পরীক্ষা কোড: ২০৩ | প্রশ্নপত্র কোড: ০৭৫
اختبار السنة الثالثة للفاضل (البكالوريوس) الشرف ، لعام ۲۰۲۲ م
[ফাজিল স্নাতক (সম্মান) তৃতীয় বর্ষ পরীক্ষা, ২০২২]
القرآن والدراسات الإسلامية
[আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
الفرق الإسلامية وعقائدها
[আল-ফিরাকুল ইসলামিয়্যাহ ওয়া আকায়িদুহা / আল-আকাইদুল ইসলামিয়্যাহ]
বিষয় কোড: ২০১৩০৫
সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০
الملاحظة : أجب عن أربعة من مجموعة (الف) وعن أربعة من مجموعة (ب)-
[দ্রষ্টব্য: (الف) অংশ থেকে চারটি এবং (ب) অংশ থেকে চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও। প্রতিটি প্রশ্নের মান সমান।]
مجموعة (الف) – ক বিভাগ (মান: ৪ × ১৫ = ৬০)
১ নম্বর প্রশ্ন
ما معنى العقيدة؟ تحدث عن أهميتها وحاجة الناس إليها-
[১. العقيدة এর অর্থ কী? আক্বীদাহর গুরুত্ব ও মানব জীবনে এর প্রয়োজনীয়তা আলোচনা কর।]
আকিদা (العقيدة)-এর শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ
ভাষাগত দৃষ্টিকোণ থেকে ‘আকিদা’ শব্দটি ‘আকদ’ (عقد) মূলধাতু থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ সুদৃঢ়ভাবে গ্রন্থিবদ্ধ করা, শক্ত বাঁধন দেওয়া বা নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নেওয়া।
ইসলামি শরীয়তের পরিভাষায়, মহান আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ, আসমানী কিতাবসমূহ, নবী-রাসূলগণ, আখেরাত দিবস এবং তাকদীরের ভালো-মন্দের ওপর কোনো প্রকার সন্দেহ-সংশয় ব্যতীত অন্তরের গভীরতম বিশ্বাস স্থাপন করাকে ‘আকিদা’ বলা হয়। আকিদা হলো দ্বীনের মূল ভিত্তি যার ওপর একজন মানুষের মুসলিম হওয়া এবং যাবতীয় আমলের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভরশীল।
আকিদার গুরুত্ব ও মানবজীবনে এর অপরিহার্য প্রয়োজনীয়তা
- আমল কবুল হওয়ার পূর্বশর্ত: সঠিক আকিদা ছাড়া হাজারো ভালো কাজ আখেরাতে ধূলিকণার মতো উড়ে যাবে। আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন:
وَلَقَدْ أُوحِيَ إِلَيْكَ وَإِلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكَ لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ
(যদি আপনি শিরক করেন, তবে অবশ্যই আপনার সমস্ত আমল বরবাদ হয়ে যাবে – সূরা আয-যুমার: ৬৫)। - সৃষ্টির পরম লক্ষ্য অর্জন: মানুষকে একমাত্র আল্লাহর তাওহীদের ভিত্তিতে ইবাদত করার জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে। বিশুদ্ধ আকিদা মানুষকে একত্ববাদের মশাল দ্বারা সঠিক পথের সন্ধান দেয়।
- আত্মিক প্রশান্তি ও মানসিক দৃঢ়তা: তাকদীরের প্রতি সঠিক আকিদা মানুষকে চরম বিপদেও ধৈর্যশীল ও আশাবাদী রাখে এবং যেকোনো পার্থিব প্রাপ্তিতে অহংকারমুক্ত রাখে।
- শিরক ও কুসংস্কারের মূলোৎপাটন: বিভ্রান্তিকর আকিদা মানুষকে গাছ, পাথর, কবর বা জ্যোতিষীর কুসংস্কারে দাসত্ব করতে বাধ্য করে; বিশুদ্ধ আকিদা মানুষকে সকল প্রকার গাইরুল্লাহর গোলামি থেকে মুক্তি দিয়ে এক আল্লাহর মর্যাদাপূর্ণ গোলাম বানায়।
- উম্মাহর বৈশ্বিক ঐক্য: ভৌগোলিক, ভাষাগত ও জাতীয় ভিন্নতা সত্ত্বেও বিশ্বের সকল মুসলমানকে যে একক সত্তা ঐক্যবদ্ধ করে তা হলো অভিন্ন ইসলামি আকিদা।
২ নম্বর প্রশ্ন
بين خلفية نشأة فرقة الخوارج ثم تحدث عن عقيدتهم فى صاحب الكبيرة مفصلا-
[২. খারেজী সম্প্রদায়ের আত্মপ্রকাশের প্রেক্ষাপট বর্ণনা কর। অতঃপর কবিরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তির ব্যাপারে তাদের বিশ্বাস বিস্তারিতভাবে আলোচনা কর।]
খারেজী সম্প্রদায়ের আত্মপ্রকাশের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
‘খারেজী’ (الخوارج) শব্দটি ‘খুরুজ’ (خروج) থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ বহির্গত হওয়া বা বিদ্রোহ করা। ইসলামের ইতিহাসে এটি প্রথম চরমপন্থী বিদআতী দল।
প্রেক্ষাপট: ৩৭ হিজরিতে সিফফিনের যুদ্ধে যখন আমিরুল মুমিনীন হযরত আলী (রা.) ও হযরত মুআবিয়া (রা.)-এর মধ্যে যুদ্ধ চরম রূপ নেয়, তখন মুআবিয়া (রা.)-এর পক্ষের পরামর্শে বর্শার ডগায় কুরআন বেঁধে মীমাংসার আহ্বান জানানো হয়। উম্মতের রক্তপাত এড়াতে উভয় পক্ষ থেকে একজন করে সালিশ (হাকাম) নিযুক্ত করার প্রস্তাব গৃহীত হয়। যুদ্ধবিরতির পর হযরত আলী (রা.)-এর বাহিনীর মধ্য থেকে প্রায় বারো হাজার উগ্র সেনা বিদ্রোহ করে দলত্যাগ করে কুফার নিকটবর্তী ‘হারূরা’ নামক স্থানে শিবির স্থাপন করে। তারা শ্লোগান তোলে: إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ
(আল্লাহ ছাড়া কারও ফয়সালা করার অধিকার নেই)। তারা দাবি করে যে, মানুষ দ্বারা সালিশি মেনে হযরত আলী (রা.) ও মুআবিয়া (রা.) কুফরি করেছেন। এ কারণে তাদের ‘খারেজী’ বা ‘হারূরিয়্যাহ’ বলা হয়। পরবর্তীতে ৩৮ হিজরিতে নাহরাওয়ানের যুদ্ধে হযরত আলী (রা.) তাদের চরমভাবে পরাজিত করেন।
কবিরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তির ব্যাপারে খারেজীদের চরমপন্থী আকিদা
খারেজীদের অন্যতম প্রধান বিভ্রান্তিকর আকিদা হলো কবিরা গুনাহগারকে তাকফীর (কাফির আখ্যা) করা:
- কাফির ঘোষণা: তাদের মতে, ঈমান ও আমল সম্পূর্ণ অবিভাজ্য। যে ব্যক্তি কোনো একটি কবিরা গুনাহে লিপ্ত হয় (যেমন ব্যভিচার, মদ্যপান, চুরি বা মিথ্যা), সে তাৎক্ষণিকভাবে ঈমান থেকে খারিজ হয়ে মুরতাদ ও মুশরিক কাফিরে পরিণত হয়।
- চিরস্থায়ী জাহান্নামী: তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী কবিরা গুনাহগার ব্যক্তি খাঁটি তাওবা ছাড়া মৃত্যুবরণ করলে সে অন্যান্য সাধারণ কাফিরের মতোই অনন্তকাল জাহান্নামের আগুনে জ্বলবে। তার জন্য কোনো সুপারিশ (শাফাআত) কার্যকর হবে না।
- রক্ত ও সম্পদ হালাল মনে করা: এই চরমপন্থী আকিদার ভিত্তিতে খারেজীরা তৎকালীন নিরপরাধ সাহাবী ও সাধারণ মুসলমানদের ওপর রক্তপাত ও গণহত্যা চালিয়েছিল। সাহাবী খুবাব ইবনুল আরাত (রা.)-এর পুত্র আবদুল্লাহকে তারা এ কারণেই নির্মমভাবে হত্যা করেছিল।
- আহলুস সুন্নাহর অবস্থান: আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদা হলো কবিরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তি কাফির হয় না; বরং সে ফাসিক মুমিন। সে আল্লাহর ইচ্ছাধীন—আল্লাহ চাইলে তাকে নিজ দয়ায় ক্ষমা করবেন অথবা গুনাহের পরিমাণ শাস্তি দিয়ে পরিশেষে জান্নাত দান করবেন।
৩ নম্বর প্রশ্ন
متى وكيف ظهرت فرقة الشيعة؟ تحدث عن فروعها وعقائدها الأساسية-
[৩. কখন, কীভাবে শিয়া সম্প্রদায়ের আত্মপ্রকাশ ঘটে? শিয়া সম্প্রদায়ের বিভিন্ন শাখা ও মৌলিক বিশ্বাসসমূহ আলোচনা কর।]
শিয়া সম্প্রদায়ের আত্মপ্রকাশের সময় ও প্রেক্ষাপট
‘শিয়া’ (الشيعة) শব্দের অর্থ সমর্থক বা দল। পারিভাষিক অর্থে যারা হযরত আলী (রা.) ও আহলে বাইতের প্রতি অতিভক্তি প্রদর্শন করে এবং হযরত আলীকে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর একমাত্র প্রত্যক্ষ মনোনীত ও অভ্রান্ত ইমাম মনে করে, তাদেরকে শিয়া বলা হয়।
আত্মপ্রকাশ: প্রাথমিকভাবে হযরত উসমান (রা.)-এর শাহাদাতের পর আবদুল্লাহ ইবনে সাবার গোপন চক্রান্তের মধ্য দিয়ে এর রাজনৈতিক বীজ রোপিত হয়। তবে ৬১ হিজরিতে কারবালার প্রান্তরে হযরত হুসাইন (রা.)-এর মর্মান্তিক শাহাদাতের পর এটি একটি সুসংগঠিত ধর্মতাত্ত্বিক সম্প্রদায়ে রূপ নেয়।
শিয়া সম্প্রদায়ের প্রধান শাখাসমূহ
- ইছনিয়া আশারিয়্যাহ বা জাফারিয়া (الإثنا عشرية): তারা হযরত আলী থেকে শুরু করে মুহাম্মদ আল-মাহদী পর্যন্ত বারো জন ইমামের অভ্রান্ততার ওপর বিশ্বাসী। বর্তমান ইরান ও ইরাকে এ শাখার প্রাধান্য।
- ইসমাঈলিয়্যা বা বাতেনিয়্যা (الإسماعيلية): এরা ষষ্ঠ ইমাম জাফর সাদিকের পর তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র ইসমাঈলকে ইমাম মানে। এরা দ্বীনের জাহেরী বিধানকে অস্বীকার করে গোপন রূপক ব্যাখ্যার দাবি করে। আগা খান এদের বর্তমান নেতা।
- যায়দিয়্যাহ (الزيدية): এরা ইমাম যায়দ ইবনে আলীর অনুসারী। শিয়াদের মধ্যে এরা সবচেয়ে মধ্যপন্থী এবং সুন্নিদের সবচেয়ে কাছাকাছি। এরা আবু বকর ও উমর (রা.)-কে কাফির বলে না। বর্তমানে ইয়েমেনে এদের বসবাস।
- গুলাত বা উগ্রপন্থী শিয়া (الغلاة): যারা হযরত আলীকে খোদাত্ব বা নবুওয়াত দান করে ইসলাম থেকে পুরোপুরি খারিজ হয়ে গেছে।
শিয়াদের মৌলিক বিশ্বাসসমূহ
