জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

উলূমুল হাদীস (Ulumul Hadith) – 204202, আরবি ভাষা ও সাহিত্য – ফাজিল অনার্স ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২২

Abswer.com Abswer.com
21 September, 2026
৭০ মিনিট পড়ার সময়
১১ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

পরীক্ষা কোড: ২০২ | প্রশ্নপত্র কোড: ০৫৮
اختبار السنة الثانية للفاضل البكالوريوس (الشرف)، لعام ٢٠٢٢
[ফাজিল স্নাতক (সম্মান) দ্বিতীয় বর্ষ পরীক্ষা, ২০২২]
اللغة العربية وآدابها
[আরবি ভাষা ও সাহিত্য]
علوم الحديث
[উলূমুল হাদীস]
বিষয় কোড: ২০৪২০২
الزمن: ٤ ساعات | الدرجات الكاملة: ٨٠
[সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০]
الملاحظة: أجب عن أربعة من مجموعة (أ) وعن أربعة من مجموعة (ب)
[দ্রষ্টব্য: ক-বিভাগ থেকে যেকোনো ৪টি এবং খ-বিভাগ থেকে যেকোনো ৪টি প্রশ্নের উত্তর দাও।]


مجموعة (أ) / ক-বিভাগ (الدرجة— ٤ × ١٥ = ٦٠)

(أجب عن أربعة من الأسئلة الآتية)

١- عَرِّفْ عِلْمَ مُصْطَلَحِ الحَدِيثِ، ثُمَّ بَيِّنْ نَشْأَتَهُ وَتَطَوُّرَهُ عَبْرَ القُرُونِ-

[১. ইলমে মুসতালাহিল হাদীসের সংজ্ঞা দাও, অতঃপর যুগপরম্পরায় এর উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ বর্ণনা করো।]

ভূমিকা: ইসলামী শরীয়তের দ্বিতীয় উৎস আল-হাদীসের বিশুদ্ধতা সংরক্ষণ এবং জাল ও দুর্বল বর্ণনা থেকে সহীহ হাদীসকে পৃথক করার নিমিত্তে মুসলিম উম্মাহ এক অনন্য বৈজ্ঞানিক শাস্ত্র উদ্ভাবন করেছে, যার নাম ‘ইলমু মুসতালাহিল হাদীস’ (علم مصطلح الحديث)। মানব ইতিহাসে সনদ ও বর্ণনাকারীদের যাচাই-বাছাইয়ের এমন সূক্ষ্ম ও নিখুঁত পদ্ধতি আর কোনো জাতি উপহার দিতে পারেনি।

১. ইলমে মুসতালাহিল হাদীসের সংজ্ঞা:

  • আভিধানিক বিশ্লেষণ: ‘ইলম’ (العلم) অর্থ জ্ঞান বা বিদ্যা; ‘মুসতালাহ’ (المصطلح) অর্থ সর্বসম্মত পারিভাষিক পরিভাষা বা নিয়মাবলী; আর ‘হাদীস’ (الحديث) অর্থ মহানবী (সা.)-এর কথা, কাজ ও মৌনসম্মতি।
  • পারিভাষিক সংজ্ঞা: হাফিজ ইবনে হাজার আসক্বালানী (রহ.) তাঁর বিশ্বখ্যাত ‘নুখবাতুল ফিকার’ গ্রন্থে বলেন:

    “هُوَ عِلْمٌ بِقَوَاعِدَ يُعْرَفُ بِهَا أَحْوَالُ السَّنَدِ وَالمَتْنِ مِنْ حَيْثُ القَبُولُ وَالرَّدُّ”

    “মুসতালাহুল হাদীস এমন কতকগুলো নিয়ম-নীতির জ্ঞান, যার সাহায্যে সনদ (বর্ণনা পরম্পরা) ও মতনের (মূল পাঠ্য) অবস্থা জানা যায়— তা গ্রহণযোগ্য (মাক্ববুল) নাকি বর্জনীয় (মারদূদ)।”
  • বিষয়বস্তু (الموضوع): সনদ ও মতন।
  • উদ্দেশ্য (الثمرة والغاية): সহীহ ও সহীহ নয় এমন বর্ণনা পৃথক করে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বিশুদ্ধ সুন্নাহর ওপর আমল করা।

২. যুগপরম্পরায় এর উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ:

  1. নবীযুগ ও সাহাবী যুগ (মৌখিক ও বাস্তব প্রয়োগের স্তর): রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবদ্দশায় সরাসরি তাঁর কাছ থেকেই সাহাবীগণ দ্বীন শিক্ষা করতেন। প্রথম ফিতনা (হযরত উসমান রা.-এর শাহাদাত) সংঘটিত হওয়ার পর সাহাবীগণ বর্ণনাকারীর পরিচয় জানতে চাইতেন। ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সীরীন (রহ.) বলেন: “পূর্বে সনদ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হতো না, কিন্তু যখন ফিতনা শুরু হলো, তখন উলামায়ে কেরাম বললেন— তোমাদের বর্ণনাকারীদের নাম বলো, যাতে আমরা আহলে সুন্নাতের বর্ণনা গ্রহণ করতে পারি এবং বিদআতীদের বর্ণনা বর্জন করতে পারি।”
  2. তাবেঈ ও তাবে-তাবেঈ যুগ (মৌলিক নীতি প্রণয়নের স্তর): এ যুগে ইমাম যুহরী, মালিক বিন আনাস, শু’বা বিন হাজ্জাজ, এবং সুফিয়ান সাওরী (রহ.) রাবীদের আদালত ও যবত যাচাইয়ের সূচনা করেন। ইমাম শাফেঈ (রহ.) তাঁর অমর গ্রন্থ ‘আর-রিসালাহ’ (الرسالة)-তে সহীহ হাদীসের পাঁচটি শর্ত সর্বপ্রথম বিধিবদ্ধ আকারে লিপিবদ্ধ করেন।
  3. স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনার যুগ (চতুর্থ হিজরী শতক):
    • প্রথম স্বতন্ত্র গ্রন্থ: কাজী আবু মুহাম্মদ আর-রামাহুরমুযী (মৃত্যু ৩৬০ হি.) সর্বপ্রথম “আল-মুহাদ্দিছুল ফাসিল বাইনার রাবী ওয়াল ওয়ায়ী” (المحدث الفاصل بين الراوي والواعي) রচনা করে মুসতালাহুল হাদীসকে একটি পূর্ণাঙ্গ শাস্ত্রে রূপ দেন।
    • হাকিম নিশাপুরী (মৃ. ৪০৫ হি.): রচনা করেন “মা’রিফাতু উলূমিল হাদীস” (معرفة علوم الحديث), যেখানে তিনি হাদীস শাস্ত্রকে ৫২টি শাখায় বিভক্ত করেন।
    • খতীব আল-বাগদাদী (মৃ. ৪৬৩ হি.): তিনি হাদীস বর্ণনা ও সংকলনের নিয়মাবলী নিয়ে “আল-কিফায়াহ ফী ইলমির রিওয়ায়াহ” এবং “আল-জামি লিআখলাকির রাবী” রচনা করেন। ইবনে নুক্বতাহ বলেন: “খতীব বাগদাদীর পর যারাই হাদীস শাস্ত্রে কলম ধরেছেন, তারা সকলেই তাঁর করুণার ওপর নির্ভরশীল।”
  4. পরিপক্কতা ও চূড়ান্ত রূপদানের স্তর:
    • ইবনুস সালাহ (মৃ. ৬৪৩ হি.): তাঁর রচিত “মুকাদ্দিমাহ ইবনুস সালাহ” (علوم الحديث) এই শাস্ত্রের সংবিধানে পরিণত হয়, যাতে ৬৫টি উলূম অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
    • হাফিজ ইবনে হাজার আসক্বালানী (মৃ. ৮৫২ হি.): তিনি “নুখবাতুল ফিকার” এবং তার সুবিখ্যাত ব্যাখ্যাগ্রন্থ “নুযহাতুন নাযার” রচনা করে এই শাস্ত্রকে সর্বোচ্চ যৌক্তিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দান করেন।

