপকথন (من وراء حجاب): কোনো মাধ্যম ছাড়াই আল্লাহ সরাসরি স্বীয় নবীর সাথে কথা বলেন, তবে কোনো চাক্ষুষ দর্শন ছাড়া অন্তরাল থেকে, যেমনটি ঘটেছিল হযরত মূসা (আ.)-এর ক্ষেত্রে তুর পাহাড়ে এবং মেরাজের রজনীতে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে।
৩. ফেরেশতা বা বার্তাবাহকের মাধ্যমে (بواسطة الملك أو الرسول): জিব্রাঈল (আ.) আল্লাহর নির্দেশক্রমে ওহি নিয়ে রাসূলের নিকট সরাসরি আগমন করতেন।

শরিয়তের বিধানগত দৃষ্টিকোণ থেকে ওহি দুই প্রকার:
ক. ওহি মাতলু (الوحي المتلو): যে ওহির শব্দ ও অর্থ উভয়টিই আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ এবং যা নামাযে তিলাওয়াত করা হয়—অর্থাৎ পবিত্র কুরআনুল কারীম।
খ. ওহি গায়রে মাতলু (الوحي غير المتلو): যে ওহির মূল মর্মার্থ আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে, তবে ভাষা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিজের এবং যা নামাযে তিলাওয়াত করা হয় না—অর্থাৎ হাদিসে নববী।

(ب) ماذا تعرف عن كيفيات نزول الوحي؟

[(খ) ওহি অবতীর্ণের বিভিন্ন অবস্থা ও পদ্ধতি সম্পর্কে তুমি কী জান?]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর বিভিন্ন পদ্ধতিতে ওহি অবতীর্ণ হতো। আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) ‘যাদুল মাআদ’ গ্রন্থে এবং হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) ‘ফাতহুল বারী’তে ওহি অবতরণের কয়েকটি বিশেষ কাইফিয়াত উল্লেখ করেছেন:

১. সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে (الرؤيا الصادقة): নবুওয়াতের সূচনাপর্বে রাসূলুল্লাহ (সা.) যে স্বপ্ন দেখতেন, তা প্রত্যুষের উজ্জ্বল আলোর ন্যায় হুবহু বাস্তবে রূপান্তরিত হতো।
২. ঘণ্টাধ্বনির ন্যায় আগমন (مثل صلصلة الجرس): ফেরেশতা না এসে সরাসরি ওহির শব্দ ঘণ্টার ঝনঝনানির মতো অত্যন্ত তীব্রভাবে আসত। এটি ছিল রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জন্য সবচেয়ে কষ্টকর ও ভারি অবস্থা। এ সময় তাঁর শরীর থেকে তীব্র শীতেও ঘাম ঝরত এবং সাওয়ারির ওপর থাকলে উটনী ভার সইতে না পেরে বসে পড়ত।
৩. মানব আকৃতিতে ফেরেশতার আগমন (تمثل الملك رجلا): জিব্রাঈল (আ.) সুশ্রী সাহাবি হযরত দিহয়া কালবী (রা.)-এর আকৃতি ধারণ করে অথবা অপরিচিত সাধারণ মানুষের রূপ নিয়ে উপস্থিত হতেন এবং রাসূলের সাথে সরাসরি কথা বলতেন। সাহাবায়ে কিরামও কখনো কখনো তাঁকে দেখতে পেতেন (যেমন হাদিসে জিব্রাঈল)।
৪. ফেরেশতার স্বরূপে আগমন (نزول الملك في صورته الأصلية): হযরত জিব্রাঈল (আ.) তাঁর আসল ছয়শত ডানাবিশিষ্ট দিগন্তব্যাপী জ্যোতির্ময় রূপ ধারণ করে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট উপস্থিত হতেন। সমগ্র জীবনে রাসূল (সা.) তাঁকে এভাবে দুবার বা তিনবার প্রত্যক্ষ করেছেন।
৫. অন্তরে সরাসরি প্রক্ষেপণ (النفث في الروع): ফেরেশতা কোনো আকৃতিতে না এসে সরাসরি রাসূলের পবিত্র অন্তরে ওহির কথা ফুঁকে বা প্রক্ষেপ করে দিতেন।
৬. ঊর্ধ্বাকাশে মেরাজের সময় সরাসরি কথোপকথন (التكليم الإلهي المباشر): কোনো মাধ্যম ছাড়াই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সরাসরি তাঁর প্রিয় হাবীবকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাযসহ বিভিন্ন হুকুম প্রদান করেছিলেন।


২. হাদিস ও সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর

الحديث:
عن عبد الله بن عمرو بن العاص قال سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول : إن الله لا يقبض العلم انتزاعا ينتزعه من العباد ولكن يقبض العلم بقبض العلماء حتى إذا لم يبق عالما اتخذ الناس رءوسا جهالا فسئلوا فأفتوا بغير علم فضلوا وأضلوا-

[আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি: নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা বান্দাদের অন্তর থেকে ইলমকে একবারে ছিনিয়ে নিয়ে উঠিয়ে নেবেন না, বরং আলেমগণের মৃত্যুর মাধ্যমেই ইলমকে উঠিয়ে নেবেন। এমনকি যখন কোনো আলেম অবশিষ্ট থাকবে না, তখন মানুষ জাহেল-মূর্খ ব্যক্তিদের নিজেদের নেতা নির্বাচন করবে। অতঃপর তাদের নিকট দ্বীনি বিষয়ে ফতোয়া চাওয়া হবে এবং তারা কোনো ইলম বা জ্ঞান ছাড়াই ফতোয়া দেবে; ফলে নিজেরাও গোমরাহ হবে এবং অন্যদেরকেও গোমরাহ করবে।]

(أ) من له حق الفتوى في الشريعة؟ بين بالاختصار –

[(ক) ইসলামি শরিয়তে ফতোয়া প্রদানের অধিকার কার রয়েছে? সংক্ষেপে বর্ণনা কর:]

ফতোয়া প্রদানের যোগ্য ব্যক্তি:
ইসলামি শরিয়তে দ্বীনের বিধান বর্ণনা বা ফতোয়া প্রদান একটি অত্যন্ত নাজুক ও দায়িত্বশীল আমানত। যে কেউ চাইলেই শরিয়তের ফতোয়া দিতে পারে না। কেবল সেই ব্যক্তিই ফতোয়া দেওয়ার অধিকার রাখে যিনি ফিকহ ও শরিয়তের মূল উৎসসমূহে প্রাজ্ঞ এবং যিনি মুফতি বা মুজতাহিদের গুণাবলি অর্জন করেছেন।

ইমাম নববী (রহ.) ও আল্লামা ইবনে সালাহ (রহ.)-এর মতে মুফতির অপরিহার্য শর্তাবলি:
১. কুরআন ও হাদিসের গভীর জ্ঞান: আহকাম সংক্রান্ত কুরআনের আয়াত এবং হাদিসের নাসিখ-মানসূখ, আম-খাস ও মুজমাল-মুফাসসাল সম্পর্কে পূর্ণ অবগত হওয়া।
২. ইজমা ও ইখতিলাফের জ্ঞান: সালাফে সালেহীনের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত (ইজমা) এবং বিভিন্ন ফকীহের মতপার্থক্য সম্পর্কে জ্ঞান থাকা।
৩. আরবি ভাষা ও সাহিত্যের পাণ্ডিত্য: নাহু, সরফ, বালাগাত এবং শব্দের ব্যুৎপত্তি ও ব্যবহারের গভীর জ্ঞান থাকা।
৪. উসূলে ফিকহের জ্ঞান: কিয়াস, ইস্তিসহাব, মাসলাহাহ ও শরিয়তের মূলনীতি প্রয়োগ করার পূর্ণ সক্ষমতা।
৫. তাকওয়া, আমানতদারি ও ন্যায়পরায়ণতা: ব্যক্তিগত জীবনে বিশ্বস্ত, মুত্তাকী এবং জাগতিক লোভ-লালসা থেকে মুক্ত হওয়া।
৬. সমকালীন সমাজ বাস্তবতা সম্পর্কে প্রজ্ঞা: পরিবেশ, পরিস্থিতি ও সাধারণ মানুষের মানসিকতা ও উরফ (প্রথা) সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখা।

(ب) ما المراد بالعلم في الحديث المذكور؟ كيف يقبض العلم؟ أوضح –

[(খ) উল্লিখিত হাদিসে ‘ইলম’ দ্বারা কী উদ্দেশ্য? কীভাবে ইলম উঠিয়ে নেওয়া হবে? ব্যাখ্যা কর:]

‘ইলম’-এর তাৎপর্য:
উল্লিখিত হাদিসে ‘ইলম’ (العلم) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ইসলামি শরিয়তের ইলম—অর্থাৎ কুরআন ও সুন্নাহর প্রামাণ্য জ্ঞান, হালাল-হারামের সঠিক উপলব্ধি, আকাইদ ও ফিকহের জ্ঞান, যা মানুষকে হিদায়াতের পথে পরিচালিত করে এবং যার ওপর আমল করা অপরিহার্য। পার্থিব কোনো জাগতিক প্রযুক্তি বা কারিগরি জ্ঞান এখানে মূল উদ্দেশ্য নয়, বরং আখেরাতমুখী দ্বীনি ইলমই এখানে উদ্দিষ্ট।

ইলম উঠিয়ে নেওয়ার রূপরেখা:
হাদিসে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, কিয়ামতের পূর্বে আল্লাহ তাআলা মানুষের মস্তিষ্ক বা হৃদয় থেকে সরাসরি স্মৃতিশক্তি মুছে দিয়ে ইলম কেড়ে নেবেন না। বরং এর কার্যপদ্ধতি হবে:
১. হাক্কানী আলেমদের ওফাত: ইলমের আসল ধারক ও বাহক হলেন নিষ্ঠাবান আলেম ও ফকীহগণ। পর্যায়ক্রমে আল্লাহ তাআলা মুখলিস প্রবীণ আলেমদের তুলে নেবেন।
২. উত্তরসূরি আলেমের শূন্যতা: পুরোনো আলেমগণের বিদায়ের পর তাদের সমমানের যোগ্য ও মুত্তাকী উত্তরসূরি আলেম তৈরি হবে না। ফলে জ্ঞানের ক্ষেত্রে গভীর শূন্যতার সৃষ্টি হবে।
৩. অজ্ঞদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা: হক্কানী আলেম না থাকায় জনসাধারণ দ্বীনি ও সামাজিক বিষয়ে মূর্খ, স্বার্থপর ও অর্ধশিক্ষিত ব্যক্তিদের নেতা ও ফতোয়াদাতা বানাবে।
৪. দ্বীনি পথভ্রষ্টতা: তারা কুরআন-সুন্নাহর সঠিক উসূল না জেনে নিজেদের মনগড়া খেয়ালখুশি মতো ফতোয়া দিবে, ফলে নিজেরাও পথভ্রষ্ট হবে এবং গোটা মুসলিম জাতিকে বিভ্রান্তির দিকে ঠেলে দেবে।


৩. হাদিস ও সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর

الحديث:
عن أبي هريرة : أن أعرابيا جاء إلى رسول الله صلى الله عليه وسلم فقال يا رسول الله! دلني على عمل إذا عملته دخلت الجنة قال تعبد الله لا تشرك به شيئا وتقيم الصلاة المكتوبة وتؤدي الزكاة المفروضة وتصوم رمضان قال والذي نفسي بيده لا أزيد على هذا فلما ولى قال النبي صلى الله عليه وسلم من سره أن ينظر إلى رجل من أهل الجنة فلينظر إلى هذا-

[আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত: একজন বেদুইন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে এসে নিবেদন করল: হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে এমন একটি আমলের কথা বাতলে দিন, যা সম্পাদন করলে আমি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারি। তিনি বললেন: তুমি আল্লাহর ইবাদত করবে, তাঁর সাথে কোনো কিছু শরিক করবে না, ফরজ নামায কায়েম করবে, নির্ধারিত ফরজ যাকাত প্রদান করবে এবং রমযানের রোযা রাখবে। লোকটি বলল: সেই সত্তার শপথ যাঁর হাতে আমার প্রাণ, আমি এর ওপর কোনো কিছু বৃদ্ধি করব না (এবং কমতিও করব না)। অতঃপর লোকটি যখন প্রস্থান করল, তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: যে ব্যক্তি কোনো জান্নাতী মানুষকে দেখে আনন্দিত হতে চায়, সে যেন এই লোকটিকে দেখে।]

(أ) ما الإيمان؟ وما الفرق بين الإيمان والإسلام؟ بين –

[(ক) ইমান কী? ইমান ও ইসলামের মধ্যে পার্থক্য কী? ব্যাখ্যা কর:]

ইমানের পরিচয়:
আভিধানিক অর্থে ‘ইমান’ (الإيمان) মানে কোনো সংবাদদাতার সততা স্বীকার করা, বিশ্বাস স্থাপন করা এবং অন্তরে নিরাপত্তা ও স্বীকৃতি দেওয়া। শরিয়তের পরিভাষায় ইমান হলো: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর পক্ষ থেকে যে দ্বীন ও বার্তা নিয়ে এসেছেন, তা অন্তরে আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করা, মুখে স্বীকার করা এবং তদানুযায়ী অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দ্বারা আমল করা। জমহুর উলামায়ে কিরামের মতে, الإيمان هو تصديق بالجنان وإقرار باللسان وعمل بالأركان (ইমান হলো অন্তরে বিশ্বাস, মুখে স্বীকৃতি এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মাধ্যমে আমল)।

ইমান ও ইসলামের মধ্যে সম্পর্ক ও পার্থক্য:
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের উলামায়ে কিরামের নিকট ইমান ও ইসলাম দুটি পরস্পর সম্পর্কযুক্ত পরিভাষা:
১. স্বতন্ত্রভাবে ব্যবহৃত হলে: যদি শুধু ‘ইমান’ বা শুধু ‘ইসলাম’ শব্দটি এককভাবে ব্যবহৃত হয়, তবে দুটি একই অর্থে ব্যবহৃত হয় এবং একে অপরের অন্তর্ভুক্ত থাকে।
২. একত্রে ব্যবহৃত হলে (যদি উভয় শব্দ একই সাথে উল্লেখিত হয়):
ইমান (الإيمان): মূলত অভ্যন্তরীণ বা বাতেনি বিশ্বাস সংক্রান্ত বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত; যেমন—আল্লাহ, ফেরেশতা, কিতাবসমূহ, রাসূলগণ, আখেরাত এবং তাকদীরের ওপর দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করা।
ইসলাম (الإسلام): মূলত বাহ্যিক ও জাহেরি আমলসমূহের সাথে সম্পর্কিত; যেমন—কালেমা পাঠ করা, নামায কায়েম করা, যাকাত আদায় করা, রমযানের রোযা রাখা এবং সামর্থ্য থাকলে হজ পালন করা।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন: “মরুবাসীরা বলে: আমরা ঈমান এনেছি। বলুন: তোমরা ঈমান আনোনি; বরং তোমরা বলো: আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি (আত্মসমর্পণ করেছি), কারণ ঈমান এখনো তোমাদের অন্তরে প্রবেশ করেনি।” (সূরা আল-হুজুরাত: ১৪)। অতএব, প্রত্যেক প্রকৃত মুমিনই মুসলিম, কিন্তু প্রত্যেক বাহ্যিক মুসলিম আত্মিকভাবে পূর্ণ মুমিন নাও হতে পারে।

(ب) اكتب نبذة من سيرة أبي هريرة (رض) بالإيضاح –

[(খ) হযরত আবু হুরায়রা (রা.)-এর জীবনীর সংক্ষিপ্ত ও স্পষ্ট বিবরণ লেখ:]

নাম ও বংশ পরিচয়:
হযরত আবু হুরায়রা (রা.)-এর জাহেলি যুগের নাম ছিল আবদুশ শামস (সূর্যের দাস)। ইসলাম গ্রহণের পর রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর নাম রাখেন ‘আব্দুর রহমান’ বা ‘আব্দুল্লাহ’। তাঁর পিতার নাম উমর। তিনি ইয়েমেনের বিখ্যাত দাওস গোত্রের সন্তান ছিলেন। বিড়ালছানার প্রতি গভীর মমত্ববোধ ও স্নেহের কারণে রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁকে আদর করে ‘আবু হুরায়রা’ (বিড়ালছানার পিতা) উপনামে ডাকেন, যা পরবর্তীকালে তাঁর মূল পরিচয়ে পরিণত হয়।

ইসলাম গ্রহণ ও সাহচর্য:
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) ৭ম হিজরিতে খায়বার যুদ্ধের সময় মদিনায় এসে ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর থেকে তিনি মসজিদে নববীর সুফফায় স্থায়ীভাবে অবস্থান গ্রহণ করেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সার্বক্ষণিক সাহচর্য অবলম্বন করেন। তিনি ব্যবসা-বাণিজ্য বা কৃষিকাজের ঝামেলায় না গিয়ে সর্বদা রাসূলের বাণী মুখস্থ ও মুখস্থকরণে নিমগ্ন থাকতেন।

হাদিস বর্ণনায় তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব:
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হলেন সমস্ত সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে সর্বাধিক হাদিস বর্ণনাকারী (مكثر الرواية)। তাঁর বর্ণিত হাদিসের মোট সংখ্যা প্রায় ৫,৩৭৪টি। একবার তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট স্মৃতিশক্তির দুর্বলতার অভিযোগ করলে রাসূল (সা.) তাঁর চাদর মেলে ধরতে বলেন এবং তাতে বরকতের দোয়া করে চাদর বুকে জড়িয়ে নিতে বলেন। এরপর থেকে তিনি কখনো কোনো শ্রুত হাদিস বিস্মৃত হননি। আট শতাধিক শীর্ষস্থানীয় সাহাবি ও তাবেয়ী তাঁর থেকে সরাসরি হাদিস বর্ণনা করেছেন।

চরিত্র, গুণাবলি ও ওফাত:
তিনি ছিলেন অত্যন্ত দরবেশ, সংযমী, মুত্তাকী এবং রাত জেগে তাহাজ্জুদ আদায়কারী একনিষ্ঠ সাধক। হযরত মুআবিয়া (রা.)-এর শাসনামলে তিনি কিছুদিন মদিনার গভর্নর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তিনি হিজরি ৫৭ বা ৫৯ সনে প্রায় ৭৮ বছর বয়সে মদিনা মুনাওয়ারায় ইন্তেকাল করেন এবং তাঁকে জান্নাতুল বাক্বীতে দাফন করা হয়।


৪. হাদিস ও সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর

الحديث:
عن انس بن مالك قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : لا يؤمن أحدكم حتى أكون أحب إليه من والده وولده والناس أجمعين-

[আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার পিতা, তার সন্তান-সন্ততি এবং সমস্ত মানবজাতির চেয়ে অধিক প্রিয়তম হই।]

(أ) ما معنى المحبة؟ وكم قسما لها؟ بين بالإيضاح-

[(ক) মহব্বত বা ভালোবাসার অর্থ কী? ভালোবাসার কয়টি প্রকার রয়েছে? সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা কর:]

মহব্বত বা ভালোবাসার সংজ্ঞা:
আরবি ভাষায় ‘আল-মাহাব্বাহ’ (المحبة) শব্দের মূল অর্থ হলো কোনো বস্তুর সৌন্দর্যের কারণে মনের স্বতঃস্ফূর্ত আকর্ষণ, অনুরাগ ও অনুরাগপূর্ণ আসক্তি (ميل النفس إلى ما تراه حسنا أو نافعا)। শরিয়তের দৃষ্টিতে মহব্বত হলো প্রিয়তমের প্রতি আন্তরিক ভক্তি, শ্রদ্ধা ও তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য নিজের সমুদয় চাওয়া-পাওয়াকে উৎসর্গ করার ঐকান্তিক বাসনা।

মহব্বতের প্রকারভেদ:
ইসলামি গবেষক ও উলামায়ে কিরামের মতে মানুষের ভালোবাসা সাধারণত তিন ভাগে বিভক্ত:
১. স্বভাবজাত ভালোবাসা (المحبة الطبيعية বা الطبعية): যা মানুষের স্বভাবগত চাহিদার কারণে সৃষ্টি হয়; যেমন ক্ষুধার্ত ব্যক্তির খাবারের প্রতি আকর্ষণ, পিপাসার্তের পানির প্রতি টান কিংবা সৌন্দর্য ও আরাম-আয়েশের প্রতি অনুরাগ।
২. স্নেহ ও আত্মীয়তার ভালোবাসা (محبة الشفقة والرحمة): রক্তের সম্পর্ক ও আত্মীয়তার টান থেকে যা উৎসারিত; যেমন পিতামাতার প্রতি সন্তানের ভালোবাসা এবং সন্তানের প্রতি পিতামাতার গভীর মমতা ও বাৎসল্য।
৩. বুদ্ধিবৃত্তিক ও ঐচ্ছিক ভালোবাসা (المحبة العقلية বা الاختيارية): বিবেক-বুদ্ধি ও ঈমানের দাবি অনুযায়ী কোনো ব্যক্তিত্বের শ্রেষ্ঠত্ব, দয়া ও ইহসান উপলব্ধি করে তাঁকে ভালোবেসে ফেলা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি মুমিনের মহব্বত হলো এই বুদ্ধিবৃত্তিক ও ঈমানি মহব্বত, যা প্রবৃত্তির আবেগ ও জাগতিক ভালোবাসার চেয়েও বহুগুণ ঊর্ধ্বে থাকে।

(ب) بين حكم محبة رسول الله صلى الله عليه وسلم على ضوء القرآن الكريم والسنة النبوية-

[(খ) পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি ভালোবাসার শরয়ী হুকুম সুস্পষ্ট কর:]

রাসূলপ্রেমের শরয়ী বিধান:
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নিজের জান, মাল, পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি এবং সমগ্র জগতের সকল কিছুর চেয়ে বেশি ভালোবাসা প্রতিটি মুসলিমের জন্য ফরজ (واجب وفرض عين)। এটি ঈমানের রুকন ও অপরিহার্য শর্ত; রাসূলের ভালোবাসা ছাড়া ঈমান পূর্ণতা পায় না।

পবিত্র কুরআনের দলিল:
১. আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনের সূরা আত-তাওবার ২৪ নম্বর আয়াতে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেন:
“বলুন, তোমাদের নিকট যদি তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই, তোমাদের পত্নী, তোমাদের আত্মীয়-স্বজন, তোমাদের অর্জিত ধন-সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য যার মন্দা পড়ার আশঙ্কা কর এবং তোমাদের বাসস্থান যা তোমরা ভালোবাস—আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও তাঁর পথে জিহাদ করার চেয়ে অধিক প্রিয় হয়, তবে অপেক্ষা কর আল্লাহর বিধান (শাস্তি) আসা পর্যন্ত।”
২. সূরা আল-আহযাবের ৬ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হয়েছে: “নবী মুমিনদের নিকট তাদের নিজেদের প্রাণের চেয়েও অধিক ঘনিষ্ঠ ও প্রিয়।”

সুন্নাহর দলিল ও বাস্তব দৃষ্টান্ত:
১. সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে, একবার হযরত উমর ফারুক (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! আমার নিজের প্রাণ ব্যতীত আপনি আমার নিকট সবকিছুর চেয়ে প্রিয়। তখন রাসূল (সা.) বললেন: ‘না উমর! যাঁর হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ, যতক্ষণ না আমি তোমার নিকট তোমার নিজের জীবনের চেয়েও বেশি প্রিয় না হব, ততক্ষণ তোমার ঈমান পূর্ণ হবে না।’ তখন উমর (রা.) গভীরভাবে অনুধাবন করে বললেন: আল্লাহর কসম, এখন আপনি আমার নিকট আমার নিজের জীবনের চেয়েও বেশি প্রিয়! রাসূল (সা.) বললেন: ‘হ্যাঁ উমর, এখন তোমার ঈমান পূর্ণ হলো।’
২. সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে: “তিনটি গুণ যার মধ্যে থাকবে, সে ঈমানের প্রকৃত স্বাদ লাভ করবে: তার নিকট আল্লাহ ও তাঁর রাসূল অন্যান্য সবকিছুর চেয়ে বেশি প্রিয়তম হওয়া…”
অতএব, রাসূলের সুন্নাহকে অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করা, তাঁর দ্বীনকে বিজয়ী করার জন্য আত্মনিয়োগ করা এবং তাঁর প্রতি হৃদয়ের গভীর থেকে সর্বোচ্চ ভালোবাসা পোষণ করাই মুমিনের প্রধানতম ফরজ কর্তব্য।


৫. হাদিস ও সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর

الحديث:
عن المغيرة بن شعبة قال خرج النبي صلى الله عليه وسلم لحاجته فلما رجع تلقيته بإداوة فصببت عليه فغسل يديه ثم غسل وجهه ثم ذهب ليغسل ذراعيه فضاقت يد الجبة فأخرجهما من أسفل الجبة فغسلهما ومسح على خفيه ثم صلى بنا-

[মুগীরা ইবনে শুবা (রা.) থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারার জন্য বাইরে গমন করলেন। অতঃপর যখন তিনি ফিরে আসলেন, আমি এক পাত্র পানিসহ তাঁর সামনে উপস্থিত হলাম। এরপর আমি তাঁর ওপর পানি ঢালতে লাগলাম; তিনি তাঁর দুই হাত ধৌত করলেন, অতঃপর মুখমণ্ডল ধৌত করলেন। এরপর তিনি তাঁর দুই বাহু ধৌত করতে উদ্যত হলেন, কিন্তু জুব্বার আস্তিন আঁটসাঁট বা সংকীর্ণ হওয়ায় তিনি হাত দুটি জুব্বার নিচ দিয়ে বের করে আনলেন এবং উভয় বাহু ধৌত করলেন। অতঃপর তিনি তাঁর উভয় মোজার (খুফফাইন) ওপর মাসেহ করলেন এবং আমাদের নিয়ে নামায আদায় করলেন।]

(أ) ما حكم المسح على الخفين للمقيم والمسافر؟ بين بالاختصار-

[(ক) মুকীম ও মুসাফিরের জন্য মোজার ওপর মাসেহ করার বিধান কী? সংক্ষেপে আলোচনা কর:]

