ফাযিল (স্নাতক) পাস ৩য় বর্ষ পরীক্ষা – ২০২১
বিষয়: আদ-দাওয়া আল-ইসলামিয়্যাহ (ঐচ্ছিক) ৩য় পত্র (বিষয় কোড: ৪৩০)
[দাওয়াহর পদ্ধতি ও কৌশল / মানহাজুদ দাওয়াতিল ইসলামিয়্যাহ]
সময়: ৩ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ১০০
[الملاحظة : أجب عن خمسة من الأسئلة التالية والدرجات متساوية-]
[দ্রষ্টব্য : নিম্নের যে-কোনো পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দাও। সকল প্রশ্নের মান সমান। | পূর্ণমান: ১০০]
ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ফাযিল (স্নাতক) পাস ৩য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২১-এর আদ-দাওয়া আল-ইসলামিয়্যাহ ৩য় পত্র (বিষয় কোড: ৪৩০) পরীক্ষার মূল প্রশ্নপত্রের প্রতিটি প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ ও প্রামাণ্য অ্যাকাডেমিক সমাধান নিচে দেওয়া হলো। ফাযিল ডিগ্রি ও অনার্স শ্রেণির ২০ নম্বরের রচনামূলক প্রশ্নের উচ্চমান বজায় রেখে ভূমিকা, মানহাজের পারিভাষিক বিশ্লেষণ, কুরআন ও সুন্নাহর দলিল, বিশ্লেষণী পয়েন্ট এবং উপসংহার সহযোগে প্রতিটি উত্তর প্রস্তুত করা হয়েছে।
১। تحدث عن المنهج الذي اتبعه رسول الله صلى الله عليه وسلم للدعوة إلى الله في حياته المدينة.
[মদিনার জীবনে রাসুলুল্লাহ (স) মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বানের জন্য যে পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন তা আলোচনা কর।]
[মান: ২০]
ভূমিকা:
৬২২ খ্রিষ্টাব্দে ঐতিহাসিক হিজরতের পর মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের যে দশ বছর মদিনা মুনাওয়ারায় অতিবাহিত হয়, তা ছিল ইসলামি দাওয়াহর সামগ্রিক পূর্ণতা ও প্রায়োগিক রূপায়নের স্বর্ণযুগ। মক্কার ১৩ বছরের ব্যক্তি গঠন ও আকিদার বুনিয়াদের ওপর ভিত্তি করে মদিনার জীবনে দাওয়াত রাষ্ট্র, আইন, বিচার, সমাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সম্প্রসারিত হয়। মদিনায় নবীজীর দাওয়াতি মানহাজ ছিল এক পূর্ণাঙ্গ বিশ্বব্যবস্থার রূপরেখা।
মদিনার জীবনে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসৃত প্রধান প্রধান দাওয়াতি পদ্ধতিসমূহ:
১. দাওয়াতি কেন্দ্র হিসেবে মসজিদে নববী প্রতিষ্ঠা:
মদিনায় পৌঁছেই নবীজী মসজিদে নববী নির্মাণ করেন। এটি ছিল একাধারে উপাসনার ঘর, দাওয়াত প্রেরণের হেডকোয়ার্টার এবং আসহাবুস্ সুফফাহর মাধ্যমে দাঈ তৈরির প্রথম আন্তর্জাতিক অ্যাকাডেমি।
২. মুয়াখাত বা ঐতিহাসিক ভ্রাতৃত্বের সামাজিক বন্ধন:
মক্কা থেকে নিঃস্ব অবস্থায় হিজরতকারী মুহাজিরদের সাথে মদিনার আনসারদের রক্তের সম্পর্কের চেয়েও গভীর আত্মিক ও অর্থনৈতিক ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ করেন, যা বিশ্ববাসীকে দাওয়াহর অনুপম সামাজিক নিরাপত্তার নমুনা প্রদর্শন করে।
৩. মদিনা সনদের মাধ্যমে বহুধর্মীয় সহাবস্থান ও সুবিচার:
বিশ্বের প্রথম লিখিত সংবিধান ‘মদিনা সনদ’ প্রণয়ন করে মুসলিম ও ইহুদিদের সমন্বয়ে ইনসাফভিত্তিক বহুত্ববাদী রাষ্ট্র গঠন করেন এবং ইহুদিদের ধর্মীয় স্বাধীনতার পূর্ণ নিশ্চয়তা দিয়ে ইসলামের পরম উদার দাওয়াত তুলে ধরেন।
৪. শরিয়তের পূর্ণাঙ্গ প্রাতিষ্ঠানিক রূপায়ন:
মদিনায় নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত, হালাল-হারাম, পারিবারিক আইন ও অর্থব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ হুকুম অবতীর্ণ হয়। নবীজী সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে শরিয়ত বাস্তবায়ন করে দেখিয়ে দেন যে ইসলাম নিছক বিশ্বাস নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা।
৫. আন্তর্জাতিক পরাশক্তিসমূহের কাছে পত্র প্রেরণ:
হুদায়বিয়ার সন্ধির পর নবীজী রোম সম্রাট হেরাক্লিয়াস, পারস্য সম্রাট খসরু পারভেজ, মিসরের মুকাউকিস এবং আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজ্জাশীর কাছে ইসলামের দাওয়াতনামা পাঠিয়ে দাওয়াতকে বিশ্বমঞ্চে নিয়ে যান।
উপসংহার:
মদিনার দাওয়াতি মানহাজ প্রমাণ করে যে, ইসলামি দাওয়াত কেবল ব্যক্তি সংশোধনে সীমাবদ্ধ নয়; বরং রাষ্ট্র, সমাজ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সর্বস্তরে আল্লাহর হুকুম কায়েম করাই এর চূড়ান্ত লক্ষ্য।
২। تحدث عن الجوانب المتفقة من المناهج الدعوية للأنبياء والرسل.
[নবি ও রাসূলগণের দাওয়াত দানের অভিন্ন পদ্ধতিসমূহ বর্ণনা কর।]
[মান: ২০]
ভূমিকা:
সৃষ্টির সূচনা থেকে পথভ্রষ্ট মানবজাতিকে মুক্তির পথ প্রদর্শনের জন্য মহান আল্লাহ যুগে যুগে যে সকল আম্বিয়া ও রাসূলগণকে পাঠিয়েছেন, তাঁদের প্রত্যেকের দাওয়াতি কর্মপদ্ধতিতে এক অপূর্ব ঐশী অভিন্নতা বিদ্যমান ছিল। তাঁদের স্থান, কাল ও শরয়ী শাখাগত কিছু আহকামে বৈচিত্র্য থাকলেও দাওয়াহর মূল ভিত্তি, চেতনা, পদ্ধতি ও দর্শনে তাঁরা ছিলেন একই মালার সুতোয় গাঁথা এক আলোকবর্তিকা।
নবী ও রাসূলগণের দাওয়াতদানের মৌলিক অভিন্ন দিকসমূহ (الجوانب المتفقة من المناهج):
১. একমাত্র আল্লাহর তাওহীদকে দাওয়াতের সূচনা বানানো:
সকল নবীর দাওয়াতি সিলেবাসের প্রথম অধ্যায় ছিল তাওহীদ প্রতিষ্ঠা ও শিরক বর্জন। আদম (আ.) থেকে মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত প্রত্যেক নবী তাঁর কওমকে ডেকে বলেছেন:
اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُم مِّنْ إِلَٰهٍ غَيْرُهُ
“তোমরা একমাত্র আল্লাহর ইবাদত কর, তিনি ছাড়া তোমাদের অন্য কোনো সত্য ইলাহ নেই।” (সূরা আল-আ’রাফ: ৫৯)।
২. নিঃস্বার্থ সেবা ও কোনো প্রতিদান না চাওয়া:
নবীগণ কখনো স্বজাতির কাছে কোনো অর্থ, রাজত্ব বা পার্থিব প্রতিদান চাননি। তাঁদের সমস্বরে অভিন্ন ঘোষণা ছিল:
إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَى اللَّهِ
“আমার প্রতিদান তো কেবল মহান আল্লাহর নিকটই রয়েছে।” (সূরা ইউনুস: ৭২)।
৩. মানবজাতির প্রতি পরম দরদ ও কল্যাণকামিতা (النصيحة):
কোনো নবীই জাতিকে ধ্বংস করার বা অভিশাপ দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে আসেননি; বরং একজন মমতাময়ী পিতার মতো ব্যথিত অন্তরে মানুষকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন। নূহ (আ.) বলেছিলেন: وَأَنصَحُ لَكُمْ وَأَعْلَمُ مِنَ اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ – “আমি তোমাদের কল্যাণ কামনা করি।” (সূরা আল-আ’রাফ: ৬২)।
৪. চরম নির্যাতন ও বিরোধিতায় অবিচল ধৈর্য ধারণ:
মিথ্যা অপবাদ, বয়কট, দেশান্তর ও হত্যার চক্রান্তের মুখেও সকল নবী ছিলেন অটল পাহাড়ের মতো দৃঢ়সংকল্প।
৫. যুক্তি, প্রমাণ ও মুজিযার মাধ্যমে সত্য স্পষ্টকরণ:
আল্লাহর নির্দেশে চাক্ষুষ মুজিযা ও অকাট্য বুদ্ধিবৃত্তিক দলিলের মাধ্যমে বিরোধীদের ভ্রান্তি প্রমাণ করা।
উপসংহার:
আম্বিয়ায়ে কেরামের এই অভিন্ন মানহাজই হলো ইসলামি দাওয়াহর চিরন্তন রূপরেখা। এই ঐশী নীতিমালার অনুসরণের মাধ্যমেই দাঈর দাওয়াতে রুহানিয়াত ও বিপ্লব সঞ্চারিত হয়।
৩। ماذا تفهم بالدعوة السرية؟ تحدث عن مناهج رسول الله صلى الله عليه وسلم في دعوته السرية مفصلا.
[‘আদ-দা’ওয়াহ আস-সিররিয়্যাহ’ বলতে কী বুঝ? রাসূলুল্লাহ (স)-এর দা’ওয়াহ সিররিয়ার পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা কর।]
[মান: ২০]
ভূমিকা:
নবুওয়তের সুমহান দায়িত্ব প্রাপ্তির পর মক্কার মাটিতে মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রাথমিক তিন বছরের দাওয়াতি মিশনটি ইতিহাসে ‘আদ-দাওয়াতুস সিররিয়্যাহ’ (الدعوة السرية) বা গোপন দাওয়াত নামে পরিচিত। এটি কোনো ভীরুতা বা কাপুরুষতা ছিল না; বরং চরম প্রতিকূল পৌত্তলিক পরিবেশে ইসলামি দাওয়াহর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং একদল বিশ্বস্ত ও আপসহীন জানবায কর্মী তৈরির জন্য এটি ছিল এক দূরদর্শী, বিজ্ঞানসম্মত ও ঐশী কৌশল।
১. আদ-দাওয়াতুস সিররিয়্যাহর পরিচয়:
নবুওয়তের প্রথম দিন থেকে শুরু করে সাফা পাহাড়ে প্রকাশ্য ঘোষণার পূর্ব পর্যন্ত দীর্ঘ তিন বছর কালব্যাপী অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের কাছে ব্যক্তিগত পর্যায়ে তাওহীদের দাওয়াত পৌঁছানোর ঐতিহাসিক পর্যায়কে ‘আদ-দাওয়াতুস সিররিয়্যাহ’ বলে।
২. গোপন দাওয়াতের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসৃত প্রধান কর্মপদ্ধতি ও কৌশলসমূহ:
১. সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও নিকটাত্মীয়দের দিয়ে সূচনা: নবীজী কোনো প্রকাশ্য জমায়েত না করে প্রথমে এমন ব্যক্তিদের কাছে ইসলাম পেশ করেন যারা তাঁর পূর্ববর্তী ৪০ বছরের সত্যবাদিতা ও আমানতদারী সম্পর্কে শতভাগ নিশ্চিত ছিলেন। ফলে প্রথম দিনেই খাদিজা (রা.), কিশোর আলী (রা.), দাস যায়েদ ইবনে হারেসা (রা.) এবং পরম বন্ধু আবু বকর (রা.) কোনো দ্বিধা ছাড়াই ইসলাম গ্রহণ করেন।
২. দাঈ তৈরি ও আবু বকর (রা.)-এর ভূমিকা: ইসলাম গ্রহণের পরপরই আবু বকর (রা.) দাওয়াতি কাজে নেমে পড়েন এবং তাঁর প্রচেষ্টায় উসমান বিন আফফান, আবদুর রহমান বিন আউফ, সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস ও যুবাইর বিন আওয়ামের (রা.) মতো আরবের শ্রেষ্ঠ যুবকরা ইসলাম কবুল করেন।
৩. গোপন মারকায হিসেবে দারুল আরকাম প্রতিষ্ঠা: দাওয়াত পরিচালনা ও সাহাবাদের কুরআন শিক্ষার জন্য সাফা পাহাড়ের পাদদেশে তরুণ সাহাবী আরকাম ইবনে আবিল আরকামের বাড়িকে একটি নিরাপদ গোপন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে রূপান্তর করা হয়।
৪. পাহাড়ের গিরিদরীতে নামায আদায়: সাহাবাগণ মক্কার জনচক্ষুর অন্তরালে পাহাড়ি উপত্যকায় গিয়ে গোপনে জামাআতে নামায আদায় করতেন, যাতে কুরাইশদের সাথে অকাল সংঘাত এড়ানো যায়।
৫. আকিদা ও চরিত্র গঠনের গভীর পাঠশালা: এই তিন বছরে প্রায় চল্লিশ জন নারী ও পুরুষ ইসলাম গ্রহণ করেন, যাদের অন্তরকে নবীজী শিরক ও দুনিয়ার লোভ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করে আল্লাহর জন্য জীবন উৎসর্গ করার এক ইস্পাতকঠিন কাফেলায় রূপান্তর করেছিলেন।
উপসংহার:
আদ-দাওয়াতুস সিররিয়্যাহ আধুনিক দাঈদের শিক্ষা দেয় যে, প্রতিকূল সমাজে বিপ্লবী কাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সতর্কতা, গোপন প্রশিক্ষণ ও খাঁটি ভিত্তি তৈরি করা প্রকাশ্য কার্যক্রমের চেয়েও বহুগুণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
৪। ما القدوة الحسنة؟ بين أهميتها في مجال الدعوة الإسلامية.
[‘কুদওয়া হাসানা’ বলতে কী বোঝায়? ইসলামী দা’ওয়াহ-এর ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব বর্ণনা কর।]
[মান: ২০]
ভূমিকা:
ইসলামি দাওয়াহর সবচেয়ে শক্তিশালী, স্থায়ী ও অনবদ্য মাধ্যম হলো ‘আল-কুদওয়াতুল হাসানাহ’ (القدوة الحسنة) বা উত্তম চাক্ষুষ আদর্শ। দাওয়াতি ময়দানে দাঈর মুখের কথার চেয়ে তাঁর ব্যক্তিগত চরিত্র, আমল ও জীবনযাপনের ভাষা বহুগুণ বেশি প্রভাব বিস্তার করে। একজন দাঈ যখন যা বলেন তা অক্ষরে অক্ষরে নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করেন, তখন মানুষের হৃদয় কোনো প্রকার যুক্তিতর্ক ছাড়াই সত্যের প্রতি অনুগত হয়ে যায়।
১. কুদওয়াহ হাসানাহর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ:
– আভিধানিক অর্থ: ‘কুদওয়াহ’ শব্দের অর্থ অনুকরণীয় আদর্শ, মডেল বা নমুনা। আর ‘হাসানাহ’ অর্থ সুন্দর ও কল্যাণময়।
– পারিভাষিক সংজ্ঞা: নিজের কথা, কাজ, আচরণ, ইবাদত ও লেনদেনের মাধ্যমে এমন এক নিষ্কলুষ ও আকর্ষণীয় বাস্তব চরিত্র মানুষের সামনে উপস্থাপন করা, যা দেখে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তা অনুসরণ করতে উদ্বুদ্ধ হয়—তাকে ‘কুদওয়াতুল হাসানাহ’ বলে।
২. কুরআনুল কারীমের দৃষ্টিতে কুদওয়াহ হাসানাহর কেন্দ্রীয় গুরুত্ব:
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র জীবনকে সমগ্র মানবজাতির জন্য একমাত্র পরম আদর্শ ঘোষণা করে বলেন:
لَّقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِّمَن كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ
“নিশ্চয় তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ—তার জন্য, যে আল্লাহ ও পরকালের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে।” (সূরা আল-আহযাব: ২১)।
৩. দাওয়াতি ময়দানে কুদওয়াহ হাসানাহর অপরিহার্য ভূমিকা ও প্রভাব:
১. মুখের কথার চেয়ে আমলের গভীর প্রভাব: আরবরা বলত: لسان الحال أفصح من لسان المقال – “কর্মের ভাষা মুখের কথার চেয়েও বেশি প্রাঞ্জল ও শক্তিশালী।” দাঈ যদি নিজে তাহাজ্জুদ পড়েন, দানশীল হন এবং নম্র হন—তবে তাঁর একটি ছোট উপদেশও পাথরে খোদাইয়ের মতো কাজ করে।
২. মুনাফেকির কলঙ্ক থেকে মুক্তি: নিজে যা করে না তা অন্যকে নসীহত করাকে আল্লাহ তাআলা চরম অপছন্দ করেন। কুরআন বলে: كَبُرَ مَقْتًا عِندَ اللَّهِ أَن تَقُولُوا مَا لَا تَفْعَلُونَ (সূরা আস-সাফ: ৩)। কথা ও কাজের অসঙ্গতি দাওয়াতকে ধ্বংস করে দেয়।
৩. ইতিহাসে ইসলাম বিস্তার: মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও বাংলায় কোনো সৈন্যবাহিনী যায়নি; বরং মুসলিম ব্যবসায়ী ও সুফিদের অনুপম আমানতদারী ও চারিত্রিক সৌন্দর্য দেখেই সেখানকার কোটি কোটি মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছিল।
উপসংহার:
কুদওয়াহ হাসানাহ হলো দাওয়াহর মূল ভিত্তি। বর্তমান যুগে লম্বা বক্তব্যের চেয়ে নিজের জীবনে সুন্নাতের নিখুঁত বাস্তব নমুনা পেশ করাই দাঈদের প্রধান কাজ।
৫। تحدث عن العقبات والعوائق التي يواجهها الداعي وطرق علاجها بالإيجاز.
[দাঈ যে সব বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হয়ে থাকেন তা এবং সেগুলো मुकाबला করার বিভিন্ন উপায় সংক্ষেপে আলোচনা কর।]
[মান: ২০]
ভূমিকা:
আল্লাহর দ্বীনের পথে আহ্বান জানানো কোনো পুষ্পশয্যা নয়; বরং এটি কাঁটাভরা এক পরম সংগ্রামী পথ। ইতিহাসের প্রথম দিন থেকেই দাঈদেরকে সমাজের কায়েমি স্বার্থবাদী মহল, অজ্ঞ জনতা ও বাতিল শক্তির পক্ষ থেকে নানামুখী বাধা-বিপত্তি ও পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়েছে। কুরআনুল কারীমে এই সকল বাধার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং তা থেকে উত্তরণের ঐশী ব্যবস্থাপত্রও প্রদান করা হয়েছে।
১. দাওয়াতি ময়দানে দাঈ যে সকল বাধা-বিপত্তির (العقبات والعوائق) মুখোমুখি হন:
১. মিথ্যা অপবাদ ও চরিত্র হনন (الحرب النفسية): বাতিল শক্তি সর্বপ্রথম দাঈর চরিত্র ও সম্মানের ওপর আঘাত হানে। রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে তারা পাগল, কবি ও জাদুকর বলেছিল।
২. শারীরিক নির্যাতন, কারাবরণ ও হত্যার হুমকি: সত্যের দাওয়াত দিলে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ভয়ে জালিম শাসকরা দাঈদের ওপর জেল-জুলুম ও নির্যাতন চালায়।
৩. স্বজনদের বিরোধিতা ও সমাজচ্যুতি: অনেক সময় স্বয়ং পরিবার ও আত্মীয়স্বজন সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়, যেভাবে ইব্রাহীম (আ.)-এর পিতা এবং নবীজীর চাচা আবু লাহাব বাধা দিয়েছিল।
৪. লোভনীয় প্রলোভন ও আপসের ফাঁদ: অর্থ, ক্ষমতা বা নারীর প্রলোভন দেখিয়ে দাঈকে সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত করার অপচেষ্টা চালানো।
৫. আর্থিক অনটন ও একাকীত্বের হতাশা: দাওয়াতি কাজে আত্মনিয়োগ করতে গিয়ে পার্থিব উপার্জনের সংকট এবং পাশে কাউকে না পাওয়ার আত্মিক পরীক্ষা।
২. এই বাধা-বিপত্তি মোকাবেলার কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক উপায় (طرق علاجها):
১. সবর ও নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা: আল্লাহ বলেন: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ ۚ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ – “ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর, নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।” (সূরা আল-বাকারা: ১৫৩)।
২. ইখলাস ও পরকালীন সফলতায় বিশ্বাস: দাঈ জানবেন যে তাঁর মূল প্রতিদান মানুষের কাছে নয়, আল্লাহর কাছে। সাময়িক পরাজয় চূড়ান্ত পরাজয় নয়।
৩. হিকমত ও রণকৌশল পরিবর্তন: এক ময়দানে তীব্র বাধা এলে অন্য ক্ষেত্র বা বিকল্প মাধ্যম অনুসন্ধান করা (যেমন: হিজরত করা)।
৪. উম্মাহর দাঈদের পারস্পরিক মজবুত ভ্রাতৃত্ব: একা না থেকে হক্কানী দাঈদের সাথে ঐক্যবদ্ধ থাকা।
উপসংহার:
বাধা-বিপত্তি মূলত দাঈর ঈমানকে খাঁটি সোনায় পরিণত করার ঐশী পরশপাথর। নবীজী বলেছেন: “সর্বাধিক কঠিন পরীক্ষা আম্বিয়াদের হয়, এরপর পর্যায়ক্রমে যারা তাঁদের অনুসারী।” ঈমানী অবিচলতার মাধ্যমেই বিজয় অবশ্যম্ভাবী।
৬। بين أهمية الجهاد في الدعوة إلى الله مع بيان الفرق بينه وبين الإرهاب.
[দা’ওয়াতের ক্ষেত্রে জিহাদের গুরুত্ব আলোচনা কর এবং জিহাদ ও সন্ত্রাসের মধ্যে পার্থক্য বর্ণনা কর।]
[মান: ২০]
ভূমিকা:
ইসলাম শান্তির ধর্ম, আর এই শান্তির শাশ্বত সুরক্ষাকবচ হলো ‘আল-জিহাদ ফী সাবিলিল্লাহ’ (الجهاد في سبيل الله)। বর্তমান বিশ্বে পশ্চিমা মিডিয়া এবং চরমপন্থী কতিপয় বিভ্রান্ত গোষ্ঠীর অপতৎপরতার কারণে জিহাদের সুমহান ধারণাকে বিকৃত করে ‘সন্ত্রাসবাদ’ (الإرهاب)-এর সাথে একাকার করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে জিহাদ এবং সন্ত্রাসবাদের মধ্যে রয়েছে আকাশ-পাতাল ব্যবধান। দাওয়াত ইলাল্লাহর পথে জিহাদের অবস্থান ও মর্যাদা সঠিকভাবে অনুধাবন করা উম্মাহর জন্য অত্যন্ত জরুরি।
১. জিহাদের সংজ্ঞা ও দাওয়াতে এর গুরুত্ব:
– জিহাদের অর্থ: ‘জিহাদ’ শব্দের মূল অর্থ সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা ও আত্মত্যাগ করা। শরিয়তের পরিভাষায় আল্লাহর জমিনে ফিতনা-ফাসাদ দূর করে সত্য, ইনসাফ ও দ্বীনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য জান, মাল ও প্রয়োজনে অস্ত্র দিয়ে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করাকে জিহাদ বলে।
– দাওয়াতে জিহাদের ভূমিকা: জিহাদ দাওয়াত বিস্তারের কোনো জবরদস্তিমূলক মাধ্যম নয় (কারণ لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ – দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই); বরং যে সকল অত্যাচারী শাসক মানুষকে স্বাধীনভাবে ইসলামের দাওয়াত শুনতে বাধা দেয় এবং দাওয়াতের পথে পাহাড় হয়ে দাঁড়ায়—সেই বাধার প্রাচীর অপসারণ করে দাওয়াহর মুক্ত পথ তৈরি করাই জিহাদের মূল উদ্দেশ্য।
২. সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞা (الإرهاب):
কোনো ন্যায়সঙ্গত শরয়ী কারণ ছাড়া নিরীহ মানুষকে হত্যা করা, জনমনে ত্রাস ও আতঙ্ক সৃষ্টি করা, বিশৃঙ্খলা, আত্মঘাতী হামলা এবং ধ্বংসযজ্ঞ চালানোকে সন্ত্রাসবাদ (ফাসাদ ফিল আরদ) বলে, যা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম ও কবিরা গুনাহ।
৩. জিহাদ ও সন্ত্রাসবাদের মধ্যকার মৌলিক ও অকাট্য পার্থক্যসমূহ:
১. উদ্দেশ্যগত পার্থক্য: জিহাদের উদ্দেশ্য একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি, মজলুমের মুক্তি ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা। আর সন্ত্রাসের উদ্দেশ্য ব্যক্তিগত বা দলীয় ক্ষমতা, অর্থলিপ্সা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি।
২. আইনগত বৈধতা: জিহাদ কেবল বৈধ ইসলামি রাষ্ট্রপ্রধান বা সুশৃঙ্খল নেতৃত্বের অধীনে শরিয়তের শর্ত সাপেক্ষে পরিচালিত হয়। কোনো ব্যক্তি বা উগ্র গোষ্ঠী নিজ উদ্যোগে মানুষ হত্যা করে জিহাদ নাম দিতে পারে না।
৩. লক্ষ্যবস্তুর পার্থক্য: জিহাদে কেবল ময়দানে যুদ্ধরত শত্রু সৈন্যদের সাথে লড়াই করা বৈধ। ইসলামে যুদ্ধের ময়দানেও নারী, শিশু, বৃদ্ধ, কৃষক, পুরোহিত ও উপাসনালয়ের ওপর হামলা চালানো সম্পূর্ণ হারাম। পক্ষান্তরে সন্ত্রাসবাদে নির্বিচারে নির্দোষ নারী-শিশু ও সাধারণ মানুষকে হত্যা করা হয়।
৪. পরিণতি: জিহাদের মাধ্যমে সমাজে শান্তি ও সুবিচার কায়েম হয়; আর সন্ত্রাসের মাধ্যমে রক্তপাত, ঘৃণা ও ধ্বংসের বিস্তার ঘটে।
উপসংহার:
জিহাদ হলো মানবজাতির নিরাপত্তার গ্যারান্টি, আর সন্ত্রাস হলো মানবতার চরম শত্রু। ইসলামে সন্ত্রাসবাদের কোনো স্থান নেই; জিহাদের পবিত্র চেতনাকে সন্ত্রাসবাদের কলঙ্ক থেকে মুক্ত রাখা দাঈদের প্রধান দায়িত্ব।
৭। ما الإعلام؟ وكم قسما له وما هو؟ بين أهمية الدعوة بوسائل الإعلام وانترنيت بيانا مفصلا.
[মিডিয়া কী? তা কত প্রকার ও কী কী? গণমাধ্যম ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে দা’ওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনার গুরুত্ব সম্পর্কে বিবরণ দাও।]
[মান: ২০]
ভূমিকা:
একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক বিশ্ব একটি ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ বা বিশ্বগ্রামে পরিণত হয়েছে। এই রূপান্তরের মূল চালিকাশক্তি হলো আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি, গণমাধ্যম (মিডিয়া) ও ইন্টারনেট। ভৌগোলিক দূরত্ব এখন মুহূর্তের মধ্যে বিলীন হয়ে গেছে। অতীতে একটি বার্তা অন্য দেশে পৌঁছাতে যেখানে মাস বা বছর লাগত, আজ ইন্টারনেটের এক ক্লিকে কোটি কোটি মানুষের সামনে তা দৃশ্যমান হয়। এই বৈপ্লবিক সুযোগকে ইসলামের দাওয়াত প্রসারে কাজে লাগানো বর্তমান যুগের দাঈদের জন্য ফরযে কিফায়াহর সমতুল্য।
১. আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ও মিডিয়ার সংজ্ঞা:
আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ও মিডিয়া বলতে স্যাটেলাইট টেলিভিশন, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ওয়েবসাইট, সার্চ ইঞ্জিন, পডকাস্ট এবং ফেসবুক, ইউটিউব, এক্স ও ইনস্টাগ্রামের মতো সোশ্যাল মিডিয়া নেটওয়ার্ককে বোঝায়, যা তথ্যের দ্রুত আদান-প্রদান ও জনমত গঠনে নেতৃত্ব দেয়।
২. ইসলামি দাওয়াহ প্রচারে ইন্টারনেটের বহুমুখী ও বৈপ্লবিক ভূমিকা:
১. বিশ্বব্যাপী সীমানাহীন দাওয়াত: ইন্টারনেটের কল্যাণে ভিসা ও পাসপোর্টের বাধা ছাড়াই অমুসলিম অধ্যুষিত আমেরিকা, ইউরোপ, জাপান বা চীনের সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে কুরআনের তর্জমা ও ইসলামের সত্যবাণী পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
২. ডিজিটাল ইসলামি লাইব্রেরি ও রিসোর্স সেন্টার: হাজার হাজার তাফসির, হাদিস গ্রন্থ, সিরাত ও ফতোয়া সমগ্র আজ পিডিএফ ও অ্যাপসের মাধ্যমে স্মার্টফোনে সংরক্ষিত। যে কোনো অনুসন্ধিৎসু মানুষ মুহূর্তের মধ্যে রেফারেন্স যাচাই করতে পারছে।
৩. ভিজ্যুয়াল ও অডিও কনটেন্ট বিপ্লব: ইউটিউব ও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রখ্যাত দাঈদের উচ্চমানের লেকচার, স্বল্পদৈর্ঘ্য রিলস ও অনুপ্রেরণাদায়ী ভিডিও তরুণ প্রজন্মকে পাপের পথ থেকে ফিরিয়ে এনে তাওবার দিকে ধাবিত করছে।
৪. ইসলামোফোবিয়ার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক বৌদ্ধিক প্রতিরোধ: ইসলাম বা মহানবী (সা.)-এর বিরুদ্ধে যখনই কোনো অপপ্রচার চালানো হয়, মুসলিম দাঈ ও গবেষকগণ ইন্টারনেটের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক তথ্যবহুল কাউন্টার বয়ান দিয়ে সেই ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দিচ্ছেন।
৫. অনলাইন ইসলামি একাডেমি ও কুরআন শিক্ষা: ঘরে বসেই সারা বিশ্বের লাখ লাখ নারী-পুরুষ অনলাইন মাদরাসার মাধ্যমে শুদ্ধভাবে কুরআন তিলাওয়াত ও দ্বীনি শিক্ষা অর্জন করতে পারছে।
৩. ইন্টারনেট ব্যবহারে দাঈদের সতর্কতা:
– নির্ভরযোগ্য ও সহীহ রেফারেন্স ছাড়া কোনো তথ্য শেয়ার না করা。
– ভিউ ও রিয়্যাক্ট বাড়ানোর জন্য অপ্রাসঙ্গিক বা সুরসুরি সৃষ্টিকারী থাম্বনেইল পরিহার করা。
– কমেন্ট সেকশনে কুরুচিপূর্ণ তর্কবিতর্ক এড়িয়ে শালীনতা বজায় রাখা।
উপসংহার:
ইন্টারনেট হলো বর্তমান যুগের সবচেয়ে শক্তিশালী দাওয়াতি মিম্বর। এই প্রযুক্তিকে আল্লাহর দ্বীনের জন্য যত বেশি ব্যবহার করা যাবে, তত দ্রুত বিশ্বমঞ্চে ইসলামের বিজয় ত্বরান্বিত হবে।
৮। اكتب حالة الدعوة الإسلامية في بنغلاديش ومشاكلها الكبرى بالإيضاح.
[বাংলাদেশে ইসলামি দাওয়াতের অবস্থা ও প্রধান সমস্যাসমূহ বিশদভাবে লেখ।]
[মান: ২০]
ভূমিকা:
বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র। এ দেশের শতকরা ৯০ ভাগের বেশি মানুষ ইসলামের মৌলিক আকিদায় বিশ্বাসী এবং সাধারণ মুসলমানদের অন্তরে রয়েছে আল্লাহর রাসূল ও ওলামায়ে কেরামের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা। কিন্তু এই উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েও বর্তমান বাংলাদেশে ইসলামি দাওয়াহ বহুবিধ অভ্যন্তরীণ সংকট, বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি। এ দেশের দাওয়াতি অবস্থা ও প্রধান সমস্যাসমূহ গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
১. বাংলাদেশে ইসলামি দাওয়াতের বর্তমান চালচিত্র ও ইতিবাচক দিক:
– মসজিদ ও মাদরাসার বিস্তার: দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত তিন লক্ষাধিক মসজিদ এবং লক্ষাধিক কওমি ও আলিয়া মাদরাসা রয়েছে।
– ওয়াজ মাহফিল ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান: প্রতি বছর হাজার হাজার ওয়াজ মাহফিল ও তাফসিরুল কুরআন মাহফিলের আয়োজন হয়, যাতে লাখ লাখ মানুষ সমবেত হয়।
– ডিজিটাল দাওয়াহর জনপ্রিয়তা: তরুণদের মাঝে সহীহ দ্বীন শেখার আগ্রহ এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় ইসলামি লেকচারের বিপুল শ্রোতা তৈরি হয়েছে।
২. বাংলাদেশে ইসলামি দাওয়াতের প্রধান প্রধান সমস্যাসমূহ (المشاكل الكبرى):
১. অভ্যন্তরীণ ফিরকাবাজি ও কাদা ছোড়াছুড়ি: ওলামায়ে কেরাম ও বিভিন্ন ইসলামি দলের মধ্যে ছোটখাটো ফিকহী মতপার্থক্য নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া ও মাহফিলের মঞ্চে প্রকাশ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি দাওয়াহর মর্যাদা ধূলিসাৎ করছে। সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে।
২. ওয়াজের বাণিজ্যিকায়ন ও সুরের মোহ: গভীর কোরআন-হাদিসের আলোচনার চেয়ে সস্তা সুর, কেচ্ছা-কাহিনী ও হাস্যরসাত্মক বয়ানের মাধ্যমে মাহফিলগুলোকে বিনোদনের মাধ্যমে পরিণত করার প্রবণতা দেখা দিয়েছে।
৩. শিক্ষাব্যবস্থার দ্বিমুখী বিভাজন: জেনারেল শিক্ষিত সমাজ ও মাদরাসা শিক্ষিত সমাজের মধ্যে বিরাট মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে। জেনারেল শিক্ষিতদের উপযোগী বুদ্ধিবৃত্তিক ভাষায় কথা বলার দাঈর সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত।
৪. পাশ্চাত্য অপসংস্কৃতি ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের আগ্রাসন: মিডিয়া ও পাঠ্যক্রমের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের মাঝে সেক্যুলারিজম, লিবারেলিজম ও ধর্মহীন চিন্তাধারা পরিকল্পিতভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
৫. প্রান্তিক অঞ্চলে খ্রিষ্টান মিশনারি তৎপরতা: পার্বত্য চট্টগ্রাম ও উত্তরাঞ্চলের দরিদ্র আদিবাসী ও অভাবী মানুষের মাঝে বিপুল অর্থের বিনিময়ে ধর্মান্তরিত করার ছদ্মবেশী তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
৩. এই সমস্যাসমূহ সমাধানের উপায়:
– সর্বসম্মত মৌলিক তাওহীদের প্ল্যাটফর্মে ওলামায়ে কেরামের বৃহত্তর ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা。
– দাঈদের জন্য আধুনিক বিজ্ঞান, তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব ও মিডিয়া প্রশিক্ষণের বিশেষ একাডেমি গঠন করা。
– ওয়াজ মাহফিলগুলোতে সস্তা চটকদারিতার পরিবর্তে কুরআন-হাদিসের দরদমাখা সহীহ তালিম নিশ্চিত করা।
উপসংহার:
বাংলাদেশ ইসলামি দাওয়াহর এক অত্যন্ত উর্বর ভূমি। দাঈগণ যদি প্রজ্ঞা ও ঐক্যের সাথে ময়দানে কাজ করেন, তবে এই দেশ সমগ্র বিশ্বের জন্য এক আদর্শ ইসলামি মডেল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
ফাযিল ৩য় বর্ষ আদ-দাওয়া আল-ইসলামিয়্যাহ ৩য় পত্রের মূল বিষয়বস্তু কী?
আদ-দাওয়া আল-ইসলামিয়্যাহ ৩য় পত্রের (বিষয় কোড: ৪৩০) সিলেবাস মূলত ‘দাওয়াহর পদ্ধতি ও কৌশল’ (মানহাজুদ দাওয়াতিল ইসলামিয়্যাহ)-এর ওপর রচিত। এতে হিকমাহ, মাওইযাহ হাসানাহ, মুজাদালাহ হাসানাহ, জিহাদের প্রকৃত রূপরেখা, মিডিয়া ও ইন্টারনেটের ব্যবহার, সমাজসেবা এবং সমকালীন দাওয়াতি চ্যালেঞ্জসমূহ অন্তর্ভুক্ত।
ফাযিল পরীক্ষায় ২০ নম্বরের প্রশ্নের জন্য কত বড় উত্তর লিখতে হবে?
ডিগ্রি ও অনার্স মানবণ্টন অনুযায়ী প্রতিটি প্রশ্নের জন্য ভূমিকা, মানহাজের পারিভাষিক বিশ্লেষণ, কুরআন-হাদিসের আরবি ইবারত ও অর্থ, ৫-৮টি সুনির্দিষ্ট পয়েন্ট, সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা এবং উপসংহার সহযোগে কমপক্ষে ৩৫০ থেকে ৫০০+ শব্দে উত্তর লেখা আবশ্যক।
কুরআনের দৃষ্টিতে দাওয়াহর তিনটি প্রধান প্রায়োগিক পদ্ধতি কী কী?
সূরা আন-নাহলের ১২৫ নম্বর আয়াতের আলোকে তিনটি মৌলিক পদ্ধতি হলো: ১. আল-হিকমাহ (প্রজ্ঞা ও যুক্তিপূর্ণ কৌশল), ২. আল-মাওইযাতুল হাসানাহ (উত্তম উপদেশ ও দরদমাখা নসীহত), এবং ৩. আল-মুজাদালাহ বিল্লাতী হিয়া আহসান (উত্তম ও শালীন বিতর্ক)।
ইসলামি দাওয়াহে জিহাদ ও সন্ত্রাসবাদের মধ্যকার মৌলিক পার্থক্য কী?
জিহাদ হলো শরিয়তের অধীনে বৈধ রাষ্ট্র ও নেতৃত্বের মাধ্যমে ফিতনা দমন ও ইনসাফ কায়েমের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা, যেখানে নিরপরাধ মানুষ হত্যা সম্পূর্ণ হারাম; আর সন্ত্রাসবাদ হলো কোনো শরয়ী ভিত্তি ছাড়া নিরীহ মানুষের মাঝে ভীতি সৃষ্টি ও রক্তপাত ঘটানো, যা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
আধুনিক দাওয়াতি ময়দানে ইন্টারনেটের সবচেয়ে বড় সুবিধা কী?
ইন্টারনেটের মাধ্যমে ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক সীমানা অতিক্রম করে বিশ্বের যে কোনো প্রান্তে মুহূর্তের মধ্যে লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে সহীহ ইসলামি আকিদা ও কুরআনের সত্যবাণী পৌঁছে দেওয়া যায়।
দাওয়াতে ‘কুদওয়াহ হাসানাহ’ কেন সর্বাধিক কার্যকর?
কারণ মানুষ মুখের কথার চেয়ে বক্তার বাস্তব চরিত্র, সততা ও আমল দেখে শতগুণ বেশি প্রভাবিত হয়। দাঈর কথা ও কাজের মিলই দাওয়াতকে অপরাজেয় শক্তিতে রূপান্তর করে।