- ইমামত (الإمامة): নবুওয়াতের মতোই ইমামতকে তারা ঈমানের অবিচ্ছেদ্য মৌলিক রুকন মনে করে। তাদের মতে ইমামগণ আল্লাহর পক্ষ থেকে মনোনীত, নিষ্পাপ (মা’সূম) এবং সৃষ্টিজগতের ওপর তাঁদের অলৌকিক কর্তৃত্ব রয়েছে।
- সাহাবায়ে কিরামের ন্যায়পরায়ণতা অস্বীকার: তারা গুটি কয়েক সাহাবী ছাড়া প্রায় সকল সাহাবী (বিশেষ করে আবু বকর, উমর ও উসমান রা.)-এর ওপর অপবাদ আরোপ করে।
- তাক্বিয়্যাহ (التقية): নিজের সুরক্ষার স্বার্থে প্রকাশ্যে বিপরীত বিশ্বাস প্রদর্শন করা বা কপটতাকে তারা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ গণ্য করে।
- মুতা বিবাহ (نظام المتعة): নির্দিষ্ট সময়ের বিনিময়ে চুক্তিভিত্তিক বিবাহকে তারা বৈধ মনে করে, যা সুন্নি আকিদায় সম্পূর্ণ হারাম।
৪ নম্বর প্রশ্ন
ما موقف أهل السنة والجماعة فى الشيعة؟ بين مدللاً ومفصلاً-
[৪. শিয়াদের ব্যাপারে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের অবস্থান কী? দলিল-প্রমাণসহ বিস্তারিতভাবে আলোচনা কর।]
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের দৃষ্টিভঙ্গি ও শ্রেণিভিত্তিক ফতোয়া
আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআত শিয়াদের সামগ্রিকভাবে ঢালাও কাফির ঘোষণা করে না; বরং তাদের বিভিন্ন দল ও বিশ্বাসের মারাত্মকতার ভিত্তিতে বিচার করে:
১. সরাসরি কাফির ও ইসলামচ্যুত শিয়া (الغلاة):
- যারা হযরত আলী (রা.)-কে উপাস্য বা আল্লাহর অবতার দাবি করে।
- যারা দাবি করে যে জিবরাঈল (আ.) ওহী নিয়ে আসতে ভুল করে আলীর বদলে মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছে এসেছেন (নাউযুবিল্লাহ)।
- যারা আল-কুরআনুল কারীমে বিকৃতি (তাহরীফ) ঘটেছে বলে বিশ্বাস করে। কারণ আল্লাহ কুরআনের সুরক্ষার নিশ্চয়তা দিয়েছেন (
إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ
)। - যারা উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.)-এর চরিত্রের ওপর অপবাদ আরোপ করে; কারণ আল্লাহ তাআলা সূরা আন-নূরে সরাসরি তাঁর পবিত্রতার সনদ ঘোষণা করেছেন। কুরআনের আয়াত অস্বীকারকারী সর্বসম্মতভাবে কাফির।
২. বিদআতী ও চরম বিভ্রান্ত দল (المبتدعة والضلال):
যেমন সাধারণ ইমামিয়্যাহ শিয়া—যারা হযরত আবু বকর ও উমর (রা.)-এর খেলাফতকে অন্যায় দাবি করে কিন্তু তাঁদের স্পষ্ট কাফির বলে না, এবং সাহাবায়ে কিরামের প্রতি গালিগালাজ করে। আহলে সুন্নাহর ইমামগণের মতে তারা ইসলামচ্যুত না হলেও চরম পথভ্রষ্ট, বিদআতী ও ফাসিক। তাদের পেছনে সালাত আদায় করা না-জায়েজ।
৩. আহলে বাইতের প্রকৃত ভালোবাসা সুন্নিদের মূলনীতি:
আহলে সুন্নাহ দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করে যে, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র আহলে বাইতকে ভক্তি ও শ্রদ্ধা করা প্রতিটি মুমিনের ঈমানী দায়িত্ব। কিন্তু সেই ভালোবাসার নামে সাহাবায়ে কিরামের প্রতি বিষোদগার করা বা নবুওয়াতের সাথে ইমামতকে সমকক্ষ বানানো স্পষ্ট গুমরাহী।
৫ নম্বর প্রশ্ন
تحدث عن مسألة خلق القرآن وتداعياتها السياسية مفصلا-
[৫. مسألة خلق القرآن ও এর রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে বিশদভাবে আলোচনা কর।]
খালকে কুরআন (কুরআন সৃষ্টির বিতর্ক)-এর পটভূমি
আব্বাসীয় শাসনামলে গ্রিক দর্শনের অন্ধ অনুকরণে মু’তাযিলা সম্প্রদায় আল্লাহর গুণাবলি অস্বীকার (তা’তীল) করতে গিয়ে দাবি করে যে, আল-কুরআন আল্লাহর শাশ্বত ও চিরন্তন কালাম (বাণী) নয়; বরং তা মহান আল্লাহর একটি নশ্বর সৃষ্ট বস্তু (مخلوق)।
পক্ষান্তরে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অকাট্য আকিদা হলো: আল-কুরআন হলো আল্লাহর অনাদি, চিরন্তন কালাম (কুরআন কালামুল্লাহ গাইরু মাখলূক্ব)। এটি কোনো সৃষ্ট বস্তু নয়।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও ‘মিহনা’র ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি
- রাষ্ট্রীয় চাপ প্রয়োগ ও মিহনার সূচনা: আব্বাসীয় খলিফা আল-মামুন (শাসনকাল ১৯৮-২১৮ হি.) মুতাযিলী পণ্ডিত বিশেষ করে আহমদ ইবনে আবি দুয়াদ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ‘খালকে কুরআন’-এর মতবাদকে সরকারি রাষ্ট্রীয় ধর্মবিশ্বাসে রূপান্তর করেন।
- আলেমদের ওপর নারকীয় নির্যাতন: যেসব আলেম ও বিচারপতি কুরআনকে সৃষ্টি বলতে অস্বীকার করেছিলেন, তাঁদের চাকরিচ্যুত, বন্দি এবং জল্লাদ দিয়ে চাবুক মেরে নির্মম নির্যাতন করা হয়। এ ঐতিহাসিক ধর্মীয় নিগ্রহকে ‘আল-মিহনা’ (المحنة) বলা হয়। খলিফা আল-মু’তাসিম ও আল-ওয়াসিকের আমলেও এ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস অব্যাহত থাকে।
- ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (র.)-এর অটল প্রতিরোধ: ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (র.) সত্য আকিদা রক্ষায় এক পাহাড়ের ন্যায় অবিচল ছিলেন। খলিফার দরবারে জল্লাদের নির্মম বেত্রাঘাতে রক্তাক্ত ও সংজ্ঞাহীন হয়েও তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছিলেন: “আমাকে কুরআন বা সুন্নাহর কোনো একটি দলিল এনে দাও, তবেই আমি তোমাদের কথা মানব; অন্যথায় আমি কুরআনকে সৃষ্ট বস্তু বলতে পারব না।” তাঁর এই ঐতিহাসিক আত্মত্যাগ উম্মতের আকিদাকে বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা করেছিল।
- সত্যের বিজয় ও মুতাযিলাদের পতন: পরবর্তীতে খলিফা আল-মুতাওয়াক্কিল ২৩২ হিজরিতে ক্ষমতায় এসে মিহনার সমাপ্তি টানেন, মুতাযিলাদের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ করেন এবং আহলে সুন্নাহর মূলধারাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পুনর্বহাল করেন।
৬ নম্বর প্রশ্ন
اكتب تاريخ نشأة القاديانية- ثم فند عقيدتها فى ختم النبوة مدعما بالأدلة من القرآن والسنة-
[৬. কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের আত্মপ্রকাশের ইতিহাস লেখ। অতঃপর ‘খতমে নবুওয়াত’ বিষয়ে তাদের আকিদা কুরআন ও হাদিসের দলিলের মাধ্যমে খণ্ডন কর।]
কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের আত্মপ্রকাশের ইতিহাস
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ভারতে মুসলমানদের জিহাদী চেতনা ও আকিদা ধ্বংস করার হীন চক্রান্তে ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের গুরুদাসপুর জেলার কাদিয়ান গ্রামের বাসিন্দা মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী (১৮৩৯-১৯০৮ খ্রি.)-কে দাঁড় করায়।
মির্জা গোলাম আহমদ প্রথমে নিজেকে সংস্কারক (মুজাদ্দিদ), এরপর প্রতিশ্রুত মসীহ ও মাহদী এবং পরিশেষে ১৯০১ সালে নিজেকে প্রত্যক্ষ নবী ও রাসূল হিসেবে দাবি করে। ইংরেজদের আনুগত্যকে সে ধর্মীয় ফরজ আখ্যা দেয় এবং ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে জিহাদ হারাম ঘোষণা করে। ফলে তার অনুসারীরা ‘কাদিয়ানী’ বা তথাকথিত ‘আহমদীয়া’ জামাত নামে একটি নতুন অমুসলিম বাতিল দলে পরিণত হয়।
খতমে নবুওয়াত বিষয়ে কাদিয়ানীদের কুফরি আকিদা
কাদিয়ানীদের বিশ্বাস হলো মুহাম্মদ (সা.) শেষ নবী নন; তাঁর পরও শরীয়তবিহীন বা জিল্লীরূপে নবুওয়াত অব্যাহত রয়েছে এবং মির্জা গোলাম আহমদ সেই নবী।
কুরআন ও হাদীসের অকাট্য দলিলের মাধ্যমে খণ্ডন
- কুরআনের অকাট্য দলিল: মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন:
مَّا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِّن رِّجَالِكُمْ وَلَٰكِن رَّسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ
(মুহাম্মদ তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসূল এবং শেষ নবী – সূরা আল-আহযাব: ৪০)। আরবি ভাষায় ‘খাতামুন নাবিয়্যীন’ অর্থ নবুওয়াতের মোহর বা চূড়ান্ত পরিসমাপ্তিকারী, যার পর কোনো নতুন নবী আসার সম্ভাবনা চিরতরে রুদ্ধ। - সহীহ হাদীসের দলিল:
- রাসূলুল্লাহ (সা.) দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ইরশাদ করেছেন:
أَنَا خَاتَمُ النَّبِيِّينَ لاَ نَبِيَّ بَعْدِي
(আমিই শেষ নবী, আমার পর আর কোনো নবী নেই – সহীহ মুসলিম)। - তিনি আরও বলেন: “রিসালাত ও নবুওয়াতের ধারা চিরতরে নিঃশেষ হয়ে গেছে, সুতরাং আমার পর আর কোনো রাসূলও আসবে না এবং কোনো নবীও আসবে না” (তিরমিযী)।
- নবীজি (সা.) নবুওয়াতের প্রাসাদকে এমন এক সুন্দর ভবনের সাথে তুলনা করেছেন যার কেবল একটি ইটের স্থান খালি ছিল; তিনি বললেন: আমিই সেই শেষ ইট এবং আমিই খাতামুন নাবিয়্যীন।
- রাসূলুল্লাহ (সা.) দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ইরশাদ করেছেন:
- ইজমা উম্মত: সমগ্র মুসলিম উম্মাহ এবং বিশ্ব মুসলিম নেতৃবৃন্দ একমত যে, মুহাম্মদ (সা.)-এর পর নবুওয়াতের যেকোনো দাবিদার একজন কাযযাব, দাজ্জাল ও মুরতাদ। ১৯৭৪ সালে বিশ্ব মুসলিম রাবেতা এবং পাকিস্তানের জাতীয় সংসদে কাদিয়ানীদের আইনত অমুসলিম সংখ্যালঘু হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
৭ নম্বর প্রশ্ন
ما الفرقة الناجية؟ تحدث عن خصائصها وسماتها فى ضوء القرآن والسنة-
[৭. الفرقة الناجية কী? কুরআন ও হাদিসের আলোকে তাদের বৈশিষ্ট্য ও পরিচায়কসমূহ আলোচনা কর।]
আল-ফিরকাতুন নাজিয়াহ (মুক্তিকামী দল)-এর পরিচিতি
‘আল-ফিরকাতুন নাজিয়াহ’ বলতে উম্মতের সেই একক মূলধারাকে বোঝায় যারা দুনিয়ায় দ্বীনের সঠিক রূপরেখার ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে এবং আখেরাতে জাহান্নামের আগুন থেকে নাজাত বা মুক্তি লাভ করে চিরস্থায়ী জান্নাতে প্রবেশ করবে।
বিখ্যাত ইফতিরাকুল উম্মাহর হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: “ইহুদিরা ৭১ দলে এবং খ্রিস্টানরা ৭২ দলে বিভক্ত হয়েছিল; আর আমার উম্মত ৭৩ দলে বিভক্ত হবে। তাদের মধ্যে একটি দল ব্যতীত বাকি ৭২ দলই জাহান্নামে যাবে। সাহাবায়ে কিরাম জিজ্ঞাসা করলেন: হে আল্লাহর রাসূল! সেই মুক্তিপ্রাপ্ত দলটি কারা? তিনি বললেন: مَا أَنَا عَلَيْهِ وَأَصْحَابِي
অর্থাৎ ‘আমি এবং আমার সাহাবীগণ আজ যার ওপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছি’ (তিরমিযী)। এই দলটিই হলো আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআত।”
কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে মুক্তিপ্রাপ্ত দলের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ
- কিতাবুল্লাহ ও সুন্নাতে রাসুলের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ: নিজস্ব রায় বা দর্শনের পরিবর্তে তাঁরা প্রতিটি আকিদা ও আমলের ক্ষেত্রে কুরআন ও সহীহ সুন্নাহকে সর্বোচ্চ মানদণ্ড মনে করেন।
- সাহাবায়ে কিরামের বুঝ ও মানহাজের প্রতি আনুগত্য: দীন বোঝার ক্ষেত্রে তাঁরা সাহাবীগণের ইজমা ও আসারকে অনুসরণ করেন; কোনো নতুন বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা তৈরি করেন না।
- বিদআত ও কুসংস্কার থেকে পূর্ণ পবিত্রতা: আকিদা বা ইবাদতে নতুন কোনো মানবীয় প্রথা (বিদআত) সংযোজন করেন না; রাসূলের সুন্নাহর ওপর কঠোরভাবে অবিচল থাকেন।
- দ্বীনের মধ্যে ভারসাম্য ও চরমপন্থা বর্জন: তাঁরা খারেজীদের মতো চরমপন্থী নন এবং মুরজিয়াদের মতো উদাসীন নন; বরং সকল বিষয়ে মধ্যমপন্থা (ওয়াসাত্বিয়্যাহ) বজায় রাখেন।
- উম্মতের মুসলিম জামাত ও ঐক্যের হেফাযত: তুচ্ছ শাখা-প্রশাখাগত বিষয়ে মুসলমানদের মাঝে ফাটল সৃষ্টি করেন না এবং তাকফীরবাদের ফিতনা থেকে দূরে থাকেন।
৮ নম্বর প্রশ্ন
تحدث عن فتنة أهل القرآن فى الوقت الحاضر- ثم اذكر واجبات الدعاة فى الرد عليهم-
[৮. বর্তমান সময়ে আহলে কুরআনের ফিত্না সম্পর্কে আলোচনা কর। অতঃপর তাদের মোকাবেলায় দায়ীদের করণীয় বর্ণনা কর।]
বর্তমান যুগে ‘আহলে কুরআন’ (হাদীস অস্বীকারকারী)-দের ফিতনা
বর্তমান যুগে পশ্চিমা প্রাচ্যবিদ ও ইসলামবিদ্বেষী শক্তির প্ররোচনায় মুসলিম সমাজে একটি চরম বিভ্রান্তিকর দলের আবির্ভাব ঘটেছে যারা নিজেদের ধূর্ততার সাথে ‘আহলে কুরআন’ বা ‘কুরআনবাদী’ দাবি করে। বাস্তবে তারা হলো ‘মুনকিরীনে হাদীস’ বা হাদীস অস্বীকারকারী চক্র।
তাদের বিভ্রান্তির স্বরূপ: তারা দাবি করে যে ইসলাম পালনের জন্য কেবল কুরআনই যথেষ্ট; রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ ও হাদীসের কোনো প্রামাণিকতা বা আইনগত উপযোগিতা নেই। অথচ হাদীস অস্বীকার করলে ইসলামের কোনো বাস্তব কাঠামোই অবশিষ্ট থাকে না। যেমন: কুরআনে সালাত কায়েমের নির্দেশ আছে, কিন্তু সালাতের ওয়াক্ত, রাকাত সংখ্যা, রুকু-সিজদার পদ্ধতি ও তাসবীহ সবই হাদীস দ্বারা নির্ধারিত। যাকাতের নিসাব, হজের তওয়াফ ও পাথর নিক্ষেপের নিয়ম সবই হাদীসের ওপর প্রতিষ্ঠিত। সুতরাং হাদীস অস্বীকারের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো কুরআনকে ধ্বংস করে ইসলামকে মানুষের খেয়ালখুশিমতো বিকৃত করা।
