পরীক্ষা কোড: ২০১ | প্রশ্নপত্র কোড: ০২৯
ফাজিল স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষ পরীক্ষা, ২০২২
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
[মুসলমানদের ইতিহাস (৫৭০-৭৫০) মহানবি (সাঃ), খোলাফায়ে রাশেদুন এবং উমাইয়া খিলাফত]
বিষয় কোড: ২০৫১০১
সময়—৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান—৮০
[দ্রষ্টব্য: ক বিভাগ থেকে ৪টি এবং খ বিভাগ থেকে ২টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।]
ক বিভাগ (রচনামূলক প্রশ্ন)
১। ইসলাম-পূর্ব আরবের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা পর্যালোচনা কর।
[Review the political and social conditions of pre-Islamic Arabia.]
ভূমিকা
মহানবি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আবির্ভাবের পূর্বে আরবের যে যুগটি ছিল, তা ইতিহাসে ‘আইয়ামে জাহেলিয়াত’ বা অজ্ঞানতা ও তামসতার যুগ নামে পরিচিত। এ সময় আরবে কোনো রাষ্ট্রীয় ঐক্য বা কেন্দ্রীয় শাসন ছিল না; সমাজ ছিল অনাচার, নৈতিক অবক্ষয় ও গোত্রীয় অহমিকায় জর্জরিত।
রাজনৈতিক অবস্থা
- গোত্রীয় অরাজকতা ও শেখের শাসন: আরবের রাজনৈতিক কাঠামো ছিল গোত্রভিত্তিক। প্রতিটি গোত্র একজন প্রবীণ নেতা বা ‘শায়খ’-এর অধীনে পরিচালিত হতো। তবে গোত্রের বাইরে অন্য কারো প্রতি তাদের আনুগত্য ছিল না। ফলে এক গোত্রের সাথে অন্য গোত্রের স্থায়ী শত্রুতা লেগে থাকত।
- আসাবিয়্যাহ বা অন্ধ গোত্রীয় পক্ষপাতিত্ব: বেদুইনদের চালিকাশক্তি ছিল ‘আসাবিয়্যাহ’। গোত্রের স্বার্থে যে কোনো অন্যায় বা রক্তপাতকে তারা গৌরবের মনে করত।
- দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধবিগ্রহ (আইয়ামুল আরব): তুচ্ছাতিতুচ্ছ অজুহাতে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ যুগের পর যুগ চলত। বনু বকর ও বনু তাগলিবের মধ্যকার ‘বাসুস যুদ্ধ’ প্রায় ৪০ বছর স্থায়ী হয়েছিল। ফিজার যুদ্ধ হারাম মাসে সংঘটিত হয়ে সমাজে ত্রাস সৃষ্টি করেছিল।
- বিদেশি পরাশক্তির আধিপত্য: উত্তর আরবে রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের প্রভাব ছিল এবং ইয়েমেনে আবিসিনীয় ও পারসিকদের তাঁবেদারি কায়েম ছিল। আরবরা নিজেরা ছিল ক্ষমতাহীন ও বিভক্ত।
সামাজিক অবস্থা
- নারীর অমর্যাদা ও কন্যাসন্তান হত্যা: সমাজে নারীর কোনো সামাজিক বা মানবিক অধিকার ছিল না। নারীদের অস্থাবর সম্পত্তির মতো ভোগ করা হতো। কন্যাসন্তানের জন্মকে চরম লজ্জাজনক মনে করে জীবন্ত প্রোথিত (ওয়াদউল বানাত) করার নিষ্ঠুর প্রথা চালু ছিল।
- দাসপ্রথার চরম বর্বরতা: সমাজে দাস-দাসীদের পশুর মতো হাটে কেনাবেচা করা হতো। তাদের কোনো মানবাধিকার ছিল না; মালিকরা তাদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালাত।
- নৈতিক অবক্ষয় ও অনাচার: মদ্যপান, জুয়াখেলা (মাইসির), ব্যভিচার এবং লুণ্ঠন ছিল তাদের নিত্যদিনের বিনোদন। সুদখোর মহাজনরা ঋণের দায়ে মুক্ত মানুষকে দাসে পরিণত করত।
উপসংহার
ইসলাম-পূর্ব আরবের এই রাজনৈতিক নৈরাজ্য ও সামাজিক অবিচারের অবসান ঘটিয়ে হযরত মুহাম্মদ (সা.) এক অনন্য মানবিক সাম্যবাদী ও সুশৃঙ্খল সমাজের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।
২। হুদায়বিয়ার সন্ধির শর্তগুলো উল্লেখপূর্বক ইসলামের ইতিহাসে এর গুরুত্ব বর্ণনা কর।
[Mentioning the provisions of the Treaty of Hudaybiay describe its importance to the history of Islam.]
ভূমিকা ও পটভূমি
৬ষ্ঠ হিজরির জিলকদ মাসে (৬২৮ খ্রিষ্টাব্দ) মহানবি (সা.) ১,৪০০ নিরস্ত্র সাহাবি নিয়ে ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা অভিমুখে যাত্রা করেন। কুরাইশরা মক্কার উপকণ্ঠে হুদায়বিয়া নামক স্থানে মুসলিমদের গতিরোধ করে। রক্তপাত এড়ানোর জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) কুরাইশ প্রতিনিধি সুহায়েল বিন আমরের সাথে এক ঐতিহাসিক সন্ধি স্বাক্ষর করেন, যা ‘হুদায়বিয়ার সন্ধি’ নামে খ্যাত।
হুদায়বিয়ার সন্ধির প্রধান শর্তসমূহ
- ১. মুসলিমরা এ বছর ওমরাহ না করে মদিনায় ফিরে যাবে এবং পরবর্তী বছর এসে মাত্র তিন দিন অবস্থান করে ওমরাহ পালন করতে পারবে।
- ২. আগমনকালে আত্মরক্ষার জন্য কোষবদ্ধ তরবারি ছাড়া কোনো ভারী যুদ্ধাস্ত্র আনা যাবে না।
- ৩. আগামী ১০ বছর উভয় পক্ষের মধ্যে কোনো প্রকার যুদ্ধ বা সংঘর্ষ চলবে না (দশ বছরের শান্তি চুক্তি)।
- ৪. আরবের যে কোনো গোত্র স্বাধীনভাবে মুসলিমদের সাথে বা কুরাইশদের সাথে মৈত্রী চুক্তি সম্পাদন করতে পারবে।
- ৫. মক্কার কোনো কুরাইশ অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া মদিনায় আশ্রয় নিলে তাকে মক্কায় ফেরত দিতে হবে; কিন্তু মদিনার কোনো মুসলিম মক্কায় গেলে তাকে ফেরত দেওয়া হবে না (বাহ্যত অসম শর্ত)।
ইসলামের ইতিহাসে এর গুরুত্ব ও সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য
- ১. কুরআনের ঘোষণা—’ফাতহুম মুবিন’ (সুস্পষ্ট বিজয়): আপাতদৃষ্টিতে শর্তগুলো মুসলিমদের বিপক্ষে মনে হওয়ায় অনেক সাহাবি ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা ওহি নাজিল করে ঘোষণা করেন: “নিশ্চয়ই আমি আপনাকে দান করেছি এক সুস্পষ্ট বিজয়।” (সূরা আল-ফাতহ: ১)।
- ২. মদিনা রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: এই চুক্তির মাধ্যমে কুরাইশরা মদিনা রাষ্ট্র এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে সমমর্যাদাসম্পন্ন রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে নেয়।
- ৩. ইসলাম প্রচারে অভূতপূর্ব সাফল্য: ১০ বছরের যুদ্ধবিরতির ফলে উভয় পক্ষের মানুষের মধ্যে অবাধ মেলামেশা ও আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি হয়। মুসলিমদের চারিত্রিক মাধুর্য দেখে মাত্র দুই বছরের মধ্যে পূর্ববর্তী বিশ বছরের চেয়েও অধিকসংখ্যক মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেন। খালিদ বিন ওয়ালিদ ও আমর ইবনুল আসের মতো মহান বীররা এ সময়েই ইসলাম গ্রহণ করেন।
- ৪. আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইসলামের দাওয়াত প্রেরণ: আরবের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ বন্ধ হওয়ায় রাসুলুল্লাহ (সা.) রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াস, পারস্যের খসরু পারভেজ, মিসরের মুকাওকিস এবং আবিসিনিয়ার নাজ্জাশীর নিকট ইসলামের দাওয়াতি চিঠি প্রেরণ করেন।
- ৫. রক্তপাতহীন মক্কা বিজয়ের রাজপথ সুগম: এই সন্ধির মাধ্যমেই বনু খুজায়াহ মুসলিমদের মিত্রে পরিণত হয় এবং কুরাইশরা সন্ধি ভঙ্গ করায় মাত্র দুই বছর পর রক্তপাতহীনভাবে মক্কা বিজয় সম্পন্ন হয়।
উপসংহার
হুদায়বিয়ার সন্ধি ছিল মহানবি (সা.)-এর কূটনৈতিক দূরদর্শিতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার সর্বশ্রেষ্ঠ নিদর্শন। এটি মুসলিম উম্মাহকে সামরিক প্রতিরক্ষার অবস্থান থেকে আন্তর্জাতিক নেতৃত্বশীল শক্তিতে পরিণত করেছিল।
৩। হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের কারণ ও ফলাফল সম্পর্কে আলোচনা কর।
[Discuss the reasons and consequences of the migration of Hazrat Muhammad (sm.) from Mecca to Medina.]
ভূমিকা
৬২২ খ্রিষ্টাব্দে মহান আল্লাহর আদেশে মহানবি হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর প্রিয় জন্মভূমি মক্কা ত্যাগ করে মদিনায় গমন করেন। ইসলামের ইতিহাসে এই অবিস্মরণীয় ঘটনাকে ‘হিজরত’ (Hijrah) বলা হয়। এটি কোনো কাপুরুষোচিত পলায়ন ছিল না, বরং তা ছিল বিশ্বজয়ের এক কৌশলগত ঐতিহাসিক বাঁক।
হিজরতের প্রধান কারণসমূহ
- ১. মক্কার কুরাইশদের অমানবিক নির্যাতন: ইসলাম প্রচারের শুরু থেকেই কুরাইশরা মহানবি (সা.) ও তাঁর অনুসারীদের ওপর শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার চালাচ্ছিল। শিয়াবে আবি তালিবে তিন বছরের নিষ্ঠুর অর্থনৈতিক অবরোধ মুসলিমদের জীবন বিপন্ন করে তুলেছিল।
- ২. আশ্রয়স্থল ও পৃষ্ঠপোষকের মৃত্যু (আমুল হুজন): নবুওয়তের দশম বর্ষে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রিয়তমা স্ত্রী খাদিজা (রা.) এবং অভিভাবক চাচা আবু তালিবের ইন্তেকাল হলে কুরাইশদের অত্যাচারের মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে যায়।
- ৩. তায়েফে নির্মম প্রত্যাখ্যাত হওয়া: আশ্রয়ের আশায় তায়েফ গমন করলে সেখানকার দুষ্ট লোকেরা নবিজির ওপর পাথর নিক্ষেপ করে রক্তাক্ত করে।
- ৪. আকাবার শপথ ও মদিনাবাসীর আন্তরিক আমন্ত্রণ: মদিনার আওস ও খাজরাজ গোত্রের লোকেরা আকাবার তিনটি ঐতিহাসিক শপথে ইসলাম গ্রহণ করে এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে নিজেদের জীবনের চেয়েও বেশি নিরাপত্তা দেওয়ার অঙ্গীকার করে মদিনায় আসার উদাত্ত আহ্বান জানায়।
- ৫. দারুন নদওয়ায় হত্যার মহাপরিকল্পনা: কুরাইশরা মক্কার পার্লামেন্ট দারুন নদওয়ায় সমবেত হয়ে প্রতিটি গোত্রের একজন করে যুবকের সমন্বয়ে গঠিত ঘাতক দল দ্বারা মহানবি (সা.)-কে ঘুমের মধ্যে যৌথভাবে হত্যার ষড়যন্ত্র করে। আল্লাহ তায়ালা ওহির মাধ্যমে জানিয়ে দিলে রাসুল (সা.) হিজরতের সিদ্ধান্ত নেন।
হিজরতের সুদূরপ্রসারী ফলাফল
- একটি সার্বভৌম ইসলামি রাষ্ট্রের জন্ম: হিজরতের ফলে ইয়াসরিবের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘মদিনাতুন্নবী’ (নবির নগরী)। সেখানে ইসলামের প্রথম স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
- মদিনা সনদ ও প্রথম সংবিধান প্রণয়ন: সকল ধর্ম ও গোত্রের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করে তিনি ৪৭ ধারার ঐতিহাসিক মদিনা সনদ রচনা করেন।
- ইসলামের বৈশ্বিক বিস্তার ও জিহাদের অনুমতি: হিজরতের পরেই আত্মরক্ষামূলক জিহাদের অনুমতি মেলে এবং বদর, ওহুদ ও খন্দকের মতো যুদ্ধ জয়ের মাধ্যমে ইসলাম পরাশক্তিতে রূপ নেয়।
- হিজরি সনের প্রবর্তন: খলিফা ওমর (রা.) এই ঐতিহাসিক মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখতে হিজরি বর্ষপঞ্জি প্রবর্তন করেন।
৪। হযরত ওসমান (রাঃ) এর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো বিশ্লেষণ কর।
[Analyse the charges brought against Hazrat Osman (R.)]
ভূমিকা
তৃতীয় খলিফা হযরত ওসমান ইবনে আফফান (রা.) ছিলেন ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আত্মত্যাগী সাহাবি, যাঁকে রাসুলুল্লাহ (সা.) ‘জুন-নুরাইন’ (দুই জ্যোতির অধিকারী) উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। তাঁর ১২ বছরের শাসনামলের প্রথম ছয় বছর ছিল চরম শান্তি ও বিজয়ের স্বর্ণযুগ। কিন্তু শেষ ছয় বছরে সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে একদল স্বার্থান্বেষী ও চরমপন্থী গোষ্ঠী তাঁর বিরুদ্ধে একগুচ্ছ ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে বিদ্রোহ সৃষ্টি করে, যা শেষ পর্যন্ত ৩৫ হিজরিতে তাঁর মর্মান্তিক শাহাদাতে রূপ নেয়।
আনীত প্রধান অভিযোগসমূহ ও তার ঐতিহাসিক পর্যালোচনা
- ১. স্বজনপ্রীতি বা উমাইয়াদের উচ্চপদে নিয়োগের অভিযোগ:
- অভিযোগ: বিদ্রোহীরা অভিযোগ করে যে খলিফা তাঁর নিজ উমাইয়া বংশীয় আত্মীয়দের গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশের গভর্নর নিযুক্ত করেছেন (যেমন: আব্দুল্লাহ বিন সাদ, ওয়ালিদ বিন উকবা, মারওয়ান বিন হাকাম)।
- বাস্তবতা ও খণ্ডন: হযরত ওসমান (রা.) যোগ্যতার ভিত্তিতেই নিয়োগ দিয়েছিলেন। মুয়াবিয়া (রা.)-কে পূর্বে হযরত ওমর (রা.)-ই সিরিয়ার গভর্নর করেছিলেন। মিশরে আব্দুল্লাহ বিন সাদ আফ্রিকার বহু দেশ বিজয় করেন এবং প্রথম মুসলিম নৌবাহিনী গঠন করে বাইজেন্টাইন নৌবহর ধ্বংস করেন। এছাড়া তিনি পূর্ববর্তী বহু অ-উমাইয়ার পদ বহাল রেখেছিলেন।
- ২. পবিত্র কুরআন ভস্মীভূত করার অভিযোগ:
- অভিযোগ: ভিন্ন ক্বেরাত ও আঞ্চলিক উচ্চারণের কুরআন পুড়িয়ে দিয়ে খলিফা ধর্মের অবমাননা করেছেন বলে কুচক্রীরা রটায়।
- বাস্তবতা ও খণ্ডন: এটি ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহৎ কাজ। আজারবাইজান ও আর্মেনিয়া অভিযানে মুসলিমদের মধ্যে ক্বেরাত নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে তিনি সাহাবিদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে কুরাইশ উচ্চারণে মূল কপি থেকে সাতটি প্রামাণ্য প্রতিলিপি তৈরি করে বিভিন্ন প্রদেশে পাঠান এবং অবশিষ্ট ভিন্ন পাঠগুলো ভস্মীভূত করে মুসলিম উম্মাহকে গৃহযুদ্ধ থেকে রক্ষা করেন। এজন্য তাঁকে ‘জামেউল কুরআন’ বলা হয়।
- ৩. বাইতুল মালের অর্থ অপচয়ের অভিযোগ:
- অভিযোগ: খলিফা বাইতুল মালের অর্থ নিজের আত্মীয়-স্বজনকে দান করছেন।
- বাস্তবতা ও খণ্ডন: হযরত ওসমান (রা.) ছিলেন তৎকালীন আরবের অন্যতম শীর্ষ ধনী ব্যবসায়ী (‘গনি’)। তিনি খিলাফতের কোনো সরকারি বেতনই নিতেন না; বরং নিজের ব্যক্তিগত বিপুল সম্পদ থেকে আত্মীয়স্বজন ও দরিদ্রদের অকাতরে দান করতেন।
- ৪. চারণভূমি বা ‘হিমা’ সংরক্ষণের অভিযোগ:
- অভিযোগ: সাধারণ জনগণের পশু চারণ বন্ধ করে তিনি নিজের উট চরানোর জন্য নজদের সরকারি চারণভূমি দখল করেছেন।
- বাস্তবতা ও খণ্ডন: খলিফা ওমর (রা.)-এর আমল থেকেই বাইতুল মালের যুদ্ধ ও জাকাতের পশুর জন্য চারণভূমি সংরক্ষিত ছিল। ওসমানের আমলে পশু বৃদ্ধি পাওয়ায় তা সম্প্রসারিত করা হয়। খলিফা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছিলেন যে খেলাফতে আসার পর তাঁর ব্যক্তিগত উটের সংখ্যা কমে মাত্র দুটিতে নেমে এসেছে।
- ৫. বিশিষ্ট সাহাবিদের প্রতি অবিচারের অভিযোগ: হযরত আবু জর গিফারী (রা.)-কে রাবাজায় নির্বাসন এবং আম্মার বিন ইয়াসির ও আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর সাথে কঠোর আচরণের অভিযোগ। প্রকৃতপক্ষে আবু জর গিফারী নিজের ইচ্ছাতেই নিঃসঙ্গ জীবন বেছে নিয়ে রাবাজায় চলে গিয়েছিলেন।
বিদ্রোহের আসল কারণ
অভিযোগগুলো ছিল নিছক বাহানা। ইয়েমেনি ধর্মান্তরিত ইহুদি আব্দুল্লাহ ইবনে সাবার গোপন ষড়যন্ত্র, কুফা ও মিসরের উচ্ছৃঙ্খল যুবকদের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং উমাইয়া-হাশেমী প্রাচীন দ্বন্দ্বকে উসকে দেওয়াই ছিল এই বিদ্রোহের মূল চালিকাশক্তি।
উপসংহার
হযরত ওসমান (রা.) ছিলেন সম্পূর্ণ নিষ্পাপ, ক্ষমাশীল ও আত্মত্যাগী খলিফা। তিনি নিজের প্রাণ বাঁচাতে একজন মুসলিমের রক্তও ঝরাননি, বরং নিজের রক্ত দিয়ে ইসলামি ঐক্য রক্ষার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছিলেন।
৫। আবদুল মালিক বিন মারওয়ানের সংস্কারসমূহ মূল্যায়ন কর।
[Evaluate the reforms of Abdul Malik bin Marwan.]
ভূমিকা
উমাইয়া খিলাফতের পঞ্চম খলিফা আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান (শাসনকাল: ৬৮৫—৭০৫ খ্রি.) উমাইয়া বংশের অন্যতম সর্বশ্রেষ্ঠ ও প্রতিভাবান রাষ্ট্রনায়ক। দ্বিতীয় গৃহযুদ্ধে যখন উমাইয়া খেলাফত সম্পূর্ণ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছিল, তখন তিনি লৌহকঠিন হস্তে বিদ্রোহ দমন করে সাম্রাজ্য রক্ষা করেন। এ কারণে ঐতিহাসিকগণ তাঁকে উমাইয়া বংশের ‘দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাতা’ (Second Founder) এবং ‘আবুল মুলুক’ (খলিফাদের পিতা) হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
আব্দুল মালিকের ঐতিহাসিক সংস্কারসমূহ
- ১. স্বাধীন আরবি মুদ্রা প্রবর্তন (৬৯৫ খ্রি.): পূর্বে মুসলিম জাহানে রোমান দিনার ও পারসিক দিরহাম প্রচলিত ছিল। আব্দুল মালিকই প্রথম বিদেশি মুদ্রার ওপর থেকে নির্ভরতা দূর করে নিজস্ব খাঁটি আরবি লিপি ও কুরআনের আয়াত সম্বলিত স্বর্ণের ‘দিনার’ এবং রৌপ্যের ‘দিরহাম’ চালু করেন। এটি ইসলামি সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করে।
- ২. আরবিকে দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে বাধ্যতামূলককরণ: পূর্বে সিরিয়ায় গ্রিক, মিসরে কপ্টিক এবং ইরাক ও পারস্যে ফারসি ভাষায় সরকারি হিসাব ও দলিলপত্র লেখা হতো। তিনি সমগ্র সাম্রাজ্যে একমাত্র ‘আরবি’কে রাষ্ট্রভাষা ও সরকারি দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে ঘোষণা করেন। এর ফলে অনারবদের মধ্যে আরবি ভাষা দ্রুত বিস্তার লাভ করে।
- ৩. ডাক ব্যবস্থার (বারিদ) আমূল আধুনিকীকরণ: সাম্রাজ্যের প্রতিটি প্রদেশের সাথে দ্রুত যোগাযোগ ও গোয়েন্দা নজরদারির জন্য তিনি ঘোড়ার ডাক ব্যবস্থা উন্নত করেন।
- ৪. অনুপম স্থাপত্যকীর্তি—কুব্বাতুস সাখরা (Dome of the Rock): ৬৯১ খ্রিষ্টাব্দে জেরুজালেমে পবিত্র মেরাজের স্মৃতিবিজড়িত পাথরের ওপর তিনি বিশ্বখ্যাত ‘কুব্বাতুস সাখরা’ বা ডোম অব দ্য রক মসজিদ নির্মাণ করেন। এর অপূর্ব সোনালী গম্বুজ ও মোজাইকের কাজ ইসলামি স্থাপত্যকলার অমর বিস্ময়।
- ৫. সাম্রাজ্যের পুনরেকত্রীকরণ: হাজ্জাজ বিন ইউসুফের সহায়তায় তিনি মক্কার খলিফা আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়েরের প্রতিরোধ ভেঙে সমগ্র মুসলিম বিশ্বকে পুনরায় এক পতাকাতলে আনেন।
উপসংহার
মুদ্রা, ভাষা ও প্রশাসনের আরবীয়করণের মাধ্যমে আব্দুল মালিক উমাইয়া খিলাফতকে একটি খাঁটি অখণ্ড ইসলামি সাম্রাজ্যে রূপান্তরিত করেছিলেন। তাঁর সংস্কারের ওপর দাঁড়িয়েই পরবর্তীকালে উমাইয়াদের স্বর্ণযুগ বিকশিত হয়েছিল।
৬। বিজেতা হিসেবে আল ওয়ালিদের কৃতিত্ব মূল্যায়ন কর।
[Evaluate the achievements of Al-Walid as a conquerer.]
ভূমিকা
উমাইয়া খলিফা প্রথম আল-ওয়ালিদের দশ বছরের শাসনামল (৭০৫—৭১৫ খ্রি.) উমাইয়া সাম্রাজ্যের সর্বাপেক্ষা গৌরবময় বিজয় ও ভৌগোলিক সম্প্রসারণের যুগ। তাঁর সময়কালে ইসলামি সাম্রাজ্যের সীমানা পশ্চিমে ইউরোপের ফ্রান্স ও স্পেন থেকে শুরু করে পূর্বে সিন্ধু ও মধ্য এশিয়ার চীন সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। ঐতিহাসিক গিবন মন্তব্য করেছেন, তাঁর আমলে তিন মহাদেশে যুগপৎ বিজয়ের যে জোয়ার বয়েছিল, রোমানদের শ্রেষ্ঠ যুগেও তা দেখা যায়নি।
বিজেতা হিসেবে আল-ওয়ালিদের সাফল্য ও প্রধান সেনাপতিগণ
- ১. পশ্চিমে ইউরোপ বিজয় (তারিক ও মুসা): ৭১১ খ্রিষ্টাব্দে তারিক বিন জিয়াদ ও মুসা বিন নুসাইরের নেতৃত্বে ভিসিগথ রাজা রডারিককে পরাজিত করে স্পেন (আন্দালুস) বিজয় সম্পন্ন হয়। মুসলিম বাহিনী পিরেনিজ পর্বতমালা অতিক্রম করে ফ্রান্সের দক্ষিণ প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
- ২. পূর্বে সিন্ধু ও মুলতান বিজয় (মুহাম্মদ বিন কাসিম): ৭১২ খ্রিষ্টাব্দে মাত্র ১৭ বছর বয়সী অকুতোভয় সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাসিম রাজা দাহিরকে পরাজিত করে ভারতের সিন্ধু ও মুলতান জয় করেন এবং ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম ইসলামি শাসনের দ্বার উন্মুক্ত করেন।
- ৩. মধ্য এশিয়া ও ট্রান্সঅক্সিয়ানা বিজয় (কুতায়বা বিন মুসলিম): বীর সেনাপতি কুতায়বা বিন মুসলিম জয়হুন ও সিহুন নদী অতিক্রম করে বুখারা, সমরকন্দ, খোয়ারিজম ও ফারগানা জয় করেন এবং চীনা সীমান্ত কাশগড় পর্যন্ত অভিযান পরিচালনা করে তুর্কিদের ইসলামে দীক্ষিত করেন।
- ৪. কনস্টান্টিনোপল সীমান্তে বাইজেন্টাইনদের দমন: আল-ওয়ালিদের ভাই মাসলামাহ বিন আব্দুল মালিক এশিয়া মাইনরে বাইজেন্টাইন বাহিনীকে বারবার পরাজিত করে বেশ কিছু কৌশলগত দুর্গ দখল করেন।
উপসংহার
ওয়ালিদ নিজে যুদ্ধক্ষেত্রে না গেলেও তিনি ছিলেন সেনাপতি বাছাইয়ে অনন্য প্রতিভাবান। তাঁর বিজয়ের ফলেই ইসলামের ইতিহাসে বৃহত্তম সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং দামেস্ক বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।
৭। শাসক হিসেবে হিশামের অবদান মূল্যায়ন কর।
[Evaluate Hisham’s contribution as a ruler.]
ভূমিকা
খলিফা হিশাম বিন আব্দুল মালিক (শাসনকাল: ৭২৪—৭৪৩ খ্রি.) ছিলেন দামেস্কের উমাইয়া খিলাফতের সর্বশেষ যোগ্য ও মহান শাসক। তাঁর পূর্বসূরি ইয়াজিদ-২-এর অপচয় ও বিশৃঙ্খলার পর তিনি সাম্রাজ্যকে পুনরায় অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দান করেন। ঐতিহাসিক পি. কে. হিট্টি মন্তব্য করেছেন, হিশাম ছিলেন উমাইয়া বংশের শেষ স্তম্ভ; তাঁর মৃত্যুর পরই উমাইয়া খিলাফতের দ্রুত পতন ঘটে।
শাসক হিসেবে হিশামের প্রধান অবদানসমূহ
- ১. কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলা ও বাইতুল মাল সমৃদ্ধকরণ: হিশাম ছিলেন অত্যন্ত মিতব্যয়ী ও দূরদর্শী শাসক। তিনি অপচয় রোধ করেন, দুর্নীতির পথ বন্ধ করেন এবং কর ব্যবস্থায় ন্যায়পরায়ণতা প্রতিষ্ঠা করেন। মৃত্যুর সময় তিনি বাইতুল মালে বিপুল অর্থ উদ্বৃত্ত রেখে যান।
- ২. সেচ ব্যবস্থা ও কৃষি উন্নয়ন: তিনি কৃষির উন্নয়নে একাধিক নতুন খাল খনন করান, পতিত জমি আবাদ করেন এবং ফসলের জাত উন্নয়নের ব্যবস্থা করেন।
- ৩. বহিরাগত সামরিক প্রতিরোধ:
- তুরানের খাজারদের দমন: ককেশাস সীমান্তে দুর্ধর্ষ খাজার তুর্কিদের আক্রমণ মারওয়ান বিন মুহাম্মদের নেতৃত্বে কঠোরভাবে প্রতিহত করেন।
- ফ্রান্সের টুরসের যুদ্ধ (৭৩২ খ্রি.): তাঁর আমলেই সেনাপতি আব্দুর রহমান আল-গাফেকির নেতৃত্বে ফ্রান্সে বিখ্যাত টুরস বা পোয়েটিয়ার্সের যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
- ৪. শিল্প, সাহিত্য ও অনুবাদ চর্চা: তিনি গ্রিক ও পারসিক সাহিত্য ও দর্শনের বহু গ্রন্থ আরবিতে অনুবাদের রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করেন।
উপসংহার
অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ ও চরম সংকটের মধ্যেও হিশাম সুদীর্ঘ বিশ বছর দক্ষতার সাথে খিলাফতকে টিকিয়ে রেখেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পরই উমাইয়া বংশে কোনো যোগ্য শাসক না থাকায় সাম্রাজ্যের পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে।
৮। জাবের যুদ্ধের কারণ ও ফলাফল লিখ।
[Write down the causes and results of the battle of Zab.]
পটভূমি ও যুদ্ধের কারণসমূহ
১৩২ হিজরি / ২৫ জানুয়ারি ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে উত্তর ইরাকের টাইগ্রিস নদীর উপনদী গ্রেট যাব (Zab)-এর তীরে উমাইয়া ও আব্বাসীয়দের মধ্যে এই ঐতিহাসিক যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধের মূল কারণগুলো ছিল:
- উমাইয়া খলিফা মারওয়ান-২-এর দমনমূলক নীতি এবং অনারব মাওয়ালীদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ।
- আব্বাসীয়দের পক্ষে আবু মুসলিম খোরাসানীর দক্ষ সামরিক নেতৃত্ব এবং কুফায় আবুল আব্বাস আস-সাফফাহর খলিফা ঘোষণা।
- উমাইয়া শাসনের অভ্যন্তরীণ নৈতিক অবক্ষয় এবং সৈন্যদের মধ্যকার কায়সী-কালবী গৃহবিবাদ।
যুদ্ধের বিবরণ ও ফলাফল
খলিফা মারওয়ান-২-এর ১ লাখ ২০ হাজার সেনাবহরের বিরুদ্ধে আব্বাসীয় সেনাপতি আব্দুল্লাহ বিন আলীর সুশৃঙ্খল বাহিনী বীরত্বের সাথে লড়াই করে। মারওয়ানের বাহিনীর একাংশ দলত্যাগ করায় উমাইয়ারা সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয় এবং মারওয়ান পালিয়ে মিশরে গিয়ে নিহত হন।
- উমাইয়া খিলাফতের চির অবসান: দামেস্কের ৯০ বছরের উমাইয়া শাসনের সমাধি রচিত হয়।
- আব্বাসীয় খিলাফতের অভিষেক: বিশ্ব মুসলিম জাহানে দীর্ঘ পাঁচশত বছরের আব্বাসীয় খিলাফতের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।
খ বিভাগ (সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন)
৯। মদিনা সনদের প্রধান প্রধান ধারাগুলো বিশ্লেষণ কর।
[Analyse the main provisions of the Charter of Medina.]
সনদের ধারা ও বিশ্লেষণ
৬২২ খ্রিষ্টাব্দে মহানবি (সা.) মদিনার সকল সম্প্রদায়কে নিয়ে ৪৭টি ধারার যে ঐতিহাসিক সনদ রচনা করেন, তার প্রধান দিকগুলো হলো:
- ১. একক জাতি গঠন: মদিনার মুসলিম ও ইহুদিরা পরস্পরকে রক্ষা করবে এবং তারা একটি অভিন্ন রাজনৈতিক সম্প্রদায় (উম্মাহ ওয়াহিদা) হিসেবে বাস করবে।
- ২. ধর্মীয় স্বাধীনতা: প্রত্যেকে স্বাধীনভাবে নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে; কারও ওপর ধর্ম চাপানো হবে না।
- ৩. যৌথ প্রতিরক্ষা: বহিরাগত আক্রমণ হলে সকল নাগরিক কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করবে এবং নিজ নিজ খরচে লড়বে।
- ৪. বিরোধের চূড়ান্ত ফয়সালা: কোনো জটিল দ্বন্দ্ব দেখা দিলে তার চূড়ান্ত মীমাংসা করবেন মহানবি হযরত মুহাম্মদ (সা.)।
১০। সিফফিনের যুদ্ধের কারণ ও ফলাফল আলোচনা কর।
[Discuss the causes and results of the battle of Siffin.]
যুদ্ধের কারণ ও বিবরণ
৩৭ হিজরিতে (৬৫৭ খ্রিষ্টাব্দ) ফোরাত নদীর তীরে খলিফা হযরত আলী (রা.) এবং সিরিয়ার গভর্নর মুয়াবিয়া (রা.)-এর মধ্যে সিফফিনের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মূল কারণ ছিল খলিফা ওসমানের হত্যার বিচার বিলম্বিত হওয়া এবং মুয়াবিয়ার আনুগত্য অস্বীকার। যুদ্ধে আলীর বাহিনী জয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছালে মুয়াবিয়ার সেনাপতি আমর ইবনুল আসের পরামর্শে সিরীয় সৈন্যরা বর্শার অগ্রভাগে পবিত্র কুরআন বেঁধে শান্তি ও মধ্যস্থতার আহ্বান জানায়।
ফলাফল
হযরত আলী (রা.) যুদ্ধ বন্ধ করে সালিশি (তাহকিম) মেনে নেন। কিন্তু এই মধ্যস্থতা ব্যর্থ হয় এবং আলীর বাহিনী থেকে একটি উগ্র দল বেরিয়ে গিয়ে ‘খারেজি’ নামে চরমপন্থী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর জন্ম দেয়, যা খিলাফতে আরও গভীর বিশৃঙ্খলা ডেকে আনে।
১১। হযরত ওমর বিন আবদুল আজিজের প্রশাসনিক ব্যবস্থা সম্পর্কে আলোচনা কর।
[Discuss about the administrative system of Hazrat Omar bin Abdul Aziz (R.).]
প্রশাসনিক অনন্যতা
৭১৭ থেকে ৭২০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত উমাইয়া খলিফা ওমর বিন আবদুল আজিজ খোলাফায়ে রাশেদুনের আদর্শে খিলাফত পরিচালনা করেন। তিনি রাজকীয় বিলাসিতা ত্যাগ করে সাদামাটা জীবন বেছে নেন। তিনি দুর্নীতিগ্রস্ত গভর্নরদের পদচ্যুত করেন, আহলে বাইতের ফাদাক সম্পত্তি ফিরিয়ে দেন, জুমার খুতবায় আলীর প্রতি কটূক্তি বন্ধ করেন এবং নওমুসলিম মাওয়ালীদের ওপর থেকে অন্যায় জিজিয়া কর প্রত্যাহার করেন। তাঁর সুশাসনে সমাজে এমন অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আসে যে সমগ্র খিলাফতে জাকাত নেওয়ার মতো গরিব পাওয়া যেত না।
১২। মাওয়ালী কারা? উমাইয়াদের মাওয়ালী নীতি ব্যাখ্যা কর।
[Who were the Mawalids? Explain the Mawalids policy of the Umayyads.]
মাওয়ালীদের পরিচয় ও উমাইয়াদের নীতি
উমাইয়া যুগে যেসব অনারব জনগোষ্ঠী (পারসিক, মিসরীয় কপ্টিক, বারবার, সিন্ধি) ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, ইসলামি পরিভাষায় তাঁদের ‘মাওয়ালী’ (Mawali বা ক্লায়েন্ট) বলা হতো। ইসলাম সকল মুসলিমকে সমান অধিকার দিলেও উমাইয়া শাসকরা তাঁদের আরব আভিজাত্যের অহমিকায় দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক গণ্য করত। সামরিক বাহিনীতে অংশ নিলেও তাঁদের পূর্ণ বেতন বা গনিমতের অংশ দেওয়া হতো না। এমনকি ইসলাম গ্রহণের পরও রাজস্ব ঘাটতির অজুহাতে হাজ্জাজ বিন ইউসুফের মতো প্রশাসকরা তাঁদের কাছ থেকে জিজিয়া কর আদায় করত। উমাইয়াদের এই বৈষম্যমূলক নীতির কারণেই মাওয়ালীরা চরম ক্ষুব্ধ হয়ে আব্বাসীয়দের পতাকাতলে যোগ দেয় এবং উমাইয়া খিলাফতের পতন ঘটায়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. ‘মুসলমানদের ইতিহাস (৫৭০—৭৫০)’ বিষয়ের মূল অধ্যায়গুলো কী কী?
ইসলাম-পূর্ব জাহেলি যুগ, মহানবি (সা.)-এর নবুওয়ত ও মাদানি রাষ্ট্র, খোলাফায়ে রাশেদুনের যুগান্তকারী শাসনকাল এবং দামেস্কের উমাইয়া খিলাফতের উত্থান ও পতন এ কোর্সের মূল আলোচ্য বিষয়।
২. হুদায়বিয়ার সন্ধিকে কুরআন মজিদে কেন ‘সুস্পষ্ট বিজয়’ বলা হয়েছে?
কারণ এই সন্ধির মাধ্যমে কুরাইশরা মদিনা রাষ্ট্রকে প্রথম রাজনৈতিক স্বীকৃতি দেয়, দীর্ঘ যুদ্ধ বন্ধ হয় এবং শান্তিময় পরিবেশে অগণিত মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে, যা পরবর্তীকালে রক্তহীন মক্কা বিজয়ের দ্বার খুলে দেয়।
৩. হযরত ওসমান (রা.)-কে কেন ‘জামেউল কুরআন’ বলা হয়?
বিভিন্ন প্রদেশে কুরআনের বিশুদ্ধ তিলাওয়াত নিয়ে বিভ্রান্তি দূর করতে তিনি কুরাইশ উপভাষায় মূল পাঠ অনুযায়ী প্রামাণ্য প্রতিলিপি প্রস্তুত করিয়ে সকল মুসলিম অঞ্চলে পাঠান এবং উম্মাহর মধ্যে একত্বের প্রতীক তৈরি করেন।
৪. খলিফা আব্দুল মালিক বিন মারওয়ানকে কেন উমাইয়াদের ‘দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাতা’ বলা হয়?
দ্বিতীয় গৃহযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে তিনি সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক ঐক্য রক্ষা করেন, নিজস্ব আরবি মুদ্রা দিনার ও দিরহাম চালু করেন এবং আরবিকে সরকারি দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।
৫. সিফফিনের যুদ্ধ থেকে মুসলিম সমাজে কোন নতুন গোষ্ঠীর জন্ম হয়েছিল?
সালিশি (তাহকিম) মেনে নেওয়ার প্রতিবাদে খলিফা আলীর দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে চরমপন্থী খারেজি (Kharijite) সম্প্রদায়ের জন্ম হয়েছিল।
৬. পরীক্ষার খাতায় ঐতিহাসিক প্রশ্নের সেরা উপস্থাপনা কৌশল কী?
উত্তরের প্রতিটি ভাগে স্পষ্ট সাব-হেডিং ব্যবহার করা, আরবি পরিভাষা (যেমন: তাহকিম, আসাবিয়্যাহ, মাওয়ালী, বারিদ) সঠিকভাবে উল্লেখ করা এবং প্রামাণ্য ঐতিহাসিক দলিলের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করা।

