জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

উলূমুল হাদীস (Ulumul Hadith) – 204202, আরবি ভাষা ও সাহিত্য – ফাজিল অনার্স ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০১৯

Abswer.com Abswer.com
21 September, 2026
৫৩ মিনিট পড়ার সময়
৯ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

পরীক্ষা কোড: ২০২ | সেট কোড: ৫৮
اختبار السنة الثانية للفاضل البكالوريوس (الشرف)، لعام ٢٠١٩م
[ফাজিল স্নাতক (সম্মান) দ্বিতীয় বর্ষ পরীক্ষা, ২০১৯]
اللغة العربية وآدابها
[আরবি ভাষা ও সাহিত্য]
علوم الحديث
[উলূমুল হাদিস]
বিষয় কোড: ২০৪২০২
الزمن: ٤ ساعات | الدرجات الكاملة: ٨٠
[সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০]
الملاحظة: أجب عن أربعة من مجموعة (ألف) وعن أربعة من مجموعة (ب)-
[দ্রষ্টব্য: (الف) অংশ থেকে ৪টি এবং (ب) অংশ থেকে ৪টি প্রশ্নের উত্তর দাও।]


١- عَرِّفْ عِلْمَ مُصْطَلَحِ الحَدِيثِ – ثُمَّ بَيِّنْ نَشْأَتَهُ وَتَطَوُّرَهُ عَبْرَ القُرُونِ-

[১. ইলমু মুসত্বালাহিল হাদিসের পরিচয় দাও। অতঃপর বিভিন্ন যুগে এর উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ আলোচনা করো।]

ইলমু মুসত্বালাহিল হাদিসের পরিচয়:

আভিধানিক অর্থ: ‘ইলম’ (العلم) অর্থ জ্ঞান বা বিদ্যা; ‘মুসত্বালাহ’ (المصطلح) অর্থ কোনো বিশেষ বিদ্যায় সুনির্দিষ্ট অর্থে ব্যবহৃত পারিভাষিক শব্দাবলি বা রীতিনীতি; এবং ‘আল-হাদিস’ (الحديث) অর্থ মহানবী ﷺ-এর বাণী, কর্ম, মৌনসম্মতি ও গুণাবলি।

পারিভাষিক সংজ্ঞা: আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী (র.) তাঁর ‘নুখবাতুল ফিকার’ গ্রন্থে বলেন:

“عِلْمٌ بِقَوَاعِدَ يُعْرَفُ بِهَا أَحْوَالُ السَّنَدِ وَالمَتْنِ مِنْ حَيْثُ القَبُولُ وَالرَّدُّ”-

অর্থাৎ: “যে শাস্ত্রীয় মূলনীতিমালার মাধ্যমে সনদ ও মতনের গ্রহণযোগ্যতা (মাকবুল) এবং বর্জনীয়তা (মারদুদ) নিরূপণ করা যায়, তাকে ইলমু মুসত্বালাহিল হাদিস বলা হয়।”

ইলমু মুসত্বালাহিল হাদিসের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ঐতিহাসিক পর্যায়:

  • ১. নবুওয়াত ও সাহাবিদের যুগ (বিকাশের সূচনা): রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর যুগে প্রত্যক্ষ বর্ণনার কারণে কোনো যাচাইয়ের প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু হযরত উসমান (রা.)-এর শাহাদাত এবং ফিতনার উদ্ভবের পর সাহাবায়ে কেরাম সনদ তলব শুরু করেন। ইমাম ইবনে সিরীন (র.) বলেন, “প্রথমে সনদের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হতো না, কিন্তু ফিতনার পর বলা হতো— ‘তোমাদের বর্ণনাকারীদের নাম বলো, যাতে আহলে সুন্নাত হলে তাদের হাদিস গ্রহণ করা হয় এবং আহলে বিদআত হলে বর্জন করা হয়’।”
  • ২. তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ীদের যুগ (২য় হিজরি শতক): এ যুগে হাদিস বর্ণনায় সততা, স্মৃতিশক্তি এবং সনদের অবিচ্ছিন্নতা যাচাইয়ের প্রাথমিক মৌখিক মূলনীতি গড়ে ওঠে। ইমাম শু’বাহ ইবনুল হাজ্জাজ, সুফিয়ান সাওরী ও ইমাম মালিক (র.) জারহ ও তা’দীলের ভিত্তি স্থাপন করেন।
  • ৩. ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম মুসলিমের যুগ (৩য় হিজরি শতক): ইমাম শাফেয়ী (র.) তাঁর ‘আর-রিসালাহ’ গ্রন্থে সহীহ হাদিস ও খবরের শর্তাবলি প্রথম লিখিতভাবে সন্নিবেশ করেন। এরপর ইমাম মুসলিম তাঁর ‘সহীহ মুসলিম’-এর ভূমিকায় এবং ইমাম তিরমিযী তাঁর ‘আল-ইলাল’ গ্রন্থে হাদিসের শ্রেণিবিন্যাসের নিয়মাবলী আলোচনা করেন।
  • ৪. স্বতন্ত্র শাস্ত্র হিসেবে পূর্ণাঙ্গ সংকলন যুগ (৪র্থ শতক থেকে পরবর্তী কাল):
    • কাজী আবু মুহাম্মদ আর-রামাহুরমুযী (মৃ. ৩৬০ হি.) সর্বপ্রথম এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ স্বতন্ত্র গ্রন্থ ‘আল-মুহাদ্দিসুল ফাসিল বাইনার রাবী ওয়াল ওয়ায়ী’ রচনা করেন।
    • হাকিম নায়সাবুরী (মৃ. ৪০৫ হি.) প্রণয়ন করেন ‘মারিফাতু উলূমিল হাদিস’
    • খতীব বাগদাদী (মৃ. ৪৬৩ হি.) রচনা করেন ‘আল-কিফায়াহ ফী ইলমির রিওয়ায়াহ’
    • ইমাম ইবনুস সালাহ (মৃ. ৬৪৩ হি.) তাঁর কালজয়ী ‘মুকাদ্দিমাতু ইবনিস সালাহ’ (উলূমুল হাদিস) সংকলন করে সমস্ত বিচ্ছিন্ন নীতিকে সংহত রূপ দান করেন।
    • পরবর্তীতে হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানী (মৃ. ৮৫২ হি.) ‘নুখবাতুল ফিকার’ ও এর ভাষ্য ‘নুযহাতুন নাযার’ রচনার মাধ্যমে এই শাস্ত্রকে চরম উৎকর্ষে পৌঁছান।

٢- مَا المُرْسَلُ؟ بَيِّنْ حُكْمَ رِوَايَتِهِ مَعَ اخْتِلاَفِ الأَئِمَّةِ فِيهِ-

[২. মুরসাল হাদিস কাকে বলে? ইমামগণের মতভেদসহ মুরসাল হাদিস দ্বারা দলিল গ্রহণের বিধান আলোচনা করো।]

মুরসাল (المرسل) হাদিসের পরিচয়:

আভিধানিক অর্থ: ‘মুরসাল’ শব্দটি إرسال (ইরসাল) ধাতু থেকে নির্গত ইসমে মাফ’উল, যার অর্থ উন্মুক্ত করা, ছেড়ে দেওয়া বা বাঁধনমুক্ত করা। সনদের কোনো একটি স্তরকে সরাসরি মুক্ত করে পরবর্তী স্তরে যুক্ত করার কারণে একে মুরসাল বলা হয়।

পারিভাষিক সংজ্ঞা: মুহাদ্দিসগণের সর্বসম্মত সংজ্ঞায়:

“مَا سَقَطَ مِنْ آخِرِ إِسْنَادِهِ مَنْ بَعْدَ التَّابِعِيِّ”-

অর্থাৎ: “যে হাদিসের সনদের শেষাংশ হতে অর্থাৎ তাবেয়ীর পরবর্তী রাবী (সাহাবি) বাদ পড়ে যায় এবং তাবেয়ী মধ্যবর্তী সাহাবির নাম উল্লেখ না করে সরাসরি রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে বর্ণনা করেন, তাকে মুরসাল হাদিস বলে।”

মুরসাল হাদিস দ্বারা দলিল গ্রহণের ক্ষেত্রে ইমামগণের মতপার্থক্য:

ইমাম / মাযহাব মুরসাল হাদিসের শারঈ হুকুম দলিল ও মূলনীতি
ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মালিক (র.) নিঃশর্তভাবে গ্রহণযোগ্য ও প্রামাণ্য দলিল (হুজ্জাত)। তাবেয়ী যদি নির্ভরযোগ্য (সিক্বাহ) হন, তবে তিনি কোনো বিশ্বস্ত ব্যক্তি ছাড়া সরাসরি রাসূল ﷺ-এর দিকে হাদিস সম্পর্কিত করবেন না। তাই মধ্যবর্তী রাবীর নাম উহ্য রাখলেও তা গ্রহণযোগ্য।
ইমাম শাফেয়ী (র.) শর্তসাপেক্ষে গ্রহণযোগ্য (مقبول بشروط)। ইমাম শাফেয়ীর মতে কেবল জ্যেষ্ঠ তাবেয়ী (যেমন সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব)-এর মুরসাল গ্রহণযোগ্য হবে, যদি তা অন্য কোনো মুত্তাসিল সনদ, অন্য মুরসাল, সাহাবির আমল বা ক্বিয়াসের মাধ্যমে সমর্থিত হয়।
জমহুর মুহাদ্দিসীন (ইমাম বুখারী ও মুসলিম) নীতিগতভাবে যঈফ বা অগ্রহণযোগ্য (مردود عند الجمهور)। যেহেতু মধ্যবর্তী রাবী উহ্য রয়েছেন এবং তিনি সাহাবি নাকি দুর্বল কোনো তাবেয়ী তা নিশ্চিত নয়, তাই সনদের সংযোগের শর্ত নষ্ট হওয়ায় তা মূলত মুনক্বাতি বা দুর্বল।

٣- عَرِّفِ الحَدِيثَ الصَّحِيحَ – ثُمَّ بَيِّنْ شُرُوطَهُ وَأَقْسَامَهُ وَحُكْمَهُ بِالأَمْثِلَةِ-

[৩. সহীহ হাদিসের পরিচয় দাও। অতঃপর এর শর্তাবলি, প্রকারভেদ ও হুকুম উদাহরণসহ বর্ণনা করো।]

সহীহ হাদিসের সংজ্ঞা:

আভিধানিক অর্থ: ‘সহীহ’ (الصحيح) অর্থ রোগমুক্ত, নির্ভেজাল, অক্ষত ও বিশুদ্ধ।

পারিভাষিক সংজ্ঞা: ইমাম ইবনুস সালাহ ও হাফিজ ইবনে হাজার (র.)-এর মতে:

“هُوَ الحَدِيثُ المُسْنَدُ الَّذِي يَتَّصِلُ إِسْنَادُهُ بِنَقْلِ العَدْلِ الضَّابِطِ عَنِ العَدْلِ الضَّابِطِ إِلَى مُنْتَهَاهُ، وَلاَ يَكُونُ شَاذًّا وَلاَ مُعَلَّلًا”-

অর্থাৎ: “যে হাদিসের সনদের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে পূর্ণ ন্যায়পরায়ণ (আদিল) ও নির্ভরযোগ্য স্মৃতিশক্তিসম্পন্ন (যাবিত) বর্ণনাকারী কর্তৃক পরস্পর সংযুক্ত সনদে বর্ণিত হয় এবং হাদিসটি শায (নির্ভরযোগ্য বর্ণনার বিপরীত) ও মু’আল্লাল (সূক্ষ্ম গোপন ত্রুটিযুক্ত) হওয়া থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকে, তাকে সহীহ হাদিস বলে।”

সহীহ হাদিসের ৫টি মৌলিক শর্ত:

  1. ইত্তিসালুস সানাদ (اتصال السند): সনদের প্রতিটি বর্ণনাকারী তার পূর্ববর্তী বর্ণনাকারীর কাছ থেকে সরাসরি হাদিস শ্রবণ বা গ্রহণ করা, কোনো স্তরে বর্ণনাকারী উহ্য না থাকা।
  2. আদালাতুর রুওয়াত (عدالة الرواة): সনদের প্রতিটি বর্ণনাকারী দ্বীনদার, তাকওয়াবান, কবিরা গুনাহ ও নীচ স্বভাবমুক্ত মুসলিম হওয়া।
  3. যাবতুর রুওয়াত (ضبط الرواة): প্রতিটি বর্ণনাকারীর স্মৃতিশক্তি বা লিখিত পাণ্ডুলিপি ত্রুটিমুক্ত ও নিখুঁত হওয়া।
  4. আদামুশ শুযূয (عدم الشذوذ): কোনো নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী তার চেয়ে অধিক নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীর বিরোধী বর্ণনা না করা।
  5. আদামুল ইল্লাহ (عدم العلة): হাদিসের মধ্যে এমন কোনো গোপন সূক্ষ্ম ত্রুটি না থাকা যা আপাতদৃষ্টিতে ধরা পড়ে না কিন্তু হাদিসের বিশুদ্ধতাকে ক্ষুণ্ণ করে।

সহীহ হাদিসের প্রকারভেদ:

  • ১. সহীহ লি-যাতিহী (صحيح لذاته): যে হাদিস নিজস্ব সনদের শক্তিতেই সহীহ হওয়ার পাঁচটি শর্ত পূর্ণাঙ্গভাবে পূরণ করে। যেমন: মালিক সূত্রে নাফে’ হতে, তিনি ইবনে উমর (রা.) হতে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “بُنِيَ الإِسْلاَمُ عَلَى خَمْسٍ” (ইসলাম পাঁচটি স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত)।
  • ২. সহীহ লি-গায়রিহী (صحيح لغيره): যে হাদিস মূলত হাসান লি-যাতিহী (রাবীর স্মৃতিশক্তি সামান্য কম), কিন্তু অপর এক বা একাধিক সমমানের সূত্রে বর্ণিত হওয়ার কারণে তার দুর্বলতা দূরীভূত হয়ে সহীহের মানে উন্নীত হয়। যেমন: মুহাম্মদ বিন আমর সূত্রে আবু সালামাহ হতে, তিনি আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত: “আমার উম্মতের জন্য কষ্টকর না হলে আমি প্রতি সালাতে মিসওয়াকের নির্দেশ দিতাম।”

শারঈ হুকুম: সহীহ হাদিসের ওপর আমল করা এবং আকাইদ ও ফিকহী আহকামে একে চূড়ান্ত দলিল হিসেবে গ্রহণ করা ওয়াজিব।


٤- عَرِّفِ المُتَوَاتِرَ – ثُمَّ بَيِّنْ شُرُوطَ المُتَوَاتِرِ وَحُكْمَهُ وَأَقْسَامَهُ-

[৪. মুতাওয়াতির হাদিসের পরিচয় দাও। অতঃপর এর শর্তাবলি, হুকুম ও প্রকারসমূহ বর্ণনা করো।]

মুতাওয়াতির (المتواتر) হাদিসের পরিচয়:

আভিধানিক অর্থ: ‘মুতাওয়াতির’ শব্দটি التواتر থেকে নির্গত, যার অর্থ একের পর এক ক্রমান্বয়ে বিরতিহীনভাবে আগমন করা।

পারিভাষিক সংজ্ঞা:

“مَا رَوَاهُ جَمْعٌ غَفِيرٌ تَسْتَحِيلُ عَادَةً تَوَاطُؤُهُمْ عَلَى الكَذِبِ، عَنْ مِثْلِهِمْ مِنْ أَوَّلِ السَّنَدِ إِلَى مُنْتَهَاهُ، وَكَانَ مُسْتَنَدُ انْتِهَائِهِمُ الحِسَّ”-

অর্থাৎ: “সনদের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে এমন বিপুল সংখ্যক বর্ণনাকারী কর্তৃক বর্ণিত হাদিস, যাদের পক্ষে স্বাভাবিক অভ্যাসের কারণে মিথ্যা বা ভুলের ওপর একমত হওয়া একেবারেই অসম্ভব এবং তাদের সংবাদের শেষ ভিত্তি পঞ্চেন্দ্রিয়গ্রাহ্য (চাক্ষুষ দর্শন বা শ্রবণ) হতে হয়।”

মুতাওয়াতির হাদিসের ৪টি শর্ত:

  1. বর্ণনাকারীদের সংখ্যা বিপুল ও পর্যাপ্ত হওয়া (কোনো কোনো উসূলবিদের মতে কমপক্ষে ১০ জন বা তার অধিক)।
  2. সনদের প্রতিটি স্তরে অর্থাৎ সাহাবি, তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ী যুগে এই বিপুল সংখ্যা অটুট থাকা।
  3. স্বাভাবিক বাস্তবতায় তাদের পারস্পরিক যোগাযোগ করে মিথ্যা রচনার কোনো সুযোগ না থাকা।
  4. তাদের বর্ণনার ভিত্তি অনুমান নয়, বরং চাক্ষুষ দেখা বা কানে শোনার ওপর প্রতিষ্ঠিত হওয়া।

মুতাওয়াতিরের প্রকারভেদ:

  • ১. মুতাওয়াতিরে লাফযী (المتواتر اللفظي): যে হাদিসের শব্দ ও অর্থ উভয়ই মুতাওয়াতির সূত্রে অভিন্নভাবে বর্ণিত হয়েছে। যেমন রাসূল ﷺ-এর বাণী: “مَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّدًا فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ” (যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার ওপর মিথ্যা আরোপ করে, সে যেন জাহান্নামে নিজের ঠিকানা বানিয়ে নেয়)। এই হাদিসটি সত্তরের অধিক সাহাবি বর্ণনা করেছেন।
  • ২. মুতাওয়াতিরে মা’নাবী (المتواتر المعنوي): বিভিন্ন ঘটনা ও ভিন্ন ভিন্ন শব্দে বর্ণিত কিন্তু সবগুলোর মূল মর্মকথা বা সাধারণ অর্থ মুতাওয়াতির স্তরে পৌঁছেছে। যেমন: দু’আ করার সময় দুই হাত উত্তোলনের হাদিসসমূহ। প্রায় একশত ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনায় এসেছে যে রাসূল ﷺ বিভিন্ন দু’আয় হাত তুলেছেন।

হুকুম: মুতাওয়াতির হাদিস قطعي الثبوت (নিশ্চিত ও দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণিত)। এটি মানুষকে এমন অকাট্য জ্ঞান দান করে যা অস্বীকারকারী কাফির বলে গণ্য হয়।


٥- مَا المَشْهُورُ؟ وَمَا الفَرْقُ بَيْنَهُ وَبَيْنَ المُسْتَفِيضِ؟ بَيِّنْ حُكْمَهُ مَعَ ذِكْرِ أَشْهَرِ المُصَنَّفَاتِ فِيهِ-

[৫. মশহুর হাদিস কাকে বলে? মশহুর ও মুস্তাফীযের মাঝে পার্থক্য কী? এর হুকুম এবং এ বিষয়ে রচিত প্রসিদ্ধ গ্রন্থাবলির বিবরণ দাও।]

মশহুর (المشهور) হাদিসের পরিচয়:

আভিধানিক অর্থ: ‘মশহুর’ অর্থ প্রসিদ্ধ, সুবিদিত, বহুল প্রচারিত।

পারিভাষিক সংজ্ঞা: উলূমুল হাদিসের পরিভাষায়:

“مَا رَوَاهُ ثَلاَثَةٌ فَأَكْثَرَ فِي كُلِّ طَبَقَةٍ، مَا لَمْ يَبْلُغْ حَدَّ التَّوَاتُرِ”-

অর্থাৎ: “যে হাদিসের সনদের প্রতিটি স্তরে কমপক্ষে তিনজন বা ততোধিক রাবী বর্ণনা করেছেন, কিন্তু তা মুতাওয়াতিরের সীমায় পৌঁছেনি, তাকে মশহুর হাদিস বলে।”

মশহুর ও মুস্তাফীয (المستفيض)-এর মধ্যকার পার্থক্য:

  • মতবাদ ১ (উভয়টি সমার্থক): ফুকাহায়ে কেরামের একাংশের মতে মশহুর ও মুস্তাফীয একই অর্থবোধক পরিভাষা।
  • মতবাদ ২ (মুস্তাফীয অধিকতর সংকীর্ণ): জমহুর উলামায়ে কেরামের মতে মুস্তাফীযের ক্ষেত্রে শর্ত হলো সনদের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে বর্ণনাকারীর সংখ্যা সমান হতে হবে। পক্ষান্তরে মশহুরের ক্ষেত্রে যেকোনো স্তরে বর্ণনাকারীর সংখ্যা তিনের অধিক হলেও তা মশহুর থাকে। ফলে প্রতিটি মুস্তাফীযই মশহুর, কিন্তু প্রতিটি মশহুর মুস্তাফীয নয় (عموم وخصوص مطلق)।
  • মতবাদ ৩: মশহুর কখনো পরিভাষাগত নয় বরং সাধারণ মানুষের মুখে প্রচলিত হাদিসকেও বলা হয় (المشهور على الألسنة), চাই তার বিশুদ্ধ সনদ থাকুক বা না থাকুক; কিন্তু মুস্তাফীয কেবল সহীহ সনদে বর্ণিত হাদিসকেই বলা হয়।

মশহুর হাদিসের হুকুম: মুহাদ্দিসগণের মতে মশহুর হাদিস সহীহ, হাসান কিংবা যঈফও হতে পারে; সনদের মানদণ্ডের ওপর ভিত্তি করে এর ওপর আমল ওয়াজিব হয়। তবে হানাফী মাযহাবের উসূলে মশহুর হাদিস ‘ইলমে তুমআনীনাত’ (প্রশান্তিদায়ক প্রবল ধারণা) সৃষ্টি করে এবং এর দ্বারা কুরআনের সাধারণ বিধানকে খাস (নির্দিষ্ট) করা যায়।

মশহুর হাদিস বিষয়ে রচিত বিখ্যাত গ্রন্থাবলি:

  1. ইমাম সাখাবী (র.) প্রণীত ‘আল-মাক্বাসিদুল হাসানাহ ফী বায়ানি কাসীরিম মিনাল আহাদিসিল মুশতাহিরাতি আলাল আলসিনাহ’
  2. আল্লামা আজলূনী (র.) প্রণীত ‘কাশফুল খাফা ওয়া মুযীলুল ইলবাস আম্মা ইশতাহারা মিনাল আহাদিসি আলা আলসিনাতিন নাস’
  3. ইমাম ইবনে দাইবা আশ-শায়বানী (র.) প্রণীত ‘তাময়ীযুত্ব ত্বায়্যিব মিনাল খাবীস’

٦- مَاذَا تَعْلَمُ بِمُصْطَلَحِ “الطَّعْنِ فِي الرَّاوِي”؟ بَيِّنْ أَسْبَابَ الطَّعْنِ المُتَعَلِّقَةَ بِالعَدَالَةِ وَالضَّبْطِ مُخْتَصَرًا-

[৬. ‘আত-ত্বা’নু ফির-রাবী’ পরিভাষা দ্বারা কী বোঝায়? বর্ণনাকারীর আদালত ও যাব্ত সংশ্লিষ্ট অভিযোগের কারণসমূহ সংক্ষেপে আলোচনা করো।]

‘আত-ত্বা’নু ফির-রাবী’ (الطعن في الراوي) পরিভাষার তাৎপর্য:

হাদিস শাস্ত্রের সমালোচনামূলক বিদ্যায় ‘ত্বা’ন’ (طعن) অর্থ দোষারোপ করা বা আপত্তি উত্থাপন করা। রাবীর ওপর কোনো দোষারোপ করা বলতে হাদিস বর্ণনাকারীর চরিত্র, সততা (আদালত) কিংবা স্মৃতিশক্তি ও নির্ভুলতা (যাব্ত)-এর ওপর এমন কোনো ত্রুটি সাব্যস্ত করাকে বোঝায়, যার ফলে তাঁর বর্ণিত হাদিসের গ্রহণযোগ্যতা বিনষ্ট বা হ্রাস পায়।

ত্বা’ন বা আপত্তির ১০টি কারণ (أسباب الطعن العشرة):

হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানী (র.) ‘নুখবাতুল ফিকার’ গ্রন্থে ত্বা’নের দশটি কারণ উল্লেখ করেছেন, যার পাঁচটি রাবীর ‘আদালত’ (চরিত্র) এবং পাঁচটি ‘যাব্ত’ (স্মৃতিশক্তি)-এর সাথে সম্পৃক্ত:

১. আদালত (عدالة) সংশ্লিষ্ট ৫টি কারণ:

  • (১) আল-কাযিব (الكذب – মিথ্যাবাদিতা): রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নামে ইচ্ছাকৃত মিথ্যা হাদিস রচনা করা। এর দ্বারা বর্ণিত হাদিসকে ‘মাওযূ’ (منكر/موضوع – জাল) বলা হয়।
  • (২) আত-তুহমাতু বিল কাযিব (التهمة بالكذب – মিথ্যাচারের অভিযোগ): সাধারণ কথাবার্তায় মিথ্যাবাদী হিসেবে পরিচিত হওয়া, যদিও হাদিসের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট মিথ্যা প্রমাণিত হয়নি। এর হাদিসকে ‘মাতরূক’ (متروك) বলা হয়।
  • (৩) আল-ফিসক্ব (الفسق – পাপাচার): প্রকাশ্যে শরীয়তের বিধান লঙ্ঘন করা বা কবিরা গুনাহে লিপ্ত থাকা। এর হাদিস ‘মুনকার’ বা দুর্বল।
  • (৪) আল-বিদ’আহ (البدعة – বিদ’আত): দ্বীনের মধ্যে নবউদ্ভাবিত ভ্রান্ত বিশ্বাস বা মতবাদে লিপ্ত হওয়া।
  • (৫) আল-জাহালাহ (الجهالة – অজ্ঞাত পরিচয়): রাবীর ব্যক্তিগত পরিচয় বা বিশ্বস্ততা অজ্ঞাত থাকা (মাজহুলুল আইন বা মাজহুলুল হাল)।

২. যাব্ত (ضبط) সংশ্লিষ্ট ৫টি কারণ:

  • (১) ফাহশুল গালাত (فحش الغلط – মারাত্মক ভুলভ্রান্তি): বর্ণনায় ভুলের মাত্রা সঠিকের চেয়ে বেশি হওয়া। এর হাদিস ‘মুনকার’।
  • (২) কাসরাতুল গাফলাহ (كثرة الغفلة – অসতর্কতা ও অমনোযোগিতা): হাদিস ধারণ ও বর্ণনায় চরম অসচেতন থাকা।
  • (৩) আল-ওয়াহম (الوهم – বিভ্রান্তি বা অলীক ধারণা): ভুলবশত একটি সনদকে অপর সনদে বা মুরসালকে মুত্তাসিল মনে করে বর্ণনা করা। এর হাদিস ‘মু’আল্লাল’।
  • (৪) মুখালাফাতুস সিক্বাত (مخالفة الثقات – নির্ভরযোগ্যদের বিরোধিতা): অধিকতর নির্ভরযোগ্য রাবীদের বিরোধী বর্ণনা পেশ করা (শায বা মুনকার)।
  • (৫) সূউল হিফয (سوء الحفظ – স্মৃতিশক্তির দুর্বলতা): রাবীর স্মৃতিশক্তি স্থায়ীভাবে দুর্বল হওয়া অথবা বার্ধক্যজনিত কারণে স্মৃতিভ্রম ঘটা।

٧- عَرِّفِ السَّنَدَ وَالمَتْنَ – ثُمَّ بَيِّنِ الفَرْقَ بَيْنَهُمَا-

[৭. সনদ ও মতনের সংজ্ঞা দাও। অতঃপর উভয়ের মধ্যকার পার্থক্য স্পষ্ট করো।]

১. সনদের পরিচয়:

আভিধানিক অর্থ: ‘সানাদ’ (السند) অর্থ টেকসই অবলম্বন, ঠেস দেওয়ার স্থান বা যা কিছুর ওপর নির্ভর করা হয়।

পারিভাষিক সংজ্ঞা:

“سِلْسِلَةُ الرِّجَالِ المُوَصِّلَةُ لِلْمَتْنِ”-

অর্থাৎ: “হাদিসের মূল বাণী (মতন) পর্যন্ত পৌঁছার জন্য যে বর্ণনাকারী পরম্পরা বা রাবীদের অবিচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতা বিদ্যমান থাকে, তাকে সনদ বলা হয়।”

২. মতনের পরিচয়:

আভিধানিক অর্থ: ‘মতন’ (المتن) অর্থ শক্ত ও উঁচু ভূমি, পিঠ বা কোনো বস্তুর মূল অংশ।

পারিভাষিক সংজ্ঞা:

“مَا يَنْتَهِي إِلَيْهِ السَّنَدُ مِنَ الكَلاَمِ”-

অর্থাৎ: “সনদের শেষ প্রান্তে পৌঁছে বর্ণনাকারীদের উদ্ধৃতি যেখানে সমাপ্ত হয় এবং মহানবী ﷺ বা সাহাবির যে মূল বক্তব্য শুরু হয়, তাকে মতন বলে।”

সনদ ও মতনের মধ্যকার মূল পার্থক্য:

তুলনার বিষয় সনদ (السند) মতন (المتن)
মূল সত্তা বর্ণনাকারীদের তালিকা ও পরম্পরা (Chain of Transmitters)। হাদিসের মূল বক্তব্য, বাণী বা শিক্ষার বিষয়বস্তু (Text / Content)।
পর্যালোচনার স্থান রাবীদের জীবনচরিত, বিশ্বস্ততা ও আদালতের বিচার (আসমাউর রিজাল)। অর্থের বিশুদ্ধতা, ব্যাকরণ ও কুরআনের সাথে সামঞ্জস্যতা (দিরায়াত)।
ভূমিকা এটি মতনের সত্যতা ও প্রামাণিকতা যাচাইয়ের মাধ্যম। এটিই হাদিসের কাঙ্ক্ষিত মূল লক্ষ্য ও শারঈ বিধানের উৎস।

٨- عَرِّفِ العَزِيزَ وَالغَرِيبَ-

[৮. আযীয ও গারীব হাদিসের পরিচয় দাও।]

১. আযীয (العزيز) হাদিস:

আভিধানিক অর্থ: ‘আযীয’ অর্থ শক্তিশালী বা দুর্লভ ও সম্মানিত।

পারিভাষিক সংজ্ঞা:

“أَنْ لاَ يَقِلَّ رُوَاتُهُ عَنِ اثْنَيْنِ فِي جَمِيعِ طَبَقَاتِ السَّنَدِ”-

অর্থাৎ: “যে হাদিসের সনদের কোনো স্তরেই বর্ণনাকারীর সংখ্যা দুজনের কম হয় না; চাই কোনো স্তরে দুজনের অধিক হোক, কিন্তু সর্বনিম্ন দুজন বিদ্যমান থাকে, তাকে আযীয হাদিস বলে।”

উদাহরণ: হযরত আনাস ও আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত বিখ্যাত হাদিস: “لا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ” (তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ না আমি তার কাছে পিতা, সন্তান ও সমগ্র মানবজাতির চেয়ে অধিক প্রিয় হব)। আনাস (রা.) থেকে কাতাদাহ ও আবদুল আযীয ইবনে সুহাইব— এই দুজন বর্ণনা করেছেন এবং তাদের থেকে পরবর্তী স্তরে দুজন করে রাবী বর্ণনা করেছেন।

২. গারীব (الغريب) হাদিস:

আভিধানিক অর্থ: ‘গারীব’ অর্থ অপরিচিত, নিঃসঙ্গ বা স্বদেশত্যাগী একাকী ব্যক্তি।

পারিভাষিক সংজ্ঞা:

“مَا يَنْفَرِدُ بِرِوَايَتِهِ رَاوٍ وَاحِدٌ فِي أَيِّ مَوْضِعٍ مِنْ طَبَقَاتِ السَّنَدِ”-

অর্থাৎ: “সনদের যেকোনো একটি স্তরে মাত্র একজন একক বর্ণনাকারী কর্তৃক বর্ণিত হাদিসকে গারীব হাদিস বলা হয়।”

উদাহরণ: বুখারী শরীফের প্রথম হাদিস: “إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ”। এই হাদিসটি রাসূল ﷺ থেকে এককভাবে কেবল উমর (রা.) বর্ণনা করেছেন; উমর থেকে এককভাবে আলক্বামাহ; আলক্বামাহ থেকে এককভাবে মুহাম্মদ ইবনে ইবরাহীম আত-তায়মী; এবং তাঁর থেকে এককভাবে ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আল-আনসারী বর্ণনা করেছেন। পরবর্তীতে ইয়াহইয়া থেকে বিপুল সংখ্যক রাবী হাদিসটি বর্ণনা করেন।


٩- مَا مَعْنَى التَّدْلِيسِ لُغَةً وَاصْطِلاَحًا وَمَا حُكْمُهُ؟

[৯. তাদলীস-এর শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ কী? এর শারঈ হুকুম কী?]

তাদলীসের আভিধানিক অর্থ:

‘তাদলীস’ (التدليس) শব্দটি الدَّلَس (আদ-দালাস) ধাতু থেকে গৃহীত, যার অর্থ অন্ধকার বা আঁধার। ব্যাবসায়িক পরিভাষায় পণ্যের ত্রুটি ক্রেতার দৃষ্টি থেকে আড়াল করে গোপন রাখাকে তাদলীস বলা হয়।

তাদলীসের পারিভাষিক সংজ্ঞা:

মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায়:

“إِخْفَاءُ عَيْبٍ فِي الإِسْنَادِ وَتَحْسِينٌ لِظَاهِرِهِ”-

অর্থাৎ: “সনদের কোনো ত্রুটিকে গোপন রেখে তার বাহ্যিক রূপকে সুন্দর ও ত্রুটিমুক্ত হিসেবে উপস্থাপন করাকে তাদলীস বলে।”

তাদলীসের প্রধান দুটি প্রকার:

  • ১. তাদলীসুল ইসনাদ (تدليس الإسناد): রাবী এমন এক উস্তাদের কাছ থেকে হাদিস বর্ণনা করা যার সমসাময়িক তিনি ছিলেন এবং সাক্ষাৎ ঘটেছে, কিন্তু উক্ত নির্দিষ্ট হাদিসটি তাঁর মুখ থেকে সরাসরি শোনেননি; অথচ বর্ণনার সময় এমন অস্পষ্ট শব্দ (যেমন: ‘আন’ বা ‘ক্বালা’) ব্যবহার করা যাতে শ্রোতা মনে করে তিনি সরাসরি শুনেছেন।
  • ২. তাদলীসুশ শুয়ূখ (تدليس الشيوخ): রাবী নিজের শাইখ বা উস্তাদের অপ্রসিদ্ধ নাম, উপনাম, বংশ বা পেশা উল্লেখ করে বর্ণনা করা, যাতে তাঁর আসল পরিচয় গোপন থাকে।

তাদলীসের শারঈ হুকুম:

তাদলীস অত্যন্ত নিন্দনীয় ও অপছন্দনীয় কাজ। ইমাম শু’বাহ ইবনুল হাজ্জাজ (র.) কঠোর ভাষায় বলেছেন: “التَّدْلِيسُ أَخُو الكَذِبِ” (তাদলীস হলো মিথ্যার ভাই)। মুহাদ্দিসগণের নীতি হলো: যে রাবী একবার মুদাল্লিস হিসেবে চিহ্নিত হন, তাঁর ‘আন’ (عن) যুক্ত বর্ণনা গ্রহণযোগ্য হয় না, যতক্ষণ না তিনি স্পষ্টভাবে ‘হাদ্দাসানা’ (حدثنا – তিনি আমাদের শুনিয়েছেন) বা ‘সামি’তু’ (سمعت – আমি শুনেছি) বলে স্পষ্ট না করেন।


١٠- اُكْتُبْ أَلْفَاظَ الجَرْحِ وَالتَّعْدِيلِ مَعَ المَرَاتِبِ-

[১০. আলফাযুল জারহি ওয়াত তা’দীল স্তরসহ লিপিবদ্ধ করো।]

জারহ ও তা’দীলের পরিচয়:

রাবীর স্মৃতিশক্তি ও চরিত্রগত ত্রুটি প্রকাশ করাকে ‘জারহ’ (الجرح) এবং রাবীর সততা ও নির্ভরতা প্রমাণ করাকে ‘তা’দীল’ (التعديل) বলা হয়। ইমাম ইবনে আবি হাতিম ও হাফিজ ইবনে হাজার (র.) জারহ ও তা’দীলকে ছয়টি করে স্তরে বিন্যস্ত করেছেন:

১. তা’দীল বা প্রশংসার ৬টি স্তর (مراتب التعديل):

  1. সর্বোচ্চ স্তর (মুবালাগাহ): أَوْثَقُ النَّاسِ (সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য), أَثْبَتُ النَّاسِ (সর্বাধিক সুদৃঢ়)।
  2. গুণাবলির পুনরাবৃত্তি: ثِقَةٌ ثِقَةٌ (অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য), ثِقَةٌ ثَبْتٌ (বিশ্বস্ত ও সুপ্রতিষ্ঠিত)।
  3. একক নির্ভরযোগ্যতা প্রকাশ: ثِقَةٌ (নির্ভরযোগ্য), مُتْقِنٌ (নিখুঁত), عَدْلٌ (ন্যায়পরায়ণ)।
  4. সামান্য কম নির্ভরযোগ্য: صَدُوقٌ (সত্যবাদী), لاَ بَأْسَ بِهِ (বর্ণনায় কোনো সমস্যা নেই)।
  5. দুর্বলতার ইঙ্গিতযুক্ত সততা: مَحَلُّهُ الصِّدْقُ (সত্যনিষ্ঠার অধিকারী), شَيْخٌ (মাঝারি মানের শাইখ)।
  6. সর্বনিম্ন স্তর: صَالِحُ الحَدِيثِ (হাদিস নেক আমলের উপযোগী), يُكْتَبُ حَدِيثُهُ لِلاِعْتِبَارِ (তুলনার জন্য লেখা যায়)।

২. জারহ বা সমালোচনার ৬টি স্তর (مراتب الجرح):

  1. সবচেয়ে হালকা দোষ: فِيهِ مَقَالٌ (তার ব্যাপারে কিছু বক্তব্য আছে), لَيِّنُ الحَدِيثِ (হাদিস বর্ণনায় কিছুটা শিথিল)।
  2. দলিল হিসেবে অযোগ্য: لا يُحْتَجُّ بِهِ (তার দ্বারা দলিল গ্রাহ্য নয়), ضَعِيفٌ (দুর্বল)।
  3. প্রত্যাখ্যাত হওয়ার নিকটবর্তী: رُدَّ حَدِيثُهُ (তার হাদিস বর্জনীয়), لا يُكْتَبُ حَدِيثُهُ (তার হাদিস লেখা যাবে না)।
  4. অভিযুক্ত স্তর: مُتَّهَمٌ بِالكَذِبِ (মিথ্যাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত), يَسْرِقُ الحَدِيثَ (হাদিস চোর)।
  5. পরিত্যক্ত স্তর: مَتْرُوكُ الحَدِيثِ (পরিত্যক্ত), سَاقِطٌ (পতিত রাবী)।
  6. চরমতম স্তর: دَجَّالٌ (মস্ত প্রতারক), كَذَّابٌ (চরম মিথ্যাবাদী), يَضَعُ الحَدِيثَ (হাদিস জালকারী)।

١١- مَا مَعْنَى الإِسْنَادِ؟ بَيِّنْ أَهَمِّيَّتَهُ-

[১১. ইসনাদের অর্থ কী? এর গুরুত্ব বিস্তারিত আলোচনা করো।]

ইসনাদের অর্থ:

‘ইসনাদ’ (الإسناد) শব্দটি বাবে ইফ’আল থেকে আগত মাসদার, যার অর্থ কোনো বক্তব্যকে তার মূল বক্তার দিকে সম্পর্কিত করা বা সনদ উল্লেখ করা। মুহাদ্দিসগণের দৃষ্টিতে সনদ এবং ইসনাদ প্রায় সমার্থক হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।

ইসলামী শরীয়ত ও হাদিস সংরক্ষণে ইসনাদের ঐতিহাসিক গুরুত্ব:

  • ১. মুসলিম উম্মাহর একক অনন্য বৈশিষ্ট্য: ইসনাদ প্রথা হলো আল্লাহ প্রদত্ত এমন এক অনন্য ব্যবস্থা যা পূর্ববর্তী কোনো উম্মতকে (ইহুদি বা খ্রিস্টান) দেওয়া হয়নি। তাদের ধর্মগ্রন্থের কোনো বিশুদ্ধ সনদসূত্র নেই, যার ফলে তাদের কিতাব বিকৃত হয়ে গেছে। কেবল ইসলামেই প্রতিটি নববী বাণীর নির্ভুল সনদ সংরক্ষিত রয়েছে।
  • ২. ইমামগণের ঐতিহাসিক উক্তি:
    • বিখ্যাত তাবেয়ী ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সিরীন (র.) বলেন: “إِنَّ هَذَا العِلْمَ دِينٌ، فَانْظُرُوا عَمَّنْ تَأْخُذُونَ دِينَكُمْ” (নিশ্চয় এই জ্ঞানই দ্বীন; অতএব তোমরা গভীরভাবে লক্ষ্য করো কার কাছ থেকে তোমাদের দ্বীন গ্রহণ করছ – সহীহ মুসলিম)।
    • ইমাম আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক (র.) বলেন: “الإِسْنَادُ مِنَ الدِّينِ، وَلَوْلا الإِسْنَادُ لَقَالَ مَنْ شَاءَ مَا شَاءَ” (ইসনাদ দ্বীনেরই অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ; যদি ইসনাদ না থাকত, তবে যার যা ইচ্ছা সে তা-ই বলে বেড়াত – মুকাদ্দিমায়ে মুসলিম)।
    • ইমাম সুফিয়ান সাওরী (র.) বলেন: “ইসনাদ হলো মুমিনের অস্ত্র; যার কাছে অস্ত্র নেই সে যুদ্ধ করবে কীভাবে?”
  • ৩. দ্বীন ও সুন্নাহর নিরাপত্তা: যুগে যুগে বহু বিদআতী ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী হাদিসের নামে মনগড়া কথা ছড়ানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু ইসনাদ পরীক্ষার মাধ্যমেই মুহাদ্দিসগণ সত্য থেকে মিথ্যা এবং সহীহ থেকে জাল হাদিসকে নিখুঁতভাবে পৃথক করতে সক্ষম হয়েছেন।

١٢- بَيِّنْ آدَابَ طَالِبِ الحَدِيثِ-

[১২. হাদিস অন্বেষণকারীর (তালিবুল হাদিস) আদব ও শিষ্টাচারসমূহ বর্ণনা করো।]

হাদিস শাস্ত্রের শিক্ষার্থীর অপরিহার্য আদবসমূহ:

খতীব বাগদাদী (র.) ‘আল-জামি লি-আখলাক্বির রাবী ওয়া আদাবিস সামি’ এবং ইমাম নববী (র.) হাদিস অন্বেষণকারীর জন্য বিশেষ শিষ্টাচারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন:

  1. ইখলাস বা নিষ্ঠা (إخلاص النية): হাদিস শিক্ষার একমাত্র উদ্দেশ্য হতে হবে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং দ্বীনের হেফাজত। পার্থিব খ্যাতি, অহংকার বা অর্থ উপার্জনের নিয়তে হাদিস শিক্ষা করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
  2. অর্জিত জ্ঞানের ওপর আমল (العمل بالحديث): হাদিস শুনে তা মুখস্থ করার পাশাপাশি নিজের বাস্তব জীবনে তার ওপর আমল করা। সুফিয়ান সাওরী (র.) বলেন, “যখনই কোনো সুন্নাতের হাদিস তোমার কাছে পৌঁছবে, অন্তত একবার হলেও তার ওপর আমল করবে, তবেই তুমি হাদিসের সংরক্ষক হতে পারবে।”
  3. উস্তাদ ও শাইখদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা (توقير الشيوخ): হাদিসের শাইখ ও শিক্ষকদের সম্মান করা, তাঁদের সামনে শান্ত ও বিনয়ী হয়ে বসা এবং কোনো অসৌজন্যমূলক আচরণ না করা।
  4. পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা (الطهارة والوقار): অজু অবস্থায় সুগন্ধি মেখে মার্জিত পোশাকে হাদিসের দরসে উপস্থিত হওয়া। ইমাম মালিক (র.) সর্বদা গোসল ও অজু করে উৎকৃষ্ট পোশাক পরিধান করে হাদিসের পাঠদান করতেন।
  5. জ্ঞানচর্চায় একাগ্রতা ও অহংকার বর্জন (الحرص والتواضع): হাদিস শিখতে কোনোপ্রকার লজ্জা বা অহংকার না করা। মুজাহিদ (র.) বলেন: “লজ্জাশীল ব্যক্তি এবং অহংকারী ব্যক্তি কখনো ইলম অর্জন করতে পারে না।” সমবয়সী বা ছোটদের কাছ থেকেও সঠিক হাদিস গ্রহণ করতে কুণ্ঠাবোধ না করা।
  6. হাদিস সংরক্ষণ ও প্রচার (النشر والتبليغ): যা শেখা হয়েছে তা সুন্দর হস্তাক্ষরে লিখে রাখা, বারবার মুযাকারা (চর্চা) করা এবং উম্মাহর কল্যাণে তা বিশ্বস্ততার সাথে অপর মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. উলূমুল হাদীস বা মুসত্বালাহুল হাদিস পাঠের মূল উদ্দেশ্য কী?

হাদিসের সনদ ও মতনের গভীর চুলচেরা বিশ্লেষণের মাধ্যমে সহীহ, হাসান, যঈফ এবং জাল হাদিসের মাঝে নিখুঁত পার্থক্য নিরূপণ করা এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর খাঁটি বাণীকে সুরক্ষিত রাখা।

২. সহীহ হাদিসের প্রধান পাঁচটি শর্ত কী কী?

১. সনদের অবিচ্ছিন্নতা (ইত্তিসালুস সানাদ); ২. বর্ণনাকারীদের ন্যায়পরায়ণতা (আদালাত); ৩. পূর্ণ স্মৃতিশক্তি (যাব্ত); ৪. নির্ভরযোগ্যদের সাথে বৈপরীত্য না থাকা (অ-শায হওয়া); এবং ৫. সূক্ষ্ম গোপন ত্রুটিমুক্ত হওয়া (মু’আল্লাল না হওয়া)।

৩. মুতাওয়াতির হাদিস অস্বীকারকারীর বিধান কী?

মুতাওয়াতির হাদিস অকাট্য ও নিশ্চিত জ্ঞান প্রদান করে। তাই শরীয়তের অকাট্য মুতাওয়াতির হাদিসকে অস্বীকার করা স্পষ্ট কুফরি বলে গণ্য হয়।

৪. হানাফী মাযহাবে মুরসাল হাদিসের মর্যাদা কী?

ইমাম আবু হানিফা (র.)-এর মতে নির্ভরযোগ্য তাবেয়ী কর্তৃক বর্ণিত মুরসাল হাদিস সম্পূর্ণরূপে প্রামাণ্য দলিল (হুজ্জাত) এবং এর ওপর আমল করা ওয়াজিব।

৫. হাদিস শাস্ত্রে ‘ইসনাদ’ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

ইমাম ইবনুল মুবারক বলেছেন, “ইসনাদ দ্বীনেরই অংশ; যদি ইসনাদ না থাকত তবে যে যার ইচ্ছা দ্বীনের নামে কথা বলত।” ইসনাদই দ্বীনের বিশুদ্ধতা রক্ষা করেছে।

৬. তাদলীসকে কেন মারাত্মক অপরাধ গণ্য করা হয়?

কারণ তাদলীসের মাধ্যমে সনদের কোনো দুর্বল রাবী বা গোপন ত্রুটিকে চতুরতার সাথে আড়াল করে কৃত্রিমভাবে হাদিসকে শক্তিশালী দেখানোর অপচেষ্টা করা হয়, যা একপ্রকার ধোঁকা ও মিথ্যার নামান্তর।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *