জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

আত-তাফসীর বিদূনিস সানাদ (At-Tafsir Bidunis Sanad) – 201201, আল-কুরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ – ফাজিল অনার্স ২য় বর্ষ পরীক্ষা 2020

Abswer.com Abswer.com
21 September, 2026
৫৯ মিনিট পড়ার সময়
৮ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ২য় বর্ষ পরীক্ষা 2020
বিভাগ: আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: আত-তাফসীর বিদূনিস সানাদ (التفسير بدون السند)
বিষয় কোড: 201201 | পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
[দ্রষ্টব্য: (ক) অংশ হতে যে কোনো পাঁচটি এবং (খ) অংশ হতে যে কোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দাও।]


مجموعة (أ) – ক বিভাগ: আয়াতভিত্তিক তাফসির ও প্রশ্নোত্তর

١- قال الله تبارك وتعالى: ﴿الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ ۝ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ ۝ مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ ۝ إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ﴾

[১. মহান আল্লাহ তা’আলার বাণী: “যাবতীয় প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য, যিনি সকল সৃষ্টির পালনকর্তা। যিনি পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু। যিনি বিচার দিবসের মালিক। আমরা কেবল আপনারই ইবাদত করি এবং কেবলমাত্র আপনারই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি।” (সূরা আল-ফাতিহা: ২-৫)]

আয়াতসমূহের সংক্ষিপ্ত তাফসির:

সূরা আল-ফাতিহা হলো পবিত্র কুরআনের সারসংক্ষেপ বা ‘উম্মুল কিতাব’। এখানে আল্লাহর একচ্ছত্র প্রশংসা, তাঁর রবুবিয়্যাত বা সার্বিক প্রতিপালন, তাঁর অফুরন্ত রহমত এবং পরকালীন বিচার দিবসের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পর বান্দার পক্ষ থেকে একমাত্র আল্লাহর দাসত্ব ও সাহায্যের আকুল প্রার্থনা পেশ করা হয়েছে। ‘আলহামদু লিল্লাহ’ বলে সকল অস্তিত্বের মূল উৎসের প্রতি কৃতজ্ঞতা নিবেদন করা হয়েছে।

(أ) ما معنى الرحمن والرحيم؟ وما الفرق بينهما؟

[(ক) ‘আর-রাহমান’ এবং ‘আর-রাহিম’-এর অর্থ কী? এ দুটির মধ্যে পার্থক্য কী?]

  1. শাব্দিক অর্থ: ‘আর-রাহমান’ (الرَّحْمَنُ) এবং ‘আর-রাহিম’ (الرَّحِيمُ) উভয় শব্দই ‘আর-রহমাহ’ (الرَّحْمَةُ) মূলধাতু থেকে গৃহীত, যার অর্থ দয়া, অনুগ্রহ ও করুণা। ‘আর-রাহমান’ শব্দটি ‘ফা’লান’ (فَعْلَانُ) ওজনে গঠিত, যা আধিক্য ও ব্যাপকতা নির্দেশ করে। আর ‘আর-রাহিম’ শব্দটি ‘ফা’ইল’ (فَعِيلٌ) ওজনে গঠিত, যা ধারাবাহিকতা ও স্থায়িত্ব প্রকাশ করে।
  2. অর্থগত পার্থক্য:
    • রহমতের ব্যাপকতা ও বিশেষত্ব: ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) এবং তাফসিরবিদগণের মতে, ‘আর-রাহমান’ হলেন তিনি—যার করুণা সৃষ্টিজগতের সকল প্রাণীর জন্য উন্মুক্ত (মুমিন, কাফির নির্বিশেষে)। আর ‘আর-রাহিম’ হলেন তিনি—যার বিশেষ রহমত পরকালে কেবল বিশ্বাসী মুমিনদের জন্য নির্ধারিত। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: “আর তিনি মুমিনদের প্রতি পরম দয়ালু (রহিম)।” (সূরা আল-আহযাব: ৪৩)।
    • নামকরণের বৈশিষ্ট্য: ‘আর-রাহমান’ নামটি আল্লাহর এমন এক অনুপম গুণবাচক নাম, যা আল্লাহ ছাড়া সৃষ্টিজগতের কারো জন্য ব্যবহার করা সম্পূর্ণ হারাম। পক্ষান্তরে ‘রহিম’ শব্দটি সৃষ্টির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে; যেমন পবিত্র কুরআনে রাসূলুল্লাহ (সা.) সম্পর্কে বলা হয়েছে: “তিনি মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল ও পরম দয়ালু (রহিম)।” (সূরা আত-তাওবাহ: ১২৮)।

(ب) كم قراءة في قول: مَلِكِ يَوْمِ الدِّين؟ بيّن-

[(খ) ‘মালিকি ইয়াওমিদ দ্বীন’ বাক্যে কয়টি কিরাত রয়েছে? বর্ণনা কর।]

  1. প্রসিদ্ধ মুতাওয়াতির কিরাতসমূহ: ‘مَلِكِ يَوْمِ الدِّينِ’ বাক্যে সাব’আহ (সাত) কিরাতের ইমামগণের মধ্যে মূলত দুইটি বিশুদ্ধ ও সুপ্রসিদ্ধ কিরাত বিদ্যমান:
    • আলিফসহ কিরাত (مَالِكِ): ইমাম আসিম, ইমাম কিসাঈ এবং ইয়াকুব (রহ.) আলিফ দীর্ঘ করে ‘মালিক’ (مَالِكِ – স্বত্বাধিকারী/মালিক) পড়েছেন। এর অর্থ: যিনি বিচার দিবসের একক মালিক ও পূর্ণ ক্ষমতার অধিকারী।
    • আলিফ ব্যতীত কিরাত (مَلِكِ): ইমাম নাফি’, ইবনে কাসির, আবু আমর, ইবনে আমির এবং হামযাহ (রহ.) আলিফ ছাড়া লামের নিচে যের দিয়ে ‘মালিক’ (مَلِكِ – বাদশাহ/সম্রাট) পড়েছেন। এর অর্থ: বিচার দিবসের একচ্ছত্র সার্বভৌম অধিপতি ও মহারাজা।
  2. উভয় কিরাতের অর্থগত সমন্বয়: উভয় কিরাতই অর্থ ও মাহাত্ম্যের দিক থেকে পরিপূর্ণ। কারণ একজন বাদশাহ (মালিক) প্রজাদের ওপর শাসন ক্ষমতা রাখলেও ব্যক্তিগত সম্পত্তির মালিক নাও হতে পারেন; আবার একজন মালিক সম্পত্তির অধিকারী হলেও রাজনৈতিক বাদশাহ নাও হতে পারেন। কিন্তু মহীয়ান আল্লাহ তা’আলা বিচার দিবসে একই সাথে পরম ‘মালিক’ (সকল সৃষ্টির স্বত্বাধিকারী) এবং সর্বোচ্চ ‘মালিক’ (একচ্ছত্র সার্বভৌম অধিপতি)।

٢- قال تعالى: ﴿إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا سَوَاءٌ عَلَيْهِمْ أَأَنذَرْتَهُمْ أَمْ لَمْ تُنذِرْهُمْ لَا يُؤْمِنُونَ ۝ خَتَمَ اللَّهُ عَلَىٰ قُلُوبِهِمْ وَعَلَىٰ سَمْعِهِمْ ۖ وَعَلَىٰ أَبْصَارِهِمْ غِشَاوَةٌ ۖ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ﴾

[২. মহান আল্লাহর বাণী: “নিশ্চয় যারা কুফরি করেছে, আপনি তাদেরকে সতর্ক করুন বা না করুন—উভয়ই তাদের জন্য সমান, তারা ঈমান আনবে না। আল্লাহ তাদের অন্তরে এবং তাদের কানে মোহর এঁটে দিয়েছেন এবং তাদের চোখের ওপর রয়েছে পর্দা; আর তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।” (সূরা আল-বাকারা: ৬-৭)]

আয়াতদ্বয়ের সংক্ষিপ্ত তাফসির:

মুমিনদের বৈশিষ্ট্যের বর্ণনার পর এখানে একগুঁয়ে ও পথভ্রষ্ট কাফিরদের চিরন্তন পরিণতি বর্ণনা করা হয়েছে। যারা সত্যকে জেনে-বুঝে অহংকারবশত অস্বীকার করে, তাদের অন্তর মোহরাঙ্কিত হয়ে যায়। ফলে কোনো সত্য উপদেশ তাদের অন্তরে দাগ কাটে না।

(أ) ما معنى الإنذار؟ وكم قراءة في أَأَنذَرْتَهُمْ؟ بيّن-

[(ক) ‘ইনযার’ শব্দের অর্থ কী? ‘আ-আনযারতাহুম’ শব্দে কয়টি কিরাত রয়েছে? বর্ণনা কর।]

  1. ‘ইনযার’-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ: ‘ইনযার’ (الإنذار) শব্দের আভিধানিক অর্থ সতর্ক করা, ভীতি প্রদর্শন করা বা আসন্ন বিপদ সম্পর্কে পূর্বাহ্নে হুশিয়ার করা। ইসলামি পরিভাষায়, ইনযার হলো মানুষকে আল্লাহ তা’আলার ক্রোধ, অবাধ্যতার অশুভ পরিণতি এবং জাহান্নামের কঠোর শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করে সত্য পথে আহ্বান করা।
  2. ‘أَأَنذَرْتَهُمْ’-এর কিরাতগত রূপভেদ: এখানে পরপর দুইটি হামযা একত্রিত হয়েছে (হামযাতুল ইস্তিফহাম ও ফা’ কালিমার হামযা)। কিরাতশাস্ত্রে এ সংক্রান্ত প্রধান কিরাতসমূহ:
    • তাহকিক (উভয় হামযা স্পষ্ট উচ্চারণ): কুফার ক্বারীগণ (ইমাম আসিম ও হামযাহ) উভয় হামযাকে পৃথক ও সুস্পষ্টভাবে উচ্চারণ করেন—’আ-আনযারতাহুম’।
    • তাসহিল (দ্বিতীয় হামযা নরম করে পড়া): ইমাম নাফি’, ইবনে কাসির ও আবু আমর (রহ.) দ্বিতীয় হামযাকে আলিফ ও হামযার মধ্যবর্তী নরম ধ্বনিতে (তাসহিল) পড়েন।
    • ইবদাল ও ইদখাল: কোনো কোনো কিরাতে উভয় হামযার মাঝে একটি আলিফ প্রবেশ করিয়ে (ইদখাল) অথবা দ্বিতীয় হামযাকে আলিফে রূপান্তর করে (ইবদাল) পড়া হয়।

(ب) ما معنى الكفر؟ وما الفرق بينه وبين الشرك؟

[(খ) ‘কুফর’ শব্দের অর্থ কী? কুফর এবং শিরকের মধ্যে পার্থক্য কী?]

  1. কুফরের অর্থ: আভিধানিক অর্থে ‘কুফর’ (الكُفْرُ) হলো কোনো কিছু ঢেকে রাখা বা গোপন করা। কৃষককে আরবীতে ‘কাফির’ বলা হয় কারণ সে বীজ মাটিতে ঢেকে দেয়। শরীয়তের পরিভাষায়, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.) কর্তৃক আনীত দ্বীনের কোনো অকাট্য বিধানকে জেনে-শুনে অবিশ্বাস বা অস্বীকার করাকে কুফর বলা হয়।
  2. কুফর ও শিরকের পার্থক্য:
    • আম ও খাস সম্পর্ক: প্রতিটি শিরকই কুফর, কিন্তু প্রতিটি কুফর শিরক নয়। অর্থাৎ কুফর হলো ব্যাপক (আম) এবং শিরক হলো তার একটি বিশেষ রূপ (খাস)।
    • সংজ্ঞাগত পার্থক্য: কুফর হলো সত্যকে সরাসরি অস্বীকার করা, অবিশ্বাস করা বা দ্বীনের কোনো অকাট্য হুকুম অমান্য করা (যেমন—পরকাল বা নামায অস্বীকার করা)। আর শিরক হলো আল্লাহর রবুবিয়্যাত, উলুহিয়্যাত বা গুণাবলিতে অন্য কাউকে সমকক্ষ বা অংশীদার স্থির করা।

٣- قال تعالى: ﴿مَثَلُهُمْ كَمَثَلِ الَّذِي اسْتَوْقَدَ نَارًا فَلَمَّا أَضَاءَتْ مَا حَوْلَهُ ذَهَبَ اللَّهُ بِنُورِهِمْ وَتَرَكَهُمْ فِي ظُلُمَاتٍ لَّا يُبْصِرُونَ ۝ صُمٌّ بُكْمٌ عُمْيٌ فَهُمْ لَا يَرْجِعُونَ ۝ أَوْ كَصَيِّبٍ مِّنَ السَّمَاءِ فِيهِ ظُلُمَاتٌ وَرَعْدٌ وَبَرْقٌ يَجْعَلُونَ أَصَابِعَهُمْ فِي آذَانِهِم مِّنَ الصَّوَاعِقِ حَذَرَ الْمَوْتِ ۚ وَاللَّهُ مُحِيطٌ بِالْكَافِرِينَ﴾

[৩. মহান আল্লাহর বাণী: “তাদের দৃষ্টান্ত সেই ব্যক্তির মতো, যে আগুন জ্বালালো; অতঃপর যখন আগুন তার চারপাশ আলোকিত করল, আল্লাহ তাদের আলো অপসারিত করলেন এবং তাদেরকে ঘোর অন্ধকারে ফেলে দিলেন, যাতে তারা দেখতে পায় না। তারা বধির, মূক ও অন্ধ; কাজেই তারা ফিরে আসবে না। অথবা তাদের দৃষ্টান্ত আকাশের বর্ষণমুখর মেঘের মতো, যাতে রয়েছে ঘন অন্ধকার, বজ্রধ্বনি ও বিদ্যুৎ চমক। বজ্রের গর্জনে মৃত্যুর ভয়ে তারা কানে আঙুল দিয়ে রাখে; অথচ আল্লাহ কাফিরদের পরিবেষ্টন করে আছেন।” (সূরা আল-বাকারা: ১৭-১৯)]

আয়াতসমূহের সংক্ষিপ্ত তাফসির:

এখানে মুনাফিকদের চরম দ্বিধাদ্বন্দ্ব, কপটতা ও অভ্যন্তরীণ অন্ধকারের দুটি প্রোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হয়েছে: একটি অগ্নির দৃষ্টান্ত (মাসালে নারি) এবং অন্যটি বৃষ্টি ও ঝড়ের দৃষ্টান্ত (মাসালে মায়ি)। মুনাফিকরা মুখে ইসলামের আলো গ্রহণ করার ভান করলেও অন্তরের কুফরি ও সংশয়ের কারণে তারা আলোহীন অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকে।

(أ) ما معنى المثل؟ وما الفائدة في إيراد الأمثال في القرآن؟

[(ক) ‘আল-মাসাল’ শব্দের অর্থ কী? কুরআনে দৃষ্টান্ত পেশ করার উপকারিতা কী?]

  1. আল-মাসাল (المثل)-এর পরিচয়: আভিধানিক অর্থে সদৃশ, উপমা, সমতুল্য বা দৃষ্টান্ত। বালাগাত ও তাফসিরশাস্ত্রে, কোনো অদৃশ্য, বিমূর্ত বা আধ্যাত্মিক ভাববস্তুকে মানুষের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ও চাক্ষুষ উদাহরণের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার অপূর্ব সাহিত্যিক রীতিকে ‘মাসাল’ বলা হয়।
  2. কুরআনে দৃষ্টান্ত বর্ণনার উপকারিতাসমূহ:
    • বিমূর্ত বিষয়কে মূর্ত করা: বুদ্ধিভিত্তিক ও অদৃশ্য ধারণাসমূহকে সাধারণ মানুষের উপলব্ধির উপযোগী করে সহজবোধ্য করা।
    • অন্তরে গভীর প্রভাব বিস্তার: চমকপ্রদ উপমা মানবহৃদয়ে দ্রুত নাড়া দেয় এবং মানুষকে উপদেশ গ্রহণে অনুপ্রাণিত করে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: “আর আমি মানুষের জন্য কুরআনে সব ধরনের দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছি, যাতে তারা শিক্ষা গ্রহণ করে।” (সূরা আয-যুমার: ২৭)।
    • সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য স্পষ্টীকরণ: মুমিনদের অন্তরের নূর এবং মুনাফিক ও কাফিরদের বিভ্রান্তিকে অত্যন্ত বাস্তবসম্মত উপমার সাহায্যে পৃথক করে দেওয়া।

(ب) فسّر الآية: ﴿يَجْعَلُونَ أَصَابِعَهُمْ فِي آذَانِهِم مِّنَ الصَّوَاعِقِ حَذَرَ الْمَوْتِ﴾

[(খ) ﴿يَجْعَلُونَ أَصَابِعَهُمْ فِي آذَانِهِم مِّنَ الصَّوَاعِقِ حَذَرَ الْمَوْتِ﴾ আয়াতটির ব্যাখ্যা কর।]

ব্যাখ্যা ও তাৎপর্য:

  • বাহ্যিক রূপক অর্থ: আকাশ থেকে যখন ঘোর অমানিশার মধ্যে প্রচণ্ড গর্জন ও বজ্রবিদ্যুৎসহ বৃষ্টিপাত হয়, তখন আতঙ্কগ্রস্ত পথিক মৃত্যুর ভয়ে নিজের কানে আঙুল গুঁজে দেয় যেন ভয়ংকর বজ্রপাত তার শ্রবণশক্তি ধ্বংস না করে।
  • মুনাফিকদের অভ্যন্তরীণ অবস্থা: কুরআনের অবতীর্ণ নির্দেশাবলি, জিহাদের হুকুম এবং কাফির-মুনাফিকদের জন্য নির্ধারিত শাস্তির ঘোষণাকে বজ্রপাতের সাথে তুলনা করা হয়েছে। মুনাফিকরা কুরআনের সেই বিপ্লবী ও কঠোর হুকুমত শুনে এমন আতঙ্কিত হয়ে পড়ে যেন তা তাদের জন্য সাক্ষাৎ মৃত্যু। তাই তারা সত্যের আহ্বান থেকে নিজেদের কান বন্ধ করে রাখে। কিন্তু তাদের এই নিষ্ফল প্রচেষ্টা আল্লাহর সর্বব্যাপী শক্তি থেকে তাদের রক্ষা করতে পারবে না; কারণ “আল্লাহ কাফিরদের সর্বদিক থেকে পরিবেষ্টন করে আছেন”।

٤- قوله تعالى: ﴿الم ۝ اللَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ ۝ نَزَّلَ عَلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ وَأَنزَلَ التَّوْرَاةَ وَالْإِنجِيلَ﴾

[৪. আল্লাহ তা’আলার বাণী: “আলিফ-লাম-মীম। আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই, তিনি চিরঞ্জীব, চিরস্থায়ী সর্বসত্তার ধারক। তিনি আপনার প্রতি সত্যসহ এই কিতাব অবতীর্ণ করেছেন, যা পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সত্যায়নকারী; আর তিনি অবতীর্ণ করেছিলেন তাওরাত ও ইনজিল।” (সূরা আলে ইমরান: ১-৩)]

(أ) لم قال الله تعالى: نَزَّلَ الْكِتَابَ وَأَنزَلَ التَّوْرَاةَ وَالْإِنجِيلَ؟

[(ক) কুরআনের ক্ষেত্রে ‘নাযযালা’ এবং তাওরাত ও ইনজিলের ক্ষেত্রে ‘আনযালা’ বলার কারণ কী?]

  1. ‘তাফ’ঈল’ বনাম ‘ইফ’আল’ বাব: আরবি ভাষার ধাতুগত ব্যুৎপত্তি অনুযায়ী ‘নাযযালা’ (نَزَّلَ) শব্দটি এসেছে ‘তাফ’ঈল’ (تفعيل) বাব থেকে, যা ধাপে ধাপে, ক্রমে ক্রমে এবং দীর্ঘ সময় ধরে অবতরণ (তাদরিজ) বোঝায়। অন্যদিকে ‘আনযালা’ (أَنْزَلَ) শব্দটি এসেছে ‘ইফ’আল’ (إفعال) বাব থেকে, যা একসাথে একবারে অবতীর্ণ করা নির্দেশ করে।
  2. কুরআন ও পূর্ববর্তী কিতাবের অবতীর্ণের রূপভেদ:
    • কুরআন মাজীদ: মহানবী (সা.)-এর নবুওয়াতী জিন্দেগিতে বিভিন্ন প্রেক্ষাপট, ঘটনাবলি ও প্রশ্নের জবাবে দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে ধাপে ধাপে কিস্তিতে কিস্তিতে অবতীর্ণ হয়েছে। তাই কুরআনের ক্ষেত্রে মুবালাগা ও তাদরিজ নির্দেশক ক্রিয়াপদ ‘নাযযালা’ ব্যবহার করা হয়েছে।
    • তাওরাত ও ইনজিল: তাওরাত হযরত মুসা (আ.)-কে তূর পাহাড়ে লিখিত ফলক আকারে একসাথে এককালীন প্রদান করা হয়েছিল। একইভাবে ইনজিল কিতাবও এককালীন অবতীর্ণ হয়েছিল। এজন্য এগুলোর ক্ষেত্রে এককালীন অবতরণ নির্দেশক ক্রিয়াপদ ‘আনযালা’ ব্যবহার করা হয়েছে। এটি কুরআনের অপরূপ শব্দচয়ন ও নির্ভুল বালাগাতীয় অলৌকিকত্বের প্রমাণ।

(ب) ما معنى الاسم الأعظم؟ وما هو؟ فصّل-

[(খ) ‘আল-ইসমুল আজম’-এর অর্থ কী এবং উহা কী? বিস্তারিত লেখ।]

  1. অর্থ ও ধারণা: ‘আল-ইসমুল আজম’ (الاسم الأعظم) অর্থ মহান আল্লাহর সবচেয়ে মহিমান্বিত, শ্রেষ্ঠ ও তাৎপর্যপূর্ণ নাম। সহীহ হাদিসসমূহে এসেছে, যে ব্যক্তি আল্লাহর ইসমুল আজমের মাধ্যমে দু’আ করে, আল্লাহ তার দু’আ নিশ্চিতভাবে কবুল করেন এবং কিছু চাইলে দান করেন।
  2. ইসমুল আজম কোনটি (ওলামাদের মতামত): হাদিসের বর্ণনার আলোকে ওলামায়ে কেরাম বেশ কয়েকটি অভিমত ব্যক্ত করেছেন:
    • ‘আল-হাইউল ক্বাইয়্যুম’: অধিকাংশ মুহাদ্দিস ও তাফসিরবিদের মতে, ‘আল-হাইউল ক্বাইয়্যুম’ (الْحَيُّ الْقَيُّومُ) হলো ইসমুল আজম। কারণ রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ইসমুল আজম তিনটি সূরায় রয়েছে—সূরা আল-বাকারা (আয়াতুল কুরসী), সূরা আলে ইমরান (শুরুর আয়াত) এবং সূরা ত্বা-হা। এ তিনটি সূরার সাধারণ গুণবাচক নাম হলো ‘আল-হাইউল ক্বাইয়্যুম’।
    • ‘আল্লাহ’ (لفظ الجلالة): ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও অনেকের মতে ‘আল্লাহ’ মূল সত্তাগত নামটিই ইসমুল আজম, কারণ এটি সমস্ত ঐশী সিফাতকে অন্তর্ভুক্ত করে।

٥- قال تعالى: ﴿زُيِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ الشَّهَوَاتِ مِنَ النِّسَاءِ وَالْبَنِينَ وَالْقَنَاطِيرِ الْمُقَنطَرَةِ مِنَ الذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ وَالْخَيْلِ الْمُسَوَّمَةِ وَالْأَنْعَامِ وَالْحَرْثِ ۗ ذَٰلِكَ مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَاللَّهُ عِندَهُ حُسْنُ الْمَآبِ﴾

[৫. মহান আল্লাহর বাণী: “মানবজাতির জন্য সুশোভিত করা হয়েছে কামনার বস্তুসমূহ—নারী, সন্তানসন্ততি, সোনা-রুপার রাশিকৃত স্তূপ, চিহ্নিত উৎকৃষ্ট ঘোড়া, গবাদিপশু ও কৃষিক্ষেত। এগুলো পার্থিব জীবনের ক্ষণস্থায়ী ভোগসামগ্রী; আর আল্লাহর নিকটেই রয়েছে সর্বোৎকৃষ্ট আশ্রয়।” (সূরা আলে ইমরান: ১৪)]

(أ) بيّن سبب نزول الآية: ﴿زُيِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ الشَّهَوَاتِ مِنَ النِّسَاءِ﴾

[(ক) ﴿زُيِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ الشَّهَوَاتِ مِنَ النِّسَاءِ﴾ আয়াতের শানে নুযুল বর্ণনা কর।]

শানে নুযুল ও প্রেক্ষাপট:

  • মদীনার ইহুদিরা এবং আরবের কাফিররা পার্থিব ধন-সম্পদ, সন্তানসন্ততি এবং বৈষয়িক আড়ম্বরের প্রাচুর্য নিয়ে অত্যন্ত অহংকার করত। তারা দরিদ্র মুসলিমদের উপহাস করে বলত, যদি তোমরা সত্য দ্বীনের ওপর থাকতে তবে আল্লাহ তোমাদেরই দুনিয়ার সমস্ত প্রাচুর্য ও নেতৃত্ব দান করতেন।
  • তাছাড়া বদর যুদ্ধে পরাজয়ের পর মক্কার মুশরিকরা ধন-সম্পদের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে পুনরায় মুসলমানদের আক্রমণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এ প্রেক্ষাপটে মহান আল্লাহ তা’আলা এ আয়াত নাজিল করে জানিয়ে দেন যে, দুনিয়ার এই মোহময় সৌন্দর্য, সন্তানসন্ততি ও সম্পদের স্তূপ মানুষের পরীক্ষা স্বরূপ সাময়িকভাবে সুশোভিত করা হয়েছে। কিন্তু এগুলো ক্ষণস্থায়ী; মুমিনদের আসল লক্ষ্য হওয়া উচিত পরকালীন জান্নাত, যা আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত।

(ب) ما المراد بالقناطير المقنطرة؟

[(খ) ‘আল-ক্বানাতীরুল মুক্বানত্বারাহ’ দ্বারা উদ্দেশ্য কী?]

  1. শাব্দিক বিশ্লেষণ: ‘ক্বানাতীর’ (قَنَاطِير) হলো ‘কিনত্বার’ (قِنْطَار)-এর বহুবচন, যার অর্থ অগাধ বা বিপুল পরিমাণ ধনভাণ্ডার। আর ‘মুক্বানত্বারাহ’ (مُقَنْطَرَة) শব্দটি আধিক্য বোঝাতে তাকিদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, যার অর্থ স্তূপীকৃত, একত্রিত বা একের ওপর আরেক স্তূপ করে রাখা সম্পদ।
  2. পরিমাণ ও উদ্দেশ্য: মুফাসসিরগণের মতে, এর দ্বারা কোনো সুনির্দিষ্ট ওজনের চেয়ে বরং অঢেল, সীমাহীন ও স্তূপীকৃত সোনা-রুপার স্বর্ণভাণ্ডার উদ্দেশ্য। প্রাচীন আরবে অনেক ধন-সম্পদ পুঞ্জীভূত করে রাখাকে কিনত্বার বলা হতো। আয়াতের উদ্দেশ্য হলো—মানুষ স্বর্ণ ও রৌপ্যের যে বিপুল সম্পদের স্তূপ জমা করতে ভালোবাসে, তা আখিরাতের অফুরন্ত নেয়ামতের তুলনায় একেবারেই নগণ্য।

٦- قال تعالى: ﴿يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ ۚ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا﴾

[৬. আল্লাহ তা’আলার বাণী: “হে মানবসমাজ! তোমরা তোমাদের রবকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তা থেকে তার সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের দুজন থেকে বহু নর-নারী ছড়িয়ে দিয়েছেন। আর আল্লাহকে ভয় কর, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের কাছে দাবি জানাও এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করাকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ওপর সদা নজরদার।” (সূরা আন-নিসা: ১)]

(أ) اذكر وجه التسمية لسورة النساء-

[(ক) সূরা আন-নিসার নামকরণের কারণ উল্লেখ কর।]

  1. নারীদের অধিকারের বিশদ বিবরণ: এ সূরার নাম ‘সূরা আন-নিসা’ (سورة النساء) রাখা হয়েছে কারণ এতে নারীজাতির অধিকার, পারিবারিক আইন, সামাজিক মর্যাদা, মোহরানা, বিবাহ ও তালাকের বিধান এবং উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে নারীর সুনির্দিষ্ট হিস্যার মতো বিষয়গুলো কুরআনের অন্য যেকোনো সূরার চেয়ে সর্বাধিক বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে।
  2. জাহেলি বঞ্চনার অবসান: প্রাক-ইসলামী জাহেলিয়াতের যুগে নারীদের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হতো এবং তাদের ভোগের বস্তু মনে করা হতো। এ সূরা নাজিল করে মহান আল্লাহ নারীদের স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব ও অর্থনৈতিক অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন।

(ب) ما هو محل الإعراب بقوله تعالى: ﴿وَالْأَرْحَامَ﴾؟

[(খ) আল্লাহ তা’আলার বাণী ﴿وَالْأَرْحَامَ﴾-এর মাহাল্লে ইরাব কী?]

  1. নসবযুক্ত কিরাত (وَالْأَرْحَامَ – যবরসহ): জমহুর ক্বারীগণের কিরাতে ‘আল-আরহামা’ শব্দটি মানসুব (যবরযুক্ত)। এর ইরাবি বিশ্লেষণ: এটি ‘ইত্তাক্বুল্লাহ’ বাক্যের ‘আল্লাহ’ (لفظ الجلالة) শব্দের ওপর মা’তুফ (معطوف)। অর্থ দাঁড়ায়: “তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আত্মীয়তার সম্পর্ককে সম্মান কর (তা ছিন্ন করা থেকে বেঁচে থাক)।”
  2. জরযুক্ত কিরাত (وَالْأَرْحَامِ – যেরসহ): ইমাম হামযাহ (রহ.) যের দিয়ে পড়েছেন। সেক্ষেত্রে এটি ‘বিহি’ (بِهِ) সর্বনামের সাথে যুক্ত; যার অর্থ: “যার নামে এবং আত্মীয়তার সম্পর্কের দোহাই দিয়ে তোমরা একে অপরের কাছে অধিকার প্রার্থনা কর।” তবে অধিকাংশ ভাষাবিদ নসবযুক্ত কিরাতকেই সর্বাধিক শক্তিশালী ও বিশুদ্ধ মত হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

٧- ﴿وَاللَّاتِي يَأْتِينَ الْفَاحِشَةَ مِن نِّسَائِكُمْ فَاسْتَشْهِدُوا عَلَيْهِنَّ أَرْبَعَةً مِّنكُمْ ۖ فَإِن شَهِدُوا فَأَمْسِكُوهُنَّ فِي الْبُيُوتِ حَتَّىٰ يَتَوَفَّاهُنَّ الْمَوْتُ أَوْ يَجْعَلَ اللَّهُ لَهُنَّ سَبِيلًا﴾

[৭. আল্লাহ তা’আলার বাণী: “আর তোমাদের নারীদের মধ্যে যারা ব্যভিচার করে, তাদের বিরুদ্ধে তোমাদের মধ্য হতে চারজন পুরুষ সাক্ষী তলব কর; অতঃপর যদি তারা সাক্ষ্য দেয়, তবে তাদেরকে গৃহে অবরুদ্ধ রাখ যে পর্যন্ত না মৃত্যু তাদের অবসান ঘটায় অথবা আল্লাহ তাদের জন্য অন্য কোনো পথ নির্দেশ করেন।” (সূরা আন-নিসা: ১৫)]

(أ) ما معنى الفاحشة؟ وما المراد بالفاحشة هنا؟

[(ক) ‘আল-ফাহিশাহ’-এর অর্থ কী? এখানে ফাহিশা দ্বারা উদ্দেশ্য কী?]

  1. শাব্দিক অর্থ: ‘আল-ফাহিশাহ’ (الفاحشة) শব্দের মূল হলো فحش, যার অর্থ চরম অশ্লীলতা, নির্লজ্জতা, সীমালঙ্ঘন ও ঘৃণ্য আচরণ।
  2. আয়াতোক্ত উদ্দেশ্য: এখানে ‘আল-ফাহিশাহ’ দ্বারা সুস্পষ্টভাবে ব্যভিচার (الزنا) উদ্দেশ্য। ইসলামের প্রারম্ভিক যুগে ব্যভিচারের চূড়ান্ত দণ্ডবিধি (রজম বা বেত্রাঘাত) নাজিল হওয়ার পূর্বে সাময়িক শাস্তি হিসেবে ব্যভিচারিণী নারীকে গৃহে আজীবন অবরুদ্ধ করে রাখার নির্দেশ ছিল। পরবর্তীতে সূরা আন-নূরের মাধ্যমে এ বিধান মানসূখ (রহিত) হয়ে পূর্ণাঙ্গ দণ্ডবিধি নির্ধারিত হয়।

(ب) ما الحكمة في أربعة شهداء؟ وما هي الشروط في شاهدي الزنا؟

[(খ) সাক্ষী চারজন হওয়ার হেকমত কী? ব্যভিচারের সাক্ষীদের শর্তসমূহ কী কী?]

  1. চারজন সাক্ষীর হেকমত:
    • সাধারণ বিচারিক ক্ষেত্রে দুইজন সাক্ষী যথেষ্ট হলেও ব্যভিচারের ক্ষেত্রে চারজন সাক্ষী বাধ্যতামূলক করার মূল কারণ মানুষের সতীত্ব ও সম্মান রক্ষা করা।
    • তুচ্ছ সন্দেহে বা অপবাদ দিয়ে সমাজে যেন কোনো নারীর সম্ভ্রম নষ্ট না করা যায় এবং ব্যভিচারের প্রমাণকে অত্যন্ত কঠিন করে অপবাদের মিথ্যা প্রবণতা প্রতিহত করাই এর প্রধান প্রজ্ঞাময় উদ্দেশ্য।
  2. সাক্ষীদের শর্তসমূহ:
    • সাক্ষীদের অবশ্যই প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন এবং মুসলিম হতে হবে।
    • ন্যায়পরায়ণ ও আদিল (বিশ্বস্ত চরিত্রের অধিকারী) হতে হবে।
    • প্রত্যক্ষদর্শী হতে হবে—সাক্ষী চারজনকে স্বচক্ষে একই মজলিসে সুরমাদানি ও শলাকার মতো সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় অপরাধ সংঘটিত হতে দেখতে হবে। সামান্য সন্দেহ থাকলে হদ কার্যকর হবে না।

٨- قال تعالى: ﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ لِلَّهِ شُهَدَاءَ بِالْقِسْطِ ۖ وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَىٰ أَلَّا تَعْدِلُوا ۚ اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَىٰ ۖ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۚ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ﴾

[৮. মহান আল্লাহর বাণী: “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর জন্য ন্যায়ের ওপর দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত থাক এবং ন্যায়বিচারের সাথে সাক্ষ্য দানকারী হও। কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদেরকে সুবিচার বর্জনে প্ররোচিত না করে। তোমরা সুবিচার কর, এটি তাকওয়ার সর্বাধিক নিকটবর্তী; আর আল্লাহকে ভয় কর, নিশ্চয় তোমরা যা কর আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক অবগত।” (সূরা আল-মায়েদাহ: ৮)]

(أ) ما المراد بقوله تعالى: ﴿كُونُوا قَوَّامِينَ لِلَّهِ شُهَدَاءَ بِالْقِسْطِ﴾؟

[(ক) আল্লাহ তা’আলার বাণী ﴿كُونُوا قَوَّامِينَ لِلَّهِ شُهَدَاءَ بِالْقِسْطِ﴾-এর মর্মার্থ কী?]

  • মর্মার্থ: ‘ক্বাLegacyয়্যামীন’ শব্দটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও অবিচল নিষ্ঠা বোঝায়। এর অর্থ হলো—মুমিনরা জীবনের সকল ক্ষেত্রে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ন্যায়ের পথে অবিচল থাকবে। কোনো পার্থিব লোভ, আত্মীয়তার টান বা ভয়ের কারণে তারা সত্য সাক্ষ্য গোপন বা বিকৃত করবে না। সুবিচার প্রতিষ্ঠায় আপসহীন ভূমিকা পালন করাই হলো খাঁটি ঈমানের দাবি।

(ب) ما معنى التقوى والعدل؟ بيّن-

[(খ) ‘তাকওয়া’ এবং ‘আদল’-এর অর্থ কী? বর্ণনা কর।]

  1. তাকওয়া (التقوى): আভিধানিক অর্থ বেঁচে থাকা, সতর্ক হওয়া ও আত্মরক্ষা করা। শরীয়তের পরিভাষায়, আল্লাহর ভয়ে তাঁর যাবতীয় আদেশ পালন এবং নিষেধসমূহ বর্জন করে নিজেকে জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করার নাম তাকওয়া। হযরত আলী (রা.) বলেছেন: “তাকওয়া হলো পরাক্রমশালী আল্লাহকে ভয় করা, কুরআন অনুযায়ী আমল করা, অল্পে তুষ্ট থাকা এবং পরকালের যাত্রার প্রস্তুতি গ্রহণ করা।”
  2. আদল (العدل): আভিধানিক অর্থ সামঞ্জস্য, সমতা ও ভারসাম্য রক্ষা করা। পারিভাষিক অর্থে, প্রতিটি সত্তা ও ব্যক্তিকে তার প্রাপ্য অধিকার যথাযথভাবে প্রদান করা এবং কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব ছাড়া ন্যায়নীতি বজায় রাখাকে আদল বা সুবিচার বলা হয়।

مجموعة (ب) – খ বিভাগ: তাফসিরের মূলনীতি ও ইতিহাস

٩- ما معنى التفسير بدون السند؟ ثم بيّن نشأته وتطوره مفصّلا-

[৯. ‘আত-তাফসীর বিদূনিস সানাদ’-এর অর্থ কী? অতঃপর উহার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ বিস্তারিত বর্ণনা কর।]

ভূমিকা: উলূমুল কুরআনের ইতিহাসে তাফসির সংকলনের ধারা প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত: প্রথমত ‘আত-তাফসীর বিল মা’সুর’ বা সনদভিত্তিক সনাতন ধারা এবং দ্বিতীয়ত ‘আত-তাফসীর বিদূনিস সানাদ’ বা সনদবিহীন তাফসির সংকলন ধারা। হিজরী চতুর্থ শতকের পর থেকে তাফসির শাস্ত্রে সনদ পরিহারের এই নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়।

ক. ‘আত-তাফসীর বিদূনিস সানাদ’-এর শাব্দিক ও পারিভাষিক পরিচয়:

  1. শাব্দিক অর্থ: ‘আত-তাফসীর’ (التفسير) অর্থ ব্যাখ্যা করা, উন্মোচন করা। ‘বিদূনিস সানাদ’ (بدون السند) অর্থ সনদ বা বর্ণনাকারী পরম্পরা ব্যতীত।
  2. পারিভাষিক সংজ্ঞা: যেসব তাফসির গ্রন্থে প্রতিটি আয়াতের তাফসির বর্ণনায় সাহাবী ও তাবেয়ীগণের ধারাবাহিক দীর্ঘ সনদ বাদ দিয়ে কেবল মূল তাফসিরি কথা, ব্যাখ্যা, ভাষাগত বিশ্লেষণ এবং ফিকহি সিদ্ধান্ত সংক্ষেপে সন্নিবেশিত করা হয়েছে, তাকে আত-তাফসীর বিদূনিস সানাদ (التفسير بدون السند) বলা হয়।

খ. আত-তাফসীর বিদূনিস সানাদের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ:

  1. সনদ বিলোপের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: প্রাথমিক যুগে ইমাম তাবারী (রহ.) ও ইবনে আবি হাতিম (রহ.) প্রমুখ মুহাদ্দিস প্রতিটি মতের জন্য দীর্ঘ সনদ উল্লেখ করতেন। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে পাঠকদের জন্য দীর্ঘ সনদ মুখস্থ রাখা ও পড়া দুরূহ হয়ে পড়ে এবং গ্রন্থসমূহ অত্যন্ত বৃহদাকার ধারণ করে।
  2. সংক্ষিপ্তকরণের সূচনা যুগ: হিজরী চতুর্থ ও পঞ্চম শতাব্দীতে ইমাম আবু ইসহাক আস-সা’লাবী (মৃত ৪২৭ হি.) এবং ইমাম বগভী (রহ.) সনদের ধারা সংক্ষেপ করতে শুরু করেন। অতঃপর ইমাম যামাখশারী (রহ.) তাঁর ‘আল-কাশশাফ’ এবং ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী (রহ.) তাঁর ‘মাফাতিহুল গাইব’ গ্রন্থে সনদ সম্পূর্ণরূপে বর্জন করে বিশুদ্ধ যুক্তি, ভাষাতত্ত্ব ও দর্শনভিত্তিক তাফসির উপস্থাপন করেন।
  3. সুফল ও সীমাবদ্ধতা:
    • সুফল: সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য তাফসির অধ্যয়ন অত্যন্ত সহজ ও সাবলীল হয়েছে এবং মূল ভাববস্তু দ্রুত হৃদয়ঙ্গম করা সম্ভব হয়েছে।
    • সীমাবদ্ধতা: সনদ না থাকার কারণে অনেক সময় দুর্বল বর্ণনা ও ইসরাঈলি রেওয়ায়েত যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে।

١٠- اذكر نبذة من حياة صاحب الكشاف ثم قارن بين تفسير الكشاف وتفسير البيضاوي مختصرًا-

[১০. ‘তাফসীরে কাশশাফ’-এর গ্রন্থকারের জীবনী সংক্ষেপে লেখ। অতঃপর তাফসীরে কাশশাফ ও তাফসীরে বায়যাবীর মধ্যে সংক্ষেপে তুলনা কর।]

