ফাযিল (স্নাতক) পাস ৩য় বর্ষ পরীক্ষা – ২০২১
বিষয়: ইসলামি অর্থনীতি ২য় পত্র (বিষয় কোড: ৪৩৮)
[সামষ্টিক অর্থনীতি ও ইসলামি সরকারি অর্থব্যবস্থা]
সময়: ৩ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ১০০
ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ফাযিল (স্নাতক) পাস ৩য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২১-এর ইসলামি অর্থনীতি ২য় পত্র (বিষয় কোড: ৪৩৮) পরীক্ষার মূল প্রশ্নপত্রের প্রতিটি প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ, প্রামাণ্য ও অ্যাকাডেমিক সমাধান নিচে দেওয়া হলো। ফাযিল ডিগ্রি ও অনার্স শ্রেণির ২০ নম্বরের রচনামূলক প্রশ্নের উচ্চমান বজায় রেখে ভূমিকা, সামষ্টিক অর্থনৈতিক তত্ত্ব, কুরআন ও সুন্নাহর দলিল, বিশ্লেষণী তুলনামূলক ছক এবং প্রায়োগিক দিক সহযোগে প্রতিটি উত্তর প্রস্তুত করা হয়েছে।
কন্টেন্ট তালিকা / প্রশ্নসূচি
- ব্যাষ্টিক ও সামষ্টিক অর্থনীতির পার্থক্য দেখাও। ইসলামি অর্থনীতিতে সামষ্টিক অর্থনীতি পাঠের প্রয়োজনীয়তা আলোচনা কর।
- ভোগ বলতে কী বুঝ? ইসলামের দৃষ্টিতে সঞ্চয় ও বিনিয়োগ আচরণ ব্যাখ্যা কর।
- মুদ্রাস্ফীতি বলতে কী বুঝ? মুদ্রাস্ফীতির ফলাফল এবং নিয়ন্ত্রণ আলোচনা কর।
- যাকাত ফরজ হওয়ার শর্তসমূহ আলোচনা কর। সমাজে দারিদ্র্য দূরীকরণে যাকাতের ভূমিকা মূল্যায়ন কর।
- ইসলামি অর্থব্যবস্থায় সরকারের আয়ের উৎস ও ব্যয়ের খাতগুলো আলোচনা কর।
- “ইসলামি অর্থনীতির উৎস যেখানে কুরআন ও হাদিস, আধুনিক অর্থনীতি সেখানে মানবপ্রসূত।”- উক্তিটি ব্যাখ্যা কর।
- দারিদ্র্য ধারণাটি ব্যাখ্যা কর। দারিদ্র্য বিমোচনে ইসলামি দিক নির্দেশনাগুলো আলোচনা কর।
- ইসলামি ব্যাংক কী? বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ইসলামি ব্যাংকিং-এর ভূমিকা আলোচনা কর।
- সামাজিক নিরাপত্তা বলতে কী বুঝ? ইসলামে সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের ভূমিকা আলোচনা কর।
- টীকা লিখ (যে কোনো দুটি): (ক) মুদ্রানীতি; (খ) প্রকৃত জি.এন.পি; (গ) বায়তুল মাল; (ঘ) উশর।
প্রশ্নোত্তর ও পূর্ণাঙ্গ সমাধান
ব্যাষ্টিক ও সামষ্টিক অর্থনীতির পার্থক্য দেখাও। ইসলামি অর্থনীতিতে সামষ্টিক অর্থনীতি পাঠের প্রয়োজনীয়তা আলোচনা কর।
ভূমিকা:
অর্থনীতি শাস্ত্রের আলোচনা ও বিশ্লেষণের পরিধিকে আধুনিককালে প্রধান দুটি শাখায় বিভক্ত করা হয়েছে: ব্যষ্টিক অর্থনীতি (Microeconomics) এবং সামষ্টিক অর্থনীতি (Macroeconomics)। ১৯৩৩ সালে নরওয়েজীয় অর্থনীতিবিদ র্যাগনার ফ্রিশ (Ragnar Frisch) সর্বপ্রথম অর্থনীতিতে এই দুটি পরিভাষা প্রয়োগ করেন। একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, জাতীয় সমৃদ্ধি এবং ইনসাফপূর্ণ সরকারি অর্থব্যবস্থা পরিচালনার জন্য সামষ্টিক অর্থনীতির জ্ঞান অপরিহার্য।
১. ব্যষ্টিক ও সামষ্টিক অর্থনীতির প্রামাণ্য সংজ্ঞা:
– ব্যষ্টিক অর্থনীতি: গ্রিক শব্দ ‘Mikros’ থেকে ‘Micro’ শব্দের উৎপত্তি, যার অর্থ ক্ষুদ্র। যে অর্থনীতিতে সমাজের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পৃথক অর্থনৈতিক চলক বা এককের আচরণ আলোচনা করা হয়—যেমন একজন নির্দিষ্ট ভোক্তার চাহিদা, একটি ফার্মের উৎপাদন বা একটি পণ্যের দাম নির্ধারণ—তাকে ব্যষ্টিক অর্থনীতি বলে।
– সামষ্টিক অর্থনীতি: গ্রিক শব্দ ‘Makros’ থেকে ‘Macro’ শব্দের উৎপত্তি, যার অর্থ বৃহৎ বা সামগ্রিক। যে অর্থনীতিতে একটি দেশের জাতীয় পর্যায়ের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সমস্যা ও চলকসমূহ—যেমন জাতীয় আয়, সামগ্রিক চাহিদা, মোট সঞ্চয় ও বিনিয়োগ, সাধারণ মূল্যস্তর, কর্মসংস্থান ও মুদ্রাস্ফীতি—আলোচনা করা হয়, তাকে সামষ্টিক অর্থনীতি বলে।
২. ব্যষ্টিক ও সামষ্টিক অর্থনীতির মৌলিক পার্থক্যসমূহ:
| পার্থক্যসূচক ক্ষেত্র | ব্যষ্টিক অর্থনীতি (Microeconomics) | সামষ্টিক অর্থনীতি (Macroeconomics) |
|---|---|---|
| ১. বিশ্লেষণের পরিধি | অর্থনীতির ক্ষুদ্র বা আংশিক একক নিয়ে আলোচনা করে। | জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সামগ্রিক রূপরেখা আলোচনা করে। |
| ২. মূল চলকসমূহ | একক ভোক্তার চাহিদা, একক দ্রব্যের দাম, ফার্মের মুনাফা। | জাতীয় আয় (GNP), সামগ্রিক মূল্যস্তর, বেকারত্ব হার। |
| ৩. ভারসাম্যের প্রকৃতি | আংশিক ভারসাম্য বিশ্লেষণ (Partial Equilibrium)। | সাধারণ বা সামগ্রিক ভারসাম্য বিশ্লেষণ (General Equilibrium)। |
| ৪. মূল লক্ষ্য | সীমিত সম্পদে ব্যক্তি উপযোগ ও ফার্মের মুনাফা সর্বোচ্চকরণ। | পূর্ণ কর্মসংস্থান, প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক ইনসাফ প্রতিষ্ঠা। |
| ৫. সরকারি ভূমিকার মাত্রা | বাজারের স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ। | মুদ্রানীতি, রাজস্ব নীতি ও রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপে বিস্তৃত। |
৩. ইসলামি অর্থনীতিতে সামষ্টিক অর্থনীতি পাঠের প্রয়োজনীয়তা:
১. সুদমুক্ত জাতীয় রাজস্ব ও মুদ্রানীতি প্রণয়ন: দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কীভাবে সুদহীন আর্থিক ব্যবস্থা পরিচালনা করবে, তা সামষ্টিক ইসলামি অর্থনীতি ছাড়া নিরূপণ অসম্ভব।
২. জাতীয় দারিদ্র্য বিমোচন ও যাকাত ব্যবস্থাপনা: বায়তুল মাল ও রাষ্ট্রীয় যাকাত বোর্ডের মাধ্যমে সমগ্র মুসলিম জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য দূরীকরণের পরিকল্পনা প্রণয়ন।
৩. মুদ্রাস্ফীতি ও মূল্যস্তর নিয়ন্ত্রণ: বাজারে সিন্ডিকেট ও কৃত্রিম মুদ্রাস্ফীতি দমন করে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা করা।
৪. সম্পদের সুষম জাতীয় বণ্টন: ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার বৈষম্য কমিয়ে কুরআন ঘোষিত ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা।
উপসংহার:
ব্যষ্টিক অর্থনীতি গাছের পাতার মতো পৃথক অস্তিত্বকে বিশ্লেষণ করে, আর সামষ্টিক অর্থনীতি সমগ্র বনকে একসঙ্গে অবলোকন করে। ইসলামি কল্যাণ রাষ্ট্র বিনির্মাণে সামষ্টিক অর্থনীতির বিকল্প নেই।
ভোগ বলতে কী বুঝ? ইসলামের দৃষ্টিতে সঞ্চয় ও বিনিয়োগ আচরণ ব্যাখ্যা কর।
ভূমিকা:
মানবজীবনের নিরাপত্তা ও মর্যাদাপূর্ণ অস্তিত্ব নিশ্চিত করা ইসলামি সমাজ দর্শনের প্রধান স্তম্ভ। সমাজে প্রতিটি মানুষের খাদ্য, চিকিৎসা ও বাসস্থানের গ্যারান্টি থাকাকে ‘সামাজিক নিরাপত্তা’ (Social Security) বলে। একই সাথে ভোগ, সঞ্চয় ও বিনিয়োগ আচরণ কীভাবে একজন মুমিন পরিচালনা করবে, সে বিষয়ে ইসলামের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে।
১. সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের ভূমিকা:
– ১. ব্যক্তির ভূমিকা: মাতা-পিতা ও নিকটাত্মীয়দের ভরণপোষণ নিশ্চিত করা ব্যক্তির ওপর ফরজ (নাফাক্বা)। সামর্থ্যবান ব্যক্তির প্রতিবেশীর ক্ষুধায় পাশে দাঁড়ানো বাধ্যতামূলক। নবীজী (সা.) ইরশাদ করেন: “সে ব্যক্তি মুমিন নয় যে নিজে পেট পুরে খায় অথচ তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে।”
– ২. সমাজের ভূমিকা: ওয়াকফ (Waqf) প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, সামাজিক কল্যাণ তহবিল তৈরি এবং অনাথ ও বিধবাদের সুরক্ষায় ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ নেওয়া।
– ৩. রাষ্ট্রের ভূমিকা: বায়তুল মাল থেকে নিয়মিত ভাতা প্রদান, বেকারত্ব ভাতা এবং চিকিৎসা বীমা প্রদান। হযরত উমর (রা.) বলেছিলেন: “ফোরাত নদীর তীরে যদি একটি কুকুরও না খেয়ে মারা যায়, তবে আমি উমর আল্লাহর কাছে দায়ী থাকব!”
২. ইসলামের দৃষ্টিতে ভোগ, সঞ্চয় ও বিনিয়োগ আচরণ:
১. ভোগ আচরণ: ইসলাম মধ্যমপন্থা অনুসরণের নির্দেশ দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَالَّذِينَ إِذَا أَنفَقُوا لَمْ يُسْرِفُوا وَلَمْ يَقْتُرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذَٰلِكَ قَوَامًا
“আর যারা ব্যয়ের ক্ষেত্রে অপচয়ও করে না এবং কৃপণতাও করে না; বরং তারা এই দুইয়ের মাঝে মধ্যপন্থা অবলম্বন করে।” (সূরা আল-ফুরকান: ৬৭)।
২. সঞ্চয় আচরণ: ভবিষ্যৎ পরিবারের সুরক্ষায় সঞ্চয় বৈধ; কিন্তু সম্পদ কুক্ষিগত করে রাখা (কাঞ্জ/كنز) হারাম। সূরা তওবার ৩৪ আয়াতে যারা স্বর্ণ-রৌপ্য জমা করে রাখে তাদের জাহান্নামের ভয়াবহ শাস্তির হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
৩. বিনিয়োগ আচরণ: সঞ্চিত অর্থ সুদমুক্ত লাভ-লোকসানের অংশীদারিত্বে (মুশারাকা ও মুদারাবা) বিনিয়োগ করে কলকারখানা গড়ে তোলা এবং হালাল জীবিকা সৃষ্টি করা।
উপসংহার:
সামাজিক নিরাপত্তা ও সুষম বিনিয়োগের এই সংমিশ্রণই ইসলামকে চিরন্তন শান্তির ধর্মে রূপ দিয়েছে।
মুদ্রাস্ফীতি বলতে কী বুঝ? মুদ্রাস্ফীতির ফলাফল এবং নিয়ন্ত্রণ আলোচনা কর।
ভূমিকা:
আধুনিক সামষ্টিক অর্থনীতির সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক ব্যাধি হলো ‘মুদ্রাস্ফীতি’ (Inflation)। এটি সাধারণ মানুষের পকেট থেকে নিঃশব্দে ক্রয়ক্ষমতা কেড়ে নেয় এবং ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। ইসলামি অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতিকে সামাজিক ইনসাফের চরম পরিপন্থী গণ্য করে তা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে।
১. মুদ্রাস্ফীতির শাস্ত্রীয় সংজ্ঞা:
অর্থনীতিবিদ কলবোর্ন (Coulborn)-এর মতে: “অতিরিক্ত পরিমাণ অর্থ যখন অতি অল্প পরিমাণ দ্রব্যের পেছনে ধাবিত হয়, তখন তাকে মুদ্রাস্ফীতি বলে।”
সহজ কথায়—যখন কোনো দেশে সামগ্রিক মূল্যস্তর (General Price Level) ক্রমাগত ও দীর্ঘ সময় ধরে বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং এর ফলে অর্থের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পায়, তখন সেই অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে মুদ্রাস্ফীতি বলা হয়।
২. মুদ্রাস্ফীতি সৃষ্টির প্রধান প্রধান কারণসমূহ:
- চাহিদা বৃদ্ধিজনিত মুদ্রাস্ফীতি (Demand-Pull Inflation): দেশে যদি সামগ্রিক উৎপাদন বৃদ্ধির চেয়ে মানুষের আয় ও অর্থ সরবরাহ দ্রুত বৃদ্ধি পায়, তবে অতিরিক্ত চাহিদার চাপে পণ্যের দাম বাড়ে।
- উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধিজনিত মুদ্রাস্ফীতি (Cost-Push Inflation): কাঁচামাল, জ্বালানি তেল, পরিবহন খরচ বা সুদের হার বেড়ে গেলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়, যার ফলে উৎপাদক দাম বাড়িয়ে দেয়।
- ঘাটতি বাজেট ও অতিরিক্ত কাগজি মুদ্রা ছাপানো: সরকার যখন রাজস্ব আয়ের চেয়ে অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে অপরিকল্পিতভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নতুন টাকা ছাপে (Deficit Financing)।
- মজুতদারি, সিন্ডিকেট ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য: কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির মাধ্যমে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেওয়া।
- সুদের চক্রবৃদ্ধি প্রভাব: ঋণের ওপর চড়া সুদ শিল্পপণ্যের মূল্যের সাথে যুক্ত হয়ে সামগ্রিক মূল্যস্তরকে উস্কে দেয়।
৩. ইসলামি অর্থব্যবস্থায় মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বৈজ্ঞানিক সমাধান:
১. সুদ নির্মূল করে লাভ-লোকসানের অর্থায়ন: সুদের অতিরিক্ত বোঝা পণ্যের ওপর না চাপায় উৎপাদন খরচ স্থিতিশীল থাকে।
২. মজুতদারি ও কালোবাজারির কঠোর দমন: রাসূলুল্লাহ (সা.) মজুতদারদের ওপর লানত দিয়েছেন। হিসবাহ আদালতের মাধ্যমে অসাধু সিন্ডিকেট নির্মূল করা।
৩. স্বর্ণ-রৌপ্যভিত্তিক বা সম্পদ-সমর্থিত মুদ্রা (Asset-backed Currency): নিছক কাগজি টাকার লাগামহীন মুদ্রণ বন্ধ করে বাস্তব সম্পদের সমমানের মুদ্রা প্রবর্তন।
৪. প্রকৃত উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ: ফাটকাবাজি, জুয়া বা শেয়ার বাজারের ভুয়া লেনদেন বন্ধ করে কৃষি ও ভারী শিল্পে পুঁজি বিনিয়োগ।
উপসংহার:
মুদ্রাস্ফীতি দরিদ্রের ওপর এক নীরব নিষ্ঠুর করের মতো। ইসলামি শরিয়তের বাস্তবভিত্তিক অর্থনৈতিক সংস্কারই পারে স্থিতিশীল ও টেকসই মূল্যস্তর নিশ্চিত করতে।
যাকাত ফরজ হওয়ার শর্তসমূহ আলোচনা কর। সমাজে দারিদ্র্য দূরীকরণে যাকাতের ভূমিকা মূল্যায়ন কর।
ভূমিকা:
ইসলামের পাঁচটি মৌলিক স্তম্ভের মধ্যে ‘যাকাত’ হলো আর্থ-সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্তম্ভ। এটি কেবল একটি আধ্যাত্মিক ইবাদত নয়; বরং দারিদ্র্য নির্মূল, ক্রয়ক্ষমতা সৃষ্টি এবং সম্পদ পুনর্বণ্টনের বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ ঐশ্বরিক ব্যবস্থা। কুরআনুল কারীমে নামাজের পাশাপাশি মোট ৮২ বার যাকাতের তাগিদ দেওয়া হয়েছে, যা এর অসামান্য গুরুত্বকে প্রমাণ করে।
১. যাকাতের শাব্দিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা:
– শাব্দিক অর্থ: ‘যাকাত’ (الزكاة) শব্দের আভিধানিক অর্থ পবিত্রতা, প্রবৃদ্ধি, পরিচ্ছন্নতা এবং আধিক্য (النماء والزيادة والطهارة)। যাকাত প্রদানের মাধ্যমে ধনীর সম্পদ অবশিষ্ট অপবিত্রতা থেকে মুক্ত হয় এবং সম্পদে আল্লাহর বরকত বৃদ্ধি পায়।
– পারিভাষিক সংজ্ঞা: শরীয়তের পরিভাষায়—কোনো মুসলিম নিসাব পরিমাণ সম্পদের একক মালিক হওয়ার পর পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হলে, তার উদ্বৃত্ত সম্পদের সুনির্দিষ্ট অংশ (সাধারণত ২.৫%) আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কুরআনে নির্ধারিত আটটি খাতের হকদারদের মাঝে নিঃশর্তভাবে মালিক বানিয়ে দেওয়াকে যাকাত বলে।
– কুরআনের নির্দেশ: وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ – “তোমরা সালাত কায়েম কর এবং যাকাত প্রদান কর।” (সূরা আল-বাক্বারাহ: ৪৩)।
২. যাকাতের আটটি ব্যয়ের খাত (مصارف الزكاة – সূরা তাওবা: ৬০):
১. ফকির (নিঃস্ব), ২. মিসকিন (অভাবগ্রস্ত), ৩. যাকাত আদায়ে নিয়োজিত কর্মচারী (আমেলা), ৪. ইসলামের প্রতি মন আকৃষ্ট করার জন্য (মুআল্লাফাতুল কুলুব), ৫. দাসমুক্তি ও বন্দিমুক্তি (রিক্বাব), ৬. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি (গারেমীন), ৭. আল্লাহর পথে জিহাদ ও দ্বীনের দাওয়াত (ফী সাবিলিল্লাহ), ৮. অসহায় মুসাফির (ইবনুস সাবিল)।
৩. সমাজে দারিদ্র্য দূরীকরণে যাকাতের অনন্য ভূমিকা:
১. স্বাবলম্বীকরণ ও টেকসই দারিদ্র্যমুক্তি: হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলতেন: “যখন কাউকে যাকাত দেবে, তখন তাকে চিরদিনের জন্য ধনী ও স্বাবলম্বী বানিয়ে দাও।” অর্থাৎ ক্ষুদ্র ঋণ বা ভিক্ষার বদলে এককালীন এমন পুঁজি বা উপকরণ দেওয়া যাতে সে নিজেই পরবর্তীতে যাকাতদাতা হতে পারে।
২. সম্পদের অলস মজুত ভাঙা: সম্পদে ২.৫% হারে যাকাত কার্যকর থাকলে অলস ফেলে রাখলে ৪০ বছরে মূলধন শেষ হয়ে যাবে। ফলে পুঁজিপতিরা অর্থ অলস না রেখে উৎপাদনশীল ব্যবসায় খাটাতে বাধ্য হয়, যা ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে।
৩. অর্থনৈতিক ভারসাম্য ও অপরাধ হ্রাস: ক্ষুধা ও বঞ্চনা মানুষকে চুরি, ছিনতাই ও সমাজবিরোধী কাজে ঠেলে দেয়। যাকাত সামাজিক সুরক্ষা দিয়ে সমাজে নিরাপত্তা ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে।
৪. যাকাতভিত্তিক অর্থসংস্থান বনাম করভিত্তিক অর্থসংস্থান:
প্রচলিত কর ফাঁকি দেওয়া আধুনিক সমাজে স্বাভাবিক ব্যাপার; কিন্তু যাকাত আল্লাহর প্রতি ঈমানী আনুগত্য হওয়ায় মুসলিমরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে তা আদায় করে। এছাড়া করের অর্থ অপচয় ও আমলাতান্ত্রিক ব্যয়ে বিনষ্ট হলেও যাকাতের অর্থ সরাসরি প্রান্তিক গরিবের হাতে পৌঁছায়।
উপসংহার:
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, খলিফা উমর বিন আবদুল আজিজের শাসনামলে যাকাত ব্যবস্থার নিখুঁত প্রয়োগের ফলে গোটা রাষ্ট্রে একজনও যাকাত গ্রহণের মতো দরিদ্র মানুষ খুঁজে পাওয়া যায়নি। আধুনিক বিশ্বে দারিদ্র্যমুক্ত সমাজ গড়তে এই ব্যবস্থা অবিলম্বে পুনর্বহাল করা উচিত।
ইসলামি অর্থব্যবস্থায় সরকারের আয়ের উৎস ও ব্যয়ের খাতগুলো আলোচনা কর।
ভূমিকা:
ইসলামি রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রণালয় ও সর্বজনীন কোষাগারকে ‘বায়তুল মাল’ (بيت المال) বলা হয়। এটি কোনো ব্যক্তি বা শাসকের ব্যক্তিগত তহবিল নয়; বরং সমগ্র মুসলিম উম্মাহ ও প্রজাসাধারণের পরম পবিত্র আমানত। খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগে, বিশেষত দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর খেলাফতকালে বায়তুল মালের যে প্রাতিষ্ঠানিক ও সুশৃঙ্খল কাঠামো গড়ে উঠেছিল, তা আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্রের অগ্রদূত।
১. বায়তুল মালের প্রধান প্রধান আয়ের উৎসসমূহ:
| আয়ের উৎস | প্রকৃতি ও বিধান | আদায়ের হার |
|---|---|---|
| ১. যাকাত (الزكاة) | ধনী মুসলিমদের উদ্বৃত্ত সম্পদের ওপর বাধ্যতামূলক ঐশ্বরিক প্রদেয়। | স্বর্ণ, রৌপ্য ও নগদ অর্থে ২.৫%। |
| ২. উশর (العشر) | মুসলিমদের কৃষিজমির উৎপন্ন ফসলের ওপর প্রদেয় ফসলি যাকাত। | বৃষ্টির পানিতে সেচে ১০%, কৃত্রিম সেচে ৫%। |
| ৩. জিযিয়া (الجزية) | ইসলামি রাষ্ট্রে বসবাসকারী অমুসলিমদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তার বিনিময়ে প্রদেয় সামরিক কর। | সামর্থ্যানুযায়ী বার্ষিক নির্ধারিত মুদ্রা (নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও সন্ন্যাসী মুক্ত)। |
| ৪. খারাজ (الخراج) | অমুসলিমদের মালিকানাধীন বা বিজিত ভূমির ওপর ধার্যকৃত ভূমি রাজস্ব। | জমির উর্বরতা ও উৎপাদনের ভিত্তিতে নির্ধারিত। |
| ৫. খুমুস ও গনিমত (الخمس) | যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ও ভূগর্ভস্থ খনিজ সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ। | মোট পরিমাণের ২০% (এক-পঞ্চমাংশ)। |
| ৬. ফায় ও আশুর (الفيء والعشور) | যুদ্ধহীন বিজিত সম্পত্তি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কাফেলার ওপর আরোপিত শুল্ক। | শুল্ক হিসেবে মুসলিমদের ২.৫%, অমুসলিমদের ৫-১০%। |
২. বায়তুল মালের ব্যয়ের খাতসমূহ:
বায়তুল মালের তহবিল দুটি প্রধান অ্যাকাউন্টে পরিচালিত হতো:
১. যাকাত ও সাদাকাত ফান্ড: এই ফান্ডের অর্থ কেবলমাত্র সূরা আত-তাওবার ৬০ নম্বর আয়াতে উল্লেখিত ৮টি নির্দিষ্ট খাতে (ফকির, মিসকিন, দাসমুক্তি, ঋণগ্রস্ত ইত্যাদি) ব্যয় করা হতো; অন্য কোনো খাতে খরচ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল।
২. সাধারণ রাজস্ব ফান্ড (খারাজ, জিযিয়া ও বাণিজ্য শুল্ক): এই ফান্ডের অর্থ দিয়ে সমগ্র রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কর্মচারীদের বেতন, সেনাবাহিনীর প্রতিরক্ষা ব্যয়, রাস্তাঘাট, সেতু, খাল খনন, মসজিদ-মাদরাসা নির্মাণ এবং নাগরিকদের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা ও শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হতো।
৩. বায়তুল মালের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি:
হযরত উমর (রা.) বায়তুল মাল থেকে প্রতিটি নবজাতক শিশুর জন্য দুধভাতা, বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধীদের জন্য পেনশন এবং দুর্যোগকালে বিনামূল্যে খাদ্য বিতরণের ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। এক ইহুদি বৃদ্ধকে ভিক্ষা করতে দেখে তিনি নির্দেশ দেন: “আমরা যৌবনে তার থেকে জিযিয়া আদায় করেছি, আর বার্ধক্যে তাকে ফেলে রাখতে পারি না!”
উপসংহার:
বায়তুল মাল ছিল শতভাগ দুর্নীতিমুক্ত ও স্বচ্ছতার প্রতীক। এই অর্থনৈতিক মডেল বাস্তবায়ন করলে কোনো দেশ কখনো ঋণগ্রস্ত বা পরনির্ভরশীল হতে পারে না।
“ইসলামি অর্থনীতির উৎস যেখানে কুরআন ও হাদিস, আধুনিক অর্থনীতি সেখানে মানবপ্রসূত।”- উক্তিটি ব্যাখ্যা কর।
ভূমিকা:
মানব সমাজের উৎপাদন, বণ্টন, বিনিময় ও সম্পদের মালিকানা পরিচালনার জন্য বিশ্বে প্রধানত তিনটি অর্থনৈতিক মতবাদ বিকাশ লাভ করেছে: ১. অবাধ পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা (Laissez-faire Capitalism), ২. কেন্দ্রীয়ভাবে পরিকল্পিত সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা (Centrally Planned Socialism), এবং ৩. ঐশী ও ভারসাম্যপূর্ণ ইসলামি অর্থব্যবস্থা (Islamic Economy)। একটি শোষণহীন মানবিক সমাজ বিনির্মাণে এ তিনটি ব্যবস্থার তুলনামূলক রূপরেখা অনুধাবন করা আবশ্যক।
১. তিনটি প্রধান অর্থব্যবস্থার তুলনামূলক চিত্র:
| মূল উপাদান | পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা (Capitalism) | সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা (Socialism) | ইসলামি অর্থব্যবস্থা (Islamic Economy) |
|---|---|---|---|
| ১. দর্শন ও উৎস | মানবীয় ব্যক্তিস্বার্থ ও বস্তুবাদ। | শ্রেণীহীন সাম্যবাদ ও দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ। | কুরআন ও সুন্নাহর ঐশী জীবনবিধান। |
| ২. সম্পদের মালিকানা | সম্পূর্ণ ব্যক্তিমালিকানা; রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপহীন। | রাষ্ট্রীয় মালিকানা; ব্যক্তিমালিকানা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। | প্রকৃত মালিক আল্লাহ; মানুষ সীমিত আমানতদার। |
| ৩. অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি | ব্যক্তিগত মুনাফা সর্বোচ্চকরণ। | রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা ও কোটা পূরণ। | আল্লাহর সন্তুষ্টি ও মানবতার ফালাহ (কল্যাণ)। |
| ৪. সুদ ও অর্থায়ন | সুদ হলো অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। | রাষ্ট্রীয় ব্যাংক; ব্যক্তিগত সুদ নিষিদ্ধ। | সুদ সম্পূর্ণ হারাম; অংশীদারি বিনিয়োগ। |
| ৫. বণ্টন ব্যবস্থা | মূল্য ব্যবস্থার স্বয়ংক্রিয় শোষণ; ধনী-গরিব বৈষম্য। | রাষ্ট্র কর্তৃক জোরপূর্বক রেশনিং ও সমবণ্টন। | যাকাত, উশর ও মিরাসের সুষম মানবিক পুনর্বণ্টন। |
| ৬. ভোক্তার স্বাধীনতা | সার্বভৌম ভোক্তা; ক্ষতিকর পণ্যও অবাধ। | ভোক্তার কোনো স্বাধীনতা নেই; রাষ্ট্র যা দেয়। | হালালের সীমার মধ্যে পূর্ণ স্বাধীন ও সুষম। |
২. পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের ঐতিহাসিক ব্যর্থতা:
– পুঁজিবাদের ব্যর্থতা: এতে ব্যক্তির স্বাধীনতা থাকে কিন্তু সামাজিক ন্যায়বিচার থাকে না। মুষ্টিমেয় ধনী সমগ্র জাতির রক্ত চুষে সম্পদ পুঞ্জীভূত করে এবং বারবার মহামন্দা ও ঋণের সংকট তৈরি হয়।
– সমাজতন্ত্রের ব্যর্থতা: সাম্য প্রতিষ্ঠার নামে মানুষের ব্যক্তিগত উদ্যোগ, কর্মস্পৃহা ও ধর্মীয় অনুভূতি কেড়ে নেওয়া হয়। আমলাতান্ত্রিক স্বৈরাচার সমাজকে পঙ্গু করে দেয় এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো একনায়কতান্ত্রিক পরাশক্তি ধসে পড়ে।
৩. ইসলামি অর্থব্যবস্থার অনন্য শ্রেষ্ঠত্ব:
ইসলাম পুঁজিবাদের মতো ব্যক্তির কর্মপ্রেরণাকে ধ্বংস করে না, আবার সমাজতন্ত্রের মতো রাষ্ট্রীয় জুলুমের শিকার করে না। এটি ব্যক্তিগত উদ্যোগকে স্বীকার করে কিন্তু যাকাত ও সুদের নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে শোষণের পথ বন্ধ করে দেয়।
উপসংহার:
পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের ব্যর্থতার পর একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বমানবতার জন্য ইসলামি অর্থব্যবস্থাই একমাত্র টেকসই ও শান্তিময় বিকল্প পথ।
দারিদ্র্য ধারণাটি ব্যাখ্যা কর। দারিদ্র্য বিমোচনে ইসলামি দিক নির্দেশনাগুলো আলোচনা কর।
ভূমিকা:
ইসলামের পাঁচটি মৌলিক স্তম্ভের মধ্যে ‘যাকাত’ হলো আর্থ-সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্তম্ভ। এটি কেবল একটি আধ্যাত্মিক ইবাদত নয়; বরং দারিদ্র্য নির্মূল, ক্রয়ক্ষমতা সৃষ্টি এবং সম্পদ পুনর্বণ্টনের বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ ঐশ্বরিক ব্যবস্থা। কুরআনুল কারীমে নামাজের পাশাপাশি মোট ৮২ বার যাকাতের তাগিদ দেওয়া হয়েছে, যা এর অসামান্য গুরুত্বকে প্রমাণ করে।
১. যাকাতের শাব্দিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা:
– শাব্দিক অর্থ: ‘যাকাত’ (الزكاة) শব্দের আভিধানিক অর্থ পবিত্রতা, প্রবৃদ্ধি, পরিচ্ছন্নতা এবং আধিক্য (النماء والزيادة والطهارة)। যাকাত প্রদানের মাধ্যমে ধনীর সম্পদ অবশিষ্ট অপবিত্রতা থেকে মুক্ত হয় এবং সম্পদে আল্লাহর বরকত বৃদ্ধি পায়।
– পারিভাষিক সংজ্ঞা: শরীয়তের পরিভাষায়—কোনো মুসলিম নিসাব পরিমাণ সম্পদের একক মালিক হওয়ার পর পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হলে, তার উদ্বৃত্ত সম্পদের সুনির্দিষ্ট অংশ (সাধারণত ২.৫%) আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কুরআনে নির্ধারিত আটটি খাতের হকদারদের মাঝে নিঃশর্তভাবে মালিক বানিয়ে দেওয়াকে যাকাত বলে।
– কুরআনের নির্দেশ: وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ – “তোমরা সালাত কায়েম কর এবং যাকাত প্রদান কর।” (সূরা আল-বাক্বারাহ: ৪৩)।
২. যাকাতের আটটি ব্যয়ের খাত (مصارف الزكاة – সূরা তাওবা: ৬০):
১. ফকির (নিঃস্ব), ২. মিসকিন (অভাবগ্রস্ত), ৩. যাকাত আদায়ে নিয়োজিত কর্মচারী (আমেলা), ৪. ইসলামের প্রতি মন আকৃষ্ট করার জন্য (মুআল্লাফাতুল কুলুব), ৫. দাসমুক্তি ও বন্দিমুক্তি (রিক্বাব), ৬. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি (গারেমীন), ৭. আল্লাহর পথে জিহাদ ও দ্বীনের দাওয়াত (ফী সাবিলিল্লাহ), ৮. অসহায় মুসাফির (ইবনুস সাবিল)।
৩. সমাজে দারিদ্র্য দূরীকরণে যাকাতের অনন্য ভূমিকা:
১. স্বাবলম্বীকরণ ও টেকসই দারিদ্র্যমুক্তি: হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলতেন: “যখন কাউকে যাকাত দেবে, তখন তাকে চিরদিনের জন্য ধনী ও স্বাবলম্বী বানিয়ে দাও।” অর্থাৎ ক্ষুদ্র ঋণ বা ভিক্ষার বদলে এককালীন এমন পুঁজি বা উপকরণ দেওয়া যাতে সে নিজেই পরবর্তীতে যাকাতদাতা হতে পারে।
২. সম্পদের অলস মজুত ভাঙা: সম্পদে ২.৫% হারে যাকাত কার্যকর থাকলে অলস ফেলে রাখলে ৪০ বছরে মূলধন শেষ হয়ে যাবে। ফলে পুঁজিপতিরা অর্থ অলস না রেখে উৎপাদনশীল ব্যবসায় খাটাতে বাধ্য হয়, যা ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে।
৩. অর্থনৈতিক ভারসাম্য ও অপরাধ হ্রাস: ক্ষুধা ও বঞ্চনা মানুষকে চুরি, ছিনতাই ও সমাজবিরোধী কাজে ঠেলে দেয়। যাকাত সামাজিক সুরক্ষা দিয়ে সমাজে নিরাপত্তা ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে।
৪. যাকাতভিত্তিক অর্থসংস্থান বনাম করভিত্তিক অর্থসংস্থান:
প্রচলিত কর ফাঁকি দেওয়া আধুনিক সমাজে স্বাভাবিক ব্যাপার; কিন্তু যাকাত আল্লাহর প্রতি ঈমানী আনুগত্য হওয়ায় মুসলিমরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে তা আদায় করে। এছাড়া করের অর্থ অপচয় ও আমলাতান্ত্রিক ব্যয়ে বিনষ্ট হলেও যাকাতের অর্থ সরাসরি প্রান্তিক গরিবের হাতে পৌঁছায়।
উপসংহার:
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, খলিফা উমর বিন আবদুল আজিজের শাসনামলে যাকাত ব্যবস্থার নিখুঁত প্রয়োগের ফলে গোটা রাষ্ট্রে একজনও যাকাত গ্রহণের মতো দরিদ্র মানুষ খুঁজে পাওয়া যায়নি। আধুনিক বিশ্বে দারিদ্র্যমুক্ত সমাজ গড়তে এই ব্যবস্থা অবিলম্বে পুনর্বহাল করা উচিত।
ইসলামি ব্যাংক কী? বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ইসলামি ব্যাংকিং-এর ভূমিকা আলোচনা কর।
ভূমিকা:
মানবজীবনের নিরাপত্তা ও মর্যাদাপূর্ণ অস্তিত্ব নিশ্চিত করা ইসলামি সমাজ দর্শনের প্রধান স্তম্ভ। সমাজে প্রতিটি মানুষের খাদ্য, চিকিৎসা ও বাসস্থানের গ্যারান্টি থাকাকে ‘সামাজিক নিরাপত্তা’ (Social Security) বলে। একই সাথে ভোগ, সঞ্চয় ও বিনিয়োগ আচরণ কীভাবে একজন মুমিন পরিচালনা করবে, সে বিষয়ে ইসলামের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে।
১. সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের ভূমিকা:
– ১. ব্যক্তির ভূমিকা: মাতা-পিতা ও নিকটাত্মীয়দের ভরণপোষণ নিশ্চিত করা ব্যক্তির ওপর ফরজ (নাফাক্বা)। সামর্থ্যবান ব্যক্তির প্রতিবেশীর ক্ষুধায় পাশে দাঁড়ানো বাধ্যতামূলক। নবীজী (সা.) ইরশাদ করেন: “সে ব্যক্তি মুমিন নয় যে নিজে পেট পুরে খায় অথচ তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে।”
– ২. সমাজের ভূমিকা: ওয়াকফ (Waqf) প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, সামাজিক কল্যাণ তহবিল তৈরি এবং অনাথ ও বিধবাদের সুরক্ষায় ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ নেওয়া।
– ৩. রাষ্ট্রের ভূমিকা: বায়তুল মাল থেকে নিয়মিত ভাতা প্রদান, বেকারত্ব ভাতা এবং চিকিৎসা বীমা প্রদান। হযরত উমর (রা.) বলেছিলেন: “ফোরাত নদীর তীরে যদি একটি কুকুরও না খেয়ে মারা যায়, তবে আমি উমর আল্লাহর কাছে দায়ী থাকব!”
২. ইসলামের দৃষ্টিতে ভোগ, সঞ্চয় ও বিনিয়োগ আচরণ:
১. ভোগ আচরণ: ইসলাম মধ্যমপন্থা অনুসরণের নির্দেশ দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَالَّذِينَ إِذَا أَنفَقُوا لَمْ يُسْرِفُوا وَلَمْ يَقْتُرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذَٰلِكَ قَوَامًا
“আর যারা ব্যয়ের ক্ষেত্রে অপচয়ও করে না এবং কৃপণতাও করে না; বরং তারা এই দুইয়ের মাঝে মধ্যপন্থা অবলম্বন করে।” (সূরা আল-ফুরকান: ৬৭)।
২. সঞ্চয় আচরণ: ভবিষ্যৎ পরিবারের সুরক্ষায় সঞ্চয় বৈধ; কিন্তু সম্পদ কুক্ষিগত করে রাখা (কাঞ্জ/كنز) হারাম। সূরা তওবার ৩৪ আয়াতে যারা স্বর্ণ-রৌপ্য জমা করে রাখে তাদের জাহান্নামের ভয়াবহ শাস্তির হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
৩. বিনিয়োগ আচরণ: সঞ্চিত অর্থ সুদমুক্ত লাভ-লোকসানের অংশীদারিত্বে (মুশারাকা ও মুদারাবা) বিনিয়োগ করে কলকারখানা গড়ে তোলা এবং হালাল জীবিকা সৃষ্টি করা।
উপসংহার:
সামাজিক নিরাপত্তা ও সুষম বিনিয়োগের এই সংমিশ্রণই ইসলামকে চিরন্তন শান্তির ধর্মে রূপ দিয়েছে।
সামাজিক নিরাপত্তা বলতে কী বুঝ? ইসলামে সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের ভূমিকা আলোচনা কর।
ভূমিকা:
মানবজীবনের নিরাপত্তা ও মর্যাদাপূর্ণ অস্তিত্ব নিশ্চিত করা ইসলামি সমাজ দর্শনের প্রধান স্তম্ভ। সমাজে প্রতিটি মানুষের খাদ্য, চিকিৎসা ও বাসস্থানের গ্যারান্টি থাকাকে ‘সামাজিক নিরাপত্তা’ (Social Security) বলে। একই সাথে ভোগ, সঞ্চয় ও বিনিয়োগ আচরণ কীভাবে একজন মুমিন পরিচালনা করবে, সে বিষয়ে ইসলামের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে।
১. সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের ভূমিকা:
– ১. ব্যক্তির ভূমিকা: মাতা-পিতা ও নিকটাত্মীয়দের ভরণপোষণ নিশ্চিত করা ব্যক্তির ওপর ফরজ (নাফাক্বা)। সামর্থ্যবান ব্যক্তির প্রতিবেশীর ক্ষুধায় পাশে দাঁড়ানো বাধ্যতামূলক। নবীজী (সা.) ইরশাদ করেন: “সে ব্যক্তি মুমিন নয় যে নিজে পেট পুরে খায় অথচ তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে।”
– ২. সমাজের ভূমিকা: ওয়াকফ (Waqf) প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, সামাজিক কল্যাণ তহবিল তৈরি এবং অনাথ ও বিধবাদের সুরক্ষায় ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ নেওয়া।
– ৩. রাষ্ট্রের ভূমিকা: বায়তুল মাল থেকে নিয়মিত ভাতা প্রদান, বেকারত্ব ভাতা এবং চিকিৎসা বীমা প্রদান। হযরত উমর (রা.) বলেছিলেন: “ফোরাত নদীর তীরে যদি একটি কুকুরও না খেয়ে মারা যায়, তবে আমি উমর আল্লাহর কাছে দায়ী থাকব!”
২. ইসলামের দৃষ্টিতে ভোগ, সঞ্চয় ও বিনিয়োগ আচরণ:
১. ভোগ আচরণ: ইসলাম মধ্যমপন্থা অনুসরণের নির্দেশ দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَالَّذِينَ إِذَا أَنفَقُوا لَمْ يُسْرِفُوا وَلَمْ يَقْتُرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذَٰلِكَ قَوَامًا
“আর যারা ব্যয়ের ক্ষেত্রে অপচয়ও করে না এবং কৃপণতাও করে না; বরং তারা এই দুইয়ের মাঝে মধ্যপন্থা অবলম্বন করে।” (সূরা আল-ফুরকান: ৬৭)।
২. সঞ্চয় আচরণ: ভবিষ্যৎ পরিবারের সুরক্ষায় সঞ্চয় বৈধ; কিন্তু সম্পদ কুক্ষিগত করে রাখা (কাঞ্জ/كنز) হারাম। সূরা তওবার ৩৪ আয়াতে যারা স্বর্ণ-রৌপ্য জমা করে রাখে তাদের জাহান্নামের ভয়াবহ শাস্তির হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
৩. বিনিয়োগ আচরণ: সঞ্চিত অর্থ সুদমুক্ত লাভ-লোকসানের অংশীদারিত্বে (মুশারাকা ও মুদারাবা) বিনিয়োগ করে কলকারখানা গড়ে তোলা এবং হালাল জীবিকা সৃষ্টি করা।
উপসংহার:
সামাজিক নিরাপত্তা ও সুষম বিনিয়োগের এই সংমিশ্রণই ইসলামকে চিরন্তন শান্তির ধর্মে রূপ দিয়েছে।
টীকা লিখ (যে কোনো দুটি): (ক) মুদ্রানীতি; (খ) প্রকৃত জি.এন.পি; (গ) বায়তুল মাল; (ঘ) উশর।
নিচে নির্বাচিত গুরুত্বপূর্ণ সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রত্যয়সমূহের গভীর তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো:
(ক) প্রকৃত জি.এন.পি. (Real GNP):
কোনো নির্দিষ্ট আর্থিক বছরে দেশে উৎপাদিত মোট জাতীয় উৎপাদনকে (GNP) যখন চলতি বাজারমূল্যের (Current Price) পরিবর্তে কোনো নির্দিষ্ট ভিত্তি বছরের স্থির মূল্যে (Constant/Base Year Price) পরিমাপ করা হয়, তখন তাকে ‘প্রকৃত জি.এন.পি.’ বলে। এটি নিছক মুদ্রাস্ফীতিজনিত বিভ্রান্তিকর আর্থিক প্রবৃদ্ধির কৃত্রিম হিসাব দূর করে দেশের প্রকৃত বস্তুগত দ্রব্য ও সেবার বাস্তব প্রবৃদ্ধি পরিমাপ করে। সূত্র: Real GNP = (Nominal GNP / Price Deflator) × ১০০। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার সঠিক প্রতিফলন ঘটে।
(খ) সরকারি বাজেট (Government Budget):
বাজেট হলো একটি নির্দিষ্ট আর্থিক বছরে সরকারের সম্ভাব্য রাজস্ব আয় ও উন্নয়ন-অনুন্নয়ন ব্যয়ের একটি সাংবিধানিক পূর্বপরিকল্পিত আর্থিক দলিল। বাজেট প্রধানত তিন প্রকার: ১. সুষম বাজেট (আয় = ব্যয়); ২. উদ্বৃত্ত বাজেট (আয় > ব্যয়); এবং ৩. ঘাটতি বাজেট (ব্যয় > আয়)। আধুনিক উন্নয়নশীল বিশ্বে ঘাটতি বাজেট ব্যাপকভাবে দেখা গেলেও অতিরিক্ত কাগজি মুদ্রা ছাপিয়ে মুদ্রাস্ফীতি সৃষ্টি করা ইসলামে অপছন্দনীয়। ইসলামি রাষ্ট্র বাস্তব সম্পদভিত্তিক ভারসাম্যপূর্ণ বা উদ্বৃত্ত বাজেটকে অগ্রাধিকার দেয় এবং সামরিক বা প্রশাসনিক বিলাসিতার চেয়ে সাধারণ নাগরিকের সামাজিক সুরক্ষায় সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখে।
(গ) মিরাস বা ইসলামি উত্তরাধিকার আইন (Mirath):
পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নিসায় আল্লাহ তাআলা মৃত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সম্পত্তির যে অলঙ্ঘনীয় ও বিস্তারিত বণ্টনব্যবস্থা নির্ধারণ করেছেন তাকে ‘মিরাস’ বলে। এটি ইসলামি অর্থব্যবস্থায় সম্পদ বিকেন্দ্রীকরণের সবচেয়ে শক্তিশালী সামাজিক হাতিয়ার। ধনতান্ত্রিক বিশ্বের মতো সম্পদ জ্যেষ্ঠ সন্তান বা একক পুঁজিপতির হাতে পুঞ্জীভূত না হয়ে পিতা, মাতা, স্ত্রী, পুত্র ও কন্যাদের মধ্যে সুনির্দিষ্ট অনুপাতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বণ্টিত হয়ে সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়ে।
(ঘ) দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র (Vicious Circle of Poverty):
অর্থনীতিবিদ র্যাগনার নার্কসের মতে অনুন্নত দেশগুলোর দারিদ্র্য একটি চক্রাকার ঘূর্ণির মতো। মূল বক্তব্য: কম আয়ের কারণে মানুষের সঞ্চয় কম হয়; সঞ্চয় কম হলে বিনিয়োগ কমে যায়; বিনিয়োগের অভাবে মূলধনের স্বল্পতা ও উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায়; যার ফলে পুনরায় মাথাপিছু আয় কমে যায় এবং জাতি আজীবন দারিদ্র্যের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত থাকে। ইসলামি অর্থনীতি যাকাত, উশর, ওয়াকফ এবং সুদমুক্ত করযে হাসানার মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর হাতে এককালীন পর্যাপ্ত মূলধন সরবরাহ করে এই দুষ্টচক্রকে চিরতরে ছিন্ন করে।
(ঙ) উশর ও খারাজ (Ushr & Kharaj):
উশর হলো মুসলিম কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের ওপর ধার্যকৃত বাধ্যতামূলক যাকাত (বৃষ্টির সেচে ১০%, কৃত্রিম সেচে ৫%)। আর খারাজ হলো বিজিত অঞ্চলের অমুসলিমদের জমির ওপর ধার্যকৃত ন্যায়সংগত রাষ্ট্রীয় ভূমি রাজস্ব। উভয় উৎস ইসলামি রাষ্ট্রের বায়তুল মালের প্রধান কৃষি রাজস্ব হিসেবে গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী রাখে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
ফাযিল ৩য় বর্ষ ইসলামি অর্থনীতি ২য় পত্রের মূল বিষয়বস্তু কী?
ইসলামি অর্থনীতি ২য় পত্রের (বিষয় কোড: ৪৩৮) মূল সিলেবাস সামষ্টিক অর্থনীতি (Macroeconomics) এবং ইসলামি সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর রচিত। এতে জাতীয় আয়, মুদ্রাস্ফীতি, যাকাত ও উশর, বায়তুল মাল, আয় বণ্টন, রাজস্ব নীতি ও কর ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত।
ফাযিল পরীক্ষায় ২০ নম্বরের প্রশ্নের আদর্শ উত্তরের পরিধি কতটুকু হওয়া উচিত?
ডিগ্রি ও অনার্স মানবণ্টন অনুযায়ী প্রতিটি ২০ নম্বরের প্রশ্নের জন্য ভূমিকা, সামষ্টিক তত্ত্ব ও সংজ্ঞা, কুরআন-সুন্নাহর আরবি দলিল ও অর্থ, ৫-৮টি স্পষ্ট বিশ্লেষণী পয়েন্ট, তুলনামূলক ছক এবং উপসংহার সহযোগে কমপক্ষে ৩৫০ থেকে ৫০০+ শব্দে উত্তর লেখা আবশ্যক।
জাতীয় আয় পরিমাপের প্রধান তিনটি পদ্ধতি কী কী?
জাতীয় আয় পরিমাপের মৌলিক ৩টি পদ্ধতি হলো: ১. উৎপাদন পদ্ধতি (Output Method), ২. আয় পদ্ধতি (Income Method) এবং ৩. ব্যয় পদ্ধতি (Expenditure Method)।
ইসলামে সম্পদ সুষম বণ্টনের প্রধান কুরআনী নীতি কী?
সূরা আল-হাশরের ৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন: ‘যাতে ধন-সম্পদ কেবল তোমাদের ধনীদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়।’ এ লক্ষ্যে ইসলাম একদিকে যাকাত ও মিরাস প্রবর্তন করেছে, অন্যদিকে সুদ ও মজুতদারি নিষিদ্ধ করেছে।
ইসলামি রাষ্ট্রে বায়তুল মালের আয়ের প্রধান খাতগুলো কী কী?
বায়তুল মালের আয়ের প্রধান উৎসগুলো হলো: যাকাত, উশর (ফসলি কর), জিযিয়া (নিরাপত্তা কর), খারাজ (ভূমি রাজস্ব), খুমুস (যুদ্ধলব্ধ ও খনিজ সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ) এবং আশুর (বাণিজ্য শুল্ক)।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলো জাতীয় উৎপাদন ও আয়ের নিছক সংখ্যাতাত্ত্বিক বা পরিমাণগত বৃদ্ধি; আর অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলো প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি সমাজের কাঠামোগত রূপান্তর এবং দারিদ্র্য ও বৈষম্য দূর করে মানুষের জীবনযাত্রার গুণগত মানোন্নয়ন।

