পরীক্ষা কোড: 204 | প্রশ্নপত্র কোড: 173
اختبار السنة الرابعة للفاضل (البكالوريوس) الشرف، لعام ٢٠٢١
[ফাজিল (স্নাতক) সম্মান চতুর্থ বর্ষ পরীক্ষা, ২০২১]
الدعوة والدراسات الإسلامية
[দা’ওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
دراسة تفسير القرآن الكريم
[দিরাসাতু তাফসীরুল কুরআনিল কারীম]
বিষয় কোড: 203409
الوقت: ٤ ساعات [সময়: ৪ ঘণ্টা] | الدرجات الكاملة: ٨٠ [পূর্ণমান: ৮০]
الملاحظة : أجب عن خمسة من مجموعة (الف) وعن واحد من مجموعة (ب)
[দ্রষ্টব্য : (الف) অংশ থেকে পাঁচটি এবং (ب) অংশ থেকে একটি প্রশ্নের উত্তর দাও।]
مجموعة (الف) [বিভাগ ‘ক’ – আয়াতসমূহের তরজমা, তাফসির ও সংশ্লিষ্ট প্রশ্নাবলী]
মান: ১৪ × ৫ = ৭০
١- الحمد لله ربّ العالمين- الرحمن الرحيم- مالك يوم الدين- اياك نعبد واياك نستعين- اهدنا الصراط المستقيم-
[১. সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। যিনি পরম দয়ালু, অসীম দাতা। বিচার দিবসের মালিক। আমরা কেবল আপনারই ইবাদত করি এবং কেবল আপনারই নিকট সাহায্য প্রার্থনা করি। আমাদেরকে সরল-সঠিক পথ প্রদর্শন করুন।]
আয়াতসমূহের বিশ্লেষণমূলক তাফসির
পবিত্র কুরআনের সর্বপ্রথম সূরা ‘সূরা আল-ফাতিহা’ হলো উম্মুল কুরআন বা কুরআনের সারসংক্ষেপ।
- الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ: আলহামদু শব্দের শুরুতে ‘আলিফ-লাম’ জাতিবাচক ও সার্বিকতা প্রকাশক। অর্থাৎ সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকে অনন্তকাল পর্যন্ত যত প্রশংসা উচ্চারিত হয়েছে বা হবে, তার একমাত্র অধিকারী মহাবিশ্বের একক স্রষ্টা ও পালনকর্তা আল্লাহ। ‘রব’ অর্থ যিনি কোনো সৃষ্টিকে অভাব পূরণ করে ক্রমবিকাশের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গতায় পৌঁছে দেন।
- الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ: পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু। রাহমান হলেন দুনিয়াতে কাফির-মুমিন নির্বিশেষে সবার প্রতি দয়াবান; আর রাহীম হলেন পরকালে বিশেষ করে ঈমানদার বান্দাদের প্রতি অফুরন্ত করুণাশীল।
- مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ: কিয়ামত দিবসের একমাত্র সার্বভৌম কর্তৃত্ব ও মালিকানা আল্লাহর। সেদিন পার্থিব বাদশাহদের বাহ্যিক ক্ষমতাও সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়ে যাবে।
- إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ: এটি তাওহিদের প্রাণ। ইবাদত ও সাহায্য কামনায় একত্ববাদ। আরবি ব্যাকরণে মাফউলকে (ইম্যাক) পূর্বে এনে সীমাবদ্ধতা (হসর) সৃষ্টি করা হয়েছে; অর্থাৎ আমরা অন্য কারও নয়, কেবলই আপনার বন্দেগী করি এবং জাগতিক ও পারলৌকিক সকল সাহায্যে কেবল আপনারই মুখাপেক্ষী।
- اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ: আল্লাহ অভিমুখী হওয়ার একমাত্র নির্ভুল সরল পথ—যাতে কোনো বক্রতা বা চরমপন্থা নেই।
(أ) هل التسمية آية من الفاتحة؟ اذكر أقوال العلماء فيه-
[(ক) ‘তাসমিয়া’ (বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম) কি সূরা ফাতিহার অংশ বা আয়াত? এ ব্যাপারে আলেমদের মতামত উল্লেখ কর।]
উত্তর: বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম সূরা ফাতিহার অন্তর্ভুক্ত পৃথক একটি আয়াত কি না—এ নিয়ে আইম্মা-ই-কেরামের মধ্যে তিনটি বিখ্যাত অভিমত রয়েছে:
- শাফেয়ী মাযহাবের মত: বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম সূরা ফাতিহার প্রথম আয়াত এবং এটি সূরা ফাতিহার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই তাঁদের মতে নামাজে উচ্চস্বরে বা নীরবে বিসমিল্লাহ পাঠ করা ফরজ; অন্যথায় ফাতিহা অসম্পূর্ণ থাকবে।
দলীল: সুনানে দারাকুতনী ও বায়হাকীতে বর্ণিত হযরত আবু হুরায়রা (রা.)-এর হাদিস: “তোমরা যখন আলহামদু পাঠ করবে, তখন বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম পড়বে, কারণ এটি উম্মুল কুরআন এবং বিসমিল্লাহ তার সাতটি আয়াতের একটি।” - হানাফি মাযহাবের মত: বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম পবিত্র কুরআনেরই একটি সম্মানিত আয়াত, যা দুই সূরার মাঝে বরকত ও পার্থক্যের জন্য অবতীর্ণ হয়েছে; তবে এটি সূরা ফাতিহা বা অন্য কোনো সূরার নিজস্ব অংশ নয়। তাই নামাজে প্রত্যেক রাকাআতে বিসমিল্লাহ পাঠ করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ এবং তা নিঃশব্দে পাঠ করতে হয়।
দলীল: সহিহ মুসলিমের হাদিসে নবীজি, আবু বকর ও উমর (রা.) নামাজ শুরু করতেন সরাসরি ‘আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন’ দিয়ে। - মালিকি মাযহাবের মত: ফরজ নামাজে জামায়াতের সাথে বিসমিল্লাহ পড়া মাকরূহ; কেবল নফল নামাজে পড়া জায়েজ।
(ب) ما الفرق بين الحمد والشكر؟ بين كما فسر الزمخشري-
[(খ) ‘আল-হামদ’ এবং ‘আশ-শুকর’-এর মধ্যে পার্থক্য কী? ইমাম যামাখশারী যেভাবে তাফসির করেছেন তা বর্ণনা কর।]
উত্তর: বিখ্যাত মুফাসসির আল্লামা আবুল কাসেম যামাখশারী তাঁর কালজয়ী তাফসির ‘আল-কাশশাফ’-এ আল-হামদ ও আশ-শুকরের ভাষাতাত্ত্বিক ও অর্থগত পার্থক্য অত্যন্ত প্রাঞ্জলভাবে তুলে ধরেছেন:
- বিষয়বস্তু ও পরিধির দিক থেকে: ‘হামদ’ (الحمد) অর্থ কোনো মহান সত্তার অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য, পূর্ণতা ও গুণের কারণে অন্তরের ভক্তিভরে প্রশংসা করা। অনুগ্রহ পাওয়া যাক বা না যাক—সর্বাবস্থায় আল্লাহর প্রশংসা করা হামদ। অপরপক্ষে ‘শুকর’ (الشكر) কেবল তখনই করা হয়, যখন কারও কাছ থেকে কোনো প্রত্যক্ষ অনুগ্রহ, দয়া বা নিয়ামত লাভ করা হয়। সুতরাং নিয়ামতের পূর্বে শুকর হয় না, কিন্তু হামদ সর্বাবস্থায় প্রযোজ্য। এদিক থেকে হামদের পরিধি শুকরের চেয়ে ব্যাপক।
- প্রকাশের মাধ্যমের দিক থেকে: হামদ কেবল মুখ বা জবানের দ্বারাই উচ্চারিত হয় (ثناء باللسان)। কিন্তু শুকর মুখ, অন্তর এবং শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমলের মাধ্যমেও প্রকাশ পায় (যেমন নামাজ পড়ে শুকরিয়া আদায় করা)। কুরআনে বলা হয়েছে: “اعْمَلُوا آلَ دَاوُودَ شُكْرًا” (হে দাউদ পরিবার! তোমরা কাজের মাধ্যমে শুকরিয়া আদায় কর)। এদিক থেকে শুকরের মাধ্যম হামদের চেয়ে ব্যাপক।
٢- الـم- ذالك الكتاب لا ريب فيه- هدى للمتقين- الذين يؤمنون بالغيب ويقيمون الصلوة ومما رزقناهم ينفقون- والذين يؤمنون بما أنزل إليك وما أنزل من قبلك وبالآخرة هم يوقنون- أولئك على هدى من ربهم وأولئك هم المفلحون-
[২. আলিফ-লাম-মীম। এ সেই কিতাব, যাতে কোনো সন্দেহ নেই; খোদাভীরুদের জন্য পথপ্রদর্শক। যারা অদৃশ্যে বিশ্বাস স্থাপন করে, নামাজ কায়েম করে এবং আমি যে রিজিক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে। এবং যারা বিশ্বাস স্থাপন করে যা আপনার প্রতি নাযিল করা হয়েছে এবং যা আপনার পূর্বে নাযিল করা হয়েছিল, আর পরকালের প্রতি তারা অটল বিশ্বাস রাখে। এরাই তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে সঠিক পথের ওপর রয়েছে এবং এরাই সফলকাম।]
আয়াতসমূহের সংক্ষিপ্ত তাফসির
পবিত্র কুরআনের দ্বিতীয় সূরা বাকারার সূচনায় আল্লাহ মানবজাতিকে জানিয়ে দিচ্ছেন যে, কুরআন এমন এক ঐশী গ্রন্থ যাতে কোনো ভ্রান্তি, বৈপরীত্য বা সংশয়ের অবকাশ নেই। এতে মুত্তাকীদের পাঁচটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হয়েছে: (১) গায়েবের প্রতি অটল ঈমান, (২) নামাজ কায়েম করা, (৩) আল্লাহর পথে ধন-সম্পদ ব্যয় করা, (৪) পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল আসমানি কিতাবে বিশ্বাস, এবং (৫) আখেরাতের প্রতি নিশ্চিত প্রত্যয় পোষণ। যারা এই গুণাবলী অর্জন করবে তারাই দুনিয়া ও আখেরাতে চূড়ান্ত সফলতা লাভ করবে।
(أ) ما معنى التقوى؟ بين مراتبه وفائدته-
[(ক) তাকওয়ার অর্থ কী? এর স্তরসমূহ ও উপকারিতা বর্ণনা কর।]
উত্তর:
তাকওয়ার অর্থ: তাকওয়া শব্দটি আরবি وقاية (প্রতিরক্ষা ঢাল) থেকে নির্গত। এর অর্থ বেঁচে থাকা, সতর্ক থাকা, আত্মরক্ষা করা। শরীয়তের পরিভাষায়—আল্লাহর ভয়ে তাঁর সমস্ত নির্দেশ পালন করা এবং তাঁর যাবতীয় নিষেধ ও সন্দেহযুক্ত বিষয় থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখাকে তাকওয়া বলে।
তাকওয়ার স্তরসমূহ (مراتب التقوى): ইমাম বায়যাবী ও জমহুর মুফাসসিরগণের মতে তাকওয়ার তিনটি প্রধান স্তর রয়েছে:
- প্রথম স্তর (عامة المؤمنين): শিরক ও কুফর থেকে বেঁচে থেকে তাওহিদের ওপর অবিচল থাকার মাধ্যমে চিরস্থায়ী জাহান্নাম থেকে আত্মরক্ষা করা।
- দ্বিতীয় স্তর (أهل الصلاح): কবিরা গুনাহ পরিত্যাগ করা, সগিরা গুনাহ পরিহার করা এবং শরীয়তের ফরজ-ওয়াজিবসমূহ যথাযথ পালন করা। এটিই সাধারণ শরয়ী তাকওয়া।
- তৃতীয় স্তর (أهل الحقيقة والخواص): অন্তর থেকে আল্লাহ ছাড়া অন্য সমস্ত কিছুর মোহ দূর করে প্রতিটি পদক্ষেপে একমাত্র আল্লাহর রেজামন্দিতে আত্মনিয়োগ করা।
তাকওয়ার উপকারিতা: তাকওয়ার মাধ্যমে মানুষ হকের দিশা পায় (ফুরকান), গুনাহ মাফ হয়, বরকতময় রিজিক অর্জিত হয় এবং আল্লাহর দরবারে শ্রেষ্ঠ মর্যাদা লাভ করা যায় (সূরা আল-হুজুরাত: ১৩)।
(ب) لم خصصت الهداية بالمتقين؟ وقد أتى في قوله تعالى: هدى للناس- وضح في ضوء تفسير البيضاوى-
[(খ) কুরআনকে কেন কেবল ‘মুত্তাকীদের জন্য হেদায়েত’ বলা হলো? অথচ কুরআনের অন্যত্র বলা হয়েছে ‘কুরআন সমগ্র মানবজাতির জন্য হেদায়েত’—তাফসিরে বায়যাবীর আলোকে ব্যাখ্যা কর।]
উত্তর:
ইমাম কাজী নাসিরুদ্দীন আল-বায়যাবী (রহ.) তাঁর তাফসির ‘আনওয়ারুত তানযীল ওয়া আসরারুত তা’বীল’-এ এই আপাত বৈপরীত্যের চমৎকার ও গভীর সমাধান দিয়েছেন:
- হেদায়েতের দুটি ভিন্ন অর্থ:
