ইসলামিক স্টাডিজ ১ম পত্র (Islamic Studies 1st Paper) – 416, ইসলামিক স্টাডিজ – ফাযিল পাস ৩য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২১

StudyBoi StudyBoi
September 26, 2026
৮৯ মিনিট পড়ার সময়
১ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন

ফাযিল (স্নাতক) পাস ৩য় বর্ষ পরীক্ষা – 2021
বিষয়: ইসলামিক স্টাডিজ ১ম পত্র (ঐচ্ছিক) (বিষয় কোড: ৪১৬)
[আল-কুরআন ও কুরআন সম্পর্কিত উলূম]
সময়: ৩ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ১০০

ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ফাযিল (স্নাতক) পাস ৩য় বর্ষ পরীক্ষা 2021-এর ইসলামিক স্টাডিজ ১ম পত্র (বিষয় কোড: ৪১৬) পরীক্ষার মূল প্রশ্নপত্রের প্রতিটি প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ, প্রামাণ্য ও বিশদ অ্যাকাডেমিক সমাধান নিচে দেওয়া হলো। ফাযিল ডিগ্রী ও অনার্স শ্রেণির ২০ নম্বরের রচনামূলক প্রশ্নের উচ্চমান বজায় রেখে ভূমিকা, শানে নুযূল, আরবি ইবারত, ধারাবাহিক পয়েন্ট এবং উপসংহার সহযোগে প্রতিটি উত্তর প্রস্তুত করা হয়েছে।

কন্টেন্ট তালিকা / প্রশ্নসূচি

  1. الزاني لا ينكح الا زانية او مشركة… [ব্যভিচারী নারী-পুরুষের বিবাহ ও মিথ্যা অপবাদের শরয়ী বিধান]
  2. ياايها الذين امنوا لا تقدموا بين يدى الله ورسوله… [আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি শিষ্টাচার রক্ষা ও আমল রক্ষার বিধান]
  3. ياايها الذين امنوا ان تنصروا الله ينصركم ويثبت اقدامكم… [আল্লাহর দ্বীনকে সাহায্য ও বিজয়ের ঐশ্বরিক শর্তাবলি]
  4. طسم – تلك ايت الكتب المبين… [হযরত মূসা (আ) ও স্বৈরাচারী ফেরাউনের ঘটনা এবং সত্যের অবধারিত বিজয়]
  5. تحدث عن الاحكام الشريعة المبينة فى سورة النور. [সূরা আন-নূরে বর্ণিত মৌলিক শরয়ী আহকাম ও পারিবারিক বিধানসমূহ]
  6. ما معنى القران لغة واصطلاحا؟ اذكر وجوه اعجازه مفصلا. [কুরআনের আভিধানিক-পারিভাষিক পরিচয় ও এর অলৌকিকত্বের (ই’জাজ) দিকসমূহ]
  7. ما معنى الوحى لغة واصطلاحا؟ وما الفرق بينه وبين الالهام؟ [ওহীর আভিধানিক-পারিভাষিক অর্থ ও ওহী এবং ইলহামের পার্থক্য]
  8. ما المراد باسباب النزول؟ وما اهميتها فى فهم القران؟ [আসবাবে নুযূলের পরিচয় এবং কুরআন অনুধাবনে এর গুরুত্ব]
  9. ما معنى التفسير لغة واصطلاحا؟ وما الفرق بين التفسير والتأويل؟ [তাফসির ও তাবিলের পরিচয় এবং এদের মধ্যকার মৌলিক পার্থক্য]
  10. ما هى العلوم التى يحتاج اليها المفسر؟ [মুফাসসিরের আবশ্যকীয় শর্তাবলি ও প্রয়োজনীয় শাস্ত্রসমূহ]
  11. تحدث عن خصائص السور المكية والمدنية. [মাক্কী ও মাদানী সূরার স্বরূপ, পরিচয় ও প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্যাবলি]
  12. بين خصائص القران الكريم بالتفصيل. [পবিত্র কুরআনুল কারীমের অনন্য ও সার্বজনীন বৈশিষ্ট্যাবলি]
  13. عرف النسخ لغة واصطلاحا – ثم تحدث عن كيفيات النسخ وشروطه. [নাসখের পরিচয়, প্রকারভেদ, শর্তাবলি ও ঐতিহাসিক হিকমত]
  14. اكتب عن اول ما نزل واخر ما نزل من القران الكريم بالتحقيق. [কুরআনের প্রথম ও শেষ অবতীর্ণ আয়াতের প্রামাণ্য তাহক্বীক্ব]

প্রশ্নোত্তর ও পূর্ণাঙ্গ সমাধান

১. الزاني لا ينكح الا زانية او مشركة… [ব্যভিচারী নারী-পুরুষের বিবাহ ও মিথ্যা অপবাদের শরয়ী বিধান]

মূল আয়াত ও অর্থ:
الزَّانِي لَا يَنكِحُ إِلَّا زَانِيَةً أَوْ مُشْرِكَةً وَالزَّانِيَةُ لَا يَنكِحُهَا إِلَّا زَانٍ أَوْ مُشْرِكٌ ۚ وَحُرِّمَ ذَٰلِكَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ – وَالَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ ثُمَّ لَمْ يَأْتُوا بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ فَاجْلِدُوهُمْ ثَمَانِينَ جَلْدَةً وَلَا تَقْبَلُوا لَهُمْ شَهَادَةً أَبَدًا ۚ وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
আয়াতের অর্থ: ব্যভিচারী পুরুষ কেবল ব্যভিচারিণী অথবা মুশরিক নারীকে বিয়ে করে এবং ব্যভিচারিণী নারীকে কেবল ব্যভিচারী অথবা মুশরিক পুরুষই বিয়ে করে; আর মুমিনদের জন্য এটি হারাম করা হয়েছে। আর যারা সতী-সাধ্বী নারীদের ওপর অপবাদ আরোপ করে অতঃপর চারজন সাক্ষী উপস্থিত করতে পারে না, তাদেরকে আশিটি বেত্রাঘাত কর এবং কখনো তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করো না; বস্তুত এরাই ফাসিক। (সূরা আন-নূর: ৩-৪)

ভূমিকা:
পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নূর হলো পারিবারিক পবিত্রতা, সামাজিক নৈতিকতা ও নারীর সম্ভ্রম সুরক্ষার এক অনন্য ঐশ্বরিক সনদ। মানবসমাজের নৈতিক কাঠামো ধ্বংসকারী মারাত্মক অপরাধ ব্যভিচার এবং সমাজে কুৎসা রটনাকারী মিথ্যা অপবাদের প্রতিরোধে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এ সূরায় কঠোর আইনি ও সামাজিক অনুশাসন জারি করেছেন।

১. আয়াতের শানে নুযূল (নাজিলের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট):
হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, জাহেলী যুগে আরবে কিছু পেশাদার পতিতা নারী ছিল, যাদের আয়ের ওপর তাদের পরিবার চলত। মক্কা থেকে হিজরতকারী কতিপয় অতি দরিদ্র নিঃস্ব সাহাবী আর্থিক অসচ্ছলতা দূর করার মানসে ওইসব নারীদের বিয়ে করার ইচ্ছা পোষণ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট অনুমতি প্রার্থনা করেন। এই প্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা আয়াত নাজিল করে দ্ব্যর্থহীনভাবে জানিয়ে দেন যে, কোনো চরিত্রবান মুমিন কোনো প্রকাশ্য ব্যভিচারিণী নারীকে বিয়ে করতে পারে না।

২. ব্যভিচারীর বৈবাহিক বিধান ও ফকীহগণের দৃষ্টিভঙ্গি:
আয়াতে ‘وحُرِّمَ ذَٰلِكَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ’ বাক্যাংশের ব্যাখ্যায় মুফাসসির ও ফকীহগণের মধ্যে দুটি প্রধান অভিমত রয়েছে:
ক. ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (র.)-এর মত: ব্যভিচারে অভ্যস্ত কোনো নারী বা পুরুষ খাঁটি তওবা না করা পর্যন্ত কোনো সচ্চরিত্র মুমিনের সাথে তাদের বৈবাহিক চুক্তি সম্পাদন সম্পূর্ণ হারাম ও বাতিল।
খ. জমহুর ফকীহ (ইমাম আবু হানীফা, ইমাম মালেক ও ইমাম শাফেঈ)-এর মত: এখানে হারাম দ্বারা মূলত চরম অপছন্দনীয় ও মাকরূহে তাহরীমী বোঝানো হয়েছে। একজন পবিত্রাত্মা মুমিনের উচিত নিজের ঈমান ও পরিবারের পবিত্রতা রক্ষায় ব্যভিচারী ব্যক্তিদের পরিহার করা।

৩. হদ্দুল কাযাফ (মিথ্যা অপবাদের শরয়ী দণ্ডবিধি):
ইসলামে কারো চরিত্রের ওপর অপবাদ দেওয়াকে ‘কাযাফ’ (قذف) বলা হয়। সমাজে যেন কেউ কারো বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাতে না পারে, সেজন্য কুরআনে তিনটি সুস্পষ্ট আইনি শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে:
১. শারীরিক শাস্তি: অপবাদকারীকে জনসম্মুখে ৮০টি বেত্রাঘাত (جلدة) করতে হবে।
২. আইনি অধিকার হরণ: জীবনে কখনো তার কোনো সাক্ষ্য আদালতে গ্রহণযোগ্য হবে না।
৩. নাগরিক ও ধর্মীয় মর্যাদা হারানো: তাকে চিরতরে ‘ফাসিক’ বা অবাধ্য পাপী হিসেবে চিহ্নিত করা হবে।

৪. চারজন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্যের অনিবার্যতা:
সাধারণ ফৌজদারি মামলায় দুজন সাক্ষী যথেষ্ট হলেও ব্যভিচারের মতো স্পর্শকাতর অভিযোগে ইসলাম কঠোরভাবে চারজন পুরুষ ও নির্ভরযোগ্য প্রত্যক্ষদর্শীর চাক্ষুষ সাক্ষ্য শর্ত করেছে। চারজনের একজন কম হলেও অভিযোগকারীদের উল্টো বেত্রাঘাতের মুখোমুখি হতে হবে। এর উদ্দেশ্য হলো মানুষের ব্যক্তিগত সম্ভ্রম রক্ষা করা এবং চরিত্রহননের নোংরা রাজনীতি চিরতরে বন্ধ করা।

উপসংহার ও সামাজিক শিক্ষা:
সূরা আন-নূরের এই অনুশাসন প্রমাণ করে যে, ইসলাম ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে উশৃঙ্খলতা সমর্থন করে না এবং বাকস্বাধীনতার নামে কারো সম্মানহানি বরদাশত করে না। পারিবারিক শুদ্ধতা বজায় রাখতে এবং সুস্থ সমাজ বিনির্মাণে এই বিধানের বিকল্প নেই।

২. ياايها الذين امنوا لا تقدموا بين يدى الله ورسوله… [আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি শিষ্টাচার রক্ষা ও আমল রক্ষার বিধান]

মূল আয়াত ও অর্থ:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُقَدِّمُوا بَيْنَ يَدَيِ اللَّهِ وَرَسُولِهِ ۖ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۚ إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ – يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَرْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ وَلَا تَجْهَرُوا لَهُ بِالْقَوْلِ كَجَهْرِ بَعْضِكُمْ لِبَعْضٍ أَن تَحْبَطَ أَعْمَالُكُمْ وَأَنتُمْ لَا تَشْعُرُونَ
আয়াতের অর্থ: হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশের অগ্রবর্তী হয়ো না এবং আল্লাহকে ভয় কর; নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু শোনেন ও জানেন। হে মুমিনগণ! তোমরা নবীর কণ্ঠস্বরের ওপর নিজেদের কণ্ঠস্বর উঁচু করো না এবং নিজেদের মধ্যে যেভাবে উচ্চস্বরে কথা বল তাঁর সাথে সেভাবে উচ্চস্বরে কথা বলো না; পাছে তোমাদের অজ্ঞাতসারে তোমাদের সকল আমল বিনষ্ট হয়ে যায়। (সূরা আল-হুজুরাত: ১-২)

ভূমিকা:
সূরা আল-হুজুরাতকে ইসলামী শিষ্টাচার ও নৈতিকতার মহাসনদ বলা হয়। ঈমানের পর একজন মুমিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো মহান আল্লাহ ও তাঁর হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য ও পরম আদব বজায় রাখা। এই আয়াতে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র দরবারে কথা বলার ও আচরণ করার অলঙ্ঘনীয় ঐশ্বরিক নিয়ম ঘোষণা করা হয়েছে।

১. শানে নুযূল:
সহীহ বুখারীতে হযরত ইবনে যুবাইর (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, একবার বনী তামীম গোত্রের একটি প্রতিনিধি দল রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে উপস্থিত হয়। প্রতিনিধি দলের প্রধান কে হবেন—এ নিয়ে হযরত আবু বকর (রা.) এবং হযরত ওমর (রা.)-এর মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়। একপর্যায়ে তাঁদের দুজনের কণ্ঠস্বর নবী করীম (সা.)-এর উপস্থিতিতে কিছুটা উচ্চ হয়ে যায়। তাঁদের কোনো অসৎ উদ্দেশ্য ছিল না, কিন্তু নবীর মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য রেখে আল্লাহ তাআলা এই কড়া সতর্কতা নাজিল করেন। এরপর হযরত ওমর (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে এত মৃদু স্বরে কথা বলতেন যে, রাসূলকে আবার জিজ্ঞেস করতে হতো তিনি কী বলছেন।

২. আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অগ্রবর্তী না হওয়ার তাৎপর্য (লা তুক্বাদ্দিমূ):
‘লা তুক্বাদ্দিমূ বাইনা ইয়াদায়িল্লাহি ওয়া রাসূলিহী’ কথার অর্থ হলো:
১. দ্বীনের কোনো বিষয়ে নিজের বুদ্ধি, যুক্তি বা রায়কে আল্লাহ ও রাসূলের নির্দেশের ওপরে প্রাধান্য না দেওয়া।
২. রাসূলের নির্দেশ পাওয়ার পূর্বেই কোনো বিষয়ে নিজে চূড়ান্ত ফয়সালা গ্রহণ না করা।
৩. ইবাদত, লেনদেন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় কুরআন ও সুন্নাহর পূর্ণ আনুগত্য নিশ্চিত করা।

৩. নবীর দরবারে কণ্ঠস্বর সংযত রাখার বিধান:
আয়াতে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে কথা বলার তিনটি আদব নির্ধারণ করা হয়েছে:
ক. কণ্ঠস্বর নিচু রাখা: তাঁর কথার ওপর কথা না বলা এবং তাঁর চেয়ে উচ্চস্বরে আওয়াজ না করা।
খ. সাধারণ মানুষের মতো নাম ধরে না ডাকা: নিজেদের মধ্যে যেভাবে একজন অন্যজনকে নাম ধরে ডাকে, সেভাবে না ডেকে পরম ভক্তিভরে ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ’ বা ‘ইয়া নাবীয়াল্লাহ’ বলে সম্বোধন করা।
গ. আমল বরবাদ হওয়ার ভয়াবহ পরিণতি: রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি সামান্য বেয়াদবি বা অশ্রদ্ধা মানুষের সারা জীবনের নামাজ, রোজা, হজ ও দান-সদকার মতো নেক আমল মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস করে দেয়।

৪. সমকালীন প্রেক্ষাপটে এই আয়াতের প্রাসঙ্গিকতা:
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পরও এই বিধান সমানভাবে প্রযোজ্য। যখন তাঁর পবিত্র হাদিস পাঠ করা হয়, তখন নীরবতা পালন করা, তাঁর সুন্নাহর প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা এবং কোনো অবস্থাতেই হাদিসের ওপর নিজের যুক্তিকে স্থান না দেওয়া এই আদবের অন্তর্ভুক্ত।

উপসংহার:
নবীপ্রেম ও নবীর প্রতি আদব হলো ঈমানের রূহ। আদববিহীন আমল আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য নয়; বরং আন্তরিক ভক্তি ও আনুগত্যই বান্দাকে আল্লাহর নৈকট্যবান করে তোলে।

৩. ياايها الذين امنوا ان تنصروا الله ينصركم ويثبت اقدامكم… [আল্লাহর দ্বীনকে সাহায্য ও বিজয়ের ঐশ্বরিক শর্তাবলি]

মূল আয়াত ও অর্থ:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَنصُرُوا اللَّهَ يَنصُرْكُمْ وَيُثَبِّتْ أَقْدَامَكُمْ – وَالَّذِينَ كَفَرُوا فَتَعْسًا لَّهُمْ وَأَضَلَّ أَعْمَالَهُمْ – ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمْ كَرِهُوا مَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأَحْبَطَ أَعْمَالَهُمْ
আয়াতের অর্থ: হে ঈমানদারগণ! তোমরা যদি আল্লাহকে (অর্থাৎ আল্লাহর দ্বীনকে) সাহায্য কর, তবে তিনিও তোমাদের সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পা সুদৃঢ় রাখবেন। আর যারা কুফরি করে, তাদের জন্য রয়েছে ধ্বংস এবং তিনি তাদের কর্মসমূহ বিনষ্ট করে দেবেন। কারণ তারা অপছন্দ করেছে যা আল্লাহ নাজিল করেছেন, ফলে তিনি তাদের আমল বাতিল করে দিয়েছেন। (সূরা মুহাম্মদ: ৭-৯)

ভূমিকা:
সূরা মুহাম্মদ হলো হক ও বাতিলের দ্বন্দ্ব, জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ এবং ঈমানদারদের বিজয়ের পথনির্দেশক সূরা। আলোচ্য আয়াতে মহান আল্লাহ মানবজাতির সামনে তাঁর চিরন্তন ঐশ্বরিক নিয়ম ঘোষণা করেছেন যে, বিজয়ের ভিত্তি কোনো বাহ্যিক জনবল বা সমরাস্ত্র নয়; বরং ঈমানী দৃঢ়তা এবং আল্লাহর দ্বীনের প্রতি একনিষ্ঠ আত্মনিয়োগই হলো চূড়ান্ত বিজয়ের একমাত্র শর্ত।

১. ‘আল্লাহকে সাহায্য করা’ বলতে কী বোঝায়?
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অভাবমুক্ত, পরাক্রমশালী ও সর্বশক্তিমান। তিনি কারো সাহায্যের মুখাপেক্ষী নন। আয়াতে ‘আল্লাহকে সাহায্য করা’ অর্থ রূপক; এর শাস্ত্রীয় অর্থ হলো:
১. মহান আল্লাহর নির্দেশিত দ্বীন-ইসলামকে নিজের ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে বিজয়ী করার সংগ্রাম করা।
২. আল্লাহর রাসূলের সুন্নাহকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং বিদয়াত ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া।
৩. আল্লাহর জমিনে তাঁর কালেমাকে সমুন্নত রাখতে জান-মাল দিয়ে দ্বীনি মেহনত ও জিহাদে শরিক হওয়া।

২. ঐশ্বরিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি (ইয়ানসুরকুম):
যখন বান্দা নিঃস্বার্থভাবে আল্লাহর দ্বীনের জন্য দাঁড়িয়ে যায়, তখন আল্লাহ তাঁর পক্ষ থেকে তিনটি স্তরে সাহায্য অবতীর্ণ করেন:
ক. অন্তরে স্থৈর্য ও প্রশান্তি: শত্রুর শত ভয়ভীতি ও প্রতিকূলতার মধ্যেও অন্তরে অটল সাহস ও সাকীনাহ দান করেন।
খ. অদৃশ্য শক্তির সাহায্য: বদর ও খন্দকের যুদ্ধের মতো ফেরেশতাদের মাধ্যমে এবং প্রাকৃতিক শক্তি দিয়ে মুমিনদের বিজয়ী করেন।
গ. ‘ইউসাব্বিত আক্বদামাকুম’ (পদযুগল সুদৃঢ় রাখা): যুদ্ধের ময়দানে এবং জীবনের চরম সংকটে মুমিনের অবস্থানকে পাহাড়ের মতো অটল রাখেন, যাতে তারা কখনো পশ্চাদপসরণ না করে।

৩. কাফেরদের ধ্বংস ও আমল নিষ্ফল হওয়ার কারণ:
আয়াতের দ্বিতীয় অংশে কাফেরদের পরিণতি বর্ণনা করা হয়েছে। তারা আল্লাহর ওহী ও শরীয়তকে ঘৃণা করত বিধায় তাদের সমস্ত বৈষয়িক শক্তি, চক্রান্ত ও মানবিক কাজ ধূলিসাৎ হয়ে যায়। কুরআনের অমোঘ নিয়ম—হকের বিরোধী শক্তির চূড়ান্ত পরিণতি সর্বদা অবধারিত ধ্বংস।

উপসংহার:
আজ মুসলিম উম্মাহর রাজনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয়ের মূল কারণ হলো তারা আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করার দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছে। উম্মাহ যদি পুনরায় আল্লাহর দ্বীনের সাহায্যে এগিয়ে আসে, তবে কুরআনের ওয়াদা অনুযায়ী আসমানী সাহায্য ও ঐতিহাসিক সম্মান পুনরুজ্জীবিত হবে।

৪. طسم – تلك ايت الكتب المبين… [হযরত মূসা (আ) ও স্বৈরাচারী ফেরাউনের ঘটনা এবং সত্যের অবধারিত বিজয়]

মূল আয়াত ও অর্থ:
طسم – تِلْكَ آيَاتُ الْكِتَابِ الْمُبِينِ – نَتْلُو عَلَيْكَ مِن نَّبَإِ مُوسَىٰ وَفِرْعَوْنَ بِالْحَقِّ لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ – إِنَّ فِرْعَوْنَ عَلَا فِي الْأَرْضِ وَجَعَلَ أَهْلَهَا شِيَعًا يَسْتَضْعِفُ طَائِفَةً مِّنْهُمْ يُذَبِّحُ أَبْنَاءَهُمْ وَيَسْتَحْيِي نِسَاءَهُمْ ۚ إِنَّهُ كَانَ مِنَ الْمُفْسِدِينَ – وَنُرِيدُ أَن نَّمُنَّ عَلَى الَّذِينَ اسْتُضْعِفُوا فِي الْأَرْضِ وَنَجْعَلَهُمْ أَئِمَّةً وَنَجْعَلَهُمُ الْوَارِثِينَ
আয়াতের অর্থ: তা-সীন-মীম। এগুলো সুস্পষ্ট কিতাবের আয়াত। মুমিন সম্প্রদায়ের উপকারের জন্য আমরা তোমার কাছে মূসা ও ফেরাউনের সত্য বৃত্তান্ত পাঠ করছি। নিশ্চয় ফেরাউন জমিনে উদ্ধত হয়েছিল এবং তার প্রজাদের বিভিন্ন দলে বিভক্ত করেছিল; তাদের একদলকে সে চরম দুর্বল করে রেখেছিল—তাদের পুত্রদের সে হত্যা করত এবং তাদের নারীদের জীবিত রাখত; নিশ্চয় সে ছিল বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের একজন। আর আমরা ইচ্ছা করলাম, জমিনে যাদের দুর্বল করা হয়েছিল তাদের প্রতি অনুগ্রহ করতে, তাদেরকে নেতা বানাতে এবং দেশের উত্তরাধিকারী করতে। (সূরা আল-কাসাস: ১-৫)

ভূমিকা:
সূরা আল-কাসাসে আল্লাহ তাআলা স্বৈরাচার, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস এবং দুর্বল মজলুমের ওপর ঐশ্বরিক অনুগ্রহের এক অবিস্মরণীয় ঐতিহাসিক নকশা অঙ্কন করেছেন। মক্কার অসহায় নির্যাতিত মুসলমানদের সান্ত্বনা দিতে গিয়ে আল্লাহ দেখিয়েছেন, কীভাবে ইতিহাসের চরম পরাক্রমশালী খোদায়ী দাবিদার ফেরাউনকে একটি অসহায় শিশুর মাধ্যমে পর্যুদস্ত করা হয়েছিল।

১. ফেরাউনের স্বৈরাচার ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের স্বরূপ:
পবিত্র আয়াতে ফেরাউনের তিনটি ভয়াবহ অপরাধের বিবরণ দেওয়া হয়েছে:
১. ‘আলা ফিল আরদ’ (জমিনে অহংকার ও খোদায়ী দাবি): সে নিজেকে মিশরের সর্বোচ্চ রব দাবি করেছিল এবং সকল নৈতিক সীমা লঙ্ঘন করেছিল।
২. ‘জাআলা আহলাহা শিয়াআ’ (বিভাজন শাসননীতি): সে প্রজাদের বিভিন্ন গোত্রে ভাগ করে বিভেদ সৃষ্টি করেছিল, যাতে তারা কখনো ঐক্যবদ্ধ হতে না পারে।
৩. বর্বর গণহত্যা ও নারী নির্যাতন: জ্যোতিষীদের ভবিষ্যৎবাণী শুনে নিজের সিংহাসন টিকিয়ে রাখতে সে বনী ইসরাঈলের নবজাতক পুত্রসন্তানদের পাইকারি হারে জবাই করত এবং কন্যাদের দাসী বানাত।

২. মজলুমের পক্ষে আল্লাহর ঐতিহাসিক পরিকল্পনা:
আয়াতের ৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহর শাশ্বত দর্শন ঘোষিত হয়েছে: وَنُرِيدُ أَن نَّمُنَّ عَلَى الَّذِينَ اسْتُضْعِفُوا – আল্লাহ নির্যাতিত ও পদদলিত জনতাকে জমিনের নেতা (ائِمَّةً) ও ক্ষমতার উত্তরাধিকারী (الْوَارِثِينَ) করতে চান। ফেরাউন যাকে হত্যা করতে হাজার হাজার শিশু খুন করেছিল, আল্লাহ সেই মূসাকে ফেরাউনের নিজের রাজপ্রাসাদেই পরম আদরে লালন-পালন করিয়েছিলেন।

৩. শিক্ষা ও সমকালীন তাৎপর্য:
ক. কোনো স্বৈরাচারী শাসক যত শক্তিশালীই হোক না কেন, আল্লাহর কুদরতের সামনে সে কীট-পতঙ্গের চেয়েও দুর্বল।
খ. ভাগ কর এবং শাসন কর (Divide and Rule) নীতি ফেরাউনী স্বভাবের অন্যতম লক্ষণ।
গ. চরম নির্যাতন ও অন্ধকারের পরেই সত্যের আলো ও ঈমানদারদের বিজয় অবধারিত হয়ে ওঠে।

উপসংহার:
হযরত মূসা (আ.) ও ফেরাউনের কাহিনী কেবল অতীতের গল্প নয়; এটি কিয়ামত পর্যন্ত আগমনকারী সকল মজলুমের জন্য সান্ত্বনা এবং সকল জালেমের জন্য ভয়াবহ সতর্কবার্তা।

৫. تحدث عن الاحكام الشريعة المبينة فى سورة النور. [সূরা আন-নূরে বর্ণিত মৌলিক শরয়ী আহকাম ও পারিবারিক বিধানসমূহ]

ভূমিকা:
সূরা আন-নূর হলো পবিত্র কুরআনুল কারীমের ২৪তম সূরা। এটি একটি মাদানী সূরা, যাতে ইসলামী সমাজব্যবস্থা, পারিবারিক পবিত্রতা এবং ব্যক্তি চরিত্রের নিষ্কলুষতা নিশ্চিত করার জন্য অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট শরয়ী আহকাম নাযিল করা হয়েছে। সমাজের মূল ভিত্তি পরিবারকে অনাচার থেকে মুক্ত রাখাই এ সূরার প্রধান লক্ষ্য।

সূরা আন-নূরে বর্ণিত প্রধান প্রধান শরয়ী বিধানসমূহ:

১. ব্যভিচারের হদ্দ বা দণ্ডবিধি (حد الزنا):
সূরা আন-নূরের ২ নম্বর আয়াতে অবিবাহিত নারী বা পুরুষের ব্যভিচারের শাস্তি হিসেবে ১০০টি কশাঘাত নির্ধারণ করা হয়েছে। বিচার কার্যকর করার সময় মুমিনদের একটি দলকে উপস্থিত থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং কোনো প্রকার অন্যায় অনুকম্পা প্রদর্শন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

২. অপবাদের শাস্তি (حد القذف):
কোনো সতী-সাধ্বী নারীর চরিত্রে অপবাদ আরোপকারী যদি চারজন চাক্ষুষ সাক্ষী উপস্থিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে তার জন্য তিনটি শাস্তি নির্ধারিত হয়েছে: ৮০টি বেত্রাঘাত, আদালতে চিরতরে সাক্ষ্যের অযোগ্যতা এবং ফাসিক হিসেবে চিহ্নিত হওয়া।

৩. লিআনের বিধান (حكم اللعان):
স্বামী যদি স্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ তোলে কিন্তু কোনো সাক্ষী না থাকে, তবে স্বামী-স্ত্রী আদালতের সামনে চারবার আল্লাহর নামে শপথ করবে এবং পঞ্চমবার মিথ্যাবাদীর ওপর আল্লাহর লানত বা গজব কামনা করবে। এর মাধ্যমে তাদের বিবাহ চিরতরে বিচ্ছেদ ঘটবে।

৪. ইফকের ঘটনা ও মুনাফিকদের কুৎসা রটনার প্রতিরোধ:
উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.)-এর ওপর মুনাফিকদের অপবাদের জবাব দিয়ে আল্লাহ তাআলা তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করে ১০টি আয়াত নাজিল করেন এবং ভিত্তিহীন গুজব ছড়ানোকে মারাত্মক অপরাধ ঘোষণা করেন।

৫. দৃষ্টি সংযত রাখা ও পর্দার বিধান (حجاب):
মুমিন পুরুষ ও নারীদের চোখ নিচু রাখতে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নারীদের মাথার ওড়না দিয়ে বক্ষদেশ আবৃত রাখতে এবং মাহরাম পুরুষ ব্যতীত অন্যের সামনে সৌন্দর্য প্রকাশ না করতে কঠোর বিধান দেওয়া হয়েছে।

৬. গৃহে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা (الاستئذان):
কারো ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ভঙ্গ না করার লক্ষ্যে অন্যের ঘরে প্রবেশের পূর্বে সালাম দেওয়া এবং অনুমতি প্রার্থনা করাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

উপসংহার:
সূরা আন-নূরের এই অনুশাসনগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে সমাজে ধর্ষণ, পরকীয়া, চরিত্রহনন ও পারিবারিক বিশৃঙ্খলা চিরতরে নির্মূল হয়ে এক স্বর্গীয় শান্তিময় পরিবেশ গড়ে উঠবে।

৬. ما معنى القران لغة واصطلاحا؟ اذكر وجوه اعجازه مفصلا. [কুরআনের আভিধানিক-পারিভাষিক পরিচয় ও এর অলৌকিকত্বের (ই’জাজ) দিকসমূহ]

ভূমিকা:
আল-কুরআনুল কারীম হলো বিশ্বজগতের প্রতিপালক মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর অবতীর্ণ সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ আসমানী কিতাব। এটি মানবজাতির হেদায়েতের চিরন্তন আলোকবর্তিকা এবং কিয়ামত পর্যন্ত মানব ও জিন জাতির জন্য এক অপরাজিত জীবন্ত মুজিজা।

১. আল-কুরআনের আভিধানিক অর্থ:
‘কুরআন’ (القرآن) শব্দটি আরবি ‘ক্বারাআ’ (قرأ) ধাতু থেকে নিষ্পন্ন, যার আভিধানিক অর্থ পাঠ করা, তিলাওয়াত করা বা একত্রিত করা। যেহেতু এই কিতাবটি পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি পঠিত হয় এবং এতে পূর্ববর্তী সকল আসমানী কিতাবের নির্যাস একত্রিত করা হয়েছে, তাই একে ‘কুরআন’ বলা হয়।

২. আল-কুরআনের পারিভাষিক সংজ্ঞা:
উসূলে ফিকহ ও উলূমুল কুরআনের ইমামগণের সর্বসম্মত সংজ্ঞানুযায়ী:
هُوَ كَلَامُ اللَّهِ الْمُنَزَّلُ عَلَى نَبِيِّهِ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، الْمُعْجِزُ بِلَفْظِهِ، الْمُتَعَبَّدُ بِتِلَاوَتِهِ، الْمَنْقُولُ إِلَيْنَا بِالتَّوَاتُرِ، الْمَكْتُوبُ فِي الْمَصَاحِفِ
অর্থ: কুরআন হলো আল্লাহর কালাম, যা তাঁর নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর অবতীর্ণ, যা তার শব্দ ও বাক্যশৈলীতে অলৌকিক, যার তিলাওয়াত ইবাদত হিসেবে গণ্য, যা মুতাওয়াতির সূত্রে আমাদের কাছে পৌঁছানো এবং যা মুসহাফসমূহে লিপিবদ্ধ।

৩. আল-কুরআনের ই’জাজ বা অলৌকিকত্বের প্রধান দিকসমূহ:
‘ই’জাজ’ (إعجاز) অর্থ অপরকে অক্ষম বা পরাভূত করা। আল-কুরআন আরবের বাঘা বাঘা কবি-সাহিত্যিকদের একটি সূরার সমকক্ষ রচনার চ্যালেঞ্জ দিয়ে চিরতরে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। এর অলৌকিকত্বের প্রধান দিকগুলো হলো:

  1. অনুপম ভাষা ও অলঙ্কারশাস্ত্রীয় সৌন্দর্য (الإعجاز اللغوي والبياني): কুরআনের ছন্দ, শব্দচয়ন, ব্যঞ্জনা ও বাক্যগঠন মানুষের সকল সাহিত্যের ঊর্ধ্বে। এটি না পদ্য, না গদ্য; বরং এক স্বর্গীয় মূর্ছনা যা অন্তরে কাঁপন সৃষ্টি করে।
  2. অতীতের নিখুঁত ঐতিহাসিক সত্যতা (الإخبار عن المغيبات الماضية): নিরক্ষর নবীর মুখ দিয়ে কয়েক হাজার বছর পূর্বের আদ, সামূদ, লূত, আসহাবে কাহাফ ও ফেরাউনের অবিকল ইতিহাস তুলে ধরা, যা প্রাচীন শিলালিপি আবিষ্কারের পর অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়েছে।
  3. ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবায়ন (الإخبار عن المغيبات المستقبلة): সূরা আর-রূমে পারস্যের বিরুদ্ধে রোমানদের ঐতিহাসিক বিজয়ের ভবিষ্যদ্বাণী এবং মক্কা বিজয়ের সুসংবাদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়িত হয়েছিল।
  4. আধুনিক বৈজ্ঞানিক তথ্যের অভ্রান্ত নির্ভুলতা (الإعجاز العلمي): মানব ভ্রূণের বিকাশ (সূরা মুমিনূন: ১২-১৪), মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ (সূরা যারিয়াত: ৪৭), পর্বতমালার পেরেকসদৃশ ভারসাম্য রক্ষা এবং সমুদ্রের পানির অন্তরাল সংক্রান্ত তথ্য আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে হুবহু মিলে যায়।
  5. চিরন্তন আইন ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাজবিধান (الإعجاز التشريعي): ব্যক্তিগত নৈতিকতা থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক কূটনীতি পর্যন্ত কুরআনের আইনব্যবস্থা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বিধান।

উপসংহার:
কুরআনের ই’জাজ কোনো নির্দিষ্ট যুগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যত দিন যাচ্ছে, বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কার কুরআনের প্রতিটি সত্যকে মানবজাতির সামনে ভাস্বর করে তুলছে।

৭. ما معنى الوحى لغة واصطلاحا؟ وما الفرق بينه وبين الالهام؟ [ওহীর আভিধানিক-পারিভাষিক অর্থ ও ওহী এবং ইলহামের পার্থক্য]

ভূমিকা:
মহান আল্লাহ ও তাঁর প্রেরিত নবী-রাসূলগণের মধ্যে যোগাযোগ ও প্রত্যাদেশের একমাত্র নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হলো ‘ওহী’। ওহী হলো দ্বীনের সমস্ত জ্ঞানের মূল উৎস, যা মানবজাতিকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে আসে।

১. ওহীর আভিধানিক অর্থ:
‘ওহী’ (الوحي) আরবি শব্দ, যার অর্থ অতি দ্রুত ও গোপনে ইশারা করা, সংকেত দেওয়া, লিখে দেওয়া অথবা অন্যের অন্তরে এমনভাবে কোনো কথা পৌঁছে দেওয়া যা তৃতীয় কেউ বুঝতে পারে না।

২. ওহীর পারিভাষিক সংজ্ঞা:
ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায়, মহান আল্লাহ তাআলা মানবজাতির পথপ্রদর্শনের উদ্দেশ্যে ফেরেশতা জিবরাঈল (আ.)-এর মাধ্যমে বা অন্য কোনো উপায়ে তাঁর মনোনীত নবী ও রাসূলগণের অন্তরে যে শরয়ী বার্তা ও বিধান অবতীর্ণ করেন, তাকে ‘ওহী’ বলা হয়।

৩. ওহী অবতীর্ণ হওয়ার প্রধান মাধ্যমসমূহ:
সূরা আশ-শূরার ৫১ নম্বর আয়াতের আলোকে ওহীর তিনটি রূপ রয়েছে:
১. সরাসরি অন্তরে ইলকা করা বা সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে।
২. পর্দার অন্তরাল থেকে সরাসরি কথা বলার মাধ্যমে (যেমন মূসা আ.-এর সাথে তূর পাহাড়ে)।
৩. ফেরেশতা জিবরাঈল (আ.)-এর মাধ্যমে বার্তা প্রেরণ।

৪. ওহী এবং ইলহামের (الإلهام) মধ্যকার মৌলিক পার্থক্যসমূহ:

পার্থক্যসূচক বিষয় ওহী (الوحي) ইলহাম (الإلهام)
১. প্রাপক কেবল নবী ও রাসূলগণের জন্য নির্দিষ্ট। সাধারণ মুমিন, ওলী বা যে কোনো মানুষের অন্তরে হতে পারে।
২. মাধ্যম ফেরেশতা জিবরাঈল (আ.) বা আল্লাহর সরাসরি সম্বোধন। সরাসরি অন্তরে কোনো শুভ চিন্তার উদয় হওয়া।
৩. শরয়ী দলিল দ্বীনের অকাট্য (ক্বাতঈ) দলিল; এর ওপর আমল ফরজ। কখনো শরীয়তের দলিল নয়; ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রযোজ্য।
৪. নির্ভুলতা শতভাগ নির্ভুল ও শয়তানের প্রভাবমুক্ত। ভ্রান্তি ও শয়তানি প্ররোচনার মিশ্রণ ঘটা সম্ভব।
৫. অস্বীকারের হুকুম ওহী অস্বীকারকারী নির্দ্বিধায় কাফের হয়ে যায়। ইলহাম অস্বীকার করলে ঈমানের কোনো ক্ষতি হয় না।

উপসংহার:
ওহী হলো ইসলামী আকীদা ও শরীয়তের সুপ্রিম অথরিটি। ওহী ব্যতীত মানুষের মনগড়া চিন্তা বা তথাকথিত আধ্যাত্মিক ইলহাম দিয়ে ইসলামের কোনো বিধান রচিত হতে পারে না।

৮. ما المراد باسباب النزول؟ وما اهميتها فى فهم القران؟ [আসবাবে নুযূলের পরিচয় এবং কুরআন অনুধাবনে এর গুরুত্ব]

ভূমিকা:
উলূমুল কুরআনের অন্যতম প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ একটি শাখা হলো ‘ইলমু আসবাবিন নুযূল’ (علم أسباب النزول)। পবিত্র কুরআনের বহু আয়াত কোনো নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, সাহাবীদের প্রশ্ন বা সমসাময়িক সমস্যার সমাধানে অবতীর্ণ হয়েছে। এই প্রেক্ষাপট জানা ব্যতীত আয়াতের সঠিক মর্ম উপলব্ধি করা অসম্ভব।

১. আসবাবে নুযূলের পরিচয়:
‘আসবাব’ শব্দটি ‘সাবাব’ (سبب)-এর বহুবচন, যার অর্থ কারণ বা উপলক্ষ। ‘নুযূল’ (نزول) অর্থ অবতরণ। পারিভাষিক অর্থে—যে সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনা, প্রেক্ষাপট বা প্রশ্নের প্রেক্ষিতে পবিত্র কুরআনের কোনো এক বা একাধিক আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে, তাকে ‘আসবাবে নুযূল’ বা শানে নুযূল বলা হয়।

২. কুরআন অনুধাবনে আসবাবে নুযূলের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা:

  1. আয়াতের সঠিক মর্ম ও উদ্দেশ্য অনুধাবন: ইমাম আল-ওয়াহিদী বলেন, “আয়াতের শানে নুযূল এবং অবতরণের ঐতিহাসিক পটভূমি জানা ব্যতীত তার তাফসির করা অসম্ভব।” যেমন সূরা বাকারার ১১৫ নম্বর আয়াত (فَأَيْنَمَا تُوَلُّوا فَثَمَّ وَجْهُ اللَّهِ)-এর শানে নুযূল না জানলে কেউ মনে করতে পারে যে নামাজের জন্য কেবলার প্রয়োজন নেই; অথচ এটি সফরকালে অন্ধকার রাতে কেবলা নির্ধারণে ভুলের প্রেক্ষাপটে নাজিল হয়েছিল।
  2. শরয়ী হুকুমের অন্তর্নিহিত হিকমত জানা: কোনো আইন কেন বাধ্যতামূলক বা হারাম করা হলো (যেমন মদ হারাম হওয়ার ধারাবাহিক পর্যায়), তা শানে নুযূলের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়।
  3. নির্দিষ্ট ও সাধারণ বিধানের পার্থক্য নির্ণয়: আল্লামা সুয়ূতী বলেন, কোনো আয়াত নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য নাজিল হলেও তার শিক্ষা সর্বজনীন কি না, তা শানে নুযূলের আলোকেই ফকীহগণ নির্ণয় করেন (العبرة بعموم اللفظ لا بخصوص السبب)।
  4. সংশয় ও বিভ্রান্তি নিরসন: কুরআনের বাহ্যিক বিরোধ বা অস্পষ্টতা দূর করতে শানে নুযূল আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করে।

৩. আসবাবে নুযূল জানার প্রামাণ্য মাধ্যম:
আসবাবে নুযূল কোনো মনগড়া যুক্তি বা অনুমানের বিষয় নয়। এটি একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী সাহাবায়ে কেরামের সহীহ রেওয়ায়েত ও সনদের মাধ্যমেই সাব্যস্ত হতে হয়।

উপসংহার:
শানে নুযূল হলো কুরআনের আয়াতসমূহের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। এর সঠিক জ্ঞানের মাধ্যমেই কুরআনের তাফসির চরমপন্থা ও অপব্যাখ্যার হাত থেকে রক্ষা পায়।

৯. ما معنى التفسير لغة واصطلاحا؟ وما الفرق بين التفسير والتأويل؟ [তাফসির ও তাবিলের পরিচয় এবং এদের মধ্যকার মৌলিক পার্থক্য]

ভূমিকা:
মহান আল্লাহর কালাম আল-কুরআনুল কারীমের সঠিক অর্থ, গভীর রহস্য ও অন্তর্নিহিত শিক্ষা মানবজাতির বোধগম্য করে তোলার শাস্ত্রীয় প্রচেষ্টাই হলো ‘ইলমুত তাফসির’। কুরআন অনুধাবনের ক্ষেত্রে তাফসিরের সাথে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে উচ্চারিত আরেকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা হলো ‘তাবিল’। প্রাচীন ও আধুনিক যুগের উলূমুল কুরআনের বিশেষজ্ঞ এবং মুফাসসিরগণের নিকট এই দুই পরিভাষার সংজ্ঞা, স্বরূপ ও পারস্পরিক তুলনামূলক সম্পর্ক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এক শাস্ত্রীয় গবেষণার বিষয়।

১. তাফসিরের শাব্দিক ও পারিভাষিক বিশ্লেষণ:
– শাব্দিক অর্থ: ‘তাফসির’ (التفسير) শব্দটি আরবি ‘ফাসর’ (فسر) ধাতু থেকে ‘তাফঈল’ (تفعيل) ওজনে নিষ্পন্ন হয়েছে, যার আভিধানিক অর্থ উন্মোচন করা, সুস্পষ্ট করা, অনাবৃত করা বা কোনো গোপন বিষয়কে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান করা (الكشف والإظهار والإبانة)।
– পারিভাষিক সংজ্ঞা: ইমাম যারকাশী (র.) তাঁর ‘আল-বুরহান ফী উলূমিল কুরআন’ গ্রন্থে বলেন: “তাফসির হলো এমন এক শাস্ত্র, যার মাধ্যমে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর অবতীর্ণ আল্লাহর কিতাব কুরআনুল কারীমের অর্থ উপলব্ধি করা যায়, এর হুকুম-আহকাম ও হিকমতসমূহ উদঘাটন করা যায় এবং এর শব্দশৈলীর নিহিত তাৎপর্য স্পষ্ট হয়।” আল্লামা সুয়ূতী (র.)-এর মতে, যে শাস্ত্র কুরআনের নাজিলের প্রেক্ষাপট, শানে নুযূল, মাক্কী-মাদানী, নাসিখ-মানসূখ, মুহকাম-মুতাশাবিহ এবং হালাল-হারামের বিশদ ব্যাখ্যা প্রদান করে, তাকে তাফসির বলে।

২. তাবিলের শাব্দিক ও পারিভাষিক বিশ্লেষণ:
– শাব্দিক অর্থ: ‘তাবিল’ (التأويل) শব্দটি ‘আওল’ (أول) ধাতু থেকে নিষ্পন্ন, যার অর্থ মূল উৎসে ফিরিয়ে আনা বা কোনো বিষয়ের চূড়ান্ত পরিণতিতে পৌঁছানো (الرجوع إلى الأصل أو العاقبة)। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: ذَٰلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا – “এটাই উত্তম এবং পরিণামের দিক দিয়ে উৎকৃষ্টতম।” (সূরা আন-নিসা: ৫৯)।
– পারিভাষিক সংজ্ঞা: মুতাকাদ্দিমীন বা প্রাথমিক যুগের মুফাসসিরদের (যেমন ইমাম তাবারী) মতে তাফসির ও তাবিল সমার্থক ছিল। কিন্তু মুতাআখখিরীন বা পরবর্তী যুগের উসূলবিদ ও ফকীহগণের নিকট তাবিলের সুনির্দিষ্ট অর্থ রয়েছে। পরিভাষায়—কোনো আয়াত বা শব্দের প্রত্যক্ষ ও প্রকাশ্য অর্থকে (মা’না জাহির) কোনো শক্তিশালী শরয়ী দলিলের ভিত্তিতে ত্যাগ করে তার অন্তর্নিহিত, রূপক বা দূরবর্তী সম্ভাব্য অর্থ গ্রহণ করাকে ‘তাবিল’ বলা হয়, যা কুরআন ও সুন্নাহর সাধারণ মূলনীতির সাথে সংগতিপূর্ণ।

৩. তাফসির ও তাবিলের মধ্যকার মৌলিক পার্থক্যসমূহ:

পার্থক্যসূচক ক্ষেত্র তাফসির (التفسير) তাবিল (التأويل)
১. অর্থের পরিধি শব্দের প্রকাশ্য, প্রত্যক্ষ ও সরাসরি আভিধানিক অর্থের ব্যাখ্যা। শব্দের অন্তর্নিহিত, রূপক ও গভীর সম্ভাব্য তাৎপর্যের বিশ্লেষণ।
২. নির্ভরতার ভিত্তি রেওয়ায়েত, হাদিস, সাহাবা ও তাবেঈদের বর্ণনার ওপর প্রধানত নির্ভরশীল (রওয়ায়াহ)। গভীর ভাষাগত প্রজ্ঞা, চিন্তাশক্তি ও নীতিমালার আলোকে ইজতিহাদের ওপর নির্ভরশীল (দিরায়াহ)।
৩. নিশ্চয়তার মাত্রা তাফসিরের মাধ্যমে একটি নিশ্চিত ও সুস্পষ্ট অর্থ ব্যক্ত হয়; মুফাসসির দাবি করেন এটিই বক্তব্য। তাবিলের ক্ষেত্রে সম্ভাবনা (জ্বন) ও অনুমানের সুযোগ থাকে; এটি ব্যাখ্যাকারীর ইজতিহাদী মতামত।
৪. প্রয়োগের ক্ষেত্র কুরআনের সকল আয়াত, শব্দমালা ও ঐতিহাসিক কাহিনীর ক্ষেত্রে সাধারণভাবে প্রযোজ্য। বিশেষত মুতাশাবিহাত, রূপক আয়াত ও গভীর তাত্ত্বিক হুকুমের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ।
৫. বিচ্যুতির ঝুঁকি সহীহ সনদে বর্ণিত হলে এতে বিভ্রান্তির সুযোগ থাকে না। সঠিক উসূল না মানলে মনগড়া মতবাদ ও বাতিল ফেরকার অপব্যাখ্যার চরম ঝুঁকি থাকে।

৪. তাবিল গ্রহণের শরিয়তসম্মত শর্তাবলি:
বাতিলপন্থী ও বিভ্রান্ত ফেরকাগুলো তাদের ভ্রান্ত আকিদা প্রচারের জন্য যথেচ্ছ তাবিলের অপব্যবহার করেছে। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের নিকট কোনো আয়াতের তাবিল গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য তিনটি অলঙ্ঘনীয় শর্ত রয়েছে:
১. গ্রহণকৃত অর্থটি অবশ্যই আরবি ভাষার ব্যাকরণ ও সাহিত্যের সাথে সংগতিপূর্ণ হতে হবে।
২. প্রকাশ্য অর্থ পরিত্যাগ করার পেছনে কুরআন, সুন্নাহ বা অকাট্য বুদ্ধিবৃত্তিক দলিলের সুনির্দিষ্ট ভিত্তি থাকতে হবে।
৩. সেই দূরবর্তী অর্থটি যেন শরীয়তের অন্য কোনো অকাট্য নসের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক না হয়।

উপসংহার:
তাফসির হলো কুরআন অনুধাবনের প্রথম ও মৌলিক সোপান, যার মাধ্যমে আয়াতের প্রকাশ্য কাঠামো উন্মোচিত হয়; পক্ষান্তরে তাবিল হলো তার ভেতরের গভীর মুক্তা আহরণের এক প্রজ্ঞাপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক স্তর। উভয় শাস্ত্রের নীতিমালার সঠিক অনুসারী হয়েই কেবল আল-কুরআনের পূর্ণাঙ্গ জ্ঞানভাণ্ডারে প্রবেশ করা সম্ভব।

১০. ما هى العلوم التى يحتاج اليها المفسر؟ [মুফাসসিরের আবশ্যকীয় শর্তাবলি ও প্রয়োজনীয় শাস্ত্রসমূহ]

ভূমিকা:
কুরআনুল কারীম মহান আল্লাহর পবিত্র বাণী। নিজের মনগড়া বুদ্ধি দিয়ে কুরআনের তাফসির করাকে রাসূলুল্লাহ (সা.) কঠোরভাবে হারাম ঘোষণা করেছেন। আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী (র.) তাঁর বিখ্যাত ‘আল-ইতকান ফী উলূমিল কুরআন’ গ্রন্থে একজন যোগ্য মুফাসসির হওয়ার জন্য ১৫টি মৌলিক শাস্ত্রে গভীর পাণ্ডিত্যকে শর্ত করেছেন।

মুফাসসিরের জন্য আবশ্যকীয় প্রধান শাস্ত্রসমূহ:

  1. ইলমুল লুগাত (আরবি ভাষাতত্ত্ব): আরবি ভাষার শব্দকোষ ও ব্যুৎপত্তি সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান, যাতে শব্দের ভুল অর্থ করা না হয়।
  2. ইলমুন নাহু ও সরফ (আরবি ব্যাকরণ ও রূপতত্ত্ব): ব্যাকরণগত ই’রাব ও ক্রিয়ার রূপান্তর পরিবর্তন হলে বাক্যের অর্থ সম্পূর্ণ বদলে যায়, তাই নাহু-সরফে পাণ্ডিত্য অপরিহার্য।
  3. ইলমুল বালাগাত (অলঙ্কারশাস্ত্র – মাআনী, বায়ান ও বাদী): কুরআনের স্বর্গীয় সাহিত্যশৈলী ও অলৌকিকত্ব বোঝার জন্য বালাগাতের জ্ঞান থাকা বাধ্যতামূলক।
  4. ইলমুল ক্বিরাআত (পঠনপদ্ধতি): বিভিন্ন ক্বিরাআতের মাধ্যমে যে অর্থের বৈচিত্র্য সৃষ্টি হয় তা অনুধাবন করা।
  5. ইলমে উসূলে দ্বীন ও আকীদা (ধর্মতত্ত্ব): আল্লাহর সিফাত ও ঈমানী বিষয়ে বিশুদ্ধ আকিদা পোষণ করা, যাতে কোনো ভ্রান্ত ফেরকার প্রভাবে অপব্যাখ্যা না ঘটে।
  6. ইলমু উসূলিল ফিকহ: কুরআনের আয়াত থেকে শরয়ী হুকুম (আম, খাস, মুজমাল, মুফাসসাল) ইস্তিম্বাত করার নিয়ম জানা।
  7. ইলমে আসবাবিন নুযূল: আয়াত নাযিলের প্রেক্ষাপট ও শানে নুযূল সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকা।
  8. ইলমে নাসিখ ও মানসূখ: কোন হুকুমটি বহাল আছে এবং কোনটি রহিত হয়েছে তা স্পষ্টভাবে জানা।
  9. ইলমুল হাদীস ও উসূলে হাদীস: হাদিসের সনদ ও মতন বিশ্লেষণ করে রাসূল (সা.) ও সাহাবাদের সঠিক ব্যাখ্যা গ্রহণ করা।
  10. ইলমুল মাওহিবাহ (ঐশ্বরিক প্রজ্ঞা): যারা অর্জিত ইলম অনুযায়ী আমল করে, আল্লাহ তাদের এই বিশেষ আধ্যাত্মিক দূরদর্শিতা দান করেন।

উপসংহার:
এই শাস্ত্রীয় দক্ষতা ব্যতীত কেউ নিজেকে মুফাসসির দাবি করলে সে উম্মাহকে বিভ্রান্ত করবে। তাই তাফসিরের ময়দানে প্রাচীন মুফাসসিরগণের প্রামাণ্য শাস্ত্রীয় পদ্ধতি অনুসরণ করাই নিরাপদ পথ।

১১. تحدث عن خصائص السور المكية والمدنية. [মাক্কী ও মাদানী সূরার স্বরূপ, পরিচয় ও প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্যাবলি]

ভূমিকা:
পবিত্র কুরআনের ১১৪টি সূরাকে নাযিলের সময় ও স্থানভেদে প্রধানত দুটি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে: মাক্কী ও মাদানী। উলূমুল কুরআনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাস্ত্র হলো মাক্কী ও মাদানীর পরিচয় জানা। এর মাধ্যমে ইসলামের দাওয়াতি কর্মপদ্ধতি ও শরীয়তের আইনের ধারাবাহিক বিবর্তন স্পষ্ট হয়।

১. মাক্কী ও মাদানীর প্রামাণ্য সংজ্ঞা:
মুহাদ্দিস ও মুফাসসিরগণের সর্বসম্মত গ্রহণযোগ্য মত হলো (কালভিত্তিক সংজ্ঞা):
– মাক্কী সূরা: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মদীনায় হিজরতের পূর্বে অবতীর্ণ সকল সূরা বা আয়াতকে ‘মাক্কী’ বলা হয়, তা মক্কায় নাযিল হোক বা মক্কার বাইরে (যেমন তায়েফে বা মিরাজে)।
– মাদানী সূরা: হিজরতের পরবর্তী সময়ে অবতীর্ণ সকল সূরা ও আয়াতকে ‘মাদানী’ বলা হয়, তা মদীনায় নাযিল হোক কিংবা মক্কা বিজয়ের সময় মক্কায় নাযিল হোক।

২. মাক্কী সূরার প্রধান বৈশিষ্ট্যাবলি:
১. আকীদা ও তাওহীদের প্রাধান্য: মাক্কী সূরাগুলোতে আল্লাহর একত্ববাদ, শিরক উচ্ছেদ, আখেরাতের বিচার দিবস, জান্নাত ও জাহান্নামের জীবন্ত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
২. পূর্ববর্তী নবীগণের ইতিহাস: অত্যাচারিত সাহাবীদের সান্ত্বনা দিতে পূর্ববর্তী নবী-রাসূল ও তাদের অবাধ্য জাতির ধ্বংসের ইতিহাস সবিস্তারে বিধৃত হয়েছে।
৩. সংক্ষিপ্ত ও ছন্দময় ওজস্বী ভাষা: মাক্কী আয়াতগুলো আকারে সংক্ষিপ্ত, প্রাঞ্জল এবং কাফেরদের হৃদয় কাঁপানো কঠোর হুঁশিয়ারিতে পূর্ণ।
৪. ‘ইয়া আইয়্যুহান নাস’ দ্বারা সম্বোধন: সমগ্র মানবজাতিকে উদ্দেশ্য করে কথা বলা হয়েছে।
৫. সিজদার আয়াত ও হুরুফে মুকাত্তায়াত: যেসব সূরায় সিজদার আয়াত রয়েছে এবং যেগুলোর শুরুতে হুরুফে মুকাত্তায়াত (যেমন: আলিফ-লাম-মীম) আছে, তার সবই মাক্কী (সূরা বাকারা ও আলে ইমরান ব্যতীত)।

৩. মাদানী সূরার প্রধান বৈশিষ্ট্যাবলি:
১. শরীয়তের অনুশাসন ও দণ্ডবিধি: এতে নামাজ, রোজা, যাকাত, হজ, জিহাদ, উত্তরাধিকার আইন এবং পারিবারিক ও ফৌজদারি দণ্ডবিধি বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে।
২. মুনাফিকদের স্বরূপ উন্মোচন: মদীনায় আত্মপ্রকাশ করা মুনাফিকদের ষড়যন্ত্র ও কুটিলতা সবিস্তারে প্রকাশ করা হয়েছে।
৩. আহলে কিতাবদের সাথে সংলাপ: ইহুদি ও খ্রিস্টানদের বিভ্রান্তি খণ্ডন করে ইসলামের দিকে আহ্বান জানানো হয়েছে।
৪. দীর্ঘ আয়াত ও সহজ বর্ণনাভঙ্গি: আইনি ব্যাখ্যা থাকার কারণে মাদানী আয়াতগুলো তুলনামূলক দীর্ঘ ও বিশ্লেষণধর্মী।
৫. ‘ইয়া আইয়্যুহাল্লাযীনা আমানূ’ সম্বোধন: মুমিনদের ঈমানী দায়িত্ব পালনের নির্দেশ সম্বলিত সম্বোধন।

উপসংহার:
মাক্কী যুগে ঈমানের মজবুত বুনিয়াদ তৈরি করা হয়েছিল এবং মাদানী যুগে সেই বুনিয়াদের ওপর একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার ইমারত নির্মাণ করা হয়েছিল।

১২. بين خصائص القران الكريم بالتفصيل. [পবিত্র কুরআনুল কারীমের অনন্য ও সার্বজনীন বৈশিষ্ট্যাবলি]

ভূমিকা:
পবিত্র কুরআনুল কারীম কোনো পার্থিব মানুষের রচিত সাধারণ গ্রন্থ নয়; এটি নিখিল বিশ্বের প্রতিপালক মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর অবতীর্ণ সর্বশেষ, সর্বশ্রেষ্ঠ এবং শাশ্বত জীবনবিধান। পূর্ববর্তী সকল আসমানী কিতাব ও মানবীয় সাহিত্যের ওপর কুরআনের এমন কিছু অনন্য ও অলৌকিক বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান, যা একে কিয়ামত পর্যন্ত অপরাজেয় ও মানব ইতিহাসের সর্বাধিক পঠিত এবং প্রভাবশালী মহাগ্রন্থে পরিণত করেছে।

পবিত্র কুরআনুল কারীমের অনন্য ও মৌলিক বৈশিষ্ট্যাবলি:

১. প্রত্যক্ষ ঐশ্বরিক বাণী ও অবিকৃত সংরক্ষণ (الحفظ الإلهي والتواتر):
পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবসমূহের সংরক্ষণের দায়িত্ব তৎকালীন উম্মত ও আলেমদের ওপর ন্যস্ত ছিল; ফলে কালের আবর্তে সেগুলোতে মানুষের হস্তক্ষেপে বিকৃতি সাধিত হয়েছে। কিন্তু আল-কুরআনের সংরক্ষণের দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নিজ কুদরতে গ্রহণ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে:
إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ
“নিশ্চয়ই আমিই এই কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং আমি নিজেই এর পরম সংরক্ষক।” (সূরা আল-হিজর: ৯)। বিগত দেড় হাজার বছরের ইতিহাসে কুরআনের একটি নুকতা, হরকত বা হরফেও বিন্দুমাত্র কোনো পরিবর্তন আসেনি।

২. সর্বজনীনতা ও শাশ্বত চিরন্তনতা (العموم والخلود):
অন্যান্য নবীগণের কিতাব ছিল নির্দিষ্ট জাতি, নির্দিষ্ট অঞ্চল বা একটি বিশেষ সময়ের জন্য। পক্ষান্তরে কুরআনুল কারীম কোনো বিশেষ দেশ, ভাষা, গোত্র বা শতাব্দীর জন্য নয়; বরং কিয়ামত পর্যন্ত আগমনকারী প্রতিটি মানুষ ও জিন জাতির সার্বিক মুক্তির চিরন্তন দিশারী। আল্লাহ বলেন: وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا كَافَّةً لِّلنَّاسِ بَشِيرًا وَنَذِيرًا – “আমি আপনাকে সমগ্র মানবজাতির জন্য সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি।” (সূরা সাবা: ২৮)।

৩. মানবজীবনের পূর্ণাঙ্গ ও ভারসাম্যপূর্ণ সংবিধান (الشمولية والكمال):
আল-কুরআন কেবল ব্যক্তিগত উপাসনার কিতাব নয়; এটি মানুষের জীবনের আদ্যোপান্ত সকল দিক পরিচালনা করার এক পূর্ণাঙ্গ জীবনাদর্শ (A Complete Code of Life)। তাওহীদ, রিসালাত ও আখেরাতের মতো আধ্যাত্মিক আকীদা থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক আইন, বিচারব্যবস্থা, রাষ্ট্রনীতি, বাণিজ্য, পারিবারিক শান্তি এবং সমাজ সংস্কার—মানবজাতির প্রতিটি জটিল সমস্যার অকাট্য সমাধান কুরআনে সন্নিবেশিত হয়েছে।

৪. অপূর্ব ভাষাশৈলী ও অলৌকিক ই’জাজ (الإعجاز البياني واللغوي):
কুরআনের ছন্দ, শব্দচয়ন, অলঙ্কার এবং বাগ্মিতা আরবের সেরা সাহিত্যিক ও কবিদের নির্বাক করে দিয়েছিল। সমগ্র মানব ও জিন জাতিকে এই কুরআনের একটি সূরার সমকক্ষ সাহিত্য রচনা করার প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া হয়েছে, যা কিয়ামত পর্যন্ত কেউ গ্রহণ করতে সক্ষম হবে না।

৫. তিলাওয়াতের মাধুর্য ও অলৌকিক মুখস্থকরণ (سهولة التلاوة والحفظ):
আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন: وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِن مُّدَّكِرٍ – “আর নিশ্চয় আমি উপদেশ গ্রহণের জন্য কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি।” (সূরা আল-ক্বামার: ১৭)। বিশ্বের লক্ষ-কোটি কচি শিশু ও কিশোর এই সুবিশাল কিতাবের প্রতিটি শব্দ হুবহু স্মৃতিতে ধারণ করে হাফেজে কুরআন হচ্ছেন, যা অন্য কোনো ধর্মের কোনো ধর্মগ্রন্থে কল্পনাতীত।

৬. অভ্রান্ত বৈজ্ঞানিক তথ্য ও আধুনিক বিজ্ঞানের পরম সামঞ্জস্য:
কুরআন কোনো বিজ্ঞানের বই নয়; অথচ এতে আলোচিত প্রতিটি সৃষ্টিতাত্ত্বিক তথ্য—যেমন মানব ভ্রূণের পর্যায়ক্রমিক বিকাশ, বিগ ব্যাং বা মহাবিশ্ব সৃষ্টি, মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ, পানিচক্র এবং পর্বতমালা কর্তৃক পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষা—আধুনিক বিজ্ঞান গবেষণার সাথে শতভাগ সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রমাণিত হয়েছে।

উপসংহার:
কুরআনুল কারীম হলো আলো, শেফা এবং বিশ্ব মানবতার মহাসনদ। এই মহাগ্রন্থের বিধানকে ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমেই পার্থিব শান্তি এবং পরকালীন চিরস্থায়ী মুক্তি অর্জন সম্ভব।

১৩. عرف النسخ لغة واصطلاحا – ثم تحدث عن كيفيات النسخ وشروطه. [নাসখের পরিচয়, প্রকারভেদ, শর্তাবলি ও ঐতিহাসিক হিকমত]

ভূমিকা:
ইসলামী শরীয়তের বিধানাবলি ক্রমান্বয়ে সহজীকরণ ও মানবজাতির কল্যাণ নিশ্চিত করার এক অনন্য বৈজ্ঞানিক নীতি হলো ‘নাসখ’ (النسخ)। কোন বিধানটি কার্যকর এবং কোনটি পূর্ববর্তী বিধানকে রহিত করেছে, তা জানা ফকীহ ও মুফাসসিরগণের জন্য অপরিহার্য।

১. নাসখের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ:
‘নাসখ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ বিলোপ করা, পরিবর্তন করা, স্থানান্তর করা বা দূর করা। যেমন বলা হয়—সূর্য অন্ধকারের অপনোদন করেছে।
শরীয়তের পরিভাষায়, শরয়ী কোনো পূর্ববর্তী বিধানকে পরবর্তীতে অবতীর্ণ অন্য কোনো শরয়ী দলিলের মাধ্যমে স্থগিত বা রহিত করে নতুন বিধান জারি করাকে ‘নাসখ’ বলা হয়। যে দলিল রহিত করে তাকে ‘নাসিখ’ (الناسخ) এবং যা রহিত হয় তাকে ‘মানসূখ’ (المنسوخ) বলে।

২. নাসখের মৌলিক শর্তাবলি (شروط النسخ):
১. মানসূখ ও নাসিখ উভয়টিই সুস্পষ্ট শরয়ী দলিল (কুরআন বা সুন্নাহ) হতে হবে।
২. নাসিখ হুকুমটি মানসূখের পরে নাযিল হতে হবে।
৩. উভয় বিধানের মধ্যে সমন্বয় সাধনের কোনো অবকাশ না থাকা।
৪. নাসখ কেবল আদেশ ও নিষেধমূলক বিধানে হতে পারে; আকীদা, ঈমান ও ঐতিহাসিক তথ্যে নাসখ হতে পারে না।

৩. কুরআনে নাসখের প্রকারভেদ (كيفيات النسخ):
কুরআন মাজীদে নাসখের তিনটি প্রধান রূপ পরিলক্ষিত হয়:
১. হুকুম রহিত কিন্তু তিলাওয়াত বহাল (نسخ الحكم وبقاء التلاوة): এটিই সবচেয়ে বেশি ঘটেছে। যেমন: বিধবা নারীর এক বছরের ভরণপোষণ সংক্রান্ত আয়াত রহিত হয়ে চার মাস দশ দিনের হুকুম জারি হয়েছে, কিন্তু উভয় আয়াতই কুরআনে তিলাওয়াত করা হয়।
২. তিলাওয়াত রহিত কিন্তু হুকুম বহাল (نسخ التلاوة وبقاء الحكم): যেমন বিবাহিত ব্যভিচারীর পাথর নিক্ষেপে মৃত্যুদণ্ডের বিধান। এর তিলাওয়াত রহিত হলেও শরয়ী হুকুম হিসেবে তা হাদিস ও ইজমা দ্বারা প্রতিষ্ঠিত।
৩. হুকুম ও তিলাওয়াত উভয়ই রহিত (نسخ الحكم والتلاوة معا): যেমন দুধপানের নির্দিষ্ট কিছু সূচনালগ্নের শর্ত যা পরবর্তীতে রহিত হয়ে গেছে।

৪. নাসখের অন্তর্নিহিত হিকমত:
১. জাহেলী সমাজকে ধাপে ধাপে মদ্যপান ও অন্যায়ের অভ্যাস থেকে মুক্ত করা (তাদ্দারুজ)।
২. উম্মতের ওপর শরীয়তের বোঝা সহজ করা এবং তাদের পরীক্ষা নেওয়া।

উপসংহার:
নাসখ কোনো দুর্বলতা নয়; বরং এটি মানবজাতির মানসিক বিকাশ ও প্রয়োজনানুযায়ী মহান আল্লাহর এক পরম প্রজ্ঞাপূর্ণ ব্যবস্থা।

১৪. اكتب عن اول ما نزل واخر ما نزل من القران الكريم بالتحقيق. [কুরআনের প্রথম ও শেষ অবতীর্ণ আয়াতের প্রামাণ্য তাহক্বীক্ব]

ভূমিকা:
কুরআনের প্রথম ও শেষ আয়াত জানা উলূমুল কুরআনের অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও গবেষণাধর্মী অধ্যায়। এর মাধ্যমে ওহীর সূচনা ও সমাপ্তির কালরেখা নির্ধারিত হয় এবং শরীয়তের পূর্ণাঙ্গতার প্রমাণ পাওয়া যায়।

১. সর্বসম্মত প্রামাণ্য মতে প্রথম অবতীর্ণ আয়াত:
মুহাদ্দিস ও মুফাসসিরগণের অকাট্য ঐকমত্য অনুযায়ী, নবুওয়াতের সূচনালগ্নে হেরা গুহায় জিবরাঈল (আ.)-এর মাধ্যমে সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয় সূরা আল-আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াত:
اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ – خَلَقَ الْإِنسَانَ مِنْ عَلَقٍ – اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ – الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ – عَلَّمَ الْإِنسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ
সহীহ বুখারীতে হযরত আয়েশা (রা.) থেকে এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ এসেছে। এর মাধ্যমে মানবজাতির জন্য জ্ঞান ও কলমের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা দিয়ে ওহীর যাত্রা শুরু হয়।

২. পূর্ণাঙ্গ সূরা হিসেবে প্রথম কোনটি?
পূর্ণাঙ্গ সূরা হিসেবে সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়েছে সূরা আল-ফাতিহা অথবা সূরা আল-মুদ্দাসসির। তবে খণ্ডাংশ হিসেবে সূরা আলাকের প্রথম ৫ আয়াতই সর্বপ্রথম।

৩. সর্বশেষ অবতীর্ণ আয়াত সম্পর্কিত তাহক্বীক্ব:
কুরআনের শেষ আয়াত কোনটি—এ বিষয়ে সাহাবা ও তাবিঈগণের মাঝে কয়েকটি বর্ণনা রয়েছে, যার মধ্যে সর্বাধিক বিশুদ্ধ অভিমত হলো:
ক. ইমাম বুখারী ও ইবনে আব্বাস (রা.)-এর সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য মত:
কুরআনের সর্বশেষ অবতীর্ণ আয়াত হলো সূরা আল-বাকারার ২৮১ নম্বর আয়াত:
وَاتَّقُوا يَوْمًا تُرْجَعُونَ فِيهِ إِلَى اللَّهِ ۖ ثُمَّ تُوَفَّىٰ كُلُّ نَفْسٍ مَّا كَسَبَتْ وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ
অর্থ: “আর তোমরা সেই দিনকে ভয় কর, যেদিন তোমাদের সবাইকে আল্লাহর কাছে ফিরিয়ে নেওয়া হবে। অতঃপর প্রত্যেক প্রাণীকে তার অর্জিত কর্মের পূর্ণ প্রতিফল দেওয়া হবে এবং তাদের প্রতি কোনো জুলুম করা হবে না।”
এই আয়াত নাযিলের মাত্র কয়েকদিন (মতান্তরে ৯ বা ২১ দিন) পর রাসূলুল্লাহ (সা.) ওফাত লাভ করেন।
খ. সূরা মায়েদার ৩ নম্বর আয়াত (اليَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ):
বিদায় হজের আরাফাতের ময়দানে এই আয়াতটি নাযিল হয়। এটি ছিল দ্বীনের মৌলিক বিধিবিধান ও আহকামের দিক থেকে সর্বশেষ আয়াত; অর্থাৎ এরপর আর কোনো হালাল বা হারামের হুকুম নাযিল হয়নি।

উপসংহার:
জ্ঞান অর্জনের নির্দেশ (اقْرَأْ) দিয়ে যে কুরআনের সূচনা হয়েছিল, পরকালীন জবাবদিহিতা ও তাকওয়ার চূড়ান্ত স্মরণ (وَاتَّقُوا يَوْمًا) দিয়ে তার পরিসমাপ্তি ঘটেছে। এটি প্রমাণ করে জ্ঞান ও তাকওয়ার সমন্বয়ই মানবজীবনের মূল উদ্দেশ্য।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

ফাযিল ৩য় বর্ষের ইসলামিক স্টাডিজ ১ম পত্রের বিষয় কোড কত?

ফাযিল (স্নাতক) পাস ৩য় বর্ষের ইসলামিক স্টাডিজ ১ম পত্রের বিষয় কোড হলো ৪১৬।

ইসলামিক স্টাডিজ ১ম পত্রের প্রধান সিলেবাসভুক্ত বিষয়বস্তু কী কী?

এই পত্রের মূল সিলেবাসভুক্ত বিষয় হলো নির্বাচিত তাফসির (সূরা আন-নূর, সূরা মুহাম্মদ, সূরা আল-হুজুরাত ও সূরা আল-কাসাস) এবং উলূমুল কুরআনের মূলনীতি।

কুরআনের প্রথম এবং সর্বশেষ অবতীর্ণ আয়াত কোনটি?

সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয় সূরা আলাকের প্রথম ৫ আয়াত (ইকরা…) এবং সর্বাধিক বিশুদ্ধ মতানুযায়ী সর্বশেষ অবতীর্ণ হয় সূরা বাকারার ২৮১ নং আয়াত (ওয়াত্তাকূ ইয়াওমান…)।

মাক্কী ও মাদানী সূরার মধ্যে মৌলিক পার্থক্যের মাপকাঠি কী?

হিজরতের কালরেখাই মূল মাপকাঠি; হিজরতের পূর্বে অবতীর্ণ সূরা মাক্কী এবং হিজরতের পরে অবতীর্ণ সকল সূরা মাদানী।

হদ্দুল কাযাফ বা মিথ্যা অপবাদের শাস্তি কী?

মিথ্যা অপবাদকারীকে জনসম্মুখে ৮০টি বেত্রাঘাত করতে হবে এবং আজীবনের জন্য তার সাক্ষ্য প্রদানের নাগরিক অধিকার বাতিল হবে।

২০ নম্বরের প্রশ্নের উত্তরে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ার কৌশল কী?

ভূমিকা, বিশুদ্ধ আরবি আয়াত ও অর্থ, শানে নুযূল, অন্তত ৫-৭টি সুস্পষ্ট তাত্ত্বিক পয়েন্ট এবং উপসংহার সুবিন্যস্তভাবে লিখলে পূর্ণ নম্বর পাওয়া যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *