পরীক্ষা কোড: ২০১ | প্রশ্নপত্র কোড: ০৩৩
ফাজিল (স্নাতক) সম্মান প্রথম বর্ষ পরীক্ষা, ২০২১
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
MUSLIMS RULE IN SPAIN, EGYPT AND NORTH AFRICA (711—1517 A.D.)
[স্পেন, মিশর ও উত্তর আফ্রিকার মুসলিম শাসন (৭১১—১৫১৭ খ্রি.)]
বিষয় কোড: ২০৫১০৫
সময়—৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান—৮০
[দ্রষ্টব্য: ক বিভাগ থেকে ৪টি এবং খ বিভাগ থেকে ২টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।]
ক বিভাগ (রচনামূলক প্রশ্ন)
১। মুসলমানদের স্পেন বিজয়ের কারণ ও ঘটনাবলি পর্যালোচনা কর।
[Review the causes and events of the conquest of Spain by the Muslims.]
ভূমিকা
৭১১ খ্রিষ্টাব্দে উমাইয়া খলিফা প্রথম ওয়ালিদের আমলে উত্তর আফ্রিকার গভর্নর মুসা বিন নুসাইরের প্রেরিত বীর সেনাপতি তারিক বিন জিয়াদের নেতৃত্বে ইউরোপের আইবেরীয় উপদ্বীপ (বর্তমান স্পেন ও পর্তুগাল) বিজয় বিশ্ব ইতিহাসের এক যুগান্তকারী ঘটনা। এর মাধ্যমে ইউরোপের মাটিতে প্রায় আট শতাব্দীব্যাপী (৭১১—১৪৯২ খ্রি.) এক গৌরবোজ্জ্বল মুসলিম সভ্যতা ও সংস্কৃতির দ্বার উন্মোচিত হয়।
স্পেন বিজয়ের কারণসমূহ
- ১. স্পেনের অভ্যন্তরীণ অরাজকতা ও ভিসিগথদের অত্যাচার: তৎকালীন স্পেনের গথিক (Visigoth) রাজা রডারিক ছিলেন এক চরম অত্যাচারী ও লম্পট শাসক। তিনি বৈধ রাজা উইটিজাকে হত্যা করে সিংহাসন দখল করেছিলেন। কৃষক, সার্ফ ও মেহনতি মানুষের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা এবং অভিজাতদের নৈতিক অবক্ষয়ে রাজ্য ধ্বংসের মুখে পৌঁছেছিল।
- ২. ইহুদিদের ওপর বর্বর নির্যাতন: খ্রিষ্টান ধর্মান্ধ চার্চের প্ররোচনায় স্পেনের ইহুদিদের জোরপূর্বক খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত করা হতো এবং তাদের সন্তান ও সম্পত্তি কেড়ে নেওয়া হতো। ফলে নির্যাতিত ইহুদিরা মুসলিমদের আগমনকে মুক্তির দূত হিসেবে স্বাগত জানায়।
- ৩. কাউন্ট জুলিয়ানের আমন্ত্রণ ও ব্যক্তিগত প্রতিশোধ: সিউটার শাসক কাউন্ট জুলিয়ানের কন্যা ফ্লোরিণ্ডা রডারিকের রাজদরবারে শিক্ষানবিশীকালে রডারিক কর্তৃক শ্লীলতাহানির শিকার হন। এতে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে কাউন্ট জুলিয়ান উত্তর আফ্রিকার মুসলিম সেনাপতি মুসা বিন নুসাইরকে স্পেন আক্রমণের আমন্ত্রণ জানান এবং জাহাজ ও সামরিক সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
- ৪. উমাইয়া খেলাফতের বিশ্বজয়ের উদ্যম: খলিফা আল-ওয়ালিদের সেনাপতি মুসা বিন নুসাইর সমগ্র উত্তর আফ্রিকা ও বারবারদের অঞ্চল জয় করার পর ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইসলামি দাওয়াত ইউরোপে সম্প্রসারণের প্রাকৃতিক সুযোগ খুঁজে পাচ্ছিলেন।
স্পেন বিজয়ের ঐতিহাসিক ঘটনাবলি
- প্রাথমিক অভিযান: ৭১০ খ্রিষ্টাব্দে তারীফ বিন মালিকের নেতৃত্বে মাত্র ৪০০ সৈন্য নিয়ে একটি প্রাথমিক পরিদর্শন অভিযান পরিচালিত হয় (তাঁর নামানুসারেই স্পেনের ‘তারিফা’ উপকূলের নামকরণ হয়)।
- তারিক বিন জিয়াদের অভিযান (৭১১ খ্রি.): ৭১১ খ্রিষ্টাব্দে বারবার সেনাপতি তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ৭,০০০ (পরে আরও ৫,০০০ বৃদ্ধি) সৈন্য নিয়ে জিব্রাল্টার প্রণালী অতিক্রম করেন। তিনি যে পাহাড়ে অবতরণ করেছিলেন, তাঁর নামানুসারেই তার নাম হয় ‘জাবালুত তারিক’ বা জিব্রাল্টার (Gibraltar)।
- জাহাজ পুড়িয়ে দেওয়ার ঐতিহাসিক ভাষণ: অবতরণের পর তারিক সমস্ত জাহাজ আগুনে ভস্মীভূত করার নির্দেশ দেন এবং মুসলিম সৈন্যদের উদ্দেশ্যে ঐতিহাসিক ভাষণ দেন: “হে লোকসকল! তোমাদের পেছনে সমুদ্র, আর সামনে শত্রু। এখন কেবল বীরত্ব ও ধৈর্যই তোমাদের একমাত্র ভরসা।”
- গুয়াডালেটের নির্ণায়ক যুদ্ধ (Battle of Guadalete): ১৯ জুলাই ৭১১ খ্রিষ্টাব্দে রিও বারবেট বা গুয়াডালেট নদীর তীরে রডারিকের সুবিশাল ১ লাখ সৈন্যের বিরুদ্ধে তারিকের ১২,০০০ সৈন্যের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়। রডারিকের বাহিনীর এক অংশ বিশ্বাসঘাতকতা করে পালিয়ে যায় এবং রডারিক যুদ্ধে নিহত হন।
- নগর বিজয় ও কর্ডোভা দখল: গুয়াডালেটের বিজয়ের পর তারিক মালাগা, এলভিরা ও রাজধানী টলেডো জয় করেন। পরবর্তীতে মুসা বিন নুসাইর ১৮,০০০ সুসজ্জিত আরব সেনাদল নিয়ে সেভিল, কারমোনা ও মেরিডা অধিকার করেন। অল্প সময়ের মধ্যে সমগ্র স্পেন মুসলিমদের করতলগত হয়।
উপসংহার
স্পেন বিজয় কেবল ভৌগোলিক ভূমি জয় ছিল না, এটি ছিল দাসত্ব ও ধর্মান্ধতায় নিমজ্জিত মধ্যযুগীয় ইউরোপকে বিজ্ঞান, দর্শন ও আলোকিত সভ্যতার আলোয় উদ্ভাসিত করার এক অবিস্মরণীয় ঐতিহাসিক পটভূমি।
২। তুমি কি তৃতীয় আব্দুর রহমানকে স্পেনের উমাইয়া শাসকদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ মনে কর? কেন?
[Do you consider Abdur Rahman 3rd as the greatest of the Umayyad rules of Spain? Why?]
ভূমিকা
স্পেনের উমাইয়া খিলাফতের প্রায় তিনশত বছরের (৭৫৬—১০৩১ খ্রি.) ইতিহাসে খলিফা তৃতীয় আব্দুর রহমান (শাসনকাল: ৯১২—৯৬১ খ্রি.) ছিলেন নিঃসন্দেহে সর্বাপেক্ষা মহান, সফল ও প্রতিভাবান শাসক। তাঁর সুদীর্ঘ অর্ধ শতাব্দীর শাসনামলে স্পেন গৃহযুদ্ধ ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা থেকে মুক্ত হয়ে অর্থনৈতিক প্রাচুর্য ও সাংস্কৃতিক মহিমায় ইউরোপের শ্রেষ্ঠ পরাশক্তিতে পরিণত হয়। সার্বিক বিবেচনায় তাঁকে স্পেনের উমাইয়া শাসকদের মধ্যে ‘সর্বশ্রেষ্ঠ’ মনে করা সম্পূর্ণ ঐতিহাসিক সত্য।
তাঁকে সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক মনে করার ঐতিহাসিক কারণসমূহ
- ১. গৃহযুদ্ধ দমন ও আন্দালুসের রাজনৈতিক ঐক্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা: ৯১২ খ্রিষ্টাব্দে মাত্র ২১ বছর বয়সে যখন তিনি সিংহাসনে আরোহণ করেন, তখন স্পেন বিদ্রোহী আরব অভিজাত, খ্রিষ্টান বিদ্রোহী ওমর বিন হাফসুন এবং উত্তর আফ্রিকার ফাতেমীয়দের হুমকিতে ভেঙে টুকরো টুকরো হওয়ার মুখে ছিল। আব্দুর রহমান অসাধারণ সামরিক দক্ষতায় ওমর বিন হাফসুনের দুর্ভেদ্য ববাসত্রো দুর্গ চূর্ণ করেন, সেভিল অধিকার করেন এবং সমগ্র আন্দালুসে একচ্ছত্র কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেন।
- ২. আনুষ্ঠানিকভাবে ‘খলিফা’ উপাধি গ্রহণ (৯২৯ খ্রি.): পূর্বে স্পেনের শাসকরা আব্বাসীয়দের ভয়ে নিজেদের কেবল ‘আমির’ বলতেন। কিন্তু উত্তর আফ্রিকার শিয়া ফাতেমীয়দের মোকাবেলা করতে এবং স্পেনের আন্তর্জাতিক মর্যাদা বৃদ্ধি করতে তিনি ৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে ‘আন-নাসির লি-দিনিল্লাহ’ (আল্লাহর ধর্মের সাহায্যকারী) উপাধি ধারণ করে নিজেকে স্বাধীন ‘খলিফা’ ঘোষণা করেন এবং কর্ডোভা খিলাফত প্রতিষ্ঠা করেন।
- ৩. খ্রিষ্টান রাজ্যগুলোর ওপর আধিপত্য: উত্তর স্পেনের আক্রমণাত্মক খ্রিষ্টান রাজ্য লিওন, নাভার ও ক্যাস্টিলকে তিনি ধারাবাহিক অভিযানে পর্যুদস্ত করেন। খ্রিষ্টান রাজারা কর্ডোভায় এসে কর প্রদানে এবং খলিফার বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য হয়।
- ৪. কর্ডোভার স্বর্ণযুগ ও ইউরোপের বাতিঘর: তাঁর আমলে রাজধানী কর্ডোভা ছিল তৎকালীন সমগ্র ইউরোপের সর্বাপেক্ষা চোখধাঁধানো নগরী। এখানে ৭০০টি মসজিদ, ৩,০০টি গণস্নানাগার, ৫০টি আধুনিক হাসপাতাল এবং রাতের বেলা আলোকিত পাকা রাস্তা ছিল। কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয় তৎকালীন বিশ্বের জ্ঞানচর্চার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়।
- ৫. স্থাপত্যের বিস্ময় ‘মদিনাতুজ জাহরা’ নির্মাণ: তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী জাহরার নামানুসারে তিনি কর্ডোভার কাছে পাহাড়ের পাদদেশে অপূর্ব মার্বেল পাথর, সোনা ও ফোয়ারা সজ্জিত ত্রিতল বিশিষ্ট রাজপ্রাসাদ নগরী ‘মদিনাতুজ জাহরা’ নির্মাণ করেন, যা সেকালের পৃথিবীর অন্যতম স্থাপত্য আশ্চর্য ছিল।
- ৬. অর্থনৈতিক প্রাচুর্য ও আন্তর্জাতিক মর্যাদা: কৃষি ক্ষেত্রে আধুনিক সেচ ব্যবস্থা, কাঁচশিল্প, রেশম ও চামড়া শিল্পের বিপ্লব ঘটে। কর্ডোভার রাজকোষের বার্ষিক আয় দাঁড়ায় ৬২ লাখ স্বর্ণ দিনার। জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি ও কনস্টান্টিনোপলের বাইজেন্টাইন সম্রাটরা কর্ডোভায় রাজকীয় রাষ্ট্রদূত পাঠিয়ে খলিফার সাথে মিত্রতা স্থাপন করতেন।
উপসংহার
ঐতিহাসিক লেনপুলের ভাষায়, “তৃতীয় আব্দুর রহমান স্পেনের জন্য যা করেছিলেন, তা তৎকালীন পৃথিবীর অন্য কোনো শাসক নিজ দেশের জন্য করতে পারেননি।” তিনি স্পেনের মাটিতে ইসলামি খেলাফতকে খ্যাতির শীর্ষে নিয়ে গিয়েছিলেন। তাই তাঁকে স্পেনের উমাইয়াদের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক হিসেবে গণ্য করা শতভাগ যথার্থ।
৩। উত্তর আফ্রিকায় ফাতেমীয় আন্দোলনের প্রকৃতি আলোচনা কর। তুমি কি এই ধারণার সাথে একমত যে, ইহা ছিল ধর্মের আবরণে সতর্কতার সাথে সংগঠিত একটি রাজনৈতিক আন্দোলন?
[Discuss the nature of the Fatimid Movement in North Africa. Do you agree with the view that it was a political movement carefully organized under the cover of religion?]
ভূমিকা
দশম শতাব্দীর প্রারম্ভে (৯০৯ খ্রি.) উত্তর আফ্রিকার তিউনিসিয়ায় আগলাবীয় বংশকে উৎখাত করে ওবায়দুল্লাহ আল-মাহদীর নেতৃত্বে যে শিয়া খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়, তা ইতিহাসে ‘ফাতেমীয় খিলাফত’ (Fatimid Khilafat) নামে পরিচিত। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কন্যা ফাতিমা (রা.) এবং হযরত আলী (রা.)-এর বংশধর দাবি করে এই রাজবংশের নামকরণ করা হয়। আন্দোলনটির আদর্শ ছিল চরমপন্থী ইসমাইলি শিয়া মতবাদ, কিন্তু এর নেপথ্যে কাজ করেছিল ক্ষমতা দখলের এক সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা।
ফাতেমীয় আন্দোলনের প্রকৃতি ও সাংগঠনিক কৌশল
- ইসমাইলি বা বাতেনি মতবাদ: ফাতেমীয়রা প্রচার করত যে কুরআনের একটি প্রকাশ্য (জাহিরি) এবং একটি গোপন বা আধ্যাত্মিক (বাতেনি) অর্থ রয়েছে, যা কেবল নিষ্পাপ ইমামরাই জানেন। ষষ্ঠ ইমাম জাফর সাদিকের পর তাঁরা ইসমাইল বিন জাফরকে প্রকৃত ইমাম মানত।
- গোপন প্রচার সেল (দাওয়া পদ্ধতি): ফাতেমীয়রা মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় গোপন মিশনারি (দায়ী) নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। সাধারণ মানুষের সাথে মিশে তারা সমাজের অন্যায় ও আব্বাসীয়দের অত্যাচারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উসকে দিত।
- আবু আব্দুল্লাহ আশ-শিয়ার রাজনৈতিক কূটকৌশল: ফাতেমীয় আন্দোলনের প্রকৃত রাজনৈতিক স্থপতি ছিলেন প্রধান দায়ী আবু আব্দুল্লাহ আশ-শিয়া। তিনি উত্তর আফ্রিকার দুর্গম পাহাড়ি বারবারদের কুতামা গোত্রের সরল বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে তাদের মধ্যে মেসিয়ানিক বা মাহদী আগমনের তীব্র আবেগ সৃষ্টি করেন এবং তাদের নিয়ে একটি দুর্ধর্ষ সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন।
“ধর্মের আবরণে একটি রাজনৈতিক আন্দোলন”—উক্তিটির বিশ্লেষণ
ঐতিহাসিকদের এই ধারণার সাথে সম্পূর্ণ একমত হওয়ার মতো যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ ও যৌক্তিক ভিত্তি রয়েছে:
- ১. বংশ মর্যাদার রাজনৈতিক ব্যবহার: সাধারণ মুসলমানদের কাছে সহানুভূতি ও আনুগত্য পাওয়ার জন্য তারা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে হযরত ফাতিমা (রা.) ও আলীর পবিত্র রক্তের উত্তরাধিকারী হওয়ার দাবি করে। অথচ সমসাময়িক বহু ইতিহাসবিদ ও সুন্নি আলেমদের মতে ওবায়দুল্লাহ মাহদীর বংশলতিকা ছিল পারসিক দ্বৈতবাদী মায়মুন আল-কাদ্দাহর সাথে সম্পৃক্ত।
- ২. মাহদী মতবাদের মাধ্যমে চরম ধর্মান্ধতা সৃষ্টি: আবু আব্দুল্লাহ বারবারদের বুঝিয়েছিলেন যে ওবায়দুল্লাহ হলেন সেই প্রতিশ্রুত ‘ইমাম মাহদী’, যিনি পৃথিবীতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবেন। এই অন্ধ ধর্মীয় উন্মাদনাকে তিনি তিউনিসিয়ার শাসক আগলাবীয়দের সিংহাসন দখলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন।
- ৩. রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা অর্জিত হতেই ধর্মীয় নেতাদের হত্যা: ৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে ক্ষমতা দখল করে ওবায়দুল্লাহ খলিফা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার মাত্র দুই বছরের মাথায় (৯১১ খ্রি.) তিনি সেই আবু আব্দুল্লাহ আশ-শিয়াকেই নির্মমভাবে হত্যা করেন, যাঁর রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে তিনি সিংহাসন পেয়েছিলেন। এটি প্রমাণ করে তাদের কাছে ধর্মীয় আনুগত্য নয়, ক্ষমতাই ছিল মূল লক্ষ্য।
- ৪. আব্বাসীয়দের সমকক্ষ রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলা: তাদের মূল লক্ষ্য আধ্যাত্মিক সংস্কার ছিল না; বরং তারা চেয়েছিল বাগদাদের সুন্নি আব্বাসীয় খিলাফত এবং স্পেনের উমাইয়া খিলাফত ধ্বংস করে সমগ্র মুসলিম জাহানে কায়রোভিত্তিক একটি একচ্ছত্র শিয়া সাম্রাজ্য কায়েম করা।
উপসংহার
নিঃসন্দেহে ফাতেমীয় আন্দোলন ছিল ধর্মের আবরণে মোড়ানো এক সুচতুর ও দীর্ঘমেয়াদী ভূ-রাজনৈতিক আন্দোলন। ধর্মীয় প্রতীক ও ইমামতের ভাবাবেগকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের এমন নিখুঁত উদাহরণ মধ্যযুগীয় ইতিহাসে বিরল।
৪। শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে ফাতেমীয়দের অবদান আলোচনা কর।
[Discuss the contributions of Fatimids to the education and culture.]
ভূমিকা
৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে সেনাপতি জওহর আল-সাকিলির মাধ্যমে মিশর বিজয়ের পর ফাতেমীয় খিলাফত তার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের চরম শিখরে পৌঁছে। কায়রোকে কেন্দ্র করে ফাতেমীয় খলিফাগণ শিল্প, বিজ্ঞান, সাহিত্য এবং উচ্চশিক্ষার যে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করেছিলেন, তা কায়রোকে বাগদাদ ও কর্ডোভার পাশাপাশি মধ্যযুগীয় পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাংস্কৃতিক নগরীতে রূপান্তরিত করেছিল।
শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে প্রধান অবদানসমূহ
- ১. আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা (৯৭২ খ্রি.): ৯৭০ থেকে ৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে সেনাপতি জওহর খলিফা আল-মুইজের নির্দেশে কায়রোতে ঐতিহাসিক ‘জামে আল-আজহার’ মসজিদ নির্মাণ করেন। খলিফা আল-আজিজের আমলে এটি পূর্ণাঙ্গ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়। এটি বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়, যা আজ পর্যন্ত ইসলামি জ্ঞান ও আরবি ভাষা শিক্ষার সর্বপ্রধান কেন্দ্র হিসেবে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।
- ২. দারুল হিকমাহ বা দারুল ইলম প্রতিষ্ঠা (১০০৫ খ্রি.): খলিফা আল-হাকিম বাগদাদের বায়তুল হিকমার অনুকরণে কায়রোতে ‘দারুল ইলম’ বা জ্ঞানভবন স্থাপন করেন। এখানে কুরআন, হাদিস, চিকিৎসাবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং গ্রিক দর্শনের বিপুল গ্রন্থ সংগৃহীত ছিল। সাধারণ শিক্ষার্থী ও গবেষকদের বিনামূল্যে কাগজ, কলম ও গবেষণাবৃত্তি দেওয়া হতো।
- ৩. সুবিশাল রাজকীয় পাঠাগার: কায়রোর রাজকীয় প্রাসাদের পাঠাগারে প্রায় ৪০টি কক্ষে ২ লক্ষাধিক (কারো মতে ৬ লক্ষাধিক) দুর্লভ পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত ছিল। কেবল চিকিৎসা শাস্ত্রের ওপরই সেখানে ২৪,০০০ গ্রন্থ ছিল।
- ৪. বিখ্যাত বিজ্ঞানীদের পৃষ্ঠপোষকতা:
- ইবনুল হাইসাম (Alhazen): আলোকবিজ্ঞানের জনক ইবনুল হাইসাম ফাতেমীয় খলিফা আল-হাকিমের দরবারে গবেষণা করেন এবং তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘কিতাবুল মানাজির’ (Book of Optics) রচনা করেন।
- আলী বিন ইউনুস: বিশ্বখ্যাত জ্যোতির্বিদ আলী বিন ইউনুস কায়রোর মোকাট্টাম পাহাড়ে স্থাপিত মানমন্দিরে গবেষণা করে নিখুঁত জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক তালিকা ‘জিজ আল-হাকিমি’ প্রস্তুত করেন।
- আম্মার আল-মাওসিলী: আধুনিক চোখের ছানি অপারেশনের সুই আবিষ্কারক বিখ্যাত চক্ষু বিশেষজ্ঞ।
- ৫. স্থাপত্য ও চারুকলা: ফাতেমীয়রা কায়রোর আল-হাকিম মসজিদ, আল-আকমাল মসজিদ এবং বিখ্যাত তোরণ বাবুল ফুতুহ, বাবুন নাসর ও বাবু জুওয়াইলা নির্মাণ করে অনন্য স্থাপত্যরীতির প্রবর্তন করে। কাঁচশিল্প, চিনামাটির পাত্র এবং নকশাদার বস্ত্রশিল্পে ফাতেমীয় কারিগররা চরম উৎকর্ষ অর্জন করেছিল।
উপসংহার
ফাতেমীয়রা শিয়া মতাদর্শের হলেও শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রসারে তারা ছিলেন অত্যন্ত উদার। কায়রো নগরী ও আল-আজহারের প্রতিষ্ঠা বিশ্ব সভ্যতার ইতিহাসে ফাতেমীয়দের চির অমর করে রেখেছে।
৫। শাসক হিসেবে খলিফা আল-আজিজের কৃতিত্ব মূল্যায়ন কর।
[Evaluate the achievements of Khalifa Al-Aziz as a ruler.]
ভূমিকা
ফাতেমীয় খিলাফতের পঞ্চম খলিফা এবং মিশরে শাসন পরিচালনাকারী দ্বিতীয় খলিফা ছিলেন আবুল মানসুর নিজার আল-আজিজ বিল্লাহ (শাসনকাল: ৯৭৫—৯৯৬ খ্রি.)। তিনি ছিলেন ফাতেমীয় রাজবংশের সর্বশ্রেষ্ঠ, সর্বাপেক্ষা প্রজাবৎসল, পরমতসহিষ্ণু ও দূরদর্শী শাসক। তাঁর ২১ বছরের শান্তিপূর্ণ শাসনামলকে ফাতেমীয় সাম্রাজ্যের ‘স্বর্ণযুগ’ বলা হয়।
শাসক হিসেবে আল-আজিজের প্রধান কৃতিত্বসমূহ
- ১. সাম্রাজ্য সম্প্রসারণ ও নিরাপত্তা বিধান: তিনি সিরিয়ার বিদ্রোহী দলগুলোকে দমন করে দামেস্ক, আলেপ্পো, হিমস এবং বৈরুত ফাতেমীয় সাম্রাজ্যভুক্ত করেন। পবিত্র মক্কা ও মদিনার হারামাইন শরিফাইনে আব্বাসীয় খলিফার পরিবর্তে আল-আজিজের নামে খুতবা পাঠ শুরু হয়। ফাতেমীয় সাম্রাজ্য আটলান্টিক মহাসাগর থেকে লোহিত সাগর এবং ইয়েমেন পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।
- ২. অভূতপূর্ব ধর্মীয় সহনশীলতা ও ধর্মনিরপেক্ষ নীতি: আল-আজিজ ছিলেন শিয়া খলিফা, কিন্তু তিনি সকল ধর্মের প্রজাদের প্রতি অসীম উদারতা দেখিয়েছিলেন। তাঁর প্রধান উজির ছিলেন একজন ধর্মান্তরিত ইহুদি পণ্ডিত ইয়াকুব বিন কিল্লিস। তিনি খ্রিস্টান পণ্ডিত ঈসা বিন নেস্টোরিয়াসকে গুরুত্বপূর্ণ সচিবালয়ের দায়িত্ব দেন। এমনকি কায়রো ও অন্যান্য স্থানে খ্রিস্টানদের নতুন গির্জা নির্মাণের অনুমতি দেন।
- ৩. আল-আজহারের রূপান্তর ও শিক্ষার বিকাশ: তাঁর উজির ইয়াকুব বিন কিল্লিসের পরামর্শে আল-আজহার মসজিদকে নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করা হয়। তিনি ৩৫ জন বিজ্ঞ পণ্ডিতকে মাসিক স্থায়ী বেতন ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দেন।
- ৪. সুবিশাল কায়রো পাঠাগার সমৃদ্ধকরণ: আল-আজিজ ছিলেন একজন পণ্ডিত ও বইপ্রেমিক খলিফা। তিনি কায়রোর রাজকীয় লাইব্রেরিকে সমৃদ্ধ করেন। সেখানে এক লক্ষাধিক বাঁধানো বই ছিল এবং কেবল বিখ্যাত ইতিহাসবিদ আত-তাবারীর ‘তারিখুর রাসুল ওয়াল মুলুক’-এরই ২০টিরও বেশি সম্পূর্ণ কপি সংরক্ষিত ছিল।
- ৫. স্থাপত্য ও জনকল্যাণ: তিনি কায়রোতে সুদৃশ্য ‘কাসরুল বাশীর’ (গোল্ডেন প্যালেস), জামে হাকিমের ভিত্তি স্থাপন এবং নীল নদের তীরজুড়ে বহু চমৎকার বাগান, সেতু ও রাস্তাঘাট নির্মাণ করেন। তাঁর আমলে মিশরে কোনো প্রকার দুর্ভিক্ষ বা খাদ্যসংকট হয়নি।
উপসংহার
খলিফা আল-আজিজ ছিলেন এক আদর্শ মানবিক শাসক। ক্ষমা, বদান্যতা, নিরপেক্ষতা এবং প্রজাপালনে তিনি যে উচ্চ নৈতিক মানদণ্ড স্থাপন করেছিলেন, তা মধ্যযুগের ইতিহাসে সত্যিই এক দুর্লভ দৃষ্টান্ত।
৬। মিশরে ফাতেমীয় বংশের পতনের কারণগুলো লেখ।
[Write the causes of the downfall of the Fatimids in Egypt.]
ভূমিকা
উত্তর আফ্রিকা ও মিশরে দীর্ঘ দুই শতাব্দীরও বেশি সময় (৯০৯—১১৭১ খ্রি.) শাসন পরিচালনার পর একাদশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে ফাতেমীয় খিলাফত চরম অবক্ষয়ের মুখে পড়ে। অবশেষে ১১৭১ খ্রিষ্টাব্দে মহান বীর সালাহুদ্দীন আইয়ূবী কর্তৃক মিশরে শেষ ফাতেমীয় খলিফা আল-আদিদের ক্ষমতাচ্যুতির মাধ্যমে ফাতেমীয় খিলাফতের চির অবসান ঘটে এবং মিশরে সুন্নি আইয়ূবী সালতানাত প্রতিষ্ঠিত হয়।
ফাতেমীয়দের পতনের প্রধান কারণসমূহ
- ১. অযোগ্য ও শিশু খলিফাদের সিংহাসন আরোহণ: আল-আজিজের পর খলিফা আল-হাকিমের বিভ্রান্তিকর নীতি এবং তৎপরবর্তী সময়ে অপ্রাপ্তবয়স্ক ও দুর্বল খলিফারা সিংহাসনে বসেন (যেমন: আল-মুস্তানসিরের শিশুকালে সিংহাসনে বসা)। ফলে খলিফারা তাঁদের ব্যক্তিগত ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন।
- ২. উজির ও সামরিক অভিজাতদের একনায়কতন্ত্র (উজিরদের যুগ): দুর্বল খলিফাদের সুযোগ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বা উজিররা সর্বেসর্বা হয়ে ওঠেন। ক্ষমতার লোভে বিভিন্ন উজির ও সেনাপতিরা একে অপরকে হত্যা করতে থাকে (যেমন: শাওয়ার ও দিরগামের মধ্যকার গৃহযুদ্ধ), যা রাষ্ট্রকে সম্পূর্ণ পঙ্গু করে দেয়।
- ৩. সেনাবাহিনীতে জাতিগত গৃহযুদ্ধ: ফাতেমীয় সেনাবাহিনীতে তিনটি বিবদমান জাতিগোষ্ঠী ছিল—সুদানি হাবশি দল, বারবার দল এবং তুর্কি অশ্বারোহী দল। খলিফা মুস্তানসিরের আমলে হাবশি ও তুর্কিদের মধ্যে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ বাঁধে, যা রাজধানী কায়রোকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে।
- ৪. ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় (আল-শিদ্দাহ আল-মুসতানসিরিয়্যাহ): খলিফা মুস্তানসিরের আমলে নীল নদে পানি না আসায় ১০৬৫ থেকে ১০৭২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত টানা সাত বছর মিশরে ইতিহাসের ভয়াবহতম দুর্ভিক্ষ ও মহামারী দেখা দেয়। মানুষ কুকুর, বিড়াল এমনকি মানুষের মাংস খেতে বাধ্য হয়। রাজকোষ শূন্য হয়ে যায় এবং রাজকীয় লাইব্রেরির মহামূল্যবান গ্রন্থগুলো বিক্রি বা পুড়িয়ে ফেলা হয়।
- ৫. কারামাতিয়া ও ক্রুসেডারদের সামরিক চাপ: একদিকে অভ্যন্তরীণ কোন্দল, অন্যদিকে ইউরোপ থেকে আগত খ্রিষ্টান ক্রুসেডাররা ফাতেমীয়দের ফিলিস্তিন ও লেবানন থেকে বিতাড়িত করে মিশরের সীমান্ত পর্যন্ত হুমকি সৃষ্টি করে। শাওয়ারের মতো দুর্নীতিবাজ উজির ক্রুসেডারদের ডেকে এনে দেশের নিরাপত্তা বিপন্ন করেন।
- ৬. সালাহুদ্দীন আইয়ূবীর আগমন ও আইয়ূবী বংশ প্রতিষ্ঠা: ফাতেমীয়দের ক্রুসেডারদের হাত থেকে রক্ষা করতে সিরিয়ার নুরউদ্দিন জঙ্গি তাঁর সেনাপতি আসাদুদ্দিন শিরকুহ এবং সালাহুদ্দীন আইয়ূবীকে মিশরে পাঠান। শিরকুহর মৃত্যুর পর সালাহুদ্দীন মিশরের উজির হন। তিনি অত্যন্ত প্রজ্ঞার সাথে শিয়া প্রভাব দূর করেন এবং ১১৭১ খ্রিষ্টাব্দে খলিফা আল-আদিদের মৃত্যুর পর বাগদাদের আব্বাসীয় খলিফার নামে জুমার খুতবা চালু করে ফাতেমীয় শাসনের সমাপ্তি টানেন।
উপসংহার
ফাতেমীয় বংশের পতন ছিল তাদের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি, জাতিগত গৃহযুদ্ধ এবং ধর্মীয় সংকীর্ণতার অনিবার্য ফল। সালাহুদ্দীন আইয়ূবীর মাধ্যমে মিশরে পুনরায় সুন্নি মতাদর্শের পুনরুজ্জীবন ঘটে এবং ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ জিহাদের নতুন শক্তি অর্জিত হয়।
খ বিভাগ (সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন)
৭। স্পেনের ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের পরিচয় দাও।
[Discuss about the geographical features of Spain.]
ভৌগোলিক অবস্থান ও সীমানা
আইবেরীয় উপদ্বীপে অবস্থিত স্পেন ইউরোপের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে এক কৌশলগত অবস্থানে বিদ্যমান। এর উত্তরে বিস্কে উপসাগর ও ফ্রান্সের সাথে সংযোগকারী পিরেনিজ পর্বতমালা, পূর্বে ও দক্ষিণ-পূর্বে ভূমধ্যসাগর, দক্ষিণে মাত্র কয়েক মাইল চওড়া জিব্রাল্টার প্রণালী (যা স্পেনকে আফ্রিকা মহাদেশ থেকে পৃথক করেছে) এবং পশ্চিমে পর্তুগাল ও আটলান্টিক মহাসাগর অবস্থিত।
ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ও নদ-নদী
স্পেনের অধিকাংশ ভূখণ্ড পাহাড়ি ও মালভূমি দ্বারা আবৃত। দেশটির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর রুক্ষ আবহাওয়া ও খরস্রোতা নদীসমূহ। প্রধান নদীগুলোর মধ্যে রয়েছে গুয়াডালকুইভির (ওয়াদিউল কাবির), গুয়াডিয়ানা (ওয়াদিউল আনা), টেগাস (তাজো) এবং এব্রো (ইবরো)। মুসলিম শাসনামলে এই নদীগুলোর পানি ব্যবহার করে খাল খনন ও নরিয়া (জলচক্র) স্থাপনের মাধ্যমে স্পেনের অনুর্বর উপত্যকাগুলোকে ইউরোপের সবচেয়ে শস্যশ্যামল ফলের বাগানে পরিণত করা হয়েছিল।
৮। মিশরে মামলুক বংশ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস লেখ।
[Discuss the history of foundation of the Mumluk dynasty of Egypt.]
মামলুকদের পরিচয় ও পটভূমি
‘মামলুক’ (Mamluk) শব্দের অর্থ কেনা গোলাম বা ক্রীতদাস। আইয়ূবী সুলতানরা তাঁদের সেনাবাহিনীতে তুর্কি ও ককেশাসের দুর্ধর্ষ কিপচাক দাসদের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন, যারা পরবর্তীতে ‘মামলুক’ নামে পরিচিত হয়।
বংশ প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক ঘটনা
১২৫০ খ্রিষ্টাব্দে সপ্তম ক্রুসেডের সময় শেষ আইয়ূবী সুলতান তুরান শাহের ঔদ্ধত্য ও অযোগ্যতার কারণে মামলুক সেনাপতিরা তাঁকে হত্যা করেন। সুলতান সালিহ আইয়ূবীর বিধবা বিদূষী স্ত্রী শাজারাতুদ দুর ক্ষমতা দখল করেন এবং তিনিই প্রথম মুসলিম নারী হিসেবে মিশরের মসনদে বসেন। কিন্তু বাগদাদের খলিফা একজন নারীর শাসন প্রত্যাখ্যান করলে শাজারাতুদ দুর মামলুক প্রধান সেনাপতি ইজ্জুদ্দীন আইবেককে বিবাহ করেন। এর ফলে ১২৫০ খ্রিষ্টাব্দে আইবেক সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং মিশরে আনুষ্ঠানিকভাবে বীরত্বপূর্ণ ‘মামলুক সালতানাত’ (১২৫০—১৫১৭ খ্রি.) প্রতিষ্ঠিত হয়।
৯। প্রথম বাইবার্সের কৃতিত্ব মূল্যায়ন কর।
[Assess the achievements of Baybars-1.]
পরিচয় ও ঐতিহাসিক ভূমিকা
সুলতান রুকনুদ্দীন প্রথম বাইবার্স (শাসনকাল: ১২৬০—১২৭৭ খ্রি.) ছিলেন মিশরের মামলুক বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা ও সর্বশ্রেষ্ঠ সুলতান। তিনি ১২৬০ খ্রিষ্টাব্দে আইন জালুতের যুদ্ধে মোঙ্গল বাহিনীকে প্রথমবার রুখে দিয়ে মুসলিম জাহানকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার মূল সেনাপতি ছিলেন।
প্রধান কৃতিত্বসমূহ
- মোঙ্গল ও ক্রুসেডার বিতাড়ন: তিনি ফিলিস্তিন ও সিরিয়া থেকে দুর্ধর্ষ ক্রুসেডার দুর্গগুলো একের পর এক দখল করেন এবং এন্টিওক উদ্ধার করেন। মোঙ্গলদের ধারাবাহিক আক্রমণ প্রতিহত করে তিনি সিরিয়া ও মিশরে শান্তি ফেরান।
- নামমাত্র আব্বাসীয় খিলাফত পুনরুজ্জীবন: ১২৫৮ সালে হালাকু খান বাগদাদ ধ্বংস করলে ১২৬১ খ্রিষ্টাব্দে বাইবার্স আব্বাসীয় বংশের এক শাহজাদাকে কায়রোতে এনে খলিফা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন এবং নিজের শাসনের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বৈধতা অর্জন করেন।
- যোগাযোগ ও জনকল্যাণ: তিনি কায়রো ও দামেস্কের মধ্যে নিয়মিত পায়রা ও ঘোড়ার ডাক ব্যবস্থা চালু করেন এবং বিখ্যাত ‘বাইবার্স মসজিদ’ নির্মাণ করেন।
১০। স্পেনে মুসলমানদের পতনের কারণগুলো চিহ্নিত কর।
[Identify the causes of the fall of Muslims in Spain.]
ভূমিকা ও চূড়ান্ত পতন
৭১১ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত মুসলিম আন্দালুস সুদীর্ঘ প্রায় আটশত বছর টিকে থাকার পর ২ জানুয়ারি ১৪৯২ খ্রিষ্টাব্দে শেষ মুসলিম ঘাঁটি গ্রানাডার সুলতান আবু আব্দুল্লাহর (Boabdil) আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বিলুপ্ত হয়।
পতনের প্রধান কারণসমূহ
- ১. আরব বনাম বারবার জাতিগত রক্তক্ষয়ী সংঘাত: স্পেনের মুসলিম সমাজ কখনোই একটি অখণ্ড জাতিতে রূপ নিতে পারেনি। আরবদের বর্ণবাদী অহমিকা এবং বারবারদের অসন্তোষের কারণে প্রায়ই গৃহযুদ্ধ বাধত।
- ২. মুলুকুত তাওয়াইফ বা ক্ষুদ্র খণ্ডরাজ্যে বিভক্তি: উমাইয়া খিলাফতের পতনের পর স্পেন বিশটিরও বেশি দুর্বল ক্ষুদ্র রাজ্যে (মুলুকুত তাওয়াইফ) ভাগ হয়ে যায়, যারা খ্রিষ্টানদের মোকাবেলার বদলে খ্রিষ্টান রাজাদের সাহায্য নিয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করত।
- ৩. সম্মিলিত খ্রিষ্টান পুনর্দখল আন্দোলন (Reconquista): ফার্ডিন্যান্ড ও ইসাবেলার বিবাহবন্ধনের মাধ্যমে আরাগন ও ক্যাস্টিল একত্রিত হয়ে শক্তিশালী খ্রিষ্টান সামরিক মোর্চা গঠন করে মুসলমানদের ওপর চূড়ান্ত আঘাত হানে।
- ৪. বিলাসিতা ও সামরিক শক্তির অবক্ষয়: শেষ যুগের মুসলিম শাসকরা যুদ্ধ ও প্রতিরক্ষা ভুলে প্রাসাদের প্রাচুর্য ও গানে মত্ত হয়ে পড়েছিলেন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. ‘স্পেন, মিশর ও উত্তর আফ্রিকার মুসলিম শাসন’ কোর্সের ভৌগোলিক পরিধি কতটুকু?
এ কোর্সে ইউরোপের স্পেন ও পর্তুগাল (আন্দালুস), উত্তর আফ্রিকার মাগরেব অঞ্চল (মরক্কো, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া) এবং মিশরের ফাতেমীয়, আইয়ূবী ও মামলুক সালতানাতের ইতিহাস (৭১১—১৫১৭ খ্রি.) পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
২. স্পেনে মুসলমানদের ইতিহাস পড়ার সময় কোন শাসকের ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত?
স্পেনের উমাইয়া খিলাফতের প্রতিষ্ঠাতা প্রথম আব্দুর রহমান (সাকরে কুরাইশ) এবং কর্ডোভার সর্বশ্রেষ্ঠ খলিফা তৃতীয় আব্দুর রহমানের সংস্কার, পররাষ্ট্রনীতি ও মদিনাতুজ জাহরার স্থাপত্য বিশেষভাবে পড়তে হবে।
৩. ফাতেমীয় খিলাফতের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরাধিকার কোনটি?
ফাতেমীয় খলিফা আল-মুইজ ও আল-আজিজের পৃষ্ঠপোষকতায় ৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত কায়রোর ‘আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়’ বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর সর্বশ্রেষ্ঠ ও প্রাচীনতম বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরাধিকার।
৪. আইন জালুতের যুদ্ধের ঐতিহাসিক গুরুত্ব কী ছিল?
১২৬০ খ্রিষ্টাব্দে ফিলিস্তিনের আইন জালুতের যুদ্ধে মামলুকরা অপরাজেয় মোঙ্গল বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকাকে নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছিল।
৫. ১৪৯২ সালে গ্রানাডার পতনের পর স্পেনের মুসলমানদের পরিণতি কী হয়েছিল?
খ্রিষ্টান রাজারা সন্ধির শর্ত ভেঙে মুসলমানদের জোরপূর্বক খ্রিষ্টান হতে বাধ্য করে (মরিস্কো) এবং কুখ্যাত ইনকুইজিশনের (Inquisition) মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মুসলমানকে আগুনে পুড়িয়ে ও নির্মম নির্যাতন করে স্পেন থেকে বিতাড়িত করে।
৬. ২০৫১০৫ বিষয়ের পরীক্ষায় মানসম্মত উত্তরের প্রধান শর্ত কী?
স্পেনীয় ও উত্তর আফ্রিকীয় ভৌগোলিক নামসমূহ (যেমন: কর্ডোভা, গ্রানাডা, তোয়াইফ, মাগরেব, কায়রো) নির্ভুলভাবে লেখা এবং ইউরোপীয় ঐতিহাসিকদের (যেমন: লেনপুল, পি. কে. হিট্টি) প্রামাণ্য মূল্যায়ন সংযুক্ত করা।

