মুসলমানদের ইতিহাস (৭৫০—১২৫৮) আব্বাসীয় এবং আঞ্চলিক রাজবংশসমূহ (History of the Muslims 750-1258) – 205102, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি – ফাজিল অনার্স ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২১

StudyBoi StudyBoi
September 26, 2026
৫৩ মিনিট পড়ার সময়
৩ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন

পরীক্ষা কোড: ২০১ | প্রশ্নপত্র কোড: ০৩০
ফাজিল (স্নাতক) সম্মান প্রথম বর্ষ পরীক্ষা, ২০২১
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
HISTORY OF THE MUSLIMS (750—1258) THE ABBASIDS AND THE REGIONAL DYNASTIES
[মুসলমানদের ইতিহাস (৭৫০—১২৫৮) আব্বাসীয় এবং আঞ্চলিক রাজবংশসমূহ]
বিষয় কোড: ২০৫১০২
সময়—৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান—৮০
[দ্রষ্টব্য: ক বিভাগ থেকে ৪টি এবং খ বিভাগ থেকে ২টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।]


ক বিভাগ (রচনামূলক প্রশ্ন)

১। আবু জাফর আল মানসুরকে আব্বাসীয় বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলা হয় কেন? ব্যাখ্যা কর।

[Why is Abu Jafar al Mansur called the real founder of Abbasid dynasty? Explain.]

ভূমিকা

আব্বাসীয় খিলাফতের প্রথম খলিফা আবুল আব্বাস আস-সাফফাহ (৭৫০—৭৫৪ খ্রি.) বংশের প্রতিষ্ঠা করলেও তাঁর সংক্ষিপ্ত শাসনামল কেবল শত্রু নিধনেই অতিবাহিত হয়। তাঁর মৃত্যুর পর দ্বিতীয় খলিফা হিসেবে ক্ষমতায় আসেন তাঁর ভ্রাতা আবু জাফর আল-মানসুর (৭৫৪—৭৭৫ খ্রি.)। মানসুর তাঁর অসাধারণ রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, কঠোর প্রশাসনিক দক্ষতা এবং দৃঢ় পদক্ষেপের মাধ্যমে নবপ্রতিষ্ঠিত ও টালমাটাল আব্বাসীয় সাম্রাজ্যকে স্থিতিশীল ও সুসংহত করেন। এ কারণেই অধিকাংশ ঐতিহাসিক তাঁকে আব্বাসীয় বংশের ‘প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা’ (Real Founder) হিসেবে গণ্য করেন।

যেসব কারণে আবু জাফর আল-মানসুরকে প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়

  • ১. সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী ও শত্রুদের দমন:
    • চাচা আব্দুল্লাহর বিদ্রোহ দমন: ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই তাঁর শক্তিশালী চাচা সিরিয়ার গভর্নর আব্দুল্লাহ খিলাফতের দাবিদার হন। মানসুর আবু মুসলিমের সহায়তায় নিসিবিনের যুদ্ধে তাঁকে পরাস্ত ও কারারুদ্ধ করেন।
    • আবু মুসলিম খোরাসানীর অপসারণ: আবু মুসলিম ছিলেন আব্বাসীয় খিলাফত প্রতিষ্ঠার প্রধান কারিগর এবং খোরাসানে তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল আকাশচুম্বী। তিনি খলিফার জন্য একচ্ছত্র ক্ষমতার হুমকি হয়ে উঠলে মানসুর অত্যন্ত কৌশলে ৭৫৫ খ্রিষ্টাব্দে তাঁকে রাজদরবারে ডেকে এনে হত্যা করেন এবং সম্ভাব্য গৃহযুদ্ধ ঠেকান।
  • ২. আলীয় বা শিয়া বিদ্রোহের চূড়ান্ত অবসান: আব্বাসীয়রা ক্ষমতায় আসার জন্য আলীয়দের (হযরত আলীর বংশধর) সমর্থন নিয়েছিল, কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় শিয়ারা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। ইমাম হাসানের বংশধর মুহাম্মদ আন-নাফস উজ-জাকিয়্যাহ মদিনায় এবং তাঁর ভাই ইব্রাহিম বসরার বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। মানসুর কঠোর হস্তে ৭৬২-৭৬৩ খ্রিষ্টাব্দে এ বিদ্রোহ দমন করে সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক সংহতি নিশ্চিত করেন।
  • ৩. দারুস সালাম বা বাগদাদ নগরী প্রতিষ্ঠা (৭৬২ খ্রি.): মানসুরের সর্বশ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক অবদান হলো টাইগ্রিস (দজলা) নদীর তীরে ‘মদিনাতুস সালাম’ বা নতুন রাজধানী বাগদাদ নির্মাণ। ভৌগোলিক, সামরিক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এই নগরী পরবর্তী ৫০০ বছর ধরে মুসলিম বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সভ্যতার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়।
  • ৪. সুদৃঢ় প্রশাসনিক ও আর্থিক কাঠামো: মানসুর সাম্রাজ্যের রাজস্ব ও ডাক যোগাযোগ ব্যবস্থা (বারিদ) পুনর্গঠন করেন। বারিদ বিভাগ কেবল চিঠি আদান-প্রদান করত না, বরং প্রতিটি প্রদেশের গভর্নরের কার্যকলাপ নজরদারিতে খলিফার চোখ-কান হিসেবে কাজ করত। মৃত্যুর সময় তিনি বাইতুল মালে বিপুল উদ্বৃত্ত তহবিল রেখে যান, যা পরবর্তী সোনালী যুগের ভিত্তি রচনা করে।

উপসংহার

ঐতিহাসিক পি. কে. হিট্টির মতে, আবুল আব্বাস ছিলেন রক্তপিপাসু বিজেতা, কিন্তু মানসুর ছিলেন রাষ্ট্রনায়ক ও সাম্রাজ্যের স্থপতি। তিনি যদি কঠোর হস্তে বিদ্রোহ দমন না করতেন এবং বাগদাদ প্রতিষ্ঠা না করতেন, তবে আব্বাসীয় বংশ অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যেত। তাই তাঁকে আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলা সম্পূর্ণ যুক্তিযুক্ত।


২। আমিন ও মামুনের মধ্যে গৃহযুদ্ধের বর্ণনা দাও। মামুনের জয়লাভের কারণসমূহ কী ছিল?

[Describe the civil war between Amin and Mamun. What were the causes of Mamun’s success?]

ভূমিকা

খলিফা হারুন-অর-রশীদের মৃত্যুর পর তাঁর দুই পুত্র—মুহাম্মদ আল-আমিন এবং আব্দুল্লাহ আল-মামুনের মধ্যে ক্ষমতার উত্তরাধিকার নিয়ে ৮১০ থেকে ৮১৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত যে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ সংঘটিত হয়, তা আব্বাসীয় ইতিহাসের অন্যতম সংকটময় অধ্যায়। এটি কেবল দুই ভাইয়ের যুদ্ধ ছিল না, বরং এর পেছনে ছিল আরব বনাম অনারব (ফারসি) রাজনৈতিক প্রভাবের সংঘাত।

গৃহযুদ্ধের পটভূমি ও ঘটনাবলি

  • হারুনের ত্রুটিপূর্ণ উত্তরাধিকার চুক্তি: হারুন-অর-রশীদ তাঁর আরব বংশোদ্ভূত জুবায়দার গর্ভজাত পুত্র আমিনকে প্রথম উত্তরাধিকারী এবং পারসিক দাসী মারাজিলের গর্ভজাত অধিকতর যোগ্য পুত্র মামুনকে পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের (খোরাসান) শাসক ও পরবর্তী খলিফা মনোনীত করে পবিত্র কাবা ঘরে অঙ্গীকারনামা ঝুলিয়ে দেন।
  • আমিনের চুক্তিভঙ্গ ও বৈরিতা: ৮০৯ খ্রিষ্টাব্দে খলিফা হয়ে আমিন তাঁর প্রধানমন্ত্রী ফজল বিন রাবির প্ররোচনায় মামুনকে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করে নিজ অপ্রাপ্তবয়স্ক পুত্র মুসাকে সিংহাসনের পরবর্তী উত্তরাধিকারী ঘোষণা করেন। এতে দুই ভাইয়ের মধ্যে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ে।
  • রায়-এর যুদ্ধ (৮১১ খ্রি.): আমিন তাঁর সেনাপতি আলী বিন ঈসাকে ৫০,০০০ সৈন্যসহ খোরাসান আক্রমণে পাঠান। মামুনের দক্ষ সেনাপতি তাহির বিন হুসাইন মাত্র কয়েক হাজার সৈন্য নিয়ে অতর্কিত রণকৌশলে আলী বিন ঈসাকে পরাজিত ও হত্যা করেন।
  • বাগদাদ অবরোধ ও আমিনের পরিণতি (৮১৩ খ্রি.): তাহির ও হারসামা বাগদাদ অবরোধ করেন। দীর্ঘ প্রায় এক বছর ধরে নির্মম যুদ্ধের পর বাগদাদের পতন ঘটে। আমিন বন্দি হন এবং পরবর্তীতে তাহিরের সৈন্যদের হাতে নিহত হন। এর ফলে মামুন ৮১৩ খ্রিষ্টাব্দে আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের অপ্রতিদ্বন্দ্বী খলিফা হন।

মামুনের জয়লাভের প্রধান কারণসমূহ

  • ১. মামুনের ব্যক্তিগত প্রজ্ঞা ও প্রশাসনিক দক্ষতা: মামুন ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণ, ধৈর্যশীল ও দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক। অন্যদিকে আমিন ছিলেন অপরিণামদর্শী, বিলাসী ও দুর্বলচিত্তের শাসক।
  • ২. তাহির বিন হুসাইনের সামরিক প্রতিভা: মামুনের প্রধান সেনাপতি তাহির ছিলেন অসাধারণ রণকৌশলী। তাঁর সুসংহত সামরিক নেতৃত্বের সামনে আমিনের বিশৃঙ্খল বাহিনী টিকতে পারেনি।
  • ৩. পারসিক জাতীয়তাবাদী সমর্থন: খোরাসান ও পারস্যের সুসংহত জনগণ মামুনকে নিজেদের রক্ত মনে করত এবং সর্বশক্তি দিয়ে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিল। বিপরীতে আরবরা ছিল দ্বিধাবিভক্ত।
  • ৪. আমিনের অযোগ্য নেতৃত্ব ও সামরিক বিশৃঙ্খলা: আমিন সামরিক অভিযানের চেয়ে রাজপ্রাসাদের বিনোদনেই বেশি মগ্ন থাকতেন। যুদ্ধ চলাকালীনও তিনি নৌকাবিহার ও মাছ ধরায় মেতে ছিলেন, যা সৈন্যদের মনোবল ভেঙে দেয়।

উপসংহার

আমিন ও মামুনের গৃহযুদ্ধ ছিল আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের আরব আধিপত্যের ওপর পারসিক প্রভাবের চূড়ান্ত বিজয়। মামুনের বিজয়ের মধ্য দিয়ে আব্বাসীয় খেলাফতে বিজ্ঞান, দর্শন ও মুক্তচিন্তার এক অনন্য স্বর্ণযুগের সূচনা হয়।


৩। আবু মুসলিম খোরাসানীর পরিচয় দাও। আব্বাসীয় খিলাফত প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান মূল্যায়ন কর।

[Introduce Abu Muslim Khurasani. Evaluate his contributions for establishing the Abbasid Khilafat.]

ভূমিকা

উমাইয়া খিলাফতের ধ্বংসস্তূপের ওপর আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের সৌধ নির্মাণে যে মানুষটির অবদান সবচেয়ে বেশি, তিনি হলেন কিংবদন্তি সেনাপতি ও রাজনৈতিক সংগঠক আবু মুসলিম খোরাসানী। তাঁর আসল নাম আবদুর রহমান বিন উসমান। সাধারণ দাস জীবন থেকে উঠে এসে তিনি নিজ অসাধারণ প্রতিভা ও দূরদর্শিতার বলে ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিয়েছিলেন।

আবু মুসলিমের পরিচয় ও কর্মজীবন

আবু মুসলিম আনুমানিক ৭০০ খ্রিষ্টাব্দে ইস্পাহান বা কুফায় জন্মগ্রহণ করেন। ৭৪১ খ্রিষ্টাব্দে আব্বাসীয় ইমাম ইব্রাহিমের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ ঘটে। ইব্রাহিম তাঁর প্রখর মেধা, নেতৃত্বগুণ ও সাংগঠনিক ক্ষমতা দেখে মুগ্ধ হন এবং তাঁকে আব্বাসীয় আন্দোলনের প্রধান সংগঠক (দায়ী আদ-দুয়াত) হিসেবে খোরাসানে প্রেরণ করেন।

আব্বাসীয় খিলাফত প্রতিষ্ঠায় তাঁর ঐতিহাসিক অবদান

  • ১. জনমত গঠন ও কালো পতাকার উন্মোচন (৭৪৭ খ্রি.): ৭৪৭ খ্রিষ্টাব্দের রমজান মাসে তিনি খোরাসানের মার্ভ অঞ্চলে প্রকাশ্যে আব্বাসীয়দের কালো পতাকা (রায়াতুস সাওদা) উত্তোলন করেন। তিনি কায়সী ও কালবী গোত্রীয় দ্বন্দ্ব এবং মাওয়ালীদের ওপর উমাইয়াদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে সফলভাবে জনমত গড়ে তোলেন।
  • ২. মার্ভ ও খোরাসান বিজয়: উমাইয়া গভর্নর নসর বিন সাইয়ারকে পরাজিত করে তিনি মার্ভ অধিকার করেন এবং অল্প সময়ের ব্যবধানে সমগ্র খোরাসান ও পারস্যে আব্বাসীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন।
  • ৩. কুফা ও ইরাক বিজয়: তাঁর সেনাপতি কাহতাবার নেতৃত্বে আব্বাসীয় বাহিনী ইরাক আক্রমণ করে এবং কুফা দখল করে। সেখানে ৭৪৯ খ্রিষ্টাব্দে আবুল আব্বাস আস-সাফফাহকে প্রথম আব্বাসীয় খলিফা ঘোষণা করা হয়।
  • ৪. জাবের নির্ণায়ক যুদ্ধ (৭৫০ খ্রি.): টাইগ্রিস নদীর তীরে গ্রেট যাব-এর যুদ্ধে উমাইয়া খলিফা মারওয়ান-২-এর ১ লাখ সুসজ্জিত বাহিনীকে আবু মুসলিমের অনুগত বাহিনী সম্পূর্ণ পরাস্ত করে। দামেস্কের পতন ঘটে এবং উমাইয়া শাসনের চির অবসান হয়।
  • ৫. নতুন সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা রক্ষা: খলিফা আস-সাফফাহর মৃত্যুর পর যখন আব্দুল্লাহ বিন আলী বিদ্রোহ করেন, তখন আবু জাফর আল-মানসুরের অনুরোধে আবু মুসলিম নিসিবিনের যুদ্ধে আব্দুল্লাহকে পরাজিত করে খেলাফত রক্ষা করেন।

আবু মুসলিমের ট্র্যাজিক পরিণতি ও মূল্যায়ন

আবু মুসলিমের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা খলিফা আল-মানসুরের কাছে আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তিনি বুঝতে পারেন, সাম্রাজ্যে কার্যত দুটি ক্ষমতার কেন্দ্র তৈরি হয়েছে। অবশেষে ৭৫৫ খ্রিষ্টাব্দে আল-মানসুর কূটনৈতিক চালে তাঁকে রাজদরবারে নিমন্ত্রণ জানিয়ে নিরস্ত্র অবস্থায় নির্মমভাবে হত্যা করেন। ঐতিহাসিকদের মতে, আবু মুসলিম ছিলেন “কিং মেকার” বা সাম্রাজ্য নির্মাতা; তিনি না থাকলে আব্বাসীয় খিলাফতের অস্তিত্বই সম্ভব হতো না।


৪। আব্বাসীয়দের পররাষ্ট্রনীতি আলোচনা কর।

[Discuss the foreign policies of the Abbasid.]

