ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ২য় বর্ষ পরীক্ষা 2021
বিভাগ: আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: উলূমুল বালাগাহ (علم البلاغة)
বিষয় কোড: 201206 | পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
[দ্রষ্টব্য: مجموعة (أ) হতে চারটি এবং مجموعة (ب) হতে চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও।]
مجموعة (أ) – ক বিভাগ: রচনামূলক প্রশ্নাবলি
١- عرف علم البلاغة مع بيان نشأته وتطوره وغايته وأهمية دراسته-
[১. علم البلاغة এর সংজ্ঞা, উৎপত্তি, ক্রমবিকাশ, লক্ষ্য ও علم البلاغة পাঠের গুরুত্ব আলোচনা কর।]
ভূমিকা: আরবি ভাষা ও সাহিত্যের অলংকার, সৌন্দর্য এবং মর্মস্পর্শী মাধুর্য প্রকাশের অনন্য শাস্ত্র হলো ‘ইলমুল বালাগাহ’ (علم البلاغة)। পবিত্র কুরআনের অলৌকিকত্ব (إعجاز القرآن) উপলব্ধি এবং আরবি ভাষার প্রাতিষ্ঠানিক ও সাহিত্যিক প্রকাশের সূক্ষ্ম রহস্য উন্মোচনে বালাগাত শাস্ত্রের ভূমিকা অপরিসীম।
ক. বালাগাহ-এর পরিচয়:
- শাব্দিক অর্থ: ‘বালাগাহ’ (البلاغة) শব্দটি আরবি ‘বালাগা’ (بلغ) ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ পৌঁছানো (الوصول), সমাপ্তিতে উপনীত হওয়া বা অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানো। যেমন বলা হয়: ‘বালাগাতুর রিকাবু ইলা মাক্কাহ’ (بلغت الركاب إلى مكة – কাফেলা মক্কায় পৌঁছেছে)।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: বালাগাতবিদগণের পরিভাষায়—
مطابقة الكلام الفصيح لمقتضى الحال مع فصاحته
“পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপটের চাহিদানুযায়ী (মুক্তাদ্বা-আল-হাল) এমন বিশুদ্ধ ও প্রাঞ্জল (ফাসীহ) বক্তব্য প্রদান করা, যা শ্রোতার হৃদয়ে সুস্পষ্ট প্রভাব সৃষ্টি করে।”
খ. বালাগাহ শাস্ত্রের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ:
- জাহেলী ও প্রাথমিক যুগ: প্রাক-ইসলামী যুগে আরবরা সহজাত স্বভাবজাত প্রতিভা (সালীক্বাহ) দ্বারা অলঙ্কৃত ভাষায় কথা বলত। তারা উকাজ ও অন্যান্য মেলায় সাহিত্য প্রতিযোগিতা করত। তখন বালাগাত কোনো লিখিত বা নিয়মবদ্ধ শাস্ত্র ছিল না।
- ইসলামী ও উমাইয়া যুগ: কুরআন নাযিল হওয়ার পর এর অতুলনীয় ভাষার গঠন নিয়ে গবেষণা শুরু হয়। প্রখ্যাত সাহাবী ও তাবিঈগণ কুরআনের শব্দপ্রয়োগ নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করেন।
- আব্বাসীয় যুগ ও সংকলন পর্ব: তৃতীয় হিজরী শতকে আবুল আব্বাস আল-মুবাররাদ (আল-কামিল), আবু উবায়দাহ (মাজাযুল কুরআন), এবং ইবনে কুতায়বাহ (মুশকিলুল কুরআন) বালাগাতের মৌলিক নিয়ম লিপিবদ্ধ করেন। পরবর্তীতে খলিফা ইবনুল মু’তাযয (মৃ. ২৯৬ হি.) ‘কিতাবুল বাদী’ (كتاب البديع) রচনা করে এ শাস্ত্রকে স্বতন্ত্র রূপ দান করেন।
- পদ্ধতিগত পূর্ণাঙ্গ রূপায়ন: ইমাম আব্দুল ক্বাহির জুরজানী (মৃ. ৪৭১ হি.) তাঁর অমর গ্রন্থ ‘দালাইলুল ই’জায’ ও ‘আসরারুল বালাগাহ’ রচনার মাধ্যমে বালাগাতকে ইলমুল মা’আনী ও ইলমুল বায়ান-এ সুবিন্যস্ত করেন। পরবর্তীতে খতীব দিমাশকী আল-কাজবিনী (মৃ. ৭৩৯ হি.) ‘তালখীসুল মিফতাহ’ ও ‘আল-ঈযাহ’ গ্রন্থের মাধ্যমে বালাগাতকে তিনটি শাখায় (মা’আনী, বায়ান ও বাদী’) সুনির্দিষ্ট করেন।
গ. বালাগাহ শাস্ত্রের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য (غاية علم البلاغة):
- পবিত্র কুরআনের সাহিত্যিক শ্রেষ্ঠত্ব, অনুপম ভাষাভঙ্গি ও ই’জাযের রহস্য যথাযথভাবে অনুধাবন করা।
- রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বাণী (হাদীস শরিফ)-এর অন্তর্নিহিত সাহিত্যিক মাধুর্য অনুধাবন করা।
- পরিস্থিতি অনুযায়ী বাক্য গঠনের উপযুক্ত কৌশল আয়ত্ত করা এবং অপ্রাসঙ্গিক বা অনুপযুক্ত ভাষাভঙ্গি পরিহার করা।
- আরবি গদ্য ও কবিতায় নিজের মনোভাব প্রাঞ্জল ও আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরার সক্ষমতা অর্জন করা।
ঘ. বালাগাহ পাঠের গুরুত্ব:
ইলমুল বালাগাহ হলো তাফসীর শাস্ত্রের অন্যতম প্রধান সহায়ক স্তম্ভ। ইমাম যামাখশারী (রহ.) উল্লেখ করেছেন, বালাগাত শাস্ত্রের দুটি শাখা (মা’আনী ও বায়ান)-এ গভীর পাণ্ডিত্য ব্যতীত কোনো ব্যক্তি আল্লাহর কালামের অন্তর্নিহিত অলৌকিক রহস্য উন্মোচন করতে পারে না।
٢- ما الأمر؟ وكم صيغة له؟ تحدث عن المعانى التى يدل عليها الأمر بالأمثلة-
[২. الأمر কাকে বলে? এর ছিগাহ কয়টি? الأمر যে সব অর্থে ব্যবহৃত হয় তা উদাহরণসহ আলোচনা কর।]
ক. আল-আমর (الأمر)-এর পরিচয়:
বালাগাতশাস্ত্রে ‘আমর’ বলা হয় এমন বাক্য বা ক্রিয়াপদকে, যার মাধ্যমে কোনো ঊর্ধ্বতন বা সমমর্যাদার সত্তা বাধ্যতামূলকভাবে অধস্তন কাউকে কোনো কাজ বাস্তবায়ন বা সম্পাদন করার নির্দেশ প্রদান করে (طلب الفعل على وجه الاستعلاء والإلزام)।
খ. আমরের মৌলিক সীগাহ বা রূপ (صيغ الأمر):
বালাগাতবিদগণের সর্বসম্মত মতে আমরের আসল সীগাহ ৪টি:
- ফে’লে আমরের প্রত্যক্ষ রূপ (فعل الأمر): যেমন—أَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ (তোমরা নামায কায়েম কর ও যাকাত প্রদান কর)।
- লামে আমরের সাথে মুদ্বরী ক্রিয়া (المضارع المقترن بلام الأمر): যেমন—لِيُنْفِقْ ذُو سَعَةٍ مِنْ سَعَتِهِ (সামর্থ্যবান ব্যক্তি যেন তার সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করে)।
- ইসমে ফে’ল আমর (اسم فعل الأمر): যেমন—حَيَّ عَلَى الصَّلَاةِ (নামাযের দিকে এসো), عَلَيْكُمْ أَنْفُسَكُمْ (তোমরা নিজেদের দায়িত্ব গ্রহণ কর)।
- আমরের অর্থবোধক মাসদার বা ভাববাচ্য বিশেষ্য (المصدر النائب عن فعل الأمر): ক্রিয়ার পরিবর্তে ব্যবহৃত মাসদার। যেমন—فَصَبْرٌ جَمِيلٌ (অতএব সুন্দর ধৈর্যই কাম্য) অথবা وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا (পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার কর)।
গ. আমরের রূপক বা অপ্রত্যক্ষ অর্থসমূহ (المعاني المجازية للأمر):
আমর তার মূল বাধ্যতামূলক আদেশ ছাড়াও প্রেক্ষাপটভেদে বিভিন্ন অলঙ্কারিক অর্থে ব্যবহৃত হয়:
- দু’আ বা প্রার্থনা (الدعاء): অধস্তন ব্যক্তি কর্তৃক মহান স্রষ্টার নিকট আকুতি। যেমন: رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا (হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দিন)।
- ইলতিমাস বা অনুরোধ (الالتماس): সমান মর্যাদাসম্পন্ন দুজন ব্যক্তির পরস্পরের কাছে কিছু চাওয়া। যেমন বন্ধুর প্রতি: ‘আমদিন্নী বিক্বালামিকা’ (আমাকে তোমার কলমটি দাও)।
- ইরশাদ বা উপদেশ (الإرشاد): যাতে দুনিয়া বা আখেরাতের কল্যাণ নিহিত থাকে। যেমন: وَاسْتَشْهِدُوا شَهِيدَيْنِ مِنْ رِجَالِكُمْ (তোমরা তোমাদের পুরুষদের মধ্য থেকে দু’জন সাক্ষী গ্রহণ কর)।
- তাহদীদ বা হুমকি (التهديد): শাসানো বা সতর্ক করা। যেমন: اعْمَلُوا مَا شِئْتُمْ (তোমাদের যা ইচ্ছা কর—নিশ্চয় তিনি তোমাদের কৃতকর্ম দেখছেন)।
- তা’জীয বা অপারগকরণ (التعجيز): প্রতিপক্ষকে পরাস্ত ও অক্ষম প্রমাণ করা। যেমন কাফেরদের প্রতি কুরআনের চ্যালেঞ্জ: فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِنْ مِثْلِهِ (তবে তোমরা এর অনুরূপ একটি সূরা নিয়ে আস)।
- ইবাহাত বা বৈধতা প্রকাশ (الإباحة): কোনো কাজের অনুমতি প্রদান। যেমন: وَكُلُوا وَاشْرَبُوا حَتَّىٰ يَتَبَيَّنَ لَكُمُ الْخَيْطُ الْأَبْيَضُ (তোমরা আহার ও পান কর যতক্ষণ না সাদা রেখা প্রকাশিত হয়)।
- ইকরম বা সম্মান প্রদর্শন (الإكرام): সাদরে আমন্ত্রণ বা সম্মানিত করা। যেমন জান্নাতীদের বলা হবে: ادْخُلُوهَا بِسَلَامٍ آمِنِينَ (তোমরা এতে প্রবেশ কর শান্তিতে, নিরাপদে)।
٣- عرف التشبيه- اكتب أركانه وأقسامه وأغراضه مفصلا-
[৩. التشبيه এর সংজ্ঞা দাও। তার রুকন, প্রকারভেদ ও উদ্দেশ্যাবলি বিস্তারিত লেখ।]
ক. তাশবীয় (التشبيه)-এর পরিচয়:
শাব্দিক অর্থ: সাদৃশ্য স্থাপন করা, তুলনা করা বা উপমা দেওয়া।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: কোনো বিশেষ গুণ বা বৈশিষ্ট্যে একটি বস্তুকে অন্য একটি বস্তুর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ বলে ঘোষণা করা, যা কোনো উপমাবাচক হরফ (আদাতুত তাশবীয়) দ্বারা ব্যক্ত হয় এবং উভয়ের মাঝে একটি সাধারণ উদ্দেশ্য বিদ্যমান থাকে।
খ. তাশবীয়ের রুকনসমূহ (أركان التشبيه):
তাশবীয়ের মৌলিক উপাদান বা রুকন ৪টি:
- মুশাব্বাহ (المشبه): যাকে তুলনা করা হয়। যেমন: ‘যায়দুন কাল আসাদি’ (যায়েদ সিংহের মত)—এখানে ‘যায়েদ’ হলো মুশাব্বাহ।
- মুশাব্বাহ বিহী (المشبه به): যার সাথে তুলনা করা হয়। ওপরের বাক্যে ‘সিংহ’ হলো মুশাব্বাহ বিহী। (মুশাব্বাহ ও মুশাব্বাহ বিহীকে একত্রে ‘ত্বারফায়িত তাশবীয়’ বলা হয়)।
- আদাতুত তাশবীয় (أداة التشبيه): উপমাবাচক শব্দ বা হরফ। যেমন: কাফ (كـ), কা-আন্না (كأنّ), মিসল (مثل) ইত্যাদি।
- ওয়াজহুশ শাবাহ (وجه الشبه): যে সাধারণ গুণ বা বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে তুলনা করা হয়। যেমন: ‘বীরত্ব’ বা ‘সাহসিকতা’।
গ. তাশবীয়ের প্রকারভেদ (أقسام التشبيه):
- আদাতুল তাশবীয় উল্লেখ থাকা না থাকার বিবেচনায়:
- তাশবীয় মুরসাল (المرسل): যাতে আদাত উল্লেখ থাকে। যেমন: ‘আলী কাল বাদরি’ (আলী চাঁদের মত)।
- তাশবীয় মুয়াক্কাদ (المؤكد): যেখান থেকে আদাত বিলুপ্ত করা হয়। যেমন: ‘আলী বদরুন’ (আলী পূর্ণিমার চাঁদ)।
- ওয়াজহুশ শাবাহ উল্লেখ থাকা না থাকার বিবেচনায়:
- তাশবীয় মুফাসসাল (المفصل): ওয়াজহুশ শাবাহ সুস্পষ্ট উল্লেখ থাকে। যেমন: ‘যায়েদ সিংহের মত সাহসী’।
- তাশবীয় মুজমাল (المجمل): ওয়াজহুশ শাবাহ উহ্য থাকে। যেমন: ‘যায়েদ সিংহের মত’।
- তাশবীয় বালীগ (التشبيه البليغ): যে তাশবীয়ের মধ্যে আদাত এবং ওয়াজহুশ শাবাহ উভয়টিই উহ্য থাকে। কেবল মুশাব্বাহ ও মুশাব্বাহ বিহী থাকে। যেমন: ‘আল-ইলমু নূরুন’ (জ্ঞানই আলো)। বালাগাতশাস্ত্রে এটি সর্বোচ্চ স্তরের তাশবীয়।
ঘ. তাশবীয়ের উদ্দেশ্যসমূহ (أغراض التشبيه):
- মুশাব্বাহ-এর সম্ভাব্যতা প্রমাণ করা (بيان إمكان المشبه): অসম্ভব মনে হওয়া বিষয়কে উপমার মাধ্যমে যুক্তিসিদ্ধ করা।
- মুশাব্বাহ-এর অবস্থা স্পষ্ট করা (بيان حال المشبه): শ্রোতার কাছে অজানা বস্তুর অবস্থা তুলে ধরা।
- গুণের মাত্রা ও তীব্রতা বর্ণনা (بيان مقدار حاله): প্রশংসিত গুণের গভীরতা ফুটিয়ে তোলা।
- শ্রোতার মনে প্রত্যয় ও দৃঢ়তা স্থাপন (تقرير حال المشبه): কোনো বক্তব্যকে শ্রোতার হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত করা।
- মুশাব্বাহ-কে অলঙ্কৃত বা প্রশংসিত করা (تزيين المشبه): কোনো বস্তুকে আকর্ষণীয় রূপ দান করা।
٤- ما الاستفهام؟ وكم أدواته؟ وما هى؟ اذكر المعانى التى تخرج إليها ألفاظ الاستفهام عن معناها الأصلى بالأمثلة-
[৪. الاستفهام কাকে বলে? তার أدوات কয়টি ও কী কী? ألفاظ الاستفهام তার মূল অর্থ ছাড়া যে সব অর্থে ব্যবহৃত হয় তা উদাহরণসহ লেখ।]
ক. আল-ইস্তিফহাম (الاستفهام)-এর পরিচয়:
শাব্দিক অর্থ: কোনো বিষয় বুঝতে চাওয়া, অনুসন্ধান করা বা প্রশ্ন করা।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: পূর্বে অজানা ছিল এমন কোনো বিষয় বিশেষ কোনো প্রশ্নবোধক হরফ বা শব্দের সাহায্যে জানার আকাঙ্ক্ষা করাকে ইস্তিফহাম বলা হয়।
খ. ইস্তিফহামের আদাওয়াত বা সরঞ্জামসমূহ (أدوات الاستفهام):
বালাগাতবিদদের মতে ইস্তিফহামের সরঞ্জাম মোট ১১টি। এগুলো হরফ ও ইসম-এ বিভক্ত:
- হরফ (২টি):
- হামযাহ (الهمزة – أَ): এটি ‘তাসাওয়ুর’ (একক ধারণা) এবং ‘তাসদীক্ব’ (পূর্ণ বাক্যের সত্যতা প্রতিপাদন)—উভয় ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। যেমন: ‘আ-আলীউন ক্বা-ইমুন আম খালিদ?’ অথবা ‘আ-ক্বামা আলীউন?’
- হাল (هل): এটি শুধুমাত্র ‘তাসদীক্ব’ এর জন্য ব্যবহৃত হয়। যেমন: ‘হাল হাদ্বারা খালিদুন?’ (খালেদ কি উপস্থিত হয়েছে?)।
- ইসম বা বিশেষ্য (৯টি):
- মান (مَنْ): বিবেকবান সত্তা (বুদ্ধিমান প্রাণী/মানুষ) সম্পর্কে জানার জন্য।
- মা (ما): বিবেকহীন বস্তু বা কোনো বস্তুর প্রকৃত স্বরূপ জানার জন্য।
- মাতা (متى): অতীত ও ভবিষ্যৎ সময় জানার জন্য।
- আইয়্যানা (أيّان): ভবিষ্যতের ভয়াবহ বা গুরুগম্ভীর সময় নির্ধারণে। যেমন: أَيَّانَ يَوْمُ الدِّينِ (প্রতিদান দিবস কবে?)।
- কায়ফা (كيف): কোনো কিছুর অবস্থা বা প্রকৃতি জানার জন্য।
- আইনা (أين): স্থান সম্পর্কে জানার জন্য।
- আন্না (أنّى): ‘কায়ফা’ (কেমন করে), ‘আইনা’ (কোথা থেকে), বা ‘মাতা’ (কখন)—এই ত্রিবিধ অর্থে আসে।
- কাম (كم): সংখ্যা বা পরিমাণ জানার জন্য।
- আইয়্যু (أيّ): পারস্পরিক দুটি বিষয়ের মাঝে একটিকে পৃথক ও নির্দিষ্ট করার জন্য।
গ. ইস্তিফহামের রূপক ও বালাগাতী অর্থসমূহ:
ইস্তিফহাম মূল প্রশ্নবোধক উদ্দেশ্য ছাড়াও নানা সাহিত্যিক ও আলঙ্কারিক অর্থে প্রয়োগ হয়:
- ইনকার বা অস্বীকার (الإنكار): কোনো বিষয়কে সরাসরি নাকচ করা। যেমন: أَغَيْرَ اللَّهِ تَدْعُونَ (তোমরা কি আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ডাকবে?)।
- তাকরীর বা স্বীকৃতি আদায় (التقرير): শ্রোতার মুখ থেকে সত্যের স্বীকারোক্তি নেওয়া। যেমন: أَلَسْتُ بِرَبِّكُمْ قَالُوا بَلَىٰ (আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই? তারা বলল: অবশ্যই!)।
- তা’আজ্জুব বা বিস্ময় প্রকাশ (التعجب): কোনো অদ্ভুত ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ। যেমন হযরত সুলাইমান (আ.) এর উক্তি: مَا لِيَ لَا أَرَى الْهُدْهُدَ (আমার কি হলো যে আমি হুদহুদকে দেখছি না?)।
- নাহী বা নিষেধাজ্ঞা (النهي): প্রশ্নের ছলে কোনো কাজ থেকে বারণ করা। যেমন: أَتَخْشَوْنَهُمْ فَاللَّهُ أَحَقُّ أَنْ تَخْشَوْهُ (তোমরা কি তাদের ভয় পাচ্ছ? অথচ আল্লাহকেই ভয় করা সর্বাধিক সমীচীন)।
- তামান্নী বা আকাঙ্ক্ষা (التمني): অপূরণীয় কোনো আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ। যেমন জাহান্নামীদের উক্তি: فَهَلْ لَنَا مِنْ شُفَعَاءَ فَيَشْفَعُوا لَنَا (আমাদের কি কোনো সুপারিশকারী আছে যে আমাদের জন্য সুপারিশ করবে?)।
- তাহক্বীর বা অবজ্ঞা প্রকাশ (التحقير): কাউকে তুচ্ছ প্রদর্শন করা। যেমন: أَهَٰذَا الَّذِي يَذْكُرُ آلِهَتَكُمْ (এ-ই কি সেই ব্যক্তি যে তোমাদের উপাস্যদের সমালোচনা করে?)।
٥- عرف الحقيقة والمجاز مع بيان أقسامهما ممثلا-
[৫. الحقيقة ও المجاز এর সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ উদাহরণসহ বর্ণনা কর।]
ক. হাক্বীক্বাত (الحقيقة)-এর পরিচয়:
শাব্দিক অর্থ: সত্য, যথার্থ, অটল বা প্রতিষ্ঠিত বস্তু।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: যে শব্দকে পরিভাষার নিয়মানুযায়ী তার নিজস্ব মূল ও প্রাথমিক অর্থে প্রয়োগ করা হয়, তাকে হাক্বীক্বাত বলে। যেমন ‘আসাদ’ (أسد) শব্দকে চার পা বিশিষ্ট হিংস্র পশু বা বাঘ-সিংহের অর্থে ব্যবহার করা।
হাক্বীক্বাতের প্রকারভেদ:
- হাক্বীক্বাতে লুগাবিয়্যাহ (ভাষাগত বাস্তবতা): যা মূল অভিধান অনুযায়ী ব্যবহৃত হয়। যেমন: ‘শামস’ (সূর্য)।
- হাক্বীক্বাতে শারইয়্যাহ (শরীয়তগত বাস্তবতা): শরীয়তের পরিভাষায় যে অর্থে নির্ধারিত। যেমন: ‘সালাত’ শব্দের শরীয়ত নির্ধারিত নামাযের অর্থ।
- হাক্বীক্বাতে উরফিয়্যাহ (প্রচলিত প্রথাগত বাস্তবতা): কোনো বিশেষ জাতি বা পেশার প্রচলিত অর্থ। এটি ‘উমুমী’ (সার্বজনীন) বা ‘খুসূসী’ (বিশেষ পরিভাষা) হতে পারে। যেমন: ‘দাব্বাহ’ বলতে চতুস্পদ জন্তু বোঝানো।
খ. মাজায (المجاز)-এর পরিচয়:
শাব্দিক অর্থ: অতিক্রম করা বা স্থানান্তরিত হওয়া।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: যে শব্দকে তার মূল অর্থ ছাড়া কোনো সাদৃশ্যগত বা অন্য কোনো সম্পর্কের (আলাক্বাহ) ভিত্তিতে অন্য অর্থে ব্যবহার করা হয় এবং সেখানে মূল অর্থ গ্রহণ না করার সুস্পষ্ট প্রমাণ (ক্বারীনাহ) বিদ্যমান থাকে, তাকে মাজায বলে।
গ. মাজাযের প্রকারভেদ (أقسام المجاز):
বালাগাতশাস্ত্রে মাজায প্রধানত দুটি ধারায় বিভক্ত:
- মাজাযে আকলী (المجاز العقلي): ক্রিয়াপদকে তার প্রকৃত কর্তার পরিবর্তে সম্পর্কযুক্ত অন্য কোনো কিছুর সাথে সম্বন্ধযুক্ত করা। যেমন: ‘বানাল আমীরুল ক্বাসরা’ (আমীর প্রাসাদ নির্মাণ করেছেন)—প্রকৃতপক্ষে আমীর নিজে নির্মাণ করেননি, রাজমিস্ত্রিরা নির্মাণ করেছে; আমীর হলেন নির্দেশের সম্বন্ধ।
- মাজাযে লুগাবী (المجاز اللغوي): একক শব্দের অর্থ পরিবর্তন। এটি আবার প্রধান দুই ভাগে বিভক্ত:
- ইস্তি’আরাহ (الاستعارة): যখন আসল ও রূপক অর্থের মাঝে ‘তাশবীয়’ বা সাদৃশ্যের সম্পর্ক থাকে। যেমন: ‘রায়াইতু আসাদান ইয়াহমিলুস সায়ফা’ (আমি তলোয়ারধারী একটি সিংহ দেখেছি)—এখানে সিংহ দ্বারা সাহসী সৈনিক উদ্দেশ্য।
- মাজাযে মুরসাল (المجاز المرسل): যখন আসল ও রূপক অর্থের মাঝে সাদৃশ্য ব্যতীত অন্য কোনো সম্পর্ক (যেমন কারণ, অংশ, সামগ্রিকতা ইত্যাদি) থাকে। যেমন: ‘রায়াতুল মাশিয়াতু গায়সান’ (পশুরা বৃষ্টি খেয়েছে)—এখানে বৃষ্টির কারণে উৎপন্ন ঘাস উদ্দেশ্য।
٦- عرف المساواة والإطناب- ثم بين أقسام الإطناب ممثلا-
[৬. المساواة ও الإطناب এর সংজ্ঞা দাও। الإطناب এর প্রকারগুলো উদাহরণসহ আলোচনা কর।]
ভূমিকা: আরবি অলংকারশাস্ত্রের ‘ইলমুল মা’আনী’ শাখায় শব্দ ও অর্থের পরিমাণের পারস্পরিক সামঞ্জস্যের ওপর ভিত্তি করে বক্তব্যকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়: ঈজায (সংক্ষিপ্ত প্রকাশ), মুসাওয়াত (সমপরিমাণ প্রকাশ) এবং ইত্নাব (প্রসারিত প্রকাশ)।
ক. মুসাওয়াত ও ইত্নাব-এর পরিচয়:
- আল-মুসাওয়াত (المساواة): যে বাক্যে শব্দের পরিমাণ এবং অর্থের পরিমাণ সম্পূর্ণ সমান ও ভারসাম্যপূর্ণ থাকে—শব্দ অর্থের চেয়ে অতিরিক্তও হয় না এবং অর্থ বুঝতে কোনো ঘাটতিও থাকে না। যেমন পবিত্র কুরআনের বাণী:
وَمَا تُقَدِّمُوا لِأَنْفُسِكُمْ مِنْ خَيْرٍ تَجِدُوهُ عِنْدَ اللَّهِ
“তোমরা নিজেদের জন্য যে কল্যাণ অগ্রে পাঠাবে, তা আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত পাবে।” (সূরা আল-বাক্বারাহ: ১১০)। - আল-ইত্নাব (الإطناب): কোনো বিশেষ সাহিত্যিক ও অর্থগত উপকারের (ফায়িদাহ) উদ্দেশ্যে শব্দের সংখ্যাকে অর্থের পরিমাণের চেয়ে বৃদ্ধি করা। কোনো কারণ বা উপকার ছাড়া কেবল শব্দ বাড়ালে তাকে দোষ বা ‘হাশও’ (الحشو) বলা হয়, কিন্তু উপকার থাকলে তাকে প্রশংসিত ‘ইত্নাব’ বলা হয়।
খ. ইত্নাব-এর বিভিন্ন প্রকার (أقسام الإطناب):
ইত্নাব বহুবিধ সাহিত্যিক আঙ্গিকে প্রকাশ পায়, যার প্রধান রূপগুলো নিচে উল্লেখ করা হলো:
- আমের পর খাস উল্লেখ করা (ذكر الخاص بعد العام): সামগ্রিক বিষয়ের উল্লেখের পর বিশেষ একটি বিষয়ের গুরুত্ব বুঝাতে তা আলাদা করে উল্লেখ করা। যেমন:
حَافِظُوا عَلَى الصَّلَوَاتِ وَالصَّلَاةِ الْوُسْطَىٰ
“তোমরা সমস্ত নামাযের যত্ন নাও, বিশেষ করে মধ্যবর্তী নামাযের (আসর)।” এখানে সব নামাযের মধ্যে আসর অন্তর্ভুক্ত থাকা সত্ত্বেও তার বিশেষ মর্যাদার কারণে আলাদা উল্লেখ করা হয়েছে। - খাসের পর আম উল্লেখ করা (ذكر العام بعد الخاص): বিশেষ বস্তু আগে বলে পরে ব্যাপকতা প্রকাশ করা। যেমন হযরত নূহ (আ.)-এর দু’আ:
رَبِّ اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِمَنْ دَخَلَ بَيْتِيَ مُؤْمِنًا وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ
(হে প্রতিপালক! আমাকে, আমার মাতাপিতাকে, আমার ঘরে প্রবেশকারী মুমিনদের এবং সমস্ত মুমিন নর-নারীকে ক্ষমা করুন)। - স্পষ্ট ব্যাখ্যার পর অস্পষ্টতা দূরীকরণ (الإيضاح بعد الإبهام): প্রথমে সংক্ষেপে বলে শ্রোতার আগ্রহ সৃষ্টি করা, অতঃপর বিশদ ব্যাখ্যা দেওয়া। যেমন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا هَلْ أَدُلُّكُمْ عَلَىٰ تِجَارَةٍ تُنْجِيكُمْ مِنْ عَذَابٍ أَلِيمٍ ۞ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ… - পুনরাবৃত্তি বা তাকরার (التكرار لداعي التأكيد): কোনো কথা হৃদয়ে গেঁথে দেওয়ার জন্য বা সতর্ক করার জন্য পুনরাবৃত্তি করা। যেমন:
كَلَّا سَوْفَ تَعْلَمُونَ ۞ ثُمَّ كَلَّا سَوْفَ تَعْلَمُونَ (কখনই নয়, তোমরা শীঘ্রই জানতে পারবে; আবার বলি, কখনই নয়, তোমরা শীঘ্রই জানতে পারবে)। - ই’তিরাদ্ব বা প্রচ্ছন্ন বাক্য সংযোজন (الاعتراض): মূল বক্তব্যের মাঝে দু’আ বা প্রশংসাসূচক বাক্য নিয়ে আসা। যেমন: ‘ক্বালা রাসূলুল্লাহি — সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম — কাযা…’।
- তাতমীম বা পরিপূরক শর্তযুক্তকরণ (التتميم): কোনো ভুল ধারণা নিরসনের জন্য অতিরিক্ত শর্তযুক্ত করা। যেমন: وَيُطْعِمُونَ الطَّعَامَ عَلَىٰ حُبِّهِ مِسْكِينًا وَيَتِيمًا وَأَسِيرًا (তারা খাদ্যের প্রতি গভীর আকর্ষণ থাকা সত্ত্বেও অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দীদের তা আহার করায়)।
مجموعة (ب) – খ বিভাগ: সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি
٧- ما الإنشاء؟ بين أقسامه بالأمثلة-
[৭. الإنشاء এর সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ উদাহরণসহ বর্ণনা কর।]
ক. আল-ইনশা (الإنشاء)-এর সংজ্ঞা:
যে বাক্য কোনো বাহ্যিক বাস্তবতার সংবাদ বহন করে না এবং যার বক্তাকে সরাসরি সত্যবাদী (সাদিক্ব) কিংবা মিথ্যাবাদী (কাযিব) বলা যায় না, তাকে আল-ইনশা বলে। উচ্চারণের মাধ্যমেই এর বাস্তব অর্থ সংঘটিত হয়।
খ. ইনশার প্রকারভেদ:
ইনশা প্রধানত দুই প্রকার:
- ইনশায়ে ত্বলাবী (الإنشاء الطلبي): যাতে এমন কোনো কিছু অর্জনের দাবি থাকে যা উচ্চারণের সময় উপস্থিত ছিল না। এর প্রধান ৫টি রূপ:
- আমর (الأمر – আদেশ): যেমন—اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ (পড় তোমার প্রতিপালকের নামে)।
- নাহী (النهي – নিষেধ): যেমন—وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَا (ব্যভিচারের কাছেও যেও না)।
- ইস্তিফহাম (الاستفهام – জিজ্ঞাসা): যেমন—مَنْ ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَهُ (কে সে যে তাঁর নিকট সুপারিশ করবে?)।
- তামান্নী (التمني – আকাঙ্ক্ষা): যেমন—‘লাইতাশ শাবাবা ইয়া’উদু’ (হায়! যদি তারুণ্য ফিরে আসত)।
- নিদা (النداء – আহ্বান): যেমন—يَا مَرْيَمُ اقْنُتِي لِرَبِّكِ (হে মারইয়াম! তোমার প্রতিপালকের আনুগত্য কর)।
- ইনশায়ে গাইরে ত্বলাবী (الإنشاء غير الطلبي): যাতে কোনো কিছু অর্জনের দাবি থাকে না। যেমন:
- মাদহ ও যাম্ম (প্রশংসা ও নিন্দা): যেমন—نِعْمَ الْعَبْدُ (কতই না উত্তম বান্দা!) এবং بِئْسَ الِاسْمُ الْفُسُوقُ।
- ক্বাসাম (শপথ): যেমন—وَالشَّمْسِ وَضُحَاهَا (সূর্য ও তার উজ্জ্বল কিরণের শপথ)।
- তা’আজ্জুব (বিস্ময় প্রকাশ): যেমন—‘মা আহসানাস সামা-আ!’ (আকাশ কতই না সুন্দর!)।
- উকুফ ও ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি: যেমন—‘বি’তু’ (আমি বিক্রি করলাম)।
٨- ماذا تفهم من الاستعارة؟ بين أقسامها-
[৮. الاستعارة বলতে কী বোঝ? এর প্রকারভেদ বর্ণনা কর।]
ক. আল-ইস্তি’আরাহ (الاستعارة)-এর পরিচয়:
শাব্দিক অর্থ: কোনো বস্তু ধার নেওয়া বা কর্জ করা।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: যে তাশবীয়ের দুটি মূল রুকনের (মুশাব্বাহ ও মুশাব্বাহ বিহী) যেকোনো একটিকে বিলুপ্ত করে অপরটিকে গ্রহণ করা হয় এবং উভয়ের মাঝে সাদৃশ্যের সম্পর্ক (علاقة المشابهة) থাকে, তাকে ইস্তি’আরাহ বলে। অন্য কথায়, ইস্তি’আরাহ হলো আদাত ও এক পক্ষ বর্জিত সংক্ষিপ্ততম তাশবীয়।
খ. রুকন বিলুপ্তির ভিত্তিতে ইস্তি’আরাহর প্রকারভেদ:
- ইস্তি’আরাহ তাসরীহিয়্যাহ (الاستعارة التصريحية): যে ইস্তি’আরায় মুশাব্বাহ বিহী (যার সাথে তুলনা করা হয়) সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে এবং মুশাব্বাহ বিলুপ্ত করা হয়। যেমন পবিত্র কুরআনের আয়াত:
كِتَابٌ أَنْزَلْنَاهُ إِلَيْكَ لِتُخْرِجَ النَّاسَ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ
“এটি এমন গ্রন্থ যা আপনার প্রতি নাযিল করেছি যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন।” এখানে ‘কুফর ও অজ্ঞতা’কে অন্ধকারের সাথে এবং ‘ঈমান ও হেদায়েত’কে আলোর সাথে তুলনা করে কেবল আলো ও অন্ধকার উল্লেখ করা হয়েছে। - ইস্তি’আরাহ মাকনিয়্যাহ (الاستعارة المكنية): যে ইস্তি’আরায় মুশাব্বাহ বিহী বিলুপ্ত থাকে, কিন্তু তার কোনো অবিচ্ছেদ্য বৈশিষ্ট্য বা নিদর্শন রেখে দেওয়া হয়। যেমন কবি হাজ্জাজ বিন ইউসুফের উক্তি:
إِنِّي لَأَرَى رُءُوسًا قَدْ أَيْنَعَتْ وَحَانَ قِطَافُهَا
“আমি এমন কিছু মস্তক দেখতে পাচ্ছি যা পেকে গেছে এবং তা কেটে ফেলার সময় হয়েছে।” এখানে মস্তককে ফলের সাথে তুলনা করা হয়েছে, ফল শব্দটি বাদ দিয়ে তার বৈশিষ্ট্য ‘পেকে যাওয়া ও আহরণ’ উল্লেখ করা হয়েছে।
٩- عرف المحسنات اللفظية ممثلا-
[৯. المحسنات اللفظية এর সংজ্ঞা উদাহরণসহ লেখ।]
ক. মুহাসসিনাতে লাফযিয়্যাহ (المحسنات اللفظية)-এর পরিচয়:
আরবি অলংকারশাস্ত্রের ‘ইলমুল বাদী’ (علم البديع) শাখায় বাক্যের গঠনগত ও বাহ্যিক সৌন্দর্য বৃদ্ধির যে সমস্ত শিল্পকৌশল ব্যবহার করা হয়, যার ফলে ভাষার উচ্চারণ শ্রুতিমধুর, ছন্দোবদ্ধ ও চিত্তাকর্ষক রূপ লাভ করে, তাকে মুহাসসিনাতে লাফযিয়্যাহ (শব্দালংকার) বলা হয়।
খ. প্রধান প্রধান শব্দালংকার ও তার উদাহরণ:
- জিনাস (الجناس – শব্দের সমোচ্চারণ): দুটি শব্দের উচ্চারণে, হরফে ও রূপে হুবহু বা কাছাকাছি মিল থাকা সত্ত্বেও অর্থে সম্পূর্ণ ভিন্ন হওয়া।
- জিনাসে তাম (সম্পূর্ণ সমোচ্চারণ): যেমন কুরআনে ইরশাদ হয়েছে—
وَيَوْمَ تَقُومُ السَّاعَةُ يُقْسِمُ الْمُجْرِمُونَ مَا لَبِثُوا غَيْرَ سَاعَةٍ
“যেদিন ক্বিয়ামত (الساعة) সংঘটিত হবে, অপরাধীরা শপথ করে বলবে তারা এক মুহূর্তের (ساعة) বেশি অবস্থান করেনি।” এখানে প্রথম সা’আহ অর্থ ক্বিয়ামত এবং দ্বিতীয় সা’আহ অর্থ পার্থিব ক্ষুদ্র সময়।
- জিনাসে তাম (সম্পূর্ণ সমোচ্চারণ): যেমন কুরআনে ইরশাদ হয়েছে—
- সাজা’ (السجع – অনুগ্রাস বা অন্ত্যমিল): গদ্যের দুটি বা ততোধিক বাক্যের শেষ অক্ষরের নিখুঁত মিল। যেমন পবিত্র কুরআনের বাণী:
فِيهَا سُرُرٌ مَرْفُوعَةٌ ۞ وَأَكْوَابٌ مَوْضُوعَةٌ ۞ وَنَمَارِقُ مَصْفُوفَةٌ (সূরা আল-গাশিয়াহ)। প্রতিটি বাক্যের শেষে ‘তা’ মারবূতাহ ও একই ছন্দ রয়েছে। - ইক্বতিবাস (الاقتباس – উদ্ধৃতি সংযোজন): কবিতা বা গদ্যের মধ্যে কুরআন বা হাদীসের কোনো বাক্য নিজের রচনার অঙ্গ হিসেবে উদ্ধৃতির উল্লেখ ছাড়া চমৎকারভাবে ব্যবহার করা।
١٠- بين علاقة المجاز المرسل ممثلا-
[১০. مجاز المرسل এর علاقة গুলো উদাহরণসহ বর্ণনা কর।]
ক. মাজাযে মুরসাল (المجاز المرسل)-এর সংজ্ঞা:
যে শব্দ তার আসল অর্থ ব্যতীত অন্য অর্থে ব্যবহৃত হয় এবং তাদের মধ্যকার সম্পর্কটি তাশবীয় বা সাদৃশ্য ছাড়া অন্য কোনো যুক্তিসঙ্গত সংযোগের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে, তাকে মাজাযে মুরসাল বলে।
খ. মাজাযে মুরসালের প্রধান প্রধান ‘আলাক্বাহ’ বা সম্পর্কসমূহ:
- জুযইয়্যাহ (الجزئية – অংশের উল্লেখ করে সামগ্রিকতা বোঝানো): কোনো বস্তুর একটি অংশের নাম নিয়ে পুরো সত্তাকে বোঝানো। যেমন: ‘ফাতাহরীরু রাাক্বাবাতিন’ (একটি ঘাড় মুক্ত করা)—ঘাড় একটি অংশ, কিন্তু এর দ্বারা পুরো দাসকে মুক্ত করা উদ্দেশ্য।
- কুল্লিয়্যাহ (الكلية – সামগ্রিকতার উল্লেখ করে অংশ বোঝানো): সম্পূর্ণ অংশের নাম উল্লেখ করে আংশিক উদ্দেশ্য নেওয়া। যেমন:
يَجْعَلُونَ أَصَابِعَهُمْ فِي آذَانِهِمْ (তারা তাদের আঙুলগুলো কানের ভেতর ঢুকিয়ে দেয়)—প্রকৃতপক্ষে পুরো আঙুল ঢোকানো সম্ভব নয়, বরং আঙুলের অগ্রভাগ উদ্দেশ্য। - সাবাবিয়্যাহ (السببية – কারণ উল্লেখ করে ফলাফল বোঝানো): কারণকে উল্লেখ করে তার দ্বারা সৃষ্ট বস্তুকে বোঝানো। যেমন: ‘রা’আয়নাল গায়সা’ (আমরা বৃষ্টি চরিয়েছি)—বৃষ্টি হলো কারণ, উদ্দেশ্য হলো বৃষ্টি দ্বারা উৎপন্ন সবুজ ঘাস।
- মুসাব্বাবিয়্যাহ (المسببية – ফলাফল উল্লেখ করে কারণ বোঝানো): ফলাফল উল্লেখ করে মূল কারণ উদ্দেশ্য নেওয়া। যেমন:
وَيُنَزِّلُ لَكُمْ مِنَ السَّمَاءِ رِزْقًا (তিনি আকাশ থেকে তোমাদের জন্য রিযিক বর্ষণ করেন)—রিযিক হলো ফল, কিন্তু এখানে মূল কারণ ‘বৃষ্টি’ উদ্দেশ্য। - ইতিবারু মা কানা (اعتبار ما كان – অতীত অবস্থার বিবেচনা): অতীত নাম ব্যবহার করা। যেমন: وَآتُوا الْيَتَامَىٰ أَمْوَالَهُمْ (এতিমদের সম্পদ তাদের ফিরিয়ে দাও)—বয়োপ্রাপ্ত হলে তারা আর এতিম থাকে না, কিন্তু অতীত অবস্থার স্মরণে এতিম বলা হয়েছে।
- ইতিবারু মা ইয়াকূন (اعتبار ما يكون – ভবিষ্যত অবস্থার বিবেচনা): ভবিষ্যতে যা হবে সেই নামে বর্তমানকে সম্বোধন করা। যেমন ইউসুফ (আ.)-এর বন্দীর উক্তি: إِنِّي أَرَانِي أَعْصِرُ خَمْرًا (আমি স্বপ্নে দেখলাম আমি মদ নিংড়াচ্ছি)—প্রকৃতপক্ষে আঙ্গুর নিংড়ানো হচ্ছিল যা পরবর্তীতে মদে পরিণত হবে।
١١- اذكر تقسيم الكلام ممثلا-
[১১. الكلام এর প্রকার উদাহরণসহ উল্লেখ কর।]
ক. বালাগাতশাস্ত্রে কালাম (الكلام)-এর পরিচয়:
অর্থবোধক বাক্যকে বালাগাতশাস্ত্রে ‘কালাম’ বলা হয়। বক্তব্যের উদ্দেশ্য ও বহিরাগত বাস্তবতার সাথে সম্পর্কের ভিত্তিতে বালাগাতবিদগণ কালামকে প্রধান দুই ভাগে বিভক্ত করেছেন:
- আল-খবর (الخبر): যে বাক্য কোনো বাস্তব তথ্য বা সংবাদের রূপ বহন করে এবং বাস্তবতার নিরিখে যার বক্তাকে সত্যবাদী (সাদিক্ব) কিংবা মিথ্যাবাদী (কাযিব) বলা সম্ভব। যেমন: ‘আল-কুরআনু কালামুল্লাহ’ (কুরআন আল্লাহর বাণী) অথবা ‘আশ-শামসু ত্বালি’আতুন’ (সূর্য উদিত হয়েছে)।
- আল-ইনশা (الإنشاء): যে বাক্য কোনো বহিরাগত সংবাদের রূপ ধারণ করে না এবং যার বক্তাকে সরাসরি সত্যবাদী বা মিথ্যাবাদী বলা যায় না; বরং বাক্য উচ্চারণের সাথেই তার উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হয়। যেমন: ‘ইজহাবু ইলাল মাসজিদ’ (মসজিদে যাও)।
খ. শ্রোতার মানসিক অবস্থানুসারে খবরের প্রকারভেদ (ضرب الخبر):
- ইবতিদাঈ (الابتدائي): নিঃশঙ্ক শ্রোতার জন্য কোনো তাকীদ ছাড়া বক্তব্য। যেমন: ‘মুহাম্মাদুন ত্বালিবুন’।
- ত্বালাবী (الطلبي): দ্বিধান্বিত শ্রোতার জন্য একটি তাকীদসহ বাক্য। যেমন: ‘ইন্না মুহাম্মাদান ত্বালিবুন’।
- ইনকারী (الإنكاري): চরম অস্বীকারকারীর জন্য একাধিক তাকীদসহ বাক্য। যেমন: ‘ওয়াল্লাহি ইন্না মুহাম্মাদান লাত্বালিবুন’।
١٢- عرف النداء- ثم بين أدواته-
[১২. النداء এর সংজ্ঞা দাও। এর أدوات গুলো লেখ।]
ক. আন-নিদা (النداء)-এর পরিচয়:
শাব্দিক অর্থ: ডাকা, আহ্বান করা বা উচ্চৈঃস্বরে স্মরণ করা।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: ‘উদ্দীন’ বা ‘আনাদি’ (আমি ডাকছি) ক্রিয়ার স্থলাভিষিক্ত কোনো বিশেষ হরফের সাহায্যে উদ্দিষ্ট ব্যক্তির দৃষ্টি আকর্ষণ করা বা তাকে নিজের দিকে মনোযোগী করার বাক্যকে নিদা (আহ্বান) বলা হয়।
খ. নিদার হরফসমূহ (أدوات النداء):
আরবি বালাগাত ও ব্যাকরণশাস্ত্রে নিদার জন্য নির্ধারিত হরফ মোট ৮টি। এগুলো আহ্বানের দূরত্বের ভিত্তিতে বিভক্ত:
- কাছের মানুষকে ডাকার জন্য (للقريب):
- হামযাহ (الهمزة – أ): যেমন—‘আ-যায়েদু আক্ববিল’ (হে যায়েদ! অগ্রসর হও)।
- আই (أيْ): যেমন—‘আই বুনাইয়্যা’ (হে আমার প্রিয় বৎস!)।
- দূরের মানুষকে ডাকার জন্য (للبعيد):
- আয়া (آيَا)
- হায়া (هَيَا)
- আই (آيْ)
- ওয়া (وَا): এটি মূলত শোক বা ক্রন্দনে ব্যবহৃত হয় (নুদ্ববাহ)। যেমন: ‘ওয়া মুসলিমা-হ’।
- কাছে ও দূরে সবক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য (للقريب والبعيد):
- ইয়া (يَا): এটি নিদার মূল ও সর্বাধিক ব্যবহৃত হরফ। কাছে ও দূরে উভয় দূরত্বে এটি ব্যবহৃত হয়। যেমন কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمْ (হে মানবজাতি! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর)।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. উলূমুল বালাগাহ প্রধানত কয়টি শাখায় বিভক্ত?
উলূমুল বালাগাহ প্রধানত তিনটি প্রধান শাখায় বিভক্ত: ইলমুল মা’আনী (علم المعاني), ইলমুল বায়ান (علم البيان), এবং ইলমুল বাদী’ (علم البديع)।
২. ফাসাহাত ও বালাগাত-এর মধ্যে মৌলিক পার্থক্য কী?
ফাসাহাত হলো একক শব্দ বা বাক্যের ব্যাকরণিক শুদ্ধতা ও শ্রুতিমধুরতা। অপরদিকে বালাগাত হলো সেই বিশুদ্ধ বাক্যকে পরিস্থিতি ও শ্রোতার মানসিক অবস্থার উপযোগী করে পরিবেশন করার সাহিত্যিক যোগ্যতা।
৩. তাশবীয় বালীগ কাকে বলা হয়?
যে উপমায় উপমাবাচক শব্দ (আদাতুত তাশবীয়) এবং সাদৃশ্যের ভিত্তি (ওয়াজহুশ শাবাহ)—উভয়টিই উহ্য রেখে কেবল মুশাব্বাহ ও মুশাব্বাহ বিহী উল্লেখ করা হয়, তাকে তাশবীয় বালীগ বলে। যেমন: ‘আল-ইলমু নূরুন’ (জ্ঞানই আলো)।
৪. আমরের আসল অর্থ কী এবং এটি রূপক অর্থে কখন ব্যবহৃত হয়?
আমরের আসল অর্থ হলো ঊর্ধ্বতন সত্তা কর্তৃক কোনো কাজ সম্পাদনের বাধ্যতামূলক আদেশ। তবে বাক্যের প্রেক্ষাপট ও সম্পর্কের ভিত্তিতে এটি প্রার্থনা (দু’আ), অনুরোধ (ইলতিমাস), হুমকি (তাহদীদ), অক্ষমকরণ (তা’জীয) ইত্যাদি বিভিন্ন রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়।
৫. হাক্বীক্বাত ও মাজাযের মধ্যে পার্থক্য কী?
শব্দকে যখন তার আসল অভিধানিক অর্থে ব্যবহার করা হয় তখন তা হাক্বীক্বাত। আর যখন কোনো বিশেষ সম্পর্ক ও প্রমাণের ভিত্তিতে আসল অর্থ বাদ দিয়ে রূপক অর্থে প্রয়োগ করা হয়, তখন তাকে মাজায বলা হয়।
৬. পবিত্র কুরআন অনুধাবনে বালাগাত শাস্ত্রের ভূমিকা কী?
পবিত্র কুরআনের সাহিত্যিক অতুলনীয়তা ও ই’জাযের রহস্য সাধারণ ব্যাকরণ দিয়ে অনুধাবন করা অসম্ভব। কেবল বালাগাত শাস্ত্রের মাধ্যমেই কুরআনের শব্দচয়ন, অলঙ্কার এবং বাক্যগঠনের অন্তর্নিহিত ঐশী অলৌকিক সৌন্দর্য উপলব্ধি করা সম্ভব।