ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২০
বিভাগ: আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: অর্থনীতি ও ইসলামি অর্থনীতি (Economics & Islamic Economics)
বিষয় কোড: 202106 | সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০
২০২০ সালের ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ১ম বর্ষের আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অর্থনীতি ও ইসলামি অর্থনীতি (Economics & Islamic Economics, বিষয় কোড: 202106) পরীক্ষাটি প্রচলিত অর্থনীতির মৌলিক তত্ত্বসমূহ, উৎপাদনের উপাদান, চাহিদা-যোগানের সনাতন বিশ্লেষণ এবং ইসলামের কল্যাণমুখী অর্থনৈতিক দর্শন ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার আলোকে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। নিম্নে উক্ত প্রশ্নপত্রের পুঙ্খানুপুঙ্খ ও প্রামাণ্য সমাধান তুলে ধরা হলো।
ক বিভাগ — রচনামূলক প্রশ্ন
১। অর্থনীতির সংজ্ঞা দাও। অর্থনীতির পরিধি ও বিষয়বস্তু আলোচনা কর।
[Define economics. Discuss the scope or subject-matter of economics.]
ভূমিকা
মানবজাতির জাগতিক অস্তিত্ব ও সামাজিক প্রগতির মূলভিত্তি হলো সম্পদ অর্জন, বণ্টন ও ভোগ। সীমিত সম্পদের কার্যকর ব্যবহারের মাধ্যমে অসীম মানবিক অভাব পূরণের বিজ্ঞানসম্মত আলোচনাই হলো অর্থনীতি।
অর্থনীতির সংজ্ঞা
অর্থনীতির সংজ্ঞায়নে যুগভেদে অর্থনীতিবিদগণ ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেছেন:
- ক্লাসিক্যাল অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিতে (অ্যাডাম স্মিথ): অর্থনীতির জনক অ্যাডাম স্মিথ (Adam Smith) ১৭৭৬ সালে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ An Inquiry into the Nature and Causes of the Wealth of Nations-এ বলেন— “অর্থনীতি হলো এমন এক শাস্ত্র যা জাতির সম্পদের প্রকৃতি ও কারণ অনুসন্ধান করে।”
- নব্য-ক্লাসিক্যাল অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিতে (আলফ্রেড মার্শাল): অধ্যাপক আলফ্রেড মার্শাল (Alfred Marshall) ১৮৯০ সালে তাঁর Principles of Economics গ্রন্থে বলেন— “অর্থনীতি মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের সাধারণ কার্যাবলি আলোচনা করে; এটি ব্যক্তিগত ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সেই অংশ পরীক্ষা করে যা মানুষের পার্থিব কল্যাণ সাধনের উপায় ও তার ব্যবহারের সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত।”
- আধুনিক দৃষ্টিতে (লায়োনেল রবিন্স): অধ্যাপক এল রবিন্স (Lionel Robbins) ১৯৩২ সালে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য ও বিজ্ঞানসম্মত সংজ্ঞা দিয়ে বলেন— “অর্থনীতি এমন একটি বিজ্ঞান যা অসীম অভাব এবং বিকল্প ব্যবহারযোগ্য সীমিত সম্পদের মধ্যকার সম্পর্ক সংক্রান্ত মানব আচরণ নিয়ে আলোচনা করে।”
অর্থনীতির পরিধি ও বিষয়বস্তু
- অসীম অভাব ও সীমিত সম্পদ: মানুষের অভাব বহুমুখী ও অসীম, কিন্তু অভাব পূরণের সম্পদ সীমাবদ্ধ। এই অপ্রতুলতাই অর্থনীতির মূল ভিত্তি।
- নির্বাচন ও অগ্রাধিকার: সীমিত সম্পদ দিয়ে কোন অভাবটি আগে পূরণ করা হবে, সেই যৌক্তিক নির্বাচন অর্থনীতির অন্যতম প্রধান বিষয়।
- উৎপাদন (Production): প্রকৃতিপ্রদত্ত উপাদানের সাথে শ্রম ও মূলধনের সমন্বয়ে নতুন উপযোগ সৃষ্টি করা।
- বণ্টন (Distribution): উৎপাদিত জাতীয় আয় উৎপাদনের চারটি উপাদান— ভূমি (খাজনা), শ্রম (মজুরি), মূলধন (সুদ/মুনাফা) এবং সংগঠনের (মুনাফা) মধ্যে সুষমভাবে বণ্টন করা।
- বিনিময় (Exchange): বাজার ব্যবস্থা, অর্থ ও ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে পণ্য ও সেবার আদান-প্রদান।
- ভোগ (Consumption): মানুষের অভাব তৃপ্তির উদ্দেশ্যে পণ্যের উপযোগ নিঃশেষ করা।
- অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন: জাতীয় আয় বৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বেকারত্ব হ্রাস এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন সম্পর্কিত নীতিমালা প্রণয়ন।
২। চাহিদা ও যোগান বলতে কী বুঝ? চাহিদা ও যোগানের সনাতন তত্ত্বটি আলোচনা কর।
[What do you mean by demand and supply? Discuss the conventional theory of demand and supply.]
চাহিদার ধারণা
সাধারণ ভাষায় কোনো দ্রব্য পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে চাহিদা বলে। কিন্তু অর্থনীতিতে কেবল আকাঙ্ক্ষাই চাহিদা নয়। অর্থনীতিতে কার্যকর চাহিদা হতে হলে তিনটি শর্ত পূরণ হতে হয়: (১) কোনো দ্রব্য পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা, (২) দ্রব্যটি কেনার প্রয়োজনীয় আর্থিক সামর্থ্য এবং (৩) অর্থ ব্যয়ের সদিচ্ছা।
যোগানের ধারণা
একটি নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট দামে বিক্রেতা বা উৎপাদক কোনো দ্রব্যের যে পরিমাণ বিক্রয় করতে বাজারে প্রস্তুত থাকে, তাকে যোগান (Supply) বলে। মজুত সামগ্রিক দ্রব্যের পরিমাণ নির্দেশ করে, কিন্তু যোগান কেবল বিক্রয়যোগ্য অংশকে নির্দেশ করে।
চাহিদা ও যোগানের সনাতন তত্ত্ব (ভারসাম্য দাম নির্ধারণ)
সনাতন অর্থনীতিবিদ আলফ্রেড মার্শালের মতে, বাজারে কোনো পণ্যের দাম এককভাবে চাহিদা বা এককভাবে যোগান দ্বারা নির্ধারিত হয় না; বরং উভয় পক্ষের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ায় একটি ভারসাম্য বিন্দুতে নির্ধারিত হয়। একে কাঁচির দুটি ফলার সাথে তুলনা করা হয়।
- চাহিদা বিধি: অন্যান্য অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে দ্রব্যের দাম বাড়লে চাহিদা কমে এবং দাম কমলে চাহিদা বাড়ে (বিপরীতমুখী সম্পর্ক)।
- যোগান বিধি: অন্যান্য অবস্থা স্থির থাকলে দ্রব্যের দাম বাড়লে যোগান বাড়ে এবং দাম কমলে যোগান কমে (সম্মুখী সম্পর্ক)।
- ভারসাম্য দাম (Equilibrium Price): যে দামে ক্রেতার চাহিদার পরিমাণ এবং বিক্রেতার যোগানের পরিমাণ হুবহু সমান হয়, তাকে ভারসাম্য দাম বলা হয়।
- যদি দাম ভারসাম্যের চেয়ে বেশি হয়, বাজারে দ্রব্যের উদ্বৃত্ত দেখা দেবে এবং বিক্রেতাদের প্রতিযোগিতায় দাম হ্রাস পাবে।
- যদি দাম ভারসাম্যের চেয়ে কম হয়, বাজারে ঘাটতি দেখা দেবে এবং ক্রেতাদের প্রতিযোগিতায় দাম বৃদ্ধি পাবে।
- অবশেষে চাহিদা ও যোগানের সমতায় (Demand = Supply) বাজার স্থিরতা লাভ করে।
৩। অর্থনীতিতে উৎপাদন বলতে কী বুঝায়? উৎপাদনের উপকরণগুলোর বিবরণ দাও।
[What is meant by production in economics? Discuss about factors of production.]