- ১. পথপ্রদর্শন বা সত্যের সুস্পষ্ট উপস্থাপন (الدلالة والإرشاد): এই অর্থে কুরআন সমগ্র মানবজাতির জন্য হেদায়েত (هُدًى لِّلنَّاسِ)। অর্থাৎ কুরআন সমস্ত কাফির, মুশরিক, মুমিন নির্বিশেষে সবার সামনে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য উন্মুক্ত করে প্রদর্শন করেছে।
- ২. বাস্তবে হেদায়েত গ্রহণ ও সফলতায় পৌঁছানো (الإيصال إلى البغية والتوفيق): এই হেদায়েত কেবল তাদের জন্যই কার্যকর হয়, যাদের অন্তরে তাকওয়া, খোদাভীতি ও সত্য গ্রহণের আন্তরিক মানসিকতা রয়েছে।
- মুত্তাকীদের বিশেষায়ন করার কারণ: যদিও সূর্যের আলো সবার জন্য উন্মুক্ত, কিন্তু যে ব্যক্তি চোখ বন্ধ করে রাখে সে আলো থেকে বঞ্চিত হয়। অনুরূপভাবে কুরআন সমগ্র মানবতার পথপ্রদর্শক হলেও কাফির ও অহংকারীরা এর হেদায়েত প্রত্যাখ্যান করে; কেবল মুত্তাকীগণই কুরআনের হেদায়েত দ্বারা বাস্তবিক উপকৃত হয়। তাই হেদায়েত ফলপ্রসূ হওয়ার বিবেচনায় এখানে একে ‘হুদাল লিল মুত্তাকীন’ বলে বিশেষায়িত করা হয়েছে।
٣- ومن الناس من يقول امنا بالله وباليوم الآخر وما هم بمؤمنين- يخادعون الله والذين آمنوا وما يخدعون إلا أنفسهم وما يشعرون- في قلوبهم مرض فزادهم الله مرضا ولهم عذاب اليم بما كانوا يكذبون-
[৩. আর মানুষের মধ্যে কিছু এমন লোক রয়েছে যারা বলে, আমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান এনেছি, অথচ তারা আদৌ মুমিন নয়। তারা আল্লাহ ও ঈমানদারদের ধোঁকা দিতে চায়, অথচ এতে তারা নিজেদের ছাড়া অন্য কাউকে ধোঁকা দিচ্ছে না, কিন্তু তারা তা উপলব্ধি করতে পারছে না। তাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে, অতঃপর আল্লাহ তাদের সেই ব্যাধি আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন; আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি, কারণ তারা মিথ্যা বলত।]
আয়াতসমূহের তাফসির
সূরা আল-বাকারার শুরুতে মানবজাতিকে তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়েছে: প্রথম চার আয়াতে খাঁটি মুমিনদের আলোচনা, পরবর্তী দুই আয়াতে প্রকাশ্য কাফিরদের আলোচনা, এবং অতঃপর ১৩টি আয়াতে মুনাফিকদের কপট চরিত্রের বিস্তৃত স্বরূপ উন্মোচন করা হয়েছে। মদিনায় যখন ইসলাম বিজয়ী শক্তিতে রূপ নিল, তখন একদল স্বার্থান্বেষী লোক মুখে ইসলামের দাবি করত আর অন্তরে কুফর গোপন রাখত। আল্লাহ তাদের মিথ্যাচার ও আত্মপ্রবঞ্চনার মুখোশ উন্মোচন করেছেন।
(أ) عرف النفاق ثم بين صفات المنافقين في ضوء الكتاب والسنة-
[(ক) নিফাকের পরিচয় দাও। অতঃপর কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্যসমূহ বর্ণনা কর।]
উত্তর:
নিফাকের পরিচয়: নিফাক শব্দটি আরবি نفق (নাফাক্বা—সুড়ঙ্গ পথ) থেকে নির্গত। যার একদিকে প্রবেশ ও অন্যদিকে বের হওয়ার পথ থাকে। শরীয়তের পরিভাষায়—মুখে ঈমান ও আনুগত্য প্রকাশ করা এবং অন্তরে কুফর, শিরক ও বিদ্বেষ গোপন রাখাকে নিফাক বলে।
কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে মুনাফিকদের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:
- কথায় কথায় মিথ্যা বলা (الكذب): প্রকাশ্যে ঈমানের মিথ্যা শপথ করা।
- ওয়াদা ভঙ্গ করা ও আমানতে খিয়ানত: সহিহ হাদিসে এসেছে: “মুনাফিকের আলামত তিনটি: কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে ভঙ্গ করে এবং আমানত রাখলে খিয়ানত করে।” (সহিহ বুখারি)
- দ্বিমুখী নীতি অবলম্বন: মুমিনদের সাথে মিলিত হলে বলে আমরা তোমাদের সাথে আছি, আর নিজেদের শয়তানদের সাথে নিভৃতে গেলে বলে আমরা তো তাদের সাথে উপহাস করছিলাম (সূরা বাকারা: ১৪)।
- নামাজে অলসতা ও লোকদেখানো ভাব: “তারা যখন নামাজে দাঁড়ায় তখন অলসভাবে দাঁড়ায়, কেবল লোক দেখানোর জন্য…” (সূরা আন-নিসা: ১৪২)।
- জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে অবস্থান: পরকালে কাফিরদের চেয়েও মুনাফিকদের শাস্তি কঠিন হবে: “إِنَّ الْمُنَافِقِينَ فِي الدَّرْكِ الْأَسْفَلِ مِنَ النَّارِ” (সূরা আন-নিসা: ১৪৫)।
(ب) ما المراد بقوله تعالى – “في قلوبهم مرض”؟ وكيف يزاد؟ بين
[(খ) “তাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে”—আল্লাহর এই বাণীর উদ্দেশ্য কী? এবং কীভাবে তা বৃদ্ধি পায়? বর্ণনা কর।]
উত্তর:
অন্তরের ব্যাধির অর্থ: মুফাসসিরগণের মতে এখানে ‘মরয’ (مرض) বা রোগ বলতে শারীরিক রোগ নয়; বরং অন্তরের আত্মিক ও নৈতিক ব্যাধিকে বোঝানো হয়েছে। যথা: সংশয় (شک), নিফাক (نفاق), হিংসা (حسد), ইসলামের বিজয়ে অন্তর্জ্বালা এবং সত্য প্রত্যাখ্যানের অন্ধ অহংকার।
ব্যাধি কীভাবে বৃদ্ধি পায় (وكيف يزاد):
- ঐশী স্বাভাবিক নিয়ম: মানুষ যখন কোনো অন্যায়ের ওপর অবিচল থাকে, তখন আল্লাহ তার অন্তরে সেই পাপের অন্ধকার আরও ঘনীভূত করে দেন।
