ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ২য় বর্ষ পরীক্ষা 2020
বিভাগ: আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: উলূমুল বালাগাহ (علوم البلاغة)
বিষয় কোড: 201206 | পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
[দ্রষ্টব্য: (ক) অংশ হতে যে কোনো চারটি এবং (খ) অংশ হতে যে কোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও।]
مجموعة (أ) – ক বিভাগ: রচনামূলক প্রশ্নাবলি
١- عرف الفصاحة- ثم بيّن أقسامها بالأمثلة-
[১. ফাসাহাত-এর পরিচয় দাও। অতঃপর এর প্রকারসমূহ উদাহরণসহ বর্ণনা কর।]
ভূমিকা: আরবি অলংকারশাস্ত্রে ‘ফাসাহাত’ (الفصاحة) হলো বালাগাতের মূল ভিত্তি ও পূর্বশর্ত। বিশুদ্ধ, প্রাঞ্জল ও শ্রুতিমধুর শব্দচয়ন ব্যতীত কোনো বক্তব্য বালাগাতের স্তরে পৌঁছাতে পারে না। প্রবাদ রয়েছে: “কুল্লু বালীগিন ফাসীহুন, ওয়া লাইসা কুল্লু ফাসীহিন বালীগান” (প্রতিটি বালাগাতপূর্ণ বক্তব্যই ফাসীহ, কিন্তু প্রতিটি ফাসীহ বক্তব্য বালাগাতপূর্ণ নাও হতে পারে)।
ক. ফাসাহাতের আভিধানিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা:
- শাব্দিক অর্থ: ‘ফাসাহাত’ শব্দের মূল অর্থ প্রকাশ পাওয়া, উন্মোচিত হওয়া বা স্পষ্ট হওয়া। যেমন আরবীতে বলা হয়: ‘ফাসাহাস সুবহু’ (সকাল স্পষ্ট ও আলোকময় হয়েছে)।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: যে বক্তব্য বা শব্দ উচ্চারণে জিহ্বায় ভারী না লাগে, ব্যাকরণিক অশুদ্ধতা থেকে মুক্ত থাকে এবং অর্থের দিক থেকে সুস্পষ্ট ও প্রাঞ্জল হয়, তাকে ফাসাহাত বলা হয়।
খ. ফাসাহাতের প্রকারভেদ:
বালাগাতবিদগণের মতে ফাসাহাত তিন শ্রেণীতে বিভক্ত:
- ফাসাহাতুল কালিমা (فصاحة الكلمة): একক শব্দের বিশুদ্ধতা। এটি ৩টি দোষ থেকে মুক্ত হতে হয়:
- তানাফুরে হুরুফ (হরফের কর্কশতা বর্জন): যেমন ‘হুখউখ’ (এক ধরণের গাছ)।
- মুখালাফাতুল ক্বিয়াস (ব্যাকরণিক ভুল বর্জন): যেমন ‘আজলালা’ শব্দের ভুল রূপ ‘আজলাল’।
- গারাবাত (শব্দের দুর্বোধ্যতা পরিহার): যেমন অপ্রচলিত দুরূহ শব্দ ব্যবহার করা।
- ফাসাহাতুল কালাম (فصاحة الكلام): পূর্ণ বাক্যের বিশুদ্ধতা। এটি বাক্যগত তানাফুর, দুর্বল সংযোজন (দা’ফুত তালীফ) এবং জটিলতা (তা’ক্বীদ লাফযী ও মা’নাবী) থেকে মুক্ত হতে হয়।
- ফাসাহাতুল মুতাকাল্লিম (فصاحة المتكلم): বক্তার এমন সহজাত সাহিত্যিক যোগ্যতা ও প্রতিভা, যার মাধ্যমে সে যেকোনো পরিস্থিতিতে মনের ভাব বিশুদ্ধ ও অলঙ্কৃত ভাষায় প্রকাশ করতে সক্ষম হয়।
٢- عرف الخبر- ثم بيّن أقسام الخبر باعتبار المخاطب بالأمثلة-
[২. খবর-এর পরিচয় দাও। অতঃপর শ্রোতার (المخاطب) মানসিক অবস্থা বিবেচনায় খবরের প্রকারভেদ উদাহরণসহ বর্ণনা কর।]
ক. খবরের পরিচয়:
আরবি বালাগাতশাস্ত্রে ‘খবর’ (الخبر) হলো এমন বাক্য, যার বক্তাকে বাস্তবতার আলোকে সত্যবাদী (সাদিক্ব) কিংবা মিথ্যাবাদী (কাযিব) বলা সম্ভব। যদি বাক্যটি বাস্তবতার সাথে মিলে যায় তবে তা সত্য, আর বাস্তবতার বিপরীত হলে তা মিথ্যা। যেমন: ‘আল-ইলমু নাফি’উন’ (العلم نافع – জ্ঞান উপকারী)।
খ. শ্রোতার মানসিক অবস্থা বিবেচনায় খবরের প্রকারভেদ (ضرب الخبر):
বালাগাতশাস্ত্রে শ্রোতার মানসিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী খবর তিন প্রকার:
- ইবতিদাঈ (الضرب الابتدائي – প্রাথমিক খবর):
- প্রেক্ষাপট: যখন শ্রোতার মনে বক্তব্যের বিষয়ে কোনো পূর্ব ধারণা বা সংশয় থাকে না (খালিউয যিহন)।
- পদ্ধতি: কোনো প্রকার তাকীদ (জোরদানকারী হরফ) ছাড়াই স্বাভাবিক বাক্য বলা হয়।
- উদাহরণ: ‘আখূকা ক্বা-দিমুন’ (أخوك قادم – তোমার ভাই এসেছে)।
- ত্বালাবী (الضرب الطلبي – অনুসন্ধিৎসু খবর):
- প্রেক্ষাপট: যখন শ্রোতা বক্তব্যটি সত্য না মিথ্যা তা নিয়ে ইতস্তত ও সংশয়ে ভোগে (মুতারদ্দিদ)।
- পদ্ধতি: তার সন্দেহ দূর করার জন্য বাক্যে একটি তাকীদ ব্যবহার করা উত্তম।
- উদাহরণ: ‘ইন্না আখাকা ক্বা-দিমুন’ (إنّ أخاك قادم – নিশ্চয় তোমার ভাই এসেছে)।
- ইনকারী (الضرب الإنكاري – অস্বীকারমূলক খবর):
- প্রেক্ষাপট: যখন শ্রোতা বক্তব্যটি দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করে (মুনকির)।
- পদ্ধতি: তার অস্বীকৃতির মাত্রা অনুযায়ী এক বা একাধিক তাকীদ (যেমন ইন্না, লামে ইবতিদা, ক্বাসাম ইত্যাদি) ব্যবহার করা ওয়াজিব।
- উদাহরণ: ‘ওয়াল্লাহি ইন্না আখাকা লাক্বা-দিমুন’ (والله إنّ أخاك لقادم – আল্লাহর শপথ! নিশ্চয় তোমার ভাই অবশ্যই এসেছে)। কুরআনে সূরা ইয়াসীনের আয়াত: “ইন্না ইলাইকুম মুরসালূন” এবং অস্বীকারের তীব্রতায়: “ইন্না ইলাইকুম লামুরসালূন”।
٣- عرف الإنشاء- ثم اذكر أقسام الإنشاء الطلبي بالأمثلة-
[৩. ইনশা-এর পরিচয় দাও। অতঃপর আল-ইনশাউত ত্বলাবী-এর প্রকারসমূহ উদাহরণসহ আলোচনা কর।]
ক. ইনশা (الإنشاء)-এর পরিচয়:
যে বাক্য কোনো বহিরাগত বাস্তবতার সংবাদ দেয় না এবং যার বক্তাকে সত্যবাদী বা মিথ্যাবাদী আখ্যা দেওয়া যায় না, বরং উচ্চারণের মাধ্যমেই যার মর্ম সৃষ্টি হয়, তাকে ইনশা বলে। যেমন আদেশ, নিষেধ, প্রশ্ন ইত্যাদি।
খ. আল-ইনশাউত ত্বলাবী (الإنشاء الطلبي)-এর প্রকারভেদ:
যে ইনশায় কোনো কিছু অর্জনের দাবি থাকে যা পূর্বে অর্জিত ছিল না, তাকে ইনশায়ে ত্বলাবী বলে। এর প্রধান ৫টি প্রকার:
- আমর (الأمر – আদেশ): উপরস্থ ব্যক্তি কর্তৃক অধস্তনকে কোনো কাজ করার নির্দেশ। যেমন: ‘আক্বীমুস সালাত’ (أقيموا الصلاة – নামায কায়েম কর)।
- নাহী (النهي – নিষেধ): কোনো কাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ। যেমন: ‘লা তুশরিক বিল্লাহ’ (لا تشرك بالله – আল্লাহর সাথে শিরক করো না)।
- ইস্তিফহাম (الاستفهام – প্রশ্নবোধক জিজ্ঞাসা): অজানা বিষয় জানার আকাঙ্ক্ষা। যেমন: ‘হাল আতা-কা হাদীসুল গা-শিয়াহ’ (هل أتاك حديث الغاشية)।
- তামান্নী (التمني – দুর্লভ আকাঙ্ক্ষা): অসম্ভব বা অত্যন্ত কঠিন কোনো বস্তুর আকাঙ্ক্ষা করা (সাধারণত ‘লাইতা’ দ্বারা)। যেমন: ‘ইয়া লাইতানী কুনতু তুরাবা’ (يا ليتني كنت ترابا – হায়! আমি যদি মাটি হয়ে যেতাম!)।
- নিদা (النداء – আহ্বান): কাউকে ডাকার বা আকর্ষণ করার বাক্য। যেমন: ‘ইয়া আইয়্যুহান নাস’ (يا أيها الناس – হে মানবজাতি!)।
٤- ما هو الإيجاز والإطناب؟ ثم بيّن أقسام الإيجاز بالأمثلة-
[৪. ‘ই’জায’ ও ‘ইতনাব’ কাকে বলে? অতঃপর ই’জায-এর প্রকারগুলো উদাহরণসহ বর্ণনা কর।]
ক. ই’জায ও ইতনাবের সংজ্ঞা:
- আল-ই’জায (الإيجاز): অল্প শব্দে কিন্তু গভীর, সমৃদ্ধ ও পূর্ণাঙ্গ অর্থ প্রকাশ করার অলংকারিক রীতিকে ই’জায (সংক্ষিপ্তকরণ) বলে। শর্ত হলো বক্তব্য অস্পষ্ট হওয়া যাবে না।
- আল-ইতনাব (الإطناب): কোনো বিশেষ সাহিত্যিক উপকারিতা, গুরুত্ব বা তাকিদের উদ্দেশ্যে শব্দের পরিমাণ বাড়িয়ে বিস্তারিত আলোচনা করাকে ইতনাব (দীর্ঘকরণ) বলে।
খ. ই’জাযের প্রকারভেদ:
ই’জায প্রধানত দুই প্রকার:
- ই’জাযুল ক্বাসার (إيجاز القصر – সংক্ষেপকরণ): কোনো শব্দ বিলুপ্ত না করেই ক্ষুদ্রতম বাক্যে সমুদ্রসম গভীর অর্থ সন্নিবেশিত করা।
- কুরআনিক উদাহরণ: “ওয়ালাকুম ফিল ক্বিসাসি হায়াত” (ولكم في القصاص حياة – আর ক্বিসাসের মধ্যে তোমাদের জন্য জীবন নিহিত রয়েছে—সূরা বাকারা: ১৭৯)। জাহেলি আরবরা বলত ‘আল-ক্বাতলু আনফা লিল ক্বাতলি’; কিন্তু কুরআনের মাত্র চারটি শব্দ সমগ্র সমাজবিজ্ঞানের মূল সুর স্পষ্ট করে দিয়েছে।
- ই’জাযুল হাযফ (إيجاز الحذف – বিলোপকরণ): বাক্যের কোনো হরফ, শব্দ বা পূর্ণ উপবাক্যকে বিলুপ্ত করে সংক্ষেপ করা, যেখানে পূর্বাপর ইঙ্গিত দ্বারা বিলুপ্ত অংশ বোঝা যায়।
- শব্দ বিলোপের উদাহরণ: “ওয়াসআলিল ক্বারইয়াহ” (জনপদকে জিজ্ঞাসা কর—এখানে ‘আহল’ বা অধিবাসী শব্দটি বিলুপ্ত)।
- বাক্য বিলোপের উদাহরণ: মুসা (আ.)-কে বলা হলো লাঠি দিয়ে পাথরে আঘাত কর; এর পরই বলা হলো ‘ফানফাজারাত মিনহুসনাতা আশরাতা আইনান’ (অতঃপর তা থেকে বারোটি ঝরনা প্রবাহিত হলো)। এখানে ‘তিনি আঘাত করলেন’ বাক্যটি বিলুপ্ত।
٥- عرف النهي- وكم صيغة له؟ تحدث عن المعاني التي يدل عليها النهي-
[৫. ‘নাহী’-এর পরিচয় দাও। এর সীগাহ কয়টি? নাহী যেসব অলংকারিক অর্থে ব্যবহৃত হয় তা আলোচনা কর।]
ক. নাহীর পরিচয় ও মূল সীগাহ:
বালাগাতের পরিভাষায়, উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি কর্তৃক শক্তিসুলভ ভঙ্গিতে কাউকে কোনো কাজ বর্জন করার নির্দেশ দেওয়াকে নাহী (النهي) বলে। এর মৌলিক সীগাহ একটিই: ‘লা আন-নাহিয়াহ’ যুক্ত ফে’লে মুদারে (لا الناهية + الفعل المضارع)। যেমন: ‘লা তাফ’আল’ (لا تفعل – তুমি করো না)।
খ. নাহীর বালাগাতীয় আলঙ্কারিক অর্থসমূহ:
নাহী তার আসল নিষেধাজ্ঞামূলক অর্থ ছাড়াও প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিম্নোক্ত অর্থে ব্যবহৃত হয়:
- দু’আ (الدعاء – বিনম্র প্রার্থনা): যখন অধস্তন ব্যক্তি আল্লাহর কাছে নিবেদন করে। যেমন: “রাব্বানা লা তুয়াখিজনা” (ربنا لا تؤاخذنا – হে আমাদের রব! আপনি আমাদের পাকড়াও করবেন না)।
- ইলতিমাস (الالتماس – সমপর্যায়ের অনুরোধ): সহকর্মী বা বন্ধুদের মধ্যে। যেমন: ‘হে বন্ধু, কথা বলো না।’
- তাহক্বীর (التحقير – অবজ্ঞা ও তাচ্ছিল্য): প্রতিপক্ষকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতে। যেমন: “লা তামলুকূনা শাইয়ান”।
- তায়য়ীস (التيئيس – হতাশ করা): কাফিরদের শাস্তি নিশ্চিত বোঝাতে। যেমন: “লা তা’তাযিরুল ইয়াওম” (لا تعتذروا اليوم – আজ কোনো অজুহাত পেশ করো না)।
٦- الاستعارة ما هي؟ وكم قسما لها؟ بيّن بالأمثلة-
[৬. ‘ইস্তি’আরাহ’ কাকে বলে? এটি কত প্রকার? উদাহরণসহ বর্ণনা কর।]
ক. ইস্তি’আরাহর সংজ্ঞা:
‘ইস্তি’আরাহ’ (الاستعارة) শব্দের আভিধানিক অর্থ ধার করা বা কর্জ নেওয়া। ইলমুল বয়ানের পরিভাষায়, তাশবীয়াহর (উপমা) প্রধান দুই স্তম্ভ—মুশাব্বাহ (যার সাথে তুলনা করা হয়) অথবা মুশাব্বাহ বিহী (যার সাথে তুলনা করা হয়)—এর যেকোনো একটিকে বিলুপ্ত করে এবং কোনো সাদৃশ্যের ভিত্তিতে শব্দকে রূপক অর্থে ব্যবহার করাকে ইস্তি’আরাহ বলা হয়। যেমন: বীর যোদ্ধাকে দেখে বলা হলো—“আমি ময়দানে একটি সিংহকে লড়াই করতে দেখেছি।” এখানে বীর সেনাকে সিংহের ধার করা শব্দে প্রকাশ করা হয়েছে।
খ. প্রধান প্রকারভেদ (মূল উপাদানের উপস্থিতির দৃষ্টিতে):
- ইস্তি’আরায়ে তাসরীহিয়্যাহ (الاستعارة التصريحية): যেখানে মুশাব্বাহকে বিলুপ্ত করে সরাসরি মুশাব্বাহ বিহীকে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়।
- কুরআনিক উদাহরণ: “কিতাবুন আনযালনাহু ইলাইকা লিতুখরিজান নাসা মিনায যুলুমাতি ইলান নূর” (সূরা ইব্রাহিম: ১)। এখানে ‘যুলুমাত’ দ্বারা কুফরি এবং ‘নূর’ দ্বারা ঈমানকে বোঝানো হয়েছে। কুফরি ও ঈমানকে বাদ দিয়ে সরাসরি নূর ও যুলুমাত উল্লেখ করা হয়েছে।
- ইস্তি’আরায়ে মাকনিয়্যাহ (الاستعارة المكنية): যেখানে মুশাব্বাহ বিহীকে গোপন রেখে কেবল তার কোনো অবিচ্ছেদ্য বৈশিষ্ট্য বা নিদর্শনকে প্রকাশ করা হয়।
- উদাহরণ: কবি আবু যুহাইবের কবিতা: “যখন মৃত্যু তার নখর বিধে দিল…”। এখানে মৃত্যুকে শিকারী হিংস্র পশুর সাথে তুলনা করা হয়েছে, পশুটিকে উল্লেখ না করে তার বৈশিষ্ট্য ‘নখর’ উল্লেখ করা হয়েছে।
مجموعة (ب) – খ বিভাগ: সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি
٧- عرف البلاغة- ثم اذكر اقسامها بالأمثلة-
[৭. বালাগাত-এর পরিচয় দাও। অতঃপর এর শাখাগুলো উদাহরণসহ উল্লেখ কর।]
বালাগাতের পরিচয়: পরিস্থিতি ও শ্রোতার মানসিক অবস্থার (মুক্বতাদায়ে হাল) সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্য রেখে বিশুদ্ধ ও অলঙ্কৃত ভাষায় মনের ভাব প্রকাশ করার যোগ্যতাকে বালাগাত (البلاغة) বলে।
বালাগাতের তিনটি প্রধান শাখা:
- ইলমুল মা’আনী (علم المعاني): বাক্য গঠন ও বক্তব্যকে পরিস্থিতির উপযোগী করার শাস্ত্র (যেমন—খবর, ইনশা, ক্বাসর, ই’জায)।
- ইলমুল বায়ান (علم البيان): একই অর্থকে বিভিন্ন উপায়ে স্পষ্ট ও প্রাঞ্জল করে প্রকাশের শাস্ত্র (যেমন—তাশবীহ, মাজায, ইস্তি’আরাহ, কিনায়াহ)।
- ইলমুল বাদী’ (علم البديع): শব্দ ও অর্থের বাহ্যিক সৌন্দর্য বৃদ্ধির শাস্ত্র (যেমন—জিনাস, সাজা’, তিবাক্ব, মুক্বাবালাহ)।
٨- بيّن أسباب حذف المسند اليه وذكره-
[৮. মুসনাদ ইলাইহ-কে বিলুপ্তকরণ ও বাক্যে উল্লেখ করার কারণসমূহ বর্ণনা কর।]
- মুসনাদ ইলাইহ উল্লেখ করার কারণ: বক্তব্যকে সুস্পষ্ট করা, শ্রোতার স্মৃতিতে তা বদ্ধমূল করা, মুসনাদ ইলাইহর প্রতি সম্মান প্রদর্শন বা অবজ্ঞা প্রকাশ করা।
- মুসনাদ ইলাইহ বিলুপ্ত করার কারণ: বাক্য সংক্ষিপ্ত করা (ই’জায), বিষয়টি পূর্বাপর দ্বারা নিশ্চিতভাবে জানা থাকা, গোপন রাখার ইচ্ছা কিংবা ভয়ে বা সম্মানে নাম প্রকাশ না করা। যেমন: “নি’মাল মাওলা ওয়া নি’মান নাসীর”।
٩- عرف النداء- ثم تحدث عن أغراضه بالأمثلة-
[৯. নিদা (সম্বোধন)-এর সংজ্ঞা দাও। অতঃপর এর আলঙ্কারিক উদ্দেশ্যাবলি আলোচনা কর।]
সংজ্ঞা: কোনো হরফের সাহায্যে কাউকে নিজের দিকে মনোযোগী করার আহ্বানকে নিদা (النداء) বলে। প্রধান হরফসমূহ হলো: يَا، أَيَا، هَيَا، أَيْ، والهمزة।
বালাগাতীয় উদ্দেশ্যসমূহ:
- ইস্তিগাসাহ (আকুল সাহায্য প্রার্থনা): ‘ইয়া লিল্লাহি লিল মুসলিমীন’।
- নুদ্ববাহ (শোক প্রকাশ): ‘ওয়া মুহাম্মাদাহ’, ‘ওয়া ক্বালবাহ’।
- তাহাসসুর (আক্ষেপ প্রকাশ): ‘ইয়া হাসরাতা আলাল ইবাদ’ (সূরা ইয়াসীন)।
- তাযাজ্জুর (বিরক্তি ও বঞ্চনা): ‘ইয়া লাইতানী লাম উতিতাবিয়াহ’।
١٠- عرف الوصل والفصل بالأمثلة-
[১০. উদাহরণসহ ওয়াসল ও ফসলের পরিচয় দাও।]
- আল-ওয়াসল (الوصل): ওয়াও (و) অব্যয়ের মাধ্যমে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী বাক্যের মধ্যে সংযোজন ঘটানো। যেমন: “আল্লাহু ইয়াক্ববিদূ ওয়া ইয়াবসুতু” (والله يقبض ويبسط)।
- আল-ফসল (الفصل): কোনো সংযোজক অব্যয় (ওয়াও) ব্যবহার না করে দুটি বাক্যকে পরস্পর পৃথক রাখা। যেমন: “ওয়া ইযা খালাও ইলা শায়াতীনিহিম ক্বালূ ইন্না মা’আকুম; ইন্নামা নাহনু মুসতাহযিঊন; আল্লাহু ইয়াসতাহযিউ বিহিম” (সূরা বাকারা)। এখানে পরিপূর্ণ বিচ্ছিন্নতা বা কামালুল ইনক্বিতা’র কারণে ফসল হয়েছে।
١١- الكناية ما هي؟ ثم بيّن أقسامها-
[১১. ‘কিনায়াহ’ কাকে বলে? অতঃপর এর প্রকারগুলো বর্ণনা কর।]
সংজ্ঞা: কোনো শব্দকে তার আভিধানিক অর্থে গ্রহণ করার অবকাশ রেখে অন্তর্নিহিত অন্য এক প্রচ্ছন্ন অর্থে ব্যবহার করাকে কিনায়াহ বলে।
প্রকারভেদ (উদ্দেশ্যের দৃষ্টিতে ৩ প্রকার):
- কিনায়াহ আনিস সিফাত (كناية عن الصفة): কোনো গুণকে সরাসরি না বলে ইঙ্গিত করা। যেমন: ‘সে লম্বা তলোয়ারের বেল্ট পরিধান করে’—দ্বারা তার উচ্চ দৈহিক উচ্চতা বোঝানো।
- কিনায়াহ আনিল মাওসূফ (كناية عن الموصوف): গুণীর নাম গোপন রেখে গুণের মাধ্যমে তাকে বোঝানো। যেমন কুরআনে জাহাজকে ‘যাতি আলওয়াহিন ওয়া দুসুর’ (কাষ্ঠফলক ও পেরেকের তৈরি বস্তু) বলা হয়েছে।
- কিনায়াহ আনিন নিসবাত (كناية عن النسبة): কোনো গুণকে সরাসরি ব্যক্তির সাথে না মিলিয়ে তার পরিহিত বস্ত্র বা অঙ্গের দিকে সম্বন্ধযুক্ত করা।
١٢- عرف المحسنات المعنوية بالأمثلة-
[১২. ‘মুহাসসিনাতে মা’নাবিয়্যাহ’-এর উদাহরণসহ পরিচয় দাও।]
পরিচয়: ইলমুল বাদী’-এর যে অংশে বাক্যের বাহ্যিক শব্দের পরিবর্তে মূলত অভ্যন্তরীণ অর্থ ও ভাববস্তুকে অলঙ্কৃত ও সুন্দর করার কলাকৌশল আলোচনা করা হয়, তাকে আল-মুহাসসিনাতুল মা’নাবিয়্যাহ (المحسنات المعنوية) বলে।
প্রধান উদাহরণসমূহ:
- তিবাক্ব (الطباق): একই বাক্যে দুটি বিপরীতমুখী শব্দের সমন্বয়। যেমন: “হুওয়াল আউয়ালু ওয়াল আখিরু ওয়ায যাহিরু ওয়াল বাতিন” (সূরা আল-হাদীদ: ৩)।
- মুক্বাবালাহ (المقابلة): ক্রমানুসারে একাধিক শব্দের বিপরীত শব্দ অপর অংশে সাজানো। যেমন: “ফালায়াদহাকূ ক্বালীলাও ওয়ালিয়াবকূ কাসীরা” (সূরা আত-তাওবাহ)।
- তাওরিয়াহ (التورية): এমন শব্দ ব্যবহার করা যার দুটি অর্থ থাকে—একটি নিকটবর্তী যা উদ্দেশ্য নয় এবং অন্যটি দূরবর্তী যা বক্তার মূল উদ্দেশ্য।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. বালাগাত ও ফাসাহাতের মধ্যে মূল পার্থক্য কী?
ফাসাহাত হলো শব্দের উচ্চারণগত মাধুর্য ও ব্যাকরণিক বিশুদ্ধতা; আর বালাগাত হলো পরিস্থিতি ও শ্রোতার অবস্থা অনুযায়ী উপযুক্ত ও চিত্তাকর্ষক বক্তব্য উপস্থাপন করা।
২. ইলমু বালাগাহ কয়টি শাস্ত্রে বিভক্ত?
বালাগাত শাস্ত্র প্রধানত তিনটি শাখায় বিভক্ত: ইলমুল মা’আনী (অর্থবিজ্ঞান), ইলমুল বায়ান (রূপক ও বয়ানবিজ্ঞান) এবং ইলমুল বাদী’ (অলংকারবিজ্ঞান)।
৩. ‘ইবতিদাঈ’, ‘ত্বালাবী’ ও ‘ইনকারী’ খবরের পার্থক্য কী?
শ্রোতা নির্লিপ্ত হলে কোনো তাকীদ ছাড়া বাক্য বলা ইবতিদাঈ; শ্রোতা সন্দিহান হলে একটি তাকীদ দেওয়া ত্বালাবী; এবং শ্রোতা অস্বীকারকারী হলে একাধিক তাকীদ দেওয়া ইনকারী খবর।
৪. ‘ই’জাযুল ক্বাসার’ কাকে বলে?
কোনো শব্দ বিলুপ্ত না করেই সংক্ষিপ্ততম বাক্যে বিস্তৃত ও অগাধ অর্থ ফুটিয়ে তোলাকে ই’জাযুল ক্বাসার বলে; পবিত্র কুরআনের আয়াতসমূহ এর শ্রেষ্ঠ নিদর্শন।
৫. ইস্তি’আরাহর মূল উপাদান কয়টি?
ইস্তি’আরাহর প্রধান উপাদান তিনটি: মুসতা’আর লাহ (মুশাব্বাহ), মুসতা’আর মিনহু (মুশাব্বাহ বিহী) এবং জামে’ (উভয়ের মধ্যকার সাদৃশ্যপূর্ণ গুণ)।
৬. ‘তিবাক্ব’ ও ‘মুক্বাবালাহ’-এর পার্থক্য কী?
তিবাক্ব হলো একটি শব্দের বিপরীতে একটি বিপরীত শব্দ আনা; আর মুক্বাবালাহ হলো একাধিক বিপরীতমুখী শব্দকে সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে অর্থকে প্রোজ্জ্বল করা।