পরীক্ষা কোড: ২০২ | সেট কোড: ৫৭
اختبار السنة الثانية للفاضل البكالوريوس (الشرف)، لعام ٢٠١٩م
[ফাজিল স্নাতক (সম্মান) দ্বিতীয় বর্ষ পরীক্ষা, ২০১৯]
اللغة العربية وآدابها
[আরবি ভাষা ও সাহিত্য]
نصوص من الحديث
[নুসূস মিনাল হাদিস]
বিষয় কোড: ২০৪২০১
الزمن: ٤ ساعات | الدرجات الكاملة: ٨٠
[সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০]
الملاحظة: أجب عن أربعة من مجموعة (ألف) وعن أربعة من مجموعة (ب)-
[দ্রষ্টব্য: (الف) অংশ থেকে ৪টি এবং (ب) অংশ থেকে ৪টি প্রশ্নের উত্তর দাও।]
١- عَنْ أَنَسٍ عَنِ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ: “ثَلاَثٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ وَجَدَ حَلاَوَةَ الإِيمَانِ: أَنْ يَكُونَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا، وَأَنْ يُحِبَّ المَرْءَ لاَ يُحِبُّهُ إِلَّا لِلَّهِ، وَأَنْ يَكْرَهَ أَنْ يَعُودَ فِي الكُفْرِ كَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُقْذَفَ فِي النَّارِ”-
(الف) عَرِّفِ المَحَبَّةَ – وَكَمْ قِسْمًا لَهَا؟ بَيِّنْ مُفَصَّلًا-
(ب) اُكْتُبْ نُبْذَةً مِنْ حَيَاةِ أَنَسٍ رَضِيَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهُ-
[১. হযরত আনাস (রা.) হতে বর্ণিত, নবী করীম ﷺ ইরশাদ করেছেন: “তিনটি গুণ যার মধ্যে থাকবে, সে ঈমানের মিষ্টতা ও স্বাদ আস্বাদন করতে পারবে: আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তার নিকট অন্য সবকিছুর চেয়ে অধিক প্রিয় হওয়া; কোনো ব্যক্তিকে কেবল আল্লাহর জন্যই ভালোবাসা; এবং কুফরির দিকে ফিরে যাওয়াকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মতোই ঘৃণা করা।”
(ক) ভালোবাসার (المحبة) সংজ্ঞা দাও এবং এর প্রকারভেদ বিস্তারিত বর্ণনা করো।
(খ) হযরত আনাস (রা.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী লিপিবদ্ধ করো।]
হাদিসের সরলার্থ ও মূল বক্তব্য:
উক্ত হাদিসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের অন্যতম মৌলিক হাদিস। ঈমানের বাহ্যিক স্বীকৃতির ঊর্ধ্বে এর আধ্যাত্মিক স্বাদ ও মানসিক প্রশান্তি অর্জনের তিনটি মৌলিক মানদণ্ড এখানে বর্ণিত হয়েছে। ঈমানের মিষ্টতা (حلاوة الإيمان) বলতে নেক আমল সম্পাদনে আত্মিক আনন্দ লাভ এবং দ্বীনের পথে যেকোনো ত্যাগ স্বীকারে পরম তৃপ্তি অনুভব করাকে বোঝায়।
(ক) ভালোবাসার (المحبة) সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ:
আভিধানিক অর্থ: ‘মুহাব্বত’ (المحبة) শব্দটি আরবি حُبّ ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ প্রেম, প্রীতি, আসক্তি, স্নেহ ও আন্তরিক আকর্ষণ।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: আল্লামা রাগিব আল-ইসফাহানী (র.) বলেন, “মুহাব্বত হলো মনের এমন এক স্বাভাবিক ও ইচ্ছাকৃত আকর্ষণ, যা কোনো সত্তার পরিপূর্ণতা, সৌন্দর্য কিংবা প্রাপ্ত অনুগ্রহ অবলোকন করে তার দিকে ঝুঁকে পড়ে।” ইমাম কুরতুবী (র.)-এর মতে, আল্লাহর প্রতি বান্দার ভালোবাসার অর্থ হলো তাঁর আনুগত্যে পরম নিষ্ঠা এবং তাঁর নির্দেশিত বিধানাবলিকে সর্বান্তঃকরণে গ্রহণ করা।
মুহাব্বতের প্রকারভেদ: ইসলামী পণ্ডিত ও মুহাদ্দিসগণের মতে ভালোবাসা প্রধানত তিন প্রকার:
- ১. মুহাব্বতে আকলিয়া (المحبة العقلية – বুদ্ধিবৃত্তিক ভালোবাসা): যা কোনো সত্তার গুণাবলি ও শ্রেষ্ঠত্ব অনুধাবন করে বুদ্ধিমত্তার বিচারে উৎসারিত হয়। যেমন: আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ভালোবাসা। এই ভালোবাসা জাগতিক সকল সম্পর্কের ঊর্ধ্বে স্থান পায়।
- ২. মুহাব্বতে তাবাঈয়াহ (المحبة الطبعية – স্বভাবজাত ভালোবাসা): যা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি ও প্রকৃতির সাথে জড়িত। যেমন: পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি, স্ত্রী এবং ধন-সম্পদের প্রতি মানুষের স্বাভাবিক ভালোবাসা। এই ভালোবাসা যতক্ষণ শরীয়তের সীমার মধ্যে থাকে ততক্ষণ প্রশংসনীয়।
- ৩. মুহাব্বতে রূহী বা ফি-লিল্লাহ (المحبة الروحية / في الله – আধ্যাত্মিক ভালোবাসা): আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে দ্বীনদার ও সৎ মুমিনদের ভালোবাসা, যা হাদিসে ঈমানের পরিপূর্ণতার অন্যতম শর্ত হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে।
(খ) হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী:
- নাম ও বংশপরিচয়: নাম আনাস, উপনাম আবু হামযাহ। পিতার নাম মালিক ইবনে নযর এবং মাতার নাম উম্মে সুলাইম বিনতে মিলহান (রা.)। তিনি মদীনার বিখ্যাত খাযরাজ গোত্রের বনু নাজ্জার শাখার সন্তান ছিলেন।
- খেদমতে নববীতে আত্মনিয়োগ: হিজরতের সময় তাঁর বয়স ছিল প্রায় ১০ বছর। তাঁর মাতা উম্মে সুলাইম (রা.) তাঁকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর খেদমতে সমর্পণ করেন। তিনি একটানা দশ বছর রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সার্বক্ষণিক খাদেম হিসেবে খেদমত করার সৌভাগ্য অর্জন করেন। আনাস (রা.) বলেন, “এই দীর্ঘ সময়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ কখনো আমার কোনো কাজে ‘উহ্’ পর্যন্ত বলেননি এবং কেন এমনটি করলে বা করলে না তা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেননি।”
- রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বরকতময় দু’আ: রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর জন্য দু’আ করেছিলেন: “হে আল্লাহ! আপনি তার ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে বরকত দান করুন এবং তাকে দীর্ঘায়ু দান করুন।” এই দু’আর বদৌলতে তিনি দীর্ঘায়ু লাভ করেন এবং প্রচুর ধন-সম্পদ ও শতাধিক সন্তানের জনক হন।
- হাদিস বর্ণনায় অবদান: তিনি মাকসিরীন (সর্বাধিক হাদিস বর্ণনাকারী) সাহাবিদের অন্যতম। তাঁর বর্ণিত হাদিসের সংখ্যা ২,২৮৬টি।
- ওফাত: সাহাবিদের মধ্যে তিনি অন্যতম সর্বশেষ জীবিত সাহাবি ছিলেন। হিজরি ৯৩ সনে বসরায় তিনি ইন্তেকাল করেন। তখন তাঁর বয়স ছিল প্রায় ১০৩ বছর।
٢- عَنِ البَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ قَالَ: أَمَرَنَا النَّبِيُّ ﷺ بِسَبْعٍ وَنَهَانَا عَنْ سَبْعٍ، أَمَرَنَا بِاتِّبَاعِ الجَنَائِزِ وَعِيَادَةِ المَرِيضِ وَإِجَابَةِ الدَّاعِي وَنَصْرِ المَظْلُومِ وَإِبْرَارِ القَسَمِ وَرَدِّ السَّلاَمِ وَتَشْمِيتِ العَاطِسِ، وَنَهَانَا عَنْ آنِيَةِ الفِضَّةِ وَخَاتَمِ الذَّهَبِ وَالحَرِيرِ وَالدِّيبَاجِ وَالقَسِّيِّ وَالإِسْتَبْرَقِ-
(الف) مَا مَعْنَى الجَنَائِزِ؟ مَتَى شُرِعَتْ صَلاَةُ الجَنَازَةِ؟
(ب) اُذْكُرْ أَحْكَامَ آنِيَةِ الفِضَّةِ وَخَاتَمِ الذَّهَبِ-
[২. হযরত বারা ইবনে আযিব (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: নবী করীম ﷺ আমাদেরকে সাতটি বিষয়ের আদেশ করেছেন এবং সাতটি বিষয় থেকে নিষেধ করেছেন। তিনি আমাদের আদেশ করেছেন জানাযার অনুসরণ করতে, রোগীর সেবা করতে, আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দিতে, মাজলুমকে সাহায্য করতে, কসমকারীর শপথ পূরণ করতে, সালামের উত্তর দিতে এবং হাঁচিদাতার জবাব দিতে। আর তিনি আমাদের নিষেধ করেছেন রৌপ্যের পাত্র ব্যবহার, স্বর্ণের আংটি পরিধান, রেশমি পোশাক, মোটা রেশম (দিবাজ), কাস্সি (রেশমমিশ্রিত বস্ত্র) এবং সূক্ষ্ম রেশম (ইস্তাবরাক্ব) ব্যবহার করতে।
(ক) জানাযার অর্থ কী? জানাযার সালাত কখন প্রবর্তিত হয়েছিল?
(খ) রৌপ্যপাত্র ও স্বর্ণের আংটি ব্যবহারের বিধান আলোচনা করো।]
হাদিসের সরলার্থ ও সংক্ষিপ্ত তাৎপর্য:
হাদিসটি সামাজিক সম্প্রীতি, মানবিক মূল্যবোধ রক্ষা এবং ব্যক্তিগত জীবনে অপচয় ও অহংকার বর্জনের এক অনন্য রূপরেখা উপস্থাপন করে। সাতটি করণীয় কাজের মাধ্যমে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও সহমর্মিতা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সাতটি বর্জনীয় কাজের মাধ্যমে বিলাসিতা ও অহংকার দূরীভূত হয়।
(ক) জানাযার (الجنائز) অর্থ ও প্রবর্তনকাল:
অর্থ বিশ্লেষণ: ‘জানাযাহ’ (جنازة – জীম-এ যবর দিয়ে) শব্দটি মৃতদেহকে এবং ‘জিনাযাহ’ (جنازة – জীম-এ যের দিয়ে) খাটিয়া বা শবযানকে নির্দেশ করে। বহুবচনে الجنائز (আল-জানায়েয) ব্যবহৃত হয়। শরীয়তের পরিভাষায়, কোনো মুসলিমের ইন্তেকালের পর তাকে গোসল ও কাফন পরিয়ে বিশেষ নিয়মে দু’আ সম্বলিত সালাত আদায় করে দাফনের ব্যবস্থা করাকে জানাযা বলা হয়।
জানাযার সালাতের প্রবর্তন: জানাযার সালাত ফরযে কিফায়াহ। হিজরতের প্রাক্কালে কিংবা হিজরতের প্রথম বর্ষে মদীনা মুনাওয়ারায় জানাযার সালাত প্রবর্তিত হয়। ঐতিহাসিক মতানুসারে, আনসার সাহাবি হযরত আস’আদ ইবনে যুরারাহ (রা.) কিংবা বদর যুদ্ধের শহীদগণের ওপর সর্বপ্রথম বিধিবদ্ধভাবে জানাযার সালাত আদায় করা হয়েছিল।
(খ) রৌপ্যপাত্র ও স্বর্ণের আংটি ব্যবহারের শারঈ বিধান:
| বিষয় | পুরুষের ক্ষেত্রে শারঈ বিধান | নারীর ক্ষেত্রে শারঈ বিধান | শারঈ কারণ ও হিকমত |
|---|---|---|---|
| রৌপ্য বা স্বর্ণের পাত্র (آنية الفضة والذهب) | খাবার ও পানীয় গ্রহণে ব্যবহার করা সর্বসম্মতভাবে হারাম। | খাবার ও পানীয় গ্রহণে ব্যবহার করা সর্বসম্মতভাবে হারাম। | অহংকার, অমিতব্যয়িতা পরিহার এবং দরিদ্রদের অন্তরে আঘাত না দেওয়া। রাসূল ﷺ বলেছেন: “যে ব্যক্তি সোনা-রুপার পাত্রে পান করে, সে মূলত পেটে জাহান্নামের আগুন ঢালে।” |
| স্বর্ণের আংটি ও অলংকার (خاتم الذهب) | পুরুষের জন্য পরিধান করা সম্পূর্ণ হারাম। | নারীদের জন্য পরিধান ও অলংকার হিসেবে ব্যবহার করা বৈধ (হালাল)। | পুরুষের বীরত্ব ও গাম্ভীর্য রক্ষা করা এবং নারীদের সৌন্দর্যচর্চার স্বভাবজাত চাহিদাকে স্বীকৃতি প্রদান। |
| রৌপ্যের আংটি (خاتم الفضة) | পুরুষের জন্য এক মিসকাল (প্রায় ৪.৩৫ গ্রাম) পরিমাণ ওজনের রুপার আংটি ব্যবহার করা সুন্নাত/মুস্তাহাব। | নারীদের জন্য সকল প্রকার রুপার অলংকার ব্যবহার সর্বসম্মতভাবে জায়েয। | রাসূলুল্লাহ ﷺ রাষ্ট্রীয় চিঠিপত্রে সিলমোহর ব্যবহারের উদ্দেশ্যে রুপার আংটি তৈরি করেছিলেন। |
٣- عَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ يَقُولُ سَمِعْتُ النَّبِيَّ ﷺ يَقُولُ: “أَنَا فَرَطُكُمْ عَلَى الحَوْضِ، مَنْ وَرَدَهُ شَرِبَ مِنْهُ، وَمَنْ شَرِبَ مِنْهُ لَمْ يَظْمَأْ أَبَدًا، لَيَرِدَنَّ عَلَيَّ أَقْوَامٌ أَعْرِفُهُمْ وَيَعْرِفُونِي ثُمَّ يُحَالُ بَيْنِي وَبَيْنَهُمْ”-
(الف) مَا مَعْنَى الحَوْضِ؟ مَنِ الَّذِي يَشْرَبُ مِنَ الحَوْضِ؟ اُذْكُرْ صِفَاتِهِ مُفَصَّلًا-
