اختبار السنة الرابعة للفاضل البكالوريوس (الشرف) ، لعام ۲۰۲۲
[ফাজিল স্নাতক (সম্মান) চতুর্থ বর্ষ পরীক্ষা, ২০২২]
الدعوة والدراسات الإسلامية
[দা’ওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
التصوف
[আত-তাসাউফ]
বিষয় কোড: ২০৩৮০৫ | পরীক্ষা কোড: ২০৪ | প্রশ্নপত্র কোড: ১৩৩
সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০
مجموعة (الف) – ক-বিভাগ (রচনামূলক প্রশ্নাবলি)
١- عرف التصوف ثم بين موضوعه ومشروعيته وحاجته-
[১. তাসাউফের পরিচয় দাও। অতঃপর এর আলোচ্য বিষয়, শরঈ বৈধতা ও প্রয়োজনীয়তা বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
ইসলামী জীবনব্যবস্থায় জাহেরি আমল ও আনুষ্ঠানিক ইবাদতের পাশাপাশি কলবের পরিশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ সাধন অপরিহার্য। ইসলামী পরিভাষায় আত্মশুদ্ধি, বিনয়, ইখলাস এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এই শাস্ত্রকে ‘তাসাউফ’ বা ‘ইহসান’ বলা হয়।
التصوف (তাসাউফ)-এর সংজ্ঞা ও উৎপত্তি
শাব্দিক অর্থ: ‘তাসাউফ’ শব্দের ব্যুৎপত্তি নিয়ে একাধিক অভিমত রয়েছে—
- ‘সুফ’ (الصوف) শব্দ থেকে উদ্ভুত, যার অর্থ পশম। প্রাচীন যুগের জাহিদ ও আল্লাহপ্রেমিকগণ বিনয় ও ত্যাগের প্রতীক হিসেবে মোটা পশমী পোশাক পরিধান করতেন। (ইমাম ইবনে খালদুনের অভিমত)।
- ‘সুফফাহ’ (الصفة) থেকে, অর্থাৎ মসজিদে নববীর আহলে সুফফাহর পবিত্র আসহাবদের জীবনধারার অনুসারী হওয়া।
- ‘সাফা’ (الصفاء) থেকে, যার অর্থ অন্তর নির্মল, স্বচ্ছ ও কলুষমুক্ত করা।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: শায়খুল ইসলাম জাকারিয়া আল-আনসারী (রহ.) বলেন—
“التصوف علم تعرف به أحوال تزكية النفوس، وتصفية الأخلاق، وتعمير الظاهر والباطن لنيل السعادة الأبدية”
(“তাসাউফ এমন এক শাস্ত্র যার মাধ্যমে অন্তরের পরিশুদ্ধি, চারিত্রিক মাধুর্য অর্জন এবং চিরন্তন মুক্তিলাভের উদ্দেশ্যে জাহের ও বাতিনকে আবাদ করার পন্থা জানা যায়।”)
তাসাউফের আলোচ্য বিষয় (موضوع علم التصوف)
তাসাউফ শাস্ত্রের মূল আলোচ্য বিষয় হলো ‘মানবিক আত্মা ও অন্তর’ (النفس والقلب)। কীভাবে কলবকে কুপ্রবৃত্তি, হিংসা, রিয়া, অহংকার থেকে মুক্ত করে আল্লাহপ্রেম, তাওয়াক্কুল, শোকর, সবর ও ইখলাসের গুণে বিভূষিত করা যায়—এটাই এ শাস্ত্রের মূল উদ্দেশ্য।
তাসাউফের শরঈ বৈধতা (مشروعيته)
কুরআন ও সুন্নাহর অকাট্য দলিলে তাসাউফ বা তাজকিয়াতুন নফস সুস্পষ্টভাবে সমর্থিত:
- কুরআনের দলিল: আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন: “নিশ্চয় সে সফলকাম হয়েছে যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করেছে, আর সে ব্যর্থ হয়েছে যে নিজেকে কলুষিত করেছে।” (সূরা আশ-শামস: ৯-১০)। অন্যত্র রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রেরণের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন: “তিনি তাদের নিকট আল্লাহর আয়াত তিলাওয়াত করেন এবং তাদের পরিশুদ্ধ করেন (ইউযাক্কীহিম)।” (সূরা আল-জুমুআ: ২)।
- হাদিসের দলিল: সুবিখ্যাত ‘হাদিসে জিবরীল’-এ রাসূলুল্লাহ (সা.) দ্বীনের তিনটি মৌলিক স্তম্ভের মধ্যে তৃতীয়টি হিসেবে ‘ইহসান’-কে উল্লেখ করে বলেন: “ইহসান হলো তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে যেন তুমি তাঁকে দেখছ, আর যদি তুমি তাঁকে দেখতে না পাও তবে বিশ্বাস রাখবে তিনি নিশ্চয় তোমাকে দেখছেন।” (সহিহ বুখারী ও মুসলিম)। এই ইহসানের বাস্তব রূপই হলো তাসাউফ।
মানবজীবনে তাসাউফের প্রয়োজনীয়তা (الحاجة إليه)
- আমলের প্রাণ সঞ্চার: ইখলাস ও একাগ্রতা ব্যতীত কোনো ইবাদত কবুল হয় না। তাসাউফ বাহ্যিক আমলকে প্রাণবন্ত করে।
- আত্মিক ব্যাধি নিরাময়: অহংকার, গীবত, লোভ, হিংসার মতো গোপন পাপ যা মানুষের নেক আমল ধ্বংস করে দেয়, তা থেকে মুক্তির জন্য তাসাউফের পথনির্দেশ জরুরি।
- চরিত্রের পূর্ণতা: উত্তম চরিত্র মানবজীবনের ভূষণ। তাসাউফের মাধ্যমেই নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ সাধিত হয়।
٢- ما علم اليقين وعين اليقين وحق اليقين؟ بين مفصلا-
[২. ইলমুল ইয়াকীন, আইনুল ইয়াকীন ও হাক্কুল ইয়াকীন কী? বিস্তারিত বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
ইসলামী বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক উপলব্ধির সর্বোচ্চ স্তর হলো ‘ইয়াকীন’ বা সুদৃঢ় প্রত্যয়। সুফিয়া ও ইসলামী দার্শনিকগণ ইয়াকীনকে তিনটি প্রধান স্তরে বিন্যস্ত করেছেন, যা পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে।
১. ইলমুল ইয়াকীন (علم اليقين) – জ্ঞানের স্তর
সংজ্ঞা: কোনো বস্তু বা সত্য সম্পর্কে সুস্পষ্ট প্রমাণ, যুক্তি, সংবাদ ও দলীলের ভিত্তিতে যে দৃঢ় জ্ঞান ও প্রত্যয় সৃষ্টি হয়, তাকে ইলমুল ইয়াকীন বলে।
দৃষ্টান্ত: দূর থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখে নিশ্চিত জ্ঞান লাভ করা যে সেখানে নিশ্চয় আগুন আছে। অথবা কুরআন ও হাদিসের নির্ভরযোগ্য বর্ণনার ভিত্তিতে নিশ্চিত বিশ্বাস স্থাপন করা যে জান্নাত ও জাহান্নাম সত্য।
কুরআনের দলিল: আল্লাহ তা’আলা বলেন: “কখনো না, যদি তোমরা ‘ইলমুল ইয়াকীন’ (নিশ্চিত জ্ঞান) দ্বারা জানতে!” (সূরা আত-তাকাসুর: ৫)।
২. আইনুল ইয়াকীন (عين اليقين) – দর্শনের স্তর
সংজ্ঞা: কোনো বাস্তবতাকে সরাসরি নিজ চোখে প্রত্যক্ষ করে বা চাক্ষুষ সাক্ষীর মাধ্যমে যে দ্বিধাহীন প্রত্যয় অর্জিত হয়, তাকে আইনুল ইয়াকীন বলে।
দৃষ্টান্ত: ধোঁয়ার উৎসের কাছে গিয়ে সরাসরি লেলিহান অগ্নিশিখা নিজ চোখে প্রত্যক্ষ করা। অথবা কিয়ামতের দিন স্বচক্ষে জাহান্নাম প্রত্যক্ষ করা।
কুরআনের দলিল: আল্লাহ তা’আলা বলেন: “অতঃপর তোমরা অবশ্যই তা ‘আইনুল ইয়াকীন’ (চাক্ষুষ প্রত্যয়)-এর সাথে দেখবে।” (সূরা আত-তাকাসুর: ৭)।
৩. হাক্কুল ইয়াকীন (حق اليقين) – অনুভূতির স্তর
সংজ্ঞা: কোনো বাস্তবতার সাথে প্রত্যক্ষভাবে একীভূত হয়ে, স্পর্শ করে বা স্বাদে-অনুভবে উপলব্ধি করার মাধ্যমে অর্জিত চরম ও চূড়ান্ত প্রত্যয়কে হাক্কুল ইয়াকীন বলে।
দৃষ্টান্ত: আগুনে হাত দিয়ে বা তাতে প্রবেশ করে আগুনের উত্তাপ ও দহন নিজে তীব্রভাবে অনুভব করা। অথবা জান্নাতে প্রবেশ করে জান্নাতের নেয়ামত নিজে ভোগ করা।
কুরআনের দলিল: আল্লাহ তা’আলা বলেন: “নিশ্চয় এটিই সুনিশ্চিত সত্য – ‘হাক্কুল ইয়াকীন’।” (সূরা আল-ওয়াকিয়াহ: ৯৫; সূরা আল-হাক্কাহ: ৫১)।
তাসাউফের দৃষ্টিকোণ থেকে তাৎপর্য
সাধারণ বিশ্বাসী ব্যক্তি ইলমুল ইয়াকীনের স্তরে থাকে, মুকাশাফার অধিকারী সালেক আইনুল ইয়াকীনের স্তরে উন্নীত হয় এবং ওলী ও আরিফ বিল্লাহগণ আল্লাহর মারিফাতের ক্ষেত্রে হাক্কুল ইয়াকীনের পরম স্তরে পৌঁছান।
٣- اذكر أهمية الاستغفار والشكر والامانة في الحياة الانسانية مفصلا-
[৩. মানবজীবনে ইস্তিগফার, শোকর ও আমানতের গুরুত্ব বিস্তারিত উল্লেখ কর।]
ভূমিকা
মানবজীবনকে সুশৃঙ্খল, পুণ্যময় ও বরকতময় করার জন্য ইসলামী জীবনবিধানে আত্মশুদ্ধির মৌলিক গুণাবলি হিসেবে ইস্তিগফার, শোকর ও আমানতদারির ওপর সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
১. ইস্তিগফারের গুরুত্ব (أهمية الاستغفار)
- পাপ মোচন ও রহমত লাভ: মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। ইস্তিগফার হলো আত্মিক ধৌতকরণ। আল্লাহ বলেন: “তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, নিশ্চয় তিনি অতিশয় ক্ষমাশীল।” (সূরা নূহ: ১০)।
- জীবিকা ও সম্পদে বরকত: ইস্তিগফারের মাধ্যমে আসমান থেকে বৃষ্টি বর্ষিত হয় এবং ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে প্রাচুর্য আসে (সূরা নূহ: ১১-১২)।
- বিপদ-আপদ থেকে নিরাপত্তা: হাদীস শরিফে এসেছে: “যে ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তিগফার করবে, আল্লাহ তার সকল সংকট থেকে মুক্তির পথ করে দেবেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেবেন যা সে কল্পনাও করতে পারেনি।” (আবু দাউদ)।
২. শোকর বা কৃতজ্ঞতার গুরুত্ব (أهمية الشكر)
- নেয়ামত বৃদ্ধির কারণ: আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করলে নেয়ামত বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। ইরশাদ হয়েছে: “যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করো, তবে অবশ্যই আমি তোমাদের জন্য নেয়ামত বাড়িয়ে দেব।” (সূরা ইবরাহীম: ৭)।
- আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আযাব থেকে মুক্তি: অকৃতজ্ঞতা কুফরির নামান্তর, আর শোকর হলো বান্দার প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টির সর্বোত্তম উপায়। আল্লাহ বলেন: “তোমরা যদি শোকর করো এবং ঈমান আনো, তবে আল্লাহ তোমাদের শাস্তি দিয়ে কী করবেন?” (সূরা আন-নিসা: ১৪৭)।
- আত্মিক প্রশান্তি: শোকরগুজার বান্দা সর্বদা অল্পে তুষ্ট (ক্বানাআত) থাকে, ফলে লোভ ও মানসিক অশান্তি থেকে মুক্ত থাকে।
৩. আমানতের গুরুত্ব (أهمية الأمانة)
- ঈমানের মাপকাঠি: আমানতদারিতা মুমিনের ভূষণ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “যার আমানতদারিতা নেই, তার ঈমান নেই।” (মুসনাদে আহমাদ)।
- সামাজিক শান্তি ও ইনসাফ: আমানত কেবল ধন-সম্পদের হেফাযত নয়; রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব, চাকরি, মানুষের গোপনীয়তা রক্ষা এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সঠিক ব্যবহার সবই আমানতের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তা’আলা নির্দেশ দেন: “নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন আমানতসমূহ তার প্রাপকদের কাছে পৌঁছে দিতে।” (সূরা আন-নিসা: ৫৮)।
- খেয়ানতের পরিণতি: আমানতে খেয়ানত করা মুনাফিকের অন্যতম প্রধান লক্ষণ। খেয়ানতের কারণে সমাজে বিশৃঙ্খলা ও অনাচার সৃষ্টি হয়।
٤- تحدث عن ضرر الكذب والكبر والحسد بالايضاح مع الادلة-
[৪. মিথ্যা, অহংকার ও হিংসার ক্ষতিকর প্রভাব দলিলসহ বিশদ আলোচনা কর।]
ভূমিকা
মানবচরিত্রকে ধ্বংসকারী মারাত্মক আত্মিক ব্যাধিগুলোর মধ্যে মিথ্যা, অহংকার ও হিংসা অন্যতম। এগুলোকে তাসাউফের পরিভাষায় ‘মুহলিকাত’ (ধ্বংসকারী চরিত্র) বলা হয়, যা একজন মানুষের সমস্ত নেক আমল জ্বালিয়ে ছারখার করে দেয়।
১. মিথ্যার ক্ষতিকর প্রভাব (ضرر الكذب)
- সকল পাপের মূল ও পঙ্কিলতার পথ: রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: “তোমরা মিথ্যা থেকে বেঁচে থাকো, কেননা মিথ্যা পাপের পথে পরিচালিত করে, আর পাপ জাহান্নামে নিয়ে যায়।” (সহিহ বুখারী ও মুসলিম)।
- মুনাফিকির আলামত: হাদিসে বলা হয়েছে: “মুনাফিকের নিদর্শন তিনটি: যখন কথা বলে মিথ্যা বলে…” (সহিহ বুখারী)।
- আল্লাহর লানত ও বরকতহীনতা: পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: “মিথ্যুকদের ওপর আল্লাহর লানত।” (সূরা আলে ইমরান: ৬১)। মিথ্যাবাদী মানুষের আস্থা হারায় এবং সমাজে ফিতনা সৃষ্টি করে।
২. অহংকারের ক্ষতিকর প্রভাব (ضرر الكبر)
- জান্নাত থেকে বঞ্চিত হওয়া: রাসূলুল্লাহ (সা.) কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন: “যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণও অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।” (সহিহ মুসলিম)।
- অহংকারের সংজ্ঞা ও স্বরূপ: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: “অহংকার হলো সত্যকে অস্বীকার করা এবং মানুষকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা।” (সহিহ মুসলিম)।
- ইবলিসের পতনের কারণ: শয়তানের প্রথম পাপ ছিল অহংকার। সে বলেছিল, “আমি তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ।” ফলে সে চিরতরে অভিশপ্ত ও বিতাড়িত হয়। কিয়ামতের দিন অহংকারীদের পিপীলিকার ন্যায় ক্ষুদ্রাকার করে হাশরের মাঠে লাঞ্ছিত করা হবে।
৩. হিংসার ক্ষতিকর প্রভাব (ضرر الحسد)
- নেক আমল ভস্মীভূত হওয়া: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “তোমরা হিংসা থেকে বেঁচে থাকো, কেননা হিংসা নেক আমলসমূহকে এমনভাবে খেয়ে ফেলে (ধ্বংস করে) যেভাবে আগুন কাঠকে ভস্ম করে দেয়।” (আবু দাউদ)।
- আল্লাহর ফায়সালার প্রতি অসন্তোষ: আল্লাহ কাকে কী নেয়ামত দান করবেন তা তাঁর একান্ত ইচ্ছা। হিংসুক মূলত আল্লাহর বণ্টনের ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে আপত্তি জানায়।
- আত্মিক যন্ত্রণা ও সামাজিক দ্বন্দ্ব: হিংসুক অন্যের ভালো দেখে সর্বদা অন্তর্জ্বালায় ভোগে এবং পারস্পরিক ঘৃণা ও শত্রুতা ছড়ায়।
٥- بين ترجمة خواجه معين الدين الجشتى رحمة الله عليه وخدماته فى شبه القارة الهندية-
[৫. খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী এবং ভারতীয় উপমহাদেশে তাঁর অবদান আলোচনা কর।]
ভূমিকা
সুলতানুল হিন্দ, গরীব নেওয়াজ হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী সানজারি আল-আজমিরী (রহ.) ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের দাওয়াত ও তাসাউফের সর্বশ্রেষ্ঠ পুরোধা ব্যক্তিত্ব। তাঁর অতুলনীয় চারিত্রিক সৌন্দর্য ও আধ্যাত্মিক পরশে কোটি কোটি মানুষ শিরকের অন্ধকার থেকে তাওহিদের আলো লাভ করে।
সংক্ষিপ্ত জীবনী
জন্ম ও বংশ: তিনি ১১৪২ খ্রিষ্টাব্দে (৫৩৬ হিজরি) পারস্যের সিজিস্তানের (সানজার) এক সম্ভ্রান্ত সাইয়্যিদ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পিতৃকুল থেকে ইমাম হাসান (রা.) এবং মাতৃকুল থেকে ইমাম হুসাইন (রা.)-এর বংশধর।