অর্থনীতিতে উৎপাদনের ধারণা
মানুষ কোনো মৌলিক বস্তুর অবিনাশী পদার্থ সৃষ্টি করতে পারে না। অর্থনীতিতে উৎপাদন বলতে নতুন কোনো বস্তু সৃষ্টি নয়, বরং প্রকৃতিপ্রদত্ত উপাদানের রূপান্তর, স্থানান্তর বা সময়ের পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন ‘উপযোগ’ (Utility) সৃষ্টি করাকে বোঝায়। যেমন: কাঠ থেকে আসবাবপত্র তৈরি করা।
উৎপাদনের উপকরণসমূহ
অর্থনীতিতে উৎপাদনের চারটি মৌলিক উপাদান রয়েছে:
- ভূমি (Land): উৎপাদনের আদি ও মৌলিক প্রাকৃতিক উপাদান। মাটি, ভূগর্ভস্থ খনিজ সম্পদ, নদীনালা, বনভূমি, বায়ুমণ্ডল ও জলবায়ু—যা প্রকৃতি মানুষকে বিনামূল্যে দান করেছে, তাকে অর্থনীতিতে ভূমি বলে। ভূমির যোগান সীমাবদ্ধ এবং এর প্রতিদান হলো ‘খাজনা’ (Rent)।
- শ্রম (Labour): উৎপাদন প্রক্রিয়ায় নিয়োজিত মানুষের শারীরিক ও মানসিক যাবতীয় কর্মপ্রচেষ্টাকে শ্রম বলা হয়। শ্রম একটি ক্ষণস্থায়ী উপাদান যা সংরক্ষণ করা যায় না। শ্রমিকের পারিশ্রমিক হলো ‘মজুরি’ (Wages)।
- মূলধন (Capital): মানুষের শ্রম দ্বারা উৎপাদিত সম্পদের যে অংশ বর্তমান ভোগের জন্য ব্যবহৃত না হয়ে পুনরায় ভবিষ্যৎ উৎপাদন প্রক্রিয়ায় নিয়োজিত হয়, তাকে মূলধন বলে। যেমন: কলকারখানা, যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল। মূলধনের প্রতিদান হলো ‘সুদ’ (প্রচলিত অর্থে) বা ‘মুনাফার অংশ’ (ইসলামি অর্থে)।
- সংগঠন (Organization): উৎপাদনের অন্য তিনটি উপাদান—ভূমি, শ্রম ও মূলধনকে একত্রিত করে সুষ্ঠু পরিচালনা, পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং উৎপাদনের ঝুঁকি গ্রহণকারী সত্তাকে সংগঠন বা উদ্যোক্তা বলা হয়। উদ্যোক্তার অর্জিত প্রতিদান হলো ‘মুনাফা’ (Profit)।
৪। ইসলামি অর্থনীতি বলতে কী বুঝ? ইসলামি অর্থনীতির প্রকৃতি আলোচনা কর।
[What do you mean by Islamic economics? Discuss the nature of Islamic economics.]
ইসলামি অর্থনীতির সংজ্ঞা
কুরআন ও সুন্নাহর দিকনির্দেশনার আলোকে মানবজাতির জাগতিক ও পরকালীন কল্যাণ অর্জনের লক্ষ্যে অর্থনৈতিক সম্পদ আহরণ, উৎপাদন, বণ্টন ও ভোগ সংক্রান্ত সামগ্রিক নীতিমালাকে ইসলামি অর্থনীতি বলে।
ড. এম এ মান্নান (Dr. M. A. Mannan)-এর মতে: “ইসলামি অর্থনীতি হলো এমন এক সামাজিক বিজ্ঞান যা ইসলামের মূলনীতির আলোকে মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আলোচনা করে।”
ইসলামি অর্থনীতির প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য
- আল্লাহর নিরঙ্কুশ মালিকানা: আসমান ও জমিনের যাবতীয় সম্পদের প্রকৃত ও চূড়ান্ত মালিকানা একমাত্র মহান আল্লাহর। মানুষ কেবল একজন আমানতদার ও প্রতিনিধি (খলিফা) হিসেবে সম্পদ ব্যবহার করতে পারে।
- দ্বিমুখী কল্যাণ (দুনিয়া ও আখিরাত): প্রচলিত অর্থনীতির লক্ষ্য কেবল পার্থিব উপযোগ ও মুনাফা বৃদ্ধি; পক্ষান্তরে ইসলামি অর্থনীতির চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো ‘ফালাহ’—যা ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তির সমন্বয়।
- সুদ ও শোষণের সম্পূর্ণ উচ্ছেদ: ইসলাম সুদকে (রিবা) সম্পূর্ণ হারাম ঘোষণা করেছে এবং অংশীদারিত্বমূলক মুনাফা-লোকসান বণ্টন (মুশারাকা ও মুদারাবা) নীতি প্রতিষ্ঠা করেছে।
- সম্পদের সুষম বণ্টন ও সামাজিক নিরাপত্তা: যাকাত, সদকা, ওয়াকফ ও ফিতরার মাধ্যমে ধনীদের ধনভাণ্ডার থেকে সমাজের দরিদ্র ও অসহায় জনগোষ্ঠীর অধিকার সুনিশ্চিত করা হয়।
- হালাল ও হারামের সীমারেখা: অবাধ ভোগ নয়, বরং উপার্জনের প্রতিটি ক্ষেত্রে হালাল ও হারামের সুস্পষ্ট মানদণ্ড বাধ্যতামূলক।
- নৈতিকতা ও অর্থনীতির মেলবন্ধন: এটি কেবল জড়বাদী লাভ-ক্ষতির গণিত নয়, বরং তাকওয়া, পরোপকার, আমানতদারি ও ইনসাফের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
৫। পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা বলতে কী বুঝ? পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার সাথে ইসলামি অর্থব্যবস্থার পার্থক্য আলোচনা কর।
[What do you mean by capitalistic economic system? Distinguish between capitalistic and Islamic economic system.]
পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার পরিচয়
যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় উৎপাদনের উপাদানগুলোর ব্যক্তিগত মালিকানা বিদ্যমান থাকে, অবাধ প্রতিযোগিতা ও স্বয়ংক্রিয় দাম ব্যবস্থার মাধ্যমে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং মুনাফা অর্জনই প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে, তাকে পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা (Capitalism) বলে।
পুঁজিবাদী ও ইসলামি অর্থব্যবস্থার তুলনামূলক পার্থক্য
| বিষয় | পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা | ইসলামি অর্থব্যবস্থা |
|---|---|---|
| মালিকানা দর্শন | সম্পদের ওপর ব্যক্তির নিরঙ্কুশ ও লাগামহীন ব্যক্তিগত মালিকানা স্বীকৃত। | সম্পদের নিরঙ্কুশ মালিক আল্লাহ; মানুষ নৈতিক দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধি ও ট্রাস্টি মাত্র। |
| মূল চালিকাশক্তি | সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জন এবং ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করা। | আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, ব্যক্তিগত চাহিদা পূরণ ও সামষ্টিক জনকল্যাণ (ফালাহ)। |
| সুদ ব্যবস্থা | সুদ হলো মূলধন গঠন ও ব্যাংকিং কাঠামোর প্রধান ভিত্তি। | সুদ (রিবা) সম্পূর্ণ হারাম ও নিষিদ্ধ; লাভ-লোকসানের অংশীদারিত্ব এর ভিত্তি। |
| সম্পদ বণ্টন | সম্পদ মুষ্টিমেয় ধনীদের হাতে পুঞ্জীভূত হয়; চরম শ্রেণি বৈষম্য দেখা দেয়। | যাকাত, উশর ও উত্তরাধিকার আইনের মাধ্যমে সম্পদের বিকেন্দ্রীকরণ ও সুষম বণ্টন নিশ্চিত হয়। |
| নৈতিক দায়বদ্ধতা | নৈতিকতা ও ধর্মীয় অনুশাসনকে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের বাইরে রাখা হয়। | অর্থনৈতিক প্রতিটি সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রম হালাল-হারাম এবং পরকালীন জবাবদিহিতার অধীন। |
| বাজার নিয়ন্ত্রণ | অবাধ বাজার ব্যবস্থা; সিন্ডিকেট ও কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ থাকে। | যৌক্তিক স্বাধীনতা স্বীকৃত, তবে সিন্ডিকেট, একচেটিয়া মজুতদারি (ইহতিকার) ও প্রতারণা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। |
৬। ইসলামে আয় ও ব্যয়ের ধারণা দাও। হালাল উপার্জনের বৈধ পন্থাগুলো আলোচনা কর।
[Give the concept of expenditure and income in Islam. Discuss the rightful method of income.]
ইসলামে আয়ের ধারণা
ইসলামে জীবিকা অর্জন কেবল জাগতিক প্রয়োজন নয়, বরং এটি একটি অন্যতম ইবাদত। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন— “ফরজ ইবাদতসমূহের পর হালাল রিজিক অন্বেষণ করা একটি ফরজ।” ইসলামে আয়ের ক্ষেত্রে মৌলিক শর্ত হলো তা অবশ্যই শরিয়াহসম্মত ও সৎ উপায়ে অর্জিত হতে হবে। জুলুম, মিথ্যা, প্রতারণা বা হারাম পণ্যের কারবার থেকে অর্জিত কোনো আয় ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয়।
ইসলামে ব্যয়ের ধারণা
ইসলাম অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা সুরা আল-ফুরকানের ৬৭ নম্বর আয়াতে ইরশাদ করেন—
«وَالَّذِينَ إِذَا أَنْفَقُوا لَمْ يُسْرِفُوا وَلَمْ يَقْتُرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذَٰلِكَ قَوَامًا»
(এবং তারা যখন ব্যয় করে তখন অপচয়ও করে না, কার্পণ্যও করে না; বরং তারা উভয়ের মধ্যবর্তী অবস্থায় সুদৃঢ় থাকে)।
অপচয় (ইসরাফ) এবং কৃপণতা—উভয়কেই ইসলামে কঠোরভাবে নিন্দা করা হয়েছে।
হালাল উপার্জনের বৈধ পন্থা
- কৃষি ও ভূমিনির্ভর উৎপাদন: কৃষিকাজ ও বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি করা রাসুলুল্লাহ (সা.) কর্তৃক অত্যন্ত প্রশংসিত ও পুণ্যের কাজ।
- শরিয়াহসম্মত ব্যবসা-বাণিজ্য (তিজারাত): সততা ও ইনসাফভিত্তিক ব্যবসা-বাণিজ্য আয়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। হাদিসে বিশ্বস্ত ও সত্যবাদী ব্যবসায়ীকে কেয়ামতের দিন নবী, সিদ্দিক ও শহীদদের সঙ্গী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
- শারীরিক ও মেধাভিত্তিক শ্রম (কাসবুল ইয়াদ): নিজ হাতের উপার্জনকে ইসলাম সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়েছে। হজরত দাউদ (আ.) নিজ হাতে বর্ম তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।
- অংশীদারিত্বমূলক কারবার (মুশারাকা ও মুদারাবা): মূলধন ও শ্রমের যৌথ সমন্বয়ে গঠিত ব্যবসা যেখানে উভয়ে ন্যায়সঙ্গত মুনাফা ও ঝুঁকি ভাগ করে নেয়।
- ভাড়া ও ইজারা চুক্তি: শরিয়াহসম্মত ঘরবাড়ি, জমি বা যানবাহন ভাড়া দিয়ে বৈধ উপায়ে ভাড়া গ্রহণ করা।
খ বিভাগ — সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন
৭। ইসলামি বিমা কী?
