পরীক্ষা কোড: ২০২ | প্রশ্নপত্র কোড: ০৫৭
اختبار السنة الثانية للفاضل البكالوريوس (الشرف)، لعام ٢٠٢٣
[ফাজিল স্নাতক (সম্মান) দ্বিতীয় বর্ষ পরীক্ষা, ২০২৩]
اللغة العربية وآدابها
[আরবি ভাষা ও সাহিত্য]
نصوص من الحديث
[নুসূস মিনাল হাদীস]
বিষয় কোড: ২০৪২০১
الزمن: ٤ ساعات | الدرجات الكاملة: ٨٠
[সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০]
الملاحظة: أجب عن أربعة من مجموعة (أ) وعن أربعة من مجموعة (ب)
[দ্রষ্টব্য: ক-বিভাগ থেকে যেকোনো ৪টি এবং খ-বিভাগ থেকে যেকোনো ৪টি প্রশ্নের উত্তর দাও।]
مجموعة (أ) / ক-বিভাগ (الدرجة— ٤ × ١٥ = ٦٠)
(ترجم الأحاديث وأجب عن الأسئلة الملحقة بها)
١- عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ : «الإِيمَانُ بِضْعٌ وَسِتُّونَ شُعْبَةً، وَالحَيَاءُ شُعْبَةٌ مِنَ الإِيمَانِ»-
[১. হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “ঈমানের ষাটের অধিক শাখা-প্রশাখা রয়েছে, আর লজ্জা হলো ঈমানের অন্যতম একটি শাখা।”]
(أ) عَرِّفِ الإِيمَانَ، وَكَمْ شُعْبَةً لَهُ؟ بَيِّنْ عَشْرًا مِنْهَا-
[(ক) ঈমানের পরিচয় দাও। ঈমানের শাখা কতটি? তার মধ্য থেকে দশটি শাখা বিস্তারিত উল্লেখ করো।]
ভূমিকা: মানবজীবনের সামগ্রিক পবিত্রতা ও আখিরাতের অনন্ত সফলতার মূল ভিত্তি হলো ঈমান। আলোচ্য হাদিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈমানকে একটি সুবিশাল ও ফলবতী বৃক্ষের সাথে তুলনা করেছেন, যার বহু শাখা-প্রশাখা মানবজীবনের প্রতিটি অঙ্গনকে পরিব্যাপ্ত করে রাখে।
১. ঈমানের শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ:
- আভিধানিক অর্থ: ‘ঈমান’ (الإيمان) শব্দটি বাবে ইফ’আল (إفعال)-এর মাসদার। এর মূলধাতু ‘আমন’ (أ-م-ن)। এর আভিধানিক অর্থ হলো বিশ্বাস স্থাপন করা (التصديق), নিরাপত্তা দেওয়া (الأمان) এবং স্বীকৃতি প্রদান করা (الإقرار)।
- পারিভাষিক অর্থ: আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের পরিভাষায়, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের একত্ববাদ, তাঁর গুণাবলী এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনীত শরিয়তের সমস্ত বিধানকে অন্তরে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা, মুখে উচ্চারণ ও স্বীকৃতি দেওয়া এবং শারীরিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন করাকে ঈমান বলে। ইমাম বুখারী (রহ.) বলেন: الإيمان قول وعمل يزيد وينقص (ঈমান হলো কথা ও কাজের সমষ্টি; যা আনুগত্যে বৃদ্ধি পায় এবং পাপে হ্রাস পায়)।
২. ঈমানের শাখার সংখ্যা:
সহীহ বুখারীর বর্ণনায় এসেছে ‘ঈমানের ষাটের অধিক শাখা রয়েছে’ (بضع وستون شعبة)। সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে ‘ঈমানের সত্তরের অধিক শাখা রয়েছে’ (بضع وسبعون شعبة)। আরবি ভাষায় ‘বিদ্ব’ (بضع) শব্দটি তিন থেকে নয় পর্যন্ত সংখ্যা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী ও ইমাম বাইহাকী (রহ.)-এর মতে, এই সংখ্যার বিরোধ কোনো বৈপরীত্য নয়; বরং সত্তরের বর্ণনাটি পূর্ণতর বিষয়সমূহের সমন্বিত রূপ।
৩. ঈমানের দশটি প্রধান শাখা:
ইমাম বাইহাকী (রহ.) তাঁর রচিত ‘শুআবুল ঈমান’ কিতাবে ঈমানের শাখাগুলোকে সুবিন্যস্ত করেছেন। তার মধ্য থেকে উল্লেখযোগ্য ১০টি শাখা নিম্নে আলোচনা করা হলো:
- তাওহীদে বিশ্বাস (الإيمان بالله وتوحيده): আল্লাহ তাআলার রুবূবিয়্যাত, উলূহিয়্যাত ও আসমা ওয়াস সিফাতে কোনো শরিক না করে একমাত্র তাঁরই উপাস্য হওয়ার প্রতি অবিচল বিশ্বাস রাখা। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: فأفضلها قول لا إله إلا الله (এর সর্বোচ্চ শাখা হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলা)।
- রাসূলগণের প্রতি বিশ্বাস (الإيمان بالرسل): হযরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত সকল আসমানি নবীর সত্যতায় বিশ্বাস স্থাপন।
- আসমানি কিতাবসমূহের প্রতি বিশ্বাস (الإيمان بالكتب السماوية): তাওরাত, যাবুর, ইঞ্জিল এবং সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ কিতাব আল-কুরআনুল কারীমের ওপর পূর্ণ আস্থা ও ঈমান পোষণ।
- ফেরেশতাগণের প্রতি বিশ্বাস (الإيمان بالملائكة): আল্লাহর নূরানি সৃষ্টি ফেরেশতাকুলের অস্তিত্ব ও তাঁদের অর্পিত দায়িত্ব পালনের সত্যতায় বিশ্বাস রাখা।
- তাকদীরে বিশ্বাস (الإيمان بالقدر خيره وشره): ভালো-মন্দ যাবতীয় বিষয়ের ফয়সালা আল্লাহর সার্বভৌম ইচ্ছা ও পূর্বজ্ঞান অনুযায়ী নির্ধারিত হওয়ার প্রতি বিশ্বাস।
- সালাত কায়েম করা (إقام الصلاة): দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ সালাত খুশু-খুযুর সাথে সঠিক সময়ে যথানিয়মে জামাতে আদায় করা।
- যাকাত প্রদান (إيتاء الزكاة): নেসাব পরিমাণ সম্পদের অধিকারী হলে প্রতি বছর নির্দিষ্ট হারে গরিব-অসহায়দের মাঝে ফরজ যাকাত বণ্টন করা।
- রমযানের সিয়াম পালন (صوم رمضان): রমযান মাসের পুরো এক মাস সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও পাপাচার থেকে বিরত থেকে সিয়াম সাধনা করা।
- লজ্জাশীলতা অবলম্বন (الحياء): যাবতীয় অশ্লীলতা, অন্যায় ও নাফরমানি থেকে নিজের অন্তর ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে সংযত রাখা। এটি ঈমানের অন্যতম মৌলিক সৌন্দর্য।
- কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ (إماطة الأذى عن الطريق): রাস্তাঘাট ও জনসাধারণের চলাচলের স্থান থেকে কাঁটা, ময়লা বা ক্ষতিকর বস্তু সরিয়ে নেওয়া। হাদিসের ভাষায় এটি ঈমানের সর্বনিম্ন শাখা।
(ب) كَمْ لَفْظًا لِتَحَمُّلِ الحَدِيثِ وَمَا هُوَ؟ بَيِّنْ-
[(খ) হাদিস তাহাম্মুল (গ্রহণের) শব্দ বা পরিভাষা কতটি ও কী কী? বিস্তারিত বর্ণনা করো।]
১. তাহাম্মুলুল হাদিসের পরিচয়: হাদিস শাস্ত্রে উস্তাদ বা শায়খের কাছ থেকে হাদিস শ্রবণ, গ্রহণ ও সংরক্ষণ করাকে ‘তাহাম্মুলুল হাদিস’ (تحمل الحديث) বলা হয়। আর পরবর্তী শিক্ষার্থীদের কাছে তা যথাযথভাবে শিক্ষাদান বা পৌঁছে দেওয়াকে ‘আদাউল হাদিস’ (أداء الحديث) বলা হয়।
২. তাহাম্মুলের প্রধান পরিভাষা ও স্তরসমূহ: মুহাদ্দিসগণের ঐকমত্য অনুযায়ী হাদিস গ্রহণের মোট আটটি স্তর বা পদ্ধতি রয়েছে, যার জন্য সুনির্দিষ্ট পরিভাষা বা শব্দমালা ব্যবহৃত হয়:
- ১. আস-সামা’ (السماع من لفظ الشيخ): শায়খের মুখ থেকে সরাসরি হাদিসের শব্দাবলি পাঠ শ্রবণ করা। এর প্রকাশের পরিভাষা: سمعت (আমি শুনেছি) অথবা حدثنا / حدثني (আমাদেরকে বা আমাকে হাদিস বর্ণনা করেছেন)। এটি তাহাম্মুলের সর্বোচ্চ ও সর্বসম্মত স্তর।