এ ফিতনা মোকাবেলায় ইসলামি দায়ীদের অপরিহার্য দায়িত্ব
- কুরআনে সুন্নাহর প্রামাণিকতা তুলে ধরা: কুরআনের শত শত আয়াত প্রমাণ করে যে রাসূলের আনুগত্য আল্লাহর আনুগত্যের সমান (
مَّن يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ
) এবং রাসূলের নির্দেশ গ্রহণ করা ফরজ (وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ
)। এসব আয়াত জোরালোভাবে প্রচার করা। - উলূমুল হাদীসের কঠোর বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রদর্শন: হাদীস সংকলনের যে অনন্য ঐতিহাসিক ও রিজালশাস্ত্রীয় মানদণ্ড উম্মাহ তৈরি করেছে তা তুলে ধরা।
- ডিজিটাল মিডিয়া ও বইপুস্তকে দাঁতভাঙা জবাব: ইন্টারনেটের মাধ্যমে তাদের যুক্তিহীন অপপ্রচার ও সংকীর্ণতার মুখোশ উন্মোচন করে তরুণ প্রজন্মকে সচেতন করা।
- হাদীস চর্চার প্রসার: মসজিদ ও মাদ্রাসায় সহীহ হাদীসের তা’লীম ও তাদরীস বৃদ্ধি করা যাতে সাধারণ মানুষের ঈমান মজবুত থাকে।
مجموعة (ب) – খ বিভাগ (মান: ৪ × ৫ = ২০)
৯ নম্বর প্রশ্ন
تحدث عن أهمية الإيمان بالقدر فى ضوء القرآن والسنة موجزًا-
[৯. ‘তাকদিরের প্রতি বিশ্বাস’ এর গুরুত্ব সম্পর্কে কুরআন ও হাদিসের আলোকে সংক্ষেপে আলোচনা কর।]
তাকদীরের প্রতি ঈমান আনা ঈমানের ছয়টি মৌলিক রুকনের অন্যতম। এর গুরুত্ব নিম্নরূপ:
- কুরআনের সাক্ষ্য: আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন:
إِنَّا كُلَّ شَيْءٍ خَلَقْنَاهُ بِقَدَرٍ
(নিশ্চয় আমি প্রতিটি বস্তুকে সুনির্দিষ্ট পরিমাপে সৃষ্টি করেছি – সূরা আল-ক্বামার: ৪৯)। মহাবিশ্বে যা কিছু ঘটছে তা সবই আল্লাহর চিরন্তন পূর্বজ্ঞান ও ইচ্ছা অনুযায়ী লাওহে মাহফুজে লিপিবদ্ধ আছে। - হাদীসে জিবরাঈল: নবীজি (সা.) ঈমানের সংজ্ঞায় ইরশাদ করেন: “তুমি ঈমান আনবে তাকদীরের ভালো ও মন্দের প্রতি” (সহীহ মুসলিম)।
- আত্মিক প্রশান্তি: তাকদীরে বিশ্বাসী মানুষ ক্ষতিতে নিরাশ হয় না এবং সাফল্যে উদ্ধত হয় না; কারণ সে জানে যা ঘটার তা আল্লাহর হুকুমেই ঘটেছে।
১০ নম্বর প্রশ্ন
اكتب ثلاثة نصوص من القرآن والسنة فى ذم الافتراق والاختلاف مع ترجمتها بالبنغالية-
[১০. অনৈক্য ও বিভেদের প্রতি নিন্দাসূচক কুরআন ও হাদীসের তিনটি উদ্ধৃতি তর্জমাসহ লেখ।]
১. কুরআনের বাণী (সূরা আলে ইমরান: ১০৩):
وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا
[তোমরা সবাই মিলে আল্লাহর রজ্জুকে সুদৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধর এবং পরস্পর বিভক্ত হয়ো না।]
২. কুরআনের বাণী (সূরা আল-আনআম: ১৫৯):
إِنَّ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا لَّسْتَ مِنْهُمْ فِي شَيْءٍ
[নিশ্চয় যারা তাদের দ্বীনকে খণ্ড-বিখণ্ড করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে, তাদের কোনো কাজের সাথেই আপনার কোনো সম্পর্ক নেই।]
৩. হাদীসে নববী (সুনানে তিরমিযী):
عَلَيْكُمْ بِالْجَمَاعَةِ وَإِيَّاكُمْ وَالْفُرْقَةَ، فَإِنَّ الشَّيْطَانَ مَعَ الْوَاحِدِ وَهُوَ مِنَ الاِثْنَيْنِ أَبْعَدُ
[তোমরা ঐক্যবদ্ধ মুসলিম জামাতকে আঁকড়ে ধর এবং বিভেদ-অনৈক্য থেকে বেঁচে থাক; কেননা শয়তান একাকী ব্যক্তির সাথে থাকে এবং সে দুজন থেকে অধিকতর দূরে থাকে।]
১১ নম্বর প্রশ্ন
من مؤسس فرقة المعتزلة؟ اكتب نبذة من حياته-
[১১. মু’তাজিলা সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা কে? তার সংক্ষিপ্ত জীবনী লেখ।]
প্রতিষ্ঠাতা: মু’তাযিলা সম্প্রদায়ের মূল প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ওয়াসিল ইবনে আত্বা (واصل بن عطاء)।
সংক্ষিপ্ত জীবনী: তিনি ৮০ হিজরিতে মদিনায় জন্মগ্রহণ করেন এবং বসরায় প্রতিপালিত হন। তিনি যুগশ্রেষ্ঠ তাবেয়ী ইমাম হাসান বসরী (র.)-এর জ্ঞানপীঠে শিক্ষা লাভ করেন। কবিরা গুনাহগার ব্যক্তির ব্যাপারে হাসান বসরীর সাথে মতভেদ করে তিনি দাবি করেন যে, কবিরা গুনাহগার ব্যক্তি মুমিনও নয় কাফিরও নয়; বরং সে উভয় স্তরের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থান করে (المنزلة بين المنزلتين)। এই মতভেদ করে তিনি হাসান বসরীর দরবার ছেড়ে পৃথক হয়ে যান। তখন হাসান বসরী বলেছিলেন: اعْتَزَلَ عَنَّا وَاصِلٌ
(ওয়াসিল আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল)। সেই থেকে তাঁর অনুসারীদের ‘মু’তাযিলা’ (বিচ্ছিন্ন দল) বলা হয়। তিনি ১৩১ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেন।
১২ নম্বর প্রশ্ন
ما المراد بالشيعة الاسماعيلية؟ بين أصول عقائدهم-
[১২. ‘ইসমাইলিয়া শিয়া’ বলতে কী বোঝায়? তাদের মৌলিক বিশ্বাসসমূহ বর্ণনা কর।]
পরিচয়: যে শিয়া গোষ্ঠী ষষ্ঠ ইমাম জাফর সাদিকের মৃত্যুর পর তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র মূসা কাজিমের পরিবর্তে জ্যেষ্ঠ পুত্র ইসমাঈল ইবনে জাফরকে সপ্তম বৈধ ইমাম হিসেবে বিশ্বাস করে, তাদেরকে ‘ইসমাইলিয়া শিয়া’ বলা হয়। মিশরের ফাতেমীয় খেলাফত ছিল এ মতবাদের রাজনৈতিক বহিঃপ্রকাশ।
মৌলিক আকিদাসমূহ:
- বাতেনী দর্শন: তারা বিশ্বাস করে কুরআনের প্রতিটি অক্ষরের একটি প্রকাশ্য (যাহের) অর্থ এবং একটি গোপন আধ্যাত্মিক (বাতেন) অর্থ রয়েছে। তারা দাবী করে বাতেনী জ্ঞান জানলে নামাজ, রোজা ইত্যাদি শরীয়তী আমলের প্রয়োজন থাকে না।
- ইমামের খোদাত্ব রূপ: তারা ইমামকে আল্লাহর অলৌকিক প্রতিভূ মনে করে এবং ইমামের কথাই একমাত্র শরীয়ত হিসেবে মানে।
১৩ নম্বর প্রশ্ন
عرف بالأشعرية والماتريدية بإيضاح-
[১৩. বিশদভাবে আশআরিয়্যাহ ও মাতুরিদিয়্যাহ এর পরিচয় দাও।]
আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদাকে যুক্তি ও দর্শনের মোকাবেলায় সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করতে তৃতীয় ও চতুর্থ হিজরী শতকে দুটি প্রধান ধারার আবির্ভাব ঘটে:
- আল-আশআরিয়্যাহ (الأشعرية): ইমাম আবুল হাসান আল-আশআরী (২৬০-৩২৪ হি.) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ধারা। তিনি প্রথম জীবনে ৪০ বছর মুতাযিলী ছিলেন; পরবর্তীতে সত্যের সন্ধান পেয়ে মুতাযিলী যুক্তিবাদের বিরুদ্ধে কলমী লড়াই চালিয়ে সুন্নি আকিদা পুনরুজ্জীবিত করেন। শাফেয়ী ও মালেকী মাযহাবের অধিকাংশ আলেম এ ধারার অনুসারী।
- আল-মাতুরিদিয়্যাহ (الماتريدية): ইমাম আবু মনসুর আল-মাতুরিদী (মৃত্যু ৩৩৩ হি.) কর্তৃক সমরকন্দে প্রতিষ্ঠিত ধারা। হানাফী মাযহাবের ইমাম ও আলেমগণ প্রায় সবাই আকিদায় মাতুরিদী ঘরানার অন্তর্ভুক্ত। এ উভয় ধারা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের নির্ভরযোগ্য মূলধারা হিসেবে স্বীকৃত।
১৪ নম্বর প্রশ্ন
اشرح موقف الخوارج من مسألة ‘الحاكمية’-
[১৪. الحاكمية বিষয়ে খারেজী সম্প্রদায়ের অবস্থান ব্যাখ্যা কর।]
খারেজীরা চরম সংকীর্ণভাবে আল্লাহর হাকেমিয়্যাত (সার্বভৌমত্ব)-এর ব্যাখ্যা করেছিল। সিফফিনের যুদ্ধে যখন মানুষের মধ্য থেকে সালিশ নিযুক্ত করা হলো, তখন তারা সূরা আল-মায়িদাহর ৪৪ আয়াত وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ
এবং إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ
দ্বারা দাবি করল যে, কোনো মানুষ অন্য মানুষের মাঝে বিচার বা সালিশ করার কোনো ক্ষমতাই রাখে না; যে তা করবে সে কাফির।
তাদের এ বিভ্রান্তির জবাবে আমিরুল মুমিনীন হযরত আলী (রা.) বলেছিলেন: كَلِمَةُ حَقٍّ أُرِيدَ بِهَا بَاطِلٌ
অর্থাৎ “কথাটি সত্য (যে ফায়সালা একমাত্র আল্লাহর), কিন্তু এর দ্বারা উদ্দেশ্য নেওয়া হয়েছে চরম বাতিল।” খারেজীরা শাসনের বাস্তবতা অস্বীকার করে অরাজকতা সৃষ্টি করেছিল।
১৫ নম্বর প্রশ্ন
تحدث عن عقيدة أهل السنة والجماعة فى الإيمان بالرسل والملائكة-
[১৫. রসুলগণ ও ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান বিষয়ে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আক্বীদাহ আলোচনা কর।]
- রাসূলগণের প্রতি আকিদা: আল্লাহ তাআলা মানবজাতির হেদায়েতের জন্য বহু নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। তাঁদের প্রথম হলেন আদম (আ.) এবং সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ হলেন মুহাম্মদ (সা.)। সকল নবী নবুওয়াত প্রকাশের পূর্বে ও পরে কবিরা ও সগিরা গুনাহ থেকে সম্পূর্ণ নিষ্পাপ (মা’সূম)। তাঁদের কাউকে অস্বীকার করা কুফরি।
- ফেরেশতাগণের প্রতি আকিদা: ফেরেশতাগণ নূরের তৈরি এক নিষ্পাপ সৃষ্টি। তাঁদের কোনো লিঙ্গভেদ (নারী-পুরুষ) বা জৈবিক ক্ষুধা-তৃষ্ণা নেই। তাঁরা মহান আল্লাহর অবাধ্যতা করার ক্ষমতাই রাখেন না এবং রাত-দিন আল্লাহর তাসবীহ পাঠ ও অর্পিত দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত থাকেন।
১৬ নম্বর প্রশ্ন
علق على واحد مما يلى: (الف) الجبرية (ب) البهائية (ج) المرجئة-
[১৬. নিচের যে কোনো একটি বিষয়ে টীকা লেখ:]
(ক) আল-জাবারিয়্যাহ (الجبرية):
জাহম ইবনে সাফওয়ান কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এক চরমপন্থী দার্শনিক দল। তাদের বিশ্বাস হলো—মানুষের নিজস্ব কোনো ইচ্ছা, শক্তি বা স্বাধীনতা নেই। মানুষ হলো বাতাসের মুখে উড়ে চলা শুকনো পাতার ন্যায় সম্পূর্ণ নিরুপায় ও বাধ্য (মাজবুর)। তারা দাবি করে মানুষ ভালো বা মন্দ কাজের জন্য দায়ী নয়, সবই আল্লাহ তাকে দিয়ে জোরপূর্বক করান। এটি আহলে সুন্নাহর আকিদা বিরোধী এক চরম পথভ্রষ্ট মতবাদ।
(খ) আল-বাহাঈয়্যাহ (البهائية):
ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইরানে মীর্জা আলী মুহাম্মদ বাব এবং মীর্জা হুসাইন আলী (বাহাউল্লাহ)-এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত একটি চরম ইসলামবিরোধী কুফরি সম্প্রদায়। বাহাউল্লাহ নিজেকে আল্লাহর অবতার দাবি করে নতুন শরীয়ত প্রণয়ন করে, নামাজ-রোজা রহিত করে এবং কাবাঘরের পরিবর্তে ইরানের বাবে আক্বাকে কেবলা নির্ধারণ করে। তারা ইসলামের গণ্ডির বাইরে সম্পূর্ণ কাফির।
(গ) আল-মুরজিয়াহ (المرجئة):
‘ইরজা’ (বিলম্বিত করা বা আশা দেওয়া) থেকে উদ্ভূত। এরা খারেজীদের বিপরীত প্রান্তে অবস্থানকারী চরম দল। তাদের ভ্রান্ত দাবি হলো—অন্তরে ঈমান থাকলে কোনো গুনাহই মানুষের ক্ষতি করে না, যেমন কুফরির সাথে কোনো নেক আমল উপকারে আসে না। তারা আমলকে ঈমান থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দিয়েছে, যার ফলে তাদের আকিদা মানুষের মধ্যে পাপের নির্ভীকতা তৈরি করে। আহলে সুন্নাহ এদের বিভ্রান্ত ঘোষণা করেছে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. ‘আল-ফিরাকুল ইসলামিয়্যাহ’ শাস্ত্র পাঠের মূল উদ্দেশ্য কী?
ইতিহাসে উদ্ভূত বিভিন্ন বাতিল ও বিভ্রান্ত ফেরকার উৎপত্তির কারণ ও ভুল আকায়েদ জেনে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মূলধারার ওপর অবিচল থাকা।
২. খারেজী সম্প্রদায়ের প্রধান মারাত্মক ভ্রান্তি কোনটি?
কবিরা গুনাহে লিপ্ত মুসলিমকে সরাসরি কাফির ঘোষণা করা এবং তাদের জান-মালকে হালাল মনে করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে রক্তপাত চালানো।
৩. কাদিয়ানী সম্প্রদায় কেন ইসলামের দৃষ্টিতে অমুসলিম?
কারণ তারা পবিত্র কুরআন ও মুতাওয়াতির হাদীস দ্বারা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর শেষ নবুওয়াত (খতমে নবুওয়াত) সরাসরি অস্বীকার করেছে।
৪. ‘খালকে কুরআন’ বিষয়ে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বলের অবদান কী?
তিনি রাষ্ট্রীয় অকথ্য নির্যাতন ও কারাগারের জেল-জুলুম সহ্য করেও দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেছিলেন যে কুরআন আল্লাহর শাশ্বত কালাম, কোনো সৃষ্টি নয়।
৫. ‘আহলে কুরআন’ নামধারী আধুনিক চক্রের মূল উদ্দেশ্য কী?
তারা কুরআনের নামের আড়ালে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ ও হাদীসকে অস্বীকার করে ইসলামের মূল বিধিবিধানকে বিকৃত করার গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।
৬. ফাজিল ৩য় বর্ষের পরীক্ষার জন্য আকায়েদ ও ফেরকা বিষয়ক প্রস্তুতি কীভাবে নেওয়া উচিত?
প্রতিটি ফেরকার প্রতিষ্ঠাতা, আবির্ভাবের পটভূমি, মৌলিক ভ্রান্ত বিশ্বাস এবং তার বিপরীতে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের দলিলভিত্তিক সঠিক আকিদা ছক আকারে মুখস্থ করা জরুরি।