ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ২য় বর্ষ পরীক্ষা 2022
বিভাগ: আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: আত-তাফসীর বিদূনিস সানাদ (التفسير بدون السند)
বিষয় কোড: 201201 | পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
[দ্রষ্টব্য: (ক) অংশ হতে যে কোনো পাঁচটি এবং (খ) অংশ হতে যে কোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দাও। বাম পাশে উল্লেখিত সংখ্যা প্রশ্নের পূর্ণমান জ্ঞাপক।]
مجموعة (أ) – ক অংশ: আয়াতসমূহের ব্যাখ্যা ও সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর
١- قال الله تبارك تعالى: ﴿الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ ۞ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ ۞ مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ ۞ إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ﴾
[১. আয়াতগুলোর তাফসির লিখে উহার সাথে সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর দাও]
আয়াতসমূহের তাফসীর ও মূলভাব:
তাফসীর: সূরা আল-ফাতিহার এ আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা’আলার সার্বভৌমত্ব, পরিপূর্ণ প্রশংসা, অসীম দয়া ও পরকালের চূড়ান্ত মালিকানার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ‘আল-হামদু লিল্লাহ’ দ্বারা বিশ্বজাহানের যাবতীয় প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্ধারিত করা হয়েছে, যিনি নিখিল বিশ্বের একমাত্র পালনকর্তা ও প্রতিপালক। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা তাঁর পরম করুণাময় ও দয়ালু রূপ তুলে ধরে মানবজাতিকে একমাত্র তাঁরই দাসত্ব ও সাহায্য প্রার্থনার নির্দেশ প্রদান করেছেন।
(الف) ما معنى الرَّحْمَنِ وَالرَّحِيمِ؟ وَمَا الْفَرْقُ بَيْنَهُمَا؟
[রহমান এবং রহীম-এর অর্থ কী? এ দুটির মধ্যে পার্থক্য কী?]
- শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ:
- আর-রাহমান (الرَّحْمَنُ): এটি ‘ফা’লান’ (فَعْلَان) ওজনে গঠিত সিফাতে মুসাব্বাহা, যা দয়া ও করুণার আধিক্য ও পূর্ণতা নির্দেশ করে। এর অর্থ—যিনি পরম করুণাময়, যাঁর রহমত বিশ্বজগতের সৃষ্টিমাত্রের ওপর পরিব্যাপ্ত।
- আর-রাহীম (الرَّحِيمُ): এটি ‘ফাঈল’ (فَعِيل) ওজনে গঠিত ইসমে ফাঈল বা সিফাত, যা অনুগ্রহের স্থায়িত্ব ও ধারাবাহিকতা প্রকাশ করে। এর অর্থ—যিনি অতি দয়ালু ও চিরস্থায়ী অনুগ্রহকারী।
- উভয়ের মাঝে সূক্ষ্ম পার্থক্য:
- ইমাম খাত্তাবী ও ইমাম তিরমিযী (রহ.) বর্ণনা করেন: ‘আর-রাহমান’ হলেন তিনি, যাঁর করুণা ও অনুগ্রহ দুনিয়াতে মুমিন ও কাফের নির্বিশেষে সকল সৃষ্টির জন্য উন্মুক্ত; আর ‘আর-রাহীম’ হলেন তিনি, যাঁর বিশেষ করুণা ও ক্ষমা আখেরাতে শুধুমাত্র মুমিন বান্দাদের জন্য নির্ধারিত থাকবে (কুরআনের বাণী: “ওয়া কা-না বিল মু’মিনীনা রাহীমা”)।
- ‘আর-রাহমান’ নামটি আল্লাহর এমন এক অনুপম একক বৈশিষ্ট্য যা কোনো সৃষ্টির জন্য প্রয়োগ করা জায়েয নয়; পক্ষান্তরে ‘রাহীম’ গুণটি সৃষ্টির ক্ষেত্রেও প্রয়োগ হতে পারে (যেমন রাসূলুল্লাহ ﷺ সম্পর্কে বলা হয়েছে: ‘বিল মু’মিনীনা রাউফুর রাহীম’)।
(ب) كَمْ قِرَاءَةً فِي قَوْلِهِ: ﴿مَلِكِ يَوْمِ الدِّينِ﴾؟ بَيِّنْ-
[মালিকি ইয়াওমিদ্দীন-এর মধ্যে কয়টি ক্বিরাআত রয়েছে? বর্ণনা কর।]
মুতাওয়াতির ও নির্ভরযোগ্য সাব’আহ ক্বিরাআতের ইমামগণের মাঝে ﴿مَلِكِ يَوْمِ الدِّينِ﴾ বাক্যাংশে প্রধানত দুটি সুবিখ্যাত ক্বিরাআত রয়েছে:
- আলিফসহ ক্বিরাআত — ‘মালিক’ (مَالِكِ): ইমাম আসিম, ইমাম কিসাঈ, এবং ইমাম ইয়াকূব (রহ.) আলিফ টান দিয়ে ‘মালিক’ পাঠ করেছেন। এর অর্থ—যিনি ক্বিয়ামত দিবসের একচ্ছত্র মালিক ও স্বত্বাধিকারী। সেদিন কারও নিজস্ব কোনো ক্ষমতা বা মালিকানা থাকবে না।
- আলিফবিহীন ক্বিরাআত — ‘মালিক’ (مَلِكِ): ইমাম নাফি’, ইমাম ইবনে কাসীর, ইমাম আবু আমর, ইমাম ইবনে আমির, এবং ইমাম হামযাহ (রহ.) আলিফ ছাড়া লামের যের দিয়ে ‘মালিক’ পাঠ করেছেন। এর অর্থ—যিনি বিচার দিবসের সার্বভৌম বাদশাহ ও সর্বময় শাসক।
উভয় ক্বিরাআতই মুতাওয়াতির এবং অর্থগত দিক থেকে একে অপরের পরিপূরক। কারণ কোনো ব্যক্তি বাদশাহ হলেও সব সম্পত্তির মালিক নাও হতে পারে, আবার কোনো ব্যক্তি মালিক হলেও বাদশাহ নাও হতে পারে; কিন্তু মহান আল্লাহ ক্বিয়ামত দিবসে একই সাথে সার্বভৌম বাদশাহ (الملك) এবং সমগ্র রাজত্বের একচ্ছত্র মালিক (المالك)।
٢- قال الله تعالى: ﴿وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَقُولُ آمَنَّا بِاللَّهِ وَبِالْيَوْمِ الْآخِرِ وَمَا هُمْ بِمُؤْمِنِينَ ۞ يُخَادِعُونَ اللَّهَ وَالَّذِينَ آمَنُوا وَمَا يَخْدَعُونَ إِلَّا أَنْفُسَهُمْ وَمَا يَشْعُرُونَ ۞ فِي قُلُوبِهِمْ مَرَضٌ فَزَادَهُمُ اللَّهُ مَرَضًا وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ بِمَا كَانُوا يَكْذِبُونَ﴾
[২. আয়াতগুলোর তাফসির লিখে উহার সাথে সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর দাও]
আয়াতসমূহের তাফসীর:
সূরা আল-বাক্বারার এ আয়াতগুলোতে মদীনার মুনাফিক শ্রেণির মুখোশ উন্মোচন করা হয়েছে। তারা মুখে আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাসের ভান করত, কিন্তু অন্তরে কুফর লুকিয়ে রাখত। তারা নিজেদের চাতুর্য দিয়ে আল্লাহ ও মুমিনদের ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করত, অথচ প্রকৃতপক্ষে তারা নিজেদের আত্মাকেই প্রতারিত করছিল। তাদের অন্তরে নিফাক্ব ও হিংসারূপী যে ব্যাধি ছিল, আল্লাহ তা বাড়িয়ে দিয়েছেন এবং তাদের মিথ্যাচারের কারণে আখেরাতে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি নির্ধারিত রয়েছে।
(الف) مَنْ هُمُ الْمُنَافِقُونَ؟ بَيِّنْ-
[মুনাফিক কারা? বর্ণনা কর।]
মুনাফিকদের পরিচয়: ইসলামি শরীয়তের পরিভাষায় মুনাফিক হলো সেই ব্যক্তি, যে বাহ্যিকভাবে নিজেকে মুসলিম হিসেবে প্রকাশ করে, নামায-রোযা ও ইসলামের বাহ্যিক রীতিনীতি পালন করে, কিন্তু অন্তরে কুফর, শিরক ও ইসলামের প্রতি তীব্র শত্রুতা গোপন রাখে।
- মুনাফিকদের প্রকারভেদ: মুনাফিকি দুই প্রকার:
- নিফাক্বে ই’তিক্বাদী (বিশ্বাসগত মুনাফিকি): যা মানুষকে সরাসরি জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে (আদ-দারকুল আসফাল) পৌঁছে দেয়। আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ও তার সঙ্গীরা এ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত ছিল।
- নিফাক্বে আমালী (আচরণগত মুনাফিকি): বিশ্বাসে মুমিন হওয়া সত্ত্বেও মুনাফিকের স্বভাব ধারণ করা—যেমন মিথ্যা বলা, আমানতের খিয়ানত করা, ওয়াদা ভঙ্গ করা ও বিবাদে অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করা।
(ب) مَا مَعْنَى الْخِدَاعِ لُغَةً وَشَرْعًا؟
[আল-খিদা’ এর শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ কী?]
- শাব্দিক অর্থ: ‘আল-খিদা’ (الخداع) শব্দটি আরবি ‘খাদা’আ’ (خدع) থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ প্রতারণা করা, ধোঁকা দেওয়া, আসল বিষয় গোপন করে কৃত্রিম বিষয় প্রকাশ করা বা কোনো বস্তুকে ক্ষতিকর রূপ দিয়ে গোপনে ফাঁদে ফেলা।
- পারিভাষিক অর্থ: কোনো ব্যক্তির সাথে বাহ্যিকভাবে ভালো আচরণ ও বন্ধুত্বের রূপ প্রদর্শন করে অন্তরে তার ক্ষতিসাধন ও অনিষ্টের পরিকল্পনা গোপন রাখাকে শরীয়তের পরিভাষায় খিদা’ বা প্রতারণা বলে। মুনাফিকরা মুমিনদের সামনে ইসলাম প্রকাশ করে গোপনে তাদের ক্ষতি করতে চেয়েছিল।
٣- قال الله تعالى: ﴿وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ لَا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ قَالُوا إِنَّمَا نَحْنُ مُصْلِحُونَ ۞ أَلَا إِنَّهُمْ هُمُ الْمُفْسِدُونَ وَلَٰكِنْ لَا يَشْعُرُونَ ۞ وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ آمِنُوا كَمَا آمَنَ النَّاسُ قَالُوا أَنُؤْمِنُ كَمَا آمَنَ السُّفَهَاءُ أَلَا إِنَّهُمْ هُمُ السُّفَهَاءُ وَلَٰكِنْ لَا يَعْلَمُونَ﴾
[৩. আয়াতগুলোর তাফসির লিখে উহার সাথে সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর দাও]
আয়াতসমূহের তাফসীর:
মুনাফিকদের যখন পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা ও অশান্তি সৃষ্টি করতে নিষেধ করা হতো, তখন তারা নির্লজ্জভাবে দাবি করত যে তারা নাকি সমাজে শান্তি ও সংস্কার সাধন করছে। আল্লাহ তা’আলা দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন—তারাই প্রকৃত ফাসাদ সৃষ্টিকারী, কিন্তু তাদের উপলব্ধি নেই। আর যখন সাহাবায়ে কেরামের মতো খাঁটি ঈমান আনতে বলা হতো, তখন তারা সাহাবীগণকে ‘নির্বোধ’ (সুফাহা) বলে উপহাস করত। আল্লাহ প্রত্যুত্তরে জানান, প্রকৃতপক্ষে ওরাই নির্বোধ, অথচ অজ্ঞতার কারণে ওরা তা জানে না।
(الف) مَا مَعْنَى الْإِيمَانِ لُغَةً وَشَرْعًا؟ بَيِّنْ مُفَصَّلًا-
[আল-ঈমান-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ কী? বিস্তারিত বর্ণনা কর।]
- আভিধানিক অর্থ: ‘ঈমান’ (الإيمان) শব্দের মূল অর্থ স্বীকৃতি দেওয়া, সত্যায়ন করা (التصديق) এবং নির্ভীক চিত্তে বিশ্বাস স্থাপন করা। যেমন কুরআনে ইউসুফ (আ.)-এর ভাইদের উক্তি: “ওয়ামা আনতা বিমু’মিনিল লানা” (আপনি আমাদের বিশ্বাস করবেন না)।
- পারিভাষিক অর্থ: আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা’আতের আক্বীদা অনুযায়ী ঈমানের সংজ্ঞা হলো:
التصديق بالقلب والإقرار باللسان والعمل بالأركان
“অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করা, মুখে মৌখিক স্বীকৃতি দেওয়া এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে তা কাজে পরিণত করা।” রাসূলুল্লাহ ﷺ আল্লাহর পক্ষ থেকে যা কিছু দ্ব্যর্থহীনভাবে নিয়ে এসেছেন, তা নিঃশঙ্কচিত্তে সত্য বলে মেনে নেওয়ার নামই ঈমান।
(ب) مَا مَعْنَى الْمُفْسِدُونَ وَمَا الْمُرَادُ بِالْمُفْسِدُونَ؟
[আল-মুফসিদূন অর্থ কী? আল-মুফসিদূন দ্বারা উদ্দেশ্য কী?]
- শাব্দিক অর্থ: ‘মুফসিদূন’ (المفسدون) হলো বহুবচন, একবচনে ‘মুফসিদ’। এর অর্থ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী, অনিষ্টকারী, ফিতনাবাজ বা ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত ব্যক্তি।
- উদ্দেশ্য ও মর্মার্থ: আয়াতে ‘মুফসিদূন’ দ্বারা মদীনার মুনাফিকদের বোঝানো হয়েছে। তাদের ফাসাদের মূল রূপগুলো ছিল:
- কাফের ও মুশরিকদের সাথে গোপনে মৈত্রী স্থাপন করে মুসলিমদের সামরিক ও রাজনৈতিক তথ্য পাচার করা।
- মুসলিম সমাজের ঐক্যে ফাটল ধরানো এবং বিভ্রান্তিমূলক গুজব ছড়ানো।
- আল্লাহর অবাধ্যতা ও পাপাচারে লিপ্ত হয়ে জমিনের স্বাভাবিক ভারসাম্য ও নৈতিক শান্তি নষ্ট করা।
٤- قوله تعالى: ﴿الم ۞ اللَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ ۞ نَزَّلَ عَلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيْهِ وَأَنْزَلَ التَّوْرَاةَ وَالْإِنْجِيلَ﴾
[৪. আয়াতগুলোর তাফসির লিখে উহার সাথে সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর দাও]
আয়াতসমূহের তাফসীর:
সূরা আলে ইমরানের সূচনায় হুরুফে মুকাত্তা’আত ‘আলিফ-লাম-মীম’ দিয়ে শুরু করে তাওহীদের ভিত্তি ঘোষণা করা হয়েছে। আল্লাহ ব্যতীত কোনো সত্য উপাস্য নেই, যিনি চিরঞ্জীব ও বিশ্বজগতের ধারক। তিনি নবী মুহাম্মদ ﷺ-এর ওপর সত্যসহ কুরআন নাযিল করেছেন, যা পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সত্যায়নকারী এবং এর পূর্বে তিনি মানবজাতির হেদায়াতের জন্য তাওরাত ও ইঞ্জিল অবতীর্ণ করেছিলেন।
(الف) مَا الْفَرْقُ بَيْنَ نَزَّلَ وَأَنْزَلَ؟ بَيِّنْ-
[নায্যালা ও আনযালা-এর মধ্যে পার্থক্য কী? বর্ণনা কর।]
আরবি বালাগাত ও ব্যাকরণশাস্ত্রে ‘নায্যালা’ (نَزَّلَ) ও ‘আনযালা’ (أَنْزَلَ) উভয়েই অবতরণ নির্দেশ করলেও ব্যবহারের ক্ষেত্রে অর্থগত সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে:
- নায্যালা (نَزَّلَ): বাবে তাফঈল (التفعيل) থেকে এসেছে, যা তাদরীজ (التدريج) অর্থাৎ ধাপে ধাপে, ক্রমে ক্রমে দীর্ঘ সময় নিয়ে অবতীর্ণ হওয়া নির্দেশ করে। পবিত্র কুরআন ২৩ বছর ধরে পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ধারাবাহিকভাবে নাযিল হয়েছিল, তাই কুরআনের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে: ‘নায্যালা আলাইকাল কিতাব’।
- আনযালা (أَنْزَلَ): বাবে ইফ’আল (الإفعال) থেকে এসেছে, যা দফ’আতান ওয়াহিদাতান (دفعة واحدة) অর্থাৎ একবারে বা সামগ্রিকভাবে অবতীর্ণ হওয়া বোঝায়। তাওরাত ও ইঞ্জিল পূর্ববর্তী নবীদের ওপর একবারে গ্রন্থাকারে নাযিল হয়েছিল, তাই তাদের ক্ষেত্রে ‘আনযালাত তাওরাতা ওয়াল ইঞ্জীল’ বলা হয়েছে। এছাড়া কুরআন লওহে মাহফুজ থেকে প্রথম আসমানে সামগ্রিকভাবে অবতীর্ণ হওয়ার ক্ষেত্রেও ‘আনযালা’ ব্যবহৃত হয়েছে (যেমন: ‘ইন্না আনযালনাহু ফী লাইলাতিল ক্বদর’)।
(ب) مَا مَعْنَى الِاسْمِ الْأَعْظَمِ؟ وَمَا هُوَ؟ فصِّلْ-
[আল-ইসমে আযম-এর অর্থ কী? সেটা কী? বর্ণনা কর।]
- ইসমে আযম-এর পরিচয়: ‘আল-ইসমুল আ’যম’ (الاسم الأعظم) অর্থ আল্লাহর সর্বাধিক মহিমান্বিত ও বরকতময় নাম। হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, যে ব্যক্তি আল্লাহর এই নামের উসিলা দিয়ে দু’আ করে, তার দু’আ নিশ্চিতভাবে কবুল হয় এবং সে যা প্রার্থনা করে তা দান করা হয়।
- ইসমে আযম নির্ধারণে আলেমগণের মতামত: সহীহ হাদীসের আলোকে ওলামায়ে কেরামের প্রধান অভিমতগুলো নিম্নরূপ:
- ‘আল্লাহ’ (الله): অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে ‘আল্লাহ’ হলো ইসমে আযম, কারণ এটি আল্লাহ তা’আলার যাতি নাম (সত্তাগত নাম) এবং সকল গুণবাচক নামের উৎস।
- ‘আল-হাইয়্যুল ক্বাইয়্যূম’ (الْحَيُّ الْقَيُّومُ): সুনানে আবু দাউদ ও তিরমিযীতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ এক সাহাবীকে ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা বিআন্না লাকাল হামদ… ইয়া হাইয়্যু ইয়া ক্বাইয়্যূম’ পড়তে শুনে বললেন, সে আল্লাহর ইসমে আযমের মাধ্যমে দু’আ করেছে। সূরা আল-বাক্বারার আয়াতুল কুরসী এবং সূরা আলে ইমরানের ২ নং আয়াতে এ দুটি নাম এক সাথে এসেছে।
٥- قال الله تعالى: ﴿قَدْ كَانَ لَكُمْ آيَةٌ فِي فِئَتَيْنِ الْتَقَتَا فِئَةٌ تُقَاتِلُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَأُخْرَىٰ كَافِرَةٌ يَرَوْنَهُمْ مِثْلَيْهِمْ رَأْيَ الْعَيْنِ وَاللَّهُ يُؤَيِّدُ بِنَصْرِهِ مَنْ يَشَاءُ إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَعِبْرَةً لِأُولِي الْأَبْصَارِ﴾
[৫. আয়াতগুলোর তাফসির লিখে উহার সাথে সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর দাও]
(الف) مَا الْمُرَادُ بِقَوْلِهِ تَعَالَى: “قَدْ كَانَ لَكُمْ آيَةٌ فِي فِئَتَيْنِ”؟
[“ক্বাদ কানা লাকুম আয়াতুন ফী ফি’আতাইনি” আয়াতাংশের মর্মার্থ কী?]
মর্মার্থ: মদীনার ইহুদিরা যখন বদর যুদ্ধের বিজয়ের পর রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে অবজ্ঞা করে বলেছিল যে, কুরাইশরা যুদ্ধ জানত না বলেই পরাজিত হয়েছে, আমাদের সাথে যুদ্ধ বাঁধলে বুঝতে পারতেন; তখন আল্লাহ তা’আলা এ আয়াত নাযিল করেন। আল্লাহ বলেন—বদর প্রান্তরে মুখোমুখি হওয়া দুটি দলের মধ্যে তোমাদের জন্য এক মহান নিদর্শন ও শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত রয়েছে। একদল ছিল আল্লাহর পথে লড়াইকারী মুমিন দল (৩১৩ জন), আর অপর দল ছিল কাফের কুরাইশ বাহিনী (প্রায় ১০০০ জন)। পার্থিব শক্তির স্বল্পতা সত্ত্বেও আল্লাহ মুমিনদের বিজয় দান করেছেন। এতে দূরদর্শী ও চক্ষুষ্মানদের জন্য পরম শিক্ষা রয়েছে।
(ব) বদর যুদ্ধের ঐতিহাসিক ঘটনা সংক্ষেপে লেখ:
ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ (২য় হিজরীর ১৭ রমযান):
- প্রেক্ষাপট: মক্কার কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে একটি বাণিজ্য কাফেলা সিরিয়া থেকে মক্কার দিকে ফিরছিল। কুরাইশরা মদীনায় মুসলিমদের ওপর আক্রমণ করতে আবু জাহেলের নেতৃত্বে ১০০০ সুসজ্জিত সেনার এক বিশাল বাহিনী নিয়ে বদর প্রান্তরে উপস্থিত হয়।
- মুসলিম বাহিনীর প্রস্তুতি: রাসূলুল্লাহ ﷺ মাত্র ৩১৩ জন সাহাবী (যাঁদের মধ্যে ৭০টি উট ও মাত্র ২টি ঘোড়া ছিল) নিয়ে আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা করে বদরের ময়দানে আগমন করেন।
- রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কান্নাজড়িত দু’আ: যুদ্ধের রাতে রাসূলুল্লাহ ﷺ অশ্রুসিক্ত নয়নে দু’আ করেন: “হে আল্লাহ! যদি এই ক্ষুদ্র দলটি আজ ধ্বংস হয়ে যায়, তবে পৃথিবীতে আপনার ইবাদত করার মতো আর কেউ থাকবে না।”
- ঐশী সাহায্য ও চূড়ান্ত বিজয়: আল্লাহ তা’আলা ফেরেশতাদের বাহিনী পাঠিয়ে মুমিনদের সাহায্য করেন। কাফেরদের ওপর মুসলিমরা প্রবল আক্রমণ চালিয়ে তাদের ৭০ জন শীর্ষ নেতাকে (যার মধ্যে আবু জাহেল, উতবা, শায়বা অন্তর্ভুক্ত) হত্যা করেন এবং ৭০ জনকে যুদ্ধবন্দী করেন। মাত্র ১৪ জন মুসলিম সাহাবী শাহাদাত বরণ করেন এবং ইসলামের ইতিহাসে প্রথম চূড়ান্ত সামরিক বিজয় অর্জিত হয়।
٦- قال الله تعالى: ﴿يُوصِيكُمُ اللَّهُ فِي أَوْلَادِكُمْ لِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِّ الْأُنْثَيَيْنِ فَإِنْ كُنَّ نِسَاءً فَوْقَ اثْنَتَيْنِ فَلَهُنَّ ثُلُثَا مَا تَرَكَ وَإِنْ كَانَتْ وَاحِدَةً فَلَهَا النِّصْفُ وَلِأَبَوَيْهِ لِكُلِّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا السُّدُسُ مِمَّا تَرَكَ إِنْ كَانَ لَهُ وَلَدٌ فَإِنْ لَمْ يَكُنْ لَهُ وَلَدٌ وَوَرِثَهُ أَبَوَاهُ فَلِأُمِّهِ الثُّلُثُ فَإِنْ كَانَ لَهُ إِخْوَةٌ فَلِأُمِّهِ السُّدُسُ…﴾
[৬. আয়াতগুলোর তাফসির লিখে উহার সাথে সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর দাও]
(الف) بَيِّنْ مِيرَاثَ الْوَالِدَيْنِ-
[পিতামাতার মিরাছ সম্পর্কে বর্ণনা কর।]
ইসলামি মিরাছ আইনে মৃত ব্যক্তির পিতা ও মাতার উত্তরাধিকারের বিধান নিম্নরূপ:
- পিতার অংশ:
- মৃত ব্যক্তির কোনো সন্তান (পুত্র বা কন্যা) থাকলে পিতা সম্পত্তির এক-ষষ্ঠাংশ (১/৬) পাবেন।
- মৃত ব্যক্তির কোনো সন্তান বা পৌত্র না থাকলে পিতা ‘আসাবা’ (অবশিষ্টভোগী) হিসেবে সম্পূর্ণ অবশিষ্ট সম্পত্তি লাভ করবেন।
- কেবলমাত্র কন্যা সন্তান থাকলে পিতা ১/৬ অংশ নেওয়ার পর অবশিষ্ট অংশও আসাবা হিসেবে গ্রহণ করবেন।
- মাতার অংশ:
- মৃত ব্যক্তির কোনো সন্তান থাকলে অথবা একাধিক ভাই-বোন থাকলে মাতা সম্পত্তির এক-ষষ্ঠাংশ (১/৬) পাবেন।
- মৃত ব্যক্তির কোনো সন্তান না থাকলে এবং একাধিক ভাই-বোন না থাকলে মাতা সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ (১/৩) পাবেন।
(ب) مَاذَا نَصِيبُ الْبَنَاتِ؟ بَيِّنْ-
[কন্যাদের অংশ কী? বর্ণনা কর।]
মৃত ব্যক্তির মেয়েদের অংশের ক্ষেত্রে ৩টি মূল বিধান রয়েছে:
- যদি মৃত ব্যক্তির পুত্র সন্তান থাকে, তবে কন্যা তার ভাইয়ের সাথে ‘আসাবা বিল গাইর’ হবে এবং ভাই যা পাবে বোন তার অর্ধেক পাবে (للذكر مثل حظ الأنثيين)।
- যদি কোনো পুত্র সন্তান না থাকে এবং কন্যা একা (একক) হয়, তবে সে মোট সম্পত্তির অর্ধেক (১/২) পাবে।
- যদি কোনো পুত্র সন্তান না থাকে এবং কন্যা দুই বা ততোধিক হয়, তবে তারা সকলে মিলে মোট সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ (২/৩) সমানভাগে ভাগ করে নেবে।
٧- قال الله تعالى: ﴿حُرِّمَتْ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنْزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللَّهِ بِهِ وَالْمُنْخَنِقَةُ وَالْمَوْقُوذَةُ وَالْمُتَرَدِّيَةُ وَالنَّطِيحَةُ وَمَا أَكَلَ السَّبُعُ إِلَّا مَا ذَكَّيْتُمْ وَمَا ذُبِحَ عَلَى النُّصُبِ وَأَنْ تَسْتَقْسِمُوا بِالْأَزْلَامِ ذَٰلِكُمْ فِسْقٌ الْيَوْمَ يَئِسَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ دِينِكُمْ فَلَا تَخْشَوْهُمْ وَاخْشَوْنِ الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا﴾
[৭. আয়াতগুলোর তাফসির লিখে উহার সাথে সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর দাও]
(الف) مَا الْمُرَادُ بِقَوْلِهِ تَعَالَى: ﴿الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ﴾؟
[“আল-ইয়াওমা আকমালতু লাকুম দীনাকুম” আয়াতাংশটির মর্মার্থ কী?]
মর্মার্থ ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: বিদায় হজের দিন (১০ম হিজরীর ৯ই জিলহজ, আরাফাতের ময়দানে জুমু’আর দিনে) এই বরকতময় আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এর মর্মার্থ হলো:
- ইসলাম ধর্মের মূল ভিত্তি, আক্বীদা, হালাল-হারাম ও শরীয়তের মৌলিক বিধিবিধান আজ পরিপূর্ণতা লাভ করেছে; ক্বিয়ামত পর্যন্ত এতে আর কোনো সংযোজন বা পরিবর্তনের অবকাশ নেই।
- মুসলিমদের ওপর আল্লাহর নেয়ামত (জাহেলিয়াতের অন্ধকার থেকে মুক্ত করে খেলাফত ও তাওহীদের আলো দান) পূর্ণতা লাভ করেছে।
- ইসলামকে একমাত্র মনোনীত ও সন্তুষ্টচিত্ত দ্বীন হিসেবে আল্লাহ চূড়ান্ত অনুমোদন দান করেছেন। এ আয়াত শুনে হযরত উমর (রা.) কেঁদেছিলেন, কারণ কোনো বস্তু পূর্ণতা পেলে তার বিদায়লগ্ন সমাগত হয়।
(ب) উল্লিখিত আয়াতে যেসব খাদ্য হারাম করা হয়েছে সেগুলো কী কী?
আয়াতে বর্ণিত হারাম খাদ্য ও পশু মোট ১০টি শ্রেণীতে বিভক্ত:
- আল-মাইতাহ (الميتة): স্বাভাবিকভাবে বা রোগাক্রান্ত হয়ে মৃত প্রাণী।
- আদ-দাম (الدم): প্রবাহিত রক্ত।
- লাহমুল খিঞ্জীর (لحم الخنزير): শূকরের মাংস, চর্বি ও সমগ্র দেহ।
- মা উহিল্লা লিগাইরিল্লাহি বিহী: যা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও নামে উৎসর্গ বা জবাই করা হয়েছে।
- আল-মুনখানিক্বাহ (المنخنقة): গলায় ফাঁস লেগে বা শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যাওয়া প্রাণী।
- আল-মাওকূযাহ (الموقوذة): লাঠি বা পাথরের আঘাতে প্রহৃত হয়ে মৃত প্রাণী।
- আল-মুতারাদ্দিয়াহ (المتردية): পাহাড় বা উঁচু স্থান থেকে নিচে পড়ে মারা যাওয়া প্রাণী।
- আন-নাতীহাহ (النطيحة): অন্য পশুর গুঁতো খেয়ে মারা যাওয়া প্রাণী।
- মা আকালাস সাবু’উ: হিংস্র পশুর আক্রমণে ক্ষতবিক্ষত হয়ে মৃত প্রাণী (তবে জীবিত অবস্থায় পেয়ে শরয়ী নিয়মে জবাই করতে পারলে তা হালাল)।
- মা যুবিহা আলান নুসুব: মূর্তিপূজার বেদীতে উৎসর্গকৃত প্রাণী এবং ভাগ্য নির্ণায়ক তীরের মাধ্যমে বণ্টনকৃত মাংস।
٨- قال الله تعالى: ﴿إِنَّمَا التَّوْبَةُ عَلَى اللَّهِ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السُّوءَ بِجَهَالَةٍ ثُمَّ يَتُوبُونَ مِنْ قَرِيبٍ فَأُولَٰئِكَ يَتُوبُ اللَّهُ عَلَيْهِمْ وَكَانَ اللَّهُ عَلِيمًا حَكِيمًا ۞ وَلَيْسَتِ التَّوْبَةُ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السَّيِّئَاتِ حَتَّىٰ إِذَا حَضَرَ أَحَدَهُمُ الْمَوْتُ قَالَ إِنِّي تُبْتُ الْآنَ وَلَا الَّذِينَ يَمُوتُونَ وَهُمْ كُفَّارٌ أُولَٰئِكَ أَعْتَدْنَا لَهُمْ عَذَابًا أَلِيمًا﴾
[৮. আয়াতগুলোর তাফসির লিখে উহার সাথে সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর দাও]
(الف) تَحَدَّثْ عَنْ شُرُوطِ قَبُولِ التَّوْبَةِ مُوَضَّحًا-
[তওবা কবুল হওয়ার শর্তগুলো বিশদভাবে বর্ণনা কর।]
ইসলামি শরীয়তে তওবা হলো গুনাহ বর্জন করে খাঁটি মনে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা। তওবা কবুল হওয়ার জন্য ইমাম নববী (রহ.) ও মুফাসসিরগণ নিম্নোক্ত শর্তসমূহ নির্ধারণ করেছেন:
- গুনাহ সম্পূর্ণরূপে বর্জন করা: যে পাপে ব্যক্তি লিপ্ত ছিল তা অবিলম্বে সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করতে হবে।
- অতীতের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হওয়া (আন-নাদাম): মনের গভীর থেকে কৃত পাপের জন্য লজ্জিত ও ব্যথিত হতে হবে। হাদীসে এসেছে: “অনুতাপই হলো তওবা”।
- ভবিষ্যতে পুনরায় না জড়ানোর দৃঢ় সংকল্প: পুনরায় কোনোদিন এই গুনাহে লিপ্ত না হওয়ার জন্য খাঁটি নিয়ত করা।
- বান্দার হকের দায়মুক্তি: গুনাহটি যদি কোনো মানুষের অধিকার বা হকের সাথে সংশ্লিষ্ট হয় (যেমন আত্মসাৎকৃত অর্থ, গীবত ইত্যাদি), তবে তার ক্ষতিপূরণ দিয়ে অথবা তার কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে দায়মুক্ত হতে হবে।
- তওবার সময়সীমা পার না হওয়া: মৃত্যুর টান (গারগারা) ওঠার পূর্বেই এবং পশ্চিম আকাশে সূর্য উদিত হওয়ার পূর্বেই তওবা করতে হবে।
(ب) مَا مَعْنَى الْجَهَالَةِ؟
[আল-জাহালাহ কাকে বলে?]
জাহালাত (অজ্ঞতা)-এর ব্যাখ্যা: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) এবং তাবেয়ী মুজাহিদ ও কাতাদাহ (রহ.) বলেন—এখানে ‘জাহালাত’ বলতে কোনো বিষয়ের জ্ঞান না থাকা বোঝায় না; বরং যে ব্যক্তিই জেনে বা না জেনে আল্লাহর অবাধ্যতা ও পাপে লিপ্ত হয়, সে সেই মুহূর্তে নিজের নফস ও প্রবৃত্তির তাড়নায় এক প্রকার জাহালাত বা মূর্খতা প্রদর্শন করে। কারণ যে ব্যক্তি আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ও আখেরাতের শাস্তির কথা পূর্ণ চেতনায় স্মরণে রাখে, সে কখনোই গুনাহ করতে পারে না। অতএব, তওবা খাঁটি হলে আল্লাহ তা কবুল করেন।
٩- قال الله تعالى: ﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ لِلَّهِ شُهَدَاءَ بِالْقِسْطِ وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَىٰ أَلَّا تَعْدِلُوا اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَىٰ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ﴾
[৯. আয়াতগুলোর তাফসির লিখে উহার সাথে সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর দাও]
(الف) مَا مَعْنَى التَّقْوَى وَالْعَدْلِ؟ بَيِّنْ-
[আল-আদল ও আত-তাক্বওয়া এর অর্থ কী? বর্ণনা কর।]
- আল-আদল (العدل – ন্যায়পরায়ণতা):
- শাব্দিক অর্থ: ভারসাম্য স্থাপন করা, সোজা করা বা নিরপেক্ষ থাকা।
- পারিভাষিক অর্থ: অধিকারীকে তার প্রাপ্য অধিকার যথাযথভাবে প্রদান করা, কোনো পক্ষের প্রতি পক্ষপাতিত্ব বা বৈষম্য না করা এবং শত্রুর সাথেও ন্যায় ও সততার আচরণ বজায় রাখা।
- আত-তাক্বওয়া (التقوى – আল্লাহভীতি):
- শাব্দিক অর্থ: আত্মরক্ষা করা বা বেঁচে থাকা।
- পারিভাষিক অর্থ: আল্লাহর নির্দেশাবলী পালনের মাধ্যমে এবং তাঁর নিষেধাজ্ঞাগুলো কঠোরভাবে বর্জনের মাধ্যমে নিজেকে আল্লাহর অসন্তোষ ও জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করার নামই তাক্বওয়া। হযরত আলী (রা.) বলেন: “তাক্বওয়া হলো মহা পরাক্রমশালীকে ভয় করা, কুরআন অনুযায়ী আমল করা, অল্পে তুষ্ট থাকা এবং বিদায়ের দিনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা।”
(ب) مَا الْمُرَادُ بِقَوْلِهِ تَعَالَى: ﴿قَوَّامِينَ لِلَّهِ شُهَدَاءَ بِالْقِسْطِ﴾؟
[ক্বাওয়ামীনা লিল্লাহি শুহাদা-আ বিল ক্বিসতি এর উদ্দেশ্য কী?]
মর্মার্থ: এর উদ্দেশ্য হলো মুমিন বান্দারা ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সততা ও ন্যায়ের ওপর সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকবে। কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ, আত্মীয়তার টান বা লোভ-লালসার কারণে তারা সত্য সাক্ষ্য গোপন করবে না কিংবা মিথ্যা সাক্ষ্য দেবে না। এমনকি শত্রুভাবাপন্ন কোনো জাতির প্রতি ব্যক্তিগত বিদ্বেষ বা ক্ষোভও যেন তাদেরকে ন্যায়বিচার থেকে বিচ্যুত না করে। ন্যায়বিচার কায়েম করাই তাক্বওয়ার সর্বাধিক নিকটবর্তী পথ।
١٠- قال الله تعالى: ﴿وَإِذْ قَالَ مُوسَىٰ لِقَوْمِهِ يَا قَوْمِ اذْكُرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ جَعَلَ فِيكُمْ أَنْبِيَاءَ وَجَعَلَكُمْ مُلُوكًا وَآتَاكُمْ مَا لَمْ يُؤْتِ أَحَدًا مِنَ الْعَالَمِينَ﴾
[১০. আয়াতগুলোর তাফসির লিখে উহার সাথে সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর দাও]
(الف) আয়াত সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনা উল্লেখ কর:
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: হযরত মূসা (আ.) যখন বনি ইসরাঈলকে ফেরাউনের অত্যাচার ও লোহিত সাগরের নিমজ্জন থেকে রক্ষা করে নিরাপদে সিনাই উপত্যকায় নিয়ে আসেন, তখন আল্লাহ তা’আলা তাঁদের পবিত্র ভূমি ফিলিস্তিনে প্রবেশ করে সেখানকার জালেম ও পরাক্রমশালী আমালিক্বা জাতির বিরুদ্ধে জিহাদ করার নির্দেশ দেন। কিন্তু বনি ইসরাঈলরা ছিল দীর্ঘকালীন গোলামীর কারণে ভীতু ও অকৃতজ্ঞ। তারা জিহাদে যেতে অস্বীকার করতে শুরু করে। তখন হযরত মূসা (আ.) তাদেরকে আল্লাহর অতীত নিয়ামত ও অনুগ্রহের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে উজ্জীবিত করার জন্য এই হৃদয়স্পর্শী বক্তব্য প্রদান করেন।
(ب) مَا هِيَ النِّعْمَةُ الَّتِي أَعْطَى اللَّهُ بَنِي إِسْرَائِيلَ؟
[আল্লাহ বনি ইসরাঈলকে যে সকল নিয়ামত দিয়েছিলেন তা কী কী?]
আয়াতে বনি ইসরাঈলকে প্রদত্ত প্রধান প্রধান তিনটি বিশেষ নিয়ামতের উল্লেখ রয়েছে:
- অসংখ্য নবী ও রাসূল প্রেরণ (جَعَلَ فِيكُمْ أَنْبِيَاءَ): হযরত ইয়াকূব (আ.) থেকে শুরু করে হযরত ঈসা (আ.) পর্যন্ত বনি ইসরাঈলের বংশে কয়েক হাজার নবী ও রাসূল প্রেরণ করে তাদেরকে ধর্মীয় দিক থেকে সম্মানিত করা হয়েছিল।
- রাজত্ব ও স্বাধীনতা দান (وَجَعَلَكُمْ مُلُوكًا): মিশরে ফেরাউনের লাঞ্ছনাদায়ক দাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে তাদেরকে স্বাধীন নাগরিক এবং তাদের মাঝে বহু পরাক্রমশালী বাদশাহ (যেমন তালূত, দাউদ ও সুলাইমান আ.) সৃষ্টি করা হয়েছিল। কাতাদাহ (রহ.) বলেন, তাদের প্রত্যেকের জন্য খাদেম ও ঘরবাড়ি বরাদ্দ থাকার কারণে তাদের বাদশাহর সমমর্যাদা দেওয়া হয়েছিল।
- অতুলনীয় বিশেষ অনুগ্রহ (آتَاكُمْ مَا لَمْ يُؤْتِ أَحَدًا مِنَ الْعَالَمِينَ): তৎকালীন যুগে অন্য কোনো জাতিকে যা দেওয়া হয়নি—যেমন আকাশ থেকে মান্না ও সালওয়া অবতীর্ণ করা, মেঘমালার ছায়া দান, পাথরে লাঠির আঘাতে ১২টি ঝর্ণাধারা প্রবাহিত হওয়া ইত্যাদি অলৌকিক নিয়ামত তাদের দেওয়া হয়েছিল।
مجموعة (ب) – খ অংশ: সংক্ষিপ্ত তাত্ত্বিক প্রশ্নাবলি
١١- ما معنى التفسير بدون السند؟ ثم بين نشأته وتطوره مفصلا-
[১১. التفسير بدون السند এর অর্থ কী? উহার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ বর্ণনা কর।]
ক. আত-তাফসীর বিদূনিস সানাদ (التفسير بدون السند)-এর পরিচয়:
সংজ্ঞা: যে তাফসীর গ্রন্থে প্রতিটি আয়াতের ব্যাখ্যায় বর্ণনাকারীদের দীর্ঘ সনদের ধারাবাহিক শৃঙ্খল (سلسلة الرواة বা الاسناد) উল্লেখ না করে সরাসরি মূল ব্যাখ্যা ও বিশুদ্ধ বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়, তাকে আত-তাফসীর বিদূনিস সানাদ (সনদবিহীন তাফসীর) বলা হয়। এটি আধুনিক যুগের তাফসীর সাহিত্যের প্রধান ধারা।
খ. উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ:
- প্রাথমিক যুগ (সনদভিত্তিক ধারা): হিজরী প্রথম ও দ্বিতীয় শতকে তাফসীর ছিল হাদীসের একটি অংশ। ইমাম তাবারী (মৃ. ৩১০ হি.) এবং ইবনে আবি হাতিমের যুগে প্রতিটি রেওয়ায়েতের সাথে পূর্ণ সনদ উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক ছিল।
- মধ্যযুগ ও সনদের বিলুপ্তি পর্ব: চতুর্থ ও পঞ্চম হিজরী শতকের পর যখন সনদের বিশুদ্ধতা ও বর্ণনাকারীদের জীবনী হাদীস গ্রন্থে সংরক্ষিত হয়ে গেল, তখন সাধারণ পাঠকের সুবিধার্থে ও গ্রন্থের আকার সংক্ষেপ করার উদ্দেশ্যে মুফাসসিরগণ দীর্ঘ সনদ বাদ দিয়ে তাফসীর রচনা শুরু করেন। ইমাম ছা’লাবী, ইমাম বাগাভী এবং পরবর্তীতে আল্লামা ইবনে কাসীর ও ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী সংক্ষেপে তাফসীর সংকলন করেন।
- আধুনিক যুগ ও পূর্ণাঙ্গ রূপায়ন: আধুনিক যুগে সনদবিহীন তাফসীর চরম উৎকর্ষ লাভ করে। যেমন—ইমাম আলূসীর ‘রূহুল মা’আনী’, সাইয়্যিদ কুতুবের ‘ফী যিলালিল কুরআন’, আল্লামা তান্তাবী জাওহারীর ‘আল-জাওয়াহির’, এবং আল্লামা শাওকানীর ‘ফাতহুল ক্বাদীর’। বর্তমানে সাধারণ শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য সনদবিহীন তাফসীরই সর্বাধিক জনপ্রিয় ও সহজবোধ্য মাধ্যম।
١٢- بين سبب نزول سورة النساء مع ذكر وجه تسميتها-
[১২. সূরা নিসা’র নামকরণের কারণসহ শানে নুযূল বর্ণনা কর।]
ক. সূরা নিসার নামকরণের কারণ (وجه التسمية):
পবিত্র কুরআনের চতুর্থ সূরাটির নাম রাখা হয়েছে সূরা আন-নিসা (سورة النساء)। ‘নিসা’ শব্দের অর্থ নারী বা রমণী সমাজ। পবিত্র কুরআনে নারীদের অধিকার, বিবাহ, মোহরানা, তালাক, উত্তরাধিকার সম্পত্তি (মিরাছ), পারিবারিক মর্যাদা এবং বৈবাহিক পবিত্রতা নিয়ে এত বিশদ আলোচনা আর কোনো সূরায় করা হয়নি। নারীদের সামগ্রিক অধিকার সুরক্ষার স্মারক হিসেবে এই সূরার নামকরণ করা হয়েছে ‘সূরা আন-নিসা’।
খ. সূরা নিসার শানে নুযূল ও পটভূমি:
- উহুদ যুদ্ধের প্রেক্ষাপট: ৩য় হিজরীতে ঐতিহাসিক উহুদ যুদ্ধে ৭০ জন বিশিষ্ট মুসলিম সাহাবী শাহাদাত বরণ করেন। ফলে মদীনার বহু পরিবারে বিপুল সংখ্যক নারী বিধবা এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু এতিম হয়ে পড়ে। জাহেলী যুগে নারীদের ও এতিমদের সম্পত্তির কোনো অধিকার দেওয়া হতো না; বরং অভিভাবকরা এতিমদের ধনসম্পদ আত্মসাৎ করত।
- সামাজিক সংস্কার ও বিধান অবতীর্ণ: এই সংকটময় মুহূর্তে আল্লাহ তা’আলা সূরা নিসা নাযিল করে এতিমদের অধিকার সংরক্ষণ, তাদের সম্পদের আমানত রক্ষা, বিধবাদের পুনর্বাসনে এক সাথে চারজন পর্যন্ত বিয়ের শর্তযুক্ত অনুমতি এবং পিতা-মাতার রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে পুরুষের পাশাপাশি নারীদের সুনির্দিষ্ট উত্তরাধিকারের অংশ নিশ্চিত করেন। এই সূরা তৎকালীন বর্বর আরব সমাজে এক যুগান্তকারী সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপ্লব সাধন করে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. আত-তাফসীর বিদূনিস সানাদ অধ্যয়নের প্রধান সুবিধা কী?
সনদবিহীন তাফসীর অধ্যয়নের প্রধান সুবিধা হলো দীর্ঘ সনদের জটিলতা ছাড়াই সাধারণ পাঠক সরাসরি কুরআনের আয়াতের নির্ভরযোগ্য অর্থ, শিক্ষা ও বিধান দ্রুত হৃদয়ঙ্গম করতে পারে।
২. সূরা আল-ফাতিহায় ‘মালিক’ শব্দের দুটি ক্বিরাআতের অন্তর্নিহিত রহস্য কী?
একটি ক্বিরাআত হলো ‘মালিক’ (বাদশাহ) এবং অন্যটি হলো ‘মালিক’ (স্বত্বাধিকারী)। এর মাধ্যমে মহান আল্লাহ ক্বিয়ামতের দিন একই সাথে সর্বময় শাসক এবং সকল কিছুর একমাত্র মালিক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
৩. পবিত্র কুরআনে মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য কীভাবে তুলে ধরা হয়েছে?
কুরআনে মুনাফিকদের দ্বিমুখী চরিত্রের অধিকারী, মিথ্যাবাদী, ফাসাদ সৃষ্টিকারী এবং অন্তরে অহংকার ও ব্যাধিগ্রস্ত বলে চিহ্নিত করা হয়েছে, যারা মুখে ইসলাম প্রকাশ করে কিন্তু অন্তরে শত্রুতা পোষণ করে।
৪. ইসলামি আইনে নারীদের উত্তরাধিকার নিশ্চিত করার তাৎপর্য কী?
জাহেলী যুগে নারীদের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হতো। সূরা নিসার মাধ্যমে ইসলাম নারীদের স্বত্বাধিকারী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা ও পারিবারিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছে।
৫. বদর যুদ্ধে মুসলিমদের বিজয়ের প্রধান শিক্ষা কী?
বদর যুদ্ধের প্রধান শিক্ষা হলো সামরিক শক্তির প্রাচুর্য নয়, বরং আল্লাহর প্রতি অবিচল ঈমান, তাক্বওয়া এবং তাওহীদের ওপর দৃঢ়তাই বিজয়ের মূল চাবিকাঠি।
৬. তওবা কবুল হওয়ার জন্য প্রধান শর্তগুলো কী কী?
তওবা কবুল হওয়ার প্রধান শর্ত হলো তাৎক্ষণিকভাবে পাপ বর্জন করা, অতীত ভুলের জন্য লজ্জিত হওয়া, ভবিষ্যতে আর না জড়ানোর সংকল্প করা এবং মানুষের অধিকার নষ্ট করে থাকলে তা ফিরিয়ে দেওয়া।