ভূমিকা

উমাইয়াদের আক্রমণাত্মক ও দিগ্বিজয়ী পররাষ্ট্রনীতির বিপরীতে আব্বাসীয়দের পররাষ্ট্রনীতি ছিল মূলত প্রতিরক্ষামূলক, কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়ন, সীমান্ত সুসংহতকরণ এবং অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানভিত্তিক। উমাইয়া যুগে ভূখণ্ড সম্প্রসারণই ছিল প্রধান লক্ষ্য, কিন্তু আব্বাসীয়রা সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও বিশ্ব পরাশক্তিগুলোর সাথে ভারসাম্যপূর্ণ মৈত্রীর ওপর জোর দেয়।

আব্বাসীয় পররাষ্ট্রনীতির প্রধান দিকসমূহ

  • ১. বাইজেন্টাইন (রোমান) সাম্রাজ্যের সাথে সম্পর্ক:
    • এশিয়া মাইনর সীমান্তে বাইজেন্টাইনদের সাথে আব্বাসীয়দের প্রায়ই সংঘর্ষ হতো। খলিফা আল-মাহদী এবং হারুন-অর-রশীদের আমলে মুসলিম বাহিনী কনস্টান্টিনোপলের দ্বারপ্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
    • সম্রাজ্ঞী আইরিন (Empress Irene) মুসলিমদের বশ্যতা স্বীকার করে বার্ষিক কর প্রদানে বাধ্য হন। কিন্তু সম্রাট নাইসিফোরাস কর বন্ধ করলে হারুন তাঁকে কঠোর ভাষায় ঐতিহাসিক চিঠি লিখে আক্রমণ করেন এবং অপমানজনক শর্তে পুনরায় কর আদায় করেন। সীমান্ত সুরক্ষায় হারুন ‘আল-আওয়াসিম’ নামে সামরিক দুর্গ বেষ্টনী গড়ে তোলেন।
  • ২. ফ্রাঙ্কিশ সাম্রাজ্যের (শার্লামেন) সাথে মিত্রতা: হারুন-অর-রশীদ ইউরোপের পরাশক্তি পবিত্র রোমান সম্রাট শার্লামেনের (Charlemagne) সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক দূত ও রাজকীয় উপহার বিনিময় করেন। স্পেনের উমাইয়া আমিরাত এবং কনস্টান্টিনোপলের বাইজেন্টাইনদের অভিন্ন শত্রু বিবেচনা করে এই পারস্পরিক মৈত্রী গড়ে উঠেছিল। হারুন শার্লামেনকে জেরুজালেমের খ্রিস্টান তীর্থযাত্রীদের অধিকারের নিশ্চয়তা দেন এবং একটি আশ্চর্য জলঘড়ি উপহার পাঠান।
  • ৩. চীনের তাং সাম্রাজ্যের সাথে সম্পর্ক ও তালাসের যুদ্ধ (৭৫১ খ্রি.): মধ্য এশিয়ায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ৭৫১ খ্রিষ্টাব্দে কিরঘিজস্তানের তালাসের যুদ্ধে আব্বাসীয় বাহিনী চীনা বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে। এই বিজয়ের মাধ্যমে মধ্য এশিয়ায় ইসলাম স্থায়ী হয় এবং মুসলিমরা চীনাদের কাছ থেকে কাগজ তৈরির প্রযুক্তি লাভ করে। পরবর্তীতে চীনের সাথে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক অত্যন্ত সুদৃঢ় হয়।
  • ৪. স্পেনের উমাইয়া আমিরাতের প্রতি নীতি: স্পেনে প্রথম আবদুর রহমান কর্তৃক স্বাধীন উমাইয়া আমিরাত প্রতিষ্ঠিত হলে আব্বাসীয়রা তা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। পরবর্তীকালে স্পেনের উমাইয়াদের চাপে রাখতে আব্বাসীয়রা কূটনৈতিকভাবে ইউরোপীয় শক্তিগুলোর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করত।
  • ৫. ভারত ও পূর্ব প্রাচ্যের সাথে সামুদ্রিক বাণিজ্য: ভারতের সিন্ধু অঞ্চল শান্ত রাখা এবং ভারত মহাসাগর, সিংহল, মালয় ও চীন পর্যন্ত মুসলিম বণিকদের নিরাপদ নৌ-বাণিজ্যের জন্য আব্বাসীয় নৌবহর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

উপসংহার

আব্বাসীয়দের পররাষ্ট্রনীতি ছিল অত্যন্ত আধুনিক, বহুমাত্রিক ও বাস্তববাদী। সামরিক শক্তির চেয়ে কূটনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ে জোর দেওয়ার কারণে আব্বাসীয় যুগ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এক মর্যাদাশীল অবস্থান লাভ করেছিল।


৫। বার্মাকী পরিবারের পরিচয় দাও। তাদের উত্থান-পতনের ইতিহাস বিবৃত কর।

[Introduce the Barmakid family. Narrate their history of rise and fall.]

ভূমিকা

আব্বাসীয় খিলাফতের স্বর্ণযুগে প্রায় অর্ধ শতাব্দীকাল (৭৫৪—৮০৩ খ্রি.) ধরে শাসনকার্য পরিচালনা ও রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় যে অনারব পারসিক পরিবারটি কিংবদন্তির মর্যাদা লাভ করেছিল, তারা হলো ‘বার্মাকী পরিবার’ (Barmakids)। খলিফা হারুন-অর-রশীদের শাসনামলে তাদের ক্ষমতা, প্রতিপত্তি ও উদারতার খ্যাতি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল।

বার্মাকী পরিবারের পরিচয়

বার্মাকী পরিবারের মূল প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন খালিদ বিন বার্মাক। তারা ছিলেন উত্তর আফগানিস্তানের বলখ শহরের বিখ্যাত বৌদ্ধ বা নওবাহার অগ্নিমন্দিরের প্রধান পুরোহিত পরিবারের বংশধর। ইসলাম গ্রহণের পর খালিদ আব্বাসীয় আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং খলিফা আস-সাফফাহ ও আল-মানসুরের অধীনে উজিরের পদ লাভ করেন।