- ২. আল-ক্বিরাআহ আলাশ শায়খ বা আল-আরদ্ব (القراءة على الشيخ / العرض): ছাত্র নিজে শায়খের সামনে পাঠ করে শোনায় এবং শায়খ তা নীরবে শোনেন বা সংশোধন করে দেন। এর পরিভাষা: أخبرنا / أخبرني قراءة عليه (আমরা তাঁর সামনে পাঠের মাধ্যমে সংবাদ পেয়েছি)।
- ৩. আল-ইজাযাহ (الإجازة): শায়খ কোনো ছাত্রকে মুখে বা লিখিতভাবে তাঁর বর্ণিত হাদিস রেওয়ায়েত করার অনুমতি প্রদান করা। পরিভাষা: أجاز لي فلان (অমুক আমাকে অনুমতি দিয়েছেন)।
- ৪. আল-মুনাওয়ালাহ (المناولة): শায়খ তাঁর কিতাব বা হাদিসের মূল পাণ্ডুলিপি ছাত্রের হাতে অর্পণ করে বলেন, ‘এটি আমার রেওয়ায়েতকৃত হাদিস, তুমি তা বর্ণনা করো’। পরিভাষা: ناولني فلان।
- ৫. আল-মুকাতাবাহ (المكاتبة): শায়খ স্বহস্তে দূরবর্তী কোনো ছাত্রের কাছে হাদিস লিখে প্রেরণ করা। পরিভাষা: كتب إليّ فلان।
- ৬. আল-ই’লাম (إعلام الشيخ): শায়খ ছাত্রকে অবহিত করেন যে, এটি তাঁর শোনা কিতাব বা হাদিস, তবে সুস্পষ্টভাবে রেওয়ায়েতের অনুমতি উচ্চারণ করেন না। পরিভাষা: أعلمني شيخي।
- ৭. আল-ওয়াসিয়্যাহ (الوصية بالكتب): শায়খ মৃত্যুর পূর্বে বা সফরে গমনের পূর্বে কারো অনুকূলে তাঁর কিতাবের অসিয়ত করে যাওয়া। পরিভাষা: أوصى إليّ فلان بكتابه।
- ৮. আল-বিজাদাহ (الوجادة): শায়খের পরিচিত হস্তলিপিতে কোনো পাণ্ডুলিপি বা হাদিস পাওয়া, যা তাঁর কাছ থেকে সরাসরি শ্রবণ বা অনুমোদনের মাধ্যমে লাভ করা হয়নি। পরিভাষা: وجدت بخط فلان।
٢- عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ : «أَرْبَعٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ كَانَ مُنَافِقًا خَالِصًا، وَمَنْ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنْهُنَّ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنَ النِّفَاقِ حَتَّى يَدَعَهَا: إِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ، وَإِذَا حَدَّثَ كَذَبَ، وَإِذَا عَاهَدَ غَدَرَ، وَإِذَا خَاصَمَ فَجَرَ»-
[২. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “চারটি স্বভাব যার মধ্যে বিদ্যমান থাকবে সে খাঁটি মুনাফিক বলে গণ্য হবে, আর যার মধ্যে এর কোনো একটি স্বভাব থাকবে তার মধ্যে মুনাফিকীর একটি স্বভাব থাকবে যতক্ষণ না সে তা পরিত্যাগ করে: যখন তার কাছে আমানত রাখা হয় সে খিয়ানত করে; যখন কথা বলে মিথ্যা বলে; যখন প্রতিশ্রুতি দেয় চুক্তি ভঙ্গ করে; এবং যখন বিবাদে লিপ্ত হয় অশ্লীল ভাষা ও অন্যায়ের আশ্রয় নেয়।”]
(أ) مَا مَعْنَى النِّفَاقِ لُغَةً وَشَرْعًا؟
[(ক) নিফাকের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ কী?]
১. নিফাকের আভিধানিক অর্থ: ‘নিফাক’ (النفاق) শব্দটি বাবে মুফা’আলাহ (مفاعلة)-এর মাসদার। এটি আরবি ‘নাফাক্বা’ (نَفَقَ) ধাতু থেকে উদ্ভূত। এর দুটি মূল আভিধানিক তাৎপর্য রয়েছে:
- এক গর্ত দিয়ে ঢুকে অন্য গর্ত দিয়ে বের হওয়া। যেমন বনরুই বা জারবূ নামক মরুভূমির ইঁদুরের মাটির নিচের সুড়ঙ্গকে ‘নাফাক্বা’ (نَفَق) বলা হয়, যার একাধিক গোপন মুখ থাকে। মানুষ দেখতে পায় এক মুখে ঢুকেছে, কিন্তু সে দ্রুত অন্য মুখ দিয়ে পালিয়ে যায়।
- দ্বিতীয় অর্থ হলো দ্বৈত চরিত্র প্রদর্শন করা, সত্যকে লুকিয়ে রেখে বাহ্যিক কৃত্রিমতা প্রকাশ করা।
২. নিফাকের পারিভাষিক অর্থ: শরীয়তের পরিভাষায়, অন্তরে কুফরি, হিংসা বা শত্রুতা গোপন রেখে মুখে এবং বাহ্যিক আচরণে ইসলাম ও ঈমানের প্রকাশ ঘটানোকে নিফাক বলা হয়। যে ব্যক্তি এ ধরনের জঘন্য প্রতারণায় লিপ্ত থাকে তাকে ‘মুনাফিক’ (المنافق) বলা হয়।
৩. নিফাকের প্রকারভেদ: ইসলামি শরিয়তে নিফাক দুই প্রকার:
- আক্বিদাগত নিফাক (النفاق الاعتقادي / الأكبر): অন্তরে ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে কেবল সামাজিক বা বৈষয়িক সুবিধার জন্য বাহ্যিকভাবে মুসলিম পরিচয় দেওয়া। এই শ্রেণির মুনাফিকরা চিরস্থায়ী জাহান্নামী এবং এদের ঠিকানা হবে জাহান্নামের সর্বনিম্ন তলদেশে (الدرك الأسفل من النار)।
- আমলগত নিফাক (النفاق العملي / الأصغر): অন্তরে মূল ঈমান বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও চারিত্রিক ত্রুটির কারণে মিথ্যা বলা, ওয়াদা ভঙ্গ করা, আমানতের খিয়ানত করা বা কলহে অশ্লীলতার মতো পাপাচারে লিপ্ত হওয়া। এটি কবিরা গুনাহ, তবে এর দ্বারা ব্যক্তি ইসলাম থেকে সম্পূর্ণরূপে খারিজ হয়ে চিরস্থায়ী কাফির হয় না। আলোচ্য হাদিসে মূলত আমলি নিফাকের প্রতি সতর্ক করা হয়েছে।
(ب) حَلِّلِ الكَلِمَاتِ الآتِيَةَ: اؤْتُمِنَ، غَدَرَ، فَجَرَ، يَدَعَهَا-
[(খ) নিম্নোক্ত শব্দগুলোর ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ (তাহলীল) করো: اؤْتُمِنَ، غَدَرَ، فَجَرَ، يَدَعَهَا।]
| শব্দ | সীগাহ ও বাহাস | বাব ও মূলধাতু (মাদ্দা) | জিনস ও অর্থ |
|---|---|---|---|
| اؤْتُمِنَ | واحد مذكر غائب، فعل ماض مجهول | ইফতি’আল (افتعال)، أ-م-ن | মাহমূযুল ফা (مهموز الفاء)، অর্থ: তার নিকট আমানত রাখা হলো। |
| غَدَرَ | واحد مذكر غائب، فعل ماض معروف | যরাবা-ইয়াযরিবু (ضرب – يضرب)، غ-د-ر | সহীহ (صحيح)، অর্থ: সে বিশ্বাসভঙ্গ করল / বিশ্বাসঘাতকতা করল। |
| فَجَرَ | واحد مذكر غائب، فعل ماض معروف | যরাবা অথবা নাসারা (فَجَرَ يَفْجُرُ)، ف-ج-ر | সহীহ (صحيح)، অর্থ: সে সীমালঙ্ঘন করল / পাপ ও অশ্লীলতায় জড়াল। |
| يَدَعَهَا | واحد مذكر غائب، مضارع معروف (منصوب بـ حَتَّى) مع ضمير مفعول | ফাতাহা-ইয়াফতাহু (ودع يدع)، و-د-ع | মিছালে ওয়াবী (مثال واوي)، অর্থ: সে তা বর্জন করে বা পরিত্যাগ করে। |
٣- عَنْ عَلِيِّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ : «لَمْ يَكُنِ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِالطَّوِيلِ وَلاَ بِالقَصِيرِ، شَثْنَ الكَفَّيْنِ وَالقَدَمَيْنِ، ضَخْمَ الرَّأْسِ، ضَخْمَ الكَرَادِيسِ، طَوِيلَ المَسْرُبَةِ، إِذَا مَشَى تَكَفَّأَ تَكَفُّؤًا كَأَنَّمَا يَنْحَطُّ مِنْ صَبَبٍ، لَمْ أَرَ قَبْلَهُ وَلاَ بَعْدَهُ مِثْلَهُ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ»-
[৩. হযরত আলী ইবনু আবি তালিব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অতিরিক্ত দীর্ঘদেহী ছিলেন না এবং খর্বাকৃতিও ছিলেন না। তাঁর উভয় হাত ও পদদ্বয় ছিল মাংসল ও মজবুত। তাঁর মস্তক মোবারক ছিল সুগঠিত ও বড়, অস্থিসন্ধিগুলো ছিল সুদৃঢ় ও বলিষ্ঠ, বক্ষ থেকে নাভি পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল পশমের সরু রেখা। যখন তিনি পথ চলতেন তখন সামনের দিকে কিছুটা ঝুঁকে দৃঢ় পদক্ষেপে চলতেন, যেন তিনি কোনো উঁচু স্থান থেকে নিচের দিকে অবতরণ করছেন। আমি তাঁর পূর্বে কিংবা পরে তাঁর মতো এমন অনুপম ব্যক্তিত্ব আর কাউকেই প্রত্যক্ষ করিনি।”]
(أ) صَوِّرْ صُورَةَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي ضَوْءِ الحَدِيثِ-
[(ক) হাদিসের আলোকে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শারীরিক অবয়ব ও রূপসৌন্দর্য চিত্রায়িত করো।]
ভূমিকা: বিশ্বজাহানের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব, সাইয়্যিদুল মুরসালীন হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন দৈহিক গঠন ও চারিত্রিক সৌন্দর্যের এক পূর্ণাঙ্গ ও অনুপম পরাকাষ্ঠা। হযরত আলী (রা.) বর্ণিত আলোচ্য হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র শামীম ও রূপলাবণ্যের এক অপূর্ব চিত্র ফুটে উঠেছে:
- শারীরিক উচ্চতা ও আকৃতি: নবীজী (সা.) অস্বাভাবিক দীর্ঘদেহী ছিলেন না এবং বেঁটেও ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন মধ্যমাকৃতির অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ ও নজরকাড়া সুঠাম দেহের অধিকারী।
- হাত ও পায়ের গঠন (شَثْنَ الكَفَّيْنِ وَالقَدَمَيْنِ): তাঁর পবিত্র হাত ও পায়ের তালু ছিল অত্যন্ত নরম-কোমল, অথচ বলিষ্ঠ ও মাংসল। সাহাবি আনাস (রা.) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাতের তালুর চেয়ে অধিক নরম কোনো রেশম বা মোলায়েম কাপড় স্পর্শ করিনি।
- মস্তক ও অস্থিসন্ধি (ضَخْمَ الرَّأْسِ، ضَخْمَ الكَرَادِيسِ): তাঁর মস্তক মোবারক ছিল সুডৌল ও ব্যক্তিত্বব্যঞ্জক এবং দেহের প্রধান অস্থিসন্ধিগুলো (যেমন কাঁধ, কনুই, হাঁটু) ছিল অত্যন্ত সুদৃঢ় ও শক্তিশালী, যা তাঁর শারীরিক শক্তি ও পরিপূর্ণ পৌরুষের পরিচায়ক।
- বুকের লোমরাজি (طَوِيلَ المَسْرُبَةِ): তাঁর পবিত্র বক্ষস্থল ছিল প্রশস্ত ও পশমহীন। কেবল কণ্ঠনালী থেকে নাভি মোবারক পর্যন্ত চিকন ও চমৎকার পশমের একটি রেখা প্রসারিত ছিল।
- হাঁটার চমৎকার ভঙ্গি (إِذَا مَشَى تَكَفَّأَ): চলার সময় তিনি কোনো প্রকার অহংকার বা জড়তা প্রদর্শন করতেন না। তিনি দৃঢ় পায়ে সামান্য সামনের দিকে ঝুঁকে এমন তেজস্বী ভঙ্গিতে দ্রুত হাঁটতেন, যেন কোনো উঁচু ঢাল থেকে নিম্নের দিকে সাবলীলভাবে নেমে আসছেন।
- অনুপম সামগ্রিক রূপ: হযরত আলী (রা.) হাদিসের শেষে পরম মুগ্ধতা নিয়ে সাক্ষ্য দেন যে, সমগ্র সৃষ্টিজগতে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মতো এমন অতুলনীয় সৌন্দর্যের অধিকারী মহামানব তিনি ইতিপূর্বে কখনো দেখেননি এবং তাঁর পরেও কখনো দেখেননি।
(ب) اُكْتُبْ نُبْذَةً مِنْ حَيَاةِ عَلِيِّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ-
[(খ) হযরত আলী ইবনু আবি তালিব (রা.)-এর জীবনের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি লেখো।]
১. নাম ও বংশপরিচয়: হযরত আলী ইবনু আবি তালিব ইবনু আব্দুল মুত্তালিব। কুনিয়াত ছিল আবুল হাসান এবং আবু তুরাব (রাসূলুল্লাহ সা. প্রদত্ত প্রিয় উপাধি)। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আপন চাচাতো ভাই এবং প্রিয়তম কন্যা হযরত ফাতিমাতুয যাহরা (রা.)-এর সম্মানিত স্বামী।
২. ইসলাম গ্রহণ ও শৈশব: তিনি বালকদের মধ্যে সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণের অনন্য গৌরবের অধিকারী। শিশুকাল থেকেই তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর স্নেহছায়ায় প্রতিপালিত হন। হিজরতের ঐতিহাসিক রজনীতে নিজের জীবনের মায়াত্যাগ করে তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বিছানায় শুয়ে ছিলেন এবং কাফিরদের গচ্ছিত আমানত ফেরত দিয়ে হিজরত সম্পন্ন করেন।
৩. বীরত্ব ও খিলাফত: তিনি ছিলেন ইসলামের শ্রেষ্ঠতম বীর সিপাহসালার। বদর, উহুদ, খন্দক ও খায়বার যুদ্ধে তাঁর অসির আঘাতে ইসলামের বিজয় ত্বরান্বিত হয়। খায়বার বিজয়ে তিনি ‘আসাদুল্লাহিল গালিব’ (আল্লাহর অপরাজেয় সিংহ) উপাধিতে ভূষিত হন। তাবুক যুদ্ধ ব্যতীত তিনি সকল অভিযানে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে ছিলেন। হযরত উসমান (রা.)-এর শাহাদাতের পর হিজরি ৩৫ সনে তিনি খোলাফায়ে রাশেদীনের চতুর্থ খলিফা হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
৪. ইলম ও ফিকাহ: রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: أنا مدينة العلم وعلي بابها (আমি জ্ঞানের নগরী আর আলী হলো তার প্রবেশদ্বার)। তিনি ছিলেন সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে শীর্ষ ফকীহ ও আরবি ব্যাকরণ শাস্ত্রের (নাহব) ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের নির্দেশদাতা।
৫. শাহাদাত: হিজরি ৪০ সনের ১৭ই রমযান কুফার মসজিদে ফজরের সালাতের সময় পথভ্রষ্ট খারেজি ইবনে মুলজিমের বিষাক্ত তরবারির আঘাতে তিনি মারাত্মক আহত হন এবং ২১শে রমযান শাহাদাত বরণ করেন।
٤- عَنِ ابْنِ أَبِي مُلَيْكَةَ قَالَتْ أَسْمَاءُ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ : «أَنَا عَلَى حَوْضٍ أَنْتَظِرُ مَنْ يَرِدُ عَلَيَّ مِنْكُمْ، فَيُؤْخَذُ بِنَاسٍ مِنْ دُونِي، فَأَقُولُ: أُمَّتِي، فَيُقَالُ: لاَ تَدْرِي مَا عَمِلُوا بَعْدَكَ، مَا بَرِحُوا يَرْجِعُونَ عَلَى أَعْقَابِهِمْ»-
[৪. ইবনু আবি মুলাইকাহ থেকে বর্ণিত, হযরত আসমা (রা.) নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: “আমি হাউযের তীরে অবস্থান করে তোমাদের মধ্য থেকে যারা আমার কাছে আসবে তাদের জন্য অপেক্ষা করব। অতঃপর আমার সামনে থেকেই কিছু লোককে পাকড়াও করে দূর করে দেওয়া হবে। তখন আমি বলব: এরা তো আমার উম্মত! তখন বলা হবে: আপনি জানেন না আপনার ইন্তেকালের পর এরা দ্বীনের মধ্যে কী নতুন সৃষ্টি করেছে; এরা তো তাদের পেছনের দিকে ফিরে গিয়েছিল (দ্বীন ত্যাগ বা বিকৃত করেছিল)।”]
(أ) مَا المُرَادُ بِالفِتَنِ؟ بَيِّنْ مُفَصَّلاً-
[(ক) ‘ফিতনা’ দ্বারা কী উদ্দেশ্য? বিস্তারিত বর্ণনা করো।]
১. ফিতনার আভিধানিক অর্থ: ‘ফিতনা’ (الفتنة) শব্দটি আরবি ‘ফাতন’ (فَتْن) থেকে গৃহীত। সোনাকে আগুনে পুড়িয়ে খাঁটি-ভেজাল যাচাই করার প্রক্রিয়াকে মূলত ফিতনা বলা হয়। পরিভাষায় ফিতনা বলতে কঠিন পরীক্ষা, বিপর্যয়, সামাজিক বিভ্রান্তি এবং হক ও বাতিলের চরম গোলযোগকে বোঝায়।
২. হাদিসে বর্ণিত ফিতনার তাৎপর্য:
- দ্বীনের বিকৃতি ও বিদআতের বিস্তার: হাদিসে ফিতনা বলতে বোঝানো হয়েছে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ ও সাহাবায়ে কেরামের আদর্শ বর্জন করে ধর্মের নামে নতুন মনগড়া বিশ্বাস ও কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করা।
- দ্বীনত্যাগী বা মুরতাদদের ফিতনা: রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পরপরই আরবের কিছু গোত্রের যাকাত অস্বীকার করা ও নবুওয়াতের মিথ্যা দাবিদারদের ফিতনা।
- উম্মাহর বিভক্তি ও রক্তপাত: ক্ষমতার লোভে বা বাতিল মতবাদের প্ররোচনায় মুসলমানদের পরস্পরের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ এবং উম্মাহর মধ্যে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি।
(ب) مَا مَعْنَى الحَوْضِ؟ مَنِ الَّذِي يَشْرَبُ مِنَ الحَوْضِ؟ اُذْكُرْ صِفَاتِهِ-
[(খ) হাউয শব্দের অর্থ কী? কারা হাউয থেকে পানি পান করবে? হাউযের গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্যসমূহ উল্লেখ করো।]
১. হাউযের অর্থ ও পরিচয়: ‘হাউয’ (الحوض) শব্দের আভিধানিক অর্থ জলাশয় বা পানির বড় চৌবাচ্চা। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায়, কিয়ামতের কঠিন দিনে মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় হাবীব হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে উম্মতের তৃষ্ণা নিবারণের জন্য হাশরের ময়দানে যে বিশেষ ঐশী জলাশয় দান করবেন, তাকে ‘হাউযুল কাউসার’ (حوض الكوثر) বলা হয়।
২. হাউয থেকে পান করার সৌভাগ্যবান ব্যক্তিগণ:
- উম্মতে মুহাম্মদীর মধ্যে যারা নিখাদ তাওহীদের ওপর অবিচল ছিল এবং বিদআত ও দ্বীনের বিকৃতি থেকে মুক্ত ছিল।
- যাঁরা সুন্নাহর একনিষ্ঠ অনুসারী ছিলেন এবং দুনিয়ার লোভ-লালসার কাছে ঈমান বিসর্জন দেননি।
- রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁদেরকে অজুর উজ্জ্বল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের শুভ্র জ্যোতি (غرًّا محجّلين) দেখে চিনতে পারবেন।
৩. হাউযুল কাউসারের বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী: সহীহ বুখারী ও মুসলিমের প্রামাণ্য হাদিস অনুযায়ী হাউযের বিবরণ নিম্নরূপ:
- দৈর্ঘ্য ও প্রশস্ততা: এর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তের দূরত্ব হবে এক মাসের পথ (مسيرة شهر)। চারকোনা সমদূরত্বের সুবিশাল আয়তন।
- পানির গুণাগুণ: এর পানি দুধের চেয়েও সাদা (أشد بياضًا من اللبن), বরফের চেয়েও শীতল এবং খাঁটি মধুর চেয়েও মিষ্টি (أحلى من العسل)।
- সুগন্ধি: এর পবিত্র সুঘ্রাণ হবে মিশকের সুগন্ধির চেয়েও অধিক আকর্ষণীয় ও সুরভিত (ريحه أطيب من المسك)।
- পানপাত্রের প্রাচুর্য: এর পানপাত্রের সংখ্যা হবে আকাশের নক্ষত্ররাজির মতো অগণিত (كيزانه كنجوم السماء)।
- অফুরন্ত তৃপ্তি: যে ব্যক্তি এই হাউয থেকে একবার পানি পান করার সৌভাগ্য অর্জন করবে, সে জান্নাতে প্রবেশের পূর্ব পর্যন্ত আর কখনোই পিপাসার্ত হবে না (من شرب منه لم يظمأ أبدًا)।
٥- عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ : قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : «لاَ يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ»-
[৫. হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “তোমাদের মধ্যে কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার পিতা, তার সন্তান-সন্ততি এবং সমস্ত মানুষ অপেক্ষা অধিক প্রিয়তর হব।”]
(أ) عَرِّفِ المَحَبَّةَ، وَكَمْ قِسْمًا لَهَا؟ بَيِّنْ مُفَصَّلاً-
[(ক) মহব্বত (ভালোবাসা)-এর পরিচয় দাও। ভালোবাসা কত প্রকার? বিস্তারিত ব্যাখ্যা করো।]
১. মহব্বতের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ:
- আভিধানিক অর্থ: ‘আল-মাহাব্বাহ’ (المحبة) শব্দটি হুব্ব (حبّ) ধাতু থেকে উদ্ভূত। এর অর্থ ভালোবাসা, আকর্ষণ, হৃদয়ের টান এবং পছন্দনীয় বিষয়ের প্রতি অন্তরের গভীর আগ্রহ সৃষ্টি হওয়া।
- পারিভাষিক অর্থ: আত্মার এমন এক তীব্র আধ্যাত্মিক ও মানসিক আকর্ষণ, যা মানুষকে কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিত্বের সন্তুষ্টি অর্জন ও আনুগত্য প্রদর্শনে পরিপূর্ণভাবে আত্মনিয়োগ করতে বাধ্য করে।
২. ভালোবাসার প্রকারভেদ: ওলামায়ে কেরাম ভালোবাসাকে প্রধানত তিন ভাগে বিভক্ত করেছেন:
- প্রাকৃতিক বা সহজাত ভালোবাসা (المحبة الطبعية): যা মানুষের স্বভাবজাত চাহিদার তাগিদে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সৃষ্টি হয়। যেমন— সন্তানের প্রতি পিতার ভালোবাসা, ক্ষুধার্ত ব্যক্তির খাদ্যের প্রতি ভালোবাসা কিংবা তীব্র তৃষ্ণায় শীতল পানির প্রতি ভালোবাসা।
- যৌক্তিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক ভালোবাসা (المحبة العقلية): যেখানে মানুষের প্রবৃত্তি নয়; বরং বিবেক, উপকারিতা ও মহৎ গুণাবলীর ভিত্তিতে ভালোবাসা তৈরি হয়। যেমন— একজন রোগীর তিক্ত ওষুধের প্রতি ভালোবাসা অথবা কোনো মহৎ বিদ্বানের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা বুদ্ধিবৃত্তিক ও বিশ্বাসগত স্তরের সর্বোচ্চ রূপ।
- শ্রদ্ধা ও মর্যাদাপূর্ণ ভালোবাসা (المحبة الإجلالية): কারো মহত্ত্ব, মর্যাদা ও আত্মিক শ্রেষ্ঠত্বের কারণে অন্তরে ভক্তি ও শ্রদ্ধামিশ্রিত যে ভালোবাসার সঞ্চার হয়। যেমন— পিতামাতার প্রতি সন্তানের ভালোবাসা এবং আল্লাহর ওলি ও উস্তাদগণের প্রতি ভালোবাসা।
(ب) اُكْتُبْ مَظَاهِرَ حُبِّ الرَّسُولِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي ضَوْءِ القُرْآنِ وَالسُّنَّةِ-
[(খ) কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ বা নিদর্শনসমূহ লেখো।]
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা নিছক মৌখিক দাবির বিষয় নয়; বরং বাস্তব জীবনে তার সুস্পষ্ট প্রতিফলন থাকা অপরিহার্য:
- ১. নিঃশর্ত আনুগত্য ও অনুসরণ: আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ (বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো তবে আমার অনুসরণ করো, তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন— সূরা আলে ইমরান: ৩১)। সুন্নাহর পূর্ণাঙ্গ অনুসরণই ভালোবাসার প্রথম ও প্রধান মাপকাঠি।
- ২. রাসূলের ফায়সালাকে বিনাবাক্যে মেনে নেওয়া: সূরা আন-নিসার ৬৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ (অতএব আপনার রবের কসম, তারা কখনোই মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ না তাদের পারস্পরিক বিরোধে আপনাকে বিচারক হিসেবে মেনে নেয় এবং আপনার দেওয়া সিদ্ধান্তে অন্তরে কোনো দ্বিধাবোধ না রেখে তা সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করে)।
- ৩. বেশি বেশি দরূদ ও সালাম প্রেরণ: রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসার অন্যতম বহিঃপ্রকাশ হলো তাঁর ওপর বেশি বেশি দরূদ পড়া। আল্লাহ বলেন: إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ ۚ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا (সূরা আল-আহযাব: ৫৬)।
- ৪. দ্বীনের প্রচার ও প্রতিরক্ষায় আত্মত্যাগ: রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মর্যাদা রক্ষায় এবং তাঁর আনীত শরিয়ত প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিজের জীবন, ধন-সম্পদ ও পরিবার-পরিজনের মায়াকে তুচ্ছ জ্ঞান করে নিবেদিত হওয়া। সাহাবায়ে কেরাম উহুদ ও হুনাইনের প্রান্তরে নিজেদের বুক দিয়ে তীরের আঘাত ঠেকিয়ে রাসূল (সা.)-কে রক্ষা করেছিলেন।
- ৫. আহলে বাইত ও সাহাবায়ে কেরামকে ভালোবাসা: নবীজী (সা.) যাঁদের ভালোবেসেছেন, যেমন তাঁর পরিবারবর্গ (আহলে বাইত) এবং তাঁর অনুগত সঙ্গী সাহাবায়ে কেরামকে অন্তর দিয়ে ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শন করা।
٦- اُكْتُبْ تَارِيخَ جَمْعِ الحَدِيثِ وَحِفْظِهِ وَتَدْوِينِهِ مُوجَزًا-
[৬. হাদিস সংরক্ষণ, সংকলন ও গ্রন্থায়নের ধারাবাহিক ইতিহাস সংক্ষেপে লিপিবদ্ধ করো।]
ভূমিকা: হাদিস হলো কুরআনুল কারীমের প্রথম ও প্রামাণ্য তাফসীর এবং ইসলামি শরিয়তের দ্বিতীয় অপরিহার্য উৎস। ইসলামের সূচনা লগ্ন থেকে শুরু করে বিভিন্ন যুগে পরম সতর্কতা ও ঐশী নিরাপত্তার মাধ্যমে হাদিস সংরক্ষিত ও গ্রন্থিত হয়েছে।
১. নবুওয়াত ও রিসালাতের যুগ (عصر النبوة):
- রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে হাদিস সংরক্ষণের প্রধান মাধ্যম ছিল সাহাবায়ে কেরামের অসাধারণ স্মরণশক্তি ও বাস্তব আমল।
- শুরুতে কুরআনের সাথে মিশ্রিত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় হাদিস লেখায় সাময়িক নিষেধাজ্ঞা থাকলেও পরবর্তীতে সাহাবিদের মুখস্থ ও লিখিত উভয় প্রকারের অনুমতি দেওয়া হয়। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস (রা.) রাসূল (সা.)-এর অনুমতিক্রমে ‘আস-সহীফাতুস সাদীকা’ (الصحيفة الصادقة) নামক হাদিসের পাণ্ডুলিপি লিখেছিলেন। এছাড়া হযরত আনাস, আলী ও আবু হুরায়রা (রা.)-এর নিকটও লিখিত নুসখা বিদ্যমান ছিল।
২. খুলাফায়ে রাশেদীন ও সাহাবাদের যুগ (عصر الخلفاء الراشدين):
- এ যুগে সাহাবায়ে কেরাম হাদিস বর্ণনায় চরম সতর্কতা অবলম্বন করতেন। কোনো হাদিস গ্রহণে তাঁরা সাক্ষী তলব করতেন বা শপথ নিতেন।
- সাহাবিগণ দ্বীনের দাওয়াত ও হাদিসের শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে কুফা, বসরা, সিরিয়া, মিশর প্রভৃতি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েন এবং সুবিশাল হাদিস পাঠশালা গড়ে তোলেন।
৩. তাবেয়ী ও প্রথম সরকারি সংকলনের যুগ (হিজরি প্রথম শতক):
- উমাইয়া খলিফা হযরত উমর ইবনু আব্দুল আযীয (রহ.) (ওফাত: ১০১ হি.) হাদিসের বিলুপ্তি ও বিশেষজ্ঞদের মৃত্যুর আশঙ্কায় সরকারিভাবে হাদিস সংকলনের ঐতিহাসিক ফরমান জারি করেন।
- তিনি মদিনার গভর্নর আবু বকর ইবনু হাযম এবং প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম মুহাম্মদ ইবনু মুসলিম ইবনে শিহাব আয-যুহরী (রহ.)-কে হাদিস সংগ্রহের নির্দেশ দেন। ইমাম যুহরী (রহ.)-কে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক হাদিস সংকলক গণ্য করা হয়।
৪. বিষয়ভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাসের যুগ (হিজরি দ্বিতীয় শতক):
- এ যুগে ফিকহি অধ্যায় অনুযায়ী হাদিস শ্রেণিবদ্ধ করে কিতাব রচনার ধারা শুরু হয়।
- এ যুগের বিখ্যাত গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে: ইমাম মালিক ইবনু আনাস (রহ.)-এর ‘মুয়াত্তা ইমাম মালিক’ (موطأ الإمام مالك), সুফিয়ান সাওরী, ইবনুল মুবারক ও ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর রচনাবলী।
৫. হাদিস সংকলনের স্বর্ণযুগ (হিজরি তৃতীয় শতক):
- হিজরি তৃতীয় শতককে হাদিস শাস্ত্রের সোনালী যুগ বলা হয়। এ যুগে হাদিস থেকে সহীহ ও যয়ীফকে সূক্ষ্মভাবে পৃথক করা হয় এবং কুতুবুস সিত্তাহ (সিহাহ সিত্তা) সংকলিত হয়।
- ইমাম বুখারী (সহীহ বুখারী), ইমাম মুসলিম (সহীহ মুসলিম), ইমাম আবু দাউদ (সুনান আবু দাউদ), ইমাম তিরমিযী (জামে তিরমিযী), ইমাম নাসাঈ (সুনান নাসাঈ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (সুনান ইবনে মাজাহ) এই যুগে তাঁদের জগদ্বিখ্যাত কিতাবসমূহ রচনা করেন।
٧- عَرِّفِ الحَدِيثَ المُتَوَاتِرَ، وَكَمْ قِسْمًا لَهُ؟ بَيِّنْ حُكْمَهُ بِالتَّفْصِيلِ-
[৭. মুতাওয়াতির হাদিসের পরিচয় দাও। এটি কত প্রকার? এর বিধান বিস্তারিত বর্ণনা করো।]
১. মুতাওয়াতির হাদিসের সংজ্ঞা:
- আভিধানিক অর্থ: ‘মুতাওয়াতির’ (المتواتر) শব্দটি তাওয়াতুর (تواتر) ধাতু থেকে নির্গত ইসমে ফায়েল। এর অর্থ হলো একের পর এক বিরতিহীনভাবে ধারাবাহিকভাবে আসা। যেমন আল্লাহ বলেন: ثُمَّ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا تَتْرَىٰ (অতঃপর আমি আমার রাসূলদের একের পর এক প্রেরণ করেছি— সূরা আল-মুমিনূন: ৪৪)।
- পারিভাষিক অর্থ: উসূলে হাদিসের পরিভাষায়, যে হাদিস সনদের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি যুগে এত বিপুল সংখ্যক বর্ণনাকারী বর্ণনা করেছেন, যাদের সংখ্যাগত প্রাচুর্য ও স্থানিক দূরত্বের কারণে মিথ্যা বা বিভ্রান্তির ওপর একমত হওয়া মানবীয় অভ্যাসের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ অসম্ভব— তাকে মুতাওয়াতির হাদিস বলা হয়।
২. মুতাওয়াতির হওয়ার আবশ্যকীয় শর্তাবলী:
- সনদের প্রতিটি স্তরে বর্ণনাকারীর সংখ্যা বিপুল হতে হবে (ন্যূনতম দশজন বা ততোধিক)।
- তাঁরা সকলে মিথ্যা রচনার উদ্দেশ্যে ঐক্যবদ্ধ হওয়া বুদ্ধি ও স্বাভাবিক অভ্যাসের দিক থেকে অসম্ভব হতে হবে।
- হাদিসটি পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার (যেমন: سمعنا বা رأينا) সাথে সংশ্লিষ্ট হতে হবে, কোনো দার্শনিক কল্পনা বা অন্ধ অনুমানের ভিত্তিতে নয়।
৩. মুতাওয়াতির হাদিসের প্রকারভেদ: মুতাওয়াতির হাদিস দুই প্রকার:
- মুতাওয়াতিরে লাফযী (المتواتر اللفظي): যে হাদিসের মূল শব্দমালা ও ভাব উভয়ই অভিন্ন শব্দে বিপুল সংখ্যক সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। যেমন বিখ্যাত হাদিস: مَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّدًا فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ (যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার ওপর মিথ্যারোপ করে, সে যেন জাহান্নামে নিজের ঠিকানা বানিয়ে নেয়)। এটি ষাটের অধিক সাহাবি হুবহু একই শব্দে বর্ণনা করেছেন।
- মুতাওয়াতিরে মা’নাবী (المتواتر المعنوي): যে হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনার শব্দমালা ভিন্ন হলেও এর মূল অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ও বিষয়বস্তু সকল সূত্রে অভিন্ন ও অকাট্যভাবে প্রমাণিত। যেমন— দোয়ায় দুই হাত তোলার হাদিস, যা প্রায় একশত ভিন্ন ভিন্ন ঘটনায় বর্ণিত হয়েছে।
৪. মুতাওয়াতির হাদিসের শরিয়তসম্মত হুকুম ও প্রামাণিকতা:
- মুতাওয়াতির হাদিস ‘ইলমে ক্বাতঈ বা ইয়াক্বীনী যরূরী’ (العلم القطعي الضروري) তথা অকাট্য নিশ্চিত জ্ঞান দান করে। অর্থাৎ চোখ দিয়ে কোনো বস্তু স্বচক্ষে দেখলে যেমন বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ থাকে না, মুতাওয়াতির হাদিসের মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞানও তদ্রূপ সন্দেহাতীত।
- এ কারণে মুতাওয়াতির হাদিসের বর্ণনাকারীদের ব্যক্তিগত নির্ভরযোগ্যতা বা জীবনী (জারহ ও তা’দীল) যাচাই করার কোনো প্রয়োজন পড়ে না; সনদেই এর অকাট্য সত্যতা প্রতিষ্ঠিত।
- মুতাওয়াতির হাদিসের মাধ্যমে প্রমাণিত কোনো অকাট্য আক্বিদা বা অকাট্য বিধানকে জেনেশুনে অস্বীকারকারী ব্যক্তি কাফির বলে গণ্য হবে।
٨- كَمْ قِسْمًا لِلْحَدِيثِ بِاعْتِبَارِ وُصُولِهِ إِلَيْنَا؟ بَيِّنْ مُفَصَّلاً وَمُمَثَّلاً-
[৮. আমাদের নিকট হাদিস পৌঁছার বা সনদের সূত্রের বিচারে হাদিস কত প্রকার? উদাহরণসহ বিস্তারিত বর্ণনা করো।]
ভূমিকা: আমাদের কাছে হাদিসের আগমন ও সনদের বর্ণনাকারীদের সংখ্যাধিক্যের বিচারে আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) তাঁর ‘নুখবাতুল ফিকার’ কিতাবে হাদিসকে প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত করেছেন: মুতাওয়াতির (المتواتر) এবং খবরে ওয়াহিদ বা আহাদ (خبر الآحاد)।
১. আল-মুতাওয়াতির (الحديث المتواتر):
যে হাদিস প্রতিটি যুগে বিপুল সংখ্যক বিশ্বস্ত রাবী বর্ণনা করেছেন, যাদের মিথ্যার ওপর একমত হওয়া অসম্ভব। এটি পূর্বের প্রশ্নে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হয়েছে। উদাহরণ: من كذب علي متعمدا… হাদিসটি।
২. খবরে ওয়াহিদ বা আহাদ (خبر الآحاد):
যে হাদিসের সনদে মুতাওয়াতিরের শর্তাবলী পূর্ণ হয়নি, তাকে খবরে ওয়াহিদ বলা হয়। অর্থাৎ বর্ণনাকারীর সংখ্যা মুতাওয়াতিরের নির্দিষ্ট সীমায় পৌঁছায়নি। বর্ণনাকারীর সংখ্যার তারতম্য অনুযায়ী খবরে ওয়াহিদ তিন প্রকার:
- ক. হাদিসে মাশহুর (الحديث المشهور): যে হাদিসের সনদের প্রতিটি স্তরে বা যেকোনো স্তরে বর্ণনাকারীর সংখ্যা তিন বা ততোধিক ছিল, তবে তা মুতাওয়াতিরের সীমায় পৌঁছেনি।
উদাহরণ: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী: المُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ المُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ (প্রকৃত মুসলমান সেই ব্যক্তি যার জিহ্বা ও হাতের অনিষ্ট থেকে অন্যান্য মুসলমান নিরাপদ থাকে)। - খ. হাদিসে আযীয (الحديث العزيز): যে হাদিসের সনদের যেকোনো এক বা একাধিক স্তরে বর্ণনাকারীর সংখ্যা কোনোক্রমেই দুইজনের কম ছিল না (ন্যূনতম দুইজন রাবী বিদ্যমান)।
উদাহরণ: হযরত আনাস ও আবু হুরায়রা (রা.) সূত্রে বর্ণিত হাদিস: لاَ يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ। এই হাদিসটি আনাস (রা.) থেকে কাতাদাহ ও আব্দুল আযীয ইবনু সুহাইব— এই দুইজন বর্ণনা করেছেন এবং তাঁদের থেকে আবার দুইজন করে বর্ণনা করেছেন। - গ. হাদিসে গরীব (الحديث الغريب): যে হাদিসের সনদের যেকোনো স্তরে একক কোনো বর্ণনাকারী হাদিসটি বর্ণনা করেছেন (তথা রাবীর সংখ্যা একজন)।
উদাহরণ: বিখ্যাত নিয়তের হাদিস: إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ। এই হাদিসটি রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে কেবল হযরত উমর (রা.), তাঁর থেকে আলক্বামাহ, তাঁর থেকে মুহাম্মদ ইবনু ইবরাহীম আত-তায়মী এবং তাঁর থেকে ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদ আল-আনসারী এককভাবে বর্ণনা করেছেন। পরবর্তীতে ইয়াহইয়া থেকে বহু সূত্রে এটি ছড়িয়ে পড়ে।
مجموعة (ب) / খ-বিভাগ (الدرجة— ٤ × ٥ = ٢٠)
(أجب عن أربعة من الأسئلة الآتية)
٩- هَلِ الإِيمَانُ يَزِيدُ وَيَنْقُصُ؟ بَيِّنْ مُدَلَّلاً-
[৯. ঈমান কি বৃদ্ধি পায় এবং হ্রাস পায়? দলিলের আলোকে ব্যাখ্যা করো।]
আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অভিমত: জমহুর মুহাদ্দিসীন, ইমাম মালিক, ইমাম শাফেয়ী, ইমাম আহমদ ইবনু হাম্বল এবং আল্লামা বুখারী (রহ.)-এর মতে ঈমান নেক আমলের মাধ্যমে বৃদ্ধি পায় এবং গুনাহ ও পাপাচারের মাধ্যমে হ্রাস পায় (الإيمان يزيد بالطاعة وينقص بالمعصية)।
১. কুরআন মাজীদের সুস্পষ্ট দলিল:
- আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا (প্রকৃত মুমিন তো তারাই যাদের সামনে আল্লাহর নাম স্মরণ করা হলে তাদের অন্তর কেঁপে ওঠে এবং যখন তাদের সামনে তাঁর আয়াত তেলাওয়াত করা হয় তখন তা তাদের ঈমান বাড়িয়ে দেয়— সূরা আল-আনফাল: ২)।
- অন্য আয়াতে বলা হয়েছে: لِيَزْدَادُوا إِيمَانًا مَّعَ إِيمَانِهِمْ (যাতে তারা তাদের ঈমানের সাথে আরও ঈমান বৃদ্ধি করে নেয়— সূরা আল-ফাতহ: ৪)।
২. সুন্নাহর দলিল:
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীদের উদ্দেশ্য করে এক হাদিসে ইরশাদ করেন: مَا رَأَيْتُ مِنْ نَاقِصَاتِ عَقْلٍ وَدِينٍ (আমি তোমাদের চেয়ে বুদ্ধি ও দ্বীনের ক্ষেত্রে অপূর্ণ আর কাউকে দেখিনি)। এখানে দ্বীন বা ঈমানের হ্রাসের সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে।
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর দৃষ্টিভঙ্গি: ইমাম আযম আবু হানীফা (রহ.) বলেন, ঈমানের মূল বিশ্বাস বা তাসদীকের দিক থেকে কোনো কম-বেশি হয় না (কারণ বিশ্বাসে কম-বেশি হলে সন্দেহ জন্ম নেয়); তবে ঈমানের নূর, দৃঢ়তা এবং আমলের দিক থেকে তারতম্য ও হ্রাস-বৃদ্ধি অনস্বীকার্য।
١٠- عَرِّفِ الحَدِيثَ القُدْسِيَّ، ثُمَّ بَيِّنِ الفَرْقَ بَيْنَهُ وَبَيْنَ القُرْآنِ الكَرِيمِ-
[১০. হাদিসে কুদসীর সংজ্ঞা দাও। অতঃপর হাদিসে কুদসী ও কুরআন মাজীদের মধ্যকার পার্থক্য সুস্পষ্ট করো।]
১. হাদিসে কুদসীর পরিচয়: ‘কুদসী’ (قدسي) শব্দের অর্থ পবিত্র। পরিভাষায় যে হাদিসের মূল বক্তব্য বা ভাব মহান আল্লাহ তাআলা ওহী, ইলহাম বা স্বপ্নের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হৃদয়ে অবতীর্ণ করেছেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) স্বীয় জবানে তা আল্লাহর বরাতে বর্ণনা করেছেন (যেমন: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم فيما يرويه عن ربه), তাকে হাদিসে কুদসী বলা হয়।
২. কুরআনুল কারীম ও হাদিসে কুদসীর মধ্যকার পার্থক্য:
- শব্দ ও ভাবের উৎস: কুরআন মাজীদের শব্দ ও অর্থ উভয়ই সরাসরি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ এবং তা মুজিযা। পক্ষান্তরে হাদিসে কুদসীর অর্থ ও ভাব আল্লাহর পক্ষ থেকে হলেও শব্দ ও বাক্যশৈলী রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিজস্ব।
- সালাতে তেলাওয়াত: সালাতের মধ্যে কেবল কুরআন তেলাওয়াত করা ফরজ ও বাধ্যতামূলক; হাদিসে কুদসী পাঠ করলে সালাত আদায় হবে না।
- স্পর্শের হুকুম: অজু বা পবিত্রতা ব্যতীত কুরআন স্পর্শ করা জায়েয নেই; কিন্তু হাদিসে কুদসীর কিতাব অজু ছাড়াও ধরা যায়।
- বর্ণনার অকাট্যতা: কুরআন মাজীদের প্রতিটি শব্দ ও আয়াত অকাট্য মুতাওয়াতির সনদে সংরক্ষিত; পক্ষান্তরে হাদিসে কুদসীর মধ্যে সহীহ, হাসান এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে যয়ীফ হাদিসও বিদ্যমান থাকে।
- চ্যালেঞ্জ ও মুজিযা: কুরআন মাজীদ মানবজাতিকে একটি সূরার মতো রচনার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে; কিন্তু হাদিসে কুদসীর ক্ষেত্রে এমন কোনো চ্যালেঞ্জ প্রদান করা হয়নি।
١١- مَا الفَرْقُ بَيْنَ الحَدِيثِ المَشْهُورِ وَالمُسْتَفِيضِ؟ بَيِّنْ مُفَصَّلاً-
[১১. হাদিসে মাশহুর ও মুস্তাফীযের মধ্যকার পার্থক্য বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করো।]
১. হাদিসে মাশহুর (الحديث المشهور): যে হাদিসের সনদের প্রতিটি স্তরে কমপক্ষে তিনজন বা ততোধিক বর্ণনাকারী বিদ্যমান থাকে, কিন্তু তা মুতাওয়াতিরের সীমায় পৌঁছায় না। এছাড়া জনসাধারণের মাঝে ব্যাপকভাবে প্রচলিত হাদিসকেও লোকমুখে ‘মাশহুর’ বলা হয়, যদিও তার কোনো বিশুদ্ধ সনদ না থাকে।
২. হাদিসে মুস্তাফীয (الحديث المستفيض): ‘ইসতিফাদ্বাহ’ (استفاضة) থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ ছড়িয়ে পড়া বা প্লাবিত হওয়া। পরিভাষায় যে হাদিসের সনদের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে সমসংখ্যক বর্ণনাকারী (কমপক্ষে তিনজন) বিদ্যমান থাকে।
৩. মাশহুর ও মুস্তাফীযের মধ্যকার মৌলিক পার্থক্য:
- সমতার শর্ত: মুস্তাফীয হওয়ার জন্য সনদের উভয় প্রান্ত তথা প্রথম ও শেষ স্তরে বর্ণনাকারীর সংখ্যা সমান থাকা আবশ্যক। পক্ষান্তরে মাশহুরের ক্ষেত্রে বর্ণনাকারীর সংখ্যা সমান থাকা শর্ত নয়; শুরুতে একজন থাকলেও পরবর্তীতে তা ছড়িয়ে পড়লে তা মাশহুর হতে পারে।
- আম ও খাছ সম্পর্ক: হাদিস শাস্ত্রবিদগণের মতে, মাশহুর হলো ব্যাপক (عام) এবং মুস্তাফীয হলো বিশেষ (خاص)। অর্থাৎ প্রত্যেক মুস্তাফীয হাদিসই মাশহুর, কিন্তু প্রত্যেক মাশহুর হাদিস মুস্তাফীয নয়।
- লোকপ্রসিদ্ধি: মাশহুর কখনো কখনো মুহাদ্দিসদের পরিভাষা ছাড়াও সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচলিত উক্তি বা বাণীকেও বোঝায়; কিন্তু মুস্তাফীয সর্বদাই সনদের সুনির্দিষ্ট শর্তযুক্ত পরিভাষা।
١٢- هَلِ السُّنَّةُ حُجَّةٌ أَمْ لاَ؟ وَمَنْ هُمْ مُنْكِرُو الحَدِيثِ؟ بَيِّنْ-
[১২. সুন্নাহ কি শরিয়তের হুজ্জত (প্রমাণ)? হাদিস অস্বীকারকারী কারা? ব্যাখ্যা করো।]
১. সুন্নাহর প্রামাণিকতা (حجية السنة): সুন্নাহ বা হাদিস ইসলামি শরিয়তের দ্বিতীয় অকাট্য ও অলঙ্ঘনীয় দলিল। সুন্নাহ ব্যতীত কুরআন মাজীদের কোনো বিধানই বাস্তব জীবনে পালন করা সম্ভব নয় (যেমন সালাতের রাকাত সংখ্যা, রুকু-সিজদার তাসবীহ, যাকাতের নেসাব ও হজ্জের নিয়মাবলী কেবল সুন্নাহর মাধ্যমেই জানা যায়)।
- কুরআনের ঘোষণা: وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا (রাসূল তোমাদের যা দেন তা গ্রহণ করো এবং যা থেকে নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাকো— সূরা আল-হাশর: ৭)।
- রাসূলের সতর্কতা: রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: أَلاَ إِنِّي أُوتِيتُ الْقُرْآنَ وَمِثْلَهُ مَعَهُ (জেনে রেখো! আমাকে কুরআনের সাথে তার অনুরূপ জ্ঞান তথা সুন্নাহও দান করা হয়েছে— সুনান আবু দাউদ)।
২. হাদিস অস্বীকারকারী বা মুনকিরীনে হাদিস:
- যারা নিজেদের প্রতারণামূলকভাবে ‘আহলুল কুরআন’ দাবি করে হাদিস ও সুন্নাহর প্রামাণিকতাকে অস্বীকার করে এবং বলে যে দ্বীনের জন্য কেবল কুরআনই যথেষ্ট, তাদেরকে মুনকিরীনে হাদিস বা ফেতনায় ইনকারে হাদিসের অনুসারী বলা হয়।
- ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে ভারতীয় উপমহাদেশে এই ফেতনার উদ্ভব হয়। মৌলভী আব্দুল্লাহ চকড়ালভী, আহমদ উদ্দীন অমৃতসরী এবং পরবর্তীতে গোলাম আহমদ পারভেজ এই ভ্রান্ত মতবাদ প্রচার করে।
- ইসলামি বিধান: জমহুর উম্মাহর সর্বসম্মত ফতোয়া অনুযায়ী, ইচ্ছাকৃতভাবে সুন্নাহর অস্তিত্ব ও প্রামাণিকতাকে সার্বিকভাবে অস্বীকারকারী ব্যক্তি সুস্পষ্ট কাফির এবং ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত।
١٣- مَا مَعْنَى الشَّمَائِلِ؟ اُذْكُرْ بَعْضَ شَمَائِلِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ-
[১৩. শামায়েল শব্দের অর্থ কী? নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কতিপয় শামায়েল বা চারিত্রিক সৌন্দর্য উল্লেখ করো।]
১. শামায়েলের অর্থ: ‘শামায়েল’ (الشمائل) শব্দটি ‘শিমাল’ (شِمال) শব্দের বহুবচন। এর আভিধানিক অর্থ স্বভাব, চরিত্র, গুণাবলী ও চালচলন। পরিভাষায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শারীরিক গঠন, বেশভূষা, চালচলন, রুচিবোধ এবং দৈনন্দিন জীবনের অনুপম চরিত্র ও আচার-আচরণকে ‘শামায়েলে নববী’ (الشمائل النبوية) বলা হয়। এ বিষয়ে ইমাম তিরমিযী (রহ.)-এর ‘শামায়েলে তিরমিযী’ বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ।
২. রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কতিপয় শামায়েল:
- উদার ক্ষমা ও সহনশীলতা: তিনি কখনো ব্যক্তিগত অপমানের প্রতিশোধ নেননি। মক্কা বিজয়ের দিনে পরম শত্রু কুরাইশদেরকে তিনি নিঃশর্ত ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন।
- সদা হাস্যোজ্জ্বল মুখমণ্ডল: সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনুল হারিস (রা.) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চেয়ে বেশি মুচকি হাসিমুখ আর কাউকেই দেখিনি।
- দানশীলতা ও মহানুভবতা: তিনি ছিলেন বাতাসের চেয়েও অধিক দানশীল। কোনো অভাবী ব্যক্তি তাঁর কাছে কিছু চাইলে তিনি কখনো ‘না’ বলতেন না।
- বিনয় ও সাদাসিধে জীবনযাপন: তিনি খেজুর পাতার চাটাইয়ে শয়ন করতেন, নিজের জুতো নিজে সেলাই করতেন এবং ক্রীতদাস ও সাধারণ মানুষের সাথে বসে খাবার খেতেন।
١٤- مَا الحَدِيثُ المُنْقَطِعُ؟ بَيِّنْ حُكْمَهُ بِالاخْتِصَارِ-
[১৪. হাদিসে মুনক্বাতি’ কাকে বলে? সংক্ষেপে এর বিধান বর্ণনা করো।]
১. হাদিসে মুনক্বাতি’র সংজ্ঞা:
- আভিধানিক অর্থ: ‘মুনক্বাতি’ (المنقطع) শব্দটি ইনক্বিত্বা’ (انقطاع) থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ ছিন্ন, কর্তিত বা বিচ্ছিন্ন।
- পারিভাষিক অর্থ: উসূলে হাদিসের পরিভাষায়, যে হাদিসের সনদের মধ্যবর্তী যেকোনো স্থান থেকে ধারাবাহিকতা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় অর্থাৎ কোনো একজন বর্ণনাকারী বাদ পড়ে যায়, তাকে হাদিসে মুনক্বাতি’ বলা হয়। (তবে সাহাবির স্তর থেকে বাদ পড়লে তাকে মুরসাল এবং শুরুর দিক থেকে বাদ পড়লে মু’আল্লাক্ব বলা হয়)।
২. হাদিসে মুনক্বাতি’র হুকুম:
- হাদিসে মুনক্বাতি’ সর্বসম্মতিক্রমে যয়ীফ বা দুর্বল হাদিসের অন্তর্ভুক্ত (المنقطع ضعيف مردود)।
- কারণ সনদের যে বর্ণনাকারী বাদ পড়েছেন তাঁর নাম-পরিচয় অজ্ঞাত (মাজহুল)। আর অজ্ঞাত ব্যক্তি বিশ্বস্ত (সিক্বাহ) ছিলেন কি না তা যাচাই করা অসম্ভব হওয়ায় হাদিসটি প্রামাণিক হিসেবে গৃহীত হয় না।
١٥- هَلْ تَجُوزُ صَلاَةُ الجَنَازَةِ عَلَى الغَائِبِ؟ وَمَا الاخْتِلاَفُ فِيهِ؟ فَصِّلْ-
[১৫. গায়েবানা জানাযা কি জায়েয? এ বিষয়ে ইমামগণের মতপার্থক্য বিস্তারিত লেখো।]
ভূমিকা: মৃতদেহ সামনে উপস্থিত না রেখে দূরবর্তী কোনো স্থানে তার মাগফিরাতের উদ্দেশ্যে জানাযার সালাত আদায় করাকে ‘সালাতুল জানাযা আলাল গায়েব’ বা গায়েবানা জানাযা বলা হয়। হাবশার বাদশাহ নাজ্জাশীর মৃত্যুর পর রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনায় তাঁর জানাযা আদায় করেছিলেন।
ইমামগণের মতপার্থক্য: এ বিষয়ে মুজতাহিদ ইমামগণের মধ্যে তিনটি প্রধান মত রয়েছে:
- ইমাম শাফেয়ী ও আহমদ ইবনু হাম্বল (রহ.)-এর মত: গায়েবানা জানাযা সর্বাবস্থায় জায়েয। তাঁদের দলিল হলো নবী কারীম (সা.) সাহাবিদের নিয়ে মদিনার মুসল্লায় বাদশাহ নাজ্জাশীর গায়েবানা জানাযা আদায় করেছিলেন।
- ইমাম আবু হানীফা ও মালিক (রহ.)-এর মত: সাধারণ মৃত ব্যক্তির ওপর গায়েবানা জানাযা আদায় করা জায়েয নেই; জানাযার জন্য মৃতদেহ ইমাম ও মুসল্লিদের সামনে উপস্থিত থাকা আবশ্যক। তাঁদের যুক্তি হলো— বাদশাহ নাজ্জাশীর ঘটনাটি ছিল রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জন্য একটি খাস মুজিযা। ওহীর মাধ্যমে মদিনা থেকে হাবশা পর্যন্ত মধ্যবর্তী পর্দা উঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং লাশ সরাসরি রাসূল (সা.)-এর দৃষ্টির সামনে রাখা হয়েছিল। এছাড়া খোলাফায়ে রাশেদীনের আমলে বহু সাহাবি দূরদেশে শহীদ হয়েছেন, কিন্তু তাঁদের কারো গায়েবানা জানাযা পড়া হয়নি।
- আল্লামা ইবনে তাইমিয়া ও ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.)-এর সমন্বিত মত: যদি কোনো মৃত মুসলমান এমন স্থানে মৃত্যুবরণ করে যেখানে তার জানাযার সালাত আদায় করার মতো কোনো মুসলিম ছিল না (যেমন বাদশাহ নাজ্জাশী খ্রিস্টান অধ্যুষিত হাবশায় ছিলেন), তবে তার জন্য গায়েবানা জানাযা আদায় করা সুন্নাত। কিন্তু যার ওপর জানাযা পড়া হয়েছে, তার ওপর পুনরায় গায়েবানা জানাযা পড়ার প্রয়োজন নেই।
١٦- اُكْتُبْ أَسْمَاءَ الكُتُبِ السِّتَّةِ مَعَ ذِكْرِ مُصَنِّفِيهَا-
[১৬. কুতুবুস সিত্তাহ (সিহাহ সিত্তা)-এর নাম এবং তাঁদের সংকলকদের পূর্ণ নাম লিপিবদ্ধ করো।]
| ক্রম | গ্রন্থের নাম (কিতাব) | সংকলক (ইমাম)-এর পূর্ণ নাম | ওফাত সন |
|---|---|---|---|
| ১ | সহীহুল বুখারী (صحيح البخاري) (আল-জামে আল-মুসনাদ আস-সহীহ) |
ইমাম আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনু ইসমাইল আল-বুখারী (রহ.) | ২৫৬ হিজরি |
| ২ | সহীহ মুসলিম (صحيح مسلم) (আল-মুসনাদ আস-সহীহ) |
ইমাম আবুল হুসাইন মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ আল-কুশাইরী আন-নিশাপুরী (রহ.) | ২৬১ হিজরি |
| ৩ | জামে আত-তিরমিযী (جامع الترمذي) (সুনানুত তিরমিযী) |
ইমাম আবু ঈসা মুহাম্মদ ইবনু ঈসা আত-তিরমিযী (রহ.) | ২৭৯ হিজরি |
| ৪ | সুনান আবি দাউদ (سنن أبي داود) | ইমাম আবু দাউদ সুলাইমান ইবনুল আশ’আছ আস-সিজিস্তানী (রহ.) | ২৭৫ হিজরি |
| ৫ | সুনান আন-নাসাঈ (سنن النسائي) (আল-মুজতাবা) |
ইমাম আবু আব্দুর রহমান আহমদ ইবনু শুআইব আন-নাসাঈ (রহ.) | ৩০৩ হিজরি |
| ৬ | সুনান ইবনে মাজাহ (سنن ابن ماجه) | ইমাম আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনু ইয়াযীদ ইবনে মাজাহ আল-ক্বাযভীনি (রহ.) | ২৭৩ হিজরি |
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. ফাজিল অনার্স ২য় বর্ষের নুসূস মিনাল হাদিস বিষয়ের প্রশ্ন কাঠামো কেমন?
নুসূস মিনাল হাদিস (কোড: ২০৪২০১) বিষয়ের পূর্ণমান ৮০ নম্বর এবং সময় ৪ ঘণ্টা। প্রশ্নপত্রটিতে দুটি বিভাগ থাকে: ক-বিভাগ থেকে ৪টি রচনামূলক প্রশ্নের জন্য ৬০ নম্বর এবং খ-বিভাগ থেকে ৪টি সংক্ষিপ্ত প্রশ্নের জন্য ২০ নম্বর বরাদ্দ থাকে।
২. ক-বিভাগের হাদিস ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে পূর্ণ নম্বর পাওয়ার কৌশল কী?
হাদিস ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে হাদিসের প্রাসঙ্গিক পটভূমি (শানে ওরূদ), শব্দের ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ (তাহলীল) এবং হাদিসের ফিকহি শিক্ষা ও মাসআলা প্রামাণ্য দলিলের সাথে উপস্থাপন করলে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়া যায়।
৩. হাদিস তাহাম্মুল ও আদা এর মূল পার্থক্য কী?
উস্তাদের কাছ থেকে যথাযথ নিয়ম মেনে হাদিস গ্রহণ ও সংরক্ষণ করাকে তাহাম্মুল (تحمل) বলা হয়; আর সেই গৃহীত হাদিস পরবর্তী শিক্ষার্থীদের কাছে বিশ্বস্ততার সাথে পৌঁছে দেওয়া বা বর্ণনা করাকে আদা (أداء) বলা হয়।
৪. সিহাহ সিত্তার কোন কোন কিতাবকে সহীহাইনের মর্যাদা দেওয়া হয়?
ইমাম বুখারী (রহ.) সংকলিত ‘সহীহুল বুখারী’ এবং ইমাম মুসলিম (রহ.) সংকলিত ‘সহীহ মুসলিম’—এই দুটি গ্রন্থকে যৌথভাবে ‘সহীহাঈন’ বলা হয়, যা কুরআনের পর সর্বাধিক বিশুদ্ধ কিতাব।
৫. সুন্নাহ অস্বীকারকারীদের ব্যাপারে ইসলামি শরিয়তের সিদ্ধান্ত কী?
সুন্নাহ ও হাদিস ইসলামি শরিয়তের দ্বিতীয় মূল উৎস। জমহুর উম্মাহর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সুন্নাহর প্রামাণিকতাকে সামগ্রিকভাবে অস্বীকারকারী ব্যক্তি দ্বীনের গণ্ডি থেকে বহিষ্কৃত বলে গণ্য হয়।
৬. খ-বিভাগের প্রশ্নোত্তরে কোন বিষয়ের ওপর বেশি জোর দিতে হবে?
খ-বিভাগে প্রতিটি প্রশ্নের মান ৫ নম্বর। তাই অপ্রয়োজনীয় দীর্ঘ ভূমিকা পরিহার করে মূল সংজ্ঞা, প্রকারভেদ এবং বিশুদ্ধ আরবি পরিভাষা ও উদাহরণ স্পষ্টভাবে তুলে ধরা শ্রেয়।