জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

আল-ইত্তিজাহাতুল ফিকরিয়্যাহ আল-মুআসিরাহ (Al-Ittijahat al-Fikriyyah al-Muasirah) – 203803, দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ – ফাজিল অনার্স ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা ২০২২

Abswer.com Abswer.com
20 September, 2026
৭৪ মিনিট পড়ার সময়
১৪ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

اختبار السنة الرابعة للفاضل البكالوريوس (الشرف) ، لعام ۲۰۲۲
[ফাজিল স্নাতক (সম্মান) চতুর্থ বর্ষ পরীক্ষা, ২০২২]
الدعوة والدراسات الإسلامية
[দা’ওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
الاتجاهات الفكرية المعاصرة
[আল-ইত্তিজাহাতুল ফিকরিয়্যাহ আল-মুআসিরাহ]
বিষয় কোড: ২০৩৮০৩ | পরীক্ষা কোড: ২০৪ | প্রশ্নপত্র কোড: ১৩১
সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০


مجموعة (الف) – ক-বিভাগ (রচনামূলক প্রশ্নাবলি)

١- ما معنى العلمانية؟ بين نشأتها وتطورها وأثارها-

[১. ধর্মনিরপেক্ষতা কী? এর উৎপত্তি ক্রমবিকাশ এবং প্রভাব বর্ণনা কর।]

ভূমিকা

বর্তমান বিশ্বে রাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি ও সমাজচিন্তায় সবচেয়ে বহুল আলোচিত ও প্রভাবশালী মতবাদগুলোর অন্যতম হলো ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ বা ‘আল-ইলমানিয়্যাহ’ (العلمانية)। এটি মানবজীবন থেকে ধর্মের কর্তৃত্ব খর্ব করে ইহজাগতিক স্বার্থ ও যুক্তিকে প্রাধান্য দেওয়ার এক বস্তুবাদী মতাদর্শ।

العلمانية (ধর্মনিরপেক্ষতা)-এর অর্থ ও পরিচয়

শাব্দিক অর্থ: ইংরেজি ‘Secularism’ শব্দের আরবি প্রতিশব্দ হলো ‘আল-ইলমানিয়্যাহ’ (العلمانية) বা ‘আদ-দুনইয়াবিয়্যাহ’ (الدنيوية)। ল্যাটিন শব্দ ‘Saeculum’ থেকে এর উৎপত্তি, যার অর্থ যুগ, সমকালীন সময় বা ইহজাগতিক পার্থিব জীবন। বাংলায় একে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ বা ‘ইহজাগতিকতাবাদ’ বলা হয়।

পারিভাষিক সংজ্ঞা: এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার মতে, সেক্যুলারিজম হলো এমন এক দার্শনিক ও রাজনৈতিক মতবাদ যা মানবজীবনের নৈতিকতা, শিক্ষা, আইন ও রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডকে ধর্ম বা ঐশী বিধানের প্রভাব ও কর্তৃত্ব থেকে সম্পূর্ণ পৃথক রাখার দাবি জানায়। অর্থাৎ রাষ্ট্র পরিচালনা, বিচারব্যবস্থা ও সামাজিক বিধানে ধর্মের কোনো ভূমিকা থাকবে না।

ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ (نشأتها وتطورها)

  1. মধ্যযুগীয় ইউরোপের প্রেক্ষাপট: মধ্যযুগে ইউরোপে রোমান ক্যাথলিক চার্চ এবং ধর্মযাজক পোপদের চরম স্বৈরাচার, নির্যাতন এবং ইনকুইজিশন (ধর্মীয় আদালত)-এর বর্বরতার প্রেক্ষাপটে ধর্মনিরপেক্ষতার বীজ বপন হয়। চার্চ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও যুক্তিবাদকে কঠোর হস্তে দমন করত এবং বিজ্ঞানীদের আগুনে পুড়িয়ে মারত (যেমন: ব্রুনো, গ্যালিলিও)।
  2. রেনেসাঁ ও সংস্কার আন্দোলন (Reformation): ষোড়শ শতাব্দীতে মার্টিন লুথারের নেতৃত্বে প্রটেস্ট্যান্ট আন্দোলনের ফলে চার্চের একচ্ছত্র আধিপত্য ভেঙে পড়ে এবং মানুষ স্বাধীনভাবে চিন্তা করার সুযোগ পায়।
  3. দার্শনিক বিপ্লব ও ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯ খ্রি.): জন লক, ভলতেয়ার, রুশো প্রমুখ পশ্চিমা দার্শনিকের লেখনী মানুষের মন থেকে ধর্মের ভীতি দূর করে। ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লবের মাধ্যমে চার্চের ক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করে ‘সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতা’র স্লোগানে আনুষ্ঠানিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের জন্ম হয়।
  4. মুসলিম বিশ্বে অনুপ্রবেশ: ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির আগ্রাসন, অটোমান খেলাফতের পতন (১৯২৪ খ্রি.) এবং মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বে জোরপূর্বক ধর্মনিরপেক্ষতা চাপিয়ে দেওয়া হয়।

মানবসমাজে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের ক্ষতিকর প্রভাবসমূহ (آثار العلمانية)

  • ধর্মহীনতা ও নাস্তিকতার প্রসার: জীবন থেকে ধর্মকে বিচ্ছিন্ন করার ফলে সমাজে ধর্মহীনতা, সংশয়বাদ ও চরম নাস্তিক্যবাদের উদ্ভব ঘটেছে।
  • নৈতিক অবক্ষয় ও পরিবার ব্যবস্থার ধ্বংস: সমকামিতা, লিভ-টুগেদার, বিবাহবিচ্ছেদ এবং পরকীয়া বৈধতা পেয়ে পরিবারিক কাঠামো ধ্বংসের মুখে পড়েছে।
  • আইনের সার্বভৌমত্বে আল্লাহর অধিকার অস্বীকার: আল্লাহর হালাল-হারাম বিধানকে উপেক্ষা করে মানুষের ইচ্ছামাফিক আইন রচনার ফলে পুঁজিবাদী শোষণ ও জুলুম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
  • মুসলিম উম্মাহর মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব: অনেক মুসলিম সমাজে সেক্যুলার শিক্ষা ব্যবস্থার কারণে তরুণ প্রজন্ম দ্বীনের মূল শিক্ষা থেকে দূরে সরে গিয়ে হীনমন্যতায় ভুগছে।

উপসংহার

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান (نظام شامل للزندگی)। ইসলামে রাজনীতি, অর্থনীতি ও রাষ্ট্র ধর্মীয় বিধানের সাথে অবিচ্ছেদ্য। তাই ইউরোপের চার্চের প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠা ধর্মনিরপেক্ষতা কখনোই ইসলামের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে না।


٢- ما المراد بالغزو الفكرى؟ ثم بين وسائله وأهدافه فى العصر الحديث-

[২. الغزو الفكرى দ্বারা উদ্দেশ্য কী? আধুনিক যুগে এর মাধ্যম ও উদ্দেশ্য বর্ণনা কর।]

ভূমিকা

আধুনিক যুগে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহকে পরাভূত করার জন্য শত্রুরা কেবল ভৌগোলিক বা সামরিক যুদ্ধের ওপর নির্ভর করছে না; বরং তারা এক অতীব ভয়াবহ অদৃশ্য ও নীরব যুদ্ধের পথ বেছে নিয়েছে, যার নাম ‘আল-গাযবুল ফিকরী’ (الغزو الفكري) বা সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসন।

الغزو الفكرى (সাংস্কৃতিক আগ্রাসন)-এর অর্থ ও মর্মার্থ

অর্থ: ‘গাযব’ (غزو) অর্থ আক্রমণ বা আগ্রাসন, আর ‘ফিকর’ (فكر) অর্থ চিন্তা, আদর্শ বা মতাদর্শ।

পারিভাষিক অর্থ: সামরিক অস্ত্র ও রক্তপাত ছাড়াই কোনো জাতির আকিদা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, মূল্যবোধ ও নৈতিকতাকে ধ্বংস করে নিজেদের কুফরি ও সেক্যুলার মতাদর্শ তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুপরিকল্পিত দীর্ঘমেয়াদী ষড়যন্ত্রমূলক কার্যক্রমকে ‘আল-গাযবুল ফিকরী’ বলা হয়। এটি মূলত মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ (Psychological Warfare), যার মাধ্যমে মানুষের মস্তিষ্ক জয় করা হয়।

আধুনিক যুগে বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের মাধ্যমসমূহ (وسائل الغزو الفكري)

  1. মিডিয়া ও বিনোদন শিল্প: হলিউড, বলিউড, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, নাটক, সিনেমা ও সঙ্গীতের মাধ্যমে অবাধ যৌনাচার, নগ্নতা, বস্তুবাদ এবং ইসলামবিদ্বেষী বার্তা মুসলিম সমাজে সুকৌশলে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
  2. ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা ব্যবস্থা: পশ্চিমা কারিকুলাম ও শিক্ষানীতি অনুসরণের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে নিজস্ব ইতিহাস, কুরআন ও সুন্নাহর গৌরবময় উত্তরাধিকার থেকে বিচ্ছিন্ন করে বস্তুবাদী ভাবধারায় গড়ে তোলা হচ্ছে।
  3. ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়া: ফেসবুক, টিকটক, ইউটিউব ইত্যাদিতে অশালীন কন্টেন্ট ও সন্দেহবাদী ট্রল ছড়িয়ে যুবসমাজের ঈমান ও সময় নষ্ট করা হচ্ছে।
  4. এনজিও ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা: নারী অধিকার, সমকামিতা ও ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে ইসলামি পারিবারিক আইন ও হিজাবের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
  5. প্রাচ্যতত্ত্ববিদ (ওরিয়েন্টালিস্ট)-দের বিষাক্ত গবেষণা: হাদিস শাস্ত্র, সীরাতে রাসূল ও কুরআনের সংকলন নিয়ে মিথ্যা সংশয় সৃষ্টি করে মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের বিভ্রান্ত করা।

বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য (أهدافه في العصر الحديث)

  • মুসলিমদের আকিদা ও আত্মবিশ্বাস ধ্বংস করা: মুসলিমদের মনে এই ধারণা তৈরি করা যে ইসলাম বর্তমান আধুনিক যুগে অপ্রাসঙ্গিক ও পশ্চাৎপদ।
  • পশ্চিমা সভ্যতার অন্ধ অনুকরণে বাধ্য করা: মুসলিম তরুণদের চালচলন, পোশাক, ভাষা ও জীবনধারায় পশ্চিমাদের মানসিক দাসে পরিণত করা।
  • উম্মাহর ঐক্য ও খেলাফতের পুনরুত্থান ঠেকানো: জাতীয়তাবাদ ও ক্ষুদ্র সংকীর্ণতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে মুসলিমদের বিভক্ত রাখা যাতে তারা বৈশ্বিক পরাশক্তি হতে না পারে।
  • জিহাদ ও শাহাদাতের চেতনাকে মুছে ফেলা: অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর ঈমানী চেতনাকে স্তিমিত করে কাপুরুষ ও ভোগবাদী জাতিতে রূপান্তর করা।

উপসংহার

সামরিক আগ্রাসনে ভূখণ্ড হারায়, কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনে ঈমান ও ঐতিহ্য হারিয়ে যায়। তাই মুসলিম উম্মাহর বুদ্ধিজীবী ও দায়ীদের কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক বিকল্প ইসলামি সংস্কৃতি ও মানসম্মত মিডিয়া গড়ে তুলে এই আগ্রাসন প্রতিহত করতে হবে।


٣- ما الاستعمار؟ وما أنواعه؟ بين أهدافه الاقتصادية والثقافية والدينية مفصلا-

[৩. সাম্রাজ্যবাদ কী? এর প্রকারগুলো কী? সাম্রাজ্যবাদের অর্থনৈতিক সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বিস্তারিতভাবে বর্ণনা কর।]

ভূমিকা

বিগত কয়েক শতাব্দী ধরে এশিয়া, আফ্রিকা ও মুসলিম দেশসমূহের ওপর পশ্চিমা ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রসমূহ যে আধিপত্য, শোষণ ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেছিল, তা ইতিহাসে ‘সাম্রাজ্যবাদ’ বা ‘আল-ইসতিমার’ (الاستعمار) নামে পরিচিত। আপাতদৃষ্টিতে দেশ গঠন বা সভ্য করার দাবি করলেও এর আসল চরিত্র ছিল ভয়াবহ শোষণমূলক।

الاستعمار (সাম্রাজ্যবাদ / উপনিবেশবাদ)-এর পরিচয়

শাব্দিক অর্থ: আরবি ‘ইসতিমার’ শব্দটি ‘আমারা’ (عمر) ধাতু থেকে এসেছে, যার বাহ্যিক অর্থ আবাদ করা, সংস্কার করা বা পুনর্গঠন করা। কিন্তু ইউরোপীয় শক্তিগুলো তাদের আগ্রাসনকে আড়াল করতে এই পরিভাষা ব্যবহার করেছিল।

পারিভাষিক অর্থ: এক বা একাধিক শক্তিশালী পরাশক্তি কর্তৃক স্বীয় স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে অপেক্ষাকৃত দুর্বল জাতি বা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব হরণ করে তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যবস্থার ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ আরোপ করাকে ‘সাম্রাজ্যবাদ’ বা ‘উপনিবেশবাদ’ বলা হয়।

সাম্রাজ্যবাদের প্রকারভেদ (أنواع الاستعمار)

  1. প্রত্যক্ষ বা সামরিক সাম্রাজ্যবাদ (الاستعمار العسكري المباشر): যেখানে সরাসরি সেনাবাহিনী প্রেরণ করে অন্য দেশ দখল করা হয় এবং বিদেশি গভর্নর দ্বারা শাসনকার্য পরিচালিত হয় (যেমন: ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসন, আলজেরিয়ায় ফরাসি শাসন)।
  2. পরোক্ষ বা নব্য সাম্রাজ্যবাদ (الاستعمار الحديث / غير المباشر): ভৌগোলিক শাসন প্রত্যাহার করলেও দেশীয় পুতুল সরকার, অর্থনৈতিক ঋণ (IMF, World Bank), অস্ত্র ব্যবসা ও ভূ-রাজনীতির মাধ্যমে একটি দেশের সার্বভৌমত্ব নিয়ন্ত্রণ করা।
  3. অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ (الاستعمار الاقتصادي): বহুজাতিক কোম্পানি ও অবাধ পুঁজিবাদের মাধ্যমে কোনো দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ ও বাজার দখল করা।
  4. সাংস্কৃতিক ও তথ্য সাম্রাজ্যবাদ (الاستعمار الثقافي والإعلامي): নিজেদের ভাষা, পোশাক ও বিনোদন ব্যবস্থা চাপিয়ে দিয়ে অন্য জাতির সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা মুছে ফেলা।

সাম্রাজ্যবাদের প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য (أهداف الاستعمار)

সাম্রাজ্যবাদীদের লক্ষ্যকে প্রধানত তিনটি স্তরে ভাগ করা যায়:

১. অর্থনৈতিক লক্ষ্য (الأهداف الاقتصادية):

  • উপনিবেশভুক্ত দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ (তেল, গ্যাস, স্বর্ণ, তুলা, খনিজ পদার্থ) লুট করে নিজ দেশে পাচার করা।
  • দেশীয় কুটির শিল্প ও কৃষি ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে নিজেদের কারখানায় উৎপাদিত পণ্যের জন্য একচেটিয়া বাজার সৃষ্টি করা।
  • সস্তা শ্রম ও চড়া সুদের জালে আবদ্ধ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে চিরস্থায়ী ঋণী করে রাখা।

২. সাংস্কৃতিক লক্ষ্য (الأهداف الثقافية):

  • স্থানীয় সমৃদ্ধ ভাষা ও ইসলামি সাহিত্য ধ্বংস করে ইংরেজি, ফরাসি ইত্যাদি ঔপনিবেশিক ভাষা চাপিয়ে দেওয়া।
  • দেশীয় বুদ্ধিজীবী ও আমলাদের মাঝে নিজেদের সংস্কৃতির প্রতি অন্ধ মোহ তৈরি করা (লর্ড মেকলের শিক্ষানীতি: “রক্তে-বর্ণে ভারতীয়, কিন্তু রুচি ও চিন্তায় ইংরেজ”)।
  • অনুকরণপ্রিয় ও হীনমন্য একশ্রেণির সেক্যুলার নেতৃত্ব তৈরি করা।

৩. ধর্মীয় লক্ষ্য (الأهداف الدينية):

  • খ্রিস্টান মিশনারিদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে দরিদ্র ও অসহায় মুসলিম এবং অমুসলিমদের খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত করা।
  • ইসলামের মৌলিক বিধান, জিহাদ ও হিজাবকে বিকৃত করে উপস্থাপন করা এবং ইসলামি শরীয়াহ আইন বাতিল করে সেক্যুলার আইন প্রতিস্থাপন করা।
  • শিয়া-সুন্নি ও গোত্রীয় বিভাজন তৈরি করে উম্মাহর ঐক্যে ফাটল ধরানো (Divide and Rule নীতি)।

উপসংহার

সাম্রাজ্যবাদীদের প্রত্যক্ষ শাসন শেষ হলেও নব্য-সাম্রাজ্যবাদের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহ আজও পরাধীনতার শৃঙ্খলে বন্দি। সার্বিক অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা ও পূর্ণাঙ্গ কুরআন-সুন্নাহর অনুসারী রাষ্ট্রব্যবস্থাই এই শৃঙ্খল ভাঙার একমাত্র পথ।


٤- ما المراد باالصهيونية؟ بين أعمالها ضد الاسلام والمسلمين-

[৪. জায়নবাদ দ্বারা উদ্দেশ্য কী? ইসলাম এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাদের কার্যাবলি আলোচনা কর।]

ভূমিকা

বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের রক্তক্ষয়ী সংকটের কেন্দ্রবিন্দু হলো ‘জায়নবাদ’ বা ‘আস-সুহইউনিয়্যাহ’ (الصهيونية)। এটি একটি উগ্র, বর্ণবাদী ও ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক ইহুদি আন্দোলন, যার প্রত্যক্ষ বলি হয়েছে ফিলিস্তিনের নিরীহ মুসলিম ও খ্রিস্টান জনগোষ্ঠী।

الصهيونية (জায়নবাদ)-এর পরিচয় ও উৎপত্তি

উৎপত্তি ও শাব্দিক অর্থ: জেরুজালেমের (আল-কুদস) দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত ‘জায়ন পাহাড়’ (Mount Zion)-এর নামানুসারে এই আন্দোলনের নামকরণ হয়েছে। ইহুদিরা বিশ্বাস করে, এটি তাদের প্রতিশ্রুত পুণ্যভূমি।

পারিভাষিক অর্থ: উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে (১৮৯৭ সালে সুইজারল্যান্ডের ব্যাসেলে থিওডোর হার্জেলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ১ম জায়নবাদী কংগ্রেসে) প্রতিষ্ঠিত একটি চরমপন্থী রাজনৈতিক ইহুদি আন্দোলন, যার মূল লক্ষ্য ছিল বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ইহুদিদের ফিলিস্তিনের মাটিতে পুনর্বাসিত করে একটি বর্ণবাদী রাষ্ট্র (ইসরায়েল) কায়েম করা এবং কথিত ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ প্রতিষ্ঠা করা।

ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে জায়নবাদের ধ্বংসাত্মক কার্যাবলি

  1. পবিত্র ভূমি ফিলিস্তিন জবরদখল ও গণহত্যা: ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ মদদে ফিলিস্তিনের বৈধ অধিবাসীদের বাস্তুচ্যুত করে অবৈধ ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। দিয়ার ইয়াসিন, সাবরা-শাতিলা এবং সাম্প্রতিক গাজা উপত্যকায় হাজার হাজার নারী ও শিশুকে নির্মমভাবে গণহত্যা করা।
  2. মসজিদুল আকসার অবমাননা ও সুড়ঙ্গ খনন: মুসলমানদের প্রথম কিবলা ও তৃতীয় পবিত্রতম স্থান ‘আল-মসজিদুল আকসা’-কে ধ্বংস করে সেখানে কথিত ‘সুলাইমানি মন্দির’ (হেকল সুলাইমান) নির্মাণের উদ্দেশ্যে মসজিদের নিচে ও চারপাশে প্রতিনিয়ত সুড়ঙ্গ খনন করা হচ্ছে। ১৯৬৯ সালে মসজিদে অগ্নিসংযোগসহ নিয়মিত নামাজে বাধা প্রদান করা হচ্ছে।
  3. ফিলিস্তিনিদের ওপর জাতিগত নিধন (Apartheid): ফিলিস্তিনের ভূমিতে অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপন, পৃথক দেয়াল নির্মাণ এবং সমগ্র গাজাকে একটি উন্মুক্ত কারাগারে রূপান্তর করে খাদ্য, ওষুধ ও বিদ্যুৎ বন্ধ করে অমানবিক অবরোধ চাপিয়ে রাখা।
  4. মুসলিম বিশ্বে অস্থিরতা ও বিভাজন সৃষ্টি: মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিশালী মুসলিম দেশগুলোকে (যেমন: ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া) আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ও যুদ্ধের মাধ্যমে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার পেছনে জায়নবাদী লবি (AIPAC) প্রধান ভূমিকা পালন করেছে।
  5. আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ: বিশ্বখ্যাত ব্যাংক, অস্ত্র ব্যবসা এবং গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করে বিশ্ববাসীর কাছে ইসলাম ও প্রতিরোধকারী ফিলিস্তিনিদের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিত্রিত করা এবং ইসরায়েলি বর্বরতাকে বৈধতা দান করা।

উপসংহার

জায়নবাদ কেবল একটি রাজনৈতিক শক্তি নয়, বরং এটি বৈশ্বিক শান্তির জন্য এক মারাত্মক হুমকি। বায়তুল মুকাদ্দাস ও ফিলিস্তিন পুনরুদ্ধার কেবল ফিলিস্তিনিদের একার দায়িত্ব নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের দুইশত কোটি মুসলিমের ঈমানী দায়িত্ব।


٥- ما حركة التنصير؟ بين عوامل اهم الهيئات التنصيرية-

[৫. মিশনারী আন্দোলন কী? গুরুত্বপূর্ণ মিশনারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম সম্পর্কে আলোচনা কর।]

ভূমিকা

বিশ্বজুড়ে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের, বিশেষ করে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত করার জন্য পশ্চিমা দেশগুলো সুসংগঠিত, বিপুল অর্থায়নে পরিচালিত যে দীর্ঘমেয়াদী ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অভিযান পরিচালনা করে আসছে, তাকে ‘আন্দোলনুত তানসীর’ (حركة التنصير) বা খ্রিস্টান মিশনারী আন্দোলন বলা হয়।

حركة التنصير (খ্রিস্টান মিশনারী আন্দোলন)-এর অর্থ ও পরিচয়

অর্থ: ‘তানসীর’ (تنصير) শব্দটি এসেছে ‘নাসরানী’ (نصراني) থেকে, যার অর্থ কাউকে খ্রিস্টান বা নাসারা বানানো। ইংরেজিতে একে ‘Christian Missionary Movement’ বলা হয়।

পারিভাষিক সংজ্ঞা: গির্জা ও পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর সার্বিক পৃষ্ঠপোষকতায় সুপরিকল্পিত শিক্ষা, সেবা, চিকিৎসা ও প্রচারণার মাধ্যমে মুসলিম ও অনুন্নত জাতিসমূহের মাঝে খ্রিস্টধর্মের বিশ্বাস ও ক্রুশের আধিপত্য বিস্তার করার বৈশ্বিক অভিযানকে মিশনারী আন্দোলন বলা হয়। স্যামুয়েল জোয়েমার-এর মতো উগ্র মিশনারিরা স্পষ্ট ঘোষণা করেছিলেন, “আমাদের আসল উদ্দেশ্য কেবল মুসলিমদের খ্রিস্টান বানানো নয়, বরং তাদের অন্তরে থাকা ইসলামের মূল শক্তিকে নিঃশেষ করে দেওয়া।”

মিশনারী সংগঠনগুলোর মূল কার্যপদ্ধতি ও হাতিয়ারসমূহ (عوامل وهيئات التنصير)

মিশনারী সংস্থাগুলো সরাসরি ধর্মপ্রচারের চেয়ে মানবিক সেবার অন্তরালে অত্যন্ত ধূর্ততার সাথে কাজ করে:

  1. চিকিৎসা সেবা ও হাসপাতাল (المستشفيات والخدمات الصحية): অনুন্নত ও দরিদ্র অঞ্চলে আধুনিক দাতব্য হাসপাতাল, ক্লিনিক ও অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস খুলে রোগীদের নিখরচায় চিকিৎসা ও সেবা দেওয়া হয় এবং সেবা চলাকালে খ্রিস্টের কৃপা ও ভালোবাসার বার্তা শুনিয়ে ধর্মান্তরিত হতে উদ্বুদ্ধ করা হয়।
  2. শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয় (المدارس والجامعات): মানসম্মত ইংরেজি মাধ্যম স্কুল, কলেজ ও হোস্টেল প্রতিষ্ঠা করে সমাজের উচ্চবিত্ত ও প্রভাবশালী পরিবারের সন্তানদের খ্রিস্টীয় নৈতিকতা ও সেক্যুলার চিন্তায় দীক্ষিত করা (যেমন: মিশরে আমেরিকান ইউনিভার্সিটি, লেবাননে বৈরুত আমেরিকান ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশে সেন্ট জোসেফ বা নটরডেম কলেজ)।
  3. ত্রাণ, এনজিও ও পুনর্বাসন কর্মসূচি (الإغاثة والمنظمات غير الحكومية): বন্যা, খরা, মহামারী বা যুদ্ধবিধ্বস্ত মুসলিম দেশগুলোতে চাল, ডাল, নগদ অর্থ ও বাড়ি তৈরি করে দেওয়ার বিনিময়ে দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে ধর্মান্তরিত করা। বিশেষ করে আফ্রিকার দেশগুলো ও এশিয়ার দুর্গম পাহাড়ি উপজাতিদের মাঝে এ কার্যক্রম ব্যাপক।
  4. প্রেস, প্রকাশনা ও অনুবাদ কেন্দ্র: বিশ্বজুড়ে প্রতিটি স্থানীয় মাতৃভাষায় সহজ-সরল বাইবেল, শিশুতোষ রঙিন গল্পবই, পত্রিকা ও অডিও-ভিডিও সিডি বিনামূল্যে বিতরণ করা।

গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি আন্তর্জাতিক মিশনারী সংস্থা ও পরিষদ

  • ওয়ার্ল্ড কাউন্সিল অব চার্চেস (World Council of Churches – WCC): বিশ্বের প্রায় সকল প্রোটেস্ট্যান্ট ও অর্থোডক্স চার্চের সমন্বয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক সংস্থা যা মিশনারী কার্যক্রম সমন্বয় করে।
  • সোসাইটি অফ জেসাস (Jesuits – اليسوعيون): ক্যাথলিক চার্চের সবচেয়ে সুসংগঠিত বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচারক দল যারা শিক্ষাক্ষেত্রে সক্রিয়।
  • ওয়ার্ল্ড ভিশন (World Vision): সেবা ও শিশু দত্তক গ্রহণের আড়ালে পরিচালিত অন্যতম বৃহৎ বৈশ্বিক খ্রিস্টান এনজিও।
  • ক্যারিতাস (Caritas Internationalis): ক্যাথলিক চার্চ পরিচালিত আন্তর্জাতিক সাহায্য ও উন্নয়ন সংস্থা।

উপসংহার

মিশনারী আন্দোলন মানবসেবার আবরণে মুসলিমদের ঈমান হরণের এক অদৃশ্য জাল। মুসলিম দেশসমূহের সরকার, ধনকুবের এবং দায়ীদের উচিত বিকল্প ইসলামি দাতব্য ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানো।


٦- ما الفرق بين الهندوسية والشيخية؟ تحدث عقائدهما بالتفصيل-

[৬. হিন্দুধর্ম ও শিখধর্মের মধ্যে পার্থক্য কী? তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসসমূহ বিস্তারিত আলোচনা কর।]

ভূমিকা

ভারতীয় উপমহাদেশে জন্ম নেওয়া দুটি প্রভাবশালী প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ধর্ম হলো হিন্দুধর্ম ও শিখধর্ম। উভয় ধর্মের জন্মভূমি এক হলেও উভয়ের আকিদা, উপাসনা পদ্ধতি, ঈশ্বরতত্ত্ব ও সামাজিক কাঠামোর মধ্যে মৌলিক ও সুদূরপ্রসারী পার্থক্য রয়েছে।

হিন্দুধর্মের মৌলিক বিশ্বাসসমূহ (عقائد الهندوسية)

  • বহুঈশ্বরবাদ ও ত্রিমূর্তি (الشرك وتعدد الآلهة): হিন্দুধর্মে লক্ষ লক্ষ দেব-দেবীর অস্তিত্বে বিশ্বাস করা হয়। এদের মধ্যে প্রধান তিন দেবতা ব্রহ্মা (স্রষ্টা), বিষ্ণু (পালনকর্তা) ও শিব (সংহারকর্তা)-কে ‘ত্রিমূর্তি’ বলা হয়।
  • অবতারবাদ (عقيدة التجسد): ঈশ্বর মানব বা অন্য কোনো রূপ ধারণ করে পৃথিবীতে অবতরণ করেন বলে তারা বিশ্বাস করে (যেমন: রাম, কৃষ্ণ ইত্যাদি অবতার)।
  • মূর্তিপূজা (عبادة الأصنام): দেব-দেবীর পাথরের বা মাটির প্রতিমা তৈরি করে মন্দির ও বাড়িতে ফুল-জল ও ভোগ দিয়ে পূজা-অর্চনা করা।
  • বর্ণপ্রথা বা জাতিভেদ (نظام الطبقات): সমাজ চারটি কঠোর বর্ণে বিভক্ত: ব্রাহ্মণ (সর্বোচ্চ), ক্ষত্রিয় (যোদ্ধা), বৈশ্য (ব্যবসায়ী) এবং শূদ্র (নিম্নবর্ণীয়/অস্পৃশ্য)। জন্মের ভিত্তিতে এই বর্ণ নির্ধারিত হয়।
  • জন্মান্তরবাদ ও কর্মফল (التناسخ والكارما): মৃত্যুর পর আত্মা নতুন শরীরে বারবার জন্ম নেয়। পূর্বজন্মের পাপ-পুণ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী জন্ম নির্ধারিত হয়। মোক্ষ লাভের মাধ্যমে এই পুনর্জন্ম চক্র থেকে মুক্তি মেলে।
  • পবিত্র গ্রন্থ: বেদ, উপনিষদ, রামায়ণ, মহাভারত এবং ভগবদ গীতা।