মোজার ওপর মাসেহ করার সাধারণ বিধান:
চামড়ার বা শরিয়তসম্মত মোজার (খুফফাইন) ওপর মাসেহ করা সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত এবং এটি ইসলামি শরিয়তের একটি অন্যতম বিশেষ সুযোগ ও ছাড় (রুকখসত)। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সমস্ত আলেমদের ঐকমত্যে এটি সম্পূর্ণ জায়েয ও সহীহ হাদিস দ্বারা সুপ্রতিষ্ঠিত। এমনকি ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেছেন, যে ব্যক্তি মোজার ওপর মাসেহকে অস্বীকার করে, তার আহলে সুন্নাত থেকে বিচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, কারণ এটি প্রায় মুতাওয়াতির পর্যায়ের হাদিস দ্বারা সাব্যস্ত।

মুকীম ও মুসাফিরের জন্য সময়সীমা:
সহীহ হাদিসে মুকীম ও মুসাফিরের জন্য মোজার ওপর মাসেহের পৃথক সময়সীমা নির্ধারিত করে দেওয়া হয়েছে:
১. মুকীমের জন্য (যে ব্যক্তি নিজ এলাকায় অবস্থান করছে): মুকীম ব্যক্তির জন্য মোজার ওপর মাসেহ করার মেয়াদ হলো এক দিন ও এক রাত—অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টা
২. মুসাফিরের জন্য (যে ব্যক্তি সফর অবস্থায় রয়েছে): মুসাফির ব্যক্তির জন্য মাসেহ করার মেয়াদ হলো তিন দিন ও তিন রাত—অর্থাৎ ৭২ ঘণ্টা

মেয়াদ গণনার নিয়ম:
মোজার ওপর মাসেহের মেয়াদ মোজা পরিধান করার সময় থেকে শুরু হয় না; বরং পূর্ণ পবিত্রতা সহকারে মোজা পরার পর প্রথম যখন অজু ভেঙে যায়, সেই অজু ভাঙার পরবর্তী অজুতে প্রথমবার মাসেহ করার সময় থেকে ২৪ ঘণ্টা বা ৭২ ঘণ্টার হিসাব শুরু হয়।

(ب) اذكر شروط المسح على الخفين-

[(খ) মোজার ওপর মাসেহ করার শর্তাবলি উল্লেখ কর:]

চামড়ার বা শরিয়তসম্মত মোজার ওপর মাসেহ বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য ফকীহগণ নিম্নোক্ত শর্তসমূহ নির্ধারণ করেছেন:
১. পূর্ণ পবিত্রতার সাথে পরিধান করা: পূর্ণ অজু বা গোসল করে পবিত্র অবস্থায় উভয় মোজা পরিধান করতে হবে। অপবিত্র অবস্থায় মোজা পরলে তার ওপর মাসেহ বৈধ হবে না।
২. গোড়ালি আবৃত থাকা: মোজা দুটি পায়ের টাখনু বা উভয় গোড়ালিসহ সম্পূর্ণ আবৃতকারী হতে হবে। টাখনু অনাবৃত থাকলে মাসেহ সহীহ হবে না।
৩. মোজা পরে হাঁটার উপযোগী ও মজবুত হওয়া: মোজা এমন মজবুত হতে হবে যাতে সাধারণ জুতো ছাড়া তা পরে কমপক্ষে এক ফারসাখ (প্রায় ৩ মাইল) বা তার বেশি হাঁটা যায় এবং তা ছিঁড়ে যায় না।
৪. পানি প্রবেশ রোধক হওয়া: মোজা এমন ঘন ও পুরু হতে হবে যাতে এর ওপর পানি মাসেহ করলে তা ভিজে ভেতরে ত্বকে সরাসরি পানি না পৌঁছায়।
৫. স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে পায়ে আটকে থাকা: কোনো ফিতা বা রশি দিয়ে শক্ত করে না বেঁধেও চামড়ার নিজস্ব কাঠামোর কারণে মোজা যেন পায়ে দৃঢ়ভাবে লেগে থাকে।
৬. ছেঁড়ার পরিমাণ সীমাবদ্ধ থাকা: মোজায় যদি কোনো ছিদ্র বা ফাঁক থাকে, তবে তা যেন পায়ের ছোট তিন আঙুল পরিমাণের চেয়ে বড় না হয়। তিন আঙুল বা তার চেয়ে বড় ছিদ্র থাকলে মাসেহ বাতিল হবে।
৭. ফরজ গোসল ওয়াজিব না হওয়া: মোজার ওপর মাসেহ কেবল ছোট অপবিত্রতা (অজু ভঙ্গের ক্ষেত্রে) বৈধ। যদি কারোর ওপর গোসল ফরজ হয় (যেমন জানাবাত), তবে মোজা খুলে সম্পূর্ণ শরীর ধৌত করা ওয়াজিব।


৬. হাদিস ও সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর

الحديث:
عن ابن عباس (رض) أن رسول الله صلى الله عليه وسلم بعث معاذا إلى اليمن فقال : إنك تأتى قوما أهل كتاب فادعهم إلى شهادة أن لا إله إلا الله وأنى رسول الله فإنهم أطاعوا لذالك فأعلمهم أن الله افترض عليهم خمس صلوات في اليوم والليلة فإنهم أطاعوا لذالك فأعلمهم أن الله افترض عليهم صدقة أموالهم تؤخذ من أغنيائهم وترد على فقرائهم فإنهم أطاعوا لذالك فإياك وكرائم أموالهم واتق دعوة المظلوم فإنها ليس بينها وبين الله حجاب-

[ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.)-কে ইয়েমেনের শাসক ও দাঈ হিসেবে প্রেরণ করলেন, তখন তাঁকে বললেন: তুমি এমন এক সম্প্রদায়ের নিকট যাচ্ছ যারা আহলে কিতাব (ইহুদি ও খ্রিস্টান)। কাজেই তুমি তাদেরকে সর্বপ্রথম এ সাক্ষ্য প্রদানের দিকে আহ্বান করবে যে, আল্লাহ ব্যতীত কোনো সত্য উপাস্য নেই এবং নিশ্চয়ই আমি আল্লাহর রাসূল। যদি তারা এ বিষয়ে আনুগত্য প্রদর্শন করে, তবে তাদের জানিয়ে দেবে যে, আল্লাহ তাদের ওপর প্রতি দিন ও রাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরজ করেছেন। যদি তারা এটিও মেনে নেয়, তবে তাদের জানিয়ে দেবে যে, আল্লাহ তাদের ওপর তাদের ধন-সম্পদে সাদকা (যাকাত) ফরজ করেছেন, যা তাদের ধনীদের নিকট থেকে গ্রহণ করা হবে এবং তাদের দরিদ্রদের মাঝে বণ্টন করা হবে। যদি তারা এতেও অনুগত হয়, তবে সাবধান! তাদের উৎকৃষ্ট মানের সম্পদ গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকবে; আর মজলুমের বদদোয়াকে ভয় করবে, কেননা মজলুমের বদদোয়া ও আল্লাহর মাঝে কোনো অন্তরাল বা পর্দা থাকে না।]

(أ) عرف الزكاة- ثم بين مصارف الزكاة-

[(ক) যাকাতের সংজ্ঞা দাও। অতঃপর যাকাতের খাতসমূহ বর্ণনা কর:]

যাকাতের সংজ্ঞা:
‘যাকাত’ (الزكاة) শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো পবিত্রতা, পরিচ্ছন্নতা, বৃদ্ধি পাওয়া ও বরকত লাভ করা। শরিয়তের পরিভাষায়, নিসাব পরিমাণ মালের মালিক কোনো স্বাধীন, বালেগ ও সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন মুসলিমের বছরান্তে স্বীয় উদ্বৃত্ত সম্পদ থেকে নির্দিষ্ট একটি অংশ (সাধারণত ২.৫% বা চল্লিশ ভাগের এক ভাগ) আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে শরিয়ত নির্ধারিত নির্দিষ্ট খাতে নিঃশর্তভাবে কোনো অভাবী মুসলিমকে মালিক বানিয়ে প্রদান করাকে যাকাত বলে।

যাকাতের খাতসমূহ (مصارف الزكاة):
মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনের সূরা আত-তাওবার ৬০ নম্বর আয়াতে সুস্পষ্টভাবে যাকাত বণ্টনের আটটি খাতের উল্লেখ করেছেন:
১. ফকির (الفقراء): যার অত্যন্ত সামান্য সম্পদ রয়েছে কিন্তু তা নিসাব পরিমাণ নয় এবং নিজের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য অপর্যাপ্ত।
২. মিসকীন (المساكين): চরম নিঃস্ব ও নিঃসম্বল ব্যক্তি, যার কাছে কোনো কিছুই নেই এবং যে কারো কাছে হাত পাততেও লজ্জা পায়।
৩. যাকাত আদায়কারী কর্মচারী (العاملين عليها): ইসলামি রাষ্ট্র কর্তৃক যাকাত সংগ্রহ, হিসাবরক্ষণ ও বিতরণের কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দ।
৪. মন জয় করার উদ্দেশ্যে (المؤلفة قلوبهم): নবদীক্ষিত মুসলিমদের ঈমানের ওপর দৃঢ় রাখা কিংবা অমুসলিমদের ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য সহায়তাদান।
৫. দাসমুক্তি (في الرقاب): ক্রীতদাস-দাসীকে চুক্তিভিত্তিক মুক্তিপণ আদায়ে সহায়তা করা (বর্তমান যুগে বন্দি মুক্তি বা ঋণের শৃঙ্খল মুক্তি)।
৬. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি (الغارمين): এমন ব্যক্তি যে বৈধ প্রয়োজনে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছে এবং নিজের সম্পদ দ্বারা তা পরিশোধ করতে সম্পূর্ণ অক্ষম।
৭. আল্লাহর পথে (في سبيل الله): দ্বীন ইসলাম প্রচার, প্রসার ও ইসলামি সীমান্ত রক্ষার কাজে নিয়োজিত মুজাহিদ ও অসহায় দ্বীনি শিক্ষার্থীদের সহায়তা করা।
৮. মুসাফির (ابن السبيل): সফর অবস্থায় নিঃস্ব হয়ে পড়া পথিক, নিজ বাড়িতে যার সম্পদ থাকলেও বর্তমান সফরে অর্থকষ্টে পড়েছে, তাকে গন্তব্যে পৌঁছার জন্য প্রয়োজনীয় যাকাত দেওয়া।

(ب) اكتب أهمية الزكاة فى الاقتصاد الإسلامي مختصرا-

[(খ) ইসলামি অর্থনীতিতে যাকাতের গুরুত্ব সংক্ষেপে লেখ:]

ইসলামি অর্থব্যবস্থার মেরুদণ্ড এবং সামাজিক নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি হলো যাকাত। এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম:
১. সম্পদের সুষম বণ্টন ও কেন্দ্রীভবন রোধ: পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মতো সম্পদ যাতে কেবল মুষ্টিমেয় ধনীদের হাতে কুক্ষিগত না থাকে, তা নিশ্চিত করে যাকাত। এটি ধনীদের উদ্বৃত্ত সম্পদ সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মাঝে সঞ্চালন করে।
২. দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থান: যাকাতের তহবিল পরিকল্পিতভাবে বিনিয়োগ করে অভাবীদের স্বাবলম্বী করা যায়, যা সমাজ থেকে স্থায়ীভাবে বেকারত্ব ও ভিক্ষাবৃত্তি নির্মূল করে।
৩. ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি: দরিদ্র মানুষের হাতে অর্থ পৌঁছালে বাজারে পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পায়, যার ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য, উৎপাদন এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল থাকে।
৪. সামাজিক ভারসাম্য ও সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠা: যাকাত ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার বৈষম্য এবং শ্রেণিবিদ্বেষ দূর করে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ সুদৃঢ় করে।
৫. সুদমুক্ত অর্থনীতির ভিত্তি: যাকাত ব্যবস্থা সুদের অভিশাপ দূর করে কল্যাণমুখী ও ইনসাফভিত্তিক অর্থব্যবস্থা কায়েম করতে মৌলিক ভূমিকা পালন করে।


৭. হাদিস ও সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর

الحديث:
باب فى الصلوة الوسطى – حدثنا عثمان بن أبى شيبة نا يحيى بن زكريا بن أبى زائدة ويزيد بن هارون عن هشام بن حسان عن محمد عن عبيدة عن على رضى الله عنه أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال : يوم الخندق حبسونا عن صلوة الوسطى صلوة العصر ملأ الله بيوتهم وقبورهم نارا-

[সালাতুল উসতা অধ্যায়: উসমান ইবনে আবি শাইবা আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: ইয়াহইয়া ইবনে যাকারিয়া ইবনে আবি যায়িদা এবং ইয়াযিদ ইবনে হারুন আমাদের হাদিস শুনিয়েছেন হিশাম ইবনে হাসসান থেকে, তিনি মুহাম্মদ থেকে, তিনি উবায়দা থেকে, তিনি হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণনা করেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খন্দকের যুদ্ধের দিন ইরশাদ করেছিলেন: তারা (কাফের কুরাইশরা যুদ্ধের ব্যস্ততার কারণে) আমাদেরকে মধ্যবর্তী সালাত—অর্থাৎ আসরের সালাত থেকে বিরত রেখেছে; আল্লাহ তাদের ঘরবাড়ি ও তাদের কবরসমূহ আগুনে পরিপূর্ণ করে দিন!]

(أ) ما الصلوة الوسطى؟ وكم قولا فى الصلوة الوسطى؟ بين-

[(ক) ‘সালাতুল উসতা’ কী? সালাতুল উসতা সম্পর্কে কয়টি মত রয়েছে? আলোচনা কর:]

সালাতুল উসতার পরিচয়:
পবিত্র কুরআনের সূরা আল-বাকারার ২৩৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন: “তোমরা সমস্ত সালাতের প্রতি যত্নবান হও, বিশেষ করে ‘সালাতুল উসতা’ (মধ্যবর্তী সালাত)-এর প্রতি, আর আল্লাহর সমীপে একান্ত অনুগত হয়ে দাঁড়াও।” এখানে সালাতুল উসতা দ্বারা দ্বীনের সর্বাধিক ফজিলতপূর্ণ ও গুরুত্ববহ একটি নির্দিষ্ট সালাতকে নির্দেশ করা হয়েছে।

সালাতুল উসতা নির্ধারণে উলামাদের মতপার্থক্য:
সালাতুল উসতা কোন সালাত—এ বিষয়ে তাবেয়ী ও ফকীহগণের মধ্যে প্রায় বিশটিরও বেশি অভিমত পাওয়া যায়। প্রধান প্রধান অভিমতগুলো নিম্নরূপ:
১. প্রথম মত (জমহুর ও সর্বাধিক বিশুদ্ধ মত): সালাতুল উসতা হলো ‘আসরের সালাত’। হযরত আলী, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ, ইবনে আব্বাস, আবু হুরায়রা (রা.) এবং ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল ও অধিকাংশ মুহাদ্দিসের মত এটি। উপরে বর্ণিত সহীহ হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন: “حبسونا عن صلوة الوسطى صلوة العصر” (তারা আমাদের মধ্যবর্তী সালাত অর্থাৎ আসরের সালাত থেকে বিরত রেখেছে)। এটি সুস্পষ্ট নাস (দলিল)।
২. দ্বিতীয় মত: সালাতুল উসতা হলো ‘ফজরের সালাত’। হযরত উমর, আব্দুল্লাহ ইবনে উমর, যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) এবং ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম মালিক (রহ.)-এর একটি প্রসিদ্ধ অভিমত এটি। তাঁদের যুক্তি হলো, ফজর হলো রাতের অন্ধকার ও দিনের আলোর মধ্যবর্তী সালাত এবং এতে দীর্ঘ কিরাত পাঠ করা হয়।
৩. তৃতীয় মত: সালাতুল উসতা হলো ‘যোহরের সালাত’। যায়েদ ইবনে সাবিত ও উসামা বিন যায়েদ (রা.) থেকে একটি বর্ণনায় এসেছে যে, এটি দিনের ঠিক মধ্যভাগে প্রচণ্ড গরমের সময় আদায় করতে হয়।
৪. চতুর্থ মত: সালাতুল উসতা হলো ‘মাগরিবের সালাত’। কারণ এটি রাকাত সংখ্যার দিক থেকে পূর্ণ চারেরও নয় আবার দুইয়েরও নয়, বরং দিনের মধ্যবর্তী বেজোড় সালাত।
৫. পঞ্চম মত: সালাতুল উসতা হলো ‘এশার সালাত’। কারণ এটি দুই অন্ধকারের মধ্যবর্তী সালাত।
সঠিক সিদ্ধান্ত: সহীহ বুখারী ও মুসলিমের সুস্পষ্ট হাদিসের আলোকে কোনো প্রকার দ্বিধা ছাড়াই প্রমাণিত হয় যে, সালাতুল উসতা হলো মূলত ‘আসরের সালাত’।

(ب) متى وقعت غزوة الخندق؟ وما نتائجها؟

[(খ) খন্দকের যুদ্ধ কখন সংঘটিত হয়েছিল? এর ফলাফল কী ছিল?]

খন্দকের যুদ্ধের সময়কাল:
খন্দকের যুদ্ধ (যা গাযওয়াতুল আহযাব বা সম্মিলিত বাহিনীর যুদ্ধ নামেও পরিচিত) হিজরি ৫ম সনের শাওয়াল ও জিলকদ মাসে (খ্রিষ্টীয় ৬২৭ সনে) সংঘটিত হয়েছিল। ইহুদিদের প্ররোচনায় মক্কার কুরাইশ, গাতফান ও অন্যান্য আরব গোত্র মিলে প্রায় দশ হাজার সৈন্যের এক বিশাল সম্মিলিত বাহিনী মদিনা অবরোধ করেছিল। সাহাবি হযরত সালমান ফারসী (রা.)-এর পরামর্শে মদিনার অরক্ষিত অংশে গভীর পরিখা (খন্দক) খনন করা হয়।

যুদ্ধের ফলাফল ও প্রভাব:
১. কাফের বাহিনীর চরম ব্যর্থতা ও পলায়ন: প্রায় এক মাসব্যাপী অবরোধ চলার পর তীব্র শীত ও আল্লাহর প্রেরিত প্রচণ্ড ঘূর্ণিবাতাসের মুখে মুশরিক বাহিনীর তাঁবু উপড়ে যায় এবং তাদের সমস্ত রসদ বিনষ্ট হয়। ফলে তারা চরম অপদস্থ হয়ে রণে ভঙ্গ দিয়ে মক্কায় পালিয়ে যায়।
২. রণকৌশলগত আমূল পরিবর্তন: এ যুদ্ধের পর কাফেরদের আক্রমণের ক্ষমতা চিরতরে নিঃশেষ হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সা.) ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন: “এখন থেকে আমরাই তাদের আক্রমণ করব, তারা আর আমাদের আক্রমণ করতে পারবে না।”
৩. বিশ্বাসঘাতক বনু কুরায়জা ইহুদিদের শাস্তি: যুদ্ধের চরম সংকটে মদিনা সনদের চরম লঙ্ঘন ও বিশ্বাসঘাতকতা করার কারণে মদিনার ইহুদি গোত্র বনু কুরায়জাকে সমূলে প্রতিহত করা হয় এবং মদিনা সম্পূর্ণভাবে অভ্যন্তরীণ শত্রুমুক্ত হয়।
৪. মুসলিম শক্তির অপ্রতিদ্বন্দ্বী উত্থান: মদিনা রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামূলক পর্ব সমাপ্ত হয়ে রাজনৈতিক ও সামরিক আধিপত্যের নতুন যুগের সূচনা হয়, যার ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে হুদাইবিয়ার সন্ধি ও মক্কা বিজয় ত্বরান্বিত হয়।


৮. হাদিস ও সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর

الحديث:
عن أبى هريرة (رض) قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : كل عمل ابن آدم يضاعف الحسنة بعشر أمثالها إلى سبع مائة ضعف إلى ما شاء الله يقول الله إلا الصوم فإنه لى وأنا أجزى به يدع شهوته وطعامه من أجلى للصائم فرحتان فرحة عند فطره وفرحة عند لقاء ربه ولخلوف فم الصائم أطيب عند الله من ريح المسك-

[আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: আদম সন্তানের প্রতিটি আমলের প্রতিদান দশ গুণ থেকে সাতশত গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়, এমনকি আল্লাহ যতটুকু চান (ততটুকু বাড়িয়ে দেন)। আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন: কিন্তু রোযা ব্যতীত; কেননা নিশ্চয়ই রোযা কেবল আমার জন্যই এবং আমি স্বয়ং এর প্রতিদান দেব। সে কেবল আমার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যেই তার প্রবৃত্তি ও পানাহার বর্জন করে। রোযাদারের জন্য রয়েছে দুটি পরম আনন্দ: একটি আনন্দ তার ইফতারের সময় এবং অপর আনন্দ তার প্রতিপালকের সাথে সাক্ষাতের সময়। আর নিশ্চয়ই রোযাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট কস্তুরীর সুবাসের চেয়েও অধিক সুগন্ধিময়।]

(أ) عرف الصوم – ثم بين أهمية الصوم فى ضوء الحديث-

[(ক) রোযার সংজ্ঞা দাও। অতঃপর হাদিসের আলোকে রোযার গুরুত্ব বর্ণনা কর:]

রোযার সংজ্ঞা:
‘সাওম’ (الصوم) শব্দের আভিধানিক অর্থ বিরত থাকা বা আত্মনিয়ন্ত্রণ করা (الإمساك والكف)। শরিয়তের পরিভাষায়, মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ইবাদতের উদ্দেশ্যে সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সকল প্রকার পানাহার, ধূমপান ও যৌনসম্ভোগ থেকে নিয়তসহ নিজেকে সম্পূর্ণ বিরত রাখাকে ‘সাওম’ বা রোযা বলা হয়।

হাদিসের আলোকে রোযার বিশেষ গুরুত্ব:
উল্লিখিত হাদিসে রোযার এমন কিছু একক বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদার কথা বর্ণিত হয়েছে যা অন্য কোনো ইবাদতের ক্ষেত্রে পাওয়া যায় না:
১. অসীম ও অপরিমিত সওয়াব: অন্যান্য নেক আমলের প্রতিদান নির্ধারিত (১০ থেকে ৭০০ গুণ পর্যন্ত), কিন্তু রোযার সওয়াবের কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই। আল্লাহ নিজে অগণিত ও অফুরন্ত বরকত দিয়ে এর প্রতিদান দেবেন।
২. আল্লাহর সাথে একাত্মতা ও এখলাস: রোযা এমন একটি গোপন ইবাদত যাতে লোকদেখানো বা রিয়ার কোনো সুযোগ নেই। বান্দা নির্জনে চাইলে লুকিয়ে পানাহার করতে পারত, কিন্তু কেবল আল্লাহর ভয়েই সে তা বর্জন করে। এজন্য আল্লাহ রোযাকে নিজের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন।
৩. উভয় জাহানে দ্বিমুখী পরম আনন্দ: রোযাদার পার্থিব জীবনে ইফতারের সময় ক্ষুধা নিবারণ ও ইবাদত সমাপ্তির প্রশান্তি লাভ করে এবং পরকালে জান্নাত ও আল্লাহর দিদার লাভের মাধ্যমে অতুলনীয় আনন্দের অধিকারী হবে।
৪. কস্তুরীর সুবাসের চেয়েও প্রিয় মর্যাদা: দীর্ঘ উপবাসের কারণে রোযাদারের পাকস্থলী খালি হয়ে মুখে যে গন্ধ তৈরি হয়, দুনিয়ার দৃষ্টিতে তা অপ্রীতিকর মনে হলেও আল্লাহর দরবারে তা হরিণের নাভির সুগন্ধি কস্তুরীর চেয়েও অধিক সুবাসিত ও সম্মানিত।

(ب) اشرح ‘يقول الله إلا الصوم فإنه لى وأنا أجزى به’-

[(খ) হাদিসে বর্ণিত আল্লাহর বাণী: “রোযা ব্যতীত, কেননা নিশ্চয়ই রোযা আমারই জন্য এবং আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব”—এর তাৎপর্য ব্যাখ্যা কর:]

হাদিসে কুদসির এই বাক্যটি অত্যন্ত গভীর তাৎপর্যমণ্ডিত। মুহাদ্দিস ও ফকীহগণ এর নিম্নোক্ত ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন:
১. লোকদেখানো মনোভাবের অনুপস্থিতি (الخلوص من الرياء): নামায, হজ, যাকাত ইত্যাদি বাহ্যিক আমল মানুষ দেখতে পায়, ফলে তাতে প্রদর্শনেচ্ছা প্রবেশের সুযোগ থাকে। কিন্তু রোযা সম্পূর্ণ গোপন আমল; কেউ রোযা রেখেছে কি না তা আল্লাহ ও বান্দা ছাড়া তৃতীয় কেউ জানতে পারে না। এটি নিখাদ এখলাসের ইবাদত।
২. মালিকানার একক সম্মাননা: যদিও সমস্ত নেক আমলই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, কিন্তু রোযাকে বিশেষ মর্যাদা দিয়ে আল্লাহ বলেছেন ‘রোযা আমার জন্য’। যেমন সব মসজিদ আল্লাহর ঘর হওয়া সত্ত্বেও কাবাকে বিশেষ সম্মানে ‘বাইতুল্লাহ’ বলা হয়।
৩. স্বয়ং আল্লাহর পক্ষ থেকে সীমাহীন পুরস্কার: ‘وأنا أجزى به’ (আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব)—এর অর্থ হলো ফেরেশতাদের নির্ধারিত হিসাব-নিকাশের খাতা অতিক্রম করে আল্লাহ তাআলা কোনো হিসাব ছাড়াই (بغير حساب) নিজ কুদরতি হাতে রোযাদারকে জান্নাতের সুউচ্চ নেয়ামত দ্বারা ধন্য করবেন। অন্য এক কেরাতে ‘وأنا أُجْزَى به’ পড়া হলে এর অর্থ দাঁড়ায়: রোযার প্রতিদান স্বয়ং আল্লাহ নিজেই (অর্থাৎ আল্লাহ বান্দাকে নিজের দর্শন দান করবেন)।
৪. অন্য কোনো উপাস্যের জন্য রোযা রাখা হয়নি: জাহেলি যুগ থেকে শুরু করে মূর্তিপূজক মুশরিকরা তাদের মিথ্যা দেব-দেবীর নামে সেজদা করেছে, কুরবানি দিয়েছে, কিন্তু কোনো জাতি তাদের উপাস্যের সন্তুষ্টির জন্য রোযার মতো কঠোর উপবাস ব্রত পালন করেনি। এটি কেবল এক আল্লাহর জন্যই নির্ধারিত।


مجموعة (ب) : [খ-বিভাগ]

أجب عن واحد من الأسئلة التالية (لكل سؤال ١٠ درجات) :
[নিচের যে কোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দাও (প্রতিটি প্রশ্নের মান ১০) :]


৯. ইমাম বুখারী (রহ.)-এর জীবনী ও গ্রন্থের বৈশিষ্ট্য

السؤال:
اكتب ماذا تعرف عن حياة الإمام البخارى (رح) مع ذكر مزايا كتابه-

[ইমাম বুখারী (রহ.)-এর জীবনচরিত সম্পর্কে তুমি কী জান তা লেখ এবং তাঁর সংকলিত গ্রন্থের অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ উল্লেখ কর:]

ভূমিকা:
হাদিস শাস্ত্রের ইতিহাসের মুকুটহীন সম্রাট, ‘আমীরুল মুমিনীন ফিল হাদিস’ উপাধিতে ভূষিত অবিসংবাদিত ইমাম হলেন ইমাম আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল আল-বুখারী (রহ.)। তিনি মানব ইতিহাসের সর্বাধিক বিশুদ্ধ হাদিস গ্রন্থ ‘সহীহুল বুখারী’ সংকলন করে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।

ইমাম বুখারী (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনচরিত:

১. নাম, বংশ ও জন্ম:
তাঁর নাম মুহাম্মদ, উপনাম আবু আব্দুল্লাহ, উপাধি আমীরুল মুমিনীন ফিল হাদিস। তাঁর পিতার নাম ইসমাইল এবং দাদার নাম ইব্রাহীম। তিনি হিজরি ১৯৪ সনের ১৩ শাওয়াল জুমাবারে মধ্য এশিয়ার প্রাচীন ঐতিহাসিক নগরী বোখারাতে (বর্তমান উজবেকিস্তানে) জন্মগ্রহণ করেন।

২. শৈশব ও দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়া:
শৈশবেই তাঁর পিতা ইন্তেকাল করায় তিনি পিতৃহীন অবস্থায় জননীর স্নেহছায়ায় লালিত-পালিত হন। শৈশবে তিনি চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর পুণ্যবতী মাতার গভীর রোনাজারি ও দোয়ার বরকতে হযরত ইব্রাহীম (আ.) স্বপ্নে এসে সুসংবাদ দেন এবং অলৌকিকভাবে তাঁর চোখের জ্যোতি সম্পূর্ণ ফিরে আসে।

৩. জ্ঞানার্জন ও হাদিস সাধনা:
তিনি মাত্র দশ বছর বয়সে পবিত্র কুরআন হিফজ করেন এবং বোখারার হাদিস মাহফিলে যোগদান শুরু করেন। ষোল বছর বয়সে তিনি মক্কায় গিয়ে হজ্জ সম্পাদন করেন এবং সেখানে প্রখ্যাত মুহাদ্দিসগণের নিকট দীর্ঘকাল হাদিস শিক্ষা করেন। হাদিস সংগ্রহের উদ্দেশ্যে তিনি তৎকালীন সমগ্র মুসলিম বিশ্ব—মক্কা, মদিনা, কুফা, বসরা, বাগদাদ, দামেস্ক, মিশর ও নিশাপুর দীর্ঘ ১৬ বছর পরিভ্রমণ করেন। তিনি এক হাজারেরও বেশি মুহাদ্দিস থেকে প্রায় ছয় লক্ষ হাদিস লিপিবদ্ধ ও মুখস্থ করেছিলেন। তাঁর স্মরণশক্তি ছিল বিশ্ববিস্ময়কর।

৪. ওফাত:
জীবনের শেষভাগে বোখারার শাসকের সাথে মতবিরোধের জেরে (শাসক তাঁর সন্তানদের জন্য রাজপ্রাসাদে গিয়ে আলাদা হাদিস পড়ানোর দাবি জানিয়েছিল, যা ইমাম বুখারী ইলমের মর্যাদার স্বার্থে প্রত্যাখ্যান করেন) তিনি সমরকন্দের নিকটবর্তী ‘খারতাংক’ গ্রামে হিজরত করেন। সেখানেই তিনি হিজরি ২৫৬ সনের ১ শাওয়াল (ঈদুল ফিতরের রাতে) ৬২ বছর বয়সে ওফাত লাভ করেন।

সহীহুল বুখারী গ্রন্থের অনন্য বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদাসমূহ:

ইমাম বুখারী (রহ.) রচিত ‘আল-জামি আল-মুসনাদ আস-সহীহ আল-মুখতাসার মিন উমুরি রাসূলিল্লাহি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওয়া সুনানিহি ওয়া আইয়ামিহি’ সংকলনের মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ নিম্নরূপ:

১. সর্বাপেক্ষা বিশুদ্ধতম কিতাব (أصح الكتب بعد كتاب الله): সমগ্র উম্মতের সর্বসম্মত ঐকমত্য (ইজমা) অনুযায়ী, পবিত্র কুরআনুল কারীমের পর পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে বিশুদ্ধতম ও প্রামাণ্য গ্রন্থ হলো সহীহ বুখারী।
২. সনদ ও রাবীর ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর শর্তাবলী: ইমাম বুখারী কোনো হাদিস সহীহ হিসেবে গ্রহণ করার জন্য সনদের ধারাবাহিকতা ও রাবীর বিশ্বস্ততার পাশাপাশি উস্তাদ ও ছাত্রের মধ্যকার নিশ্চিত চাক্ষুষ সাক্ষাৎ ও দীর্ঘদিনের প্রত্যক্ষ সাহচর্য (المعاصرة وثبوت اللقاء) শর্তযুক্ত করেছেন, যা অন্য মুহাদ্দিসগণের তুলনায় সবচেয়ে কঠোর।
৩. ইস্তিখারা ও আধ্যাত্মিক পবিত্রতা: ইমাম বুখারী বলেন, “আমি আমার এই সহীহ গ্রন্থে কোনো হাদিস সন্নিবেশ করিনি যতক্ষণ না আমি গোসল করে দুই রাকাত ইস্তিখারার নামায আদায় করে তার সহীহ হওয়ার ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চিত হয়েছি।” তিনি মসজিদে নববীতে রওজাতুম মিন রিয়াযিল জান্নাহ এবং মিম্বারের মধ্যস্থলে বসে এ গ্রন্থের মূল পাণ্ডুলিপি রচনা করেন।
৪. ফিকহী গভীরতা ও অধ্যায় বিন্যাস (ترجمة الأبواب): মুহাদ্দিসগণের মধ্যে সর্বজনবিদিত প্রবাদ হলো: “فقه البخاري في تراجمه”—অর্থাৎ ‘ইমাম বুখারীর ফিকহি প্রজ্ঞা ও ইজতিহাদ নিহিত রয়েছে তাঁর অধ্যায় বা অনুচ্ছেদ বিন্যাসের শিরোনামে’। তিনি প্রতিটি অধ্যায়ের শিরোনামে চমৎকারভাবে আয়াত ও হাদিস থেকে মাসআলা উদ্ভাবন করেছেন।
৫. পুনরাবৃত্তি ও বিভিন্ন সূত্রে শিক্ষণীয় উপস্থাপন: একটি হাদিসের মধ্যে একাধিক ফিকহি হুকুম থাকলে তিনি প্রয়োজনমাফিক বিভিন্ন উপযুক্ত অধ্যায়ে সেটিকে উপযুক্ত সনদে পুনরাবৃত্তি করে আলোচনা করেছেন।


১০. সুনানে আরবাআ ও জামে তিরমিযীর বৈশিষ্ট্য

السؤال:
عرف السنن الأربع ثم اذكر خصائص الجامع للترمذى-

[সুনানে আরবাআ’র পরিচয় দাও। অতঃপর জামে তিরমিযী গ্রন্থের অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ উল্লেখ কর:]

ভূমিকা:
হাদিস শাস্ত্রের ছয়টি সর্বাধিক প্রসিদ্ধ প্রামাণ্য গ্রন্থকে একত্রে ‘সিহাহ সিত্তাহ’ বা ‘আল-কুতুবুস সিত্তাহ’ বলা হয়। এই ছয়টি গ্রন্থের মধ্যে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম ব্যতীত বাকি চারটি কিতাবকে হাদিস গবেষকগণের পরিভাষায় ‘আস-সুনানুল আরবাআ’ (السّنن الأربع) বা চার সুনান গ্রন্থ বলা হয়।

সুনানে আরবাআ (السّنن الأربع)-এর পরিচয়:

১. সুনানে আবু দাউদ (سنن أبي داود): ইমাম আবু দাউদ সুলাইমান ইবনুল আশআস আস-সিজিস্তানী (রহ.) (২০২-২৭৫ হি.) কর্তৃক সংকলিত। এটি মূলত আহকাম বা ফিকহি বিধান সংক্রান্ত হাদিসের সর্বশ্রেষ্ঠ সংকলন। এতে প্রায় ৪,৮০০টি হাদিস রয়েছে। ফকীহগণের নিকট ফতোয়া প্রদানের ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব অপরিসীম।
২. জামে তিরমিযী বা সুনানে তিরমিযী (جامع الترمذي): ইমাম আবু ঈসা মুহাম্মদ ইবনে ঈসা আত-তিরমিযী (রহ.) (২০৯-২৭৯ হি.) কর্তৃক সংকলিত। এটি ফিকহের পাশাপাশি হাদিসের মান নির্ণয় ও রাবীদের দোষত্রুটি ব্যাখ্যার এক অপূর্ব সংকলন।
৩. সুনানে নাসাঈ (سنن النسائي): ইমাম আবু আব্দুর রহমান আহমাদ ইবনে শুআইব আন-নাসাঈ (রহ.) (২১৫-৩০৩ হি.) কর্তৃক সংকলিত। চার সুনানের মধ্যে সনদ যাচাই ও ত্রুটিমুক্তির দিক থেকে এটি সবচেয়ে শক্তিশালী ও বিশুদ্ধতম হিসেবে গণ্য। এর অপর নাম ‘আল-মুজতাবা’।
৪. সুনানে ইবনে মাজাহ (سنن ابن ماجه): ইমাম আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ইয়াযিদ ইবনে মাজাহ আল-কাযভীনি (রহ.) (২০৯-২৭৩ হি.) কর্তৃক সংকলিত। সুন্দর বিন্যাস, সাবলীল অধ্যায়বিন্যাস এবং বিরল ফিকহি হাদিস সন্নিবেশের জন্য এটি বিশেষভাবে সমাদৃত।

জামে আত-তিরমিযী গ্রন্থের অনন্য বৈশিষ্ট্য ও স্বাতন্ত্র্য:

ইমাম তিরমিযী (রহ.)-এর সংকলিত গ্রন্থটি হাদিস সাহিত্যের এক অনন্য মাস্টারপিস। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে উল্লেখ করা হলো:

১. হাদিসের মান নির্ধারণ (الحكم على الحديث): ইমাম তিরমিযীর সবচেয়ে বড় স্বাতন্ত্র্য হলো তিনি প্রতিটি হাদিস উল্লেখ করার পরপরই তার সনদের মান বিশ্লেষণ করেছেন; যেমন—’হাদিসুন হাসানুন সহীহ’, ‘হাদিসুন হাসান’, বা ‘হাদিসুন গারীব’। তাঁর হাত ধরেই হাদিস শাস্ত্রে ‘হাসান’ পরিভাষাটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।
২. ফকীহ ও মুজতাহিদগণের মতামতের বিবরণ (مذاهب الفقهاء): কোনো মাসআলায় সাহাবি, তাবেয়ী এবং তৎকালীন চার ইমামসহ শীর্ষস্থানীয় ফকীহগণের (যেমন সুফিয়ান সাওরী, ইবনুল মুবারক, ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমাদ) কী ফতোয়া বা অভিমত ছিল, তা তিনি প্রতিটি অধ্যায়ে অত্যন্ত নিরপেক্ষভাবে আলোচনা করেছেন।
৩. অনুচ্ছেদের সমার্থক হাদিসের নির্দেশনা (وفى الباب عن فلان): ইমাম তিরমিযী কোনো অনুচ্ছেদে একটি হাদিস উল্লেখ করার পর বলেন “وفي الباب عن فلان وفلان”—অর্থাৎ এ বিষয়ে অমুক অমুক সাহাবি থেকেও হাদিস বর্ণিত আছে। এর মাধ্যমে একজন গবেষক সহজেই উক্ত বিষয়ের সমস্ত সহায়ক সূত্র অবগত হতে পারেন।
৪. ইলল বা সূক্ষ্ম ত্রুটির উন্মোচন (بيان علل الحديث): তিনি হাদিসের সনদে কোনো গোপন দোষত্রুটি, রাবীর দুর্বলতা কিংবা সনদের বিচ্ছিন্নতা থাকলে তা স্পষ্ট ভাষায় ব্যাখ্যা করেছেন।
৫. ‘জামে’ কিতাবের সর্বজনীনতা: এটি কেবল ফিকহি সুনান গ্রন্থ নয়; বরং এতে আকাইদ, তাফসীর, সিয়ার, মানাকিব, যুহদ, শিষ্টাচার এবং জান্নাত-জাহান্নাম সংক্রান্ত হাদিসের সমস্ত মৌলিক বিভাগ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এজন্য একে ‘জামে’ এবং ‘সুনান’ উভয় মর্যাদায় ভূষিত করা হয়।


সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. ফাজিল অনার্স ৩য় বর্ষের দিরাসাতুল হাদিস (২০১৩০৪) বিষয়ের মান বণ্টন কেমন?

দিরাসাতুল হাদিস পরীক্ষায় মোট পূর্ণমান ৮০ এবং সময় ৪ ঘণ্টা। প্রশ্নপত্র দুটি বিভাগে বিভক্ত: ‘ক’ বিভাগে মোট ৮টি হাদিসভিত্তিক প্রশ্ন থাকে যার মধ্য থেকে ৫টির উত্তর দিতে হয় (প্রতিটি ১৪ নম্বর: হাদিস অনুবাদ ৬ + আনুষঙ্গিক প্রশ্ন ৮ = মোট ৭০ নম্বর); এবং ‘খ’ বিভাগে ২টি শাস্ত্রীয় প্রশ্ন থেকে ১টির উত্তর দিতে হয় (মান ১০ নম্বর)।

২. ওহিয়ে মাতলু ও ওহিয়ে গায়রে মাতলুর মূল পার্থক্য কী?

ওহিয়ে মাতলু হলো যার শব্দ ও অর্থ উভয়টিই সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ এবং যা নামাযে তিলাওয়াত করা ফরজ (পবিত্র কুরআন)। আর ওহিয়ে গায়রে মাতলু হলো যার মূল বক্তব্য ও ভাব আল্লাহর পক্ষ থেকে কিন্তু ভাষা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিজস্ব এবং যা নামাযে তিলাওয়াত করা হয় না (হাদিসে নববী)।

৩. মুকীম ও মুসাফিরের জন্য মোজার ওপর মাসেহের সময়সীমা কতক্ষণ?

শরিয়তের নির্ধারিত বিধান মতে, মুকীম ব্যক্তির জন্য মোজার ওপর মাসেহ করার বৈধ মেয়াদ হলো এক দিন ও এক রাত (২৪ ঘণ্টা) এবং মুসাফিরের জন্য তিন দিন ও তিন রাত (৭২ ঘণ্টা)। এই সময় গণনা শুরু হয় পবিত্র অবস্থায় মোজা পরার পর প্রথম অজু ভঙ্গের পরবর্তী মাসেহ করার সময় থেকে।

৪. পবিত্র কুরআনে বর্ণিত ‘সালাতুল উসতা’ বলতে কোন সালাতকে বোঝানো হয়েছে?

সহীহ বুখারী ও মুসলিমের দ্ব্যর্থহীন হাদিসের আলোকে সালাতুল উসতা বা মধ্যবর্তী সালাত বলতে ‘আসরের সালাত’-কে বোঝানো হয়েছে। খন্দকের যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ (সা.) কাফেরদের বিরুদ্ধে দোয়া করতে গিয়ে সুস্পষ্টভাবে আসরের সালাতকেই সালাতুল উসতা হিসেবে অভিহিত করেছেন।

৫. হাদিসে কুদসিতে রোযাকে কেন আল্লাহর নিজস্ব ইবাদত হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে?

রোযা সম্পূর্ণ লোকচক্ষুর অন্তরালে একমাত্র আল্লাহর ভয়ে পালন করা হয়, যার ফলে এতে প্রদর্শনপ্রিয়তা বা রিয়ার কোনো সুযোগ থাকে না। বান্দা কেবল আল্লাহর ভালোবাসায় নিজের তীব্র ক্ষুধা ও জৈবিক চাহিদা ত্যাগ করে। তাই আল্লাহ তাআলা রোযাকে বিশেষভাবে নিজের সাথে সম্পৃক্ত করে সীমাহীন প্রতিদান নিজ কুদরতি হাতে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

৬. হাদিস শাস্ত্রে ‘সুনানে আরবাআ’ বলতে কোন চারটি কিতাবকে বোঝায়?

সিহাহ সিত্তাহ বা কুতুবুস সিত্তাহর অন্তর্ভুক্ত সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম ব্যতীত বাকি চারটি মৌলিক প্রামাণ্য কিতাবকে সুনানে আরবাআ বলা হয়। এগুলো হলো: ১. সুনানে আবু দাউদ, ২. জামে আত-তিরমিযী, ৩. সুনানে নাসাঈ এবং ৪. সুনানে ইবনে মাজাহ।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *