পরীক্ষা কোড: ২০২ | প্রশ্নপত্র কোড: ০৫৭
اختبار السنة الثانية للفاضل (البكالوريوس) الشرف، لعام ٢٠٢١م
[ফাজিল (স্নাতক) সম্মান দ্বিতীয় বর্ষ পরীক্ষা, ২০২১]
اللغة العربية وآدابها
[আরবি ভাষা ও সাহিত্য]
نصوص من الحديث
[নুসূসুম মিনাল হাদীস]
বিষয় কোড: ২০৪২০১
الوقت — ٤ ساعات | الدرجات الكاملة — ٨٠
[সময় — ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান — ৮০]
الملاحظة: أجب عن أربعة من مجموعة (الف) وعن أربعة من مجموعة (ب)
[দ্রষ্টব্য: ক-বিভাগ থেকে যেকোনো ৪টি এবং খ-বিভাগ থেকে যেকোনো ৪টি প্রশ্নের উত্তর দাও।]
مجموعة (أ) / ক-বিভাগ (الدرجة— ٤ × ١٥ = ٦٠)
(ترجم الأحاديث وأجب عن الأسئلة الملحقة بها)
١- حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ مُحَمَّدٍ الْجُعْفِيُّ قَالَ حَدَّثَنَا أَبُو عَامِرٍ الْعَقَدِيُّ قَالَ حَدَّثَنَا سُلَيْمَانُ بْنُ بِلَالٍ عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ دِينَارٍ عَنْ أَبِي صَالِحٍ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «الإِيمَانُ بِضْعٌ وَسِتُّونَ شُعْبَةً، وَالْحَيَاءُ شُعْبَةٌ مِنَ الإِيمَانِ»-
[১. হাদিসটির সরল অর্থ করো এবং সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর দাও: (ক) ঈমানের সংজ্ঞা দাও এবং এর শাখা কয়টি? এর মধ্য থেকে দশটি শাখা বর্ণনা করো। (খ) হাদিস গ্রহণের (তাহাম্মুলুল হাদিস) শব্দ কয়টি ও কী কী? বর্ণনা করো।]
হাদিসের সরল মর্মার্থ: আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ আল-জু’ফী (র.) হযরত আবু হুরায়রাহ (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, নবী করীম ﷺ ইরশাদ করেছেন: “ঈমানের ষাটের অধিক (অন্য বর্ণনায় সত্তরের অধিক) শাখা-প্রশাখা রয়েছে; আর লজ্জা-শরম হলো ঈমানের একটি অন্যতম প্রধান শাখা।” (সহীহ বুখারী, কিতাবুল ঈমান)
(ক) ঈমানের পরিচয়, শাখা ও দশটি শাখার বিবরণ:
- ঈমানের আভিধানিক অর্থ: বিশ্বাস স্থাপন করা, সত্যায়ন করা (التصديق) এবং অন্তরে পরম নিরাপত্তা লাভ করা।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা’আতের আক্বীদা অনুসারে: الإيمان هو تصديق بالجنان، وإقرار باللسان، وعمل بالأركان — অর্থাৎ অন্তরে বিশ্বাস স্থাপন করা, মুখে মৌখিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে কর্মে বাস্তবায়ন করা।
- ঈমানের শাখার সংখ্যা: হাদিসের পাঠে এসেছে ‘بِضْعٌ وَسِتُّونَ’ (ষাটের অধিক, অর্থাৎ ৬৩ থেকে ৬৯টি) এবং মুসলিম শরীফের বর্ণনায় এসেছে ‘بِضْعٌ وَسَبْعُونَ’ (সত্তরের অধিক, অর্থাৎ ৭৭টি)। ইমাম বায়হাক্বী (র.) তাঁর সুবিখ্যাত ‘শুআবুল ঈমান’ (شعب الإيمان) গ্রন্থে ৭৭টি শাখাকে সুবিন্যস্ত করেছেন।
- ঈমানের প্রধান ১০টি শাখা:
- আল্লাহ তা’আলার অস্তিত্ব, রুবূবিয়াত ও উলূহিয়াতে একত্ববাদে বিশ্বাস (التوحيد)।
- আল্লাহর প্রেরিত সকল ফেরেশতাগণের প্রতি বিশ্বাস।
- আল্লাহর নাযিলকৃত সমস্ত আসমানী কিতাবের প্রতি ঈমান।
- আল্লাহর সমস্ত নবী ও রাসুলগণের ওপর বিশ্বাস।
- তাকদীর বা ভাগ্যের ভালো-মন্দের ওপর বিশ্বাস।
- পরকাল, পুনরুত্থান ও হিসাব-কিতাবের ওপর বিশ্বাস।
- সর্বোচ্চ শাখা: ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ কালেমার সাক্ষ্য দান ও যিকির।
- সর্বনিম্ন শাখা: পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু (পাথর, কাঁটা ইত্যাদি) অপসারণ করা (إماطة الأذى عن الطريق)।
- লজ্জাশীলতা (الحياء): যা মানুষকে অন্যায় ও অশ্লীলতা থেকে বিরত রাখে।
- পিতামাতার প্রতি সদ্ব্যবহার ও আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা (بر الوالدين وصلة الرحم)।
(খ) তাহাম্মুলুল হাদিসের (হাদিস গ্রহণ) শব্দাবলী:
মুহাদ্দিসীন কেরামের নিকট শায়খ বা উস্তাদের কাছ থেকে হাদিস শ্রবণ ও গ্রহণের জন্য আটটি সুনির্দিষ্ট মাধ্যম (طرق التحمل) এবং সেগুলোর নির্দিষ্ট পরিভাষা রয়েছে:
- আল-সামা’ (السماع من لفظ الشيخ): উস্তাদের মুখের পাঠ শুনে গ্রহণ করা। এর শব্দাবলী: سمعتُ (আমি শুনেছি), حدّثنا (তিনি আমাদের হাদিস বর্ণনা করেছেন)। এটি তাহাম্মুলের সর্বোচ্চ স্তর।
- আল-ক্বিরাআহ আল্লাশ-শায়খ বা আরয (القراءة على الشيخ): উস্তাদের সামনে ছাত্রের পাঠ করা। এর পরিভাষা: أخبرنا (তিনি আমাদের অবহিত করেছেন), قرأتُ عليه (আমি তাঁর সামনে পাঠ করেছি)।
- আল-ইজাযাহ (الإجازة): বর্ণনার অনুমতি দেওয়া। এর পরিভাষা: أجاز لي فلان বা أنبأنا إجازة।
- আল-মুনাওয়ালাহ (المناولة): উস্তাদ স্বহস্তে ছাত্রকে পাণ্ডুলিপি হস্তান্তর করে বর্ণনার অনুমতি দেওয়া। এর শব্দ: ناولني فلان।
- আল-মুকাতেবাহ (المكاتبة): উস্তাদ কর্তৃক নিজ হাতে লিখে ছাত্রকে পাঠানো। এর শব্দ: كتب إليّ فلان।
- আল-ই’লাম (إعلام الشيخ): উস্তাদ ছাত্রকে জানিয়ে দেওয়া যে এটি তাঁর বর্ণিত হাদিস। এর পরিভাষা: أعلمني شيخي।
- আল-ওয়াসিয়্যাহ (الوصية بالكتب): মৃত্যুর পূর্বে কিতাবের অসিয়ত করে যাওয়া। এর পরিভাষা: أوصى إليّ فلان بكتابه।
- আল-ওয়িজাদাহ (الوجادة): শায়খের হস্তাক্ষরে লিখিত পাণ্ডুলিপি প্রাপ্তি। এর শব্দ: وجدتُ بخط فلان।
٢- عَنِ الْبَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ قَالَ: «أَمَرَنَا النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِسَبْعٍ وَنَهَانَا عَنْ سَبْعٍ— أَمَرَنَا بِاتِّبَاعِ الْجَنَائِزِ، وَعِيَادَةِ الْمَرِيضِ، وَإِجَابَةِ الدَّاعِي، وَنَصْرِ الْمَظْلُومِ، وَإِبْرَارِ الْقَسَمِ، وَرَدِّ السَّلاَمِ، وَتَشْمِيتِ الْعَاطِسِ، وَنَهَانَا عَنْ آنِيَةِ الْفِضَّةِ، وَخَاتَمِ الذَّهَبِ، وَالْحَرِيرِ، وَالدِّيبَاجِ، وَالقَسِّيِّ، وَالإِسْتَبْرَقِ»-
[২. হাদিসটির সরল অর্থ করো এবং সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর দাও: (ক) জানাজা শব্দের অর্থ কী? জানাজার সালাত কখন প্রবর্তিত হয়? বর্ণনা করো। (খ) রৌপ্যপাত্র, স্বর্ণের আংটি ও রেশম ব্যবহারের হুকুম উল্লেখ করো।]
হাদিসের সরল মর্মার্থ: হযরত বারা ইবনে আযিব (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: “রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাদেরকে সাতটি কাজের নির্দেশ দিয়েছেন এবং সাতটি কাজ থেকে নিষেধ করেছেন। নির্দেশ দিয়েছেন: জানাজার পেছনে যাওয়া, রোগীর সেবা-শুশ্রূষা করা, দাওয়াতদাতার দাওয়াত কবুল করা, অত্যাচারিতকে সাহায্য করা, শপথকারীর শপথ পূর্ণ করতে সহায়তা করা, সালামের উত্তর দেওয়া এবং হাঁচিদাতার হাঁচির জবাব দেওয়া। আর নিষেধ করেছেন: রূপার পাত্র ব্যবহার, স্বর্ণের আংটি পরিধান, সাধারণ রেশম, দিবায (পুরু রেশম), ক্বাস্সী (মিশরীয় রেশমি বস্ত্র) এবং ইস্তাবরাক্ব (কারুকার্যখচিত রেশম) ব্যবহার করতে।” (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)
(ক) জানাজার পরিচয় ও জানাজার সালাত প্রবর্তনের প্রেক্ষাপট:
- আভিধানিক অর্থ: ‘আল-জানাজাহ’ (الجَنَازَة – জীম অক্ষরে ফাতহাহ দিলে) অর্থ মৃত ব্যক্তি বা খাটসহ লাশ; আর ‘আল-জিনাযাহ’ (الجِنَازَة – কাসরাহ দিলে) অর্থ যে খাটের ওপর লাশ বহন করা হয়। এর মূল ধাতু ‘জানাজা’ (جَنَزَ), যার অর্থ ঢেকে রাখা বা গোপন করা।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: মৃত মুসলমানের মাগফিরাত ও পরকালীন কল্যাণের জন্য বিশেষ পদ্ধতিতে তাকবীর ও দোয়াসহ যে সালাত আদায় করা হয়, তাকে সালাতুল জানাজা বলা হয়। এটি ফরযে কিফায়াহ।
- জানাজার সালাত প্রবর্তনের সময়কাল:
- ইতিহাস ও সিরাত বিশেষজ্ঞদের বিশুদ্ধ মতানুযায়ী, সালাতুল জানাজা প্রথম হিজরীতে মদিনায় হিজরতের পর বিধিবদ্ধ হয়।
- রাসুলুল্লাহ ﷺ মদিনায় হিজরত করার পর আনসার সাহাবী হযরত আস’আদ ইবনে যুরারাহ (রা.) অথবা হযরত বারা ইবনে মা’রূর (রা.)-এর ওফাতকালে সর্বপ্রথম আনুষ্ঠানিক জানাজার সালাত কায়েম করেন। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, বদর যুদ্ধের শহীদদের জানাজা পড়ার মাধ্যমে এর ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়।
(খ) রৌপ্যপাত্র, স্বর্ণের আংটি ও রেশম ব্যবহারের শরয়ী বিধান:
- ১. রৌপ্যপাত্র (آنية الفضة): নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্যই সোনা বা রূপার পাত্রে পানাহার করা সম্পূর্ণরূপে হারাম ও কবিরা গুনাহ। রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: الَّذِي يَشْرَبُ فِي إِنَاءِ الفِضَّةِ إِنَّمَا يُجَرْجِرُ فِي بَطْنِهِ نَارَ جَهَنَّمَ (যে ব্যক্তি রূপার পাত্রে পান করে, সে মূলত তার পেটে জাহান্নামের আগুন টেনে নেয়)। তবে অলংকার হিসেবে নারীদের জন্য রূপা ব্যবহার বৈধ।
- ২. স্বর্ণের আংটি (خاتم الذهب): পুরুষদের জন্য যেকোনো ধরনের স্বর্ণালংকার বা স্বর্ণের আংটি পরিধান করা সম্পূর্ণ হারাম। রাসুলুল্লাহ ﷺ এক ব্যক্তির হাতে স্বর্ণের আংটি দেখে তা খুলে নিক্ষেপ করেন এবং বলেন: “তোমাদের কেউ কি নিজের হাতে জাহান্নামের অঙ্গার রাখতে চায়?” তবে নারীদের জন্য স্বর্ণের আংটি ও গহনা পরিধান সর্বসম্মতিক্রমে হালাল।
- ৩. রেশম বস্ত্র (الحرير والديباج): খাঁটি রেশমি পোশাক ও রেশমের বিছানা ব্যবহার পুরুষদের জন্য সম্পূর্ণ হারাম। রাসুলুল্লাহ ﷺ সোনা ও রেশম হাতে নিয়ে ঘোষণা করেছিলেন: إِنَّ هَذَيْنِ حَرَامٌ عَلَى ذُكُورِ أُمَّتِي، حِلٌّ لِإِنَاثِهِمْ (নিশ্চয় এ দুটি বস্তু আমার উম্মতের পুরুষদের জন্য হারাম এবং নারীদের জন্য হালাল)। তবে পুরুষদের পোশাকে চার আঙুল পরিমাণ রেশমের নকশা বা পাড় থাকা মুহাদ্দিসগণের মতে জায়েজ।
٣- عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «أَرْبَعٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ كَانَ مُنَافِقًا خَالِصًا، وَمَنْ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنْهُنَّ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنَ النِّفَاقِ حَتَّى يَدَعَهَا: إِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ، وَإِذَا حَدَّثَ كَذَبَ، وَإِذَا عَاهَدَ غَدَرَ، وَإِذَا خَاصَمَ فَجَرَ»-
[৩. হাদিসটির সরল অর্থ করো এবং সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর দাও: (ক) আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থে নিফাক্ব বলতে কী বোঝায়? (খ) শব্দগুলোর ব্যাকরণগত তাহলীল করো: اؤتمن، غدر، فجر، يدعها।]
হাদিসের সরল মর্মার্থ: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করীম ﷺ ইরশাদ করেছেন: “চারটি স্বভাব যার মধ্যে বিদ্যমান থাকবে, সে খাঁটি মুনাফিক হিসেবে গণ্য হবে; আর যার মধ্যে এর কোনো একটি স্বভাব থাকবে, তার মধ্যে নিফাক্বের একটি স্বভাব থাকবে—যতক্ষণ না সে তা পরিত্যাগ করে। লক্ষণ চারটি হলো: ১. যখন তার নিকট কোনো আমানত রাখা হয়, সে খিয়ানত করে; ২. যখন সে কথা বলে, মিথ্যা বলে; ৩. যখন সে অঙ্গীকার করে, তা ভঙ্গ করে; এবং ৪. যখন সে বিতণ্ডায় লিপ্ত হয়, অশ্লীলতা ও সীমা লঙ্ঘন করে।” (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)
(ক) নিফাক্বের আভিধানিক ও পারিভাষিক পরিচয়:
- আভিধানিক অর্থ: ‘নিফাক্ব’ (النفاق) শব্দটি النَّافِقَاء (নাফিকা) থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ বনবিড়াল বা ইঁদুরের গর্তের গোপন নির্গমন পথ—যা বাইরে থেকে একরকম দেখায় কিন্তু ভেতরে অন্য পথ থাকে। অর্থাৎ দ্বিচারিতা, কপটতা বা প্রতারণা।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: النفاق هو إظهار الإيمان وإبطان الكفر أو المعصية — অন্তরে কুফরি, হিংসা বা অবাধ্যতা গোপন রেখে মুখে ঈমান ও আনুগত্য প্রকাশ করাকে নিফাক্ব বলে।
- নিফাক্বের প্রকারভেদ: নিফাক্ব দুই প্রকার:
- নিফাক্বে আক্বীদাহ (বিশ্বাসগত নিফাক্ব): অন্তরে পরিপূর্ণ অবিশ্বাস রেখে প্রকাশ্যে মুসলমান দাবি করা। এ ধরনের মুনাফিক চিরস্থায়ী জাহান্নামী।
- নিফাক্বে আমল (কর্মগত নিফাক্ব): বিশ্বাস ঠিক থাকা সত্ত্বেও চরিত্রে মুনাফিকের স্বভাব (মিথ্যা, খিয়ানত, ওয়াদাভঙ্গ) লালন করা। হাদিসে একেই সতর্ক করা হয়েছে।
(খ) শব্দাবলির ব্যাকরণগত তাহলীল (التحليل النحوي والصرفي):
| শব্দ (الكلمة) | সীগাহ ও বহস | বাব ও মূলবর্ণ (المادة) | অর্থ ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ |
|---|---|---|---|
| اُؤْتُمِنَ | واحد مذكر غائب، فعل ماضي مجهول | বাবে ইফতি’আল (اِفْتَعَلَ), مادة: أ-م-ن (সহীহ/মাহমুযুল ফা) | তার নিকট আমানত রাখা হলো। এটি শর্ত বাক্যের ফে’ল। |
| غَدَرَ | واحد مذكر غائب، فعل ماضي معروف | বাবে নাসারা বা যারাবা (فَعَلَ يَفْعِلُ), مادة: غ-د-ر (সহীহ) | সে বিশ্বাসঘাতকতা করল / চুক্তিভঙ্গ করল। |
| فَجَرَ | واحد مذكر غائب، فعل ماضي معروف | বাবে নাসারা বা যারাবা (فَعَلَ يَفْعُلُ), مادة: ف-ج-ر (সহীহ) | সে সত্যচ্যুত হলো / সীমা লঙ্ঘন ও গালিগালাজ করল। |
| يَدَعَهَا | واحد مذكر غائب، فعل مضارع معروف + ضمير | বাবে ফাতাহা (فَعَلَ يَفْعَلُ), مادة: و-د-ع (মিসালে ওয়াবী) | সে তা বর্জন করবে। ‘حَتَّى’ অব্যয়ের পর ‘أَنْ’ উহ্য থাকার কারণে ফে’লটি মনসুব (যবরযুক্ত) হয়েছে। |
٤- عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «عُرِضَ عَلَيَّ الأَنْبِيَاءُ فَإِذَا مُوسَى عَلَيْهِ السَّلاَمُ ضَرْبٌ مِنَ الرِّجَالِ كَأَنَّهُ مِنْ رِجَالِ شَنُوءَةَ، وَرَأَيْتُ عِيسَى بْنَ مَرْيَمَ عَلَيْهِ السَّلاَمُ فَإِذَا أَقْرَبُ مَنْ رَأَيْتُ بِهِ شَبَهًا عُرْوَةُ بْنُ مَسْعُودٍ، وَرَأَيْتُ إِبْرَاهِيمَ عَلَيْهِ السَّلاَمُ فَإِذَا أَقْرَبُ مَنْ رَأَيْتُ بِهِ شَبَهًا صَاحِبُكُمْ يَعْنِي نَفْسَهُ الكَرِيمَةَ، وَرَأَيْتُ جِبْرَئِيلَ عَلَيْهِ السَّلاَمُ فَإِذَا أَقْرَبُ مَنْ رَأَيْتُ بِهِ شَبَهًا دِحْيَةُ»-
[৪. হাদিসটির সরল অর্থ করো এবং সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর দাও: (ক) আমাদের নবী মুহাম্মদ ﷺ-এর সাথে শারীরিক ও বাহ্যিক সাদৃশ্যে সর্বাধিক নিকটবর্তী কে ছিলেন? তাঁর সংক্ষিপ্ত গুণাবলী বর্ণনা করো। (খ) হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.)-এর জীবনী সংক্ষেপে তুলে ধরো।]
হাদিসের সরল মর্মার্থ: হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: “আমার সামনে নবীগণকে উপস্থাপন করা হলো। আমি দেখলাম মূসা (আ.) ছিলেন মাঝারি শারীরিক গঠনের সুঠাম পুরুষ, যেন তিনি শানুয়াহ গোত্রের একজন। আর আমি মরিয়ম-পুত্র ঈসা (আ.)-কে দেখলাম, মানুষের মধ্যে চেহারায় তাঁর সাথে সর্বাধিক সাদৃশ্যপূর্ণ হলেন উরওয়াহ ইবনে মাসউদ (রা.)। আর আমি ইবরাহীম (আ.)-কে দেখলাম, মানুষের মধ্যে তাঁর সাথে সবচেয়ে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ হলেন তোমাদের সঙ্গী (অর্থাৎ স্বয়ং রাসুলুল্লাহ ﷺ)। আর আমি জিবরাঈল (আ.)-কে দেখলাম, মানুষের মধ্যে তাঁর সাথে সর্বাধিক সাদৃশ্যপূর্ণ হলেন দিহইয়া কালবী (রা.)।” (সহীহ মুসলিম)
(ক) নবী করীম ﷺ-এর সাথে সর্বাধিক সাদৃশ্য ও তাঁর গুণাবলী:
- সাদৃশ্যপূর্ণ ব্যক্তিত্ব: হাদিসের স্পষ্ট বক্তব্য অনুযায়ী হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর শারীরিক গঠন, চেহারা ও অবয়বের সাথে আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ ﷺ-এর সর্বাধিক হুবহু সাদৃশ্য ছিল। এছাড়া সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে হযরত হাসান ইবনে আলী (রা.) এবং জাফর ইবনে আবি তালিব (রা.)-এর সাথে নবীজির অসাধারণ শারীরিক সাদৃশ্য ছিল।
- হযরত ইবরাহীম (আ.) ও নবীজির অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ:
- তিনি ছিলেন ‘খালিলুল্লাহ’ (আল্লাহর পরম বন্ধু), যেমন নবীজি ﷺ ছিলেন ‘হাবিবুল্লাহ’।
- তিনি ছিলেন তাওহীদের অবিসংবাদিত ইমাম এবং হানিফ (একনিষ্ঠ) আদর্শের প্রতিষ্ঠাতা।
- অতুলনীয় ধৈর্য, ত্যাগ ও পরম আনুগত্যের মূর্ত প্রতীক।
- অতিথিপরায়ণতা ও দানশীলতায় তিনি ছিলেন সমগ্র মানবজাতির জন্য অনন্য আদর্শ।
(খ) হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী:
- নাম ও বংশপরিচয়: জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে হারাম আল-আনসারী আস-সালামী (রা.)। তিনি মদিনার আনসারদের খাজরাজ গোত্রের বনু সালামা শাখার সন্তান।
- ইসলাম গ্রহণ ও আত্মত্যাগ: তিনি শৈশবেই পিতা হযরত আব্দুল্লাহর সাথে দ্বিতীয় আক্বাবার বায়’আতে অংশগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ওহুদ যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। পিতা শহীদ হওয়ার সময় তাঁর ওপর বহু ঋণ এবং সাত/নয়জন কন্যা সন্তানের দায়িত্ব অর্পণ করে যান, যা জাবির (রা.) অপরিসীম ধৈর্য ও বিশ্বস্ততার সাথে পালন করেন।
- যুদ্ধসমূহে অংশগ্রহণ: ওহুদ ও বদর ব্যতীত তিনি খন্দক, বায়’আতে রিদওয়ানসহ রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সাথে ১৯টি সমরাভিযানে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ করেন।
- হাদিস বর্ণনা ও ইলমী মর্যাদা: তিনি ছিলেন ‘মুকসিরীন’ (সর্বাধিক হাদিস বর্ণনাকারী সাতজন সাহাবী)-এর অন্যতম। তিনি রাসুলুল্লাহ ﷺ থেকে সর্বমোট ১,৫৪০টি হাদিস বর্ণনা করেছেন। মদিনার মসজিদে নববীতে তাঁর হাদিসের একটি বিখ্যাত শিক্ষাবলয় (হালকা) ছিল।
- ইন্তেকাল: তিনি মদিনায় সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে সর্বশেষ ব্যক্তি হিসেবে প্রায় ৭৪/৭৭ হিজরীতে ৯৪ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।
٥- عَرِّفِ الحَدِيثَ المُتَوَاتِرَ، وَكَمْ قِسْمًا لَهُ؟ بَيِّنْ حُكْمَهُ بِالتَّفْصِيلِ-
[৫. হাদিসে মুতাওয়াতিরের সংজ্ঞা দাও। এর প্রকার কয়টি? বিস্তারিতভাবে এর বিধান বর্ণনা করো।]
ভূমিকা: বর্ণনাকারীর সংখ্যার দিক থেকে হাদিসকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়: মুতাওয়াতির (المتواتر) ও আহাদ (الآحاد)। মুতাওয়াতির হলো নিশ্চিত ও সংশয়হীন জ্ঞানের সর্বোচ্চ স্তর।
১. মুতাওয়াতিরের পরিচয়:
- আভিধানিক অর্থ: ‘মুতাওয়াতির’ (المتواتر) শব্দটি التَّوَاتُر থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ একের পর এক ক্রমান্বয়ে আসা (التتابع)।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: هو ما رواه جمع غفير تحيل العادة تواطؤهم على الكذب، عن مثلهم من أول السند إلى منتهاه، وكان مستند انتهائهم الحس — অর্থাৎ যে হাদিসকে সনদের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে এমন বিপুল সংখ্যক রাবী বর্ণনা করেছেন, যাদের পক্ষে স্বাভাবিকভাবে মিথ্যার ওপর একমত হওয়া যুক্তি ও অভ্যাসের দৃষ্টিতে অসম্ভব, এবং তাদের বর্ণনার ভিত্তি ছিল প্রত্যক্ষ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অনুভূতি (দেখা বা শোনা)।
- মুতাওয়াতির হওয়ার প্রধান ৪টি শর্ত:
- বিপুল সংখ্যক বর্ণনাকারী থাকা (অধিকাংশের মতে কমপক্ষে ১০ জন বা তার বেশি)।
- সনদের প্রতিটি স্তরে (طبقات السند) এই বিপুল সংখ্যা অক্ষুণ্ণ থাকা।
- পারস্পরিক ভৌগোলিক দূরত্ব বা ভিন্নতার কারণে তাদের মিথ্যায় একমত হওয়া অসম্ভব হওয়া।
- সংবাদের ভিত্তি অনুমান নয়, বরং চাক্ষুষ দর্শন বা শ্রবণ হওয়া।
২. মুতাওয়াতিরের প্রকারভেদ: মুতাওয়াতির প্রধানত দুই প্রকার:
- মুতাওয়াতিরে লাফযী (المتواتر اللفظي): যে হাদিসের সমস্ত সনদে শব্দ ও অর্থ হুবহু একই রকমভাবে বর্ণিত হয়েছে। যেমন নবীজির বাণী: مَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّدًا فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ (যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার ওপর মিথ্যা আরোপ করে, সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা বানিয়ে নেয়)। এটি সত্তরের অধিক সাহাবী হুবহু একই শব্দে বর্ণনা করেছেন।
- মুতাওয়াতিরে মা’নাবী (المتواتر المعنوي): যার মূল প্রতিপাদ্য ও অর্থ এক কিন্তু বর্ণনাকারীদের শব্দ ভিন্ন ভিন্ন। যেমন: দোয়ায় হাত তোলার হাদিস, শাফা’আতের হাদিস, হাউযে কাউসারের হাদিস ইত্যাদি।
৩. হাদিসে মুতাওয়াতিরের শরয়ী হুকুম:
- ইয়াক্বীনে ক্বাত’ঈ লাভ: হাদিসে মুতাওয়াতির দ্বারা অকাট্য ও চাক্ষুষ নিশ্চিত জ্ঞান (العلم الضروري القطعي) লাভ হয়, ঠিক যেমন কোনো বস্তু নিজের চোখে দেখলে সংশয় থাকে না।
- আমল ও বিশ্বাসের বাধ্যবাধকতা: এর ওপর ঈমান আনা এবং আমল করা সর্বসম্মতভাবে ফরয।
- অস্বীকারকারীর হুকুম: কোনো ব্যক্তি যদি দ্বীনের স্পষ্ট মুতাওয়াতির বিষয়কে অস্বীকার করে, তবে সে সর্বসম্মতভাবে কাফির বলে গণ্য হবে; কেননা তা মূলত রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নবুয়ত ও বাণীর স্পষ্ট অস্বীকৃতির শামিল।
- সনদ যাচাইয়ের অপ্রয়োজনীয়তা: সাধারণ হাদিসের ক্ষেত্রে রাবীর আদালত ও যবত যাচাই করতে হয়, কিন্তু মুতাওয়াতির হাদিসে রাবীদের সংখ্যাধিক্যের কারণে তাদের ব্যক্তিগত দোষত্রুটি অনুসন্ধানের প্রয়োজন হয় না।
٦- عَرِّفِ الكُتُبَ السِّتَّةَ وَمَنْ صَنَّفُوهَا؟ اذْكُرْ خُصُوصِيَّتَيْنِ لِكُلِّ الكُتُبِ السِّتَّةِ-
[৬. কুতুবে সিত্তাহর পরিচয় দাও এবং এগুলো কারা সংকলন করেছেন? কুতুবে সিত্তাহর প্রত্যেকটির দুটি করে বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করো।]
ভূমিকা: ইসলামী শরীয়তের বিশুদ্ধ হাদিস সংকলনসমূহের মধ্যে সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য ও সর্বজনস্বীকৃত ছয়টি কিতাবকে সম্মিলিতভাবে ‘কুতুবে সিত্তাহ’ (الكتب الستة) বা সিহাহ সিত্তাহ বলা হয়।
১. কুতুবে সিত্তাহ ও এর সংকলকবৃন্দের পরিচয়:
| ক্রম | গ্রন্থের নাম | ইমাম/সংকলকের নাম | ওফাত সাল |
|---|---|---|---|
| ১ | সহীহুল বুখারী (صحيح البخاري) | ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল আল-বুখারী (র.) | ২৫৬ হিজরী |
| ২ | সহীহ মুসলিম (صحيح مسلم) | ইমাম মুসলিম ইবনে আল-হাজ্জাজ আন-নায়সাবূরী (র.) | ২৬১ হিজরী |
| ৩ | সুনানে আবু দাউদ (سنن أبي داود) | ইমাম আবু দাউদ সুলাইমান ইবনুল আশ’আস আস-সিজিস্তানী (র.) | ২৭৫ হিজরী |
| ৪ | জামে আত-তিরমিযী (جامع الترمذي) | ইমাম আবু ঈসা মুহাম্মদ ইবনে ঈসা আত-তিরমিযী (র.) | ২৭৯ হিজরী |
| ৫ | সুনানে আন-নাসায়ী (سنن النسائي) | ইমাম আহমদ ইবনে শুআইব আন-নাসায়ী (র.) | ৩০৩ হিজরী |
| ৬ | সুনানে ইবনে মাজাহ (سنن ابن ماجه) | ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াজিদ ইবনে মাজাহ আল-কাযভীনি (র.) | ২৭৩ হিজরী |
২. প্রত্যেকটি গ্রন্থের দুটি করে অনন্য বৈশিষ্ট্য:
- সহীহুল বুখারী:
- কুরআনুল কারীমের পর পৃথিবীতে সর্বাধিক বিশুদ্ধ গ্রন্থ এবং এতে কেবল শর্তহীন সহীহ হাদিস স্থান পেয়েছে।
- অধ্যায় নির্ধারণ ও ফিক্বহী দৃষ্টিভঙ্গি (تراجم الأبواب) এত সমৃদ্ধ যে বলা হয়: فقه البخاري في تراجمه (ইমাম বুখারীর ফিক্বহ তাঁর অধ্যায় শিরোনামের ভেতর নিহিত)।
- সহীহ মুসলিম:
- একই বিষয়ের সমস্ত সনদ ও পাঠকে একটি নির্দিষ্ট স্থানে চমৎকার বিন্যাসে সুসংবদ্ধ করা হয়েছে (حسن الترتيب)।
- সনদের সূক্ষ্ম শব্দগত পার্থক্য যেমন: حدّثنا ও أخبرنا-এর মধ্যে অত্যন্ত কঠোর সতর্কতা বজায় রাখা হয়েছে।
- সুনানে আবু দাউদ:
- ফিক্বহী আহকাম ও বিধিবিধান সম্পর্কিত হাদিসের (أحاديث الأحكام) ক্ষেত্রে এটি বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম আকর গ্রন্থ।
- দুর্বল কোনো হাদিস থাকলে ইমাম আবু দাউদ নিজেই তার ত্রুটি বা মানের ওপর সুস্পষ্ট মন্তব্য করেছেন।
- জামে আত-তিরমিযী:
- হাদিস বর্ণনার পর এর বিশুদ্ধতার মান (সহীহ, হাসান, গরীব) সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
- সাহাবা ও তাবেয়ীগণের ফিক্বহী মাযহাব ও মতপার্থক্য স্পষ্টভাবে সন্নিবেশিত হয়েছে।
- সুনানে আন-নাসায়ী:
- সনদের ত্রুটি-বিচ্যুতি (علل الحديث) বর্ণনায় এবং রাবীদের যাচাইয়ে ইমাম নাসায়ী ছিলেন অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও কঠোর।
- সুনান গ্রন্থসমূহের মধ্যে নাসায়ীর শর্তাবলী সহীহাইনের শর্তের সর্বাধিক নিকটবর্তী।
- সুনানে ইবনে মাজাহ:
- অধ্যায় বিন্যাস ও ফিক্বহী অনুচ্ছেদ সাজানোর ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত চমৎকার ও সুশৃঙ্খল।
- অন্য পাঁচ গ্রন্থে আসেনি এমন বহু বিরল হাদিস (زوائد ابن ماجه) ও ফিক্বহী দলিলের সমাবেশ ঘটিয়েছে।
مجموعة (ب) / খ-বিভাগ (الدرجة— ٤ × ٥ = ٢٠)
(أجب عن أربعة من الأسئلة الآتية)
٧- هَلْ الإِيمَانُ يَزِيدُ وَيَنْقُصُ؟ بَيِّنْ مُدَلَّلاً-
[৭. ঈমান কি বাড়ে ও কমে? দলিলসহ বর্ণনা করো।]
ভূমিকা: ঈমানের হ্রাস-বৃদ্ধি (زيادة الإيمان ونقصانه) ইসলামী আক্বীদার অন্যতম মৌলিক বিতর্কিত বিষয়। এ ব্যাপারে সালাফে সালেহীন এবং অন্যান্য দলের মধ্যে মতপার্থক্য বিদ্যমান।
১. ইমামগণের দৃষ্টিভঙ্গি:
- জমহুর আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা’আতের মত: ইমাম বুখারী, ইমাম শাফেয়ী, ইমাম মালেক ও ইমাম আহমদ (র.)-এর মতে ঈমান সৎকাজের দ্বারা বৃদ্ধি পায় এবং পাপের কারণে হ্রাস পায় (يزيد بالطاعة وينقص بالمعصية)।
- ইমাম আবু হানিফা (র.)-এর বিশ্লেষণ: ঈমানের মূল বিশ্বাস বা সত্যায়নের (التصديق الأصلي) দিক থেকে তা বাড়ে বা কমে না; বরং ঈমানের নূর, পূর্ণতা এবং আমলের দিক থেকে তারতম্য ঘটে।
২. কুরআন ও হাদিস থেকে দলিল:
- পবিত্র কুরআনের দলিল:
- আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন: لِيَزْدَادُوا إِيمَانًا مَعَ إِيمَانِهِمْ — “যাতে তাদের ঈমানের সাথে আরও ঈমান বৃদ্ধি পায়।” (সূরা আল-ফাতহ: ৪)
- অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে: وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا — “যখন তাদের সামনে তাঁর আয়াত তিলাওয়াত করা হয়, তখন তা তাদের ঈমানকে বৃদ্ধি করে।” (সূরা আল-আনফাল: ২)
- হাদিস শরীফের দলিল:
- রাসুলুল্লাহ ﷺ নারী সাহাবীদের লক্ষ্য করে বলেছিলেন: مَا رَأَيْتُ مِنْ نَاقِصَاتِ عَقْلٍ وَدِينٍ (আমি বুদ্ধি ও দ্বীনদারিতে অপূর্ণ তোমাদের চেয়ে কাউকে দেখিনি)। এখানে দ্বীন ও ঈমানের হ্রাস-বৃদ্ধির স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে।
- নবীজি আরও ইরশাদ করেন, পথ থেকে কাঁটা সরানো ঈমানের অংশ এবং জিহাদের সর্বনিম্ন স্তর হলো অন্তরে অন্যায়কে ঘৃণা করা, যা ঈমানের দুর্বলতম অবস্থা নির্দেশ করে।
٨- هَلْ تَجُوزُ صَلاَةُ الجَنَازَةِ فِي المَسَاجِدِ؟ وَمَا الاخْتِلاَفُ فِيهِ؟ بَيِّنْ-
[৮. মসজিদে জানাজার নামাজ পড়া কি জায়েজ? এ ব্যাপারে মতভেদ কী? বর্ণনা করো।]
ভূমিকা: মসজিদের মূল মর্যাদা ও পবিত্রতা রক্ষা এবং জানাজার নামাজ মাঠে (ঈদগাহ/মাকবারা) আদায় করার সুন্নাহর আলোকে মসজিদে জানাজা পড়ার বৈধতা নিয়ে ফুক্বাহায়ে কেরামের মাঝে মতপার্থক্য রয়েছে।
১. ফুক্বাহায়ে কেরামের মতপার্থক্য:
- ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমদ (র.)-এর মত: মসজিদে জানাজার সালাত আদায় করা সম্পূর্ণ জায়েজ এবং কোনো প্রকার অপছন্দনীয় (মাকরূহ) নয়। তাঁদের দলিল হলো হযরত আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত সহীহ হাদিস, যেখানে রাসুলুল্লাহ ﷺ হযরত সুহাইল ইবনে বায়যা (রা.)-এর জানাজার সালাত মসজিদের ভেতরেই আদায় করেছিলেন। এছাড়া হযরত আবু বকর ও হযরত উমর (রা.)-এর জানাজাও মসজিদে নববীতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
- ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মালেক (র.)-এর মত: স্বাভাবিক অবস্থায় মসজিদের ভেতরে জানাজার সালাত পড়া মাকরূহে তানযীহী। তবে মসজিদ সংলগ্ন খোলা চত্বরে বা মসজিদের বাইরে লাশ রেখে ইমাম মসজিদের সীমানায় দাঁড়ালে অথবা বৃষ্টি ও ওজরের কারণে তা মাকরূহ নয়।
২. হানাফী মাযহাবের যুক্তি: রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: مَنْ صَلَّى عَلَى جَنَازَةٍ فِي المَسْجِدِ فَلَا شَيْءَ لَهُ (যে ব্যক্তি মসজিদে জানাজা পড়ল, তার কোনো সওয়াব নেই / কোনো গুনাহ নেই)। উপরন্তু মসজিদ মূলত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও ইবাদতের জন্য নির্মিত হয়েছে এবং সেখানে লাশ প্রবেশ করালে মসজিদের পবিত্রতা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সমন্বয়: কোনো প্রতিকূল আবহাওয়া বা বিশেষ অসুবিধা দেখা দিলে সর্বসম্মতভাবেই মসজিদে জানাজা পড়া সম্পূর্ণ বৈধ।
٩- اُكْتُبْ صِفَاتِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الخَلْقِيَّةَ فِي ضَوْءِ الحَدِيثِ-
[৯. হাদিসের আলোকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শারীরিক/শারীরিক গঠনগত বৈশিষ্ট্যসমূহ লিপিবদ্ধ করো।]
ভূমিকা: হাদিস শরীফে সাহাবায়ে কেরাম রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর অতুলনীয় দৈহিক সৌন্দর্য ও শামায়েল অত্যন্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বর্ণনা করেছেন।
হাদিসের আলোকে নবীজির শারীরিক বৈশিষ্ট্যসমূহ:
- শারীরিক উচ্চতা ও গঠন: তিনি অতি দীর্ঘও ছিলেন না এবং বেঁটেও ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন সুষম মধ্যমাকৃতির (رَبْعَةٌ مِنَ القَوْمِ)। তাঁর বুক ও কাঁধ ছিল সুপ্রশস্ত এবং শরীর ছিল সুগঠিত ও অত্যন্ত আকর্ষণীয়।
- চেহারার সৌন্দর্য: হযরত বারা (রা.) ও জাবির ইবনে সামুরাহ (রা.) বলেন, তাঁর চেহারা ছিল পূর্ণিমার চাঁদের ন্যায় উজ্জ্বল ও দ্যুতিময়। তাঁর মুখের আকৃতি ছিল সামান্য গোলাকার ও রক্তিম শুভ্রবর্ণ।
- চক্ষু ও ভ্রুযুগল: তাঁর চোখ দুটি ছিল ডাগর, শুভ্রাংশের মাঝে কুচকুচে কালো তারা এবং চোখের প্রান্তসীমায় মৃদু লালিমাযুক্ত। তাঁর চোখের পাপড়ি ছিল দীর্ঘ এবং ভ্রুদ্বয় ছিল ধনুকের মতো বাঁকানো।
- মুবারক কেশরাজি: তাঁর মাথার চুল সম্পূর্ণ কোঁকড়ানোও ছিল না আবার একেবারে সোজাও ছিল না; বরং তা ছিল ঈষৎ ঢেউখেলানো। চুল সাধারণত কানের লতি বা কাঁধ পর্যন্ত ঝুলন্ত থাকত। ওফাতকালে তাঁর দাড়ি ও চুলে মাত্র বিশটির মতো পাকা চুল ছিল।
- মোহরে নবুয়ত: তাঁর দুই কাঁধের মাঝামাঝি কবুতরের ডিমের মতো লালচে উঁচু অংশে ‘মোহরে নবুয়ত’ অঙ্কিত ছিল।
- হাতের তালু ও পদযুগল: হযরত আনাস (রা.) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর হাতের তালুর চেয়ে নরম কোনো রেশম বা দিবায স্পর্শ করিনি। তাঁর শরীরের ঘ্রাণ ছিল মেশক-আম্বরের চেয়েও বেশি সুবাসিত।
١٠- عَرِّفِ الحَدِيثَ القُدْسِيَّ ثُمَّ بَيِّنْ الفَرْقَ بَيْنَهُ وَبَيْنَ القُرْآنِ الكَرِيمِ-
[১০. হাদিসে কুদসীর সংজ্ঞা দাও এবং এর সাথে পবিত্র কুরআনের পার্থক্যসমূহ তুলে ধরো।]
ভূমিকা: ইসলামী শরীয়তের বাণীসমূহের মধ্যে হাদিসে কুদসী এক অনন্য মর্যাদার অধিকারী, যা রাসুলুল্লাহ ﷺ সরাসরি আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে বর্ণনা করেছেন।
১. হাদিসে কুদসীর সংজ্ঞা:
- আভিধানিক অর্থ: ‘কুদসী’ শব্দটি ‘কুদ্দুস’ (القدس) থেকে আগত, যার অর্থ পবিত্র বা মহিমান্বিত।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: الحديث القدسي هو ما رواه النبي صلى الله عليه وسلم عن ربه تبارك وتعالى، مع كون اللفظ من النبي والمعنى من الله — অর্থাৎ যে হাদিসের অর্থ আল্লাহ তা’আলা রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে ইলহাম বা স্বপ্নের মাধ্যমে জানিয়েছেন এবং রাসুলুল্লাহ ﷺ স্বীয় ভাষায় তা প্রকাশ করেছেন, তাকে হাদিসে কুদসী বলা হয়। যেমন: قَالَ اللهُ تَعَالَى: كُلُّ عَمَلِ ابْنِ آدَمَ لَهُ إِلَّا الصَّوْمَ فَإِنَّهُ لِي وَأَنَا أَجْزِي بِهِ।
২. হাদিসে কুদসী ও কুরআনুল কারীমের মধ্যকার প্রধান পার্থক্য:
| তুলনার ক্ষেত্র | পবিত্র কুরআনুল কারীম | হাদিসে কুদসী |
|---|---|---|
| শব্দ ও অর্থের উৎস | শব্দ ও অর্থ উভয়ই সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। | অর্থ আল্লাহর পক্ষ থেকে, কিন্তু ভাষার রূপ রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর। |
| মু’জিযাহ বা চ্যালেঞ্জ | কুরআন মানবজাতির জন্য চিরন্তন মু’জিযাহ এবং এর একটি সূরার মতো রচনার চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। | এটি মু’জিযাহ নয় এবং এর সাথে কোনো সাহিত্যিক চ্যালেঞ্জ যুক্ত নেই। |
| সালাতে তিলাওয়াত | সালাতে কুরআনের আয়াত পাঠ করা নামাযের রুকন ও ফরয। | সালাতে হাদিসে কুদসী তিলাওয়াত করা জায়েজ নয় এবং নামাজ হবে না। |
| বর্ণনার ধারাবাহিকতা | সমগ্র কুরআন অকাট্য মুতাওয়াতির সনদে সংরক্ষিত। | অধিকাংশ হাদিসে কুদসী খবরে ওয়াহিদ এবং তা সহীহ, হাসান বা যঈফ হতে পারে। |
| স্পর্শ করার বিধান | ওযু ব্যতীত কুরআন স্পর্শ করা সর্বসম্মতভাবে হারাম। | ওযু ছাড়াও হাদিসে কুদসীর কিতাব স্পর্শ করা জায়েজ। |
١١- مَا الفَرْقُ بَيْنَ الحَدِيثِ المَشْهُورِ وَالمُسْتَفِيضِ؟ بَيِّنْ مُفَصَّلاً-
[১১. হাদিসে মাশহুর ও মুস্তাফীযের মধ্যকার পার্থক্য বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করো।]
ভূমিকা: খবরে ওয়াহিদের রাবীর সংখ্যার আধিক্য ও ব্যাপ্তির ওপর ভিত্তি করে হাদিস শাস্ত্রবিদগণ মাশহুর ও মুস্তাফীয পরিভাষাদ্বয় ব্যবহার করেছেন।
১. হাদিসে মাশহুর (الحديث المشهور):
- সংজ্ঞা: যে হাদিসের বর্ণনাকারীর সংখ্যা সনদের প্রতিটি স্তরে কমপক্ষে তিন বা ততোধিক হয়েছে কিন্তু মুতাওয়াতিরের সীমায় পৌঁছেনি, তাকে হাদিসে মাশহুর বলে।
- হানাফী উসূলবিদগণের পরিভাষায়— যা সাহাবায়ে কেরামের যুগে খবরে ওয়াহিদ ছিল, কিন্তু তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ীদের যুগে এসে মুতাওয়াতিরের ন্যায় খ্যাতি ও ব্যাপ্তি লাভ করেছে। যেমন: إنما الأعمال بالنيات (পরবর্তী যুগে মাশহুর)।
২. হাদিসে মুস্তাফীয (الحديث المستفيض):
- আভিধানিক অর্থ: ‘মুস্তাফীয’ এসেছে فاض الماء (পানি উপচে পড়া ও চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়া) থেকে।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: যে হাদিসের সনদ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সমানভাবে বিস্তৃত হয়েছে এবং প্রতিটি স্তরে রাবীর সংখ্যা তিন বা ততোধিক সমহারে বজায় থেকেছে।
৩. উভয়ের মধ্যকার প্রধান ৩টি পার্থক্য:
- ব্যাপকতা ও সংকীর্ণতা (العموم والخصوص): হাদিস বিশারদদের মতে, ‘মুস্তাফীয’ হলো মাশহুরের চেয়ে অধিক নির্দিষ্ট (أخص مطلقًا)। অর্থাৎ প্রত্যেক মুস্তাফীযই মাশহুর, কিন্তু প্রত্যেক মাশহুর মুস্তাফীয নয়।
- সনদের স্তরে সমতা: মুস্তাফীয হওয়ার জন্য সনদের প্রথম স্তর (সাহাবী) থেকে শেষ স্তর পর্যন্ত রাবীর সংখ্যা কমপক্ষে তিনজন বা সমসংখ্যক থাকা আবশ্যক। পক্ষান্তরে, মাশহুরে প্রথম স্তরে একজন সাহাবী থাকলেও পরবর্তী স্তরে লোকসংখ্যা বৃদ্ধি পেলে তা মাশহুর হতে পারে।
- জনসাধারণের মাঝে খ্যাতি: কোনো ভিত্তিহীন বা দুর্বল কথাও জনগণের মুখে মুখে প্রচারিত হলে তাকে সাধারণ পরিভাষায় ‘মাশহুর’ (المشهور على الألسنة) বলা হয়, কিন্তু ‘মুস্তাফীয’ কেবল শাস্ত্রীয় নির্ভরযোগ্য সনদের ক্ষেত্রেই প্রযুক্ত হয়।
١٢- وَازِنْ بَيْنَ البُخَارِيِّ وَمُسْلِمٍ مُبَيِّنًا-
[১২. সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা করো।]
ভূমিকা: উম্মতে মুসলিমার সর্বসম্মত ঐক্যমতে মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের পর পৃথিবীর সর্বাধিক বিশুদ্ধতম দুটি হাদিস গ্রন্থ হলো ইমাম বুখারীর ‘সহীহুল বুখারী’ ও ইমাম মুসলিমের ‘সহীহ মুসলিম’। এ দুটি গ্রন্থকে একত্রে ‘সহীহাইন’ (الصحيحان) বলা হয়।
সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের তুলনামূলক বিচার-বিশ্লেষণ:
| তুলনার মাপকাঠি | সহীহ আল-বুখারী | সহীহ মুসলিম |
|---|---|---|
| সনদের বিশুদ্ধতা ও শর্ত | ইমাম বুখারী সমসাময়িক হওয়ার পাশাপাশি রাবী ও উস্তাদের সরাসরি চাক্ষুষ সাক্ষাত (ثبوت اللقاء) শর্ত করেছেন। ফলে এর বিশুদ্ধতা সর্বোচ্চ। | ইমাম মুসলিমের মতে রাবী ও উস্তাদ একই যুগের হওয়া এবং সাক্ষাত সম্ভব হওয়া (المعاصرة وإمكان اللقاء) যথেষ্ট। |
| বিন্যাস ও পদ্ধতি | একটি হাদিসকে বিভিন্ন ফিক্বহী মাসআলার প্রমাণ হিসেবে একাধিক অধ্যায়ে খণ্ড খণ্ড করে উল্লেখ করেছেন। | একটি হাদিসের সমস্ত সনদ ও পাঠকে একটি সুনির্দিষ্ট স্থানে চমৎকারভাবে একত্রিত করেছেন, যা সাধারণ পাঠকের জন্য অধিকতর সহজ। |
| ফিক্বহী মর্যাদা | ইমাম বুখারীর মূল প্রাধান্য ছিল হাদিসের ফিক্বহ ও গভীর উদ্ভাবনী জ্ঞান (استنباط الفقه)। | ইমাম মুসলিমের প্রধান লক্ষ্য ছিল হাদিসের সনদ ও পাঠের বিশুদ্ধ রূপ সুসংরক্ষণ। |
| রাবীদের মানদণ্ড | ইমাম বুখারীর বর্ণিত রাবীগণের আস্থা ও স্মৃতিশক্তির মান ইমাম মুসলিমের তুলনায় সামগ্রিকভাবে অধিক নির্ভরযোগ্য ও অনিন্দ্যনীয়। | ইমাম মুসলিম এমন কিছু রাবী থেকে হাদিস এনেছেন যাদের ব্যাপারে সামান্য সমালোচনা রয়েছে, তবে তিনি তা মুতাবা’আত হিসেবে এনেছেন। |
সারসংক্ষেপ ও সিদ্ধান্ত:
জমহুর মুহাদ্দিসীন ও উলামায়ে কেরামের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলো— বিশুদ্ধতা, সনদের অকাট্যতা এবং ফিক্বহী গভীরতার দিক থেকে সহীহ বুখারী শ্রেষ্ঠ; আর চমৎকার বিন্যাস, অধ্যায়নের সুবিধা ও পাঠের সমন্বয়ের দিক থেকে সহীহ মুসলিম অগ্রগণ্য। হাফিজ ইবনে হাজার আসক্বালানী (র.) বলেন: اتفق العلماء على أن البخاري أصح من مسلم (উলামাগণ একমত যে বুখারী মুসলিমের চেয়ে অধিক বিশুদ্ধ)।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. নুসূসুম মিনাল হাদীস বিষয়ের মূল উদ্দেশ্য কী?
এই বিষয়ের মূল উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীদের রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নির্বাচিত হাদিসসমূহের বিশুদ্ধ পাঠ, সরল অনুবাদ, ব্যাকরণগত বিশ্লেষণ এবং আধুনিক বাস্তবতায় হাদিসের শিক্ষা উপলব্ধি করানো।
২. ঈমানের শাখা সত্তরের অধিক বলতে কী বোঝায়?
হাদিস বিশারদদের মতে, ঈমান কেবল মৌখিক স্বীকৃতির নাম নয়; বরং মানুষের জীবনের যাবতীয় সৎকাজ, নৈতিকতা ও ইবাদত ঈমানের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা হিসেবে গণ্য।
৩. খাঁটি মুনাফিকের প্রধান চারটি বৈশিষ্ট্য কী কী?
খাঁটি মুনাফিকের ৪টি লক্ষণ হলো: আমানতের খিয়ানত করা, কথায় মিথ্যা বলা, চুক্তি বা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা এবং বিতণ্ডায় লিপ্ত হলে সীমা লঙ্ঘন ও গালিগালাজ করা।
৪. মুতাওয়াতির হাদিস অস্বীকারকারীর শরয়ী বিধান কী?
মুতাওয়াতির হাদিস অকাট্য জ্ঞানের উৎস হওয়ায় তা অস্বীকারকারী ব্যক্তি সর্বসম্মত ফতোয়া অনুযায়ী ইসলাম থেকে খারিজ ও কাফির বলে গণ্য হবে।
৫. হাদিসে কুদসী ও কুরআনের মধ্যে প্রধান তফাত কী?
কুরআনের শব্দ ও অর্থ উভয়ই আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ এবং তা নামাযে তিলাওয়াত করা আবশ্যক; পক্ষান্তরে হাদিসে কুদসীর অর্থ আল্লাহর হলেও শব্দ ও ভাষা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর এবং তা নামাযে পাঠ করা যায় না।
৬. সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে কোনটি অধিক বিশুদ্ধ?
জমহুর মুহাদ্দিসীনদের সর্বসম্মত মতানুযায়ী, সনদের কঠোর শর্ত ও বিশুদ্ধতার দিক থেকে সহীহ বুখারী সমগ্র বিশ্বে সর্বাধিক বিশুদ্ধ ও শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ।