পরীক্ষা কোড: ২০২ | প্রশ্নপত্র কোড: ০৬৮
اختبار السنة الثانية للفاضل البكالوريوس (الشرف)، لعام ٢٠٢٤
[ফাজিল স্নাতক (সম্মান) দ্বিতীয় বর্ষ পরীক্ষা, ২০২৪]
اللغة العربية وآدابها
[আরবি ভাষা ও সাহিত্য]
تاريخ الأدب العربي-١ (من العهد الجاهلي إلى العهد الأموي)
[আরবি সাহিত্যের ইতিহাস-১ (জাহিলী যুগ থেকে উমাইয়া যুগ পর্যন্ত)]
বিষয় কোড: ২০৪২০৫
الزمن: ٤ ساعات | الدرجات الكاملة: ٨٠
[সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০]
الملاحظة: أجب عن ستة من مجموعة (أ) وعن أربعة من مجموعة (ب)
[দ্রষ্টব্য: ক-বিভাগ থেকে যেকোনো ৬টি এবং খ-বিভাগ থেকে যেকোনো ৪টি প্রশ্নের উত্তর দাও।]
مجموعة (أ) / ক-বিভাগ (الدرجة— ٦ × ١٠ = ٦٠)
١- مَا هِىَ جَزِيرَةُ العَرَبِ؟ بَيِّنْ أَقْسَامَهَا مِنْ حَيْثُ السُّكَّانِ وَالأَقَالِيمِ-
[১. জাযিরাতুল আরব (আরব উপদ্বীপ) কাকে বলে? এর অধিবাসী ও ভৌগোলিক অঞ্চলের শ্রেণিবিভাগ বিশদভাবে আলোচনা করো।]
১. জাযিরাতুল আরবের ভৌগোলিক পরিচয়:
তিন দিকে জলরাশি (দক্ষিণে ভারত মহাসাগর/আরব সাগর, পূর্বে পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগর, পশ্চিমে লোহিত সাগর) এবং উত্তর দিকে স্থলভাগ (সিরিয়া ও ইরাকের মরুভূমি) দ্বারা বেষ্টিত এশিয়া মহাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় বিশাল ভূখণ্ডকে ‘জাযিরাতুল আরব’ বা আরব উপদ্বীপ বলা হয়। প্রাচীন আরবরা একে একটি দ্বীপ হিসেবে বিবেচনা করত বলেই একে ‘জাযিরা’ নামকরণ করা হয়েছে।
২. অধিবাসীদের বিচারে আরবের শ্রেণিবিভাগ:
ইতিহাসবিদ ও বংশতালিকাবিদগণ প্রাচীন আরব অধিবাসীদের মূলত তিনটি প্রধান শাখায় বিভক্ত করেছেন:
- ক. আল-আরবুল বায়েদাহ (العرب البائدة – বিলুপ্ত আরব): প্রাচীনতম আরব জাতিসমূহ, যারা ইসলামের ইতিহাসের বহু পূর্বেই আল্লাহর অবাধ্যতার দরুন ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল। যেমন: আদ, সামূদ, তাসম, জাদীস ও আমালিক্বা সম্প্রদায়।
- খ. আল-আরবুল আরেবাহ (العرب العاربة – খাঁটি আরব): যারা হযরত ক্বাহতানের বংশধর এবং যাদের মূল আবাস ছিল ইয়েমেনে। এদের কাহতানী আরবও বলা হয়। পরবর্তীতে মা’রিব বাঁধ ভেঙে গেলে এরা হেজাজ, নজদ ও সিরিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। যেমন: আওস, খাজরাজ, জুহায়না ও গাসসান গোত্র।
- গ. আল-আরবুল মুসতা’রেবাহ (العرب المستعربة – মিশ্র বা বহিরাগত আরব): হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)-এর বংশধরগণ, যারা বিশুদ্ধ কাহতানী জুরহুম গোত্রের সাথে বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে বিশুদ্ধ আরবি ভাষা শিক্ষা গ্রহণ করেন। এদের ‘আদনানী আরব’ও বলা হয়। কুরাইশ গোত্র এবং স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.) এই আদনানী ধারার অন্তর্ভুক্ত।
৩. ভূপ্রাকৃতিক অঞ্চলের বিচারে আরবের বিভাজন (الأقاليم):
- আল-হিজায (الحجاز): মধ্য ও পশ্চিম আরবের পার্বত্য অঞ্চল, যা লোহিত সাগরের সমভূমি থেকে নজদ মালভূমিকে আড়াল করে রাখে। মক্কা, মদিনা ও তায়েফ এর অন্তর্গত।
- তিহামাহ (تهامة): লোহিত সাগরের উপকূলবর্তী তীব্র উষ্ণ ও আর্দ্র নিম্নাঞ্চল।
- নাজদ (نجد): মধ্য আরবের সুবিশাল উন্মুক্ত শুষ্ক মালভূমি অঞ্চল।
- আল-ইয়ামান (اليمن): দক্ষিণ আরবের সুজলা-সুফলা ও উর্বর শস্যশ্যামল ঐতিহাসিক ভূখণ্ড।
- আল-আরূয (العروض): ইয়ামামাহ, ওমান ও বাহরাইন সংলগ্ন পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চল।
٢- مَا هُوَ العَصْرُ الجَاهِلِىُّ؟ اكْتُبْ مُمَيِّزَاتِ الأَدَبِ لِلْعَصْرِ الجَاهِلِىِّ مُوجَزًا-
[২. জাহিলী যুগ কাকে বলে? সংক্ষেপে জাহিলী সাহিত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ লেখো।]
১. জাহিলী যুগের সংজ্ঞা ও সময়কাল:
ইসলামের শুভাগমনের পূর্বে আরবের যে যুগে মানুষ তাওহীদের শিক্ষা বিস্মৃত হয়ে পৌত্তলিকতা, অনৈতিকতা, অন্ধ গোত্রীয় আভিজাত্য, মদ, জুয়া ও রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্বে লিপ্ত ছিল, তাকে ইতিহাসে ‘আইয়ামে জাহিলিয়্যাত’ বা জাহিলী যুগ বলা হয়। সাহিত্যের পরিভাষায়, ইসলাম আবির্ভাবের পূর্ববর্তী প্রায় দেড়শত বছর (৫০০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ৬১০ খ্রিষ্টাব্দ) সময়কালকে সাহিত্যের জাহিলী যুগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
২. জাহিলী সাহিত্যের প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য:
- মরু জীবনের বাস্তব প্রতিচ্ছবি: জাহিলী কবিতা ছিল মরুভূমির প্রত্যক্ষ দর্পণ। যাযাবরদের তাঁবু, উট, ঘোড়া, বিরান ভিটা (আতলাল), শিকার, মরুর ঝড় ও বন্য পশুর নিখুঁত চিত্রায়ন এতে ফুটে উঠেছে।
- ভাষার সারল্য ও অলঙ্কারসমৃদ্ধ ওযন: কৃত্রিম জটিলতা পরিহার করে শক্তিশালী, ভাবগম্ভীর ও প্রাঞ্জল শব্দচয়ন এবং আরবি ছন্দের (বাহর ও কাফিয়া) কঠোর অনুসরণ।
- কাসিদার ঐতিহ্যবাহী কাঠামো: প্রতিটি দীর্ঘ কবিতা সাধারণত নাসীব বা প্রেমাস্পদের স্মৃতিচারণ, পথচলার বর্ণনা (রেহলাহ) এবং পরিশেষে মূল উদ্দেশ্য (প্রশংসা, শোকগাথা বা আত্মগৌরব) দিয়ে সাজানো হতো।
- গোত্রপ্রীতি ও আত্মমর্যাদা (আল-হামাসাহ): নিজ গোত্রের শৌর্যবীর্য, বীরত্ব, মেহমানদারি ও দানশীলতার আত্মতৃপ্তিমূলক বয়ান এবং শত্রুর বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণাত্মক চেতনা।
- কাল্পনিক মিথ্যার অনুপস্থিতি: রূপক বা পৌরাণিক কাহিনীর চেয়ে বাস্তব অনুভূতি ও ইন্দ্রিয়লব্ধ অভিজ্ঞতার প্রাধান্য ছিল অত্যন্ত প্রবল।
٣- عَرِّفِ الشِّعْرَ، ثُمَّ بَيِّنْ نَشْأَةَ الشِّعْرِ العَرَبِىِّ وَتَطَوُّرَهُ-
[৩. কবিতার সংজ্ঞা দাও। অতঃপর আরবি কবিতার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ বিশদভাবে আলোচনা করো।]
১. কবিতার সংজ্ঞা:
- আভিধানিক অর্থ: ‘আশ-শি’র’ (الشعر) শব্দের অর্থ অনুভূতি, অন্তর্দৃষ্টি বা সূক্ষ্ম উপলব্ধি।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: কুদামা ইবনে জা’ফর ও ইমাম সা’লাব (রহ.)-এর মতে— «الكَلَامُ المَوْزُونُ المُقَفَّى الدَّالُّ عَلَى مَعْنًى» অর্থাৎ, নির্দিষ্ট ছন্দ (ওযন) ও অন্ত্যমিল (কাফিয়া) যুক্ত অর্থপূর্ণ এমন আবেগময়ী বাণীকে কবিতা বলে, যা মানবহৃদয়ে গভীর প্রভাব বিস্তার করে।
২. আরবি কবিতার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ:
- হুদাহ ও সাজ’ (সূচনালগ্ন): মরুভূমিতে উট চালনার সময় বেদুঈনরা ছন্দময় গান গাইত, যাকে ‘হুদা’ (الحداء) বলা হতো। উটের পদধ্বনির সাথে সামঞ্জস্য রেখে এই ছন্দ ধীরে ধীরে অন্ত্যমিলযুক্ত গদ্য ‘সাজ’ (السجع)-এ রূপান্তরিত হয়।
- রজয ছন্দের বিকাশ: সাজের ক্রমবিকাশের ফলে এক ধরনের ক্ষুদ্র ছন্দ ‘রজয’ (الرجز)-এর উদ্ভব হয়, যা যুদ্ধক্ষেত্রে বীরত্ব ও হুংকার প্রকাশের জন্য ব্যবহৃত হতো। একে সাহিত্যের প্রাথমিক রূপ বলা হয়।
- কাসীদার পূর্ণাঙ্গ রূপ (মুহালহিল ও ইমরুল কায়েস): খ্রিষ্টীয় পঞ্চম শতাব্দীর শেষভাগে মুহালহিল ইবনে রাবীআ প্রথম দীর্ঘ কাসীদা রচনা শুরু করেন। অতঃপর ইমরুল কায়েস এসে আরবি কবিতার ছন্দ, বিষয়বিন্যাস ও উপমার এক বৈপ্লবিক মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করেন। উকাজ মেলা (سوق عكاظ) এই কাব্যচর্চাকে আরবের জাতীয় মর্যাদার প্রতীকে রূপান্তর করে।
٤- مَا مَعْنَى المُعَلَّقَةِ؟ وَمَنْ هُمْ أَصْحَابُ المُعَلَّقَةِ؟ بَيِّنْ مَزَايَا مُعَلَّقَةِ زُهَيْرِ بْنِ أَبِى سُلْمَى-
