পরীক্ষা কোড: ২০২ | প্রশ্নপত্র কোড: ০৬১
اختبار السنة الثانية للفاضل البكالوريوس (الشرف)، لعام ٢٠٢٣
[ফাজিল স্নাতক (সম্মান) দ্বিতীয় বর্ষ পরীক্ষা, ২০২৩]
اللغة العربية وآدابها
[আরবি ভাষা ও সাহিত্য]
تاريخ الأدب العربي-١ (من العهد الجاهلي إلى العهد الأموي)
[আরবি সাহিত্যের ইতিহাস-১ (জাহিলী যুগ থেকে উমাইয়া যুগ পর্যন্ত)]
বিষয় কোড: ২০৪২০৫
الزمن: ٤ ساعات | الدرجات الكاملة: ٨٠
[সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০]
الملاحظة: أجب عن ستة من مجموعة (أ) وعن أربعة من مجموعة (ب)
[দ্রষ্টব্য: ক-বিভাগ থেকে যেকোনো ৬টি এবং খ-বিভাগ থেকে যেকোনো ৪টি প্রশ্নের উত্তর দাও।]
مجموعة (أ) / ক-বিভাগ (الدرجة— ٦ × ١٠ = ٦٠)
(أجب عن ستة من الأسئلة الآتية)
١- مَنْ هُمُ العَرَبُ البَائِدَةُ وَالعَارِبَةُ وَالمُسْتَعْرِبَةُ؟ بَيِّنْ بِالتَّفْصِيلِ-
[১. আরব বাইদাহ, আরিবা ও মুসতারিবা কারা? বিস্তারিত বর্ণনা করো।]
ভূমিকা: মানব সভ্যতার ইতিহাসে আরব জাতি এক ঐতিহ্যবাহী ও মর্যাদাপূর্ণ জাতিসত্তা। বংশতাত্ত্বিক ধারা, উৎস এবং প্রাচীনতার ভিত্তিতে ঐতিহাসিক ও নৃতত্ত্ববিদগণ সমগ্র আরব জাতিকে প্রধানত তিনটি মৌলিক শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেন। যথা: আল-আরব আল-বাইদাহ (বিলুপ্ত আরব), আল-আরব আল-আরিবা (খাঁটি আরব) এবং আল-আরব আল-মুসতারিবা (আরবায়িত আরব)। নিম্নে এদের পরিচয় ও বিস্তারিত বিবরণ উপস্থাপন করা হলো:
১. আল-আরব আল-বাইদাহ (العرب البائدة):
- পরিচয়: ‘বাইদাহ’ (البائدة) শব্দটির মূল ধাতু হলো ‘বায়েদ’ (بيد), যার আভিধানিক অর্থ বিলুপ্ত, ধ্বংসপ্রাপ্ত বা নিশ্চিহ্ন হওয়া। পারিভাষিক অর্থে যেসকল প্রাচীন আরব গোত্র প্রাক-ইসলামী যুগে আরব উপদ্বীপে বসবাস করত কিন্তু কালের আবর্তে এবং প্রাকৃতিক ও ঐশী শাস্তির কারণে যাদের অস্তিত্ব সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, তাদেরকে ‘আরব বাইদাহ’ বলা হয়।
- প্রসিদ্ধ গোত্রসমূহ: পবিত্র কুরআনে উল্লেখিত প্রাচীন ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিসমূহ এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। যেমন: কওমে আদ (قوم عاد), সামূদ (ثمود), তাসম (طسم), জাদীস (جديس), আমালিক্বাহ (العمالقة), জুরহুম আল-উলা (جرهم الأولى) ইত্যাদি।
- ইতিহাস ও পরিণতি: তাদের শক্তিশালী সভ্যতা ও প্রাসাদ ছিল, কিন্তু তাদের অবাধ্যতা ও সত্য প্রত্যাখ্যানের কারণে তারা বজ্রপাত, ঘূর্ণিবায়ু এবং ভূমিকম্পের দ্বারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। তাদের ভাষা প্রাচীন সেমিটিক আরবি ছিল, তবে তাদের কোনো লিখিত সাহিত্য বর্তমানে অবশিষ্ট নেই।
২. আল-আরব আল-আরিবা (العرب العاربة):
- পরিচয়: ‘আরিবা’ (العاربة) শব্দের অর্থ খাঁটি, খাঁটি রক্তজাত বা আদি আরব। ঐতিহাসিকদের মতে এরা হলেন কাহতানী আরব (القحطانيون)। অর্থাৎ ইয়ারুব বিন কাহতানের (يعرب بن قحطان) বংশধরগণ। ইয়ারুবই প্রথম ব্যক্তি যিনি খাঁটি ও বিশুদ্ধ আরবি ভাষায় স্পষ্টভাবে কথা বলেন।
- মূল বাসস্থান: এদের আদি বাসস্থান ছিল দক্ষিণ আরবে, বিশেষ করে ইয়েমেনে (اليمن)। সেখানে তারা সুপ্রাচীন ও সমৃদ্ধ সাবা ও হিময়ার রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল। বিখ্যাত ‘মাআরিব বাঁধ’ (سد مأرب) তাদের উন্নত প্রকৌশলবিদ্যার নিদর্শন ছিল।
- প্রসিদ্ধ শাখা-প্রশাখা: মাআরিব বাঁধ ভেঙে বন্যা (سيل العرم) আসার পর তারা আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। তাদের মূল দুটি শাখা:
- হিময়ার (حمير): যায়দ বিন কাহলানের বংশধরগণ।
- কাহলান (كهلان): এদের মধ্য থেকেই মদীনার বিখ্যাত আওস (الأوس) ও খাযরাজ (الخزرج) গোত্র, সিরিয়ার গাসসানীয় (الغساسنة) এবং ইরাকের হীরা রাজ্যের লাখমীয় (المناذرة) রাজবংশের উৎপত্তি ঘটে।
৩. আল-আরব আল-মুসতারিবা (العرب المستعربة):
- পরিচয়: ‘মুসতারিবা’ (المستعربة) অর্থ যারা পরবর্তীতে আরবি ভাষা ও সংস্কৃতি গ্রহণ করে আরব হিসেবে একীভূত হয়েছে। এরা হলেন আদনানী আরব (العدنانيون)। অর্থাৎ হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর বংশধর।
- আরবায়নের প্রেক্ষাপট: হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর মাতৃভাষা ছিল সুরিয়ানী বা হিব্রু। যখন হযরত ইব্রাহিম (আ.) তাঁকে শিশুকালে মক্কার মরুভূমিতে রেখে যান, তখন সেখানে কাহতানী বংশের ‘জুরহুম’ (جرهم) গোত্র বসতি স্থাপন করে। হযরত ইসমাঈল (আ.) তাদের সঙ্গে বসবাস করে খাঁটি আরবি ভাষা শেখেন এবং তাদের বংশে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ফলে তাঁর বংশধরেরা ‘আরবায়িত আরব’ বা ‘মুসতারিবা’ নামে খ্যাত হন।
- গুরুত্ব ও বংশধারা: আদনানের পরবর্তী বংশধারায় আরবের সর্বশ্রেষ্ঠ গোত্র কুরাইশ (قريش) আবির্ভূত হয়। আর এই সম্মানিত বংশেই নিখিল বিশ্বের রহমত, মানবতার মুক্তির দূত হযরত মুহাম্মদ (সা.) আগমন করেন।
| শ্রেণীবিভাগ | বংশতাত্ত্বিক উৎস | প্রধান গোত্র ও বাসস্থান | ঐতিহাসিক স্থায়িত্ব |
|---|---|---|---|
| আল-আরব আল-বাইদাহ | প্রাচীন বিলুপ্ত সেমিটিক বংশ | আদ, সামূদ, তাসম, জাদীস (আহকাফ ও হিজাজ) | ঐতিহাসিক শাস্তিতে সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত |
| আল-আরব আল-আরিবা | কাহতানী (ইয়ারুব বিন কাহতান) | হিময়ার, কাহলান, আওস, খাযরাজ (ইয়েমেন) | খাঁটি আরবের আদি উৎস |
| আল-আরব আল-মুসতারিবা | আদনানী (ইসমাঈল আ. বিন ইব্রাহিম আ.) | কুরাইশ, কিনানাহ, মুযার, রাবীআহ (মক্কা ও নজদ) | বিশ্বনবী (সা.)-এর বংশধারা ও কোরআনিক আরবি |
٢- مَا هُوَ العَصْرُ الجَاهِلِيُّ؟ اُكْتُبْ مُمَيِّزَاتِ الأَدَبِ لِلْعَصْرِ الجَاهِلِيِّ مُوجَزًا-
[২. জাহিলী যুগ কাকে বলে? জাহিলী সাহিত্যের বৈশিষ্ট্যসমূহ সংক্ষেপে লিপিবদ্ধ করো।]
ভূমিকা: আরবি সাহিত্যের ইতিহাসে প্রাক-ইসলামী যুগটি ‘আল-আসর আল-জাহিলী’ (العصر الجاهلي) নামে সুপরিচিত। এই যুগে আরব সমাজে জ্ঞান-বিজ্ঞানের চরম অবনতি ঘটলেও ভাষার বিশুদ্ধতা ও কাব্যিক অলঙ্কার শাস্ত্রীয় শ্রেষ্ঠত্বে তা ছিল এক অনুপম স্বর্ণযুগ।
১. আসরে জাহিলী বা জাহিলী যুগের সংজ্ঞা ও সময়সীমা:
- শাব্দিক বিশ্লেষণ: ‘জাহিলিয়্যাত’ (الجاهلية) শব্দটি ‘জাহল’ (الجهل) থেকে উদ্ভূত, যার বিপরীত হলো ‘ইলম’ (জ্ঞান) বা ‘হিলম’ (ধৈর্য ও সহনশীলতা)। এটি কেবল মূর্খতা নয়, বরং বর্বরতা, অরাজকতা, পৌত্তলিকতা এবং নৈতিক স্খলনের প্রতীক।
- সময়সীমা: সাহিত্য গবেষকদের মতে, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুওয়াত প্রকাশের পূর্ববর্তী প্রায় দেড়শত থেকে দুইশত বছরের (৪৫০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ৬১০ খ্রিষ্টাব্দ) সময়কালকে জাহিলী যুগ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। কারণ এর পূর্বের কোনো সুসংহত আরবি লিখিত সাহিত্য আমাদের কাছে পৌঁছায়নি। যেমনটি আল-জাহিজ বলেছেন: “আমাদের কাছে সংরক্ষিত খাঁটি আরবি কবিতার ইতিহাস আনুমানিক ১৫০ থেকে ২০০ বছরের প্রাচীন।”
২. জাহিলী সাহিত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ: জাহিলী যুগের সাহিত্য মূলত কবিতা (الشعر) এবং কিছু মৌখিক গদ্য (النثر) আকারে বিকশিত হয়েছিল। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ নিম্নে আলোচনা করা হলো:
- বাস্তবধর্মিতা ও মরুজীবনের নিখুঁত চিত্রায়ন (الصدق والواقعية): জাহিলী কবিরা কল্পনাপ্রবণ ছিলেন না; বরং তারা তাদের চারপাশের রুক্ষ মরুভূমি, বালিয়াড়ি, তাঁবু, উট, ঘোড়া এবং শিকারের জীবন্ত চিত্র আঁকতেন।
- ভাষার বিশুদ্ধতা ও শব্দের গাম্ভীর্য (فصاحة الألفاظ وجزالتها): জাহিলী সাহিত্যের শব্দচয়ন ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী, গম্ভীর ও ছন্দময়। প্রতিটি শব্দ ছিল তার উপযুক্ত স্থানে সুবিন্যস্ত। কোনো কৃত্রিমতা বা অপ্রয়োজনীয় জটিলতা সেখানে ছিল না।
- কাসীদার সুনির্দিষ্ট কাঠামো (بناء القصيدة التقليدي): একটি দীর্ঘ কাসীদা সাধারণত প্রেমিকার পরিত্যক্ত বাসস্থানের স্মৃতিচারণ (বুক্বা আলাল আতলাল – البكاء على الأطلال), নাসীব বা গযল (প্রেম নিবেদন), তারপর মরুযাত্রার বর্ণনা (رحلة الناقة) এবং পরিশেষে মূল উদ্দেশ্য— ফখর (আত্মগৌরব), মাদহ (প্রশংসা) বা হামাসাহ (বীরত্ব)-তে পৌঁছাত।
- অলঙ্কারের স্বাভাবিক ব্যবহার (البساطة في الخيال والتشبيه): কবিরা মরু প্রকৃতির উপাদানের মাধ্যমে স্বাভাবিক উপমা (تشبيه) ও রূপক (استعارة) ব্যবহার করতেন। কোনো তাত্ত্বিক দর্শনের চাপিয়ে দেওয়া রূপক তাদের কাব্যে ছিল না।
- আরব সমাজের দর্পণ (الشعر ديوان العرب): জাহিলী কবিতা ছিল আরবদের ইতিহাস ও সংস্কৃতির এনসাইক্লোপিডিয়া। তৎকালীন গোত্রীয় যুদ্ধ, অতিথিপরায়ণতা, সাহসিকতা, বংশমর্যাদা এবং গোত্রীয় অহমিকা সবকিছু কবিতায় সংরক্ষিত ছিল।
- মৌখিক প্রচলন ও স্মৃতিশক্তির নির্ভরতা (الرواية الشفوية): সাহিত্য লিখিতভাবে সংরক্ষিত হতো না; বরং ‘রাবী’ (الراوي) বা আবৃত্তিকারদের মুখস্থের মাধ্যমে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে তা স্থানান্তরিত হতো। ওকাজ (سوق عكاظ) মেলা ছিল কাব্য যাচাই ও প্রতিযোগিতার প্রধান মিলনমেলা।
٣- عَرِّفِ الشِّعْرَ ثُمَّ اذْكُرْ خَصَائِصَ الشِّعْرِ الجَاهِلِيِّ مُفَصَّلاً-
[৩. কবিতার সংজ্ঞা দাও, অতঃপর জাহিলী কবিতার বৈশিষ্ট্যসমূহ বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করো।]
ভূমিকা: কবিতা মানব মনের গভীরতম অনুভূতি ও সুকুমার বৃত্তির নান্দনিক বহিঃপ্রকাশ। প্রাক-ইসলামী আরবে কবিতার মর্যাদা ছিল অপরিসীম। তাদের কাছে কবিতা ছিল আত্মরক্ষার শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার এবং মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সর্বোচ্চ বাহন।
১. কবিতার সংজ্ঞা (تعريف الشعر):
- আভিধানিক অর্থ: ‘শির’ (الشعر) শব্দের আভিধানিক অর্থ অনুভূতি, উপলব্ধি করা, অনুধাবন করা বা প্রজ্ঞা (الفطنة والمعرفة)। যেমন আরবিতে বলা হয়: “شعرت بالشيء” অর্থাৎ আমি বিষয়টি গভীরভাবে অনুভব করলাম।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: সাহিত্যিক ও ব্যাকরণবিদদের সর্বসম্মত সংজ্ঞায় বলা হয়েছে:
“الشِّعْرُ هُوَ الكَلاَمُ المَوْزُونُ المُقَفَّى الدَّالُّ عَلَى مَعْنًى بِالقَصْدِ”
“কবিতা হলো এমন ছন্দোবদ্ধ ও অন্ত্যমিলবিশিষ্ট অর্থবহ সুসংগঠিত বাণী, যা কবি সচেতন ইচ্ছায় (ইচ্ছাকৃতভাবে) রচনা করেন।” - খলিল বিন আহমদ আল-ফারাহীদী কবিতার জন্য ১৬টি বাহর বা ছন্দ প্রকরণ উদ্ভাবন করেন, যার ওপর ভিত্তি করে আরবি কবিতা নিয়ন্ত্রিত হয়।
২. জাহিলী কবিতার বৈশিষ্ট্যসমূহ (خصائص الشعر الجاهلي):
- বুনিয়াদী শব্দশৈলী ও কাঠিন্য (جزالة الألفاظ ومتانتها): জাহিলী কবিতার ভাষা অত্যন্ত বলিষ্ঠ, তেজোদৃপ্ত এবং মার্জিত। মরুভূমির রুক্ষতা ও যাযাবর জীবনের বলিষ্ঠতা তাদের শব্দচয়নে সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। সেখানে চটুলতা বা দুর্বল শব্দের স্থান ছিল না।
- স্বতঃস্ফূর্ত অনুভূতি ও কল্পনা (قوة العاطفة وصدقها): কবিদের আবেগ ছিল অকৃত্রিম। গোত্রের প্রতি ভালোবাসা, শত্রুর প্রতি ক্রোধ কিংবা বিরহবেদনা সবই প্রকাশ পেত কোনো কপটতা ব্যতিরেকে।
- স্পষ্ট উপমা ও দৃশ্যমান চিত্রকল্প (وضوح التشبيه والتصوير الحسي): কবিরা অদৃশ্য কোনো জগত থেকে উপমা আনতেন না। তারা প্রেমিকার গতিকে হরিণের চঞ্চলতার সাথে, কিংবা অশ্বের ক্ষিপ্রতাকে শিকারি চিল বা বজ্রের সাথে তুলনা করতেন। যেমন ইমরুল কায়েসের বিখ্যাত পঙ্ক্তি:
مِكَرٍّ مِفَرٍّ مُقْبِلٍ مُدْبِرٍ مَعًا * كَجُلْمُودِ صَخْرٍ حَطَّهُ السَّيْلُ مِنْ عَلِ
“সে একাধারে আক্রমণকারী ও পলায়নকারী, সামনে অগ্রসরমান ও পশ্চাদপসরণকারী; সে যেন পাহাড়ের ওপর থেকে প্রবল বন্যায় গড়িয়ে পড়া এক বিশাল পাথরের খণ্ড।” - ঐতিহ্যবাহী কাসীদা পদ্ধতি (وحدة البيت وتنوع الأغراض): প্রাচীন কবিতায় সম্পূর্ণ কাসীদার অখণ্ড বিষয়ের চেয়ে প্রতিটি পঙ্ক্তির স্বকীয়তা (وحدة البيت) বেশি প্রাধান্য পেত। একটি কাসীদার একটি পঙ্ক্তি আলাদা করলেও তা সম্পূর্ণ অর্থ প্রকাশ করতে সক্ষম ছিল।
- গোত্রীয় চেতনা ও মর্যাদা রক্ষা (العصبية القبلية): জাহিলী কবিতার অন্যতম মূল চালিকাশক্তি ছিল গোত্রীয় পক্ষপাতিত্ব। কবি ছিলেন গোত্রের মুখপাত্র। গোত্রের বিজয়কে মহিমান্বিত করা এবং পরাজিত শত্রুকে হেয় প্রতিপন্ন করা কবিতার অন্যতম অনুষঙ্গ ছিল।
٤- تَحَدَّثْ عَنْ تَأْثِيرِ القُرْآنِ الكَرِيمِ فِي ارْتِقَاءِ اللُّغَةِ العَرَبِيَّةِ وَآدَابِهَا-
[৪. আরবি ভাষা ও সাহিত্যের উৎকর্ষ সাধনে পবিত্র কুরআনের প্রভাব আলোচনা করো।]
ভূমিকা: আল-কুরআনুল কারীম কেবল একটি আসমানী ধর্মগ্রন্থই নয়, বরং এটি আরবি ভাষার চিরন্তন অভিভাবক এবং আরবি সাহিত্যের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রূপান্তরকারী অলৌকিক শক্তি। পবিত্র কুরআন নাজিল হওয়ার পর আরবি ভাষা যাযাবর স্থানীয় গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক মর্যাদায় আসীন হয়।
১. আরবি ভাষার স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা বিধান (حفظ اللغة وخلودها): বিশ্বের বহু প্রাচীন ভাষা যেমন ল্যাটিন, প্রাচীন গ্রিক, বা আরামাইক কালের বিবর্তনে মৃত বা পরিবর্তিত ভাষায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু পবিত্র কুরআন আরবি ভাষাকে অবিকৃতভাবে চিরস্থায়ী রূপ দান করেছে। আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন:
“إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ” (সূরা আল-হিজর: ৯)
কুরআনের সংরক্ষণের দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ গ্রহণ করায় আরবি ভাষাও কিয়ামত পর্যন্ত সুরক্ষিত হয়ে গেছে।
২. উপভাষা দূরীকরণ ও কুরাইশ ভাষার প্রমিতকরণ (توحيد اللهجات العربية): জাহিলী যুগে আরবে বহু গোত্রীয় উপভাষা (যেমন কাসকাসা, তামতামা, আন’আনা ইত্যাদি) বিদ্যমান ছিল। পবিত্র কুরআন কুরাইশ গোত্রের সর্বাধিক মার্জিত ও বিশুদ্ধ উপভাষায় অবতীর্ণ হয়ে সমগ্র আরব জাহানকে একক প্রমিত সাহিত্যের ভাষায় (اللغة الفصحى) ঐক্যবদ্ধ করে।
৩. শব্দভাণ্ডার ও পরিভাষার সমৃদ্ধি (إثراء المعجم اللغوي): কুরআন আরবি ভাষায় অসংখ্য নতুন আধ্যাত্মিক, নৈতিক ও আইনগত পরিভাষা যুক্ত করে শব্দার্থের দিগন্ত উন্মোচন করেছে। যেমন: الصلاة (সালাত), الزكاة (যাকাত), النفاق (মুনাফিক্বী), الفسق (পাপাচার), الكفر (কুফর), الجنة (জান্নাত), الصراط (সিরাত) ইত্যাদি শব্দসমূহকে সাধারণ আভিধানিক অর্থ থেকে উন্নত শরীয়তের পারিভাষিক অর্থে রূপান্তর করা হয়।
৪. নতুন জ্ঞান-বিজ্ঞানের জন্মদান (نشأة العلوم اللغوية والإسلامية): পবিত্র কুরআনের শব্দাবলি ও অর্থকে সঠিকভাবে অনুধাবন এবং সুরক্ষার স্বার্থেই পরবর্তীতে আরবি ব্যাকরণ ও ভাষাতত্ত্বের উৎপত্তি ঘটে। যেমন:
- ইলমুন নাহু ও সারফ (علم النحو والصرف): অনারবদের ইসলাম গ্রহণের ফলে ভাষা বিকৃতি (لحن) রোধে হযরত আলী (রা.)-এর নির্দেশনায় আবুল আসওয়াদ আদ-দুয়ালী নাহু শাস্ত্র রচনা করেন।
- ইলমুল বালাগাত (علم البلاغة): কুরআনের অলৌকিক সাহিত্য সৌন্দর্য ও ই’জায (إعجاز القرآن) প্রমাণের তাগিদ থেকেই মাআনী, বায়ান ও বাদী শাস্ত্রের উন্মেষ ঘটে।
- অভিধান শাস্ত্র (المعاجم العربية): খলিল বিন আহমদের ‘কিতাবুল আইন’ সহ সুবিশাল অভিধানসমূহ কুরআনের কঠিন শব্দের ব্যাখ্যার পথ ধরেই সংকলিত হয়।
৫. গদ্য সাহিত্যের আধুনিকায়ন ও বিশুদ্ধ শৈলীর উদ্ভব: প্রাক-ইসলামী যুগে আরবে গদ্যের ব্যবহার ছিল অতি সীমিত। কুরআনের অনুপম ছন্দময় ও অর্থপূর্ণ শৈলী আরবি গদ্যকে উচ্চাসনে পৌঁছে দেয়। খুতবা, চিঠিপত্র এবং রাষ্ট্রীয় দলিলাদির জন্য কুরআনিক স্টাইলই হয়ে ওঠে সর্বজনীন মানদণ্ড।
٥- مَنْ هُمُ الشُّعَرَاءُ المُخَضْرَمُونَ؟ اُذْكُرْ خِدْمَاتِهِمْ فِي الشِّعْرِ الإِسْلاَمِيِّ-
[৫. মুখাযরাম কবি কারা? ইসলামী কবিতায় তাদের অবদান আলোচনা করো।]
ভূমিকা: আরবি সাহিত্যের ইতিহাসে এমন একদল প্রতিভাধর কবি আবির্ভূত হয়েছিলেন যারা জাহিলী যুগের বর্বরতা ও পৌত্তলিকতা প্রত্যক্ষ করেছিলেন এবং পরবর্তীতে ইসলামের আলোকপ্রাপ্ত হয়ে মহানবী (সা.)-এর পবিত্র সংস্পর্শ লাভ করেছিলেন। সাহিত্য পরিভাষায় তাদের ‘শুআরাউল মুখাযরামুন’ (الشعراء المخضرمون) বলা হয়।
১. মুখাযরাম কবিদের সংজ্ঞা:
- আভিধানিক অর্থ: ‘মুখাযরাম’ (المخضرم) শব্দটি ‘খাযরামা’ ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ দ্বিখণ্ডিত করা বা দুভাগে কাটা।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: সাহিত্য সমালোচকদের পরিভাষায়:
“المُخَضْرَمُ هُوَ الشَّاعِرُ الَّذِي أَدْرَكَ الجَاهِلِيَّةَ وَالإِسْلاَمَ وَأَسْلَمَ”
“মুখাযরাম হলেন সেই কবি, যিনি জাহিলী যুগ ও ইসলামী যুগ উভয়টির সাক্ষাৎ পেয়েছেন এবং ইসলাম গ্রহণ করেছেন।” - প্রসিদ্ধ মুখাযরাম কবিগণের মধ্যে রয়েছেন: হাসসান বিন সাবিত (حسان بن ثابت), কা’ব বিন যুহাইর (كعب بن زهير), আল-খানসা (الخنساء), লাবিদ বিন রাবীআহ (لبيد بن ربيعة), এবং আল-হুতাইআহ (الحطيئة)।
২. ইসলামী কবিতায় মুখাযরাম কবিদের অবদান ও ভূমিকা:
- ইসলামের আদর্শ প্রচার ও সুরক্ষা (الدفاع عن الإسلام): কাফের কুরাইশরা যখন রসূলুল্লাহ (সা.) ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে কবিতার মাধ্যমে কুৎসা রটাত, তখন হাসসান বিন সাবিত (রা.) তাঁর তীব্র বাক্যবাণে তার মোক্ষম জবাব দিতেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁকে বলেন: “হে হাসসান, তুমি তাদের ব্যঙ্গোক্তি করো, জিব্রাঈল (আ.) তোমার সাথে রয়েছেন।”
- কাব্যরীতির নৈতিক রূপান্তর (تهذيب الأغراض الشعرية): মুখাযরাম কবিরা কবিতাকে অশ্লীল কামোদ্দীপনা, মদ ও অহমিকা থেকে মুক্ত করে তাওহীদ, তাকওয়া, বীরত্ব ও আখেরাতমুখী চিন্তায় রূপান্তর করেন। কা’ব বিন যুহাইর তাঁর অমর কাসীদা ‘বানাত সু’আদ’-এ মহানবী (সা.)-কে হেদায়েতের আলোকবর্তিকা হিসেবে চিত্রিত করেন।
- শোকগাঁথায় ঈমানী সংযম (الرثاء الملتزم): জাহিলী যুগের শোকগাথায় অধৈর্য বিলাপ ও আর্তনাদ থাকত। কিন্তু খানসা (রা.) ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর চার পুত্রের শাহাদাতে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে শোকগাঁথায় এক অনন্য ঈমানী সংযমের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
- ভাষা ও ভাবধারায় কুরআনের সংমিশ্রণ (التأثر بالقرآن الكريم): মুখাযরাম কবিদের কবিতায় কুরআনের শব্দমালা, ভাবগাম্ভীর্য ও পরিভাষা সরাসরি প্রবেশ করে। লাবিদ বিন রাবীআহ ইসলাম গ্রহণের পর কুরআনের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে কবিতা রচনাই প্রায় ছেড়ে দিয়েছিলেন এবং বলতেন, “আল্লাহ আমাকে কুরআনের মতো অমূল্য গ্রন্থ উপহার দেওয়ার পর কবিতার আর প্রয়োজন নেই।”
٦- بَيِّنْ مَوْقِفَ القُرْآنِ وَالسُّنَّةِ مِنَ الشِّعْرِ مُفَصَّلاً-
[৬. কবিতা সম্পর্কে কুরআন ও সুন্নাহর দৃষ্টিভঙ্গি বিস্তারিত বর্ণনা করো।]
ভূমিকা: ইসলাম আগমনকালে আরব সমাজে কবিতা ছিল একচ্ছত্র শক্তিশালী মাধ্যম। তবে সেই কবিতার অধিকাংশ ব্যবহৃত হতো অশ্লীলতা, মিথ্যা ফখর এবং শত্রুর প্রতি অবমাননাকর ব্যঙ্গবিদ্রূপে। ফলে ইসলাম কবিতাকে সামগ্রিকভাবে নিষিদ্ধ করেনি, বরং তার বিষয়বস্তু ও উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিয়েছে।
১. কবিতা সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি:
- কুরআন কোনো কবিতা নয়: তৎকালীন মক্কার মুশরিকরা মহানবী (সা.)-কে কবি এবং কুরআনকে কবিতা বলে অপবাদ দিত। আল্লাহ তাআলা তাদের এই অপবাদ প্রত্যাখ্যান করে বলেন:
“وَمَا عَلَّمْنَاهُ الشِّعْرَ وَمَا يَنْبَغِي لَهُ إِنْ هُوَ إِلَّا ذِكْرٌ وَقُرْآنٌ مُبِينٌ” (সূরা ইয়াসীন: ৬৯)
অর্থাৎ নবুওয়াত ও কবিতার স্বভাব সম্পূর্ণ ভিন্ন; নবুওয়াত সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত, আর জাহিলী কবিতা বহুলাংশে কল্পনানির্ভর। - সূরা আশ-শুআরার মূলনীতি: সূরা আশ-শুআরায় সাধারণ কবিদের পথভ্রষ্টতার কথা উল্লেখ করার পর মুমিন কবিদের ব্যতিক্রম হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে:
“وَالشُّعَرَاءُ يَتَّبِعُهُمُ الْغَاوُونَ * أَلَمْ تَرَ أَنَّهُمْ فِي كُلِّ وَادٍ يَهِيمُونَ * وَأَنَّهُمْ يَقُولُونَ مَا لَا يَفْعَلُونَ * إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَذَكَرُوا اللَّهَ كَثِيرًا وَانْتَصَرُوا مِنْ بَعْدِ مَا ظُلِمُوا” (সূরা শুআরা: ২২৪-২২৭)
এখানে প্রমাণিত হয় যে, ঈমান, সৎকর্ম ও সত্যের প্রতিরক্ষায় রচিত কবিতা সম্পূর্ণরূপে প্রশংসনীয় ও অনুমোদিত।
২. কবিতা সম্পর্কে হাদীস ও সুন্নাহর দৃষ্টিভঙ্গি:
- প্রজ্ঞাপূর্ণ কবিতার প্রশংসা: সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন:
“إِنَّ مِنَ الشِّعْرِ حِكْمَةً” — “নিশ্চয়ই কোনো কোনো কবিতার মধ্যে প্রজ্ঞা ও তত্ত্বজ্ঞান নিহিত রয়েছে।” - সত্যের প্রতিরক্ষায় কবিতাকে জিহাদের অংশ সাব্যস্ত করা: রাসূলুল্লাহ (সা.) কবি হাসসান বিন সাবিত (রা.)-এর জন্য মসজিদে নববীতে মিম্বর স্থাপন করে দিয়েছিলেন, যাতে তিনি ইসলামের শত্রুদের জবাব দিতে পারেন। তিনি বলতেন: “কুরাইশদের ওপর তোমার ব্যঙ্গোক্তি তীরের আঘাতের চেয়েও মারাত্মক।”
- বাতিল ও অশ্লীল কবিতার নিন্দা: যদি কবিতা মানুষকে আল্লাহ বিমুখ করে দেয় এবং পাপাচারে লিপ্ত করে, তবে তা নিষিদ্ধ। হাদিসে এসেছে:
“لَأَنْ يَمْتَلِئَ جَوْفُ رَجُلٍ قَيْحًا يَرِيهِ خَيْرٌ لَهُ مِنْ أَنْ يَمْتَلِئَ شِعْرًا”
“কারো পেট পুঁজ দ্বারা পূর্ণ হওয়া, যা তার দেহকে গলিয়ে দেয়, এমন কবিতা দ্বারা পূর্ণ হওয়ার চেয়ে উত্তম যা তাকে আল্লাহর জিকির থেকে গাফেল করে।” (সহীহ বুখারী)
উপসংহার: ইসলামের দৃষ্টিতে কবিতা হলো কথার মতো (الشعر كلام)— ভালো কথা যেমন উত্তম ও সওয়াবের কাজ, ভালো কবিতাও তদ্রূপ; আর মন্দ কথা যেমন পাপ ও বর্জনীয়, মন্দ কবিতাও তদ্রূপ পরিত্যাজ্য।
٧- مَنْ هُوَ شَاعِرُ الرَّسُولِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؟ اُكْتُبْ مُسَاهَمَاتِهِ الأَدَبِيَّةَ فِي الدِّفَاعِ عَنِ الإِسْلاَمِ وَالمُسْلِمِينَ-
[৭. রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কবি কে? ইসলাম ও মুসলিমদের প্রতিরক্ষায় তাঁর সাহিত্যিক অবদান লিপিবদ্ধ করো।]
ভূমিকা: বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সম্মানিত দরবারে যেসকল কবি ইসলামের পক্ষে কলম ও জিহ্বার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছিলেন, তাঁদের প্রধান ছিলেন হযরত হাসসান বিন সাবিত আনসারী (রা.)। তিনি মুসলিম বিশ্বে ‘শা’ইরুর রাসূল’ (شاعر الرسول) বা রাসূলের কবি উপাধিতে ভূষিত হন।
১. সংক্ষিপ্ত পরিচয়:
- নাম ও বংশ: নাম হাসসান, পিতার নাম সাবিত, মাতার নাম ফুরায়আ বিনতে খালিদ। তিনি মদীনার ঐতিহ্যবাহী খাযরাজ গোত্রের বনু নাজ্জার শাখার সন্তান।
- দীর্ঘায়ু জীবন: তিনি প্রায় ১২০ বছর জীবিত ছিলেন। ৬০ বছর তিনি জাহিলী যুগে অতিবাহিত করেন এবং বাকী ৬০ বছর ইসলামে নিষ্ঠাবান সাহাবী হিসেবে কাটিয়েছেন। এজন্য তিনি শীর্ষস্থানীয় মুখাযরাম কবি।
- উপাধি: ‘শা’ইরুর রাসূল’ (شاعر الرسول) এবং ‘শা’ইরুল আনসার’ (شاعر الأنصار)।
২. ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতিরক্ষায় সাহিত্যিক অবদান:
- কুরাইশ কবিদের অপপ্রচারের মোক্ষম জবাব: মক্কার কুরাইশদের তিন কুখ্যাত কবি— আমর বিন আস, ইবনুয যিব’আরা এবং আবু সুফিয়ান বিন হারেস যখন মহানবী (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামকে আক্রমণ করে ব্যঙ্গাত্মক কবিতা লিখত, তখন হাসসান (রা.) একাই তাদের সমগ্র গোত্রীয় অহমিকা চূর্ণ করে দিতেন।
- ঐশী মদদ ও রূহুল কুদুসের সাহচর্য: স্বয়ং মহানবী (সা.) তাঁর জন্য দোয়া করে বলতেন:
“اللَّهُمَّ أَيِّدْهُ بِرُوحِ القُدُسِ” — “হে আল্লাহ! আপনি তাঁকে জিব্রাঈল (পবিত্র আত্মা)-এর মাধ্যমে সাহায্য করুন।” - বিজয়ের দিনগুলোর অমর গাথা: বদর, উহুদ, খন্দক এবং মক্কা বিজয়ের প্রেক্ষাপটে তিনি অসংখ্য তেজোদৃপ্ত কাসীদা রচনা করেন। মক্কা বিজয়ের প্রাক্কালে রচিত তাঁর বিখ্যাত উক্তি:
عَدِمْنَا خَيْلَنَا إِنْ لَمْ تَرَوْهَا * تُثِيرُ النَّقْعَ مَوْعِدُهَا كَدَاءُ
“আমাদের অশ্বারোহী দল ধ্বংস হয়ে যাক, যদি তোমরা তাদের না দেখ কাদা উপত্যকা অতিক্রম করে ধূলিঝড় উড়িয়ে তীব্র গতিতে ধাবিত হতে।” - রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রশংসাগীতি (المدائح النبوية): তাঁর রচিত নাত ও প্রশংসামূলক কবিতা বিশ্বসাহিত্যের অমর সম্পদ। রাসূল (সা.)-এর অবয়ব বর্ণনায় তিনি বলেন:
وَأَحْسَنُ مِنْكَ لَمْ تَرَ قَطُّ عَيْنِي * وَأَجْمَلُ مِنْكَ لَمْ تَلِدِ النِّسَاءُ
خُلِقْتَ مُبَرَّءًا مِنْ كُلِّ عَيْبٍ * كَأَنَّكَ قَدْ خُلِقْتَ كَمَا تَشَاءُ
“আপনার চেয়ে সুন্দর মানুষ আমার চোখ কখনো দেখেনি, আপনার চেয়ে অপরূপ সৌন্দর্য কোনো নারী কখনো প্রসব করেনি। আপনি যাবতীয় ত্রুটিমুক্ত হয়ে সৃষ্টি হয়েছেন, যেন আপনি আপনার নিজের মনের মতো করেই সৃষ্টি হয়েছেন।” - রাসূল (সা.)-এর ওফাতে শোকগাঁথা (المرثية): প্রিয়নবী (সা.)-এর ইন্তেকালের পর তাঁর বিরহে হাসসান (রা.) অশ্রুসিক্ত নয়নে যে মর্মস্পর্শী শোকগাঁথা রচনা করেছিলেন, তা আজ পর্যন্ত মুসলিম হৃদয়কে উদ্বেলিত করে।
٨- مَا مَعْنَى التَّنَاقُضِ؟ بَيِّنْ نَقَائِضَ جَرِيرٍ وَالفَرَزْدَقِ بِالإِيجَازِ-
[৮. নাক্বাইজ বা তানাকুযের অর্থ কী? জারীর ও ফারাজদাক্বের নাক্বাইজ সংক্ষেপে আলোচনা করো।]
ভূমিকা: উমাইয়া যুগের আরবি কবিতায় একটি স্বতন্ত্র ও চমকপ্রদ কাব্যধারার উদ্ভব ঘটেছিল, যা ‘আন-নাক্বাইজ’ (النقائض) নামে পরিচিত। এই ধারায় কবি জারীর ও কবি আল-ফারাজদাক্বের মধ্যকার কাব্যযুদ্ধ আরবি সাহিত্যের ভাষাতাত্ত্বিক ইতিহাসে অনন্য মাইলফলক।
১. তানাকুয ও নাক্বাইজের সংজ্ঞা:
- আভিধানিক অর্থ: ‘নাক্বাইজ’ শব্দটি ‘নাক্বদ’ (نقض)-এর বহুবচন, যার অর্থ ভেঙে ফেলা, খুলে ফেলা বা বাতিল করা। যেমন সুতা দিয়ে বোনা দড়ি খুলে ফেলা।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: সাহিত্য পরিভাষায়:
“النَّقَائِضُ هِيَ أَنْ يَنْظِمَ شَاعِرٌ قَصِيدَةً فِي الفَخْرِ أَوِ الهِجَاءِ، فَيَرُدَّ عَلَيْهِ شَاعِرٌ آخَرُ بِقَصِيدَةٍ عَلَى نَفْسِ البَحْرِ وَالرَّوِيِّ نَاقِضًا مَعَانِيَهُ”
“নাক্বাইজ হলো এক কবি কর্তৃক আত্মগৌরব (ফখর) বা ব্যঙ্গাত্মক (হিজা) কোনো কাসীদা রচনা করার পর অন্য এক কবি কর্তৃক ঠিক একই ছন্দ (বাহর), অন্ত্যমিল (কাফিয়া/রাভী) ও ওজনে পাল্টা কাসীদা রচনা করে প্রথম কবির সমস্ত বক্তব্য ও দাবি খণ্ডন করে দেওয়া।”
২. জারীর ও ফারাজদাক্বের নাক্বাইজ (نقائض جرير والفرزدق):
- পটভূমি: উমাইয়া যুগে ইরাকের বসরা শহরের ‘মিরবাদ’ (المربد) বাজারে দীর্ঘ চল্লিশ বছর ধরে বনু তামীম গোত্রেরই দুই উপগোত্রীয় কবি জারীর (বনু কুলাইব) এবং আল-ফারাজদাক্ব (বনু মুজাশি)-এর মধ্যে এই যুদ্ধ অব্যাহত ছিল। পরবর্তীতে তৃতীয় আরেক কবি আল-আখতাল ফারাজদাক্বের সাথে যোগ দিয়েছিলেন।
- কাব্যিক বৈশিষ্ট্য ও প্রতিযোগিতা:
- ফারাজদাক্বের বৈশিষ্ট্য: ফারাজদাক্ব তাঁর অভিজাত বংশমর্যাদা, পূর্বপুরুষদের দানশীলতা ও যুদ্ধজয়ের গৌরবে গর্জি উঠতেন। যেমন তিনি বলেন:
إِنَّ الَّذِي سَمَكَ السَّمَاءَ بَنَى لَنَا * بَيْتًا دَعَائِمُهُ أَعَزُّ وَأَطْوَلُ
“নিশ্চয়ই যিনি আকাশকে সমুন্নত করেছেন, তিনি আমাদের এমন ঘর নির্মাণ করে দিয়েছেন যার স্তম্ভসমূহ অত্যন্ত সম্মানিত ও সুউচ্চ।” - জারীরের মোক্ষম আঘাত: জারীর দরিদ্র ঘরের সন্তান হলেও ছিলেন সহজাত প্রতিভাধর ও উপস্থিত বুদ্ধিসম্পন্ন। তিনি তাৎক্ষণিক ফারাজদাক্বের ছন্দেই আক্রমণ করে বলতেন:
أَخْزَى الَّذِي سَمَكَ السَّمَاءَ مُجَاشِعًا * وَبَنَى بِنَاءَكَ فِي الحَضِيضِ الأَسْفَلِ
“যিনি আকাশ উন্নত করেছেন তিনি তোমার মুজাশি গোত্রকে লাঞ্ছিত করেছেন, এবং তোমার ঘরের ভিত্তি স্থাপন করেছেন সর্বনিম্ন অতল গহ্বরে!”
- ফারাজদাক্বের বৈশিষ্ট্য: ফারাজদাক্ব তাঁর অভিজাত বংশমর্যাদা, পূর্বপুরুষদের দানশীলতা ও যুদ্ধজয়ের গৌরবে গর্জি উঠতেন। যেমন তিনি বলেন:
- সাহিত্যিক গুরুত্ব: এই নাক্বাইজ ব্যক্তিগত শত্রুতা হলেও আরবি অভিধান, ব্যাকরণ ও প্রাচীন আরবের ইতিহাস সংরক্ষণে অসামান্য অবদান রেখেছে। আবু উবায়দাহ এ বিষয়ে ‘কিতাবুন নাক্বাইজ’ নামে সুবিশাল সংকলন প্রস্তুত করেন। প্রাচীন পণ্ডিতরা বলতেন: “ফারাজদাক্বের কবিতা না থাকলে আরবি ভাষার এক-তৃতীয়াংশ হারিয়ে যেত।”
٩- اُكْتُبْ خُلاَصَةَ قَصِيدَةِ ‘بَانَتْ سُعَادُ’ لِكَعْبِ بْنِ زُهَيْرٍ-
[৯. কা’ব ইবনে যুহাইর (রা.)-এর ‘বানাত সু’আদ’ কাসীদার সারসংক্ষেপ লিপিবদ্ধ করো।]
ভূমিকা: প্রখ্যাত মুখাযরাম কবি কা’ব বিন যুহাইর (রা.)-এর রচিত ‘বানাত সু’আদ’ (بانت سعاد) আরবি সাহিত্যের অন্যতম সর্বশ্রেষ্ঠ প্রশংসাগীতি (المدائح النبوية)। এই কাসীদা পাঠের মাধ্যমেই তিনি মহানবী (সা.)-এর ক্ষমা লাভ করেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) খুশি হয়ে নিজের গায়ের চাদর (বুরদাহ) উপহার দেন। এজন্য একে ‘কাসীদাতুল বুরদাহ’ও বলা হয়।
১. ঐতিহাসিক পটভূমি (خلفية القصيدة):
মক্কা বিজয়ের পর কা’ব বিন যুহাইর ইসলামের বিরুদ্ধে কটূক্তি করায় রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। কা’বের ভাই বুজায়র (রা.) যিনি আগেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, তিনি কা’বকে পরামর্শ দেন যে, মুহাম্মদ (সা.) এমন এক মহানুভব নবী যিনি তওবাকারীকে ক্ষমা করে দেন। কা’ব গভীর অনুশোচনা নিয়ে গোপনে মদীনায় এসে ফজরের নামাজের পর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে উপস্থিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং এই কাসীদাটি আবৃত্তি করেন।
২. কাসীদার মূল বিষয়বস্তু ও সারসংক্ষেপ: ৫৮টি পঙ্ক্তি বিশিষ্ট এই অমর কাসীদাটি তিনটি প্রধান অংশে বিভক্ত:
- ভূমিকা ও নাসীব (প্রেমিকার স্মৃতিচারণ):
কাসীদার সূচনা হয় প্রচলিত জাহিলী প্রথায় প্রেমিকা সু’আদের বিদায় ও বিরহবেদনার বর্ণনার মাধ্যমে:
بَانَتْ سُعَادُ فَقَلْبِي اليَوْمَ مَتْبُولُ * مُتَيَّمٌ إِثْرَهَا لَمْ يُفْدَ مَكْبُولُ
“সু’আদ বিদায় নিয়েছে, ফলে আজ আমার হৃদয় বিষাদগ্রস্ত ও ভগ্নহৃদয়; তার পিছে বন্দি, কোনো মুক্তিপণ দিয়ে যার বন্ধন খোলা হয়নি।”
এখানে তিনি যৌবনের অস্থিরতা ও দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী মোহ থেকে উত্তরণের ইঙ্গিত দেন। - মরুযাত্রা ও উটের ক্ষিপ্র গতি (وصف الناقة والرحلة):
দ্বিতীয় অংশে কা’ব মদীনা অভিমুখে আসার কঠিন মরুযাত্রার কষ্ট, রুক্ষ প্রান্তর এবং তাঁর বাহন উটনীর দুর্দম গতি ও সহনশীলতার নিখুঁত বর্ণনা দেন, যা জাহিলী বর্ণনারীতির শীর্ষস্থানীয় উদাহরণ। - ক্ষমা প্রার্থনা ও মহানবী (সা.)-এর অনুপম প্রশংসা (الاعتذار والمدح النبوي):
কাসীদার এই অংশটিই এর প্রাণভোমরা। কা’ব চোগলখোরদের গুজবে কান না দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে বলেন:
أُنْبِئْتُ أَنَّ رَسُولَ اللهِ أَوْعَدَنِي * وَالعَفْوُ عِنْدَ رَسُولِ اللهِ مَأْمُولُ
“আমাকে জানানো হয়েছে যে আল্লাহর রাসূল আমাকে শাস্তির হুমকি দিয়েছেন; অথচ আল্লাহর রাসূলের কাছেই তো ক্ষমার প্রত্যাশা করা হয়।”
অতঃপর তিনি মানবতার মুক্তির দূত বিশ্বনবীর প্রশংসায় সেই কালজয়ী পঙ্ক্তিটি উচ্চারণ করেন:
إِنَّ الرَّسُولَ لَنُورٌ يُسْتَضَاءُ بِهِ * مُهَنَّدٌ مِنْ سُيُوفِ اللهِ مَسْلُولُ
“নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসূল এক জ্যোতির্ময় আলোকবর্তিকা, যাঁর আলোতে বিশ্ববাসী সঠিক পথ পায়; তিনি আল্লাহর উন্মুক্ত তরবারিসমূহের মধ্যে ভারতীয় ইস্পাতে তৈরি এক ধারালো তরবারি।”
পরিণতি: কবিতা শুনে দয়ার নবী মুগ্ধ হন এবং নিজের কাঁধ থেকে একখানা ইয়ামানী চাদর নামিয়ে কা’বের গায়ে জড়িয়ে দেন।
١٠- تَحَدَّثْ عَنِ الحَالَةِ الثَّقَافِيَّةِ فِي العَصْرِ الأُمَوِيِّ-
[১০. উমাইয়া যুগের সাংস্কৃতিক অবস্থা ও সাহিত্যিক পরিবেশ সম্পর্কে আলোচনা করো।]
ভূমিকা: খোলাফায়ে রাশেদীনের পর ৪১ হিজরীতে মুয়াবিয়া (রা.) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত উমাইয়া খিলাফত (৪১–১৩২ হি. / ৬৬১–৭৫০ খ্রি.) ছিল আরব ও মুসলিম সভ্যতার বিস্তৃতির এক অনন্য স্বর্ণযুগ। এ যুগে রাজধানী মদীনা থেকে দামেস্কে স্থানান্তরিত হয় এবং ইসলামী সাম্রাজ্য স্পেন থেকে সিন্ধু নদ পর্যন্ত প্রসারিত হওয়ায় এক সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সূচনা ঘটে।
১. ভাষাগত ও সাহিত্যের রূপান্তর:
- রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা: উমাইয়া খলিফাগণ (যেমন মুয়াবিয়া, আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান, আল-ওয়ালিদ) ছিলেন খাঁটি আরব সংস্কৃতির অনুরাগী। তারা রাজদরবারে কবি, সাহিত্যিক ও ঐতিহাসিকদের বিপুল সম্মানে ভূষিত করতেন।
- কবিতার নতুন ধারার বিকাশ: এ যুগে গজলে উযরী বা পবিত্র প্রেমগীতি (যেমন জামিল বুসাইনা, কায়েস লুবনা), রাজনৈতিক কবিতা (বনু উমাইয়া, শিয়া ও খারেজীদের দলীয় কবিতা) এবং নাক্বাইজ (جرير والفرزدق) ধারার অভূতপূর্ব বিকাশ ঘটে।
২. রাষ্ট্রীয় দপ্তরের আরবায়ন (تعريب الدواوين): খলিফা আব্দুল মালিক বিন মারওয়ানের নির্দেশে পূর্বে ফারসি, গ্রিক ও রোমান ভাষায় পরিচালিত রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ও প্রশাসনিক দলিলসমূহ সম্পূর্ণরূপে আরবিতে রূপান্তরিত করা হয়। ফলে আরবি সরকারি ও আন্তর্জাতিক প্রশাসনিক ভাষায় রূপ লাভ করে।
৩. ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক জ্ঞানের উন্মেষ:
- হাদীস সংকলনের সূচনা: খলিফা ওমর বিন আব্দুল আজিজের রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ইবনে শিহাব আয-যুহরী (রহ.)-এর মাধ্যমে হাদীস সংকলনের সুশৃঙ্খল পথযাত্রা শুরু হয়।
- ইতিহাস ও মাগাযী সাহিত্য: রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুদ্ধবিগ্রহ ও জীবনী (আল-মাগাযী ওয়াস সিয়ার) রচনার সূচনা হয় উরওয়াহ বিন যুবায়ের এবং ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহের মাধ্যমে।
৪. জ্ঞান-বিজ্ঞান ও অনুবাদের প্রাথমিক সূচনা: রাজপুত্র খালিদ বিন ইয়াজিদ বিন মুয়াবিয়া (যিনি ‘হাকীমু আলি মারওয়ান’ নামে পরিচিত ছিলেন) চিকিৎসাশাস্ত্র, রসায়ন এবং জ্যোতির্বিদ্যার গ্রিক ও কপটিক গ্রন্থসমূহ সর্বপ্রথম আরবিতে অনুবাদ করার ব্যবস্থা করেন।
৫. স্থাপত্য ও চারুকলা: এ যুগে নির্মিত দামেস্কের সুপ্রসিদ্ধ ‘উমাইয়া জামে মসজিদ’ এবং জেরুজালেমের ‘কুব্বাতুস সাখরা’ (Dome of the Rock) তৎকালীন মুসলিম স্থাপত্য ও আরবি চারুলিপির (خط عربي) চরম উৎকর্ষের প্রমাণ বহন করে।
١١- اُكْتُبْ نُبْذَةً مِنْ حَيَاةِ النَّابِغَةِ الذُّبْيَانِيِّ مَعَ ذِكْرِ خِدْمَاتِهِ فِي الأَدَبِ العَرَبِيِّ-
[১১. নাবিগাহ জুবয়ানী-এর সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত এবং আরবি সাহিত্যে তাঁর অবদান লিপিবদ্ধ করো।]
ভূমিকা: প্রাক-ইসলামী জাহিলী যুগের শীর্ষস্থানীয় মু’আল্লাকা কবিদের অন্যতম হলেন আন-নাবিগাহ আয-যুবয়ানী। সাহিত্য বিচারক ও রাজদরবারের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আরবি সাহিত্যের ইতিহাসে তাঁর স্থান অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ।
১. সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত (نبذة من حياته):
- নাম ও উপাধি: আসল নাম যিয়াদ বিন মুয়াবিয়া (زياد بن معاوية)। তিনি কায়স বংশের বনু জুবয়ান গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন। হঠাৎ পরিণত বয়সে তাঁর কবি প্রতিভার অভূতপূর্ব স্ফুরণ ঘটায় এবং অসাধারণ কবিতা প্রবাহিত হওয়ায় তাঁকে ‘নাবিগাহ’ (النابغة – যার মেধা আকস্মিক বিচ্ছুরিত হয়) উপাধি দেওয়া হয়।
- রাজকীয় জীবন: তিনি হীরা রাজ্যের লাখমীয় রাজা নু’মান বিন মুনযির (النعمان بن المنذر)-এর রাজদরবারে প্রধান সভাকবি হিসেবে বিপুল মর্যাদা ও সম্পদের মালিক হন। পরবর্তীতে শত্রুভাবাপন্ন ব্যক্তিদের চক্রান্তে রাজার সাথে ভুল বোঝাবুঝি হলে তিনি আত্মগোপন করেন এবং গাসসানীয় রাজদরবারে আশ্রয় নেন। অবশেষে তিনি বিশ্ববিখ্যাত ক্ষমা প্রার্থনামূলক কাসীদা (الاعتذاريات) রচনা করে রাজার সন্তুষ্টি লাভ করেন।
- ইন্তেকাল: তিনি মহানবী (সা.)-এর নবুওয়াত প্রকাশের সামান্য পূর্বে আনুমানিক ৬০৪ বা ৬০৫ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।
২. আরবি সাহিত্যে তাঁর অবদান ও বিশিষ্ট স্থান:
- সাহিত্য সমালোচনার সভাপতি (حكم سوق عكاظ): ওকাজ মেলায় প্রতি বছর তাঁর জন্য লাল চামড়ার তাঁবু খাটানো হতো। তৎকালীন আরবের শ্রেষ্ঠ কবিরা— যেমন হাসসান বিন সাবিত, আল-খানসা এবং আল-আ’শা তাঁদের কবিতা নিয়ে আসতেন এবং নাবিগাহ সবার কবিতা শুনে নিরপেক্ষ রায় প্রদান করতেন।
- ক্ষমা প্রার্থনামূলক কাব্যধারার প্রবর্তক (رائد الاعتذاريات): আরবি কবিতায় ভয়, অনুশোচনা ও ক্ষমা প্রার্থনার ধারাকে তিনিই সর্বোচ্চ শিখরে নিয়ে যান। রাজা নু’মানের ক্রোধ উপশমে তাঁর কালজয়ী পঙ্ক্তি:
فَإِنَّكَ كَاللَّيْلِ الَّذِي هُوَ مُدْرِكِي * وَإِنْ خِلْتُ أَنَّ المُنْتَأَى عَنْكَ وَاسِعُ
“নিশ্চয়ই আপনি যেন এক সর্বগ্রাসী রাতের মতো যা আমাকে স্পর্শ করবেই, যদিও আমি ভাবি যে আপনার হাত থেকে পালানোর মতো বিশাল দূরত্ব আমার সামনে খোলা রয়েছে।” - মু’আল্লাকা কাব্য: তাঁর বিখ্যাত মু’আল্লাকা “يَا دَارَ مَيَّةَ بِالعَلْيَاءِ فَالسَّنَدِ” যা ছন্দ, শিল্পসৌকর্য ও নৈতিক উপদেশের এক অনন্য সংকলন। প্রখ্যাত খলিফা হযরত ওমর (রা.) বলতেন: “নাবিগাহ ছিলেন জাহিলী যুগের সবচেয়ে শক্তিশালী ও ভারসাম্যপূর্ণ কবি।”
١٢- تَحَدَّثْ عَنِ النَّقْدِ الأَدَبِيِّ فِي العَصْرِ الأُمَوِيِّ مُفَصَّلاً-
[১২. উমাইয়া যুগে সাহিত্য সমালোচনার (আন-নাক্বদুল আদাবী) ক্রমবিকাশ ও স্বরূপ বিস্তারিত আলোচনা করো।]
ভূমিকা: সাহিত্যের রসাস্বাদন, ত্রুটি-বিচ্যুতি নির্দেশ এবং গুণগত মান নির্ধারণের শাস্ত্রকে সাহিত্য সমালোচনা বা ‘আন-নাক্বদুল আদাবী’ (النقد الأدبي) বলা হয়। জাহিলী যুগের সাধারণ প্রাথমিক সমালোচনা উমাইয়া যুগে এসে একটি প্রণালীবদ্ধ, তুলনামূলক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিজ্ঞানের রূপ ধারণ করে।
১. উমাইয়া যুগে সাহিত্য সমালোচনার উৎস ও ক্ষেত্রসমূহ:
- ক. বসরার আল-মিরবাদ বাজার (سوق المربد بالبصرة): জাহিলী যুগের ওকাজ মেলার বিকল্প হিসেবে উমাইয়া যুগে বসরার মিরবাদ বাজার সাহিত্যিকদের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। সেখানে জারীর, ফারাজদাক্ব ও তাদের ভক্তরা উপস্থিত হয়ে একে অপরের কবিতার ছন্দ, ব্যাকরণ ও ভাবগত ত্রুটি ধরে তাৎক্ষণিক সমালোচনা করতেন।
- খ. মক্কার সুকুকে উকাজ ও হিজাজের মজলিস: মক্কা ও মদীনার সাহিত্য মজলিসে সুকায়না বিনতে আল-হুসাইন (রা.) এবং বিখ্যাত ভাষাতত্ত্ববিদ ইবনে আবি আতীক প্রমুখ সাহিত্য সমালোচনার মজলিস পরিচালনা করতেন। কবি উমর বিন আবি রাবিয়ার প্রেমগীতির ছন্দ ও শালীনতা নিয়ে সেখানে চুলচেরা বিশ্লেষণ হতো।
- গ. উমাইয়া খলিফা ও গভর্নরদের দরবার: খলিফা আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান এবং ইরাকের গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসুফ স্বয়ং কাব্য সমালোচক ছিলেন। তারা রাজদরবারে উপস্থিত কবিদের পরীক্ষার মুখোমুখি করতেন।
২. সাহিত্য সমালোচনার মৌলিক বৈশিষ্ট্যসমূহ:
- তুলনামূলক সমালোচনা (الموازنة بين الشعراء): এ যুগের সমালোচনার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল কবিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণ। যেমন জারীর, ফারাজদাক্ব ও আখতালের মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ— এ নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক হতো। প্রখ্যাত সমালোচকগণ বলতেন: “ফারাজদাক্ব খোদাই করেন পাথরে, আর জারীর তুলে আনেন সমুদ্রের মুক্তা।”
- ভাষাতাত্ত্বিক ও ব্যাকরণিক মানদণ্ড (النقد اللغوي والنحوي): এ যুগে ইলমুন নাহু ও লুগাহর বিকাশ ঘটায় সমালোচকগণ কবিতার ব্যাকরণগত বিশুদ্ধতা (الإعراب) এবং শব্দের ব্যুৎপত্তিগত যথার্থতা পরীক্ষা শুরু করেন।
- ইসলামী নৈতিক মূল্যবোধের প্রভাব: কবিতা ইসলামী শরীয়তের পরিপন্থী কিনা, অতিমাত্রায় মদ্যপান ও বেহায়াপনা উৎসাহিত করছে কিনা— তা সমালোচনার অন্যতম শর্তে পরিণত হয়।
مجموعة (ب) / খ-বিভাগ (الدرجة— ٤ × ٥ = ٢٠)
(أجب عن أربعة من الأسئلة الآتية)
١٣- اُكْتُبْ أَغْرَاضَ الشِّعْرِ الجَاهِلِيِّ-
[১৩. জাহিলী কবিতার বিষয়বস্তু বা উদ্দেশ্যসমূহ (আ’গরায) লিপিবদ্ধ করো।]
উত্তর: জাহিলী যুগে কবিরা যেসকল সুনির্দিষ্ট ভাব ও উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করে কবিতা রচনা করতেন, সেগুলোকে ‘আ’গরাযুশ শির’ (أغراض الشعر) বলা হয়। প্রধান বিষয়বস্তুগুলো নিম্নরূপ:
- আল-ফখর ওয়াল হামাসাহ (الفخر والحماسة – আত্মগৌরব ও বীরত্বগাথা): নিজের বীরত্ব, আত্মমর্যাদা ও গোত্রের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করা। যেমন আমর বিন কুলসুমের কাসীদা।
- আল-মাদহ (المدح – প্রশংসা): রাজা, সর্দার ও দানশীল ব্যক্তিদের মহত্ত্ব ও বদান্যতার প্রশংসা করা। যেমন জুহাইর বিন আবি সুলমা কর্তৃক হারিস বিন আওফের প্রশংসা।
- আল-হিজা (الهجاء – নিন্দা ও ব্যঙ্গোক্তি): শত্রু গোত্রের দুর্বলতা, কৃপণতা ও কাপুরুষতার তীব্র কটাক্ষ করা।
- আল-গযল (الغزل – প্রেম ও প্রণয়): প্রেমিকার রূপ-লাবণ্য, সৌন্দর্য ও বিরহের আকুতি বর্ণনা করা। এটি ছিল কাসীদার অন্যতম সূচনা অংশ।
- আর-রিছা (الرثاء – শোকগাঁথা): গোত্রের কোনো বীর বা প্রিয়জনের মৃত্যুতে বিলাপ ও বেদনা প্রকাশ। যেমন আল-খানসার শোকগাঁথা।
- আল-ওয়াসফ (الوصف – প্রকৃতি ও বস্তুর বর্ণনা): মরুভূমির রুক্ষতা, উট, ঘোড়া, শিকার ও বৃষ্টির অপরূপ নিখুঁত চিত্রায়ন।
- আল-হিকমাহ (الحكمة – প্রজ্ঞা ও উপদেশ): জীবনের অভিজ্ঞতা ও গভীর দর্শন প্রকাশ। যেমন কবি যুহাইর ও লাবীদের কবিতা।
١٤- اُكْتُبْ خَصَائِصَ مُعَلَّقَةِ امْرِئِ القَيْسِ-
[১৪. ইমরুল কায়েসের মু’আল্লাকার প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ লিপিবদ্ধ করো।]
উত্তর: ‘আমীরুশ শুআরা’ নামে খ্যাত ইমরুল কায়েসের মু’আল্লাকা “قِفَا نَبْكِ مِنْ ذِكْرَى حَبِيبٍ وَمَنْزِلِ” আরবি সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ শাহকার। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ হলো:
- ধ্বংসাবশেষের স্মৃতিচারণের প্রবর্তক: প্রেমিকার পরিত্যক্ত ভিটার স্মৃতিচারণ করে কান্নার ঐতিহ্য (البكاء على الأطلال) তিনিই প্রথম নিখুঁতভাবে প্রবর্তন করেন।
- অনুপম দৃশ্যমান উপমা: রাতের নিস্তব্ধতা ও দীর্ঘতাকে সাগরের ঢেউয়ের সাথে তুলনা:
وَلَيْلٍ كَمَوْجِ البَحْرِ أَرْخَى سُدُولَهُ * عَلَيَّ بِأَنْوَاعِ الهُمُومِ لِيَبْتَلِي - অশ্ব ও শিকারের গতিময় বর্ণনা: অশ্বের তীব্র গতি ও শক্তিমত্তার বর্ণনা আধুনিক চলচ্চিত্রের ফ্রেমের মতো জীবন্ত।
- শব্দশৈলীর সাবলীলতা ও সুরের লালিত্য: বাহরে তাওয়ীল ছন্দে রচিত এই কাসীদার প্রতিটি শব্দে এক অবিরাম সাংগীতিক মূর্ছনা বিদ্যমান।
١٥- اُكْتُبْ أَسْمَاءَ الشُّعَرَاءِ المُخَضْرَمِينَ-
[১৫. কয়েকজন বিশিষ্ট মুখাযরাম কবির নাম ও পরিচয় লিপিবদ্ধ করো।]
উত্তর: প্রাক-ইসলামী জাহিলী যুগ ও ইসলামী যুগ উভয়টির প্রত্যক্ষদর্শী এবং ইসলাম গ্রহণকারী বিশিষ্ট মুখাযরাম কবিগণ হলেন:
- হযরত হাসসান বিন সাবিত (حسان بن ثابت): রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রধান কবি এবং ইসলামের প্রথম সারির সাহিত্যিক রক্ষক।
- হযরত কা’ব বিন যুহাইর (كعب بن زهير): প্রখ্যাত জাহিলী কবি যুহাইর বিন আবি সুলমার পুত্র এবং বিশ্বখ্যাত ‘বানাত সু’আদ’ কাসীদার রচয়িতা।
- হযরত আল-খানসা – তুমাদির বিনতে আমর (الخنساء): আরবি সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ শোকগাঁথা (মরসিয়া) রচয়িত্রী।
- হযরত লাবিদ বিন রাবীআহ (لبيد بن ربيعة): মু’আল্লাকার অমর কবি, যিনি ইসলাম গ্রহণের পর তাকওয়াপূর্ণ জীবন বেছে নেন।
- হযরত আল-হুতাইআহ (الحطيئة): ব্যঙ্গাত্মক কবিতা ও দীর্ঘ কাসীদায় পারদর্শী কবি।
١٦- اُكْتُبْ أَرْبَعَةَ أَبْيَاتٍ مِنَ الشِّعْرِ الجَاهِلِيِّ-
[১৬. জাহিলী কবিতার চারটি পঙ্ক্তি (অর্থসহ) লিপিবদ্ধ করো।]
উত্তর: প্রাক-ইসলামী জাহিলী যুগের অমর কবি যুহাইর বিন আবি সুলমার হিকমত ও জীবনদর্শনের সুপ্রসিদ্ধ চারটি পঙ্ক্তি নিম্নে প্রদত্ত হলো:
١- سَئِمْتُ تَكَالِيفَ الحَيَاةِ وَمَنْ يَعِشْ * ثَمَانِينَ حَوْلاً لاَ أَبَا لَكَ يَسْأَمِ
অর্থ: “আমি জীবনের যাবতীয় দুঃখ-কষ্টে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি; আর যে ব্যক্তি আশিটি বছর বেঁচে থাকে, নিঃসন্দেহে সে জীবনে বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ে।”
٢- وَأَعْلَمُ عِلْمَ اليَوْمِ وَالأَمْسِ قَبْلَهُ * وَلَكِنَّنِي عَنْ عِلْمِ مَا فِي غَدٍ عَمِ
অর্থ: “আমি বর্তমানের জ্ঞান রাখি এবং তার আগের অতীতের জ্ঞানও আমার জানা আছে; কিন্তু আগামীকালের ভাগ্যে কী ঘটবে সে সম্পর্কে আমি সম্পূর্ণ অন্ধ ও অজ্ঞ।”
٣- وَمَنْ يَجْعَلِ المَعْرُوفَ مِنْ دُونِ عِرْضِهِ * يَفِرْهُ وَمَنْ لاَ يَتَّقِ الشَّتْمَ يُشْتَمِ
অর্থ: “যে ব্যক্তি নিজের সম্মান রক্ষার্থে সৎকাজ ও বদান্যতাকে ঢাল বানায়, তার মর্যাদা অটুট থাকে; আর যে ব্যক্তি মন্দ বাক্য থেকে নিজেকে রক্ষা করে না, সে তিরস্কৃত হয়।”
٤- وَمَنْ هَابَ أَسْبَابَ المَنَايَا يَنَلْنَهُ * وَإِنْ يَرْقَ أَسْبَابَ السَّمَاءِ بِسُلَّمِ
অর্থ: “মৃত্যুর মুখোমুখি হতে যে ভয় পায়, মৃত্যু তাকে স্পর্শ করবেই; যদিও সে সিঁড়ি বেয়ে আকাশে উঠে আশ্রয় গ্রহণ করে।”
١٧- مَنْ هُوَ جَرِيرٌ؟ اُكْتُبْ نُبْذَةً مِنْ حَيَاتِهِ-
[১৭. জারীর কে? তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত লিপিবদ্ধ করো।]
উত্তর: জারীর উমাইয়া যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ তিন কবির একজন। তাঁর বিস্তারিত পরিচয় নিম্নরূপ:
- নাম ও বংশ: পূর্ণ নাম জারীর বিন আতিয়্যাহ বিন হুজায়ফা আল-খাতাফী আত-তামীমী। তিনি ইরাকের নজদ অঞ্চলে বনু তামীম গোত্রের সাধারণ বনু কুলাইব পরিবারে আনুমানিক ৩৩ হিজরীতে (৬৫৩ খ্রি.) জন্মগ্রহণ করেন।
- সাহিত্যিক প্রতিভা: তিনি ছিলেন অত্যন্ত কোমল স্বভাবের, গভীর আবেগপ্রবণ ও সহজাত কবি। তিনি প্রেমগীতি (গযল), শোকগাঁথা এবং নাক্বাইজ ধারায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। বিশেষ করে তাঁর বিরহগাথা আজও আরবে লোকমুখে গীত হয়:
إِنَّ العُيُونَ الَّتِي فِي طَرْفِهَا حَوَرٌ * قَتَلْنَنَا ثُمَّ لَمْ يُحْيِينَ قَتْلاَنَا - আখলাক ও দীনদারী: সমকালীন অন্যান্য কবিদের তুলনায় তিনি ব্যক্তিগত জীবনে সচ্চরিত্রবান, একপত্নীক এবং ধার্মিক ছিলেন।
- মৃত্যু: তিনি দীর্ঘকাল বেঁচে থাকার পর তাঁর দীর্ঘদিনের কাব্যপ্রতিদ্বন্দ্বী কবি ফারাজদাক্বের ইন্তেকালের অল্প কিছুদিন পরেই ১১০ বা ১১১ হিজরীতে (৭২৮ খ্রি.) মৃত্যুবরণ করেন। ফারাজদাক্বের মৃত্যুতে তিনি এক অপূর্ব শোককাব্য রচনা করেছিলেন।
١٨- اُكْتُبْ أَغْرَاضَ النَّثْرِ الأُمَوِيِّ-
[১৮. উমাইয়া গদ্য সাহিত্যের বিষয়বস্তু ও উদ্দেশ্যসমূহ লিপিবদ্ধ করো।]
উত্তর: উমাইয়া যুগে ইসলামি সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি এবং রাজনৈতিক সংঘাতের ফলে আরবি গদ্যের (النثر) অভাবনীয় রূপান্তর ঘটে। এ যুগের প্রধান গদ্যের উদ্দেশ্য ও ক্ষেত্রসমূহ হলো:
- আল-খুতাবাহ (الخطابة – ভাষণ ও বক্তৃতা): এটি ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। এর প্রধান তিনটি শাখা ছিল:
- রাজনৈতিক ভাষণ: জনগণকে অনুগত রাখা বা বিদ্রোহে উস্কানি দিতে ব্যবহৃত হতো। যেমন যিয়াদ বিন আবিহীর বিখ্যাত ‘খুতবায়ে বাত্রা’ এবং হাজ্জাজ বিন ইউসুফের কুফার ঐতিহাসিক ভাষণ।
- ধর্মীয় ওয়ায ও নসীহত: হাসান আল-বসরীর মতো বুজুর্গদের দুনিয়াবিমুখতা ও আখেরাতমুখী ভাষণ।
- সামরিক ও যুদ্ধের ভাষণ: মুজাহিদদের জিহাদে উদ্বুদ্ধ করতে সেনাপতিদের ভাষণ। যেমন তারিক বিন জিয়াদের স্পেনের ভাষণ।
- আর-রাসায়েল (الرسائل – পত্র সাহিত্য): রাষ্ট্রীয় এবং ব্যক্তিগত পত্রালাপ। এ যুগে সরকারি দপ্তর আরবায়িত হওয়ায় প্রশাসনিক পত্র আদান-প্রদান নতুন শিল্পে পরিণত হয়। বিখ্যাত সচিব আব্দুল হামিদ আল-কাতিব (عبد الحميد الكاتب)-এর হাতে প্রাতিষ্ঠানিক পত্রসাহিত্যের বুনিয়াদ স্থাপিত হয়। এজন্য প্রবাদ প্রচলিত আছে: “পত্রসাহিত্য আব্দুল হামিদের মাধ্যমে শুরু হয়েছে আর ইবনে আমীদের মাধ্যমে সমাপ্ত হয়েছে।”
- আল-উহূদ ওয়াল ওয়াসায়া (العهود والوصايا – চুক্তি ও উপদেশমালা): খলিফা ও বিজ্ঞজনদের রাষ্ট্রীয় চুক্তি এবং সন্তানদের প্রতি মূল্যবান দিকনির্দেশনামূলক উপদেশ।
١٩- قَدِّرْ مُسَاهَمَةَ الشَّاعِرِ الفَرَزْدَقِ فِي الشِّعْرِ العَرَبِيِّ-
[১৯. আরবি কবিতায় কবি আল-ফারাজদাক্বের অবদান মূল্যায়ন করো।]
উত্তর: হাম্মাম বিন গালিব, যিনি ‘আল-ফারাজদাক্ব’ (الفرزدق – পিষ্ট রুটি বা গোলগাল চেহারাবিশিষ্ট) নামে খ্যাত, উমাইয়া যুগের এক পর্বতসম কবি প্রতিভা। আরবি কবিতায় তাঁর অবদান নিম্নরূপ:
- ভাষার দুর্লভ সম্পদ সংরক্ষণ: ফারাজদাক্ব ছিলেন প্রাচীন আরবি ভাষার চলন্ত অভিধান। প্রাচীন দুরূহ শব্দ, বিরল ই’রাব এবং ব্যাকরণিক প্রয়োগে তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়। এজন্য প্রাচীন বিদ্বানদের বিখ্যাত উক্তি:
“لَوْلاَ شِعْرُ الفَرَزْدَقِ لَذَهَبَ ثُلُثُ لُغَةِ العَرَبِ”
“ফারাজদাক্বের কবিতা যদি না থাকত, তবে আরবি ভাষার এক-তৃতীয়াংশ বিলুপ্ত হয়ে যেত।” - ফখর বা আত্মগৌরবের শিখর: তাঁর পিতামহ সাসাআ বিন নাজিয়া জাহিলী যুগে জীবন্ত কবর দেওয়া কন্যাসন্তানদের মুক্তিপণের বিনিময়ে রক্ষা করতেন। ফারাজদাক্ব তাঁর কবিতায় এই দানশীলতা ও বংশমর্যাদা অত্যন্ত রাজকীয় ভঙ্গিতে তুলে ধরেন।
- আহলে বাইতের মর্যাদা রক্ষায় ঐতিহাসিক কাসীদা: উমাইয়া খলিফা হিশাম বিন আব্দুল মালিক যখন কাবা তাওয়াফকালে ইমাম জয়নুল আবেদীনকে দেখে না চেনার ভান করেন, তখন ফারাজদাক্ব নির্ভীকচিত্তে রাজদরবারে দাঁড়িয়ে ইমামের প্রশংসায় যে ঐতিহাসিক কাসীদা পাঠ করেছিলেন, তা চিরস্মরণীয়:
هَذَا الَّذِي تَعْرِفُ البَطْحَاءُ وَطْأَتَهُ * وَالبَيْتُ يَعْرِفُهُ وَالحِلُّ وَالحَرَمُ
“ইনিই সেই ব্যক্তিত্ব যাঁর পদচিহ্ন মক্কার প্রতিটি ধূলিকণা চেনে, এবং কাবা ঘর, হেরেম ও হেরেমের বাইরের প্রতিটি প্রান্ত যাঁকে গভীর শ্রদ্ধায় চেনে!”
٢٠- مَتَى بَدَأَ العَصْرُ الأُمَوِيُّ وَمَتَى انْتَهَى؟
[২০. উমাইয়া যুগ কবে শুরু হয় এবং কবে সমাপ্ত হয়?]
উত্তর: ইসলামের ইতিহাসে রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে উমাইয়া যুগ এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এর সূচনা ও সমাপ্তির সময়রেখা নিম্নরূপ:
- সূচনা (البداية): উমাইয়া যুগের সূচনা হয় ৪১ হিজরীতে (৬৬১ খ্রিষ্টাব্দে)। চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রা.)-এর শাহাদাত এবং তৎপুত্র হযরত হাসান (রা.) কর্তৃক মুসলিম উম্মাহর রক্তক্ষয় বন্ধে হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর অনুকূলে খেলাফত হস্তান্তরের মাধ্যমে এই যুগের সূচনা হয়। এই বছরটিকে মুসলিম ইতিহাসে ‘আমুল জামাআত’ (عام الجماعة – ঐক্যের বছর) বলা হয়।
- সমাপ্তি (النهاية): উমাইয়া খেলাফতের সমাপ্তি ঘটে ১৩২ হিজরীতে (৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে)। ঐতিহাসিক ‘যাব’-এর যুদ্ধে (معركة الزاب) আব্বাসীয়দের হাতে সর্বশেষ উমাইয়া খলিফা দ্বিতীয় মারওয়ানের পরাজয় ও হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে উমাইয়া যুগের অবসান ঘটে এবং বাগদাদকেন্দ্রিক আব্বাসীয় যুগের শুভ সূচনা হয়।
- মোট স্থায়িত্বকাল: প্রাচ্যে উমাইয়াদের শাসনকাল মোট ৯১ হিজরী বছর (প্রায় ৮৯ খ্রিষ্টাব্দীয় বছর) স্থায়ী হয়েছিল। পরবর্তীতে উমাইয়া রাজপুত্র আব্দুর রহমান আদ-দাখিল আন্দালুসে (স্পেনে) পুনরায় ১৩৮ হিজরীতে উমাইয়া আমিরাত প্রতিষ্ঠা করেন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. তারীখুল আদাবিল আরাবী-১ কোর্সের মূল আলোচ্য বিষয় কী?
তারীখুল আদাবিল আরাবী-১ পত্রটিতে প্রাক-ইসলামী জাহিলী যুগ থেকে শুরু করে ইসলামের আবির্ভাব, খোলাফায়ে রাশেদীন এবং উমাইয়া খিলাফতের পতন (১–১৩২ হি.) পর্যন্ত আরবি কবিতা, গদ্য, সাহিত্যিক পরিবেশ ও বিশিষ্ট কবি-সাহিত্যিকদের অবদান পর্যালোচনা করা হয়।
২. জাহিলী কবিতার প্রধান সাতটি মু’আল্লাকা বলতে কী বোঝায়?
মু’আল্লাকাত হলো জাহিলী যুগের শ্রেষ্ঠ সাতজন কবির (ইমরুল কায়েস, তারাফাহ, যুহাইর, লাবীদ, আমর বিন কুলসুম, আনতারা, হারিস বিন হিল্লিযাহ) রচিত দীর্ঘ কাসীদা, যা তাদের সাহিত্যিক উৎকর্ষের কারণে স্বর্ণাক্ষরে লিখে কাবা শরীফের দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল বলে বর্ণনা রয়েছে।
৩. উমাইয়া যুগের নাক্বাইজ কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য কী?
নাক্বাইজ হলো একই ছন্দ ও অন্ত্যমিলে রচিত প্রতিদ্বন্দিতামূলক কাব্যযুদ্ধ, যেখানে এক কবি অপর কবির আত্মগৌরব বা ব্যঙ্গোক্তিকে খণ্ডন করে তৎক্ষণাৎ পাল্টা কাসীদা রচনা করতেন। জারীর ও ফারাজদাক্ব এই ধারার শ্রেষ্ঠ রূপকার ছিলেন।
৪. মুখাযরাম কবি কাকে বলা হয়?
যে সকল কবি জাহিলী যুগের অংশবিশেষ পেয়েছেন এবং ইসলাম আগমনের পর নবুওয়াত ও রিসালাতের আলো লাভ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন, তাঁদের সাহিত্য পরিভাষায় ‘শুআরাউল মুখাযরামুন’ বা মুখাযরাম কবি বলা হয়। যেমন হযরত হাসসান বিন সাবিত (রা.)।
৫. জাহিলী কবিতাকে ‘আরবদের রেজিস্টার’ বা ‘দেওয়ানুল আরব’ বলা হয় কেন?
প্রাক-ইসলামী আরবে প্রাতিষ্ঠানিক লিখিত ইতিহাস সংরক্ষণের ব্যবস্থা ছিল না। তৎকালীন আরবের যুদ্ধবিগ্রহ, বংশমর্যাদা, ভূগোল, সামাজিক প্রথা, রীতিনীতি ও সংস্কৃতির সমস্ত তথ্য কবিতাতেই অবিকৃতভাবে সংরক্ষিত ছিল বলে একে ‘দেওয়ানুল আরব’ (دیوان العرب) বলা হয়।
৬. কা’ব ইবনে যুহাইর রচিত ‘বানাত সু’আদ’ কাসীদাকে কেন বুরদাহ বলা হয়?
কা’ব ইবনে যুহাইর (রা.) যখন দরবারে নববীতে উপস্থিত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনাপূর্বক এই কাসীদাটি পাঠ করেন, তখন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) আনন্দিত হয়ে নিজের পবিত্র গায়ের ইয়ামানী চাদর বা ‘বুরদাহ’ উপহার দিয়েছিলেন। এ কারণেই এটি ‘কাসীদাতুল বুরদাহ’ নামে সুপরিচিত।