ফাযিল (স্নাতক) পাস ৩য় বর্ষ পরীক্ষা – ২০২৩
বিষয়: ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি (ঐচ্ছিক) প্রথম পত্র (বিষয় কোড: ৪১৩)
[মুসলমানদের রাজনৈতিক ইতিহাস (১২৫৮ খ্রিঃ পর্যন্ত)]
সময় : ৩ ঘণ্টা | পূর্ণমান : ১০০
[দ্রষ্টব্য : সকল প্রশ্নের মান সমান। যে কোনো পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দাও।]
ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ফাযিল (স্নাতক) পাস ৩য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২৩-এর ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি ১ম পত্র (বিষয় কোড: ৪১৩) পরীক্ষার মূল প্রশ্নপত্রের প্রতিটি প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ, প্রামাণ্য ও অ্যাকাডেমিক সমাধান নিচে দেওয়া হলো। ফাযিল ডিগ্রি ও অনার্স শ্রেণির ২০ নম্বরের রচনামূলক প্রশ্নের উচ্চমান বজায় রেখে ভূমিকা, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, প্রামাণ্য দলিল, বিশ্লেষণী ছক এবং ফলাফল সহযোগে প্রতিটি উত্তর প্রস্তুত করা হয়েছে।
১। আইয়্যামে জাহেলিয়া বলতে কী বুঝ? আরবের সেই সময়কার সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার একটি বর্ণনা দাও।
[What do you understand by Ayyam al-Jahiliyyah? Give a description of the social and political conditions of Arabia at that time.]
[মান: ২০]
ভূমিকা
ইসলামের আবির্ভাবের পূর্ববর্তী আরবের যুগকে সাধারণভাবে ‘আইয়ামে জাহেলিয়াত’ বা অজ্ঞতা ও অন্ধকারের যুগ বলা হয়। ‘জাহেলিয়াত’ শব্দটি আরবি ‘জাহল’ ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার আক্ষরিক অর্থ অজ্ঞতা, মূর্খতা, বর্বরতা ও নীতিহীনতা। পি. কে. হিট্টির মতে, এটি ছিল ধর্মীয় অনুশাসনহীন, নৈতিক অবক্ষয় এবং অরাজকতাপূর্ণ এক ঐতিহাসিক কালখণ্ড।
সামাজিক অবস্থা
- ১. গোত্রপ্রীতি ও রক্তের বদলা: তৎকালীন সমাজ বহুসংখ্যক যাযাবর বেদুইন গোত্রে বিভক্ত ছিল। গোত্রীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ বিবেচনা করা হতো এবং কোনো ব্যক্তির অন্যায়ের জন্য অপর গোত্রের যে কাউকেই হত্যা করা বৈধ মনে করা হতো। ‘আসাবিয়াত’ (উগ্র গোত্রীয় অন্ধপ্রেম) সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিদ্যমান ছিল।
- ২. নারীজাতির চরম অবমাননা: সমাজে নারীদের কোনো সম্মান, অধিকার বা মর্যাদা ছিল না। তাদের ভোগ্যপণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হতো। সম্পত্তিতে নারীদের কোনো অধিকার ছিল না। বহুবিবাহ ছিল অনিয়ন্ত্রিত। সবচেয়ে লোমহর্ষক প্রথা ছিল কন্যা সন্তান জন্ম নেওয়াকে চরম অপমানকর মনে করে জীবন্ত পুঁতে ফেলা (ওয়াদুল বানাত)।
- ৩. দাস প্রথা ও শোষণ: দাস-দাসীদের পশুর চেয়েও অধম বিবেচনা করা হতো। দাসদের বাজারে নিলামে বিক্রি করা হতো এবং তাদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হতো।
- ৪. নৈতিক অবক্ষয়: মদ, জুয়া, ব্যভিচার, দস্যুবৃত্তি ও খুনোখুনি ছিল আরবদের দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক অংশ। সামান্য ঘোড়দৌড় বা পানির কূপ নিয়ে তারা যুগ যুগ ধরে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে (যেমন—হরবুল ফিজার ও বাসূসের যুদ্ধ) লিপ্ত থাকত।
রাজনৈতিক অবস্থা
- ১. কেন্দ্রীয় সরকারের অনুপস্থিতি: প্রাক-ইসলামি আরবে কোনো ঐক্যবদ্ধ কেন্দ্রীয় সরকার, আইন বা সংবিধান ছিল না। সমগ্র উপদ্বীপ ছিল শতধা বিভক্ত যাযাবর গোত্রের আবাসভূমি।
- ২. জোর যার মুল্লুক তার নীতি: সমাজে কোনো বিচারব্যবস্থা ছিল না; যে গোত্র বাহুবলে যত শক্তিশালী, তারাই অন্য দুর্বল গোত্রের ওপর আধিপত্য বিস্তার করত। ন্যায়বিচারের কোনো ধারণা ছিল না।
- ৩. গোত্রপ্রধান বা শেখের কর্তৃত্ব: প্রতিটি গোত্রের নেতৃত্বে থাকতেন একজন প্রবীণ ব্যক্তি যাকে ‘শেখ’ বলা হতো। তবে শেখের কোনো আইনি বা বাধ্যতামূলক ক্ষমতা ছিল না; তিনি কেবল গোত্রের ঐক্যমত্য ও যুদ্ধ পরিচালনার জন্য নেতৃত্ব দিতেন।
- ৪. বিদেশি আগ্রাসনের হুমকি: উত্তর ও উত্তর-পূর্বে শক্তিশালী রোমান (বাইজেন্টাইন) এবং পারস্য (সাসানীয়) সাম্রাজ্য আরব সীমান্তে সীমান্তরক্ষী রাষ্ট্র (গাসসানি ও লাখমি) তৈরি করে আরবের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করত। দক্ষিণে ইয়েমেনে আবিসিনিয়ার খ্রিস্টান শাসক আবরাহার আক্রমণ আরবের রাজনৈতিক দুর্বলতাকে উন্মোচিত করেছিল।
উপসংহার
আইয়ামে জাহেলিয়াতের এই সামাজিক অনাচার ও রাজনৈতিক নৈরাজ্য দূর করে শান্তি, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব এবং সুসংহত রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিশ্বমানবতাকে মুক্তি দিতেই মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুওয়াত লাভ ঘটেছিল।
২। সমাজ সংস্কারক হিসেবে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স) এর কৃতিত্ব মূল্যায়ন কর।
[Evaluate the achievements of Prophet Muhammad (PBUH) as a social reformer.]
[মান: ২০]
ভূমিকা
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) কেবল একজন আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক বা ধর্মপ্রচারক ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন মানব ইতিহাসের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সমাজ সংস্কারক। জাহেলিয়াতের কলুষিত, অনাচারযুক্ত ও বর্বর সমাজকে মাত্র তেইশ বছরের নবুওয়াতি জীবনে একটি শান্তিময়, মানবিক ও আদর্শিক সমাজে রূপান্তরিত করে তিনি সমাজ সংস্কারের ইতিহাসে এক অনন্য বিপ্লব সাধন করেন।
সমাজ সংস্কারক হিসেবে মহানবীর ঐতিহাসিক কৃতিত্ব
- ১. ভ্রাতৃত্ব ও সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠা: আরবের জাত-পাত, বর্ণবৈষম্য ও উগ্র গোত্রপ্রীতি বিলুপ্ত করে তিনি ঘোষণা করলেন—“সকল মুসলিম ভাই ভাই; কোনো অনারবের ওপর আরবের এবং কোনো আরবের ওপর অনারবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই।” তিনি এক সময়ের ক্রীতদাস হযরত বেলাল (রা.)-কে ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন এবং কুরাইশ বংশের বিশিষ্ট সাহাবীদের ভাই হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
- ২. নারী জাতির মুক্তি ও মর্যাদা দান: ইসলাম পূর্ব সমাজে চরম অবহেলিত ও নির্যাতিত নারীকে তিনি সর্বোচ্চ সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত করেন। তিনি জীবন্ত কন্যা সন্তান হত্যা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেন। ঘোষণা করেন—“মায়ের পদতলে সন্তানের জান্নাত।” সম্পত্তিতে নারীর উত্তরাধিকার নিশ্চিত করেন, দেনমোহর বাধ্যতামূলক করেন এবং বিবাহে নারীর মতামতকে আইনি স্বীকৃতি দেন।
- ৩. দাস প্রথার সংস্কার ও দাসমুক্তি: তৎকালীন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় দাস প্রথা রাতারাতি নিষিদ্ধ না হলেও তিনি দাসদের মুক্তির জন্য অসংখ্য পথ উন্মুক্ত করেন। কাফফারা ও সাওয়াবের মাধ্যমে দাসমুক্তির নির্দেশ দেন এবং বলেন—“তোমরা যা খাবে দাসদেরও তা খাওয়াবে, যা পরবে তাদেরও তা পরাবে।” যায়েদ ইবনে হারেসাকে সেনাপতি করে দাস মুক্তির বাস্তব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
- ৪. মদ্যপান ও জুয়া নিষিদ্ধকরণ: সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে থাকা মদ্যপান, জুয়া ও অশ্লীলতাকে পর্যায়ক্রমে সম্পূর্ণ হারাম ঘোষণা করে সুস্থ, পবিত্র ও উৎপাদনশীল পারিবারিক ও সামাজিক জীবন গড়ে তোলেন।
- ৫. সুদের বিলুপ্তি ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার: জাহেলি যুগের শোষণমূলক মহাজনী সুদি প্রথা (রিবা) চিরতরে নিষিদ্ধ করেন এবং জাকাত, সদকা ও ফিতরার মাধ্যমে ধনীদের সম্পদ থেকে গরিবদের হক আদায় করে অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা করেন।
- ৬. কুসংস্কার ও অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ: ভাগ্য নির্ধারণের তির, পশুবলি, ভূত-প্রেতের কুসংস্কার এবং অস্পৃশ্যতার চির অবসান ঘটিয়ে তাওহিদ ও যুক্তিবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটান।
উপসংহার
ঐতিহাসিক মাইকেল এইচ. হার্ট তাঁর বিশ্বখ্যাত গ্রন্থ ‘The 100’-এ হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে পৃথিবীর ইতিহাসের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে স্থান দিয়েছেন। সমাজ সংস্কারক হিসেবে তাঁর বৈপ্লবিক পরিবর্তন মানবসভ্যতার চিরন্তন আলোকবর্তিকা।
৩। মহানবী (সা) এর মক্কা হতে মদিনায় হিজরতের গুরুত্ব আলোচনা কর।
[Discuss the significance of the Hijrah of the Holy Prophet (PBUH) from Mecca to Medina.]
[মান: ২০]
ভূমিকা
৬২২ খ্রিস্টাব্দে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর নির্দেশে জন্মভূমি মক্কা ত্যাগ করে উত্তর দিকে অবস্থিত ইয়াসরিবে (পরবর্তীতে মদিনাতুন নবী বা মদিনা) গমন করেন। ইসলামের ইতিহাসে এই মহিমান্বিত ঘটনাকে ‘হিজরত’ (Hijrah) বলা হয়। এটি কোনো কাপুরুষোচিত পলায়ন ছিল না, বরং ইসলামের অস্তিত্ব রক্ষা এবং একটি সার্বজনীন কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এক সুদূরপ্রসারী কৌশলগত স্থানান্তর ছিল।
হিজরতের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও তাৎপর্য
- ১. মক্কী যুগের নিপীড়নের অবসান: মক্কায় দীর্ঘ তেরো বছর ধরে মুসলমানরা কুরাইশদের অসহনীয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, সামাজিক বয়কট (শেয়াবে আবু তালেবে বন্দিজীবন) সহ্য করছিল। হিজরতের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহ এই দাসত্ব ও নির্যাতন থেকে মুক্তি পেয়ে উন্মুক্ত নিরাপদ জীবনের সন্ধান পায়।
- ২. সার্বভৌম মদিনা রাষ্ট্রের পত্তন: হিজরতের পূর্বে ইসলাম ছিল কেবল একটি ধর্মীয় বিশ্বাস; হিজরতের পর মদিনায় ইসলাম রাষ্ট্রীয় রূপ পরিগ্রহ করে। মহানবী (সা.) কেবল ধর্মীয় নেতা থেকে একটি সার্বভৌম স্বাধীন রাষ্ট্রের সফল রাষ্ট্রনায়কে উন্নীত হন।
- ৩. মদিনা সনদ ও লিখিত সংবিধান প্রণয়ন: হিজরতের পরপরই মহানবী (সা.) আনসার, মুহাজির ও ইহুদিদের মধ্যে মদিনা সনদ স্বাক্ষর করে একটি আধুনিক বহুত্ববাদী রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করেন।
- ৪. আনসার ও মুহাজিরদের ঐতিহাসিক ভ্রাতৃত্ব: হিজরতের মাধ্যমে মদিনাবাসী (আনসার) নিজেদের বাড়ি-ঘর ও সম্পদ নিঃস্বার্থভাবে মক্কার আশ্রয়হীন ভাইদের (মুহাজির) সাথে ভাগ করে এক অমর ঐতিহাসিক ভ্রাতৃত্বের (মুআখাত) দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
- ৫. ইসলামি বর্ষপঞ্জি বা হিজরি সনের সূচনা: ইসলামের ইতিহাসে হিজরতের প্রভাব এতটাই গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ ছিল যে, দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রা.) মহানবীর হিজরতের বছর (৬২২ খ্রি.) থেকেই মুসলমানদের সরকারি ‘হিজরি সাল’ গণনা শুরু করেন।
- ৬. বিশ্ববিজয়ের শুভসূচনা: হিজরতের ফলেই মুসলমানরা সামরিক শক্তি সঞ্চয় করতে সক্ষম হয় এবং বদর, ওহুদ ও খন্দকের প্রতিরোধ পার হয়ে মক্কা বিজয়সহ সমগ্র আরব উপদ্বীপে তাওহিদের বিজয় পতাকা উত্তোলন করে।
উপসংহার
ঐতিহাসিক পি. কে. হিট্টির ভাষায়—“হিজরত ছিল ইসলামের ইতিহাসে এক বিশাল সন্ধিক্ষণ। এটি ছিল ইসলামের শৈশবকাল থেকে যৌবনে পদার্পণের মুহূর্ত।” হিজরত না হলে ইসলাম হয়তো মক্কার বালুকাবেলাতেই সীমিত থাকত, বিশ্বধর্মে পরিণত হতে পারত না।
৪। ওহুদ যুদ্ধের কারণ ও ফলাফল বর্ণনা কর।
[Describe the causes and results of the Battle of Uhud.]
[মান: ২০]
ভূমিকা
৬২৫ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে (হিজরি ৩য় সনের শাওয়াল মাসে) মদিনার তিন মাইল উত্তরে অবস্থিত ঐতিহাসিক ওহুদ পর্বতের পাদদেশে মুসলিম বাহিনী এবং মক্কার কুরাইশদের মধ্যে ওহুদ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। বদর যুদ্ধে শোচনীয় পরাজয়ের পর প্রতিশোধের আগুনে উন্মত্ত হয়ে কুরাইশরা এই আক্রমণ পরিচালনা করেছিল।
ওহুদ যুদ্ধের কারণসমূহ
- ১. বদর পরাজয়ের চরম প্রতিশোধস্পৃহা: বদর যুদ্ধে কুরাইশদের শীর্ষস্থানীয় নেতা আবু জাহেল, উতবাসহ ৭০ জন নিহত হওয়ায় প্রতিটি কুরাইশ পরিবারে শোক ও প্রতিশোধের আগুন জ্বলছিল। আবু সুফিয়ান শপথ নিয়েছিলেন মুসলমানদের ধ্বংস না করা পর্যন্ত মাথায় সুবাসিত তেল দেবেন না।
- ২. বাণিজ্যিক স্বার্থ ও অবরোধের অবসান: বদর যুদ্ধের পর মদিনার মুসলমানরা কুরাইশদের সিরিয়াগামী বাণিজ্যিক পথ অবরুদ্ধ করে দেয়। কুরাইশরা এই অর্থনৈতিক অবরোধ ভেঙে বাণিজ্য পথ পুনরুদ্ধারের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে।
- ৩. বিশাল সামরিক প্রস্তুতি: আবু সুফিয়ান বদর থেকে ফিরে আসা কাফেলার সমস্ত মুনাফা (প্রায় ৫০ হাজার দিনার) ওহুদ যুদ্ধের অস্ত্রের জন্য ব্যয় করে ৩,০০০ সুসজ্জিত সৈন্য, ২০০ অশ্বারোহী এবং ৭০০ বর্মধারী সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী গঠন করে।
- ৪. মহিলাদের যুদ্ধের ময়দানে নিয়ে আসা: কুরাইশরা তাদের সৈন্যদের মনোবল ধরে রাখার জন্য আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা বিনতে উতবাসহ বহু মহিলাকে সাথে আনে, যারা দফ বাজিয়ে বীরদের উৎসাহিত করতে থাকে।
ওহুদ যুদ্ধের ফলাফল ও মুসলিম বাহিনীর শিক্ষা
- ১. মুসলিম বাহিনীর প্রাথমিক বিজয়: মহানবী (সা.) মাত্র ৭০০ সাহাবী নিয়ে ওহুদ পর্বতের চূড়ায় পৌঁছান। যুদ্ধের শুরুতে আলী, হামযা ও আবু দুজানা (রা.)-এর অসীম বীরত্বে কুরাইশ বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে যেতে থাকে এবং তাদের রণক্ষেত্র ছেড়ে অস্ত্র ফেলে পালায়।
- ২. গিরিপথের ৫০ জন ধনুর্বিধের ভুলের খেসারত: মহানবী (সা.) পশ্চাদ্ভাগ সুরক্ষার জন্য আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়েরের নেতৃত্বে ওহুদের ‘আইনাইন’ গিরিপথে ৫০ জন সুদক্ষ তীরন্দাজ নিযুক্ত করেছিলেন এবং নির্দেশ দিয়েছিলেন—“আমরা জয়ী হই বা পরাজিত হই, কোনো অবস্থাতেই তোমরা এ স্থান ত্যাগ করবে না।” কিন্তু মুসলমানদের জয়ী হতে দেখে গনিমতের মাল সংগ্রহের লোভে ৪০ জন তীরন্দাজ স্থান ত্যাগ করে নিচে নেমে আসে।
- ৩. খালিদ বিন ওয়ালিদের অতর্কিত আক্রমণ: এই সুযোগে কুরাইশদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ (যিনি তখনো মুসলিম হননি) পাহাড়ি গিরিপথ ঘুরে মুসলমানদের ওপর পেছন দিক থেকে প্রচণ্ড আক্রমণ চালান। এতে মুসলিম বাহিনীর বিজয় মুহূর্তের মধ্যে বিপর্যয়ে রূপ নেয়।
- ৪. ৭০ জন সাহাবীর শাহাদাত: এই যুদ্ধে ইসলামের সিংহ হযরত হামযা (রা.), মুসআব ইবনে উমায়েরসহ ৭০ জন বিশিষ্ট সাহাবী শাহাদাত বরণ করেন। কুরাইশ নারী হিন্দা হযরত হামযার বুক চিরে কলিজা চিবিয়ে জঘন্য উল্লাস প্রকাশ করে।
- ৫. মহানবীর আহত হওয়া: প্রচণ্ড আক্রমণে মহানবী (সা.)-এর পবিত্র দাঁত মোবারক শহীদ হয় এবং শিরস্ত্রাণ ভেঙে মাথায় ঢুকে তিনি গুরুতর আহত হন। এমনকি তাঁর শাহাদাতের মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে পড়লে মুসলমানরা দিশেহারা হয়ে পড়ে।
- ৬. ঐতিহাসিক শিক্ষা: ওহুদ যুদ্ধ মুসলিম উম্মাহর জন্য চরম এক নৈতিক শিক্ষা রেখে যায়—নেতৃত্বের নির্দেশ অমান্য করা এবং পার্থিব লোভের পরিণতি কত ভয়াবহ হতে পারে তা মুসলমানরা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করে।
উপসংহার
যদিও ওহুদ যুদ্ধে মুসলমানরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, কিন্তু কুরাইশরা মদিনা ধ্বংস বা মুসলমানদের সম্পূর্ণ নির্মূল করতে পারেনি। তাই কৌশলগতভাবে এটি মুসলমানদের জন্য একটি কঠিন আত্মসংশোধন ও দৃঢ়তার পরীক্ষা ছিল।
৫। হজরত আবু বকর (রা) কে ইসলামের ত্রাণকর্তা বলা হয় কেন? আলোচনা কর।
[Why is Hazrat Abu Bakr (R.) called the Savior of Islam? Discuss.]
[মান: ২০]
ভূমিকা
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওফাতের পর মুসলিম উম্মাহ যখন নেতৃত্বহীনতা, ধর্মত্যাগ এবং বহিঃশত্রুর ষড়যন্ত্রে এক মহাপ্রলয়ঙ্করী অস্তিত্ব সংকটে নিমজ্জিত হয়েছিল, তখন ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) (শাসনকাল: ৬৩২—৬৩৪ খ্রি.) লৌহকঠিন ঈমান ও অনন্য প্রজ্ঞা দিয়ে ইসলামকে রক্ষা করেন। তাঁর এই অমর অবদানের জন্য ঐতিহাসিকগণ তাঁকে একবাক্যে ‘ইসলামের ত্রাণকর্তা’ (Savior of Islam) হিসেবে অভিহিত করেন।
তাঁকে ‘ইসলামের ত্রাণকর্তা’ বলার ঐতিহাসিক কারণসমূহ
- ১. ওফাত পরবর্তী মানসিক সংকট নিরসন: মহানবীর ওফাতের খবরে সাহাবীদের মধ্যে শোকের মাতম শুরু হয়; এমনকি হযরত ওমরের মতো বীর সাহাবী তলোয়ার উন্মুক্ত করে বলেন—যে বলবে নবী মারা গেছেন তার গর্দান নেব। এই সংকটময় মুহূর্তে আবু বকর (রা.) শান্তচিত্তে ঐতিহাসিক ভাষণ দেন: “তোমাদের মধ্যে যারা মুহাম্মদের পূজা করতে, তারা জেনে রাখো মুহাম্মদ মৃত্যুবরণ করেছেন; আর যারা আল্লাহর ইবাদত করো, তারা জেনে রাখো আল্লাহ চিরঞ্জীব, তাঁর কোনো মৃত্যু নেই।” এই বক্তব্য উম্মাহর শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে।
- ২. ভণ্ড নবীদের বিদ্রোহ দমন: মহানবীর জীবদ্দশার শেষভাগে এবং ওফাতের পর আরবের বিভিন্ন প্রান্তে নবুওয়াতের মিথ্যা দাবিদার ভণ্ড নবীদের উত্থান ঘটে; যেমন—আসওয়াদ আনসি, মুসায়লামা কাযযাব, তুলাইহা এবং সাজাহ। আবু বকর (রা.) কোনো আপস না করে খালিদ বিন ওয়ালিদসহ শ্রেষ্ঠ সেনাপতিদের পাঠিয়ে ইয়ামামার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে মুসায়লামাসহ সকল ভণ্ড নবীদের সমূলে নির্মূল করেন।
- ৩. ধর্মত্যাগী ও রিদ্দার যুদ্ধ পরিচালনা: মহানবীর ওফাতের সুযোগে বহু আরব গোত্র ইসলাম ত্যাগ করে পূর্বের পৌত্তলিকতায় ফিরে যাওয়ার ষড়যন্ত্র করে, যা ইতিহাসে ‘রিদ্দা আন্দোলন’ (Apostasy Movement) নামে পরিচিত। আবু বকর (রা.) কঠোর হস্তে এই ধর্মত্যাগীদের দমন করে সমগ্র আরবে ইসলামের প্রাধান্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন।
- ৪. জাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে আপসহীন জিহাদ: কিছু কপট ও গোত্রপ্রধান ঘোষণা করল—আমরা নামাজ পড়ব কিন্তু মদিনার সরকারকে জাকাত দেব না। অনেক সাহাবী তখন কিছুটা শিথিলতার পরামর্শ দিলেও আবু বকর (রা.) বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করলেন—“আল্লাহর কসম! যদি কেউ রাসুলুল্লাহর যুগে একটি উটের দড়িও জাকাত হিসেবে দিয়ে থাকে আর আজ তা দিতে অস্বীকার করে, তবে আমি তার বিরুদ্ধে জিহাদ করব।” এর মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্রের আর্থিক ও শরয়ি ভিত্তি রক্ষা করেন।
- ৫. আল-কুরআন গ্রন্থাকারে সংরক্ষণ: ইয়ামামার যুদ্ধে বহু হাফেজে কুরআন সাহাবী শহীদ হলে হযরত ওমরের পরামর্শে আবু বকর (রা.) সাহাবী যায়েদ ইবনে সাবিতকে প্রধান করে পবিত্র কুরআনকে সর্বপ্রথম গ্রন্থাকারে একত্রিত ও সংরক্ষণ করেন, যা মানবসভ্যতার জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান।
- ৬. বাইজান্টাইন ও পারস্য সীমান্তে অভিযান: দেশের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমন করেই তিনি ক্ষান্ত হননি; বরং রোমান ও পারস্য শক্তির সীমান্ত আগ্রাসন রুখতে তিনি উসামা ইবনে যায়েদ, খালিদ বিন ওয়ালিদ ও আবু উবায়দা (রা.)-এর নেতৃত্বে দূরদর্শী সামরিক অভিযান পরিচালনা করে ইসলামের আন্তর্জাতিক অগ্রযাত্রার সূচনা করেন।
উপসংহার
মাত্র দুই বছর তিন মাসের শাসনামলে হযরত আবু বকর (রা.) যদি আপসহীন ও বলিষ্ঠ পদক্ষেপ না নিতেন, তবে ইসলাম হয়তো অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যেতো। উইলিয়াম ম্যুর যথার্থই বলেছেন—“আবু বকর না থাকলে ইসলাম হয়তো ওহুদের মতোই ধূলিসাৎ হয়ে যেতো; তিনি ছিলেন ইসলামের সত্যিকার ত্রাতা।”
৬। হজরত ওসমান (রা) হত্যার কারণসমূহ ব্যাখ্যা কর।
[Explain the causes of the assassination of Hazrat Uthman (R.).]
[মান: ২০]
ভূমিকা
৬৫৬ খ্রিস্টাব্দের ১৭ জুন (৩৫ হিজরির ১৮ জিলহজ) জুমার দিনে ইসলামের তৃতীয় খলিফা হযরত উসমান ইবনে আফফান (রা.)-কে তাঁর নিজ বাসভবনে অত্যন্ত বর্বরোচিতভাবে শহীদ করা হয়। এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড ইসলামের ইতিহাসে প্রথম গৃহযুদ্ধ (ফিতনা) এবং উম্মাহর ঐক্যে এক মারাত্মক ফাটল সৃষ্টি করেছিল।
হত্যাকাণ্ডের প্রধান কারণসমূহ
- ১. আব্দুল্লাহ ইবনে সাবার গোপন ষড়যন্ত্র: ইয়েমেনের সানআর এক ইহুদি আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা বাহ্যিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির জন্য গোপন চক্রান্তের জাল বিস্তার করে। সে প্রচার করতে থাকে যে হযরত আলীই হলেন মহানবীর প্রকৃত ওয়াসি বা উত্তরাধিকারী এবং উসমান অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেছেন। এই বিষাক্ত প্রচারণায় কুফা, বসরা ও মিশরের একদল বিভ্রান্ত মানুষ যোগ দেয়।
- ২. কুরাইশ ও অনারবদের অসন্তোষ: ইসলামি সাম্রাজ্যের দ্রুত বিস্তারের ফলে বহু নব্য বিজিত অঞ্চলের মানুষ (বিশেষ করে ইরাক ও মিশরের নওমুসলিমরা) মদিনার কেন্দ্রীয় শাসন এবং কুরাইশদের রাজনৈতিক আধিপত্যকে মেনে নিতে পারছিল না। তারা প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন ও ক্ষমতার ভাগাভাগির দাবি তোলে।
- ৩. স্বজনপ্রীতির মিথ্যা প্রচারণা: উমাইয়া বংশীয় কিছু গভর্নর নিয়োগকে কেন্দ্র করে খলিফার বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির মিথ্যা ও অতিরঞ্জিত অভিযোগ ছড়ানো হয়, যা সাধারণ মুসলিমদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করে।
- ৪. মারওয়ান ইবনে হাকামের বিতর্কিত ভূমিকা: খলিফার প্রধান সচিব মারওয়ান ইবনে হাকামের কিছু একতরফা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং বিদ্রোহীদের সাথে আপস আলোচনার সময় একটি জাল চিঠির বিভ্রান্তি পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে ঠেলে দেয়।
- ৫. খলিফার চরম নম্রতা ও অহিংস নীতি: খলিফা উসমান ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু ও অহিংস। যখন কুফা, বসরা ও মিশর থেকে কয়েক হাজার বিদ্রোহী মদিনা ঘেরাও করে, তখন সাহাবীগণ (বিশেষ করে হযরত হাসান, হোসাইন ও আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের) অস্ত্র হাতে প্রতিরোধ করতে চাইলে খলিফা শপথ দিয়ে তাদের বারণ করেন। তিনি বলেন—“আমি রাসুলুল্লাহর শহরে মুসলমানদের রক্ত ঝরাতে পারি না।” এই অহিংস মানসিকতাকে বিদ্রোহীরা খলিফার দুর্বলতা মনে করে সুযোগ নেয়।
- ৬. রক্তক্ষয়ী মদিনা অবরোধ ও শাহাদাত: বিদ্রোহীরা দীর্ঘ চল্লিশ দিন ধরে খলিফার বাড়ি অবরোধ করে রাখে, এমনকি তাঁর খাবার ও পানি সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। অবশেষে ৩৫ হিজরির ১৮ জিলহজ বিদ্রোহীরা পেছনের প্রাচীর টপকে খলিফার কক্ষে প্রবেশ করে এবং কুরআন তিলাওয়াতরত অবস্থায় আশি বছরের বৃদ্ধ খলিফাকে বর্বরোচিতভাবে কুপিয়ে শহীদ করে। তাঁর স্ত্রী নায়েলা বাধা দিতে গিয়ে হাতের আঙুল হারান।
উপসংহার
হযরত উসমান (রা.)-এর শাহাদাত ছিল ইসলামি সাম্রাজ্যে ফিতনা ও রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের কালো দ্বার উন্মোচন। এই হত্যাকাণ্ডের কারণেই পরবর্তীতে জमल ও সিফফিনের যুদ্ধ এবং শিয়া-সুন্নি রাজনৈতিক বিভেদের সূত্রপাত ঘটে।
৭। হজরত আলী (রা) ও মুয়াবিয়া (রা)-এর মধ্যকার দ্বন্দ্বের কারণসমূহ পর্যালোচনা কর। এর ফলাফল কী হয়েছিল?
[Review the causes of the conflict between Hazrat Ali (R.) and Muawiyah (R.). What were its consequences?]
[মান: ২০]
ভূমিকা
হযরত উসমান (রা.)-এর মর্মান্তিক শাহাদাতের পর ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রা.) এবং সিরিয়ার প্রভাবশালী গভর্নর হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও ক্ষমতার যে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সৃষ্টি হয়, তা ইসলামের রাজনৈতিক ইতিহাসে অত্যন্ত বেদনাদায়ক এক অধ্যায়। এই দ্বন্দ্বের চরম পরিণতি ঘটেছিল ৬৫৭ খ্রিস্টাব্দের ঐতিহাসিক ‘সিফফিনের যুদ্ধ’ এবং পরবর্তী মধ্যস্থতার মাধ্যমে।
দ্বন্দ্বের প্রধান কারণসমূহ
- ১. উসমান হত্যার বিচারের অগ্রাধিকার বনাম রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা:
- মুয়াবিয়া (রা.)-এর দাবি: উমাইয়া বংশের প্রধান প্রতিনিধি হিসেবে মুয়াবিয়া দাবি করেন যে, নতুন খলিফা হযরত আলীকে সবার আগে খলিফা উসমানের হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করে কিসাস (রক্তের বিচার) কার্যকর করতে হবে; নতুবা তিনি আলীর হাতে বায়াত গ্রহণ করবেন না। তিনি দামেস্কের মসজিদে উসমানের রক্তমাখা জামা এবং তাঁর স্ত্রীর কর্তিত আঙুল ঝুলিয়ে রেখে তীব্র জনমত গড়ে তোলেন।
- হযরত আলী (রা.)-এর অবস্থান: হযরত আলী (রা.) উসমান হত্যার বিচার করতে নীতিগতভাবে সম্পূর্ণ একমত ছিলেন; কিন্তু তিনি যুক্তি দেন যে মদিনায় তখন বিদ্রোহীদের অস্ত্রধারী নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং সাম্রাজ্যে নৈরাজ্য চলছে। তাই আগে সব অঞ্চলের গভর্নরদের আনুগত্য ও রাষ্ট্রীয় শান্তি ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন, তারপর আদালতের মাধ্যমে হত্যাকারীদের বিচার করা হবে।
- ২. প্রাদেশিক গভর্নরদের অপসারণ: দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই হযরত আলী পূর্বতন সকল উমাইয়া গভর্নরকে বরখাস্ত করার আদেশ দেন। কিন্তু সিরিয়ার গভর্নর মুয়াবিয়া (যিনি বিশ বছর ধরে সিরিয়ায় শক্তিশালী শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন) এই আদেশ মানতে সরাসরি অস্বীকার করেন।
- ৩. কুরাইশদের উমাইয়া ও হাশেমি বংশীয় প্রাচীন দ্বন্দ্ব: জাহেলি যুগ থেকেই কুরাইশদের দুটি প্রধান শাখা বনু হাশেম ও বনু উমাইয়ার মধ্যে নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব ছিল। উসমানের মৃত্যুর পর খিলাফত পুনরায় হাশেমি বংশে ফিরে আসায় উমাইয়ারা রাজনৈতিক ক্ষমতা হারানোর আশঙ্কায় মুয়াবিয়ার নেতৃত্বে সংগঠিত হয়।
- ৪. সিফফিনের যুদ্ধ ও সালিশির প্রতারণা: ৬৫৭ খ্রিস্টাব্দে ইউফ্রেটিস নদীর তীরে সিফফিনের যুদ্ধে যখন আলীর বাহিনী প্রায় বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে, তখন মুয়াবিয়ার সেনাপতি আমর ইবনুল আসের কূটকৌশলে সিরিয়ান সৈন্যরা বর্শার মাথায় পবিত্র কুরআন বেঁধে সন্ধির আবেদন জানায়। আলী বাধ্য হয়ে যুদ্ধ থামিয়ে সালিশি (তাহকিম) মানতে সম্মত হন। কিন্তু সালিশিতে আমর ইবনুল আস প্রবীণ সাহাবী আবু মুসা আল-আশআরীকে ধোঁকা দিয়ে মুয়াবিয়াকে একতরফাভাবে খলিফা ঘোষণা করেন।
দ্বন্দ্বের সুদূরপ্রসারী ফলাফল
- ১. খারিজি সম্প্রদায়ের উদ্ভব: সিফফিনের যুদ্ধে সালিশি মেনে নেওয়ার প্রতিবাদে আলীর বাহিনীর একটি উগ্র দল বেরিয়ে যায়, যাদের ‘খারিজি’ (দলত্যাগী) বলা হয়। তারা ‘লা হুকমা ইল্লা লিল্লাহ’ (আল্লাহ ছাড়া কোনো বিধানদাতা নেই) স্লোগান দিয়ে মুসলিমদের কাফের ঘোষণা করে এবং আলীর বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেয়।
- ২. খিলাফতের বিভক্তি ও দ্বৈত শাসন: এই দ্বন্দ্বের ফলে ইসলামি সাম্রাজ্য দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে—ইরাক, ইরান ও হেজাজে হযরত আলীর শাসন এবং সিরিয়া ও মিশরে মুয়াবিয়ার শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।
- ৩. হযরত আলীর শাহাদাত (৬৬১ খ্রি.): খারিজিদের চক্রান্তে ৬১ হিজরির ১৭ রমজান কুফার মসজিদে নামাজরত অবস্থায় আব্দুর রহমান ইবনে মুলজাম বিষাক্ত তরবারি দিয়ে হযরত আলী (রা.)-কে আঘাত করে শহীদ করে।
- ৪. উমাইয়া রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা: আলীর শাহাদাত এবং পরবর্তীতে হযরত হাসানের ক্ষমতা ত্যাগের মধ্য দিয়ে ৬৬১ খ্রিস্টাব্দে হযরত মুয়াবিয়া দামেস্কে উমাইয়া বংশের শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। এর ফলে খোলাফায়ে রাশেদীনের গণতান্ত্রিক ও আদর্শিক খিলাফতের চির অবসান ঘটে এবং বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্রের সূচনা হয়।
৮। উমাইয়া খিলাফতের পতনের প্রধান কারণগুলো পর্যালোচনা কর।
[Review the main causes of the downfall of the Umayyad Caliphate.]
[মান: ২০]
ভূমিকা
৬৬১ খ্রিস্টাব্দে হযরত মুয়াবিয়া (রা.) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত উমাইয়া খিলাফত দীর্ঘ নব্বই বছর টিকে থাকার পর ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে এক রক্তক্ষয়ী বিপ্লবের মাধ্যমে পতনবরণ করে। যদিও উমাইয়া আমলে ইসলামি সাম্রাজ্য স্পেন থেকে ভারতের সিন্ধু পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করেছিল, কিন্তু অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি, বৈষম্যমূলক নীতি এবং রাজনৈতিক অবিচারের কারণে এই পরাক্রমশালী সাম্রাজ্যের পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে।
উমাইয়া খিলাফতের পতনের মূল কারণসমূহ
- ১. রাজতান্ত্রিক ও বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকার: মুয়াবিয়া (রা.) কর্তৃক স্বীয় পুত্র ইয়াজিদকে খলিফা মনোনীত করার মাধ্যমে খোলাফায়ে রাশেদীনের শুরা ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতির কবর রচনা করা হয়। অযোগ্য, বিলাসপ্রিয় ও চরিত্রহীন উত্তরসূরিদের কারণে রাজপরিবারের প্রতি মুসলিম জনতার তীব্র ঘৃণা তৈরি হয়।
- ২. কারবালার মর্মন্তুদ ট্র্যাজেডি (৬৮০ খ্রি.): ইয়াজিদের বাহিনী কর্তৃক মহানবীর দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসাইন (রা.) এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের কারবালার প্রান্তরে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনা সমগ্র মুসলিম বিশ্বকে স্তম্ভিত ও ক্ষুব্ধ করে তোলে। এই কলঙ্কিত ঘটনার কারণে উমাইয়ারা রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বৈধতা চিরতরে হারিয়ে ফেলে।
- ৩. অনারব মুসলিমদের (মাওয়ালী) প্রতি চরম বৈষম্য: উমাইয়া শাসকগণ খাঁটি আরব শ্রেষ্ঠত্ববাদে বিশ্বাসী ছিল। পারসিক ও অন্যান্য অনারব নওমুসলিমদের তারা ‘মাওয়ালী’ (দাসশ্রেণি) হিসেবে বিবেচনা করত এবং তাদের ওপর অন্যায়ভাবে জিজিয়া কর চাপিয়ে রাখত ও উচ্চপদ থেকে বঞ্চিত করত। ফলে এই বিশাল ক্ষুব্ধ জনগোষ্ঠী উমাইয়াদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়।
- ৪. আরবদের অন্তর্দ্বন্দ্ব (মুদারীয় ও হিমারীয় দ্বন্দ্ব): উত্তর আরবের কায়েসী বা মুদারীয় গোত্র এবং দক্ষিণ আরবের ইয়েমেনী বা হিমারীয় গোত্রের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী সংঘাত উমাইয়া রাজদরবার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। খলিফাগণ কোনো এক গোত্রের পক্ষ অবলম্বন করায় সাম্রাজ্যের জাতীয় ঐক্য সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে।
- ৫. শিয়া ও খারিজিদের সার্বক্ষণিক বিদ্রোহ: হযরত আলীর অনুসারী শিয়া সম্প্রদায় এবং চরমপন্থী খারিজিরা উমাইয়াদের অবৈধ দখলদার মনে করত এবং প্রায় প্রতি বছর বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্রোহ চালিয়ে উমাইয়া সামরিক শক্তিকে ক্ষয়িষ্ণু করে তোলে।
- ৬. পরবর্তী খলিফাদের অযোগ্যতা ও বিলাসিতা: প্রথম সারির খলিফাদের (যেমন মুয়াবিয়া, আব্দুল মালিক, ওয়ালিদ) পর দ্বিতীয় ইয়াজিদ, ওয়ালিদ-২ প্রমুখ খলিফা রাজপ্রাসাদের মদ, নারী ও সঙ্গীতের ইন্দ্রিয়সুখে ডুবে গিয়ে শাসনকাজ ধ্বংস করে ফেলেন।
- ৭. আব্বাসীয়দের সুসংগঠিত গোপন প্রচারণা ও বিপ্লব: মহানবীর চাচা আব্বাস (রা.)-এর বংশধররা অত্যন্ত চতুরতার সাথে গোপনে খোরাসান ও পারস্যে উমাইয়াবিরোধী প্রচার চালায়। সেনাপতি আবু মুসলিম খোরাসানীর নেতৃত্বে আব্বাসীয়রা শিয়া ও মাওয়ালীদের একত্রিত করে সুবিশাল বাহিনী গড়ে তোলে। ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে ‘জাব’-এর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে শেষ উমাইয়া খলিফা মারওয়ান-২ শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন এবং উমাইয়া খিলাফত ধূলিসাৎ হয়ে যায়।
উপসংহার
উমাইয়াদের পতন ছিল অন্যায়, সামাজিক বৈষম্য এবং নৈতিক স্খলনের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক ন্যায়বিচারের অমোঘ নিয়ম। রাজতন্ত্র ও আরব অহমিকা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তারা যে সাম্রাজ্য গড়েছিল, জনতার পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণে তা মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে বিলুপ্ত হয়ে যায়।
৯। খলিফা আল-ওয়ালিদের রাজ্য বিস্তার সম্পর্কে বর্ণনা কর।
[Describe the territorial expansion of Caliph Al-Walid.]
[মান: ২০]
ভূমিকা
উমাইয়া খিলাফতের ষষ্ঠ খলিফা প্রথম আল-ওয়ালিদ (শাসনকাল: ৭০৫—৭১৫ খ্রি.)-এর দশ বছরের শাসনামল ছিল ইসলামি ইতিহাসের অন্যতম সর্বাধিক বিজয় ও রাজ্য বিস্তারের স্বর্ণযুগ। পিতা আব্দুল মালিকের সুদৃঢ় প্রশাসনিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে তিনি তাঁর অসাধারণ সেনাপতিদের (মুহাম্মদ বিন কাসিম, কুতায়বা বিন মুসলিম, মুসা বিন নুসায়ের ও তারিক বিন জিয়াদ) মাধ্যমে পূর্ব ও পশ্চিমে একযোগে ইসলামি সীমানা ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে সম্প্রসারিত করেন।
খলিফা আল-ওয়ালিদের রাজ্য বিস্তারের প্রধান অভিযানসমূহ
১. প্রাচ্যের বিজয়: মধ্য এশিয়া ও ট্রান্সঅক্সিয়ানা বিজয়
ইরাকের গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসুফের অধীনে ওয়ালিদের সুযোগ্য সেনাপতি কুতায়বা বিন মুসলিম আল-বাহিলী মধ্য এশিয়ায় এক অবিশ্বাস্য সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন:
- ৭০৫ থেকে ৭১৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে তিনি আমুদরিয়া (অক্সাস) নদী অতিক্রম করে সমরকন্দ, বুখারা, বলখ ও খাওয়ারিজম বিজয় করেন।
- এরপর তিনি আরও পূর্বে অগ্রসর হয়ে ফারগানা এবং বর্তমান চীনের সীমান্তসংলগ্ন কাশগড় পর্যন্ত ইসলামি শাসন কায়েম করেন। এই বিজয়ের ফলে মধ্য এশিয়ার বিশাল তুর্কি জনগোষ্ঠী ইসলামের ছায়াতলে আসে।
২. ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের প্রবেশ: সিন্ধু ও মুলতান বিজয়
৭১২ খ্রিস্টাব্দে ওয়ালিদের মাত্র সতেরো বছর বয়সী তরুণ ও প্রতিভাবান সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাসিম ভারতের সিন্ধু প্রদেশে অভিযান চালান:
- রাজা দাহিরকে দেবল ও রাওয়ারের যুদ্ধে পরাজিত ও হত্যা করে তিনি সমগ্র সিন্ধু প্রদেশ মুসলিম সাম্রাজ্যভুক্ত করেন।
- এরপর তিনি উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে স্বর্ণসমৃদ্ধ শহর ‘মুলতান’ জয় করেন। এর ফলে ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম বিজয়ের স্থায়ী ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়।
৩. পাশ্চাত্যের বিজয়: উত্তর আফ্রিকা ও স্পেন (আন্দালুসিয়া) বিজয়
পশ্চিমে ওয়ালিদের সাম্রাজ্য বিস্তার ছিল বিশ্বের ইতিহাসের অন্যতম বিস্ময়কর অধ্যায়:
- উত্তর আফ্রিকা সম্পূর্ণ বিজয়: সেনাপতি মুসা বিন নুসায়ের উত্তর আফ্রিকার বার্বারদের বিদ্রোহ দমন করে আটলান্টিক মহাসাগরের তীরবর্তী মরক্কো ও তাঞ্জিয়ার পর্যন্ত পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন।
- স্পেন বিজয় (৭১১ খ্রি.): মুসা বিন নুসায়েরের অধীনস্থ বার্বার সেনাপতি তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ৭,০০০ সৈন্য নিয়ে জিব্রাল্টার (জাবালুত তারিক) প্রণালী অতিক্রম করে স্পেনে প্রবেশ করেন। ৭১১ খ্রিস্টাব্দে ‘গুয়াদালেতের যুদ্ধে’ ভিসিগোথ রাজা রডারিককে পরাজিত করে তিনি কর্ডোভা, টলেডো ও সেভিল জয় করেন। পরবর্তীতে মুসা বিন নুসায়েরের যোগদানে সমগ্র আইবেরীয় উপদ্বীপ (বর্তমান স্পেন ও পর্তুগাল) উমাইয়া সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং ফ্রান্সে প্রবেশের দ্বার উন্মোচিত হয়।
উপসংহার
খলিফা ওয়ালিদের রাজ্য বিস্তারের ফলে পূর্বে চীন ও সিন্ধু নদ থেকে পশ্চিমে আটলান্টিক মহাসাগর এবং ফ্রান্সের সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত এক সুবিশাল পরাক্রমশালী ইসলামি বিশ্বসাম্রাজ্য গড়ে ওঠে। সামরিক বিজয়ের পাশাপাশি তিনি দামেস্কের সুবিখ্যাত ‘উমাইয়া জামে মসজিদ’ নির্মাণ করে স্থাপত্যকলার ক্ষেত্রেও অমর হয়ে আছেন।
১০। খলিফা হারুন-অর-রশীদ ইতিহাসে এত বিখ্যাত কেন? তাঁর কৃতিত্ব মূল্যায়ন কর।
[Why is Caliph Harun al-Rashid so famous in history? Evaluate his achievements.]
[মান: ২০]
ভূমিকা
আব্বাসীয় খিলাফতের পঞ্চম খলিফা হারুন-অর-রশীদ (শাসনকাল: ৭৮৬—৮০৯ খ্রি.) ছিলেন মুসলিম জাহানের অন্যতম সর্বাধিক নন্দিত, ঐশ্বর্যবান ও জনপ্রিয় শাসক। তাঁর শাসনামল ছিল আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের সমৃদ্ধি, ন্যায়বিচার এবং বিশ্বজোড়া সুনামের এক অনন্য শিখর। আরব্য উপন্যাসের (এক হাজার এক রজনী বা আরব্য রজনী) রূপকথার নায়ক হিসেবে তিনি বিশ্বজুড়ে রোমান্টিক খলিফা হিসেবে সমাদৃত হলেও, বাস্তব ইতিহাসে তিনি ছিলেন এক অনন্য দূরদর্শী ও ন্যায়পরায়ণ রাষ্ট্রনায়ক।
ইতিহাসে হারুন-অর-রশীদের বিখ্যাত হওয়ার কারণ ও কৃতিত্ব
- ১. জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা: হারুন-অর-রশীদ ছিলেন পরম বিদ্বান ও জ্ঞানানুরাগী শাসক। তাঁর রাজদরবার তৎকালীন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ আলেম, ফকিহ, কবি, সাহিত্যিক, চিকিৎসক ও বিজ্ঞানীদের দ্বারা সর্বদা মুখরিত থাকত। তিনি প্রথম বাগদাদে লাইব্রেরি ও অনুবাদ ব্যুরো প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীতে ‘বাইতুল হিকমাহ’ রূপ ধারণ করে। তাঁর বিখ্যাত উজির জাফর ও ফজল বার্মাকী জ্ঞানচর্চায় প্রভূত অর্থ ব্যয় করতেন।
- ২. বিশ্বজোড়া কূটনৈতিক মর্যাদা ও আন্তর্জাতিক সুসম্পর্ক: হারুন-অর-রশীদের খ্যাতি সমগ্র ইউরোপ ও এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল। ইউরোপের শক্তিশালী পবিত্র রোমান সম্রাট শার্লিমেন (Charlemagne)-এর সাথে তাঁর চমৎকার কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিল। শার্লিমেন বাগদাদে দূত পাঠিয়েছিলেন এবং খলিফা তাঁকে একটি দুর্লভ পানিচালিত যান্ত্রিক ঘড়ি, হাতির দাঁতের দাবা ও মূল্যবান উপহার প্রেরণ করে ইউরোপকে চমকে দিয়েছিলেন। চীনের তাং সম্রাটের সাথেও তাঁর সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক ছিল।
- ৩. বাইজান্টাইন (রোমান) আগ্রাসন দমন: বাইজান্টাইন সম্রাজ্ঞী আইরিন খলিফাকে নিয়মিত রাজস্ব দিতেন। কিন্তু পরবর্তীতে সম্রাট নাইসিফোরাস ক্ষমতা গ্রহণ করে রাজস্ব বন্ধ করে খলিফাকে অহংকারপূর্ণ চিঠি লিখলে হারুন চিঠির অপর পিঠে রক্ত গরম করা জবাব লেখেন: “বিশ্বাসীগণের নেতা হারুনের পক্ষ থেকে রোমান কুকুর নাইসিফোরাসের প্রতি—আমি তোমার চিঠি পড়েছি। এর জবাব তুমি চোখে দেখবে, কানে শুনবে না।” খলিফা বিশাল বাহিনী নিয়ে হেরাক্লিয়া আক্রমণ করে নাইসিফোরাসকে নতজানু করে দ্বিগুণ কর দিতে বাধ্য করেন।
- ৪. অর্থনীতি ও বাণিজ্য বিপ্লব: তাঁর আমলে বাগদাদ ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে ঐশ্বর্যশালী বাণিজ্যিক নগরী। টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদী দিয়ে চীন, ভারত, মিশর ও আফ্রিকা থেকে পণ্যবোঝাই জাহাজ আসত। দেশের সর্বত্র স্বর্ণমুদ্রা (দিনার) ও রৌপ্যমুদ্রা (দিরহাম)-এর প্রাচুর্য ছিল।
- ৫. জনকল্যাণ ও সামাজিক সেবা: তিনি বাগদাদে আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণ করেন, যেখানে রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ দেওয়া হতো। রাস্তাঘাট, সরাইখানা, মসজিদ এবং মক্কা-মদিনাগামী তীর্থযাত্রীদের জন্য তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী রানি জুবায়দা বিখ্যাত ‘নাহরে জুবায়দা’ (জুবায়দা খাল) খনন করে হাজিদের পানির সংকট দূর করেন।
- ৬. ছদ্মবেশে প্রজার খোঁজখবর: দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমরের মতো হারুন-অর-রশীদও রাতের আঁধারে সাধারণ মানুষের ছদ্মবেশে বাগদাদের রাস্তায় ঘুরে প্রজাদের প্রকৃত অবস্থা ও অভাব-অভিযোগ পর্যবেক্ষণ করতেন।
উপসংহার
ঐতিহাসিকদের বর্ণনামতে, হারুন-অর-রশীদের আমল ছিল প্রাচুর্য, নিরাপত্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রযাত্রার এক অপার্থিব রূপকথা। তাঁর অসামান্য সামরিক দক্ষতা এবং জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্রনায়কত্বই তাঁকে ইতিহাসের পাতায় চিরভাস্বর করে রেখেছে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. ফাযিল ৩য় বর্ষের ৪১৩ কোডের পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের মূল কৌশল কী?
আইয়ামে জাহেলিয়াত ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সংস্কার, খোলাফায়ে রাশেদীনের শাসন ও নির্বাচন ব্যবস্থা, উমাইয়া খিলাফতের উত্থান-পতন এবং আব্বাসীয় স্বর্ণযুগের ইতিহাস পয়েন্টভিত্তিক নির্ভুল তথ্য ও বিশ্লেষণসহ উপস্থাপন করা।
২. আইয়ামে জাহেলিয়াতের সবচেয়ে ঘৃণ্য কুপ্রথা কোনটি ছিল?
কন্যা সন্তান জন্ম নেওয়াকে চরম অপমান ও কলঙ্কের কারণ মনে করে জ্যান্ত মাটির নিচে পুঁতে ফেলা (ওয়াদুল বানাত) এবং সমাজে নারীদের উত্তরাধিকার ও মানবিক অধিকার সম্পূর্ণ অস্বীকার করা।
৩. হিজরতের পর মদিনায় কোন কোন ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়?
মসজিদে নববী নির্মাণ, আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে ঐতিহাসিক ভ্রাতৃত্ববন্ধন (মুআখাত) স্থাপন এবং বিশ্বের প্রথম লিখিত সংবিধান হিসেবে ৪৭ ধারার মদিনা সনদ প্রণয়ন।
৪. হযরত আবু বকর (রা.) কেন জাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেন?
কারণ নামাজ ও জাকাত ইসলামের মৌলিক স্তম্ভ; জাকাত অস্বীকার করার অর্থ ছিল রাষ্ট্রের আইন অমান্য করে ইসলামি শরিয়াহর সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক ভিত্তিকে ধ্বংস করে দেওয়া।
৫. সিফফিনের যুদ্ধে মুয়াবিয়ার বাহিনী কেন বর্শার মাথায় কুরআন বেঁধেছিল?
যখন তারা হযরত আলীর বাহিনীর বীরত্বে নিশ্চিত পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল, তখন সেনাপতি আমর ইবনুল আসের কূটকৌশলে যুদ্ধ থামিয়ে সালিশির মাধ্যমে পরাজয় এড়াতে তারা এ পদক্ষেপ নিয়েছিল।
৬. খলিফা আল-ওয়ালিদের সময়কালে কোন কোন ঐতিহাসিক সেনাপতি ছিলেন?
মধ্য এশিয়া বিজয়ী কুতায়বা বিন মুসলিম, সিন্ধু বিজয়ী মুহাম্মদ বিন কাসিম, উত্তর আফ্রিকা বিজয়ী মুসা বিন নুসায়ের এবং স্পেন বিজয়ী তারিক বিন জিয়াদ।

