পরীক্ষা কোড: ২০১ | প্রশ্নপত্র কোড: ০৩৪
ফাজিল (স্নাতক) সম্মান প্রথম বর্ষ পরীক্ষা, ২০২১
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
বাংলা (Bangla)
বিষয় কোড: ২০৫১০৬
সময়—৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান—৮০
[দ্রষ্টব্য: ক, খ ও গ বিভাগ থেকে ২টি করে এবং ঘ বিভাগ থেকে ৪টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।]
ক বিভাগ (সাহিত্য: প্রাচীন ও মধ্যযুগ এবং আধুনিক যুগ)
১। (ক) মধ্যযুগে রচিত রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান কাব্যধারার সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধর।
ভূমিকা
বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগে (বিশেষত পঞ্চদশ থেকে অষ্টাদশ শতক) দেব-দেবী নির্ভর মঙ্গলকাব্য ও বৈষ্ণব পদাবলীর ধর্মীয় পরিমণ্ডলের বাইরে এসে সম্পূর্ণ মানবিক প্রেম ও পার্থিব অনুভূতির যে কাব্যধারা বিকশিত হয়েছিল, তা ‘রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান’ নামে পরিচিত। মধ্যযুগের মুসলিম কবিগণ ফারসি, আরবি ও হিন্দি সাহিত্যের কাহিনি অবলম্বন করে এই ধর্মনিরপেক্ষ মানবিক সাহিত্যধারা প্রবর্তন করেন, যা বাংলা কাব্যে এক যুগান্তকারী আধুনিক চেতনার উন্মেষ ঘটায়।
রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যানের বৈশিষ্ট্য ও প্রধান কবিগণ
- ১. শাহ মুহম্মদ সগীর ও প্রথম প্রণয়কাব্য: গৌড়ের সুলতান গিয়াসউদ্দীন আজম শাহের রাজত্বকালে (১৩৮৯—১৪১০ খ্রি.) শাহ মুহম্মদ সগীর রচনা করেন প্রথম রোমান্টিক প্রণয়কাব্য ‘ইউসুফ-জুলেখা’। এতে তিনি ধর্মীয় কাহিনিকে মানবীয় রূপদান করে লিখেছেন: “নানা কাব্যে দেখিনু বিস্তর। না কহিল কেহ প্রেম সাগরের চর।”
- ২. আরাকান বা রোসাঙ্গ রাজদরবারের অবদান: সপ্তদশ শতাব্দীতে আরাকান রাজদরবারের পৃষ্ঠপোষকতায় রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান তার চরম উৎকর্ষে পৌঁছায়:
- দৌলত কাজী: হিন্দি কবি সাধন ও মিয়ার রচিত কাহিনি অবলম্বনে তিনি রচনা করেন অমর কাব্য ‘সতীময়না ও লোরচন্দ্রানী’। মানবীয় চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক রূপায়ণে তিনি অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দেন।
- মহাকবি আলাওল: মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ কবি আলাওল রচনা করেন কালজয়ী কাব্য ‘পদ্মাবতী’ (মালিক মুহাম্মদ জায়সীর পদুমাবত অবলম্বনে)। এছাড়া তিনি ‘সয়ফুলমুলুক বদিউজ্জামাল’, ‘সিকান্দরনামা’ ও ‘তোহফা’ রচনা করেন। তাঁর কাব্যে পাণ্ডিত্য, মানবপ্রেম ও নাট্যধর্মী বর্ণনার অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে।
- ৩. অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কবি ও কাব্য: সাবিরিদ খানের ‘বিদ্যাসুন্দর’, সৈয়দ সুলতানের ‘নবী বংশ’ ও ‘শবে মেরাজ’, আব্দুল হাকিমের ‘লালমতি-সাইফুলমুলুক’ এবং দৌলত উজীর বাহরাম খানের ‘লাইলী-মজনু’ এই ধারার উল্লেখযোগ্য সংযোজন।
- ৪. মূল বৈচিত্র্য: অলৌকিক দেব-দেবীর স্থলে রক্তমাংসের মানুষের সুখ-দুঃখ, মিলন-বিরহ, নারীর বিশ্বস্ততা ও আত্মত্যাগের নিখুঁত বাস্তবসম্মত রূপায়ণই ছিল এ কাব্যের প্রাণ।
উপসংহার
মধ্যযুগের রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান কাব্যধারা বাংলা সাহিত্যকে ধর্মের নিগড় থেকে মুক্ত করে খাঁটি মানবিক রসের আস্বাদন দিয়েছিল। আধুনিক বাংলা উপন্যাসের বীজ এই কাব্যধারার মধ্যেই নিহিত ছিল।
অথবা, ১। (খ) টীকা লেখ: (১) চর্যাপদ, (২) লাইলী-মজনু।
(১) চর্যাপদ
চর্যাপদ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রাচীনতম লিখিত প্রামাণ্য নিদর্শন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে এর রচনাকাল সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতক (৬৫০—১২০০ খ্রি.) এবং ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে দশম থেকে দ্বাদশ শতক (৯৫০—১২০০ খ্রি.)। ১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজদরবারের রাজকীয় লাইব্রেরি থেকে ‘হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় রচিত বৌদ্ধ গান ও দোহা’ নামে এটি আবিষ্কার করেন। চর্যাপদের পদকর্তাদের ‘সিদ্ধাচার্য’ বলা হতো (যেমন: লুইপা, কাহ্নপা, ভুসুকুপা, কুক্কুরীপা)। আবিষ্কৃত সাড়ে ৪৬টি পদের মূল বিষয়বস্তু ছিল বৌদ্ধ সহজিয়া সাধকদের গুহ্য সাধন প্রণালী, যা ‘সন্ধ্যা ভাষা’ বা প্রতীকী ভাষায় রচিত। এর মাধ্যমে তৎকালীন প্রাচীন বাংলার নদীনালা, নৌকা, শিকার, জাতিভেদ এবং ডোম-শবরদের দরিদ্র জীবনের বাস্তব চিত্রও ফুটে উঠেছে। ১৯২৬ সালে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁর ODBL গ্রন্থে ভাষাতাত্ত্বিক প্রমাণের সাহায্যে প্রমাণ করেন যে চর্যাপদ খাঁটি প্রাচীন বাংলা ভাষায় রচিত।
(২) লাইলী-মজনু
আরবি লোকগাথার অমর ট্র্যাজিক প্রেমের উপাখ্যান অবলম্বনে ফারসি কবি নিজামী গজনভী যে মহাকাব্য রচনা করেছিলেন, ষোড়শ শতাব্দীতে চট্টগ্রামের কবি দৌলত উজীর বাহরাম খান তা বাংলায় ‘লাইলী-মজনু’ শিরোনামে কাব্যরূপ দেন। এতে কায়েস (মজনু) এবং লাইলীর নিষ্কলঙ্ক, আধ্যাত্মিক ও অবিনশ্বর প্রেমের বেদনাবিধুর রূপ চিত্রিত হয়েছে। তৎকালীন সামন্ত সমাজের নির্মম রক্তচক্ষু ও গোত্রীয় অহমিকা উপেক্ষা করে ভালোবাসার জন্য নিজের অস্তিত্ব বিসর্জনের যে মহাকাব্যিক হাহাকার এতে রূপায়িত হয়েছে, তা বাংলা রোমান্টিক কাব্যধারায় এক চিরন্তন সম্পদ।
২। (ক) বিহারীলাল চক্রবর্তীকে ‘ভোরের পাখি’ আখ্যা দিয়ে কবিগুরু যথার্থ কাজ করেছেন—মূল্যায়ন কর।
ভূমিকা ও উক্তির তাৎপর্য
বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগে আত্মকেন্দ্রিক গীতিকবিতার (Lyric Poetry) প্রথম সফল প্রবক্তা ছিলেন বিহারীলাল চক্রবর্তী (১৮৩৫—১৮৯৪ খ্রি.)। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর পূর্বসূরি বিহারীলাল সম্পর্কে মুগ্ধ হয়ে লিখেছিলেন: “তিনি প্রত্যুষের সুর ধরিয়া আগমন করিলেন… তিনি বাংলা কাব্যাকাশের ভোরের পাখি।” ভোরবেলা যেমন রাত্রির অন্ধকার কাটিয়ে পাখির কাকলিতে দিনের আগমন বার্তা ঘোষিত হয়, তেমনি মধ্যযুগীয় বর্ণনাধর্মী কাব্যের অবসান ঘটিয়ে নিখাদ রোমান্টিক অন্তর্মুখী অনুভূতির গীতিময় প্রকাশ বিহারীলালের মাধ্যমেই ঘটেছিল।
কবিগুরুর মূল্যায়নের যথার্থতা
- ১. আত্মমগ্ন গীতিকবিতার সূচনা: বিহারীলালের পূর্বে মাইকেল মধুসূদন দত্ত বা ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত বাইরের জগৎ, স্বদেশ বা মহাকাব্যের কাহিনি নিয়ে কাব্য রচনা করতেন। বিহারীলালই সর্বপ্রথম নিজের গভীর হৃদয়াবেগ, আনন্দ-বেদনা ও কল্পনার জগতকে কাব্যের প্রধান উপজীব্য করেন। তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থগুলো হলো ‘সারদামঙ্গল’, ‘সঙ্গীত শতক’, ‘বঙ্গসুন্দরী’ এবং ‘প্রেমপ্রবাহিনী’।
- ২. রবীন্দ্র প্রতিভার অনুপ্রেরণা: বালক রবীন্দ্রনাথ বিহারীলালের ‘সারদামঙ্গল’ কাব্য সুর করে গাইতেন। বিহারীলালের সৌন্দর্যের দেবী ‘সারদা’ রবীন্দ্রনাথের ‘মানসী’ ও ‘জীবনদেবতা’ ভাবনার আদি উৎস হিসেবে কাজ করেছিল। রবীন্দ্রনাথ অকপটে স্বীকার করেছেন যে আধুনিক গীতি কবিতার সহজ-সরল আত্মপ্রকাশের পথ বিহারীলালই তাঁকে চিনিয়েছিলেন।
উপসংহার
বিহারীলাল কোনো বিশাল মহাকাব্য রচনা করেননি, কিন্তু তিনি যে গীতিধারার সুর বাঁধলেন, রবীন্দ্রনাথ পরবর্তীকালে তাতে বিশ্বজয়ের সুর মেলালেন। সুতরাং রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক তাঁকে ‘ভোরের পাখি’ আখ্যা দেওয়া সম্পূর্ণ যথাযথ ও কাব্যিক বিচারে চিরসত্য।
অথবা, ২। (খ) “নজরুল শুধু বিদ্রোহের নন, প্রেমেরও কবি”—বাক্যের সারকথা বিশ্লেষণ কর।
ভূমিকা
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে সাধারণত ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও তিনি ছিলেন খাঁটি অর্থে প্রেমের চিরন্তন পূজারী। তিনি নিজেই তাঁর শেষ ভাষণে ঘোষণা করেছিলেন: “আমি কবি হতে আসিনি, আমি নেতা হতে আসিনি—আমি প্রেম দিতে এসেছিলাম, প্রেম পেতে এসেছিলাম।” তাঁর এক হাতে যেমন ছিল ‘বাঁকা বাঁশের বাঁশরী’, অন্য হাতে ছিল ‘রণতূর্য’।
প্রেমের কবি হিসেবে নজরুলের স্বরূপ
- ১. শাশ্বত প্রেমের সুর ও আকুলতা: নজরুলের ‘দোলন-চাঁপা’, ‘ছায়ানট’, ‘চক্রবাক’, ‘পূবের হাওয়া’ এবং ‘সিন্ধু-হিন্দোল’ কাব্যগ্রন্থের সর্বত্র প্রেমের গভীর ব্যাকুলতা ও বিরহের সুর ধ্বনিত হয়েছে। তাঁর অমর কবিতা ‘অভিশাপ’ ও ‘পূজারিনী’ প্রেমের আত্মত্যাগের চরম পরাকাষ্ঠা।
- ২. গানে প্রেমের অমর প্রকাশ: নজরুল বাংলা সঙ্গীতে প্রায় চার হাজার গান রচনা করেছেন, যার সিংহভাগই প্রেমের ও বিরহের গান। রাগপ্রধান গান থেকে শুরু করে গজল—সবখানেই ভালোবাসার বিরহ-বেদনা অশ্রুভেজা সুরে মূর্ত হয়েছে।
- ৩. প্রেমের গভীরতায় বিদ্রোহের জন্ম: প্রকৃতপক্ষে নজরুল যে পরাধীনতা, অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিলেন, তার মূলেও ছিল মানবতার প্রতি তাঁর অসীম ভালোবাসা। তিনি মানুষকে ভালোবাসতেন বলেই মানুষের শৃঙ্খল মুক্তির জন্য বিদ্রোহী হয়েছিলেন।
উপসংহার
নজরুলের কাব্যে বিদ্রোহের আগ্নেয়গিরি ও প্রেমের শান্ত ফল্গুধারা যুগপৎ প্রবাহিত হয়েছে। প্রেম ও দ্রোহের এই অপূর্ব সমন্বয়ই তাঁকে বাংলা সাহিত্যের চিরঞ্জীব কবির আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
খ বিভাগ (প্রবন্ধ ও ছোটগল্প)
৩। (ক) ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে আমাদের ভাষা কী রকম হওয়া উচিত? ‘আমাদের ভাষা সমস্যা’ প্রবন্ধের আলোকে বর্ণনা কর।
ভূমিকা
ভাষাতত্ত্ববিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ‘আমাদের ভাষা সমস্যা’ একটি যুগান্তকারী দিকনির্দেশনামূলক প্রবন্ধ। পাকিস্তানের প্রারম্ভিক পর্বে রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে যখন তীব্র বিতর্ক ও ষড়যন্ত্র চলছিল, তখন তিনি ভাষাতাত্ত্বিক ও বাস্তবতার নিরিখে বাংলা ভাষার মর্যাদা ও এর গ্রহণযোগ্য স্বরূপ তুলে ধরেন।
প্রবন্ধের আলোকে ভাষার কাম্য স্বরূপ
- ১. বাংলা ভাষার স্বকীয়তা রক্ষা: তিনি জোর দিয়ে বলেন যে বাংলা কোনো কৃত্রিম ভাষা নয়; এর হাজার বছরের ইতিহাস ও সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে। উর্দু বা আরবিকে চাপিয়ে দেওয়া যেমন অন্যায়, তেমনি কৃত্রিম সংস্কৃতায়নও কাম্য নয়।
- ২. দৈনন্দিন চলতি ভাষার প্রাধান্য: ভাষা হতে হবে প্রাণবন্ত ও সাধারণ মানুষের বোধগম্য। আড়ষ্ট সাধু ভাষার চেয়ে শিষ্ট চলতি ভাষাই আধুনিক যোগাযোগের প্রধান বাহন হওয়া উচিত।
- ৩. শব্দ ব্যবহারে উদারতা: বাংলায় বহুল প্রচলিত আরবি, ফারসি ও পর্তুগিজ শব্দকে অনর্থক বর্জন না করে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করার পক্ষে তিনি মত দেন। কারণ জীবিত ভাষা সর্বদা বহিরাগত শব্দ আত্মস্থ করেই সমৃদ্ধ হয়।
- ৪. জাতীয় ঐক্যের মূল ভিত্তি: তিনি ঐতিহাসিক সতর্কবার্তা উচ্চারণ করে বলেছিলেন: “আমরা হিন্দু বা মুসলিম যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি।” তিনি প্রমাণ করেন যে ধর্ম নয়, ভাষাই হলো বাঙালির আত্মপরিচয় ও জাতীয় ঐক্যের মূল স্তম্ভ।
অথবা, ৩। (খ) ‘তৈল’ প্রবন্ধে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বাঙালি চরিত্রের যে নির্মল সত্য প্রকাশ করেছেন তার স্বরূপ বিশ্লেষণ কর।
ভূমিকা ও মূল বক্তব্য
মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ব্যঙ্গাত্মক ও রম্য প্রবন্ধ ‘তৈল’ বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য ক্লাসিক সৃষ্টি। এতে তিনি আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ ভোজ্য তেলকে রূপক হিসেবে ব্যবহার করে সমাজের সর্বত্র বিরাজমান তোষামোদ, তোয়াজ ও চাটুকারিতার মনোবৃত্তিকে অত্যন্ত নির্দয় কিন্তু সত্যনিষ্ঠভাবে ব্যবচ্ছেদ করেছেন।
বাঙালি চরিত্রের নির্মল সত্যের স্বরূপ
- ১. সর্বশক্তিমান মাধ্যম হিসেবে তোষামোদ: প্রাবন্ধিক বলেন, জগতে বিদ্যা, বুদ্ধি, মেধা বা সততা দিয়ে যা অর্জন করা যায় না, সামান্য চাটুকারিতা বা ‘তৈল মর্দন’ দিয়ে তা অনায়াসেই হাসিল করা যায়। ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের তেল দিয়ে বশ করা মধ্যবিত্ত বাঙালির চিরকালীন মজ্জাগত স্বভাবে পরিণত হয়েছে।
- ২. সামাজিক স্তরে স্তরে তোষামোদের বিস্তার: চাকুরিজীবী থেকে শুরু করে রাজনীতিক, আত্মীয়-স্বজন এবং সমাজের সর্বস্তরে তোষামোদের খেলা চলছে। যিনি যত নিখুঁতভাবে তেল দিতে পারেন, সমাজে তাঁর সফলতার পাল্লা তত ভারী হয়।
- ৩. আত্মমর্যাদাহীনতার কঠোর সমালোচনা: লেখক তীক্ষ্ণ কৌতুকের আড়ালে বাঙালির মেরুদণ্ডহীন ও নীতিহীন আপসকামী মানসিকতাকে ধিক্কার জানিয়েছেন, যা ব্যক্তি ও জাতিকে ভেতর থেকে অন্তঃসারশূন্য করে তোলে।
৪। (ক) সৈয়দ মুজতবা আলী বিরচিত ‘পাদটীকা’ গল্প অনুসারে পণ্ডিত মশাইয়ের চরিত্র অঙ্কন কর।
ভূমিকা
রম্যসাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলীর কালজয়ী ছোটগল্প ‘পাদটীকা’-য় স্কুলের অবহেলিত সংস্কৃত শিক্ষক ‘পণ্ডিত মশাই’ (শ্রীযুক্ত তারাপদ দেবশর্মা)-এর মাধ্যমে মধ্যবিত্ত সমাজের চরম দারিদ্র্য, সততা এবং মানবিক মর্যাদার করুণ ট্র্যাজেডি চিত্রিত হয়েছে।
পণ্ডিত মশাইয়ের চরিত্রের প্রধান দিকসমূহ
- ১. নিঃস্বার্থ শিক্ষকতা ও অগাধ পাণ্ডিত্য: পণ্ডিত মশাই সংস্কৃত ও ব্যাকরণে অগাধ জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। মাসে মাত্র পঁচিশ টাকা বেতনে তিনি জীবনের সমস্ত শক্তি দিয়ে ছাত্রদের শিক্ষাদান করতেন।
- ২. চরম দারিদ্র্য ও আত্মমর্যাদা: সাতটি সন্তান ও অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে তিনি অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাতেন। কিন্তু নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে কারও কাছে হাত পাততেন না। ছেঁড়া চাদর গায়ে জড়িয়েও তিনি আভিজাত্য বজায় রাখতেন।
- ৩. সমাজের নির্মম উপেক্ষা ও পাদটীকার প্রতীক: স্কুলের বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী সভায় স্কুল পরিদর্শক সাহেবের আগমনে সবাই সম্মানিত হলেও পণ্ডিত মশাইকে রাখা হয় পেছনের এক কোণে। বইয়ের মূল টেক্সটের নিচে যেমন গুরুত্বহীনভাবে ছোট অক্ষরে ‘পাদটীকা’ পড়ে থাকে, সমাজে পণ্ডিত মশাইদের অবস্থানও ছিল তেমনি উপেক্ষিত।
- ৪. প্রতিবাদের নীরব ভাষা: পরিদর্শক সাহেবের সামনে নিজের বাস্তব দুঃখের কথা এক অসাধারণ ব্যঙ্গ ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে তুলে ধরে তিনি সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থার শোষণ ও বিবেকহীনতাকে চপেটাঘাত করেন।
অথবা, ৪। (খ) ছোটগল্প কাকে বলে? ছোটগল্প হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সমাপ্তি’ গল্পের সার্থকতা আলোচনা কর।
ছোটগল্পের সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্য
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘বর্ষাযাপন’ কবিতায় ছোটগল্পের সবচেয়ে প্রামাণ্য সংজ্ঞা দিয়েছেন:
“ছোট প্রাণ, ছোট ব্যথা, ছোট ছোট দুঃখ কথা / নিতান্তই সহজ সরল / সহস্র বিস্মৃতি রাশি প্রত্যহ যেতেছে ভাসি / তারি দু চারিটি অশ্রুজল। / নাহি বর্ণনার ছটা ঘটনার ঘনঘটা / নাহি তত্ত্ব নাহি উপদেশ / অন্তরে অতৃপ্তি রবে সাঙ্গ করি মনে হবে / শেষ হয়ে হইল না শেষ।”
অর্থাৎ স্বল্প পরিসরে মানবজীবনের কোনো একক মুহূর্ত বা খণ্ডভাবের অতৃপ্তিজনক শিল্পসম্মত রূপায়ণই হলো ছোটগল্প।
‘সমাপ্তি’ গল্পের সার্থকতা ও মৃন্ময়ী চরিত্র
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সমাপ্তি’ বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সার্থক ছোটগল্প:
- পটভূমি ও কাহিনি সংক্ষেপ: অপূর্ব নামের শহুরে বিএ পাস তরুণ গ্রামে এসে প্রথাসিদ্ধ শান্ত মেয়ে পছন্দ না করে দুরন্ত, ডানপিটে ও স্বাধীনচেতা কিশোরী ‘মৃন্ময়ী’ (যাকে সবাই পাগলী বলত)-কে ভালোবেসে বিবাহ করে।
- মানসিক দ্বন্দ্ব ও রূপান্তর: বিবাহের পর পারিবারিক শৃঙ্খল ও নিয়মের খাঁচায় মৃন্ময়ীর অবাধ্য মন ছটফট করতে থাকে। সে মুক্ত বাতাসে পালিয়ে যায়। কিন্তু অপূর্ব যখন তাকে ভালোবেসে দূরে সরে যায়, তখন একাকিত্বের মাঝে মৃন্ময়ীর সুপ্ত নারীহৃদয়ে ভালোবাসার অপূর্ব পুনর্জাগরণ ঘটে। চঞ্চল কিশোরী এক প্রেমময়ী আত্মত্যাগী নারীতে রূপান্তরিত হয়।
- ছোটগল্পের সার্থকতা: কোনো বাহুল্যতা নেই, মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরই প্রধান। গল্পের সমাপ্তিতে কোনো প্রথাগত মিলন নয়, বরং হৃদয়ের অন্তর্মুখী মিলনেই এক অতৃপ্ত সৌন্দর্যে গল্পের পরিসমাপ্তি ঘটে।
গ বিভাগ (কবিতা)
৫। (ক) ‘বলাকা’ কবিতা অবলম্বনে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গতিতত্ত্বের পরিচয় দাও।
ভূমিকা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বলাকা’ কাব্যের নাম-কবিতা ‘বলাকা’ (ঝিলম নদীর তীরে রচিত) কবির দার্শনিক ভাবনার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। ফরাসি দার্শনিক অঁরি বের্গসোর (Henri Bergson) ‘বহমান সময়’ ও গতিবাদের সাথে উপনিষদের আধ্যাত্মিক সমন্বয় ঘটিয়ে কবি এখানে বিশ্বপ্রকৃতির অন্তরালে বহমান শাশ্বত ‘গতিতত্ত্ব’ (Philosophy of Motion) প্রকাশ করেছেন।
গতিতত্ত্বের মূল ভাববস্তু
- ১. ঝিলমের স্থিরতা ও হাঁসের ডানার স্পন্দন: সন্ধ্যায় ঝিলম নদীর বাঁকা জলস্রোত যখন অন্ধকারে খাপের মধ্যে তরবারির মতো নিশ্চল হয়ে ছিল, তখন হঠাৎ একদল বুনো হাঁসের ডানার সাঁ সাঁ শব্দে সমগ্র অন্ধকার স্পন্দিত হয়ে ওঠে। এই ডানার গতিই কবির স্তব্ধ চেতনায় গতির বিদ্যুৎ চমক এনে দেয়।
- ২. জগতের সর্ববস্তুতে গতির উপলব্ধি: কবি অনুভব করলেন, বাহ্যত যা কিছু স্থির ও অচল মনে হয়—পর্বত, বনানী, নদী, নক্ষত্র—সবকিছুই অদৃশ্যের পানে উড়ে চলেছে। স্থির পর্বত আসলে ডানাহীন উড্ডয়নাকাঙ্ক্ষী পাখি।
- ৩. ‘হেথা নয়, অন্য কোথা’: সৃষ্টির মূল কথা হলো এগিয়ে চলা, স্থবিরতাই মৃত্যু। অন্তহীন মহাকালের পানে মানবাত্মা অবিরাম যাত্রা করছে পূর্ণতার সন্ধানে। “নহে নহে, অন্য কোথা, অন্য কোথা, অন্য কোনোখানে।”
অথবা, ৫। (খ) ‘বনলতা সেন’ একটি অসামান্য আধুনিক বাংলা কবিতা—আলোচনা কর।
ভূমিকা
রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের কালজয়ী সৃষ্টি ‘বনলতা সেন’ আধুনিক বাংলা কবিতার ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা পঠিত ও সমাদৃত রোমান্টিক-আধ্যাত্মিক কবিতা। ১৯৪২ সালে প্রকাশিত এই কবিতায় দেশ-কালের সীমানা পেরিয়ে মানবাত্মার আদিম ক্লান্তি ও পরম শান্তির অন্বেষণ মূর্ত হয়ে উঠেছে।
কবিতার আধুনিকতা ও শিল্পমূল্য
- ১. হাজার বছরের ঐতিহাসিক বিস্তার: কবি নিজেকে এক চিরন্তন পথিকেরূপে উপস্থাপন করে বলেন: “হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে / সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে / অনেক ঘুরেছি আমি…”। বিদিশার অন্ধকার, শ্রাবস্তীর কারুকার্য ইত্যাদি উপমার মাধ্যমে তিনি ক্ল্যাসিক্যাল ইতিহাসের গহ্বরে ডুব দিয়েছেন।
- ২. ক্লান্তির অপনোদন ও শান্তির প্রতীক: বিশ্বযুদ্ধের অস্থিরতা ও আধুনিক জীবনের জটিলতায় ক্লান্ত পথিক কবির জীবনে নাটোরের বনলতা সেন কোনো রক্তমাংসের সাধারণ নারী নন, তিনি সকল ক্লান্তি দূরকারী এক চিরন্তন শান্তির প্রতীক—“আমারে দুদ্দণ্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন।”
- ৩. অনবদ্য উপমা ও চিত্রকল্প: “পাখির নীড়ের মত চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন”—এই উপমাটি বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রোমান্টিক চিত্রকল্প হিসেবে নন্দিত। সন্ধ্যার নিস্তব্ধতায় সকল লেনদেন চুকে গেলে কেবল অন্ধকারের মুখোমুখি বসে থাকার আবহ আধুনিক একাকীত্বের পরম রূপ।
৬। (ক) ‘মুসাফির’ কবিতায় জীবনের যে চরম বাস্তবতার চিত্রটি ফুটে উঠেছে তা আলোচনা কর।
ভূমিকা ও সারসংক্ষেপ
কবি ফররুখ আহমদের ‘মুসাফির’ কবিতা মানবজীবনের ক্ষণস্থায়ী রূপ ও পরকালের শাশ্বত যাত্রার গভীর দার্শনিক চিত্র ধারণ করেছে। মানুষ এই পৃথিবীতে চিরস্থায়ী নয়, সে কেবল কয়েকদিনের জন্য আসা এক পথিক বা ‘মুসাফির’।
বাস্তবতার প্রতিফলন
- পৃথিবী এক সরাইখানা: কবি বলেন, মানুষ এই পার্থিব জগতকে নিজের চিরন্তন বাসস্থান মনে করে মোহে নিমজ্জিত থাকে। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো এই পৃথিবী একটি মুসাফিরখানা মাত্র, যেখানে সামান্য বিশ্রাম নিয়েই সবাইকে ডাক এলে চলে যেতে হয়।
- মৃত্যুচিন্তা ও সতর্কবার্তা: জীবনের কোলাহল, ধনসম্পদের অহংকার আর ক্ষমতার লোভ মৃত্যুর নির্মম স্পর্শে মুহূর্তে ধূলিসাৎ হয়ে যায়। কবি মানুষকে পার্থিব মোহ ত্যাগ করে চিরন্তন আখেরাতের পাথেয় সংগ্রহের আহ্বান জানিয়েছেন।
অথবা, ৬। (খ) ‘আমার পূর্ব বাংলা’ একটি অসামান্য আধুনিক কবিতা—উক্তিটি বিশ্লেষণ কর।
ভূমিকা ও মূল বক্তব্য
কবি সৈয়দ আলী আহসানের ‘আমার পূর্ব বাংলা’ কবিতা দেশপ্রেম, নিসর্গপ্রীতি এবং জাতীয়তাবাদী চেতনার এক অনবদ্য আধুনিক মেলবন্ধন। বাষট্টি ও তেষট্টির উত্তাল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে স্বদেশের মাটিকে এক মমতাময়ী মাতৃরূপে কবি হৃদয়ে ধারণ করেছেন।
কবিতার নান্দনিক ও আধুনিক রূপ
- ১. রূপময় বাংলার চিত্রকল্প: কবি পূর্ব বাংলাকে বর্ণনা করেছেন রূপক ও ইন্দ্রিয়ঘন উপমার সাহায্যে—নদীর স্রোতে ভেসে যাওয়া কচুরিপানা, বটের ছায়া, ধানের গন্ধ ও বৃষ্টিভেজা সবুজ পাতার স্নিগ্ধতা যেন কবির শিরায় শিরায় প্রবাহিত।
- ২. রাজনৈতিক প্রতিরোধের প্রচ্ছন্ন সুর: নিসর্গের অন্তরালে পাকিস্তানি শোষকদের বিরুদ্ধে বাঙালির নিজস্ব আত্মপরিচয় ও জাতীয়তাবাদী স্বাধিকারের যে অগ্নিগর্ভ স্পন্দন লুকিয়ে ছিল, তা কবিতাটিকে আধুনিক রাজনৈতিক কবিতার মর্যাদা দান করেছে।
ঘ বিভাগ (ব্যাকরণ ও নির্মিতি)
৭। যে কোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও:
(ক) বাংলা ব্যাকরণ কাকে বলে? এর আলোচ্য বিষয়গুলোর পরিচয় দাও।
সংজ্ঞা: যে শাস্ত্র পাঠ করলে বাংলা ভাষা শুদ্ধরূপে লিখতে, পড়তে ও বলতে পারা যায় এবং ভাষার অভ্যন্তরীণ গঠনপ্রকৃতি বিশদভাবে জানা যায়, তাকে বাংলা ব্যাকরণ বলে।
আলোচ্য বিষয়সমূহ: সকল ভাষার মতো বাংলা ব্যাকরণেরও চারটি প্রধান আলোচ্য বিষয় রয়েছে:
- ধ্বনিমূল ও ধ্বনিতত্ত্ব (Phonology): ধ্বনি, বর্ণ, উচ্চারণ রীতি, ণ-ত্ব ও ষ-ত্ব বিধান, সন্ধি ইত্যাদি।
- রূপতত্ত্ব বা শব্দতত্ত্ব (Morphology): শব্দ গঠন, প্রত্যয়, উপসর্গ, সমাস, বচন, লিঙ্গ, পদ প্রকরণ ও ধাতু।
- বাক্যতত্ত্ব (Syntax): বাক্যের গঠন, বাক্য রূপান্তর, পদক্রম, যতিচিহ্ন ও বাগধারা।
- অর্থতত্ত্ব (Semantics): শব্দের মুখ্যার্থ, গৌণার্থ, সমার্থক শব্দ, বিপরীতার্থক শব্দ ও অর্থ পরিবর্তন।
(খ) ণ-ত্ব ও ষ-ত্ব বিধান কাকে বলে? ণ-ত্ব ও ষ-ত্ব বিধানের তিনটি করে নিয়ম উদাহরণসহ লেখ।
ণ-ত্ব বিধান: তৎসম (সংস্কৃত) শব্দে মূর্ধন্য-ণ (ণ)-এর সঠিক ব্যবহারের নিয়মকে ণ-ত্ব বিধান বলে।
তিনটি নিয়ম:
- ১. ঋ, র, ষ-এর পর মূর্ধন্য-ণ বসে। যেমন: ঋণ, বর্ণ, কারণ, ভীষণ।
- ২. ট-বর্গীয় ধ্বনির (ট, ঠ, ড, ঢ) পূর্বে যুক্তাক্ষরে মূর্ধন্য-ণ হয়। যেমন: বণ্টন, কণ্ঠ, কাণ্ড।
- ৩. ঋ, র, ষ-এর পর স্বরবর্ণ, ক-বর্গ, প-বর্গ কিংবা য, ৱ, হ, ং থাকলে পরবর্তী ন মূর্ধন্য-ণ হয়। যেমন: কৃপণ, অর্পণ, লক্ষণ।
ষ-ত্ব বিধান: তৎসম শব্দে মূর্ধন্য-ষ (ষ)-এর সঠিক ব্যবহারের নিয়মকে ষ-ত্ব বিধান বলে।
তিনটি নিয়ম:
- ১. অ, আ ভিন্ন অন্য স্বরবর্ণ এবং ক ও র-এর পরের প্রত্যয়ের ‘স’ মূর্ধন্য-ষ হয়। যেমন: ভবিষ্যৎ, মুমূর্ষু, পরিষ্কার।
- ২. ই-কারান্ত ও উ-কারান্ত উপসর্গের পর কতগুলো ধাতুতে ‘স’ মূর্ধন্য-ষ হয়। যেমন: অভিষেক, অনুষ্ঠান, নিষেধ।
- ৩. ট-বর্গীয় ধ্বনির পূর্বে যুক্তাক্ষরে মূর্ধন্য-ষ হয়। যেমন: কষ্ট, নষ্ট, শ্রেষ্ঠ।
(গ) ব্যাসবাক্যসহ সমাস নির্ণয় কর (যে কোনো পাঁচটি):
- আমরা: তুমি, সে ও আমি = নিত্য সমাস (বা একশেষ দ্বন্দ্ব সমাস)।
- শতাব্দী: শত অব্দের সমাহার = দ্বিগু সমাস।
- দেশান্তর: অন্য দেশ = নিত্য সমাস।
- বহুব্রীহি: বহু ব্রীহি (ধান) আছে যার = বহুব্রীহি সমাস।
- ত্রিফলা: ত্রি (তিন) ফলের সমাহার = দ্বিগু সমাস।
- রাতকানা: রাতে যে কানা = মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস।
- প্রতিদিন: দিনে দিনে = অব্যয়ীভাব সমাস।
(ঘ) আধুনিক বাংলা বানানের পাঁচটি নিয়ম উদাহরণসহ লেখ।
বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের পাঁচটি নিয়ম নিচে দেওয়া হলো:
- তৎসম ভিন্ন শব্দে কেবল ই-কার: সকল অতৎসম (তদ্ভব, দেশি, বিদেশি ও মিশ্র) শব্দে কেবল হ্রস্ব ই বা ি-কার হবে; ঈ-কার হবে না। যেমন: পাখি, শাড়ি, সরকারি, জানুয়ারি, তরকারি।
- স্ত্রীবাচক শব্দে ই-কার: অতৎসম স্ত্রীবাচক শব্দের শেষে হ্রস্ব ই-কার হবে। যেমন: নানি, দাদি, চাচি, মাসি, বউদি।
- রেফ-এর পর ব্যঞ্জনবর্ণের দ্বিত্ব হবে না: যেমন: কর্ম (কর্ম্ম নয়), সূর্য (সূর্য্য নয়), ধর্ম (ধর্ম্ম নয়), কার্যালয়।
- যুক্তাক্ষরে ‘স’ ও ‘শ’-এর ব্যবহার: বিদেশি শব্দে কখনোই মূর্ধন্য-ষ হবে না, সর্বদা দন্ত্য-স হবে। যেমন: স্টেশন, স্টল, বাস, মাস্টার, পোস্ট।
- সন্ধিজাত ং-এর ব্যবহার: সন্ধির ক্ষেত্রে ক-বর্গের পূর্বে ম্ থাকলে তা অনুস্বার (ং) হবে। যেমন: অহম্ + কার = অহংকার (অহঙ্কার নয়), সংগী (সঙ্গী নয়)।
(ঙ) প্রত্যয়ের নামসহ প্রকৃতি ও প্রত্যয় নির্ণয় কর (যে কোনো পাঁচটি):
- গায়ক: √গৈ + অক (ণক) = কৃৎ প্রত্যয়।
- পাগলামি: পাগল + আমি = তদ্ধিত প্রত্যয়।
- ঢাকাই: ঢাকা + আই = তদ্ধিত প্রত্যয়।
- ডুবন্ত: √ডুব্ + অন্ত = কৃৎ প্রত্যয়।
- রান্না: √রাধ্ + না = কৃৎ প্রত্যয়।
- চৌকিদার: চৌকি + দার = তদ্ধিত প্রত্যয় (বিদেশি)।
- দয়ালু: দয়া + আলু = তদ্ধিত প্রত্যয়।
(চ) ভাব-সম্প্রসারণ লেখ: “যে সহে সে রহে।”
মূলভাব: সহনশীলতা ও ধৈর্য মানব চরিত্রের এক মহত্তম গুণ। পার্থিব জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত ও প্রতিকূলতায় যে ব্যক্তি ধৈর্য ধারণ করে টিকে থাকে, শেষ পর্যন্ত সেই বিজয়ী হয় এবং ইতিহাসে চিরস্থায়ী আসন লাভ করে।
সম্প্রসারিত ভাব: মানবজীবন কুসুমাস্তীর্ণ নয়। জীবনের চলার পথ নানা বাধা-বিপত্তি, দুঃখ-কষ্ট ও অপমানে পরিপূর্ণ। জগতে যাঁরা অধৈর্য ও চঞ্চল, তাঁরা সামান্য প্রতিকূলতাতেই ভেঙে পড়েন এবং লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে হারিয়ে যান। পক্ষান্তরে যাঁরা পরম ধৈর্যের সাথে সকল প্রতিকূল পরিস্থিতি সহ্য করেন, ঝড়-ঝঞ্ঝার মধ্যেও বৃক্ষের মতো শিকড় গেড়ে দাঁড়িয়ে থাকেন, সাফল্য একসময় তাঁদের পদচুম্বন করে। প্রকৃতিতেও দেখা যায়—প্রচণ্ড ঝড়ে বড় বড় অহংকারী গাছ উপড়ে যায়, কিন্তু ঘাস মাথা নত করে ঝড় সহ্য করে অক্ষত থাকে। ইসলামের ইতিহাসে মহানবি (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামের জীবন ছিল চরম সহনশীলতার জীবন্ত প্রতীক। তায়েফের রক্তপাত ও মক্কার বঞ্চনা সহ্য করেছিলেন বলেই মদিনায় ইসলামের চিরন্তন সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
মন্তব্য: ক্ষণিকের উত্তেজনায় প্রতিক্রিয়াশীল না হয়ে যেকোনো সংকটকে ধৈর্য ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে অতিক্রম করাই স্থায়ী সফলতার একমাত্র চাবিকাঠি।
(ছ) মাদ্রাসা শিক্ষার মানোন্নয়নে তোমার সুপারিশ ব্যক্ত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট একটি প্রতিবেদন রচনা কর।
তারিখ: ২৫ অক্টোবর, ২০২১
বরাবর: মহাপরিচালক, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর, ঢাকা।
বিষয়: মাদ্রাসা শিক্ষার মানোন্নয়ন ও আধুনিকীকরণের লক্ষ্যে বাস্তবধর্মী সুপারিশমালা পেশ।
১. ভূমিকা:
বাংলাদেশ একটি ঐতিহ্যবাহী মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। এদেশের নৈতিক ভিত্তি সুদৃঢ়করণ এবং দক্ষ জনশক্তি গঠনে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা শত শত বছর ধরে অনন্য ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে বর্তমান একবিংশ শতাব্দীর তথ্যপ্রযুক্তি ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার যুগে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও সময়োপযোগী ও কার্যকর করার লক্ষ্যে আধুনিক সংস্কার সাধন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
২. বিদ্যমান সমস্যা ও চ্যালেঞ্জসমূহ:
সরেজমিনে দেখা যায়, অধিকাংশ মাদ্রাসায় আধুনিক বিজ্ঞানাগার ও কম্পিউটার ল্যাবের চরম সংকট রয়েছে। ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ করে প্রায়োগিক আরবি ভাষা (Communicative Arabic) এবং ইংরেজি ভাষায় শিক্ষার্থীদের দক্ষতা অত্যন্ত সীমিত। এছাড়া যুগোপযোগী কারিকুলাম ও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণহীনতা মানসম্মত শিক্ষা অর্জনে অন্তরায় সৃষ্টি করছে।
৩. মানোন্নয়নে সুপারিশমালা:
- ক. কারিগরি ও আইসিটি শিক্ষার অন্তর্ভুক্তি: প্রতিটি মাদ্রাসায় বাধ্যতামূলক কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন এবং শিক্ষার্থীদের ফ্রিল্যান্সিং, কোডিং ও কারিগরি ট্রেড কোর্সে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে।
- খ. আধুনিক ভাষা ল্যাব স্থাপন: মুখস্থ বিদ্যার পরিবর্তে আধুনিক আরবি ও ইংরেজি কথন ও লিখন দক্ষতার জন্য অডিও-ভিজ্যুয়াল ভাষা ল্যাব চালু করতে হবে।
- গ. শিক্ষকদের মানসম্মত প্রশিক্ষণ: আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতি ও তথ্যপ্রযুক্তিতে শিক্ষকদের নিয়মিত উচ্চতর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
- ঘ. অবকাঠামো ও লাইব্রেরি উন্নয়ন: আধুনিক গ্রন্থাগার, বিজ্ঞানাগার ও আবাসিক সুবিধাদির মান উন্নত করতে বিশেষ সরকারি বরাদ্দ প্রদান।
- ঙ. উচ্চশিক্ষার সাথে সমন্বয়: ফাজিল ও কামিল স্তরের পাঠ্যসূচিকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সমমানে উন্নীত করা।
৪. উপসংহার:
ইসলামি মূল্যবোধের সাথে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটাতে পারলে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা দেশ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জাতির নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হবে। কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা ও আশু পদক্ষেপই পারে এ স্বপ্ন পূরণ করতে।
প্রতিবেদকের নাম: মো. আব্দুল্লাহ আল মারুফ
ফাজিল (সম্মান) ১ম বর্ষ, রোল: ২০১-০৩৪
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. ফাজিল ১ম বর্ষের ‘বাংলা সাহিত্য ও ব্যাকরণ’ পরীক্ষার প্রশ্নের ধারা কেমন?
প্রশ্নপত্রটি মূলত চারটি বিভাগে বিভক্ত: ক বিভাগ (সাহিত্য: প্রাচীন ও মধ্যযুগ), খ বিভাগ (গদ্য ও ছোটগল্প), গ বিভাগ (কবিতা) এবং ঘ বিভাগ (ব্যাকরণ, নির্মিতি ও প্রতিবেদন)। মোট ৮০ নম্বরের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।
২. চর্যাপদ থেকে পরীক্ষায় কোন বিষয়গুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ?
চর্যাপদের আবিষ্কারক (হরপ্রসাদ শাস্ত্রী), আবিষ্কারের সন ও স্থান (১৯০৭ খ্রি., নেপালের রাজদরবার), রচনাকাল, প্রধান পদকর্তা এবং এর ভাষার ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও সমাজচিত্র সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
৩. বাংলা ব্যাকরণ অংশে কোন কোন টপিক পড়লে সহজে শতভাগ নম্বর পাওয়া যায়?
ণ-ত্ব ও ষ-ত্ব বিধানের নিয়ম, সমাস নির্ণয়, আধুনিক বাংলা বানানের নিয়ম এবং প্রকৃতি ও প্রত্যয় নির্ণয় ভালোভাবে আয়ত্ত করলে ব্যাকরণ অংশে পূর্ণ নম্বর তোলা অত্যন্ত সহজ হয়।
৪. ‘বলাকা’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গতিতত্ত্ব’ বলতে কী বোঝায়?
বিশ্বপ্রকৃতির কোনো কিছুই স্থির নয়; পর্বত, নদী, নক্ষত্র থেকে মানবচেতনা পর্যন্ত সবকিছুই এক অনন্ত অচেনার সন্ধানে অবিরাম সম্মুখপানে ধাবমান—স্থবিরতাই মৃত্যু এবং এগিয়ে চলাই জীবনের পরম ধর্ম।
৫. ‘তৈল’ প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মূল লক্ষ্য কী ছিল?
বাঙালি সমাজের অন্ধ তোষামোদ, স্তাবকতা এবং চাটুকারিতার মাধ্যমে অন্যায় সুবিধা আদায়ের সামাজিক ব্যাধিকে তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের মাধ্যমে সবার সামনে উন্মোচিত করা।
৬. ২০৫১০৬ বিষয়ের পরীক্ষার খাতায় প্রতিবেদন ও ভাব-সম্প্রসারণ লেখার সঠিক নিয়ম কী?
ভাব-সম্প্রসারণে মূলভাব, সম্প্রসারিত ভাব ও মন্তব্য—এই তিনটি অনুচ্ছেদে লিখতে হয়। প্রতিবেদনে যথাযথ তারিখ, প্রাপক, বিষয়, ভূমিকা, সুপারিশমালা ও প্রতিবেদকের পরিচিতি সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক ফরম্যাটে উপস্থাপন করতে হয়।

