পরীক্ষা কোড: ২০৪ | প্রশ্নপত্র কোড: ১৮৪
ফাজিল (স্নাতক) সম্মান চতুর্থ বর্ষ পরীক্ষা, ২০২১
বিভাগ: ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
বিষয়: আল-মাযাহিব আল-ফিকহিয়্যাহ (দ্বিতীয় পত্র)
[Al-Madhahib al-Fiqhiyyah (Paper II)]
বিষয় কোড: ২০৫৪০২
সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০
مجموعة (الف) : الأسئلة الإنشائية [ক বিভাগ: রচনামূলক প্রশ্ন]
[দ্রষ্টব্য: যেকোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও। প্রতিটি প্রশ্নের মান ১৫: ১৫ × ৪ = ৬০]
١- ما هو علم الفقه؟ ثم بين نشأته وتطوره مع ذكر اهميته في الاسلام-
[১. বাংলা অনুবাদ: علم الفقه কাকে বলে? অতঃপর ইসলামে এর গুরুত্ব বর্ণনাপূর্বক এ শাস্ত্রের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
ইসলামী জীবনব্যবস্থাকে সুশৃঙ্খল ও গতিশীল রাখতে এবং কুরআন ও সুন্নাহর বিধানাবলিকে মানুষের বাস্তব জীবনে প্রয়োগোপযোগী করতে যে শাস্ত্রটি সর্বাধিক ভূমিকা পালন করেছে, তা হলো ‘ইলমুল ফিকহ’ (علم الفقه)। মানুষের ব্যক্তিগত ইবাদত থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক কূটনীতি পর্যন্ত জীবনের প্রতিটি অঙ্গনের পথনির্দেশ ফিকহ শাস্ত্রের মাধ্যমেই নিশ্চিত হয়।
ইলমুল ফিকহের পরিচয় ও সংজ্ঞা
আভিধানিক অর্থ: ‘ফিকহ’ (فقه) আরবি শব্দ, যার অর্থ কোনো বিষয়ের গভীর উপলব্ধি, সূক্ষ্ম জ্ঞান ও প্রজ্ঞা। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
قَالُوا يَا شُعَيْبُ مَا نَفْقَهُ كَثِيرًا مِّمَّا تَقُولُ
অর্থ: “তারা বলল, হে শুআইব! তুমি যা বলছ তার অনেক কথাই আমরা বুঝতে পারছি না।” (সূরা হূদ: ৯১)। এখানে ‘নাফকাহু’ শব্দটি গভীর উপলব্ধি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।
পারিভাষিক সংজ্ঞা:
- ইমাম আবু হানিফা (র.)-এর মতে: “الفقه معرفة النفس ما لها وما عليها” অর্থাৎ, “মানুষের অনুকূল ও প্রতিকূল বিষয়াবলি (অধিকার ও দায়িত্ব) সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখাই হলো ফিকহ।” পরবর্তীতে আকিদা ও তাসাউফ পৃথক হলে একে ‘আমলি ফিকহ’ হিসেবে নির্দিষ্ট করা হয়।
- আল্লামা বাযদবী ও জমহুর উসূলবিদদের মতে: “الفقه هو العلم بالأحكام الشرعية العملية المكتسبة من أدلتها التفصيلية” অর্থাৎ, “বিস্তারিত ও সুনির্দিষ্ট প্রামাণ্য উৎসসমূহ (কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াস) থেকে উদ্ভাবিত ইসলামী শরিয়তের বাস্তব আমলভিত্তিক বিধানাবলির গভীর জ্ঞানই হলো ফিকহ।”
ফিকহ শাস্ত্রের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস
ফিকহ শাস্ত্রের ঐতিহাসিক বিকাশকে মূলত পাঁচটি যুগে বিভক্ত করা যায়:
- নবুওয়াত যুগ (১ম হিজরি/রাসূলুল্লাহ সা.-এর যুগ): এটি ফিকহের ভিত্তিকাল। এ যুগে বিধান প্রণয়নের একমাত্র উৎস ছিল ওহী (ওহীয়ে মাতলু বা কুরআন এবং ওহীয়ে গাইরে মাতলু বা হাদিস)। সাহাবিগণ কোনো সমস্যার মুখোমুখি হলে সরাসরি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে সমাধান চাইতেন এবং ওহীর মাধ্যমে সমাধান দেওয়া হতো।
- খুলাফায়ে রাশেদীন ও সাহাবিদের যুগ: রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর নতুন অঞ্চলের বিজয়ের ফলে মুসলিম সমাজে নানা নতুন জটিল মাসআলার সৃষ্টি হয়। হযরত আবু বকর, উমর, উসমান ও আলী (রা.) এবং ফকীহ সাহাবিগণ (যেমন: আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ, আয়েশা, যায়েদ ইবনে সাবিত রা.) কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইজতিহাদ ও পরামর্শের ভিত্তিতে সমাধান দিতেন। এ যুগে ইজমা ও ইজতিহাদের বিকাশ ঘটে।
- তাবেয়ি ও প্রাচীন ফিকহী পাঠশালার যুগ (উমাইয়া আমল): এ যুগে মুসলিম বিশ্বে ফিকহের দুটি বড় ঘরানা গড়ে ওঠে:
- মাদরাসাতুল হাদিস (হিজায/মদিনা): যার নেতৃত্বে ছিলেন সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব ও উরওয়া ইবনুয যুবাইর প্রমুখ। তাঁরা হাদিস ও আসারকে প্রাধান্য দিতেন।
- মাদরাসাতুর রায় বা কূফা পাঠশালা (ইরাক): যার নেতৃত্বে ছিলেন আলক্বামাহ, ইবরাহীম নাখঈ প্রমুখ। তাঁরা যুক্তি, সাদৃশ্য ও কার্যকারণভিত্তিক ইজতিহাদকে প্রাধান্য দিতেন।
- মাযহাবসমূহ গঠন ও সংকলনের স্বর্ণযুগ (আব্বাসীয় আমল): দ্বিতীয় ও তৃতীয় হিজরিতে চার প্রধান ইমামের মাধ্যমে ফিকহ শাস্ত্রের পূর্ণাঙ্গ সংকলন সম্পন্ন হয়। ইমাম আবু হানিফা (৮০-১৫০ হি.), ইমাম মালিক (৯৩-১৭৯ হি.), ইমাম শাফেয়ী (১৫০-২০৪ হি.) এবং ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (১৬৪-২৪১ হি.) উসূল ও কাওয়ায়েদ প্রতিষ্ঠা করে ফিকহকে বিশ্বকোষীয় রূপ দেন।
- স্থায়ীকরণ ও তারজীহের যুগ: পরবর্তীতে ফুকাহায়ে কিরাম নিজ নিজ মাযহাবের মূলনীতির ওপর নতুন নতুন মাসআলার সমাধান (তাখরীজ ও তারজীহ) প্রণয়ন করেন এবং বর্তমান যুগ পর্যন্ত যুগোপযোগী ফতোয়া প্রদান করে আসছেন।
ইসলামে ফিকহ শাস্ত্রের গুরুত্ব
- শুদ্ধ আমলের নিশ্চয়তা: নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত ইত্যাদি ইবাদত কীভাবে বিশুদ্ধভাবে আদায় করতে হবে তা ফিকহ ছাড়া জানা অসম্ভব।
- হালাল-হারামের সীমারেখা নির্ধারণ: ব্যবসা-বাণিজ্য, চুক্তি, পারিবারিক জীবন ও রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে কোনটি বৈধ ও কোনটি নিষিদ্ধ তা ফিকহ স্পষ্ট করে।
- ইসলামের গতিশীলতা রক্ষা: কিয়াস ও ইজতিহাদের মাধ্যমে কিয়ামত পর্যন্ত উদ্ভূত আধুনিক সমস্যার (যেমন: অঙ্গ প্রতিস্থাপন, কৃত্রিম প্রজনন, ডিজিটাল কারেন্সি ইত্যাদি) সমাধান দিতে ফিকহ অপরিহার্য।
উপসংহার
ইলমুল ফিকহ হলো ইসলামের প্রাণশক্তির ধারক। এটি কুরআন ও সুন্নাহর মহাসমুদ্র থেকে ব্যবহারিক জীবনের মণিমুক্তা আহরণের একমাত্র নির্ভরযোগ্য মাধ্যম।
٢- اذكر نبذا من حياة الامام الأعظم ابى حنيفة (رح) مع بيان خدماته في علم الفقه-
[২. বাংলা অনুবাদ: ইমাম আজম আবু হানীফা (রহ) এর জীবনী লেখ। ফিক্হ শাস্ত্রে তাঁর অবদান বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
ইসলামী ফিকহ শাস্ত্রের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র এবং সর্বাধিক অনুসৃত হানাফী মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা হলেন ‘ইমামে আজম’ হযরত আবু হানিফা নোমান ইবনে সাবিত (রহ.)। ফিকহের জটিল শাখা-প্রশাখাকে নিয়মতান্ত্রিক শৃঙ্খলায় আবদ্ধ করে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার কৃতিত্ব তাঁরই প্রাপ্য।
ইমাম আজম আবু হানিফা (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী
- জন্ম ও পরিচয়: তিনি ৮০ হিজরি (৬৯৯ খ্রি.) মোতাবেক উমাইয়া খলিফা আব্দুল মালিকের রাজত্বকালে ইরাকের কূফা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর নাম নোমান, পিতার নাম সাবিত এবং উপনাম আবু হানিফা। তিনি পারস্যের সম্ভ্রান্ত পরিবারের বংশধর ছিলেন।
- তাবেয়ির মর্যাদা: ইমাম আবু হানিফা (রহ.) একজন মর্যাদাবান তাবেয়ি ছিলেন। তিনি প্রখ্যাত সাহাবি হযরত আনাস ইবনে মালিক, আব্দুল্লাহ ইবনে আবী আওফা (রা.) প্রমুখ সাহাবির সাক্ষাৎ লাভ করেছেন এবং তাঁদের থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন।
- শিক্ষা ও দীক্ষা: প্রথমে তিনি বস্ত্র ব্যবসায়ী ছিলেন। ইমাম শা’বী (রহ.)-এর উৎসাহে তিনি ইলম অর্জনে আত্মনিয়োগ করেন। ইলমুল কালামে পারদর্শিতা অর্জনের পর তিনি কূফার তৎকালীন শ্রেষ্ঠ ফকীহ হযরত হাম্মাদ ইবনে আবী সুলাইমান (রহ.)-এর দীর্ঘ ১৮ বছর সান্নিধ্যে থেকে ফিকহ শাস্ত্রে পূর্ণ পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। এছাড়া তিনি ইমাম জাফর আস-সাদিক, আতা ইবনে আবী রাবাহ এবং মক্কা-মদিনার প্রখ্যাত আলিমদের নিকট থেকে হাদিস ও ফিকহ অর্জন করেন।
- চরিত্রমাধুর্য ও তাকওয়া: তিনি ছিলেন অসামান্য আল্লাহভীরু ও পরম দানশীল। সারাদিন রোজা রাখতেন এবং রাতে দীর্ঘ সময় তাহাজ্জুদ নামাজে রত থাকতেন। তিনি ৪০ বছর ধরে এশার ওযু দিয়ে ফজরের নামাজ আদায় করতেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণিত আছে।
- আপসহীনতা ও শাহাদাত: আব্বাসীয় খলিফা আল-মনসুর তাঁকে প্রধান বিচারপতির (ক্বাযিউল কুযাত) পদ গ্রহণের জন্য চাপ প্রয়োগ করেন। সরকারের রাজনৈতিক অন্যায়ের সহযোগী না হওয়ার দৃঢ়তায় তিনি পদ গ্রহণে অসম্মতি জানান। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে মনসুর তাঁকে কারারুদ্ধ করে চরম নির্যাতন করেন। অবশেষে ১৫০ হিজরিতে (৭৬৭ খ্রি.) ৭০ বছর বয়সে কারাগারেই তিনি বিষপ্রয়োগে শাহাদাত বরণ করেন।
ফিকহ শাস্ত্রে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর অবিস্মরণীয় অবদান
- ফিকহ সম্পাদনা কমিটি গঠন (গণতান্ত্রিক অ্যাকাডেমি): ইমাম আবু হানিফা এককভাবে ফতোয়া দিতেন না। তিনি কূফায় ৪০ জন প্রথিতযশা ফকীহ ও মুহাদ্দিসের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন ফিকহ অ্যাকাডেমি গঠন করেন। ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মদ, জুফার, হাসান ইবনে যিয়াদ প্রমুখের সাথে গভীর বিতর্ক ও পর্যালোচনার পর একটি মাসআলা চূড়ান্ত করা হতো।
- আনুমানিক ফিকহ (الفقه التقديري): তিনি শুধু বিদ্যমান সমস্যার সমাধান দেননি, বরং ভবিষ্যতে যেসব সম্ভাব্য সমস্যা ও ঘটনা ঘটতে পারে—এমন আনুমানিক লক্ষাধিক মাসআলার যৌক্তিক সমাধান তৈরি করে রেখে যান।
- ফিকহী অধ্যায়সমূহের শ্রেণিবিন্যাস: তিনিই সর্বপ্রথম ফিকহকে কিতাবুত তাহারাত, কিতাবুস্ সালাত, কিতাবুল বুয়ূ ইত্যাদি নিয়মতান্ত্রিক অধ্যায়ে সুসজ্জিত করেন, যা পরবর্তী সকল মাযহাব অনুসরণ করেছে।
- ইস্তিহসান নীতির প্রবর্তন: কঠোর উপমার বিপরীতে জনকল্যাণ ও সহজতার স্বার্থে তিনি ‘ইস্তিহসান’ (উত্তম বিকল্প গ্রহণ) নীতির সার্থক প্রয়োগ ঘটান।
- সুযোগ্য ছাত্র তৈরি: তিনি এমন একদল ছাত্র তৈরি করে যান যাঁরা জ্ঞানজগতে অমরত্ব লাভ করেন। ইমাম আবু ইউসুফ আব্বাসীয় খিলাফতের প্রধান বিচারপতি হয়ে হানাফী ফিকহকে রাষ্ট্রীয় আইনে পরিণত করেন এবং ইমাম মুহাম্মদ ইবনুল হাসান আশ-শায়বানী ‘জাহিরুর রিওয়ায়াহ’-এর ছয়টি বিশ্ববিখ্যাত কিতাবের মাধ্যমে এ ফিকহ চিরস্থায়ী করেন।
উপসংহার
ইমাম শাফেয়ী (রহ.) সত্যই বলেছেন: “الناس في الفقه عيال على أبي حنيفة” অর্থাৎ, “ফিকহ শাস্ত্রে সমগ্র মুসলিম জাতি আবু হানিফার পরিবারের মতো মুখাপেক্ষী।” তাঁর অবদান ইসলামী আইনের ইতিহাসে এক চিরভাস্বর আলোকবর্তিকা।
٣- عرّف التقليد- بيّن اقسامه وحاجته وقبوليته مفصلا-
[৩. বাংলা অনুবাদ: التقليد এর পরিচয় দাও। এর প্রকারভেদ প্রয়োজনীয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
ইসলামী শরিয়তে দ্বীনদারির সুরক্ষা এবং সাধারণ মানুষের জন্য কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক আনুগত্য নিশ্চিত করতে তাকলিদ একটি প্রতিষ্ঠিত নীতি। ইজতিহাদের যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও মনগড়া ব্যাখ্যা পরিহার করে নির্ভরযোগ্য মুজতাহিদ ইমামের অনুসরণই হলো তাকলিদ।
তাকলিদের পরিচয় ও সংজ্ঞা
আভিধানিক অর্থ: তাকলিদ (تقليد) শব্দটি আরবি ‘ক্বিলাদাহ’ (قلادة) শব্দমূল থেকে এসেছে, যার অর্থ গলায় হার বা রশি পরানো, কারো ওপর দায়িত্ব অর্পণ করা বা আনুগত্যের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: উসূলুল ফিকহের পরিভাষায়:
“التقليد هو قبول قول الغير بلا حجة”
অর্থ: “দলিলের বিস্তারিত উৎস না জেনে কোনো মুজতাহিদ ইমামের কথাকে প্রামাণ্য জেনে মেনে নেওয়া ও আমল করাই হলো তাকলিদ।” ইমাম সুয়ূতী ও ইবনুল হুমাম বলেন, দলিলবিহীন ব্যক্তির নয়, বরং যিনি দলিল সম্পর্কে দক্ষ তাঁর রায়কে বিশ্বস্ততার কারণে গ্রহণ করাই তাকলিদ।
তাকলিদের প্রকারভেদ
তাকলিদ প্রধানত দুই প্রকার:
- তাকলিদে শাখসী (ব্যক্তি নির্দিষ্ট তাকলিদ): কোনো একজন নির্দিষ্ট মুজতাহিদ ইমামের (যেমন: ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফেয়ী বা ইমাম আহমদ বিন হাম্বল) ফিকহী মূলনীতি ও রায়ের সামগ্রিক অনুগত হওয়া। বর্তমান যুগে দ্বীনের শৃঙ্খলা রক্ষা ও খেয়ালখুশি পরিহার করতে তাকলিদে শাখসী ওয়াজিব বলে জমহুর আলিমগণ একমত হয়েছেন।
- তাকলিদে গাইরে শাখসী (নির্দিষ্টতাহীন তাকলিদ): কোনো নির্দিষ্ট ইমামের অনুসরণ না করে একেক সময় একেক মুজতাহিদের ফতোয়া গ্রহণ করা। এতে নফসের গোলামি ও সুবিধাবাদের (তালফীক্ব) ব্যাপক আশঙ্কা থাকে।
তাকলিদের প্রয়োজনীয়তা
- সবার জন্য ইজতিহাদ অসম্ভব: আল-কুরআন ও হাদিসের নাসিখ-মানসূখ, মুতল্লাক-মুক্বাইয়্যাদ, আম-খাছ, ইল্লত ও ব্যাকরণগত জটিলতা বুঝে সরাসরি দলিল থেকে মাসআলা বের করা সাধারণ মানুষের পক্ষে অসম্ভব। সাধারণ মানুষ যদি নিজেই ইজতিহাদ শুরু করে তবে সমাজে চরম বিভ্রান্তি ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে।
- কুরআনের নির্দেশ: মহান আল্লাহ আদেশ করেছেন:
فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِن كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ
অর্থ: “অতএব জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞাসা কর, যদি তোমরা না জানো।” (সূরা আন-নাহল: ৪৩)। এখানে অজ্ঞদের জন্য আলিমদের অনুসরণ করাকে সরাসরি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
- সাহাবি ও তাবেয়িদের আমল: সাধারণ সাহাবিগণ সকল বিষয়ে ফতোয়া দিতেন না, বরং ইবনে মাসউদ, যায়েদ ইবনে সাবিত, ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মতো মুজতাহিদ সাহাবিদের ফতোয়া কোনো দলিল যাচাই ছাড়াই গ্রহণ করতেন। এটাই ছিল সাহাবা যুগের তাকলিদ।
তাকলিদের গ্রহণযোগ্যতা ও সীমানা
- কার জন্য তাকলিদ গ্রহণযোগ্য: সাধারণ মানুষ (আম জনগণ) এবং যারা ইজতিহাদের স্তরে পৌঁছাননি, তাদের জন্য তাকলিদ করা সর্বসম্মতভাবে ওয়াজিব।
- কার জন্য তাকলিদ হারাম: যিনি মুজতাহিদে মুতত্লাক্ব এবং সরাসরি কুরআন ও হাদিস থেকে বিধান বের করার পূর্ণ যোগ্যতাসম্পন্ন, তাঁর জন্য অন্যের তাকলিদ করা নাজায়েজ।
- আকিদাগত বিষয়ে তাকলিদ নিষিদ্ধ: আল্লাহর অস্তিত্ব, তাওহিদ ও নবুওয়াতের মতো মৌলিক আকিদাগত বিষয়ে তাকলিদ গ্রহণযোগ্য নয়; এগুলো নিজস্ব বিবেক ও অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতে বিশ্বাস করতে হয়।
উপসংহার
তাকলিদ মানে অন্ধপূজা নয়, বরং বিশেষজ্ঞের ওপর আস্থা রেখে কুরআন-সুন্নাহর সঠিক অনুসারী হওয়া। চিকিৎসা বিজ্ঞানে যেমন ডাক্তারের পরামর্শ মেনে চলা অন্ধত্ব নয় বরং প্রজ্ঞা, তেমনি দ্বীনের ক্ষেত্রে তাকলিদ হলো শরিয়ত রক্ষার অন্যতম ঢাল।
٤- ماذا تفهم من المذاهب؟ ثم قارن بين المذهب الحنفى وبين الشافعى والمالكى والحنبلى موضحا-
[৪. বাংলা অনুবাদ: মাযহাব বলতে কী বুঝ? অতঃপর হানাফী মাযহাব এবং শাফেয়ী, মালেকী ও হাম্বলী মাযহাবের মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা কর।]
ভূমিকা
ইসলামের ব্যবহারিক জীবনে কুরআন ও সুন্নাহর বিধানাবলিকে সুনির্দিষ্ট মূলনীতির আলোকে প্রায়োগিক রূপ দেওয়ার নামই হলো ‘মাযহাব’। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের চার প্রধান ফিকহী মাযহাব মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের প্রতীক ও ফিকহী ঐতিহ্যের ধারক।
মাযহাবের ধারণা
আভিধানিক অর্থ: ‘মাযহাব’ (مذهب) আরবি শব্দ, এর অর্থ চলার পথ, মতবাদ, পদ্ধতি বা গৃহীত দৃষ্টিভঙ্গি।
পারিভাষিক অর্থ: কুরআন, সুন্নাহ ও অন্যান্য দলিল থেকে ইসলামী শরিয়তের বাস্তব বিধিবিধান আহরণের ক্ষেত্রে কোনো মুজতাহিদ ইমামের সুসংবদ্ধ উসূল, কর্মপদ্ধতি ও ফতোয়ার সামগ্রিক ধারাকে মাযহাব বলা হয়।
চার মাযহাবের মধ্যে তুলনামূলক পর্যালোচনা
চারটি মাযহাবই কুরআন ও সহিহ সুন্নাহকে মূল উৎস মানে। তবে বিধান আহরণের মাধ্যমিক উৎস (উসূল)-এর ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে কিছু বৈচিত্র্য রয়েছে:
| বৈশিষ্ট্য / মাযহাব | হানাফী মাযহাব | মালেকী মাযহাব | শাফেয়ী মাযহাব | হাম্বলী মাযহাব |
|---|---|---|---|---|
| প্রতিষ্ঠাতা | ইমাম আবু হানিফা (৮০-১৫০ হি.) | ইমাম মালিক (৯৩-১৭৯ হি.) | ইমাম শাফেয়ী (১৫০-২০৪ হি.) | ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (১৬৪-২৪১ হি.) |
| উৎপত্তি কেন্দ্র | কূফা (ইরাক) | মদিনা মুনাওয়ারা (হিজায) | মক্কা, বাগদাদ ও কায়রো (মিশর) | বাগদাদ (ইরাক) |
| ফিকহী পদ্ধতি | রায়, যুক্তি, কিয়াস ও ইস্তিহসানের গভীর প্রয়োগ। | আমালু আহলিল মাদীনাহ (মদিনাবাসীর অবিচ্ছিন্ন আমল) ও মাসালিহে মুরসালাহ। | হাদিস ও যুক্তির ভারসাম্যপূর্ণ উসূল; ‘কিতাবুর রিসালাহ’ রচনা। | হাদিস ও আসার-এর ওপর সর্বোচ্চ জোর; দুর্বল হাদিসকেও কিয়াসের ওপর অগ্রাধিকার। |
| সাহাবিদের ফতোয়া | একক সাহাবির রায়কে কিয়াসের ওপর প্রাধান্য দেন। | মদিনার সাত ফকীহের ঐকমত্যকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেন। | সাহাবির ফতোয়া দলিল নয়, যদি না অন্য দলিলে সমর্থিত হয়। | সাহাবিদের মতামত থেকে কুরআন-সুন্নাহর নিকটবর্তী মত গ্রহণ করেন। |
| ভৌগোলিক বিস্তার | তুর্কি, মধ্য এশিয়া, ভারতীয় উপমহাদেশ ও বলকান অঞ্চল (বিশ্বের বৃহত্তম মাযহাব)। | উত্তর আফ্রিকা (মরক্কো, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, সুদান) ও পশ্চিম আফ্রিকা। | মিশর, সিরিয়া, ইয়েমেন, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও পূর্ব আফ্রিকা। | সৌদি আরব ও উপসাগরীয় আরব দেশসমূহ। |
মাযহাবসমূহের পারস্পরিক দৃষ্টিভঙ্গি
চার ইমামের কেউ কখনো নিজেদের মধ্যে শত্রুতা পোষণ করেননি। বরং তাঁরা একে অপরকে পরম শ্রদ্ধা করতেন। তাঁদের মতপার্থক্য ছিল শাখাগত (ফুরুয়ী) বিষয়ে, যা উম্মাহর জন্য রহমতস্বরূপ। ইমাম শাফেয়ী ছিলেন ইমাম মালিকের ছাত্র এবং ইমাম আহমদ ছিলেন ইমাম শাফেয়ীর ছাত্র।
উপসংহার
চারটি মাযহাব মূলত একই সত্যের চারটি ভিন্ন ভিন্ন রাজপথ। তাদের মূল লক্ষ্য এক—কুরআন ও সুন্নাহর পরিপূর্ণ আনুগত্য ও সন্তুষ্টি অর্জন।
٥- ما هي آراء الفقهاء في رفع اليدين في الصلاة؟ اكتب ترجيح الأقوال-
[৫. বাংলা অনুবাদ: নামাযে হাত উত্তোলনের ব্যাপারে ফোকাহায়ে কিরামগণের কী অভিমত? ترجيح الأقوال (উত্তম মতটি) লেখ।]
ভূমিকা
নামাজে রুকুতে যাওয়ার সময় এবং রুকু থেকে উঠার সময় হাত উত্তোলন করা (রফে ইয়াদাইন) একটি বিখ্যাত শাখাগত মতপার্থক্যপূর্ণ মাসআলা। এটি কোনো মৌলিক ঈমানী বিরোধ নয়, বরং মুস্তাহাব বা সুন্নতের অগ্রাধিকারের বিষয়।
ফুকাহায়ে কিরামগণের অভিমত
- প্রথম মত (হানাফী ও অধিকাংশ কূফাবাসীর অভিমত):
নামাজে কেবল তাকবীরে তাহরীমার সময় হাত তুলতে হবে। রুকুতে যাওয়ার সময় বা রুকু থেকে উঠার সময় কিংবা সিজদায় যাওয়ার সময় হাত তোলা যাবে না (মুস্তাহাব নয়)। এটি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ, হযরত আলী, সুফিয়ান সাওরী ও ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর অভিমত।
দলিলসমূহ:
- হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন: “أَلَا أُصَلِّي بِكُمْ صَلَاةَ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ؟ فَصَلَّى فَلَمْ يَرْفَعْ يَدَيْهِ إِلَّا فِي أَوَّلِ مَرَّةٍ” অর্থাৎ, “আমি কি তোমাদেরকে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নামাজের মতো নামাজ পড়ে দেখাব না? অতঃপর তিনি নামাজ পড়লেন এবং প্রথমবার ছাড়া আর হাত তুললেন না।” (সুনানে তিরমিযী, নাসাঈ, আবু দাউদ; ইমাম তিরমিযী একে সহিহ ও হাসান বলেছেন)।
- হযরত বারা ইবনে আযিব (রা.) বর্ণনা করেন: “নবী করীম (সা.) যখন নামাজ শুরু করতেন তখন হাত তুলতেন, এরপর নামাজের শেষ পর্যন্ত আর হাত তুলতেন না।” (সুনানে আবু দাউদ)।
- দ্বিতীয় মত (শাফেয়ী, হাম্বলী ও জমহুর মুহাদ্দিসীনদের অভিমত):
তাকবীরে তাহরীমা ছাড়াও রুকুতে যাওয়ার সময়, রুকু থেকে মাথা উঠানোর সময় এবং তৃতীয় রাকাতের শুরুতে হাত উঠানো সুন্নত। এটি ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.)-এর অভিমত।
দলিল: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকবীরে তাহরীমার সময়, রুকুতে যাওয়ার সময় এবং রুকু থেকে মাথা তোলার সময় হাত উত্তোলন করতেন। (সহিহ বুখারী ও মুসলিম)।
- তৃতীয় মত (মালেকী মাযহাবের অভিমত):
ইমাম মালিক (রহ.) তাঁর বিখ্যাত কিতাব ‘আল-মুদাওওয়ানাতুল কুবরা’-তে তাকবীরে তাহরীমা ছাড়া অন্য কোথাও হাত না তোলার পক্ষেই মত দিয়েছেন এবং মদিনার অধিকাংশ আলিমদের আমল হিসেবে এটিকেই প্রাধান্য দিয়েছেন।
তারজীহ বা উত্তম মতের বিশ্লেষণ (ترجيح الأقوال)
উভয় পক্ষের কাছেই সহিহ সনদযুক্ত হাদিস বিদ্যমান। তবে ফিকহী মূলনীতির বিচারে হানাফী মাযহাবের মতটি অধিক শক্তিশালী হওয়ার কারণসমূহ:
- নাসেখ ও মানসূখ (পরবর্তী আমল): রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রথম দিকে রফে ইয়াদাইন করতেন, কিন্তু পরবর্তীতে নামাজে স্থিরতা ও খুশু-খুযু বজায় রাখার স্বার্থে বারবার হাত তোলা রহিত (মানসূখ) করা হয়েছিল। হযরত জাবির ইবনে সামুরা (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদের বারবার হাত তুলতে দেখে বললেন: “مَا لِي أَرَاكُمْ رَافِعِي أَيْدِيكُمْ كَأَنَّهَا أَذْنَابُ خَيْلٍ شُمْسٍ؟ اسْكُنُوا فِي الصَّلَاةِ” অর্থাৎ, “তোমাদের কী হলো যে অবাধ্য ঘোড়ার লেজের মতো বারবার হাত তুলছ? নামাজে স্থিরতা অবলম্বন কর।” (সহিহ মুসলিম)।
- নামাজের মৌলিক আত্মা হলো অঙ্গপ্রত্যঙ্গের স্থিরতা: নামাজে যত কম অঙ্গ সঞ্চালন হবে, খুশু ও বিনয় তত বেশি সংরক্ষিত হবে।
সারকথা: এটি একটি শাখাগত মাসআলা। যারা রফে ইয়াদাইন করেন বা যারা করেন না—উভয়ের নামাজই সর্বসম্মতভাবে বিশুদ্ধ। এটিকে কেন্দ্র করে উম্মাহর মধ্যে বিবাদ সৃষ্টি করা সম্পূর্ণ হারাম।
٦- ما هو اختلاف العلماء في حكم القرأة خلف الإمام؟ ثم اكتب رأيك مفصلا-
[৬. বাংলা অনুবাদ: ইমামের পিছনে কিরাত পড়ার বিধান নিয়ে ওলামায়ে কেরামগণের কী মতানৈক্য আছে? অতঃপর তোমার বিস্তারিত মতামত ব্যক্ত কর।]
ভূমিকা
জামাআতের নামাজে মুক্তাদির জন্য ইমামের পেছনে কিরাত (সূরা ফাতিহা ও অন্য সূরা) পাঠ করার বিধান নিয়ে ফুকাহায়ে কিরামের মধ্যে ঐতিহাসিক মতভেদ বিদ্যমান। এটি ফিকহের অন্যতম সর্বাধিক আলোচিত মাসআলা।
ওলামায়ে কিরামগণের মতানৈক্য
এ বিষয়ে প্রধানত তিনটি অভিমত পাওয়া যায়:
- হানাফী মাযহাবের অভিমত (সম্পূর্ণ নিষেধ):
ইমামের পেছনে মুক্তাদির কোনো অবস্থাতেই কিরাত পড়া যাবে না—তা জাহরী (উচ্চস্বরে পঠিত যেমন: ফজর, মাগরিব, এশা) নামাজ হোক কিংবা সিররী (নীরবে পঠিত যেমন: জোহর, আসর) নামাজ হোক। মুক্তাদি সর্বাবস্থায় চুপ থাকবে।
দলিলসমূহ:
- পবিত্র কুরআনের নির্দেশ: وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْآنُ فَاسْتَمِعُوا لَهُ وَأَنصِتُوا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ অর্থ: “আর যখন কুরআন তিলাওয়াত করা হয়, তখন তা মনোযোগ দিয়ে শোনো এবং চুপ থাকো, যাতে তোমাদের ওপর দয়া করা হয়।” (সূরা আল-আ’রাফ: ২০৪)। মুফাসসিরদের মতে এ আয়াত নামাজের কিরাত সম্বন্ধেই অবতীর্ণ।
- রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুস্পষ্ট হাদিস: “مَنْ كَانَ لَهُ إِمَامٌ فَقِرَاءَةُ الْإِمَامِ لَهُ قِرَاءَةٌ” অর্থাৎ, “যার কোনো ইমাম রয়েছে, ইমামের কিরাত পাঠই তার নিজের কিরাত হিসেবে গণ্য হবে।” (মুসনাদে আহমাদ, মুয়াত্তা ইমাম মুহাম্মদ; সহিহ সনদে বর্ণিত)।
- সহিহ মুসলিমে এসেছে: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: “وَإِذَا قَرَأَ فَأَنْصِتُوا” অর্থাৎ, “ইমাম যখন কিরাত পাঠ করে, তখন তোমরা নীরব থাকো।”
- শাফেয়ী মাযহাবের অভিমত (ওয়াজিব/ফরজ):
ইমামের পেছনে প্রত্যেক মুক্তাদির ওপর সূরা ফাতিহা পাঠ করা ওয়াজিব—চাই তা জাহরী নামাজ হোক বা সিররী নামাজ হোক।
দলিল: রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: “لَا صَلَاةَ لِمَنْ لَمْ يَقْرَأْ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ” অর্থাৎ, “যে ব্যক্তি সূরা ফাতিহা পাঠ করল না, তার নামাজ হলো না।” (সহিহ বুখারী ও মুসলিম)।
- মালেকী ও হাম্বলী মাযহাবের অভিমত (মধ্যম পন্থা):
নীরব (সিররী) নামাজে মুক্তাদি সূরা ফাতিহা পড়বে; কিন্তু সরব (জাহরী) নামাজে যখন ইমাম কিরাত জোরে পড়বেন, তখন মুক্তাদি চুপ থেকে মনোযোগ দিয়ে শুনবে, পড়বে না।
বিস্তারিত বিশ্লেষণ ও ব্যক্তিগত মতামত
উভয় পক্ষের দলিলের গভীর পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয় যে:
- শাফেয়ী মাযহাবের হাদিসটি (لَا صَلَاةَ لِمَنْ لَمْ يَقْرَأْ) মূলত একাকী নামাজ আদায়কারী (মুনফারিদ) এবং ইমামের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কারণ জামাআতে ইমাম হলেন মুক্তাদিদের প্রতিনিধি। প্রতিনিধি যখন কুরআন তিলাওয়াত করেন, তখন তা পেছনের সবার পক্ষ থেকেই আদায় হয়ে যায়।
- যদি সরব নামাজে ইমামের পড়ার সময় মুক্তাদিও পড়তে থাকে, তবে কুরআনের স্পষ্ট নির্দেশ “মনোযোগ দিয়ে শোনো এবং চুপ থাকো”-এর লঙ্ঘন ঘটে।
- উপসংহার ও ফয়সালা: হানাফী মাযহাবের সিদ্ধান্তটি আল-কুরআনের সার্বজনীন নির্দেশ ও নামাজের নিয়মতান্ত্রিক শৃঙ্খলার সাথে পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে অন্য মাযহাবের দলিলের প্রতিও পূর্ণ শ্রদ্ধা বজায় রাখতে হবে এবং এ জাতীয় শাখাগত বিষয়ে উম্মাহর মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি পরিহার করতে হবে।
مجموعة (ب) : الأسئلة القصيرة [খ বিভাগ: সংক্ষিপ্ত উত্তর প্রশ্ন]
[দ্রষ্টব্য: যেকোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও। প্রতিটি প্রশ্নের মান ৫: ৫ × ৪ = ২০]
٧- ما الفرق بين الرجال والنساء في كيفية اداء الصلاة؟
[৭. বাংলা অনুবাদ: পুরুষ আর নারীদের নামাজ আদায়ের পদ্ধতির মধ্যে কী পার্থক্য?]
উত্তর:
ইসলামী ফিকহে পুরুষ ও নারীর নামাজের মূল রোকন ও ফরজসমূহ অভিন্ন হলেও পর্দা ও শারীরিক গঠনের কারণে কিছু সুন্নতে পার্থক্য রয়েছে:
- হাত বাঁধার ক্ষেত্রে: পুরুষ তাকবীরে তাহরীমার সময় হাত কান পর্যন্ত তুলবে এবং নাভির নিচে হাত বাঁধবে। আর নারী হাত কাঁধ বা বুক পর্যন্ত তুলবে এবং বুকের ওপর হাত রাখবে।
- রুকুর ক্ষেত্রে: পুরুষ রুকুতে পিঠ সম্পূর্ণ সোজা রাখবে এবং হাতের আঙুলগুলো ছড়িয়ে দিয়ে হাঁটু আঁকড়ে ধরবে। কিন্তু নারী রুকুতে কিছুটা ঝুঁকবে (যাতে পিঠ সোজা না হয়) এবং আঙুলগুলো মিলিয়ে রেখে হাঁটুর ওপর হাত রাখবে।
- সিজদার ক্ষেত্রে: পুরুষ পেট রান থেকে এবং বাহু বগল থেকে পৃথক রাখবে। আর নারী নিজেকে সংকুচিত করে মাটির সাথে মিশিয়ে রাখবে, বাহু পেটের সাথে ও রান মাটির সাথে মিলিয়ে রাখবে।
- বৈঠকের ক্ষেত্রে: পুরুষ বাম পা বিছিয়ে তার ওপর বসবে এবং ডান পা খাড়া রাখবে। আর নারী উভয় পা ডান দিক দিয়ে বের করে দিয়ে মাটির ওপর বসবে (তাওয়াররুক করবে)।
٨- هل يجهر التأمين ام يخفى في الصلاة؟
[৮. বাংলা অনুবাদ: নামাযে ‘আমিন’ কি উচ্চস্বরে নাকি নিম্নস্বরে পড়া যাবে?]
উত্তর:
নামাজে সূরা ফাতিহা শেষ করার পর ‘আমিন’ বলা সুন্নত। এটি উচ্চস্বরে (জাহর) বলা হবে নাকি নিম্নস্বরে (সিরর) বলা হবে, এ নিয়ে ফুকাহাদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে:
- হানাফী ও মালেকী মাযহাব: আমিন সর্বদা নিম্নস্বরে বলা সুন্নত।
যুক্তি: ‘আমিন’ একটি দোয়া (হে আল্লাহ কবুল করুন)। আর পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: ادْعُوا رَبَّكُمْ تَضَرُّعًا وَخُفْيَةً অর্থাৎ, “তোমরা তোমাদের রবকে বিনম্রভাবে এবং গোপনে (নিম্নস্বরে) ডাকো।” (সূরা আল-আ’রাফ: ৫৫)। এছাড়া সাহাবিদের অধিকাংশই নিম্নস্বরে আমিন বলতেন। - শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাব: জাহরী নামাজে ইমাম ও মুক্তাদি উচ্চস্বরে আমিন বলবে। তারা হযরত ওয়াইল ইবনে হুজর (রা.)-এর হাদিস দলিল হিসেবে উপস্থাপন করেন।
সারকথা: উচ্চস্বরে বা নিম্নস্বরে—উভয় পদ্ধতিই হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। কোনো এক পদ্ধতি অবলম্বনের কারণে অপরের নামাজ বাতিল হয় না।
٩- بين الحكم الجمع بين الصلاتين-
[৯. বাংলা অনুবাদ: الجمع بين الصلاتين এর হুকুম বর্ণনা কর।]
উত্তর:
সংজ্ঞা: দুই ওয়াক্তের নামাজ (যেমন: জোহর ও আসর অথবা মাগরিব ও এশা) একই ওয়াক্তে একত্র করে আদায় করাকে ‘জামউন বাইনাস সালাতাইন’ বলা হয়।
ফিকহী হুকুম:
- হানাফী মাযহাব: হানাফী মাযহাব মতে হজের ময়দান ছাড়া (আরাফাতে জোহর ও আসর একত্র করা এবং মুযদালিফায় মাগরিব ও এশা একত্র করা) অন্য কোনো অবস্থায় প্রকৃতভাবে (জামে হাক্বিক্বী) দুই ওয়াক্তের নামাজ এক ওয়াক্তে পড়া জায়েজ নেই। তবে সফর বা অতিবৃষ্টির সময় ‘জামে সূরী’ (প্রথম ওয়াক্তের শেষ সময়ে প্রথম নামাজ এবং দ্বিতীয় ওয়াক্তের শুরুতে দ্বিতীয় নামাজ আদায়) করা জায়েজ। দলিল: কুরআনে বলা হয়েছে, নামাজ নির্দিষ্ট সময়ে ফরজ।
- জমহুর ফুকাহা (শাফেয়ী, মালেকী, হাম্বলী): সফর, অতিবৃষ্টি ও বিপদের কারণে জোহর-আসর এবং মাগরিব-এশা অগ্রিম একত্র করে (জামে তাক্বদীম) কিংবা পিছিয়ে একত্র করে (জামে তাখীর) পড়া জায়েজ।
١٠- بين الاختلاف بين العلماء بعدد تكبيرات العيدين-
[১০. বাংলা অনুবাদ: দুই ঈদের তাকবীরের সংখ্যা সম্পর্কে ওলামায়ে কেরামগণের মতামত বর্ণনা কর।]
উত্তর:
ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার নামাজে অতিরিক্ত তাকবীর দেওয়ার সংখ্যা নিয়ে ওলামায়ে কেরামগণের অভিমত নিম্নরূপ:
- হানাফী মাযহাব: দুই রাকাত মিলিয়ে মোট ৬টি অতিরিক্ত তাকবীর—১ম রাকাতে কিরাতের পূর্বে ৩ তাকবীর এবং ২য় রাকাতে কিরাতের পরে রুকুর পূর্বে ৩ তাকবীর। এটি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) ও কূফাবাসী সাহাবিদের আমল দ্বারা প্রমাণিত।
- শাফেয়ী মাযহাব: মোট ১২টি অতিরিক্ত তাকবীর—১ম রাকাতে কিরাতের পূর্বে ৭ তাকবীর এবং ২য় রাকাতে কিরাতের পূর্বে ৫ তাকবীর।
- মালেকী ও হাম্বলী মাযহাব: মোট ১১ বা ১২টি অতিরিক্ত তাকবীর—১ম রাকাতে তাকবীরে তাহরীমাসহ ৭টি এবং ২য় রাকাতে কিয়ামের তাকবীর ছাড়া ৫টি তাকবীর।
প্রত্যেক মাযহাবের নিজস্ব প্রামাণ্য হাদিস রয়েছে এবং সবকটি পদ্ধতিই সহিহ আমল হিসেবে গণ্য।
١١- اكتب فضائل زيارة روضة النبى صلى الله عليه وسلم-
[১১. বাংলা অনুবাদ: প্রিয় নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) এর রওজা শরীফ যেয়ারতের ফযিলতগুলো লেখ।]
উত্তর:
মদিনা মুনাওয়ারায় সর্বশ্রেষ্ঠ মানব হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর রওজা মোবারক জিয়ারত করা একটি অত্যন্ত বরকতময়, সওয়াবপূর্ণ এবং ওয়াজিবের নিকটবর্তী মুস্তাহাব আমল। এর অসীম ফযিলতসমূহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত:
- শাফায়াত ওয়াজিব হওয়া: রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন:
“مَنْ زَارَ قَبْرِي وَجَبَتْ لَهُ شَفَاعَتِي”
অর্থ: “যে ব্যক্তি আমার রওজা জিয়ারত করল, তার জন্য আমার শাফায়াত অবধারিত (ওয়াজিব) হয়ে গেল।” (সুনানে দারা কুতনী, তাবারানী)।
- জীবদ্দশায় সাক্ষাতের সমতুল্য: নবী করীম (সা.) বলেন: “যে ব্যক্তি আমার ওফাতের পর আমার কবর জিয়ারত করল, সে যেন আমার জীবদ্দশাতেই আমার সাথে সাক্ষাৎ করল।” (বায়হাকী)।
- সালামের সরাসরি জবাব লাভ: তিনি আরও ইরশাদ করেন: “যখনই কেউ আমার কবরের পাশে এসে সালাম দেয়, আল্লাহ আমার রুহ ফিরিয়ে দেন এবং আমি নিজে তার সালামের জবাব প্রদান করি।” (আবু দাউদ)।
- জান্নাতের বাগানে প্রবেশের সৌভাগ্য: রওজা শরীফ ও মিম্বারের মধ্যবর্তী স্থান সম্পর্কে তিনি বলেন: “مَا بَيْنَ بَيْتِي وَمِنْبَرِي رَوْضَةٌ مِنْ رِيَاضِ الْجَنَّةِ” অর্থাৎ, “আমার ঘর ও মিম্বারের মধ্যবর্তী স্থানটি জান্নাতের বাগানসমূহের একটি বাগান।” (সহিহ বুখারী)।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. ফিক্বহী মাযহাব (২০৫৪০২) বিষয়ের মূল উদ্দেশ্য কী?
উত্তর: এই বিষয়ের মূল লক্ষ্য হলো ইসলামী আইনের উৎপত্তি, ক্রমবিকাশ এবং চার প্রধান ফিকহী মাযহাবের (হানাফী, মালেকী, শাফেয়ী, হাম্বলী) মূলনীতি ও শাখাগত মতপার্থক্য সম্পর্কে প্রামাণ্য ও গভীর জ্ঞান অর্জন করা।
২. সাধারণ মুসলমানের জন্য কি কোনো একটি মাযহাবের তাকলিদ করা আবশ্যক?
উত্তর: হ্যাঁ, জমহুর উলামায়ে কেরামের মতে যারা সরাসরি কুরআন ও হাদিস থেকে ইজতিহাদ করার যোগ্যতাসম্পন্ন নন, তাদের জন্য বিভ্রান্তি ও নফসের দাসত্ব থেকে বাঁচতে যেকোনো একটি নির্ভরযোগ্য মাযহাবের তাকলিদ করা ওয়াজিব।
৩. চার মাযহাবের মধ্যে কি মৌলিক আকিদাগত কোনো বিরোধ রয়েছে?
উত্তর: একেবারেই না। চার মাযহাবই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের অন্তর্ভুক্ত এবং তাঁদের আকিদা অভিন্ন। তাঁদের মতপার্থক্য কেবল শাখাগত (ফুরুয়ী) আমল ও ইজতিহাদী পদ্ধতির ক্ষেত্রে, যা উম্মাহর জন্য সহজতা ও রহমতস্বরূপ।
৪. নামাজে ইমামের পেছনে সূরা ফাতিহা না পড়লে কি হানাফী মাযহাব অনুযায়ী নামাজ হবে?
উত্তর: হ্যাঁ, হানাফী মাযহাব মতে ইমামের কিরাত পাঠই মুক্তাদির কিরাত হিসেবে গণ্য হয়। তাই ইমামের পেছনে মুক্তাদির চুপ থাকা আবশ্যক এবং সূরা ফাতিহা না পড়লেও নামাজ পূর্ণাঙ্গভাবে আদায় হবে।
৫. রফে ইয়াদাইন বা হাত তোলার মাসআলায় ভিন্ন মত অবলম্বনকারীদের সাথে কি বিরোধ করা যাবে?
উত্তর: কোনোভাবেই নয়। রফে ইয়াদাইন করা বা না করা উভয়টিই সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত। এটি নিয়ে মুসলিম সমাজে দলাদলি বা বিভেদ সৃষ্টি করা শরিয়তের দৃষ্টিতে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
৬. পরীক্ষার খাতায় আরবি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সঠিক নিয়ম কী?
উত্তর: ২০৫৪০২ পত্রে আরবি প্রশ্নসমূহ সুন্দরভাবে তুলে ধরে বাংলায় গভীর বিশ্লেষণাত্মক উত্তর প্রদান করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে নির্ভুল আরবি ইবারত, হাদিসের নস ও ফিকহী পরিভাষাসমূহ উল্লেখ করতে হবে।