ক. ইমাম যামাখশারী (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী:

  1. নাম ও জন্ম: গ্রন্থকারের পূর্ণ নাম মাহমুদ ইবনে উমর ইবনে মুহাম্মদ আল-খাওয়ারিজমী আয-যামাখশারী। উপনাম আবুল কাসিম এবং উপাধি ‘জারুল্লাহ’ (আল্লাহর প্রতিবেশী—কারণ তিনি দীর্ঘদিন মক্কায় কাবা শরীফের সান্নিধ্যে অবস্থান করেছিলেন)। তিনি ৪৬৭ হিজরীতে খাওয়ারিজমের যামাখশার নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
  2. শিক্ষা ও পান্ডিত্য: তিনি ছিলেন আরবি ভাষা, ব্যাকরণ, অলংকারশাস্ত্র (বালাগাত) এবং তাফসিরের এক অবিসংবাদিত ইমাম। তাঁর রচিত ‘আল-কাশশাফ’ আরবি অলংকারশাস্ত্রের প্রয়োগে কুরআনের অলৌকিকত্ব প্রমাণের ক্ষেত্রে এক অমর কালজয়ী গ্রন্থ। তিনি ৫৩৮ হিজরীতে জুরজানিয়ায় ইন্তেকাল করেন।

খ. তাফসীরে কাশশাফ ও তাফসীরে বায়যাবীর সংক্ষিপ্ত তুলনা:

তুলনার ক্ষেত্র তাফসীরে কাশশাফ (ইমাম যামাখশারী) তাফসীরে বায়যাবী (ইমাম বায়যাবী)
মূল বৈশিষ্ট্য বালাগাত ও অলংকারশাস্ত্রের অনন্য প্রয়োগে কুরআনের প্রাতিষ্ঠানিক সৌন্দর্য বিশ্লেষণ। কাশশাফের মূল বালাগাতীয় সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখে সংক্ষিপ্ত ও মার্জিত রূপ প্রদান।
আকিদাগত অবস্থান ইমাম যামাখশারী মু’তাযিলা মতবাদের অনুসারী ছিলেন এবং তাঁর গ্রন্থে মু’তাযিলা চিন্তাধারা প্রকাশ পেয়েছে। ইমাম বায়যাবী আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা’আতের (আশ’আরী) আকিদা অনুযায়ী কাশশাফের মু’তাযিলা দৃষ্টিভঙ্গি সংশোধন করেন।
ফিকহি বিশ্লেষণ প্রধানত হানাফি ফিকহ ও সাধারণ পর্যালোচনা। শাফিয়ী ফিকহ এবং বিভিন্ন মাযহাবের দলিলভিত্তিক আলোচনা।
কিরাত ও ভাষা বিশদ ব্যাকরণ ও বিরল আরবি কবিতার সমৃদ্ধ উদ্ধৃতি। সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত গভীর ও সুবিন্যস্ত কিরাত ও নাহু-সরফের আলোচনা।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. ‘আত-তাফসীর বিদূনিস সানাদ’ বলতে কী বোঝায়?

যে তাফসির গ্রন্থে প্রতিটি আয়াতের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে সাহাবী ও তাবেয়ীগণের ধারাবাহিক দীর্ঘ সনদ উল্লেখ না করে কেবল মূল ব্যাখ্যা ও অর্থ উপস্থাপন করা হয়, তাকে আত-তাফসীর বিদূনিস সানাদ বলে।

২. ‘আর-রাহমান’ ও ‘আর-রাহিম’-এর মূল পার্থক্য কী?

‘আর-রাহমান’ হলো আল্লাহর এমন ব্যাপক রহমত যা দুনিয়াতে সকল সৃষ্টির জন্য উন্মুক্ত, আর ‘আর-রাহিম’ হলো আল্লাহর সেই বিশেষ অনুগ্রহ যা আখিরাতে কেবল ঈমানদারদের জন্য নির্ধারিত।

৩. কুরআনে দৃষ্টান্ত (الأمثال) পেশ করার মূল উদ্দেশ্য কী?

অদৃশ্য ও আধ্যাত্মিক সত্যকে মানুষের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য রূপকের মাধ্যমে স্পষ্ট করা, মানুষের অন্তরে গভীর উপদেশ জাগ্রত করা এবং সত্যের মর্যাদা তুলে ধরাই হলো কুরআনের দৃষ্টান্তসমূহের মূল উদ্দেশ্য।

৪. কুরআনের ক্ষেত্রে ‘নাযযালা’ এবং পূর্ববর্তী কিতাবের ক্ষেত্রে ‘আনযালা’ কেন ব্যবহৃত হয়েছে?

কুরআন দীর্ঘ ২৩ বছরে ধাপে ধাপে নাজিল হওয়ায় ধারাবাহিকতা নির্দেশক শব্দ ‘নাযযালা’ ব্যবহৃত হয়েছে; পক্ষান্তরে তাওরাত ও ইনজিল এককালীন অবতীর্ণ হওয়ায় ‘আনযালা’ ব্যবহৃত হয়েছে।

৫. সূরা আন-নিসা নামকরণের প্রধান তাৎপর্য কী?

এ সূরায় নারীদের সামাজিক মর্যাদা, উত্তরাধিকার সম্পত্তি, মোহরানা এবং পারিবারিক অধিকারের বিষয়ে কুরআনের অন্য যেকোনো সূরার চেয়ে সর্বাধিক বিস্তারিত বিধান দেওয়া হয়েছে।

৬. তাফসীরে কাশশাফ ও তাফসীরে বায়যাবীর মৌলিক সম্পর্ক কী?

ইমাম বায়যাবী মূলত ইমাম যামাখশারীর তাফসীরে কাশশাফের অনুপম সাহিত্যিক ও বালাগাতীয় শ্রেষ্ঠত্বকে গ্রহণ করে তার মধ্যে থাকা মু’তাযিলা মতবাদ বর্জনপূর্বক আহলুস সুন্নাহর আকিদায় সংক্ষিপ্ত রূপ দিয়েছেন।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *