ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ২য় বর্ষ পরীক্ষা 2022
বিভাগ: আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: আত-তাফসীরুল মুয়াসসির (التفسير المعاصر)
বিষয় কোড: 201202 | পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
[দ্রষ্টব্য: (ক) অংশ হতে যে কোনো পাঁচটি এবং (খ) অংশ হতে যে কোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দাও। বাম পাশে উল্লেখিত সংখ্যা প্রশ্নের পূর্ণমান জ্ঞাপক।]
مجموعة (أ) – ক অংশ: আয়াতসমূহের ব্যাখ্যা ও সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর
١- قال الله تعالى: ﴿الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَجَعَلَ الظُّلُمَاتِ وَالنُّورَ ثُمَّ الَّذِينَ كَفَرُوا بِرَبِّهِمْ يَعْدِلُونَ﴾
[১. আয়াতগুলোর তাফসির লিখে উহার সাথে সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর দাও]
আয়াতের মূলভাব ও সংক্ষিপ্ত তাফসীর:
সূরা আল-আন’আমের সূচনায় আল্লাহ তা’আলা তাঁর একচ্ছত্র রুবূবিয়াত, সৃষ্টিশীলতা ও কুদরতের বর্ণনা দিয়েছেন। তিনিই আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং অন্ধকারসমূহ ও আলোর উৎপত্তি করেছেন। এত সুস্পষ্ট ঐশী নিদর্শনের পরেও কাফেররা তাদের প্রতিপালকের সাথে অন্যদের সমকক্ষ ও শরীক সাব্যস্ত করে—যা এক চরম অকৃতজ্ঞতা ও বিভ্রান্তি।
(الف) مَا مَعْنَى الْحَمْدِ؟ وَمَا الْفَرْقُ بَيْنَ ‘خَلَقَ’ وَ ‘جَعَلَ’؟ بَيِّنْ مُخْتَصَرًا-
[আল-হামদ এর অর্থ কী? খালাক্বা ও জা’আলা এর পার্থক্য সংক্ষেপে বর্ণনা কর।]
- আল-হামদ (الحمد)-এর পরিচয়: ‘হামদ’ শব্দের অর্থ ঐচ্ছিক অনুগ্রহ ও গুণাবলীর কারণে পূর্ণ বিনয়, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার সাথে কারও নিখুঁত প্রশংসা করা। আয়াতে আলিফ-লামটি ‘ইস্তিগরাক্ব’ (সার্বিকতা) অর্থে এসেছে, যা প্রমাণ করে মহাবিশ্বের যাবতীয় পূর্ণাঙ্গ প্রশংসা কেবল মহান আল্লাহর জন্যই নির্ধারিত।
- ‘খালাক্বা’ (خَلَقَ) ও ‘জা’আলা’ (جَعَلَ)-এর মাঝে পার্থক্য:
- খালাক্বা (خَلَقَ): কোনো পূর্ব নমুনা বা উপাদান ব্যতীত শূন্য থেকে নতুনভাবে কোনো বস্তু অস্তিত্বে আনাকে ‘খালক্ব’ (ابداع الشيء على غير مثال سابق) বলে। আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী পূর্বে কোনো অস্তিত্ব ছিল না, আল্লাহ তাঁর অসীম কুদরতে তা অস্তিত্বে এনেছেন; তাই এখানে ‘খালাক্বাস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ্ব’ বলা হয়েছে।
- জা’আলা (جَعَلَ): একটি বস্তুকে অন্য বস্তুতে রূপান্তরিত করা, অবস্থার রূপান্তর ঘটানো বা সৃষ্টিজগতের নিয়ামক তৈরি করাকে ‘জা’ল’ বলা হয়। আল্লাহ আসমান-জমিন সৃষ্টির পর তা থেকে পর্যায়ক্রমে অন্ধকার ও আলো তৈরি করেছেন এবং এদের পারস্পরিক চক্র সৃষ্টি করেছেন; তাই এখানে ‘জা’আলা’ ক্রিয়াপদ ব্যবহৃত হয়েছে।
(ب) مَا الْمُرَادُ بِالظُّلُمَاتِ وَالنُّورِ؟
[আয-যুলুমাত ও আন-নূর দ্বারা কী বোঝানো হয়েছে?]
মুফাসসিরগণের মতে ‘যুলুমাত’ ও ‘নূর’-এর অর্থ দ্বিবিধ:
- বস্তুগত অর্থ (المعنى الحسي): রাতের অন্ধকার এবং দিনের আলো। আল্লাহ রাত্রিকে বিশ্রামের জন্য অন্ধকারাচ্ছন্ন করেছেন এবং সূর্য উদিত করে দিনকে আলোকময় করেছেন।
- রূপক ও আত্মিক অর্থ (المعنى المعنوي): বালাগাতবিদ ও সমকালীন মুফাসসিরগণের মতে, ‘যুলুমাত’ (বহুবচন) দ্বারা কুফর, শিরক, জাহেলিয়াত, কুসংস্কার ও ভ্রষ্টতার বহুবিধ অন্ধকারের পথ নির্দেশ করা হয়েছে; আর ‘নূর’ (একবচন) দ্বারা তাওহীদ, সত্য দ্বীন ইসলাম ও হেদায়াতের একক উজ্জ্বল রাজপথ বোঝানো হয়েছে। সত্যের পথ সবসময় একটি, কিন্তু বিভ্রান্তির পথ বহু ও বিচিত্র।
٢- قال الله تعالى: ﴿قُلْ إِنِّي أَخَافُ إِنْ عَصَيْتُ رَبِّي عَذَابَ يَوْمٍ عَظِيمٍ ۞ مَنْ يُصْرَفْ عَنْهُ يَوْمَئِذٍ فَقَدْ رَحِمَهُ وَذَٰلِكَ الْفَوْزُ الْمُبِينُ ۞ وَإِنْ يَمْسَسْكَ اللَّهُ بِضُرٍّ فَلَا كَاشِفَ لَهُ إِلَّا هُوَ وَإِنْ يَمْسَسْكَ بِخَيْرٍ فَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ ۞ وَهُوَ الْقَاهِرُ فَوْقَ عِبَادِهِ وَهُوَ الْحَكِيمُ الْخَبِيرُ﴾
[২. আয়াতগুলোর তাফসির লিখে উহার সাথে সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর দাও]
(الف) اعْرِبْ قَوْلَهُ تَعَالَى: ﴿وَهُوَ الْقَاهِرُ فَوْقَ عِبَادِهِ﴾-
[আল্লাহ তায়ালার বাণী— وهو القاهر فوق عباده এর তারকীব কর।]
| শব্দ | ব্যাকরণিক পদ ও তারকীব (الإعراب) |
|---|---|
| وَ (ওয়াও) | ওয়াও-এ ইস্তিনাফিয়্যাহ (واو الاستئناف) বা হালিয়্যাহ। |
| هُوَ (হুওয়া) | দমীরে মুনফাসিল (ضمير منفصل), মারফূ’ মাহাল্লান, মুবতাদা (مبتدأ)। |
| الْقَاهِرُ (আল-ক্বাহিরু) | ইসমে ফাঈল, পেশযুক্ত (مرفوع بالضمة الظاهرة), মুবতাদার প্রথম খবর (خبر أول)। |
| فَوْقَ (ফাওক্বা) | যারফে মাকান (ظرف مكان منصوب), ‘আল-ক্বাহির’ সিফাতের সাথে মুতা’আল্লিক্ব, যা মর্যাদাগত শ্রেষ্ঠত্ব ও ক্ষমতার প্রাধান্য নির্দেশ করে। মুদাফ (مضاف)। |
| عِبَادِهِ (ইবাদিহী) | ‘ইবাদ’ হলো মুদাফ ইলাইহি মাজরুর (مضاف إليه مجرور), এবং ‘হি’ হলো দমীরে মুত্তাসিল মুদাফ ইলাইহি। |
সারসংক্ষেপ: মুবতাদা ও খবর মিলে জুমলায়ে ইসমিয়্যাহ গঠিত হয়েছে।
(ب) اكْتُبْ آرَاءَ عُلَمَاءِ الْمُتَكَلِّمِينَ بِعِصْمَةِ الْأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ السَّلَامُ مُفَصَّلًا-
[নবিগণের নিষ্পাপ হওয়ার বিষয়ে তর্কশাস্ত্রবিদদের মতামত লেখ।]
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা’আতের মুতাকাল্লিমীন (ইলমুল কালাম বিশারদগণ) নবীদের ইসমত বা নিষ্পাপত্ব সম্পর্কে নিম্নলিখিত বিষয়ে একমত ও ব্যাখ্যা দিয়েছেন:
- ওহী প্রচার ও রিসালাত পৌঁছানোর ক্ষেত্রে: সকল মুতাকাল্লিমের সর্বসম্মত অভিমত হলো, ওহী প্রচারের ক্ষেত্রে নবীরা পূর্ণরূপে নিষ্পাপ। এতে কোনো প্রকার ভুল, বিস্মৃতি, পরিবর্তন বা মিথ্যার অনুপ্রবেশ সম্পূর্ণ অসম্ভব (মুহাল)।
- কুফর ও শিরক থেকে মুক্তি: নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে এবং পরে—সমগ্র জীবনে সকল নবী ও রাসূল কুফর ও শিরকের অপবিত্রতা থেকে সম্পূর্ণ নিষ্পাপ ও মুক্ত ছিলেন।
- কবিরা গুনাহ (الكبيرة): নবুওয়াত প্রাপ্তির পর কোনো নবী ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনো কবিরা গুনাহে লিপ্ত হতে পারেন না—এ বিষয়ে আলেমগণের ইজমা প্রতিষ্ঠিত।
- সগিরা গুনাহ (الصغيرة):
- যে সমস্ত সগিরা গুনাহে ব্যক্তিত্ব বা মর্যাদার লাঘব ঘটে (যেমন ক্ষুদ্রতম চুরি বা প্রতারণা), তা থেকেও নবীরা সম্পূর্ণ মুক্ত।
- অনিচ্ছাকৃত সাধারণ ভুল বা ‘তারকে আওলা’ (উত্তম পন্থা ত্যাগ করা) কখনো কখনো সংঘটিত হতে পারে, যা কুরআন মজীদে ‘যাল্লাত’ (زلة) হিসেবে বর্ণিত হয়েছে এবং সাথে সাথে আল্লাহ তা’আলা ওহীর মাধ্যমে তাঁদের সংশোধন করে দিয়েছেন।
٣- قال الله تعالى: ﴿المص ۞ كِتَابٌ أُنْزِلَ إِلَيْكَ فَلَا يَكُنْ فِي صَدْرِكَ حَرَجٌ مِنْهُ لِتُنْذِرَ بِهِ وَذِكْرَىٰ لِلْمُؤْمِنِينَ ۞ اتَّبِعُوا مَا أُنْزِلَ إِلَيْكُمْ مِنْ رَبِّكُمْ وَلَا تَتَّبِعُوا مِنْ دُونِهِ أَوْلِيَاءَ قَلِيلًا مَا تَذَكَّرُونَ﴾
[৩. আয়াতগুলোর তাফসির লিখে উহার সাথে সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর দাও]
(الف) مَا الْمُرَادُ بِقَوْلِهِ تَعَالَى: ﴿وَذِكْرَىٰ لِلْمُؤْمِنِينَ﴾؟ فصِّلْ-
[‘যিকরা লিল মু’মিনীনা’ দ্বারা উদ্দেশ্য কী? বর্ণনা কর।]
ব্যাখ্যা ও তাৎপর্য: ‘যিকরা’ (ذكرى) শব্দের অর্থ উপদেশ, স্মারক ও আত্মিক জাগরণ। কুরআনের দাওয়াত সার্বজনীন হলেও বিশেষভাবে মুমিনদের জন্য ‘যিকরা’ বলার কারণ হলো:
- পবিত্র কুরআন কাফেরদের জন্য ভীতি প্রদর্শনকারী (লুতুনযিরা বিহী), কিন্তু মুমিনদের জন্য তা অন্তর জুড়ানো উপদেশ, যা তাদের ঈমানকে সতেজ করে এবং সৎকর্মে উদ্বুদ্ধ করে।
- যেহেতু কেবল ঈমানদাররাই কুরআনের উপদেশ থেকে প্রকৃত শিক্ষা ও আত্মশুদ্ধি লাভ করে, তাই সম্মানার্থে উপদেশকে মুমিনদের সাথে খাস করে বলা হয়েছে: “ওয়া যিকরা লিল মু’মিনীন”। যেমন অন্য আয়াতে এসেছে: “ওয়া যাক্কির ফাইন্নায যিকরা তানফাউল মু’মিনীন”।
(ب) فَسِّرْ قَوْلَهُ تَعَالَى: ﴿وَلَا تَتَّبِعُوا مِنْ دُونِهِ أَوْلِيَاءَ﴾-
[‘ওয়ালা তাত্তাবি’ঊ মিন দূনিহী আওলিয়া’ আয়াতাংশের তাফসীর কর।]
তাফসীর: আল্লাহ তা’আলা মানবজাতিকে কঠোরভাবে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন আল্লাহ প্রেরিত ওহী ও শরীয়তের সুস্পষ্ট বিধান বর্জন করে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোনো মনগড়া অভিভাবক, ধর্মগুরু, মুশরিক নেতা বা প্রবৃত্তির অন্ধ অনুকরণ না করে। জাহেলী যুগে আরবরা তাদের গোত্রপতি ও মূর্তিদের বিধিবিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করত। আয়াতের মাধ্যমে সুস্পষ্ট ঘোষণা করা হলো—সার্বভৌম আনুগত্য, আইন প্রণয়ন এবং উপাসনার চূড়ান্ত কর্তৃত্ব একমাত্র মহান আল্লাহর। আল্লাহর ওহীর বিপরীতে কোনো মানুষের হুকুম মানা যাবে না।
٤- قال الله تعالى: ﴿وَلَقَدْ مَكَّنَّاكُمْ فِي الْأَرْضِ وَجَعَلْنَا لَكُمْ فِيهَا مَعَايِشَ قَلِيلًا مَا تَشْكُرُونَ ۞ وَلَقَدْ خَلَقْنَاكُمْ ثُمَّ صَوَّرْنَاكُمْ ثُمَّ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لِآدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ لَمْ يَكُنْ مِنَ السَّاجِدِينَ﴾
[৪. আয়াতগুলোর তাফসির লিখে উহার সাথে সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর দাও]
(الف) مَا مَحَلُّ إِعْرَابِ قَوْلِهِ تَعَالَى: ‘مَا تَشْكُرُونَ’؟ بَيِّنْ-
[আল্লাহর বাণী— ‘মা তাশকুরূন’ এর মাহাল্লে ই’রাব কী হয়েছে? বর্ণনা কর।]
- আয়াতে ‘ক্বালীলাম মা তাশকুরূন’ (قَلِيلًا مَا تَشْكُرُونَ) বাক্যাংশে ‘ক্বালীলান’ শব্দটি একটি উহ্য সিফাত বা মাফ’উলে মুতলাকের স্থলাভিষিক্ত (نائب عن المفعول المطلق)। মূল বাক্যটি ছিল: ‘তাশকুরূনা শুকরান ক্বালীলান’।
- ‘মা’ (مَا) হলো ‘মা-য়ে যায়িদাহ’ (ما زائدة لتأكيد القلة), যা অকৃতজ্ঞতা ও অতি অল্প কৃতজ্ঞতার ওপর জোর প্রদানের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে।
- ‘তাশকুরূন’ (تشكرون) হলো ফে’লে মুদ্বরী মারফূ’ (যার আলামত হলো নূনের উপস্থিতি), এবং ওয়াও হলো তার ফাঈল। সমগ্র জুমলাটি জুমলায়ে ফে’লিয়্যাহ যা মাফ’উলে মুতলাকের সাথে যুক্ত।
(ب) مَاذَا تَفْهَمُ عَنْ ‘مَعَايِشَ’؟ بَيِّنْ-
[‘মা’আয়িশ’ দ্বারা কী বোঝানো হয়েছে? বর্ণনা কর।]
‘মা’আয়িশ’ (معايش)-এর ধারণা: এটি ‘মাঈশাহ’ (معيشة) শব্দের বহুবচন। এর অর্থ মানবজীবনের বেঁচে থাকার উপকরণ, জীবনোপকরণ ও জীবিকার মাধ্যম।
- আল্লাহ তা’আলা মানবজাতিকে পৃথিবীতে বসবাস উপযোগী পরিবেশ দান করেছেন এবং খাদ্যশস্য, ফলমূল, পানীয়, নদীনালা, বাতাস, খনিজ সম্পদ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের অগণিত উপায়-উপকরণ সৃষ্টি করে দিয়েছেন।
- এই অসীম অনুগ্রহের সমষ্টিকে আয়াতে ‘মা’আয়িশ’ বলা হয়েছে। মুফাসসিরগণ বলেন, আল্লাহ তা’আলা মানুষের মৌলিক চাহিদা (অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ও কর্মসংস্থান) মেটানোর জন্য জমিনের বুকে অফুরন্ত নেয়ামত গচ্ছিত রেখেছেন।
٥- قال الله تعالى: ﴿إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَىٰ رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ ۞ الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُونَ﴾
[৫. আয়াতগুলোর তাফসির লিখে উহার সাথে সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর দাও]
(الف) مَا الِاخْتِلَافُ فِي الْقِرَاءَةِ خَلْفَ الْإِمَامِ؟ بَيِّنْ-
[ইমামের পিছনে ক্বিরাআত পড়ার মতভেদ বর্ণনা কর।]
নামাযে জামা’আতে ইমামের পেছনে মুক্তাদীর সূরা ফাতিহা পাঠ করার বিষয়ে ফুক্বাহায়ে কেরামের মাঝে তিনটি প্রধান অভিমত রয়েছে:
- ইমাম আবু হানীফা (রহ.) ও হানাফী মাযহাব: ইমামের পেছনে মুক্তাদীর কোনো অবস্থাতেই (জাহরী বা সিররী নামাযে) ক্বিরাআত পড়া জায়েয নয়; বরং মুক্তাদী সম্পূর্ণ নীরব থেকে মনোযোগ দিয়ে শুনবে। তাঁদের দলীল হলো সূরা আল-আ’রাফের ২০৪ নং আয়াত: “আর যখন কুরআন পাঠ করা হয়, তখন মনোযোগ দিয়ে শোন এবং নিশ্চুপ থাক” এবং প্রসিদ্ধ হাদীস: “যার ইমাম আছে, ইমামের ক্বিরাআতই তার ক্বিরাআত” (মুসনাদে আহমাদ)।
- ইমাম শাফেঈ (রহ.): সকল নামাযে (জাহরী হোক বা সিররী) প্রত্যেক মুক্তাদীর ওপর সূরা ফাতিহা পড়া ওয়াজিব বা রুকন। তাঁদের দলীল রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বাণী: “যে ব্যক্তি সূরা ফাতিহা পাঠ করল না, তার নামায হলো না” (সহীহ বুখারী)।
- ইমাম মালিক ও ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.): মধ্যমপন্থা অবলম্বন করে তাঁরা বলেন—যে নামাযে ইমাম উচ্চৈঃস্বরে ক্বিরাআত পড়েন (যেমন মাগরিব, ইশা ও ফজর), তাতে মুক্তাদী চুপ থাকবে; আর যে নামাযে নিঃশব্দে পড়া হয় (যেমন যোহর ও আসর), তাতে মুক্তাদী সূরা ফাতিহা পড়বে।
(ب) بَيِّنْ مَعْنَى قَوْلِهِ تَعَالَى: ﴿وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُونَ﴾-
[‘ওয়া মিম্মা রাযাক্বনাহুম ইউনফিক্বূন’ এর মর্মার্থ বর্ণনা কর।]
মর্মার্থ: এই আয়াতাংশটি খাঁটি মুমিনদের আর্থিক ইবাদত ও ত্যাগের পরিচয় বহন করে। আল্লাহ তা’আলা তাঁদের যে সম্পদ, ধন-দৌলত ও সামর্থ্য দান করেছেন, তা থেকে তাঁরা আল্লাহর নির্দেশিত পথে অকাতরে ব্যয় করে। এতে দুটি স্তর অন্তর্ভুক্ত:
- ফরজ বা বাধ্যতামূলক ব্যয়: যাকাত, ফিতরা এবং পরিবার-পরিজনের আবশ্যকীয় ভরণপোষণ।
- নফল বা ঐচ্ছিক ব্যয়: দান-সদকাহ, দ্বীন প্রচারের কাজে অর্থ সাহায্য, দারিদ্র্য বিমোচন এবং অভাবগ্রস্তদের মুক্তহস্তে সহায়তা প্রদান।
٦- قال الله تعالى: ﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَا تَوَلَّوْا عَنْهُ وَأَنْتُمْ تَسْمَعُونَ ۞ وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ قَالُوا سَمِعْنَا وَهُمْ لَا يَسْمَعُونَ ۞ إِنَّ شَرَّ الدَّوَابِّ عِنْدَ اللَّهِ الصُّمُّ الْبُكْمُ الَّذِينَ لَا يَعْقِلُونَ﴾
[৬. আয়াতগুলোর তাফসির লিখে উহার সাথে সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর দাও]
(الف) بَيِّنْ حُكْمَ إِطَاعَةِ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَكَيْفِيَّتَهُ-
[আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যের হুকুম ও পদ্ধতি বর্ণনা কর।]
- আনুগত্যের হুকুম: আল্লাহ ও তাঁর প্রিয় রাসূল ﷺ-এর নিঃশর্ত আনুগত্য করা প্রতিটি মুসলিমের ওপর ফরজ এবং এটিই ঈমানের মূল মাপকাঠি। রাসূলের আনুগত্য মূলত আল্লাহরই আনুগত্য (“মান ইউতি’ইর রাসূলা ফাক্বাদ আত্বা’আল্লাহ”)। রাসূলের সুন্নাহকে অস্বীকার বা অবজ্ঞা করা স্পষ্ট কুফরী।
- আনুগত্যের পদ্ধতি:
- আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সহীহ সুন্নাহকে জীবনের সকল ব্যক্তিগত, পারিবারিক, অর্থনৈতিক ও বিচারিক ফায়সালায় চূড়ান্ত মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করা।
- আনুগত্য হতে হবে দ্বিধাহীন ও আন্তরিক চিত্তে, কোনো বাহ্যিক কপটতা বা অসন্তোষ ছাড়া।
- রাসূলুল্লাহ ﷺ যা দিয়েছেন তা সানন্দে গ্রহণ করা এবং যা নিষেধ করেছেন তা থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকা।
(ب) حَلِّلِ الْأَلْفَاظَ التَّالِيَةَ: (أَطِيعُوا، لَا تَوَلَّوْا، تَسْمَعُونَ)-
[নিচের শব্দগুলোর ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ কর:]
| শব্দ | শব্দমূল (مادة) ও সিগাহ | বাব ও ব্যাকরণিক অর্থ |
|---|---|---|
| أَطِيعُوا (আত্বী’ঊ) | ط – و – ع (ত্বা-ওয়াও-আইন)। জমা মুযাক্কার হাযির, আমরে হাযির মা’রূফ। | বাবুল ইফ’আল (الإفعال)। অর্থ: তোমরা আনুগত্য কর ও মেনে নাও। |
| لَا تَوَلَّوْا (লা তাওয়াল্লাও) | و – ل – ي (ওয়াও-লাম-ইয়া)। জমা মুযাক্কার হাযির, নাহিয়ে হাযির মা’রূফ। | বাবু তাফা’উল (التَفَعُّل)। মূলত ছিল ‘লা তাতাওয়াল্লাও’। অর্থ: তোমরা মুখ ফিরিয়ে নিও না। |
| تَسْمَعُونَ (তাসমা’ঊন) | س – م – ع (সীন-মীম-আইন)। জমা মুযাক্কার হাযির, মুদ্বরী মারফূ’। | বাবু সামি’আ (فَعِلَ – يَفْعَلُ)। অর্থ: তোমরা শুনছ বা বুঝতে পারছ। |
٧- قال الله تعالى: ﴿كَيْفَ يَكُونُ لِلْمُشْرِكِينَ عَهْدٌ عِنْدَ اللَّهِ وَعِنْدَ رَسُولِهِ إِلَّا الَّذِينَ عَاهَدْتُمْ عِنْدَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ فَمَا اسْتَقَامُوا لَكُمْ فَاسْتَقِيمُوا لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَّقِينَ﴾
[৭. আয়াতগুলোর তাফসির লিখে উহার সাথে সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর দাও]
(الف) اكْتُبِ الْقِصَّةَ الْمُتَعَلِّقَةَ بِهَٰذِهِ الْآيَةِ الْكَرِيمَةِ-
[আয়াত সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনা বর্ণনা কর।]
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ঘটনা: ৬ষ্ঠ হিজরীতে হুদাইবিয়ার প্রান্তরে কাফের কুরাইশদের সাথে রাসূলুল্লাহ ﷺ ১০ বছরের এক ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তিতে আবদ্ধ হন। চুক্তির অন্যতম শর্ত ছিল অন্যান্য গোত্রগুলো চাইলে যেকোনো পক্ষের সাথে মৈত্রী চুক্তি করতে পারবে। তদনুযায়ী বনু খোযা’আ মুসলিমদের সাথে এবং বনু বকর কুরাইশদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়। কিন্তু চুক্তির মাত্র দু’বছরের মাথায় বনু বকর কুরাইশদের গোপন সামরিক সহায়তায় রাতের আঁধারে মুসলিমদের মিত্র বনু খোযা’আর ওপর হামলা চালিয়ে নির্মম হত্যাকাণ্ড চালায়। কুরাইশরা সরাসরি চুক্তি ভঙ্গ করে। তখন ৯ম হিজরীতে সূরা আত-তাওবাহর এই আয়াতগুলো নাযিল করে মুশরিকদের সাথে কৃত সকল চুক্তি বাতিলের চূড়ান্ত ঘোষণা (বারা’আত) দেওয়া হয়। তবে যারা চুক্তি ভঙ্গ করেনি (যেমন বনু যামরা ও বনু মুদলিয), তাদের নির্ধারিত মেয়াদ পর্যন্ত চুক্তি বহাল রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।
(ب) مَنْ هُمُ الْمُشْرِكُونَ؟ وَمَنْ هُمُ الْمُتَّقُونَ؟ بَيِّنْ-
[মুশরিক কারা এবং মুত্তাকী কারা? বর্ণনা কর।]
- মুশরিক (المشركون): যারা মহান আল্লাহর সত্তা, গুণাবলী বা ইবাদতের কোনো ক্ষেত্রে অন্য কাউকে অংশীদার বা শরীক সাব্যস্ত করে। যেমন মক্কার পৌত্তলিকরা আল্লাহর অস্তিত্ব স্বীকার করেও মূর্তিদের আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম মনে করত।
- মুত্তাকী (المتقون): যারা আল্লাহর প্রতিটি আদেশ নিষ্ঠার সাথে পালন করে এবং যাবতীয় নিষেধ ও হারাম থেকে নিজেকে রক্ষা করে চলে। আয়াতে চুক্তি রক্ষাকারী ও বিশ্বস্ত মুমিনদের মুত্তাকী হিসেবে আখ্যায়িত করে বলা হয়েছে—আল্লাহ মুত্তাকীদের ভালোবাসেন।
٨- قال الله تعالى: ﴿إِنَّمَا يَعْمُرُ مَسَاجِدَ اللَّهِ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَأَقَامَ الصَّلَاةَ وَآتَى الزَّكَاةَ وَلَمْ يَخْشَ إِلَّا اللَّهَ فَعَسَىٰ أُولَٰئِكَ أَنْ يَكُونُوا مِنَ الْمُهْتَدِينَ﴾
[৮. আয়াতগুলোর তাফসির লিখে উহার সাথে সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর দাও]
(الف) بَيِّنْ أَهَمِّيَّةَ الْمَسْجِدِ فِي الِاجْتِمَاعِ الْإِسْلَامِيِّ-
[ইসলামি সমাজে মসজিদের গুরুত্ব বর্ণনা কর।]
ইসলামি সমাজব্যবস্থায় মসজিদ কেবল নামাযের স্থান নয়; বরং এটি হলো মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিক জাগরণের প্রাণকেন্দ্র:
- সামাজিক সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা: মসজিদে ধনী-গরিব, শাসক ও প্রজা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এক কাতারে দাঁড়ায়, যা সকল সামাজিক বৈষম্য দূর করে।
- পরামর্শ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্র: রাসূলুল্লাহ ﷺ ও খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগে মসজিদ ছিল রাষ্ট্রীয় পরামর্শ সভা, সেনাপতিদের নির্দেশনা কেন্দ্র এবং ন্যায়বিচারের আদালত।
- শিক্ষাদান ও নৈতিক প্রশিক্ষণ: কুরআন-হাদীস ও ইসলামের মৌলিক জ্ঞান অর্জনের সর্বপ্রথম প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যাপীঠ হলো মসজিদ।
(ب) مَا مَعْنَى الزَّكَاةِ؟ اكْتُبْ مَصَارِفَهَا مُدَلَّلًا-
[যাকাত অর্থ কী? এর খাতসমূহ দলিলসহ লেখ।]
- যাকাতের পরিচয়: ‘যাকাত’ শব্দের অর্থ পবিত্রতা, প্রবৃদ্ধি ও বরকত। শরীয়তের পরিভাষায় নির্দিষ্ট পরিমাণ ধনসম্পদ (নিসাব পরিমাণ) পূর্ণ এক বছর অতিক্রম করলে তার সুনির্দিষ্ট অংশ (২.৫%) আল্লাহর নির্ধারিত খাতে নিঃশর্ত মালিকানা প্রদানকে যাকাত বলে।
- যাকাতের ৮টি খাত (কুরআনের দলীলসহ): সূরা আত-তাওবাহর ৬০ নং আয়াতে আল্লাহ তা’আলা যাকাতের ৮টি খাত সুস্পষ্ট নির্ধারণ করেছেন:
﴿إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ فَرِيضَةً مِنَ اللَّهِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ﴾- ফকীর (الفقراء): যার সামান্য সম্পদ আছে কিন্তু তা দিয়ে মৌলিক প্রয়োজন মেটে না।
- মিসকীন (المساكين): যার কোনো সম্বল বা উপার্জন নেই।
- যাকাত আদায়কারী কর্মচারী (العاملين عليها)।
- মন জয় করার উদ্দেশ্যে (المؤلفة قلوبهم): নওমুসলিম বা দ্বীনের প্রতি আকৃষ্ট ব্যক্তি।
- দাসমুক্তি (في الرقاب): বন্দীদশা থেকে মুক্তি অর্জনে।
- ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি (الغارمين): যে ঋণ পরিশোধে সম্পূর্ণ অক্ষম।
- আল্লাহর পথে জিহাদ ও দাওয়াত (في سبيل الله)।
- মুসাফির (ابن السبيل): নিজ দেশে ধনী হলেও সফরে সহায়সম্বলহীন হয়ে পড়া ব্যক্তি।
٩- قال الله تعالى: ﴿الر تِلْكَ آيَاتُ الْكِتَابِ الْحَكِيمِ ۞ أَكَانَ لِلنَّاسِ عَجَبًا أَنْ أَوْحَيْنَا إِلَىٰ رَجُلٍ مِنْهُمْ أَنْ أَنْذِرِ النَّاسَ وَبَشِّرِ الَّذِينَ آمَنُوا أَنَّ لَهُمْ قَدَمَ صِدْقٍ عِنْدَ رَبِّهِمْ قَالَ الْكَافِرُونَ إِنَّ هَٰذَا لَسَاحِرٌ مُبِينٌ﴾
[৯. আয়াতগুলোর তাফসির লিখে উহার সাথে সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর দাও]
(الف) أَيْنَ وَمَتَى نَزَلَتْ سُورَةُ ‘يُونُسَ’؟ بَيِّنْ وَجْهَ تَسْمِيَتِهَا-
[কখন এবং কোথায় সূরা ইউনুস নাযিল হয়? এ নামে নামকরণের কারণ বর্ণনা কর।]
- নাযিলের স্থান ও কাল: সূরা ইউনুস হলো একটি মাক্কী সূরা। এটি মক্কায় হিজরতের পূর্বে, দাওয়াতের সংকটময় অন্তিম সময়ে অবতীর্ণ হয়। এতে মোট ১০৯টি আয়াত রয়েছে।
- নামকরণের কারণ: এই সূরার ৯৮ নং আয়াতে হযরত ইউনুস (আ.) ও তাঁর জাতির ঈমান আনার এক বিরল ও অনন্য ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। আযাব প্রত্যক্ষ করার পর কোনো জাতির তওবা কবুল হওয়ার নজির ছিল না, একমাত্র ইউনুস (আ.)-এর কওম আযাবের লক্ষণ দেখে খাঁটি মনে তওবা করায় আল্লাহ তাদের আযাব উঠিয়ে নিয়েছিলেন। এই ঐতিহাসিক শিক্ষার স্মারক হিসেবে সূরার নাম ‘সূরা ইউনুস’ রাখা হয়েছে।
(ب) ‘أَوْحَيْنَا إِلَىٰ رَجُلٍ مِنْهُمْ’ أَوْضِحْ هَٰذِهِ الْقِطْعَةَ-
[‘আওহায়না ইলা রাজুলিম মিনহুম’ আয়াতাংশটির ব্যাখ্যা কর।]
ব্যাখ্যা: মক্কার কাফেররা একগুঁয়েমি করে বলত—আল্লাহ যদি নবী পাঠাতেই চান তবে কোনো শক্তিশালী ফেরেশতা পাঠালেন না কেন? একজন রক্ত-মাংসের সাধারণ মানুষ কীভাবে আল্লাহর রাসূল হতে পারে? আল্লাহ তা’আলা তাদের এই অমূলক বিস্ময় প্রত্যাখ্যান করে বলেন: মানুষের হেদায়াত ও আদর্শিক অনুসরণের জন্য তাদের মধ্য থেকেই একজন মানুষ পাঠানোই যুক্তিযুক্ত ও পরম স্বাভাবিক। কারণ ফেরেশতা পাঠালে মানুষ তাকে আদর্শ হিসেবে অনুসরণ করতে পারত না। আর মুহাম্মদ ﷺ তাদেরই ভাষায় কথা বলেন, তাদের মাঝেই বিশ্বস্ত হিসেবে শৈশব থেকে বেড়ে উঠেছেন।
١٠- قال الله تعالى: ﴿وَيَقُولُونَ لَوْلَا أُنْزِلَ عَلَيْهِ آيَةٌ مِنْ رَبِّهِ فَقُلْ إِنَّمَا الْغَيْبُ لِلَّهِ فَانْتَظِرُوا إِنِّي مَعَكُمْ مِنَ الْمُنْتَظِرِينَ﴾
[১০. আয়াতগুলোর তাফসির লিখে উহার সাথে সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর দাও]
(الف) আয়াতে কারীমার সংশ্লিষ্ট প্রেক্ষাপট ও ঘটনা বর্ণনা কর:
প্রেক্ষাপট: মক্কার কুরাইশরা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আনীত কুরআনের অতুলনীয় সাহিত্যের অলৌকিকত্বকে অগ্রাহ্য করে অযৌক্তিক সব অলৌকিক নিদর্শন দাবি করত। তারা বলত—সাফা পাহাড়কে সোনায় পরিণত করে দেওয়া হোক, অথবা সরাসরি আকাশ থেকে কোনো কিতাব তাদের চোখের সামনে নামিয়ে আনা হোক কিংবা ফেরেশতা এসে সাক্ষ্য দিক। তাদের জবাবে আল্লাহ নবীজিকে নির্দেশ দেন—অলৌকিক নিদর্শন নিজের ইচ্ছামতো দেখানো নবীর কাজ নয়; বরং গায়েবের জ্ঞান ও ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর হাতে। আল্লাহ চাইলে নিদর্শন দেখান, আবার অবাধ্য হলে ধ্বংস করে দেন। অতএব আল্লাহ কী ফয়সালা করেন তার অপেক্ষা কর।
(ب) مَا مَعْنَى الْغَيْبِ؟ هَلْ يَعْلَمُهُ أَحَدٌ إِلَّا اللَّهُ؟ بَيِّنْ-
[আল-গায়িব অর্থ কী? আল্লাহ ছাড়া অন্য কেহ উহা জানে কি? বর্ণনা কর।]
- গায়েব (الغيب)-এর পরিচয়: যা মানুষের বাহ্যিক ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অভিজ্ঞতার বাইরে, মানবিক চিন্তা ও যুক্তির অগম্য এবং যা সরাসরি প্রত্যক্ষ করা যায় না, তাকে গায়েব বা অদৃশ্যের জগত বলে। যেমন—আল্লাহর সত্তা, ফেরেশতা, জান্নাত, জাহান্নাম, কবরের অবস্থা ও ক্বিয়ামতের সঠিক সময়।
- গায়েবের জ্ঞান কি আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ জানে?:
- মৌলিক ও যাতি জ্ঞান (علم الغيب الذاتي): নিজস্ব ক্ষমতায় গায়েবের সার্বভৌম জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তা’আলারই একক বৈশিষ্ট্য। কোনো নবী, ওলী বা ফেরেশতার এই ক্ষমতা নেই। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: “কুল লা ইয়া’লামু মান ফিস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ্বিল গাইবা ইল্লাল্লাহ”।
- আতাই বা ওহী মারফত প্রদত্ত জ্ঞান (علم الغيب العطائي): আল্লাহ তা’আলা ওহী ও নবুওয়াতের দায়িত্ব পালনের জন্য যতটুকু প্রয়োজন মনে করেন, ততটুকু অদৃশ্যের সংবাদ তাঁর মনোনীত রাসূলগণকে অবহিত করেন (সূরা আল-জ্বিন: ২৬-২৭)। সুতরাং নবীদের কাছে যে গায়েবের সংবাদ রয়েছে তা আল্লাহর দান, নিজস্ব নয়।
مجموعة (ب) – খ অংশ: সংক্ষিপ্ত তাত্ত্বিক প্রশ্নাবলি
١١- اكتب نبذة عن حياة محمد على الصابونى وخصائص تفسيره ‘صفوة التفاسير’-
[১১. মুহাম্মদ আলী আস-সাবূনীর জীবনী ও তার صفوة التفاسير এর বৈশিষ্ট্যসমূহ লেখ।]
ক. আল্লামা মুহাম্মদ আলী আস-সাবূনীর সংক্ষিপ্ত জীবনী:
বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুফাসসির ও হাদিস বিশারদ শায়খ মুহাম্মদ আলী আস-সাবূনী (রহ.) ১৯৩০ সালে সিরিয়ার আলেপ্পো (হালাব) নগরীতে এক সম্ভ্রান্ত আলেম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শরীয়াহ ও উসূলে দ্বীন বিষয়ে সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে দীর্ঘ কয়েক দশক তিনি সৌদি আরবের মক্কার উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাফসীর ও উলূমুল কুরআনের অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২১ সালের ১৯ মার্চ তিনি তুরস্কে ইন্তেকাল করেন।
খ. ‘সাফওয়াতুত তাফাসীর’ (صفوة التفاسير)-এর অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ:
- প্রধান প্রধান তাফসীরগ্রন্থের নির্যাস: এটি মূলত তাবারী, কাশশাফ, কুরতুবী, বায়যাবী, ইবনে কাসীর ও আলূসীর মতো ক্লাসিক্যাল নির্ভরযোগ্য তাফসীরগ্রন্থসমূহের সারনির্যাস।
- সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষাভঙ্গি: জটিল সনদের উল্লেখ বাদ দিয়ে আধুনিক ও ঝরঝরে আরবি ভাষায় বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়েছে।
- সুসংগঠিত বিন্যাস: প্রতিটি সূরার শুরুতে এর মূলভাব, শানে নুযূল, অতঃপর শব্দার্থ (লুগাত), ব্যাকরণিক ব্যাখ্যা (ই’রাব), বালাগাতী সৌন্দর্য এবং আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয় আলাদা পয়েন্ট আকারে তুলে ধরা হয়েছে।
- ইসরাঈলী রেওয়ায়েত বর্জন: ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর ইসরাঈলী বর্ণনা পরিহার করে বিশুদ্ধ হাদীস ও সালাফদের ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করা হয়েছে।
١٢- عرف التفسير والتأويل ثم بين خصائص التفسير المعاصر والتفسير القديم بالتفصيل-
[১২. التفسير এবং التأويل এর সংজ্ঞা দাও। অতঃপর আধুনিক তাফসির ও প্রাচীন তাফসির এর বৈশিষ্ট্যসমূহ বর্ণনা কর।]
ক. তাফসীর ও তা’বীল-এর সংজ্ঞা:
- আত-তাফসীর (التفسير): কুরআনের আয়াতসমূহের বাহ্যিক অর্থ, প্রেক্ষাপট, শানে নুযূল ও শব্দার্থ বিশদভাবে সুস্পষ্ট করে প্রকাশ করাকে তাফসীর বলে। এটি প্রধানত বর্ণনা ও হাদীসনির্ভর (রিওয়ায়াতভিত্তিক)।
- আত-তা’বীল (التأويل): কোনো আয়াতের আপাত অর্থ থেকে সরে গিয়ে সম্ভাবনা ও দলিলের ভিত্তিতে তার গভীরতম অন্তর্নিহিত রূপক অর্থ অনুধাবন করাকে তা’বীল বলে। এটি প্রজ্ঞা ও যুক্তিভিত্তিক (দিরায়াতভিত্তিক)।
খ. প্রাচীন তাফসীর ও আধুনিক তাফসীরের বৈশিষ্ট্যের তুলনা:
| তুলনার ক্ষেত্র | প্রাচীন তাফসীর (التفسير القديم) | আধুনিক তাফসীর (التفسير المعاصر) |
|---|---|---|
| পদ্ধতি ও সনদ | বর্ণনাকারীদের দীর্ঘ সনদ এবং রেওয়ায়েত উদ্ধৃত করার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হতো। | সনদ পরিহার করে সরাসরি আয়াতের মূল বক্তব্য ও ব্যবহারিক জীবনবিধান তুলে ধরা হয়। |
| ভাষা ও শৈলী | কঠিন ক্লাসিক্যাল আরবি এবং সূক্ষ্ম নাহু-সরফ ও বালাগাতী বিতর্কের প্রাধান্য। | সহজ, প্রাঞ্জল ও গতিশীল আধুনিক সাহিত্যিক ভাষাভঙ্গি। |
| সমস্যা সমাধান | তৎকালীন যুগের কালামী বিতর্ক ও ফেক্বহী মাযহাবগত বিরোধ মেটানো প্রধান লক্ষ্য ছিল। | আধুনিক বিজ্ঞান, সমাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি ও নৈতিক অবক্ষয়ের সমাধান প্রদান। |
| ইসরাঈলিয়াত | অনেক প্রাচীন গ্রন্থে যাচাই ছাড়া ইসরাঈলী বর্ণনা স্থান পেয়েছিল। | ইসরাঈলিয়াত কঠোরভাবে বর্জন ও বৈজ্ঞানিক সত্যের সাথে সামঞ্জস্য বিধান। |
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. আত-তাফসীরুল মুয়াসসির বলতে কী বোঝায়?
আত-তাফসীরুল মুয়াসসির বা সমকালীন তাফসীর হলো আধুনিক যুগের মানুষের ভাষা, মানসিকতা ও সমসাময়িক বৈজ্ঞানিক-সামাজিক প্রেক্ষাপটের আলোকে রচিত সহজবোধ্য তাফসীর শাস্ত্র।
২. সাফওয়াতুত তাফাসীর গ্রন্থের লেখক কে?
সাফওয়াতুত তাফাসীর গ্রন্থের রচয়িতা হলেন বিংশ শতাব্দীর প্রখ্যাত সিরিয়ান আলেম ও মুফাসসির শায়খ মুহাম্মদ আলী আস-সাবূনী (রহ.)।
৩. আসমান-জমিন সৃষ্টির ক্ষেত্রে ‘খালাক্বা’ এবং আলো-অন্ধকারের ক্ষেত্রে ‘জা’আলা’ কেন বলা হয়েছে?
‘খালাক্বা’ অর্থ কোনো পূর্ব নমুনা ছাড়া অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে আনা, আর ‘জা’আলা’ অর্থ এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় রূপান্তর করা। আকাশ-পৃথিবী শূন্য থেকে সৃষ্ট এবং আলো-আঁধারি তার পর্যায়ক্রমিক রূপান্তর।
৪. ইসলামি শরীয়তে যাকাতের প্রধান খাত কয়টি?
পবিত্র কুরআনের সূরা আত-তাওবাহর ৬০ নং আয়াত অনুযায়ী যাকাত বণ্টনের প্রধান খাত সুনির্দিষ্টভাবে ৮টি।
৫. নবিগণ কি সকল প্রকার পাপ থেকে নিষ্পাপ?
হ্যাঁ, আহলুস সুন্নাহর মতে নবিগণ রিসালাত প্রচার, কুফর, শিরক এবং সকল কবিরা গুনাহ থেকে সর্বসম্মতভাবে সম্পূর্ণ নিষ্পাপ ও সুরক্ষিত।
৬. সূরা ইউনুসের নামকরণের বিশেষ তাৎপর্য কী?
হযরত ইউনুস (আ.)-এর জাতি আল্লাহর আযাব আসন্ন দেখে খাঁটি মনে তওবা করায় তাদের ওপর থেকে আযাব তুলে নেওয়া হয়েছিল, যা ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই স্মরণে সূরার নামকরণ করা হয়েছে।