শিক্ষা ও খেলাফত লাভ: বাল্যকালে পিতা-মাতা ইন্তেকাল করলে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে তিনি ইলম অন্বেষণে বোখারা ও সমরকন্দে গমন করেন। পরবর্তীতে নিশাপুরের হারুনে গিয়ে বিখ্যাত চিশতিয়া তরিকতের পীর হযরত খাজা উসমান হারুনী (রহ.)-এর সান্নিধ্যে দীর্ঘ ২০ বছর সাধনা করে খেলাফত লাভ করেন।
ভারতে আগমন: মদিনা শরীফে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর রূহানী ইশারায় তিনি ৫৬৫ হিজরিতে ভারতে আগমন করেন এবং রাজস্থানের আজমিরে তাঁর স্থায়ী খানকাহ ও দাওয়াহ মারকাজ স্থাপন করেন।
ওফাত: তিনি ১২৩৬ খ্রিষ্টাব্দে (৬৩৩ হিজরি, ৬ রজব) আজমিরে ইন্তেকাল করেন। সেখানে তাঁর সুপরিচিত দরগাহ শরীফ অবস্থিত।
উপমহাদেশে তাঁর ঐতিহাসিক অবদানসমূহ (خدماته في شبه القارة)
- লাখো মানুষের ইসলাম গ্রহণ: তৎকালীন চরম বর্ণপ্রথায় নিষ্পেষিত নিম্নবর্ণের ভারতীয়রা তাঁর মানবিক ভালোবাসা, দরবার ও লঙ্গরখানার উন্মুক্ততা দেখে অভিভূত হয়। ঐতিহাসিকদের মতে, প্রায় ৯০ লাখ অমুসলিম তাঁর হাতে ইসলাম গ্রহণ করে।
- চিশতিয়া তরীকার প্রতিষ্ঠা ও প্রসার: তিনি উপমহাদেশে চিশতিয়া তরিকাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন। খাজা কুতবুদ্দীন বখতিয়ার কাকী, বাবা ফরিদ গঞ্জে শাকার ও হযরত নিজামুদ্দীন আউলিয়া প্রমুখ মহান খলিফাদের মাধ্যমে এ তরীকা এশিয়াজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
- লঙ্গরখানা ও মানবসেবা: তাঁর খানকাহতে ধনী-গরিব নির্বিশেষে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষকে বিনামূল্যে অন্নদান করা হতো, যে কারণে তিনি ‘গরীব নেওয়াজ’ (দরিদ্রদের বন্ধু) উপাধিতে ভূষিত হন।
- ধর্মীয় সহনশীলতা ও সাম্য: তিনি জাত-পাত ও সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের প্রতি নিখাদ ভালোবাসার শিক্ষা দেন। তাঁর বিখ্যাত উক্তি: “সূর্যের মতো করুণাময়, নদীর মতো দানশীল এবং মাটির মতো বিনম্র হও।”
٦- اكتب نبذة عن حياة الشيخ أحمد السرهندي ثم بين تضحياته لنشر الدين الصحيح أيام المملكة المغولية في الهند مفصلا-
[৬. শায়খ আহমদ সিরহিন্দী (মুজাদ্দিদে আলফে সানী রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী লেখ, অতঃপর ভারতে মুঘল আমলে সহীহ দ্বীন প্রতিষ্ঠায় তাঁর আত্মত্যাগ বিস্তারিত বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
দশম হিজরি শতকের ক্রান্তিলগ্নে যখন মুঘল সম্রাট আকবরের ধর্মীয় গোঁড়ামি ও মনগড়া ‘দ্বীন-ই-ইলাহী’র কারণে ইসলাম অবলুপ্তির মুখে পড়েছিল, তখন এক যুগান্তকারী ব্যক্তিত্ব ইসলামের বিশুদ্ধ সুন্নাহর পুনরুজ্জীবন ঘটান। তিনি হলেন হযরত ইমামে রাব্বানী শায়খ আহমদ ফারুকী সিরহিন্দী (রহ.), যিনি ‘মুজাদ্দিদে আলফে সানী’ (দ্বিতীয় সহস্রাব্দের সংস্কারক) নামে সুপরিচিত।
সংক্ষিপ্ত জীবনী
জন্ম: তিনি ১৫৬৪ খ্রিষ্টাব্দে (৯৭১ হিজরি) ভারতের পাঞ্জাবের সিরহিন্দে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি হযরত উমর ফারুক (রা.)-এর বংশধর।
শিক্ষা ও বায়াত: নিজ পিতা শায়খ আব্দুল আহাদ এবং সমকালীন শীর্ষ আলেমদের থেকে কুরআন, হাদিস ও দর্শন শিক্ষা লাভ করেন। পরবর্তীতে দিল্লিতে এসে নকশবন্দিয়া তরীকার মহান সাধক হযরত খাজা বাকি বিল্লাহ (রহ.)-এর কাছে বায়াত গ্রহণ করেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই তরীকার শীর্ষ খেলাফত অর্জন করেন।
ওফাত: তিনি ১৬২৪ খ্রিষ্টাব্দে (১০৩৪ হিজরি) সিরহিন্দেই ইন্তেকাল করেন।
মুঘল আমলে সহীহ দ্বীন প্রতিষ্ঠায় তাঁর আত্মত্যাগ ও অবদান (تضحياته في نشر الدين الصحيح)
- ‘দ্বীন-ই-ইলাহী’র বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ প্রতিরোধ: সম্রাট আকবর সকল ধর্মের মিশ্রণে এক কৃত্রিম ধর্ম প্রবর্তন করে দরবারে সিজদা বাধ্যতামূলক করেছিল, গরুর গোশত নিষিদ্ধ করেছিল এবং নবীপ্রেমের স্থলে নিজের আনুগত্য চালু করেছিল। মুজাদ্দিদে আলফে সানী এর বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রাম শুরু করেন।
- দরবারীদের প্রতি ঐতিহাসিক পত্রাবলি (মাকতূবাতে ইমামে রাব্বানী): তিনি মুঘল সেনাপতি ও প্রভাবশালী মন্ত্রীদের (যেমন খান-ই-খানান, সৈয়দ সদর জাহান) কাছে শত শত চিঠি লিখে তাঁদের ঈমানী চেতনা জাগ্রত করেন এবং আকবরের ইসলামবিরোধী নীতির মুখোশ উন্মোচন করেন।
- গোয়ালিয়র দুর্গে বন্দিত্ব বরণ: সম্রাট জাহাঙ্গীরের দরবারে উপস্থিত হয়ে তিনি সম্রাটকে সিজদা করতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে ক্ষুব্ধ জাহাঙ্গীর তাঁকে গোয়ালিয়র দুর্গে দুই বছরের অধিক সময় বন্দি রাখে। সেখানেও তিনি বহু অমুসলিম কয়েদিকে ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আনেন।
- জাহাঙ্গীরের তাওবা ও সংস্কার: তাঁর আধ্যাত্মিক দৃঢ়তায় মুগ্ধ হয়ে জাহাঙ্গীর নিজের ভুল বুঝতে পেরে তাঁকে সসম্মানে মুক্তি দেয়, ইসলামবিরোধী আইনগুলো বাতিল করে এবং নিজের সেনাবাহিনীর সাথে তাঁর উপদেশ গ্রহণের ব্যবস্থা করে।
- ‘ওয়াহদাতুল ওজুদ’-এর বিপরীতে ‘ওয়াহদাতুশ শুহুদ’: দার্শনিক ভ্রান্তি দূর করে তিনি প্রমাণ করেন যে, স্রষ্টা ও সৃষ্টি কখনোই এক হতে পারে না। ফলে তথাকথিত ভণ্ড সূফীদের বিভ্রান্তি দূরীভূত হয়।
٧- ما الولاية؟ اذكر شروطها ومراتبها مفصلا-
[৭. বিলায়াত কী? এর শর্তাবলি ও স্তরসমূহ বিস্তারিত উল্লেখ কর।]
ভূমিকা
তাসাউফের অন্যতম মৌলিক পরিভাষা হলো ‘বিলায়াত’ (الولاية)। এটি আল্লাহর নৈকট্য, ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের এমন এক সর্বোচ্চ স্তর, যা বান্দা গভীর ঈমান, তাকওয়া এবং আনুগত্যের মাধ্যমে অর্জন করে থাকে।
الولاية (বিলায়াত)-এর সংজ্ঞা
শাব্দিক অর্থ: ‘কুরব’ বা নৈকট্য, ভালোবাসা, অভিভাবকত্ব ও বন্ধুত্ব।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: শরীয়তের পরিভাষায় আল্লাহর প্রতি অগাধ ঈমান ও পরিপূর্ণ তাকওয়ার অধিকারী হয়ে যে ব্যক্তি আল্লাহর বিশেষ নৈকট্যপ্রাপ্ত ও প্রিয় বান্দায় পরিণত হয়, তাকে ‘ওয়ালীউল্লাহ’ এবং তাঁর এই মর্যাদাপূর্ণ অবস্থাকে ‘বিলায়াত’ বলা হয়।
আল্লাহ তা’আলা স্বয়ং ওয়ালীদের পরিচয় দিয়ে কুরআনে ঘোষণা করেন:
“أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ – الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ”
(“মনে রেখো, নিশ্চয় আল্লাহর বন্ধুদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না। তারা হলো সেসব লোক যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করে চলেছে।”) (সূরা ইউনুস: ৬২-৬৩)।
বিলায়াত অর্জনের মৌলিক শর্তাবলি (شروط الولاية)
- সহীহ আকিদা ও খাঁটি ঈমান: কোনো ব্যক্তি শিরক, কুফর বা বিদয়াতে লিপ্ত থেকে ওলী হতে পারে না। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের আকিদায় অটল থাকা প্রথম শর্ত।
- তাকওয়া ও মুত্তাকী জীবন: সমস্ত প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য কবিরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা এবং আল্লাহর ভয়ে জীবন পরিচালনা করা।
- সুন্নাহর পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ (إتباع السنة): শরীয়ত ও সুন্নাহর ওপর অবিচল থাকা। বায়েজিদ বোস্তামী (রহ.) বলেন: “যদি কোনো ব্যক্তিকে বাতাসে উড়তে বা পানির ওপর দিয়ে হাঁটতেও দেখো, কিন্তু সুন্নাহ বিরোধী কাজে লিপ্ত পাও, তবে জেনে রাখবে সে ধোঁকাবাজ।”
- ফরজ ও নফল ইবাদতের পাবন্দী: হাদিসে কুদসীতে আল্লাহ বলেন: “বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার এত নৈকট্য লাভ করে যে, আমি তাকে ভালোবাসতে শুরু করি…” (সহিহ বুখারী)।
- দুনিয়াত্যাগ ও আত্মশুদ্ধি: অন্তরে দুনিয়ার লোভ ও লালসা বর্জন করে ইখলাসের সাথে সর্বদা আল্লাহর জিকিরে মগ্ন থাকা।
বিলায়াতের স্তরসমূহ (مراتب الولاية)
- সাধারণ বিলায়াত (الولاية العامة): সকল মুমিনের জন্য প্রযোজ্য। আল্লাহ বলেন: “আল্লাহ মুমিনদের অভিভাবক।” (সূরা আল-বাকারাহ: ২৫৭)।
- বিশেষ বিলায়াত (الولاية الخاصة): এটি মুকাররাবীন ও সুফি-সাধকদের স্তর। সুফি পরিভাষায় এই আউলিয়াদের সাংগঠনিক স্তর নিম্নরূপ:
- গাউস বা কুতুবুল আকতাব (الغوث/القطب): যুগের আধ্যাত্মিক পরিচালনার সর্বোচ্চ শীর্ষ ব্যক্তিত্ব।
- আওতাদ (الأوتاد): চারজন মহান সাধক, যারা পৃথিবীর চারদিকের আধ্যাত্মিক স্তম্ভতুল্য।
- আবদাল (الأبدال): চল্লিশজন সম্মানিত ওলী, যাঁদের ওসীলায় আল্লাহ সৃষ্টিকুলকে বিপদ থেকে রক্ষা করেন ও বৃষ্টি দেন।
- নুজাবা ও নুক্বাবা (النجباء والنقباء): সৎচরিত্রের অধিকারী ও মানবজাতির অন্তরের অবস্থা জ্ঞাতকারী সাধকবৃন্দ।
٨- بين وظائف الطريقة القادرية والجشتية والمجددية-
[৮. কাদরিয়া, চিশতিয়া ও মুজাদ্দিদিয়া তরিকার মূল ওযীফাসমূহ (আমলসমূহ) বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
ইসলামের ইতিহাসে তাসাউফ চর্চার ক্ষেত্রে চারটি প্রধান তরীকত বিশেষ প্রসিদ্ধি লাভ করেছে: কাদেরিয়া, চিশতিয়া, নকশবন্দিয়া-মুজাদ্দিদিয়া এবং সোহরাওয়ার্দিয়া। প্রত্যেক তরীকার নিজস্ব জিকির ও সাধনার পদ্ধতি (ওযীফা) রয়েছে।
১. ক্বাদেরিয়া তরীকার ওযীফা ও আমল (وظائف الطريقة القادرية)
প্রতিষ্ঠাতা: হযরত বড়পীর আবদুল কাদের জিলানী (রহ.)।
- জিকরে জলী ও খফী: এই তরিকায় উচ্চৈঃস্বরে এবং অনুচ্চস্বরে উভয়ভাবেই জিকির করা হয়। কালিমা তাইয়্যেবা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর নফী-ইসবাতে জিকির বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়।
- আসমায়ে হুসনা ও দরূদ শরিফ: প্রত্যহ ফজরের পর নির্দিষ্ট সংখ্যায় ‘ইয়া বাসেতু’, ‘ইয়া ওয়াদুদু’ এবং সায়্যিদুল ইস্তিগফার পাঠ। বিশেষত ‘দরূদে গাউসিয়া’ পাঠ করা হয়।
- মুরাকাবা ও সুলূক: অন্তরে আল্লাহর জালালিয়াত ও মহত্ত্বের ধ্যান করা।
২. চিশতিয়া তরীকার ওযীফা ও আমল (وظائف الطريقة الجشتية)
প্রতিষ্ঠাতা: হযরত খাজা আবু ইসহাক শামী (রহ.) এবং উপমহাদেশে প্রসারক খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী (রহ.)।
- জিকরে জলী ও জারব: এই তরিকায় অন্তরকে জাগ্রত করতে সবলে জিকির করার (জারব) বিশেষ নিয়ম রয়েছে—যেমন: চার জারবি জিকির (মাথার ডানে, বামে, সামনের দিকে এবং কলবে আঘাত করে)।
- পাস-আনফাস (দম নিয়ন্ত্রণ): নিঃশ্বাস নেওয়ার সময় ‘লা ইলাহা’ এবং নিঃশ্বাস ছাড়ার সময় ‘ইল্লাল্লাহ’ খেয়াল রাখা।
- সামা বা আধ্যাত্মিক কাওয়ালী: শরীয়তসম্মত সীমারেখা ও বাদ্যযন্ত্রহীন আধ্যাত্মিক ভাবোদ্দীপক কবিতার মাধ্যমে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ভালোবাসা তীব্র করা।
- চিল্লা ও আত্মত্যাগ: দীর্ঘ সময় নির্জনে আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন থাকা ও অনাহারে থেকে নফসকে বশীভূত করা।
৩. মুজাদ্দিদিয়া (নকশবন্দিয়া) তরীকার ওযীফা (وظائف الطريقة المجددية)
প্রতিষ্ঠাতা: ইমামে রাব্বানী মুজাদ্দিদে আলফে সানী শায়খ আহমদ সিরহিন্দী (রহ.)।
- একান্তভাবে জিকরে খফী (নীরব জিকির): এতে কোনো শব্দ বা অঙ্গভঙ্গি ছাড়াই কেবল জিহ্বা তালুর সাথে লাগিয়ে অন্তরে ‘আল্লাহু-আল্লাহু’ জিকির করা হয়।
- লতীফা সাধনা (সাধনার ৬টি কেন্দ্র): মানবদেহের ছয়টি সূক্ষ্ম আত্মিক কেন্দ্রকে সচল করা—১. কলব (হৃদয়), ২. রূহ (প্রাণ), ৩. সিরর (রহস্য), ৪. খফী (গোপন), ৫. আখফা (অতি গোপন) এবং ৬. নফস।
- সুন্নাহর কঠোর অনুসরণ: মুজাদ্দিদিয়া তরিকায় কোনো বেদয়াত বা বাদ্যযন্ত্রের অনুমোদন নেই। এতে ইলম শিক্ষা এবং সম্পূর্ণ সুন্নাহ মোতাবেক আমলকে সর্বোত্তম ওযীফা হিসেবে গণ্য করা হয়।
- রাবেতায়ে শায়খ: পীরের সুরত ও আধ্যাত্মিক সান্নিধ্য অন্তরে কল্পনা করে আল্লাহর ফয়েজ হাসিল করা।
مجموعة (ب) – খ-বিভাগ (সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি)
٩- ما المراقبة؟ بين-
[৯. মুরাকাবা কী? বর্ণনা কর।]
উত্তর: ‘মুরাকাবা’ (المراقبة) শব্দের আভিধানিক অর্থ নিরীক্ষণ করা, ধ্যানমগ্ন হওয়া বা সতর্কতার সাথে দৃষ্টি রাখা। তাসাউফের পরিভাষায়, বান্দা তার সমস্ত ইন্দ্রিয় বাহ্যিক জগৎ থেকে গুটিয়ে এনে দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে অন্তরে এই খেয়াল রাখা যে—“আল্লাহ তা’আলা সর্বদা আমাকে দেখছেন, আমার অন্তরের সমস্ত গোপন চিন্তা ও অবস্থা তিনি পরিপূর্ণ অবগত।”
পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: “নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারীকারী।” (সূরা আন-নিসা: ১)। মুরাকাবার মাধ্যমে অন্তরে খোদাভীতি ও একাগ্রতা সৃষ্টি হয় এবং গুনাহের প্রবণতা চিরতরে বিনষ্ট হয়।
١٠- بين شروط الشيخ الكامل-
[১০. শায়েখে কামেল (পীর)-এর শর্তাবলি বর্ণনা কর।]
উত্তর: আধ্যাত্মিক জগতে সঠিক পথপ্রদর্শনের জন্য একজন যোগ্য ও কামেল পীরের অধীন হওয়া অত্যন্ত জরুরি। আল্লামা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) ও প্রখ্যাত সুফিগণের মতে শায়েখে কামেলের মৌলিক শর্তসমূহ নিম্নরূপ:
- শরীয়তের প্রয়োজনীয় বিষয়ে গভীর জ্ঞান (ইলম) থাকা।
- আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের আকিদায় অবিচল থাকা।
- কবিরা গুনাহ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত এবং সুন্নাহর একনিষ্ঠ অনুসারী হওয়া।
- কোনো হক্কানী ও কামেল শায়খের সান্নিধ্যে দীর্ঘকাল থেকে আত্মশুদ্ধি অর্জনপূর্বক সনদ ও খেলাফতপ্রাপ্ত হওয়া।
- দুনিয়ামুখী লোভ-লালসা ও খ্যাতি থেকে মুক্ত হয়ে পরকালমুখী ও মুখলিস হওয়া।
- তাঁর সান্নিধ্যে বসলে দুনিয়ার মোহ হ্রাস পায় এবং আল্লাহর ভয় ও ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়।
١١- اذكر اهمية التوبة-
[১১. তাওবার গুরুত্ব উল্লেখ কর।]
উত্তর: ‘তাওবা’ শব্দের অর্থ প্রত্যাবর্তন করা। শরীয়তের পরিভাষায় অতীত কৃত পাপের জন্য অনুতপ্ত হয়ে অবিলম্বে তা ত্যাগ করা এবং ভবিষ্যতে আর কখনো না করার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে আসাকে তাওবা বলে।
তাওবার গুরুত্ব:
- তাওবা সকল মুমিনের জন্য ওয়াজিব। আল্লাহ বলেন: “হে ঈমানদারগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে তাওবা করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।” (সূরা আন-নূর: ৩১)।
- রাসূলুল্লাহ (সা.) নিষ্পাপ হওয়া সত্ত্বেও প্রত্যহ ৭০ থেকে ১০০ বার তাওবা ও ইস্তিগফার করতেন।
- হাদীসে এসেছে: “গুনাহ থেকে তাওবাকারী ব্যক্তি এমন নিষ্পাপ হয়ে যায় যেন সে কখনো গুনাহই করেনি।” (ইবনে মাজাহ)।
١٢- عرف الشريعة-
[১২. শরীয়তের পরিচয় দাও।]
উত্তর: ‘শরীয়ত’ (الشريعة) শব্দের আভিধানিক অর্থ স্পষ্ট ও উন্মুক্ত পথ, অথবা এমন জলাশয় যেখান থেকে তৃষ্ণার্তরা পানি পান করে।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: আল্লাহ তা’আলা তাঁর বান্দাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় জীবন সুন্দর ও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার জন্য নবী করীম (সা.)-এর মাধ্যমে যে পূর্ণাঙ্গ ও ঐশী আইন ও বিধিবিধান নাজিল করেছেন, তাকে শরীয়ত বলে। শরীয়তের মূল উৎস চারটি: কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াস। শরীয়ত হলো দ্বীনের বাহ্যিক কাঠামো ও ভিত্তি, যার ওপর তাসাউফ ও মারেফতের ইমারত নির্মিত।
١٣- ما النفس؟ بين-
[১৩. নফস কী? ব্যাখ্যা কর।]
উত্তর: ‘নফস’ (النفس) অর্থ আত্মা, প্রবৃত্তি বা ব্যক্তি সত্তা। তাসাউফের পরিভাষায় নফস হলো মানুষের ভেতরের সেই কামনা-বাসনা ও কুপ্রবৃত্তি যা মানুষকে গুনাহ ও পার্থিব মোহের দিকে আহ্বান করে।
কুরআন মজিদে নফসের তিনটি প্রধান স্তরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে:
- নফসে আম্মারা (النفس الأمارة): যে প্রবৃত্তি মানুষকে মন্দ কাজের দিকে তীব্রভাবে প্ররোচিত করে। (সূরা ইউসুফ: ৫৩)।
- নফসে লাউওয়ামা (النفس اللوامة): অনুতপ্ত আত্মা, যা কোনো পাপ সংঘটিত হলে নিজেকে ধিক্কার দেয় এবং তাওবা করে। (সূরা আল-কিয়ামাহ: ২)।
- নফসে মুতমায়িন্না (النفس المطمئنة): শান্ত ও প্রশান্ত আত্মা, যা সর্বাবস্থায় আল্লাহর সন্তুষ্টিতে তৃপ্ত ও স্থির থাকে। (সূরা আল-ফজর: ২৭)।
١٤- اكتب أسماء عشرة مؤلفات لأحمد رضا خان البريلوي رحمة الله عليه-
[১৪. আহমদ রেজা খান বেরলভী (রহ.)-এর দশটি কিতাবের নাম লেখ।]
উত্তর: ইমামে আহলে সুন্নাত মাওলানা আহমদ রেজা খান বেরলভী (১৮৫৬-১৯২১ খ্রি.) ছিলেন ভারতের বেরলভী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ও বহু গ্রন্থপ্রণেতা। তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য ১০টি কিতাবের নাম নিম্নরূপ:
- আল-আতায়া আন-নাবাবিয়্যাহ ফিল ফাতাওয়া আর-রিদভিয়্যাহ (العطايا النبوية في الفتاوى الرضوية – সংক্ষেপে ‘ফাতাওয়া-ই রিদভিয়া’, ৩০ খণ্ডে)।
- কানযুল ঈমান ফি তারজামাতিল কুরআন (কুরআনের উর্দু অনুবাদ)।
- হাদ্দায়েকে বাখশিশ (হাদায়েকে বখশিশ – নাত ও কাব্য সংকলন)।
- আদ-দাওলাতুল মাক্কিয়্যাহ বিল মাদ্দাতিল গায়বিয়্যাহ (ইলমে গায়েব সংক্রান্ত)।
- হুসসামুল হারামাইন আলা মানহারিল কুফরি ওয়াল মাইন (ঐতিহাসিক ফতোয়া গ্রন্থ)।
- আল-মুনতামিদ আল-মুস্তাকাদ (আকিদা সংক্রান্ত গ্রন্থ)।
- কালিমাতুল ইলিয়া বি ইহসায়িল হায়াতিল মিলিয়্যাহ।
- সুদুল মুখতার আলা দুররিল মুখতার (ফিকহ সংক্রান্ত টীকা)।
- তাজাল্লিয়াতুর রহমান ফি ফাজায়িলে রমাদান।
- আল-আমনু ওয়াল উলা লি নাতিল মুস্তফা বিদাফয়িল বালা।
١٥- اكتب حياة الشاه ولي الله الدهلوى رحمة الله عليه مختصرا-
[১৫. শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী লেখ।]
উত্তর: কুতুবুদ্দীন আহমদ শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী (১৭০৩-১৭৬২ খ্রি.) ছিলেন অষ্টাদশ শতাব্দীর ভারতীয় উপমহাদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ মুজাদ্দিদ, মুহাদ্দিস ও দার্শনিক।
- জন্ম: তিনি ১৭০৩ খ্রিষ্টাব্দে দিল্লির পুলতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন ‘ফাতাওয়া-ই আলমগীরী’ সংকলন বোর্ডের অন্যতম সদস্য শাহ আব্দুর রহীম দেহলভী।
- শিক্ষা: পিতার প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসায়ে রহীমিয়াতে শিক্ষা সমাপ্ত করে তিনি হারামাইন শরিফাইনে দীর্ঘকাল শায়খ আবু তাহের মাদানী (রহ.)-এর কাছে হাদিসের উচ্চতর শিক্ষা লাভ করেন।
- ঐতিহাসিক অবদান: তিনি উপমহাদেশে সাধারণ মানুষের বোধগম্যতার জন্য সর্বপ্রথম ফারসি ভাষায় কুরআনের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ ‘ফাতহুর রহমান ফি তারজামাতিল কুরআন’ সম্পন্ন করেন। তাছাড়া হাদিস ও ইসলামী দর্শনের অবিসংবাদিত মাস্টারপিস ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ’ এবং উসূলে তাফসিরের মূল আকর গ্রন্থ ‘আল-ফাওযুল কাবীর’ রচনা করেন।
- রাজনৈতিক ভূমিকা: পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে (১৭৬১) আহমদ শাহ আবদালীকে আমন্ত্রণ জানিয়ে মারাঠাদের বর্বর আধিপত্য থেকে ভারতীয় মুসলিমদের রক্ষা করেন।
١٦- ما الغيبة؟ وما ضررها؟ بين-
[১৬. গীবত কী? এর ক্ষতিসমূহ কী কী? বর্ণনা কর।]
উত্তর: ‘গীবত’ (الغيبة) অর্থ পরনিন্দা বা অসাক্ষাতে দোষ চর্চা করা। রাসূলুল্লাহ (সা.) গীবতের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন: “তোমার ভাইয়ের এমন কোনো বিষয় তার অনুপস্থিতিতে আলোচনা করা যা সে অপছন্দ করে।” সাহাবীগণ বললেন, যদি সে দোষটি সত্যিই তার মধ্যে থাকে? রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: “যা বলছ তা যদি তার মধ্যে থাকে তবেই তা গীবত হলো, আর যদি তা না থাকে তবে তা তো অপবাদ (বুহতান) হলো।” (সহিহ মুসলিম)।
গীবতের ক্ষতিকর প্রভাবসমূহ:
- মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সমতুল্য: আল্লাহ তা’আলা কুরআনে গীবতকে নিজের মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার মতো জঘন্য কাজের সাথে তুলনা করেছেন (সূরা আল-হুজুরাত: ১২)।
- কবরে কঠিন শাস্তি: হাদিস শরিফে এসেছে, কবরের অন্যতম সাধারণ আজাব গীবত ও চোগলখোরির কারণে হয়ে থাকে।
- নেক আমল স্থানান্তরিত হওয়া: কিয়ামতের দিন গীবতকারীর নেক আমল যার গীবত করা হয়েছে তাকে দিয়ে দেওয়া হবে, এবং তার গুনাহ গীবতকারীর ঘাড়ে চাপিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
- সামাজিক অশান্তি: গীবতের ফলে পারস্পরিক বিশ্বাস, ভ্রাতৃত্ববোধ ও সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্ট হয়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. তাসাউফ ও সুফিবাদের মূল ভিত্তি কী?
তাসাউফের মূল ভিত্তি হলো কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে মন ও আত্মার পরিশুদ্ধি অর্জন এবং হাদিসে জিবরীলে বর্ণিত ‘ইহসান’-এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন।
২. ‘ইয়াকীন’ কত প্রকার ও কী কী?
ইয়াকীন বা সুনিশ্চিত প্রত্যয় তিন প্রকার: ১. ইলমুল ইয়াকীন (জ্ঞানলব্ধ প্রত্যয়), ২. আইনুল ইয়াকীন (চাক্ষুষ দর্শনলব্ধ প্রত্যয়) এবং ৩. হাক্কুল ইয়াকীন (স্বাদ ও অনুভূতির মাধ্যমে চরম প্রত্যয়)।
৩. খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী (রহ.)-কে ‘গরীব নেওয়াজ’ বলা হয় কেন?
তাঁর খানকাহতে দল-মত নির্বিশেষে সকল অভাবী ও দরিদ্র মানুষকে সর্বদা খাবার, আশ্রয় ও ভালোবাসা প্রদান করার কারণে তিনি ‘গরীব নেওয়াজ’ (দরিদ্রের বন্ধু) উপাধিতে খ্যাত হন।
৪. মুজাদ্দিদে আলফে সানী (রহ.) কোন মুঘল সম্রাটের ভ্রান্ত ধর্মমত প্রতিহত করেন?
তিনি মুঘল সম্রাট আকবরের উদ্ভাবিত মনগড়া ও ইসলামবিরোধী ‘দ্বীন-ই-ইলাহী’ এবং তাঁর দরবারের ইসলামবিরোধী অপতৎপরতা রুখে দেন।
৫. ইসলামে গীবতের শাস্তি কেমন?
পবিত্র কুরআনে গীবতকে নিজের মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সমতুল্য ঘৃণ্য পাপ বলা হয়েছে এবং হাদিস অনুযায়ী এটি কবরের মারাত্মক আজাবের কারণ।
৬. ওয়ালী হওয়ার প্রধান দুটি গুণ কী?
পবিত্র কুরআনের সূরা ইউনুসের ৬৩ নম্বর আয়াত অনুযায়ী আল্লাহর ওয়ালী বা বন্ধু হওয়ার প্রধান দুটি গুণ হলো খাঁটি ‘ঈমান’ এবং অবিচল ‘তাকওয়া’।