ফাজিল স্নাতক (সম্মান) চতুর্থ বর্ষ পরীক্ষা – ২০২০
বিভাগ: আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: সিয়ারুল আম্বিয়া ওয়া মানাহিজুদ দাওয়াহ ফিল কুরআনিল কারীম (سير الأنبياء ومناهج الدعوة في القرآن الكريم)
বিষয় কোড: ৪১০ | প্রশ্নপত্র কোড: ১৬৬ | পরীক্ষা কোড: ২০৪
সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০
নির্দেশনা: পরীক্ষায় মোট ৮টি প্রশ্ন থেকে যে কোনো ৫টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ একাডেমিক সহায়তা ও সর্বোচ্চ ফলাফলের সুবিধার্থে নিম্নে সকল প্রশ্নের তাহকীকভিত্তিক, প্রামাণ্য ও বিশদ সমাধান উপস্থাপন করা হলো।
١- اكتب أساليب الدعوة الإسلامية وأهدافها موضحا-
ইসলামী দাওয়াতের পদ্ধতিসমূহ (أساليب الدعوة) ও এর সুমহান উদ্দেশ্যসমূহ (أهداف الدعوة) বিশদভাবে আলোচনা কর।
ভূমিকা
‘দাওয়াত ইলাল্লাহ’ বা আল্লাহর পথে মানুষকে আহ্বান করা হলো নবীদের মূল মিশন এবং উম্মতে মুহাম্মদীর শ্রেষ্ঠত্বের প্রধান স্মারক। একটি পথভ্রষ্ট ও জাহেলিয়াতপূর্ণ সমাজকে তাওহীদের আলোয় আলোকিত করতে এবং মানুষের আত্মিক ও সামাজিক মুক্তির জন্য সুনির্দিষ্ট ও প্রজ্ঞাপূর্ণ দাওয়াতী পদ্ধতির কোনো বিকল্প নেই।
(ক) أساليب الدعوة الإسلامية (ইসলামী দাওয়াতের পদ্ধতিসমূহ)
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা’আলা দাওয়াতের মূল পদ্ধতি ও কৌশলকে একটি কালজয়ী আয়াতে সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছেন:
﴿ادْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ ۖ وَجَادِلْهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ ۚ إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنْ ضَلَّ عَنْ سَبِيلِهِ ۖ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ﴾
“আপনি আপনার প্রতিপালকের পথের দিকে আহ্বান করুন প্রজ্ঞা (হিকমত) এবং উত্তম উপদেশের মাধ্যমে; এবং তাদের সাথে বিতর্ক করুন সর্বোত্তম পন্থায়। নিশ্চয়ই আপনার প্রতিপালকই সর্বাধিক অবগত কে তাঁর পথ ছেড়ে বিপথগামী হয়েছে এবং তিনিই হেদায়াতপ্রাপ্তদের খুব ভালো করে জানেন।” (সূরা আন-নাহল: ১২৫)।
এই মূলনীতির আলোকে ইসলামী দাওয়াতের প্রধান পদ্ধতিগুলো নিম্নরূপ:
১. আল-হিকমাহ বা প্রজ্ঞাপূর্ণ পদ্ধতি (أسلوب الحكمة)
- ‘হিকমত’ অর্থ হলো স্থান, কাল ও পাত্রভেদে যথোপযুক্ত কথা যথাস্থানে যথাযথভাবে উপস্থাপন করা।
- বুদ্ধিজীবী ও দার্শনিক চিন্তার অধিকারীদের সাথে কথা বলার সময় গভীর জ্ঞান ও অকাট্য প্রমাণের (বুরহান) মাধ্যমে সত্য তুলে ধরা।
- শ্রোতার মানসিক অবস্থা, সামাজিক মর্যাদা ও যোগ্যতার স্তর বিবেচনা করে দাওয়াত দেওয়া।
২. আল-মাও’ইযাতুল হাসানাহ বা উত্তম নসীহত (أسلوب الموعظة الحسنة)
- সাধারণ মানুষের অন্তরে প্রভাব ফেলার জন্য দরদমাখা, প্রীতিপূর্ণ ও আকর্ষণীয় সদুপদেশ দেওয়া।
- জান্নাতের নেয়ামত ও সুসংবাদ (তারগীব) এবং জাহান্নামের শাস্তি ও পরকালীন জবাবদিহিতার সতর্কবাণী (তারহীব)-এর ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয় করা।
- ভাষার রূঢ়তা, অপবাদ বা তাচ্ছিল্য বর্জন করা।
৩. আল-মুজাদালাহ বিল্লাতী হিয়া আহসান (উত্তম পন্থায় সংলাপ ও যুক্তি খণ্ডন)
- অবিশ্বাসী বা ভিন্নমতাবলম্বীদের সাথে বিতর্কের সময় ক্রোধ বা হিংসা প্রকাশ না করে ভদ্র, মার্জিত ও যুক্তিনির্ভর আচরণ করা।
- কুরআন নির্দেশ দেয়: ﴿وَلَا تُجَادِلُوا أَهْلَ الْكِتَابِ إِلَّا بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ﴾ (তোমরা আহলে কিতাবের সাথে সর্বোত্তম পন্থা ছাড়া বিতর্ক করো না—সূরা আল-আনকাবূত: ৪৬)।
৪. উত্তম চারিত্রিক দৃষ্টান্ত ও কর্মের মাধ্যমে দাওয়াত (الدعوة بالقدوة والعمل)
- দাওয়াতের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হলো দাঈর ব্যক্তিগত আমল ও উন্নত চরিত্র। কেবল মুখের কথার চেয়ে চারিত্রিক সততা মানুষকে বহুগুণ বেশি প্রভাবিত করে।
- রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নবুওয়াত প্রকাশের পূর্বেই তিনি ‘আস-সাদিক্ব’ (সত্যবাদী) ও ‘আল-আমীন’ (বিশ্বস্ত) উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন।
৫. পর্যায়ক্রমিকতা বা তাদাররুজ (أسلوب التدرج)
- দাওয়াতের ক্ষেত্রে প্রথমে তাওহীদ ও মৌলিক আকীদার সংস্কার করা, অতঃপর ফরয ইবাদতসমূহ এবং সর্বশেষ সমাজ ও আন্তর্জাতিক বিধানাবলি কার্যকর করা।
(খ) أهداف الدعوة الإسلامية (ইসলামী দাওয়াতের উদ্দেশ্যসমূহ)
ইসলামী দাওয়াতের সুমহান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যসমূহ নিম্নরূপ:
- তাওহীদের সার্বজনীন প্রতিষ্ঠা ও শিরকের মূলোৎপাটন: মানবজাতিকে মানুষের দাসত্ব ও সৃষ্টির পূজা থেকে মুক্ত করে একমাত্র একক আল্লাহর দাসত্বে ফিরিয়ে আনা (إخراج العباد من عبادة العباد إلى عبادة رب العباد)।
- মানুষের আত্মশুদ্ধি ও চারিত্রিক উৎকর্ষ সাধন (تزكية النفوس ومكارم الأخلاق): কুপ্রবৃত্তি, লোভ ও অহংকার থেকে মুক্ত করে এক আদর্শ নৈতিক চরিত্র গঠন করা। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: «إِنَّمَا بُعِثْتُ لِأُتَمِّمَ مَكَارِمَ الْأَخْلَاقِ» (উত্তম চরিত্রের পূর্ণতা বিধানের জন্যই আমি প্রেরিত হয়েছি—মুসনাদে আহমদ)।
- ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণ (إقامة القسط والعدل): রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক শোষণমুক্ত এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা যেখানে সকল মানুষের মৌলিক মানবাধিকার সংরক্ষিত থাকে।
- আল্লাহর শরীয়তের বাস্তব অনুশাসন প্রতিষ্ঠা (تحكيم شرع الله): পৃথিবীতে আল্লাহর খিলাফতের দায়িত্ব বাস্তবায়ন করা এবং কুরআন-সুন্নাহর বিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা।
- মানবজাতিকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা ও জান্নাতের পথ প্রদর্শন: চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো পরকালীন মুক্তি ও মহান রবের সন্তুষ্টি অর্জন।
উপসংহার
ইসলামী দাওয়াত কোনো সংকীর্ণ ধর্মীয় আচার নয়; এটি মানবতার সামগ্রিক কল্যাণ ও মুক্তির সর্বশ্রেষ্ঠ ঐশী আন্দোলন। প্রজ্ঞাপূর্ণ পদ্ধতি ও নিঃস্বার্থ লক্ষ্যই এই দাওয়াতকে যুগে যুগে বিজয়ী করেছে।
٢- ما معنى الموعظة الحسنة؟ بين تأثيرها في الدعوة-
‘আল-মাও’ইযাতুল হাসানাহ’ (الموعظة الحسنة)-এর অর্থ কী? দাওয়াতের ক্ষেত্রে এর গভীর প্রভাব ও কার্যকারিতা বিশদভাবে বর্ণনা কর।
ভূমিকা
মানবমন এক সংবেদনশীল ও রহস্যময় রাজ্য। কঠোরতা বা কটূবাক্যের চেয়ে ভালোবাসা, মমতা ও আন্তরিকতা মানুষের বিবেককে খুব দ্রুত স্পর্শ করে। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ নবী করীম (সা.)-কে যে দাওয়াতী নির্দেশ দিয়েছেন তার অন্যতম প্রধান উপাদান হলো ‘আল-মাও’ইযাতুল হাসানাহ’ তথা উত্তম উপদেশ।
(ক) الموعظة الحسنة-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ
- আভিধানিক অর্থ: ‘মাও’ইযাহ’ (الموعظة) শব্দটি আরবি ‘ওয়াজ’ (وَعْظ) থেকে গৃহীত। এর আভিধানিক অর্থ হলো এমন নসীহত বা উপদেশ, যা মানুষের হৃদয়কে কোমল করে, চোখের অশ্রু ঝরায় এবং পরকালের স্মরণ করিয়ে দেয় (النُّصْحُ وَالتَّذْكِيرُ بِمَا يُرَقِّقُ الْقُلُوبَ)। আর ‘আল-হাসানাহ’ (الحسنة) অর্থ সুন্দর, মনোরম, মঙ্গলজনক ও কল্যাণময়।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: বিশিষ্ট মুফাসসির ও দাঈগণের মতে—
«هِيَ النُّصْحُ وَالتَّذْكِيرُ بِالْخَيْرِ الْمَقْرُونُ بِالتَّرْغِيبِ وَالتَّرْهِيبِ فِي أُسْلُوبٍ عَاطِفِيٍّ رَقِيقٍ، لَا عُنْفَ فِيهِ وَلَا تَوْبِيخَ»
(কোনো প্রকার রূঢ়তা, অপমান বা ভর্ৎসনা ছাড়া অত্যন্ত কোমল, সহানুভূতিশীল ও দরদমাখা ভাষায় জান্নাতের সুসংবাদ এবং জাহান্নামের ভীতি প্রদর্শন করে সত্যের প্রতি মানুষকে আহ্বান করার নামই হলো ‘আল-মাও’ইযাতুল হাসানাহ’)।
(খ) দাওয়াতের ক্ষেত্রে আল-মাও’ইযাতুল হাসানাহ-র বৈপ্লবিক প্রভাব
দাওয়াতের ময়দানে কঠোর বিতর্কের চেয়ে মাও’ইযাতুল হাসানাহ বহু গুণ বেশি কার্যকর ভূমিকা পালন করে। এর প্রধান প্রভাবসমূহ নিম্নরূপ:
১. কঠিন ও পাষাণ হৃদয়কে বিগলিত করা
মানুষ যখন আন্তরিকতা ও ভালোবাসাপূর্ণ উপদেশ শোনে, তখন তার অন্তরের অহংকার ও জেদ দূরীভূত হয়। আল্লাহ তা’আলা হযরত মূসা ও হারূন (আ.)-কে পৃথিবীর ইতিহাসের চরম দাম্ভিক স্বৈরশাসক ফিরাউনের কাছে পাঠাতে গিয়ে এই নির্দেশই দিয়েছিলেন:
﴿فَقُولَا لَهُ قَوْلًا لَيِّنًا لَعَلَّهُ يَتَذَكَّرُ أَوْ يَخْشَىٰ﴾
“অতঃপর তোমরা উভয়ে তার সাথে কোমল ও নরম ভাষায় কথা বলবে; হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় পাবে।” (সূরা ত্বা-হা: ৪৪)।
২. আত্মরক্ষা ও হঠকারিতার মানসিকতা দমন
কারও দোষ সবার সামনে রূঢ় ভাষায় তুলে ধরলে সে হঠকারী হয়ে ওঠে এবং নিজের ভুলকে সত্য প্রমাণ করতে লড়াই করে। কিন্তু একান্তে ডেকে দরদের সাথে মাও’ইযাহ পেশ করলে শ্রোতা লজ্জিত হয় এবং সংশোধন হতে আগ্রহী হয়। ইমাম শাফিয়ী (রহ.) বলেন:
«تَعَمَّدْنِي بِنُصْحِكَ فِي انْفِرَادِي وَجَنِّبْنِي النَّصِيحَةَ فِي الْجَمَاعَهْ»
(তুমি যখন আমাকে নসীহত করবে তখন গোপনে একান্তে কর; প্রকাশ্য মজলিসে আমাকে উপদেশ দেওয়ার অপমান থেকে বিরত থাক)।
৩. শত্রুও পরম বন্ধুরে পরিণত হওয়া
উত্তম উপদেশ ও অমায়িক ব্যবহারের মাধ্যমে তীব্র বিরোধিতাকারী চরম শত্রুর মনোভাবও পরিবর্তন হয়ে যায়। আল্লাহ বলেন:
﴿ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيمٌ﴾
“আপনি মন্দকে উত্তম আচরণ দিয়ে প্রতিহত করুন; ফলে আপনার সাথে যার চরম শত্রুতা ছিল, সে আপনার অন্তরঙ্গ বন্ধুতে পরিণত হবে।” (সূরা ফুসসিলাত: ৩৪)।
৪. নবী করীম (সা.)-এর দাওয়াতী সফলতার চাবিকাঠি
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কোমল ব্যবহারই সমগ্র আরবের বর্বর জাতিকে ইসলামের ছায়াতলে এনেছিল। কুরআন সাক্ষ্য দেয়:
﴿فَبِمَا رَحْمَةٍ مِنَ اللَّهِ لِنْتَ لَهُمْ ۖ وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانْفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ﴾
“আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের প্রতি কোমল ও নরম হৃদয় হয়েছেন। যদি আপনি কর্কশভাষী ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, তবে তারা আপনার চারপাশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত।” (সূরা আলে ইমরান: ১৫৯)।
উপসংহার
আল-মাও’ইযাতুল হাসানাহ হলো একজন সফল দাঈর সবচেয়ে বড় অস্ত্র। এর মাধ্যমে মানুষের মন জয় করা যায়, বিদ্বেষ দূর হয় এবং হিদায়াতের পথ উন্মুক্ত হয়।
٣- تحدث عن الأساليب التي اتبعها نوح عليه السلام في دعوة قومه-
স্বজাতির কাছে দ্বীন প্রচারের ক্ষেত্রে হযরত নূহ (আ.) যেসব দাওয়াতী পদ্ধতি অনুসরণ করেছিলেন তা বিস্তারিত আলোচনা কর।
ভূমিকা
হযরত নূহ (আ.) হলেন উলুল আযম (দৃঢ়প্রতিজ্ঞ) রাসুলদের অন্যতম এবং মানবজাতির দ্বিতীয় পিতা (আবুশ বাশারিস সানী)। তিনি তাঁর চরম অবাধ্য ও মূর্তিপূজক জাতির মাঝে দীর্ঘ সাড়ে নয়শত বছর ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে তাওহীদের দাওয়াত প্রদান করেছিলেন (সূরা আল-আনকাবূত: ১৪)। সূরা নূহের প্রারম্ভে তাঁর দাওয়াতের বহুমুখী পদ্ধতিসমূহ এক হৃদয়স্পর্শী ভাষায় বর্ণিত হয়েছে।
সূরা নূহের আলোকে নূহ (আ.)-এর অনুসৃত দাওয়াতী পদ্ধতিসমূহ (أساليب الدعوة)
১. দিবা-রাত্রির বিরামহীন ও ক্লান্তিহীন দাওয়াত (الدعوة الدائمة ليلًا ونهارًا)
নূহ (আ.) কোনো নির্দিষ্ট সময় বা ঋতুর অপেক্ষায় বসে থাকেননি; বরং রাত ও দিনের প্রতিটি মুহূর্তকে দাওয়াতের কাজে উৎসর্গ করেছিলেন।
কুরআনী দলিল:
﴿قَالَ رَبِّ إِنِّي دَعَوْتُ قَوْمِي لَيْلًا وَنَهَارًا فَلَمْ يَزِدْهُمْ دُعَائِي إِلَّا فِرَارًا﴾
“তিনি বললেন: হে আমার প্রতিপালক! নিশ্চয়ই আমি আমার জাতিকে রাত ও দিন দাওয়াত দিয়েছি। কিন্তু আমার আহ্বান তাদের পলায়নপরতা ছাড়া আর কিছুই বৃদ্ধি করেনি।” (সূরা নূহ: ৫-৬)।
২. প্রকাশ্য ও গোপনীয় দাওয়াতের অনন্য সমন্বয় (الجمع بين الإعلان والإسرار)
তিনি মানুষের মনস্তত্ত্ব অনুযায়ী কখনো প্রকাশ্যে জনসমাবেশে বক্তব্য রাখতেন, আবার কখনো মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে একান্ত গোপনে দাওয়াত দিতেন।
কুরআনী দলিল:
﴿ثُمَّ إِنِّي دَعَوْتُهُمْ جِهَارًا ثُمَّ إِنِّي أَعْلَنْتُ لَهُمْ وَأَسْرَرْتُ لَهُمْ إِسْرَارًا﴾
“অতঃপর আমি তাদের প্রকাশ্যে উচ্চকণ্ঠে ডেকেছি; অতঃপর আমি তাদের প্রকাশ্যেও দাওয়াত দিয়েছি এবং অতি গোপনেও তাদের কাছে সত্য পৌঁছে দিয়েছি।” (সূরা নূহ: ৮-৯)।
৩. পার্থিব নেয়ামতের সুসংবাদ দিয়ে উদ্বুদ্ধকরণ (الترغيب بالنعم والاستغفار)
তিনি জাতিকে বুঝিয়েছেন যে আল্লাহর তাওহীদ গ্রহণ ও ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে শুধু পরকালই নয়, পার্থিব জীবনও ধন-সম্পদ ও শান্তিতে ভরে উঠবে।
কুরআনী দলিল:
﴿فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُمْ مِدْرَارًا وَيُمْدِدْكُمْ بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ وَيَجْعَلْ لَكُمْ جَنَّاتٍ وَيَجْعَلْ لَكُمْ أَنْهَارًا﴾
“অতঃপর আমি বললাম: তোমরা তোমাদের রবের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর; নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর আকাশ থেকে অজস্র বৃষ্টিবর্ষণ করবেন, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দিয়ে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের জন্য স্থাপন করবেন উদ্যান ও প্রবাহিত করবেন নদ-নদী।” (সূরা নূহ: ১০-১২)।
৪. সৃষ্টিজগতের নিদর্শনাবলি দেখিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক দাওয়াত (الاستدلال بآيات الآفاق والأنفس)
তিনি মানুষকে যুক্তি দিয়ে বোঝাতেন যে, যে মহান স্রষ্টা নিখুঁত মহাবিশ্ব তৈরি করেছেন, তাঁর ক্ষমতাকে কেন তোমরা অস্বীকার করছ?
কুরআনী দলিল:
﴿مَا لَكُمْ لَا تَرْجُونَ لِلَّهِ وَقَارًا وَقَدْ خَلَقَكُمْ أَطْوَارًا أَلَمْ تَرَوْا كَيْفَ خَلَقَ اللَّهُ سَبْعَ سَمَاوَاتٍ طِبَاقًا وَجَعَلَ الْقَمَرَ فِيهِنَّ نُورًا وَجَعَلَ الشَّمْسَ سِرَاجًا﴾
“তোমাদের কী হলো যে তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বকে ভয় করছ না? অথচ তিনি তোমাদের বিভিন্ন ধাপে সৃষ্টি করেছেন। তোমরা কি দেখ না কীভাবে আল্লাহ সপ্ত আসমান স্তরে স্তরে নির্মাণ করেছেন? এবং সেখানে চাঁদকে প্রতিফলিত জ্যোতি এবং সূর্যকে উজ্জ্বল প্রদীপ করেছেন?” (সূরা নূহ: ১৩-১৬)।
৫. চরম নিপীড়নের মুখেও অটল ধৈর্য ও তাওয়াক্কুল (الصبر والثبات المطلق)
কওমের লোকেরা কানে আঙুল গুঁজে রাখত, কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে নিত এবং তাঁকে পাথর মেরে হত্যার হুমকি দিত। তবুও তিনি এক মুহূর্তের জন্যও হতোদ্যম হননি।
উপসংহার
হযরত নূহ (আ.)-এর দাওয়াতী পদ্ধতি যুগে যুগে দাঈদের জন্য চরম প্রেরণার উৎস। ফলাফল মানুষের হাতে নয়, একনিষ্ঠ প্রচেষ্টা ও ধৈর্যই হলো আল্লাহর দরবারে সফলতার মূল মাপকাঠি।
٤- اكتب ما تعرف عن دعوة إبراهيم عليه السلام-
হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর দাওয়াতী জীবন ও কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে যা জান বিস্তারিতভাবে লেখ।
ভূমিকা
হযরত ইব্রাহিম (আ.) হলেন ‘খলীলুল্লাহ’ (আল্লাহর অন্তরঙ্গ বন্ধু) এবং ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলিম—তিনটি প্রধান ধর্মের যৌথ শ্রদ্ধার পাত্র (আবুল আম্বিয়া)। তাঁর দাওয়াতী জীবন ছিল যুক্তি, প্রজ্ঞা, অলৌকিক সাহসিকতা এবং মহান আল্লাহর প্রতি চরম আত্মত্যাগের এক অনন্য ঐতিহাসিক উপাখ্যান। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাঁকে ‘একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ উম্মাহ’ (﴿إِنَّ إِبْرَاهِيمَ كَانَ أُمَّةً﴾) বলে ভূষিত করেছেন।
ইব্রাহিম (আ.)-এর দাওয়াতের প্রধান ক্ষেত্র ও পদ্ধতিসমূহ
১. নিজ পরিবারের ভেতর থেকে দরদমাখা দাওয়াত শুরু
ইব্রাহিম (আ.) সর্বপ্রথম তাঁর পিতা আযরকে (যে মূর্তি তৈরি ও বিক্রি করত) অত্যন্ত শ্রদ্ধাপূর্ণ ভাষায় শিরক পরিত্যাগের আহ্বান জানান। তিনি প্রতি পদে পদে «يَا أَبَتِ» (হে আমার পরম স্নেহময় পিতা!) সম্বোধন করে শয়তানের পূজা ত্যাগ করতে বলেন।
কুরআনী দৃশ্য:
﴿إِذْ قَالَ لِأَبِيهِ يَا أَبَتِ لِمَ تَعْبُدُ مَا لَا يَسْمَعُ وَلَا يُبْصِرُ وَلَا يُغْنِي عَنْكَ شَيْئًا﴾ (যখন তিনি তাঁর পিতাকে বললেন: হে আমার পিতা! আপনি কেন এমন বস্তুর পূজা করেন যা শোনে না, দেখে না এবং আপনার কোনো উপকার করতে পারে না?—সূরা মারইয়াম: ৪২)। পিতা তাঁকে পাথর মেরে হত্যার হুমকি দেওয়া সত্ত্বেও তিনি বললেন: ﴿سَلَامٌ عَلَيْكَ ۖ سَأَسْتَغْفِرُ لَكَ رَبِّي﴾ (আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক, আমি আমার রবের কাছে আপনার ক্ষমার জন্য প্রার্থনা করব)।
২. মূর্তিপূজক সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বুদ্ধিদীপ্ত অভিযান ও কুঠার চালনা
জাতীর বাৎসরিক মেলার সুযোগে তিনি মন্দিরে প্রবেশ করে সকল ছোট মূর্তি ভেঙে ফেলেন এবং কুঠারটি সবচেয়ে বড় মূর্তির কাঁধে ঝুলিয়ে রাখেন। কাফেররা যখন তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করল, তখন তিনি এমন এক জওয়াব দিলেন যা তাদের ভাষাহীন করে দিল:
﴿قَالَ بَلْ فَعَلَهُ كَبِيرُهُمْ هَٰذَا فَاسْأَلُوهُمْ إِنْ كَانُوا يَنْطِقُونَ فَرَجَعُوا إِلَىٰ أَنْفُسِهِمْ فَقَالُوا إِنَّكُمْ أَنْتُمُ الظَّالِمُونَ﴾
“তিনি বললেন: বরং এই বড় মূর্তিটিই এ কাজ করেছে; অতএব তাদেরকেই জিজ্ঞাসা কর, যদি তারা কথা বলতে পারে! তখন তারা নিজেদের বিবেকের দিকে ফিরে গেল এবং বলল: নিশ্চয়ই তোমরাই তো অন্যায়কারী।” (সূরা আল-আম্বিয়া: ৬৩-৬৪)।
৩. পরাক্রমশালী শাসক নমরূদের দরবারে সাহসী সংলাপ
নমরূদ যখন নিজেকে খোদা দাবি করল, তখন ইব্রাহিম (আ.) এমন অকাট্য যুক্তি ছুড়ে দিলেন যাতে জালেম বাদশা হতভম্ব হয়ে গেল:
﴿قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّيَ الَّذِي يُحْيِي وَيُمِيتُ قَالَ أَنَا أُحْيِي وَأُمِيتُ ۖ قَالَ إِبْرَاهِيمُ فَإِنَّ اللَّهَ يَأْتِي بِالشَّمْسِ مِنَ الْمَشْرِقِ فَأْتِ بِهَا مِنَ الْمَغْرِبِ فَبُهِتَ الَّذِي كَفَرَ﴾
“ইব্রাহিম বললেন: আমার প্রতিপালক তিনিই যিনি জীবন দান করেন এবং মৃত্যু ঘটান। সে বলল: আমিও জীবন দিই ও মৃত্যু ঘটাই। ইব্রাহিম বললেন: নিশ্চয়ই আল্লাহ পূর্ব দিক থেকে সূর্য উদিত করেন, অতএব তুমি একে পশ্চিম দিক থেকে উদিত করে দেখাও! ফলে সেই কাফের হতভম্ব ও নিরুত্তর হয়ে গেল।” (সূরা আল-বাক্বারাহ: ২৫৮)।
৪. নক্ষত্রপূজকদের সাথে মহাজাগতিক যুক্তিতর্ক
বাবেলের যারা চন্দ্র-সূর্য ও তারার পূজা করত, তিনি ক্রমান্বয়ে উদয় ও অস্ত যাওয়ার বাস্তবতা দেখিয়ে প্রমাণ করলেন যে পরিবর্তনশীল ও অস্তগামী কোনো সৃষ্টি কখনো উপাস্য হতে পারে না:
﴿فَلَمَّا أَفَلَ قَالَ لَا أُحِبُّ الْآفِلِينَ… إِنِّي وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ حَنِيفًا وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ﴾
“যখন তা অস্ত গেল, তিনি বললেন: আমি অস্তগামীদের ভালোবাসি না… নিশ্চয়ই আমি একনিষ্ঠভাবে আমার মুখমণ্ডল সেই সত্ত্বার দিকে ফেরালাম যিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই।” (সূরা আল-আন’আম: ৭৬-৭৯)।
৫. অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হওয়া ও তাওয়াক্কুল
নমরূদ তাঁকে আগুনে নিক্ষেপ করলে তিনি এক মুহূর্তের জন্যও বিচলিত হননি। তাঁর মুখ থেকে বের হয়েছিল: «حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ» (আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনি কতই না উত্তম কর্মবিধায়ক)। ফলে আল্লাহ আগুনকে ফুলবাগানে পরিণত করে দিলেন (﴿يَا نَارُ كُونِي بَرْدًا وَسَلَامًا عَلَىٰ إِبْرَاهِيمَ﴾)।
উপসংহার
হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সমগ্র জীবন ছিল তাওহীদের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। পুত্র ইসমাইলকে কুরবানি এবং কা’বা ঘর নির্মাণের মাধ্যমে তিনি বিশ্ববাসীর জন্য ত্যাগের যে চিরন্তন আদর্শ রেখে গেছেন, তা কিয়ামত পর্যন্ত অম্লান থাকবে।
٥- تحدث عما أرسل رسول الله صلى الله عليه وسلم من الرسالة إلى ملك الروم وماجرى له في بلاطه من الوقائع-
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছে প্রেরিত ঐতিহাসিক পত্র এবং তার রাজদরবারে সৃষ্ট ঘটনাবলি বিস্তারিতভাবে আলোচনা কর।
ভূমিকা
ষষ্ঠ হিজরীর যিলকদ মাসে সম্পাদিত ঐতিহাসিক হুদাইবিয়ার সন্ধির পর আরবের কুরাইশদের সাথে যুদ্ধাবস্থার সাময়িক বিরতি ঘটে। এই সুযোগে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর বৈশ্বিক দাওয়াত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তৎকালীন বিশ্বের দুই পরাশক্তি রোমান সাম্রাজ্য ও পারস্যের কিসরাসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে ইসলামের ঐতিহাসিক দাওয়াতনামা প্রেরণ করেন। এর মধ্যে রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের নিকট প্রেরিত পত্র ও তার দরবারের ঘটনাবলি ইতিহাসে সর্বাধিক তাৎপর্যপূর্ণ।
(ক) রোম সম্রাটের নিকট প্রেরিত ঐতিহাসিক পত্রের বিবরণ
- দূত নির্বাচন: রাসূলুল্লাহ (সা.) এই গুরুত্বপূর্ণ মিশনের জন্য বিশিষ্ট সাহাবী হযরত দিহইয়া ইবনে খালীফা আল-কালবী (রা.)-কে মনোনীত করেন।
- পত্রের সিলমোহর: রোমানদের নিয়ম ছিল সিলমোহর ছাড়া কোনো পত্র গৃহীত হতো না। তাই রাসূলুল্লাহ (সা.) রৌপ্য নির্মিত একটি আংটি তৈরি করান, যার ওপর খোদাই করা ছিল: «مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ» (মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল)।
- পত্রের মূল আরবী পাঠ:
«بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ، مِنْ مُحَمَّدٍ عَبْدِ اللَّهِ وَرَسُولِهِ إِلَى هِرَقْلَ عَظِيمِ الرُّومِ: سَلَامٌ عَلَى مَنِ اتَّبَعَ الْهُدَى، أَمَّا بَعْدُ: فَإِنِّي أَدْعُوكَ بِدِعَايَةِ الْإِسْلَامِ، أَسْلِمْ تَسْلَمْ، يُؤْتِكَ اللَّهُ أَجْرَكَ مَرَّتَيْنِ، فَإِنْ تَوَلَّيْتَ فَإِنَّ عَلَيْكَ إِثْمَ الْأَرِيسِيِّينَ، وَ ﴿يَا أَهْلَ الْكِتَابِ تَعَالَوْا إِلَىٰ كَلِمَةٍ سَوَاءٍ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ أَلَّا نَعْبُدَ إِلَّا اللَّهَ وَلَا نُشْرِكَ بِهِ شَيْئًا وَلَا يَتَّخِذَ بَعْضُنَا بَعْضًا أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ ۚ فَإِنْ تَوَلَّوْا فَقُولُوا اشْهَدُوا بِأَنَّا مُسْلِمُونَ﴾» - পত্রের বঙ্গার্থ:
“পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে। আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল মুহাম্মদের পক্ষ থেকে রোমের মহান নেতা হিরাক্লিয়াসের প্রতি: শান্তি তাদের ওপর যারা সৎপথ অনুসরণ করে। অতঃপর: আমি আপনাকে ইসলামের দিকে আহ্বান জানাচ্ছি। ইসলাম গ্রহণ করুন, আপনি নিরাপদে থাকবেন। আল্লাহ আপনাকে দ্বিগুণ প্রতিদান দান করবেন। আর যদি আপনি মুখ ফিরিয়ে নেন, তবে আপনার প্রজাসাধারণের (আরীসীনদের) পাপের বোঝাও আপনার ওপর বর্তাবে। এবং ‘হে আহলে কিতাবগণ! এমন এক বাণীর দিকে আস যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে অভিন্ন; যেন আমরা আল্লাহ ছাড়া কারও ইবাদত না করি এবং তাঁর সাথে কাউকে শরিক না করি…’ (সূরা আলে ইমরান: ৬৪)।”
(খ) হিরাক্লিয়াসের রাজদরবারে সৃষ্ট ঘটনাবলি (সহীহ বুখারীর সূত্রে)
পত্র পেয়ে হিরাক্লিয়াস আরবের কোনো লোককে উপস্থিত করতে নির্দেশ দিলেন। তখন কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান (যিনি তখনও অমুসলিম ছিলেন) একটি বাণিজ্য কাফেলা নিয়ে সিরিয়ার গাজায় অবস্থান করছিলেন। তাঁকে রাজদরবারে তলব করা হলো।
হিরাক্লিয়াসের প্রশ্নমালা ও আবু সুফিয়ানের স্বীকারোক্তি:
হিরাক্লিয়াস আবু সুফিয়ানকে সামনে বসিয়ে তাঁর সঙ্গীদের পেছনে দাঁড় করিয়ে বললেন: সে মিথ্যা বললে তোমরা প্রতিবাদ করবে। অতঃপর তিনি অত্যন্ত কৌশলী ১১টি প্রশ্ন করেন:
| হিরাক্লিয়াসের প্রশ্ন | আবু সুফিয়ানের উত্তর | হিরাক্লিয়াসের দার্শনিক সিদ্ধান্ত |
|---|---|---|
| ১. তাঁর বংশমর্যাদা কেমন? | তিনি আমাদের মধ্যে অতি সম্ভ্রান্ত বংশের। | নবীগণ সর্বদা জাতির শ্রেষ্ঠ বংশেই প্রেরিত হন। |
| ২. তাঁর পূর্বে কি কেউ এমন দাবি করেছিল? | না, কেউ করেনি। | পূর্বে কেউ করলে বলা যেত তিনি পূর্বসূরির অনুকরণ করছেন। |
| ৩. তাঁর পূর্বপুরুষদের মধ্যে কি কোনো রাজা-বাদশাহ ছিল? | না, ছিল না। | রাজত্ব থাকলে বলা যেত তিনি পৈতৃক রাজ্য উদ্ধারের চেষ্টা করছেন। |
| ৪. নবুওয়াতের পূর্বে কি তিনি কখনো মিথ্যা বলতেন? | না, তিনি কখনোই মিথ্যা বলেননি। | যে মানুষের সাথে মিথ্যা বলে না, সে আল্লাহর ওপর মিথ্যা আরোপ করতে পারে না। |
| ৫. সমাজের অভিজাতরা না দুর্বলরা তাঁর অনুসারী? | দরিদ্র ও দুর্বল লোকেরাই তাঁর অনুসারী। | নবীগণের অনুসারী প্রাথমিকভাবে সমাজের দুর্বলরাই হয়ে থাকে। |
| ৬. তাঁর অনুসারী বাড়ছে না কমছে? | দিন দিন বাড়ছে। | ঈমানের প্রভাব এমনই হয়, যা পূর্ণতা না পাওয়া পর্যন্ত বাড়তে থাকে। |
| ৭. কেউ কি দ্বীন গ্রহণের পর তা অপছন্দ করে মুরতাদ হয়? | না, একজনও হয় না। | ঈমানের মাধুর্য যখন অন্তরে প্রবেশ করে, তখন কেউ তা ছাড়ে না। |
| ৮. তিনি কি কখনো চুক্তি ভঙ্গ বা বিশ্বাসভঙ্গ করেছেন? | না, কখনোই না। | নবীগণ কখনো ওয়াদা খেলাপ করেন না। |
| ৯. তিনি তোমাদের কী নির্দেশ দেন? | একক আল্লাহর ইবাদত, পূর্বপুরুষদের মূর্তিপূজা বর্জন, সালাত, সত্যবাদিতা, সংযম ও রক্তীয় সম্পর্ক রক্ষার নির্দেশ দেন। | এগুলো খাঁটি নবীরই শিক্ষা। |
হিরাক্লিয়াসের চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়া ও করুণ পরিণতি:
আবু সুফিয়ানের উত্তর শুনে রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াস গভীরভাবে অভিভূত হন এবং ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন:
«لَئِنْ كَانَ مَا تَقُولُ حَقًّا، فَإِنَّهُ نَبِيٌّ، وَسَيَمْلِكُ مَوْضِعَ قَدَمَيَّ هَاتَيْنِ، وَلَوْ أَنِّي أَعْلَمُ أَنِّي أَخْلُصُ إِلَيْهِ لَتَجَشَّمْتُ لُقَاءَهُ، وَلَوْ كُنْتُ عِنْدَهُ لَغَسَلْتُ عَنْ قَدَمَيْهِ»
“তুমি যা বলেছ তা যদি সত্য হয়, তবে নিশ্চিতভাবেই তিনি একজন সত্য নবী এবং অতি শীঘ্রই তিনি আমার এই দুই পায়ের নিচের ভূমিরও মালিক হবেন। আমি যদি তাঁর কাছে পৌঁছাতে পারতাম তবে অবশ্যই তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতাম এবং তাঁর পদযুগল ধৌত করে দিতাম!” (সহীহ বুখারী: ৭)।
পরবর্তীতে হিরাক্লিয়াস হিমসের প্রাসাদে রোমান সেনাপতি ও ধর্মযাজকদের একত্র করে ইসলাম গ্রহণের প্রস্তাব দিলে তারা তীব্র বিদ্রোহ করে এবং ক্ষোভে ফেটে পড়ে। তখন হিরাক্লিয়াস ক্ষমতা হারানোর ভয়ে ভণ্ডামি করে বলল: আমি কেবল তোমাদের ধর্মে অবিচলতা পরীক্ষা করছিলাম! এভাবে সত্য জেনেও পার্থিব ক্ষমতার মোহে সে ঈমান থেকে বঞ্চিত হলো।
উপসংহার
হিরাক্লিয়াসের দরবারের এই ঐতিহাসিক ঘটনা অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে তৎকালীন বিশ্বের সকল জ্ঞানী ব্যক্তিই রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নবুওয়াতের সত্যতা নিশ্চিতভাবে উপলব্ধি করেছিলেন।
٦- اكتب مشاكل الدعوة في بنغلاديش مفصلا-
বাংলাদেশে ইসলামী দাওয়াতের সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতাসমূহ সবিস্তারে আলোচনা কর।
ভূমিকা
বাংলাদেশ বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। এ দেশের মানুষের অন্তরে ইসলামের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা রয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী সমাজ বিনির্মাণ এবং তৃণমূল পর্যায়ে বিশুদ্ধ তাওহীদের দাওয়াত পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বহুবিধ অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সংকট বিদ্যমান।
বাংলাদেশে দাওয়াতের প্রধান সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতাসমূহ (مشاكل الدعوة)
১. ধর্মীয় অজ্ঞতা ও বিশুদ্ধ ইলমের অভাব (الجهل والفقر الديني)
বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক সাধারণ মুসলমান ইসলাম সম্পর্কে স্পষ্ট ও সঠিক জ্ঞান রাখে না। কুরআন তিলাওয়াত জানলেও এর অর্থ ও মর্ম অনুধাবন করে না। ফলে কোনটি সুন্নাহ আর কোনটি কুসংস্কার—তা পার্থক্য করতে না পেরে তারা চরম বিভ্রান্তির শিকার হয়।
২. শিরক, বিদ’আত ও মাযার সংস্কৃতির বিস্তার (انتشار الشرك والبدع)
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাযারপূজা, পীরপূজা, মানত এবং বিভিন্ন শিরকী আকিদা সাধারণ মানুষের বিশ্বাসকে দূষিত করে রেখেছে। এগুলোকে যখন ধর্মের নামে চালিয়ে দেওয়া হয়, তখন বিশুদ্ধ তাওহীদের দাঈদের চরম বাধার সম্মুখীন হতে হয়।
৩. আলেম ও ইসলামী দলসমূহের অনৈক্য ও দলাদলি (الفرقة والنزاع الحزبي)
দাওয়াতের ময়দানে সবচেয়ে বড় বাধা হলো ধর্মীয় নেতৃত্বের অনৈক্য। বিভিন্ন মাযহাব, তরিকা ও ফিরকার মধ্যে চুলচেরা ইখতিলাফ নিয়ে প্রকাশ্যে বাহাস, কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি ও কাফের ফতোয়া দেওয়ার কারণে সাধারণ মানুষ ইসলামের ওপর আস্থা হারাচ্ছে এবং যুবসমাজ বিভ্রান্ত হচ্ছে।
৪. ধর্মনিরপেক্ষতা, নাস্তিক্যবাদ ও পশ্চিমা অপসংস্কৃতির আক্রমণ (الغزو الفكري والإلحاد)
শিক্ষাব্যবস্থা, মূলধারার মিডিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহারের ফলে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে উদারতাবাদ (Liberalism), নাস্তিক্যবাদ ও পশ্চিমা খোলামেলা অপসংস্কৃতির বিষবাষ্প দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। অনেকেই দ্বীনকে প্রগতির অন্তরায় মনে করতে শুরু করেছে।
৫. এনজিও ও খ্রিস্টান মিশনারিদের সংঘবদ্ধ ধর্মান্তর তৎপরতা (نشاط التنصير)
উত্তরবঙ্গ, উপকূলীয় অঞ্চল এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের দরিদ্র পাহাড়ি ও দলিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে অভাব ও দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক খ্রিস্টান মিশনারিরা কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে সেবার আড়ালে ধর্মান্তর প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। তাদের তুলনায় মুসলিম দাওয়াতী সংস্থাগুলোর সামাজিক সেবামূলক বাজেট অত্যন্ত অপ্রতুল।
৬. অর্থনৈতিক সংকট ও নৈতিক অবক্ষয় (المشاكل الاقتصادية والفساد)
চরম দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও মুদ্রাস্ফীতির কারণে সমাজে সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি ও মাদকের ভয়াল বিস্তার ঘটেছে। পেটের ক্ষুধার তাড়নায় বহু মানুষ নৈতিক আদর্শ জলাঞ্জলি দিচ্ছে, যা দাওয়াতের কাজকে ভীষণভাবে ব্যাহত করে।
৭. আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর দাওয়াতী কৌশলের দুর্বলতা
সোশ্যাল মিডিয়া, শর্ট ভিডিও, পডকাস্ট, অ্যাপস ও আন্তর্জাতিক মানের গবেষণার মাধ্যমে আধুনিক শিক্ষিত তরুণ ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণির কাছে দাওয়াত পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দাঈদের কাঠামোগত দুর্বলতা এখনো প্রকট।
সমাধানের উপায়
- আলেম-উলামাদের মধ্যে মৌলিক তাওহীদ ও উম্মাহর স্বার্থে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা।
- দাওয়াতের সাথে সামাজিক সেবা ও দারিদ্র্য দূরীকরণ কর্মসূচি (ক্বরযে হাসানা, যাকাত ফান্ড) যুক্ত করা।
- তথ্যপ্রযুক্তি ও আধুনিক যোগাযোগ মাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে তরুণ সমাজের ভাষায় দাওয়াত উপস্থাপন করা।
উপসংহার
সমস্যা যতই জটিল হোক না কেন, প্রজ্ঞা, ইখলাস, নিঃস্বার্থ সেবা ও সুপরিকল্পিত সমন্বয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশে দাওয়াতের ময়দানকে এক নতুন দিগন্তে রূপান্তর করা সম্ভব।
٧- اكتب نبذة من حياة خان جهان علي رحمه الله ثم تحدث عن أعماله الدعوية-
হযরত খান জাহান আলী (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী লেখ এবং তাঁর গৌরবোজ্জ্বল দাওয়াতী কার্যক্রম ও অবদান সম্পর্কে আলোচনা কর।
ভূমিকা
বাংলায় ইসলাম প্রচারে যেসকল মহান সুফি-সাধক, যোদ্ধা ও ধর্মপ্রচারক অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেছেন, তাঁদের মধ্যে হযরত উলুগ খান জাহান আলী (রহ.) অন্যতম শীর্ষস্থানীয়। পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে অবিভক্ত বাংলার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল (যশোর, খুলনা ও বাগেরহাট)-এর গহিন জঙ্গল পরিষ্কার করে তিনি যেমন একটি সমৃদ্ধ জনপদ গড়ে তুলেছিলেন, তেমনি লক্ষ লক্ষ মানুষের মাঝে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দিয়েছিলেন।
(ক) খান জাহান আলী (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী
- পরিচয় ও আগমন: তিনি তুর্কি বংশোদ্ভূত ছিলেন। তাঁর মূল নাম ছিল ‘উলুগ খান’ এবং উপাধি ছিল ‘খান জাহান’ (বিশ্বের শাসক)। ধারণা করা হয় তিনি দিল্লির তুঘলক সালতানাতের অধীনে একজন দক্ষ সেনাপতি ও প্রশাসক ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি পার্থিব পদমর্যাদা ত্যাগ করে দ্বীনের মহান দাওয়াতী উদ্দেশ্যে বাংলায় হিজরত করেন।
- খলিফাতাবাদ রাজ্য প্রতিষ্ঠা: তিনি তৎকালীন ভাটি অঞ্চলের সুন্দরবনের হিংস্র বাঘ ও বন্য পশুতে ঘেরা বনভূমি পরিষ্কার করে এক স্বাধীন ও ন্যায়ভিত্তিক জনপদ গড়ে তোলেন, যার নাম দেওয়া হয় ‘খলিফাতাবাদ’ (বর্তমান বাগেরহাট জেলা)।
- ইন্তেকাল: এই মহান সাধক ৮৬৩ হিজরীর ২৬শে যিলহজ (১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দের ২৫শে অক্টোবর) বাগেরহাটে ইন্তেকাল করেন। বাগেরহাটে তাঁর মাজার শরীফ আজ অবধি লক্ষ লক্ষ মানুষের জিয়ারতগাহ।
(খ) أعماله الدعوية (খান জাহান আলীর দাওয়াতী কার্যক্রম ও অবদান)
খান জাহান আলী (রহ.)-এর দাওয়াতী পদ্ধতি ছিল একাধারে আত্মিক, সামাজিক ও সেবামূলক—যা ইতিহাসে ‘দাওয়াত বিল খিদমাহ’ (জনসেবার মাধ্যমে দ্বীন প্রচার) নামে সুপরিচিত:
১. সাম্য ও মানবিক মর্যাদার মাধ্যমে গণ-ধর্মান্তর
তৎকালীন দক্ষিণ বাংলার সমাজে হিন্দু বর্ণপ্রথার শিকার নিম্নবর্ণের নির্যাতিত হিন্দু ও বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী খান জাহান আলীর ইসলামী সাম্য ও ভালোবাসায় মুগ্ধ হয়ে দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করে। তিনি কোনো তরবারি চাপিয়ে দেননি, বরং আখলাক ও সেবার মাধ্যমে তাদের হৃদয় জয় করেছিলেন।
২. মসজিদ নির্মাণ ও শিক্ষাকেন্দ্রের বিস্তার
তিনি যেখানেই বসতি স্থাপন করেছেন, সেখানেই নামাজের জন্য দৃষ্টিনন্দন মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেছেন। এই মসজিদগুলো ছিল একাধারে সালাত, বিচারালয় এবং দাওয়াত ও ইলমের কেন্দ্র:
- ঐতিহাসিক ষাটগম্বুজ মসজিদ: বাগেরহাটে অবস্থিত এই সুবিশাল ৭৭টি গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদটি স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন, যা ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব ঐতিহ্য (World Heritage Site) হিসেবে ঘোষিত।
- এছাড়াও নয়গম্বুজ মসজিদ, রণবিজয়পুর মসজিদ, জিন্দা পীর মসজিদ এবং চুনখোলা মসজিদ তাঁর অক্ষয় দাওয়াতী স্মারক।
৩. পানীয় জলের সংকট দূরীকরণে বিশাল দীঘি খনন
দক্ষিণ বাংলার লবণাক্ত উপকূলীয় অঞ্চলে মিঠা পানির তীব্র সংকট ছিল। মানুষের এই চরম কষ্ট দূর করতে তিনি বহু বিশাল দীঘি খনন করেন। এর ফলে হাজার হাজার মানুষ উপকৃত হয় এবং ইসলামের প্রতি অনুরক্ত হয়:
- ঠাকুরদীঘি (খান জাহান আলীর দীঘি): বাগেরহাটের মাজার সংলগ্ন সুবিশাল দীঘি।
- ঘোড়াদীঘি: ষাটগম্বুজ মসজিদের পশ্চিমে অবস্থিত বিশালাকার দীঘি।
৪. রাস্তাঘাট ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন
তিনি চট্টগ্রাম ও ঢাকা থেকে বাগেরহাট-যশোর পর্যন্ত শত শত কিলোমিটার দীর্ঘ চওড়া রাস্তা নির্মাণ করেন (যা খান জাহানী সড়ক নামে পরিচিত)। এই যোগাযোগ ব্যবস্থার ফলে দূর-দূরান্ত থেকে আলেম ও ব্যবসায়ীরা এই অঞ্চলে এসে দ্বীনের প্রচার বাড়াতে সক্ষম হন।
উপসংহার
হযরত খান জাহান আলী (রহ.) কেবল একজন দরবেশ ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন দূরদর্শী দাঈ, দক্ষ নগর পরিকল্পনাবিদ ও মানবপ্রেমিক শাসক। দক্ষিণ বাংলায় ইসলামের শিকড় মজবুত করার পেছনে তাঁর দাওয়াতী অবদান চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
٨- علق على اثنين من التالية:
নিম্নের যে কোনো দুটি বিষয়ে সারগর্ভ টীকা লেখ। (শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক প্রস্তুতির স্বার্থে নিম্নে চারটি বিষয়েরই পুঙ্খানুপুঙ্খ সমাধান উপস্থাপন করা হলো):
(أ) أهمية الدعوة الإسلامية (ইসলামী দাওয়াতের গুরুত্ব)
১. দাওয়াতের অপরিহার্য প্রয়োজনীয়তা:
ইসলামী দাওয়াত হলো দ্বীন ইসলামের প্রাণভোমরা। দাওয়াত বন্ধ হয়ে গেলে সমাজ জাহেলিয়াতে নিমজ্জিত হয়। আল্লাহ তা’আলা উম্মতে মুহাম্মদীকে সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মত হিসেবে ঘোষণা করেছেন শুধুমাত্র দাওয়াতের কারণে:
﴿كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ﴾
“তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মত, মানবজাতির কল্যাণের জন্যই যাদের উত্থান ঘটানো হয়েছে; তোমরা সৎকাজের আদেশ করবে, অসৎকাজে নিষেধ করবে এবং আল্লাহর ওপর ঈমান রাখবে।” (সূরা আলে ইমরান: ১১০)।
২. আম্বিয়ায়ে কিরামের দায়িত্বের উত্তরাধিকার:
যেহেতু নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর পর আর কোনো নতুন নবী আসবেন না, তাই নবুওয়াতের এই দাওয়াতী মিশন পরিচালনার দায়িত্ব সমগ্র উম্মতের কাঁধে অর্পিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: «بَلِّغُوا عَنِّي وَلَوْ آيَةً» (আমার পক্ষ থেকে একটি বাণী হলেও মানুষের কাছে পৌঁছে দাও—সহীহ বুখারী)।
৩. আজাব থেকে রক্ষা ও পরকালীন মুক্তি:
সমাজে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের প্রতিরোধ না থাকলে সমগ্র জাতির ওপর আল্লাহর ব্যাপক আজাব নেমে আসে। অতএব ব্যক্তি ও জাতির পার্থিব ও পরকালীন সুরক্ষার জন্য দাওয়াত অতীব জরুরি।
(ب) أركان الدعوة الإسلامية (ইসলামী দাওয়াতের রুকনসমূহ)
বালাগত ও উলূমুদ দাওয়াহর পণ্ডিতদের মতে একটি পূর্ণাঙ্গ দাওয়াতী প্রক্রিয়ার মৌলিক চারটি রুকন বা উপাদান রয়েছে:
- আদ-দা’ঈ (الدَّاعِي – আহ্বানকারী): যিনি দাওয়াত পেশ করেন। তাঁর প্রধান গুণাবলি হলো—ইখলাস, ইলম, ধৈর্য, প্রজ্ঞা এবং নিজের কথায় ও কাজে মিল থাকা।
- আল-মাদ’ঊ (المَدْعُو – যাকে আহ্বান করা হয়): দাওয়াতের পাত্র বা লক্ষ্যদল। মাদ’ঊর মানসিক অবস্থা, ধর্মবিশ্বাস ও চিন্তাধারা অনুযায়ী দাঈকে কৌশল নির্ধারণ করতে হয়।
- মাওদূ’উদ দাওয়াহ (مَوْضُوعُ الدَّعْوَةِ – দাওয়াতের বিষয়বস্তু): অর্থাৎ কুরআন ও সুন্নাহর পরিপূর্ণ রূপরেখা—তাওহীদ, রিসালাত, আখিরাত, ইবাদত, হালাল-হারাম ও উন্নত নৈতিকতা।
- ওয়াসীলাতুদ দাওয়াহ (وَسِيلَةُ الدَّعْوَةِ – দাওয়াতের মাধ্যম ও পদ্ধতি): যার সাহায্যে দাওয়াত পৌঁছানো হয়; যেমন: বক্তব্য, লেখনী, আধুনিক ডিজিটাল মিডিয়া, ব্যক্তিগত সংলাপ এবং জনসেবামূলক কাজ।
(ج) مناهج دعوة موسى عليه السلام (হযরত মূসা আ.-এর দাওয়াতী পদ্ধতিসমূহ)
হযরত মূসা (আ.) ছিলেন বনী ইসরাঈলের প্রতি প্রেরিত মহান উলুল আযম রাসূল। তাঁর দাওয়াতের প্রধান পদ্ধতিগুলো ছিল:
- স্বৈরাচারী রাজার সামনে নির্ভীক কিন্তু কোমল দাওয়াত: ফিরাউনের রাজদরবারে গিয়ে অত্যন্ত নম্র ভাষায় আল্লাহর দাসত্ব ও বনী ইসরাঈলকে মুক্ত করার দাবি তুলে ধরা (﴿فَقُولَا لَهُ قَوْلًا لَيِّنًا﴾)।
- মু’জিজার সাহায্যে সত্যের অকাট্য প্রমাণ: ফিরাউনের জাদুকরদের সামনে লাঠি ও শুভ্র হাতের উজ্জ্বল মু’জিজা প্রদর্শন করে জাদুকরদের সেজদায় অবনত হতে বাধ্য করা।
- অবাধ্য কওমের ওপর সীমাহীন ধৈর্য: বনী ইসরাঈলের বারবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, গোবৎস পূজা এবং অদ্ভুত আবদার সত্ত্বেও পরম স্নেহে তাদের তাওরাতের বিধিবিধান শিক্ষা দেওয়া।
- নিপীড়িত জাতিকে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ করা: দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে এক স্বাধীন তাওহীদী জাতিতে রূপান্তর করা।
(د) خدمات الشاه نثار احمد رحمه الله (মাওলানা শাহ নেছারুদ্দীন আহমদ রহ.-এর অবদান)
১. সংক্ষিপ্ত পরিচিতি:
কুতুবুল আলম আল্লামা শাহ সুফি নেছারুদ্দীন আহমদ (রহ.) (১৮৭৩-১৯৫২ খ্রি.) ছিলেন অবিভক্ত বাংলা ও আসামের এক যুগান্তকারী ইসলামী চিন্তাবিদ, আধ্যাত্মিক সাধক এবং ঐতিহ্যবাহী ‘ছারছীনা দরবার শরীফ’-এর প্রতিষ্ঠাতা পীর ছাহেব। তিনি ফুরফুরার মুজাদ্দিদে জামান হযরত আবু বকর সিদ্দিকী (রহ.)-এর প্রধান খলীফা ছিলেন।
২. দ্বীনী ও দাওয়াতী অবদানসমূহ:
- মাদরাসা শিক্ষা আন্দোলন: তিনি ১৯১৫ সালে ‘ছারছীনা দারুসসুন্নাত আলিয়া মাদরাসা’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীতে দেশের অন্যতম শীর্ষ দ্বীনী শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হয়। এছাড়াও তিনি তৎকালীন বাংলাজুড়ে শত শত কুরআনুল কারীমের হাফিজিয়া ও কওমী-আলিয়া মাদরাসা ও মক্তব প্রতিষ্ঠা করেন।
- বিদ’আত ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আপসহীন জিহাদ: ইসলাম প্রচারের নামে সমাজে প্রচলিত পীরপূজা, গান-বাজনা ও শিরকী রসম-রেওয়াজের বিরুদ্ধে তিনি লেখনী ও ওয়াজ-নসীহতের মাধ্যমে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
- জমিয়তে হিযবুল্লাহ প্রতিষ্ঠা: মুসলমানদের ধর্মীয় ও সামাজিক কল্যাণে এবং ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের স্বার্থে তিনি ‘জমিয়তে হিযবুল্লাহ’ সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন।
- কাদিয়ানী ফেতনার প্রতিরোধ: ভণ্ড নবী মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর কুফরী আকীদার বিরুদ্ধে তিনি বলিষ্ঠ অবস্থান নেন এবং তৌহীদি জনতাকে সচেতন করেন। তাঁর জীবন ছিল সুন্নাত প্রতিষ্ঠা ও দ্বীনের বিশুদ্ধ দাওয়াতের এক জীবন্ত আলোকবর্তিকা।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. আল-কুরআনের আলোকে দাওয়াতের তিনটি মূল পদ্ধতি কী কী?
উত্তর: সূরা আন-নাহলের ১২৫ নম্বর আয়াতের আলোকে দাওয়াতের তিনটি মূল পদ্ধতি হলো: (১) আল-হিকমাহ (প্রজ্ঞা ও যুক্তিপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি), (২) আল-মাও’ইযাতুল হাসানাহ (কোমল ও দরদমাখা নসীহত), এবং (৩) আল-মুজাদালাহ বিল্লাতী হিয়া আহসান (উত্তম পন্থায় শালীন ও প্রমাণ্য বিতর্ক)।
২. হযরত নূহ (আ.) তাঁর জাতিকে কত বছর দাওয়াত দিয়েছিলেন?
উত্তর: পবিত্র কুরআনের সূরা আল-আনকাবূতের ১৪ নম্বর আয়াতের সুস্পষ্ট ঘোষণা অনুযায়ী হযরত নূহ (আ.) তাঁর স্বজাতিকে দীর্ঘ ৯৫০ (নয়শত পঞ্চাশ) বছর ধরে অবিরাম তাওহীদের দাওয়াত প্রদান করেছিলেন।
৩. রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াস কি সত্য জানার পরও ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন?
উত্তর: না, তিনি আবু সুফিয়ানের সাক্ষ্য থেকে মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুওয়াতের সত্যতা শতভাগ নিশ্চিত হওয়া সত্ত্বেও রোমান যাজক ও সেনাপতিদের বিদ্রোহের ভয়ে এবং রাজসিংহাসন হারানোর আশঙ্কায় শেষ পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণ করেননি।
৪. হযরত ইব্রাহিম (আ.) কীভাবে নক্ষত্রপূজকদের যুক্তিতে পরাস্ত করেছিলেন?
উত্তর: তিনি চন্দ্র, সূর্য ও নক্ষত্রের ক্রমান্বয়ে উদয় ও অস্ত যাওয়া পর্যবেক্ষণ করিয়ে প্রমাণ করেছিলেন যে—যা কিছু অস্ত যায় ও পরিবর্তনশীল, তা কখনো চিরন্তন স্রষ্টা হতে পারে না; বরং এগুলোর যিনি স্রষ্টা কেবল তিনিই ইবাদতের যোগ্য।
৫. দক্ষিণ বাংলায় ইসলাম প্রচারে হযরত খান জাহান আলী (রহ.)-এর মূল কৌশল কী ছিল?
উত্তর: তাঁর মূল কৌশল ছিল ‘দাওয়াত বিল খিদমাহ’ বা জনসেবামূলক কাজের মাধ্যমে দাওয়াত দেওয়া; যার মধ্যে লবণাক্ত অঞ্চলে বিশাল দীঘি খনন করে মিষ্টি পানির ব্যবস্থা করা, সড়ক নির্মাণ এবং সুন্দরবন পরিষ্কার করে নিপীড়িত মানুষের পুনর্বাসন অন্যতম।
৬. ছারছীনা দরবারের প্রতিষ্ঠাতা শাহ নেছারুদ্দীন আহমদ (রহ.)-এর সবচেয়ে বড় কীর্তি কী?
উত্তর: তাঁর সবচেয়ে বড় কীর্তি হলো বাংলায় বিশুদ্ধ কুরআন-সুন্নাহ ও সুন্নাতভিত্তিক দ্বীনী শিক্ষার প্রসারকল্পে ‘ছারছীনা দারুসসুন্নাত আলিয়া মাদরাসা’ এবং আলেম ও জনতাকে ঐক্যবদ্ধ করতে ‘জমিয়তে হিযবুল্লাহ’ প্রতিষ্ঠা করা।