ইসলামি অর্থনীতি ৩য় পত্র (Islamic Economics 3rd Paper) – 439, ইসলামি অর্থনীতি – ফাযিল পাস ৩য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২২

StudyBoi StudyBoi
September 26, 2026
আপডেট: September 27, 2026
৫৬ মিনিট পড়ার সময়
২ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন

ফাযিল (স্নাতক) পাস ৩য় বর্ষ পরীক্ষা – ২০২২
ইসলামি অর্থনীতি (ঐচ্ছিক) তৃতীয় পত্র
বিষয় কোড: ৪৩৯
সময় : ৩ ঘণ্টা | পূর্ণমান : ১০০
[দ্রষ্টব্য : ডান পাশের সংখ্যা প্রশ্নের পূর্ণমান জ্ঞাপক। যে-কোনো পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দাও।]

ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ফাযিল (স্নাতক) পাস ৩য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২২-এর ইসলামি অর্থনীতি ৩য় পত্র (বিষয় কোড: ৪৩৯) [ইসলামি ব্যাংকিং, বিমা ও মুদ্রা ব্যবস্থা] পরীক্ষার মূল প্রশ্নপত্রের প্রতিটি প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ ও প্রামাণ্য অ্যাকাডেমিক সমাধান নিচে দেওয়া হলো। ফাযিল ডিগ্রি ও অনার্স শ্রেণির ২০ নম্বরের রচনামূলক প্রশ্নের উচ্চমান বজায় রেখে ভূমিকা, ব্যাংকিং ও আর্থিক তত্ত্ব, কুরআন ও সুন্নাহর দলিল, বিশ্লেষণী তুলনামূলক ছক/পয়েন্ট এবং উপসংহার সহযোগে প্রতিটি উত্তর প্রস্তুত করা হয়েছে।

১। ব্যাংক ব্যবস্থার ইতিহাস ব্যাখ্যা কর। কীভাবে ব্যাংক ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটে? তা বিশ্লেষণ কর।

[মান: ১০ + ১০ = ২০]

ভূমিকা:
আধুনিক সভ্যতার আর্থিক লেনদেনের কেন্দ্রবিন্দু হলো ব্যাংক ব্যবস্থা। ব্যাংক ব্যবস্থা একদিনে বর্তমান এই ডিজিটাল ও বহুজাতিক রূপ লাভ করেনি; বরং এর পেছনে রয়েছে কয়েক সহস্রাব্দের দীর্ঘ ঐতিহাসিক বিবর্তন। প্রাচীন যুগের স্বর্ণকার, মহাজন ও ব্যবসায়ীদের টেবিল থেকে শুরু করে আধুনিক ইলেকট্রনিক ও ইসলামি ব্যাংকিংয়ের বিকাশ মানব ইতিহাসের এক চমকপ্রদ অধ্যায়।

১. ব্যাংক ব্যবস্থার ঐতিহাসিক পটভূমি ও উৎপত্তি:
‘Bank’ শব্দের উৎপত্তি নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে একাধিক মত রয়েছে:
১. ইতালীয় শব্দ ‘Banco’ থেকে এসেছে, যার অর্থ কাঠের লম্বা বেঞ্চ বা টেবিল। প্রাচীনকালে ইতালির লোম্বার্ডির ইহুদি ব্যবসায়ীরা বাজারে বেঞ্চে বসে বিভিন্ন দেশের মুদ্রা বিনিময় করত। কোনো ব্যবসায়ী ঋণ শোধে ব্যর্থ হলে তার বেঞ্চ ভেঙে দেওয়া হতো, যেখান থেকে ‘Bankrupt’ বা দেউলিয়া শব্দের উৎপত্তি।
২. জার্মান শব্দ ‘Bank’ বা ইতালীয় ‘Monte’ থেকে এসেছে, যার অর্থ যৌথ তহবিল বা স্তূপীকৃত সম্পদ।

২. কীভাবে আধুনিক ব্যাংক ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটে? (বিবর্তনের প্রধান স্তরসমূহ):
১. প্রাচীন যুগ (ব্যবিলন, গ্রিস ও রোম): খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ অব্দে ব্যবিলনের উপাসনালয় (Temple of Babylon)-এ পুরোহিতদের কাছে মানুষ নিরাপদে মূল্যবান সোনা-রূপা জমা রাখত। রোমান সাম্রাজ্যে বেসরকারি পর্যায়ে অর্থ ঋণ দেওয়ার প্রথা চালু হয়।
২. মধ্যযুগীয় স্বর্ণকার ও মহাজনদের ভূমিকা: ইংল্যান্ডে সতেরো শতকে ধনী ব্যক্তিরা তাদের স্বর্ণ নিরাপত্তার জন্য লন্ডনের স্বর্ণকারদের (Goldsmiths) কাছে জমা রাখত। স্বর্ণকাররা জমা রাখার রসিদ দিত। পরবর্তীতে দেখা গেল এই রসিদগুলোই বাজারে মুদ্রা হিসেবে বিনিময় হচ্ছে এবং সকল লোক একসাথে সোনা ফেরত চাইতে আসে না। ফলে স্বর্ণকাররা এই অলস সোনার বিপরীতে অতিরিক্ত কাগুজে রসিদ তৈরি করে সুদে ঋণ দেওয়া শুরু করে, যা আধুনিক বাণিজ্যিক ব্যাংকিংয়ের জন্ম দেয়।
৩. প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকের উত্থান: বিশ্বের প্রথম আনুষ্ঠানিক ব্যাংক হিসেবে ১১৪৮ সালে ভেনিস ব্যাংক (Bank of Venice) প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৬০৯ সালে আমস্টারডাম ব্যাংক এবং ১৬৯৪ সালে বিশ্বের প্রথম আধুনিক কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ব্যাংক অব ইংল্যান্ড’ প্রতিষ্ঠিত হয়।
৪. ইসলামি ব্যাংকিংয়ের বিপ্লব: বিশ শতকের সত্তরের দশকে দুবাই ইসলামিক ব্যাংক (১৯৭৫) এবং আইডিবি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আধুনিক ব্যাংক ব্যবস্থা সুদের বিকল্প হিসেবে এক নতুন মানবিক রূপ লাভ করে।

উপসংহার:
ব্যাংক ব্যবস্থার এই ঐতিহাসিক বিবর্তন প্রমাণ করে যে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের প্রয়োজনেই গড়ে উঠেছে। আধুনিক যুগে একে সুদমুক্ত মানবিক রূপ দেওয়াই সভ্যতার পরবর্তী সার্থকতা।

২। ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) কী? মুসলিম বিশ্বের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংকের ভূমিকা আলোচনা কর।

[মান: ৫ + ১৫ = ২০]

ভূমিকা:
মুসলিম উম্মাহর অর্থনৈতিক মুক্তি, পারস্পরিক সংহতি এবং অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব অর্জনের লক্ষ্যে ১৯৭৩ সালে ওআইসি (OIC) অর্থমন্ত্রীদের সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্তের আলোকে ১৯৭৫ সালে সৌদি আরবের জেদ্দায় প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংক (Islamic Development Bank – IDB)। এটি বিশ্বের ৫৭টি মুসলিম দেশের সমন্বয়ে গঠিত সর্ববৃহৎ বহুপাক্ষিক সুদমুক্ত আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ব্যাংক।

১. ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংকের মূল পরিচয় ও উদ্দেশ্য:
আইডিবি শরিয়তের নীতিমালার ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এর মূল উদ্দেশ্য হলো মুসলিম সদস্য দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা, দারিদ্র্য বিমোচন করা, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্য বৃদ্ধি করা এবং সদস্য দেশগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নে সুদমুক্ত আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করা।

২. মুসলিম বিশ্বের অর্থনৈতিক উন্নয়নে আইডিবির যুগান্তকারী ভূমিকা:
১. অবকাঠামো নির্মাণে দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়ন: সদস্য দেশগুলোতে সড়ক, মহাসড়ক, বন্দর, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, বিমানবন্দর ও সেচ প্রকল্প নির্মাণে আইডিবি সুকুক বন্ড ও ইজারার মাধ্যমে শত শত কোটি ডলারের সুদমুক্ত বিনিয়োগ সরবরাহ করে।
২. দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থান: উন্নয়নশীল মুসলিম দেশগুলোর পল্লী অঞ্চলে কৃষির আধুনিকায়ন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরি এবং দারিদ্র্য বিমোচন তহবিলের মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন করছে।
৩. আন্তঃইসলামি বাণিজ্যের বিস্তার: আইডিবির অধীনস্থ ‘International Islamic Trade Finance Corporation (ITFC)’-এর মাধ্যমে মুসলিম দেশগুলোর নিজেদের মধ্যকার আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে (যেমন তেল ও সার আমদানি অর্থায়ন)।
৪. শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন: বিভিন্ন সদস্য দেশের মেধাবী অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য আন্তর্জাতিক স্কলারশিপ প্রদান এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষণায় বিপুল অনুদান বরাদ্দ করে।
৫. জরুরি মানবিক ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা: যুদ্ধবিধ্বস্ত বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মুসলিম দেশসমূহে (যেমন ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান বা বাংলাদেশে বন্যা ও রোহিঙ্গা সংকটে) আইডিবি বিশেষ তহবিল গঠন করে সরাসরি মানবিক সহায়তা প্রদান করে।
৬. বাংলাদেশে আইডিবির ভূমিকা: আইডিবি বাংলাদেশে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র (সিডর শেল্টার), কৃষি উন্নয়ন এবং ইসলামি ব্যাংকগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশে অন্যতম প্রধান আন্তর্জাতিক সহযোগী।

উপসংহার:
বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের চড়া সুদের দাসত্ব থেকে মুসলিম বিশ্বকে মুক্ত করতে ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংক এক আলোকবর্তিকা। এর সক্ষমতা বৃদ্ধি উম্মাহর অর্থনৈতিক ঐক্যের প্রতীক।

৩। ব্যবসা সম্পর্কে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি কী? কোরআন-হাদিসের আলোকে ব্যবসার গুরুত্ব আলোচনা কর।

[মান: ৮ + ১২ = ২০]

ভূমিকা:
মানবজীবনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য সর্বাধিক প্রাচীন, সার্বজনীন এবং জীবিকা উপার্জনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। যেখানে পুঁজিবাদ ব্যবসাকে নিছক প্রতারণামূলক মুনাফা অর্জনের যুদ্ধক্ষেত্র মনে করে, ইসলাম সেখানে ব্যবসাকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইবাদত এবং সামাজিক খেদমতের মর্যাদায় উন্নীত করেছে। কুরআনুল কারীম ও হাদিস শরীফে ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর যেরূপ ব্যাপক দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তা অন্য কোনো ধর্মে দৃষ্ট হয় না।

১. ব্যবসা সম্পর্কে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি:
১. ব্যবসার মৌলিক বৈধতা ও হালাল ঘোষণা: আল্লাহ তাআলা ব্যবসাকে মানবজাতির জন্য শর্তহীনভাবে হালাল করেছেন এবং সুদের সকল দরজাকে রুদ্ধ করে দিয়েছেন:
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
“আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম।” (সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)।
২. পারস্পরিক সন্তুষ্টির চুক্তি: ইসলামে ব্যবসা কোনো জবরদস্তিমূলক লেনদেন নয়; এটি দুই পক্ষের পূর্ণ আন্তরিক সম্মতির ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: “তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না, তবে পারস্পরিক সন্তুষ্টির ভিত্তিতে ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে হলে তা বৈধ।” (সূরা আন-নিসা: ২৯)।
৩. নৈতিক সততার মাপকাঠি: ওজনে কারচুপি না করা, মালে ভেজাল না মেশানো, মিথ্যা শপথ করে পণ্য বিক্রি না করা এবং গোপন ত্রুটি প্রকাশ করে দেওয়া ব্যবসার ইসলামি মূলনীতি।

২. কুরআন ও হাদিসের আলোকে ব্যবসার অপার গুরুত্ব ও ফযিলত:
১. নবী ও রাসূলগণের সুন্নত: বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে একজন অত্যন্ত সফল ও আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতনামা সৎ ব্যবসায়ী ছিলেন। তাঁর সততার কারণেই তিনি ‘আল-আমিন’ খেতাবে ভূষিত হয়েছিলেন। ইসলামের প্রথম চার খলিফাসহ অধিকাংশ বিশিষ্ট সাহাবী ব্যবসায়ী ছিলেন।
২. পরকালে নবী ও শহীদগণের সাথে মর্যাদা: সৎ ব্যবসায়ীদের পরকালীন মর্যাদা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা.) এক ঐতিহাসিক সুসংবাদ দিয়ে ঘোষণা করেছেন:
التَّاجِرُ الصَّدُوقُ الأَمِينُ مَعَ النَّبِيِّينَ وَالصِّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاءِ
“সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন নবীগণ, সিদ্দিকীন ও শহীদগণের সাথে অবস্থান করবেন।” (সুনানে তিরমিযী)।
৩. জীবিকার সিংহভাগ ব্যবসায় নিহিত: হাদিস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, “তোমরা ব্যবসা-বাণিজ্য করো; কারণ জীবিকার দশটি ভাগের নয়টি ভাগই নিহিত রয়েছে ব্যবসার মধ্যে।”
৪. মানবতার সেবা ও উম্মাহর অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব: ব্যবসা পণ্যের অভাব দূর করে, দেশীয় পণ্যের বাজার সৃষ্টি করে এবং দেশকে পরনির্ভরশীলতা থেকে রক্ষা করে।

উপসংহার:
ইসলামে সততার সাথে ব্যবসা পরিচালনা করা একটি চলমান জিহাদ ও অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইবাদত। ব্যবসায়ীরা যদি নববী আদর্শে ব্যবসা পরিচালনা করেন তবে বিশ্ব অর্থনীতি থেকে শোষণ ও সংকট চিরতরে নির্মূল হবে।

৪। মুনাফা ও সুদের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ কর। ‘রিবা আল ফদল’ ও ‘রিবা আল নাসিয়া’ ব্যাখ্যা কর।

[মান: ১০ + ১০ = ২০]

ভূমিকা:
ইসলামি আর্থিক দর্শনের মূল ভিত্তিই দাঁড়িয়ে আছে সুদ (Interest/Riba) এবং মুনাফা (Profit)-এর সুনির্দিষ্ট পার্থক্যের ওপর। পুঁজিবাদী অর্থনীতিবিদরা বিভ্রান্তি ছড়িয়ে সুদ ও মুনাফাকে এক মনে করলেও ইসলামি শরীয়ত এদের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য নির্দেশ করেছে। সুদ হলো অর্থনৈতিক শোষণের হাতিয়ার, পক্ষান্তরে মুনাফা হলো মেধা, শ্রম ও ঝুঁকি গ্রহণের ইনসাফপূর্ণ প্রতিদান।

১. মুনাফা ও সুদের মৌলিক পার্থক্যসমূহ:

পার্থক্যসূচক ক্ষেত্র সুদ (রিবা / Interest) মুনাফা (Profit)
১. শরীয়তের বিধান কুরআন ও সুন্নাহর অকাট্য দলিলে সম্পূর্ণ হারাম ও কবিরা গুনাহ। ইসলামে সম্পূর্ণ হালাল, পবিত্র ও উৎসাহিত ব্যবসা।
২. ঝুঁকির উপস্থিতি পুঁজির মালিক কোনো ব্যবসায়িক ঝুঁকি বা লোকসানের দায় নেয় না; নির্দিষ্ট হারে আয় নিশ্চিত। বাস্তব ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা বিদ্যমান; লাভ ও লোকসান উভয় সম্ভাবনা থাকে।
৩. আয়ের ভিত্তি নিছক সময় অতিবাহিত হওয়া এবং ঋণের অঙ্কের ওপর অর্থ বৃদ্ধি পায়। শারীরিক ও মানসিক শ্রম, মেধা এবং উৎপাদনশীল পণ্যের রূপান্তরের ফল।
৪. সামাজিক প্রভাব গরিবকে আরও নিঃস্ব করে এবং সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য ও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে। উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করে এবং সম্পদের সুষম পুনর্বণ্টন ঘটায়।

২. ‘রিবা আল ফদল’ ও ‘রিবা আল নাসিয়া’র প্রামাণ্য ব্যাখ্যা:
শরিয়তের পরিভাষায় সুদকে প্রধানত দুটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়:
১. রিবা আল ফদল (رِبا الفضل – হস্তগত বিনিময়ে উদ্বৃত্ত সুদ):
একই জাতীয় সমজাতীয় জিনিস কম-বেশ করে তাৎক্ষণিক বিনিময় করার ফলে যে অতিরিক্ত অংশ গ্রহণ করা হয়, তাকে রিবা আল ফদল বলে। রাসূলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন: “সোনার বদলে সোনা, রূপার বদলে রূপা, গমের বদলে গম, যবের বদলে যব, খেজুরের বদলে খেজুর এবং লবণের বদলে লবণ—সমান সমান ও হাতে হাতে বিনিময় করতে হবে। যে ব্যক্তি অতিরিক্ত দেবে বা নেবে সে সুদের কারবার করল।” (সহীহ মুসলিম)। যেমন ১ কেজি ভালো খেজুরের বিনিময়ে দেড় কেজি সাধারণ খেজুর নেওয়া রিবা আল ফদল।
২. রিবা আল নাসিয়া (رِبا النَّسِيئة – বাকির বা সময়ের কারণে আরোপিত সুদ):
কোনো ঋণ পরিশোধে নির্দিষ্ট সময়ের বিলম্ব বা অবকাশ দেওয়ার শর্তে মূলধনের ওপর পূর্বনির্ধারিত যে অতিরিক্ত অর্থ ধার্য করা হয়, তাকে রিবা আল নাসিয়া বলে। জাহেলী যুগে আরবরা ঋণ দিয়ে বলত—’ঋণ শোধ করো অথবা সময় বাড়িয়ে সুদ বৃদ্ধি করো।’ আধুনিক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো যে সুদ আদায় করে তা মূলত রিবা আল নাসিয়া, যা পবিত্র কুরআনে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় হারাম করা হয়েছে।

উপসংহার:
মুনাফা অর্থনীতিকে প্রাণবন্ত রাখে এবং সুদ অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেয়। সুদের এই সূক্ষ্ম প্রকারভেদগুলো অনুধাবন করে আধুনিক ব্যাংকিংকে সুদমুক্ত ধারায় পরিচালনা করা মুসলিম উম্মাহর ঈমানি দায়িত্ব।

৫। ইসলামি ব্যাংকের সংজ্ঞা দাও। ইসলামি ব্যাংকের কার্যাবলি আলোচনা কর।

[মান: ৫ + ১৫ = ২০]

ভূমিকা:
আধুনিক বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্যাংকিং ব্যবস্থা ব্যতীত কোনো বাণিজ্য বা উৎপাদন কল্পনা করা যায় না। কিন্তু প্রচলিত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সুদের ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় তা শোষণের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। এই সমস্যার শাশ্বত ও বৈজ্ঞানিক বিকল্প হিসেবে বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে জন্ম নেয় ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থা। এটি শরিয়তের অনুশাসন মেনে সমাজের আর্থিক চাহিদা পূরণের এক অনন্য প্রাতিষ্ঠানিক রূপ।

১. ইসলামি ব্যাংকের প্রামাণ্য সংজ্ঞা:
ইসলামি ব্যাংক হলো এমন একটি আর্থিক মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান, যার যাবতীয় উদ্দেশ্য, মূলনীতি, তহবিল সংগ্রহ, আমানত গ্রহণ এবং অর্থায়ন ও বিনিয়োগ কার্যক্রম ইসলামি শরীয়তের বিধান অনুযায়ী পরিচালিত হয় এবং যা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সকল ধরনের সুদ (রিবা), জুয়া (কিমার) ও অনিশ্চয়তা (গারার) সম্পূর্ণ বর্জন করে পরিচালিত হয়।

২. ইসলামি ব্যাংকের প্রধান প্রধান কার্যাবলি:
১. আমানত সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা:
– আল-ওয়াদিয়াহ চলতি হিসাব: আমানতকারীর অর্থ নিরাপদে সংরক্ষণ করা এবং চাহিবামাত্র ফেরত দেওয়ার গ্যারান্টি প্রদান।
– মুদারাবা সঞ্চয়ী ও মেয়াদি হিসাব: গ্রাহক মূলধন জোগানদাতা (সাহেবুল মাল) এবং ব্যাংক বিনিয়োগকারী হিসেবে কাজ করে ব্যবসায় অর্জিত মুনাফা পূর্বনির্ধারিত হারে বণ্টন করে।
২. সুদমুক্ত বিনিয়োগ পরিচালনা:
– লাভ-লোকসান অংশীদারিত্ব: মুদারাবা ও মুশারাকার মাধ্যমে প্রকৃত উদ্যোক্তাদের সাথে ঝুঁকি নিয়ে বিনিয়োগ করা।
– পণ্য ও সেবা ক্রয়-বিক্রয় অর্থায়ন: বাই-মুরাবাহা (লাভের হার জানিয়ে বিক্রি), বাই-মুয়াজ্জাল (বাকিতে বিক্রয়), বাই-সালাম (অগ্রিম ক্রয়) এবং ইজারা (ভাড়া ও ইজারা চুক্তি) পদ্ধতিতে অর্থায়ন করা।
৩. বৈদেশিক বাণিজ্য ও রেমিট্যান্স সেবা: হালাল পণ্যের আমদানি-রপ্তানির জন্য এলসি (Letter of Credit) খোলা এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থ নিরাপদে দেশে স্থানান্তর করা।
৪. সামাজিক ও কল্যাণমুখী কার্যক্রম (Socio-Economic Welfare): যাকাত ফান্ড ও সাদাকাহ ফান্ড পরিচালনা করা, বেকার যুবকদের জন্য করযে হাসানা (সুদমুক্ত ঋণ) প্রদান এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে অনুদান প্রদান করা।
৫. শরী’আহ সুপারভাইজরি বোর্ড পরিচালনা: ব্যাংকের প্রতিটি লেনদেন শতভাগ হালাল হচ্ছে কিনা তা নিশ্চিত করতে প্রখ্যাত ফকীহ ও অর্থনীতিবিদদের সমন্বয়ে গঠিত স্বাধীন শরীয়াহ বোর্ড কর্তৃক নিয়মিত অডিট পরিচালনা।

উপসংহার:
ইসলামি ব্যাংক কেবল গতানুগতিক ব্যাংক নয়; এটি সামাজিক সুবিচার ও অর্থনৈতিক কল্যাণের অন্যতম দুর্গ। এর সঠিক প্রয়োগ জাতীয় সমৃদ্ধির গ্যারান্টি দেয়।

৬। বাই-মুরাবাহ, বাই-সালাম, বাই-মুয়াজ্জাল-ধারণাগুলো ব্যাখ্যা কর। বাই-মুরাবাহার ক্ষেত্রে পালনীয় রুকন বা শর্তগুলো আলোচনা কর।

[মান: ১২ + ৮ = ২০]

ভূমিকা:
ইসলামি ব্যাংকিং মূলত ক্রয়-বিক্রয় এবং সেবামূলক অংশীদারিত্বের এক সার্বিক রূপ। প্রচলিত ব্যাংকের মতো ইসলামি ব্যাংক নগদ টাকার ব্যবসা করে না; বরং গ্রাহকের বাস্তব প্রয়োজনীয় পণ্য সামগ্রী কেনাবেচার মাধ্যমে অর্থায়ন করে। এই লেনদেনে সর্বাধিক ব্যবহৃত তিনটি মৌলিক ক্রয়-বিক্রয় পদ্ধতি হলো বাই-মুরাবাহা, বাই-সালাম এবং বাই-মুয়াজ্জাল।

১. তিনটি পদ্ধতির প্রামাণ্য ধারণা:
১. বাই-মুরাবাহা (Bai Murabaha): যে ক্রয়-বিক্রয়ে বিক্রেতা পণ্যের ক্রয়মূল্য বা খরচ স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে এবং তার ওপর নির্দিষ্ট পরিমাণ পূর্বসম্মত মুনাফা যোগ করে পণ্য বিক্রি করে, তাকে মুরাবাহা বলে (Cost-plus-Profit Sale)।
২. বাই-সালাম (Bai Salam): যে চুক্তিতে ক্রেতা পণ্যের মূল্য তাৎক্ষণিকভাবে সম্পূর্ণ অগ্রিম পরিশোধ করে এবং বিক্রেতা ভবিষ্যতে কোনো নির্দিষ্ট তারিখে নির্ধারিত গুণগত মানসম্পন্ন পণ্য সরবরাহের অঙ্গীকার করে, তাকে বাই-সালাম বলে। এটি মূলত কৃষকদের ফসল উৎপাদনের পূর্বে নগদ অর্থ জোগাতে রাসূলুল্লাহ (সা.) অনুমোদন করেছিলেন।
৩. বাই-মুয়াজ্জাল (Bai Mu’ajjal): যে চুক্তিতে পণ্য অবিলম্বে ক্রেতার নিকট হস্তান্তর করা হয় কিন্তু পণ্যের নির্ধারিত মূল্য ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট মেয়াদে এককালীন বা কিস্তিতে পরিশোধের শর্ত থাকে, তাকে বাই-মুয়াজ্জাল বা বাকিতে বিক্রয় বলে।

২. বাই-মুরাবাহার ক্ষেত্রে পালনীয় রুকন ও শর্তাবলি:
বাই-মুরাবাহা যাতে সুদের ছদ্মবেশে পরিণত না হয়, সেজন্য ফকীহগণ কঠোর শর্তারোপ করেছেন:
১. পণ্য বিদ্যমান ও হালাল হওয়া: চুক্তির সময় পণ্য অস্তিত্বশীল, বৈধ ও মূল্যমানসম্পন্ন হতে হবে।
২. ব্যাংকের মালিকানা ও দখল নিশ্চিতকরণ: গ্রাহকের কাছে বিক্রির পূর্বেই ব্যাংককে অবশ্যই প্রকৃত সরবরাহকারীর কাছ থেকে পণ্যটি কিনে নিজস্ব মালিকানায় ও ঝুঁকিতে নিতে হবে। ব্যাংক কেবল টাকা দিলে এবং গ্রাহক সরাসরি পণ্য কিনলে তা শরীয়াহমতে বাতিল ও সুদে পরিণত হবে।
৩. ক্রয়মূল্য ও খরচের সঠিক ঘোষণা: পণ্য কিনতে কত খরচ হয়েছে এবং ব্যাংক কত টাকা মুনাফা নিচ্ছে তা গ্রাহকের কাছে গোপন না রেখে শতভাগ স্পষ্ট করতে হবে।
৪. নির্ধারিত মূল্যে অটল থাকা: চুক্তির পর কোনো অবস্থাতেই সময় বাড়ার কারণে মূল্য বাড়ানো যাবে না (কারণ সময় বাড়িয়ে টাকা বাড়ানোই সুদ)।

উপসংহার:
বাই-মুরাবাহা, সালাম ও মুয়াজ্জাল ইসলামি ব্যাংকিংয়ের তিনটি স্তম্ভ। শর্তাবলি যথাযথভাবে পালন করলে এই পদ্ধতিগুলো অর্থনীতিকে সুদের ছোবল থেকে শতভাগ পবিত্র রাখতে সক্ষম।

৭। ইসলামি ব্যাংকের বিনিয়োগের প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য ও পদ্ধতিগুলো আলোচনা কর।

[মান: ১০ + ১০ = ২০]

ভূমিকা:
প্রচলিত বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং ইসলামি ব্যাংকের মধ্যে প্রধানতম পার্থক্য প্রতিফলিত হয় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে। প্রচলিত ব্যাংক সুদের বিনিময়ে ঋণ দেয় এবং পণ্যের কোনো দায়িত্ব নেয় না। পক্ষান্তরে ইসলামি ব্যাংক কোনো ঋণদানকারী সংস্থা নয়; বরং এটি পণ্য ক্রয়-বিক্রয় এবং অংশীদারিত্বমূলক বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান। ইসলামি ব্যাংকের বিনিয়োগ পদ্ধতিগুলো বাস্তব অর্থনৈতিক উৎপাদনের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত।

১. ইসলামি ব্যাংকের বিনিয়োগের প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:
১. সুদমুক্ত ও শরীয়াহসম্মত: কোনো বিনিয়োগেই পূর্বনির্ধারিত সুদের চুক্তি থাকতে পারে না এবং কোনো হারাম ব্যবসায় (মদ, জুয়া, তামাক) বিনিয়োগ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
২. বাস্তব সম্পদভিত্তিক (Asset-backed Investment): প্রতিটি বিনিয়োগ লেনদেনের পেছনে একটি বাস্তব পণ্য বা সম্পদের অস্তিত্ব থাকতে হবে; কাল্পনিক বা কাগুজে অর্থ প্রবাহের কোনো স্থান নেই।
৩. ঝুঁকি ও দায়দায়িত্ব গ্রহণ: পণ্য কেনা থেকে শুরু করে গ্রাহকের কাছে হস্তান্তর পর্যন্ত পণ্যের যাবতীয় ঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতির দায় ব্যাংককে বহন করতে হয় (الخراج بالضمان)।
৪. সামাজিক ও জনকল্যাণমুখী অগ্রাধিকার: সমাজের পুষ্টিকর খাদ্য, কৃষি, বাসস্থান ও চিকিৎসা খাতকে বিনিয়োগে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।

২. ইসলামি ব্যাংকের প্রধান প্রধান বিনিয়োগ পদ্ধতিসমূহ:

পদ্ধতির নাম প্রকৃতি ও মূল অর্থায়ন কৌশল ব্যবহারিক ক্ষেত্র
১. বাই-মুরাবাহা (Cost-plus Sale) ব্যাংক গ্রাহকের অনুরোধে পণ্য কিনে ক্রয়মূল্য ও নির্দিষ্ট মুনাফা স্পষ্ট জানিয়ে কিস্তিতে বিক্রি করে। শিল্পের কাঁচামাল ও বাণিজ্যিক পণ্য ক্রয়।
২. বাই-মুয়াজ্জাল (Deferred Payment Sale) নির্দিষ্ট মূল্যে বাকিতে পণ্য বিক্রয় এবং ভবিষ্যতে এককালীন বা কিস্তিতে মূল্য পরিশোধ। আমদানি-রপ্তানি ও ভোক্তা অর্থায়ন।
৩. বাই-সালাম (Advance Purchase) পণ্যের সম্পূর্ণ মূল্য অগ্রিম পরিশোধ করা হয় এবং ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য সরবরাহ নেওয়া হয়। কৃষি খাতে কৃষকদের আগাম অর্থায়ন।
৪. ইজারা (Ijara / Leasing) স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তির ব্যবহার স্বত্ব বা ভাড়া প্রদান এবং চুক্তিশেষে গ্রাহকের মালিকানা লাভ। মেশিনারি, যানবাহন ও ভবন অর্থায়ন।
৫. মুশারাকা ও মুদারাবা লাভ ও লোকসান ভাগাভাগির ভিত্তিতে প্রত্যক্ষ মূলধন বিনিয়োগ ও অংশীদারিত্ব। বৃহৎ শিল্প ও যৌথ বাণিজ্যিক উদ্যোগ।

উপসংহার:
ইসলামি ব্যাংকের এই বহুবিধ বিনিয়োগ পদ্ধতি অর্থনীতিতে নগদ অর্থের অপব্যবহার রোধ করে বাস্তব উৎপাদন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অসাধারণ ভূমিকা পালন করে।

৮। তাকাফুল কী? তাকাফুল ও প্রচলিত বিমার মধ্যে পার্থক্য দেখাও। বাংলাদেশে তাকাফুলের গুরুত্ব আলোচনা কর।

[মান: ৩ + ১০ + ৭ = ২০]

ভূমিকা:
ঝুঁকিপূর্ণ বিশ্বে মানুষের জীবন ও সম্পদকে সুরক্ষিত রাখা একটি মৌলিক মানবিক প্রয়োজন। প্রচলিত বাণিজ্যিক বিমা ব্যবস্থা সুদ, জুয়া ও ধোঁকার ওপর প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় তা ইসলামি শরীয়তের পরিপন্থী। এর সুমহান বিকল্প হিসেবে ইসলামে ‘তাকাফুল’ (Takaful) ব্যবস্থার বিকাশ ঘটেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে বাংলাদেশে তাকাফুলের গুরুত্ব অপরিসীম।

১. তাকাফুল কী এবং প্রচলিত বিমার সাথে এর পার্থক্য:
– তাকাফুল: তাকাফুল হলো ইসলামি ভ্রাতৃত্ব ও সহযোগিতার ভিত্তিতে পরিচালিত এমন এক বিমা ব্যবস্থা, যেখানে অংশগ্রহণকারীগণ একটি যৌথ ফান্ডে দান (তাবাররু) জমা করে এবং কোনো সদস্য ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেই ফান্ড থেকে তাকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়।
– প্রচলিত বিমার সাথে মৌলিক পার্থক্য:
১. প্রচলিত বিমা হলো মুনাফালোভী কোম্পানির সাথে ঝুঁকি কেনাবেচার বাণিজ্যিক চুক্তি; তাকাফুল হলো অংশগ্রহণকারীদের পারস্পরিক সহযোগিতা ও দানের চুক্তি।
২. প্রচলিত বিমা সুদ ও জুয়ার ওপর প্রতিষ্ঠিত; তাকাফুল সম্পূর্ণ সুদ ও জুয়ামুক্ত।
৩. প্রচলিত বিমায় যাবতীয় উদ্বৃত্ত অর্থ কোম্পানি নিয়ে যায়; তাকাফুলে দাবি মেটানোর পর উদ্বৃত্ত অর্থ পুনরায় গ্রাহকদের মাঝে লাভ বা বোনাস হিসেবে ফেরত দেওয়া হয়।

২. বাংলাদেশে তাকাফুলের অপার আর্থ-সামাজিক গুরুত্ব:
১. ধর্মপ্রাণ জনগণের আস্থা ও সম্পৃক্ততা: বাংলাদেশের ৯২% মানুষ মুসলিম। সুদের ভয়ে বিশাল জনগোষ্ঠী প্রচলিত বিমা থেকে দূরে ছিল। তাকাফুল চালু হওয়ায় তারা স্বাচ্ছন্দ্যে বিমা সুবিধা গ্রহণ করছে।
২. প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা: বাংলাদেশ বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের দেশ। তাকাফুলের মাধ্যমে উপকূলীয় কৃষক ও জেলেদের ফসল ও নৌকার ঝুঁকি কভার করে গ্রামীণ অর্থনীতি রক্ষা করা যায়।
৩. ইসলামি ব্যাংকের বিনিয়োগ নিরাপত্তা: বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংকগুলো যে কোটি কোটি টাকার শিল্প, বাড়ি ও গাড়ি অর্থায়ন করছে, সেগুলোর ঝুঁকি কভার করার জন্য শরীয়াহসম্মত তাকাফুল অপরিহার্য।
৪. দীর্ঘমেয়াদী জাতীয় সঞ্চয় ও মূলধন গঠন: তাকাফুল পলিসির মাধ্যমে সংগৃহীত কোটি কোটি টাকা দেশের সুকুক বন্ড ও মেগা অবকাঠামো প্রকল্পে হালাল বিনিয়োগ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
৫. পরিবারের আর্থিক সুরক্ষা: উপার্জনক্ষম ব্যক্তির অকাল মৃত্যুতে তার পরিবার যেন রাস্তায় না নামে, সেজন্য তাকাফুল পরিবারের জন্য সম্মানজনক পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে।

উপসংহার:
বাংলাদেশে তাকাফুলের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। সঠিক প্রচার ও শক্তিশালী শরীয়াহ তদারকির মাধ্যমে তাকাফুল দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তায় এক বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখতে পারে।

৯। ইসলামি ব্যাংকের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এবং বৈশিষ্ট্য আলোচনা কর।

[মান: ৫ + ৫ + ১০ = ২০]

ভূমিকা:
ইসলামি ব্যাংক কোনো নিছক নামসর্বস্ব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নয়; বরং এটি একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যে ভাস্বর এক সার্বজনীন অর্থনৈতিক বিপ্লব। প্রচলিত পুঁজিবাদী ব্যাংক যেখানে কেবল ধনিক শ্রেণির সেবা করে এবং সুদ দিয়ে সাধারণ মানুষকে শোষণ করে, ইসলামি ব্যাংক সেখানে সমাজের প্রতিটি স্তরে ন্যায়বিচার ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার ব্রত নিয়ে পরিচালিত হয়।

১. ইসলামি ব্যাংকের পরম লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যসমূহ:
১. আল্লাহর সন্তুষ্টি ও শরিয়তের বাস্তবায়ন: জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক লেনদেন থেকে সুদ, ঘুষ, জুয়া ও শোষণমূলক প্রতারণা সম্পূর্ণ নির্মূল করে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জন করা।
২. সম্পদের সুষম প্রবাহ ও বৈষম্য দূরীকরণ: সমাজের পুঁজিপতি সিন্ডিকেটের হাত থেকে অর্থকে মুক্ত করে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দিকে প্রবাহিত করা।
৩. উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও বেকারত্ব নিরসন: জামানতের পরিবর্তে মেধা ও প্রকল্প সম্ভাব্যতা দেখে বিনিয়োগ করে তরুণদের উদ্যোক্তা বানানো।
৪. মৌলিক প্রয়োজন পূরণ ও মানবকল্যাণ (Maqasid al-Shariah): দেশের জনগণের খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক কল্যাণকর খাতসমূহকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া।
৫. হালাল বিনিয়োগের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা: দেশের ব্যবসায়ীদের সৎ উপায়ে ব্যবসা পরিচালনায় উৎসাহিত করা এবং ব্যবসায়িক নৈতিকতা ফিরিয়ে আনা।

২. ইসলামি ব্যাংকের অনন্য কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যসমূহ:
১. সুদের সম্পূর্ণ বিলোপ: ব্যাংকের কোনো হিসাব বা চুক্তিতেই সুদের কোনো অস্তিত্ব নেই।
২. লাভ ও লোকসান অংশীদারিত্ব (PLS Model): ব্যাংক কেবল লাভের ভাগিদার নয়, ব্যবসায়িক দুর্যোগে গ্রাহকের সাথে লোকসানের ঝুঁকিও সমভাবে বহন করে।
৩. বাস্তব পণ্যের সাথে লেনদেনের শর্ত: কাগুজে বা কাল্পনিক কোনো অর্থপ্রবাহ নেই; প্রতিটি অর্থের বিপরীতে দৃশ্যমান পণ্য কেনাবেচা হয়।
৪. শরীয়াহ বোর্ডের নজরদারি: দেশের শীর্ষস্থানীয় ফকীহ ও আলেমগণের সমন্বয়ে গঠিত স্বাধীন শরীয়াহ বোর্ড ব্যাংকের প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়মিত অডিট করে।
৫. যাকাত ও সমাজকল্যাণ তহবিল: ব্যাংক তার নিজস্ব আয়ের ওপর প্রতি বছর ২.৫% হারে যাকাত আদায় করে এবং গ্রাহকদের সহযোগিতায় বিশেষ সামাজিক তহবিল পরিচালনা করে।

উপসংহার:
ইসলামি ব্যাংকের লক্ষ্য ও বৈশিষ্ট্য একে গতানুগতিক ব্যাংকগুলোর চেয়ে পৃথক ও এক অনন্য মানবিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে। এর চর্চা সমাজের স্থায়ী সমৃদ্ধির সোপান।

১০। টীকা লিখ (যে কোনো দুটি): (ক) সুদের আর্থ-সামাজিক কুফল; (খ) মজুতদারী ও মালে ভেজাল মিশ্রণ; (গ) বাইয়ে মুশারাকা; (ঘ) দারিদ্র্যতা।

[মান: ১০ × ২ = ২০]

ভূমিকা:
ফাযিল ৩য় বর্ষ ইসলামি অর্থনীতি ৩য় পত্রের (২০২২) সিলেবাসভুক্ত ৪টি মৌলিক বিষয়ের সারগর্ভ অ্যাকাডেমিক টীকা নিচে প্রণয়ন করা হলো:

(ক) সুদের আর্থ-সামাজিক কুফল (Socio-Economic Evils of Interest):
সুদ একটি মারাত্মক অর্থনৈতিক বিষবাষ্প। এটি সমাজে ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধানকে আকাশচুম্বী করে তোলে। সুদের কারণে পণ্যের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেয়ে বাজারে তীব্র মুদ্রাস্ফীতি সৃষ্টি হয়। ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিরা সুদের ফাঁদে পড়ে সর্বস্ব হারিয়ে দেউলিয়া হয়। সুদ মানুষের মন থেকে দয়া ও সহমর্মিতা ধ্বংস করে চরম স্বার্থপরতা ও পুঁজিবাদী নিষ্ঠুরতা কায়েম করে। কুরআনে সুদখোরদের বিরুদ্ধে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

(খ) মজুতদারী ও মালে ভেজাল মিশ্রণ (Hoarding and Adulteration):
– মজুতদারী (Ihtikar): কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বাজারে পণ্যের দাম বাড়ানোর হীন উদ্দেশ্যে খাদ্যদ্রব্য আটকে রাখা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ও অভিশপ্ত।
– মালে ভেজাল মিশ্রণ: ভালো পণ্যের সাথে খারাপ জিনিস মেশানো, মেয়াদোত্তীর্ণ বা বিষাক্ত রাসায়নিকযুক্ত খাবার বিক্রি করা মারাত্মক বিশ্বাসঘাতকতা। রাসূলুল্লাহ (সা.) কঠোর ঘোষণা দিয়েছেন: “যে ব্যক্তি প্রতারণা ও ধোঁকাবাজি করে সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।”

(গ) বাইয়ে মুশারাকা (Bai-e-Musharaka):
মুশারাকা হলো অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে যৌথ ব্যবসা। বাইয়ে মুশারাকা হলো এমন এক অর্থায়ন পদ্ধতি যেখানে ব্যাংক এবং ব্যবসায়ী যৌথভাবে মূলধন বিনিয়োগ করে কোনো নির্দিষ্ট পণ্য বা শিল্প প্রকল্প পরিচালনা করে। ব্যবসায় অর্জিত মুনাফা পূর্বনির্ধারিত অনুপাতে ভাগ হয় এবং ক্ষতি হলে মূলধনের অনুপাতে উভয় পক্ষ বহন করে। এটি ইসলামি অর্থনীতির সর্বাধিক ইনসাফপূর্ণ বিনিয়োগ রূপ।

(ঘ) দারিদ্র্যতা (Poverty):
মানুষের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসার মতো মৌলিক মানবিক চাহিদা মেটানোর অক্ষমতাকে দারিদ্র্য বলে। ইসলামে অলসতা ও ভিক্ষাবৃত্তিকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করে কর্মসংস্থানের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য ইসলাম যাকাত, উশর, ওয়াকফ এবং সুদমুক্ত করযে হাসানার এক প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখা উপহার দিয়েছে।

উপসংহার:
এই সংক্ষেপিত বিষয়াবলি ইসলামি বাজার ব্যবস্থার নৈতিক পরিচ্ছন্নতা ও আর্থিক শৃঙ্খলার স্বরূপ তুলে ধরে।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

ফাযিল ৩য় বর্ষ ইসলামি অর্থনীতি ৩য় পত্রের মূল পাঠ্য বিষয় কী?

ইসলামি অর্থনীতি ৩য় পত্রের (বিষয় কোড: ৪৩৯) মূল সিলেবাস হলো ইসলামি ব্যাংকিং, বিমা (তাকাফুল) ও মুদ্রা ব্যবস্থা। এতে ব্যবসার ইসলামি বিধান, সুদ বনাম মুনাফা, ইসলামি ব্যাংকের কার্যাবলি ও বিনিয়োগ পদ্ধতি (মুরাবাহা, মুদারাবা, মুশারাকা), আইডিবি এবং প্রচলিত বিমার বিপরীতে তাকাফুল অন্তর্ভুক্ত।

ফাযিল পরীক্ষায় ২০ নম্বরের প্রশ্নের জন্য কত বড় উত্তর লিখতে হবে?

ডিগ্রি ও অনার্স মানবণ্টন অনুযায়ী প্রতিটি প্রশ্নের জন্য ভূমিকা, পারিভাষিক সংজ্ঞা, কুরআন ও সুন্নাহর আরবি দলিল ও অর্থ, প্রয়োজনীয় ছক/পয়েন্ট এবং উপসংহার সহযোগে কমপক্ষে ৩৫০ থেকে ৫০০+ শব্দে পূর্ণাঙ্গ উত্তর লেখা আবশ্যক।

ইসলামি ব্যাংক কীভাবে প্রচলিত সুদি ব্যাংকের চেয়ে পৃথক?

প্রচলিত ব্যাংক সুদের বিনিময়ে অর্থ ধার দিয়ে ঝুঁকিহীন মুনাফা লোটে, পক্ষান্তরে ইসলামি ব্যাংক সুদের বদলে লাভ-লোকসান অংশীদারিত্ব (মুদারাবা-মুশারাকা) এবং বাস্তব পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করে।

ইসলামে প্রচলিত বাণিজ্যিক বিমা কেন নিষিদ্ধ করা হয়েছে?

প্রচলিত বাণিজ্যিক বিমায় তিনটি শরীয়াহ নিষিদ্ধ উপাদান বিদ্যমান: ১. রিবা (সুদি বন্ডে বিনিয়োগ ও অতিরিক্ত অর্থ লেনদেন), ২. গারার (মারাত্মক অনিশ্চয়তা) এবং ৩. মাইসির (ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীল জুয়া)।

তাকাফুল ব্যবস্থার মূল দর্শন কী?

তাকাফুলের মূল দর্শন হলো ইসলামি ভ্রাতৃত্ব ও পারস্পরিক সহযোগিতা। অংশগ্রহণকারীগণ যৌথ তহবিলে স্বেচ্ছায় দান (তাবাররু) জমা করে এবং কোনো সদস্য ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেই ফান্ড থেকে তাকে ক্ষতিপূরণ দিয়ে পুনর্বাসিত করা হয়।

মুসলিম বিশ্বে ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংকের (IDB) ভূমিকা কী?

আইডিবি ওআইসিভুক্ত ৫৭টি মুসলিম দেশের সমন্বয়ে গঠিত একটি শীর্ষ বহুপাক্ষিক সুদমুক্ত ব্যাংক, যা মুসলিম দেশগুলোর মেগা অবকাঠামো নির্মাণ, আন্তঃবাণিজ্য অর্থায়ন, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং জরুরি মানবিক ত্রাণে প্রধান ভূমিকা পালন করে।