পরীক্ষা কোড: ২০১ | প্রশ্নপত্র কোড: ০২৯
ফাজিল (স্নাতক) সম্মান প্রথম বর্ষ পরীক্ষা, ২০২১
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
মুসলমানদের ইতিহাস (৫৭০—৭৫০) মহানবি (স.), খোলাফায়ে রাশেদুন এবং উমাইয়া
বিষয় কোড: ২০৫১০১
সময়—৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান—৮০
[দ্রষ্টব্য: ক বিভাগ থেকে ৪টি এবং খ বিভাগ থেকে ২টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।]
ক বিভাগ (রচনামূলক প্রশ্ন)
১। ইসলাম-পূর্ব আরবের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অবস্থা পর্যালোচনা কর।
[Review the political and religious conditions of Pre-Islamic Arabia.]
ভূমিকা
ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে আরবের সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অবক্ষয়ের যুগকে ইতিহাসে ‘আইয়ামে জাহেলিয়াত’ বা অজ্ঞতা ও অন্ধকারের যুগ হিসেবে অভিহিত করা হয়। মহানবি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুওয়ত লাভের পূর্বে (৫৭০ খ্রিষ্টাব্দের পূর্ববর্তী সময়কালে) সমগ্র আরব উপদ্বীপে কোনো সুসংহত কেন্দ্রীয় শাসনকাঠামো বা একক ধর্মীয় দর্শন ছিল না। চারদিকে গোত্রীয় সংঘাত, রাজনৈতিক নৈরাজ্য এবং বহুঈশ্বরবাদী কুসংস্কারের জয়জয়কার ছিল।
রাজনৈতিক অবস্থা
- কেন্দ্রীয় শাসনের অনুপস্থিতি ও গোত্রপ্রথা: ইসলাম-পূর্ব আরবে কোনো সর্বজনীন আইন বা কেন্দ্রীয় সরকারব্যবস্থা ছিল না। বেদুইন আরবরা গোত্রভিত্তিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিল। প্রতিটি গোত্র একজন বয়োজ্যেষ্ঠ অভিজ্ঞ ব্যক্তির নেতৃত্বে পরিচালিত হতো, যাঁকে ‘শায়খ’ (Sheikh) বলা হতো। গোত্রের সিদ্ধান্তই ছিল চূড়ান্ত।
- আসাবিয়্যাহ বা উগ্র গোত্রপ্রীতি: ইসলাম-পূর্ব যুগে আরবদের মূল চালিকাশক্তি ছিল ‘আসাবিয়্যাহ’ (গোত্রীয় পক্ষপাতিত্ব)। নিজের গোত্রের লোক অন্যায় করলেও তার পক্ষ নেওয়াকে পবিত্র দায়িত্ব মনে করা হতো। ফলে তুচ্ছ কারণে এক গোত্রের সাথে অন্য গোত্রের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বেধে যেত।
- ঐতিহাসিক যুদ্ধবিগ্রহ (আইয়ামুল আরব): সামান্য ঘোড়দৌড় বা উটের পানি পান করানোকে কেন্দ্র করে বছরের পর বছর যুদ্ধ চলত। বনু বকর ও বনু তাগলিবের মধ্যকার ‘বাসুস যুদ্ধ’ প্রায় ৪০ বছর স্থায়ী হয়েছিল। একইভাবে ‘দাহিস ও গাবরা’ এবং পবিত্র হারাম মাসে সংঘটিত ‘হরবুল ফিজার’ আরবদের প্রাণশক্তি নিঃশেষ করে ফেলেছিল।
- বিদেশি শক্তির রাজনৈতিক প্রভাব: উত্তর আরবে রোমান (বাইজেন্টাইন) সাম্রাজ্যের তাঁবেদার গাসসানীয় রাজ্য এবং পারস্যের (সাসানীয়) তাঁবেদার হিরা বা লাখমীয় রাজ্য প্রতিষ্ঠিত ছিল। দক্ষিণে ইয়েমেনে আবিসিনিয়া ও পারস্যের আধিপত্য ছিল। ফলে আরবরা রাজনৈতিকভাবে দ্বিধাবিভক্ত ও পরাশক্তির ক্রীড়নক ছিল।
ধর্মীয় অবস্থা
- পৌত্তলিকতা ও প্রতিমাপূজা: ইসলাম-পূর্ব আরবের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ছিল চরম পৌত্তলিক। তারা এক আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস করলেও মূর্তিগুলোকে আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম মনে করত। পবিত্র কাবা ঘরে ৩৬০টি প্রতিমা স্থাপন করা হয়েছিল, যার মধ্যে প্রধান ছিল হুবাল, লাত, মানাত ও উজ্জা।
- অন্ধবিশ্বাস ও ভাগ্যগণনা: আরবরা শুভাশুভ নির্ণয়ে তীরের সাহায্যে ভাগ্য নির্ধারণ (ইস্তিকসাম বিল আজলাম) করত। পাখি উড়িয়ে ভালো-মন্দের লক্ষণ বিচার এবং জ্যোতিষী ও যাদুকরদের ভবিষ্যদ্বাণীতে অন্ধ বিশ্বাস স্থাপন করত।
- অন্যান্য ধর্মের উপস্থিতি ও বিচ্যুতি:
- খ্রিস্টধর্ম: নজজরান, হিরা ও গাসসানে খ্রিস্টধর্মের প্রচলন ছিল, কিন্তু তা ত্রিত্ববাদ ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জর্জরিত ছিল।
- ইহুদিধর্ম: ইয়াসরিব (মদিনা), খায়বার ও তায়মায় ইহুদিরা বসবাস করত। তারা বর্ণবাদী অহমিকায় লিপ্ত ছিল।
- মাজুসি বা অগ্নিপূজা: পারস্য সীমান্তবর্তী এলাকায় ও বাহরাইনে অগ্নির উপাসনা প্রচলিত ছিল।
- হানিফ সম্প্রদায়: পৌত্তলিকতার ভিড়ে হাতেগোনা কয়েকজন ব্যক্তি ইব্রাহিমী একেশ্বরবাদের অনুসারী ছিলেন, যাঁদের ‘হানিফ’ বলা হতো (যেমন: ওয়ারাকা বিন নওফেল, জায়েদ বিন আমর)।
উপসংহার
ইসলাম-পূর্ব আরবের রাজনৈতিক নৈরাজ্য ও ধর্মীয় বিভ্রান্তি এমন এক অন্ধকার পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল যেখানে নৈতিকতা ও মানবতা সম্পূর্ণ বিপন্ন হয়ে পড়েছিল। এই ঘোর অমানিশা দূর করে তাওহিদভিত্তিক সুশৃঙ্খল সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুওয়ত ছিল মানবজাতির জন্য এক পরম রহমত।
২। মক্কা বিজয়ের গুরুত্ব ও তাৎপর্য বিশ্লেষণ কর।
[Analyse the importance and significance of the conquest of Mecca.]
ভূমিকা
৮ম হিজরির ২০ রমজান (৬৩০ খ্রিষ্টাব্দ) মহানবি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নেতৃত্বে রক্তপাতহীন মক্কা বিজয় বিশ্ব ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় মাইলফলক। কুরাইশদের কর্তৃক হুদায়বিয়ার সন্ধির শর্ত ভঙ্গের পর ১০,০০০ মুসলিম সেনার মক্কা অভিমুখে যাত্রা এবং কোনো রক্তপাত ছাড়াই ইসলামের মূল কেন্দ্রভূমি বিজয় সত্যের পরম বিজয় ঘোষণা করে।
মক্কা বিজয়ের পটভূমি ও কারণ
- হুদায়বিয়ার সন্ধি লঙ্ঘন: হুদায়বিয়ার সন্ধির অন্যতম শর্ত ছিল মিত্র গোত্রগুলোর নিরাপত্তা। কিন্তু কুরাইশরা তাদের মিত্র বনু বকরকে অস্ত্র ও লোকবল দিয়ে সাহায্য করে এবং তারা মুসলিমদের মিত্র বনু খুজায়াহ গোত্রের ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে হত্যাযজ্ঞ ঘটায়।
- নবির শর্ত প্রত্যাখ্যান: রাসুলুল্লাহ (সা.) কুরাইশদের তিনটি বিকল্প প্রস্তাব দেন: (১) খুজায়াহ গোত্রের রক্তের পণ দেওয়া, (২) বনু বকরের সাথে মিত্রতা বাতিল করা, অথবা (৩) হুদায়বিয়ার সন্ধি বাতিল ঘোষণা করা। কুরাইশরা অহংকারবশত সন্ধি বাতিলের পথ বেছে নেয়।
মক্কা বিজয়ের গুরুত্ব ও তাৎপর্য
- রক্তপাতহীন বিজয় ও বিশ্বস্ততার দৃষ্টান্ত: ইতিহাসে অধিকাংশ নগর বিজয় গণহত্যা ও লুণ্ঠনের মাধ্যমে অর্জিত হলেও মক্কা বিজয় ছিল সম্পূর্ণ রক্তপাতহীন ও শান্তিময়। মহানবি (সা.) মক্কায় প্রবেশের পর রক্তের কোনো প্রতিশোধ নেননি।
- সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা (العفو العام): কুরাইশরা দীর্ঘ ২১ বছর মুসলিমদের ওপর বর্ণনাতীত অত্যাচার চালিয়েছিল। কিন্তু বিজয়ের দিন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের উদ্দেশ্যে বলেন, “আজ তোমাদের বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ নেই। যাও, তোমরা সবাই মুক্ত ও স্বাধীন।” এই নজিরবিহীন ক্ষমা শত্রুদের হৃদয় জয় করে নেয়।
- কাবা ঘরের পবিত্রতা পুনরুদ্ধার ও পৌত্তলিকতার অবসান: রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বহস্তে কাবা ঘরের অভ্যন্তরের ৩৬০টি মূর্তি অপসারণ করেন এবং কুরআনুল কারিমের এই আয়াত পাঠ করেন: “বলুন, সত্য সমাগত এবং মিথ্যা অপসৃত; নিশ্চয় মিথ্যা অপসৃত হওয়ারই ছিল।” (সূরা বনি ইসরাঈল: ৮১)। এর ফলে মক্কায় শত শত বছরের পৌত্তলিকতার চির অবসান ঘটে।
- আরব উপদ্বীপে ইসলামি শক্তির নিরঙ্কুশ আধিপত্য: মক্কা বিজয়ের পর কুরাইশদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রভাব মুসলিমদের করায়ত্ত হয়। আরবের অন্যান্য গোত্র বুঝতে পারে যে ইসলামি শক্তি অপরাজেয়। দলে দলে মানুষ ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করে (আমুল উফুদ বা প্রতিনিধিদলের বছর)।
- আবু সুফিয়ানের ইসলাম গ্রহণ ও কুরাইশ নেতৃত্বের রূপান্তর: ইসলামের চরম শত্রু আবু সুফিয়ান ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তাঁর বাড়িসহ কাবার চত্বরকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
উপসংহার
মক্কা বিজয় কেবল একটি ভৌগোলিক ভূখণ্ড দখল ছিল না; এটি ছিল তাওহিদের শ্রেষ্ঠত্ব, পরমতসহিষ্ণুতা, ক্ষমা ও ইনসাফের মহোত্তম প্রকাশ। এই বিজয়ের মাধ্যমেই আরবে অখণ্ড ইসলামি রাষ্ট্রের ভিত্তি মজবুত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়।
৩। মদিনা সনদের প্রধান ধারাসমূহ উল্লেখ কর। তুমি কি এটাকে ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান মনে কর?
[Mention the main provisions of the Charter of Madina. Do you consider it as a secular constitution?]
ভূমিকা
৬২২ খ্রিষ্টাব্দে মদিনায় হিজরতের পর মহানবি হযরত মুহাম্মদ (সা.) সেখানকার মুসলিম (মুহাজির ও আনসার), ইহুদি এবং বিভিন্ন পৌত্তলিক গোত্রের মধ্যে শান্তি, সম্প্রীতি ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার লক্ষ্যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি প্রণয়ন করেন, যা ইতিহাসে ‘মদিনা সনদ’ (Charter of Madina বা Dustur al-Madina) নামে খ্যাত। এতে মোট ৪৭টি (কারো মতে ৫৩টি) ধারা লিপিবদ্ধ ছিল। এটি মানব ইতিহাসের প্রথম লিখিত সংবিধান হিসেবে স্বীকৃত।
মদিনা সনদের প্রধান ধারাসমূহ
- একক উম্মাহ গঠন: সনদে স্বাক্ষরকারী সকল মুসলিম, ইহুদি ও অমুসলিম সম্প্রদায় সম্মিলিতভাবে একটি রাজনৈতিক জাতি বা ‘একক উম্মাহ’ (Ummah Wahidah) গঠন করবে।
- ধর্মীয় স্বাধীনতা সংরক্ষণ: ইহুদিরা তাদের নিজেদের ধর্ম পালন করবে এবং মুসলিমরা তাদের ধর্ম পালন করবে। কোনো সম্প্রদায়ের ওপর জোরপূর্বক ধর্ম চাপিয়ে দেওয়া হবে না।
- মদিনার যৌথ নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা: মদিনা নগরীর ওপর বহিরাগত কোনো শত্রুর আক্রমণ হলে সকল সম্প্রদায় যৌথভাবে তা প্রতিহত করবে এবং যুদ্ধের ব্যয়ভার নিজ নিজ সম্প্রদায় বহন করবে।
- কুরাইশদের আশ্রয়দানে নিষেধাজ্ঞা: মক্কার কুরাইশ বা তাদের সহায়তাকারীদের মদিনায় কোনো প্রকার রাজনৈতিক আশ্রয় বা সাহায্য দেওয়া যাবে না।
- সর্বোচ্চ বিচারিক কর্তৃত্ব: সনদে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে কোনো বিরোধ বা বিরোধাত্মক রক্তপাত দেখা দিলে তা মহানবি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নিকট মীমাংসার জন্য পেশ করা হবে এবং আল্লাহর বিধান অনুযায়ী তার ফয়সালা হবে।
- অভ্যন্তরীণ শান্তি ও ইনসাফ: অন্যায়কারী ও অত্যাচারীকে কোনো গোত্রীয় ছাড় দেওয়া হবে না, সে নিজ গোত্রের লোক হলেও তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।
মদিনা সনদ কি ধর্মনিরপেক্ষ (Secular) সংবিধান? বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন
আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মদিনা সনদকে নিছক ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ বা সেক্যুলার সংবিধান বলা যায় কি না—এ বিষয়ে গভীর তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে:
- ধর্মনিরপেক্ষতার সমধর্মী দিকসমূহ (Pluralism & Tolerance):
- সনদে সকল ধর্মীয় সম্প্রদায়কে পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রদান করা হয়েছিল।
- নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তা প্রদানে ধর্মের ভিত্তিতে কোনো বৈষম্য করা হয়নি। ইহুদি ও অন্যান্য সম্প্রদায়কে সমান সামাজিক মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল।
- রাষ্ট্র পরিচালনায় সকল পক্ষের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়েছিল। এই দিকগুলো আধুনিক বহুত্ববাদী (Pluralistic) ও ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
- ধর্মনিরপেক্ষতা থেকে মৌলিক পার্থক্য (Theistic Foundation):
- আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষতার সংজ্ঞা: রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি থেকে ধর্মকে সম্পূর্ণ পৃথক রাখা (Separation of Church and State) এবং ঈশ্বরের সার্বভৌমত্বকে অস্বীকার করে মানবীয় সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করা।
- মদিনা সনদের ঐশী ভিত্তি: মদিনা সনদের মূল ভিত্তি ছিল আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নবুওয়াতি নেতৃত্ব। সনদের শুরুতেই বলা হয়েছিল: “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম—এটি আল্লাহর নবি মুহাম্মদের পক্ষ থেকে…” এবং বিরোধ মীমাংসার চূড়ান্ত মানদণ্ড ছিল আল্লাহর প্রত্যাদেশ (ওহি)।
- অতএব, এটি কোনো সেক্যুলার বা ধর্মহীন দলিল ছিল না; বরং এটি ছিল একত্ববাদের ছত্রছায়ায় রচিত একটি ঐশী-বহুত্ববাদী ইসলামি সাংবিধানিক রূপরেখা।
উপসংহার
মদিনা সনদ ধর্মহীন অর্থে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ ছিল না, বরং এটি ছিল ধর্মীয় সহনশীলতা ও নাগরিক সমতার এক অনন্য দলিল। আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থা যে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও বহুত্ববাদের কথা বলে, মহানবি (সা.) আজ থেকে চৌদ্দশত বছর পূর্বেই একটি ইসলামি রাষ্ট্রকাঠামোর অধীনে তা বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছিলেন।
৪। হযরত আবুবকর (রা.) কে ইসলামের ত্রাণকর্তা বলা হয় কেন? ব্যাখ্যা কর।
[Why Abu Bakar (R.) is called the savior of Islam? Explain.]
ভূমিকা
মহানবি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওফাতের পর (১১ হিজরি / ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দ) মুসলিম উম্মাহ যে নজিরবিহীন রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও মানসিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল, প্রথম খলিফা হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রা.) তাঁর অটল ঈমান, অসাধারণ প্রজ্ঞা ও আপসহীন নেতৃত্বের মাধ্যমে সেই মহাসংকট থেকে ইসলাম ও ইসলামি রাষ্ট্রকে রক্ষা করেন। এ কারণেই ঐতিহাসিকগণ তাঁকে যথার্থভাবেই ‘ইসলামের ত্রাণকর্তা’ (Savior of Islam) বলে অভিহিত করেছেন।
যেসব কারণে তাঁকে ‘ইসলামের ত্রাণকর্তা’ বলা হয়
- ১. রাসুলের ওফাতজনিত শোক ও নেতৃত্ব সংকট নিরসন: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালে সাহাবায়ে কেরাম গভীর শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েন। হযরত ওমর (রা.)-এর মতো দৃঢ় ব্যক্তিত্বও এই সত্য মেনে নিতে পারছিলেন না। হযরত আবুবকর (রা.) তখন কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করে ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন: “তোমাদের মধ্যে যারা মুহাম্মদের উপাসনা করতে, তারা জেনে রাখুক মুহাম্মদ ইন্তেকাল করেছেন; আর যারা আল্লাহর ইবাদত করতে, নিশ্চয় আল্লাহ চিরঞ্জীব, তাঁর কোনো মৃত্যু নেই।” এর মাধ্যমে উম্মাহর মধ্যে স্থিরতা ফিরে আসে এবং সাকিফা বনি সায়েদায় খিলাফতের নেতৃত্ব সংকট দূর হয়।
- ২. ভণ্ড নবিদের বিদ্রোহ দমন: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পরপরই আরবের বিভিন্ন প্রান্তে নবুওয়তের মিথ্যা দাবিদারদের উত্থান ঘটে (যেমন: মুসায়লামা আল-কাযযাব, আসওয়াদ আনসি, তুলায়হা বিন খুওয়াইলিদ এবং সাজাহ নামক এক নারী)। তারা হাজার হাজার অনুসারী জুটিয়ে মদিনা রাষ্ট্রকে ধ্বংস করতে উদ্যত হয়। হযরত আবুবকর (রা.) খালেদ বিন ওয়ালিদ (রা.)-এর নেতৃত্বে সেনাদল পাঠিয়ে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে ‘ইয়ামামার যুদ্ধ’-সহ অন্যান্য যুদ্ধে এসব ভণ্ড নবিকে সমূলে নির্মূল করেন।
- ৩. জাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে আপসহীন জিহাদ (মানিউজ জাকাত): বহু আরব গোত্র ঘোষণা করে যে তারা নামাজ পড়লেও মদিনার বাইতুল মালে জাকাত প্রদান করবে না। সাহাবিদের অনেকে সন্ধির পরামর্শ দিলেও আবুবকর (রা.) দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন: “আল্লাহর কসম! রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে যারা একটি উটের রশি পরিমাণ জাকাত দিত, আজ যদি তা দিতে অস্বীকার করে, তবে আমি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব।” তাঁর এই কঠোর পদক্ষেপে ইসলামের অন্যতম মৌলিক স্তম্ভ রক্ষা পায়।
- ৪. রিদ্দার যুদ্ধ বা ধর্মত্যাগীদের দমন: নবির মৃত্যুর পর অনেক নব্য মুসলিম ইসলাম ত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে যায়। আবুবকর (রা.) সমগ্র আরব ভূখণ্ডকে ১১টি সামরিক অঞ্চলে বিভক্ত করে যোগ্য সেনাপতিদের প্রেরণ করেন এবং সমগ্র আরব উপদ্বীপে ইসলামি শাসনের পুনঃপ্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করেন।
- ৫. ওসামা বাহিনীর অভিযান প্রেরণ: রাসুলুল্লাহ (সা.) মৃত্যুর পূর্বে রোমানদের বিরুদ্ধে ওসামা বিন জায়েদ (রা.)-এর নেতৃত্বে একটি সেনাদল প্রস্তুত করেছিলেন। চারপাশের বিশৃঙ্খলার কারণে অনেকে অভিযান স্থগিত রাখার পরামর্শ দিলেও আবুবকর (রা.) রাসুলের অন্তিম ইচ্ছাকে অগ্রাধিকার দেন। এর ফলে বহির্বিশ্বের শত্রুরা বার্তা পায় যে মদিনা রাষ্ট্র কোনোভাবেই দুর্বল হয়নি।
- ৬. পবিত্র কুরআন সংকলন: ইয়ামামার যুদ্ধে বিপুলসংখ্যক হাফেজে কুরআন সাহাবি শাহাদাতবরণ করলে হযরত ওমর (রা.)-এর পরামর্শে আবুবকর (রা.) জায়েদ বিন সাবিত (রা.)-এর নেতৃত্বে পবিত্র কুরআনকে গ্রন্থাকারে (মুসহাফ) সংকলনের ঐতিহাসিক উদ্যোগ গ্রহণ করেন, যা আল্লাহর কিতাবের চিরন্তন সংরক্ষণ নিশ্চিত করে।
উপসংহার
ঐতিহাসিক পি. কে. হিট্টি (P. K. Hitti) যথার্থই মন্তব্য করেছেন, আবুবকর না থাকলে ইসলাম হয়তো আরবের মরুভূমিতেই অঙ্কুরে বিনষ্ট হয়ে যেত। তাঁর অটল প্রত্যয় ও আত্মত্যাগের কারণেই ইসলামি খেলাফত টিকে যায় এবং বিশ্বজয়ী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের পথ সুগম হয়।
৫। হযরত ওমর (রা.) এর প্রশাসনিক ব্যবস্থা সম্পর্কে আলোচনা কর।
[Discuss about the administrative system of Hazrat Omar (R.).]
ভূমিকা
দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর শাসনকাল (৬৩৪—৬৪৪ খ্রি.) ছিল ইসলামের ইতিহাসে এক সুবর্ণ অধ্যায়। তাঁর দশ বছরের শাসনামলে ইসলামি খিলাফত পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যের বিরাট অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত হয়। এক বিশাল সাম্রাজ্যকে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার জন্য তিনি যে আধুনিক, গতিশীল ও জনকল্যাণমুখী প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলেছিলেন, তা আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদেরও বিস্মিত করে।
হযরত ওমর (রা.)-এর প্রশাসনিক কাঠামোর প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ
- মজলিসুশ শুরা বা গণতান্ত্রিক পরামর্শ পরিষদ: খলিফা কোনো স্বেচ্ছাচারী শাসক ছিলেন না। তিনি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে সাহাবায়ে কেরামের সমন্বয়ে গঠিত ‘মজলিসুশ শুরা’র পরামর্শ গ্রহণ করতেন। সাধারণ জনগণের মতামতের জন্যও বিশেষ অধিবেশন ডাকা হতো।
- প্রাদেশিক শাসন ও বিকেন্দ্রীকরণ: বিশাল সাম্রাজ্যকে শাসনকাজের সুবিধার্থে ৮টি প্রধান প্রদেশে বিভক্ত করা হয় (মক্কা, মদিনা, সিরিয়া, আল-জাজিরা, বসরা, কুফা, মিশর ও ফিলিস্তিন)। প্রতিটি প্রদেশে একজন গভর্নর বা ‘ওয়ালি’ এবং সামরিক-প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে ‘আমিল’ নিয়োগ দেওয়া হতো।
- স্বাধীন বিচারব্যবস্থা (কাজী নিয়োগ): তিনি শাসন বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করেন। প্রতিটি প্রদেশে বিজ্ঞ ও খোদাভীরু ব্যক্তিদের প্রধান বিচারপতি (কাজী) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং তাঁদের উপযুক্ত বেতনভাতা নির্ধারণ করা হয় যাতে দুর্নীতির কোনো অবকাশ না থাকে। খলিফাও আইনের ঊর্ধ্বে ছিলেন না।
- দেওয়ান ও বাইতুল মাল প্রতিষ্ঠা:
- দেওয়ানুল খারাজ: রাজস্ব আদায় ও সামরিক ভাতার হিসাব সংরক্ষণের জন্য আধুনিক রেজিস্ট্রি বা ‘দেওয়ান’ ব্যবস্থা চালু করা হয়।
- বাইতুল মাল (কেন্দ্রীয় কোষাগার): রাষ্ট্রীয় রাজস্ব সুসংহত করার জন্য বাইতুল মাল স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। জাকাত, খারাজ (ভূমিস্বত্ব কর), জিজিয়া (নিরাপত্তা কর), উশর (কৃষি কর) ও গণিমতের মাল থেকে অর্জিত রাজস্ব দরিদ্র, এতিম ও রাষ্ট্রীয় কল্যাণে ব্যয় হতো।
- জনকল্যাণ ও সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা: হযরত ওমর (রা.) নবজাতক শিশু, বৃদ্ধ, পঙ্গু এবং অমুসলিম প্রজাদের জন্যও রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা চালু করেন। দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের জন্য তিনি জরুরি খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করেন।
- পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগ (আহদাস): অপরাধ দমন ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য তিনি নৈশপ্রহরী এবং গোয়েন্দা নজরদারি ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। কর্মকর্তাদের ওপর নজরদারির জন্য বিশেষ নিরীক্ষা ব্যবস্থা ছিল।
- হিজরি সন প্রবর্তন ও অবকাঠামো উন্নয়ন: ১৬ হিজরিতে তিনি মহানবির হিজরতকে কেন্দ্র করে ইসলামি ক্যালেন্ডার বা ‘হিজরি সন’ প্রবর্তন করেন। এছাড়া যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য ডাক বিভাগ, রাস্তাঘাট, সেচ খাল এবং কুফা ও বসরার মতো নতুন পরিকল্পিত নগরী গড়ে তোলেন।
উপসংহার
হযরত ওমর (রা.)-এর প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছিল ইনসাফ, জবাবদিহিতা ও জনকল্যাণের মূর্ত প্রতীক। একজন সাধারণ নাগরিকও প্রকাশ্যে খলিফাকে জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারত। তাঁর এই প্রশাসনিক নীতি আজও বিশ্বজুড়ে সুশাসনের এক অনন্য আদর্শ হিসেবে বিবেচিত।
৬। উমাইয়া খিলাফতের পতনের কারণসমূহ বিশ্লেষণ কর।
[Analyse the causes of the downfall of Umayyad Khilafat.]
ভূমিকা
হযরত মুয়াবিয়া (রা.) কর্তৃক ৬৬১ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত উমাইয়া খিলাফত দীর্ঘ প্রায় ৯০ বছর (৬৬১—৭৫০ খ্রি.) দাপটের সাথে তিন মহাদেশব্যাপী শাসন পরিচালনা করে। কিন্তু ১৩২ হিজরি / ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে জাবের যুদ্ধে উমাইয়াদের শোচনীয় পরাজয়ের মাধ্যমে এ বংশের পতন ঘটে এবং আব্বাসীয় খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়। একটি বিশাল সাম্রাজ্যের এই আকস্মিক পতনের পেছনে বহুমুখী রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় কারণ সক্রিয় ছিল।
উমাইয়াদের পতনের প্রধান কারণসমূহ
- ১. রাজতান্ত্রিক উত্তরাধিকার নীতি ও অযোগ্য উত্তরাধিকারী: খেলাফতের গণতান্ত্রিক ও পরামর্শভিত্তিক চরিত্র নষ্ট করে মুয়াবিয়া (রা.) কর্তৃক পুত্র ইয়াজিদকে উত্তরাধিকারী মনোনয়নের মাধ্যমে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরবর্তীতে ওয়ালিদ-২, ইয়াজিদ-৩ ও ইব্রাহিমের মতো দুর্বল, আরামপ্রিয় ও অযোগ্য শাসকদের কারণে কেন্দ্রীয় শাসন ভেঙে পড়ে।
- ২. কারবালার হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডি ও জনরোষ: ৬১ হিজরিতে ইমাম হুসাইন (রা.) ও রাসুল পরিবারের সদস্যদের কারবালা প্রান্তরে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনা মুসলিম বিশ্বের বিবেককে প্রচণ্ড নাড়া দেয়। এর ফলে শিয়া ও সাধারণ মুসলমানদের মনে উমাইয়াদের প্রতি স্থায়ী ঘৃণা ও ক্ষোভের জন্ম হয়।
- ৩. মাওয়ালী বা নওমুসলিমদের প্রতি বৈষম্যমূলক নীতি: পারস্য, মিসর ও বারবার জাতির যেসব অনারব ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, তাঁদের ‘মাওয়ালী’ (Mawali) বলা হতো। উমায়ারা তাঁদের সমান মর্যাদা না দিয়ে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকের মতো আচরণ করত এবং তাঁদের ওপর থেকে জিজিয়া কর মওকুফ করতে গড়িমসি করত। এতে মাওয়ালীরা তীব্র বিদ্রোহী হয়ে ওঠে এবং আব্বাসীয়দের সাথে হাত মেলায়।
- ৪. কায়সী ও কালবী (মুদার ও হিময়ার) গোত্রীয় দ্বন্দ্ব: আরবের প্রাচীন উত্তরীয় (কায়স বা মুদার) এবং দক্ষিণীয় (কালব বা হিময়ার) গোত্রের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী শত্রুতা উমাইয়া শাসকদের পক্ষপাতিত্বের কারণে পুনরায় তীব্র রূপ নেয়। ফলে খিলাফতের সামরিক শক্তি অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।
- ৫. শিয়া ও খারেজিদের ধারাবাহিক বিদ্রোহ: কারবালার প্রতিশোধ নিতে মুখতার সাকাফি, তাওয়াবিন আন্দোলন এবং পরবর্তীকালে জায়েদ বিন আলীর নেতৃত্বে শিয়ারা ক্রমাগত বিদ্রোহ করতে থাকে। পাশাপাশি চরমপন্থী খারেজিরাও উমাইয়া শাসনের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে সাম্রাজ্যের ভিত দুর্বল করে দেয়।
- ৬. আব্বাসীয় গোপন প্রচার ও প্রচারণা (দাওয়া): মহানবির পিতৃব্য আব্বাস (রা.)-এর বংশধররা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে উমাইয়াবিরোধী গোপন প্রচারণা শুরু করে। তারা ‘আল-রেজা মিন আলে মুহাম্মদ’ (রাসুল পরিবারের যোগ্য ব্যক্তির শাসন) স্লোগান তুলে খোরাসান ও পারস্যের অসন্তুষ্ট জনগোষ্ঠীকে একত্রিত করে।
- ৭. আবু মুসলিম খোরাসানীর দক্ষ নেতৃত্ব ও জাবের যুদ্ধ: আব্বাসীয় আন্দোলনের দূরদর্শী সেনাপতি আবু মুসলিম খোরাসানী উমাইয়া বাহিনীকে পর্যুদস্ত করেন। অবশেষে ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে টাইগ্রিস নদীর তীরে ঐতিহাসিক জাবের যুদ্ধে শেষ উমাইয়া খলিফা মারওয়ান-২ শোচনীয়ভাবে পরাজিত হলে দামেস্কের উমাইয়া খিলাফতের চূড়ান্ত অবসান ঘটে।
উপসংহার
উমাইয়া বংশের পতনের মূল কারণ ছিল নৈতিক আদর্শ থেকে বিচ্যুতি, স্বজনপ্রীতি এবং অনারব মুসলিমদের ন্যায্য অধিকার হরণ। তবে দামেস্কে তাদের পতন হলেও পরবর্তীতে স্পেনে প্রথম আব্দুর রহমানের মাধ্যমে উমাইয়া শাসনের এক গৌরবোজ্জ্বল নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছিল।
খ বিভাগ (সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন)
৭। বদরের যুদ্ধের কারণ ও ফলাফল লেখ।
[Write down the causes and results of the Battle of Badar.]
ভূমিকা ও পটভূমি
২য় হিজরির ১৭ রমজান (১৭ মার্চ, ৬২৪ খ্রিষ্টাব্দ) মদিনা থেকে প্রায় ৮০ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে বদর নামক স্থানে মুসলিম ও মক্কার পৌত্তলিক কুরাইশদের মধ্যে ঐতিহাসিক বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এটি ছিল ইসলাম ও কুফরের মধ্যকার প্রথম নির্ণায়ক সম্মুখ সমর।
যুদ্ধের প্রধান কারণসমূহ
- কুরাইশদের অব্যাহত বৈরিতা: মদিনায় হিজরতের পরও কুরাইশরা মদিনা রাষ্ট্রকে ধ্বংস করতে ষড়যন্ত্র চালাচ্ছিল এবং সেখানকার অমুসলিমদের উসকানি দিচ্ছিল।
- মদিনা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবরোধ: মক্কার কাফেরদের সিরিয়াগামী বাণিজ্য কাফেলার প্রধান পথ ছিল মদিনার পাশ দিয়ে। মুসলিমরা নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে এই বাণিজ্য পথের ওপর নজরদারি শুরু করে।
- আবু সুফিয়ানের কাফেলা ও আবু জাহেলের যুদ্ধোন্মাদনা: আবু সুফিয়ানের বাণিজ্য কাফেলা আক্রান্ত হওয়ার মিথ্যা অজুহাত তুলে কুরাইশ নেতা আবু জাহেল এক হাজার সুসজ্জিত সেনাবহর নিয়ে মদিনা আক্রমণের উদ্দেশ্যে বদর প্রান্তরে উপস্থিত হয়।
যুদ্ধের ফলাফল ও গুরুত্ব
- মুসলিমদের অলৌকিক বিজয়: মাত্র ৩১৩ জন অস্ত্রহীন মুসলিম সৈন্যের হাতে ১,০০০ সুসজ্জিত কুরাইশ বাহিনী শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। স্বয়ং ফেরেশতাদের মাধ্যমে আল্লাহ মুসলিমদের সাহায্য করেন।
- কুরাইশ নেতৃত্বের ধ্বংস: ইসলামের চরম শত্রু আবু জাহেল, উতবা, শায়বা ও উমাইয়া বিন খালাফসহ ৭০ জন শীর্ষ কুরাইশ নেতা নিহত হয় এবং ৭০ জন বন্দি হয়। মুসলিমদের পক্ষে ১৪ জন সাহাবি শাহাদাতবরণ করেন।
- মদিনা রাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা: এই বিজয়ের ফলে মদিনা একটি সুসংহত সামরিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং আরব উপদ্বীপে ইসলামি রাষ্ট্রের ভিত্তি চিরতরে প্রতিষ্ঠিত হয়।
৮। হযরত মুহাম্মদ (স.) এর হিজরতের গুরুত্ব ও তাৎপর্য ব্যাখ্যা কর।
[Explain the importance and significance of migration of Hazrat Muhammad (Sm.)]
ভূমিকা ও প্রেক্ষাপট
৬২২ খ্রিষ্টাব্দে মহান আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে মহানবি হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর জন্মভূমি মক্কা ত্যাগ করে ইয়াসরিবে (মদিনা) গমন করেন। ইসলামের ইতিহাসে এই যুগান্তকারী ঘটনাকে ‘হিজরত’ (Hijrah) বলা হয়।
হিজরতের গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য
- নিপীড়িত অবস্থান থেকে সার্বভৌম রাষ্ট্রে রূপান্তর: হিজরতের পূর্বে মক্কায় মুসলিমরা ছিলেন নিপীড়িত ও সংখ্যালঘু। হিজরতের পর মদিনায় তাঁরা একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ইসলামি রাষ্ট্রের নাগরিক ও শাসকে পরিণত হন।
- মদিনা সনদ ও প্রথম সংবিধান প্রণয়ন: হিজরতের পরই রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনার বিভিন্ন ধর্ম ও গোত্রের মানুষকে নিয়ে মদিনা সনদ রচনা করেন, যা বিশ্ব ইতিহাসের প্রথম লিখিত সংবিধান।
- ভ্রাতৃত্বের অনন্য নজির (মুয়াখাত): মক্কার নিঃস্ব মুহাজিরদের সহায়তার জন্য মদিনার আনসারদের সাথে যে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন স্থাপিত হয়েছিল, তা মানব ইতিহাসের বিরল সামাজিক দৃষ্টান্ত।
- হিজরি সনের সূচনা: ইসলামের ইতিহাসে হিজরতের গুরুত্ব এতটাই অপরিসীম যে খলিফা ওমর (রা.) একে কেন্দ্র করেই ইসলামি বর্ষপঞ্জি বা হিজরি সনের গণনা শুরু করেন।
৯। হযরত আলী (রা.) ও হযরত মুয়াবিয়া (রা.) এর মধ্যকার গৃহযুদ্ধের কারণগুলো চিহ্নিত কর।
[Find out the couses of the civil war between Hazrat Ali (R.) and Hazrat Mu’awiya (R.)]
ভূমিকা
তৃতীয় খলিফা হযরত ওসমান (রা.)-এর মর্মান্তিক শাহাদাতের পর খিলাফতের মসনদে আসীন হন হযরত আলী (রা.)। কিন্তু উসমানের হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে সিরিয়ার গভর্নর হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর সাথে তাঁর চরম রাজনৈতিক বিরোধ সৃষ্টি হয়, যা অবশেষে ৩৭ হিজরিতে (৬৫৭ খ্রিষ্টাব্দ) ঐতিহাসিক সিফফিনের যুদ্ধে রূপ নেয়।
গৃহযুদ্ধের প্রধান কারণসমূহ
- ১. ওসমান (রা.)-এর রক্তের বদলা দাবি: মুয়াবিয়া (রা.) উমাইয়া গোত্রের সদস্য হিসেবে রক্তের দাবিদার হয়ে খলিফা আলীর নিকট অবিলম্বে খুনিদের বিচার দাবি করেন। অন্যদিকে আলী (রা.) মদিনার চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে আগে শৃঙ্খলা ফেরানোকে অগ্রাধিকার দেন।
- ২. মুয়াবিয়া (রা.)-এর আনুগত্য প্রকাশে অস্বীকৃতি: খলিফা আলী (রা.) সকল গভর্নরের মতো মুয়াবিয়াকেও আনুগত্যের শপথ নিতে বলেন। কিন্তু মুয়াবিয়া ওসমান হত্যার বিচার ছাড়া বায়াত নিতে অস্বীকার করেন।
- ৩. রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও গোত্রীয় প্রভাব: দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর সিরিয়ার অপ্রতিদ্বন্দ্বী গভর্নর থাকার কারণে মুয়াবিয়া (রা.) সেখানে শক্তিশালী সামরিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলেছিলেন। উমাইয়া ও হাশেমী বংশের মধ্যকার প্রাচীন আধিপত্যের প্রতিদ্বন্দ্বিতাও এর পেছনে ভূমিকা রাখে।
- ৪. সাবায়ীদের গোপন ষড়যন্ত্র: আবদুল্লাহ ইবনে সাবার অনুসারী চরমপন্থী সাবায়ীরা উভয় পক্ষের মধ্যে শান্তি আলোচনা নস্যাৎ করতে গোপনে উসকানি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করত, যাতে ওসমানের খুনিদের বিচার বিলম্বিত হয়।
১০। হযরত ওমর বিন আব্দুল আজিজ এর প্রশাসনিক ব্যবস্থা সম্পর্কে আলোচনা কর।
[Discuss about the administrative system of Hazrat Omar bin Abdul Aziz (R.)]
ভূমিকা
উমাইয়া খলিফা ওমর বিন আবদুল আজিজ (শাসনকাল: ৭১৭—৭২০ খ্রি.) ছিলেন উমাইয়া বংশের এক ব্যতিক্রমী ও পুণ্যবান শাসক। তাঁর শাসননীতি খোলাফায়ে রাশেদুনের আদর্শে পরিচালিত হওয়ায় তাঁকে ইতিহাসে ‘পঞ্চম খলিফায়ে রাশেদ’ (Fifth Righteous Caliph) বা ‘দ্বিতীয় ওমর’ বলা হয়। মাত্র আড়াই বছরের শাসনামলে তিনি খিলাফতের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন।
প্রশাসনিক ব্যবস্থার মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ
- রাজতান্ত্রিক জাঁকজমক পরিহার: ক্ষমতা গ্রহণের পরই তিনি রাজপ্রাসাদের বিলাসিতা বর্জন করেন, রাজকীয় ঘোড়া ও সম্পদ বাইতুল মালে জমা দেন এবং নিজের স্ত্রী ফাতেমার মূল্যবান অলঙ্কারও রাষ্ট্রীয় কোষাগারে দান করেন।
- জাকাত ও বাইতুল মালের সুষম বণ্টন: তিনি রাজস্ব ব্যবস্থার ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর আমলে জাকাত ব্যবস্থা এত কার্যকর হয়েছিল যে সমগ্র খিলাফতে জাকাত নেওয়ার মতো কোনো দরিদ্র মানুষ খুঁজে পাওয়া যেত না।
- মাওয়ালীদের জিজিয়া মওকুফ: তিনি ঘোষণা করেন যে কোনো ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করলেই তার ওপর থেকে জিজিয়া কর প্রত্যাহার হবে। তিনি গভর্নরদের উদ্দেশ্যে ঐতিহাসিক চিঠি লেখেন: “নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে সত্যের পথপ্রদর্শক হিসেবে পাঠিয়েছেন, কোনো কর সংগ্রাহক হিসেবে নয়।”
- আহলে বাইতের মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা: জুমার খুতবায় উমাইয়াদের প্রবর্তিত হযরত আলী (রা.)-এর প্রতি কটূক্তি করার প্রথা তিনি অবিলম্বে নিষিদ্ধ করেন এবং এর পরিবর্তে কুরআনের ইনসাফবিষয়ক আয়াত পাঠের নির্দেশ দেন। তিনি রাসুল পরিবারের ফাদাক সম্পত্তি ফেরত দেন।
- দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের অপসারণ: হাজ্জাজ বিন ইউসুফের বংশধর ও অত্যাচারী গভর্নরদের পদচ্যুত করে খোদাভীরু ও যোগ্য ব্যক্তিদের প্রশাসনিক পদে নিয়োগ দেন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. ফাজিল ১ম বর্ষের ‘মুসলমানদের ইতিহাস (৫৭০—৭৫০)’ বিষয়ের মূল পাঠ্যসূচি কী?
এ বিষয়ের মূল পাঠ্যসূচিতে ইসলাম-পূর্ব জাহেলি যুগের আরব, মহানবি (সা.)-এর পবিত্র মাক্কী ও মাদানি জীবন, খোলাফায়ে রাশেদুনের শাসনকাল (হযরত আবুবকর, ওমর, ওসমান ও আলী রা.) এবং দামেস্কের উমাইয়া খিলাফতের উত্থান-পতনের ইতিহাস বিস্তারিতভাবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
২. ইসলাম-পূর্ব আরবের আইয়ামে জাহেলিয়াত সংক্রান্ত প্রশ্নে কোন কোন দিক আলোচনা করতে হবে?
পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেতে হলে আরবের ভৌগোলিক পরিচয়, গোত্রীয় শাসনব্যবস্থা, আসাবিয়্যাহ বা গোত্রপ্রীতি, ঐতিহাসিক যুদ্ধবিগ্রহসমূহ (যেমন: বাসুস ও ফিজার যুদ্ধ) এবং ধর্মীয় পৌত্তলিকতা ও কুসংস্কার পয়েন্ট আকারে উপস্থাপন করতে হবে।
৩. মদিনা সনদ কি ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান ছিল? পরীক্ষার খাতায় কীভাবে উত্তর উপস্থাপন করা উচিত?
উত্তরে স্পষ্টভাবে লিখতে হবে যে মদিনা সনদ আজকের সংকীর্ণ ধর্মহীন সেক্যুলারিজমের অর্থে ধর্মনিরপেক্ষ ছিল না; বরং আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নেতৃত্বের অধীনে এটি ছিল বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের পারস্পরিক সহাবস্থান ও নাগরিক সমতার এক অনন্য ঐশী-বহুত্ববাদী সনদ।
৪. হযরত ওমর (রা.)-এর প্রশাসনিক সংস্কার থেকে পরীক্ষায় কোন প্রশ্নগুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ?
হযরত ওমর (রা.)-এর মজলিসুশ শুরা, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা (কাজী নিয়োগ), দেওয়ান ও বাইতুল মাল প্রতিষ্ঠা, হিজরি সনের প্রবর্তন এবং প্রাদেশিক শাসন বিকেন্দ্রীকরণের পয়েন্টগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পড়তে হবে।
৫. উমাইয়া খিলাফতের পতনের ক্ষেত্রে মাওয়ালীদের ভূমিকা কেন এত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল?
উমাইয়ারা অনারব নওমুসলিমদের (মাওয়ালী) দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক ভাবত এবং তাদের ওপর অন্যায়ভাবে কর চাপিয়ে দিত। এই ক্ষোভের সুযোগ নিয়ে আব্বাসীয়রা আবু মুসলিম খোরাসানীর নেতৃত্বে মাওয়ালীদের সংগঠিত করে উমাইয়াদের বিরুদ্ধে সফল বিদ্রোহ ঘটায়।
৬. ২০৫১০১ বিষয়ে পরীক্ষার খাতায় সর্বোচ্চ নম্বর অর্জনের সেরা কৌশল কী?
প্রতিটি ঐতিহাসিক উত্তরের শুরুতে ভূমিকা ও শেষে মূল্যায়নমূলক উপসংহার দেওয়া আবশ্যক। উত্তরের ভেতরে সুনির্দিষ্ট সাল-তারিখ, ঐতিহাসিক ও প্রাচ্যবিদদের উদ্ধৃতি এবং কুরআন-হাদিসের প্রামাণ্য দলিলের নির্ভুল উল্লেখ বেশি নম্বর পেতে সাহায্য করে।