বার্মাকীদের উত্থান ও সোনালী সময়

  • ইয়াহিয়া বিন খালিদের দূরদর্শিতা: খালিদের পুত্র ইয়াহিয়া ছিলেন খলিফা হারুন-অর-রশীদের বাল্যশিক্ষক ও অভিভাবক। খলিফা আল-হাদী যখন হারুনকে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করতে চেয়েছিলেন, ইয়াহিয়া নিজের জীবন বাজি রেখে হারুনের অধিকার রক্ষা করেন।
  • হারুনের রাজত্বকালে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা: ৭৮৬ খ্রিষ্টাব্দে হারুন খলিফা হয়ে ইয়াহিয়াকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করে বলেন, “বাবা, আমি খেলাফতের গুরুদায়িত্ব আপনার কাঁধেই ন্যস্ত করলাম।” ইয়াহিয়ার দুই সুযোগ্য পুত্র—ফজল ও জাফর সাম্রাজ্যের সমস্ত ক্ষমতা নিজেদের হাতে কেন্দ্রীভূত করেন।
  • জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা: বার্মাকীরা ছিলেন প্রবাদতুল্য দানশীল ও বিদ্যোৎসাহী। তারা ভারত ও গ্রিস থেকে পণ্ডিতদের বাগদাদে এনে চিকিৎসা ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের গ্রন্থ অনুবাদ করান। বাগদাদে প্রথম কাগজ কারখানা নির্মাণেও তাঁদের অবদান ছিল।

বার্মাকীদের আকস্মিক পতন (৮০৩ খ্রি.)

৮০৩ খ্রিষ্টাব্দে খলিফা হারুন-অর-রশীদ হঠাৎ এক রাতের মধ্যে বার্মাকীদের ওপর চরম দমনপীড়ন চালান। জাফরকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, ইয়াহিয়া ও ফজলকে কারারুদ্ধ করা হয় এবং তাদের সমস্ত রাজকীয় সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়। এই আকস্মিক পতনের কারণসমূহ:

  • ১. রাজকীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি: বার্মাকীদের হাতে সামরিক, প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতা এতটাই পুঞ্জীভূত হয়েছিল যে খলিফা হারুন নিজেই কার্যত পুতুলে পরিণত হচ্ছিলেন। বার্মাকীদের অনুমতি ছাড়া রাজকোষ থেকে একটি দিনারও ব্যয়ের উপায় ছিল না।
  • ২. জনসাধারণের কাছে মাত্রাতিরিক্ত জনপ্রিয়তা: তাঁদের অঢেল সম্পদ ও রাজকীয় জাঁকজমক খলিফার মর্যাদাকে ম্লান করে দিচ্ছিল।
  • ৩. রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ষড়যন্ত্র: আরব অভিজাতরা অনারব বার্মাকীদের উত্থান সহ্য করতে পারছিল না। খলিফার দরবারের ঈর্ষান্বিত ব্যক্তিরা গুজব ছড়ায় যে বার্মাকীরা গোপনে শিয়া মতবাদ পোষণ করে এবং সিংহাসন দখলের ষড়যন্ত্র করছে।
  • ৪. আব্বাসা-জাফর রোমান্টিক রূপকথা: অনেক ইতিহাসবিদ হারুনের ভগিনী আব্বাসা ও জাফরের গোপন বিবাহের গল্পকে কারণ হিসেবে দেখালেও আধুনিক গবেষকদের মতে এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন গল্প; পতনের মূল কারণ ছিল রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব।

উপসংহার

বার্মাকীদের পতন ছিল আব্বাসীয় আমলের এক হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডি। তাঁদের অপসারণের ফলে হারুনের দরবার তার সেরা মেধা ও দক্ষ প্রশাসকদের হারায়, যা পরবর্তী সময়ে খিলাফতের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছিল।


৬। আব্বাসীয় আমলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজবংশের উত্থানের পটভূমি আলোচনা কর।

[Discuss the background of the rising of minor dynasties during the Abbasid period.]

ভূমিকা

নবম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে আব্বাসীয় কেন্দ্রীয় শাসন দুর্বল হয়ে পড়তে শুরু করলে সাম্রাজ্যের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে বহু আধা-স্বাধীন ও স্বাধীন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজবংশের (Minor Dynasties) জন্ম হয়। এর ফলে বাগদাদের খলিফা কেবল নামে সমগ্র মুসলিম বিশ্বের আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে রয়ে যান, কিন্তু বাস্তব রাজনৈতিক ক্ষমতা স্থানীয় আমির ও সুলতানদের হাতে চলে যায়।

ক্ষুদ্র রাজবংশসমূহের উত্থানের পটভূমি ও প্রধান কারণসমূহ

  • ১. বিশাল সাম্রাজ্য ও কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা: স্পেন থেকে সিন্ধু পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল আব্বাসীয় সাম্রাজ্যে প্রাচীন যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে বাগদাদ থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে দ্রুত সৈন্য পাঠানো বা নিয়ন্ত্রণ রাখা প্রায় অসম্ভব ছিল। ফলে দূরবর্তী প্রদেশের গভর্নররা ধীরে ধীরে স্বায়ত্তশাসন দাবি করতে থাকে।
  • ২. খলিফাদের দুর্বলতা ও তুর্কি দেহরক্ষীদের আধিপত্য: খলিফা মুতাসিমের পর থেকে দুর্বল খলিফারা সিংহাসনে বসেন। মুতাসিম তুর্কি দাসদের নিয়ে যে ব্যক্তিগত বাহিনী গঠন করেছিলেন, তারা এতটাই শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে খলিফাদের তারা নিজেদের ইচ্ছামতো সিংহাসনে বসাত এবং হত্যা করত। কেন্দ্রীয় সরকারের এই দুর্বলতার সুযোগে আঞ্চলিক রাজবংশগুলো মাথাচাড়া দেয়।
  • ৩. স্বজনপ্রীতি ও বংশানুক্রমিক গভর্নর পদ: খলিফারা বাধ্য হয়ে সামরিক নেতাদের সন্তুষ্ট রাখতে নির্দিষ্ট প্রদেশের শাসনভার তাদের বংশধরদের হাতে চিরস্থায়ীভাবে ছেড়ে দিতে থাকেন। যেমন খোরাসানে তাহিরীয় বংশ এবং মিশরে তুলুনীয় বংশ এভাবেই বিকাশ লাভ করে।
  • ৪. জাতীয়তাবাদী ও ধর্মীয় পুনর্জাগরণ: পারস্যের প্রাচীন অনারব জাতীয়তাবাদী চেতনা শুয়ুবিয়া আন্দোলনের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত হয়। শিয়া, ইসমাইলি ও জাইদি মতবাদের অনুসারীরা আব্বাসীয় সুন্নি খিলাফতের কর্তৃত্ব অস্বীকার করে নিজস্ব রাজবংশ কায়েম করে (যেমন উত্তর আফ্রিকায় আগলাবীয় ও ফাতেমীয়, পারস্যে বুয়াইয়াহ ও সামানীয় বংশ)।

প্রধান প্রধান আঞ্চলিক রাজবংশ

  • তাহিরীয় ও সাফ্ফারীয় বংশ: পারস্য ও খোরাসানে প্রতিষ্ঠিত হয়।
  • সামানীয় বংশ: মধ্য এশিয়া ও ট্রান্সঅক্সিয়ানায় ফারসি সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ ঘটায়।
  • তুলুনীয় ও ইখশিদীয় বংশ: মিশরে স্বাধীন শাসন প্রতিষ্ঠা করে।
  • বুয়াইয়াহ বংশ: শিয়া মতাবলম্বী বুয়াইয়ারা বাগদাদ দখল করে খলিফাকে সম্পূর্ণ পুতুলে পরিণত করে (৯৪৫—১০৫৫ খ্রি.)।
  • সেলজুক সাম্রাজ্য: মধ্য এশিয়া থেকে এসে বুয়াইয়াদের বিতাড়িত করে এবং সুন্নি খিলাফতের রাজনৈতিক অভিভাবকত্ব গ্রহণ করে।

উপসংহার

আঞ্চলিক ক্ষুদ্র রাজবংশগুলোর উত্থান রাজনৈতিকভাবে সাম্রাজ্যকে খণ্ডবিখণ্ড করলেও সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে তা এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। কায়রো, বুখারা, নিশাপুর ও কর্ডোভার মতো আঞ্চলিক রাজধানীগুলো বাগদাদের সাথে পাল্লা দিয়ে শিল্প-সংস্কৃতির কেন্দ্রস্থলে রূপ নিয়েছিল।


৭। সেলজুক কারা? শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে তাদের অবদান মূল্যায়ন কর।

[Who are the Seljuks? Evaluate their contributions at education and culture.]

ভূমিকা

একাদশ শতাব্দীতে মধ্য এশিয়ার স্তেপ অঞ্চল থেকে আগত দুর্ধর্ষ যাযাবর তুর্কি জাতি ইসলাম গ্রহণ করে যে অপরাজেয় সাম্রাজ্য গড়ে তোলে, তা ইতিহাসে ‘সেলজুক সাম্রাজ্য’ (Seljuk Empire) নামে খ্যাত। সেলজুক তুঘরিক বেগ ১০৫৫ খ্রিষ্টাব্দে বাগদাদ থেকে শিয়া বুয়াইয়াদের উচ্ছেদ করে আব্বাসীয় খলিফাকে মুক্ত করেন এবং খলিফা তাঁকে ‘সুলতান’ (পূর্ব ও পশ্চিমের শাসক) উপাধিতে ভূষিত করেন। এর ফলে মুসলিম বিশ্বে সুন্নি মতবাদের এক নবজাগরণ ঘটে।

সেলজুকদের পরিচয়

সেলজুকদের আদি নেতা সেলজুক বিন দুকাকের নামানুসারে এই রাজবংশের নামকরণ হয়। তুঘরিল বেগ, আল্প আরসালান এবং মালিক শাহের মতো যোগ্য সুলতানদের হাত ধরে সেলজুক সাম্রাজ্য মধ্য এশিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। ১০৭১ খ্রিষ্টাব্দে ঐতিহাসিক মানজিকার্টের যুদ্ধে আল্প আরসালান বাইজেন্টাইন বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাস্ত করে রোমান সম্রাট রোমানাস ডিওজেনিসকে বন্দি করেন এবং আনাতোলিয়ায় (বর্তমান তুরস্ক) তুর্কি ও মুসলিম বসতির পথ খুলে দেন।

শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে সেলজুকদের ঐতিহাসিক অবদান

  • ১. নেজামিয়া মাদ্রাসা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা: সুলতান আল্প আরসালান ও মালিক শাহের বিচক্ষণ উজির নিজামুল মূলক তুসী মুসলিম বিশ্বে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষা কাঠামো হিসেবে ‘মাদ্রাসা নেজামিয়া’ প্রতিষ্ঠা করেন। বাগদাদ, নিশাপুর, ইস্পাহান ও বলখসহ প্রধান প্রধান শহরে নেজামিয়া মাদ্রাসা স্থাপিত হয়। এখানে বিশ্বখ্যাত পণ্ডিত ইমাম গাজ্জালী (রহ.) প্রধান অধ্যাপকের দায়িত্ব পালন করেন। এটি পরবর্তীকালে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপরেখা প্রণয়নে ভূমিকা রাখে।
  • ২. ইমাম গাজ্জালীর মাধ্যমে বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লব: সেলজুক পৃষ্ঠপোষকতায় হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজ্জালী (রহ.) তাঁর অমর গ্রন্থ ‘এহয়াউ উলুমিদ্দীন’ এবং ‘তাহাফুতুল ফালাসিফা’ রচনা করে গ্রিক দর্শনের বিভ্রান্তি খণ্ডন করেন এবং ইসলামি দর্শনে সুফিবাদ ও শরিয়তের চমৎকার সমন্বয় সাধন করেন।
  • ৩. বিজ্ঞান, গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের উন্নয়ন: সুলতান মালিক শাহের পৃষ্ঠপোষকতায় বিশ্বখ্যাত কবি ও গণিতবিদ ওমর খৈয়াম একদল জ্যোতির্বিজ্ঞানীর সাথে মিলে গবেষণা পরিচালনা করেন এবং অত্যন্ত নিখুঁত সৌর বর্ষপঞ্জি ‘জালালি ক্যালেন্ডার’ (Tarikh-i Jalali) প্রণয়ন করেন। ইস্পাহানে আধুনিক মানমন্দির স্থাপিত হয়।
  • ৪. স্থাপত্যকলার বিস্ময়: সেলজুকরা ইসলামি স্থাপত্যে ‘চার-আইওয়ান’ (Four-Iwan) বিশিষ্ট মসজিদ, চোখধাঁধানো কারুকার্যময় গম্বুজ, সুউচ্চ মিনার এবং নীল টাইলসের ব্যবহার প্রবর্তন করে। ইস্পাহানের জামে মসজিদ সেলজুক স্থাপত্যের এক অতুলনীয় নিদর্শন।
  • ৫. সুফিবাদ ও সাহিত্যের বিস্তার: সেলজুক আমলে ফারসি সাহিত্যের স্বর্ণযুগ শুরু হয়। ফরিদউদ্দিন আত্তার, সাদী শিরাজি এবং পরবর্তীকালে জালালুদ্দীন রুমীর সুফি সাহিত্যের বিকাশ সেলজুক ভাবধারারই ধারাবাহিকতা।

উপসংহার

সেলজুকরা কেবল দুর্ধর্ষ সামরিক বিজেতা ছিলেন না, বরং তারা ছিলেন সভ্যতা ও সংস্কৃতির মহান রূপকার। খ্রিষ্টান ক্রুসেডারদের প্রাথমিক আক্রমণ প্রতিহত করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষার সূচনা করে তারা মুসলিম সভ্যতাকে নতুন জীবনীশক্তি দান করেছিলেন।


খ বিভাগ (সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন)

৮। টীকা লেখ (যে কোনো দুটি):

(ক) রক্ত পিপাসু [The Bloodthirster]

আব্বাসীয় খিলাফতের প্রথম খলিফা আবুল আব্বাস (শাসনকাল: ৭৫০—৭৫৪ খ্রি.) নিজেকে ‘আস-সাফফাহ’ (As-Saffah) নামে ঘোষণা করেন, যার অর্থ ‘রক্তপিপাসু’ বা ‘রক্তপাতকারী’। উমাইয়াদের বিরুদ্ধে চরম প্রতিশোধপরায়ণতার কারণে তিনি এই উপাধি গ্রহণ করেন। জাবের যুদ্ধে বিজয়ের পর তিনি উমাইয়া রাজপরিবারের সদস্যদের নির্মমভাবে খুঁজে বের করে হত্যা করেন। এমনকি পূর্বে সমাহিত উমাইয়া খলিফাদের কবর খুঁড়ে কঙ্কাল পর্যন্ত জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। নাহার আবি ফুতরুসে প্রায় ৮০ জন উমাইয়া অভিজাতকে শান্তির মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে ভোজসভায় নিমন্ত্রণ করে তাঁদের নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয় এবং তাঁদের মরদেহের ওপর চাদর বিছিয়ে আস-সাফফাহ খাবার খান। তাঁর এই নির্দয় ভূমিকার কারণেই ইতিহাসে তিনি ‘রক্তপিপাসু’ নামে স্মরণীয় হয়ে আছেন।

(খ) জাবের যুদ্ধ [The Battle of Zab]

১৩২ হিজরি / ২৫ জানুয়ারি ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে উত্তর ইরাকের টাইগ্রিস নদীর উপনদী গ্রেট যাব-এর তীরে ঐতিহাসিক জাবের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এটি ছিল উমাইয়া এবং আব্বাসীয়দের মধ্যকার সবচেয়ে নির্ণায়ক যুদ্ধ। আব্বাসীয় সেনাপতি আব্দুল্লাহ বিন আলীর সুশৃঙ্খল বাহিনীর মুখোমুখি হন শেষ উমাইয়া খলিফা মারওয়ান-২। খলিফার সুবিশাল সেনাবহর থাকা সত্ত্বেও অভ্যন্তরীণ অনৈক্য ও সৈন্যদলের দলত্যাগের কারণে উমাইয়ারা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। খলিফা মারওয়ান পালিয়ে মিশরে আশ্রয় নেন এবং সেখানেই নিহত হন। এই যুদ্ধের মাধ্যমেই দামেস্কের ৯০ বছরের উমাইয়া শাসনের অবসান ঘটে এবং দীর্ঘ পাঁচশত বছরের আব্বাসীয় খিলাফতের শুভসূচনা হয়।

(গ) নিজামুল মূলক তুসী [Nizam-ul-Mulk Tusi]

আবু আলী হাসান বিন আলী তুসী, যিনি ইতিহাসে ‘নিজামুল মূলক’ (রাষ্ট্রের শৃঙ্খলাবিধায়ক) উপাধিতে খ্যাত (১০১৮—১০৯২ খ্রি.), ছিলেন সেলজুক সাম্রাজ্যের সর্বশ্রেষ্ঠ উজির ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তিনি প্রায় ৩০ বছর সুলতান আল্প আরসালান ও মালিক শাহের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান হলো বিশ্বখ্যাত ‘মাদ্রাসা নেজামিয়া’ প্রতিষ্ঠা এবং তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘সিয়ারুল মুলুক’ বা ‘সিয়াসতনামা’ (Book of Government) রচনা, যা মুসলিম রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এক অমূল্য দলিল। ১০৯২ খ্রিষ্টাব্দে হাসান বিন সাবাহর উগ্র হাশাশিং (Assassin) গুপ্তঘাতকের হাতে এই মহান রাষ্ট্রনায়ক শাহাদাতবরণ করেন।

(ঘ) বাদশাহ হারুন-অর-রশীদ [King Harun-ur-Rashid]

পঞ্চম আব্বাসীয় খলিফা হারুন-অর-রশীদ (শাসনকাল: ৭৮৬—৮০৯ খ্রি.) ছিলেন আব্বাসীয় ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর শাসনামল ছিল ইসলামি সভ্যতার পরম স্বর্ণযুগ। তিনি ছিলেন ন্যায়পরায়ণ শাসক, যিনি রাতে ছদ্মবেশে প্রজাদের অবস্থা দেখতে বের হতেন। তাঁর আমলে বাগদাদ ছিল বিশ্বের ধনসম্পদ, সংস্কৃতি ও জ্ঞানের রাজধানী। তিনি বিখ্যাত ‘বায়তুল হিকমাহ’ (House of Wisdom) প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক রূপরেখা দেন। রোমান সম্রাট নাইসিফোরাসকে পরাজিত করা এবং ফরাসি সম্রাট শার্লামেনের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন তাঁর আন্তর্জাতিক মর্যাদার প্রমাণ দেয়। বিশ্ববিখ্যাত রূপকথা ‘আলিফ লায়লা ওয়া লায়লা’ (এক হাজার এক রাত)-এর গল্পগুলোতে হারুন-অর-রশীদের ন্যায়বিচার ও জাঁকজমকের স্মৃতি অমর হয়ে রয়েছে।


সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. ‘মুসলমানদের ইতিহাস (৭৫০—১২৫৮)’ কোর্সের মূল আলোচ্য বিষয় কী?

এ কোর্সে উমাইয়া খিলাফতের পতনের পর আব্বাসীয় খিলাফতের প্রতিষ্ঠা, সোনালী যুগের খলিফাগণ (আল-মানসুর, হারুন-অর-রশীদ, আল-মামুন), পারসিক বার্মাকী পরিবারের ভূমিকা, আঞ্চলিক স্বাধীন রাজবংশসমূহ (যেমন: সেলজুক, বুয়াইয়াহ, ফাতেমীয়) এবং ১২৫৮ সালে হালাকু খান কর্তৃক বাগদাদ ধ্বংসের ঘটনা বিস্তারিতভাবে পড়ানো হয়।

২. কেন আবু জাফর আল-মানসুরকে আব্বাসীয়দের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়?

প্রথম খলিফা আস-সাফফাহ কেবল ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিলেন, কিন্তু মানসুর আবু মুসলিম খোরাসানী ও আলীয়দের বিদ্রোহ কঠোরভাবে দমন করেন, আধুনিক প্রশাসন ও ডাক ব্যবস্থা গড়ে তোলেন এবং কালজয়ী রাজধানী বাগদাদ প্রতিষ্ঠা করে সাম্রাজ্যকে স্থায়িত্ব দেন।

৩. আমিন ও মামুনের গৃহযুদ্ধ পরীক্ষার জন্য কেন এত তাৎপর্যপূর্ণ?

এই যুদ্ধটি নিছক দুই ভাইয়ের দ্বন্দ্ব ছিল না, এটি ছিল আরব বনাম অনারব পারসিক জাতীয়তাবাদের গভীর রাজনৈতিক সংঘাত। মামুনের বিজয়ের ফলেই আব্বাসীয় প্রশাসনে পারসিক সংস্কৃতির প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয় এবং জ্ঞানচর্চার স্বর্ণযুগ আসে।

৪. সেলজুকদের শিক্ষা ক্ষেত্রে অবদানের প্রধান দিক কোনটি?

সেলজুক উজির নিজামুল মূলক তুসী প্রতিষ্ঠিত ‘মাদ্রাসা নেজামিয়া’ ছিল মুসলিম বিশ্বের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষা কাঠামো। এতে সরকারি স্কলারশিপ ও আবাসনের ব্যবস্থা ছিল এবং ইমাম গাজ্জালী (রহ.)-এর মতো পণ্ডিতরা সেখানে শিক্ষকতা করতেন।

৫. বার্মাকী পরিবারের পতন সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মূল অভিমত কী?

বার্মাকীদের পতন কোনো ব্যক্তিগত প্রেমের কারণে ঘটেনি; বরং তাঁদের হাতে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতার মাত্রাতিরিক্ত পুঞ্জীভবন এবং খলিফা হারুন-অর-রশীদের সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কাই ছিল তাঁদের আকস্মিক ধ্বংসের মূল রাজনৈতিক কারণ।

৬. ২০৫১০২ বিষয়ের পরীক্ষায় সংক্ষিপ্ত টীকা লেখার সঠিক নিয়ম কী?

সংক্ষিপ্ত টীকায় অযথা অপ্রাসঙ্গিক ভূমিকা পরিহার করে সরাসরি ব্যক্তিত্ব বা ঘটনার সুনির্দিষ্ট সময়কাল, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, মূল কর্মকাণ্ড এবং ইতিহাসে এর প্রভাব ৩-৪টি সুস্পষ্ট পয়েন্টে সংক্ষেপে গুছিয়ে লিখতে হবে।