[৪. মুআল্লাকা শব্দের অর্থ কী? মুআল্লাকার রচয়িতাগণ কারা? যুহাইর ইবনে আবি সুলমার মুআল্লাকার প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা করো।]
১. মুআল্লাকার অর্থ ও পটভূমি:
‘মুআল্লাকা’ (المعلقة) শব্দটি ‘আল্লাকা’ ধাতু থেকে গৃহীত, যার অর্থ ঝুলিয়ে রাখা বা মূল্যবান বস্তু। জাহিলী যুগের কবিদের মধ্য থেকে উকাজ মেলার কাব্য প্রতিযোগিতায় বিজয়ী শ্রেষ্ঠ ৭টি (মতান্তরে ১০টি) দীর্ঘ কাসীদাকে সোনার জলে লিখে পবিত্র কা’বা শরীফের দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। শ্রেষ্ঠত্ব ও কা’বায় ঝোলানোর কারণেই এগুলোকে ‘মুআল্লাকাত’ (المعلقات) বলা হয়।
২. আসহাবুল মুআল্লাকাত (মুআল্লাকার প্রধান ৭ কবি):
- ইমরুল কায়েস (امرؤ القيس)
- তারাফাহ ইবনুল আবদ (طرفة بن العبد)
- যুহাইর ইবনে আবি সুলমা (زهير بن أبي سلمى)
- লাবীদ ইবনে রাবীআ (لبيد بن ربيعة)
- আমর ইবনে কুলসূম (عمرو بن كلثوم)
- আনতারাহ ইবনে শাদ্দাদ (عنترة بن شداد)
- হারিস ইবনে হিল্লিযাহ (الحارث بن حلزة)
৩. যুহাইর ইবনে আবি সুলমার মুআল্লাকার প্রধান বৈশিষ্ট্য:
- শান্তিবাদ ও যুদ্ধের ভয়াবহতা চিত্রায়ন: দাহিস ও গাবরা যুদ্ধের দীর্ঘ রক্তপাতের অবসান ঘটিয়ে বনু আবস ও বনু যুবয়ান গোত্রের মাঝে শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী দুই মহান নেতা (হারিস ইবনে আওফ ও হরম ইবনে সিনান)-এর ভূয়সী প্রশংসা করা হয়েছে।
- চিরন্তন হিকমত ও জীবনদর্শন: তাঁর কবিতার শেষাংশ নীতিবাক্য, পরকালচেতনা এবং জীবনের প্রজ্ঞাপূর্ণ উপদেশে ভরপুর। যেমন: «وَمَنْ يَجْعَلِ المَعْرُوفَ مِنْ دُونِ عِرْضِهِ يَفِرْهُ…»।
- অশ্লীলতামুক্ত শালীন ভাষা: অন্যান্য জাহিলী কবির মতো তিনি উন্মত্ত প্রেম বা অশ্লীল বর্ণনায় লিপ্ত হননি; বরং সত্যবাদিতা ও মার্জিত বাক্যচয়নে তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
- ‘হাওলিয়্যাত’ বা বর্ষব্যাপী সাধনা: যুহাইর চার মাসে একটি কাসীদা লিখতেন, চার মাস তা সংশোধন করতেন এবং চার মাস বন্ধুদের মতামত নিতেন; ফলে তাঁর কাব্য ছিল অতি সুসংহত ও নিখুঁত।
٥- قَدِّرْ أَثَرَ القُرْآنِ الكَرِيمِ فِى تَنْمِيَةِ اللُّغَةِ العَرَبِيَّةِ وَآدَابِهَا-
[৫. আরবি ভাষা ও সাহিত্যের সমৃদ্ধি ও উৎকর্ষে পবিত্র কুরআনের প্রভাব মূল্যায়ন করো।]
পবিত্র কুরআনের অবতরণ ছিল আরবি ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ বিপ্লব। কুরআন আরবি ভাষাকে এক সাধারণ আঞ্চলিক ভাষা থেকে বিশ্বজনীন অমর ভাষায় রূপান্তরিত করেছে:
- ভাষার স্থায়িত্ব ও আন্তর্জাতিকীকরণ: পৃথিবীর শত শত প্রাচীন ভাষা বিলুপ্ত হয়ে গেলেও কুরআন নাযিলের কারণে আরবি ভাষা চিরদিনের জন্য অবিকৃত ও অমরত্ব লাভ করেছে। এটি বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের মিলনসেতুতে পরিণত হয়েছে।
- শব্দভাণ্ডার ও পারিভাষিক সমৃদ্ধি: কুরআন আরবি ভাষায় বহু নতুন আধ্যাত্মিক, নৈতিক ও আইনগত পরিভাষার সংযোজন করেছে যা জাহিলী যুগে ছিল না। যেমন: ঈমান, ইসলাম, কুফর, নিফাক, সালাত, যাকাত, তাকওয়া, পরকাল ইত্যাদি।
- নতুন শাস্ত্রের উদ্ভাবন: কুরআনকে কেন্দ্র করেই মুসলিম স্কলারগণ ইলমুন নাহু, ইলমুস সরফ, ইলমুল বালাগাত, ইলমুল কিরাত, উসূলে ফিকহ এবং অভিধান শাস্ত্র আবিষ্কার করেন।
- সাহিত্যের বিষয়বস্তুর আমূল সংস্কার: সাহিত্যের গতিধারাকে অশ্লীল প্রেম, মদ ও গোত্রীয় অন্ধ অহংকার থেকে সরিয়ে স্রষ্টার মহত্ত্ব, নৈতিকতা, বিশ্বভ্রাতৃত্ব ও মানবকল্যাণের পথে পরিচালিত করেছে।
- গদ্য সাহিত্যের স্বর্ণযুগ সৃষ্টি: জাহিলী যুগে কবিতার প্রাধান্য থাকলেও কুরআনের অতুলনীয় শৈলী আরবি গদ্যকে শীর্ষ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে।
٦- مَا مَعْنَى المُخَضْرَمِ؟ قَدِّرْ مُسَاهَمَةَ كَعْبِ بْنِ زُهَيْرٍ فِى الشِّعْرِ العَرَبِىِّ-
[৬. আল-মুখাদরাম শব্দের অর্থ কী? আরবি কবিতায় কা’ব ইবনে যুহাইরের অবদান মূল্যায়ন করো।]
১. মুখাদরামের পরিচয়:
সাহিত্য ও ইতিহাসের পরিভাষায়, যে সকল কবি জাহিলী যুগ এবং ইসলামি যুগ উভয় যুগ প্রত্যক্ষ করেছেন এবং উভয় যুগে কাব্যচর্চা করেছেন, তাঁদের ‘মুখাদরাম’ (المخضرم) এবং তাঁদের কবিতাকে ‘মুখাদরামী কবিতা’ বলা হয়। যেমন: হাসসান ইবনে সাবিত, কা’ব ইবনে যুহাইর, লবীদ ও আল-খানসা।
২. কা’ব ইবনে যুহাইরের সাহিত্যিক অবদান ও ‘কাসীদায়ে বুরদাহ’:
- বংশীয় ঐতিহ্য: কা’ব ছিলেন বিখ্যাত মুআল্লাকা কবি যুহাইর ইবনে আবি সুলমার সুযোগ্য পুত্র। পিতার কাছ থেকে তিনি কাব্যপ্রতিভা উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেছিলেন।
- ঐতিহাসিক পটভূমি: প্রাথমিক জীবনে কা’ব ইসলামের বিরোধিতা করে ব্যঙ্গাত্মক কবিতা লিখেছিলেন। পরবর্তীতে সত্যের আলো উপলব্ধি করে তিনি মদিনায় এসে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে উপস্থিত হন এবং ক্ষমা প্রার্থনা করে স্বরচিত অমর কাসীদা «بَانَتْ سُعَادُ» (বানাত সু’আদ) আবৃত্তি করেন।
- নবীজির প্রশংসা ও চাদর উপহার: তাঁর কবিতার বিখ্যাত চরণে যখন তিনি রাসূল (সা.)-কে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের আলোকবর্তিকা হিসেবে তুলনা করে বলেন— «إِنَّ الرَّسُولَ لَنُورٌ يُسْتَضَاءُ بِهِ مُهَنَّدٌ مِنْ سُيُوفِ اللَّهِ مَسْلُولُ» (নিশ্চয়ই রাসূল এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা যা থেকে আলো গ্রহণ করা হয়, তিনি আল্লাহর উন্মুক্ত তরবারিসমূহের অন্যতম তরবারি)। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) মুগ্ধ হয়ে নিজের গায়ের চাদর (বুরদাহ) মোবারক কা’বকে উপহার দেন।
- সাহিত্যিক মূল্য: কাসীদায়ে বানাত সু’আদ আরবি সাহিত্যের ইতিহাসে নাত বা প্রশংসাগীতির এক অনন্য শাশ্বত মাস্টারপিস, যা অদ্যাবধি বিশ্ব সাহিত্যে সমাদৃত।
٧- مَا مَعْنَى النَّثْرِ؟ مَتَى بَدَأَ النَّثْرُ فِى الأَدَبِ العَرَبِىِّ؟ اذْكُرْ أَشْكَالَهُ المُتَنَوِّعَةَ-
[৭. নাসর বা গদ্যের সংজ্ঞা দাও। আরবি সাহিত্যে গদ্যের সূচনা কখন হয়? এর বিভিন্ন রূপ আলোচনা করো।]
১. নাসরের সংজ্ঞা ও সূচনা:
- সংজ্ঞা: যে বক্তব্য কোনো নির্দিষ্ট ছন্দ ও ওযনের বন্ধনে আবদ্ধ থাকে না; বরং ভাবের স্বাভাবিক প্রকাশে বাক্যের পর বাক্য সাজানো হয়, তাকে নাসর (النثر) বা গদ্য বলা হয়।
- সূচনাকাল: আরবি সাহিত্যে গদ্যের সূচনা অত্যন্ত প্রাচীন হলেও লিখিত গদ্যের চেয়ে মৌখিক গদ্যের প্রচলনই ছিল জাহিলী যুগের প্রধান বৈশিষ্ট্য। জীবনের দৈনন্দিন প্রয়োজন, চুক্তি ও গোত্রীয় সংকট নিরসনে গদ্যের বিকাশ ঘটে।
২. জাহিলী গদ্যের বিভিন্ন বৈচিত্র্যময় রূপ (أشكال النثر):
- আল-খুতাবাহ (الخطابة – ভাষণ ও বক্তৃতা): মেলা, যুদ্ধক্ষেত্র ও গোত্রীয় সম্মেলনে মানুষকে অনুপ্রাণিত করতে বাগ্মীগণ আবেগঘন ভাষণ দিতেন। প্রখ্যাত বাগ্মী ছিলেন কুস ইবনে সা’ইদাহ আল-আইয়াদী।
- আল-আমছাল (الأمثال – প্রবাদ-প্রবচন): কোনো বিশেষ ঐতিহাসিক ঘটনার প্রেক্ষাপটে সংক্ষিপ্ত ও প্রজ্ঞাপূর্ণ বাক্য যা পরবর্তীতে সমাজে উদাহরণ হিসেবে প্রচলিত হয়। যেমন: «رُبَّ رَمْيَةٍ مِنْ غَيْرِ رَامٍ»।
- আল-হিকাম (الحكم – নীতিবাক্য ও জ্ঞানগর্ভ বাণী): প্রবীণ অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সারগর্ভ উপদেশ, যা কোনো ঘটনার প্রেক্ষাপট ছাড়াই চিরন্তন সত্য হিসেবে উচ্চারিত হতো। যেমন আকছাম ইবনে সাইফীর বাণীসমূহ।
- আল-অসিয়্যাত (الوصايا – অন্তিম উপদেশ): মৃত্যুর পূর্বে পিতা-মাতা বা গোত্রপ্রধান কর্তৃক উত্তরসূরিদের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত দিকনির্দেশনামূলক মূল্যবান বক্তব্য। যেমন যু আল-ইছবা আল-আদওয়ানীর অসিয়ত।
- সাজউল কুহ্হান (سجع الكهان – গণকদের ছন্দোবদ্ধ বাক্য): প্রাক-ইসলামি যুগে গণক ও পুরোহিতদের ব্যবহৃত রহস্যময় অন্ত্যমিলযুক্ত গদ্য।
٨- مَا مَعْنَى النَّقَائِضِ؟ نَاقِشْ نَقَائِضَ جَرِيرٍ وَالفَرَزْدَقِ-
[৮. নাকাইদ (النقائض) সাহিত্যের অর্থ কী? জারীর ও ফারাজদাকের মধ্যকার বিখ্যাত নাকাইদ সাহিত্য পর্যালোচনা করো।]
১. নাকাইদের পরিচয়:
‘নাকাইদ’ (النقائض) শব্দটি বহুবচন, একবচনে ‘নাক্বীদাহ’। সাহিত্য পরিভাষায়, এক কবি যখন নির্দিষ্ট একটি ছন্দ (বাহর) ও অন্ত্যমিল (কাফিয়া)-এ অন্য কবির বিরুদ্ধে আত্মগৌরব বা ব্যঙ্গ করে কবিতা লেখেন, আর প্রতিপক্ষ কবি হুবহু একই ওযন ও কাফিয়া বজায় রেখে তার পাল্টা জবাব দেন, তখন এই প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক কাব্যযুগলকে নাকাইদ বলা হয়। এটি উমাইয়া যুগে এক স্বতন্ত্র সাহিত্য ধারায় পরিণত হয়।
২. জারীর ও ফারাজদাকের ঐতিহাসিক নাকাইদ:
- প্রেক্ষাপট: উমাইয়া যুগের দুই সেরা কবি জারীর ও ফারাজদাকের মধ্যে প্রায় চল্লিশ বছর ধরে এই কাব্যযুদ্ধ চলেছিল। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও কুফা-বসরার সামাজিক আড্ডায় এটি বিপুল জনপ্রিয় ছিল।
- ফারাজদাকের বৈশিষ্ট্য: তিনি ছিলেন আভিজাত্য, কঠিন ও বিরল শব্দচয়ন এবং বংশীয় ঐতিহ্যের অহংকারে সমৃদ্ধ কবি। তিনি বনু দারেম গোত্রের গৌরব তুলে ধরতেন।
- জারীরের বৈশিষ্ট্য: জারীর ছিলেন প্রাঞ্জল ভাষা, ব্যঙ্গাত্মক সূক্ষ্ম রসবোধ ও গীতিময় শব্দের জাদুকর। তিনি ফারাজদাকের গর্বকে মুহূর্তেই তীব্র বিদ্রূপের পাত্রে পরিণত করতেন।
- সাহিত্যিক মূল্যায়ন: ব্যক্তিগত আক্রমণ থাকলেও এই নাকাইদ আরবি ভাষার প্রাচীন শব্দভাণ্ডার, ব্যাকরণ ও ঐতিহাসিক তথ্য সংরক্ষণে এক অমূল্য ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে বিবেচিত।
٩- تَحَدَّثْ عَنْ تَأْثِيرِ الحَدِيثِ النَّبَوِىِّ فِى ارْتِقَاءِ اللُّغَةِ العَرَبِيَّةِ وَآدَابِهَا-
[৯. আরবি ভাষা ও সাহিত্যের উৎকর্ষ সাধনে হাদিসে নববীর প্রভাব বিশদভাবে আলোচনা করো।]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ বাগ্মী (أفصح العرب)। তিনি নিজেই ঘোষণা করেছেন— «أُوتِيتُ جَوَامِعَ الكَلِمِ» (আমাকে অল্প কথায় বিশাল ভাব প্রকাশের ক্ষমতা বা জাওয়ামিউল কালিম দান করা হয়েছে)। আরবি সাহিত্যে তাঁর পবিত্র হাদিসের প্রভাব অপরিসীম:
- বাক্যশৈলীর সারল্য ও গভীরতা: জাহিলী যুগের অহেতুক জটিলতা ও কর্কশ শব্দের পরিবর্তে হাদিস শরীফ এক প্রাঞ্জল, সুমিষ্ট ও হৃদয়গ্রাহী শৈলী উপহার দিয়েছে যা ভাব প্রকাশের অনুপম আদর্শ।
- বাগধারা ও প্রবাদতুল্য বাক্যের প্রসার: বহু হাদিসের বাক্য পরবর্তীকালে আরবি সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ প্রবাদে পরিণত হয়েছে। যেমন: «المَرْءُ مَعَ مَنْ أَحَبَّ», «لاَ يُلْدَغُ المُؤْمِنُ مِنْ جُحْرٍ وَاحِدٍ مَرَّتَيْنِ» ইত্যাদি।
- বক্তৃতা ও চিঠিপত্রের সংস্কার: রাসূল (সা.)-এর বিদায় হজের ভাষণ এবং দেশ-বিদেশের রাজন্যবর্গের নিকট প্রেরিত চিঠিসমূহ আরবি খুতবাহ ও ইনশা (রচনাবলী)-র স্থায়ী রূপরেখা নির্ধারণ করে দিয়েছে।
- উসূলে হাদিস ও ভাষাভিত্তিক গবেষণার সূচনা: হাদিসের সনদ ও মতন সংরক্ষণের তাগিদেই আরবি ব্যাকরণ, জীবনীকোষ (আসমাউর রিজাল) ও ইতিহাস চর্চার এক সুবিশাল দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে।
١٠- مَنْ هُوَ شَاعِرُ الرَّسُولِ؟ اكْتُبْ مُسَاهَمَتَهُ الأَدَبِيَّةَ فِى الدِّفَاعِ عَنِ الإِسْلاَمِ وَالمُسْلِمِينَ-
[১০. ‘শা’ইরুর রাসূল’ (রাসূলের কবি) কে ছিলেন? ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতিরক্ষায় তাঁর সাহিত্যিক অবদান তুলে ধরো।]
১. পরিচয়:
মদিনার বনু নাজ্জার গোত্রের কৃতি সন্তান হযরত হাসসান ইবনে সাবিত (রা.) ছিলেন ‘শা’ইরুর রাসূল’ বা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ব্যক্তিগত কবি। তিনি জাহিলী যুগেও প্রখ্যাত কবি ছিলেন এবং ষাট বছর বয়সে ইসলাম গ্রহণ করে তাঁর সমস্ত কাব্যশক্তি ইসলামের জন্য উৎসর্গ করেন।
২. ইসলামের প্রতিরক্ষায় তাঁর সাহিত্যিক অবদান:
- কুরাইশদের কুৎসার দাঁতভাঙা জবাব: মক্কার কাফের কবিরা যখন কবিতা দিয়ে নবীজি ও ইসলামের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা চালাত, তখন রাসূল (সা.) হাসসান (রা.)-কে মিম্বারে দাঁড় করিয়ে দিতেন এবং বলতেন: «اهْجُهُمْ وَرُوحُ القُدُسِ مَعَكَ» (তুমি এদের ব্যঙ্গ করো, জিবরীল তোমার সাথে আছেন)।
- মানসিক প্রতিরোধ ও বিজয়ের পথ সুগম: হাসসান (রা.) কুরাইশদের এমন সব লজ্জাজনক পারিবারিক ও ব্যক্তিগত দুর্বলতা উন্মোচন করে কবিতা লিখতেন যা তীরের চেয়েও মারাত্মক আঘাত হানত।
- মক্কা বিজয়ের অমর কবিতা: মক্কা বিজয়ের প্রাক্কালে তাঁর বিখ্যাত কবিতা কুরাইশদের মনোবল ভেঙে দিয়েছিল— «عَدِمْنَا خَيْلَنَا إِنْ لَمْ تَرَوْهَا تُثِيرُ النَّقْعَ مَوْعِدُهَا كَدَاءُ»।
- মর্যাদা ও প্রাপ্তি: তিনি ছিলেন ইসলামের প্রথম জাতীয় কবি, যিনি সাহিত্যকে সত্য প্রতিষ্ঠা ও বাতিলের বিরুদ্ধে জিহাদের এক অমোঘ হাতিয়ারে রূপান্তর করেছিলেন।
مجموعة (ب) / খ-বিভাগ (الدرجة— ٤ × ٥ = ٢٠)
١١- مَا هِىَ العُصُورُ الأَدَبِيَّةُ؟ بَيِّنْ-
[১১. আরবি সাহিত্যের ঐতিহাসিক যুগসমূহ সংক্ষেপে বিবরণ দাও।]
ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক প্রেক্ষাপটের ওপর ভিত্তি করে আরবি সাহিত্যের ইতিহাসকে ৫টি প্রধান যুগে বিভক্ত করা হয়েছে:
- আল-আসরুল জাহিলী (العصر الجاهلي): ইসলাম-পূর্ব প্রায় ১৫০ বছর (৫০০-৬১০ খ্রি.)।
- আসরু সদরে ইসলাম ওয়াল উমাবী (عصر صدر الإسلام والأموي): নবীজি ও খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগ (৬১০-৬৬১ খ্রি.) এবং উমাইয়া খেলাফতের যুগ (৬৬১-৭৫০ খ্রি.)।
- আল-আসরুল আব্বাসী (العصر العباسي): আব্বাসী খেলাফতের সুবর্ণযুগ (৭৫০-১২৫৮ খ্রি.)।
- আসরুদ দুয়াল ওয়াল ইনহীতাত (عصر الدول والانحطاط): তাতারি আক্রমণ পরবর্তী তুর্কি মামলুক ও ওসমানী যুগ (১২৫৮-১৭৯৮ খ্রি.)।
- আল-আসরুল হাদীস (العصر الحديث): নেপোলিয়নের মিসর অভিযান পরবর্তী আধুনিক রেনেসাঁ যুগ (১৭৯৮ থেকে বর্তমান)।
١٢- اكْتُبْ وَاقِعَةَ دَارَةِ الجُلْجُلِ بِالوُضَاحَةِ-
[১২. ইমরুল কায়েসের জীবনে ‘দারাতু জুলজুল’-এর ঘটনাটি সংক্ষেপে লেখো।]
‘দারাতু জুলজুল’ ছিল আরবের একটি বিখ্যাত জলাশয়। সেখানে কবি ইমরুল কায়েসের চাচাতো বোন সুন্দরী উনাইযা তার সখীদের নিয়ে গোসল করতে যায়। কবি গোপনে গিয়ে তাদের সমস্ত পোশাক লুকিয়ে ফেলেন এবং শর্ত দেন যে, প্রত্যেককে নগ্ন অবস্থায় জল থেকে উঠে এসে পোশাক নিতে হবে। নিরুপায় হয়ে সকলে একে একে উঠে আসে এবং পরিশেষে উনাইযাও আসে। আনন্দ উদযাপনে কবি তাঁর প্রিয় উটটি জবেহ করে সবাইকে ভূরিভোজ করান। এই বাস্তব রোমাঞ্চকর ঘটনাটি কবি তাঁর বিশ্বখ্যাত মুআল্লাকায় অমর করে রেখেছেন— «وَيَوْمَ دَخَلْتُ الخِدْرَ خِدْرَ عُنَيْزَةٍ فَقَالَتْ لَكَ الوَيْلاَتُ إِنَّكَ مُرْجِلِى»।
١٣- عَلِّقْ عَلَى جَمْعِ القُرْآنِ الكَرِيمِ-
[১৩. কুরআন মাজীদ সংকলনের ইতিহাস সংক্ষেপে পর্যালোচনা করো।]
কুরআন মাজীদ সংকলনের ইতিহাস প্রধানত দুটি যুগান্তকারী পর্যায়ে সম্পন্ন হয়:
- ১. হযরত আবু বকর (রা.)-এর খেলাফতকালে প্রথম সংকলন: ইয়ামামার যুদ্ধে বহু হাফেজ সাহাবি শাহাদাত বরণ করলে হযরত উমর (রা.)-এর পরামর্শে যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-এর নেতৃত্বে ছড়ানো-ছিটানো লিখিত অংশ ও হাফেজদের স্মৃতি মিলিয়ে প্রথমবারের মতো এক খণ্ডে পূর্ণাঙ্গ ‘মুসহাফ’ গ্রন্থিত হয়।
- ২. হযরত উসমান (রা.)-এর যুগে প্রমিতকরণ: বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের তিলাওয়াতের বৈচিত্র্যজনিত বিভ্রান্তি দূর করতে উসমান (রা.) কুরাইশ ভাষার মানদণ্ডে সেই মূল মুসহাফ থেকে ৭টি কপি তৈরি করে বিভিন্ন প্রদেশে পাঠান এবং অবশিষ্ট ব্যক্তিগত কপিগুলো নষ্ট করার নির্দেশ দেন। এ কারণেই তাঁকে ‘জামেউল কুরআন’ বলা হয়।
١٤- اكْتُبْ أَغْرَاضَ النَّثْرِ الأُمَوِىِّ-
[১৪. উমাইয়া যুগের গদ্য সাহিত্যের প্রধান উদ্দেশ্য ও শাখাগুলো লেখো।]
উমাইয়া যুগে সাম্রাজ্যের বিস্তার ও রাজনৈতিক দলাদলির কারণে গদ্য অত্যন্ত শক্তিশালী রূপ ধারণ করে। এর প্রধান উদ্দেশ্যসমূহ ছিল:
- ১. রাজনৈতিক বক্তৃতা (الخطابة السياسية): খেলাফতের দাবি, বিদ্রোহ দমন ও সামরিক বাহিনীকে উদ্দীপ্ত করতে ভাষণ। যেমন যিয়াদ ইবনে আবিহীর ‘খুতবায়ে বাতরা’ ও হাজ্জাজ বিন ইউসুফের ভাষণসমূহ।
- ২. ধর্মীয় ও ওয়াযমূলক বক্তৃতা (الخطابة الدينية): যুহদ ও পরকালের ভীতি সঞ্চারকারী আলোচনা। যেমন হাসান বসরী (রহ.)-এর ভাষণ।
- ৩. রাষ্ট্রীয় চিঠিপত্র (الرسائل الديوانية): দরবারি দাপ্তরিক চিঠিপত্র লিখন শৈলীর বিকাশ, যার প্রধান স্থপতি ছিলেন আব্দুল হামিদ আল-কাতিব।
- ৪. চুক্তি ও বিতর্ক (المناظرات): রাজনৈতিক দলসমূহের (উমাইয়া, শিয়া, খারিজি ও যুবায়েরী) পারস্পরিক আদর্শিক বিতর্ক।
١٥- اكْتُبْ أَسْمَاءَ الشُّعَرَاءِ المُخَضْرَمِينَ-
[১৫. ৫ জন বিখ্যাত মুখাদরাম কবির নাম ও পরিচয় লেখো।]
- হযরত হাসসান ইবনে সাবিত (রা.): শা’ইরুর রাসূল, যিনি কবিতার মাধ্যমে কাফেরদের অপপ্রচারের মোকাবিলা করেছিলেন।
- কা’ব ইবনে যুহাইর (রা.): বিখ্যাত মুআল্লাকা কবি যুহাইরের পুত্র এবং অমর ‘কাসীদায়ে বুরদাহ’-এর রচয়িতা।
- তুমাদির বিনতে আমর (আল-খানসা): আরবি সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ শোকগাথা (মারছিয়া) রচয়িতা নারী কবি, যিনি ভাই সাখর ও মুআবিয়ার শোকে বিখ্যাত কবিতা রচনা করেছিলেন।
- লাবীদ ইবনে রাবীআ (রা.): সাত মুআল্লাকার অন্যতম কবি, যিনি ইসলাম গ্রহণের পর কুরআনের মাহাত্ম্যে কাব্যচর্চা ছেড়ে দিয়ে ইবাদতে মগ্ন হন।
- আবু যুয়াইব আল-হাযালী (রা.): বিশিষ্ট মুখাদরাম কবি, যিনি এক যুদ্ধে তাঁর পাঁচ পুত্রের শাহাদাতের শোকে কালজয়ী মারছিয়া লিখেছিলেন।
١٦- اكْتُبْ أَرْبَعَةَ أَبْيَاتٍ مِنَ الشِّعْرِ الجَاهِلِىِّ-
[১৬. জাহিলী কবিতার যেকোনো চার চরণ আরবি পাঠ ও অর্থসহ লেখো।]
মুআল্লাকা কবি তারাফাহ ইবনুল আবদ (طرفة بن العبد)-এর অমর মুআল্লাকার চারটি প্রজ্ঞাপূর্ণ চরণ:
أَرَى عَيْشَ الفَتَى كَنْزًا نَاقِصًا وَمَا تَنْقُصِ الأَيَّامُ وَالدَّهْرُ يَنْفَدِ
سَتُبْدِى لَكَ الأَيَّامُ مَا كُنْتَ جَاهِلاً وَيَأْتِيكَ بِالأَخْبَارِ مَنْ لَمْ تُزَوِّدِ
وَيَأْتِيكَ بِالأَنْبَاءِ مَنْ لَمْ تَبِعْ لَهُ بَتَاتًا وَلَمْ تَضْرِبْ لَهُ وَقْتَ مَوْعِدِ
أَرَى المَوْتَ يَعْتَامُ الكِرَامَ وَيَصْطَفِى عَقِيلَةَ مَالِ الفَاحِشِ المُتَشَدِّدِ
[আমি মানবজীবনকে এক ক্ষয়িষ্ণু ধনভাণ্ডার হিসেবে দেখি; দিন ও কালের আবর্তনে যা কিছু হ্রাস পায় তা একসময় নিঃশেষ হয়ে যায়। অচিরেই মহাকালের দিনগুলো তোমার সামনে উন্মোচিত করবে যা তুমি জানতে না; এবং এমন লোক তোমার নিকট সংবাদ নিয়ে হাজির হবে যাকে তুমি কোনো পাথেয় দাওনি। এবং সে তোমাকে এমন সংবাদ এনে দেবে যার জন্য তুমি কোনো চুক্তি করোনি এবং কোনো সময়ও নির্ধারণ করোনি। আমি দেখি মৃত্যু শ্রেষ্ঠ ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদেরই বাছাই করে নিয়ে যায়, আর কৃপণ ও কঠোর ব্যক্তির মূল্যবান সম্পদ কেড়ে নেয়।]
١٧- اكْتُبْ خَصَائِصَ مُعَلَّقَةِ امْرِئِ القَيْسِ-
[১৭. ইমরুল কায়েসের মুআল্লাকার প্রধান সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্যসমূহ উল্লেখ করো।]
আরবি কবিতার সম্রাট ইমরুল কায়েসের মুআল্লাকা (قِفَا نَبْكِ مِنْ ذِكْرَى حَبِيبٍ وَمَنْزِلِ)-এর প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:
- বিরান ভিটায় রোদনের প্রবক্তা: তিনিই সর্বপ্রথম প্রেমাস্পদের পরিত্যক্ত বাসস্থানে থেমে অশ্রু বিসর্জন (الوقوف على الأطلال) করার ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠা করেন।
- অতুলনীয় উপমা ও রূপক: তিনি অন্ধকার রাতকে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের সাথে এবং তাঁর দ্রুতগামী ঘোড়াকে পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়া বিশাল পাথরের সাথে চমৎকার উপমায় চিত্রিত করেছেন।
- অনুভূতির তীব্রতা ও রোমাঞ্চ: তাঁর নিজস্ব জীবনের রোমাঞ্চকর প্রেম ও দারাতু জুলজুলের স্মৃতি অত্যন্ত জীবন্ত ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন।
- ছন্দের নিখুঁত প্রবাহ: বাহারে তাবীল (بحر طويل)-এ রচিত এই কাসীদা আরবি সাহিত্যের চিরন্তন সুর ও ছন্দের মডেল হিসেবে স্বীকৃত।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. আরবি সাহিত্যের ইতিহাস-১ বিষয়ের সিলেবাসে কোন যুগগুলো অন্তর্ভুক্ত?
আরবি সাহিত্যের ইতিহাস-১ (কোড: ২০৪২০৫) বিষয়ের সিলেবাস মূলত জাহিলী যুগ (ইসলাম-পূর্ব ১৫০ বছর), সদরুল ইসলাম (নবীজি ও খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগ) এবং উমাইয়া খেলাফতের সাহিত্যিক বিকাশ নিয়ে গঠিত।
২. আসহাবুল মুআল্লাকাতদের পরিচিতি পরীক্ষায় কীভাবে লেখা উচিত?
মুআল্লাকার কবিদের ক্ষেত্রে ইমরুল কায়েস, তারাফাহ ও যুহাইরের নাম, তাঁদের বিখ্যাত কবিতার প্রথম চরণ এবং তাঁদের রচনার মূল সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্যগুলো সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা দরকার।
৩. আরবি ভাষার ওপর কুরআনের প্রভাব সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর লেখার নিয়ম কী?
কুরআন কীভাবে আরবি ভাষাকে অমরত্ব দিয়েছে, নতুন শব্দভাণ্ডার ও শাস্ত্রের জন্ম দিয়েছে এবং সাহিত্যের বিষয়বস্তু সংস্কার করেছে— এই পয়েন্টগুলো প্রামাণ্যভাবে সাজিয়ে লিখতে হবে।
৪. উমাইয়া যুগের নাকাইদ সাহিত্যের গুরুত্ব কী?
নাকাইদ সাহিত্য রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত বিরোধের ওপর রচিত হলেও এটি উমাইয়া যুগের সমাজচিত্র, বিশুদ্ধ প্রাচীন আরবি শব্দকোষ এবং ব্যঙ্গ কবিতার উৎকর্ষ অনুধাবনের প্রধান উৎস।
৫. মুখাদরাম কবিদের ক্ষেত্রে কী বিশেষ তথ্য দেওয়া প্রয়োজন?
মুখাদরাম কবিদের ইসলাম গ্রহণের পূর্বের জাহিলী জীবন এবং পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করে ইসলামের প্রতিরক্ষায় তাঁদের সাহিত্যের রূপান্তর বিশেষভাবে তুলে ধরা আবশ্যক।
৬. জাহিলী গদ্যের রূপসমূহের মধ্যে কোনগুলো বেশি তাৎপর্যপূর্ণ?
জাহিলী গদ্যের মধ্যে যুদ্ধক্ষেত্রের খুতবাহ (ভাষণ), প্রজ্ঞাপূর্ণ আমছাল (প্রবাদ) এবং প্রবীণদের অসিয়ত সবচেয়ে বেশি সাহিত্যিক মূল্য বহন করে।
\n