পরীক্ষা কোড: ২০২ | প্রশ্নপত্র কোড: ০৬৫
اختبار السنة الثانية للفاضل البكالوريوس (الشرف)، لعام ٢٠٢٤
[ফাজিল স্নাতক (সম্মান) দ্বিতীয় বর্ষ পরীক্ষা, ২০২৪]
اللغة العربية وآدابها
[আরবি ভাষা ও সাহিত্য]
علوم الحديث
[উলূমুল হাদীস]
বিষয় কোড: ২০৪২০২
الزمن: ٤ ساعات | الدرجات الكاملة: ٨٠
[সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০]
الملاحظة: أجب عن أربعة من مجموعة (أ) وعن أربعة من مجموعة (ب)
[দ্রষ্টব্য: ক-বিভাগ থেকে যেকোনো ৪টি এবং খ-বিভাগ থেকে যেকোনো ৪টি প্রশ্নের উত্তর দাও।]
مجموعة (أ) / ক-বিভাগ (الدرجة— ٤ × ١٥ = ٦٠)
١- عَرِّفْ عِلْمَ مُصْطَلَحِ الحَدِيثِ، ثُمَّ بَيِّنْ نَشْأَتَهُ وَتَطَوُّرَهُ عَبْرَ القُرُونِ-
[১. ইলমে মুস্তালাহুল হাদিসের সংজ্ঞা দাও। অতঃপর যুগ পরম্পরায় এর উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ বিশদভাবে আলোচনা করো।]
ভূমিকা: মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র বাণী, কর্ম ও মৌনসম্মতিকে মানবজাতির জন্য অবিকৃত ও সুরক্ষিত রাখার লক্ষ্যে ইসলামি স্কলারগণ যে অনন্য শাস্ত্র উদ্ভাবন করেছেন, তাই হলো ‘ইলমে মুস্তালাহুল হাদিস’ বা উসূলে হাদিস। এটি মুসলিম উম্মাহর এক চিরন্তন বুদ্ধিবৃত্তিক মুজিযা।
১. ইলমে মুস্তালাহুল হাদিসের সংজ্ঞা:
- আভিধানিক অর্থ: ‘মুস্তালাহ’ (مصطلح) অর্থ পারিভাষিক রূপ বা সর্বসম্মত নিয়মকানুন এবং ‘হাদিস’ (حديث) অর্থ বাণী বা নতুন বিষয়।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী ও ইমাম সুয়ূতী (রহ.)-এর মতে— «عِلْمٌ بِقَوَاعِدَ يُعْرَفُ بِهَا أَحْوَالُ السَّنَدِ وَالمَتْنِ مِنْ حَيْثُ القَبُولُ وَالرَّدُّ» অর্থাৎ, এটি এমন কিছু সার্বিক নিয়ম ও মূলনীতির জ্ঞান, যার মাধ্যমে রাবী ও মারবী (সনদ ও মতন)-এর গ্রহণযোগ্যতা ও অগ্রহণযোগ্যতার অবস্থা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে জানা যায়।
- উদ্দেশ্য ও বিষয়বস্তু: এর মূল বিষয়বস্তু হলো হাদিসের সনদ ও মতন; আর উদ্দেশ্য হলো সহীহ ও যয়ীফ হাদিসের মধ্যে পার্থক্য করে রাসূল (সা.)-এর নামে জাল ও অশুদ্ধ বক্তব্য প্রতিরোধ করা।
২. ইলমে মুস্তালাহুল হাদিসের উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশ:
- ক. নবীজি (সা.) ও সাহাবাদের যুগ (সূচনাকাল):
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবদ্দশায় সাহাবায়ে কেরাম সরাসরি তাঁর কাছ থেকে হাদিস শ্রবণ ও সংরক্ষণ করতেন। সাহাবাদের যুগেই সত্যবাদিতা ও আমানতদারির পরীক্ষা শুরু হয়। হযরত আবু বকর ও উমর (রা.) কোনো হাদিস শুনলে সাক্ষী বা শপথের মাধ্যমে এর বিশুদ্ধতা যাচাই করতেন। হযরত আলী (রা.) রাবীর কাছ থেকে শপথ নিতেন। - খ. তাবেয়ীনদের যুগ (সনদ যাচাইয়ের সূচনা):
হযরত উসমান (রা.)-এর শাহাদাতের পর মুসলিম সমাজে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা ও শিয়া-খারিজি ফিতনার উদ্ভব হলে বিশিষ্ট তাবেয়ী ইমাম ইবনে সীরীন (রহ.) ঘোষণা করেন— «سَمُّوا لَنَا رِجَالَكُمْ» (তোমরা আমাদের নিকট হাদিসের বর্ণনাকারীদের নাম প্রকাশ করো)। এখান থেকেই প্রতিটি হাদিসের ক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্ন সনদের দাবি বাধ্যতামূলক করা হয়। - গ. সংকলন ও ফিকহি কিতাবের যুগ (হিজরি ২য় ও ৩য় শতাব্দী):
ইমাম যুহরী ও ইমাম মালিক (রহ.) তাঁদের সংকলনে সনদের মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করেন। অতঃপর ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইদরীস আশ-শাফেয়ী (রহ.) তাঁর অমর গ্রন্থ ‘আর-রিসালাহ’ (الرسالة)-এ সর্বপ্রথম সহীহ হাদিস ও খবরুল আহাদ গ্রহণের মূলনীতিসমূহ লিপিবদ্ধ করেন। পরবর্তীতে ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম (রহ.) হাদিস পরীক্ষার কঠোরতম বিজ্ঞানসম্মত স্তরবিন্যাস বাস্তবায়ন করেন। - ঘ. স্বতন্ত্র শাস্ত্র হিসেবে গ্রন্থবদ্ধকরণ (হিজরি ৪র্থ শতাব্দী থেকে বর্তমান):
- আল-মুহাদ্দিসুল ফাসিল: কাজী আবু মুহাম্মদ আর-রামাহুরমুযী (মৃ. ৩৬০ হি.) সর্বপ্রথম উসূলে হাদিসের ওপর স্বতন্ত্র গ্রন্থ ‘আল-মুহাদ্দিসুল ফাসিল বাইনার রাবী ওয়াল ওয়ায়ী’ (المحدث الفاصل بين الراوي والواعي) রচনা করেন।
- মা’রিফাতু উলূমিল হাদিস: ইমাম হাকিম আন-নিশাপুরী (মৃ. ৪০৫ হি.) এ শাস্ত্রে ৫০টিরও বেশি শাখা চিহ্নিত করেন।
- আল-কিফায়াহ ও আল-জামে: খতীব বাগদাদী (মৃ. ৪৬৩ হি.) রিওয়ায়াত ও দেরায়াতের নিয়মাবলীর ওপর অনন্য গ্রন্থ রচনা করেন।
- মুকাদ্দিমায়ে ইবনুস সালাহ: আল্লামা আবু আমর ইবনুস সালাহ (মৃ. ৬৪৩ হি.) পূর্ববর্তী সমস্ত নীতিমালার সারনির্যাস একত্র করে রচনা করেন ‘উলূমুল হাদিস’ যা মুকাদ্দিমায়ে ইবনুস সালাহ নামে খ্যাত।
- পরবর্তী যুগ: হাফিয ইবনে হাজার আসকালানীর ‘নুখবাতুল ফিকার’ ও ‘নুযহাতুন নাযার’ এবং ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতীর ‘তাদরীবুর রাবী’ এ শাস্ত্রের পূর্ণাঙ্গ ও প্রামাণ্য মাইলফলক।
٢- عَرِّفِ الحَدِيثَ الصَّحِيحَ، ثُمَّ بَيِّنْ شُرُوطَهُ وَأَقْسَامَهُ وَحُكْمَهُ بِالأَمْثِلَةِ-
[২. হাদিসে সহীহের সংজ্ঞা দাও। অতঃপর এর শর্তাবলী, প্রকারভেদ ও বিধান উদাহরণসহ বর্ণনা করো।]
১. হাদিসে সহীহের সংজ্ঞা:
উসূলে হাদিসের পরিভাষায় সহীহ হাদিস বলা হয়: «مَا اتَّصَلَ سَنَدُهُ بِنَقْلِ العَدْلِ الضَّابِطِ عَنْ مِثْلِهِ إِلَى مُنْتَهَاهُ مِنْ غَيْرِ شُذُوذٍ وَلاَ عِلَّةٍ» অর্থাৎ, যে হাদিসের সনদ শেষ পর্যন্ত এমন প্রত্যেক ন্যায়পরায়ণ ও নির্ভুল স্মৃতিসম্পন্ন বর্ণনাকারী কর্তৃক পরস্পরের সূত্রে অবিচ্ছিন্নভাবে বর্ণিত, যার মধ্যে কোনো শায (অস্বাভাবিকতা) ও ইল্লত (লুকায়িত সূক্ষ্ম দোষ) নেই, তাকে হাদিসে সহীহ বলে।
২. সহীহ হাদিসের পাঁচটি আবশ্যকীয় শর্ত:
- ইত্তেসালুস সানাদ (اتصال السند): সনদের সূচনা থেকে সমাপ্তি পর্যন্ত প্রত্যেক রাবী তার উস্তাদ থেকে সরাসরি হাদিস শুনেছেন— সনদের মাঝে কোনো বর্ণনাকারী বাদ না পড়া।
- আদালাতুর রাবী (عدالة الراوي): প্রত্যেক রাবীকে মুসলমান, বালেগ, বিবেকবান, তাকওয়াবান ও নীতিবান হতে হবে এবং প্রকাশ্য পাপাচার ও রুচিহীনতা থেকে মুক্ত হতে হবে।
- যাবতুর রাবী (ضبط الراوي): স্মৃতিশক্তি বা কিতাবে হাদিস সংরক্ষণে রাবীর পূর্ণ দক্ষতা থাকতে হবে (যাতে কোনো বিকৃতি বা ভুল না ঘটে)।
- অ-শায হওয়া (عدم الشذوذ): বিশ্বস্ত রাবীর বর্ণনাটি যেন তার চেয়ে অধিক নির্ভরযোগ্য কোনো রাবীর বর্ণনার বিপরীত না হয়।
- অ-মুআল্লাল হওয়া (عدم العلة): বাহ্যত সহীহ মনে হলেও হাদিসের সনদ বা মতনে এমন কোনো সূক্ষ্ম দোষ না থাকা যা হাদিসের বিশুদ্ধতাকে নষ্ট করে।
৩. সহীহ হাদিসের প্রকারভেদ:
- ক. সহীহ লি-যাতিহী (صحيح لذاته): যে হাদিসে ওপরের পাঁচটি শর্ত স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে সর্বোচ্চ স্তরে বিদ্যমান থাকে এবং বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য অন্য কোনো সনদের মুখাপেক্ষী হয় না। যেমন: ইমাম বুখারী বর্ণিত— «إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ» হাদিসটি।
- খ. সহীহ লি-গাইরিহী (صحيح لغيره): যে হাদিসের কোনো রাবীর স্মৃতিশক্তিতে সামান্য ঘাটতি থাকার কারণে হাদিসটি মূলত ‘হাসান লি-যাতিহী’ ছিল, কিন্তু অপর কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্রের সমর্থনের কারণে তা উন্নীত হয়ে সহীহর মর্যাদা লাভ করে। যেমন: মুহাম্মদ ইবনে আমর থেকে বর্ণিত হাদিস— «لَوْلَا أَنْ أَشُقَّ عَلَى أُمَّتِي لَأَمَرْتُهُمْ بِالسِّوَاكِ» যা অন্য একাধিক শক্তিশালী সনদের কারণে সহীহ লি-গাইরিহীর মর্যাদা লাভ করেছে।
৪. সহীহ হাদিসের হুকুম (বিধান):
সমস্ত মুসলিম উম্মাহ ও মুজতাহিদ ফকীহগণের ঐকমত্য অনুযায়ী, হাদিসে সহীহ হলো শরিয়তের অকাট্য হুজ্জাত বা প্রমাণ। এর ভিত্তিতে ইসলামি আক্বিদা ও ফিকহি আহকাম (হালাল-হারাম) সাব্যস্ত হয় এবং এর ওপর আমল করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ওয়াজিব ও অলঙ্ঘনীয়।
٣- عَرِّفِ الآحَادَ مَعَ ذِكْرِ أَنْوَاعِهَا، ثُمَّ بَيِّنْ شُرُوطَ الغَرِيبِ وَحُكْمَهُ-
[৩. খবরুল আহাদের পরিচয় দাও এবং এর প্রকারভেদ উল্লেখ করো। অতঃপর হাদিসে গরীবের শর্তাবলী ও বিধান আলোচনা করো।]
১. খবরুল আহাদের পরিচয়:
‘আহাদ’ (آحاد) শব্দটি ‘ওয়াহিদ’ (এক)-এর বহুবচন। উসূলে হাদিসের পরিভাষায়, যে হাদিসে ‘মুতাওয়াতির’-এর সমস্ত শর্ত ও রাবীসংখ্যা পূর্ণ হয়নি, তাকে খবরে ওয়াহিদ বা খবরুল আহাদ বলে (ما لم يجمع شروط المتواتر)।
২. সনদের রাবীসংখ্যার বিচারে খবরুল আহাদের প্রকারভেদ:
- ১. আল-মাশহূর (المشهور): যে হাদিসের সনদের প্রতিটি স্তরে কমপক্ষে তিনজন বা ততোধিক রাবী বর্ণনা করেছেন, কিন্তু তা মুতাওয়াতিরের সীমায় পৌঁছায়নি। যেমন: «المُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ المُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ»।
- ২. আল-আযীয (العزيز): সনদের কোনো না কোনো স্তরে বর্ণনাকারীর সংখ্যা কমপক্ষে দুজন হওয়া। যেমন: «لاَ يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ…»।
- ৩. আল-গারীব (الغريب): সনদের যেকোনো একটি স্তরে মাত্র একজন একক বর্ণনাকারী থাকলে তাকে হাদিসে গরীব বলে।
৩. হাদিসে গরীবের পরিচয় ও শর্তাবলী:
- সংজ্ঞা: «هُوَ مَا يَنْفَرِدُ بِرِوَايَتِهِ رَاوٍ وَاحِدٌ فِى أَىِّ مَوْضِعٍ مِنْ طَبَقَاتِ السَّنَدِ» অর্থাৎ, সনদের যেকোনো স্তরে যদি বর্ণনাকারী মাত্র একজন হয়ে যান, তবে তাকে গরীব হাদিস বলে।
- শর্ত ও শ্রেণিবিভাগ:
- গরীব মুতলাক (الغريب المطلق) বা ফার্দে মুতলাক: সনদের মূলে অর্থাৎ সাহাবির স্তরে একক ব্যক্তি হলে। যেমন: হযরত উমর (রা.) বর্ণিত নিয়তের হাদিসটি সাহাবা স্তরে কেবল তিনিই বর্ণনা করেছেন।
- গরীব নিসবী (الغريب النسبي): সাহাবির পরে পরবর্তী কোনো স্তরে (তাবেয়ী বা তাবে তাবেয়ী) কোনো নির্দিষ্ট রাবী বা নির্দিষ্ট শহরের বর্ণনাকারীর কারণে একক হওয়া।
- গরীব হাদিসের হুকুম: কোনো হাদিস গরীব হলেই তা যয়ীফ বা বাতিল হয়ে যায় না। যদি একক রাবী অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও ন্যায়পরায়ণ (সিকাহ) হন, তবে সে গরীব হাদিস সহীহ হবে (যেমন বুখারীর নিয়তের হাদিস)। আর যদি রাবী দুর্বল হন, তবে তা যয়ীফ বা মুনকার বলে গণ্য হবে।
٤- مَا المُرْسَلُ؟ بَيِّنْ حُكْمَ رِوَايَتِهِ مَعَ اخْتِلاَفِ الأَئِمَّةِ فِيهِ بِوُضُوحٍ-
[৪. হাদিসে মুরসাল কাকে বলে? হাদিস বিশারদ ও ফকীহগণের মতপার্থক্যসহ মুরসাল হাদিস বর্ণনার হুকুম সুস্পষ্টভাবে বিশ্লেষণ করো।]
১. হাদিসে মুরসালের পরিচয়:
- আভিধানিক অর্থ: ‘মুরসাল’ (المرسل) শব্দটি আরবি ‘ইরসাল’ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ বন্ধনমুক্ত করা বা ছেড়ে দেওয়া।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: «هُوَ مَا سَقَطَ مِنْ آخِرِ إِسْنَادِهِ مَنْ بَعْدَ التَّابِعِىِّ» অর্থাৎ, যে হাদিসের সনদের শেষ অংশ থেকে সাহাবির নাম বাদ দিয়ে কোনো তাবেয়ী সরাসরি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বরাতে হাদিস বর্ণনা করেন (যেমন তাবেয়ী বলেন: রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন), তাকে হাদিসে মুরসাল বলে।
২. মুরসাল হাদিসের প্রামাণিকতা ও হুকুম নিয়ে ইমামগণের মতভেদ:
যেহেতু তাবেয়ী ও রাসূল (সা.)-এর মধ্যকার বর্ণনাকারী কে ছিলেন তা উহ্য থাকে, তাই মুরসাল হাদিস প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য কি না— এ বিষয়ে উলামায়ে কেরাম তিনটি প্রধান ধারায় বিভক্ত:
- জমহুর মুহাদ্দিসীন ও সাধারণ নীতি (অগ্রহণযোগ্য):
ইমাম মুসলিম, ইবনুস সালাহ ও অধিকাংশ মুহাদ্দিসের মতে মুরসাল হাদিস মূলত মুনক্বাতি’ বা সনদে বিচ্ছিন্ন হাদিসের অন্তর্ভুক্ত। যেহেতু উহ্য রাবী সাহাবি না তাবেয়ী তা নিশ্চিত নয়, তাই মুরসাল হাদিস সাধারণ অবস্থায় দুর্বল (যয়ীফ) ও প্রমাণ অযোগ্য। - ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মালিক (রহ.)-এর অভিমত (নিঃশর্ত গ্রহণযোগ্য):
হানাফী ও মালেকী মাযহাবের মতে, বর্ণনাকারী তাবেয়ী যদি ন্যায়পরায়ণ ও বিশ্বস্ত (সিক্বাহ) হন এবং তিনি নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি ছাড়া অন্যের বরাতে হাদিস বর্ণনা না করার নীতিতে অবিচল থাকেন (যেমন হাসান বসরী, সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব), তবে তাঁর বর্ণিত মুরসাল হাদিস সম্পূর্ণরূপে সহীহ ও হুজ্জাত। কারণ বিশ্বস্ত তাবেয়ী মিথ্যা বা অনির্ভরযোগ্য কাউকে আড়াল করবেন না। - ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর মধ্যপন্থী অভিমত (শর্তসাপেক্ষ গ্রহণযোগ্য):
ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর মতে, বড় বড় তাবেয়ীদের (যেমন সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব) মুরসাল গ্রহণযোগ্য হবে যদি তা নিচের যেকোনো একটি শর্ত পূরণ করে:- অন্য কোনো সনদে হাদিসটি মুত্তাসিল (যুক্ত) হিসেবে বর্ণিত হওয়া।
- অপর কোনো প্রখ্যাত বর্ণনাকারীর ভিন্ন মুরসাল বর্ণনা দ্বারা সমর্থিত হওয়া।
- অধিকাংশ সাহাবি বা আলেমগণের ফতোয়া এর স্বপক্ষে থাকা।
٥- مَا هُوَ المَحْفُوظُ وَالشَّاذُّ وَالمَعْرُوفُ وَالمُنْكَرُ وَالمُتَابِعُ وَالشَّاهِدُ؟ بَيِّنْ بِالأَمْثِلَةِ-
[৫. মাহফুজ, শায, মা’রূফ, মুনকার, মুতাবি’ এবং শাহিদ কাকে বলে? উদাহরণসহ ব্যাখ্যা করো।]
উসূলে হাদিসে বর্ণনাকারীদের পারস্পরিক বৈপরীত্য এবং সমর্থক সনদের নিরিখে এ ছয়টি পরিভাষা ব্যবহৃত হয়:
- আশ-শায (الشاذ):
- সংজ্ঞা: বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য (মাকবুল) রাবী যদি এমন কোনো হাদিস বর্ণনা করেন যা তার চেয়ে অধিক নির্ভরযোগ্য বা বহুসংখ্যক নির্ভরযোগ্য রাবীর বর্ণনার বিপরীত হয়।
- উদাহরণ: আব্দুল ওয়াহিদ ইবনে যিয়াদ ছিলেন সিক্বাহ রাবী, কিন্তু তিনি ফজরের সুন্নতের পর ডান কাতে শোয়ার হাদিসে অন্য সমস্ত নির্ভরযোগ্য রাবীর বিপরীতে গিয়ে অতিরিক্ত শব্দ বৃদ্ধি করেছিলেন যা শায সাব্যস্ত হয়েছে।
- আল-মাহফুজ (المحفوظ):
- সংজ্ঞা: শাযের বিপরীত পরিভাষা। অর্থাৎ অধিক নির্ভরযোগ্য রাবীর যে বর্ণনাটি শায বর্ণনার তুলনায় সঠিক ও প্রামাণ্য বিবেচিত হয়।
- হুকুম: মাহফুজ সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণযোগ্য এবং শায প্রত্যাখ্যাত (মর্দূদ)।
- আল-মুনকার (المنكر):
- সংজ্ঞা: কোনো দুর্বল (যয়ীফ) রাবীর এমন বর্ণনা যা কোনো একক বা একাধিক নির্ভরযোগ্য (সিকাহ) রাবীর বর্ণনার বিপরীত হয়।
- উদাহরণ: হাবীব ইবনে হাবীব (যিনি যয়ীফ) আবু ইসহাক থেকে রোজা রাখা সংক্রান্ত যে বর্ণনা দিয়েছেন যা নির্ভরযোগ্য রাবীদের বিপরীত হওয়ায় ইমাম আবু যুরআ একে মুনকার বলেছেন।
- আল-মা’রূফ (المعروف):
- সংজ্ঞা: মুনকারের বিপরীত। অর্থাৎ দুর্বল রাবীর বৈপরীত্যের মুখে নির্ভরযোগ্য রাবীর যে বিশুদ্ধ বর্ণনাটি টিকে থাকে তাকে মা’রূফ বলে। এটি সর্বসম্মতিক্রমে মাকবুল।
- আল-মুতাবি’ (المتابع):
- সংজ্ঞা: কোনো রাবী যখন কোনো হাদিস বর্ণনা করেন, তখন মূল সাহাবি ঠিক রেখে যদি অন্য কোনো রাবীও সেই একই হাদিস একই সাহাবি থেকে বর্ণনা করেন, তবে সেই সহায়ক বর্ণনাকে ‘মুতাবি’ এবং এই অবস্থাকে ‘মুতাবা’আত’ (المتابعة) বলে।
- আশ-শাহিদ (الشاهد):
- সংজ্ঞা: কোনো হাদিসের সমর্থনে যদি অন্য কোনো সাহাবি থেকে একই অর্থবোধক বা সমার্থক অন্য কোনো হাদিস বর্ণিত হয়, তবে সেই দ্বিতীয় হাদিসটিকে প্রথম হাদিসের ‘শাহিদ’ (الشاهد) বলা হয়।
٦- مَاذَا تَفْهَمُ بِالجَرْحِ وَالتَّعْدِيلِ؟ اُكْتُبْ مَرَاتِبَ الجَرْحِ وَالتَّعْدِيلِ مَعَ أَشْهَرِ المُصَنَّفَاتِ فِيهِ-
[৬. জারহ ও তা’দীল বলতে কী বোঝো? জারহ ও তা’দীলের স্তরসমূহ এবং এ বিষয়ের প্রসিদ্ধ গ্রন্থাবলী আলোচনা করো।]
১. জারহ ও তা’দীলের অর্থ:
- জারহ (الجرح): হাদিসের বর্ণনাকারীর চরিত্র, দ্বীনদারিতা বা স্মৃতিশক্তিতে এমন কোনো দোষ বা ত্রুটি চিহ্নিত করা যার কারণে তার বর্ণিত হাদিস প্রত্যাখ্যাত বা দুর্বল হয়ে যায়।
- তা’দীল (التعديل): বর্ণনাকারীর সত্যবাদিতা, সততা, ন্যায়পরায়ণতা ও স্মৃতিশক্তির প্রখরতা প্রমাণ করে তাকে নির্ভরযোগ্য (সিকাহ) হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া।
- তাৎপর্য: কুরআন ও সুন্নাহর হেফাজতের স্বার্থে এটি শরিয়তের একটি অপরিহার্য ফরযে কিফায়া দায়িত্ব।
২. জারহ ও তা’দীলের স্তরসমূহ (مراتب الجرح والتعديل):
হাফিয ইবনে হাজার ও ইমাম যাহাবী (রহ.) জারহ ও তা’দীলের শব্দসমূহকে মর্যাদার ভিত্তিতে ৬টি করে স্তরে বিভক্ত করেছেন:
ক. তা’দীলের প্রধান স্তরসমূহ (উচ্চ থেকে নিম্ন):
- সর্বোচ্চ স্তর (মুবালাগা বা আধিক্যসূচক): যেমন— أَوْثَقُ النَّاسِ (সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি), إِلَيْهِ المُنْتَهَى فِى التَّثَبُّتِ।
- শব্দ দ্বিরুক্তির মাধ্যমে তাকীদ: যেমন— ثِقَةٌ ثِقَةٌ (অতি নির্ভরযোগ্য), ثِقَةٌ ثَبْتٌ।
- একক প্রশংসাসূচক শব্দ: যেমন— ثِقَةٌ (নির্ভরযোগ্য), حُجَّةٌ (প্রমাণস্বরূপ)।
- সামান্য নিম্ন প্রশংসাসূচক: যেমন— صَدُوقٌ (সত্যবাদী), لاَ بَأْسَ بِهِ (দোষ নেই)।
- যাতে নির্ভরযোগ্যতার সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই: যেমন— مَحَلُّهُ الصِّدْقُ, رُوِىَ عَنْهُ النَّاسُ।
- জারহের কাছাকাছি স্তর: যেমন— صَالِحُ الحَدِيثِ (হাদিস মোটামুটি ভালো)।
খ. জারহের প্রধান স্তরসমূহ (নিম্ন থেকে চরম বিপজ্জনক):
- সবচেয়ে মৃদু জারহ: যেমন— فِيهِ مَقَالٌ (তার ব্যাপারে কিছু কথা আছে), لَيِّنُ الحَدِيثِ (নরম স্মৃতিশক্তি)।
- দলিল হিসেবে অগ্রাহ্য: যেমন— لاَ يُحْتَجُّ بِهِ (তাকে দলিল বানানো যায় না), ضَعِيفٌ (দুর্বল)।
- অধিক দুর্বল: যেমন— ضَعِيفٌ جِدًّا (খুব দুর্বল), مُنْكَرُ الحَدِيثِ, وَاهٍ।
- মিথ্যার অভিযোগে অভিযুক্ত: যেমন— مُتَّهَمٌ بِالكَذِبِ (মিথ্যার অভিযোগে অভিযুক্ত), يَسْرِقُ الحَدِيثَ।
- চরম মিথ্যুক: যেমন— كَذَّابٌ (চরম মিথ্যাবাদী), دَجَّالٌ (প্রতারক)।
- জাল হাদিস রচনাকারী: যেমন— وَضَّاعٌ (জাল হাদিস তৈরি করে), يَضَعُ الحَدِيثَ।
৩. জারহ ও তা’দীল শাস্ত্রের প্রসিদ্ধ গ্রন্থাবলী:
- আত-তারিখুল কাবীর — ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল আল-বুখারী (রহ.)।
- কিতাবুল জারহি ওয়াত তা’দীল — ইমাম ইবনে আবি হাতিম আর-রাযী (রহ.)।
- মিযানুল ইতিদাল ফী নাক্বদির রিজাল — ইমাম শামসুদ্দীন আয-যাহাবী (রহ.)।
- তাহযীবুত তাহযীব ও তাকরীবুত তাহযীব — হাফিয ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.)।
مجموعة (ب) / খ-বিভাগ (الدرجة— ٤ × ٥ = ٢٠)
٧- مَا هُوَ السَّنَدُ وَالمَتْنُ؟ بَيِّنِ الفَرْقَ بَيْنَهُمَا؟
[৭. সনদ ও মতন কাকে বলে? এদের মধ্যকার পার্থক্য বিশ্লেষণ করো।]
১. সনদ ও মতনের সংজ্ঞা:
- আস-সানাদ (السند): হাদিসের মূল বক্তব্য পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য বর্ণনাকারীদের যে ধারাবাহিক শৃঙ্খল বা পরম্পরা রয়েছে, তাকে সনদ বলে (سلسلة الرجال الموصلة للمتن)। একে ‘ইসনাদ’ও বলা হয়।
- আল-মতন (المتن): সনদের সমাপ্তিতে যে মূল বাণী, বক্তব্য বা বিষয়ের বিবরণ শুরু হয়, তাকে মতন বলে (ما ينتهي إليه غاية السند من الكلام)।
২. পার্থক্য: সনদ হলো হাদিসের মাধ্যম বা পথ (الطريق), আর মতন হলো হাদিসের মূল লক্ষ্য ও বিষয়বস্তু (المقصود)। সনদের ভিত্তিতে হাদিসের গ্রহণযোগ্যতার মান যাচাই করা হয়, আর মতনের ওপর ভিত্তি করে শরিয়তের ফিকহি হুকুম কার্যকর করা হয়।
٨- مَا الفَرْقُ بَيْنَ الحَدِيثِ وَالخَبَرِ وَالأَثَرِ؟ بَيِّنْ بِالإِيجَازِ-
[৮. হাদিস, খবর ও আসারের মধ্যকার পার্থক্য সংক্ষেপে আলোচনা করো।]
মুহাদ্দিসীনদের পরিভাষায় শব্দ তিনটির মধ্যে বিশেষ পার্থক্য বিদ্যমান:
- আল-হাদিস (الحديث): যা কেবল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে সম্পর্কিত করা হয়— অর্থাৎ তাঁর বাণী, কাজ ও সম্মতি।
- আল-খবর (الخبر): এটি হাদিসের চেয়ে ব্যাপক। যা রাসূল (সা.) এবং অন্যদের (যেমন সাহাবা, তাবেয়ী বা পূর্ববর্তী জাতিসমূহ)-এর পক্ষ থেকে বর্ণিত ঐতিহাসিক বিবরণ বা সংবাদকে বোঝায়।
- আল-আসার (الأثر): সাধারণত সাহাবায়ে কেরাম (মাওকুফ) এবং তাবেয়ীনদের (মাকতু) বাণী ও কর্মকাণ্ডকে উসূলে হাদিসে আসার বলা হয়। ফকীহদের কেউ কেউ একে হাদিসের সমার্থক হিসেবেও ব্যবহার করেন।
٩- عَرِّفِ الرَّاوِىَ، ثُمَّ اكْتُبْ شُرُوطَ قَبُولِهِ بِالاخْتِصَارِ-
[৯. রাবীর সংজ্ঞা দাও এবং সংক্ষেপে রাবীর বর্ণনা গ্রহণের শর্তাবলী লেখো।]
১. রাবীর সংজ্ঞা: যে ব্যক্তি কোনো হাদিস তার উস্তাদ থেকে শুনে তা অন্যের কাছে বর্ণনা করেন এবং সনদের অংশীদার হন, তাকে রাবী (الراوي) বা বর্ণনাকারী বলা হয়।
২. রাবীর হাদিস গ্রহণের প্রধান শর্তাবলী:
- ইসলাম ও বয়ঃপ্রাপ্তি: হাদিস বর্ণনাকালে তাকে অবশ্যই সচেতন মুসলমান ও প্রাপ্তবয়স্ক হতে হবে।
- বুদ্ধিমত্তা (আল-আকল): রাবীকে সুস্থ বিবেকসম্পন্ন হতে হবে।
- আদালাত (العدالة): তাকওয়াবান, সততা ও প্রকাশ্য পাপাচার থেকে মুক্ত হতে হবে।
- যাবত (الضبط): মুখস্থ বা লিখিত দলিলের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও নির্ভুল স্মৃতিশক্তি বজায় থাকতে হবে।
١٠- عَلِّقْ عَلَى رِوَايَةِ الحَدِيثِ وَدِرَايَةِ الحَدِيثِ بِالإِيجَازِ-
[১০. রেওয়ায়েতুল হাদিস ও দেরায়েতুল হাদিসের ওপর সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা করো।]
হাদিস শাস্ত্র মূলত দুটি মূল ধারায় বিভক্ত:
- ১. ইলমু রিওয়ায়াতিল হাদিস (علم رواية الحديث): যে শাস্ত্রে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র বাণী, আমল, মৌনসম্মতি ও গুণাবলী হুবহু মুখস্থ, লিপিবদ্ধকরণ এবং নির্ভুলভাবে পরবর্তী প্রজন্মের নিকট পৌঁছানোর নিয়মকানুন নিয়ে আলোচনা করা হয়। এর মূল ভিত্তি হলো সংরক্ষণ ও সনদ।
- ২. ইলমু দেরায়াতিল হাদিস (علم دراية الحديث): যে শাস্ত্রে হাদিসের অভ্যন্তরীণ অর্থ, মর্মবাণী, কুরআন ও অন্যান্য মূলনীতির সাথে সামঞ্জস্যতা, ফিকহি আহকাম এবং যুক্তিসিদ্ধ বিশ্লেষণ করা হয়। এর লক্ষ্য হলো হাদিসের প্রজ্ঞা ও বিধান অনুধাবন করা।
١١- عَرِّفْ عِلْمَ نَاسِخِ الحَدِيثِ وَمَنْسُوخِهِ-
[১১. নাসেখ ও মানসূখ হাদিসের ইলমের সংজ্ঞা ও তাৎপর্য আলোচনা করো।]
১. সংজ্ঞা: যে শাস্ত্রে শরিয়তের দুটি সহীহ ও স্পষ্ট বৈপরীত্যপূর্ণ হাদিসের মধ্য থেকে পরবর্তী নির্দেশের মাধ্যমে পূর্ববর্তী নির্দেশের রহিতকরণ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়, তাকে ইলমু নাসিখিল হাদিস ওয়া মানসূখিহী বলে।
- নাসিখ (الناسخ): যে হাদিস দ্বারা পূর্ববর্তী বিধান রহিত করা হয়।
- মানসূখ (المنسوخ): যে হাদিসের পূর্বের বিধান তুলে নেওয়া বা রহিত করা হয়।
২. উদাহরণ ও গুরুত্ব: যেমন রাসূল (সা.) পূর্বে কবর যিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলেন, কিন্তু পরবর্তীতে ইরশাদ করেন— «كُنْتُ نَهَيْتُكُمْ عَنْ زِيَارَةِ القُبُورِ، فَزُورُوهَا» (আমি তোমাদের কবর যিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম, এখন তোমরা যিয়ারত করো। — সহীহ মুসলিম)। এ শাস্ত্র ফতোয়া প্রদান ও বিরোধ নিরসনে অত্যন্ত অপরিহার্য।
١٢- بَيِّنْ أَسْبَابَ وَضْعِ الحَدِيثِ بِالاخْتِصَارِ-
[১২. জাল হাদিস রচনার প্রধান কারণসমূহ সংক্ষেপে তুলে ধরো।]
ইসলামের ইতিহাসে কিছু পথভ্রষ্ট ব্যক্তি ও দল রাসূল (সা.)-এর নামে মিথ্যা ও মনগড়া হাদিস রচনা করেছে। এর প্রধান কারণগুলো হলো:
- ১. ইসলাম ধ্বংসের চক্রান্ত (যিন্দিক সম্প্রদায়): ইসলামের ভাবমূর্তি নষ্ট ও শরিয়তে বিভ্রান্তি ছড়াতে একদল মুনাফিক হাজার হাজার জাল হাদিস তৈরি করেছিল।
- ২. মাযহাবি ও রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব: উমাইয়া, আব্বাসী বা খারিজি-শিয়া রাজনৈতিক দলগুলো নিজ নিজ নেতার গুণগান ও বিপক্ষের নিন্দা করতে হাদিস বানাতো।
- ৩. অজ্ঞতাপূর্ণ নেক উদ্দেশ্য: একদল অজ্ঞ আবেদ মানুষকে ইবাদতে উদ্বুদ্ধ করতে বিভিন্ন আমল ও সুরার ফজিলতে মনগড়া সওয়াবের হাদিস রচনা করত।
- ৪. দুনিয়াবি লোভ ও তোষামোদ: শাসক বা ধনীদের খুশি করা এবং বাজারে ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে পণ্য ও খাদ্যের ফজিলতে জাল হাদিস ছড়ানো হতো।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. উলূমুল হাদিস বিষয়ের পরীক্ষার প্রস্তুতিতে কোন দিকগুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ?
উলূমুল হাদিস (কোড: ২০৪২০২) পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পেতে পরিভাষাগুলোর প্রামাণ্য আরবি সংজ্ঞা (যেমন সহীহ, মুরসাল, শায), হাদিসের সনদ ও মতনের পার্থক্য এবং ইমামগণের উসূলে হাদিস বিষয়ক গ্রন্থের নাম নিখুঁতভাবে লেখা জরুরি।
২. সহীহ হাদিসের শর্তসমূহের ব্যাখ্যায় কোন বিষয়গুলোর ওপর জোর দেওয়া উচিত?
সহীহ হাদিসের ৫টি শর্ত— ইত্তেসালুস সানাদ, আদল, যাবত, অ-শায ও অ-মুআল্লাল হওয়ার ব্যাখ্যা পয়েন্ট আকারে উদাহরণসহ উপস্থাপন করা উচিত।
৩. মুরসাল হাদিসের হুকুম সংক্রান্ত প্রশ্নে কোন ইমামদের মতভেদ আবশ্যক?
ইমাম আবু হানিফা ও মালিক (রহ.)-এর গ্রহণযোগ্যতার মত, জমহুর মুহাদ্দিসীনদের অগ্রহণযোগ্যতার সাধারণ মত এবং ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর শর্তসাপেক্ষ গ্রহণের অভিমত দলীলসহ লিখতে হবে।
৪. জারহ ও তা’দীলের স্তরগুলো লেখার নিয়ম কী?
জারহ ও তা’দীলের শব্দসমূহকে আল্লামা ইবনে হাজার ও ইমাম যাহাবীর বিন্যাস অনুযায়ী সর্বোচ্চ নির্ভরযোগ্যতা থেকে চরম জারহ পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে আরবি শব্দসহ ছক বা পয়েন্টে উপস্থাপন করা শ্রেয়।
৫. খ-বিভাগের সংক্ষিপ্ত প্রশ্নের উত্তরে কতটুকু আরবি উদ্ধৃতি দেওয়া প্রয়োজন?
খ-বিভাগের ৫ নম্বরের প্রতিটি প্রশ্নে মূল পরিভাষার সংক্ষিপ্ত আরবি সংজ্ঞা এবং সংশ্লিষ্ট একটি হাদিস বা শাস্ত্রীয় প্রবাদ উদ্ধৃত করাই যথেষ্ট।
৬. জাল হাদিস চেনার প্রধান উপায়গুলো কী কী?
জাল হাদিস চেনার প্রধান লক্ষণ হলো মতনে ভাষা ও সাহিত্যের দুর্বলতা, কুরআনের সুস্পষ্ট নির্দেশের সরাসরি বিরোধিতা, যুক্তিবিরোধী উদ্ভট কথা এবং রাবীর চরম মিথ্যাবাদী হিসেবে চিহ্নিত হওয়া।
\n