(ب) اُكْتُبْ نُبْذَةً مِنْ حَيَاةِ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ (رض)-
[৩. হযরত সাহল ইবনে সা’দ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি নবী করীম ﷺ-কে ইরশাদ করতে শুনেছি: “আমি হাউযে কাওসারে তোমাদের অগ্রগামী হব। যে সেখানে উপস্থিত হবে সে তার পানি পান করবে; আর যে একবার পান করবে সে আর কখনো তৃষ্ণার্ত হবে না। নিশ্চয়ই আমার নিকট এমন কিছু দল উপস্থিত হবে যাদের আমি চিনব এবং তারাও আমাকে চিনবে, কিন্তু এরপর আমার ও তাদের মাঝে অন্তরায় সৃষ্টি করা হবে।”
(ক) ‘আল-হাওয’-এর অর্থ কী? কারা এর পানি পান করতে পারবে? এর বৈশিষ্ট্যসমূহ বিস্তারিত উল্লেখ করো।
(খ) হযরত সাহল ইবনে সা’দ (রা.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী রচনা করো।]
হাদিসের তাৎপর্য ও ব্যাখ্যা:
হাদিসটিতে কিয়ামতের কঠিন দিনে উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য হাউযে কাওসারের পানির সুসংবাদ এবং বেদআতকারী ও দ্বীন পরিবর্তনকারীদের জন্য কঠোর সতর্কবার্তা রয়েছে। যারা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ পরিত্যাগ করে দ্বীনের মধ্যে নবউদ্ভাবন (বিদ’আত) ঘটিয়েছে, ফেরেশতাগণ তাদেরকে হাউয থেকে বিতাড়িত করবেন।
(ক) হাউযের পরিচয়, বৈশিষ্ট্য ও পানকারীগণ:
- হাউযের অর্থ: ‘হাওয’ (الحوض) অর্থ জলাশয় বা সুপেয় পানির আধার। শরীয়তের পরিভাষায়, কিয়ামতের ময়দানে আল্লাহ তা’আলা তাঁর প্রিয় হাবীব হযরত মুহাম্মদ ﷺ-কে যে অনন্য ও মহিমান্বিত সুপেয় নহর দান করবেন তাকে ‘হাউযে কাওসার’ বলা হয়।
- কারা পান করবে: রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর খাঁটি উম্মত, যারা তাঁর সুন্নাহর একনিষ্ঠ অনুসারী ছিলেন এবং কোনো বিদ’আত ও দ্বীন বিকৃতির সাথে জড়িত হননি।
- হাউযের পানির বৈশিষ্ট্যসমূহ:
- ১. এর পানি দুধের চেয়েও শুভ্র এবং মধুর চেয়েও সুমিষ্ট।
- ২. এর সুবাস মেশক-আম্বরের চেয়েও অধিক সুগন্ধিময়।
- ৩. এর পাত্রসমূহের সংখ্যা আকাশের তারকারাজির মতো অসংখ্য ও উজ্জ্বল।
- ৪. এর দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ সমপরিমাণ, যা এক মাসের ভ্রমণের দূরত্বের সমান।
- ৫. যে ব্যক্তি একবার এই হাউযের পানি পান করবে, সে জান্নাতে প্রবেশের পূর্ব পর্যন্ত আর কখনো পিপাসার্ত হবে না।
(খ) হযরত সাহল ইবনে সা’দ আস-সা’ইদী (রা.)-এর জীবনী:
- নাম ও উপনাম: নাম সাহল, উপনাম আবু আল-আব্বাস। পিতার নাম সা’দ ইবনে মালিক আল-আনসারী আল-খাযরাজী। জাহেলী যুগে তাঁর নাম ছিল ‘হাযন’ (কঠিন/রুক্ষ), রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘সাহল’ (সহজ/নম্র)।
- সাহচর্যের সৌভাগ্য: রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ওফাতকালে তাঁর বয়স ছিল প্রায় ১৫ বছর। তিনি অল্পবয়সী সাহাবিদের মধ্যে প্রখর মেধার অধিকারী ছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বহু হাদিস প্রত্যক্ষভাবে শ্রবণ ও সংরক্ষণ করেন।
- হাদিস বর্ণনা: তিনি ১৮৮টি হাদিস বর্ণনা করেছেন। ইমাম বুখারী ও মুসলিম উভয়ে তাঁর হাদিস গ্রহণ করেছেন।
- ওফাত: তিনি মদীনার সর্বশেষ ইন্তেকালকারী সাহাবি ছিলেন। ৯১ হিজরিতে প্রায় একশত বছর বয়সে মদীনা মুনাওয়ারায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
٤- عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ أَنَّهُ سَمِعَهُ يَقُولُ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ لَيْسَ بِالطَّوِيلِ البَائِنِ وَلاَ بِالقَصِيرِ وَلاَ بِالأَبْيَضِ الأَمْهَقِ وَلاَ بِالآدَمِ وَلاَ بِالجَعْدِ القَطَطِ وَلاَ بِالسَّبْطِ، بَعَثَهُ اللَّهُ تَعَالَى عَلَى رَأْسِ أَرْبَعِينَ سَنَةً فَأَقَامَ بِمَكَّةَ عَشْرَ سِنِينَ وَبِالمَدِينَةِ عَشْرَ سِنِينَ فَتَوَفَّاهُ اللَّهُ تَعَالَى عَلَى رَأْسِ سِتِّينَ سَنَةً وَلَيْسَ فِي رَأْسِهِ وَلِحْيَتِهِ عِشْرُونَ شَعَرَةً بَيْضَاءَ-
(الف) فِي هَذَا الحَدِيثِ أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ أَقَامَ بِمَكَّةَ عَشْرَ سِنِينَ وَفِي رِوَايَةٍ أَنَّهُ أَقَامَ بِمَكَّةَ ثَلَاثَ عَشْرَةَ سَنَةً، فَمَا هُوَ التَّوْفِيقُ فِي الرِّوَايَتَيْنِ المُتَعَارِضَتَيْنِ؟
(ب) اُكْتُبْ نُبْذَةً مِنْ حَيَاةِ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ (رض)-
[৪. হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ ﷺ অতিরিক্ত দীর্ঘদেহী ছিলেন না এবং খর্বকায়ও ছিলেন না। তিনি ধবধবে সাদা (রক্তশূন্য ফ্যাকাশে) বর্ণের ছিলেন না এবং তামাটে বর্ণের শ্যামলাও ছিলেন না। তাঁর মাথার চুল অতিরিক্ত কোঁকড়ানো ছিল না এবং একেবারে সোজাও ছিল না। আল্লাহ তা’আলা চল্লিশ বছর পূর্ণ হলে তাঁকে নবুওয়াত দান করেন। অতঃপর তিনি মক্কায় দশ বছর এবং মদীনায় দশ বছর অবস্থান করেন। আল্লাহ তা’আলা তাঁকে ষাট বছর বয়সে ওফাত দান করেন। সে সময় তাঁর মাথার চুল ও দাড়িতে বিশটি চুলও পক্ব (সাদা) ছিল না।
(ক) এই হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে নবী ﷺ মক্কায় নবুওয়াতের পর দশ বছর অবস্থান করেন, অথচ অপর এক সহীহ বর্ণনায় তেরো বছরের কথা উল্লেখ আছে। এই আপাত বিরোধী দুটি বর্ণনার মাঝে সমন্বয় কী?
(খ) হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.)-এর জীবনী লিপিবদ্ধ করো।]
(ক) মক্কায় অবস্থানের মেয়াদ সম্পর্কিত বর্ণনাদ্বয়ের সমন্বয় (التوفيق بين الروايات):
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নবুওয়াত-পরবর্তী মাক্কী জীবনের মেয়াদকাল এবং সর্বমোট হায়াত সম্পর্কে সাহাবিদের বর্ণনায় আপাত পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। কোনো বর্ণনায় মক্কায় ১০ বছর অবস্থান ও মোট হায়াত ৬০ বছর বলা হয়েছে, আবার জমহুর (অধিকাংশ) ঐতিহাসিক ও মুহাদ্দিসের বর্ণনায় মক্কায় ১৩ বছর অবস্থান ও মোট হায়াত ৬৩ বছর উল্লেখ রয়েছে। মুহাদ্দিসগণ এই বৈপরীত্যের চমৎকার সমন্বয় করেছেন:
- ১. ভগ্নাংশ বাদ দিয়ে পূর্ণ সংখ্যা গণনা (إلغاء الكسور): আরবি ভাষা ও গণনারীতিতে ভগ্নাংশ বা অতিরিক্ত ছোট সংখ্যা বাদ দিয়ে মূল দশক গণনা করার একটি সুবিদিত নিয়ম রয়েছে। হযরত আনাস (রা.) নবুওয়াতের প্রথম দিকের অপ্রকাশ্য দাওয়াত ও অহী বিরতির (ফাতরাতুল ওহী) প্রায় ৩ বছর বাদ দিয়ে প্রকাশ্য দাওয়াতের দশ বছরকে পূর্ণ সংখ্যা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অনুরূপভাবে মোট হায়াতের ক্ষেত্রে ৬৩ বছরের তিন বছর বাদ দিয়ে ৬০ বছর বলেছেন।
- ২. অহী সূচনার বিভিন্ন স্তর গণনা: নবুওয়াতের প্রারম্ভে সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে যে সূচনা হয়েছিল তা ছিল প্রায় ৩ বছর, আর প্রকাশ্য রিসালাতের বিধানসহ প্রচারকাল ছিল ১০ বছর। হযরত আনাস (রা.) রিসালাতের প্রকাশ্য কালকে গণনা করেছেন, আর হযরত ইবনে আব্বাস ও আয়েশা (রা.) সমগ্র অহীর সময়কাল (১৩ বছর) গণনা করেছেন।
- ৩. সিদ্ধান্ত: উভয় বর্ণনাই সত্য। জমহুর উলামায়ে কেরামের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলো রাসূলুল্লাহ ﷺ মক্কায় নবুওয়াতের পর ১৩ বছর অবস্থান করেছিলেন এবং তাঁর সর্বমোট বরকতময় হায়াত ছিল ৬৩ বছর।
(খ) হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.)-এর জীবনী সংক্ষেপ:
হযরত আনাস (রা.) ছিলেন রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বিশেষ খাদেম ও বিশ্বস্ত সাহাবি। বাল্যকালেই তিনি ইসলামের ছায়াতলে আসেন। বদর যুদ্ধ ব্যতীত পরবর্তী প্রায় সকল গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর খিদমতে উপস্থিত ছিলেন। তিনি সুন্নাহর সূক্ষ্মতম খুঁটিনাটি প্রত্যক্ষকারী সাহাবিদের অন্যতম। হযরত উমর (রা.)-এর খেলাফতকালে তিনি বসরায় দ্বীনি তালীমের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর থেকে তাবেয়ীগণের এক বিশাল জামাত হাদিস শিক্ষা লাভ করেন, যার মধ্যে ইমাম হাসান বাসরী, ইবনে সিরীন ও কাতাদাহ (র.) অন্যতম। ৯৩ হিজরিতে তিনি বসরায় ইন্তেকাল করেন।
٥- عَرِّفِ الحَدِيثَ لُغَةً وَاصْطِلاَحًا – ثُمَّ بَيِّنِ الفَرْقَ بَيْنَ الحَدِيثِ وَالسُّنَّةِ وَالأَثَرِ-
[৫. হাদিসের আভিধানিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা দাও। অতঃপর হাদিস, সুন্নাহ এবং আসার-এর মধ্যকার পার্থক্য স্পষ্ট করো।]
হাদিসের আভিধানিক অর্থ:
‘হাদিস’ (الحديث) শব্দটি আরবি ح-د-ث মূল ধাতু থেকে নির্গত। এর আভিধানিক অর্থ নতুন (الجديد – যা প্রাচীন বা পুরাতন নয়) এবং কথা বা বার্তা (الخبر والقول)। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: فَلْيَأْتُوا بِحَدِيثٍ مِّثْلِهِ إِن كَانُوا صَادِقِينَ (অতএব তারা এর সদৃশ কোনো বার্তা নিয়ে আসুক, যদি তারা সত্যবাদী হয় – সূরা তূর: ৩৪)।
হাদিসের পারিভাষিক সংজ্ঞা:
মুহাদ্দিসগণের সর্বসম্মত পরিভাষায়:
“مَا أُضِيفَ إِلَى النَّبِيِّ ﷺ مِنْ قَوْلٍ أَوْ فِعْلٍ أَوْ تَقْرِيرٍ أَوْ صِفَةٍ خَلْقِيَّةٍ أَوْ خُلُقِيَّةٍ”-
অর্থাৎ: “যা কিছু মহানবী ﷺ-এর বাণী, কর্ম, মৌনসম্মতি কিংবা তাঁর জন্মগত শারীরিক ও চারিত্রিক গুণাবলির দিকে সম্পর্কিত করা হয়, তাকে হাদিস বলে।”
হাদিস, সুন্নাহ ও আসার-এর মধ্যকার পার্থক্য:
| পরিভাষা | মৌলিক সংজ্ঞা | প্রয়োগের ক্ষেত্র | পার্থক্য ও বৈশিষ্ট্য |
|---|---|---|---|
| হাদিস (الحديث) | রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কথা, কাজ, অনুমোদন ও গুণাবলির মৌখিক বা লিখিত বিবরণ। | সনদ ও মতনের মাধ্যমে বর্ণিত একক যেকোনো রেওয়ায়েত। | এটি মূলত বর্ণনামূলক রূপ (Narrative form); যা সহীহ, হাসান বা যঈফও হতে পারে। |
| সুন্নাহ (السنة) | রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বাস্তব জীবনপদ্ধতি, দ্বীনি আদর্শ ও নিরবচ্ছিন্ন আমল। | শরীয়তের ব্যবহারিক ও আইনগত মডেল (Practical model)। | সব সুন্নাহই হাদিস দ্বারা প্রমাণিত, কিন্তু প্রতিটি ঐতিহাসিক তথ্যযুক্ত হাদিসই সরাসরি ব্যবহারিক সুন্নাত বা শারঈ হুকুম নাও হতে পারে। |
| আসার (الأثر) | সাহাবায়ে কেরাম (রা.) ও তাবেয়ীগণের বাণী, ফতোয়া ও কর্ম। | মাওকুফ (সাহাবির কথা) ও মাকতু (তাবেয়ীর কথা) বর্ণনা। | মুহাদ্দিসদের একাংশের মতে আসার হাদিসের সমার্থক হলেও অধিকাংশের মতে এটি সাহাবি ও তাবেয়ীদের বর্ণনার জন্য নির্ধারিত। |
٦- اُذْكُرْ تَارِيخَ حِفْظِ الحَدِيثِ وَكِتَابَتِهِ فِي عَهْدِ النَّبِيِّ ﷺ-
[৬. নবী করীম ﷺ-এর পবিত্র যুগে হাদিস সংরক্ষণ ও লিপিবদ্ধকরণের ইতিহাস বর্ণনা করো।]
নবী করীম ﷺ-এর যুগে হাদিস সংরক্ষণের মাধ্যমসমূহ:
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর যুগে হাদিস মূলত দুটি প্রধান মাধ্যমে সংরক্ষিত হতো: (১) স্মৃতিতে ধারণ (মুখস্থকরণ) ও পারস্পরিক চর্চা, এবং (২) লিখিত আকারে সংকলন।
১. স্মৃতিতে সংরক্ষণ (الحفظ في الصدور):
- আরব জাতির সহজাত অসাধারণ স্মৃতিশক্তি ছিল হাদিস মুখস্থকরণের প্রধান ভিত্তি। সাহাবায়ে কেরাম রাসূল ﷺ-এর প্রতিটি বাক্য অত্যন্ত একাগ্রতার সাথে মুখস্থ করতেন।
- রাসূলুল্লাহ ﷺ কোনো বক্তব্য পেশ করার সময় গুরুত্বপূর্ণ কথা তিনবার পুনরাবৃত্তি করতেন, যাতে সাহাবিগণ তা সহজে অনুধাবন ও আত্মস্থ করতে পারেন।
- সাহাবিগণ প্রত্যহ মজলিসে বসে একে অপরকে হাদিস শুনিয়ে পুনরাবৃত্তি ও মুযাকারা (পরস্পর আলোচনা) করতেন।
২. হাদিস লিপিবদ্ধকরণের ইতিহাস ও প্রাথমিক নিষেধাজ্ঞা:
নবুওয়াতের প্রাথমিক যুগে সাধারণ মুসলমানদের জন্য হাদিস লিখতে সাময়িক নিষেধ করা হয়েছিল। যেমন হাদিসে এসেছে: “لا تَكْتُبُوا عَنِّي، وَمَنْ كَتَبَ عَنِّي غَيْرَ القُرْآنِ فَلْيَمْحُهُ” (আমার থেকে কুরআন ব্যতীত অন্য কিছু লিখো না; যে লিখেছে সে যেন তা মুছে ফেলে – সহীহ মুসলিম)। এর প্রধান কারণ ছিল:
- কুরআনের আয়াতের সাথে হাদিসের বাণীর সংমিশ্রণ ঘটার আশঙ্কা রোধ করা।
- কুরআনের পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থনা সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত মুসলমানদের মনোযোগ একমাত্র আল্লাহর কিতাবে নিবদ্ধ রাখা।
৩. হাদিস লেখার অনুমতি ও ব্যক্তিগত পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত:
পরবর্তীতে যখন সাহাবিগণ কুরআন ও হাদিসের ভাষার পার্থক্য স্পষ্টভাবে বুঝতে সক্ষম হন, তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ হাদিস লেখার অবাধ অনুমতি দেন।
- সহীফায়ে সাদেকাহ: হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর অনুমতি নিয়ে সরাসরি তাঁর মুখনিঃসৃত বাণী লিখে রাখতেন। তিনি নিজেই বলেন, “আমি রাসূল ﷺ-কে জিজ্ঞেস করলাম, আমি কি আপনার সব কথা লিখব? তিনি নিজের মুখের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন: ‘লেখো! সেই সত্তার শপথ যাঁর হাতে আমার প্রাণ, এই মুখ দিয়ে সত্য ছাড়া আর কিছুই বের হয় না’।” তাঁর লিখিত এই সংকলনের নাম ‘আস-সাহীফাতুস সাদিক্বাহ’।
- আবু হুরায়রা (রা.)-এর সাক্ষ্য: হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, “সাহাবিদের মধ্যে আবদুল্লাহ ইবনে আমর ব্যতীত আমার চেয়ে অধিক হাদিস আর কেউ জানতেন না; কারণ তিনি লিখে রাখতেন, আর আমি লিখতাম না।”
- আলী (রা.)-এর সহীফা: হযরত আলী (রা.)-এর নিকট একটি লিখিত পুস্তিকা ছিল যাতে দিয়ত (রক্তপণ), বন্দী মুক্তি ও মদীনার হারাম সীমানা সম্পর্কিত হাদিস লিখিত ছিল।
- ইয়ামেনের আবু শাহ-এর ঘটনা: মক্কা বিজয়ের ভাষণের পর আবু শাহ নামক এক ইয়ামেনী সাহাবি ভাষণটি লিখে দেওয়ার আবেদন করলে রাসূল ﷺ নির্দেশ দেন: “اكْتُبُوا لأَبِي شَاهٍ” (আবু শাহ-এর জন্য এটি লিখে দাও – সহীহ বুখারী)।
٧- عَرِّفِ الإِيمَانَ – هَلِ الإِيمَانُ مُرَكَّبٌ أَمْ بَسِيطٌ؟ أَوْضِحْ-
[৭. ঈমানের সংজ্ঞা দাও। ঈমান কি যৌগিক (মুরাক্কাব) নাকি একক (বাসীত)? ব্যাখ্যা করো।]
ঈমানের সংজ্ঞা:
আভিধানিক অর্থ: ‘ঈমান’ (الإيمان) অর্থ আন্তরিক বিশ্বাস স্থাপন করা, স্বীকৃতি দেওয়া এবং নিরাপত্তা ও নির্ভরতা প্রদান করা।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: শরীয়তের পরিভাষায় ঈমান হলো: মহানবী ﷺ আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে যা কিছু নিয়ে এসেছেন সেগুলোকে সর্বান্তঃকরণে সত্য বলে বিশ্বাস করা এবং মৌখিকভাবে স্বীকৃতি প্রদান করা।
ঈমান যৌগিক (مركب) নাকি একক (بسيط) – বিশদ পর্যালোচনা:
ইলমুল কালাম ও আকাইদবিদগণের মাঝে ঈমানের উপাদান ও গঠন নিয়ে দুটি প্রসিদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি বিদ্যমান:
- ১. ইমাম আবু হানিফা (র.) ও মাতুরিদী মতবাদ (ঈমান বাসীত বা একক): এই মতানুসারে ঈমান মূলত ‘বাসীত’ বা যৌগিকতাহীন একক সত্তা। ঈমানের মূল ভিত্তি হলো ‘আত-তাসদীক্ব বিল ক্বলব’ (অন্তরের অবিচল বিশ্বাস) এবং এর সহায়ক হলো ‘আল-ইক্বরার বিল লিসান’ (মৌখিক স্বীকৃতি)। আমল (সৎকর্ম) ঈমানের মূল সত্তার অন্তর্ভুক্ত নয়, বরং তা ঈমানের পূর্ণতা ও অলংকার। সুতরাং অন্তরের বিশ্বাস স্থাপিত হলে মানুষ মুমিন হিসেবে গণ্য হয় এবং কবিরা গুনাহের কারণে ঈমান নষ্ট হয় না।
- ২. ইমাম শাফেয়ী, আহমাদ ইবনে হাম্বল ও মুহাদ্দিসগণের মতবাদ (ঈমান মুরাক্কাব বা যৌগিক): জমহুর মুহাদ্দিসগণের মতে ঈমান হলো তিনটি উপাদানের সমষ্টি বা যৌগিক (مركب من ثلاثة أمور):
- তাসদীক্ব বিল ক্বলব: অন্তরে বিশ্বাস করা।
- ইক্বরার বিল লিসান: মুখে স্বীকৃতি প্রদান করা।
- আমাল বিল আরকান: অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়ে শরীয়তের বিধিবিধান পালন করা।
এই মতানুসারে আমল ঈমানের অঙ্গ হওয়ায় আমলের তারতম্যে ঈমান বৃদ্ধি ও হ্রাস পায় (يزيد وينقص)। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে: لِيَزْدَادُوا إِيمَانًا مَّعَ إِيمَانِهِمْ (যাতে তাদের ঈমানের সাথে আরও ঈমান বৃদ্ধি পায় – সূরা ফাতহ: ৪)।
٨- هَلْ تَجُوزُ صَلاَةُ الجَنَازَةِ عَلَى الغَائِبِ؟ وَمَا الاِخْتِلاَفُ فِيهِ؟ فَصِّلْ-
[৮. গায়েবানা জানাযার সালাত আদায় করা কি জায়েয? এ বিষয়ে ইমামগণের মতপার্থক্য বিস্তারিত আলোচনা করো।]
গায়েবানা জানাযার প্রেক্ষাপট:
উপস্থিত মৃতদেহ সামনে না রেখে দূরবর্তী স্থানের কোনো মৃতের জন্য যে জানাযার সালাত আদায় করা হয় তাকে ‘সালাতুল জানাযা আলাল গায়েব’ (গায়েবানা জানাযা) বলা হয়। হাবশার বাদশাহ নাজ্জাশী (আসহামা) মৃত্যুবরণ করলে রাসূলুল্লাহ ﷺ মদীনায় সাহাবিদের নিয়ে তাঁর জানাযার সালাত আদায় করেছিলেন। এই ঘটনার ব্যাখ্যা ও হুকুম নিয়ে ফুকাহায়ে কেরামের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
ইমামগণের মাযহাব ও মতপার্থক্য:
- ১. ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (র.)-এর মত (জায়েয): তাঁদের মতে যেকোনো সম্মানিত মুসলিম, আলিম বা সাধারণ ব্যক্তি দূরদেশে ইন্তেকাল করলে তাঁর জন্য গায়েবানা জানাযা পড়া সর্বাবস্থায় বৈধ ও মুস্তাহাব। তাঁদের দলিল নাজ্জাশীর মৃত্যুর পর রাসূল ﷺ-এর গায়েবানা জানাযা আদায় করা।
- ২. ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মালিক (র.)-এর মত (নাজায়েয): হানাফী ও মালেকী ফিকহবিদগণের মতে গায়েবানা জানাযা আদায় করা জায়েয নেই। জানাযার সালাতের অন্যতম অপরিহার্য শর্ত হলো মৃতদেহ বা তার অধিকাংশ অংশ ইমাম ও মুসল্লিদের সম্মুখে বিদ্যমান থাকা (حضور الميت)।
নাজ্জাশীর ঘটনার জবাবে হানাফী যুক্তি:
- মু’জিযা স্বরূপ আল্লাহ তা’আলা রাসূল ﷺ-এর চোখের সামনে থেকে মধ্যবর্তী পর্দা তুলে দিয়েছিলেন এবং নাজ্জাশীর খাটিয়া সরাসরি তাঁর সামনে উদ্ভাসিত হয়েছিল, যা প্রকৃতপক্ষে প্রত্যক্ষ জানাযা ছিল।
- নাজ্জাশী খ্রিস্টান অধ্যুষিত ভূমিতে একাকী ঈমান রক্ষা করে ইন্তেকাল করেছিলেন এবং সেখানে তাঁর জানাযা পড়ার মতো কোনো মুসলিম ছিল না। সুতরাং যার জানাযা একবার আদায় করা হয়েছে, তার পুনঃগায়েবানা জানাযা পড়ার কোনো প্রমাণ নেই।
- ৩. ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ ও মুহাক্কিকীনদের মধ্যপন্থী মত: যদি কোনো মুসলিম এমন স্থানে ইন্তেকাল করে যেখানে তাঁর জানাযার সালাত একেবারেই আদায় করা হয়নি, তবে তাঁর জন্য গায়েবানা জানাযা পড়া সুন্নাত। কিন্তু যার এলাকায় জানাযা অনুষ্ঠিত হয়েছে, তার জন্য অন্যত্র দ্বিতীয়বার গায়েবানা জানাযা পড়ার প্রয়োজন নেই।
٩- صَوِّرْ صُورَةَ النَّبِيِّ ﷺ فِي ضَوْءِ الحَدِيثِ-
[৯. হাদিসের আলোকে নবী করীম ﷺ-এর পবিত্র শারীরিক অবয়ব ও রূপসৌন্দর্য চিত্রায়িত করো।]
হাদিসের আলোকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর অতুলনীয় শারীরিক বৈশিষ্ট্য:
হযরত আনাস, বারা ইবনে আযিব, আলী এবং উম্মে মা’বাদ (রা.) বর্ণিত শামাঈলের হাদিসসমূহের আলোকে মহানবী ﷺ-এর অনুপম রূপের বিবরণ নিম্নরূপ:
- উচ্চতা ও শারীরিক গঠন: তিনি অতি দীর্ঘও ছিলেন না এবং খর্বাকৃতিও ছিলেন না; বরং মাঝারি গঠনের এক সুষম ও প্রীতিপ্রদ শারীরিক উচ্চতার অধিকারী ছিলেন। তাঁর কাঁধ ছিল প্রশস্ত এবং সুদৃঢ়।
- চেহারা মুবারক ও গাত্রবর্ণ: তাঁর পবিত্র চেহারা ছিল পূর্ণিমার চাঁদের ন্যায় উজ্জ্বল ও জ্যোতির্ময়। তাঁর গাত্রবর্ণ ছিল শ্বেত-শুভ্রতার মাঝে হালকা লালিমাময় লাবণ্যযুক্ত (أزهر اللون)। তিনি ধবধবে ফ্যাকাশে সাদা ছিলেন না এবং কালো বা শ্যামলাও ছিলেন না।
- নয়ন ও ভ্রূযুগল: তাঁর নয়নযুগল ছিল ডাগর ও কুচকুচে কালো। চোখের প্রান্তভাগ ছিল রক্তিম আভা মিশ্রিত এবং পাপড়িগুলো ছিল দীর্ঘ ও মোহনীয়। ভ্রূদ্বয় ছিল ধনুকের মতো বাঁকা ও সূক্ষ্ম।
- পবিত্র কেশদাম ও শ্মশ্রু মুবারক: তাঁর মাথার চুল সম্পূর্ণ কোঁকড়ানোও ছিল না এবং সম্পূর্ণ সোজাও ছিল না; বরং তা ছিল কিছুটা ঢেউ খেলানো। কখনো তা কানের লতি পর্যন্ত আবার কখনো কাঁধ পর্যন্ত প্রলম্বিত থাকত। তাঁর দাড়ি মুবারক ছিল ঘন, সুবিন্যস্ত ও শোভামণ্ডিত। ওফাতের সময় তাঁর মাথায় ও দাড়িতে সাদা চুলের সংখ্যা বিশটির বেশি ছিল না।
- বক্ষ ও উদর: তাঁর বুক ও পেট ছিল সম্পূর্ণ সমান্তরাল। বুকের উপরিভাগ থেকে নাভি পর্যন্ত একটি সরু পশমরেখা বিস্তৃত ছিল। দুই কাঁধের মধ্যবর্তী স্থানে মোহরে নবুওয়াত (নবুওয়াতের সীলমোহর) শোভা পেত।
- হাঁটার ভঙ্গি: তিনি যখন পথ চলতেন, তখন অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে পা ফেলতেন, যেন কোনো উঁচু স্থান থেকে নিচের দিকে ধাবিত হচ্ছেন। তাঁর শরীর থেকে সর্বদা মেশক-আম্বরের সুবাস নির্গত হতো।
١٠- اُكْتُبْ أَسْمَاءَ الكُتُبِ السِّتَّةِ مَعَ ذِكْرِ مُصَنِّفِيهَا-
[১০. সিহাহ সিত্তাহর (কুতুবে সিত্তা) কিতাবসমূহের নাম এবং তাদের সম্মানিত সংকলকগণের নাম উল্লেখ করো।]
সিহাহ সিত্তাহর কিতাব ও সংকলকবৃন্দের পরিচিতি:
হাদিস শাস্ত্রের সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য ও বিশুদ্ধতম ছয়টি মূল সংকলনকে ‘আল-কুতুবুস সিত্তাহ’ বলা হয়। নিচে তালিকাভুক্ত করা হলো:
| ক্রম | কিতাবের নাম | মুসান্নিফ / ইমামের নাম | জন্ম ও ওফাত সন | বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্ব |
|---|---|---|---|---|
| ১ | সহীহুল বুখারী (صحيح البخاري) الجامع المسند الصحيح المختصر |
ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল আল-বুখারী (র.) | ১৯৪ হিজরি – ২৫৬ হিজরি | পবিত্র কুরআনের পর পৃথিবীর বুকে সর্বাধিক বিশুদ্ধ গ্রন্থ। |
| ২ | সহীহ মুসলিম (صحيح مسلم) المسند الصحيح المختصر |
ইমাম মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ আন-নায়সাবুরী (র.) | ২০৬ হিজরি – ২৬১ হিজরি | সনদের চমৎকার বিন্যাস ও পুনরাবৃত্তিমুক্ত সুবিন্যস্ত গ্রন্থ। |
| ৩ | সুনানে আবী দাউদ (سنن أبي داود) | ইমাম সুলায়মান ইবনুল আশ’আস আস-সিজিস্তানী (র.) | ২০২ হিজরি – ২৭৫ হিজরি | ফিকহ ও আহকামের হাদিস সংকলনে অনন্য প্রামাণ্য গ্রন্থ। |
| ৪ | জামে আত-তিরমিযী (جامع الترمذي) | ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ঈসা আত-তিরমিযী (র.) | ২০৯ হিজরি – ২৭৯ হিজরি | হাদিসের মান নির্ধারণ (সহীহ, হাসান, গরীব) ও ফুকাহাদের মতামতের আধার। |
| ৫ | সুনানে নাসাঈ (سنن النسائي) المجتبى من السنن |
ইমাম আহমদ ইবনে শুআইব আন-নাসাঈ (র.) | ২১৫ হিজরি – ৩০৩ হিজরি | সনদের ত্রুটি ও সূক্ষ্ম ইল্লত বর্ণনায় অত্যন্ত কঠোর মানদণ্ড অনুসৃত। |
| ৬ | সুনানে ইবনে মাজাহ (سنن ابن ماجه) | ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াযীদ ইবনে মাজাহ আল-কাযভীনী (র.) | ২০৯ হিজরি – ২৭৩ হিজরি | অধ্যায়ভিত্তিক চমৎকার তারতীব ও হাসান স্তরের বহু অনন্য হাদিস সম্বলিত। |
١١- كَمْ قِسْمًا لِلْحَدِيثِ بِاعْتِبَارِ السَّنَدِ؟ بَيِّنْ كُلَّ قِسْمٍ مُوَضَّحًا-
[১১. সনদের ধারাবাহিকতা ও শক্তির বিচারে হাদিস কত প্রকার? প্রতিটি প্রকার স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা করো।]
সনদের ধারাবাহিকতার বিচারে হাদিসের প্রকারভেদ:
সনদের সংযোগ (الاتصال) এবং বিচ্ছিন্নতা (الانقطاع)-এর বিচারে হাদিস প্রধানত দুই প্রকার: ১. মুত্তাসিল (متصل – সংযুক্ত সনদ) এবং ২. মুনক্বাতি (منقطع – বিচ্ছিন্ন সনদ)। তবে সনদ পৌঁছার মাধ্যম ও রাবীর সংখ্যার বিচারে হাদিস দুই প্রকার:
১. হাদিসে মুতাওয়াতির (الحديث المتواتر):
- সংজ্ঞা: যে হাদিস সনদের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে এমন বিপুল সংখ্যক বর্ণনাকারী বর্ণনা করেছেন, যাদের সকলের পক্ষে একত্রে মিথ্যা বা ভুলের ওপর একমত হওয়া স্বভাবত অসম্ভব।
- শর্তাবলি: বর্ণনাকারীদের সংখ্যাধিক্য, সকল স্তরে এই সংখ্যা অক্ষুণ্ণ থাকা এবং তথ্যটি পঞ্চেন্দ্রিয় দ্বারা প্রত্যক্ষ হওয়া।
- হুকুম: এটি নিশ্চিত ও সন্দেহাতীত জ্ঞান (العلم اليقيني القطعي) দান করে; যা অস্বীকার করা কুফরি।
২. হাদিসে আহাদ (حديث الآحاد):
যে হাদিসে মুতাওয়াতিরের শর্তসমূহ পূর্ণ হয়নি। বর্ণনাকারীর সংখ্যা বিচারে আহাদ হাদিস তিন প্রকার:
- মাশহুর (المشهور): যে হাদিসের প্রতি স্তরে অন্তত তিনজন বর্ণনাকারী বিদ্যমান থাকে।
- আযীয (العزيز): যে হাদিসের কোনো স্তরে বর্ণনাকারীর সংখ্যা দুজনের কম নয়।
- গারীব (الغريب): সনদের যেকোনো স্তরে একজন মাত্র রাবী কর্তৃক বর্ণিত হাদিস।
সনদ ও মতনের গ্রহণযোগ্যতার বিচারে হাদিসের প্রকারভেদ:
- সহীহ (الصحيح): যার সনদের প্রতিটি বর্ণনাকারী ন্যায়পরায়ণ (আদিল), পূর্ণ স্মৃতিশক্তিসম্পন্ন (যাবিত), সনদ সম্পূর্ণ অবিচ্ছিন্ন এবং যা ইল্লত (সূক্ষ্ম ত্রুটি) ও শুযূয (অন্যান্য নির্ভরযোগ্য বর্ণনার বৈপরীত্য) থেকে মুক্ত।
- হাসান (الحسن): সহীহ হাদিসের সমস্ত গুণাবলি বিদ্যমান, কেবল কোনো বর্ণনাকারীর স্মৃতিশক্তি সামান্য দুর্বল।
- যঈফ (الضعيف): যার মধ্যে সহীহ ও হাসান হাদিসের শর্তাবলির অভাব রয়েছে।
١٢- أَثْبِتْ حُجِّيَّةَ السُّنَّةِ عَقْلًا وَنَقْلًا-
[১২. বুদ্ধিবৃত্তিক (আকলী) ও উদ্ধৃতিভিত্তিক (নাক্বলী) দলীল দ্বারা সুন্নাহর প্রামাণিকতা (হুজ্জিয়্যাত) প্রমাণ করো।]
সুন্নাহর প্রামাণিকতার তাৎপর্য:
ইসলামী শরীয়তের দ্বিতীয় মূল উৎস হলো সুন্নাহ বা হাদিসে নববী। কুরআন কারীমের পরই সুন্নাহর স্থান এবং সুন্নাহ ব্যতীত কুরআনের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ অসম্ভব।
১. উদ্ধৃতিভিত্তিক প্রমাণ (الأدلة النقلية):
- কুরআনুল কারীমের অকাট্য নির্দেশ:
- আল্লাহ তা’আলা রাসূলের আনুগত্যকে নিজের আনুগত্যের সমতুল্য ঘোষণা করেছেন: مَّن يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ (যে রাসূলের আনুগত্য করল, সে মূলত আল্লাহরই আনুগত্য করল – সূরা নিসা: ৮০)।
- রাসূলের ফয়সালা মেনে নেওয়াকে ঈমানের অবিচ্ছেদ্য শর্ত করা হয়েছে: فَلا وَرَبِّكَ لا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ (অতএব আপনার রবের শপথ! তারা কিছুতেই মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যকার বিবাদে আপনাকে বিচারক মানবে – সূরা নিসা: ৬৫)।
- রাসূল ﷺ-এর আদেশ ও নিষেধ মানার নির্দেশ: وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا (রাসূল তোমাদের যা দেন তা গ্রহণ করো এবং যা থেকে নিষেধ করেন তা হতে বিরত থাকো – সূরা হাশর: ৭)।
- হাদিসের অকাট্য ঘোষণা:
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন: “أَلا إِنِّي أُوتِيتُ الكِتَابَ وَمِثْلَهُ مَعَهُ” (জেনে রেখো! আমাকে কিতাব দেওয়া হয়েছে এবং তার সাথে তার অনুরূপ আরেকটি বস্তু [সুন্নাহ] দেওয়া হয়েছে – সুনানে আবু দাউদ)।
- ইজমাউল উম্মাহ (উম্মতের ঐকমত্য):
সাহাবায়ে কেরাম থেকে শুরু করে সকল যুগের মুজতাহিদ ফুকাহাগণ সুন্নাহর অকাট্য প্রামাণিকতার ওপর সম্পূর্ণ একমত পোষণ করেছেন।
২. বুদ্ধিবৃত্তিক প্রমাণ (الأدلة العقلية):
- কুরআনের সার্বিক বিধানের ব্যাখ্যার অপরিহার্যতা: কুরআনে সালাত কায়েম করার নির্দেশ রয়েছে, কিন্তু পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের রাকাত সংখ্যা, রুকু-সিজদার নিয়ম ও পদ্ধতি কুরআনে বিশদভাবে বর্ণিত হয়নি; তা সুন্নাহ দ্বারাই নির্ধারিত হয়েছে। সুন্নাহ অস্বীকার করলে সালাত, যাকাত ও হজের মতো ফরজ বিধান পালন অসম্ভব হয়ে পড়ে।
- রিসালাতের মূল দায়িত্ব: আল্লাহ যদি কিতাব পাঠিয়েই দায়িত্ব শেষ করতেন তবে নবীর কোনো প্রয়োজন হতো না। নবীর আগমনই ঘটেছে আল্লাহর বাণীকে বাস্তব জীবনে রূপায়িত ও ব্যাখ্যা করার জন্য। ইরশাদ হয়েছে: وَأَنزَلْنَا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيْهِمْ (আর আমি আপনার প্রতি কুরআন নাযিল করেছি যাতে আপনি মানুষের জন্য যা নাযিল হয়েছে তা স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করে দেন – সূরা নাহল: ৪৪)।
- দ্বীনের স্থায়িত্ব ও সর্বজনীনতা: কিয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির হেদায়েতের জন্য রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বাস্তব সুন্নাহর প্রামাণিকতা সুরক্ষিত থাকা অপরিহার্য। তা না হলে কুরআন কেবল তত্ত্ব হিসেবে থেকে যেত, যার কোনো বাস্তব প্রায়োগিক ভিত্তি থাকত না।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. নুসূসুম মিনাল হাদীস বিষয়ের মূল উদ্দেশ্য কী?
নির্বাচিত সহীহ হাদিসসমূহের সরাসরি আরবি পাঠ, শাব্দিক বিশ্লেষণ, বিশুদ্ধ অর্থ এবং হাদিস থেকে উদ্ভূত আকাইদ, ফিকহ ও চারিত্রিক শিক্ষা গভীরভাবে উপলব্ধি করা।
২. ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করার তিনটি মৌলিক শর্ত কী কী?
১. আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সমগ্র সৃষ্টিজগতের চেয়ে অধিক ভালোবাসা; ২. কোনো বান্দাকে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই ভালোবাসা; এবং ৩. কুফরিতে ফিরে যাওয়াকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মতো ঘৃণা করা।
৩. পুরুষদের জন্য স্বর্ণ ও রেশম ব্যবহারের হুকুম কী?
পুরুষদের জন্য স্বর্ণের আংটি বা অলংকার এবং খাঁটি রেশমি বস্ত্র পরিধান করা সর্বসম্মতভাবে হারাম; তবে নারীদের জন্য এগুলো অলংকার হিসেবে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ জায়েয।
৪. হাউযে কাওসার থেকে কাদের বিতাড়িত করা হবে?
যারা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ওফাতের পর সুন্নাহ পরিত্যাগ করে দ্বীনের মধ্যে নবউদ্ভাবন (বিদ’আত) ঘটিয়েছে এবং দ্বীনের মৌলিক আদর্শ বিকৃত করেছে, তাদেরকে হাউযে কাওসার থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হবে।
৫. সিহাহ সিত্তাহ বলতে কোন কোন কিতাবকে বোঝায়?
হাদিসের প্রধান ছয়টি বিশুদ্ধ গ্রন্থকে সিহাহ সিত্তাহ বলা হয়; যথা: সহীহুল বুখারী, সহীহ মুসলিম, সুনানে আবী দাউদ, জামে আত-তিরমিযী, সুনানে নাসাঈ এবং সুনানে ইবনে মাজাহ।
৬. সুন্নাহ ব্যতীত শুধু কুরআন মানা কি ইসলামে বৈধ?
না, এটি সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর ও বাতিল মতবাদ। কুরআনুল কারীমের অসংখ্য নির্দেশে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহর আনুগত্যকে অপরিহার্য করা হয়েছে এবং সুন্নাহর বাস্তব মডেল ছাড়া কুরআনের কোনো বিধানই বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।