[What is Islamic insurance?]
উত্তর: প্রচলিত বিমা ব্যবস্থায় বিদ্যমান সুদ (রিবা), জুয়া (মাইসির) ও অনিশ্চয়তা (গারার) দূর করে পারস্পরিক সহযোগিতা, সংহতি ও আর্থিক সুরক্ষার ইসলামি মূলনীতির ভিত্তিতে পরিচালিত কল্যাণমুখী বিমা ব্যবস্থাকে ইসলামি বিমা বা ‘তাকাফুল’ (تَكَافُل) বলা হয়।
তাকাফুল ব্যবস্থায় গ্রাহকদের প্রদেয় প্রিমিয়াম একটি অনুদান বা ‘তাবাররু’ (تبرع) তহবিলে জমা হয়। কোনো সদস্য ক্ষতিগ্রস্ত হলে ওই তহবিল থেকে ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হয় এবং তহবিলের উদ্বৃত্ত মুনাফা শরিয়াহসম্মতভাবে অংশীদারদের মধ্যে বণ্টন করা হয়।
৮। উপযোগের বৈশিষ্ট্যসমূহ লেখ।
[Write the characteristics of utility.]
উত্তর: কোনো দ্রব্যের মানুষের অভাব পূরণের ক্ষমতাকে উপযোগ (Utility) বলে। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো নিম্নরূপ:
- মানসিক অনুভূতি: উপযোগ দৃশ্যমান কোনো বস্তু নয়; এটি ভোক্তার মানসিক পরিতৃপ্তির ওপর নির্ভরশীল।
- পরিবর্তনশীলতা: সময়, স্থান, রুচি ও ব্যক্তিভেদে একই দ্রব্যের উপযোগ ভিন্ন হতে পারে। যেমন: শীতকালে গরম কাপড়ের উপযোগ গ্রীষ্মকালের চেয়ে বহুগুণ বেশি।
- নৈতিকতার সাথে সম্পর্কহীন: অর্থনীতিতে উপযোগ ভালো-মন্দের বিচার করে না। ক্ষতিকর দ্রব্যেরও (যেমন ধূমপান) ভোক্তার দৃষ্টিতে তাৎক্ষণিক উপযোগ থাকতে পারে।
- ব্যবহার ও উপযোগের পার্থক্য: দ্রব্য ব্যবহারের মাধ্যমেই উপযোগ নিঃশেষ হয়, কিন্তু কেবল ব্যবহারই উপযোগের পরিমাণ নির্দেশ করে না।
- ক্রমহ্রাসমানতা: কোনো নির্দিষ্ট সময়ে ভোক্তা যখন একটি পণ্য ক্রমাগত ভোগ করতে থাকে, তখন পরবর্তী এককগুলো থেকে প্রাপ্ত প্রান্তিক উপযোগ ক্রমান্বয়ে হ্রাস পায়।
৯। মুদ্রাস্ফীতি বলতে কী বুঝ?
[What do you mean by inflation?]
উত্তর: যখন সামগ্রিক বাজারে পণ্যের উৎপাদন ও যোগানের তুলনায় অর্থের সরবরাহ মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি পায়, যার ফলে দ্রব্যমূল্যের সাধারণ স্তর ক্রমাগত বাড়তে থাকে এবং অর্থের ক্রয়ক্ষমতা স্থায়ীভাবে হ্রাস পায়, তখন সেই অবস্থাকে অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি (Inflation) বলে।
অধ্যাপক কুলবোর্ন (Coulborn)-এর ভাষায়: “Too much money chasing too few goods” (অধিক পরিমাণ অর্থ স্বল্প পরিমাণ দ্রব্যের পেছনে ধাবিত হওয়াকেই মুদ্রাস্ফীতি বলা হয়)।
১০। মুনাফা ও সুদের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ কর।
[Make a distinction between profit and interest.]
উত্তর: মুনাফা ও সুদের মৌলিক পার্থক্যসমূহ নিচে উপস্থাপন করা হলো:
- সংজ্ঞা: মূলধন ও শ্রম খাটিয়ে ব্যবসায়িক সাফল্যের মাধ্যমে যে অনিশ্চিত উদ্বৃত্ত আয় অর্জিত হয় তা মুনাফা; পক্ষান্তরে ঋণের বিনিময়ে চুক্তিবদ্ধ নির্দিষ্ট অতিরিক্ত অর্থই হলো সুদ।
- ঝুঁকি ও দায়ভার: মুনাফায় লাভ ও লোকসান উভয়ের ঝুঁকি বিদ্যমান থাকে; কিন্তু সুদে ঋণদাতার কোনো ঝুঁকি থাকে না, borrower-এর লোকসান হলেও সুদ পরিশোধ বাধ্যতামূলক।
- বৈধতা: ইসলামে শরিয়াহসম্মত মুনাফা হালাল এবং সুদ বা রিবা সম্পূর্ণ হারাম। আল-কুরআনে বলা হয়েছে— “আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন” (সুরা বাকারা: ২৭৫)।
- অর্থনৈতিক প্রভাব: মুনাফা নতুন কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও সুষম বণ্টনে সহায়ক; অপরদিকে সুদ সমাজে বৈষম্য, শোষণের প্রাচীর ও অর্থনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি করে।
১১। যাকাতের নিসাব আলোচনা কর।
[Discuss the nisab of zakat.]
উত্তর: শরিয়তের পরিভাষায় কোনো ব্যক্তির কাছে মৌলিক প্রয়োজন ও ঋণ বাদ দিয়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ বর্ধনশীল ধনসম্পদ এক পূর্ণ চান্দ্রবছর স্থিতিশীল থাকলে তার ওপর যাকাত ফরজ হয়। যাকাত ফরজ হওয়ার জন্য সম্পদের এই ন্যূনতম নির্ধারিত পরিমাণকে ‘নিসাব’ (نصاب) বলা হয়।
নিসাবের পরিমাণ:
- স্বর্ণের ক্ষেত্রে: সাড়ে সাত (৭.৫) তোলা বা ভরি (প্রায় ৮৭.৪৮ গ্রাম বা ৮৫ গ্রাম বিশুদ্ধ স্বর্ণ)।
- রৌপ্যের ক্ষেত্রে: সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) তোলা বা ভরি (প্রায় ৬১২.৩৬ গ্রাম বা ৫৯৫ গ্রাম রৌপ্য)।
- নগদ অর্থ ও ব্যবসায়িক পণ্যের ক্ষেত্রে: সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্যের সমমূল্যের নগদ টাকা, সঞ্চয়পত্র বা বিক্রয়যোগ্য ব্যবসায়ের পণ্য থাকলে ২.৫% (শতকরা আড়াই টাকা) হারে যাকাত আদায় করতে হয়।
১২। ইসলামি ব্যাংকের কাজসমূহ লেখ।
[Write the mode of operations of an Islamic Bank.]
উত্তর: ইসলামি শরিয়াহর নির্দেশিত সুদবিহীন ও কল্যাণমুখী নীতিমালার আলোকে পরিচালিত ইসলামি ব্যাংকের প্রধান কার্যাবলি নিম্নরূপ:
- আমানত গ্রহণ: সুদবিহীন চলতি হিসাব (আল-ওয়াদিয়াহ) এবং অংশীদারিত্বভিত্তিক সঞ্চয়ী ও মেয়াদি হিসাবের (মুদারাবা) মাধ্যমে আমানত সংগ্রহ করা।
- বিনিয়োগ পরিচালনা: মুশারাকা (যৌথ মূলধনি অংশীদারিত্ব), মুদারাবা (এক পক্ষের মূলধন ও অন্য পক্ষের শ্রম), মুরাবাহা (নির্দিষ্ট লাভে ক্রয়-বিক্রয়), এবং ইজারা (ভাড়ায় সম্পদ সরবরাহ) পদ্ধতিতে শরিয়াহসম্মত খাতে অর্থ বিনিয়োগ।
- ক্ষুদ্রঋণ ও কর্জে হাসানা: প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাবলম্বন ও আপৎকালীন সহায়তার জন্য সুদবিহীন ঋণ বা কর্জে হাসানা প্রদান।
- বৈদেশিক বাণিজ্য ও রেমিট্যান্স সেবা: শরিয়াহ অনুবর্তী ঋণপত্র (LC) খোলা এবং দ্রুত প্রবাসী আয় বিতরণ।
- সামাজিক দায়বদ্ধতা ও যাকাত তহবিল পরিচালনা: নিজস্ব যাকাত ও সাদাকাহ ফান্ড গঠনের মাধ্যমে দরিদ্র বিমোচন, শিক্ষা বৃত্তি প্রদান ও চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণ।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
অর্থনীতি ও ইসলামি অর্থনীতির মূল পার্থক্য কোথায়?
প্রচলিত অর্থনীতি কেবল জাগতিক মুনাফা ও অসীম অভাবের বস্তুগত সমাধানে সীমাবদ্ধ; পক্ষান্তরে ইসলামি অর্থনীতি ইহকালীন প্রাচুর্যের পাশাপাশি পরকালীন জবাবদিহিতা ও ইনসাফভিত্তিক মানবকল্যাণকে প্রাধান্য দেয়।
ইসলামি বিমা বা তাকাফুলের মূল দর্শন কী?
তাকাফুলের মূল দর্শন হলো পারস্পরিক সহযোগিতা (তাআউন), যৌথ দায়িত্ববোধ এবং গ্রাহকদের দানকৃত প্রিমিয়ামের মাধ্যমে গঠিত তহবিলের সহায়তায় ক্ষতিগ্রস্ত সদস্যকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদান।
সুদ ও মুনাফার মধ্যে সবচেয়ে দৃশ্যমান অর্থনৈতিক পার্থক্য কী?
মুনাফা ব্যবসায়িক ঝুঁকি ও বাস্তব লাভ-লোকসানের ওপর নির্ভরশীল, যা হালাল; পক্ষান্তরে সুদ একটি পূর্বনির্ধারিত বাধ্যতামূলক উদ্বৃত্ত যা উদ্যোক্তার লোকসান হলেও দাবি করা হয়, যা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম।
যাকাতের নিসাব নির্ধারণে রৌপ্যের হিসাব কেন প্রাধান্য পায়?
দরিদ্রদের সর্বোচ্চ কল্যাণের স্বার্থে আধুনিক যুগে নগদ টাকা ও ব্যবসার পণ্যের যাকাত নির্ধারণে রৌপ্যের নিসাবকে (সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্যের সমমূল্য) অধিকাংশ ফকিহগণ অগ্রাধিকার দেন।
উৎপাদনের চারটি উপাদানের মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান কোনটি?
সংগঠন বা উদ্যোক্তা হলো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান, কারণ তিনি ভূমি, শ্রম ও মূলধনের নিশ্চিত প্রতিদান পরিশোধের পর অবশিষ্ট অনিশ্চিত মুনাফা বা লোকসানের দায় এককভাবে গ্রহণ করেন।
মুদারাবা ও মুশারাকার মধ্যে পার্থক্য কী?
মুদারাবায় এক পক্ষ মূলধন দেয় এবং অন্য পক্ষ মেধা ও শ্রম দেয়; পক্ষান্তরে মুশারাকায় উভয় পক্ষই মূলধন বিনিয়োগ করে এবং পূর্বচুক্তি অনুযায়ী লাভ-লোকসান ভাগ করে নেয়।