শিখধর্মের মৌলিক বিশ্বাসসমূহ (عقائد الشيخية)

  • একত্ববাদ (التوحيد الخالص): শিখধর্মের প্রবর্তক গুরু নানক (১৪৬৯-১৫৩৯ খ্রি.) হিন্দুধর্মের মূর্তিপূজা প্রত্যাখ্যান করে ঘোষণা করেন যে ঈশ্বর একজনই, যাঁর কোনো রূপ বা আকার নেই। ঈশ্বরকে ‘ওয়াহেগুরু’ (সত্য নাম) বলা হয়।
  • মূর্তিপূজা ও অবতারবাদের প্রত্যাখ্যান: শিখধর্মে কোনো প্রতিমা, মূর্তি বা অবতারের পূজা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
  • বর্ণপ্রথা বিলোপ ও সমতা: শিখধর্ম কঠোরভাবে জাতিভেদ প্রথা প্রত্যাখ্যান করে। সকল মানুষ সমান এবং তাদের রান্নাঘর ‘লঙ্গর’-এ ধনী-দরিদ্র এক সাথে আহার করে।
  • পবিত্র গ্রন্থ: শিখদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ হলো ‘গুরু গ্রন্থ সাহিব’ (গ্রন্থ সাহেব)। দশম গুরু গোবিন্দ সিং-এর পর কোনো জীবন্ত গুরু থাকবে না, বরং এই গ্রন্থই চিরন্তন গুরু হিসেবে মান্য।
  • পঞ্চ ‘ক’ বা পাঁচ কক্কার (الأمور الخمسة): প্রতিটি দীক্ষিত শিখকে পাঁচটি জিনিস পরিধান করতে হয়: কেশ (না কাটা চুল), কঙ্গন (চিরুনি), কড়া (লোহার বালা), কাচ্ছা (বিশেষ অন্তর্বাস) এবং কিরপান (ক্ষুদ্র তলোয়ার)।

হিন্দুধর্ম ও শিখধর্মের মধ্যকার তুলনামূলক পার্থক্য

তুলনার বিষয় হিন্দুধর্ম (الهندوسية) শিখধর্ম (الشيخية)
ঈশ্বরতত্ত্ব বহুঈশ্বরবাদ, ত্রিমূর্তি ও বহু দেবতার পূজা। কঠোর একত্ববাদ (ওয়াহেগুরু), কোনো অংশীদার নেই।
মূর্তিপূজা মূর্তিপূজা ধর্মের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মূর্তিপূজা ও প্রতিমা পুরোপুরি নিষিদ্ধ।
বর্ণপ্রথা কঠোর চতুর্জাতীয় বর্ণাশ্রম প্রথা বিদ্যমান। বর্ণপ্রথা পুরোপুরি প্রত্যাখ্যাত; সকল মানুষ সমান।
অবতারবাদ ঈশ্বর মানব বা পশুরূপে জন্ম নেন। ঈশ্বর জন্ম-মৃত্যুর ঊর্ধ্বে, কোনো অবতার নেই।
প্রধান ধর্মগ্রন্থ বেদ, গীতা, রামায়ণ, মহাভারত। শ্রী গুরু গ্রন্থ সাহিব।

উপসংহার

দেখা যায়, শিখধর্ম মূলত মধ্যযুগে ইসলামি তাওহিদ ও সাম্যবাদী চিন্তার প্রভাবে হিন্দুধর্মের কুসংস্কার ও বর্ণবাদের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদী প্রতিক্রিয়া হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল।


٧- عرف مقارنة الأديان ثم بيّن أهمية دراستها للدعاة-

[৭. তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের সংজ্ঞা দাও। অতঃপর দাঈদের জন্য তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব পাঠের গুরুত্ব বর্ণনা কর।]

ভূমিকা

ইসলামি দাওয়াতকে ফলপ্রসূ ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে বিজয়ী করতে হলে কেবল নিজের ধর্ম জানাই যথেষ্ট নয়, বরং প্রতিপক্ষের ধর্মবিশ্বাস, যুক্তি ও বিভ্রান্তি সম্পর্কেও সম্যক জ্ঞান থাকা অপরিহার্য। এই মহৎ উদ্দেশ্য সাধনে ‘ইলমু মুকারানাতিল আদইয়ান’ (علم مقارنة الأديان) বা তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব এক অপরিহার্য শাস্ত্র।

مقارنة الأديان (তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব)-এর পরিচয়

শাব্দিক অর্থ: ‘মুকারানাহ’ (مقارنة) অর্থ তুলনা করা, সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য নিরূপণ করা। আর ‘আদইয়ান’ (أديان) হলো ‘দ্বীন’ (دين)-এর বহুবচন, যার অর্থ ধর্মসমূহ।

পারিভাষিক সংজ্ঞা: এটি এমন একটি বিজ্ঞান যা বিশ্বের প্রধান প্রধান ধর্মের (যেমন: ইসলাম, খ্রিস্টধর্ম, ইহুদিধর্ম, হিন্দুধর্ম, বৌদ্ধধর্ম ইত্যাদি) আকিদা, আচার-অনুষ্ঠান, ইতিহাস ও ধর্মগ্রন্থসমূহকে নিরপেক্ষভাবে পাশাপাশি রেখে যৌক্তিক বিশ্লেষণ, তুলনামূলক পর্যালোচনা এবং সত্য-মিথ্যার মানদণ্ডে তাদের স্বরূপ উন্মোচন করে। ইতিহাসে মুসলিম মনীষীগণই (যেমন: আবু রায়হান আল-বিরুনী, ইবনে হাযম আন্দালুসী, শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী) তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।

দায়ীদের জন্য তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব পাঠের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা

  1. মাদঊর মনস্তত্ত্ব ও বিশ্বাস উপলব্ধি করা: একজন দায়ী যখন কোনো অমুসলিমকে দাওয়াত দেবেন, তখন সেই অমুসলিমের ধর্মের আকিদা ও ত্রুটিগুলো না জানলে ফলপ্রসূ বিতর্ক বা আলোচনা করা সম্ভব নয়। হযরত মুয়ায (রা.)-কে ইয়েমেনে পাঠানোর সময় নবীজী (স.) প্রথমেই জানিয়ে দিয়েছিলেন, “তুমি আহলে কিতাবদের কাছে যাচ্ছ।”
  2. কুরআনী মানহাজের অনুগমন: পবিত্র কুরআনে বহু স্থানে ইহুদি, খ্রিস্টান ও পৌত্তলিকদের ভ্রান্ত আকিদার চুলচেরা বিশ্লেষণ করে যুক্তি খণ্ডন করা হয়েছে। যেমন খ্রিস্টানদের ত্রিত্ববাদ খণ্ডনে সূরা আল-ইখলাস ও সূরা আল-মায়িদার উক্তি। তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব পাঠ দায়ীকে সেই কুরআনী প্রজ্ঞায় সমৃদ্ধ করে।
  3. প্রতিপক্ষের গ্রন্থ থেকে ইসলামের সত্যতা প্রমাণ: বাইবেল, বেদ বা অন্যান্য ধর্মগ্রন্থে মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আগমন সম্পর্কে যে সকল অকাট্য ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে, তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব জানার মাধ্যমে অমুসলিমদের কাছে তাদের নিজ ধর্মগ্রন্থ থেকেই তা তুলে ধরা সম্ভব (যেমনটি আধুনিক যুগে ড. জাকির নায়েক বা মাওলানা রাহমাতুল্লাহ কিরানবী সফলভাবে করেছেন)।
  4. সন্দেহ ও অভিযোগের দাঁতভাঙা জবাব দান: ওরিয়েন্টালিস্ট ও খ্রিস্টান মিশনারিরা ইসলামের জিহাদ, বহুবিবাহ, পর্দা ইত্যাদির বিরুদ্ধে যেসব অমূলক অপপ্রচার চালায়, তাদের নিজ নিজ ধর্মগ্রন্থে এর চেয়েও কঠোর বিধান দেখিয়ে তাদের অযৌক্তিকতা প্রমাণ করা যায়।
  5. নিজ ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব ও সৌন্দর্যের গভীর উপলব্ধি: অন্যান্য ধর্মের অযৌক্তিকতা, বৈষম্য ও কুসংস্কারগুলো যখন একজন দায়ী পর্যালোচনা করেন, তখন ইসলামের নিখুঁত তাওহিদ ও সার্বজনীন সৌন্দর্যের প্রতি তাঁর নিজের ঈমান শতগুণে দৃঢ় হয়।

উপসংহার

বর্তমান বৈশ্বিক মাল্টিকালচারাল বিশ্বে অমুসলিমদের কাছে ইসলামের শাশ্বত পয়গাম পৌঁছে দেওয়ার জন্য তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব পাঠ একজন দক্ষ দায়ীর জন্য কেবল ঐচ্ছিক কোনো বিদ্যা নয়, বরং এক আবশ্যকীয় সমরাস্ত্র।


٨- ما الرأسمالية؟ وما حكمها؟ ثم بيّن الفرق بينها وبين نظام الإسلام في ضوء القرآن والسنة-

[৮. পুঁজিবাদ কী? এর হুকুম কী? কুরআন সুন্নাহর আলোকে পুঁজিবাদ ও ইসলামি ব্যবস্থার মধ্যকার পার্থক্য তুলে ধর।]

ভূমিকা

বর্তমান বিশ্বের অর্থনীতি মূলত পশ্চিমা ‘পুঁজিবাদ’ বা ক্যাপিটালিজম (الرأسمالية)-এর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তবে অবাধ ব্যক্তি স্বাধীনতা ও সুদের ওপর প্রতিষ্ঠিত এই ব্যবস্থা একদিকে যেমন ধনিক শ্রেণিকে আরও ধনী করছে, তেমনি সিংহভাগ সাধারণ মানুষকে দারিদ্র্য ও শোষণের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ইসলাম এর বিপরীতে এক ইনসাফপূর্ণ অর্থনীতি উপহার দিয়েছে।

الرأسمالية (পুঁজিবাদ)-এর পরিচয় ও সংজ্ঞা

শাব্দিক অর্থ: ‘রা’সুল মাল’ (رأس المال) অর্থ পুঁজি বা মূলধন। অর্থাৎ পুঁজিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত ব্যবস্থা।

পারিভাষিক সংজ্ঞা: যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় উৎপাদনের উপাদানসমূহ (ভূমি, শ্রম, মূলধন, সংগঠন) সম্পূর্ণ ব্যক্তিমালিকানায় থাকে, বাজার উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা ও মূল্যের স্বয়ংক্রিয় নীতির ওপর পরিচালিত হয়, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ থাকে নগণ্য এবং যেখানে মুনাফা অর্জনই প্রধান চালিকাশক্তি, তাকে পুঁজিবাদ বলা হয়। অ্যাডাম স্মিথকে এর জনক বলা হয়।

পুঁজিবাদের শরয়ী হুকুম (حكم الرأسمالية في الإسلام)

ইসলামের দৃষ্টিতে প্রচলিত পুঁজিবাদী ব্যবস্থা তার সামগ্রিক কাঠামোতে বাতিল ও হারাম। কারণ পুঁজিবাদ সুদের (রিসার্চ ও ব্যাংকিং রিবা) ওপর প্রতিষ্ঠিত, যা কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আল্লাহ বলেন:
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا — “আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।” (সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)। এছাড়া এতে অবাধ ব্যক্তিমালিকানার নামে মজুদদারি, কালোবাজারি ও শ্রমিক শোষণকে বৈধতা দেওয়া হয়। তবে ব্যক্তির হালাল পথে উপার্জনের অধিকার ইসলামে স্বীকৃত।

কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে পুঁজিবাদ ও ইসলামি অর্থনীতির তুলনামূলক পার্থক্য

  1. মালিকানার প্রকৃতি (طبيعة الملكية):
    • পুঁজিবাদ: মানুষই সম্পদের নিরঙ্কুশ ও চূড়ান্ত মালিক। সে যেভাবে ইচ্ছা অপচয় বা বিনিয়োগ করতে পারে।
    • ইসলাম: বিশ্বজগতের সমস্ত সম্পদের প্রকৃত মালিক একমাত্র আল্লাহ তাআলা। মানুষ কেবল একজন আমানতদার (ট্রাস্টি)। আল্লাহ বলেন:
      لِّلَّهِ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ — “আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই আল্লাহর।” (সূরা আল-বাকারা: ২৮৪)।
  2. সুদ বনাম যাকাত (الربا مقابل الزكاة):
    • পুঁজিবাদ: সুদের ওপর প্রতিষ্ঠিত। সুদের কারণে গরিবের রক্ত চুষে ধনীদের হাতে পুঁজি পুঞ্জীভূত হয়।
    • ইসলাম: সুদ সম্পূর্ণ হারাম এবং ধনীদের সম্পদে গরিবের জন্য ‘যাকাত’ বাধ্যতামূলক। আল্লাহ বলেন:
      كَيْ لَا يَكُونَ دُولَةً بَيْنَ الْأَغْنِيَاءِ مِنكُمْ — “যাতে ধনসম্পদ কেবল তোমাদের ধনীদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়।” (সূরা আল-হাশর: ৭)।
  3. উপার্জনের বৈধতা ও নৈতিকতা (الحلال والحرام):
    • পুঁজিবাদ: যে কোনো উপায়ে মুনাফা অর্জিত হলেই তা বৈধ (যেমন: মদ, জুয়া, পর্নোগ্রাফি, অস্ত্র বাণিজ্য)।
    • ইসলাম: কেবল হালাল পথে ব্যবসা বৈধ। ধোঁকা, জুয়া, কালোবাজারি ও মানববিধ্বংসী ব্যবসা সম্পূর্ণ হারাম।
  4. শ্রমিকের অধিকার ও সামাজিক নিরাপত্তা (حقوق العمال والتكافل الاجتماعي):
    • পুঁজিবাদ: শ্রমিককে শোষণ করে মালিক সর্বোচ্চ লাভ পকেটস্থ করে। সামাজিক দায়বদ্ধতা ঐচ্ছিক।
    • ইসলাম: রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন:
      أَعْطُوا الأَجِيرَ أَجْرَهُ قَبْلَ أَنْ يَجِفَّ عَرَقُهُ — “শ্রমিকের ঘাম শুকানোর পূর্বেই তার পারিশ্রমিক পরিশোধ করে দাও।” (সুনানে ইবনে মাজাহ)। অভাবীদের জন্য বায়তুলমাল ও সমাজকল্যাণমূলক সাহায্য নিশ্চিত।

উপসংহার

পুঁজিবাদ মানবতাকে শোষণের নিগড়ে আবদ্ধ করেছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকট থেকে মুক্তির একমাত্র মহৌষধ হলো সুদমুক্ত ও যাকাতভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বাস্তবায়ন।


مجموعة (ب) – খ-বিভাগ (সংক্ষিপ্ত উত্তরীয় প্রশ্নাবলি)

٩- ما معنى القومية؟ بين موقف الإسلام من القومية-

[৯. জাতীয়তাবাদ বলতে কী বুঝ? এ ব্যাপারে ইসলামের অবস্থান বর্ণনা কর।]

উত্তর

জাতীয়তাবাদ (القومية)-এর অর্থ: কোনো সুনির্দিষ্ট ভাষা, বংশ, অঞ্চল বা ভৌগোলিক সীমানাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা অন্ধ ঐক্য ও শ্রেষ্ঠত্ববোধকে ‘জাতীয়তাবাদ’ বলা হয়, যা অন্য জাতি বা গোষ্ঠীর প্রতি বিদ্বেষ ছড়ায়।

ইসলামের অবস্থান: অন্ধ ও সংকীর্ণ বংশীয় বা ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদকে ইসলাম কঠোরভাবে হারাম ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। একে অজ্ঞতার যুগের জাহিলিয়্যাত (العصبية الجاهلية) বলা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন:
لَيْسَ مِنَّا مَنْ دَعَا إِلَى عَصَبِيَّةٍ — “যে ব্যক্তি আসাবিয়্যাত বা অন্ধ জাতীয়তাবাদের দিকে ডাকে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।” (সুনানে আবু দাউদ)। বিদায় হজের ভাষণে তিনি বলেন: “কোনো আরবের ওপর অনারবের এবং অনারবের ওপর আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই; শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মানদণ্ড হলো তাকওয়া।” তবে নিজ জন্মভূমিকে ভালোবাসা স্বাভাবিক মানবিক গুণ, কিন্তু তা যেন দ্বীনি ভ্রাতৃত্বের ওপর প্রধান না হয়।


١٠- ما معنى الديمقراطية؟ بين موقف الإسلام من الديمقراطية-

[১০. গণতন্ত্র কী? গণতন্ত্র সম্পর্কে ইসলামের অবস্থান বর্ণনা কর।]

উত্তর

গণতন্ত্র (الديمقراطية)-এর অর্থ: এটি গ্রিক শব্দ ‘Demos’ (জনগণ) এবং ‘Kratos’ (শাসন) থেকে উদ্ভূত। অর্থাৎ “জনগণের শাসন, জনগণের দ্বারা ও জনগণের জন্য” (Democracy is the government of the people, by the people, for the people)। এতে সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক ধরা হয় জনগণকে এবং তাদের নির্বাচিত পার্লামেন্ট যে কোনো আইন পাস বা বাতিল করার চূড়ান্ত অধিকারী।

ইসলামের অবস্থান: পাশ্চাত্য গণতন্ত্রের দার্শনিক ভিত্তি—অর্থাৎ মানুষের নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্ব—ইসলামের মৌলিক আকিদার পরিপন্থী। ইসলামে সার্বভৌম ক্ষমতার একমাত্র মালিক মহান আল্লাহ:
إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ — “আইন প্রণয়নের সার্বভৌম কর্তৃত্ব একমাত্র আল্লাহর।” (সূরা ইউসুফ: ৪০)। তবে গণতন্ত্রের যেসব প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও ভালো দিক রয়েছে (যেমন: স্বৈরাচার পরিহার, জনগণের পরামর্শ বা শূরা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং জবাবদিহিতা)—তা পুরোপুরি ইসলামের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ইসলাম একে ‘শূরাভিত্তিক শাসনব্যবস্থা’ (نظام الشورى) বলে।


١١- عرف بالروتارى ثم بين أهدافه-

[১১. রোটারী ক্লাব এর পরিচয় দাও। এর লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বর্ণনা কর।]

উত্তর

রোটারী ক্লাব (الروتاري): ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে আমেরিকার শিকাগোতে পল হ্যারিস নামক এক ইহুদি বংশোদ্ভূত আইনজীবীর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক সেবাধর্মী ক্লাব। আপাতদৃষ্টিতে এটি মানবসেবামূলক প্রতিষ্ঠান হলেও এটি মূলত ফ্রি-ম্যাসনরি (Freemasonry) ও আন্তর্জাতিক জায়নবাদী আন্দোলনের একটি গোপন সহযোগী শাখা হিসেবে কাজ করে।

এর প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য:

  • সমাজের প্রভাবশালী বুদ্ধিজীবী, ব্যবসায়ী, আমলা ও যুবনেতাদের ক্লাবের সদস্য করে তাদের আনুগত্য অর্জন করা।
  • ধর্মহীনতা ও সার্বজনীন মানবিক ভ্রাতৃত্বের নামে ধর্মীয় চেতনা ও উম্মাহর স্বকীয়তা দূর করা।
  • আন্তর্জাতিক জায়নবাদী নীতির পক্ষে বিশ্বব্যাপী নীরব জনমত ও সুবিধাভোগী বলয় তৈরি করা।

١٢- تحدث عن الكنفوشية وعقائدها-

[১২. কনফুশিয়া ও এর বিশ্বাস সম্পর্কে আলোচনা কর।]

উত্তর

কনফুশীয়বাদ (الكنفوشية): চীনের প্রাচীন দার্শনিক কনফুসিয়াস (খ্রিষ্টপূর্ব ৫৫১-৪৭৯ অব্দ) কর্তৃক প্রচারিত একটি সামাজিক, নৈতিক ও দার্শনিক মতবাদ, যা পরবর্তীকালে ধর্মের রূপ ধারণ করে।

এর মৌলিক বিশ্বাস ও দর্শন:

  • এতে সুনির্দিষ্ট কোনো স্রষ্টা বা পরকালের পুঙ্খানুপুঙ্খ ধারণা নেই; বরং পার্থিব জীবনে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আনুগত্য ও নৈতিকতাকে ধর্মীয় কর্তব্য মনে করা হয়।
  • পিতৃপুরুষের পূজা (عبادة الأسلاف): পূর্বপুরুষদের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন এবং তাদের নামে খাদ্য ও নৈবেদ্য নিবেদন করা।
  • স্বর্গের আদেশ (Tian): মহাজাগতিক শক্তি বা প্রকৃতির নিয়মের প্রতি অনুগত থেকে জীবন পরিচালনা করা।
  • সামাজিক পঞ্চ-সম্পর্ক (Five Constant Relationships): শাসক-প্রজা, পিতা-পুত্র, স্বামী-স্ত্রী, বড় ভাই-ছোট ভাই এবং বন্ধু-বন্ধুর মধ্যকার নিখুঁত আনুগত্য বজায় রাখা।

١٣- ما المراد بالتغريب والاستغراب؟ بين-

[১৩. التغريب ও الاستغراب দ্বারা উদ্দেশ্য কী? বর্ণনা কর।]

উত্তর

১. আত-তাগসীব বা ওয়েস্টার্নাইজেশন (التغريب): কোনো প্রাচ্য বা মুসলিম সমাজকে পশ্চিমা সংস্কৃতি, জীবনদর্শন, পোশাক, নৈতিকতা ও রাজনীতির ছাঁচে ফেলে সম্পূর্ণ পাশ্চাত্যের অনুগামী করে গড়ে তোলার প্রক্রিয়াকে ‘তাগসীব’ বা পাশ্চাত্যকরণ বলা হয়। এর ফলে মুসলিমরা স্বীয় ঐতিহ্য ভুলে গিয়ে পশ্চিমাদের অন্ধ অনুকরণ করে।

২. আল-ইসতিগরাব বা অক্সিডেন্টালিজম (الاستغراب): প্রাচ্যবিদ বা ওরিয়েন্টালিজম (الاستشراق)-এর বিপরীতে গড়ে ওঠা এক একাডেমিক শাস্ত্র, যেখানে মুসলিম বা প্রাচ্যের পণ্ডিতগণ পশ্চিমা সভ্যতার ইতিহাস, সংস্কৃতি, দর্শন ও সমাজবিজ্ঞানকে নিজস্ব মূল্যবোধ ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে গভীর অধ্যয়ন ও চুলচেরা সমালোচনা করেন। এর উদ্দেশ্য হলো পশ্চিমা সভ্যতার দুর্বলতা ও ভ্রান্তিগুলো উন্মোচন করা।


١٤- ما الشيوعية؟ بين أضرارها-

[১৪. কমিউনিজম কী? এর ক্ষতিকর দিকগুলো বর্ণনা কর।]

উত্তর

কমিউনিজম বা সাম্যবাদ (الشيوعية): কার্ল মার্ক্স ও ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস কর্তৃক উনবিংশ শতাব্দীতে উদ্ভাবিত একটি চরম নাস্তিক্যবাদী ও বস্তুবাদী রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক দর্শন। এর মূল নীতি ছিল: “ধর্ম হলো জনগণের জন্য আফিম” এবং সমাজে সকল ব্যক্তিমালিকানা বিলুপ্ত করে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ কায়েম করা।

এর মারাত্মক ক্ষতিকর দিকসমূহ:

  1. ধর্মের অস্তিত্ব অস্বীকার: আল্লাহ, আখিরাত, ওহী ও নৈতিকতাকে সরাসরি অস্বীকার করে মানুষকে খাঁটি পাশবিক ও বস্তুবাদী প্রাণীতে পরিণত করে।
  2. ব্যক্তিমালিকানা হরণ: ব্যক্তিগত মেহনত ও উপার্জনের অধিকার কেড়ে নিয়ে মানুষকে অলস ও নিরুৎসাহিত করে দেয়।
  3. লাখ লাখ মানুষের রক্তপাত: রাশিয়ায় লেনিন ও স্তালিন এবং চীনে মাও সেতুং-এর আমলে মতাদর্শের নামে কোটি কোটি ধার্মিক মানুষকে হত্যা ও সাইবেরিয়ায় নির্বাসিত করা হয়েছিল।
  4. মসজিদ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংস: মধ্য এশিয়ার বুখারা, সমরকন্দসহ বিভিন্ন অঞ্চলের শত শত প্রাচীন মসজিদ বন্ধ বা গুদামঘরে পরিণত করা হয়েছিল।

١٥- تحدث عن البوذية وعقائدها بالإيجاز-

[১৫. বৌদ্ধধর্ম এবং তাদের বিশ্বাস সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা কর।]

উত্তর

বৌদ্ধধর্ম (البوذية): খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে ভারতীয় রাজপুত্র গৌতম বুদ্ধ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত একটি প্রাচীন আধ্যাত্মিক ধর্মমত।

এর প্রধান বিশ্বাস ও মতবাদসমূহ:

  • চতুরার্য সত্য (Four Noble Truths): ১. জীবন দুঃখময়, ২. কাম-বাসনা বা আসক্তিই দুঃখের মূল কারণ, ৩. তৃষ্ণা নিবৃত্তিতেই দুঃখের অবসান, এবং ৪. দুঃখ মুক্তির জন্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ অনুসরণীয়।
  • অষ্টাঙ্গিক মার্গ (Eightfold Path): সৎ দৃষ্টি, সৎ সংকল্প, সৎ বাক্য, সৎ কর্ম, সৎ জীবিকা, সৎ প্রচেষ্টা, সৎ স্মৃতি ও সৎ সমাধি।
  • নির্বাণ লাভ (Nirvana): পার্থিব বাসনা ও অহংকার সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করে পরম আত্মিক শান্তি অর্জন করা এবং পুনর্জন্মের চক্র থেকে চিরমুক্তি পাওয়া।
  • অহিংস নীতি: সকল জীবের প্রতি অহিংসা পোষণ করা (“অহিংসা পরম ধর্ম”)।

١٦- عرف بالليونز وأعمالها في العالم-

[১৬. লায়নস ক্লাবের পরিচয় এবং বিশ্বব্যাপী তাদের কার্যাবলি আলোচনা কর।]

উত্তর

লায়নস ক্লাব ইন্টারন্যাশনাল (الليونز): ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে আমেরিকার শিকাগোতে মেলভিন জোন্স নামক এক মার্কিন ব্যবসায়ীর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক সেবা সংস্থা। এটি রোটারী ক্লাবের মতোই ফ্রি-ম্যাসনরি ও আন্তর্জাতিক জায়নবাদী দর্শনে পরিচালিত এক এলিট ক্লাব।

বিশ্বব্যাপী তাদের কার্যাবলি:

  • দৃষ্টিহীনতা দূরীকরণ (SightFirst), রক্তদান, ডায়াবেটিস সচেতনতা এবং দুর্যোগে ত্রাণের মতো সামাজিক ও দাতব্য সেবামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করা।
  • সেবার আড়ালে সমাজের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন করে তাদের ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী মতাদর্শের অনুসারী বানানো।
  • বিশ্বজুড়ে তরুণ ও যুবকদের ‘লিও ক্লাব’-এর মাধ্যমে ধর্মহীন আন্তর্জাতিকতাবাদের শিক্ষায় প্রভাবিত করা।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. ধর্মনিরপেক্ষতা ও ইসলামের মধ্যে প্রধান সংঘাত কোথায়?

ধর্মনিরপেক্ষতা মানবজীবন ও রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে ধর্মকে পৃথক করার দাবি জানায়, অথচ ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান হওয়ায় রাজনীতি, বিচার ও রাষ্ট্রনীতি ধর্মের সাথে অবিচ্ছেদ্য।

২. বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসন (আল-গাযবুল ফিকরী) কেন সামরিক যুদ্ধের চেয়েও বিপজ্জনক?

কারণ সামরিক যুদ্ধে শুধু ভূখণ্ড বেদখল হয়, কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনে কোনো যুদ্ধ ছাড়াই মানুষের ঈমান, সংস্কৃতি, চিন্তা ও নৈতিকতার মূল ধ্বংস হয়ে যায়।

৩. জায়নবাদ আন্দোলনের মূল লক্ষ্য কী?

জায়নবাদের মূল লক্ষ্য হলো ফিলিস্তিনের মাটিতে আরবদের বাস্তুচ্যুত করে একটি উগ্র বর্ণবাদী ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা এবং মসজিদুল আকসা ধ্বংস করে তথাকথিত সুলাইমানি মন্দির নির্মাণ করা।

৪. খ্রিস্টান মিশনারিরা সাধারণত কোন কৌশলে ধর্মান্তরিত করে?

তারা সরাসরি ধর্মপ্রচারের চেয়ে দাতব্য হাসপাতাল, মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ত্রাণ সহায়তা এবং দারিদ্র্যপীড়িত এলাকায় অর্থনৈতিক সাহায্যের অন্তরালে খ্রিস্টধর্মের প্রচার চালায়।

৫. হিন্দুধর্ম ও শিখধর্মের মধ্যে মূল পার্থক্য কী?

হিন্দুধর্ম বহুদেবতা, অবতারবাদ, মূর্তিপূজা ও বর্ণপ্রথায় বিশ্বাসী; অন্যদিকে শিখধর্ম মূর্তিপূজা বর্জন করে এক নিরাকার ঈশ্বরে (ওয়াহেগুরু) বিশ্বাসী এবং বর্ণপ্রথাকে প্রত্যাখ্যান করে।

৬. পুঁজিবাদকে ইসলাম কেন পুরোপুরি সমর্থন করে না?

কারণ পুঁজিবাদ শোষক সুদের ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং অবাধ ব্যক্তি মুনাফার নামে শ্রমিক শোষণ, মজুদদারি ও সম্পদের কেন্দ্রীভবনকে প্রশ্রয় দেয়, যা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন ➜

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *