ফাজিল স্নাতক (সম্মান) চতুর্থ বর্ষ পরীক্ষা – ২০২০
বিভাগ: আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: হাদিরুল আলামিল ইসলামী / সমকালীন মুসলিম বিশ্ব (حاضر العالم الإسلامي)
বিষয় কোড: ৪১১ | প্রশ্নপত্র কোড: ১৬৭ | পরীক্ষা কোড: ২০৪
সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০
নির্দেশনা: পরীক্ষায় মোট ৮টি প্রশ্ন থেকে যে কোনো ৫টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ একাডেমিক সহায়তা ও সর্বোচ্চ সাফল্যের সুবিধার্থে নিম্নে প্রতিটি প্রশ্নের তথ্যবহুল, আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিসম্মত ও তাহকীকভিত্তিক সমাধান উপস্থাপন করা হলো।
١- عرف العالم الاسلامي- ثم اذكر اسماء الدول المسلمة في قارة الإسيا مع ذكر عاصمتهم-
‘আল-আলামুল ইসলামী’ (মুসলিম বিশ্ব)-এর পরিচয় দাও। অতঃপর এশিয়া মহাদেশের মুসলিম দেশগুলোর রাজধানীর নামসহ উল্লেখ কর।
ভূমিকা
বিশ্বরাজনীতি ও ভূ-কৌশলগত প্রেক্ষাপটে ‘মুসলিম বিশ্ব’ (The Muslim World) এক অত্যন্ত প্রভাবশালী ও সুবিশাল সত্ত্বা। প্রাকৃতিক সম্পদ, ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের দিক থেকে মুসলিম দেশসমূহ বৈশ্বিক সভ্যতার এক অপরিহার্য অংশ হিসেবে স্বীকৃত।
(ক) العالم الإسلامي (মুসলিম বিশ্ব)-এর পরিচয় ও বিস্তৃতি
- শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ: ‘আল-আলাম’ অর্থ বিশ্ব বা জগৎ এবং ‘আল-ইসলামী’ অর্থ ইসলাম সম্পর্কিত। পরিভাষায়—বিশ্বের যেসকল রাষ্ট্রে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, অথবা যেসকল রাষ্ট্র ইসলামী শাসনব্যবস্থা দ্বারা পরিচালিত, কিংবা যেসব দেশ আন্তর্জাতিক মুসলিম সংস্থা ‘অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশন’ (OIC)-এর পূর্ণ সদস্য—তাদের সম্মিলিত রাজনৈতিক, ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক বলয়কে ‘মুসলিম বিশ্ব’ বলা হয়।
- ভৌগোলিক পরিধি ও আয়তন: মুসলিম বিশ্বের ভৌগোলিক বিস্তৃতি আটলান্টিক মহাসাগরের তীরবর্তী মরক্কো থেকে শুরু করে প্রশান্ত মহাসাগরের কোল ঘেঁষা ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত। এর মোট ভৌগোলিক আয়তন প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ বর্গকিলোমিটার, যা পৃথিবীর মোট স্থলভাগের প্রায় ২২%।
- জনসংখ্যা ও সম্পদ: বর্তমানে বিশ্বে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ১৯০ কোটিরও অধিক (বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় ২৫%)। ৫৭টি মুসলিম স্বাধীন রাষ্ট্রের সমন্বয়ে এই বিশ্ব গঠিত। বিশ্বের মোট প্রমাণিত জ্বালানি তেলের প্রায় ৬০% এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ৪০% মুসলিম বিশ্বের ভূখণ্ডে সঞ্চিত রয়েছে। এছাড়াও সুয়েজ খাল, বাবুল মান্দেব, হরমুজ প্রণালী ও মালাক্কা প্রণালীর মতো বিশ্বের প্রধান সামুদ্রিক বাণিজ্য পথসমূহ মুসলিম বিশ্বের নিয়ন্ত্রণাধীন।
(খ) এশিয়া মহাদেশের মুসলিম দেশসমূহ ও তাদের রাজধানী
এশিয়া হলো বিশ্বের বৃহত্তম ও সর্বাধিক মুসলিম জনসংখ্যার মহাদেশ। এশিয়া মহাদেশের মুসলিম দেশসমূহকে তাদের আঞ্চলিক অবস্থানের ভিত্তিতে নিম্নে রাজধানীসহ তালিকাভুক্ত করা হলো:
| অঞ্চল | ক্রমিক | দেশের নাম | রাজধানীর নাম | বিশেষ ভৌগোলিক গুরুত্ব |
|---|---|---|---|---|
| ১. দক্ষিণ এশিয়া (South Asia) |
১ | বাংলাদেশ | ঢাকা | বিশ্বের ৪র্থ বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যার দেশ ও বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত কেন্দ্র। |
| ২ | পাকিস্তান | ইসলামাবাদ | মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। | |
| ৩ | আফগানিস্তান | কাবুল | মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার মিলনস্থল ও ঐতিহাসিক পার্বত্য দুর্গ। | |
| ৪ | মালদ্বীপ | মালে | ভারত মহাসাগরের ১০০% মুসলিম দ্বীপরাষ্ট্র। | |
| ২. দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া (Southeast Asia) |
৫ | ইন্দোনেশিয়া | জাকার্তা (নতুন: নুসানতারা) | বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যার দেশ (প্রায় ২৩ কোটি মুসলিম)। |
| ৬ | মালয়েশিয়া | কুয়ালালামপুর (প্রশাসনিক: পুত্রজায়া) | উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক মুসলিম অর্থনৈতিক শক্তি। | |
| ৭ | ব্রুনাই দারুসসালাম | বন্দর সেরি বেগাওয়ান | তেল সম্পদে সমৃদ্ধ শান্ত ও ধনী ইসলামী সালতানাত। | |
| ৩. মধ্য এশিয়া (Central Asia) |
৮ | কাজাখস্তান | আস্তানা (নুর-সুলতান) | মুসলিম বিশ্বের বৃহত্তম আয়তনের দেশ (ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ)। |
| ৯ | উজবেকিস্তান | তাশখন্দ | ইমাম বুখারী ও তিরমিযী (রহ.)-এর স্মৃতিধন্য ঐতিহাসিক কেন্দ্র। | |
| ১০ | তুর্কমেনিস্তান | আশগাবাত | বিশাল প্রাকৃতিক গ্যাস ভাণ্ডারের অধিকারী দেশ। | |
| ১১ | কিরগিজস্তান | বিশকেক | তিয়ানশান পর্বতবেষ্টিত মধ্য এশিয়ার মুসলিম প্রজাতন্ত্র। | |
| ১২ | তাজিকিস্তান | দুশানবে | পামির মালভূমির কোল ঘেঁষা পারসিক সংস্কৃতির মুসলিম দেশ। | |
| ৪. পশ্চিম এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য (Middle East) |
১৩ | সৌদি আরব | রিয়াদ | মক্কা-মদীনার পুণ্যভূমি ও বৈশ্বিক মুসলিম নেতৃত্বের কেন্দ্র। |
| ১৪ | তুরস্ক | আঙ্কারা | ইউরোপ ও এশিয়ার সেতুবন্ধন এবং ন্যাটো জোটের একমাত্র মুসলিম সদস্য। | |
| ১৫ | ইরান | তেহরান | প্রাচীন পারস্য সভ্যতার উত্তরাধিকারী শক্তিশালী আঞ্চলিক শক্তি। | |
| ১৬ | ইরাক | বাগদাদ | দজলা-ফোরাত অববাহিকার আব্বাসীয় খেলাফতের ঐতিহাসিক কেন্দ্র। | |
| ১৭ | সিরিয়া | দামেস্ক | উমাইয়া খেলাফতের রাজধানী ও প্রাচীন শাম দেশের কেন্দ্র। | |
| ১৮ | ফিলিস্তিন | আল-কুদস (জেরুজালেম) | পবিত্র মসজিদুল আক্বসা ও আম্বিয়াদের পুণ্যভূমি। | |
| ১৯ | জর্ডান | আম্মান | পবিত্র কুদসের ঐতিহাসিক ধর্মীয় অভিভাবক দেশ। | |
| ২০ | লেবানন | বৈরুত | ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের বহুসংস্কৃতির দেশ। | |
| ২১ | সংযুক্ত আরব আমিরাত | আবুধাবি | মধ্যপ্রাচ্যের বাণিজ্যিক ও আধুনিক পর্যটনের রাজধানী। | |
| ২২ | কাতার | দোহা | এলএনজি গ্যাস রপ্তানিকারক ধনী দেশ ও বৈশ্বিক কূটনীতির কেন্দ্র। | |
| ২৩ | কুয়েত | কুয়েত সিটি | পারস্য উপসাগরের সমৃদ্ধ তেল উৎপাদক দেশ। | |
| ২৪ | ওমান | মাসকাট | আরব সাগরের তীরের ভারসাম্যপূর্ণ নিরপেক্ষ কূটনীতির দেশ। | |
| ২৫ | বাহরাইন | মানামা | উপসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র ও প্রাচীন দিলমুন সভ্যতার কেন্দ্র। | |
| ২৬ | ইয়েমেন | সানা | আরব সভ্যতার প্রাচীনতম উৎস ও বাবুল মান্দেবের প্রবেশদ্বার। | |
| ৫. ককেশাস অঞ্চল | ২৭ | আজারবাইজান | বাকু | কাস্পিয়ান সাগরের তীরে তেল ও গ্যাসসমৃদ্ধ তুর্কি ভাষাভাষী দেশ। |
উপসংহার
এশিয়া মহাদেশের এই ২৭টি মুসলিম রাষ্ট্র একদিকে তাদের আধ্যাত্মিক ঐক্য, অন্যদিকে বিপুল প্রাকৃতিক ও মানবসম্পদের কারণে সমগ্র বিশ্বের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী অবস্থান ধরে রেখেছে।
٢- بين التحديات الرئيسية التي تواجهها الدول المسلمة في العالم الحاضر-
বর্তমান যুগে মুসলিম দেশসমূহ প্রধানত যেসব সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে তা সবিস্তারে আলোচনা কর।
ভূমিকা
বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মুসলিম বিশ্ব নানা দিক থেকে এক চরম সংকটময় সন্ধিক্ষণ অতিক্রম করছে। বিপুল ভূখণ্ড, কোটি কোটি জনশক্তি এবং অপরিমেয় খনিজ সম্পদের মালিক হওয়া সত্ত্বেও মুসলিম উম্মাহ বর্তমানে অর্থনৈতিক দুর্বলতা, অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ এবং বহিরাগত পরাশক্তিদের আধিপত্যের নির্মম শিকারে পরিণত হয়েছে।
বর্তমান মুসলিম বিশ্বের প্রধান প্রধান সংকটসমূহ (التحديات الرئيسية)
১. রাজনৈতিক সংকট ও সুশাসনের অভাব
মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই স্থিতিশীল গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও জবাবদিহিতামূলক সুশাসনের প্রচণ্ড অভাব রয়েছে। কোথাও রাজতন্ত্র, কোথাও আজীবন সামরিক একনায়কতন্ত্র এবং কোথাও নামকাওয়াস্তে নির্বাচন ব্যবস্থা জনগণের মৌলিক নাগরিক অধিকারকে অবদমিত করে রেখেছে। ফলে রাজনৈতিক অস্থিরতা, ক্ষমতা দখলের সংঘাত এবং গৃহযুদ্ধ মুসলিম দেশকে পঙ্গু করে দিচ্ছে (যেমন লিবিয়া, সিরিয়া, সুদান ও ইয়েমেন)।
২. আদর্শিক অনৈক্য ও চরম ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত
মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য ও সংহতির কোনো বাস্তব কাঠামো নেই। অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশন (OIC) আজ কেবল নামসর্বস্ব কাগুজে সংস্থায় পরিণত হয়েছে। জাতিগত অহংকার (আরব-অনাবরব), মাজহাবগত মেরুকরণ (সুন্নি-শিয়া উত্তেজনা) এবং আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে মুসলিম দেশগুলো নিজেদের ভেতরে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে।
৩. বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গবেষণায় চরম অনগ্রসরতা
জ্ঞানের যে মশালের মাধ্যমে মুসলিমরা একসময় বিশ্বে নেতৃত্ব দিয়েছিল, আজ মুসলিম বিশ্ব সেই জ্ঞান-বিজ্ঞান ও গবেষণায় সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে। বিশ্বের শীর্ষ ৫০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় মুসলিম বিশ্বের প্রতিনিধিত্ব নগণ্য। মুসলিম দেশগুলো এখনো তাদের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, আধুনিক সফটওয়্যার, চিকিৎসা প্রযুক্তি এবং ভারী শিল্পের জন্য সম্পূর্ণভাবে পশ্চিমা ও পূর্ব এশিয়ার ওপর নির্ভরশীল।
৪. অর্থনৈতিক বৈষম্য ও পরনির্ভরশীলতা
মুসলিম বিশ্বের একটি ক্ষুদ্র অংশ (উপসাগরীয় তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো) অঢেল বিত্তের অধিকারী হলেও অপর একটি বৃহৎ অংশ (সোমালিয়া, নাইজার, আফগানিস্তান, চাদ) চরম দারিদ্র্য ও ঋণের বোঝায় জর্জরিত। তাছাড়া মুসলিম দেশগুলোর বাণিজ্য পরস্পরের মধ্যে আবর্তিত হয় না; তারা তাদের বিপুল পেট্রো-ডলার পশ্চিমা ব্যাংকে বিনিয়োগ করে, যা শেষ পর্যন্ত মুসলিম বিশ্বের স্বার্থের বিরুদ্ধেই ব্যবহৃত হয়।
৫. আন্তর্জাতিক পরাশক্তিদের হস্তক্ষেপ ও কৃত্রিম মানচিত্র
মধ্যপ্রাচ্যের তেল এবং ভৌগোলিক করিডোর নিয়ন্ত্রণের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও চীনের মতো পরাশক্তিগুলো মুসলিম দেশগুলোতে নিয়মিত সামরিক ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ চালিয়ে যাচ্ছে। ‘সাইকস-পিকট চুক্তি’ (Sykes-Picot Agreement)-র মাধ্যমে অটোমান সাম্রাজ্য ভেঙে যেভাবে কৃত্রিম সীমানা টানা হয়েছিল, সেই ক্ষত আজও মুসলিম জাতিকে বিভক্ত করে রেখেছে।
৬. ফিলিস্তিন ও কাশ্মীরের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষত
মুসলিম উম্মাহর হৃদপিণ্ড হলো পবিত্র মসজিদুল আক্বসা। অথচ সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে ফিলিস্তিনের নিরীহ মুসলমানরা ইহুদিবাদী ইসরায়েলের বর্বর দখলদারিত্ব, নির্বিচার বোমাবর্ষণ ও গণহত্যার শিকার হচ্ছে। আরব ও মুসলিম দেশগুলোর অনৈক্যের সুযোগে ইসরায়েল তার আগ্রাসন দিন দিন বাড়িয়ে চলেছে। একইভাবে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর ও চীনের উইঘুর মুসলিমরা আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার থেকে বঞ্চিত।
৭. ইসলামোফোবিয়া ও আদর্শিক আগ্রাসন
পাশ্চাত্যের গণমাধ্যম ও চিন্তাবিদরা পরিকল্পিতভাবে ইসলামকে সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রবাদের সমার্থক বানিয়ে ‘ইসলামোফোবিয়া’ তৈরি করেছে। পাশাপাশি ভোগবাদী সংস্কৃতি, নাস্তিক্যবাদ ও পশ্চিমা চরম ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ মুসলিম যুবসমাজের ঈমানী ও নৈতিক মূল্যবোধকে তছনছ করে দিচ্ছে।
উপসংহার
এই জটিল সংকট থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হলো—পবিত্র কুরআনের নির্দেশ অনুযায়ী ﴿وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا﴾ (তোমরা সকলে মিলে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং পরস্পর বিভক্ত হয়ো না)—তাওহীদের ভিত্তিতে অটুট ঐক্য গড়ে তোলা এবং বিজ্ঞান, শিক্ষা ও অর্থনীতিতে আত্মনির্ভরশীল হওয়া।
٣- بين السياسة الخارجية الحالية للمملكة العربية السعودية بالتفصيل-
সৌদি আরবের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতি (السياسة الخارجية الحالية للمملكة العربية السعودية) বিস্তারিতভাবে বর্ণনা কর।
ভূমিকা
সৌদি আরব কেবল তেলসমৃদ্ধ একটি প্রভাবশালী রাষ্ট্রই নয়; বরং মক্কা ও মদীনার দুই পবিত্র মসজিদের খাদেম (খাদিমুল হারামাইন) হিসেবে মুসলিম বিশ্বের এক অবিসংবাদিত নেতা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাদশাহ সালমান বিন আব্দুল আজীজ এবং ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে সৌদি পররাষ্ট্রনীতিতে এক বৈপ্লবিক ও যুগান্তকারী রূপান্তর (Strategic Transformation) সাধিত হয়েছে।
সৌদি আরবের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতির মূল স্তম্ভ ও বৈশিষ্ট্যসমূহ
১. কৌশলগত বহুমুখীকরণ ও পূর্বমুখী নীতি (Pivot to the East)
ঐতিহাসিকভাবে ১৯৪৫ সালে বাদশাহ আব্দুল আজীজ ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের ঐতিহাসিক চুক্তির পর থেকে সৌদি আরব ছিল শতভাগ মার্কিনপন্থি। কিন্তু বর্তমান সৌদি নেতৃত্ব একক মার্কিন নির্ভরতা থেকে বের হয়ে এক স্বাধীন ও বহুমুখী ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করেছে:
- চীনের সাথে কৌশলগত অংশীদারিত্ব: চীন এখন সৌদি আরবের বৃহত্তম তেল ক্রেতা। ২০২২ সালে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ঐতিহাসিক রিয়াদ সফর এবং পেট্রো-ইউয়ানে লেনদেনের সম্ভাবনা সৌদি-চীন সম্পর্ককে অনন্য উচ্চতায় নিয়েছে।
- ব্রিকস (BRICS)-এ সম্পৃক্ততা: বিশ্ব অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণের অংশ হিসেবে সৌদি আরব উদীয়মান অর্থনীতির জোট ব্রিকস-এ যুক্ত হয়েছে।
- রাশিয়ার সাথে ওপেক প্লাস (OPEC+) চুক্তি: মার্কিন চাপ উপেক্ষা করে তেলের বৈশ্বিক বাজার স্থিতিশীল রাখতে সৌদি আরব মস্কোর সাথে ঘনিষ্ঠ জ্বালানি নীতি বজায় রেখেছে।
২. আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমন ও ঐতিহাসিক সৌদি-ইরান সমঝোতা
২০২৩ সালের ১০ই মার্চ বেইজিংয়ের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার মাধ্যমে দীর্ঘ সাত বছরের কূটনৈতিক বৈরিতার অবসান ঘটে এবং তেহরান ও রিয়াদে দূতাবাস পুনরায় চালু হয়। এর ফলে ইয়েমেনে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয় এবং মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত হ্রাসের পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
৩. সিরিয়ার আরব লীগে প্রত্যাবর্তন ও আঞ্চলিক একীকরণ
এক দশক ধরে চলা কূটনৈতিক বয়কট ভেঙে সৌদি আরবের উদ্যোগে সিরিয়াকে পুনরায় আরব লীগে ফিরিয়ে আনা হয় এবং প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ রিয়াদ সম্মেলনে যোগ দেন। এটি প্রমাণ করে সৌদি আরব এখন অঞ্চলের সমস্যা অঞ্চলে আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করতে চায়।
৪. ‘ভিশন ২০৩০’ (Vision 2030) কেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কূটনীতি
সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ ‘ভিশন ২০৩০’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নিওম সিটি (NEOM), রেড সি প্রজেক্ট ও আধুনিক প্রযুক্তি শিল্পের জন্য বৈশ্বিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করাই এখন পররাষ্ট্রনীতির প্রধান লক্ষ্য। তাই শান্ত ও স্থিতিশীল আঞ্চলিক পরিবেশ বজায় রাখা সৌদি কূটনীতির সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
৫. ফিলিস্তিন ইস্যু ও দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের অনড় অবস্থান
পশ্চিমারা সৌদি-ইসরায়েল কূটনৈতিক স্বাভাবিকীকরণের (Abraham Accords) প্রচণ্ড চাপ দেওয়া সত্ত্বেও সৌদি নেতৃত্ব স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে—১৯৬৭ সালের সীমান্ত অনুযায়ী পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ছাড়া ইসরায়েলের সাথে কোনো আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক স্থাপন করা হবে না। গাজায় ইসরায়েলী বর্বর গণহত্যার বিরুদ্ধে সৌদি আরব নিয়মিত আরব-ইসলামী শীর্ষ সম্মেলনের নেতৃত্ব দিয়ে আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে তুলেছে।
৬. আন্তর্জাতিক শান্তি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উত্থান
সৌদি আরব এখন বৈশ্বিক সংঘাত নিরসনের বিশ্বস্ত মঞ্চ হয়ে উঠছে:
- সুদানে গৃহযুদ্ধরত দুই জেনারেলের মধ্যে শান্তি আলোচনায় ‘জেদ্দা প্ল্যাটফর্ম’ গঠন।
- রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের যুদ্ধবন্দি বিনিময়ে মধ্যস্থতা এবং জেদ্দায় ইউক্রেন শান্তি সম্মেলন আয়োজন।
উপসংহার
সৌদি আরবের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতি আর কোনো পরাশক্তির অন্ধ অনুসারী নয়; বরং তা জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, আঞ্চলিক শান্তি এবং স্বাধীন আন্তর্জাতিক নেতৃত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত এক অত্যন্ত পরিণত ও বাস্তববাদী কূটনীতি।
٤- اكتب رأيك عن مستقبل الروهينجا في بنغلاديش ودور حكومة ميانمار في اعادتهم الى ميانمار-
বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ এবং মায়ানমারে তাদের প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে মায়ানমার সরকারের ভূমিকা সম্পর্কে তোমার নিজস্ব মতামত ব্যক্ত কর।
ভূমিকা
২০১৭ সালের আগস্ট মাসে মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির বর্ণবাদী সেনাবাহিনী ও চরমপন্থী মগ মিলিশিয়াদের বর্বরোচিত জাতিগত নিধনযজ্ঞ ও গণহত্যার (Ethnic Cleansing and Genocide) শিকার হয়ে প্রায় আট লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। পূর্বে আসা রোহিঙ্গাসহ বর্তমানে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ এবং নোয়াখালীর ভাসানচরে প্রায় ১২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা মানবেতর জীবনযাপন করছে। এটি বাংলাদেশের ওপর এক চরম ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছে।
(ক) বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সুচিন্তিত মতামত
একজন সচেতন গবেষক ও নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আমার মতামত নিম্নরূপ:
- স্থায়ী পুনর্বাসন অসম্ভব ও আত্মঘাতী: বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। বিপুল এই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে রেখে দেওয়া বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য মারাত্মক হুমকি। অতএব তাদের স্থায়ী বসবাসের কোনো সুযোগ নেই।
- পরিবেশগত ও স্থানীয় বিপর্যয়: উখিয়া-টেকনাফের হাজার হাজার একর সংরক্ষিত বনাঞ্চল উজাড় হয়ে গেছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে গেছে এবং স্থানীয় বাঙালি জনগোষ্ঠী নিজ ভূমে সংখ্যালঘু হয়ে চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে।
- আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার ঝুঁকি: ক্যাম্পগুলোতে মাদক চোরাচালান (ইয়াবা), মানবপাচার, অস্ত্রবাজি এবং সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর (যেমন আরসা ও আরএসও) আধিপত্য বিস্তার দেশের সামগ্রিক অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে হুমকিতে ফেলেছে।
- আন্তর্জাতিক তহবিলের ঘাটতি: ইউক্রেন যুদ্ধ ও গাজা সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলো (UNHCR, WFP) রোহিঙ্গাদের খাদ্য সহায়তার বাজেট ক্রমশ কমিয়ে দিচ্ছে, যা ভবিষ্যতে মারাত্মক মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনবে।
- একমাত্র সমাধান টেকসই প্রত্যাবাসন: রোহিঙ্গাদের জন্য সবচেয়ে উজ্জ্বল ও একমাত্র যৌক্তিক ভবিষ্যৎ হলো—নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তাসহ তাদের নিজ পৈতৃক ভূমি আরাকানে (রাখাইনে) দ্রুত ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তন।
(খ) রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে মায়ানমার সরকারের ভূমিকা
মায়ানমার সরকার শুরু থেকেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রশ্নে চরম কপটতা, প্রতারণা ও মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়ে আসছে:
| ক্ষেত্র | মায়ানমার সরকারের ভূমিকা ও অপকৌশল |
|---|---|
| ১. নাগরিকত্ব অস্বীকার | ১৯৮২ সালের বৈষম্যমূলক নাগরিকত্ব আইনের অজুহাতে তারা রোহিঙ্গাদের মায়ানমারের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে না; বরং তাদের ‘বাঙালি অনুপ্রবেশকারী’ বলে আখ্যায়িত করে। |
| ২. দ্বিপাক্ষিক চুক্তির টালবাহানা | ২০১৭ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের সাথে প্রত্যাবাসন চুক্তি করলেও বিগত সাত বছরে মায়ানমার একজন রোহিঙ্গাকেও ফিরিয়ে নেয়নি। প্রতিবারই তালিকার সত্যতা যাচাইয়ের নামে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি করেছে। |
| ৩. রাখাইনে নিরাপদ পরিবেশ তৈরিতে ব্যর্থতা | রোহিঙ্গাদের ফেলে আসা বাড়িঘর আগুনে পুড়িয়ে সেখানে সেনা ছাউনি ও বৌদ্ধ বসতি স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে এখনো চলাচলের স্বাধীনতা নেই এবং মৌলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়নি। |
| ৪. বর্তমান গৃহযুদ্ধ ও জান্তা সরকারের সংকট | ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর জান্তা সরকার মায়ানমারজুড়ে কোণঠাসা। বর্তমানে রাখাইনের অধিকাংশ অঞ্চল আরাকান আর্মি (Arakan Army) দখল করে নেওয়ায় জান্তা সরকারের প্রত্যাবাসন বাস্তবায়নের কার্যকর সক্ষমতা আরও হ্রাস পেয়েছে। |
| ৫. আন্তর্জাতিক আদালতের নির্দেশ অমান্য | আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ)-এ গাম্বিয়ার দায়েরকৃত মামলায় মায়ানমারকে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের নির্দেশ দেওয়া হলেও তারা তা পুরোপুরি অগ্রাহ্য করছে। |
বাংলাদেশের কূটনৈতিক করণীয়
- চীন ও ভারতের ওপর সর্বোচ্চ কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা, যাতে তারা তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থেই মায়ানমার জান্তা ও আরাকান আর্মিকে প্রত্যাবাসনে বাধ্য করে।
- জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আদালতে গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা এবং মিয়ানমার সামরিক জান্তার ওপর কঠোর আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও সামরিক নিষেধাজ্ঞা নিশ্চিত করা।
উপসংহার
রোহিঙ্গা সংকট কেবল বাংলাদেশের একক সমস্যা নয়; এটি একটি বৈশ্বিক মানবিক সংকট। বিশ্ব সম্প্রদায়ের সক্রিয় ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ ছাড়া মায়ানমারের ধূর্ত শাসকগোষ্ঠীকে দিয়ে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়।
٥- بين باسلوبك الخاص ما تعرف عن الوضع السياسي والاقتصادي الحالي في اليمن-
ইয়েমেনের বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটময় পরিস্থিতি সম্পর্কে যা জান তা নিজের ভাষায় বিশদভাবে বর্ণনা কর।
ভূমিকা
ইতিহাসের পাতায় একসময় যে দেশকে ‘আল-ইয়ামান আস-সাঈদ’ (সুখী ও সমৃদ্ধ ইয়েমেন) বলা হতো, সেই প্রাচীন আরব সভ্যতার লীলাভূমি আজ গত এক দশক ধরে চলা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ও পরাশক্তিদের প্রক্সি লড়াইয়ের কারণে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ মানবিক ও রাজনৈতিক নরকে পরিণত হয়েছে।
(ক) ইয়েমেনের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি (الوضع السياسي الحالي)
ইয়েমেনের বর্তমান রাজনৈতিক জটিলতা মূলত বহুমাত্রিক বিভাজনে জর্জরিত:
১. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও আরব বসন্ত
২০১১ সালের আরব বসন্তের গণআন্দোলনের মুখে দীর্ঘ ৩৩ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্ট আলী আব্দুল্লাহ সালেহর পতন ঘটে। কিন্তু পরবর্তীতে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া ব্যর্থ হলে এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দ রাব্বুহ মানসুর হাদীর দুর্বল শাসনের সুযোগে ইরানপন্থি শিয়া যায়েদী ‘হুসী বিদ্রোহীরা’ (আনসারুল্লাহ আন্দোলন) বিদ্রোহ ঘোষণা করে।
২. ২০১৪ সালে সানা দখল ও ২০১৫ সালে যৌথ অভিযান
২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে হুসীরা দেশটির রাজধানী সানা এবং অধিকাংশ উত্তরাঞ্চল দখল করে নেয়। প্রেসিডেন্ট হাদী পালিয়ে এডেনে এবং পরে রিয়াদে আশ্রয় নেন। ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরবের নেতৃত্বে আরব যৌথ সামরিক বাহিনী হুসীদের হটাতে ‘অপারেশন ডিসাইসিভ স্টর্ম’ (عاصفة الحزم) শুরু করে।
৩. বর্তমান রাজনৈতিক বিভাজন ও তিন শক্তির দ্বন্দ্ব
বর্তমানে ইয়েমেন রাজনৈতিকভাবে তিনটি প্রধান বলয়ে বিভক্ত:
- সানা ও উত্তরাঞ্চল: ইরান সমর্থিত হুসী (আনসারুল্লাহ)-দের কঠোর নিয়ন্ত্রণে। তারা ড্রোন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং সুসংগঠিত মিলিশিয়া দ্বারা পরিচালিত এক সমান্তরাল রাষ্ট্র।
- এডেন ও দক্ষিণাঞ্চল: আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল (PLC) এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত সমর্থিত ‘সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল’ (STC)-এর যৌথ নিয়ন্ত্রণে, যাদের মধ্যেও প্রায়ই মতবিরোধ ঘটে।
- মরু ও তেলসমৃদ্ধ পূর্বাঞ্চল (মারিব ও হাদরামাউত): কেন্দ্রীয় সরকারের অনুগত গোত্রীয় ও স্থানীয় বাহিনীর হাতে।
৪. লোহিত সাগর সংকট ও সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিকীকরণ
২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হুসীরা ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে লোহিত সাগরে ইসরায়েলগামী ও পশ্চিমা বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোন ও মিসাইল আক্রমণ শুরু করে। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য যৌথভাবে ইয়েমেনের বিভিন্ন হুসী ঘাঁটিতে বিমান হামলা শুরু করে, যার ফলে ইয়েমেন যুদ্ধ এখন সরাসরি আন্তর্জাতিক সংকটে রূপ নিয়েছে।
(খ) ইয়েমেনের বর্তমান অর্থনৈতিক ও মানবিক পরিস্থিতি (الوضع الاقتصادي الإنساني)
জাতিসংঘের রিপোর্ট অনুযায়ী ইয়েমেন বর্তমানে “বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক সংকট” (The World’s Worst Humanitarian Crisis) অতিক্রম করছে:
- মুদ্রা ও অর্থনীতির চরম পতন: ইয়েমেনি রিয়ালের মূল্য ঐতিহাসিক সর্বনিম্নে পৌঁছেছে। এডেন ও সানায় দুটি ভিন্ন মুদ্রানীতি চালু থাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য ও অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত। তেল রপ্তানি বন্ধ থাকায় সরকারের রাজস্ব আয় শূন্যের কোঠায়।
- ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ও খাদ্য সংকট: দেশটির মোট জনসংখ্যার ৮০% (প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ মানুষ) বেঁচে থাকার জন্য আন্তর্জাতিক ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল। লক্ষ লক্ষ শিশু তীব্র পুষ্টিহীনতায় ভুগছে এবং জাতিসংঘের মতে এটি শতাব্দীর নিকৃষ্টতম কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ।
- স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ব্যবস্থার ধস: অর্ধেকেরও বেশি হাসপাতাল ও ক্লিনিক ধ্বংস হয়ে গেছে। ওষুধ ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে কলেরা, ডিপথেরিয়া এবং সংক্রামক রোগের মহামারি নিয়মিত হানা দিচ্ছে।
- অবকাঠামো ধ্বংস ও বিদ্যুৎ সংকট: বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, রাস্তাঘাট, স্কুল ও বন্দরসমূহ বোমাবর্ষণে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। কোটি কোটি মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে শরণার্থী শিবিরে মানবেতর দিন কাটাচ্ছে।
উপসংহার
ইয়েমেন সংকট কোনো সামরিক উপায়ে সমাধান সম্ভব নয়। ২০২৩ সালে সৌদি-ইরান সমঝোতার ফলে যে আশার আলো তৈরি হয়েছিল, লোহিত সাগরের বর্তমান উত্তেজনার কারণে তা পুনরায় হুমকির মুখে পড়েছে। কেবল অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় সংলাপ এবং সকল পক্ষের আন্তরিক রাজনৈতিক সদিচ্ছাই পারে ইয়েমেনের দুঃখী জনপদে শান্তি ফিরিয়ে আনতে।
٦- كيف دخل الاسلام في الاوربا؟ بين موضحاً-
ইউরোপে কীভাবে ইসলামের আগমন ও বিস্তার ঘটেছিল তা সুস্পষ্টভাবে আলোচনা কর।
ভূমিকা
ইসলাম কোনো নির্দিষ্ট ভূগোল বা জাতির জন্য আসেনি; এটি বিশ্বজনীন ধর্ম। খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দীতে আরবের মরুভূমি থেকে যাত্রা শুরু করে মাত্র এক শতাব্দীর মধ্যেই ইসলাম ইউরোপের প্রবেশদ্বারে কড়া নাড়ে। ইতিহাসে ইউরোপে ইসলামের প্রবেশ কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; বরং তা চারটি সুস্পষ্ট ঐতিহাসিক পথ ও তরঙ্গের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়েছিল।
ইউরোপে ইসলাম প্রবেশের চারটি প্রধান ঐতিহাসিক তরঙ্গ
প্রথম তরঙ্গ: স্পেন ও আন্দালুসিয়া বিজয়ের মাধ্যমে (৭১১-১৪৯২ খ্রিষ্টাব্দ)
ইউরোপে ইসলামের প্রথম ও সর্বশ্রেষ্ঠ প্রবেশদ্বার ছিল আইবেরিয়ান উপদ্বীপ (বর্তমান স্পেন ও পর্তুগাল):
- ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: উমাইয়া খলিফা ওয়ালীদ ইবনে আব্দুল মালিকের শাসনামলে উত্তর আফ্রিকার গভর্নর মুসা বিন নুসাইরের নির্দেশে তরুণ মুসলিম সেনাপতি তারেক বিন জিয়াদ ৭১১ খ্রিস্টাব্দে মাত্র সাত হাজার সৈন্য নিয়ে জিব্রাল্টার প্রণালী অতিক্রম করে স্পেনে অবতরণ করেন।
- রাজা রডারিকের পরাজয়: গুয়াদালেতের যুদ্ধে ভিসিগথ রাজা রডারিককে পরাজিত করে মুসলিমরা মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে প্রায় সমগ্র স্পেন জয় করে।
- দীর্ঘ আটশত বছরের স্বর্ণযুগ: স্পেনে মুসলিমরা ‘আন্দালুসিয়া’ নামে এক অনন্য সভ্যতার সূচনা করে। কর্ডোবা, গ্রানাডা ও সেভিল শহর ইউরোপের অন্ধকার যুগের (Dark Ages) বিপরীতে জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শন, গণিত, চিকিৎসা ও স্থাপত্যের আলো ছড়ায়। কর্ডোবা বিশ্ববিদ্যালয় ইউরোপীয় রেনেসাঁর প্রত্যক্ষ আঁতুড়ঘরে পরিণত হয়। ১৪৯২ সালে গ্রানাডার পতনের মধ্য দিয়ে এই অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।
দ্বিতীয় তরঙ্গ: সিসিলি ও দক্ষিণ ইতালির মাধ্যমে (৮২৭-১০৯১ খ্রিষ্টাব্দ)
ইউরোপের হৃদপিণ্ডে ইসলামের দ্বিতীয় প্রবেশ ঘটে ভূমধ্যসাগরের গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ সিসিলি ও দক্ষিণ ইতালির মাধ্যমে:
- উত্তর আফ্রিকার আগলাবী বংশের শাসনামলে প্রখ্যাত ফকীহ ও সেনাপতি আসাদ ইবনে আল-ফুরাত ৮২৭ খ্রিস্টাব্দে সিসিলি অভিযান পরিচালনা করেন।
- দীর্ঘ দুই শতাধিক বছর সিসিলিতে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিল। রাজধানী পালের্মো (Palermo) বাগদাদ ও কর্ডোবার মতো সমৃদ্ধ নগরীতে পরিণত হয়। এখান থেকেই আধুনিক ব্যাংকিং, কৃষি সেচব্যবস্থা ও গ্রিক-আরবি বিজ্ঞান ইতালি হয়ে ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে।
第三 তরঙ্গ: উসমানীয় (অটোমান) খেলাফতের বিজয় ও পূর্ব ইউরোপ (১৩৫৪-১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দ)
পূর্ব ও মধ্য ইউরোপে ইসলামের ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটে উসমানীয় খেলাফতের সুলতানদের মাধ্যমে:
- বলকান অঞ্চল বিজয়: চতুর্দশ শতাব্দীতে সুলতান ওরখান ও মুরাদ বলকান অঞ্চলে প্রবেশ করেন এবং কসোভোর যুদ্ধে (১৩৮৯) সার্ব বাহিনীকে পরাজিত করে বলকানে ইসলামের ভিত্তি মজবুত করেন।
- কনস্টান্টিনোপল বিজয় (১৪৫৩ খ্রি.): মাত্র ২১ বছর বয়সে সুলতান মুহাম্মদ আল-ফাতিহ বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপল জয় করেন এবং এর নাম রাখেন ‘ইস্তাম্বুল’। এর মাধ্যমে ইউরোপের দীর্ঘদিনের দুর্ভেদ্য প্রাচীর ভেঙে যায়।
- হৃদয় জয় ও ধর্মান্তর: উসমানীয়দের সুবিচার, ধর্মীয় সহনশীলতা ও সাম্যের নীতিতে আকৃষ্ট হয়ে বসনিয়া, আলবেনিয়া ও কসোভোর স্থানীয় ইউরোপীয় খ্রিষ্টানরা স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করে। ফলে পূর্ব ইউরোপে স্থায়ী ইউরোপীয় মুসলিম জনগোষ্ঠীর সৃষ্টি হয়। মুসলিম বাহিনী অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনার তোরণ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল।
চতুর্থ তরঙ্গ: আধুনিক যুগে অভিবাসন ও দাওয়াতি প্রসার (বিংশ ও একবিংশ শতাব্দী)
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউরোপ পুনর্গঠনের জন্য জার্মানি, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য মুসলিম বিশ্ব (তুরস্ক, আলজেরিয়া, মরক্কো, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ) থেকে লাখ লাখ শ্রমিক ও অভিবাসী গ্রহণ করে। পরবর্তীতে শিক্ষার প্রসার, বৈবাহিক সম্পর্ক এবং ইসলামের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে হাজার হাজার শ্বেতাঙ্গ ইউরোপীয় ইসলাম গ্রহণ করছে। বর্তমানে ইসলাম ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং দ্রুততম বর্ধনশীল ধর্ম।
উপসংহার
ইউরোপের ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে ইসলামের অবদান চিরন্তন ও অনস্বীকার্য। আধুনিক ইউরোপীয় রেনেসাঁ ও বিজ্ঞান আন্দালুসিয়া ও সিসিলির মুসলিমদের ঋণে চিরঋণী।
٧- بين ما تعرف عن مساهمة حضرت معين الدين الجشتي رحمه الله في نشر الاسلام في الهند-
ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলাম প্রচারে খাজা গরীব নেওয়াজ হযরত মঈনউদ্দীন চিশতী (রহ.)-এর অবদান সম্পর্কে যা জান আলোচনা কর।
ভূমিকা
ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলাম কোনো তরবারির জোরে বিস্তৃত হয়নি; বরং তা বিস্তার লাভ করেছে মহান সুফি-সাধক ও আল্লাহর ওলীদের অনুপম চরিত্র, মানবপ্রেম, রুহানী ফয়েজ এবং সাম্যের বার্তার মাধ্যমে। এই মহান আধ্যাত্মিক বিপ্লবের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন সুলতানুল হিন্দ, খাজা গরীব নেওয়াজ হযরত খাজা মঈনউদ্দীন চিশতী সানজারী আজমেরী (রহ.)।
(ক) খাজা মঈনউদ্দীন চিশতী (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
- জন্ম ও বংশপরিচয়: তিনি ৫৩৬ হিজরীতে (১১৪১ খ্রিষ্টাব্দে) পারস্যের সিজিস্তানের (সিস্তান) সানজার নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পিতৃকুল থেকে ইমাম হাসান (রা.) এবং মাতৃকুল থেকে ইমাম হুসাইন (রা.)-এর বংশধর (হাসানী ও হুসাইনী সৈয়দ) ছিলেন।
- আধ্যাত্মিক সাধনা ও আগমন: তিনি চিশতীয়া তরীকার প্রতিষ্ঠাতা খাজা উসমান হারুনী (রহ.)-এর সান্নিধ্যে দীর্ঘ ২০ বছর কঠোর আত্মশুদ্ধি ও দ্বীনী ইলম অর্জন করেন। পরবর্তীতে মদীনা শরীফে রওজায়ে আতহারে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পক্ষ থেকে আধ্যাত্মিক নির্দেশ পেয়ে দ্বীন প্রচারের উদ্দেশ্যে ভারতে আগমন করেন।
- আজমীরে অবস্থান ও ওফাত: তিনি ১১৯২ খ্রিস্টাব্দে ভারতের রাজস্থানের আজমীরে স্থায়ীভাবে আস্তানা স্থাপন করেন এবং ৬৩৩ হিজরীর ৬ই রজব (১২৩৬ খ্রি.) ইন্তেকাল করেন।
(খ) ভারতে ইসলাম প্রচারে খাজা মঈনউদ্দীন চিশতী (রহ.)-এর অবদান
১. বর্ণপ্রথার শৃঙ্খল ভেঙে মানবিক সাম্যের বিপ্লব
তৎকালীন হিন্দু সমাজে চরম ব্রাহ্মণ্যবাদী জাতপাত ও বর্ণপ্রথা বিরাজমান ছিল। শূদ্র ও নিম্নবর্ণের দলিত হিন্দুদের কোনো মানবিক অধিকার ছিল না, তারা উচ্চবর্ণের মন্দিরে বা কূপের পানিতে স্পর্শ করারও অনুমতি পেত না। খাজা আজমেরী (রহ.) সবাইকে বুকে জড়িয়ে ধরে এক কাতারে বসিয়ে দিলেন। ইসলামের এই সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও মানবিক মর্যাদায় মুগ্ধ হয়ে ঐতিহাসিক তথ্যমতে তাঁর হাতে প্রায় ৯০ লক্ষাধিক মানুষ সানন্দে ইসলাম গ্রহণ করে।
২. নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও লঙ্গরখানার সেবা (গরীব নেওয়াজ উপাধি)
তিনি জাত-ধর্ম নির্বিশেষে সকল ক্ষুধার্ত ও অসহায় মানুষের জন্য বিনামূল্যে লঙ্গরখানা চালু করেন। তিনি বলতেন: «দাঈর চরিত্র হতে হবে নদীর মতো উদার, সূর্যের মতো স্নেহময় এবং মাটির মতো সহনশীল»। মানুষের সেবা ও দারিদ্র্যের পাশে দাঁড়ানোর কারণে জনগণ তাঁকে ভালোবেসে ‘গরীব নেওয়াজ’ (দরিদ্রের বন্ধু) উপাধিতে ভূষিত করে।
৩. চরম প্রতিকূলতার মুখে ক্ষমা ও আধ্যাত্মিক বিজয়
আজমীরের রাজা পৃথ্বীরাজ চৌহান ও তার রাজকীয় তান্ত্রিক জাদুকররা (যেমন জয়পাল যোগী) খাজা সাহেবকে বিতাড়িত করতে বহু ষড়যন্ত্র ও অলৌকিক লড়াই চালায়। কিন্তু খাজা সাহেবের সত্যতা ও আধ্যাত্মিক কুদরতের সামনে জয়পাল যোগী নিজেই পরাভূত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তাঁর একনিষ্ঠ খাদেমে পরিণত হন (হযরত আব্দুল্লাহ তন্ত্রী)।
৪. সুবিশাল চিশতীয়া তরীকার ধারাবাহিকতা তৈরি
খাজা মঈনউদ্দীন চিশতী (রহ.) এমন একদল আধ্যাত্মিক মহান সাধক তৈরি করেছিলেন যারা সমগ্র ভারতে ইসলামের মশাল জ্বালিয়ে রেখেছিলেন:
- দিল্লিতে খাজা কুতবুদ্দীন বখতিয়ার কাকী (রহ.)।
- পাঞ্জাব ও পাকিপত্তনে বাবা ফরিদউদ্দীন গঞ্জে শকর (রহ.)।
- দিল্লিতে হযরত খাজা নিযামুদ্দীন আউলিয়া ও আমীর খসরু (রহ.)।
- বাংলাদেশে হযরত শাহজালাল ও শাহ পরান (রহ.) প্রমুখ সুফি চিশতীয়া আদর্শের আলোতেই দ্বীন প্রচার করেছিলেন।
উপসংহার
খাজা গরীব নেওয়াজ (রহ.) ছিলেন উপমহাদেশে ইসলামের এক চিরন্তন আধ্যাত্মিক সেনাপতি। তরবারি নয়, প্রেম, ক্ষমা ও নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগের যে ইতিহাস তিনি আজমীরে রচনা করেছিলেন, তা অনাদিকাল পর্যন্ত এই অঞ্চলের মানুষের হৃদয়ে অম্লান থাকবে।
٨- علق على اثنين من الموضوعات التالية:
নিম্নে বর্ণিত বিষয়সমূহের ওপর সারগর্ভ টীকা লেখ। (শিক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতির সুবিধার্থে নিম্নে চারটি বিষয়েরই পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা তুলে ধরা হলো):
(أ) حقوق الإنسان في العالم الإسلامي (মুসলিম বিশ্বে মানবাধিকার)
১. ঐতিহ্য ও আধুনিক বাস্তবতা:
ইসলাম আজ থেকে সাড়ে চৌদ্দশত বছর পূর্বে বিদায় হজের ভাষণে মানবজাতিকে সর্বজনীন মানবাধিকার উপহার দিয়েছিল। কিন্তু সমকালীন মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্রে মানবাধিকারের বাস্তব চিত্র অত্যন্ত হতাশাজনক। বহু মুসলিম দেশে রাজনৈতিক বন্দিদের নির্যাতন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ, সংবাদমাধ্যমের ওপর সেন্সরশিপ এবং নারীদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখার মতো চরম ঘটনা ঘটছে।
২. পশ্চিমা দ্বিচারিতা ও মুসলিম বিশ্ব:
পশ্চিমা বিশ্ব মানবাধিকারকে মুসলিম দেশগুলোর ওপর ভূ-রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। যখন ফিলিস্তিনে নিরীহ নারী ও শিশুদের ওপর ইসরায়েল গণহত্যা চালায়, তখন পশ্চিমা শক্তিগুলো নীরব থাকে কিংবা অস্ত্র সরবরাহ করে; অথচ কোনো মুসলিম দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলার বিষয়ে তারা মানবাধিকারের বুলি আওড়ায়।
৩. করণীয়:
মুসলিম দেশগুলোকে জাতিসংঘের চাপানো পশ্চিমা বিকৃত সংস্কৃতি পরিহার করে পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ‘কায়রো ইসলামিক মানবাধিকার ঘোষণা’ (Cairo Declaration on Human Rights in Islam)-র পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করতে হবে, যা ন্যায়বিচার ও নাগরিক স্বাধীনতার প্রকৃত গ্যারান্টি দেয়।
(ب) طارق بن زياد (সেনাপতি তারেক বিন জিয়াদ)
১. ঐতিহাসিক পরিচয়:
তারেক বিন জিয়াদ (৬৭০-৭২০ খ্রি.) ছিলেন উত্তর আফ্রিকার বারবার (Berber) বংশোদ্ভূত এক বীর মুসলিম মুজাহিদ ও সেনাপতি। তিনি উমাইয়া গভর্নর মুসা বিন নুসাইরের অধীনে তাঞ্জিয়ারের সেনাপতি ছিলেন।
২. আন্দালুসিয়া বিজয় ও জিব্রাল্টার নামকরণ:
৭১১ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ৭,০০০ সৈন্য নিয়ে তিনি স্পেন বিজয়ে সাগর পাড়ি দেন। যে বিশাল পাথুরে পাহাড়ে তিনি অবতরণ করেছিলেন, তাঁর নামানুসারে এর নাম রাখা হয় ‘জাবালুত তারিক্ব’ (جبل طارق), যা অপভ্রংশ হয়ে আজ বিশ্বজুড়ে জিব্রাল্টার (Gibraltar) নামে খ্যাত।
৩. ঐতিহাসিক কালজয়ী ভাষণ:
স্পেনে অবতরণের পর তিনি সকল রণতরী জ্বালিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন এবং সৈন্যদের সামনে বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ী ভাষণ প্রদান করেন:
«أَيُّهَا النَّاسُ، أَيْنَ الْمَفَرُّ؟ الْبَحْرُ مِنْ وَرَائِكُمْ، وَالْعَدُوُّ أَمَامَكُمْ، وَلَيْسَ لَكُمْ وَاللَّهِ إِلَّا الصِّدْقُ وَالصَّبْرُ»
“হে লোকসকল! পলায়নের পথ কোথায়? তোমাদের পেছনে উত্তাল সমুদ্র আর সামনে তোমাদের দুর্ধর্ষ শত্রু! আল্লাহর শপথ, তোমাদের জন্য সত্যবাদিতা ও অটল ধৈর্য ছাড়া আর কোনো উপায় নেই!”
গুয়াদালেতের যুদ্ধে তিনি রডারিকের এক লাখ সেনার বিশাল বাহিনীকে ধূলিসাৎ করে ইউরোপে আটশত বছরের মুসলিম স্বর্ণযুগের ভিত্তি স্থাপন করেন।
(ج) الأحوال الاقتصادية الحالية لبنغلاديش (বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা)
১. ইতিবাচক দিক ও সম্ভাবনাময় স্তম্ভসমূহ:
বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার এক দ্রুত বিকাশমান উন্নয়নশীল অর্থনীতি। এর অর্থনীতির মূল ভিত্তি প্রধানত তিনটি:
- তৈরি পোশাক শিল্প (RMG): বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে।
- প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স: মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও মালয়েশিয়ায় কর্মরত প্রায় এক কোটি প্রবাসী বাংলাদেশি প্রতি বছর প্রায় ২২-২৪ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠিয়ে অর্থনীতির চাকা সচল রাখছেন।
- কৃষি বিপ্লব: খাদ্যশস্য, ধান, মিষ্টি পানির মাছ ও শাকসবজি উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন।
২. সমকালীন সংকট ও চ্যালেঞ্জসমূহ:
বর্তমানে বাংলাদেশ বেশ কিছু গভীর অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি:
- বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সংকট: আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি ও হুন্ডির কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেট রিজার্ভ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে।
- উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি: নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক দাম সাধারণ নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে।
- ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ ও অর্থ পাচার: ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট ও বিদেশে পাচার অর্থনীতিতে রক্তক্ষরণ ঘটিয়েছে।
- জ্বালানি সংকট ও ডলার সংকট: গ্যাস ও কয়লার সংকটে শিল্প উৎপাদনে নিয়মিত লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়ছে।
(د) محمد بن قاسم (মুহাম্মদ বিন কাসিম)
১. ঐতিহাসিক পরিচয় ও প্রেক্ষাপট:
ইমাদুদ্দীন মুহাম্মদ বিন কাসিম আস-সাক্বাফী (৬৯৫-৭১৫ খ্রি.) ছিলেন উমাইয়া খিলাফতের এক তরুণ বিশ্ববিখ্যাত সমরনায়ক। তিনি ইরাকের গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসুফের ভ্রাতুষ্পুত্র ও জামাতা ছিলেন। মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের স্থায়ী প্রবেশদ্বার উন্মোচন করেন।
২. সিন্ধু অভিযানের কারণ:
শ্রীলঙ্কার রাজা খলিফা ওয়ালীদ ও হাজ্জাজ বিন ইউসুফের জন্য কিছু অনাথ মুসলিম কন্যা ও মূল্যবান উপহারসহ জাহাজ পাঠিয়েছিলেন। সিন্ধুর দেবল বন্দরের জলদস্যুরা জাহাজটি লুট করে এবং মুসলিম নারীদের বন্দি করে। সিন্ধুর অত্যাচারী হিন্দু রাজা দাহির বন্দিদের মুক্তি দিতে অস্বীকার করলে ৭১২ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধু অভিযান পরিচালনা করেন।
৩. বিজয় ও ‘বাবুল ইসলাম’:
১৭ বছরের এই তরুণ বীর রাজা দাহিরকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত ও নিহত করেন এবং দেবল, নীরুন ও মুলতানসহ সমগ্র সিন্ধু জয় করেন। সিন্ধু বিজয়ের কারণেই আজ সিন্ধুকে ‘বাবুল ইসলাম’ (বা ইসলামের প্রবেশদ্বার) বলা হয়।
৪. অনন্য চারিত্রিক মাধুর্য ও শাসনব্যবস্থা:
তিনি স্থানীয় হিন্দুদের কোনো জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করেননি; বরং তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মন্দিরের নিরাপত্তা প্রদান করেন এবং ব্রাহ্মণদের প্রশাসনে নিয়োগ দেন। তাঁর সুবিচার ও ভালোবাসায় মুগ্ধ হয়ে সিন্ধুর অমুসলিমরা তাঁর বিদায়ের সময় কান্নায় ভেঙে পড়েছিল এবং বহু শহরে তাঁর প্রতিমূর্তি তৈরি করে শ্রদ্ধা জানিয়েছিল। তিনি ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের প্রথম সূর্য।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. ‘মুসলিম বিশ্ব’ (The Muslim World) বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: বিশ্বের যেসকল রাষ্ট্রে মুসলমানরা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ, অথবা যেখানে ইসলামী শাসনব্যবস্থা কায়েম রয়েছে এবং যা আন্তর্জাতিক সংস্থা ওআইসি (OIC)-র সদস্যভুক্ত স্বাধীন দেশ—তাদের সামগ্রিক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক সমষ্টিকে ‘মুসলিম বিশ্ব’ বলা হয়।
২. এশিয়া মহাদেশের বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যার দেশ কোনটি?
উত্তর: এশিয়া তথা সমগ্র বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যার দেশ হলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র ‘ইন্দোনেশিয়া’, যার বর্তমান মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ২৩ কোটিরও অধিক।
৩. ইউরোপে ইসলাম প্রবেশের প্রধান ঐতিহাসিক পথ কোনটি ছিল?
উত্তর: ইউরোপে ইসলাম প্রবেশের প্রধান ও প্রথম পথ ছিল ৭১১ খ্রিস্টাব্দে বীর সেনাপতি তারেক বিন জিয়াদ কর্তৃক জিব্রাল্টার প্রণালী পাড়ি দিয়ে স্পেন (তৎকালীন আন্দালুসিয়া) বিজয়, যার ফলে সেখানে দীর্ঘ আটশত বছর মুসলমানদের গৌরবোজ্জ্বল শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিল।
৪. খাজা মঈনউদ্দীন চিশতী (রহ.)-কে কেন ‘গরীব নেওয়াজ’ বলা হয়?
উত্তর: কারণ তিনি ভারতে জাত-ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সমাজের সকল নিঃস্ব, দরিদ্র ও নিম্নবর্ণের নির্যাতিত মানুষকে পরম ভালোবাসায় বুকে টেনে নিয়েছিলেন এবং আজমীরে সার্বক্ষণিক গণ-লঙ্গরখানা পরিচালনা করে ক্ষুধার্তদের মুখে অন্ন তুলে দিতেন।
৫. সিন্ধুকে কেন ‘বাবুল ইসলাম’ (باب الإسلام) বলা হয়?
উত্তর: ৭১২ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ১৭ বছর বয়সে তরুণ মুসলিম সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধু বিজয়ের মাধ্যমে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথমবারের মতো ইসলামের আনুষ্ঠানিক ও স্থায়ী বিজয় নিশান উড্ডীন করেছিলেন বিধায় সিন্ধুকে ‘বাবুল ইসলাম’ বা ইসলামের প্রবেশদ্বার বলা হয়।
৬. বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সৌদি পররাষ্ট্রনীতির প্রধান পরিবর্তন কী?
উত্তর: একক মার্কিন নির্ভরতা পরিহার করে চীন, রাশিয়া ও ব্রিকস-এর সাথে কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা, ইরানের সাথে ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি সম্পাদন এবং অর্থনৈতিক ভিশন ২০৩০ বাস্তবায়নে স্বাধীন ও আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করা।