ভারতে মুসলমানদের ইতিহাস (৭১২—১৫২৬ খ্রি.) (History of the Muslims in India 712-1526) – 205103, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি – ফাজিল অনার্স ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২২

StudyBoi StudyBoi
September 26, 2026
৫০ মিনিট পড়ার সময়
২ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন

পরীক্ষা কোড: ২০১ | প্রশ্নপত্র কোড: ০৩১
ফাজিল স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষ পরীক্ষা, ২০২২
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
[History of the Muslims in India (712—1526 A.D.)]
[ভারতে মুসলমানদের ইতিহাস (৭১২—১৫২৬ খ্রি.)]
বিষয় কোড: ২০৫১০৩
সময়—৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান—৮০
[দ্রষ্টব্য: ক বিভাগ থেকে ৪টি এবং খ বিভাগ থেকে ২টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।]


ক বিভাগ (রচনামূলক প্রশ্ন)

১। মুসলমানদের সিন্ধু বিজয়ের কারণ ও ফলাফল পর্যালোচনা কর।

[Review the causes and consequences of the conquest of Sind by the Muslims.]

ভূমিকা

৭১২ খ্রিষ্টাব্দে উমাইয়া খলিফা আল-ওয়ালিদের রাজত্বকালে ইরাকের দূরদর্শী গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসুফের সুযোগ্য জামাতা ও ভ্রাতুষ্পুত্র ১৭ বছর বয়সী কিশোর সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাসিমের নেতৃত্বে সিন্ধু বিজয় ছিল ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী সূচনা। এর মাধ্যমেই উপমহাদেশে প্রথমবারের মতো ইসলামের শাসন ও দাওয়াতের স্থায়ী পদচিহ্ন অঙ্কিত হয়।

সিন্ধু বিজয়ের কারণসমূহ

  • ১. প্রত্যক্ষ কারণ—দেবল বন্দরে জাহাজ লুণ্ঠন: সিংহলের (শ্রীলঙ্কা) রাজা উমাইয়া খলিফা এবং হাজ্জাজ বিন ইউসুফের জন্য বহু মূল্যবান উপহার, রত্নরাজি এবং সেখানে মৃত্যুবরণকারী মুসলিম বণিকদের এতিম কন্যা ও বিধবাদের আটটি জাহাজে করে দামেস্কে পাঠাচ্ছিলেন। সিন্ধুর দেবল বন্দরের জলদস্যুরা সেই জাহাজগুলো আক্রমণ করে লুণ্ঠন করে এবং মুসলিম নারী ও শিশুদের বন্দি করে।
  • ২. রাজা দাহিরের উদ্ধত অস্বীকার: হাজ্জাজ বিন ইউসুফ সিন্ধুর ব্রাহ্মণ রাজা দাহিরের কাছে বন্দিদের মুক্তি, ক্ষতিপূরণ এবং অপরাধীদের শাস্তি দাবি করেন। দাহির ঔদ্ধত্যের সাথে উত্তর দেন যে জলদস্যুদের ওপর তাঁর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। ফলে হাজ্জাজ সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্ত নেন।
  • ৩. পরোক্ষ ও রাজনৈতিক কারণ: ওমান উপকূলে বাণিজ্য সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা, বিদ্রোহী আরবদের (মুহাম্মদ বিন আল-হাফি) রাজা দাহির কর্তৃক রাজনৈতিক আশ্রয় দান এবং উমাইয়া খেলাফতের প্রাচ্যমুখী সাম্রাজ্য বিস্তারের স্বাভাবিক নীতি এ বিজয়ের নেপথ্যে কাজ করেছিল।

বিজয়ের ঘটনাবলি ও ফলাফল

মুহাম্মদ বিন কাসিম মাত্র ৬,০০০ সিরীয় অশ্বারোহী এবং ‘আল-আরুস’ নামক সুবিশাল মেকানিক্যাল কামান (মানজানিক) নিয়ে দেবল বন্দরে আক্রমণ করেন। দেবলের প্রধান মন্দিরের লাল পতাকা ভেঙে পড়ার পর দুর্গের পতন ঘটে। এরপর তিনি নীরুন ও সেহওয়ান জয় করে রাওয়ারের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে রাজা দাহিরকে পরাজিত ও হত্যা করেন। পরবর্তীতে সিন্ধুর রাজধানী অরোড় এবং বিপুল স্বর্ণভাণ্ডার সমৃদ্ধ মুলতান জয় করেন।

  • ১. রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সমতা (ব্রাহ্মণাবাদ বন্দোবস্ত): তিনি পরাজিত হিন্দুদের ‘জিম্মি’ বা সংরক্ষিত প্রজার মর্যাদা দেন এবং জিজিয়ার বিনিময়ে পূর্ণ ধর্মীয় ও নাগরিক স্বাধীনতা প্রদান করেন। পুরোহিতদের প্রশাসনিক কাজে পুনর্বাসিত করা হয়।
  • ২. সাংস্কৃতিক ও জ্ঞানগত বিপ্লব: ঐতিহাসিক লেনপুল যদিও মন্তব্য করেছিলেন যে “সিন্ধু বিজয় ভারতীয় ইতিহাসে একটি উপাখ্যান মাত্র”, কিন্তু বাস্তবে এটি ছিল সাংস্কৃতিক মহাবিপ্লব। আরব পণ্ডিতরা সংস্কৃত ভাষা থেকে গণিত (শূন্য ও দশমিক পদ্ধতি), জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং চিকিৎসাবিদ্যার বহু গ্রন্থ আরবিতে অনুবাদ করেন। আরবরা যা ‘হিন্দিসা’ নামে শিখেছিল, ইউরোপ তা ‘আরবি সংখ্যা’ হিসেবে গ্রহণ করে উপকৃত হয়।

২। সুলতান মাহমুদ গজনভীর ভারত অভিযানের উদ্দেশ্য ও ফলাফল বর্ণনা কর।

[Describe the purpose and results of Sultan Mahmud Ghaznabi’s expedition in India.]

ভূমিকা

মধ্যযুগীয় মুসলিম বিশ্বের এক অপরাজেয় সমরনায়ক সুলতান মাহমুদ গজনভী (শাসনকাল: ৯৯৭—১০৩০ খ্রি.)। তিনি ১০০০ থেকে ১০২৬ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে উত্তর ভারতে টানা ১৭ বার সফল সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন। ইতিহাসে কোনো একটি অভিযানেও তিনি পরাজিত হননি।

ভারত অভিযানের প্রকৃত উদ্দেশ্য

  • ১. সাম্রাজ্য রক্ষা ও রাজনৈতিক প্রতিপত্তি: তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল মধ্য এশিয়ায় একটি সুবিশাল শক্তিশালী গজনভী সাম্রাজ্য গড়ে তোলা। ভারতে সীমান্তবর্তী হিন্দুশাহী রাজাদের (জয়পাল ও আনন্দপাল) আক্রমণাত্মক তৎপরতা প্রতিহত করে সীমানা সুরক্ষিত করা তাঁর প্রথম লক্ষ্য ছিল।
  • ২. অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য (অর্থ সংগ্রহ): তৎকালীন ভারতের মন্দিরগুলোতে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে অঢেল ধনরত্ন, সোনা-রুপা সঞ্চিত ছিল, তা হস্তগত করে তিনি গজনীকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ও সুন্দরতম রাজধানীতে রূপান্তর এবং মধ্য এশিয়ায় সেলজুক ও কারখানিদের বিরুদ্ধে বিশাল সেনাবহর পরিচালনার ব্যয়ভার মেটাতে চেয়েছিলেন।
  • ৩. ধর্মান্তর বা সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না: তিনি ভারতে স্থায়ী কোনো রাজনৈতিক সাম্রাজ্য স্থাপন করতে আসেননি (একমাত্র পাঞ্জাব ছাড়া), কিংবা তরবারির জোরে কাউকে মুসলমান বানাননি। তাঁর সামরিক বাহিনীতে তিলক ও সেবন্দ্রায়ের মতো বহু হিন্দু সেনাপতি ও সৈন্য উচ্চপদে নিয়োজিত ছিল।

সোমনাথ মন্দির অভিযান (১০২৬ খ্রি.) ও ফলাফল

তাঁর সপ্তদশ অভিযানের সবচেয়ে স্মরণীয় ছিল গুজরাটের সুবিখ্যাত সোমনাথ মন্দির অভিযান। রাজপুতদের তীব্র প্রতিরোধ ভেঙে তিনি সোমনাথের দুর্ভেদ্য দুর্গ অধিকার করেন এবং ২০ লাখ দিনার মূল্যের অঢেল ধনরত্ন নিয়ে নিরাপদে গজনীতে ফিরে যান।

  • পাঞ্জাবের অন্তর্ভুক্তি: মাহমুদ পাঞ্জাবকে গজনভী সাম্রাজ্যের স্থায়ী প্রদেশভুক্ত করেন এবং লাহোরকে কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলেন, যা পরবর্তীকালে মুহাম্মদ ঘুরীর ভারত বিজয়ের স্থায়ী প্রবেশদ্বার তৈরি করে দেয়।
  • রাজপুত শক্তির মেরুদণ্ড চূর্ণ: ভারতের পরাক্রমশালী রাজপুত রাজাদের সামরিক দুর্বলতা ও অনৈক্য উন্মোচিত হয়।
  • গজনীর সাংস্কৃতিক স্বর্ণযুগ: সংগৃহীত অর্থ দিয়ে মাহমুদ গজনীতে বিশ্ববিদ্যালয়, সুবিশাল লাইব্রেরি এবং জাদুকরী ‘আকাশের কনে’ মসজিদ নির্মাণ করেন। তাঁর দরবারে সমবেত হয়েছিলেন আল-বিরুনি, শাহনামা রচয়িতা মহাকবি ফেরদৌসী এবং ঐতিহাসিক উতবী।

৩। উত্তর ভারতে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠায় সুলতান মুইজুদ্দিন মুহাম্মদ ঘুরীর কৃতিত্ব মূল্যায়ন কর। তাঁর সাফল্যের কারণ কী ছিল?

[Evaluate the achievements of Sultan Muizuddin Muhammad Ghuri to the establishment of Muslim rule in North India. What were the reasons of his success?]

ভূমিকা

সুলতান মাহমুদ গজনভী ভারতে বহু অভিযান পরিচালনা করলেও তিনি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন না; পক্ষান্তরে সুলতান মুইজুদ্দীন মুহাম্মদ ঘুরী (শাহাবুদ্দীন ঘুরী) ছিলেন ভারতে স্থায়ী মুসলিম সাম্রাজ্যের প্রকৃত ও মহান প্রতিষ্ঠাতা। তিনি বুঝেছিলেন যে আক্রমণ করে ফিরে যাওয়ার চেয়ে রাজনৈতিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা অনেক বেশি ফলপ্রসূ।

মুহাম্মদ ঘুরীর ঐতিহাসিক কৃতিত্ব

  • ১. তরাইনের প্রথম ও দ্বিতীয় যুদ্ধ (১১৯১ ও ১১৯২ খ্রি.): ১১৯১ সালে প্রথম তরাইনের যুদ্ধে দিল্লির চৌহান রাজা পৃথ্বীরাজের কাছে শোচনীয়ভাবে আহত ও পরাজিত হয়ে ঘুরী হতাশ হননি। তিনি এক বছর ধরে নিখুঁত প্রস্তুতি নিয়ে ১১৯২ সালে দ্বিতীয় তরাইনের যুদ্ধে ১,২০,০০০ সৈন্য নিয়ে রাজপুতদের সুকৌশলে ঘিরে ফেলে শোচনীয়ভাবে পরাস্ত করেন। পৃথ্বীরাজ নিহত হন এবং দিল্লি ও আজমির ঘুরীর দখলে আসে। এটিই ভারতীয় ইতিহাসের সবচেয়ে নির্ণায়ক মোড় পরিবর্তনকারী যুদ্ধ।
  • ২. কনৌজ ও চান্দুয়ার বিজয় (১১৯৪ খ্রি.): চান্দুয়ার যুদ্ধে তিনি শক্তিশালী গাহড়বাল রাজা জয়চাঁদকে পরাজিত করে বেনারস ও কনৌজ অধিকার করেন।
  • ৩. যোগ্য সেনাপতি তৈরি ও সাম্রাজ্য সুসংহতকরণ: তিনি কুতুবউদ্দীন আইবেককে উত্তর ভারতের গভর্নর এবং বখতিয়ার খলজিকে পূর্ব ভারতে প্রেরণ করেন। ১২০৪ সালে বখতিয়ার বাংলা ও বিহার জয় করেন।

ঘুরীর সাফল্যের প্রধান কারণসমূহ

  • ১. দুর্ধর্ষ অশ্বারোহী ও উন্নত যুদ্ধকৌশল: তাঁর বাহিনীর ক্ষিপ্রগতির তুর্কি অশ্বারোহী এবং চলমান ধনুর্ধররা ভারতীয় রাজপুতদের ধীরগতির হস্তিবাহিনীকে সহজেই ব্যর্থ করে দেয়।
  • ২. রাজপুতদের পারস্পরিক ঈর্ষা ও অনৈক্য: পৃথ্বীরাজ চৌহান ও জয়চাঁদের ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণে রাজপুতরা একক জাতীয় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছিল।
  • ৩. অদম্য মনোবল ও অধ্যবসায়: বহুবার পরাজিত হয়েও ঘুরী কখনোই লক্ষ্যচ্যুত হননি; তাঁর ইস্পাতকঠিন ইচ্ছাশক্তিই তাঁকে সফল করেছিল।

৪। দিল্লি সালতানাতের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে সুলতান শামসুদ্দিন ইলতুতমিশের অবদান মূল্যায়ন কর।

[Evaluate the contribution of Sultan Shamsuddin Iltutmish as the real founder of the Delhi Sultanate.]

ভূমিকা

১২০৬ সালে কুতুবউদ্দীন আইবেক দিল্লি সালতানাত প্রতিষ্ঠা করলেও মাত্র চার বছর পর পোলো (চৌগান) খেলতে গিয়ে ঘোড়া থেকে পড়ে আকস্মিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন। ফলে নবগঠিত সালতানাত কোনো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। এই চরম নৈরাজ্যের মুহূর্তে ১২১১ খ্রিষ্টাব্দে সিংহাসনে বসেন আইবেকের কৃতদাসী জামাতা শামসুদ্দিন ইলতুতমিশ (শাসনকাল: ১২১১—১২৩৬ খ্রি.)। তিনি তাঁর প্রজ্ঞা, তরবারি ও কূটনৈতিক বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সালতানাতকে নিশ্চিত ধ্বংস থেকে রক্ষা করেন। তাই তাঁকে দিল্লি সালতানাতের ‘প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা’ (Real Founder) বলা হয়।

ইলতুতমিশের ঐতিহাসিক অবদান ও কৃতিত্ব

  • ১. প্রতিদ্বন্দ্বী ও বিদ্রোহীদের দমন:
    • গজনীর শাসক তাজুদ্দীন ইয়ালদুজকে ১২১৫ সালে তরাইনের ৩য় যুদ্ধে পরাজিত ও বন্দি করেন।
    • সিন্ধু ও মুলতানের শক্তিশালী শাসক নাসিরুদ্দীন কুবাচাকে ১২২৮ সালে সিন্ধু নদে ডুবিয়ে আত্মহত্য করতে বাধ্য করেন।
    • বাংলার স্বাধীন সুলতান গিয়াসউদ্দীন ইওয়াজ খলজিকে দমন করে বাংলাকে দিল্লির করদ রাজ্যে পরিণত করেন।
  • ২. দূরদর্শী কূটনীতি ও মোঙ্গল আক্রমণ থেকে রক্ষা (১২২১ খ্রি.): চেঙ্গিস খানের মোঙ্গল তাড়া খেয়ে খোয়ারিজমের যুবরাজ জালালউদ্দীন মাংবার্নী ভারতে পালিয়ে এসে ইলতুতমিশের আশ্রয় প্রার্থনা করেন। ইলতুতমিশ অত্যন্ত চতুরতার সাথে “দিল্লির জলবায়ু আপনার অনুকূল নয়” বলে আশ্রয় প্রত্যাখ্যান করেন। এর ফলে চেঙ্গিস খান দিল্লি আক্রমণ না করে ফিরে যান এবং দিল্লি সালতানাত এক ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের হাত থেকে বেঁচে যায়।
  • ৩. আব্বাসীয় খলিফার ঐতিহাসিক স্বীকৃতি (১২২৯ খ্রি.): বাগদাদের খলিফা আল-মুস্তানসির বিল্লাহ ইলতুতমিশের কাছে রাজকীয় খেলাত ও মানপত্র পাঠিয়ে তাঁকে ‘সুলতান-ই-আজম’ (মহান সুলতান) হিসেবে স্বীকৃতি দেন, যা সালতানাতকে আন্তর্জাতিক আইনগত বৈধতা দান করে।
  • ৪. প্রশাসনিক ও মুদ্রানীতি সংস্কার: তিনি বিশুদ্ধ খাঁটি রৌপ্যমুদ্রা ‘টঙ্কা’ (Tanka – ১৭৫ গ্রেইন) এবং তামার মুদ্রা ‘জিতল’ চালু করেন। এছাড়া প্রশাসনিক কাজের সুবিধার্থে জমিদারি রাজস্ব বণ্টন প্রথা ‘ইকতা ব্যবস্থা’ (Iqta System) চালু করেন এবং চল্লিশজন অনুগত তুর্কি দাস আমিরের সমন্বয়ে ‘চল্লিশচক্র’ (বন্দেগান-ই-চিহালগানী) গঠন করেন।
  • ৫. কুতুব মিনারের নির্মাণ সমাপ্তি: আইবেক যে কুতুব মিনারের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, ইলতুতমিশ তার নির্মাণকাজ সুসম্পন্ন করেন এবং দিল্লিতে সুফি হযরত খাজা কুতুবউদ্দীন বখতিয়ার কাকী (রহ.)-এর সান্নিধ্যে এক নতুন আধ্যাত্মিক আবহ সৃষ্টি করেন।

উপসংহার

ইলতুতমিশ যদি সালতানাতকে শত্রুমুক্ত না করতেন, তবে দিল্লির ইতিহাস সেখানেই শেষ হয়ে যেত। তাঁর হাতেই দিল্লি একটি সাম্রাজ্যের স্থায়ী রূপ পরিগ্রহ করেছিল।


৫। সুলতান আলাউদ্দিন খলজির মূল্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা পর্যালোচনা কর।

[Review the price control system of Sultan Alauddin Khalji.]

ভূমিকা

দিল্লি সালতানাতের সর্বাপেক্ষা পরাক্রমশালী ও দূরদর্শী সাম্রাজ্যবাদী সুলতান ছিলেন আলাউদ্দিন খলজি (শাসনকাল: ১২৯৬—১৩১৬ খ্রি.)। মোঙ্গলদের ধারাবাহিক আক্রমণ প্রতিহত করা এবং সমগ্র উত্তর ও দক্ষিণ ভারতজুড়ে সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য তাঁর প্রয়োজন ছিল সুবিশাল স্থায়ী সেনাবাহিনী। কিন্তু সীমিত রাজকোষ দিয়ে সৈন্যদের উচ্চ বেতন দেওয়া সম্ভব ছিল না। তাই তিনি সৈন্যদের জীবনযাত্রার খরচ কমাতে এবং সাধারণ প্রজাদের স্বস্তি দিতে ইতিহাসের প্রথম আধুনিক ও বৈপ্লবিক ‘মূল্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও বাজার সংস্কার’ (Price Control System) প্রবর্তন করেন।

মূল্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ

  • ১. পণ্যের সরকারি মূল্য নির্ধারণ (Tariff System): তিনি খাদ্যশস্য, চাল, ডাল, তেল, চিনি, ঘোড়া, গবাদিপশু, দাস-দাসী এমনকি শাকসবজি, সুই ও সুতার মতো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র দ্রব্যেরও পাইকারি ও খুচরা মূল্য সরকারিভাবে নির্ধারণ করে দেন। নির্ধারিত মূল্যের এক পয়সা বেশি নেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি ছিল।
  • ২. দিল্লিতে চারটি বিশেষায়িত বাজার স্থাপন:
    • মন্ডি (Mandi): কেন্দ্রীয় শস্যের বাজার।
    • সরাই-ই-আদল: কাপড়, চিনি, ভেষজ ওষুধ, ঘি ও শুকনো ফলের বিশেষ বাজার।
    • ঘোড়া, গবাদিপশু ও দাসের বাজার: মধ্যস্বত্বভোগী ও দালালদের সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া হয়।
    • সাধারণ নিত্যপণ্যের বাজার।
  • ৩. কর্মকর্তা ও কঠোর নজরদারি কাঠামো: বাজারের সার্বিক নিয়ন্ত্রণের জন্য ‘দিওয়ান-ই-রিয়াসত’ এবং বাজারের পরিদর্শক হিসেবে কঠোর কর্মকর্তা ‘শাহনা-ই-মন্ডি’ নিয়োগ করা হয়। এছাড়া সুলতানের নিজস্ব গোপন তথ্যদাতা ‘মুন্হিয়ান’ বাজারে নজরদারি করত।
  • ৪. রেশনিং ও আপদকালীন সরকারি খাদ্যগুদাম: খরা ও দুর্ভিক্ষের সময় যাতে খাদ্যসংকট না হয়, সেজন্য তিনি দিল্লিতে বিশাল সরকারি শস্যভাণ্ডার গড়ে তোলেন এবং প্রতি পরিবারকে নির্দিষ্ট পরিমাণ চাল-গম রেশনের মাধ্যমে সরবরাহের ব্যবস্থা করেন।
  • ৫. নির্মম শাস্তির বিধান: ওজনে কোনো ব্যবসায়ী কম দিলে শাহনা-ই-মন্ডি তাৎক্ষণিকভাবে সেই ব্যবসায়ীর শরীর থেকে সমপরিমাণ মাংস কেটে নেওয়ার নির্দেশ দিতেন। ফলে কেউ ওজনে এক ছটাকও কম দেওয়ার সাহস পেত না।

উপসংহার

ইতিহাসবিদ জিয়াউদ্দীন বারানীর মতে, সুলতান আলাউদ্দিন খলজির মূল্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছিল মধ্যযুগীয় ইতিহাসের অন্যতম সেরা বিস্ময়। তাঁর মৃত্যুর সাথে সাথে এই ব্যবস্থা ভেঙে পড়লেও এটি প্রমাণ করে যে দূরদর্শী রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে কৃত্রিম মুদ্রাস্ফীতি রোধ করা সম্ভব।


৬। সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনাসমূহ পর্যালোচনা কর। এগুলো কেন ব্যর্থ হয়েছিল?

[Review the ambitious projects of Sultan Muhammad bin Tughlak. Why did it fail?]

ভূমিকা

তুঘলক বংশের দ্বিতীয় সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলক (শাসনকাল: ১৩২৫—১৩৫১ খ্রি.) ছিলেন ভারতীয় ইতিহাসের এক বিস্ময়কর ও ট্র্যাজিক ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন একাধারে সুপণ্ডিত, গণিতবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, চিকিৎসক এবং ন্যায়পরায়ণ শাসক। কিন্তু তাঁর প্রবর্তিত বৈপ্লবিক ও উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনাগুলো যুগের তুলনায় অতি আধুনিক এবং বাস্তবতাবিবর্জিত হওয়ায় চরম বিপর্যয় ডেকে এনেছিল। এজন্য ইতিহাসবিদরা তাঁকে ‘পাগলা রাজা’ বা ‘স্ববিরোধী চরিত্রের সংমিশ্রণ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

পাঁচটি প্রধান উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা ও ব্যর্থতার কারণসমূহ

  • ১. রাজধানী স্থানান্তর (দিল্লি থেকে দেবগিরি/দৌলতাবাদ, ১৩২৭ খ্রি.):
    • পরিকল্পনা: দক্ষিণ ভারতকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং মোঙ্গল আক্রমণ থেকে নিরাপদ থাকার জন্য তিনি সাম্রাজ্যের ভৌগোলিক কেন্দ্রে অবস্থিত দেবগিরিতে রাজধানী স্থানান্তর করেন এবং এর নাম দেন ‘দৌলতাবাদ’।
    • ব্যর্থতা: তিনি কর্মকর্তা ও সৈন্যদের পাশাপাশি দিল্লির সমগ্র নাগরিক সমাজকে তীব্র গরমের মধ্যে হাজার মাইল পথ হেঁটে দৌলতাবাদ যাওয়ার বাধ্যতামূলক নির্দেশ দেন। পথে বহু মানুষ মারা যায়। কিছুদিন পর তিনি বুঝতে পারেন যে দৌলতাবাদে বসে উত্তর ভারতের সীমান্ত পাহারা দেওয়া অসম্ভব। ফলে তিনি পুনরায় সবাইকে দিল্লিতে ফিরে আসার নির্দেশ দেন, যা সীমাহীন কষ্ট ও ক্ষোভের জন্ম দেয়।
  • ২. তাম্র ও ব্রোঞ্জের প্রতীকী মুদ্রা প্রবর্তন (১৩২৯—১৩৩০ খ্রি.):
    • পরিকল্পনা: রাজকোষের রূপার ঘাটতি মেটাতে চীনের কুবলাই খানের কাগজের নোটের অনুকরণে তিনি ব্রোঞ্জ ও তামার প্রতীকী মুদ্রা (Token Currency) চালু করেন এবং রৌপ্যমুদ্রার সমান মান ঘোষণা করেন।
    • ব্যর্থতা: রাষ্ট্রীয় টাকশালের মুদ্রার কোনো নিরাপত্তা সিল বা জলছাপ ছিল না। ফলে প্রতিটি সাধারণ গৃহেই জাল মুদ্রা তৈরির কারখানা গড়ে ওঠে। মানুষ তামার মুদ্রা দিয়ে খাজনা দেয় এবং সোনা-রুপা ঘরে লুকিয়ে রাখে। ব্যবসা-বাণিজ্য ধ্বংসের মুখে পড়লে বাধ্য হয়ে সুলতান সমস্ত তামার মুদ্রা প্রত্যাহার করে সমপরিমাণ খাঁটি রূপা ফেরত দেন, যার ফলে রাজকোষ সম্পূর্ণ দেউলিয়া হয়ে যায়।
  • ৩. দোয়াব অঞ্চলে করারোপ: গঙ্গা ও যমুনার উর্বর দোয়াব অঞ্চলের কৃষকদের ওপর অতিরিক্ত কর ধার্য করেন। কিন্তু ঠিক সেই বছরই সেখানে ভয়াবহ খরা ও দুর্ভিক্ষ শুরু হয়। সরকারি কর্মচারীরা জোর করে কর আদায় করতে গেলে কৃষকরা বিদ্রোহ করে ফসল নষ্ট করে জঙ্গলে পালিয়ে যায়।
  • ৪. খোরাসান অভিযান পরিকল্পনা: মধ্য এশিয়া জয়ের জন্য ৩ লাখ ৭০ হাজার বিশাল সৈন্য সংগ্রহ করে এক বছর ধরে তাদের অগ্রিম বেতন দিয়ে বসিয়ে রাখেন। পরবর্তীতে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যাওয়ায় অভিযান বাতিল করেন, যার ফলে বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়।
  • ৫. কারাচিল অভিযান: চীন সীমান্ত সুরক্ষায় হিমালয়ের কারাচিলে প্রেরিত সেনাদল পাহাড়ি আবহাওয়া ও অতিবৃষ্টিতে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। মাত্র কয়েকজন সৈন্য জীবিত ফিরে এসে সুলতানকে পরাজয়ের খবর দেয়।

উপসংহার

মুহাম্মদ বিন তুঘলকের উদ্দেশ্য খারাপ ছিল না; তাঁর পরিকল্পনাগুলো ছিল প্রতিভাবান কিন্তু তাঁর বাস্তবায়ন কৌশল ছিল অপরিপক্ব, কঠোর এবং সময়ের চেয়ে শতবর্ষ এগিয়ে। তাঁর এই ব্যর্থতার কারণেই সালতানাতে সর্বত্র বিদ্রোহ শুরু হয় এবং দক্ষিণ ভারতে বিজয়নগর ও বাহমানি রাজ্যের মতো স্বাধীন রাজ্যের জন্ম হয়।


৭। দিল্লির সৈয়দ বংশের প্রতিষ্ঠা ও পতনের ইতিহাস আলোচনা কর।

[Discuss the history of establishment and downfall of the Syed Dynasty in Delhi.]

প্রতিষ্ঠার পটভূমি

১৩৯৮ খ্রিষ্টাব্দে তৈমুর লঙের দিল্লি আক্রমণের ফলে তুঘলক সালতানাত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। তৈমুর লঙ ভারত ত্যাগ করার সময় তাঁর অনুগত মুলতানের সুবেদার খিজির খানকে পাঞ্জাব ও মুলতানের দায়িত্ব দিয়ে যান। এই সুযোগে খিজির খান ১৪১৪ খ্রিষ্টাব্দে দিল্লির শেষ দুর্বল শাসক দৌলত খান লোদীকে বিতাড়িত করে দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র বংশধর হিসেবে ‘সৈয়দ বংশ’ (১৪১৪—১৪৫১ খ্রি.) প্রতিষ্ঠা করেন।

সৈয়দ বংশের রাজত্বকাল ও শাসকগণ

  • ১. খিজির খান (১৪১৪—১৪২১ খ্রি.): তিনি বিনয়বশত কখনো ‘সুলতান’ উপাধি গ্রহণ করেননি; বরং তৈমুরের পুত্র শাহরুখের নামানুসারে ‘রায়ত-ই-আলা’ উপাধি নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন।
  • ২. মুবারক শাহ (১৪২১—১৪৩৪ খ্রি.): তিনি এই বংশের সবচেয়ে যোগ্য শাসক ছিলেন। তিনি ‘সুলতান’ উপাধি নেন এবং নিজ নামে মুদ্রা জারি করেন। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় ইয়াহিয়া বিন আহমদ সিরহিন্দী বিখ্যাত ‘তারিখ-ই-মুবারকশাহী’ রচনা করেন। পরবর্তীতে প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে তিনি নিহত হন।
  • ৩. মুহাম্মদ শাহ ও আলাউদ্দীন আলম শাহ: এরা ছিলেন চরম অযোগ্য ও অলস শাসক। আলম শাহ সিংহাসন ছেড়ে বাদাউনে বিলাসবহুল অবসরে চলে যান।

পতনের কারণ

সৈয়দ বংশের কর্তৃত্ব দিল্লির আশেপাশের মাত্র কয়েক মাইলের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল (তৎকালীন প্রবাদ ছিল: “বাদশাহ আলম কা রাজ, দিল্লি সে বাদাউন তক”)। কোনো শক্তিশালী সেনাবাহিনী না থাকায় ১৪৫১ খ্রিষ্টাব্দে আফগান নেতা বাহলুল লোদী রক্তপাতহীনভাবে দিল্লির ক্ষমতা দখল করেন এবং সৈয়দ বংশের বিলুপ্তি ঘটিয়ে প্রথম আফগান ‘লোদী বংশ’ প্রতিষ্ঠা করেন।


৮। দিল্লি সালতানাতের পতনের কারণসমূহ আলোচনা কর।

[Discuss the causes of the fall of the Delhi Sultanate.]

ভূমিকা

১২০৬ খ্রিষ্টাব্দে কুতুবউদ্দীন আইবেক কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত দিল্লি সালতানাত সুদীর্ঘ সোয়া তিনশত বছর (১২০৬—১৫২৬ খ্রি.) উত্তর ও দক্ষিণ ভারত শাসন করার পর ১৫২৬ সালে পানিপথের প্রথম যুদ্ধে মুঘল সম্রাট বাবুরের হাতে চূড়ান্তভাবে পরাজিত ও বিলুপ্ত হয়। এই সুবিশাল সালতানাতের পতনের পেছনে দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত কারণ সক্রিয় ছিল।

পতনের প্রধান কারণসমূহ

  • ১. নির্দিষ্ট উত্তরাধিকার নীতির অভাব ও প্রাসাদ ষড়যন্ত্র: সালতানাতে কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তরাধিকার আইন ছিল না। প্রতিটি সুলতানের মৃত্যুর পরই তরবারির শক্তিতে সিংহাসন দখলের রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ শুরু হতো এবং তুর্কি ও আফগান আমিররা পুতুল সুলতান বসিয়ে রাষ্ট্রীয় শক্তি ক্ষয় করত।
  • ২. বিশাল সাম্রাজ্য ও বিকেন্দ্রীকরণের ব্যর্থতা: আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে দিল্লি থেকে দূরবর্তী বাংলা, গুজরাট ও দক্ষিণ ভারত শাসন করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। প্রাদেশিক সুবেদাররা সামান্য সুযোগ পেলেই স্বাধীনতা ঘোষণা করত।
  • ৩. মুহাম্মদ বিন তুঘলকের ব্যর্থ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সালতানাত খণ্ডবিখণ্ড হওয়া: তুঘলকের ভুল নীতির কারণে রাজকোষ শূন্য হয় এবং বাংলা (ইলিয়াস শাহ), দক্ষিণ ভারত (বাহমানি ও বিজয়নগর) সালতানাতের হাতছাড়া হয়ে স্বাধীন হয়ে যায়।
  • ৪. তৈমুর লঙের দিল্লি আক্রমণ (১৩৯৮ খ্রি.): তৈমুরের রক্তক্ষয়ী ধ্বংসযজ্ঞে দিল্লির কেন্দ্রীয় সামরিক ও অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড চিরতরে ভেঙে পড়ে।
  • ৫. লোদী সুলতানদের আদিম উপজাতীয় সামন্তবাদ: শেষ লোদী বংশীয় আফগান শাসকরা সুলতানের মর্যাদাকে সাধারণ উপজাতীয় সর্দারের সমপর্যায়ে নামিয়ে এনেছিলেন। ইব্রাহিম লোদী এই আমিরদের দমন করতে গিয়ে সবার চরম শত্রু হয়ে ওঠেন।
  • ৬. বাবুরের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব ও কামানের ব্যবহার: ১৫২৬ সালে বাবুরের আধুনিক গোলন্দাজ বাহিনী ও রুমি যুদ্ধকৌশলের সামনে ইব্রাহিম লোদীর বিশৃঙ্খল বাহিনীর পরাজয় ছিল ঐতিহাসিক অনিবার্যতা।

খ বিভাগ (সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন)

৯। ভারতে মামলুক রাজবংশের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস লেখ।

[Write the history of the foundation of the Mamluk dynasty in India.]

বংশ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস

১২০৬ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান মুইজুদ্দীন মুহাম্মদ ঘুরী সিন্ধু নদের তীরে গুপ্তঘাতকের হাতে নিহত হলে তাঁর বিশ্বস্ত তুর্কি ক্রীতদাস সেনাপতি কুতুবউদ্দীন আইবেক লাহোরে ভারতীয় অঞ্চলের সার্বভৌম ক্ষমতা গ্রহণ করেন। ‘মামলুক’ শব্দের অর্থ কৃতদাস। আইবেক, ইলতুতমিশ ও বলবনের মতো প্রাথমিক সুলতানরা দাস অবস্থা থেকে যোগ্যতাবলে সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন বলেই ১২০৬ থেকে ১২৯০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত দিল্লি শাসনকারী এই বংশকে ‘মামলুক’ বা ‘দাস বংশ’ বলা হয়। আইবেক দিল্লিতে কুওয়াতুল ইসলাম মসজিদ এবং কুতুব মিনারের ভিত্তি স্থাপন করে সালতানাতের গোড়াপত্তন করেন।


১০। সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবনের চল্লিশচক্র সম্পর্কে আলোচনা কর।

[Discuss about the Forty of Sultan Giyasuddin Balban.]

চল্লিশচক্রের পরিচয় ও বলবনের পদক্ষেপ

সুলতান ইলতুতমিশ তাঁর শাসনের সহায়তার জন্য চল্লিশজন অত্যন্ত অনুগত ও দক্ষ তুর্কি ক্রীতদাসকে নিয়ে একটি অভিজাত রাজনৈতিক পরিষদ গঠন করেছিলেন, যা ফারসি ভাষায় ‘বন্দেগান-ই-চিহালগানী’ বা ‘চল্লিশচক্র’ নামে পরিচিত ছিল। গিয়াসউদ্দীন বলবন নিজেও একসময় এই চক্রের অন্যতম সদস্য ছিলেন। কিন্তু ইলতুতমিশের মৃত্যুর পর এই চক্র খলিফা-নির্মাতা (King Maker) হয়ে ওঠে এবং একের পর এক সুলতানকে হত্যা করে রাষ্ট্রের শাসনকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। ১২৬৬ সালে বলবন নিজে সিংহাসনে বসে বুঝতে পারেন যে সালতানাত রক্ষা করতে হলে চল্লিশচক্রের বিনাশ অপরিহার্য। তিনি তাঁর নিষ্ঠুর ‘রক্ত ও লৌহ নীতি’ প্রয়োগ করে শের খাঁ, মালিক বাকবক ও অন্যান্য ক্ষমতাধর সদস্যদের বিষপ্রয়োগে বা প্রকাশ্য ফাঁসি দিয়ে এই চক্রের ক্ষমতা চিরতরে চূর্ণ করেন।


১১। আমীর তৈমুরের ভারত অভিযান সম্পর্কে আলোচনা কর।

[Discuss about the expedition of India by Amir Taimur.]

অভিযানের প্রেক্ষাপট ও ধ্বংসযজ্ঞ

১৩৯৮ খ্রিষ্টাব্দে সমরকন্দের দুর্ধর্ষ তুর্কি-মোঙ্গল শাসক তৈমুর লঙ উত্তর ভারত আক্রমণ করেন। তৎকালীন তুঘলক সুলতান দ্বিতীয় নাসিরুদ্দীন মাহমুদ অত্যন্ত দুর্বল ছিলেন। তৈমুর দিল্লির উপকণ্ঠে সুলতানের বাহিনীকে সম্পূর্ণ পরাস্ত করে দিল্লিতে প্রবেশ করেন। তিনি টানা ১৫ দিন ধরে দিল্লি নগরীতে অবর্ণনীয় হত্যাযজ্ঞ ও লুণ্ঠন চালান এবং নগরীকে শ্মশানে পরিণত করেন। কয়েক লক্ষ নরনারীকে হত্যা করে মাথার খুলির পিরামিড তৈরি করা হয়। যাওয়ার সময় তিনি ভারতের শ্রেষ্ঠ কারিগর, স্থপতি ও বিপুল ধনসম্পদ সমরকন্দে নিয়ে যান। তৈমুরের এই ধ্বংসের ফলেই দিল্লি সালতানাতের পতন নিশ্চিত হয়েছিল।


১২। পানিপথের প্রথম যুদ্ধের বর্ণনা দাও।

[Give a description of the first battle of Panipath.]

যুদ্ধের সংক্ষিপ্ত বিবরণ

২১ এপ্রিল ১৫২৬ সালে দিল্লির উত্তরে পানিপথের ঐতিহাসিক প্রান্তরে কাবুলের অধিপতি বাবর এবং দিল্লির সুলতান ইব্রাহিম লোদীর মধ্যে পানিপথের প্রথম যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়। ইব্রাহিম লোদীর ১ লাখ বিশাল সেনাবহর থাকা সত্ত্বেও বাবুরের ১২,০০০ সুপ্রশিক্ষিত অশ্বারোহী সৈন্যের কাছে তা চূর্ণ হয়ে যায়। বাবর ঐতিহাসিক অটোমান বা ‘রুমি যুদ্ধকৌশল’ প্রয়োগ করেন এবং ভারতের মাটিতে প্রথমবারের মতো গোলন্দাজ বাহিনী ও কামানের সফল ব্যবহার করেন। ইব্রাহিম লোদী যুদ্ধক্ষেত্রে বীরের মতো লড়াই করে নিহত হন। এর মাধ্যমেই ভারতে দীর্ঘ সোয়া তিনশত বছরের দিল্লি সালতানাতের অবসান ঘটে এবং মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়।


সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. ‘ভারতে মুসলমানদের ইতিহাস (৭১২—১৫২৬)’ পেপারের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বংশ কোনটি?

দিল্লি সালতানাতের দাস বংশ ও খলজি বংশ সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ইলতুতমিশ, বলবন ও আলাউদ্দিন খলজির সামরিক ও প্রশাসনিক সংস্কার থেকে প্রতি বছর পরীক্ষায় প্রশ্ন আসে।

২. মুহাম্মদ ঘুরীকে কেন ভারতে মুসলিম সাম্রাজ্যের ‘প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা’ বলা হয়?

মাহমুদ গজনভী কেবল আক্রমণ ও লুণ্ঠন করে ফিরে যেতেন, কিন্তু ঘুরী তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে পৃথ্বীরাজকে পরাজিত করে ভারতে স্থায়ী গভর্নর ও সালতানাতের রাজনৈতিক ভিত্তি স্থাপন করে গিয়েছিলেন।

৩. আলাউদ্দিন খলজির মূল্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য কী ছিল?

বিশাল স্থায়ী সেনাবাহিনী কম বেতনে পরিচালনা করা এবং সৈন্যদের প্রয়োজনীয় নিত্যপণ্যের দাম সস্তা ও স্থিতিশীল রাখাই ছিল এই ব্যবস্থার প্রধান অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য।

৪. মুহাম্মদ বিন তুঘলকের রাজধানী স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত কেন ভুল ছিল?

কারণ দিল্লি থেকে সম্পূর্ণ প্রশাসন ও সাধারণ মানুষকে দক্ষিণ ভারতের দৌলতাবাদে স্থানান্তর করায় উত্তর ভারত মোঙ্গলদের জন্য উন্মুক্ত হয়ে পড়েছিল এবং হাজার হাজার নিরীহ প্রজা প্রাণ হারিয়েছিল।

৫. দিল্লি সালতানাতের পতনের প্রধান সামরিক কারণ কোনটি ছিল?

১৫২৬ সালে পানিপথের প্রথম যুদ্ধে মুঘল সম্রাট বাবর কর্তৃক প্রথমবারের মতো উন্নত কামানের গোলন্দাজ বাহিনী এবং তুলঘুমা রণকৌশলের আধুনিক প্রয়োগই ছিল সালতানাতের দ্রুত পতনের মূল সামরিক কারণ।

৬. ২০৫১০৩ বিষয়ের খাতায় বেশি নম্বর পাওয়ার উপায় কী?

সমসাময়িক ফারসি ইতিহাসগ্রন্থের রেফারেন্স (যেমন: তারিখ-ই-ফিরোজশাহী, তাবাকাত-ই-নাসিরী, চাচনামা) ব্যবহার করা এবং যুদ্ধকৌশলের নাম (রুমী পদ্ধতি, তুলঘুমা) স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা।