ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ৩য় বর্ষ পরীক্ষা 2021
বিভাগ: ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
বিষয়: অর্থনীতি ও ইসলামী অর্থনীতি (Economics and Islamic Economics)
বিষয় কোড: 205302 | পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
[দ্রষ্টব্য: (ক) বিভাগ থেকে ৪টি এবং (খ) বিভাগ থেকে ৪টি প্রশ্নের উত্তর দাও।]
ক বিভাগ: রচনামূলক প্রশ্নাবলি
১. অর্থনীতির সংজ্ঞা দাও। অর্থনীতির বিষয়বস্তু আলোচনা কর।
[Define economics? Discuss the subject-matter of economics.]
ক. অর্থনীতির সংজ্ঞা (Definition of Economics):
অর্থনীতি হলো মানুষের দৈনন্দিন পার্থিব কার্যাবলি এবং সম্পদ আহরণ ও ব্যবহারের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ। বিভিন্ন যুগে অর্থনীতিবিদগণ বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে এর সংজ্ঞা দিয়েছেন:
- অ্যাডাম স্মিথের সংজ্ঞা (১৭৭৬): ক্লাসিক্যাল অর্থনীতির জনক অ্যাডাম স্মিথ তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘The Wealth of Nations’-এ বলেছেন, অর্থনীতি হলো এমন একটি শাস্ত্র যা জাতিসমূহের সম্পদের প্রকৃতি ও কারণ অনুসন্ধান করে (Science of Wealth)।
- আলফ্রেড মার্শালের সংজ্ঞা (১৮৯০): নিও-ক্লাসিক্যাল অর্থনীতিবিদ আলফ্রেড মার্শাল ‘Principles of Economics’ গ্রন্থে অর্থনীতিকে মানবকল্যাণের বিজ্ঞান (Science of Material Welfare) বলে আখ্যায়িত করেন। তাঁর মতে, অর্থনীতি একদিকে সম্পদের আলোচনা এবং অন্যদিকে মানবজীবনের বৈষয়িক কল্যাণ অর্জনের অধ্যয়ন।
- এল. রবিন্সের আধুনিক সংজ্ঞা (১৯৩২): আধুনিক অর্থনীতির সর্বাপেক্ষা বিজ্ঞানসম্মত ও সর্বজনীন সংজ্ঞা দিয়েছেন লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের অধ্যাপক লায়নেল রবিন্স: “Economics is the science which studies human behavior as a relationship between ends and scarce means which have alternative uses.” অর্থাৎ অর্থনীতি এমন একটি বিজ্ঞান যা অসীম অভাব এবং বিকল্প ব্যবহারযোগ্য সীমিত সম্পদের সম্পর্কযুক্ত মানবীয় আচরণ বিশ্লেষণ করে।
খ. অর্থনীতির বিষয়বস্তু (Subject Matter of Economics):
- অভাব ও দুষ্প্রাপ্যতা: মানুষের অভাব অসীম, কিন্তু অভাব পূরণের প্রয়োজনীয় সম্পদ অত্যন্ত সীমিত। এ দুষ্প্রাপ্যতার মুখোমুখি হয়ে মানুষ কীভাবে পছন্দ (Choice) ও অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে, তা অর্থনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু।
- উৎপাদন (Production): মানুষের অভাব মেটানোর জন্য প্রাকৃতিক সম্পদের রূপ পরিবর্তনের মাধ্যমে উপযোগ সৃষ্টি করাই হলো উৎপাদন। উৎপাদনের চারটি উপাদান—ভূমি, শ্রম, মূলধন ও সংগঠন—কীভাবে দক্ষতার সাথে সমন্বিত হয়, তা আলোচিত হয়।
- বিনিময় ও বাজার (Exchange & Market): উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী অর্থ বা মূল্যের মাধ্যমে ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে বণ্টনের যাবতীয় লেনদেন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য।
- বণ্টন (Distribution): উৎপাদনের যৌথ প্রক্রিয়ায় সৃষ্ট মোট জাতীয় আয় কীভাবে উৎপাদনের উপাদানসমূহের মধ্যে খাজনা, মজুরি, সুদ ও মুনাফা হিসেবে বণ্টিত হয় তার বিশ্লেষণ।
- ভোগ (Consumption): দ্রব্যের উপযোগ ব্যবহারের মাধ্যমে অভাব পূরণের প্রক্রিয়া। এর আওতায় ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধি ও ভোক্তা আচরণ তত্ত্ব বিশদভাবে পর্যালোচিত হয়।
- সামষ্টিক অর্থনীতি ও উন্নয়ন: জাতীয় আয়, সামগ্রিক কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সাধন অর্থনীতির আধুনিক মূল লক্ষ্য।
২. চাহিদা ও যোগান কী? চাহিদা ও যোগানের সনাতন তত্ত্বটি বর্ণনা কর।
[What is demand and supply? Describe the conventional theory of demand and supply.]
ক. চাহিদা ও যোগানের ধারণা:
- চাহিদা (Demand): সাধারণ কথায় কোনো জিনিস চাওয়াই চাহিদা, কিন্তু অর্থনীতিতে কেবল ইচ্ছা যথেষ্ট নয়। কার্যকর চাহিদা হতে হলে তিনটি উপাদান অপরিহার্য: (১) দ্রব্যটি পাওয়ার ইচ্ছা, (২) ক্রয়ের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সামর্থ্য এবং (৩) অর্থ ব্যয় করার মানসিক প্রস্তুতি। এ তিনের সমন্বয়ে কোনো নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট মূল্যে একজন ক্রেতা যে পরিমাণ দ্রব্য ক্রয় করতে ইচ্ছুক ও সক্ষম হয়, তাকে চাহিদা বলে।
- যোগান (Supply): কোনো নির্দিষ্ট সময়ে ও নির্দিষ্ট মূল্যে বিক্রেতা বা উৎপাদকগণ তাঁদের মজুত পণ্যের যে নির্দিষ্ট অংশ বাজারে বিক্রয়ের জন্য প্রস্তুত বা রাজি থাকেন, তাকে যোগান বলে।
খ. চাহিদা ও যোগানের সনাতন তত্ত্ব (ভারসাম্য দাম নির্ধারণ):
ক্লাসিক্যাল ও নিও-ক্লাসিক্যাল অর্থনীতিবিদদের মতে, একটি সম্পূর্ণ মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক বাজারে ক্রেতা ও বিক্রেতার দরকষাকষির মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় মূল্য ব্যবস্থার সাহায্যে চাহিদা ও যোগানের পারস্পরিক সমতা বিন্দুতে একটি নির্দিষ্ট ভারসাম্য দাম ও পরিমাণ নির্ধারিত হয়।
- চাহিদা বিধি: অন্যান্য অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে দ্রব্যের দাম বাড়লে চাহিদা হ্রাস পায় এবং দাম কমলে চাহিদা বৃদ্ধি পায়। ফলে চাহিদা রেখা বাম থেকে ডান দিকে নিম্নগামী হয়।
- যোগান বিধি: অন্যান্য অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে দ্রব্যের দাম বাড়লে মুনাফার আশায় বিক্রেতারা বেশি পণ্য বিক্রি করতে চায়, ফলে যোগান বাড়ে; দাম কমলে যোগান হ্রাস পায়। ফলে যোগান রেখা বাম থেকে ডান দিকে ঊর্ধ্বগামী হয়।
- ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা: বাজারে যখন চাহিদা ও যোগানের পরিমাণ সমান হয় (D = S), তখন যে দাম নির্ধারিত হয় তাকে ভারসাম্য দাম বলে।
- যদি দাম ভারসাম্যের চেয়ে বৃদ্ধি পায়, তবে যোগান চাহিদার চেয়ে বেশি হয় (S > D)। বাজারে উদ্বৃত্ত দেখা দিলে বিক্রেতাদের প্রতিযোগিতায় দাম কমতে বাধ্য হয়।
- যদি দাম ভারসাম্যের চেয়ে কমে যায়, তবে চাহিদা যোগানের চেয়ে বেশি হয় (D > S)। বাজারে ঘাটতি তৈরি হলে ক্রেতাদের অতিরিক্ত চাহিদায় দাম পুনরায় বৃদ্ধি পায়।
- এভাবে অদৃশ্য হস্তের নির্দেশে বাজারে শেষ পর্যন্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে চাহিদা ও যোগানের সমতা প্রতিষ্ঠিত হয়।
৩. ইসলামি অর্থনীতির সংজ্ঞা দাও। ইসলামি অর্থনীতির উৎস হিসেবে কুরআন ও হাদিসের গুরুত্ব নিরূপণ কর।
[Determine the significance of Quran and Hadith as the source of Islamic economy.]
ক. ইসলামি অর্থনীতির সংজ্ঞা:
ইসলামি অর্থনীতি হলো এমন এক ঐশী ও সামগ্রিক অর্থব্যবস্থা যা পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর মৌলিক বিধান এবং শরীয়াহর নির্দেশনার আলোকে মানবজাতির সম্পদ আহরণ, উৎপাদন, বণ্টন ও ভোগ নিয়ন্ত্রণ করে পৃথিবীতে ন্যায়বিচার ও শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং পরকালে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও মুক্তি (ফালাহ) অর্জনের নিশ্চয়তা প্রদান করে।
খ. ইসলামি অর্থনীতির উৎস হিসেবে আল-কুরআনের গুরুত্ব:
- মৌলিক দর্শনের ঘোষণা: পবিত্র কুরআন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে মহাবিশ্বের সকল দৃশ্য-অদৃশ্য সম্পদের নিরঙ্কুশ ও একক মালিক হলেন আল্লাহ তা’আলা: “আসমান ও জমিনের রাজত্ব একমাত্র আল্লাহরই।” (সূরা আলে ইমরান: ১৮৯)। মানুষ এই সম্পদের স্বাধীন মালিক নয়, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে নিযুক্ত বিশ্বস্ত আমানতদার।
- হালাল-হারামের সুস্পষ্ট সীমারেখা: অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ন্যায় ও অন্যায়ের পার্থক্য নির্ধারণে কুরআনই চূড়ান্ত মানদণ্ড: “আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম।” (সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)। এছাড়া ঘুষ, জুয়া, প্রতারণা ও খাদ্যে ভেজাল দেওয়াকে কঠিন অপরাধ ঘোষণা করা হয়েছে।
- সুনির্দিষ্ট বাধ্যতামূলক পুনর্বণ্টন ব্যবস্থা: ধনীদের পুঞ্জীভূত সম্পদ থেকে বাধ্যতামূলকভাবে অভাবীদের মাঝে বণ্টনের জন্য যাকাতের সুস্পষ্ট আটটি খাত কুরআনুল কারীমের সূরা আত-তাওবার ৬০ নম্বর আয়াতে সুনির্দিষ্টভাবে বিধিবদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
- অপচয় ও কৃপণতা উভয়ই বর্জন: ইসলাম মধ্যমপন্থার অর্থনীতি। কুরআন বলে: “তোমরা খাও এবং পান কর, কিন্তু অপচয় করো না; নিশ্চয়ই আল্লাহ অপচয়কারীকে পছন্দ করেন না।” (সূরা আল-আ’রাফ: ৩১)।
গ. উৎস হিসেবে পবিত্র সুন্নাহ ও হাদীসের গুরুত্ব:
- কুরআনিক বিধানের বাস্তব প্রয়োগ: কুরআনে যাকাত প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু ফসলের উশর, স্বর্ণ-রৌপ্য ও গবাদিপশুর নিসাব এবং যাকাতের হার (২.৫%) সুন্নাহর মাধ্যমেই প্রমিত হয়েছে।
- বাণিজ্যিক সততা ও শ্রমিকের অধিকার: রাসূলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন: “শ্রমিকের গায়ের ঘাম শুকানোর পূর্বেই তার ন্যায্য মজুরি পরিশোধ কর।” (ইবনে মাজাহ)। তিনি আরও বলেন: “সৎ ও বিশ্বস্ত আমানতদার ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন নবী, সিদ্দিকীন ও শহীদদের সাথে থাকবে।” (তিরমিযী)।
- মজুতদারি ও কালোবাজারি নিষিদ্ধকরণ: বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারী মজুতদারদের সম্পর্কে রাসূল (সা.) কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন: “যে ব্যক্তি বাজারে পণ্যের সংকট তৈরি করার উদ্দেশ্যে খাদ্যশস্য মজুত করে, সে অপরাধী ও পাপী।” (সহীহ মুসলিম)।
৪. ইসলামি অর্থনীতি ও আধুনিক অর্থনীতির পার্থক্য নিরূপণ কর।
[Determine the differences between Islamic economics and Modern economics.]
ভূমিকা: আধুনিক সাধারণ অর্থনীতি (পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র) মানুষের বস্তুগত ভোগের ওপর ভিত্তি করে রচিত, পক্ষান্তরে ইসলামি অর্থনীতি পার্থিব সমৃদ্ধির পাশাপাশি আধ্যাত্মিক ও নৈতিক মূল্যবোধের সমন্বয়ে গঠিত এক ভারসাম্যপূর্ণ জীবনবিধান।
প্রধান পার্থক্যসমূহের তুলনামূলক ছক:
| তুলনার বিষয় | আধুনিক অর্থনীতি (পুঁজিবাদ/সমাজতন্ত্র) | ইসলামি অর্থনীতি |
|---|---|---|
| ১. উৎপত্তির ভিত্তি | মানুষের সীমিত বুদ্ধি, ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা ও দার্শনিক চিন্তাপ্রসূত। | মহান আল্লাহর ঐশী ওহী (আল-কুরআন) এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহভিত্তিক। |
| ২. সম্পদের মালিকানা | পুঁজিবাদে ব্যক্তির অবাধ মালিকানা এবং সমাজতন্ত্রে রাষ্ট্রের সর্বগ্রাসী মালিকানা। | চূড়ান্ত মালিকানা আল্লাহর; মানুষ কেবল সীমিত ও শর্তসাপেক্ষ আমানতদার। |
| ৩. অর্থনৈতিক লক্ষ্য | একমাত্র পার্থিব বস্তুগত মুনাফা ও ভোগ-উপযোগ সর্বোচ্চকরণ। | উভয় জাহানের সামগ্রিক কল্যাণ লাভ ও আল্লাহর সন্তুষ্টি (ফালাহ) অর্জন। |
| ৪. নৈতিক বাধানিষেধ | চাহিদা থাকলে মদ, জুয়া, লটারি, অনৈতিক ব্যবসা সবই বৈধ পণ্য। | কঠোরভাবে হালাল পণ্যের বাণিজ্য বৈধ; ক্ষতিকর ও অনৈতিক পণ্য সম্পূর্ণ হারাম। |
| ৫. আর্থিক চালিকাশক্তি | সুদভিত্তিক (Interest-based); যার মাধ্যমে ধনীরা শোষণ চালায়। | সুদমুক্ত এবং লাভ-ক্ষতির অংশীদারিত্ব ও যাকাত-সাদাকাহভিত্তিক। |
| ৬. সামাজিক বৈষম্য | পুঁজিবাদে ধনী-দরিদ্রের পাহাড়সম বৈষম্য ও শ্রেণিদ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। | সম্পদ যাতে কেবল ধনীদের মধ্যেই আবর্তিত না হয় তার সুদৃঢ় সুরক্ষা প্রদান করে। |
৫. ইসলামে মুনাফা ও সুদ বলতে কী বুঝায়? ইসলামে সুদ নিষিদ্ধ কেন? কুরআন ও হাদিসের আলোকে আলোচনা কর।
[What is meant by profit and interest in Islam? Why is interest prohibited in Islam? Discuss in the light of Quran and Hadith.]
ক. মুনাফা ও সুদের সংজ্ঞা:
- মুনাফা (Profit / আর-রিবহ): ব্যবসা-বাণিজ্যে মূলধন ও শ্রম বিনিয়োগ করে ঝুঁকি গ্রহণের পর বিক্রয়লব্ধ মোট আয় থেকে উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয় বাদ দেওয়ার পর যে উদ্বৃত্ত অর্জিত হয়, তাকে মুনাফা বলে। ইসলামে ঝুঁকি, শ্রম ও মূলধনের সমন্বয়ে অর্জিত মুনাফাকে সম্পূর্ণ হালাল করা হয়েছে।
- সুদ (Interest / আর-রিবা): আরবিতে ‘রিবা’ শব্দের অর্থ অতিরিক্ত, বৃদ্ধি বা বাড়তি। শরীয়তের পরিভাষায়, ঋণের চুক্তির শর্ত হিসেবে মূলধনের ওপর কোনো প্রকার ঝুঁকি ও শ্রম গ্রহণ না করে সময়ের ব্যবধানে গ্রহীতার কাছ থেকে যে পূর্বনির্ধারিত অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ করা হয়, তাকে সুদ বলে।
খ. ইসলামে সুদ নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ:
- চরম অবিচার ও একতরফা শোষণ: ব্যবসায়ে বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তা লাভ বা লোকসান উভয় ঝুঁকির সম্মুখীন হয়। কিন্তু সুদখোর মহাজন কোনো ঝুঁকি না নিয়ে নিশ্চিত অতিরিক্ত দাবি করে, যা স্পষ্ট জুলুম।
- সম্পদের কেন্দ্রীভবন ও সমাজের মেরুকরণ: সুদের মাধ্যমে সমাজের গরিব ও অভাবী মানুষদের উপার্জিত অর্থ ক্রমাগত ধনীদের হাতে পুঞ্জীভূত হয়, ফলে সমাজে ভয়াবহ বৈষম্য তৈরি হয়।
- উৎপাদনশীল বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান ব্যাহত হওয়া: মানুষ যখন ঘরে বসে ঝুঁকিমুক্ত সুদের নিশ্চয়তা পায়, তখন সে বাস্তব শিল্প-কারখানা ও ঝুঁকিপূর্ণ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করতে নিরুৎসাহিত হয়।
- সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ ধ্বংস: বিপদে মানুষকে সুদমুক্ত ঋণ (করযে হাসানা) না দিয়ে বিপদের সুযোগে অতিরিক্ত সুদ আদায় করা চরম নিষ্ঠুরতা ও সামাজিক সংহতি ধ্বংসের মূল কারণ।
গ. কুরআন ও হাদীসে সুদের ভয়াবহ নিষেধাজ্ঞা:
- আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা: পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যা অবশিষ্ট আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা প্রকৃত মুমিন হও। কিন্তু যদি তোমরা তা না কর, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও।” (সূরা আল-বাকারা: ২৭৮-২৭৯)।
- কিয়ামতের দিন শয়তানের স্পর্শে উন্মাদ ব্যক্তির মতো উঠা: “যারা সুদ খায়, তারা কিয়ামতের দিন সেই ব্যক্তির মতো দাঁড়াবে যাকে শয়তান তার স্পর্শ দ্বারা পাগল করে দিয়েছে।” (সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)।
- হাদীসের কঠোর অভিশাপ: সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় হযরত জাবির (রা.) বলেন: “রাসূলুল্লাহ (সা.) সুদখোর, সুদদাতা, সুদের হিসাব লেখক এবং সুদের দুই সাক্ষীর ওপর অভিশাপ বর্ষণ করেছেন এবং বলেছেন—তারা সবাই সমান পাপী।”
৬. সমাজে দারিদ্র্য দূরীকরণে যাকাতের ভূমিকা আলোচনা কর।
[Discuss the role of zakat in eradication of poverty in society.]
ভূমিকা: দারিদ্র্য মানবজাতির জন্য এক চরম অভিশাপ। ইসলাম নিছক মুখের উপদেশে দারিদ্র্য বিমোচন করতে চায় না, বরং যাকাতের মতো এক বাধ্যতামূলক, প্রাতিষ্ঠানিক ও বৈজ্ঞানিক রাজস্ব ব্যবস্থার মাধ্যমে সমাজের তলদেশ থেকে দারিদ্র্যকে চিরতরে নির্মূল করার বিধান দিয়েছে।
দারিদ্র্য দূরীকরণে যাকাতের কার্যকারিতা:
- সম্পদের বাধ্যতামূলক সামাজিক প্রবাহ: কুরআনের অমোঘ নির্দেশ: “যাতে ধন-সম্পদ কেবল তোমাদের ধনীদের মধ্যেই পুঞ্জীভূত হয়ে আবর্তিত না হয়।” (সূরা আল-হাশর: ৭)। যাকাতের মাধ্যমে প্রতি বছর ধনীদের মোট উদ্বৃত্ত সম্পদের ২.৫% দরিদ্রদের হাতে প্রবাহিত হয়, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সামাজিক সমতা আনে।
- টেকসই পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি: ইসলামি ফিকহের নির্দেশনা হলো দরিদ্রদের সামান্য ভিক্ষা দিয়ে চিরকাল দরিদ্র রাখা যাকাতের উদ্দেশ্য নয়; বরং এককালীন পর্যাপ্ত সম্পদ (যেমন—কৃষি জমি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পুঁজি, রিকশা বা সেলাই মেশিন) দিয়ে তাকে স্থায়ীভাবে সচ্ছল ও স্বাবলম্বী করে তোলাই যাকাতের লক্ষ্য।
- সামগ্রিক চাহিদা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি: দরিদ্র শ্রেণির মানুষের মৌলিক চাহিদার ঘাটতি থাকে। যাকাতের অর্থ পেলে তারা বাজারে খাদ্য, বস্ত্র ও চিকিৎসার পেছনে ব্যয় করে। ফলে স্থানীয় পণ্যের চাহিদা বাড়ে, কারখানাগুলোতে উৎপাদন বাড়ে এবং জাতীয় আয় বৃদ্ধি পায়।
- ঋণগ্রস্ত ও দেউলিয়াদের মুক্তি: যাকাতের অন্যতম খাত হলো ‘আল-গারিমিন’ (ঋণগ্রস্তদের ঋণ পরিশোধ)। অভাবের কারণে যারা সুদের জালে জর্জরিত হয়ে দেউলিয়া হয়ে পড়েছে, তাদেরকে যাকাত থেকে মুক্ত করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা হয়।
- ঐতিহাসিক বাস্তব সাফল্য: খলিফা উমর ইবনে আব্দুল আজিজ (র.)-এর আমলে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে রাষ্ট্রীয়ভাবে বায়তুল মালের মাধ্যমে যাকাত সংগ্রহ ও বিতরণ করা হয়েছিল। ইতিহাস সাক্ষী, তখন আফ্রিকা ও ইয়েমেনের গভর্নরেরা যাকাতের অর্থ নিয়ে ঘুরেও তা গ্রহণ করার মতো একজন হকদার ফকিরও খুঁজে পাননি। এটিই প্রমাণ করে সঠিক প্রয়োগে যাকাত দারিদ্র্য দূরীকরণের সর্বশ্রেষ্ঠ অব্যর্থ হাতিয়ার।
খ বিভাগ: সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি
৭. ইসলামি ব্যাংকিং বলতে কী বুঝায়?
[What is Islamic banking?]
ইসলামি ব্যাংকিং হলো এমন একটি সার্বিক আর্থিক ও বাণিজ্যিক মধ্যস্থতাকারী ব্যাংকিং ব্যবস্থা যা সম্পূর্ণভাবে পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর শরীয়াহ নীতিমালার অধীনে পরিচালিত হয় এবং যা সুদ (রিবা), জুয়া (মাইসির) ও অনিশ্চয়তা (গারার) পরিহার করে আমানত গ্রহণ ও বিনিয়োগ পরিচালনা করে। এটি সুদের বিনিময়ে ঋণ দেয় না; বরং লাভ-ক্ষতির অংশীদারিত্ব (মুদারাবা ও মুশারাকা) এবং বাস্তব সম্পদের কেনাবেচা ও ভাড়ার মাধ্যমে (মুরাবাহা, বাই-মুয়াজ্জাল ও ইজারা) ব্যবসা পরিচালনা করে সমাজের কল্যাণ নিশ্চিত করে।
৮. একচেটিয়া বাজার সম্পর্কে ধারণা দাও।
[Give an idea about the monopoly market.]
যে বাজারে কোনো নির্দিষ্ট দ্রব্যের কেবল একজনমাত্র উৎপাদক বা বিক্রেতা থাকে এবং বাজারে ওই দ্রব্যের কোনো নিকট বিকল্প দ্রব্য (Close Substitute) থাকে না, তাকে একচেটিয়া বাজার (Monopoly Market) বলে। গ্রিক শব্দ ‘Mono’ (একক) এবং ‘Polein’ (বিক্রয় করা) থেকে এর উৎপত্তি। এ বাজারে নতুন ফার্মের প্রবেশ পুরোপুরি অবরুদ্ধ থাকে এবং একক বিক্রেতা পণ্যের সামগ্রিক যোগান নিয়ন্ত্রণ করে ইচ্ছেমতো দাম নির্ধারণের পূর্ণ ক্ষমতা (Price Maker) ভোগ করে। ইসলামে কৃত্রিম উপায়ে একচেটিয়া বাজার সৃষ্টি ও পণ্য মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করাকে ‘ইহতিকার’ আখ্যা দিয়ে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
৯. মুদ্রাস্ফীতি বলতে কী বুঝায়?
[What is meant by inflation of money?]
অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি (Inflation) হলো এমন একটি অর্থনৈতিক অবস্থা যেখানে বাজারে পণ্যের সামগ্রিক মূল্যস্তর অব্যাহতভাবে ও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায় এবং বিপরীতভাবে অর্থের নিজস্ব ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পায়। অর্থনীতিবিদ কোলবর্নের ভাষায়: “Too much money chasing too few goods.” অতিরিক্ত কাগজি মুদ্রা ছাপানো, ব্যাংক ঋণের মাত্রাতিরিক্ত বিস্তার, দ্রব্যের উৎপাদন ঘাটতি কিংবা কাঁচামালের আন্তর্জাতিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে মুদ্রাস্ফীতি ঘটে থাকে। এর ফলে সাধারণ নির্দিষ্ট আয়ের দিনমজুর ও চাকরিজীবীদের প্রকৃত আয় কমে যায় এবং জীবনযাত্রার ব্যয় অসহনীয় হয়ে ওঠে।
১০. আইডিবি উপর একটি টীকা লিখ।
[Write a short note on IDB.]
ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (Islamic Development Bank – IDB) হলো মুসলিম বিশ্বের ৫৭টি দেশের সমন্বয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক বহুমুখী উন্নয়নমূলক আর্থিক প্রতিষ্ঠান। ১৯৭৩ সালের ডিসেম্বর মাসে ওআইসির (OIC) সদস্য দেশসমূহের অর্থমন্ত্রীদের সম্মেলনে ঐতিহাসিক ঘোষণার মাধ্যমে এটি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৭৫ সালের অক্টোবর মাসে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করে। এর প্রধান কার্যালয় সৌদি আরবের জেদ্দায় অবস্থিত। আইডিবির মূল উদ্দেশ্য হলো ইসলামি শরীয়াহর সুদমুক্ত মূলনীতির ভিত্তিতে সদস্য দেশগুলোর আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন সাধন, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, অবকাঠামো নির্মাণে সহজ শর্তে ঋণ ও অনুদান প্রদান এবং মুসলিম দেশসমূহের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও দারিদ্র্য বিমোচনে কারিগরি সহায়তা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশ আইডিবির অন্যতম সক্রিয় সুবিধাভোগী সদস্য রাষ্ট্র।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. ক্লাসিক্যাল অর্থনীতির জনক কাকে বলা হয়?
অ্যাডাম স্মিথকে ক্লাসিক্যাল অর্থনীতির জনক বলা হয়, যিনি ১৭৭৬ সালে ‘The Wealth of Nations’ গ্রন্থ রচনার মাধ্যমে অর্থনীতিকে সম্পদের বিজ্ঞান হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন।
২. ইসলামি অর্থনীতিতে সম্পদের প্রকৃত মালিক কে?
ইসলামি অর্থনীতিতে মহাবিশ্বের সকল সম্পদের প্রকৃত ও চূড়ান্ত মালিক হলেন সর্বশক্তিমান আল্লাহ তা’আলা; মানুষ পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে এই সম্পদের আমানতদার মাত্র।
৩. ইসলামে সুদ ও মুনাফার মূল পার্থক্য কী?
মুনাফা হলো ব্যবসায় ঝুঁকি ও শ্রমের সমন্বয়ে পণ্য বিক্রয়ের পর অর্জিত বৈধ উদ্বৃত্ত, আর সুদ হলো কোনো প্রকার ঝুঁকি না নিয়ে ঋণের ওপর বাধ্যতামূলক পূর্বনির্ধারিত অন্যায্য অতিরিক্ত গ্রহণ।
৪. কুরআনে সুদের বিরুদ্ধে কী কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে?
সূরা আল-বাকারার ২৭৯ নম্বর আয়াতে যারা সুদ বর্জন করে না, তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
৫. ইসলামি ব্যাংকের প্রধান দুটি বিনিয়োগ পদ্ধতির নাম কী?
ইসলামি ব্যাংকের প্রধান দুটি লাভ-ক্ষতির অংশীদারিত্বমূলক বিনিয়োগ পদ্ধতি হলো ‘মুদারাবা’ (মূলধন ও শ্রমের অংশীদারিত্ব) এবং ‘মুশারাকা’ (যৌথ মূলধনী অংশীদারিত্ব)।
৬. ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি)-এর সদর দপ্তর কোথায় অবস্থিত?
ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি)-এর কেন্দ্রীয় সদর দপ্তর সৌদি আরবের জেদ্দা শহরে অবস্থিত।