٢- عَرِّفِ الحَدِيثَ وَالخَبَرَ وَالأَثَرَ وَالسُّنَّةَ، ثُمَّ بَيِّنِ الفَرْقَ بَيْنَ الحَدِيثِ وَالسُّنَّةِ بِالتَّفْصِيلِ-

[২. হাদীস, খবর, আসার ও সুন্নাহর সংজ্ঞা দাও, অতঃপর হাদীস ও সুন্নাহর মধ্যকার পার্থক্য বিস্তারিত বর্ণনা করো।]

ভূমিকা: উলূমুল হাদীসে ‘হাদীস’, ‘খবর’, ‘আসার’ এবং ‘সুন্নাহ’ অত্যন্ত বহুল ব্যবহৃত পরিভাষা। সাধারণ দৃষ্টিতে এগুলো সমার্থক মনে হলেও মুহাদ্দিসগণের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণে এদের মধ্যে অর্থগত ও প্রয়োগিক পার্থক্য বিদ্যমান।

১. পারিভাষিক সংজ্ঞাসমূহ:

  • ক. হাদীস (الحديث):
    আভিধানিক অর্থ নতুন (الجديد) অথবা কথা (الكلام)। পারিভাষিক অর্থে: “মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দিকে সম্বন্ধযুক্ত প্রতিটি বাণী, কর্ম, মৌনসম্মতি (তাক্বরীর) এবং তাঁর দৈহিক ও চারিত্রিক গুণাবলীকে হাদীস বলা হয়।”
  • খ. খবর (الخبر):
    আভিধানিক অর্থ সংবাদ বা তথ্য (النبأ)। পারিভাষিক অর্থে এর তিনটি মত রয়েছে:

    1. এটি হাদীসের সমার্থক (مرادف للحديث)।
    2. এটি হাদীসের বিপরীত; অর্থাৎ হাদীস হলো যা রাসূল (সা.) থেকে বর্ণিত, আর খবর হলো যা অন্য কারো (যেমন রাজা-বাদশাহদের ইতিহাস) থেকে বর্ণিত।
    3. খবর ব্যাপকতর (أعم من الحديث); অর্থাৎ প্রতিটি হাদীসই খবর, কিন্তু প্রতিটি খবর হাদীস নয়।
  • গ. আসার (الأثر):
    আভিধানিক অর্থ চিহ্ন বা অবশিষ্টাংশ। পরিভাষায় অধিকাংশ মুহাদ্দিসের মতে: “সাহাবী ও তাবেঈগণের কথা, কর্ম ও সিদ্ধান্তকে ‘আসার’ বলা হয়।” তবে খোরাসানের ফকীহগণ সাহাবীদের বক্তব্যকে আসার এবং মারফূ হাদীসকে ‘খবর’ বলতেন।
  • ঘ. সুন্নাহ (السنة):
    আভিধানিক অর্থ চলার পথ, আদর্শ বা রীতি (الطريقة والسيرة)। শরীয়তের পরিভাষায়: “দ্বীনের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতিষ্ঠিত চিরন্তন আমলী আদর্শ ও তরীকা, যা সাহাবীগণের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্নভাবে উম্মাহর মধ্যে অনুসৃত হয়ে আসছে।”

২. হাদীস ও সুন্নাহর মধ্যকার সূক্ষ্ম পার্থক্য (الفرق بين الحديث والسنة):

তুলনার ক্ষেত্র হাদীস (الحديث) সুন্নাহ (السنة)
মৌলিক স্বরূপ মূলত তথ্য, বর্ণনা ও ন্যারেশন (رواية ونقل)। এটি একটি তাত্ত্বিক নথি। মূলত আমল, জীবনাদর্শ ও কর্মধারা (عمل وطريقة)। এটি একটি বাস্তব অনুশীলন।
আমলের বাধ্যবাধকতা সব হাদীস আমলযোগ্য নয় (কিছু মানসূখ বা রহিত, কিছু বিশেষ পরিস্থিতির জন্য প্রযোজ্য)। সুন্নাহ সর্বদা আমলযোগ্য ও উম্মতের জন্য সার্বক্ষণিক অনুসরণের মানদণ্ড।
ব্যাপ্তি এমনকি রাসূল (সা.)-এর একক ঘটনা বা ব্যক্তিগত অভ্যাসও হাদীস। সুন্নাহ হলো দ্বীন হিসেবে যা উম্মাহর ওপর নিয়মিত অনুশীলিত হয়েছে।
ফুক্বাহাদের দৃষ্টিভঙ্গি হাদীস বর্ণনাকারীদের বলা হয় মুহাদ্দিস (محدث)। সুন্নাহর অনুসারী ও গবেষকদের বলা হয় ফকীহ ও সাহেবে সুন্নাহ।

প্রখ্যাত তাবেঈ সুফিয়ান সাওরী (রহ.) যথার্থই বলেছেন: “এমন অনেক মানুষ রয়েছে যারা হাদীসের আলেম কিন্তু সুন্নাহ সম্পর্কে অজ্ঞ, আবার অনেকে সুন্নাহর আলেম কিন্তু হাদীস কম জানেন। আর যিনি উভয়টি জানেন, তিনিই পরিপূর্ণ ইমাম।”


٣- مَا مَعْنَى الخَبَرِ الضَّعِيفِ لُغَةً وَاصْطِلاَحًا؟ ثُمَّ بَيِّنْ حُكْمَ رِوَايَتِهِ وَالعَمَلِ بِهِ مَعَ ذِكْرِ أَشْهَرِ المُصَنَّفَاتِ فِي الأَحَادِيثِ الضَّعِيفَةِ-

[৩. খবর যয়ীফের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ কী? যয়ীফ হাদীস বর্ণনা ও তার ওপর আমল করার হুকুম এবং যয়ীফ হাদীস বিষয়ক প্রসিদ্ধ গ্রন্থসমূহের নাম উল্লেখ করো।]

ভূমিকা: গ্রহণযোগ্যতার বিচারে হাদীস প্রধানত তিন প্রকার: সহীহ, হাসান ও যয়ীফ। যে হাদীসে সহীহ ও হাসান হাদীসের শর্তাবলি পূর্ণরূপে পাওয়া যায় না, তাকে যয়ীফ হাদীস বলা হয়।

১. যয়ীফ হাদীসের সংজ্ঞা:

  • আভিধানিক অর্থ: ‘যয়ীফ’ (الضعيف) শব্দটি ‘দু’ফ’ (الضعف) ধাতু থেকে গৃহীত, যার অর্থ দুর্বল, শক্তিহীন বা অক্ষম; এটি ‘ক্ববী’ (القوي – শক্তিশালী)-এর বিপরীত।
  • পারিভাষিক সংজ্ঞা: ইমাম বায়কূনী তাঁর মানযূমাহতে বলেন:

    “وَكُلُّ مَا عَنْ رُتْبَةِ الحُسْنِ قَصُرْ * فَهْوَ الضَّعِيفُ وَهْوَ أَقْسَامًا كَثُرْ”

    অর্থাৎ: “যে হাদীসের মধ্যে হাসান হাদীসের গুণাবলী ও শর্তসমূহ অনুপস্থিত থাকে, তাকে হাদীসে যয়ীফ বলা হয়।” আল্লামা ইবনুস সালাহ ও হাফিজ ইবনে হাজার বলেন: “সহীহ ও হাসান হাদীসের শর্তসমূহ পূরণ করতে ব্যর্থ প্রতিটি হাদীসই যয়ীফ।”

২. যয়ীফ হাদীস বর্ণনার হুকুম (حكم روايته):
মুহাদ্দিসগণের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, যয়ীফ হাদীস যদি জাল বা মওযূ (الموضوع) না হয়, তবে সনদের উল্লেখ ব্যতিরেকে তা বর্ণনা করার সময় নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না যে “রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন” (قال رسول الله)। বরং দুর্বলতাবোধক ক্রিয়া (صيغة التمريض) যেমন: “রূবিয়া আনহু” (رُوِيَ عنه – বর্ণিত আছে), বা “ইউযকারু” (يُذْكَرُ – উল্লেখ করা হয়) ব্যবহার করে বর্ণনা করতে হবে।

৩. যয়ীফ হাদীসের ওপর আমল করার হুকুম (حكم العمل به): এ বিষয়ে উলামায়ে কেরামের তিনটি প্রধান মাযহাব বা মত রয়েছে:

  1. একেবারেই আমল করা যাবে না: ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিম, ইমাম ইবনে হাযম এবং আল্লামা শাওকানী (রহ.)-এর মতে দ্বীনের কোনো বিষয়েই যয়ীফ হাদীসের ওপর আমল করা বৈধ নয়; কারণ সহীহ হাদীসই দ্বীনের জন্য যথেষ্ট।
  2. শর্তহীন আমল বৈধ: কোনো কোনো গবেষক ইমাম আবু হানীফা ও ইমাম আহমদ (রহ.)-এর দিকে নিসবত করেছেন যে, কিয়াসের চেয়ে দুর্বল হাদীস উত্তম। তবে এটি মূলত ‘হাদীসে হাসান লিগায়রিহী’র ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল।
  3. শর্তসাপেক্ষে ফাযায়েলের ক্ষেত্রে আমল বৈধ (জমহুর উলামার মত): আল্লামা ইবনে হাজার আসক্বালানী (রহ.) যয়ীফ হাদীসের ওপর আমলের জন্য ৩টি অপরিহার্য শর্ত নির্ধারণ করেছেন:
    • প্রথম শর্ত: হাদীসের দুর্বলতা মারাত্মক বা চরম পর্যায়ের হতে পারবে না (أن يكون الضعف غير شديد)। অর্থাৎ বর্ণনাকারী মিথ্যাবাদী বা মিথ্যার অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়া যাবে না।
    • দ্বিতীয় শর্ত: হাদীসটি শরীয়তের কোনো স্বীকৃত মূলনীতির (أصل عام) আওতাভুক্ত হতে হবে; সম্পূর্ণ নতুন কোনো বিধান তৈরি করতে পারবে না।
    • তৃতীয় শর্ত: আমলের সময় এটিকে রাসূল (সা.)-এর সুনিশ্চিত উক্তি হিসেবে বিশ্বাস করা যাবে না, বরং সতর্কতা ও সাওয়াবের আশায় আমল করতে হবে (أن لا يُعتقد ثبوته عند العمل به)।

৪. যয়ীফ ও জাল হাদীস বিষয়ক প্রসিদ্ধ গ্রন্থসমূহ:

  • কিতাবুল ইলাল (كتاب العلل) — ইমাম ইবনে আবি হাতিম আর-রাযী এবং ইমাম দারাকুতনী।
  • আল-কামিল ফী দুআফাইর রিজাল (الكامل في ضعفاء الرجال) — ইমাম ইবনে আদী।
  • আল-ইলালুল মুতানাহিয়াহ ফিল আহাদীসিল ওয়াহিয়াহ — ইমাম ইবনুল জাওযী।
  • আল-মওযূআত (الموضوعات) — ইমাম ইবনুল জাওযী (চরম দুর্বল ও জাল বর্ণনাসমূহ)।
  • সিলসিলাতুল আহাদীসিয যয়ীফাহ ওয়াল মওযূআহ — শায়খ নাসিরুদ্দিন আলবানী (আধুনিক যুগে)।

٤- عَرِّفِ الحَدِيثَ القُدْسِيَّ وَالمَرْفُوعَ وَالمَوْقُوفَ وَالمَقْطُوعَ، ثُمَّ اكْتُبِ الفَرْقَ بَيْنَ الحَدِيثِ القُدْسِيِّ وَالقُرْآنِ الكَرِيمِ-

[৪. হাদীসে কুদসী, মারফূ, মাওকূফ ও মাক্বতূ-এর সংজ্ঞা দাও, অতঃপর হাদীসে কুদসী ও আল-কুরআনের মধ্যকার পার্থক্যসমূহ লিপিবদ্ধ করো।]

ভূমিকা: হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষায় সনদের সমাপ্তি বা কোন ব্যক্তিত্বের দিকে বাণীটি সম্বন্ধযুক্ত হয়েছে, তার ওপর ভিত্তি করে হাদীসকে চার ভাগে বিভক্ত করা হয়: কুদসী, মারফূ, মাওকূফ ও মাক্বতূ।

১. চার প্রকার হাদীসের পরিচয়:

  • ক. হাদীসে কুদসী (الحديث القدسي): ‘কুদসী’ শব্দটি ‘কুদস’ (পবিত্রতা) থেকে এসেছে। যে হাদীসের মূল বক্তব্য বা অর্থ আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ইলহাম বা স্বপ্নের মাধ্যমে মহানবী (সা.)-এর অন্তরে অবতীর্ণ হয়েছে এবং মহানবী (সা.) নিজস্ব ভাষায় তা বর্ণনা করে আল্লাহর দিকে নিসবত করেছেন। যেমন: “قال الله تعالى: يا عبادي إني حرمت الظلم على نفسي” (আল্লাহ বলেন: হে আমার বান্দারা! আমি আমার নিজের ওপর জুলুমকে হারাম করেছি)।
  • খ. হাদীসে মারফূ (الحديث المرفوع): ‘মারফূ’ অর্থ সমুন্নত। যে বাণী, কর্ম, স্বীকৃতি বা গুণাবলী স্পষ্টভাবে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দিকে সম্বন্ধযুক্ত করা হয় (তা সাহাবী থেকে বর্ণিত হোক বা পরবর্তী কেউ বর্ণনা করুক)।
  • গ. হাদীসে মাওকূফ (الحديث الموقوف): ‘মাওকূফ’ অর্থ স্থগিতকৃত। যে কথা, কাজ বা অনুমোদন সরাসরি সাহাবী (রা.)-এর ওপর গিয়ে থেমে যায় এবং রাসূল (সা.) পর্যন্ত পৌঁছে না। যেমন: “হযরত আলী (রা.) বলেন…”।
  • ঘ. হাদীসে মাক্বতূ (الحديث المقطوع): ‘মাক্বতূ’ অর্থ কর্তিত। যে বাণী বা কর্ম কোনো তাবেঈ (تابعي) বা তাবে-তাবেঈর দিকে সম্বন্ধযুক্ত করা হয়। যেমন: হাসান আল-বসরী বা সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবের ব্যক্তিগত উক্তি।

২. হাদীসে কুদসী ও পবিত্র কুরআনের মধ্যকার মৌলিক পার্থক্য:

তুলনার বিষয় পবিত্র কুরআন (القرآن الكريم) হাদীসে কুদসী (الحديث القدسي)
শব্দ ও অর্থ শব্দ এবং অর্থ উভয়টিই আল্লাহর পক্ষ থেকে জিব্রাঈল (আ.) মারফত অবতীর্ণ। অর্থ আল্লাহর পক্ষ থেকে, কিন্তু শব্দচয়ন ও ভাষা মহানবী (সা.)-এর নিজস্ব।
মুজিযা ও চ্যালেঞ্জ কুরআন এক চিরন্তন মুজিযা; এর একটি সূরার সমকক্ষ রচনার চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। এটি মুজিযা নয় এবং এর কোনো সাহিত্যিক চ্যালেঞ্জ ঘোষিত হয়নি।
নামাযে তিলাওয়াত নামাযে কুরআন তিলাওয়াত ফরজ ও ইবাদত। নামাযে হাদীসে কুদসী তিলাওয়াত বৈধ নয়, নামায ভঙ্গ হয়ে যাবে।
অক্ষরপ্রতি সওয়াব প্রতিটি হরফ তিলাওয়াতে দশটি করে নেকী অর্জিত হয়। সাধারণ ইলম চর্চার সওয়াব মিলবে, কিন্তু অক্ষরপ্রতি সুনির্দিষ্ট সওয়াব নেই।
স্পর্শ করার বিধান অজু ছাড়া কুরআন স্পর্শ করা হারাম। অজু ছাড়া হাদীসে কুদসীর কিতাব স্পর্শ করা জায়েয।
সনদের ধারাবাহিকতা কুরআনের প্রতিটি আয়াত মুতাওয়াতির ও সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত। হাদীসে কুদসী সহীহ, হাসান কিংবা দুর্বলও হতে পারে।

٥- مَا هُوَ الحَدِيثُ المُرْسَلُ وَمَا الاِخْتِلاَفُ فِي حُكْمِهِ بَيْنَ المُحَدِّثِينَ؟ بَيِّنْ مُوَضِّحًا-

[৫. হাদীসে মুরসাল কাকে বলে এবং মুহাদ্দিসগণের মাঝে এর বিধান নিয়ে মতভেদ কী? স্পষ্টভাবে বর্ণনা করো।]

ভূমিকা: সনদের ধারাবাহিকতা বিচ্ছিন্ন হওয়া (ইনক্বিতাউস সানাদ) হাদীস দুর্বল হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। সনদের সমাপ্তি প্রান্তে সাহাবীর নাম বাদ পড়ার প্রক্রিয়াকে পরিভাষায় ‘ইরসাল’ এবং বর্ণিত হাদীসটিকে ‘মুরসাল’ বলা হয়।

১. হাদীসে মুরসালের সংজ্ঞা:

  • আভিধানিক অর্থ: ‘মুরসাল’ (المرسل) শব্দটি বাবে ইফআল থেকে এসেছে, যার অর্থ উন্মুক্ত রাখা, ছেড়ে দেওয়া বা বাঁধন খুলে দেওয়া। যেন রাবী সনদের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে দিয়েছেন।
  • পারিভাষিক সংজ্ঞা: হাফিজ ইবনে হাজার আসক্বালানী বলেন:

    “هُوَ مَا سَقَطَ مِنْ آخِرِ إِسْنَادِهِ مَنْ بَعْدَ التَّابِعِيِّ”

    “তাবেঈর পরবর্তী স্তরের বর্ণনাকারী (অর্থাৎ সাহাবী) সনদের শেষ প্রান্ত থেকে বাদ পড়ে গেলে তাকে মুরসাল হাদীস বলা হয়।” অর্থাৎ যখন কোনো তাবেঈ সরাসরি বলেন: “রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন…” অথচ তিনি নিজে সরাসরি নবীজীকে দেখেননি।

২. মুরসাল হাদীসের বিধান ও মুহাদ্দিসগণের মতভেদ:
যেহেতু মুরসাল হাদীসে তাবেঈ ও রাসূল (সা.)-এর মধ্যবর্তী বর্ণনাকারী উহ্য থাকেন এবং নিশ্চিত জানা যায় না যে তিনি সাহাবী ছিলেন নাকি অন্য কোনো তাবেঈ— তাই এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে ইমামগণের মাঝে তিনটি প্রধান মাযহাব সৃষ্টি হয়েছে:

  1. মুরসাল হাদীস দুর্বল ও অগ্রহণযোগ্য (মতের প্রবক্তা: ইমাম শাফেঈ, ইমাম মুসলিম ও জমহুর মুহাদ্দিসীন):
    তাঁদের যুক্তি হলো সনদের বিশ্বস্ততা যাচাই করার জন্য রাবীর পরিচয় জানা অপরিহার্য। মধ্যবর্তী রাবী যদি কোনো দুর্বল তাবেঈ হয়ে থাকেন, তবে তা গ্রহণযোগ্য নয়। তাই অজ্ঞাত রাবী (মাজহুল)-র কারণে তা যয়ীফের অন্তর্ভুক্ত।
  2. মুরসাল হাদীস সহীহ ও গ্রহণযোগ্য (মতের প্রবক্তা: ইমাম আবু হানীফা, ইমাম মালিক এবং ইমাম আহমদ বিন হাম্বল এক বর্ণনামতে):
    তাঁদের শর্ত হলো যদি মুরসালকারী কোনো বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য তাবেঈ (ছিক্বাহ) হন (যেমন সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব, আল-হাসান আল-বসরী, ইব্রাহিম নাখয়ী)। কারণ একজন মুত্তাকী তাবেঈ কখনো নির্ভরযোগ্য মাধ্যম ছাড়া সরাসরি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দিকে সম্বন্ধ করে কথা বলবেন না।
  3. শর্তসাপেক্ষে গ্রহণযোগ্য (ইমাম শাফেঈ রহ.-এর শর্তাবলী):
    ইমাম শাফেঈ বলেন, মুরসাল হাদীস দলীল হিসেবে গৃহীত হবে যদি তা চারটি শর্তের যেকোনো একটি দ্বারা সমর্থিত হয়:

    • অন্য কোনো সনদে হাদীসটি মুত্তাসিল (যুক্ত) হিসেবে বর্ণিত হওয়া।
    • অন্য কোনো বিশ্বস্ত তাবেঈর পক্ষ থেকে ভিন্ন সনদে অনুরূপ মুরসাল বর্ণিত হওয়া।
    • অধিকাংশ সাহাবীর আমল বা ফতোয়া এর অনুকূলে থাকা।
    • অধিকাংশ ফকীহ ও উলামার আমল এর ওপর প্রতিষ্ঠিত হওয়া।

সাহাবায়ে কেরামের মুরসাল (مراسيل الصحابة): কোনো সাহাবী যদি অপর সাহাবীর মাধ্যমে শুনে সরাসরি রাসূল (সা.)-এর নামে বর্ণনা করেন, তবে সকল উলামায়ে কেরামের সর্বসম্মত ঐকমত্যে তা সহীহ ও গ্রহণযোগ্য; কারণ সকল সাহাবীই ন্যায়পরায়ণ (الصحابة كلهم عدول)।


٦- عَرِّفِ الآحَادَ وَاذْكُرْ أَنْوَاعَهَا ثُمَّ بَيِّنْ شُرُوطَ الغَرِيبِ وَحُكْمَهُ-

[৬. খাবারে আহাদের সংজ্ঞা দাও এবং এর প্রকারভেদ উল্লেখ করো, অতঃপর গরীব হাদীসের শর্তাবলি ও এর হুকুম আলোচনা করো।]

ভূমিকা: রাবীর সংখ্যা ও বর্ণনাকারীদের বিস্তৃতির ওপর ভিত্তি করে হাদীস প্রধানত দুই প্রকার: মুতাওয়াতির (المتواتر) এবং আহাদ (الآحاد)। দ্বীনের আকিদা ও আহকামের বহু বিধান এই খাবারে আহাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত।

১. খাবারে আহাদের সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ:

  • সংজ্ঞা: ‘আহাদ’ হলো ‘ওয়াহিদ’ (এক)-এর বহুবচন। পরিভাষায়: “যে হাদীসে মুতাওয়াতিরের শর্তসমূহ পূর্ণ হয় না, তাকে খাবারে আহাদ বা খবরে ওয়াহিদ বলা হয়।” অর্থাৎ যে বর্ণনার বর্ণনাকারীদের সংখ্যা এমন সীমায় পৌঁছেনি যা স্বাভাবিক যুক্তিতে তাদের মিথ্যার ওপর ঐক্যবদ্ধ হওয়া অসম্ভব বলে প্রমাণ করে।
  • প্রকারভেদ: সনদের প্রতিটি স্তরে সর্বনিম্ন রাবীর সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে আহাদ হাদীস তিন প্রকার:
    1. মাশহূর (المشهور): যে হাদীসের সনদের প্রতিটি স্তরে সর্বনিম্ন তিনজন বর্ণনাকারী বিদ্যমান থাকে, কিন্তু তা মুতাওয়াতিরের স্তরে পৌঁছে না।
    2. আযীয (العزيز): যে হাদীসের সনদের যেকোনো একটি স্তরে সর্বনিম্ন দুইজন রাবী বিদ্যমান থাকে।
    3. গরীব (الغريب): যে হাদীসের সনদের কোনো একটি স্তরে বর্ণনাকারীর সংখ্যা মাত্র একজন হয়।

২. হাদীসে গরীবের বিশদ বিবরণ, শর্ত ও হুকুম:

  • গরীবের প্রকারভেদ:
    • গরীব মুতলাক্ব (الغريب المطلق): যদি একক বর্ণনাকারীর বিচ্ছিন্নতা সনদের মূল গোড়ায় (সাহাবীর স্তরে) ঘটে। যেমন বিখ্যাত হাদীস: “إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ” যা রাসূল (সা.) থেকে কেবল হযরত ওমর (রা.) এককভাবে বর্ণনা করেছেন।
    • গরীব নিসবী (الغريب النسبي): যদি সনদের মূল অংশে একাধিক রাবী থাকে কিন্তু পরবর্তী কোনো স্তরে এসে কোনো নির্দিষ্ট এলাকার বা নির্দিষ্ট শিক্ষকের ক্ষেত্রে একক হয়ে যায়।
  • গরীব হাদীসের শর্ত ও গ্রহণযোগ্যতা: গরীব হওয়া মানেই যয়ীফ হওয়া নয়। গরীব হাদীস সহীহ হওয়ার জন্য শর্ত হলো সেই একক বর্ণনাকারীকে পূর্ণ ন্যায়পরায়ণ (আদিল) এবং প্রখর স্মরণশক্তিসম্পন্ন (তামমুয যাব্ত) হতে হবে, সনদে কোনো বিচ্ছিন্নতা থাকা যাবে না এবং হাদীসটি শায ও ইলালমুক্ত হতে হবে।
  • হুকুম: এই শর্তগুলো পূর্ণ হলে গরীব হাদীস নিশ্চিতভাবে সহীহ এবং তার ওপর আমল করা ওয়াজিব। আর শর্তে ত্রুটি ঘটলে তা যয়ীফ বা মারদূদ হিসেবে গণ্য হবে। ইমাম আহমদ বলেন: “তোমরা অপরিচিত ও বিরল গরীব বর্ণনা থেকে সতর্ক থাকো।”

٧- كَمْ طَرِيقًا لِرِوَايَةِ الحَدِيثِ وَمَا هِيَ؟ وَمَا أَقْوَالُ العُلَمَاءِ فِي الرِّوَايَةِ بِالمَعْنَى؟ بَيِّنْ مُفَصَّلاً-

[৭. হাদীস বর্ণনার (তাহাম্মুল ও আদায়ের) পদ্ধতি কয়টি ও কী কী? অর্থের মাধ্যমে হাদীস বর্ণনার (রিওয়ায়াত বিল মা’না) ক্ষেত্রে উলামাদের অভিমত বিস্তারিত বর্ণনা করো।]

ভূমিকা: উস্তাদের নিকট থেকে হাদীস গ্রহণ করাকে ‘তাহাম্মুল’ (التحمل) এবং তা অন্যের নিকট পৌঁছে দেওয়াকে ‘আদা’ (الأداء) বলা হয়। হাদীসের বিশুদ্ধতা সুরক্ষায় মুহাদ্দিসগণ তাহাম্মুল ও আদায়ের আটটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি নির্ধারণ করেছেন।

১. হাদীস গ্রহণের (তাহাম্মুলের) ৮টি পদ্ধতি:

  1. আস-সামা’ মিন লাফযিশ শায়খ (السماع من لفظ الشيخ – শিক্ষকের মুখ থেকে পাঠ শ্রবণ): উস্তাদ মুখস্থ বা কিতাব থেকে হাদীস পড়বেন এবং ছাত্ররা তা শ্রবণ করবে। এটি আদায়ের ক্ষেত্রে “সামি’তু” (سمعت) বা “হাদ্দাসানা” (حدثنا) ব্যবহৃত হয়। এটি সর্বোচ্চ স্তর।
  2. আল-ক্বিরাআতু আলাশ শায়খ বা আল-আরয (القراءة على الشيخ / العرض – শিক্ষকের সামনে পাঠ): ছাত্র উস্তাদের সামনে হাদীস পাঠ করবে এবং উস্তাদ তা শুনবেন ও সংশোধন করবেন। আদায়ের শব্দ: “আখবারানা ক্বিরাআতান আলাইহি”।
  3. আল-ইজাযাহ (الإجازة – অনুমতি প্রদান): উস্তাদ ছাত্রকে মৌখিক বা লিখিতভাবে তাঁর বর্ণিত হাদীস অন্যকে বর্ণনা করার প্রাতিষ্ঠানিক অনুমতি দান করবেন।
  4. আল-মুনাওয়ালাহ (المناولة – পাণ্ডুলিপি হস্তান্তর): উস্তাদ তাঁর হাদীসের মূল কিতাব ছাত্রের হাতে সমর্পণ করে বলবেন: এটি আমার বর্ণিত কিতাব, তুমি তা বর্ণনা করো।
  5. আল-মুকাতেবাহ (المكاتبة – পত্র মারফত প্রেরণ): উস্তাদ নিজ হাতে বা কাউকে দিয়ে হাদীস লিখে দূরবর্তী ছাত্রের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া।
  6. আল-ই’লাম (الإعلام – জানিয়ে দেওয়া): উস্তাদ ছাত্রকে অবহিত করবেন যে অমুক হাদীসটি তাঁর অমুক সনদে শোনা, তবে বর্ণনার স্পষ্ট অনুমতি বা নিষেধাজ্ঞা দেবেন না।
  7. আল-ওয়াসিয়্যাহ (الوصية – অসিয়ত করা): উস্তাদ মৃত্যুর পূর্বে কাউকে তাঁর কিতাব থেকে বর্ণনার অসিয়ত করে যাওয়া।
  8. আল-বিজাদাহ (الوجادة – পাণ্ডুলিপি প্রাপ্তি): উস্তাদের সাথে সাক্ষাৎ ব্যতীত তাঁর স্বহস্তে লিখিত সহীহ হাদীসের পাণ্ডুলিপি খুঁজে পাওয়া।

২. অর্থের মাধ্যমে হাদীস বর্ণনা (الرواية بالمعنى)-এর হুকুম ও উলামাদের অভিমত:
হাদীসের মূল শব্দের পরিবর্তে সমার্থক শব্দ দিয়ে ভাবার্থ প্রকাশের বিধান নিয়ে ফকীহ ও মুহাদ্দিসগণের মাঝে মতভেদ রয়েছে:

  • সম্পূর্ণ হারাম ও অবৈধ (ইবনে সীরীন ও একদল মুহাদ্দিস): তাঁদের মতে রাসূল (সা.)-এর পবিত্র মুখনিঃসৃত মূল শব্দই বর্ণনা করতে হবে; কারণ শব্দের পরিবর্তনের ফলে সূক্ষ্ম ভাবার্থ বিকৃত হতে পারে।
  • শর্তসাপেক্ষে বৈধ (জমহুর সাহাবা, তাবেঈন ও চার মাযহাবের ইমামগণ):
    অধিকাংশ উলামার মতে নিম্নের শর্তসমূহ পূরণ সাপেক্ষে অর্থের মাধ্যমে বর্ণনা জায়েয:

    1. বর্ণনাকারীকে আরবি ভাষা, ব্যাকরণ এবং শব্দের প্রয়োগ ও অর্থগত সূক্ষ্মতা সম্পর্কে পূর্ণ পণ্ডিত ও দূরদর্শী হতে হবে।
    2. অর্থের মাধ্যমে বর্ণনার কারণে হালাল হারামে বা কোনো শরয়ী হুকুমের পরিবর্তন ঘটতে পারবে না।
    3. হাদীসটি যদি এমন হয় যার শব্দাবলি নিজেই ইবাদত (যেমন নামাযের তাশাহহুদ, আযান, দোয়ায়ে কুনূত বা যিকির-আযকার), তবে তার ক্ষেত্রে অর্থের মাধ্যমে বর্ণনা কোনোভাবেই জায়েয নেই।

٨- مَا المُرَادُ بِمُصْطَلَحِ ‘الطَّعْنُ فِي الرَّاوِي’؟ بَيِّنْ أَسْبَابَ الطَّعْنِ المُتَعَلِّقَةَ بِالعَدَالَةِ وَالضَّبْطِ مُخْتَصَرًا-

[৮. ‘তা’ন ফির রাবী’ (বর্ণনাকারীর ওপর আপত্তি) পরিভাষা দ্বারা কী বোঝায়? আদালত ও যবতের সাথে সংশ্লিষ্ট আপত্তির কারণসমূহ সংক্ষেপে আলোচনা করো।]

ভূমিকা: হাদীসের সনদ সহীহ হওয়ার মৌলিক ভিত্তি হলো রাবীর বিশ্বস্ততা। যখন কোনো বর্ণনাকারীর চরিত্র, ধর্মপরায়ণতা কিংবা স্মরণশক্তি ও নির্ভুলতার ওপর কোনো ত্রুটি বা অভিযোগ উত্থাপিত হয়, তখন তাকে উলূমুল হাদীসের পরিভাষায় ‘আত-তা’ন ফির রাবী’ (الطعن في الراوي) বলা হয়।

১. ‘তা’ন ফির রাবী’-এর পারিভাষিক অর্থ:
‘তা’ন’ শব্দের আভিধানিক অর্থ বর্শা দিয়ে আঘাত করা বা দোষারোপ করা। পরিভাষায়: “রাবীর আদালত (চরিত্র ও তাকওয়া) কিংবা তার যাব্ত (সংরক্ষণ ক্ষমতা ও নির্ভুলতা)-এর মধ্যে এমন কোনো ত্রুটি প্রকাশ পাওয়া, যার ফলে তার বর্ণিত হাদীস গ্রহণযোগ্যতা হারায় বা দুর্বল হয়ে পড়ে।”

২. আপত্তির ১০টি কারণ (أسباب الطعن العشرة):
হাফিজ ইবনে হাজার আসক্বালানী (রহ.) ‘নুখবাতুল ফিকার’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, রাবীর ওপর আপত্তির মোট কারণ ১০টি। এর মধ্যে ৫টি সরাসরি ‘আদালত’-এর সাথে এবং বাকী ৫টি ‘যাব্ত’-এর সাথে সম্পর্কিত:

ক. আদালতের সাথে সম্পর্কিত ৫টি ত্রুটি (الأسباب المتعلقة بالعدالة):

  1. আল-কিযব (الكذب – হাদীসে মিথ্যা বলা): রাবী রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নামে ইচ্ছাকৃত মিথ্যা কথা রচনা করলে। এর দ্বারা বর্ণিত হাদীসকে ‘মওযূ’ (الموضوع) বা জাল বলা হয়। এটি সবচেয়ে জঘন্য অপরাধ।
  2. আত-তুহমাতু বিল কিযব (التهمة بالكذب – মিথ্যার অভিযোগ): রাবী সাধারণ জীবনে মানুষের সাথে মিথ্যাবাদী হিসেবে পরিচিত, তবে হাদীসে মিথ্যা বলতে সরাসরি ধরা পড়েনি। এর বর্ণিত হাদীসকে ‘মাতরূক’ (المتروك) বলা হয়।
  3. আল-ফিসক্ব (الفسق – পাপাচার): রাবী কবিরা গুনাহে লিপ্ত থাকলে অথবা সগিরা গুনাহে অবিচল থাকলে তার বর্ণনা প্রত্যাখ্যাত হয়।
  4. আল-বিদআহ (البدعة – ধর্মীয় বিদআতে লিপ্ত হওয়া): কুফরী বা মারাত্মক গোমরাহীপূর্ণ বিদআতে বিশ্বাসী হওয়া এবং সেই বিদআতের দিকে মানুষকে আহ্বানকারী হওয়া।
  5. আল-জাহালাহ (الجهالة – রাবীর অজ্ঞাত পরিচয়): রাবীর ব্যক্তিত্ব বা তার বিশ্বস্ততা অজানা থাকলে। একে ‘মাজহুলুল আইন’ বা ‘মাজহুলুল হাল’ বলা হয়।

খ. যাব্তের সাথে সম্পর্কিত ৫টি ত্রুটি (الأسباب المتعلقة بالضبط):

  1. ফাহশুস গালাত (فحش الغلط – মারাত্মক ভুল করা): বর্ণনাকারীর বর্ণনায় নির্ভুলতার চেয়ে ভুলের সংখ্যা বেশি হলে। এরূপ হাদীসকে ‘মুনকার’ (المنكر) বলা হয়।
  2. সুউল হিফয (سوء الحفظ – স্মৃতিশক্তির দুর্বলতা): রাবীর সহজাত স্মৃতিশক্তি দুর্বল হলে অথবা বার্ধক্যের কারণে স্মৃতিভ্রম ঘটলে। এরূপ হাদীসকে ‘মুয়াল্লাল’ বা যয়ীফ বলা হয়।
  3. আল-গাফলাহ আনিল ইতক্বান (الغفلة عن الإتقان – অসাবধানতা ও অমনোযোগিতা): হাদীস সংরক্ষণ ও বর্ণনার সময় অসচেতনতা প্রদর্শন করা।
  4. কাসরাতুল আওহাম (كثرة الأوهام – অতিরিক্ত বিভ্রম ও সন্দেহ): বর্ণনার সময় প্রায়ই এক সনদের সাথে অন্য সনদ বা মতনে বিভ্রান্ত হয়ে যাওয়া। একে ‘মুআল্লাল’ (المعلل) বলা হয়।
  5. মুখালাফাতুস সিক্বাত (مخالفة الثقات – নির্ভরযোগ্যদের বিরোধিতা): রাবী তার চেয়ে অধিক বিশ্বস্ত বা সংখ্যাগরিষ্ঠ রাবীদের বিপরীত বর্ণনা প্রদান করলে। একে ‘শায’ (الشاذ) বলা হয়।

مجموعة (ب) / খ-বিভাগ (الدرجة— ٤ × ৫ = ২০)

(أجب عن أربعة من الأسئلة الآتية)

٩- عَرِّفْ عُلُومَ الحَدِيثِ، وَمَنِ المُؤَسِّسُ لِهَذَا العِلْمِ؟

[৯. উলূমুল হাদীসের সংজ্ঞা দাও এবং এই শাস্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা কে?]

উত্তর:

  • উলূমুল হাদীসের সংজ্ঞা: এটি মূলত দুটি শব্দের সমষ্টি— ‘উলূম’ (জ্ঞানের শাখাসমূহ) এবং ‘হাদীস’। পরিভাষায়: “যে শাস্ত্রের মাধ্যমে হাদীসের সনদ ও মতন, বর্ণনাকারীদের অবস্থা, হাদীস গ্রহণের শর্তাবলী এবং তা সহীহ কিংবা যয়ীফ হওয়ার কারণসমূহ বিস্তারিতভাবে অবগত হওয়া যায়, তাকে উলূমুল হাদীস বলা হয়।” এর অপর নাম ইলমু মুসতালাহিল হাদীস বা উসূলুল হাদীস।
  • প্রতিষ্ঠাতা: প্রাতিষ্ঠানিক ও গ্রন্থাকারে এই শাস্ত্রের প্রথম প্রতিষ্ঠাতা হলেন চতুর্থ হিজরী শতকের প্রখ্যাত ইমাম কাজী আবু মুহাম্মদ আল-হাসান বিন আব্দুর রহমান বিন খাল্লাদ আর-রামাহুরমুযী (রহ.) [মৃত্যু: ৩৬০ হি.]। তিনি সর্বপ্রথম “আল-মুহাদ্দিছুল ফাসিল বাইনার রাবী ওয়াল ওয়ায়ী” নামক সুবিখ্যাত কিতাব রচনার মাধ্যমে উলূমুল হাদীসের আনুষ্ঠানিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

١٠- مَنِ المُحَدِّثُ وَالحَافِظُ؟

[১০. মুহাদ্দিস ও হাফিজ কাকে বলে?]

উত্তর: হাদীস শাস্ত্রের পারদর্শিতা ও হাদীস মুখস্থের পরিমাণের ভিত্তিতে আলেমদের বিভিন্ন মর্যাদাপূর্ণ উপাধিতে ভূষিত করা হয়:

  1. আল-মুহাদ্দিস (المحدث): যিনি হাদীসের সনদ ও মতন সম্পর্কে গভীর পাণ্ডিত্য রাখেন, বর্ণনাকারীদের জীবনী ও তাদের দোষ-গুণ (জারহ ও তাদীল) সম্পর্কে জানেন এবং সমকালীন কিতাবসমূহের হাদীস সম্পর্কে পূর্ণ ব্যুৎপত্তি রাখেন। প্রাচীন গবেষকদের মতে, যিনি কমপক্ষে এক লক্ষ হাদীস সনদসহ আয়ত্ত করেছেন, তিনি মুহাদ্দিস।
  2. আল-হাফিজ (الحافظ): হাফিজের মর্যাদা মুহাদ্দিসের চেয়েও উচ্চতর। যিনি হাদীসের অধিকাংশ স্তরের বর্ণনাকারীদের অবস্থা ও দোষ-ত্রুটি পুঙ্খানুপুঙ্খ জানেন। ইমাম ইবনে হাজার আসক্বালানীর মতে, যিনি সনদ ও মতনসহ কমপক্ষে তিন লক্ষ হাদীস মুখস্থ ও সংরক্ষণ করেছেন, তাকে হাদীস শাস্ত্রে ‘আল-হাফিজ’ বলা হয়। যেমন: হাফিজ ইবনে হাজার আসক্বালানী, হাফিজ যাহাবী ও হাফিজ ইরাকী (রহ.)।

١١- مَا أَسْبَابُ الوَضْعِ فِي الحَدِيثِ؟ بَيِّنْ بِالإِيجَازِ-

[১১. হাদীস জালকরণের কারণসমূহ কী কী? সংক্ষেপে বর্ণনা করো।]

উত্তর: বিশ্বনবী (সা.)-এর নামে ইচ্ছাকৃত মিথ্যা বাক্য তৈরি করাকে ‘হাদীস জালকরণ’ (الوضع في الحديث) বলা হয়। ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে কুচক্রী মহল প্রধানত নিম্নোক্ত কারণে হাদীস জাল করেছিল:

  1. রাজনৈতিক সংঘাত ও দলীয় মতান্ধতা: বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের (যেমন শিয়া, খারেজী ও উমাইয়া অনুসারী) উগ্র কর্মীরা নিজেদের নেতার মর্যাদা বাড়াতে ও বিপক্ষের বদনাম করতে হাদীস তৈরি করত।
  2. ইসলামের বিরুদ্ধে গোপন ষড়যন্ত্র (যিন্দিক্বদের অপতৎপরতা): আব্দুল করীম বিন আবিল আওজার মতো কাফের যিন্দিক্বরা মুসলমানদের বিভ্রান্ত করতে হাজার হাজার মিথ্যা হাদীস প্রচার করেছিল।
  3. অজ্ঞ সূফী ও আবেদদের নেক নিয়তে মিথ্যা রচনা: কিছু মূর্খ আবেদ মানুষকে ইবাদতে উৎসাহিত করতে বিভিন্ন সূরার বানোয়াট ফযীলত তৈরি করেছিল। তারা বলত, “আমরা তো নবীর পক্ষে মিথ্যা বলছি, বিপক্ষে নয়!” যা চরম মারাত্মক অপরাধ ছিল।
  4. মাযহাবী গোঁড়ামি: নিজ মাযহাবের ইমামের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করতে এবং বিরোধী মাযহাবের অবমূল্যায়ন করতে স্বার্থান্বেষীরা জাল হাদীস তৈরি করেছিল।
  5. দুনিয়াবী স্বার্থ ও শাসকগোষ্ঠীর সন্তুষ্টি অর্জন: রাজদরবারের খলিফা বা ধনীদের খুশি করে অর্থ ও পদমর্যাদা লাভের উদ্দেশ্যে গাইয়াস বিন ইব্রাহিমের মতো লোকেরা জাল হাদীস বলত।

١٢- عَرِّفِ العَزِيزَ وَالغَرِيبَ-

[১২. আযীয ও গরীব হাদীসের সংজ্ঞা দাও।]

উত্তর:

  • আল-আযীয (العزيز):
    • আভিধানিক অর্থ: দুর্লভ বা শক্তিশালী।
    • পারিভাষিক সংজ্ঞা: “যে হাদীসের সনদের কোনো একটি স্তরেও সর্বনিম্ন দুইজন বর্ণনাকারী বিদ্যমান থাকে, তাকে হাদীসে আযীয বলা হয়।” অর্থাৎ কোনো স্তরে যেন দুইয়ের নিচে না নামে (যদিও পরবর্তী স্তরে রাবীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়)। যেমন বুখারী ও মুসলিমের হাদীস: “لا يؤمن أحدكم حتى أكون أحب إليه من والده وولده” যা হযরত আনাস ও আবু হুরায়রা (রা.) যৌথভাবে বর্ণনা করেছেন।
  • আল-গরীব (الغريب):
    • আভিধানিক অর্থ: নিঃসঙ্গ, অপরিচিত বা বিরল।
    • পারিভাষিক সংজ্ঞা: “যে হাদীসের সনদের যেকোনো একটি স্তরে মাত্র একজন বর্ণনাকারী এককভাবে হাদীসটি বর্ণনা করেন, তাকে হাদীসে গরীব বলা হয়।” যেমন হযরত উমর (রা.) বর্ণিত নিয়ত সম্পর্কিত বিখ্যাত হাদীসটি।

١٣- مَا المَشْهُورُ؟ وَمَا الفَرْقُ بَيْنَهُ وَبَيْنَ المُسْتَفِيضِ؟

[১৩. মাশহূর হাদীস কাকে বলে এবং এর সাথে মুস্তাফীযের পার্থক্য কী?]

উত্তর:

  • মাশহূর হাদীসের সংজ্ঞা (المشهور):
    আভিধানিক অর্থ যা মানুষের মাঝে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। পরিভাষায়: “যে হাদীসের সনদের প্রতিটি স্তরে সর্বনিম্ন তিনজন বর্ণনাকারী বিদ্যমান থাকে, কিন্তু তা মুতাওয়াতিরের সীমায় পৌঁছে না, তাকে মাশহূর হাদীস বলা হয়।” যেমন: “المسلم من سلم المسلمون من لسانه ويده” (প্রকৃত মুসলমান সেই যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে)।
  • মাশহূর ও মুস্তাফীযের মধ্যকার পার্থক্য:
    1. মুস্তাফীয (المستفيض): যে হাদীসের সনদের প্রথম স্তর (সাহাবী) থেকে শেষ স্তর পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে বর্ণনাকারীর সংখ্যা সমানভাবে তিন বা ততোধিক থাকে।
    2. পার্থক্য: সকল মুস্তাফীযই মাশহূর, কিন্তু সকল মাশহূর মুস্তাফীয নয় (المستفيض أخص من المشهور)। কারণ মাশহূরে কোনো এক স্তরে তিনের বেশি রাবী থাকলেও চলে, কিন্তু মুস্তাফীযে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রাবীর সংখ্যার সমতা বজায় থাকা বাধ্যতামূলক।

١٤- مَا مَعْنَى التَّدْلِيسِ لُغَةً وَاصْطِلاَحًا؟ وَمَا حُكْمُهُ؟ بَيِّنْ-

[১৪. তাদলীসের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ কী এবং এর হুকুম কী?]

উত্তর:

  • আভিধানিক অর্থ: ‘তাদলীস’ (التدليس) শব্দটি ‘দুগলাস’ (الدلس) ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ অন্ধকারের সংমিশ্রণ বা পণ্যের দোষ ঢেকে রেখে ক্রেতার কাছে বিক্রি করা।
  • পারিভাষিক সংজ্ঞা: “সনদের ভেতরের কোনো ত্রুটি বা দুর্বলতাকে গোপন রেখে বাহ্যিকভাবে সনদকে সুন্দর ও নির্দোষ হিসেবে উপস্থাপন করাকে তাদলীস বলা হয়।” এর প্রধান প্রকার হলো ‘তাদলীসুল ইসনাদ’ (উস্তাদের নাম গোপন করে তার উপরের শায়েখের নামে এমন শব্দে বর্ণনা করা যাতে মনে হয় সরাসরি শুনেছে)।
  • হুকুম: মুহাদ্দিসগণের দৃষ্টিতে তাদলীস অত্যন্ত নিন্দনীয় ও অপছন্দনীয় কাজ। ইমাম শু’বা বিন হাজ্জাজ কঠোর ভাষায় বলতেন: “তাদলীস করা ব্যভিচারের চেয়েও মারাত্মক!” মুদাল্লিসের (তাদলীসকারী) বর্ণিত ‘আন’ (عن) যুক্ত বর্ণনা প্রত্যাখ্যাত হয়, তবে যদি সে স্পষ্টভাবে “হাদ্দাসানা” বা “সামি’তু” বলে নিজের সরাসরি শ্রবণের সাক্ষ্য দেয়, তখন তা গ্রহণযোগ্য হয়।

١٥- اُكْتُبْ أَلْفَاظَ الجَرْحِ وَالتَّعْدِيلِ مَعَ ذِكْرِ المَرَاتِبِ-

[১৫. জারহ ও তাদীল-এর স্তরসমূহ ও শব্দাবলি লিপিবদ্ধ করো।]

উত্তর: হাদীস বর্ণনাকারীদের ত্রুটি নির্ধারণকে ‘জারহ’ এবং সততা ও বিশ্বস্ততা প্রমাণকে ‘তাদীল’ বলা হয়। হাফিজ ইবনে হাজার আসক্বালানী জারহ ও তাদীলের ৬টি করে স্তর নির্ধারণ করেছেন:

ক. তাদীলের (প্রশংসার) প্রধান স্তরসমূহ:

  1. সর্বোচ্চ স্তর (মুবালাগা): أوثق الناس (সর্বাধিক বিশ্বস্ত মানুষ), إليه المنتهى في التثبت।
  2. গুণাবলির পুনরাবৃত্তি: ثقة ثقة (অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য), ثقة ثبت।
  3. একক নির্ভরযোগ্যতা: ثقة (নির্ভরযোগ্য), متقن (পোক্ত), حجة (দলীলস্বরূপ)।
  4. সামান্য দুর্বলতাযুক্ত গ্রহণযোগ্য: صدوق (সত্যবাদী), لا بأس به (কোনো সমস্যা নেই)।

খ. জারহের (ত্রুটির) প্রধান স্তরসমূহ:

  1. হালকা বা মৃদু আপত্তি: لين الحديث (হাদীস কিছুটা নরম), فيه مقال (তার ব্যাপারে কিছু কথা আছে)।
  2. দলীল হিসেবে অনুপযোগী: ضعيف (দুর্বল), ليس بالقوي (তেমন শক্তিশালী নয়)।
  3. বর্জনীয় স্তর: متروك الحديث (তার হাদীস বর্জনীয়), واهٍ بمرة (একেবারেই ভঙ্গুর)।
  4. সর্বনিম্ন স্তর (মিথ্যাবাদী): كذاب (চরম মিথ্যাবাদী), يضع الحديث (হাদীস জালকারী), دجال।

١٦- عَرِّفِ الحَدِيثَ الحَسَنَ، ثُمَّ بَيِّنْ أَقْسَامَهُ-

[১৬. হাদীসে হাসানের সংজ্ঞা দাও এবং এর প্রকারভেদ বর্ণনা করো।]

উত্তর:

  • হাদীসে হাসানের সংজ্ঞা: আভিধানিক অর্থ সুন্দর বা মনোরম। পারিভাষিক সংজ্ঞায় হাফিজ ইবনে হাজার আসক্বালানী বলেন:

    “هُوَ خَبَرُ الآحَادِ بِنَقْلِ عَدْلٍ قَلَّ ضَبْطُهُ، مُتَّصِلَ السَّنَدِ، غَيْرَ مُعَلَّلٍ وَلاَ شَاذٍّ”

    “এমন খবরে আহাদ, যার সনদ ধারাবাহিকভাবে যুক্ত, বর্ণনাকারী পূর্ণ ন্যায়পরায়ণ (আদিল), কিন্তু তার স্মরণশক্তি বা স্মৃতিসংরক্ষণ ক্ষমতা সহীহ হাদীসের বর্ণনাকারীর চেয়ে সামান্য হালকা বা কম, এবং তা কোনো অন্তর্নিহিত দোষ (ইলাল) ও শায হওয়া থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।”
  • প্রকারভেদ: হাদীসে হাসান প্রধানত দুই প্রকার:
    1. হাসান লিযাতিহী (حسن لذاته): যা নিজস্ব সনদের গুণেই উপরোক্ত হাসানের শর্তাবলি পূরণ করেছে; একে সমর্থনের জন্য অন্য কোনো সনদের প্রয়োজন হয় না।
    2. হাসান লিগায়রিহী (حسن لغيره): যে হাদীসটি মূল সনদে বর্ণনাকারীর সামান্য স্মৃতিদুর্বলতা বা সনদের সামান্য ত্রুটির কারণে মূলত ‘যয়ীফ’ ছিল, কিন্তু সমমানের অপর একাধিক নির্ভরযোগ্য সনদ দ্বারা সমর্থিত হওয়ায় তার দুর্বলতা কেটে গিয়ে তা হাসানের স্তরে উন্নীত হয়েছে।
  • হুকুম: সহীহ হাদীসের মতো হাসান হাদীসও শরীয়তের সমস্ত আহকাম ও হালাল-হারামে পরিপূর্ণ দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. উলূমুল হাদীস শাস্ত্রের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কী?

উলূমুল হাদীসের মূল উদ্দেশ্য হলো বর্ণনাকারী ও হাদীসের পাঠ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে সহীহ হাদীসকে দুর্বল ও বানোয়াট বর্ণনা থেকে পৃথক করা, যাতে মহানবী (সা.)-এর বিশুদ্ধ সুন্নাহর ওপর আস্থা রেখে দ্বীন পালন করা সম্ভব হয়।

২. সহীহ হাদীস হওয়ার প্রধান পাঁচটি শর্ত কী কী?

সহীহ হাদীসের পাঁচটি অপরিহার্য শর্ত হলো: ১. ইত্তিসালুস সানাদ (ধারাবাহিক সনদ যুক্ত থাকা), ২. আদালাতুর রুওয়াত (সকল রাবীর ন্যায়পরায়ণতা), ৩. তামমুয যাব্ত (সকল রাবীর নিখুঁত স্মরণশক্তি), ৪. আদামুশ শুযূয (শায বা বিরোধী না হওয়া), এবং ৫. আদামুল ইল্লাহ (কোনো সূক্ষ্ম ত্রুটিমুক্ত হওয়া)।

৩. হাদীসে কুদসী ও কুরআনের মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?

কুরআনের শব্দ ও অর্থ উভয়টিই আল্লাহর পক্ষ থেকে জিব্রাঈল (আ.)-এর মাধ্যমে নাযিলকৃত এবং তা নামাযে তিলাওয়াত করা ফরজ। অপরদিকে হাদীসে কুদসীর মূল বক্তব্য আল্লাহর পক্ষ থেকে হলেও এর ভাষা ও শব্দচয়ন মহানবী (সা.)-এর নিজস্ব এবং তা নামাযে তিলাওয়াতযোগ্য নয়।

৪. মুরসাল হাদীসের বিধান কী?

জমহুর মুহাদ্দিসগণের মতে মুরসাল হাদীস মূলত যয়ীফ বা অপ্রমাণ্য; কারণ এতে মধ্যবর্তী সাহাবীর নাম উহ্য থাকে। তবে ইমাম আবু হানীফা ও ইমাম মালিক (রহ.)-এর মতে নির্ভরযোগ্য তাবেঈর মুরসাল গ্রহণযোগ্য, এবং ইমাম শাফেঈর মতে কিছু শর্ত পূরণ হলে তা প্রমাণযোগ্য হয়।

৫. মুতাওয়াতির ও আহাদ হাদীসের মৌলিক পার্থক্য কী?

মুতাওয়াতির হলো এমন হাদীস যার সনদের প্রতিটি স্তরে এত বিপুলসংখ্যক নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী বিদ্যমান থাকেন যে যুক্তির বিচারে তাদের মিথ্যার ওপর ঐক্যবদ্ধ হওয়া অসম্ভব। অপরদিকে যে হাদীসে মুতাওয়াতিরের এই শর্তটি পূরণ হয় না, তাকে খাবারে আহাদ বলা হয়।

৬. যয়ীফ হাদীসের ওপর কি শরীয়তে আমল করা যায়?

আকিদা ও হালাল-হারামের বিধানে যয়ীফ হাদীস গ্রহণযোগ্য নয়। তবে ফজিলত, নেক আমল ও উপদেশমূলক বিষয়ে তিনটি শর্তে আমল করা যায়: হাদীসটি মারাত্মক দুর্বল না হওয়া, শরীয়তের স্বীকৃত মূলনীতির আওতাভুক্ত হওয়া এবং আমলের সময় একে নিশ্চিত রাসুলীয় বাণী বিশ্বাস না করা।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন ➜

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *