ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২৩
বিভাগ: আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: আস-সীরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ (السيرة النبوية)
বিষয় কোড: 201204 | পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
[দ্রষ্টব্য: (ক) বিভাগ থেকে ৪টি এবং (খ) বিভাগ থেকে ৪টি সহ মোট ৮টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।]
ক-বিভাগ (مجموعة أ)
١- اكتب الحالات السياسية والاقتصادية والخلقية قبل مبعথ النبي صلى الله عليه وسلم في العرب.
[১. আরবে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রেরিত হওয়ার পূর্বের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও চারিত্রিক অবস্থা লিপিবদ্ধ কর।]
১. রাজনৈতিক অবস্থা (الحالة السياسية):
ইসলামপূর্ব জাহেলি যুগে আরবে কোনো কেন্দ্রীয় সরকার, সুসংহত শাসনব্যবস্থা বা আইন-আদালত ছিল না। আরবের সমাজ গোত্রীয় প্রথার (النظام القبلي) ভিত্তিতে পরিচালিত হতো। প্রতিটি গোত্রের প্রধান ছিলেন ‘শায়খ’। তাদের মূলনীতি ছিল “যোর যার মুল্লুক তার”। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক গোত্র অন্য গোত্রের সাথে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হতো, যা যুগ যুগ ধরে চলত (যেমন—বাসূসের যুদ্ধ, ফিজারের যুদ্ধ)। কোনো ব্যক্তির নিরাপত্তা ছিল কেবল তার নিজস্ব গোত্রের সুরক্ষার ওপর নির্ভরশীল।
২. অর্থনৈতিক অবস্থা (الحالة الاقتصادية):
আরব উপদ্বীপের অধিকাংশ অঞ্চল ছিল শুষ্ক মরুভূমি। ফলে কৃষি কাজের সুযোগ ছিল সীমিত, কেবল মদীনা (ইয়াসরিব) ও তায়েফে ফলমূল ও কৃষিকাজ হতো। প্রধান অর্থনৈতিক পেশা ছিল পশুপালন ও বাণিজ্য। মক্কার কুরাইশরা শীতকালে ইয়েমেনে এবং গ্রীষ্মকালে সিরিয়ায় বাণিজ্য কাফেলা পাঠাত। তবে সমাজে সুদের (রিবা) চরম আধিপত্য ছিল, বিশেষ করে ইহুদী মহাজনরা চড়া সুদে ঋণ দিয়ে সাধারণ মানুষকে নিঃস্ব করত। জুয়া, লুটতরাজ এবং রাহাজানি অর্থনৈতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সমাজে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে ছিল আকাশচুম্বী বৈষম্য।
৩. চারিত্রিক ও নৈতিক অবস্থা (الحالة الخلقية):
জাহেলি যুগের আরবে নৈতিক অবক্ষয় চরম সীমায় পৌঁছেছিল। সমাজে মদ্যপান, জুয়া, ব্যভিচার এবং কন্যাশিশুকে জীবন্ত কবর দেওয়ার (وأد البنات) মতো বর্বরোচিত প্রথা প্রচলিত ছিল। নারীর কোনো মানবিক বা সামাজিক অধিকার ও মর্যাদা ছিল না; তাদেরকে ভোগ্যপণ্য এবং উত্তরাধিকার সম্পত্তি হিসেবে গণ্য করা হতো। তবে এই পঙ্কিলতার মধ্যেও তাদের মাঝে কিছু প্রশংসনীয় গুণাবলী বিদ্যমান ছিল, যেমন—অতিথি পরায়ণতা, বীরত্ব, স্বাধীনতাচেতনা, অঙ্গীকার রক্ষা এবং কাব্যচর্চায় অনন্য দক্ষতা।
٢- تحدث عن أهم الأحداث التي وقعت قبل وبعد مولد النبي صلى الله عليه وسلم.