- কুরআনের নতুন নতুন আয়াত অবতীর্ণ হওয়া: প্রতিবার যখন ইসলামের কোনো নতুন হুকুম নাযিল হতো বা ইসলামের নতুন কোনো বিজয় আসত, তখন ঈমানদারদের ঈমান বাড়ত, আর মুনাফিকদের অন্তরের হিংসা ও বিদ্বেষের রোগ দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেত (সূরা আত-তাওবাহ: ১২৫)।
٤- اقرأ كتابك كفى بنفسك اليوم عليك حسيبا- من اهتدى فإنما يهتدى لنفسه ومن ضل فإنما يضل عليها ولا تزر وازرة وزر اخرى وما كنا معذبين حتى نبعث رسولا-
[৪. পাঠ করো তোমার আমলনামা! আজ তোমার হিসাব গ্রহণের জন্য তুমি নিজেই যথেষ্ট। যে ব্যক্তি সৎপথ অবলম্বন করে সে নিজের মঙ্গলের জন্যই তা করে; আর যে পথভ্রষ্ট হয় সে নিজের ধ্বংসের জন্যই পথভ্রষ্ট হয়। আর কোনো বোঝা বহনকারী অন্যের পাপের বোঝা বহন করবে না। আর আমি কখনোই কোনো জাতিকে শাস্তি দিই না যতক্ষণ না কোনো রাসূল প্রেরণ করি।]
আয়াতসমূহের তাফসির
সূরা বনী ইসরাঈলের এই আয়াতগুলোতে কিয়ামত দিবসের এক গম্ভীর ও অকাট্য জবাবদিহিতার চিত্র ফুটে উঠেছে। মানুষের প্রতিটি চিন্তা, কথা ও কর্ম ফেরেশতারা পুঙ্খানুপুঙ্খ লিপিবদ্ধ করছেন। কিয়ামতের দিন সেই আমলনামা উন্মুক্ত কিতাব হিসেবে মানুষের সামনে পেশ করা হবে। সেখানে কোনো পক্ষপাতিত্ব বা অবিচার হবে না। মানুষ নিজেই নিজের আমলের হিসাব দেখে নির্বাক হয়ে যাবে।
(أ) ما المراد بالكتاب في الآية المذكورة؟ بين بالتفصيل-
[(ক) উল্লেখিত আয়াতে ‘কিতাব’ দ্বারা কী উদ্দেশ্য? বিস্তারিত আলোচনা কর।]
উত্তর:
আয়াতটিতে ‘কিতাব’ (كتابك) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো মানুষের আমলনামা (صحيفة الأعمال)।
- দুনিয়ার জীবনে মানুষের কাঁধে নিয়োজিত সম্মানিত কেরামান কাতিবীন ফেরেশতাদ্বয় মানুষের ভালো ও মন্দ, প্রকাশ্য ও গোপন প্রতিটি কর্মকাণ্ড অক্ষরে অক্ষরে যে রেকর্ডে লিপিবদ্ধ করেন, মৃত্যুর পর তা বন্ধ করে রাখা হয়।
- কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা সেই আমলনামাকে এক উন্মুক্ত কিতাব বা রেজিস্টার আকারে মানুষের গলায় ঝুলিয়ে প্রকাশ করবেন: “وَنُخْرِجُ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ كِتَابًا يَلْقَاهُ مَنْشُورًا” (সূরা বনী ইসরাঈল: ১৩)।
- মুমিনদের আমলনামা ডান হাতে দেওয়া হবে আর পাপী ও কাফিরদের আমলনামা বাম হাতে বা পেছন দিক থেকে দেওয়া হবে। কিতাব দেখে পাপীরা আর্তনাদ করে বলবে: “হায় আফসোস! এ কেমন কিতাব! যা ছোট বা বড় কোনো আমলই বাদ দেয়নি, সবই গণনা করে রেখেছে!” (সূরা আল-কাহফ: ৪৯)।
(ب) هل يعاقب أحد بذنوب احد أخر؟ بين في ضوء القرآن والسنة-
[(খ) কারও পাপের জন্য কি অন্য কাউকে শাস্তি দেওয়া হবে? কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে স্পষ্ট কর।]
উত্তর:
ইসলামের ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতি হলো—কারও ব্যক্তিগত পাপের বোঝা অন্য কারও ওপর চাপানো হবে না।
- কুরআনের অকাট্য নীতি: আল্লাহ সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন: “وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى” (কোনো বোঝা বহনকারী অন্যের পাপের বোঝা বহন করবে না)। পিতার পাপের জন্য সন্তানকে এবং সন্তানের পাপের জন্য পিতাকে পাকড়াও করা হবে না। খ্রিস্টধর্মের ‘জন্মগত পাপের’ (Original Sin) ভিত্তিহীন দর্শনকে ইসলাম পুরোপুরি নাকচ করেছে।
- সুন্নাহর বিধান: বিদায় হজের ভাষণে বিশ্বনবী (সা.) বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন: “জেনে রেখো! কোনো অপরাধী কেবল নিজের অপরাধের জন্যই দায়ী হবে; সন্তানের অপরাধের দায় পিতার ওপর নয় এবং পিতার অপরাধের দায় সন্তানের ওপর বর্তাবে না।” (সুনানে তিরমিজি)
- সংশয় নিরসন: যারা সমাজে কুপ্রথা বা পাপের পথ উন্মুক্ত করে, তাদের অনুসারীদের পাপের সমপরিমাণ বোঝা তাদের ওপর চাপানো হবে (সূরা আন-নাহল: ২৫)। তবে তা অন্যের পাপ বহন নয়, বরং অন্যকে পাপের দিকে পথপ্রদর্শনের কারণে তার নিজেরই কৃতকর্মের নিজস্ব শাস্তি।
٥- يا أيها الذين آمنوا لا تقدموا بين يدى الله ورسوله واتقوا الله إن الله سميع عليم- يا أيها الذين آمنوا لا ترفعوا أصواتكم فوق صوت النبى ولا تجهروا له بالقول كجهر بعضكم لبعض أن تحبط أعمالكم وأنتم لا تشعرون-
[৫. হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সিদ্ধান্তের অগ্রে যেও না এবং আল্লাহকে ভয় করো; নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। হে মুমিনগণ! তোমরা নবীর কণ্ঠস্বরের ওপর নিজেদের কণ্ঠস্বর উঁচু করো না এবং নিজেদের মধ্যে যেভাবে উচ্চস্বরে কথা বলো তাঁর সাথে সেভাবে উচ্চস্বরে কথা বলো না; পাছে তোমাদের অজ্ঞাতসারে তোমাদের সমস্ত আমল বিনষ্ট হয়ে যায়।]
আয়াতসমূহের তাফসির
সূরা আল-হুজুরাতকে বলা হয় আখলাক বা আদব-কায়দার সূরা। এ সূরার সূচনালগ্নে আল্লাহ তায়ালা মুমিনদেরকে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি পরম শ্রদ্ধা, আদব ও আনুগত্যের স্বর্ণালী নীতিমালা শিক্ষা দিয়েছেন। রাসূল (সা.)-এর সামনে নিজেদের রায় চাপিয়ে দেওয়া বা তাঁর চেয়ে উঁচু গলায় কথা বলা ঈমান ও আমল ধ্বংসের কারণ।
(أ) بين سبب نزول الآية الكريمة-
[(ক) সম্মানিত আয়াতদ্বয়ের শানে নুযূল বা নাযিলের প্রেক্ষাপট বর্ণনা কর।]
উত্তর:
ইমাম বুখারী (রহ.) হযরত ইবনে আবি মুলাইকা (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন: বনু তামীম গোত্রের এক প্রতিনিধি দল যখন মদিনায় আগমন করল, তখন তাদের নেতা কে হবেন—তা নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর উপস্থিতিতেই হযরত আবু বকর (রা.) ও হযরত উমর (রা.)-এর মধ্যে আলোচনা শুরু হয়।
- হযরত আবু বকর (রা.) পরামর্শ দিলেন কা’কা ইবনে মা’বাদকে নেতা বানাতে; আর হযরত উমর (রা.) প্রস্তাব করলেন আল-আকরা ইবনে হাবিসকে নিয়োগ দিতে।
- উভয়ের মধ্যে মতবিনিময় হতে হতে একপর্যায়ে তাঁদের কণ্ঠস্বর কিছুটা উঁচু হয়ে গেল। আবু বকর (রা.) বললেন, “তুমি তো কেবল আমার বিরোধিতাই করতে চেয়েছ!” উমর (রা.) বললেন, “আমি আপনার বিরোধিতা করতে চাইনি।”
- রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র মজলিসে তাঁদের এই বাদানুবাদ ও কণ্ঠস্বর উঁচু হওয়ার প্রেক্ষাপটে আল্লাহ তায়ালা এই আয়াত নাযিল করে সতর্ক করে দেন।
- এ আয়াত নাযিলের পর হযরত আবু বকর ও উমর (রা.) এত বিনীত হয়ে গিয়েছিলেন যে, এরপর থেকে নবীজির সামনে কথা বলতে গেলে তাঁরা এত মৃদুস্বরে বলতেন যেন কোনো গোপন কথা বলছেন (সহিহ বুখারি)।
(ب) بين عظمة النبى صلى الله عليه وسلم في ضوء سورة الحجرات-
[(খ) সূরা হুজুরাতের আলোকে নবী করিম (সা.)-এর সুমহান মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব আলোচনা কর।]
উত্তর: সূরা হুজুরাতে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যে অতুলনীয় মর্যাদা তুলে ধরা হয়েছে তা নিম্নরূপ:
- আইন প্রণয়নে নিরঙ্কুশ মর্যাদা: আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ফয়সালার পূর্বে নিজের কোনো রায় বা যুক্তি দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। শরীয়তের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব একমাত্র রাসূলের সুন্নাহর।
- আওয়াজ ও বাচনভঙ্গির আদব: কোনো সাধারণ মানুষের সাথে যেভাবে কথা বলা হয়, নবীজির শানে সেভাবে উচ্চকণ্ঠে কথা বলা যাবে না। এটি বেয়াদবি এবং এর ফলে অজান্তেই সমস্ত জীবনের আমল বরবাদ (হাফতে আমল) হয়ে যাবে।
- হুজরার বাইরে থেকে নাম ধরে না ডাকা: গ্রামের লোকেরা যেভাবে বাইরে থেকে চেঁচিয়ে ডাকত, আল্লাহ তা কঠোর ভাষায় নিন্দা করে বলেছেন অধিকাংশেরই কোনো বুদ্ধি নেই (আয়াত: ৪)।
- নবীজির প্রতি ভালোবাসা ও আত্মোৎসর্গ: মুমিনের নিজের প্রাণের চেয়েও নবীজির নির্দেশকে প্রাধান্য দিতে হবে।
٦- يا أيها الذين آمنوا ان جاءكم فاسق بنباء فتبينوا أن تصيبوا قوما بجهالة فتصبحوا على ما فعلتم نادمين-
[৬. হে মুমিনগণ! যদি কোনো পাপাচারী ব্যক্তি তোমাদের নিকট কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই-বাছাই করো; যাতে অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি না করে বসো, অতঃপর নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হও।]
আয়াতটির তাফসির
সামাজিক শান্তি, ন্যায়বিচার ও সঠিক তথ্য ব্যবস্থাপনার জন্য এটি পবিত্র কুরআনের এক অবিস্মরণীয় নীতিবাক্য। কোনো ব্যক্তির কথা শুনেই তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়া ইসলামি বিচার ও রাষ্ট্রনীতির পরিপন্থী। বিশেষ করে কোনো ফাসেক বা অনির্ভরযোগ্য সূত্রের সংবাদের ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা মুমিনের ওপর ফরজ করা হয়েছে।
(أ) بين سبب نزول الآية الكريمة-
[(ক) পবিত্র আয়াতটির নাযিলের প্রেক্ষাপট বর্ণনা কর।]
উত্তর:
মুফাসসিরগণের সর্বসম্মত মতে, আয়াতটি ওয়ালিদ ইবনে উকবা (الوليد بن عقبة)-এর ঘটনার প্রেক্ষিতে নাযিল হয়েছে।
- রাসূলুল্লাহ (সা.) বনু মুসতালিক গোত্রের নিকট থেকে জাকাত সংগ্রহের জন্য ওয়ালিদ ইবনে উকবাকে প্রেরণ করেন। জাহেলি যুগে বনু মুসতালিকের সাথে ওয়ালিদের বংশের শত্রুতা ছিল।
- ওয়ালিদ যখন তাদের এলাকার কাছাকাছি পৌঁছালেন, তখন বনু মুসতালিক গোত্রের লোকেরা অত্যন্ত আনন্দচিত্তে রাসূলের প্রতিনিধির সম্মানার্থে অস্ত্রসজ্জিত হয়ে এবং উট-ভেড়া নিয়ে স্বাগত জানানোর জন্য এগিয়ে আসে।
- ওয়ালিদ দূর থেকে তাদের অস্ত্রসহ দলবদ্ধ আসতে দেখে ভীত হয়ে পড়েন এবং মনে করেন তারা বুঝি তাকে হত্যা করতে এবং জাকাত দিতে অস্বীকার করতে আসছে। তিনি ভয়ে অগ্রসর না হয়ে মদিনায় ফিরে এসে নবীজিকে সংবাদ দেন: “হে আল্লাহর রাসূল! বনু মুসতালিক মুরতাদ হয়ে গেছে, তারা জাকাত দিতে অস্বীকার করেছে এবং আমাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছে!”
- এ কথা শুনে সাহাবিদের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং রাসূল (সা.) তাদের বিরুদ্ধে একটি সেনাদল পাঠানোর সংকল্প করেন। এমন সময় বনু মুসতালিকের সরদার আল-হারিস ইবনে আবি দ্বিরার মদিনায় এসে আরজ করলেন, আমরা তো আনন্দ সহকারে জাকাত দিতে এগিয়ে এসেছিলাম, ওয়ালিদ কেন ফিরে গেলেন আমরা বুঝতে পারিনি।
- তখনই আল্লাহ তায়ালা এই আয়াত নাযিল করে সত্য উদ্ঘাটন করেন এবং কোনো যাচাই ছাড়া আক্রমণ করতে নিষেধ করেন।
(ب) هل يقبل خبر الفاسق أم لا؟ بين-
[(খ) ফাসেকের সংবাদ কি গ্রহণযোগ্য? বর্ণনা কর।]
উত্তর:
উসুলে ফিকহ ও হাদিস শাস্ত্রের নীতি অনুসারে ফাসেকের সংবাদের বিধান নিম্নরূপ:
- হাদিস ও শরয়ী বিধান বর্ণনার ক্ষেত্রে: কোনো ফাসেক ব্যক্তির বর্ণনা দ্বারা হাদিস বা শরীয়তের মৌলিক হালাল-হারামের বিধান গ্রহণযোগ্য নয়; তার বর্ণনা সর্বসম্মতভাবে প্রত্যাখ্যাত (মর্দূদ)।
- বিচারিক সাক্ষ্যদানের ক্ষেত্রে (الشهادة في القضاء): আদালতে কোনো মামলার সাক্ষ্য হিসেবে ফাসেকের সাক্ষ্য বা শাহাদাত বাতিল ও অগ্রহণযোগ্য। কারণ যার ব্যক্তিগত জীবনে তাকওয়া ও সততা নেই, সে মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে দ্বিধাবোধ করবে না।
- দৈনন্দিন সাধারণ সংবাদের ক্ষেত্রে (الأخبار العامة): ফাসেকের সংবাদকে সরাসরি শতভাগ সত্য বলেও মেনে নেওয়া যাবে না, আবার পুরোপুরি উড়িয়ে দিয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াও দেখানো যাবে না। বরং আয়াতে ‘ফাতাবাইয়্যানূ’ (فتبينوا) নির্দেশ এসেছে—অর্থাৎ কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার পূর্বে অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য বিশ্বস্ত সূত্রের মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্ত ও তথ্য যাচাই-বাছাই করা ওয়াজিব। তদন্তে সত্য প্রমাণিত হলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
٧- والنجم إذا هوى- ما ضل صاحبكم وما غوى- وما ينطق عن الهوى- إن هو إلا وحى يوحى- علمه شديد القوى- ذو مرة فاستوى- وهو بالأفق الأعلى- ثم دنى فتدلى-
[৭. শপথ নক্ষত্রের যখন তা অস্তমিত হয়। তোমাদের সঙ্গী পথভ্রষ্ট হননি এবং বিপথগামীও হননি। এবং তিনি নিজের খেয়ালখুশিমতো কোনো কথাও বলেন না। এটি তো এক ওহী, যা তাঁর প্রতি প্রত্যাদেশ করা হয়। তাঁকে শিক্ষা দান করেছেন এক প্রবল পরাক্রান্ত সত্তা (জিবরিল)। যিনি প্রজ্ঞাবান ও শক্তিশালী, অতঃপর তিনি স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করলেন। যখন তিনি ঊর্ধ্ব দিগন্তে ছিলেন। অতঃপর তিনি নিকটবর্তী হলেন এবং আরও কাছে নেমে এলেন।]
আয়াতসমূহের তাফসির
সূরা আন-নাজমের সূচনালগ্নে আল্লাহ তায়ালা নক্ষত্রের শপথ করে বিশ্বনবীর নবুওয়ত, নিষ্কলুষ চরিত্র এবং ওহীর বিশুদ্ধতা ঘোষণা করেছেন। মক্কার কাফিররা অপবাদ দিত যে মুহাম্মদ (সা.) কবি বা গণক, তিনি নিজের পক্ষ থেকে কথা বানিয়ে বলেন। আল্লাহ দ্ব্যর্থহীনভাবে জানিয়ে দিলেন, নবীর মুখ থেকে উচ্চারিত শরীয়তের প্রতিটি শব্দ আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রত্যাদেশিত ওহী।
(أ) ما معنى الوحى لغة وشرعا؟ بين-
[(ক) ওহীর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ কী? বর্ণনা কর।]
উত্তর:
আভিধানিক অর্থ: ‘ওহী’ (الوحي) শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো—ইঙ্গিত করা, ইশারা করা, দ্রুত কোনো বার্তা প্রেরণ করা, বা গোপনে কারও অন্তরে কোনো বিষয় ঢেলে দেওয়া যা অন্য কেউ জানতে পারে না।
পারিভাষিক অর্থ: শরীয়তের পরিভাষায়—আল্লাহ তায়ালা মানবজাতির হেদায়েতের জন্য তাঁর মনোনীত নবী ও রাসূলগণের ওপর ফেরেশতা জিবরিল (আ.)-এর মাধ্যমে অথবা সরাসরি কোনো মাধ্যমহীনভাবে শরীয়তের যে ইলম ও পয়গাম অবতীর্ণ করেন, তাকে ‘ওহী’ বলে।
ওহী মূলত দুই প্রকার:
- ওহী মাতলু (الوحي المتلو): যে ওহীর শব্দ ও অর্থ উভয়ই আল্লাহর পক্ষ থেকে এবং যা নামাজে তেলাওয়াত করা হয়; অর্থাৎ পবিত্র কুরআনুল কারীম।
- ওহী গায়রে মাতলু (الوحي غير المتلو): যে ওহীর ভাব ও মর্ম আল্লাহর পক্ষ থেকে কিন্তু শব্দ রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিজস্ব এবং যা নামাজে তেলাওয়াত করা হয় না; অর্থাৎ সহিহ হাদিস।
(ب) إلامَ أُشيرَ بقوله تعالى: ‘شديد القوى’؟
[(খ) আল্লাহর বাণী ‘শাদীদুল কুওয়া’ দ্বারা কাকে ইঙ্গিত করা হয়েছে?]
উত্তর:
মুফাসসিরগণের সর্বসম্মত ঐকমত্যে ‘শাদীদুল কুওয়া’ (شَدِيدُ الْقُوَى – প্রবল পরাক্রান্ত ও মহাশক্তিধর) দ্বারা ফেরেশতাগণের সরদার হযরত জিবরিল (আলাইহিস সালাম)-কে বোঝানো হয়েছে।
- আল্লাহ তায়ালা জিবরিল (আ.)-কে অতুলনীয় দৈহিক ও রূহানি শক্তি দান করেছেন। তিনি লুত (আ.)-এর বিশাল জনপদকে মাত্র একটি ডানার অগ্রভাগ দিয়ে আসমানে তুলে উল্টে দিয়েছিলেন।
- তাঁর ছয়শত নূরানী ডানা রয়েছে। তিনি দ্রুততম সময়ে আল্লাহর আরশ থেকে পৃথিবীতে ওহী নিয়ে আসতে সক্ষম। নবীজি (সা.) তাঁকে দুবার তাঁর আদি প্রকৃত আকৃতিতে স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছিলেন।
٨- ولقد رآه نزلة أخرى- عند سدرة المنتهى- عندها جنة المأوى- إذ يغشى السدرة ما يغشى- ما زاغ البصر وما طغى- لقد رأى من آيات ربه الكبرى-
[৮. এবং নিশ্চয়ই তিনি তাঁকে আরেকবার দেখেছিলেন। সিদরাতুল মুনতাহার নিকটে। যার কাছে অবস্থিত জান্নাতুল মা’ওয়া। যখন বৃক্ষটিকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল যা আচ্ছন্ন করার ছিল। তাঁর দৃষ্টি বিভ্রান্তও হয়নি এবং লক্ষ্যচ্যুতও হয়নি। নিশ্চয়ই তিনি তাঁর প্রতিপালকের মহান নিদর্শনাবলীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন প্রত্যক্ষ করেছিলেন।]
আয়াতসমূহের তাফসির
এ আয়াতগুলোতে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ঐতিহাসিক মিরাজ রজনীর ঊর্ধ্বারোহণের শীর্ষ মুহূর্তের বিবরণ দেওয়া হয়েছে। সপ্তম আকাশের শেষ সীমানায় সিদরাতুল মুনতাহায় নবীজি জিবরিল (আ.)-কে পুনরায় তাঁর পূর্ণ আসল নূরানী সুরতে প্রত্যক্ষ করেন। সেখানকার জান্নাতুল মা’ওয়া এবং মহান আল্লাহর অতুলনীয় কুদরত নবীজির পবিত্র চোখ স্থিরভাবে প্রত্যক্ষ করেছিল।
(أ) ما المراد بـ ‘سدرة المنتهى’؟ بين-
[(ক) ‘সিদরাতুল মুনতাহা’ দ্বারা কী উদ্দেশ্য? বর্ণনা কর।]
উত্তর:
‘সিদরাহ’ (السدرة) অর্থ কুল বা বরই গাছ। ‘মুনতাহা’ (المنتهى) অর্থ সমাপ্তি বা শেষ সীমানা।
তাফসিরে তাৎপর্য: সিদরাতুল মুনতাহা হলো সপ্তম আকাশে আরশের নিচে অবস্থিত একটি সুমহান বরকতময় সীমানা নির্দেশক কুলবৃক্ষ।
- সহিহ মুসলিমের হাদিসে এসেছে—দুনিয়া থেকে যা কিছু উপরে ওঠে (বান্দার আমল ও রূহ) তা এখানে এসেই সমাপ্ত হয়; এবং আরশের উপর থেকে আল্লাহর যে ফয়সালা ও হুকুম নিচে নাযিল হয়, তাও এখানে এসে পৌঁছায়। এরপর ফেরেশতারা তা গ্রহণ করে। এ কারণেই একে ‘মুনতাহা’ (শেষ সীমানা) বলা হয়।
- নবীজি (সা.) বর্ণনা করেছেন, এর ফলগুলো ছিল হাজার অঞ্চলের বিশাল কলসির মতো এবং এর পাতাগুলো ছিল হাতির কানের মতো বিশাল। একে এমন স্বর্গীয় নূর ও সৌন্দর্য আবৃত করে রেখেছিল যে সৃষ্টির কারও পক্ষে তার সৌন্দর্য বর্ণনা করা সম্ভব নয়। এর পাশেই রয়েছে মুত্তাকীদের স্থায়ী ঠিকানা ‘জান্নাতুল মা’ওয়া’।
(ب) اذكر الواقعة المتعلقة بهذه الآيات موجزا-
[(খ) এই আয়াতসমূহের সাথে সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনাটি সংক্ষেপে উল্লেখ কর।]
উত্তর:
এই আয়াতসমূহ বিশ্বনবী (সা.)-এর পবিত্র মিরাজের (معراج) অলৌকিক ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট।
- নবুওয়তের দশম বর্ষে রজব মাসের ২৭ তারিখ রাতে হযরত জিবরিল (আ.) বোরাকযোগে নবীজিকে প্রথমে মসজিদুল হারাম থেকে বায়তুল মুকাদ্দাসে (ইসরা) নিয়ে যান। সেখানে তিনি সমস্ত নবীদের ইমামতি করেন।
- অতঃপর সেখান থেকে আকাশমণ্ডলীর সপ্তস্তর অতিক্রম করে তিনি সিদরাতুল মুনতাহায় পৌঁছেন। সিদরাতুল মুনতাহায় এসে জিবরিল (আ.) থমকে দাঁড়ান এবং বলেন, “এর সামনে এক আঙুল পরিমাণ অগ্রসর হলে আল্লাহর নূরের তাজাল্লিতে আমার ডানা পুড়ে ভস্ম হয়ে যাবে।”
- সেখানে নবীজি জিবরিল (আ.)-কে তাঁর ছয়শত ডানা বিশিষ্ট আসল আকৃতিতে দেখেন। অতঃপর নবীজি রফরফে চড়ে আল্লাহর খাস সান্নিধ্যে গমন করেন এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের ঐতিহাসিক উপহার লাভ করেন।
مجموعة (ب) [বিভাগ ‘খ’ – তাফসির শাস্ত্র ও গ্রন্থাবলীর পরিচিতি]
মান: ১০ × ১ = ১০
٩- اذكر نبذة من حياة صاحب الكشاف ثم بين مزايا تفسيره-
[৯. ‘তাফসিরে কাশশাফ’ প্রণেতার সংক্ষিপ্ত জীবনী লেখ এবং তাঁর তাফসিরের বৈশিষ্ট্যসমূহ বর্ণনা কর।]
১. তাফসিরে কাশশাফের গ্রন্থকারের সংক্ষিপ্ত জীবনী
- নাম ও বংশপরিচয়: তাঁর নাম মাহমুদ, উপনাম আবুল কাসেম, পিতার নাম উমর। তিনি আল্লামা যামাখশারী (الزمخشري) নামে সমধিক পরিচিত।
- জন্ম ও উপাধি: তিনি ৪৬৭ হিজরিতে (১০৭৫ খ্রি.) মধ্য এশিয়ার খাওয়ারেজমের যামাখশার গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি দীর্ঘকাল পবিত্র মক্কায় অবস্থান করায় তাঁকে ‘জারুল্লাহ’ (جار الله – আল্লাহর প্রতিবেশী) উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
- পাণ্ডিত্য ও শিক্ষকতা: তিনি ছিলেন আরবি ভাষা, ব্যাকরণ, অলঙ্কারশাস্ত্র (বালাগাত) এবং সাহিত্যের অবিসংবাদিত শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত। ৫৩৮ হিজরিতে এই মহান মনীষী জুরজানিয়ায় ইন্তেকাল করেন।
২. তাফসিরে কাশশাফের (الكشاف) প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য ও অনন্য মর্যাদা
তাঁর কালজয়ী তাফসিরের পূর্ণ নাম: ‘আল-কাশশাফু আন হাকায়িকিত তানযীল ওয়া উইউনিল আক্বাভীল ফী উজূহিত তা’বীল’। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:
- ভাষাতাত্ত্বিক ও অলঙ্কারশাস্ত্রীয় শ্রেষ্ঠত্ব (الإعجاز البلاغي): কুরআনের অনুপম কাব্যময়তা, বালাগাত, ফাসাহাত এবং ব্যাকরণগত সূক্ষ্মতা ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রে তাফসিরে কাশশাফের সমকক্ষ দ্বিতীয় কোনো তাফসির নেই। খোদ আল্লামা ইবনে খালদুন ও ইবনে হাজার আসকালানী এর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
- প্রশ্নোত্তর ভিত্তিক সংকলন পদ্ধতি: তিনি প্রায় প্রতিটি আয়াতে “فَإِنْ قُلْتَ… قُلْتُ…” (যদি তুমি প্রশ্ন করো… তবে আমি তার উত্তরে বলব…) রীতি ব্যবহার করে অত্যন্ত যুক্তিগ্রাহ্যভাবে সংশয় নিরসন করেছেন।
- মু’তাযিলা মতবাদের অনুপ্রবেশ ও সতর্কতা: আল্লামা যামাখশারী আকিদায় মু’তাযিলা মতাবলম্বী ছিলেন। তাই তিনি সূক্ষ্ম অলঙ্কারশাস্ত্রীয় ব্যাখ্যার আড়ালে তাঁর মু’তাযিলা আকিদা (যেমন আল্লাহর সিফাত অস্বীকার, রূ’ইয়াতুল্লাহ অস্বীকার ও খালকে কুরআন) প্রচার করার চেষ্টা করেছেন। তাই আহলে সুন্নাতের আলেমগণ তাঁর ভাষাগত সৌন্দর্য গ্রহণ করলেও তাঁর আকিদাগত বিভ্রান্তি সম্পর্কে সতর্ক করেছেন (ইমাম আহমদ ইবনুল মুনীর আল-ইস্কান্দারানী তাঁর খণ্ডন করে ‘আল-ইনসাফ’ গ্রন্থ লিখেছেন)।
١٠- اكتب خصائص تفسير البيضاوى ومنهج المؤلف في تأليفه-
[১০. তাফসিরে বায়যাবীর বৈশিষ্ট্যসমূহ এবং লেখকের সংকলন পদ্ধতি লেখ।]
১. লেখকের পরিচয়
তাফসিরে বায়যাবীর রচয়িতা হলেন কাজী নাসিরুদ্দীন আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ ইবনে উমর আল-বায়যাবী আশ-শাফেয়ী (রহ.) (মৃত্যু: ৬৮৫ হিজরি / ১২৮৬ খ্রি.)। তিনি ইরানের ফারস প্রদেশের প্রধান বিচারপতি (কাজীউল কুজাত) ছিলেন। তিনি একাধারে মুফাসসির, ফকিহ, মুতাকাল্লিম ও ভাষাবিদ ছিলেন।
২. তাফসিরে বায়যাবীর পূর্ণ নাম ও পরিচিতি
গ্রন্থটির পূর্ণ নাম ‘আনওয়ারুত তানযীল ওয়া আসরারুত তা’বীল’ (أنوار التنزيل وأسرار التأويل)। এটি মুসলিম বিশ্বের আলিয়া ও কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ শ্রেণীতে যুগ যুগ ধরে পাঠ্য কিতাব হিসেবে সমাদৃত।
৩. সংকলন পদ্ধতি ও প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ (خصائصه ومنهجه)
- তিনটি সুবিখ্যাত তাফসিরের নির্যাস: ইমাম বায়যাবী তাঁর তাফসিরকে মূলত তিনটি মৌলিক গ্রন্থের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করেছেন:
- যামাখশারীর ‘আল-কাশশাফ’ থেকে ভাষাতাত্ত্বিক ও অলঙ্কারশাস্ত্রীয় সূক্ষ্ম তত্ত্ব গ্রহণ করেছেন।
- ইমাম ফখরুদ্দীন আল-রাযীর ‘তাফসিরে কাবীর’ থেকে কালাম শাস্ত্রীয় যৌক্তিক সমাধান গ্রহণ করেছেন।
- ইমাম রাগিব ইসফাহানীর ‘মুফরাদাতুল কুরআন’ থেকে আরবি শব্দার্থ চয়ন করেছেন।
- আহলে সুন্নাতের আকিদায় পরিশোধন: তাফসিরে কাশশাফের ভেতর যেসব মু’তাযিলা আকিদার বিষবাষ্প ছিল, ইমাম বায়যাবী সেগুলোকে সুচারুভাবে ছাঁটাই করে নিখুঁত আশ’আরী আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আকিদায় রূপান্তর করেছেন।
- সংক্ষিপ্ত অথচ অর্থগর্ভ প্রাঞ্জল ভাষা (الإيجاز والإعجاز): এটি আকারে খুব বেশি দীর্ঘ নয়, অথচ প্রতিটি শব্দের ভেতর সমুদ্রসম অর্থ নিহিত রয়েছে। এর গভীরতার কারণেই পরবর্তী শতকে আলেমগণ এর ওপর শত শত ‘হাশিয়া’ বা টীকাগ্রন্থ রচনা করেছেন (যেমন শায়খজাদা, ইসামুদ্দীন, কাযীযাদা)।
- কিরাত ও ফিকহি মতভেদের উল্লেখ: বিভিন্ন প্রামাণ্য কিরাতের বর্ণনা এবং আয়াত সংশ্লিষ্ট শাফেয়ী ও হানাফি ফিকহের দলিল তিনি ইনসাফের সাথে উপস্থাপন করেছেন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. ‘দিরাসাতু তাফসীরুল কুরআনিল কারীম’ কোর্সের মূল উদ্দেশ্য কী?
নির্বাচিত গুরুত্বপূর্ণ সূরা ও আয়াতসমূহের গভীর ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, শানে নুযূল এবং প্রামাণ্য তাফসিরগ্রন্থসমূহের সংকলন পদ্ধতি ও বৈশিষ্ট্য অনুধাবন করা।
২. সূরা ফাতিহায় ‘বাসমালাহ’ কি সূরার স্বতন্ত্র আয়াত হিসেবে গণ্য?
ইমাম শাফেয়ীর মতে এটি সূরা ফাতিহার প্রথম আয়াত; তবে ইমাম আবু হানীফার মতে এটি দুই সূরার মাঝে বরকতময় পৃথক আয়াত, সূরার নিজস্ব আয়াত নয়।
৩. তাফসিরে কাশশাফের প্রধান গুণ ও দুর্বলতা কী?
প্রধান গুণ হলো এর অতুলনীয় আরবি অলঙ্কারশাস্ত্রীয় ও ভাষাগত সৌন্দর্য; আর প্রধান দুর্বলতা হলো এতে মু’তাযিলা আকিদার অনুপ্রবেশ রয়েছে।
৪. তাফসিরে বায়যাবীকে কেন মাদ্রাসার পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে?
কারণ এটি কাশশাফের মু’তাযিলা আকিদা বর্জন করে বিশুদ্ধ সুন্নি আকিদা ও অলঙ্কারশাস্ত্রের অপূর্ব সমন্বয় সাধন করেছে এবং এর ভাষা অত্যন্ত গভীর ও সুসংহত।
৫. ‘সিদরাতুল মুনতাহা’ বলতে কী বুঝায়?
সপ্তম আকাশের শেষ সীমানায় অবস্থিত একটি অলৌকিক বরই গাছ, যেখানে সৃষ্টিজগতের আমল ও ঐশী হুকুমের সমাপ্তি ঘটে এবং যা মিরাজের ঊর্ধ্বযাত্রার শীর্ষ স্থান।
৬. ফাজিল ৪র্থ বর্ষের তাফসির পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ার কৌশল কী?
আয়াতের নির্ভুল বাংলা অর্থ লেখা, শানে নুযূলের সঠিক প্রেক্ষাপট ও হাদিস উল্লেখ করা এবং বায়যাবী ও কাশশাফের ভাষাতাত্ত্বিক পয়েন্টগুলো পরিষ্কারভাবে ফুটিয়ে তোলা।