[২. নবি (স.) এর জন্মের পূর্বে ও পরে সংঘটিত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাসমূহ সম্পর্কে আলোচনা কর।]
১. জন্মের পূর্বে সংঘটিত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাসমূহ:
- হস্তীবাহিনীর ঘটনা (حادثة الفيل): নবী কারীম (সা.)-এর জন্মের প্রায় ৫০-৫৫ দিন পূর্বে ইয়েমেনের হাবশী গভর্নর আবরাহা বিশাল হস্তীবাহিনী নিয়ে পবিত্র কাবাঘর ধ্বংস করতে আক্রমণ করে। আল্লাহ তাআলা ঝাঁকে ঝাঁকে আবাবীল পাখির মাধ্যমে পাথর নিক্ষেপ করে আবরাহার সেনাবাহিনীকে চর্বিত ঘাসের মতো ধ্বংস করে দেন (عام الفيل – ৫৭০ খ্রিস্টাব্দ)।
- পিতার ওফাত: নবীজী (সা.) মাতৃগর্ভে থাকাকালীন তাঁর পিতা আব্দুল্লাহ ব্যবসায়িক সফরে গিয়ে সিরিয়া থেকে ফেরার পথে মদীনায় মাত্র ২৫ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।
২. জন্মের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাসমূহ:
- শুভ জন্ম ও বনু সা’দ গোত্রে প্রতিপালন: ৫৭০ খ্রিস্টাব্দের ১২ই রবীউল আউয়াল সোমবার সুবহে সাদিকে মক্কায় তিনি জন্মগ্রহণ করেন। আরবের সম্ভ্রান্ত প্রথা অনুযায়ী তিনি বনু সা’দ গোত্রের দাই হালীমা আস-সাদীয়ার স্নেহছায়ায় চার বছর প্রতিপালিত হন।
- বক্ষ বিদারণ (شق الصدر): শৈশবে বনু সা’দ গোত্রে অবস্থানকালে জিবরাঈল (আ.) আগমন করে তাঁর বক্ষ বিদারণ করেন এবং হৃদয় থেকে কালো রক্তপিণ্ড অপসারণ করে যমযমের পানিতে ধৌত করে ঈমান ও হিকমত দ্বারা পূর্ণ করেন।
- মাতা ও দাদার ইন্তেকাল: ছয় বছর বয়সে পিতা আব্দুল্লাহর কবর যিয়ারত শেষে ফেরার পথে ‘আবওয়া’ নামক স্থানে মাতা আমেনা ইন্তেকাল করেন। আট বছর বয়সে স্নেহশীল অভিভাবক দাদা আব্দুল মুত্তালিবও ইন্তেকাল করেন। এরপর চাচা আবু তালিব তাঁর লালন-পালনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
- হিলফুল ফুযূল ও কা’বা পুনর্নির্মাণ: পঁচিশ বছর বয়সে ফিজার যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে তিনি আর্তমানবতার সেবায় ‘হিলফুল ফুযূল’ শান্তি চুক্তি প্রতিষ্ঠা করেন এবং ৩৫ বছর বয়সে হাজরে আসওয়াদ স্থাপন নিয়ে কুরাইশদের রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ বুদ্ধিমত্তার সাথে সমাধান করেন।
٣- اكتب معنى الهجرة ثم بين سبب هجرة النبي صلى الله عليه وسلم من مكة إلى المدينة مع بيان واقعة الهجرة.
[৩. হিজরতের অর্থ লেখ। অতঃপর নবি (স.) মক্কা হতে মদিনায় হিজরতের কারণ উল্লেখপূর্বক হিজরতের ঘটনা বর্ণনা কর।]
১. হিজরতের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ (معنى الهجرة):
‘হিজরত’ (الهجرة) শব্দের আভিধানিক অর্থ পরিত্যাগ করা, বর্জন করা বা এক স্থান ছেড়ে অন্য স্থানে স্থানান্তর হওয়া। ইসলামী শরীয়তে দ্বীন-ঈমান রক্ষা, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে দারুল কুফর বা মাতৃভূমি ত্যাগ করে নিরাপদ স্থানে গমন করাকে হিজরত বলে।
২. মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের প্রধান কারণসমূহ:
- মক্কার কুরাইশদের অসহনীয় জুলুম, নিপীড়ন ও বয়কট।
- দারুন নাদওয়ায় কুরাইশ নেতাদের একত্রিত হয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে হত্যার চূড়ান্ত ষড়যন্ত্র।
- আকাবার প্রথম ও দ্বিতীয় শপথের মাধ্যমে মদীনাবাসীদের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা ও পূর্ণ আনুগত্যের প্রতিশ্রুতি।
- মক্কার বিরূপ পরিবেশের বিপরীতে মদীনায় ইসলামের দ্রুত প্রসার ও অনুকূল ক্ষেত্র তৈরি হওয়া।
- সর্বোপরি হিজরতের বিষয়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট ঐশী নির্দেশ লাভ।
৩. ঐতিহাসিক হিজরতের ঘটনা (واقعة الهجرة):
হিজরতের রাতে কুরাইশ যুবকেরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বাড়ি চারদিক থেকে ঘেরাও করে। তিনি আল্লাহর হুকুমে হযরত আলী (রা.)-কে তাঁর বিছানায় আমানত প্রত্যর্পণের দায়িত্বে রেখে সূরা ইয়াসীনের আয়াত তিলাওয়াত করে ধূলি নিক্ষেপ করে শত্রুদের চোখের সামনে দিয়ে নিরাপদে গৃহ ত্যাগ করেন। এরপর হযরত আবু বকর (রা.)-কে সাথে নিয়ে মক্কার দক্ষিণে ‘সাওর’ পর্বতের গুহায় তিন দিন আত্মগোপন করেন। শত্রুরা গুহামুখ পর্যন্ত পৌঁছে গেলেও মাকড়সার জাল ও কবুতরের বাসার কারণে বিভ্রান্ত হয়ে ফিরে যায়। অতঃপর বিশ্বস্ত পথপ্রদর্শক আব্দুল্লাহ ইবনে উরাইকিতের সাহায্যে পথ চলে ৮ই রবীউল আউয়াল কুবা পল্লীতে এবং পরবর্তীতে মদীনা মুনাওয়ারায় পৌঁছান।
٤- تحدث عن خلفية صلح الحديبية وأهم بنوده بالإيضاح.
[৪. হুদায়বিয়ার সন্ধির প্রেক্ষাপট ও গুরুত্বপূর্ণ ধারাসমূহ বিশদভাবে আলোচনা কর।]
১. হুদায়বিয়ার সন্ধির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট (خلفية صلح الحديبية):
৬ষ্ঠ হিজরীর যিলকদ মাসে রাসূলুল্লাহ (সা.) স্বপ্নে দেখেন যে তিনি সাহাবীগণসহ নিরাপদে মক্কায় গিয়ে ওমরাহ পালন করছেন। ফলে তিনি প্রায় ১৪০০ সাহাবীকে সাথে নিয়ে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র অবস্থায় কেবল কুরবানির পশুসহ ওমরাহর উদ্দেশ্যে মক্কার দিকে রওয়ানা হন। মক্কার নিকটবর্তী হুদায়বিয়া নামক স্থানে পৌঁছালে কুরাইশরা তাঁদের প্রবেশে বাধা দেয়। পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য হযরত উসমান (রা.)-কে দূত হিসেবে মক্কায় পাঠানো হলে তাঁর শাহাদাতের গুজব ছড়িয়ে পড়ে। রাসূলুল্লাহ (সা.) একটি বাবলা গাছের নিচে সাহাবীদের থেকে রক্তের শপথ নেন, যা ‘বাইআতুর রিদওয়ান’ নামে খ্যাত। এই সংকল্প দেখে ভীত হয়ে কুরাইশরা সুহাইল ইবনে আমরের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল পাঠিয়ে সন্ধি করতে সম্মত হয়।
২. হুদায়বিয়ার সন্ধির প্রধান শর্ত বা ধারাসমূহ (بنود الصلح):
- মুসলিমরা এ বছর ওমরাহ না করেই মদীনায় ফিরে যাবে এবং পরবর্তী বছর এসে মাত্র তিন দিন অবস্থান করে ওমরাহ পালন করতে পারবে।
- আগামী দশ বছর উভয় পক্ষের মধ্যে সর্বপ্রকার যুদ্ধ ও সংঘাত সম্পূর্ণরূপে বন্ধ থাকবে।
- আরবের অন্যান্য গোত্রসমূহ যার ইচ্ছা মুসলিমদের সাথে কিংবা কুরাইশদের সাথে মিত্রতা চুক্তিতে আবদ্ধ হতে পারবে (বনু খোযাআ মুসলিমদের এবং বনু বকর কুরাইশদের মিত্র হয়)।
- মক্কার কোনো লোক অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া মদীনায় পালিয়ে গেলে মুসলিমরা তাকে ফেরত দিতে বাধ্য থাকবে; কিন্তু মদীনার কোনো ব্যক্তি মক্কায় আশ্রয় নিলে কুরাইশরা তাকে ফেরত দেবে না।
- মুসলিমরা মক্কায় প্রবেশের সময় কেবল কোষাবদ্ধ তরবারি ব্যতীত অন্য কোনো ভারী অস্ত্র সাথে আনতে পারবে না।
বাহ্যিকভাবে শর্তগুলো অপমানজনক মনে হলেও এটি ছিল ইসলামের জন্য এক অবিসংবাদিত বিজয়, যাকে কুরআনে “ফাতহুম মুবীন” (সুস্পষ্ট বিজয়) বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
٥- اكتب عن وثيقة المدينة مع بيان أهميتها في التاريخ الإسلامي.
[৫. মদিনা সনদ সম্পর্কে লেখ। অতঃপর ইসলামের ইতিহাসে উহার গুরুত্ব বর্ণনা কর।]
১. মদীনা সনদের পরিচয় ও ধারা (وثيقة المدينة):
হিজরতের পর মদীনায় আনসার, মুহাজির, পৌত্তলিক এবং বিভিন্ন ইহুদী গোত্রের (বনু কাইনুকা, বনু নাদীর, বনু কুরাইযা) মধ্যে পারস্পরিক শান্তি, সম্প্রীতি ও একটি সুসংহত রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম করার লক্ষ্যে রাসূলুল্লাহ (সা.) ৬২২ খ্রিস্টাব্দে একটি ঐতিহাসিক লিখিত সংবিধান প্রণয়ন করেন, যা ‘মদীনা সনদ’ নামে খ্যাত। এতে মোট ৪৭টি (বা ৫৩টি) ধারা ছিল। প্রধান প্রধান ধারাগুলো হলো:
- মদীনার সমস্ত মুসলিম, ইহুদী ও অন্যান্য সম্প্রদায় মিলে একটি সম্মিলিত জাতি (উম্মাহ) গঠন করবে।
- সকল নাগরিক নিজ নিজ ধর্ম পালনে পূর্ণ স্বাধীন থাকবে; কারও ধর্মীয় ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করা যাবে না।
- মদীনা নগরী সকলের জন্য একটি নিরাপদ পবিত্র স্থান (হারাম) হিসেবে গণ্য হবে; বহিরাগত শত্রুর আক্রমণ হলে সকলে ঐক্যবদ্ধভাবে মদীনা রক্ষা করবে।
- যুদ্ধকালীন প্রতিরক্ষা ব্যয় সকল সম্প্রদায় মিলে যৌথভাবে বহন করবে।
- কোনো বিবাদ বা বিরোধ দেখা দিলে তার চূড়ান্ত মীমাংসা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল মুহাম্মদ (সা.) করবেন।
- কোনো অপরাধী বা যালিমকে তার গোত্র আশ্রয় দিতে পারবে না।
২. ইসলামের ইতিহাসে মদীনা সনদের গুরুত্ব:
- বিশ্বের প্রথম লিখিত সংবিধান: আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বহু শতাব্দী পূর্বে এটিই ছিল লিখিত আইনের ভিত্তিতে রচিত সর্বজনীন সংবিধান।
- ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের নিশ্চয়তা: অমুসলিম ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জান-মাল ও ধর্মীয় উপাসনালয়ের সুরক্ষার আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
- ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন: এর মাধ্যমে মদীনা একটি সার্বভৌম ইসলামী কল্যাণরাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয় এবং রাসূল (সা.) রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে স্বীকৃত হন।
- জাতীয় ঐক্য ও রক্তক্ষয়ী গোত্রদ্বন্দ্বের অবসান: আউস ও খাজরাজ গোত্রের শতবর্ষী গৃহযুদ্ধ দূরীভূত হয়ে ইসলামী ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।
٦- بين تاريخ بناء المسجد النبوي ثم اكتب أهميتها وفضائلها في الإسلام.
[৬. المسجد النبوى নির্মাণের ইতিহাস বর্ণনা কর। অতঃপর ইসলামে ইহার গুরুত্ব ও মর্যাদাসমূহ বিশদভাবে লেখ।]
১. মসজিদে নববী নির্মাণের ইতিহাস (تاريخ بناء المسجد النبوي):
হিজরতের পর মদীনা মুনাওয়ারায় রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রবেশ করলে প্রতিটি গোত্র তাঁকে আতিথেয়তা প্রদানের আবেদন জানায়। রাসূল (সা.) বলেন, “তোমরা আমার উটনীটিকে ছেড়ে দাও, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে আদিষ্ট।” উটনীটি যেখানে বসে পড়ে, সেই জায়গাটি ছিল বনু নাজ্জার গোত্রের দুই এতিম বালক সাহল ও সুহাইলের একটি খেজুর শুকানোর খামার। রাসূলুল্লাহ (সা.) হযরত আবু বকর (রা.)-এর মাধ্যমে দশ দীনার মূল্যে জায়গাটি ক্রয় করেন। এরপর ১ম হিজরীতে রাসূলুল্লাহ (সা.) স্বহস্তে পাথর ও ইট বহন করে সাহাবায়ে কেরামকে সাথে নিয়ে অত্যন্ত সাদাসিধেভাবে মসজিদে নববী নির্মাণ করেন। এর দেওয়াল ছিল কাঁচা ইটের, স্তম্ভ ছিল খেজুর গাছের কাণ্ডের এবং ছাদ ছিল খেজুর পাতার। মসজিদের একপাশে নিঃস্ব সাহাবীদের বসবাসের জন্য তৈরি করা হয় ‘সুফফাহ’।
২. মসজিদে নববীর গুরুত্ব ও ফযীলত (أهميتها وفضائلها):
- ইসলামের বহুমুখী কেন্দ্র: এটি কেবল নামাযের স্থান ছিল না, বরং একই সাথে ছিল ইসলামী রাষ্ট্রের সচিবালয়, বিচারালয়, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক কেন্দ্র, পার্লামেন্ট এবং সমর প্রস্তুতির পরামর্শকক্ষ।
- প্রথম আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় (আসহাবে সুফফাহ): সুফফাহ ছিল ইসলামের প্রথম আবাসিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যেখান থেকে হযরত আবু হুরায়রা (রা.)-সহ শত শত বিশিষ্ট হাদিস বিশারদ তৈরি হয়েছিলেন।
- অতুলনীয় ছওয়াব ও মর্যাদা: রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: “আমার এই মসজিদে এক ওয়াক্ত নামায পড়া মসজিদে হারাম ব্যতীত অন্য যেকোনো মসজিদের এক হাজার নামাযের চেয়ে উত্তম।” (বুখারী ও মুসলিম)
- রিয়াযুল জান্নাহ: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “আমার ঘর এবং আমার মিম্বরের মধ্যবর্তী স্থানটুকু জান্নাতের বাগানসমূহের একটি বাগান।”
٧- اكتب شمائل رسول الله صلى الله عليه وسلم الخلقية مفصلا.
[৭. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শারীরিক গঠন সবিস্তারে আলোচনা কর।]
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শারীরিক সৌষ্ঠব ও পবিত্র অবয়ব (الشمائل الخَلْقية):
সাহাবী হযরত আলী (রা.), হযরত আনাস (রা.) এবং উম্মে মা’বাদ (রা.)-এর বিশ্বস্ত বর্ণনার আলোকে নবী কারীম (সা.)-এর অনুপম শারীরিক গঠন নিম্নরূপ:
- উচ্চতা ও অবয়ব: তিনি অতিরিক্ত দীর্ঘকায় ছিলেন না এবং একেবারে বেঁটেও ছিলেন না; বরং মধ্যমাকৃতির চেয়ে কিছুটা দীর্ঘ ছিলেন। যখন তিনি কোনো মজলিসে বসতেন বা সমবেত লোকদের সাথে হাঁটতেন, তখন তাঁকে সবার চেয়ে বিশিষ্ট ও মর্যাদাবান দেখাত।
- চেহারা মোবারক: তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডল ছিল পূর্ণিমার চাঁদের ন্যায় উজ্জ্বল ও জ্যোতির্ময়। তাঁর চেহারায় গোলাকার ও দীর্ঘের এক চমৎকার ভারসাম্য ছিল।
- গায়ের রঙ: তাঁর গায়ের রঙ ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয় শুভ্র-গোলাপী মিশ্রিত উজ্জ্বল সাদা।
- চক্ষুযুগল: তাঁর চোখ দুটি ছিল ডাগর, কাজলটানা কুচকুচে কালো এবং চোখের শুভ্রাংশে রক্তিম আভা বিদ্যমান ছিল। তাঁর চোখের পাপড়িগুলো ছিল দীর্ঘ ও আকর্ষণীয়।
- পবিত্র কেশদাম: তাঁর মাথার চুল সম্পূর্ণ কোঁকড়ানো ছিল না এবং সোজাও ছিল না, বরং ঈষৎ ঢেউখেলানো ছিল। কখনও কান পর্যন্ত, আবার কখনও কাঁধ পর্যন্ত বাবরি রাখতেন।
- দাড়ি মোবারক: তাঁর দাড়ি ছিল ঘন ও সুবিন্যস্ত, যা তাঁর বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখত। ওফাত পর্যন্ত তাঁর মাথা ও দাড়িতে বিশটির বেশি সাদা চুল দেখা যায়নি।
- দেহসৌষ্ঠব ও হাতের তালু: তাঁর বুক ছিল প্রশস্ত, পেট ও বুক ছিল সমান্তরাল। অস্থিসন্ধিগুলো ছিল সুদৃঢ় ও মজবুত। তাঁর হাতের তালু ছিল রেশমের চেয়েও কোমল এবং তাঁর শরীর থেকে সবসময় সুবাসিত কস্তুরীর ঘ্রাণ বের হতো।
- মোহরে নবুওয়াত: তাঁর দুই কাঁধের মধ্যবর্তী স্থানে কবুতরের ডিমের মতো কিছুটা উঁচু মোহরে নবুওয়াত শোভা পেত।
٨- تحدث عن غزوة بدر ثم بين سببها مع بيان أهميتها في الإسلام.
[৮. বদর যুদ্ধ সম্পর্কে বিস্তারিত লেখ। অতঃপর ইসলামে ইহার গুরুত্ব ও কারণ বিস্তারিত বর্ণনা কর।]
১. বদর যুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও কারণসমূহ (أسباب غزوة بدر):
- মক্কার কুরাইশদের দীর্ঘ তেরো বছরের অবর্ণনীয় জুলুম, সম্পদ ক্রোক এবং মদীনার বিরুদ্ধে অব্যাহত সামরিক ষড়যন্ত্র।
- সিরিয়া থেকে আবু সুফিয়ানের বিশাল বাণিজ্যিক কাফেলার মক্কা অভিমুখে প্রত্যাবর্তনের সংবাদ এবং সেই বাণিজ্যলব্ধ অর্থ মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যয়ের পরিকল্পনা।
- আবু সুফিয়ানের কাফেলা নিরাপদে চলে যাওয়া সত্ত্বেও আবু জাহেলের দাম্ভিকতা ও মুসলিমদের নিশ্চিহ্ন করার সংকল্প নিয়ে মক্কা থেকে এক হাজার সুসজ্জিত সৈন্য নিয়ে বদরের প্রান্তরে আগমন।
- আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার পক্ষ থেকে সূরা আল-হজ্জের ৩৯ আয়াতে আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধের অনুমতি প্রদান।
২. যুদ্ধের বিবরণ (وقائع المعركة):
২য় হিজরীর ১৭ই রমযান ঐতিহাসিক বদর প্রান্তরে এই মহাসংগ্রাম অনুষ্ঠিত হয়। মুসলিম বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ছিল মাত্র ৩১৩ জন, যাঁদের কাছে ছিল মাত্র ২টি ঘোড়া ও ৭০টি উট। অপরদিকে কুরাইশদের সৈন্য ছিল ১০০০ জন, যাদের ছিল অগণিত অস্ত্রশস্ত্র ও যুদ্ধঘোড়া। রাসূলুল্লাহ (সা.) সারারাত রবের দরবারে অশ্রুসজল নয়নে ফরিয়াদ করেন: “হে আল্লাহ! যদি এই ক্ষুদ্র দলটি আজ ধ্বংস হয়ে যায়, তবে কিয়ামত পর্যন্ত জমিনে তোমার ইবাদত করার মতো কেউ থাকবে না।” আল্লাহ তাআলা মুসলিমদের সাহায্যে আসমান থেকে এক হাজার ফেরেশতা অবতীর্ণ করেন। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ইসলামের চরম শত্রু আবু জাহেল, উতবা, শায়বাসহ ৭০ জন শীর্ষ কাফির নিহত হয় এবং ৭০ জন বন্দী হয়। মুসলিমদের পক্ষে ১৪ জন সাহাবী শাহাদাত বরণ করেন।
৩. ইসলামে বদর যুদ্ধের সুদূরপ্রসারী গুরুত্ব (أهميتها في الإسلام):
- কুরআনে এই দিনকে ‘ইয়াওমুল ফুরকান’ (সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকারী দিন) বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
- এর মাধ্যমে আরবে একটি অপরাজেয় সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ইসলামী রাষ্ট্রের আত্মপ্রকাশ ঘটে।
- কুরাইশদের অহংকার চূর্ণবিচূর্ণ হয় এবং মুনাফিক ও ইহুদীদের অভ্যন্তরীণ চক্রান্ত স্তব্ধ হয়ে যায়।
- বদর যুদ্ধের মুজাহিদগণকে সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে সর্বোচ্চ মর্যাদা প্রদান করা হয়।
খ-বিভাগ (مجموعة ب)
٩- بين تاريخ نزول الوحي.
[৯. ওহী নাযিলের ইতিহাস বর্ণনা কর।]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বয়স যখন চল্লিশের কোঠায় উপনীত হয়, তখন তিনি নির্জনতা পছন্দ করতেন এবং মক্কার অদূরে হেরা গুহায় একাকী ধ্যানে নিমগ্ন থাকতেন। ৬১০ খ্রিস্টাব্দের রমযান মাসের লাইলাতুল ক্বদরে (১৭ বা ২১ রমযান) জিবরাঈল (আ.) আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রথম ওহী নিয়ে আগমন করেন। জিবরাঈল (আ.) তাঁকে জড়িয়ে ধরে তিনবার সজোরে আলিঙ্গন করে বললেন, “পড়ুন”। রাসূল (সা.) বললেন, “আমি তো পড়তে জানি না।” অতঃপর জিবরাঈল (আ.) সূরা আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াত তিলাওয়াত করেন: ﴿اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ…﴾। ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায় রাসূল (সা.) বাড়ি ফিরে খাদীজা (রা.)-কে বললেন: “যাম্মিলূনী” (আমাকে চাদর দিয়ে আবৃত কর)। খাদীজা (রা.) তাঁকে সান্ত্বনা দেন এবং প্রখ্যাত তাওরাত বিশেষজ্ঞ ওরাকা ইবনে নওফেলের নিকট নিয়ে যান, যিনি নিশ্চিত করেন যে ইনিই মূসা (আ.)-এর নিকট আগত ঐশী দূত নামূসে আকবর।
١٠- تحدث عن حلف الفضول.
[১০. হিলফুল ফুজুল সম্পর্কে আলোচনা কর।]
হারবুল ফিজারের রক্তক্ষয়ী ধ্বংসযজ্ঞ দেখে তরুণ মুহাম্মদ (সা.) ব্যথিত হন। তখন ইয়েমেনের এক ব্যবসায়ী আস ইবনে ওয়াইলের কাছে পাওনা টাকা চাইতে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হলে তিনি পাহাড়ে উঠে কুরাইশদের কাছে সুবিচার প্রার্থনা করেন। এর প্রেক্ষিতে বনু হাশিম, বনু মুত্তালিব, বনু যুহরা ও বনু তায়ম গোত্রের প্রধানগণ আব্দুল্লাহ ইবনে জাদআনের গৃহে সমবেত হয়ে আরবের ইতিহাসে সর্বপ্রথম একটি ঐতিহাসিক মানবাধিকার ও শান্তিসংঘ গঠন করেন, যা ‘হিলফুল ফুযূল’ নামে খ্যাত। এর উদ্দেশ্য ছিল সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা, মজলুম ও পরদেশী বণিকদের জানমালের নিরাপত্তা দেওয়া এবং অত্যাচারীর হাত থেকে দুর্বলকে রক্ষা করা। নবী কারীম (সা.) নবুওয়াতের পরেও বলেছিলেন: “আব্দুল্লাহ ইবনে জাদআনের ঘরে অনুষ্ঠিত সেই চুক্তিতে আমি উপস্থিত ছিলাম, যার পরিবর্তে আমাকে লাল উট দেওয়া হলেও আমি তা ত্যাগ করতাম না।”
١١- عرف الاسراء والمعراج.
[১১. মি’রাজ ও ইসরা এর পরিচয় দাও।]
ইসরা (الإسراء): নবুওয়াতের দশম বা একাদশ বর্ষে রজব মাসের ২৭ তারিখ রাতে আল্লাহর অসীম কুদরতে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র কাবা শরীফ (মসজিদুল হারাম) থেকে বায়তুল মাকদিস (মসজিদুল আকসা) পর্যন্ত বোরাকযোগে অলৌকিক নৈশভ্রমণকে ‘ইসরা’ বলা হয় (সূরা বনী ইসরাঈল: ১)।
মি’রাজ (المعراج): বায়তুল মাকদিসে সমস্ত আম্বিয়ায়ে কেরামের নামাযে ইমামতি করার পর সেখান থেকে সাত আসমান, সিদরাতুল মুনতাহা অতিক্রম করে সরাসরি মহান রব্বুল আলামীনের সান্নিধ্যে আরশে আযীমে আরোহণ করাকে ‘মি’রাজ’ বলা হয়। মি’রাজের রাতেই উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয করা হয়।
١٢- بين عن الهجرة الى الحبشة.
[১২. হাবশায় হিজরত সম্পর্কে বর্ণনা দাও।]
নবুওয়াতের পঞ্চম বর্ষে মক্কার কাফিরদের চরম নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবীদের আবিসিনিয়ায় (বর্তমান ইথিওপিয়া/হাবশা) হিজরত করার অনুমতি দেন। হাবশার খ্রিষ্টান বাদশাহ নাজ্জাশী ছিলেন অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণ ও দয়ালু। প্রথম দফায় হযরত উসমান (রা.) ও তাঁর স্ত্রী রুকাইয়্যাহ (রা.)-সহ ১২ জন পুরুষ ও ৪ জন নারী হিজরত করেন। দ্বিতীয় দফায় হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব (রা.)-এর নেতৃত্বে ৮৩ জন পুরুষ ও ১৮ জন নারী হিজরত করেন। কুরাইশরা উপহারসামগ্রী নিয়ে নাজ্জাশীর দরবারে মুসলিমদের ফিরিয়ে আনতে দূত পাঠালে জাফর (রা.) সূরা মারইয়ামের আয়াত তিলাওয়াত করে ইসলামের প্রকৃত রূপ তুলে ধরেন। নাজ্জাশী কেঁদে ফেলেন এবং মুসলিমদের আজীবন আশ্রয়ের ঘোষণা দেন।
١٣- ابحث عن غزوة تبوك.
[১৩. তাবুক যুদ্ধ সম্পর্কে বর্ণনা দাও।]
৯ম হিজরীর রজব মাসে রোমান সম্রাট হেরাক্লিয়াসের বিশাল সেনাবাহিনীর মদীনা আক্রমণের প্রস্তুতির খবর পেয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) সিরিয়া সীমান্তের তাবুক অভিমুখে ৩০,০০০ সাহাবীর এক বিশাল বাহিনী নিয়ে যাত্রা করেন। এটি ছিল প্রচণ্ড গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহ, খরা এবং ফল পাকার মৌসুম। এ সময় সাহাবীগণ অকাতরে দান করেন; হযরত আবু বকর (রা.) ঘরের সমস্ত সম্পদ এবং উসমান (রা.) এক-তৃতীয়াংশ সৈন্যের পূর্ণ সামরিক খরচ বহন করেন। মুসলিমদের অদম্য সাহস ও বিশাল সেনাবহর দেখে রোমান বাহিনী ভয়ে রণক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে যায়, ফলে কোনো যুদ্ধ ছাড়াই মুসলিমদের জয়জয়কার ঘোষিত হয়। একে ‘জাইশুল উসরাহ’ (সংকটের সেনাবাহিনী) বলা হয়।
١٤- اكتب عن اهل بيت النبي (صلعم).
[১৪. আহলে বাইতে নবি (স.) সম্পর্কে বিবরণ লেখ।]
‘আহলে বাইত’ (أهل البيت) বলতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র পরিবারবর্গকে বুঝায়। পবিত্র কুরআনে সূরা আহযাবের ৩৩ আয়াতে ইরশাদ হয়েছে: “হে নবী-পরিবার! আল্লাহ তো কেবল চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে।” জমহুর আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মতে আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত হলেন: নবীজী (সা.)-এর পবিত্র পুণ্যবতী স্ত্রীগণ (উম্মাহাতুল মুমিনীন), তাঁর সুযোগ্য কন্যাগণ, তাঁর জামাতা হযরত আলী (রা.), দৌহিত্র হযরত হাসান ও হুসাইন (রা.) এবং বনু হাশিমের অন্যান্য মুমিন সদস্যগণ (যেমন হযরত আব্বাস ও জাফরের পরিবার), যাদের জন্য সদকা গ্রহণ করা শরীয়তে হারাম করা হয়েছে।
١٥- علق : بنو قريظة.
[১৫. বনু কুরায়জা সম্পর্কে একটি টীকা লেখ।]
বনু কুরাইযা ছিল মদীনার অন্যতম প্রধান ইহুদী গোত্র, যারা মদীনা সনদে চুক্তিবদ্ধ ছিল। কিন্তু ৫ম হিজরীতে খন্দকের (আহযাব) যুদ্ধের সংকটময় মুহূর্তে তারা সম্মিলিত কাফির কুরাইশ বাহিনীর সাথে গোপনে হাত মিলিয়ে মদীনার মুসলিমদের পেছন থেকে আক্রমণ করার মাধ্যমে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করে। খন্দকের যুদ্ধ শেষে জিবরাঈল (আ.)-এর নির্দেশে মুসলিম বাহিনী বনু কুরাইযাকে অবরোধ করে। পঁচিশ দিন পর তারা তাদের পূর্বমিত্র হযরত সা’দ ইবনে মুআয (রা.)-এর ফয়সালা মেনে আত্মসমর্পণ করে। হযরত সা’দ (রা.) তাওরাতের বিধান অনুযায়ী যুদ্ধক্ষম বিশ্বাসঘাতক পুরুষদের মৃত্যুদণ্ড এবং নারী-শিশুদের বন্দীর ফয়সালা দেন, যা নবীজী (সা.) আল্লাহরই হুকুম বলে ঘোষণা করেন।
١٦- تحدث عن حجة الوداع.
[১৬. বিদায় হজ সম্পর্কে আলোচনা কর।]
১০ম হিজরীতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জীবনের একমাত্র ও শেষ হজ্জ পালন করেন, যা ইতিহাসে ‘বিদায় হজ্জ’ (حجة الوداع) নামে খ্যাত। এতে প্রায় এক লক্ষ চব্বিশ হাজার সাহাবী অংশগ্রহণ করেন। আরাফাতের ময়দানে দাঁড়িয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। এ ভাষণে তিনি জাহেলি যুগের সমস্ত কুসংস্কার ও রক্তের বদলা বাতিল করেন, নারীর অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেন, বর্ণবাদ ও বংশগৌরব নিষিদ্ধ করে মানুষের সাম্য ঘোষণা করেন, সুদের সমূলে মূলোৎপাটন করেন এবং মুসলিমদের কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার নির্দেশ দেন। এখানেই নাযিল হয়: “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম…” (সূরা মায়িদা: ৩)।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. ফাজিল ২য় বর্ষের ‘আস-সীরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ’ পরীক্ষায় কত নম্বরের উত্তর দিতে হয়?
মোট পূর্ণমান ৮০। ক-বিভাগ থেকে ৪টি রচনামূলক (৪ × ১৫ = ৬০) এবং খ-বিভাগ থেকে ৪টি সংক্ষিপ্ত (৪ × ৫ = ২০) মোট ৮টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়।
২. জাহেলি যুগের সমাজব্যবস্থার মূল বৈশিষ্ট্য কী ছিল?
গোত্রীয় শাসনপ্রথা, কন্যাশিশু হত্যা, মদ্যপান, জুয়া, ব্যভিচার এবং রক্তের বদলা হিসেবে যুগব্যাপী গৃহযুদ্ধ ছিল প্রধান বৈশিষ্ট্য।
৩. মদীনা সনদের প্রধান উদ্দেশ্য কী ছিল?
মদীনার মুসলিম, ইহুদী ও পৌত্তলিকদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও বহিরাগত আক্রমণ প্রতিহত করার ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।
৪. বদর যুদ্ধকে ‘ইয়াওমুল ফুরকান’ কেন বলা হয়?
কারণ এই যুদ্ধের বিজয়ের মাধ্যমে সত্য ও মিথ্যার মধ্যে চূড়ান্ত পার্থক্য সূচিত হয়েছিল এবং ইসলামের বিজয়ের দ্বার উন্মোচিত হয়েছিল।
৫. হুদায়বিয়ার সন্ধিকে কুরআনে কেন ‘সুস্পষ্ট বিজয়’ বলা হয়েছে?
কারণ এই সন্ধির ফলে সৃষ্ট শান্তিময় পরিবেশে ব্যাপকভাবে দাওয়াত বিস্তার লাভ করে এবং বহুসংখ্যক মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে।
৬. বিদায় হজ্জের ভাষণের মূল শিক্ষা কী?
মানবাধিকার, মানব সমতা, নারী অধিকার, সুদের বিলুপ্তি এবং কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে জীবন পরিচালনার সর্বজনীন দিকনির্দেশনা।